রিইউনিয়ন

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

তিন্নি আর সৃজা আজ একসাথে যাবে ওদের স্কুলের রিইউনিয়নে ! প্রথমে কিছুতেই রাজী হয়নি তিন্নি কিন্তু সৃজার নাছোরবান্দা জেদের কাছে শেষমেষ তাকে হার মানতেই হলো ! তিন্নি র বন্ধু বলতে বরাবর ওই একটাই নাম “সৃজা” তাও সৃজার একার চেষ্টা তেই বোধহয় এতদিন টিকে আছে এই ছোটবেলার বন্ধুত্ব ! তিন্নি যে সৃজার থেকে একদম আলাদা,সে অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই পারে না সৃজার মতন অমন সহজ সরল ভাবে সকলের সাথে মন খুলে গল্প করতে !স্কুলের শেষ দিনের পর তিন্নির সাথে কারোর কখনো কথা না হলেও সে জানে ,সৃজার সাথে স্কুলের অনেকের ই নিয়মিত যোগাযোগ আছে ,আর থাকবে না ই বা কেন ! সৃজার মত এত সুন্দর আর খোলা মনের মেয়ে তিন্নি আর একটাও দেখেনি ! সৃজা আর তিন্নি এক পাড়াতেই থাকে সেই ছোট্টবেলা থেকে ,স্কুলের মত তাদের কলেজ ও এক! এক সাথেই দুজনে কলেজ যাতায়াত করে ! সৃজার হরেক রকম মন ভোলানো গল্পের ঝুড়ি তিন্নির অগোচরেই তাদের গন্তব্যে পৌছে দেয় রোজ ! এছাড়াও ছুটির দিনের বেশিরভাগ টাই তিন্নির বাড়িতেই সময় কাটায় সৃজা ! তিন্নির বাবা মা ও খুব ভালবাসে সৃজাকে ,তাদের একমাত্র মেয়েটার মনের খোঁজ অনেক চেষ্টা করেও তারা কখনো পায়নি আর সৃজার উপস্থিতি তাদের এই না পারা কে কখনোই ভীষণ চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে দেয়নি ! তিন্নির অল্প কথাতেই সৃজা কেমন ভাবে যেন সেটাও বুঝে যায় যেটা চেষ্টা করেও তিন্নি ওকে বলতে পারেনি ! তাই দেখে অবাক হয়ে যাওয়া তিন্নিকে সৃজা হেসে উত্তর দেয় , “সেই ছোট থেকেই কিভাবে একই আছিস রে তুই তিন্নি ? এখনো যা ভাবিস তা কিছুতেই ঠিক ভাবে বলতে পারিস না ! যদিও আমার সাথে কথা বলতে তোর এত কষ্ট করে শব্দ উচ্চারণ করার কোনো দরকার নেই ,হাত পা নাড়িয়ে দিবি ,তাহলেই চলবে !” সৃজা না থাকলে বন্ধু কথাটা সম্পূর্ন অর্থহীন থেকে যেত তিন্নির জীবনে, সেই কৃতজ্ঞতা তেই নিজের অজ্ঞাতে সে সৃজাকে দিয়েছে তার জীবনের ওপর অবাধ অধিকার ! সেই অধিকারের অপব্যবহার সৃজা প্রায়ই করে থাকে ,এই যেমন আজকে সে তিন্নি কে প্রায় জোর করেই স্কুল রিইউনিয়নে নিয়ে যাচ্ছে এক অন্যরকম ভালোলাগার অজুহাত দেখিয়ে ! ভালোলাগা তো দূরের কথা ,সেই চেনা কিন্তু অচেনা মুখের ভিড়ের মধ্যে তার পুরনো অস্বস্তি র কথা ভেবেই অনিচ্ছা টা যেন আরো বেশী করে ঘিরে ধরছে তিন্নিকে ! সে কথা সৃজাকে বোঝাতে তিন্নি একবার চেষ্টা করেছিল যার উত্তরে সৃজা বলেছিল ” এতই যখন অসুবিধা তখন তুই যাস না তিন্নি আর আমিও যাব না ! আমার জন্য এত কষ্ট নাই বা করলি তুই ! আর সত্যি বলতে কি আমারও অত ইচ্ছা নেই কারোর সাথে দেখা করার ,নেহাত সবাই বার বার ফোন করছে তাই ! অনেকে তো শুনেছি বিদেশ থেকেও ছুটি নিয়ে আসছে শুধু এই রিইউনিয়নের জন্যে ,আর আমরা না হয় স্কুলের দু হাত দূর থেকেও গেলাম না , তাতে কার বা কি আসবে যাবে বল ! আমি এখনি ফোন করে তনিমা কে জানিয়ে দিচ্ছি আমরা দুজনে যেতে পারব না !” তিন্নি বাধ্য হয়েই তখন তার সকল অস্বস্তিকে আড়াল করে জোর করে হেসে বলেছিল “আমি না কোথায় বললাম সৃজা ?তুই তো আমাকে জানিস ,কাউকে ফোন করার দরকার নেই ,আমি যাব তোর সাথে রিইউনিয়নে !”

স্কুলে পৌছে একদম অবাক হয়ে গেল তিন্নি ,সব তো কেমন বদলে গেছে ,দেওয়ালের রং ,স্কুলে ঢোকার রাস্তা টা , ঢুকেই ডানদিকে যে বই য়ের দোকান টা ছিল সেটাও তো নেই আর ওই গেটের ডানদিকে যে একটা ছোট ঘরে বাহাদুর তার পরিবার নিয়ে থাকত ,কোথায় গেল ওরা ?এত অল্প সময়ে সব কিছু কি করে বদলে গেল ? কেমন যেন চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না তিন্নির ! হঠাৎ তার ঘোর ভাঙলো সৃজার হাতের হ্যাচকা টানে ,অধৈর্য্য গলায় বলল সৃজা” কিরে তিন্নি এখানেই দাড়িয়ে থাকবি নাকি ? চল সবাই বোধহয় এসে গেছে হবে এতক্ষণে ,আমার যে আর তর সইছে না রে ! ” বিনা প্রতিবাদে তিন্নি এগোতেই ওকে সবসময়ের মত অবাক করে দিয়ে সৃজা বলল “তুই যা ভাবছিস তা নয় তিন্নি ,সব আগের মতই আছে ,মোড়ক টা যা একটু পাল্টেছে ! ভিতরে আরো বড় একটা বইয়ের দোকান হয়েছে , বাহাদুর তার পরিবার নিয়ে এখন ওইদিক টায় থাকে ,বেশ বড় একটা দালান ঘর বানিয়ে দিয়েছে স্কুল ওদের জন্য ,ওই তো পুকুর ধারটা র দিকে গেলেই দেখতে পাবি,শুনেছি ঢোকার রাস্তা টা চওড়া খানিক টা বাধ্য হয়েই করেছে ,নাহলে বাড়তি ছাত্রের ভিড়ে প্রায়ই ছুটির সময় এখানে জ্যাম যট হত ,বাকি রইলো দেওয়ালের রং, সে তো আমাদের সময় তেও মাঝে মাঝে নতুন করে হত , তোরও মনে নেই ?এবার চল মা আমার !” তিন্নি এবার একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অল্প হেসে এগিয়ে গেল সৃজার সাথে !

“বাবারে!” স্কুলের মাঠে অগনিত মুখের ভিড় দেখে নিজের অজান্তেই অস্ফুটে বলে উঠলো তিন্নি ! সৃজা ওর হাত টা আরো শক্ত করে ধরে বলল “চল তো ,কিছু হবে না ,আমি তো আছি নাকি? তুই তো একা নস ! ভিড় দেখে মনে হচ্ছে সবাই প্রায় এসেছে ,একবছর ধরে প্ল্যান করা হয়েছে এই রিইউনিয়ন বুঝলি তিন্নি ? একবার ভাব ,কত কষ্ট করে খুঁজে বার করতে হয়েছে এত জনের ফোন নম্বর ,ইমেইল আইডি ,সবাইকে তো আর সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এ পাওয়া যায়নি ! এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এতোগুলো মাথা এক জায়গায় করা মোটেই সহজ কাজ নয় ,সত্যি তনিমাকে বাহবা না দিলে চলে না ,ওই তো প্রথম উদ্যোগী হয়েছিল এ মহাযজ্ঞে ,তারপর আরো সকলে এগিয়ে এসেছিল যদিও ,স্কুল কেও আগে থেকে জানিয়েছে ওরা ,তাই তো করা সম্ভব হয়েছে বিশাল আয়োজন ,সে যাই বলুক স্কুলের মাঠ টাই আরো বেশি নস্টালজিক করে দিচ্ছে,এই একই ব্যাপার অন্য কোথাও করলে এতটা ভাললাগা কিছুতেই আসত না ,তাই না বল তিন্নি ? !” তিন্নি শুধু মাথা নাড়িয়ে সৃজার কথায় সম্মতি জানালো।

হঠাৎ তনিমা এগিয়ে এসে সৃজা কে জড়িয়ে ধরে বলল ” কখন থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করছি আমরা  ! এত দেরী কেন করলি ? চল তাড়াতাড়ি ! আরে কি বলব ,কাউকে কাউকে তো চেনাই যাচ্ছে না সৃজা ,একেবারে পুরো চেঞ্জ ,চোখে না দেখলে তুই বিশ্বাস করতে পারবি না ,কি যে মজা আর গল্প হচ্ছে ,উফ ! এত আনন্দ হবে আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি রে ! এবার আর সৃজার হ্যাচকা টানের জবাবে সাড়া দিল না তিন্নি ,শুধু বলল ” তুই যা সৃজা ,আমি এখানেই আছি ,আমি বরং একটু আশপাশ টা ঘুরে দেখি ,অত ভিড়ে আমার দমবন্ধ হয়ে যাবে রে !” সৃজা তিন্নির অবস্থা বুঝতে পেরে এবার আর জেদ না করে বলল ” ঠিক আছে ! আমরা এখানে বেশিক্ষণ থাকব না ,একটু দেখা করে আসি সবার সাথে তারপর ই চলে যাব ,ভিড়ে আমাকে খুঁজে না পেলে আমার নম্বরে মিসড কল দিস বুঝলি ? তিন্নি হেসে মাথা নাড়াতেই সৃজা তার এতক্ষণ শক্ত করে ধরা হাত ছেড়ে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল তনিমার সাথে! তিন্নি স্কুল করিডোর পেরিয়ে এগিয়ে গেল সামনের রাস্তা দিয়ে , একটু এগোতেই তার চোখে পড়ল তার সেই চেনা পুকুর ধার । স্কুল র এই জায়গাটা ই তার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল ! নিস্তব্দ ,জনবিহীন এই শান্ত প্রকৃতির কোল তিন্নির এতক্ষণের সব অস্বস্তি ভুলিয়ে দিয়ে তার মন এক ভীষণ সুন্দর স্মৃতিতে ভরিয়ে দিল , সৃজা যখন টিফিনে বাকি দের সাথে গল্প করতে ব্যস্ত থাকত এই পুকুরের মাছ আর জলে ভাসতে থাকা রাজহাঁসের সাথেই টিফিন ভাগ করে খাওয়া ছিল তিন্নির রোজকার অভ্যেস ! তিন্নি এগিয়ে গিয়ে নতুন করে বাধানো সিড়ির উপরে বসে পরল ,পুকুরের শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে একটা নিশ্চিন্তের হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে !

হঠাৎ হাতের উপর একটা স্পর্শে চমকে উঠলো তিন্নি ! তাকাতেই দেখল একটা এলসেশিয়ান কুকুর তার হাত শুকে দেখছে। কুকুরটাকে দেখেই এক অনাবিল আনন্দে ভরে গেল তিন্নির মন ,অস্ফুটে সে বলে উঠলো “বাঘা ! আমাকে চিনতে পেরেছিস ?” কুকুরটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে তার চোখ জলে ভরে উঠলো ,তার মনে পরে গেল তার সাথে জড়িয়ে থাকা বাঘার সব স্ম্র্তি। তিন্নি যখন টিফিনের সময় এই পুকুর ধারে এসে বসত ,মাছ আর রাজহাঁস ছাড়াও তার সঙ্গী হত বাহাদুরের পোষা একটা এলসেশিয়ান কুকুর, বাঘা। প্রচন্ড তেজী হওয়া সত্তেও তিন্নির কোলের কাছে বাঘা তার মায়াভরা চোখ নিয়ে এক্কেবারে শান্ত হয়ে বসে থাকত। কোনো চাওয়া পাওয়া ছাড়াই ওরা দুজনে স্কুলের টিফিনের এই অল্প সময়টা একে অপরের পাশে বসে দিব্বি কাটিয়ে দিত। বাঘা কে বোঝানোর জন্য যেমন তিন্নিকে কোনো শব্দ ব্যবহার করতে হত না ঠিক তেমনি বাঘার চোখের ভাষা তিন্নির কাছে ছিল খুব স্পষ্ট। তিন্নি যেমন চেষ্টা করেও কাউকে কিছুতেই তার ভাবনার কথা বলতে পারে না , কেউ তাকে ভালোবেসে তার না বলা কথা বুঝে না নিলে সে যেমন অসহায় ,বাঘারও যেন সেই একই অবস্থা ,তাই বাঘার সাথে কাটানো সময়ে সে তার অক্ষমতা কে ভুলে গিয়ে এক চিরন্তন বন্ধুত্বে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিল যেখানে শব্দ ছিল একেবারেই নিষ্প্রয়োজন। আজ আবার সেই বাঘার স্পর্শে তিন্নি যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলল সেই ফেলে আসা দুপর বেলায়।

কিছুক্ষন পর তিন্নির ঘোর কাটতেই সে বুঝতে পারল বাঘা তার ভালবাসার আলিঙ্গনে সাড়া দিচ্ছে না ,তিন্নি তার চোখের দিকে তাকাতেই বুঝলো বাঘা তাকে চিনতে পারেনি ,তিন্নির এই ব্যবহার তার কাছে যেন একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তিন্নি কিছুতেই সেটা মেনে নিতে না পেরে বাঘাকে আবার জড়িয়ে ধরে বলল , “বাঘা ! আমি তিন্নি !আমাকে ভুলে গেলি তুই ?” এল্সেশ্যিয়ান কুকুরটা এবার কিছুটা অস্বস্তি প্রকাশ করে তিন্নির বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যোগী হলো ,কিছুটা এগিয়ে আরেকবার পিছনে ফিরে দেখে নিল সে তিন্নিকে ,তার চোখের চাওনি তিন্নিকে বুঝিয়ে দিল তার ভীষণ আশ্চর্য হওয়ার অভিজ্ঞতা। তিন্নির মনে হলো এ যেন কিছুতেই হতে পারে না ,বাঘার পক্ষে তিন্নিকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব , তবে কেন তিন্নির সাথে এরকম করল বাঘা , স্কুলের শেষ দিন দেখা না করার জন্য নাকি আর কোনদিন ফিরে না আসার জন্য তার এই কঠিন অভিমান ? তিন্নি উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়ে গেল বাঘার পিছন পিছন। এল্সেশ্যিয়ান কুকুরটা সেটা বুঝতে পেরে আবার তিন্নির কঠিন বাহুডোর এড়াতেই বোধহয় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়তে লাগলো।হঠাৎ সৃজার হাত তিন্নিকে টেনে ধরে বলল “তিন্নি ,এভাবে কোথায় যাচ্ছিস দৌড়ে ? আর ঘেমে নেয়ে একি অবস্থা হয়েছে তোর ?সব শেষে পুকুর ধারেও তোকে না দেখতে পেয়ে আমি তো চিন্তা করছিলাম !” তিন্নি সৃজার হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল “আমার উপর অভিমান করে ও যে এভাবে আমাকে না চেনার ভান করছে সৃজা ,আমাকে ওর কাছে ক্ষমা চাইতেই হবে। ” সৃজা তিন্নিকে ঝাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো “কি বলছিস তিন্নি ? কে তোকে চিনতে পারেনি ? ” তিন্নি জলভরা চোখে অসহায় ভাবে সৃজার দিকে তাকিয়ে বলল “বাঘা !” সৃজা বলল “তুই কি পাগল হয়ে গেছিস ? এটা কি কখনো হতে পারে ? অবলা জীবদের অত মান অভিমান বোধ থাকে নাকি ? আর কুকুর যাকে একবার দ্যাখে তাকে আর কোনোদিন ভুলতে পারে না। ” তিন্নি অস্থির ভাবে বলে উঠলো “তুই যে কেন আমাকে বিশ্বাস করছিস না ! আমার হাত ছাড় সৃজা ! ও যে ওইদিকে চলে গেল ,আমাকে যে যেতে হবে। ” সৃজা হাত না ছেড়েই বলল “তুই আমার সাথে চল ,আমি তোকে বাঘার কাছে নিয়ে যাচ্ছি ,দেখি কেমন ও তোকে চিনতে না পারে !” সৃজা তিন্নির হাত ধরে একটা দালান ঘরের সামনে নিয়ে গিয়ে ডাক দিল “বাহাদুর !” একজন নেপালী লোক বেরিয়ে আসতেই সৃজা বলল “হাম লোগকো বাঘা সে মিলনা হ্যায় ! থোরা লে চলোগে ?” নেপালী ভদ্রলোক অমায়িক হেসে জবাব দিল “জরুর দিদিমনি ! আইয়ে !” সৃজা আর তিন্নি নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করলো ,একটু পর একটা ছোট্ট ঘরের সামনে পৌছে বাহাদুর বলল ” অন্দর আইয়ে দিদিমনি!” তিন্নির পায়ের শব্দের সাথে সাথে স্পস্ট হয়ে উঠলো ঘরের ভিতরে এক আনন্দের আর্তনাদ ! তিন্নি মুহুর্তে সৃজার হাত ছাড়িয়ে ঘরে ঢুকতেই তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল তার এক অনেক চেনা ভালবাসা। তিন্নির চোখের জল ঢেকে গেল বাঘার অন্তহীন চুম্বনে। বাঘাকে জড়িয়ে ধরে তিন্নি এক পরম শান্তি অনুভব করে বলল “রাগ কমল তোর ?আমার যে বড় অন্যায় হয়ে গেছে রে বাঘা ! স্কুলের গন্ডি পেরোতেই এক ভীষণ ব্যস্ততায় আমি যে সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলাম , একবারও তোর কাছে আসার কথা আমার মনে পরেনি ,আজও সৃজা না থাকলে আমি যে কিছুতেই আসতাম না ,আর কোনদিন দেখা হত না আমাদের , তোর কাছে ক্ষমা চাওয়া যে বাকি থেকে যেত চিরকালের মত।আমাদের বন্ধুত্ব ক্ষনিকের ছিল না রে বাঘা ,আমি যে আজও তোকে ঠিক আগের মতই ভালোবাসি ,আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না সময়ের মায়াডোর আমাকে কিভাবে ভুলিয়ে দিয়েছিল তোর কাছে ফিরে আসার চেনা পথ। ” সৃজার চোখও জলে ভরে উঠলো এই চিরন্তন মুহুর্তের সাক্ষী হয়ে। বাহাদুর বলে উঠলো, ” লাগতা হ্যায় বহুত দিন বাদ দোস্ত মিল্নেকি খুশিমে বাঘা কো আপনা দরদ ইয়াদ নাহি হ্যয় !” তিন্নি অস্ফুটে বলে উঠলো “দরদ ? ” বাহাদুর বলল “হা জি দিদিমনি ! উসকা পেটমে এক অপারেশন হুয়া ,ইসিলিয়ে কুছ দিনসে উসকা বাহার নিকালনা বন্ধ করা দিয়া ,ওয়াসেভি উমার কে ওজাসে অব ও যাদা বাহার নাহি যাতা। ইসিলিয়ে হামনে এক নয়া এলসেশিয়ান বাচ্ছা লে আয়া পিছলে সাল ,ইতনা বারা কম্পাউন্ড কা সিকিউরিটি করনে কি শক্তি আব বাঘা মে নাহি রাহা!” এবার ব্যাপারটা তিন্নি আর সৃজার কাছে জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল ,বাঘাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা তিন্নির কানে সৃজা বলল “তুই সত্যি পাগল তিন্নি ! মোড়কের বদলে যাওয়া রঙ দেখেই এত ভয় পেলে হবে ? ভিতর অব্দি না গেলে বুঝবি কি করে চেনা জিনিসটা সত্যি অচেনা হয়েছে কিনা !”

সৃজার হাত ধরে বাড়ির পথে হাঁট তে থাকা তিন্নি বলল , ” আমরা এরপর মাঝে মাঝেই স্কুলে আসবো সৃজা ,বাঘার জমে থাকা কথাগুলো আজ যে সবটা শোনা হলো না !” সৃজা অল্প হেসে বলল , ” নিশ্চই আসবো!কি জানিস তিন্নি আমরা জীবনে এগিয়ে যেতে যেতে কিছু এমন সম্পর্ক কে পিছনে ফেলে যাই যারা সারাজীবন আমাদের শুধু একবার ফিরে আসার অপেক্ষায় নিস্পলকে বসে থাকে।প্রচন্ড ব্যস্ততায় নিজের মুখ অনেকদিন না দেখার পর হঠাৎ একদিন সকালে আয়নার সামনে দাড়িয়ে কোনো মানুষ যেমন নিজের অস্তি ত্ব নিয়ে মুহুর্তের জন্য হলেও সন্দেহ প্রকাশ করে ,ঠিক তেমনি আমাদের ভুলে যাওয়া সম্পর্ক গুলো হঠাৎ চোখের সামনে চলে এলে আমাদের মন নিজের প্রতি এক ভীষণ অবিশ্বাসে একেবারে দিশেহারা হয়ে পরে । জীবনে এগিয়ে যাওয়াটাই নিয়ম হলেও , কিছু সময় যে হাতে রাখতে হয় ফিরে দেখার জন্য ,অনেক দেরী হয়ে গেলে নিজেকে যে কিছুতেই ক্ষমা করা যায় না রে তিন্নি।”

তিন্নি সৃজাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেদে বলল ” আমি কি খুব দেরী করে ফেলেছি সৃজা ? বাঘা সব অভিমান ভুলে আমাকে সত্যি ক্ষমা করে দেবে তো ? ” সৃজা অল্প হেসে বলল ” ধুর বোকা মেয়ে ! সত্যি দেরী হয়ে গেলে আজকের রিইউনিয়ন যে অসম্পূর্ণ থেকে যেত আর অভিমান করে চিরকাল দূরে সরে থাকতে শুধু যে মানুষ ই পারে ,তোর বাঘার যে সে কৌশল জানা নেই। “

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান