ঘুমের দাম

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

রবিবারের অলস সকাল ! সবে একটা গল্প পড়া শেষ করে  খোলা জানলার  দিয়ে তাকিয়ে গুনগুন করছিল রিমঝিম  ।

(রিমিঝিম ): আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়  ….

দরজা খুলে ঢোকার আওয়াজ :

(রিমিঝিম ): কিরে  আকাশ তুই ? এভাবে না বলে কয়ে এত সকালে আমার বাড়ি চলে এলি যে ! তোর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কাকিমা নিশ্চই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দিয়েছেন!

(আকাশ) : একদম ঠিক ধরেছিস ! আর সাথে এও বলেছে আবার ঢোকার চেষ্টা করলে ব্যাপার টা মোটেই আর ঘাড় অব্দি থেমে থাকবে না, কোনরকমে অন্যের কাঁধে হাসপাতালে পৌছেও শান্তি নেই ,সেই হাসপাতালের বিল নাকি আমাকেই মেটাতে হবে লোকের বাড়ি কাজ করে! তাই বাড়ি যাওয়ার সময় কাকিমাকেও আগাম কাজের কথা বলে যাব ভেবেছি ! এটুকু বলতে পারি নলিনী দি র থেকে অন্তত একদিন হলেও কম কামাই করব আমি !”

(রিমঝিম) : হাসি।

(আকাশ): ”হ্যাটা করছিস ? ভাবছিস পারব না ? রাতের খাওয়া থালা আছে নিশ্চই ? ওরই একটা ধুয়ে আমি তোকে ডেমো দেখিয়েই ছাড়ব আজ ,তারপর দেখিস তুই আয়নার বদলে সবসময় আমার ধোওয়া থালা নিয়ে ঘুরবি !”

(রিমঝিম প্রচন্ড হাসি অল্প থামিয়ে ) : “আচ্ছা একটা কথা বল ! তুই কি করে জানলি নলিনী দি খুব কামাই করে ?

(আকাশ) : “ওই তো ! নলিনী দির ডিমান্ড নিয়ে তোর কোনো আইডিয়া নেই রিমঝিম ! আমাদের পদ্মা মাসি সেই যে পদ্মার ইলিশ খেতে বাংলাদেশে গেল তারপর আর এলো না। গত কবছর পদ্মা মাসির অনাথ করে চলে যাওয়া আমাদের সং সার নলিনী দির ই হাতে ,তার একদিন কামাই তেই মার রাগের পারদ যেভাবে উপরে চরে ,আমি ভয়ে দৌড়ে গিয়ে সামনের কালী বাড়িতে একশো টাকার মিষ্টি কিনে দিয়ে আসি,পরপর দুদিন কামাই এর ধাক্কা আমরা পিতা পুত্র মিলেও সামলাতে পারব না রে ! পদ্মা মাসির ইলিশ প্রাপ্তির পর কাকিমা ই তো নলিনী দি কে আমাদের বাড়ির কাজ টা ধরিয়ে দিয়েছে আর সেই কৃতজ্ঞতা তেই তোর মতো পেত্নী কেও আমার মা তার সোনার টুকরো ছেলের গলায় ঝোলাতে রাজি ! “

(রিমঝিম  রাগের ভান করে) :  “হ্যাঁ তবে আর কি ! আমার যেন কলসী দড়ির অভাব হয়েছে !”

(আকাশ হেসে) ” আমি চটপট নিচের বাথরুম থেকে ঘুরে আসছি ,প্রকৃতির ডাক বুঝতেই পারছিস !”

(রিমঝিম হেসে) : “আচ্ছা !”

আকাশ বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই রিমঝিমের মনে পরল তাদের নিচের বাথরুমের আলো টা কাল রাত থেকেই জ্বলছে না ,আর জানলা টাও অনেকদিন বন্ধ বলে সকালবেলা তেও ভিতর টা একদম অন্ধকার,একটা টর্চ হাতে নিয়ে এগিয়ে যেতেই নিচের করিডোরের কাছে দেখল আকাশ আর নলিনী দি কথা বলছে ! রিমঝিম কে সিড়ি দিয়ে নামতে দেখেই নলিনী দি দ্রুত চলে গেল রান্না ঘরের দিকে। রিমঝিম কিছু বুঝতে না পেরে সামনে এসে দাড়াতেই  , আকাশ নিজের অপ্রস্তুত ভাব আড়াল করে বলল :

(আকাশ) “সত্যি রিমঝিম! তোদের বাড়ির এই নকশা টা যে লোকটা বানিয়েছে ,তাকে একবার দেখলে কোনো কথা না বলে আমি সাষ্টাঙ্গে প্রনাম করতাম ! কদিন না এসেই পুরো ব্যাপরটা মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। নিচের বাথরুমের যেতে গিয়ে আমি যখন এই ভুলভুলাইয়ার অসহায় শিকার ঠিক তখনি নলিনী দির সাথে দেখা ! তা না হলে তোকেই বোধহয় এই করিডোরের উপর আমার বইয়ে দেওয়া গঙ্গা যমুনা পরিস্কার করতে হত ,আমি আর দাড়াতে পারছি না রিমঝিম, ঘরে যা ,আমি আসছি !”

( দূরে হেঁটে চলে যাওয়া পায়ের শব্দ)….

রিমঝিমের মনের উথালপাতাল প্রশ্ন তার নিচে আসার আসল কারণ টাই ভুলিয়ে দিল। আকাশ তার ছোট বেলার বন্ধু ,এই বাড়িতে তার নিত্য যাতায়াত ! রিমঝিমদের বাড়ি পুরনো রাজবাড়ির ছাচে হলেও সে জানে এ বাড়ির প্রতিটা কোণা আকাশের নখদর্পনে ! ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলাতে সে আকাশকে কোনদিন হারাতে পারেনি , এমন এমন নতুন জায়গায় সে লোকাতো ,রিমঝিম কে শেষমেষ হার মানতেই হত ! সেই আকাশের আজকের কথা আর যেই হোক রিমঝিম কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারবে না ! তাহলে সত্যি টা কি ? আকাশ কেন এভাবে মিথ্যা বলল রিমঝিমকে?  শুধু একজনই পারে রিমঝিমের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ! রিমঝিম দ্রুত পায়ে রান্না ঘরের সামনে এসে  নলিনী র উদ্যেশ্যে বলল:

(রিমিঝিম ) : আমাকে যদি সত্যি টা বল নলিনী দি, কথা দিচ্ছি আমি কাউকে বলব না ! ওটা কি নলিনী দি ? ওই যে তোমার আঁচলের তলায়? দেখাও আমাকে ।

মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকা নলিনী দি এবার আঁচলের আড়াল থেকে  একটা প্যাকেট বার করে রিমঝিমের দিকে এগিয়ে দিল !

(প্যাকেট খোলার আওয়াজ)

(রিমঝিম ):  “পঞ্চম শ্রেনীর বুক লিস্ট ! আর এই বইগুলা  কার নলিনী দি ?”

(নলিনী দি) : “আমার ছেলের ! আকাশ দাদাবাবু ই গত দুবছর ধরে আমার ছোট ছেলের স্কুলের বই গুলো কিনে দেয় ! আমার বড় ছেলের পড়ার খরচ আর সংসারের হাল টানার পর মাসের শেষে হাতে আর একদম কিছুই থাকে না দিদিমণি ! ২ বছর আগে বিজয়ার দিন আকাশ দাদা বাবুদের বাড়িতে ছোট ছেলেটাকে নিয়ে গেছিলাম ,আমার কাজের ফাঁকে কখন গিয়ে ও আকাশ দাদাবাবুর ঘরে ঢুকে পরেছিল | সবসময় বকবক করা আমার রানা , আকাশ দাদাবাবুর একটাই প্রশ্নের শুধু উত্তর দিতে পারেনি ,ওর স্কুলের নাম !তারপরদিন আমি যখন ও বাড়িতে কাজ করতে যাই , আকাশ দাদাবাবু আমাকে ঘরে ডেকে বলেছিল …..

(আকাশ ) : “তুমি রানাকে বাড়ির সামনের সরকারী স্কুল টায় ভর্তি করে দাও নলিনী দি ,কিন্তু ওর খরচের টাকা আমি তোমার হাতে দেব না , আমি ওর বই কিনে দেব আর স্কুলের মাইনা ও প্রতি মাসে আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসবো , কিছু মনে কোরো না নলিনী দি,তুমি তো রানার মা , খাবার আর বইয়ের মধ্যে কখনো বাছতে হলে আমি জানি তুমি টাকা দিয়ে সবসময় ওর খাবার টাই কিনবে !“

(রিমঝিম) : “এটা আর কেউ জানে ?”

(নলিনী দি কাকুতির স্মরে) ” না দিদিমণি ! আমি আর আকাশ দাদাবাবু ছাড়া একথা আর কেউ জানে না ,আজ তুমি জানলে। আমার রানার মুখ চেয়ে একথা কাউকে বোলো না দিদিমণি,আকাশ দাদাবাবু আমাকে বলেছে অন্যের মুখে রানা একথা জানতে পারলে , শিক্ষার উপর তার জন্মগত অধিকারকে পরের দেওয়া ভিক্ষা বলে ভুল হতে পারে ,সে যে বড় যন্ত্রণা! আমি কালকেই আকাশ দাদাবাবুকে রানার বুক লিস্ট দিয়ে এসেছিলাম ,আজকে আমি যখন সকালে কাজে গেছিলাম ,দাদাবাবু ঘুমাচ্ছিল , এখন তোমাদের বাড়িতে এসে বইগুলো আমার হাতে দিয়ে বলল  “আমি কাল রাতেই কিনে রেখেছিলাম নলিনী দি ,সকালে ঘুম থেকে উঠতে খুব দেরী হয়ে গেল আমার , বিকেল অব্দি মা য়ের থেকে এই বইগুলো লুকোনোর জায়গা আমার জানা নেই ,তাই সাত সকালে রিমঝিমের বাড়িতে আসতে হলো তোমাকে এগুলো দিতে! “

(নলিনী দি একটু থেমে ) ” আর ঠিক তখনি তুমি এসে পরলে দিদিমনি ! আকাশ দাদাবাবুর চোখের ইশারায় আমি ওভাবে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম। “

রিমঝিম ভেজা চোখে আর দাড়িয়ে থাকতে না পেরে নিজের ঘরে ফিরে এসে দেখল আকাশ ওর বিছানার পাশে র চেয়ারে বসে আছে ! (আকাশ হেসে বলল)  “কিরে ? পেট পরিষ্কার করতে হল ? এবার ব্রেকফাস্ট টা জমিয়ে খাবি কি বল !”

রিমঝিম এবার আর হাসলো না , আকাশের পাশে বসে বলল ” তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব আকাশ ? “

(আকাশ ) ” এইরে! কি কথা ? প্রপোস করার প্ল্যান করিসনি তো আবার ? বলা যায় না এত সকাল সকাল তোর বাড়িতে এসেছি বলে হয়ত ভেবে বসেছিস আমার আর মেয়ে জুটছে না ,তাই মেয়ের খোঁজে এভাবে হন্যে হয়ে ঘুরছি !”

(রিমঝিম অল্প হেসে ) ,” আজকে না হলেও যদি সত্যি একদিন প্রপোস করি তাহলে কি করবি ? পালিয়ে যাবি ?”

(আকাশ  রিমঝিমের কাছে এসে বলল) ” পালাতে তো হবেই ,তবে একা পালাব না ! ভুল যে করছে উসুল তো তাকেই গুনতে হবে,এটাই যে নিয়ম !তাই আমার জ্বালায় পাগল হয়ে যখন তুই নিজের কপাল চাপড়ে ভগবানকে দুষবি ,তখন আমি হাত পা ছড়িয়ে হা হা করে হাসব! ভেবে দ্যাখ রাজি তো ?”

(রিমঝিম  খোলা জানলার দিকে মুখ করে বলল) “সময় করে ভেবে দেখব ক্ষণ !”

(আকাশ ): ” হাজার বছর সময় দিলাম তোকে ,তার মধ্যে জানালেই হবে ! এবার কি একটা প্রশ্ন আছে বলছিলি ,তাড়াতাড়ি করে ফ্যাল ,তোর যা ভুলো মন ,আমার আবার টেনসনে বিরিয়ানি হজম হয় না ,আজকে তো নেপুদার বিয়ের নেমন্তন্ন ” ।

(রিমঝিম আকাশের দিকে না তাকিয়েই বলল ) : “তোর নাম টা কে রেখেছিল রে ?”

(আকাশ 🙂 ” কোন নামটা ? আমার তো অনেক নাম ! এই যেমন হনুমান নাম টা মায়ের দেওয়া,গাধা- শুয়োর এগুলো বাবার দেওয়া,ছোট মামা র দেওয়া অনেক আদরের নাম ‘কুলাঙ্গার’! ..”

রিমঝিম এবার হাসি চেপে রাগের ভান করে আকাশের দিকে তাকাতেই সে বলল ” আরেকটা নাম আছে বুঝলি রিমঝিম ? মা বলে আমার ঠাকুমা নাকি প্রথম দিন আমাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে আমাকে ‘আকাশ দাদাভাই’ বলে আদর করেছিল ,আর সে শুনে ওই ২ ঘন্টা বয়সেই আমার আনন্দের আর কোনো সীমা পরিসীমা ছিল না ,সারা বিছানা জলে ভাসিয়ে হাত পা ছড়িয়ে গদগদ হয়ে লুটোপুটি যাকে বলে !”

(রিমঝিম খিলখিল হাসি )….

(আকাশ তার কানের কাছে মুখ এনে বলল ) ” খুব তাড়াতাড়ি তে কি বলব ভেবে না পেয়ে একদম বাজে ছড়িয়ে ফেলেছি রিমঝিম ! তোর বাড়ির দেওয়াল গুলো পর্যন্ত আমার অজুহাত শুনে একেবারে অট্টহাসিতে ফেটে পরছিল ! উপরে ওঠার সময় তোকে নলিনী দির সাথে কথা বলতে আমি দেখেছি। তাই একটা ছোট রিকোয়েস্ট আছে ! রানার কথা যেন আর কেউ জানতে না পারে ,বুঝতেই পারছিস, নলিনী দিকে পার্মানেন্ট করতে এই বুদ্ধি টা অনেক রাত জেগে মাথা থেকে বার করেছি ,সবাই জেনে গেলে আবার নতুন করে innovation এর ঝক্কি ! আমার stipend এর তুলনায় সরকারী স্কুলের আর কতই বা খরচা বল ,পদ্মা মাসি চলে যাওয়ার পর বাবার লুঙ্গি ধোয়ার ভয়ে রাত ভর ঘুম আসত না আমার , আসল কথা হলো ওই কটা টাকা দিয়ে আমি রানার জন্য বই নয় নিজের জন্য ঘুম কিনেছি,তুই তো জানিস ,আমি ছোটবেলা থেকেই ঘুমোতে বড় ভালোবাসি রে রিমঝিম । “

রিমঝিম এবার আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি ,এরকম ঘুম কেনার ইচ্ছা তোর মত যেন আরো অনেকের হয় আকাশ,তাহলেই সবার অগোচরে অনেক রানার বইয়ের খরচ উঠে যাবে !”

One thought on “ঘুমের দাম

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান