তিতাসের সুখের সন্ধান

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বার বার ফোনের শব্দে তিতাসের বিরক্তি যেন এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল! ফোন টা সাইলেন্ট করে ডেস্ক থেকে উঠে হাতে কফি নিয়ে করিডোরের জানলার সামনে দাড়ালো সে! সামনে রাস্তার অগনিত চলন্ত গাড়ি র দিকে তাকিয়ে তিতাসের মনে হলো সবকিছু যেন কিছুক্ষণের জন্য একদম থেমে যায় ,সবকিছু মানে সবকিছু !এই ব্যস্ত দৈনন্দিন জীবন ,আশেপাশে বসে থাকা মানুষ গুলোর অবান্তর বাক্যালাপ , তার জীবনের ওপর চারিদিকের এই নতুন প্রযুক্তির নিরন্তর টহলদারী ,সব কিছু থেকে যেন মুহুর্তের জন্য হলেও মুক্তি চায় তিতাস!

হঠাৎ বর্ণালী দি তার পিঠে হাত রেখে বলল ” কিরে তিতাস! এখানে একা একা দাড়িয়ে আছিস যে ? মন খারাপ ?”

একদম কথা বলতে ইচ্ছা করছে না তিতাসের আর বিশেষ করে বর্ণালী দির সাথে তো নয় ই , অন্যের জীবনের ওপর সবসময় বর্ণালী দির এই অদম্য কৌতুহলের কোনো কারণ এতদিনেও খুঁজে পায়নি তিতাস !

যথাসম্ভব ভদ্রতার হাসি মেখে সে জবাব দিল , “কই না তো ! এই একটু ক্লান্ত বলতে পারো !”

এবার বর্ণালী দি তিতাসের অনেকদিনের চেনা সবজান্তার হাসি মেখে বলল , ” আমি সব শুনেছি রে তিতাস! এবার তোদের টিমে নীলিমা আর শুভঙ্কর ছাড়া আর কারোর প্রমোশন হয়নি ,আমি জানি তুই ওদের চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য কিন্তু তোর নিশ্চই জানতে বাকি নেই নীলিমার সাথে বড়কর্তার মাখামাখির কথা আর শুভঙ্করের কথা যদি বলিস ,ও তো শুনেছি বড়কর্তার রোজের ফাই ফরমাস অব্দি খেটে দেয় ! তাহলে কেন তুই এই নিয়ে বেকার এত মন খারাপ করছিস ?”

এবার চেষ্টা করেও তিতাস আর হাসতে পারল না ,বর্ণালী দির দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি তো তোমাকে আগেই বললাম বর্ণালী দি ,আমার মন খারাপ নয় ! নীলিমার সাথে আমার খুব ই অল্প কথা হয় ,কাউকে না জেনে তার চরিত্র নিয়ে কোনো মন্তব্য করা অন্যায় হবে আর শুভঙ্করের সাথে আমি অনেকদিন কাজ করছি ,শুধু colleague বললে ভুল হবে ,ও আমার খুব ভালো বন্ধু,তাই ওর প্রমোশন পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে অন্য কারো থাকতে পারে কিন্তু আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই ! ”

বর্ণালী দি আবার কিছু বলতে যাওয়ায় তিতাস একটু হেসে বলল , ” এখন আমাকে ডেস্ক এ ফিরতে হবে বর্ণালী দি ,একটা মিটিং আছে একটু পরে ,আবার পরে কথা বলছি তোমার সাথে! ”

অফিস বাসে র জানলা দিয়ে বাইরে দেখতে দেখতে তিতাস আবার ভাবনায় তলিয়ে গেল ! রোজকারের একঘেয়েমি নিয়মের ঘেরাটোপে নিজেকে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলছে তিতাস ,তার নিজের মত বাঁচতে চাওয়া মন যে কি পেলে খুশি হবে ,এত চেষ্টা করেও তার উত্তর কিছুতেই সে খুঁজে পায় না ! ভালো রেসাল্ট র পর ভালো চাকরি , সচ্ছল আর্থিক অবস্থা , অল্প সময়ে পাওয়া এত সাফল্য তিতাসকে তার বয়সী অনেকের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে নিয়ে গেছে ! তবুও কেন কোনোকিছুই মিটিয়ে দিতে পারে না তার মনের সেই অজানা অদৃশ্য আকাঙ্খাকে ! বর্ণালী দির কথা অনুযায়ী এবারে প্রমোশন না পাওয়াই যদি তার মন খারাপের কারণ হয় ,তাহলে এর আগে যখন প্রমোশন পেয়েছে সে , সেই খুশির হাসিতে আশেপাশের সকলে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিয়ে আশ্বাস দিলেও , একটি বার ও কেন সে সাড়া পায় নি তার ভিতরের মেয়ে টার থেকে !একমাত্র বাবা ই তার এই নিরন্তর অস্বস্তি বুঝতে পেরে বলে,

“মনের খিদে মেটানো কি আর অত সহজ রে মা ? বেশির ভাগ মানুষ ই তো সেই খিদের সাথে আপোস করে কাটিয়ে দেয় সারা টা জীবন ! কিন্তু তুই চেষ্টা ছাড়িস না ! শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খুঁজে বেড়াতে থাক কিসে তার মুক্তি ,কোথায় তার চিরন্তন আনন্দ ,হাতে সময় যে খুব কম !”

শনিবারের সকালে তিতাসের ঘুম ভাঙ্গলো ফোনে সমুদ্রের গলার আওয়াজে , ” উঠুন Madam! সূর্য দেবের উপর কৃপা করুন এবার !”

তিতাস চোখ না খুলেই হেসে বলল ” তুই বাড়িতে এসেছিস বুঝি ?”

সমুদ্র : ” তা নয় তো কি ? তোর মত তো বাড়ি তে থেকে আরামের ১০ টা – ৫ টা অফিস না আমার , সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয় কোনো রকমে মেসের খাবার গলা দিয়ে নামালেও শনি রবিতে আর পারলাম না ,তাই ভোর ভোর চলে এসেছি বাড়ি ,মা র হাতের রান্না খেতে ! ছাপোষা ,অতিসাধারণ ,ঘরকুনো বাঙালি আমি ,বুঝলি কিনা !”

তিতাস (এবার চোখ বুজে আবার পাশ ফিরে শুয়ে বলল ) : ” সবই তো বুঝলাম ,শুধু অতিসাধারণ বিশেষণ টা IIT খরগপুর থেকে পিএইচডি করছে যে ছেলে ,তাকে মানায় না ! ”

সমুদ্র (প্রচন্ড হেসে) : ” তাই বুঝি ? তোর কি তবে আশেপাশের ডিগ্রী ধারী সব মানুষ কেই খুব অসাধারণ বলে মনে হয় ? যত বেশি তাগড়াই ডিগ্রী ,অসাধারণের দৌড়ে তত বেশি উচুতে তার সিংহাসন ,তাই তো ? ”

তিতাস : ” অসাধারণ না হলেই যে অতিসাধারণ হতে হবে তার কি কোনো মানে আছে সমুদ্র ? মাঝামাঝি বলেও তো একটা কথা হয় !”

সমুদ্র : ” বাহ! একটা যন্ত্র বানালে হয় ! ভাবছি পিএইচডি র সাবজেক্ট টা বদলে দেব ,একটা অভিনব মানুষ বিচার করার যন্ত্র বুঝলি তিতাস ! সাধারণ মানুষের জন্য মানে এই ধর ব্যাচেলর ডিগ্রী ধারণ কারী দের জন্য, যন্ত্রের কাটা টা সবসময় মাঝ বরাবর থাকবে !একবার ভাব সেই উত্তেজনার মুহূর্ত , যন্ত্রে কেউ ডিগ্রী এন্ট্রি করছে :মাস্টার্স ,পিএইচডি ,পোস্ট পিএইচডি ,অনেক সাবজেক্ট এ পিএইচডি ,আর প্রচন্ড টেনসনে তাকিয়ে আছে যন্ত্রের কাটার দিকে , যন্ত্রের কাটা ঠিক কতটা টা ডানদিকে সরবে নাহলে কিভাবে পাবে সে বিশ্বদরবারে অসাধারনের সিংহাসন ! কপাল খারাপ মুর্খ গরিব মানুষদের জন্য যন্ত্রের কাটা বন্ধ ঘড়ির মত সবসময় বাদিকে ঘেষেই থাকবে , তাই এখনকার মতই তাদের হেট মাথা হেট ই থাকবে , আমার যন্ত্র ওদের জন্য নয় ,যতসব অতিসাধারনের দল ! কিছুই হবে না এদের !বার্ষিক রোজগার আর সম্পত্তির হিসেব দেবার সুবিধাও রাখব বুঝলি ,নাহলে নামকরা ব্যবসায়ী ,মন্ত্রিবর্গরা তো এই দৌড়ে পিছিয়ে পরবে ,তাদের রাগ আমার এই অভূতপূর্ব যন্ত্র টাকে ভালো বাজার করতে দেবে না ! ”

তিতাস (এবার হেসে ফেলে বলল) : ” হয়েছে ? সকাল সকাল ঘুম ভাঙিয়ে হল না শুধু ,এইসব বাজে বকে মাথা টা ব্যথা করে দিলি !এবার বল কি চাই তোর ? ”

সমুদ্র : “দেখা করবি ?আমার বাড়িতে চলে আসিস বিকেলের দিকে ,এই ধর ৬ টা ! ”

তিতাস : “আচ্ছা ,পৌছে যাব ,এবার ঘুমোতে দে আমাকে ,রাখলাম!”

সমুদ্রের মত কাছের বন্ধু তিতাসের খুব কম ই আছে তাই তার কোনো আবদারেই তিতাস না বলতে পারে না ! অগত্যা কথামতো সময়ে সমুদ্রের বাড়ি পৌঁছাল তিতাস।

সমুদ্রের মা দরজা খুলে খুব চেনা হাসি মেখে বলল ” ভিতরে এসো তিতাস ! বাপান আমাকে বলে গেছে তুমি আসবে ,একটু বসো ,ও চলে আসবে এখনি!”

(সমুদ্রের মা ওর ঘরের আলো জ্বেলে জানলা টা খুলে দিয়ে বলল) ” তুমি একটু বসো ,আমি চট করে সন্ধ্যে দিয়ে আসি !”

তিতাস (অল্প হেসে ) “আচ্ছা কাকিমা !”

সমুদ্রের মা চলে যেতেই তিতাস তাক থেকে একটা বই নিয়ে পাতা ওল্টাতে লাগলো , কিছুক্ষণ পর টেবিলের সোজাসুজি খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে দেখল সামনের মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছে !আরো যা দেখল তাতে তার মনে হলো এখনি সে সমু দ্রের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে , আর এক মুহূর্ত অপেক্ষার কোনো মানে হয় না ! তিতাস ব্যাগ টা নিয়ে বেরোতে যাবে তখনি সমুদ্রের মা হাসিমুখে একটা মিষ্টির প্লেট নিয়ে ঘরে এসে ঢুকলো !

প্লেট টা তিতাসের সামনে রেখে বলল “এটুকু খেয়ে নাও !আর বোলো না ,গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তো ছেলের কোনো পাত্তাই নেই ,ফোনেই কথা হচ্ছিল ,বলে কি একটা রিসার্চ এর কাজে ব্যস্ত তাই আসতে পারছে না ,তাই যথারীতি মন টা খুবই খারাপ ছিল কদিন ,আজ একেবারে ভোরবেলা দরজা খুলে দেখি মূর্তিমান না বলে কয়ে এসে হাজির , এমন ভাবে জড়িয়ে ধরল এতদিনের জমে থাকা রাগ আর দেখাতেই পারলাম না ! আমাকে বলে কি আমার হাতের খাবার জন্য মন কেমন করছিল তাই সব ছেড়ে পালিয়ে এসেছে ! হ্যাঁ ! তাই আর কি ! ও বোঝালেই আমি বুঝব ! মাকে ঠকানো র চেষ্টাই শুধু করা যায় , নিজের পেটের ছেলেকে চিনতে যেন আমার এখনো বাকি আছে ! ঠিক যা ভেবেছি ! , একটু পরই পাড়া র ক্লাবের ছেলেদের হাক ডাক ” ও কাকিমা! বাপান দা আসেনি ? ১৫ ই আগস্ট র ম্যাচ আছে তো !”

ও মনি দেখি মূর্তিমান জার্সি পরে নিচে এসে বলে ‘মা একটু ঘুরে আসি বুঝলে ! এসেই যখন গেছি আর ওরা এতবার ডাকছে আমাকে ,একবার না যাওয়া টা অন্যায় হবে ! তোমার ভয় নেই ,এবার পা মচকালে আর চুন হলুদ লাগবে না ,দারুন স্প্রে কিনে এনেছি আমি !”

সামনে দাড়িয়ে থাকা পাড়ার ছেলেদের মুখ চিপে হাসি দেখে আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না কিছু ! কিন্তু পাগল ছেলের মা রা তো বরাবরই আমার মত অসহায় তিতাস ,এখন আবার সেই হাত পা ভেঙ্গে ফিরে আসার অপেক্ষা ছাড়া কিছুই করার নেই !”

তিতাস (এবার হেসে জানলার দিকে তাকিয়ে বলল) ” আজ হাত পা অক্ষত আছে বলেই মনে হয় কাকিমা ,নাহলে ভাঙ্গা হাত পা নিয়ে এইভাবে বাদর নাচা সম্ভব হত না !”

সমুদ্রের মা জানলা দিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল “দেখেছ কান্ড ! বয়স টাই বেড়েছে শুধু !”

সমুদ্র কাদা জামায় হাতে একটা কাপ নিয়ে হাফাতে হাফাতে ঘরে ঢুকে টেবিলে বসে বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা তিতাসের সামনে কাপ টা রেখে বলল ” আমাদের ক্লাব আজ ৩ গোলে জিতে চ্যাম্পিয়ন তিতাস !আর আমি ২ বছর পর আবার ম্যান অফ দ্য ম্যাচ ! আমি তোকে বলে বোঝাতে পারব না এই মুহুর্তে আমার মনের অবস্থা !”

তিতাস হাত ঘড়িতে সময় টা দেখে নিল , রাত ৭ : ৩০ ! তারপর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে জোর করে হেসে বলল “বাহ ! অভাবনীয় সাফল্য! Congratulation!”

সমুদ্র তিতাসের রাগ বুঝতে পেরে বলল “সরি রে ,খুব দেরী হয়ে গেল ! মা বলেই বোধহয় তোকে

এতক্ষ ন বসিয়ে রাখতে পেরেছে , নাহলে জানলা দিয়ে আমাকে খেলতে দেখার পর , হাসিমুখে আমার অপেক্ষা করার মেয়ে তো তুই নস তিতাস! নয় নয় করে হলেও অন্তত ১৫ দিন আমার ফোন ধরতিস না ! বিশ্বাস কর আমি বুঝতে পারিনি এত দেরী হয়ে যাবে ,আসলে ফাইনাল ম্যাচের ওভারটাইম টা সব হিসেব গন্ডগোল করে দিল !”

তিতাস যথাসম্ভব রাগ চেপে নির্বিকার ভাবে বলল ” তুই শুধু শুধু পিএইচডি করে নিজের সময় নষ্ট করছিস সমুদ্র , ফুটবলে তো শুনেছি এখন ভালো খেলোয়ারের খুব অভাব !”

সমুদ্র বিদ্রুপ টা বুঝেও না বোঝার ভান করে বলল ” এসব বাজে কথা কে বলল তোকে ? ফুটবলে ভালো দলে চান্স পাওয়া পিএইচডি করার থেকেও অনেক বেশি কঠিন ,পিএইচডি পড়াশোনা র ইচ্ছা আর ধৈর্য্য থাকলেই করা যায় ,কিন্তু ভালো ফুটবল খেলতে হলে জন্মগত প্রতিভা লাগে, বুঝলি ? ”

তিতাস (একইরকম নির্বিকার ভাবে জবাব দিল): “আমি সেটাই তো বলছি সমুদ্র ! প্রতিভা যখন তোর আছে ,সেটা ঠিক জায়গায় ব্যবহার কর!”

সমুদ্র এবার অল্প হেসে বলল ” আমার তো সেই প্রতিভা নেই তিতাস,কোনদিন ছিল ও না ! তবে প্রচন্ড এক ভালবাসা আছে ,তাই খেলি ! ফুটবল মাঠের মত আনন্দ আমি যে আর কোনো কিছুতেই পাই না রে ! পিএইচডি আমার পেটের খিদে মেটাবে ঠিকই কিন্তু আমার মনের খিদের কি হবে ! তার ব্যবস্থা ও তো আমাকেই করতে হবে ,নাহলে তো এই যান্ত্রিক জগতে আমি বাঁচতে পারব না !”

এবার তিতাস কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল,কেমন যেন সেই এলোমেলো চিন্তা গুলো আবার ঘিরে ধরল তাকে !

টেবিল থেকে উঠে সমুদ্রকে বলল ,”আমাকে এখন বাড়ি যেতে হবে সমুদ্র ,অনেক রাত হয়ে গেছে!”

সমুদ্র (কি বলবে কিছু বুঝতে না পেরে বলল) : ” তিতাস ,আমার ওপর আর রেগে থাকিস না please,আরেকটু অপেক্ষা কর ,আমি ২ মিনিটে স্নান সেরেই তোকে বাড়ি পৌছে দিয়ে আসবো ,আর রাস্তায় যেতে যেতে তোকে এতদিনের জমা কথাগুলো বলাও হয়ে যাবে !”

চিন্তায় মগ্ন তিতাস যেন শুনতেই পেল না সমুদ্রের কথাগুলো , শুধু বলল , “এখন আমি আসি রে সমুদ্র ! নাহলে সত্যি অনেক দেরী হয়ে যাবে !”

ঝড়ের বেগে সমুদ্রের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল তিতাস ,প্রায় এক নিশ্বাসে দৌড়ে বাড়ি ফিরে উদ্ভ্রান্তের মত নিজের পড়ার ঘরের আলমারি খুলে একটা পুরনো বাক্স টেনে বের করে আনলো !বাক্সের উপর জমে যাওয়া ধুলোগুলো সযত্নে হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তিতাস খুলে ফেলল বাক্স টা ,নিজের অজান্তেই চোখে ভিজে গেল তার নিজের লেখা বাক্সবন্দী কবিতার খাতা গুলো দেখে ! উচ্চমাধ্যমিকে অঙ্কে লেটার পায়নি তিতাস ,তাই অনেক ভালো কলেজেই সাইন্স বিভাগে জায়গা হয়নি তার আর এজন্যে প্রায় সকলেই দায়ী করেছিল তার সাহিত্যের ওপর অকারণ ভালবাসা কে, যা কিছুতেই তাকে সাফল্যের সহজ পথের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত না ! তার ওপর শিক্ষক দের অগাধ বিশ্বাস , মাধ্যমিকের মতই উচ্চমাধ্যমিকেও স্কুল র মুখোজ্বল করার প্রচন্ড আশা ,অনেক চেষ্টা করেও পূরণ করতে পারেনি তিতাস ,আর তার জন্যে আর সকলের মত সে নিজেও দায়ী করেছিল তার আলমারির তাকে সাজিয়ে রাখা শরৎচন্দ্র ,বঙ্কিম চন্দ্র ,বিভূতিভূষণ ,সত্যজিৎ রায় ,তারাশঙ্করের বইগুলোকে ! আর তার থেকেও বেশি অপরাধী হয়ে উঠেছিল তার এই কবিতার খাতাগুলো যার অনির্বার হাতছানি একদিনের জন্যও এড়াতে পারতনা তিতাস ,কোন এক মোহনী শক্তির টানে বিনা প্রতিবাদে সে হারিয়ে যেত এক অনন্ত শব্দ মিলের জগতে ! সে এক এমন অন্তহীন ভালবাসা র দুনিয়া যার নেশা তিতাস অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারেনি ! সেই অন্তরের ভালোবাসাকে সকলের চোখে কিভাবে অপরাধী হয়ে থাকতে দিত তিতাস ? তাই সকল যন্ত্রণা কে উপেক্ষা করে নিজের হাতে সে বাক্সবন্দী করে ফেলেছিল তার সকল ভালবাসার মুহূর্ত ,তার জীবনে সহজ সাফল্যের রাস্তা পরিষ্কার করতে তিতাস নিশ্চিত করেছিল তার নিজের সৃষ্টির এই অনন্ত নির্বাসন ! আর সত্যি তার পর আর কখনো পিছন ফিরে দেখতে হয়নি তিতাসকে ,এরপরের রেসাল্ট র দিনগুলোতে আর কেউ কোনদিন অপরাধী করতে পারেনি তার ভালোবাসাকে ! একের পর এক পাওয়া সাফল্য তিতাস কে কখন ভুলিয়ে দিয়েছিল সেই কিশোরী মেয়েটার নির্বাসিত ভালবাসার কথা! এতদিন পর সে বুকে জড়িয়ে ধরল আবার সেই হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে ! এক চিরন্তন শান্তি আর সীমাহীন আনন্দে তিতাসের চোখ দিয়ে বয়ে চলল ভালবাসার সমুদ্র!

হঠাৎ বাবা কে ঘরে ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে নিল তিতাস। তারপর নিজেকে সামলে বাবাকে বলল “ওই একটা পুরোনো জিনিস খুঁজে পাচ্ছিলাম না তাই এই বাক্স গুলো একবার নামিয়েছিলাম ,আমাকে কিছু বলবে তুমি ?”

তিতাসের বাবা (অল্প হেসে বলল )” আমি জানতাম সেই হারিয়ে যাওয়া জিনিস কোথায় আছে ! কিন্তু কি জানিস মা ,কিছু জিনিস যে শুধু নিজেকেই খুঁজে পেতে হয় ,অন্য কেউ তার সন্ধান বলে দিলে সত্যিকারের খোঁজের ওপর অবিচার করা হয় যে !”

তিতাস আর কান্না চেপে রাখতে পারল না ,বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল “আমি এই অচেনা জগতে আর কিছুতেই নিজেকে হারিয়ে যেতে দেব না বাবা ,তোমার তিতাস এখন জানে তার মন কি চায় ,কিসে তার আনন্দ ,কোথায় তার মুক্তি! শুধু একটু দেরী হয়ে গেল এই যা !”

বাবা এবার জোরে হেসে উঠলো ,তারপর তিতাসের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল “ধুর! বোকা মেয়ে ,নিজের অন্তরাত্মা র সুখের চাবি যে কোথায় লোকানো ,সেই তো আমাদের এই ছোট্ট জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য ,জীবনের শেষ দিনেও তার সন্ধান পাওয়াকে কিছুতেই যে দেরী বলা চলে না। ”

ধন্যবাদ ,

রোমি

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান