সোমবার সকালবেলা বাড়ির সামনের শিব মন্দির থেকে প্রনাম করে বেরোতেই তাথৈ দেখল ,হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে অটোর লাইনে দাড়িয়ে আছে মেঘ ! তাথৈ হেসে ওর দিকে এগিয়ে যেতেই ,মেঘ বলল “কিরে তাথৈ ! সামনে পরীক্ষা বলে এভাবে সকাল সকাল গুড়ের রসগোল্লা ভগবানের সহ্য হবে তো ? যাই বলিস ভদ্রলোক বেশ ভোজন রসিক বলতে হবে,গ্যাস অম্বলের বালাই নেই ,যে যা দেয় কোনো কথা না বলে খেয়ে নেন গপাগপ !” তাথৈ হেসে বলল , “এবার বোধহয় আর পরীক্ষায় পাশ করা হলো না রে মেঘ ,তোর লোভ দেওয়া গুড়ের রসগোল্লা ভগবানের খেতে বয়েই গেছে ,আজ আবার শিবরাত্রি ,আমার হাড়ির ঠিক পিছনেই কে.সি দাসের নাম লেখা প্যাকেটের ভিতর চারগুন বড় হাড়ি দেখে আমার আগেই মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল ,এখন তোর কথা শুনে আর কোনো আশাই বাকি রইলো না!” মেঘ বলল ” শুধু কে.সি দাস ? তুই তাহলে ভালো করে দেখিস নি তাথৈ ! গুপ্তা ব্রাদার্স ,হিন্দুস্তান সুইটস ,হলদিরাম,মৌচাক আরো কত নামী দামী প্যাকেটও নিশ্চই এই খুশি করার দৌড়ে সামিল হয়ে প্রচন্ড উত্তেজনায় সেই ভদ্রলোকের একবার চেখে দেখার অপেক্ষায় কাক ভোর থেকে প্রহর গুনছে! তোর হয়তো আমাকে লোভী বেয়াদপ মনে হচ্ছে কিন্তু সত্যি বলতে কি ,ওই প্লেট ভর্তি হরেক রকম মিষ্টির সামনে হাত জোর করে দাড়িয়ে শুধু ব্লাড সুগারের রোগী কেন যেকোনো সাধারণ মানুষেরই জিভ শুকনো রাখা অসম্ভব।মহাপুরুষ রাই বা পিছ পা কোথায় ? রামকৃষ্ণ দেব তো শুনেছি কোনো রাখ ঢাক না করে আগে নিজে চেখে তবেই তার প্রানের মা কে শেয়ার দিতেন !” উত্তরে তাথৈ বলল ” তোর মত নাস্তিকেরা ভগবানকে ভালবাসার কদর যে বুঝবে না তাতে আর আশ্চর্য কি ,তাই বলে ওত বড় মহাপুরুষের নাম নিয়ে এসব আজে বাজে বললে কোনদিন গণধোলাই না খেয়ে যাস । ” মেঘ বলল “কেন গণধোলাই কেন ? আমি কি মিথ্যা বলছি নাকি ? আমি রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র ! রামকৃষ্ণ দেবের কোলে পিঠেই মানুষ,তাই ওনার ব্যাগগ্রাউন্ড আমার থেকে তোর মত সেন্জিভিয়ার্সের পাশ করা মেয়ে বেশি জানবে ?” তাথৈ জিজ্ঞাসা করলো ,” কেন ? সেন্জিভিয়ার্সের পাশ করা মেয়েরা কি বাংলার মহাপুরুষ নিয়ে কিছু জানে না নাকি ? ” মেঘ হেসে বলল ,” মহাপুরুষ ছাড় , তোরা তো প্রচন্ড ইম্পর্টান্ট একটা সম্পর্ক নিয়েই কনফিউসড , নিজের বাবাও ফাদার ,স্কুলের প্রিন্সিপাল ও ফাদার আবার ভগবানও ফাদার ,তোদের ফাদার ডাকায় একসাথে কজনের হেচকি ওঠে একবার ভেবে দ্যাখ তো । ” তাথৈ বলল , “ভালো যা ! তোদের মত গেরুয়া পোশাক পরা লোক দেখলেই তো আর ‘মহারাজ ‘ বলে পায়ে পরে যাই না । ” মেঘ বলল “তা গেরুয়া রং যে সে রং নাকি ! ভুলে যাস না আমাদের জাতীয় পতাকাতে সবচেয়ে উপরে গেরুয়া রং!” তাথৈ বিদ্রুপের স্মরে বলল “তা সেটাও কি তোদের মহারাজ দের সাজেসন বলতে চাস ? ” মে ঘ হেসে বলল “ত্যাগ বুঝিস ত্যাগ? সাধে কি বলি সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে ? গেরুয়া হলো ত্যাগের প্রতীক।সে আর তুই কি বুঝবি? সকাল সকাল গুড়ের রসগোল্লার প্রসাদ খেয়ে শুধু ভোগ ই করে গেলি !” তাথৈ বলল “উফ ! তোর সাথে আমি তর্কে পেরে উঠব না।তা এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস ?”মে ঘ বলল “আগে বল সাথে যাবি ,তবে বলব। ” তাথৈ বলল “এখন যদিও কোনো কাজ নেই ,তা কখন ফিরবি ?”মে ঘ একটু ভেবে নিয়ে বলল “তা ঘন্টা তিনেক তো লাগবেই !” তাথৈ বলল “ওরে বাবা ! তাহলে মা কে বলে দেখতে হবে ।” মে ঘ বলল “সে আমি কাকিমাকে বলে দেব খন ,রাস্তা ঘাট ভালো না ,একটা সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে সাথে থাকলে ভরসা পাব বলে নিয়ে গিয়েছিলাম। ” তাথৈ বলল ,”মনে থাকে যেন ! মায়ের বকার সামনে তুই আমার ঢাল ,তখন কিন্তু তাড়া আছে বলে পালাতে চাইলে শুনবো না। “
অটো থেকে নেমে বেশ অনেকটা হেঁটে তাথৈ ক্লান্ত হয়ে বলল “তা আমরা কোথায় যাচ্ছি একটু বলবি? আর যে পারছি না” | মেঘ বলল “ব্যাস আরেকটু কষ্ট করে চল ! প্রায় এসে গেছি । ” একটু পরেই মেঘ একটা বাড়ির সামনে এসে বেল বাজাতেই একজন বয়স্ক লোক এসে দরজা খুলল। মেঘ বলল “নগেন কাকা ,স্যার বাড়িতে আছেন ? ” নগেন কাকা হাসিমুখে মাথা নাড়তেই মেঘ তাথৈ এর হাত ধরে বলল “চল !” ওরা দুজনে দোতলার একটা ঘরে ঢুকতেই দেখল একজন বয়স্ক মানুষ হুইল চেয়ারে বসে বই পড়ছেন। মেঘকে ঢুকতে দেখেই তিনি হেসে বললেন , “গাধা !এবারও ভুলিস নি ?” মেঘ বলল “সে আর কি করব ? নগেন কাকার হাতের রান্না খেতে আপনার বাড়িতে আসার লোভ যে কিছুতেই সামলাতে পারি না। ” মেঘের পিছনে হাত ধরা তাথৈ কে দেখে ভদ্রলোক আবার হেসে বললেন ? ” এ কে ?তোর গার্লফ্রেন্ড বুঝি ?” মেঘ বলল “পাগল হয়েছেন ?একটা সেন্জিভিয়ার্সের মেয়েকে গার্লফ্রেন্ড করলে আমার তাকে রাখা সাধের বাংলা বই গুলো যে আত্মহত্যা করবে !” ভদ্রলোক হা হা করে হেসে তাথৈ এর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন ” তা ওর কথায় তুমি কিছু মনে কোরো না মা ! এ আমার ই দোষ ,বেয়াদপ ছাত্রের হয়ে এই লজ্জিত শিক্ষক তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী । তোমার নাম কি মা ?” তাথৈ হেসে বলল ” না না ,এরকম ভাবে বলবেন না ,গীতবিতান কে যদি কেউ পেপার ওয়েট হিসেবে ব্যবহার করে ,তার জন্যে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার ওপর সন্দেহ করার মত মেয়ে তাথৈ নয় ! ” ভদ্রলোক মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল “কি সুন্দর উত্তর। আর নাম টাই বা কম যায় কিসে ? তাথৈ !এত সুন্দর নাম ছেড়ে তুই বুঝি ওকে সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে বলে ডাকিস ?” মেঘ হেসে বলল ” ওর বাংলার যুক্তাক্ষর লেখা দেখলে আপনিও বলবেন। ” মেঘের কথা শেষ না হতেই নগেন কাকা মিষ্টির প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকলো ,তাকে দেখে চেয়ারে বসে থাকা ভদ্রলোক বললেন , ” নগেন ,ওদের কে দিয়েছিস তো ? দেখিস কারো খিদে যেন বাকি না থেকে যায় ” । নগেন কাকা অল্প হেসে বলল ” তা আর বলতে ? এমন সুখের চাকরির ওপর আমার যে ভারী লোভ। ভোলাকে ওখানে দাড় করিয়ে তবে এসেছি, ওদের তো সময় লাগবে,মেঘ দাদা তো আর রোজ রোজ আসে না ,এই বিশেষ দিনে আর কতক্ষণ তাকে কিছু না খাইয়ে বসিয়ে রাখব? । ” তাথৈ কিছু বুঝতে না পেরে মেঘের দিকে তাকাতেই মেঘ ওর হাত ধরে টেনে বারান্দায় নিয়ে গেল , তাথৈ দেখল বাড়ির উঠোনে প্রায় ২৫ টা কুকুর একসাথে ভাত খাচ্ছে আর একটা কম বয়সী ছেলে কারো থালায় ভাত শেষের দিকে দেখতে পেলেই দৌড়ে গিয়ে ভরে দিয়ে আসছে । মেঘ বলল “ওরা রাস্তার কুকুর। স্যার ওদের তিন বেলা এভাবেই খেতে দেন ,শরীর খারাপ হলে চিকিৎসা করান ,বর্ষা আর শীতের দিনে প্লাস্টিক আর চাদর দিয়ে পুরো উঠোন টা ঢেকে ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন।” তাথৈ অবাক হয়ে মেঘের দিকে তাকাতেই মেঘ হেসে বলল “তুই ভুল জানতিস। আমি নাস্তিক নই তবে আমার ভগবান তোর বাড়ির পাশের মন্দিরে থাকে না তাথৈ । তাকে দেখা যায় ,ছোয়া যায় ,পায়ে হাত দিয়ে প্রনামও করা যায়।এবার চল একটা ছোট্ট কাজ বাকি আছে ।” মেঘ ঘরে ঢুকে প্যাকেট থেকে একটা টিফিন বাক্স বের করে চেয়ারে বসা ভদ্রলোকের সামনে রেখে বলল “আপনার কথা মত এবার আর মাকে হাত লাগাতে দিইনি ,নিজেই বানিয়েছি আপনার পছন্দের নলেন গুড়ের পায়েস ,কোনমতে চোখ কান বুজে কষ্ট করে খেয়ে নিন । এবারেও মোমবাতি আনিনি কারণ আমার মতে আপনার বয়স বাড়ে না,কোনদিন বাড়বে না । ” ভদ্রলোক হেসে তখনি টিফিন বাক্স টা খুলে এক চামচ মুখে দিয়ে বলল “আহ্ ! অমৃত ,এই চরম প্রাপ্তিতে আমার শিক্ষক জীবন সার্থক হল মেঘ”। তারপর তাথৈ আর মেঘের মুখে অল্প পায়েস দিয়ে তিনি হাসিমুখে বললেন ” মেঘ !তাহলে এবার তোর হ্যাপি বার্থডে গান টা হেড়ে গলায় গেয়ে ফ্যাল প্রতি বছরের মত,সেই ফাকে আমি তোর এত সুন্দর করে বানানো পায়েস টা এক নিশ্বাসে শেষ করে নি । ” মেঘ বলল “না ,আপনার এই বিদ্রুপ বছরের পর বছর আর সহ্য হচ্ছে না তাই এবার গান গাওয়ার লোক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি ” । তারপর তাথৈ র দিকে তাকিয়ে হেসে বলল ,”এই যে সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে ! একটা সুন্দর গান গেয়ে শোনা আমার ভগবান কে ,তোকে এতদূর খরচা করে নিয়ে আসার কষ্ট আমায় ভুলিয়ে দে দেখি ! ” তাথৈ মেঘের কথার উত্তর না দিয়ে হুইল চেয়ারে বসে থাকা ভদ্রলোক কে প্রনাম করে গেয়ে উঠলো :
“May God bless and keep you always
May your wishes all come true
May you always do for others
And let others do for you
May you build a ladder to the stars
And climb on every rung
May you stay forever young
Forever young, forever young
May you stay forever young।।”
ভদ্রলোক তাথৈ এর মাথায় হাত রেখে জল ভরা চোখে বলল “নিশ্চই থাকব !এত মিষ্টি মেয়ের আবদার ফেলে দেওয়ার সাধ্য যে আমার নেই। মেঘের দলে যে এবার আরো একজন সামিল হলো ,আজ থেকে আমার বুড়ো হওয়া এক্কেবারে বন্ধ । আর মেঘের ওই আবোল তাবোল কথায় তুমি একদম কান দিও না মা ,ও আমাকে খুব ভালবাসে বলেই বোধহয় এতটা বাড়িয়ে বলে। আমি একজন খুব সাধারণ অসহায় মানুষ যে নিজের পায়ে হাটতে পর্যন্ত পারে না ,ওই অবলা জীব গুলো না থাকলে আমার বেঁচে থাকা যে অসম্ভব হয়ে উঠত। আপাতদৃষ্টিতে যাই মনে হোক না কেন আসল সত্যি টা হলো আমি ওদের নয় ,ওরাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। “
তাথৈ চোখের জল আড়াল করে মেঘের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে বলল ,”মোটেই না ! আসল সত্যি টা হলো কোনো নামী দামী দোকান থেকে কেনা মিষ্টি নয় , কাঁচা হাতে তৈরী, মিষ্টি কম,পুড়ে যাওয়া পায়েস ই ভগবানের মনে এরকম সকল প্রাপ্তির অনুভূতি আনতে পারে ! ভদ্রলোক সত্যি ভোজন রসিক বলেই হয়ত ভালবাসার স্বাদকে অমৃত বলে চিনে নিতে তার এতটুকু দেরী হয় না।”