ফেলুদার যোগ্য বউ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

“তুই কাকে বিয়ে করবি তিতির ? ” সোনা কাকুর প্রশ্নের উত্তরে গল্পের বই থেকে মুখ না তুলেই তিতির জবাব দিল “ফেলুদাকে !”সোনা কাকু হেসে বলল ” সামনের চায়ের দোকানের ফেলুদা ? ” তিতির মাথাটা দুদিকে নাড়িয়ে বলল “না! সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা !” সোনা কাকু বলল “আচ্ছা , কিন্তু কোন ফেলুদা ? সৌমিত্র চ্যাটার্জী ,সব্যসাচী চক্রবর্তী নাকি আবীর চ্যাটার্জী ? ” তিতির নির্বিকার ভাবে বলল “প্রদোষ মিত্র!” সোনা কাকু এবার আপাত গম্ভীর ভাবে বলল “তোর পছন্দ সত্যি প্রশংসনীয় তিতির ,পাত্র হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়ে আমার কেন, কারোর কোনো সন্দেহের অবকাশ সে রাখেনি কিন্তু তাকে তোর মনের কথা জানিয়েছিস কি ?” তিতির বলল ” না !সরাসরি বলিনি তবে তার প্রত্যেকটা গল্প এভাবে বার বার করে পড়া , বিশেষ করে তার মুখ থেকে বেরোনো কথা গুলো একেবারে মুখস্থ করে ফেলার কারণ আর যার হোক তার মত বুদ্ধিমান মানুষের তো না বোঝার কথা নয় !” সোনা কাকু বলল ” তা সে ও কি তোকে বিয়ে করতে রাজী ?” তিতির নির্বিকার ভাবে বলল ” নাহলে সাতাশ বছর বয়স অব্দি তার কোনো মেয়ে বন্ধু না থাকার কারণ আর কি বা হতে পারে তুমি ই বল সোনা কাকু ?” সোনা কাকু গম্ভীর ভাবে বলল “তা বটে !!”

হঠাৎ সোনা কাকুর ফোনটা বেজে উঠলো। তিতির শুনলো সোনাকাকুর চিন্তিত গলার স্মর “আচ্ছা,আমি নিশ্চই যাব !” তিতির বই টা নামিয়ে রেখে বলল ” কি হয়েছে সোনা কাকু ?” সোনা কাকু বলল “অনন্তের ফোন ছিল ,ওর মাসতুতো বোন নাকি খুব অসুস্থ ,খুব করে বলল আমি যদি পারি তাহলে যেন একবার গিয়ে দেখে আসি !” তিতির বলল ” তা এতে চিন্তিত হবার কি আছে ? এত বড় ডাক্তার তুমি আর অনন্ত কাকু তো তোমার পুরনো বন্ধু!” সোনাকাকু বলল ” না রে তিতির, ব্যাপারটা অত সহজ নয় ,যে অসুখের কথা অনন্ত বলল তার চিকিৎসা ডাক্তারি শাস্ত্রে আছে বলে আমার জানা নেই! তাই আমি গিয়ে কতটা কি করতে পারব সন্দেহ হচ্ছে !” তিতির বলল “মানে ? কি অসুখ ?” সোনাকাকু চিন্তিত মুখে বলল “অনন্তের বোনকে নাকি ভুতে ধরেছে !” তিতির অল্প হেসে বলল ” তাই নাকি ? আমার যে ভূত দেখার ইচ্ছা সেই ছোটবেলা থেকে ,আমাকেও সাথে নিয়ে চলো সোনাকাকু ,রথ দেখা আর কলা বেচা দুই হবে !” সোনাকাকু বলল ” রথ দেখা আর কলা বেচা ? স্কুলে যে কি শেখাচ্ছে তোকে কে জানে ! এই কথা টার মানে তখনি হয় যখন ২ টো কাজ একটা লোকই করে ,আর এখানে আমি করব চিকিৎসা আর তুই দেখবি ভূত ! ” তিতির হেসে বলল “ওই হল ,তুমি আর আমি কি আলাদা নাকি ?” সেই শুনে সোনা কাকু আবার আপাত গম্ভীর ভাবে বলল “বুঝলাম !!”

তিতির আর সোনাকাকু গাড়ি থেকে নেমে একটা বাড়ির সামনে এসে দাড়ালো ,সোনাকাকু বলল “অনন্তের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী এই বাড়িটাই মনে হচ্ছে বুঝলি তিতির ?” সেটা শুনে তিতির দৌড়ে গিয়ে দরজায় আটকানো কলিং বেল টা বাজিয়ে দিয়ে এসে আবার সোনাকাকুর পাশে দাড়ালো।

একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এসে দরজা খুলে বললেন , “ক্ষমা করবেন ,আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না !” সোনাকাকু হাত জোড় করে বলল ” নমস্কার ,আমি Dr. স্বাগ্নিক মুখার্জী ,আর ও হলো তিতির ,আমার ভাইঝি ,আমাকে অনন্ত ফোন করেছিল।” বয়স্ক ভদ্রলোক এবার লজ্জিত হয়ে বললেন ” ও! আসলে আপনার নাম বহুবার শুনলেও কোনদিন চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। অনন্ত আমাদের বলেছিল বটে কিন্তু আপনি যে বাড়িতে আসতে রাজী হবেন তা একবারও ভাবতে পারিনি ! দয়া করে ভিতরে আসুন। “

সোনাকাকুর সাথে যেকোনো জায়গায় গেলে এক অভাবনীয় আতিথেয়তা তিতির আগেও বহুবার উপভোগ করেছে,এটা কতটা আন্তরিক তা নিয়ে সে কোনদিন মাথা ঘামায়নি ,গুনের বা গুনীর আদর সব মানুষই করে বলে তার বিশ্বাস। যদিও সোনাকাকু তাকে বার বার বলেছে “পেটের দায়ে কয়েকটা পুথি পড়া লোক কে কখনোই গুনী বলা চলে না ,গুন হল জন্মগত জিনিস, একেবারে ভিতরের ,যাকে কেবল সময়ের সাথে শানিয়ে নেওয়া যায় !” তবুও তিতিরের চোখে সোনাকাকুই তার দেখা সবচেয়ে গুনী মানুষ।

তিতির সোনাকাকুর সাথে ভদ্রলোক কে অনুসরন করলো ।একটা ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে ভদ্রলোক সোনাকাকুর দিকে তাকিয়ে বললেন “আপনারা একটু বসুন ,রোহিনী মানে আমার ছেলের বউ ওদিকের ঘরে থাকে। আমি একবার ওকে গিয়ে বলে আসি ,তারপর আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি। ” সোনাকাকু বলল ” সে ঠিক আছে কিন্তু তার আগে আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল ! ” বয়স্ক ভদ্রলোক দরজার সামনে থেকে ফিরে এসে বললেন “আমার সাথে ? হ্যা নিশ্চই ! বলুন না। ” সোনা কাকু বলল ” কিছু মনে করবেন না মিস্টার সাহা,আপনার পুত্রবধু কে দেখতে যাওয়ার আগে আমার সবটা জানা দরকার,সব শুনে যদি আমার মনে হয় আমি সত্যি আপনাদের কিছু সাহায্য করতে পারব তাহলেই আমি এগোবো নাহলে শুধু শুধু সকলের মূল্যবান সময় নষ্ট করাতে আমার অমত! ” বয়স্ক ভদ্রলোক এবার সামনের সোফায় বসে বললেন “বুঝতে পারছি। আমি যথা সম্ভব চেষ্টা করব আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে। ” তারপরের কথাবার্তা এরকম :

সোনাকাকু : আমাকে খোলাখুলি বলুন আপনার কেন মনে হয় যে আপনার পুত্রবধুকে ভূতে ধরেছে।

ভদ্রলোক : এটা মাস দুই আগেকার ঘটনা। প্রায় একবছর পর সমীর মানে আমার ছেলের বিদেশ থেকে ফেরার আগের দিন বাজার থেকে জ্যান্ত মাছ কিনে আনা হয়েছিল। কিন্তু অবিশ্বাস্য ভাবে বন্ধ রান্না ঘরে বালতি ঢাকা মাছ পরের দিন সকালে একেবারে ভ্যানিশ যাকে বলে। এর কারণ নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে আবার নতুন মাছ কিনে আনায় পরদিন সকালে সেই একই ঘটনা ঘটল । মানদা হলো আমাদের পুরনো কাজের মেয়ে,সে নাকি ওই দুদিনই রোহিনীকে রান্না ঘরে ঢুকে কাঁচা মাছ খেতে দেখেছিল । শুধু তাই নয় ,তার কথা অনুযায়ী রোহিনী নাকি যখন তখন সামনের পুকুর ধারে ঘুরে বেড়ায় ,আর আশে পাশে কাউকে না দেখলেই পারের ধারে বসে পুকুরের কাঁচা মাছ ধরে খায়। সেদিন আমি মানদার কথায় কান না দিলেও তারপর কিছুদিন মাছ আনা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। হঠাৎ সমীর একদিন আবার সবার জন্য জ্যান্ত মাছ কিনে আনলো বাজার থেকে। সত্যি জানার কৌতুহলে সেদিন রাতে আমি আর আমার স্ত্রী কিছুতেই ঘুমাতে পারিনি। স্ত্রীর সাথে রান্নাঘরের পিছনের উঠোনে দেওয়ালের ধারে লুকিয়ে রান্না ঘরের দিকে চোখ রেখে অপেক্ষা করছিলাম। ক্লান্ত হয়ে প্রায় ঘুমিয়েই পরেছিলাম, কিন্তু মাঝরাতের দিকে রান্নাঘর থেকে আসা আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল ,এখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি স্বাগ্নিক বাবু ,রান্না ঘরে মাছের বালতির দিকে তাকিয়ে যে দাড়িয়ে ছিল ,সে আর কেউ নয় ,আমার পুত্রবধু রোহিনী। বেশ কিছুক্ষণ পর সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলে আমি আর আমার স্ত্রী রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম বালতি তে একটাও মাছ নেই। কিন্তু ছেলের মুখ চেয়ে একথা আমরা আর কাউকে বলতে পারিনি। কিন্তু এরপর যেটা হলো তাতে আর চুপ করে থাকা সম্ভব হলো না। আমাদের বাড়িতে আমার স্ত্রী র নিয়ে আসা সাধের কাকাতুয়া ‘টিটু’ ওই বারান্দায় দাড়ের উপর রাখা থাকতো। গত রবিবার দুপুরে আমাদের এলসেশিয়ান কুকুর রক্সীর চিৎকারে আমাদের ভাত ঘুম ভেঙে গেলে দৌড়ে বাইরে বারান্দায় গিয়ে দেখি ,টিটুর পালক গুলো অবিন্যস্ত ভাবে বারান্দা জুড়ে ছড়িয়ে আছে ,আর হাতে মুখে রক্ত মেখে বসে থাকা রোহিনী প্রাণপণে রক্সীর গলা টিপে ধরার চেষ্টা করছে। সে দৃশ্য একবার দেখলে আপনিও আমাদের মত আর রাতে ঘুমাতে পারতেন না স্বাগ্নিক বাবু। টিটুকে না বাঁচাতে পারলেও রক্সী কে কোনো ভাবে রোহিনীর কবল থেকে ছাড়িয়ে আমরা রোহিনীকে ওপাশের ঘরে নিয়ে গেছিলাম। তারপর থেকেই ওই তালা বন্ধ ঘর থেকে আমরা আর রোহিনীকে বেরোতে দিতে পারিনি ,খুব অসহায় লাগছে নিজেকে কিন্তু আমাদের আর কি বা করার আছে বলুন। ছেলেটার মুখের দিকে তাকাতে পারি না স্বাগ্নিক বাবু,একদিকে লোক লজ্জার ভয় অন্যদিকে এই বিপদ থেকে বের হওয়ার জন্য আকুলি বিকুলি প্রাণ ,আমরা যে কি করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। ইতিমধ্যে গতকাল অনন্ত আসায় লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও ওকে সব খুলে বলেছি। এখন যা আইন কানুন ,হয়তো লোক জানাজানি হলে অনেকেই ভাববে আমরা এসব বানিয়ে বানিয়ে বলছি ,ছেলে বউ কে জব্দ করার জন্য নিজেদের আটা ফন্দি ,কিন্তু বিশ্বাস করুন রোহিনী কে আমরা ভীষণ ভালোবাসি ,ওর মত ভালো মেয়ে আজকাল কার দিনে দেখা যায় না।আপনি যদি ওকে চিকিৎসা করে ভালো করে তুলতে পারেন,আপনার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ থাকবে না! “

সোনাকাকু : হুম বুঝলাম। আপনারা বাড়িতে কজন থাকেন ?

ভদ্রলোক :আমি ,আমার স্ত্রী ,সমীর ,রোহিনী ,সবুজ ,মানদা ,শ্যামচরণ আর রক্সী। সবুজ হল আমার নাতি আর শ্যামচরণও মানদার মত আমাদের অনেক পুরনো কাজের লোক।

সোনাকাকু :আমার সকলের সাথে পরিচয় হওয়া প্রয়োজন। আপনার কথা তো শুনলাম ,বাকিদের মতামতও জানা আবশ্যক। আসলে বুঝতেই পারছেন যে অসুখের কথা আপনি বলছেন সেটা সরানোর ক্ষমতা আমি কেন কোনো ডাক্তারেরই নেই ,তাই আমার জানা দরকার যদি এমন কিছু থেকে থাকে যেখানে আমি আপনাদের একটু হলেও সাহায্য করতে পারবো। তার আগে আপনার পুত্রবধুর সাথে একবার দেখা করতে চাই।

ভদ্রলোক :হ্যা নিশ্চই। আপনারা বসুন। আমি রোহিনী কে বলে আসছি ।

প্রায় ৫ মিনিট বাদে ভদ্রলোক আবার ঘরে এসে আমাদেরকে ওনাকে অনুসরন করতে অনুরোধ করলেন।লম্বা করিডোর পেরিয়ে একটা ঘরের সামনে এসে উনি বললেন “এই ঘরটা ,আপনারা যান ,আমি এখনি আসছি। ” তিতির সোনাকাকুর সাথে ঘরে ঢুকতেই দেখল একজন মাঝ বয়সী ভদ্রমহিলা খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে আছেন। সোনাকাকু বলল “নমস্কার। আমার নাম স্বাগ্নিক মুখার্জী ,আমি অনন্তের বন্ধু। ” ভদ্রমহিলা এবার সোনাকাকুর দিকে ঘুরে অল্প হেসে বললেন , “জানি ,বসুন।” তারপর তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললেন “এই বুঝি তিতির ? অনন্ত দার কাছে আপনাদের অনেক গল্প শুনেছি। ” সোনাকাকু হেসে বলল ” আপনি ঠিক ধরেছেন। ওই আমার ভাইঝি তিতির।” তারপর কিছক্ষন চুপ করে সোনাকাকু বলল “আপনি নিশ্চই জানেন আমি কেন এখানে এসেছি !” ভদ্রমহিলা হেসে বললেন ,”ডাইনীর চিকিৎসা কি আর মানুষের ডাক্তার করতে পারবে ?” সোনাকাকু বললেন ” সত্যি টা আমাকে বলুন রোহিনী দেবী , কথা দিচ্ছি আমি আপনার সাহায্য না করতে পারলে সহনাভূতি দিয়ে বিব্রত করবো না। ” ভদ্রমহিলা বললেন , “আপনি যা শুনেছেন সবই সত্যি। কাঁচা মাছ দেখলে আমি লোভ সামলাতে পারি না , আর টিটুকেও আমি খেয়েছি ,নেহাত সবাই এসে পরেছিল বলে নাহলে রক্সীকেও আপনারা দেখতে পেতেন না।” সোনাকাকু তিতিরের হাত ধরে উঠে দাড়িয়ে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন “নমস্কার ,এখন আমরা আসি ,আবার যদি কখনো আসার সুযোগ হয় নিশ্চই দেখা হবে। “

তারপরে সোনাকাকুর অনুরোধে বাড়ির বাকি লোকজন একে একে ড্রয়িং রুমে এলে তাদের সাথে সোনাকাকুর প্রশ্ন উত্তর পালা এরকম :

সোনাকাকু : আপনার পরিচয় ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : আমি মানদা ,এ বাড়িতে অনেকদিন কাজ করি।
সোনাকাকু :Mr সাহার কথা অনুযায়ী আপনি রোহিনী দেবীকে কাঁচা মাছ খেতে দেখেছেন,সেটা কি সত্যি ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : মিথ্যে কেন বলতে যাবো ডাক্তার বাবু ? একবার নয় বহুবার দেখেছি।
সোনাকাকু : আপনি এখন আসতে পারেন ।

সোনাকাকু : আপনি নিশ্চই Mrs সাহা !
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : হ্যা।
সোনাকাকু :আপনিও কি মনে করেন রোহিনী দেবীকে ভুতে ধরেছে ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : না মনে করার কোনো উপায় কি সে রেখেছে ? নিজের পেটের মেয়ের মত ভালোবাসি তাকে ডাক্তার বাবু,আপনি যে ভাবে হোক আমাদের এ বিপদ থেকে রক্ষা করুন।
সোনাকাকু : কথা দিতে পারছি না কিন্তু চেষ্টা করব। আপনি এখন আসুন।

সোনাকাকু : আপনি?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক : ডাক্তার বাবু আমি শ্যামাচরণ। আপনি মানদার কথা শুনবেন না ডাক্তার বাবু ,ও খুব মিথ্যে কথা বলে।
সোনাকাকু : তাহলে সত্যি টা কি তুমি জানো ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: তা না জানলেও আমি জানি বৌদিমুনিকে ভুতে ধরতে পারে না। তিনি যে দেবী ,তাকে কি করে ভুতে ধরবে!
সোনাকাকু :দেবী? ঠিক বুঝলাম না। খুলে বল।
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: তা আমি বলতে পারবো না ডাক্তার বাবু কিন্তু আপনি দয়া করে মানদার কথা বিশ্বাস করবেন না।
সোনাকাকু :তুমি এখন এসো।

সোনাকাকু : আপনি নিশ্চই সমীর সাহা ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক : হ্যা।
সোনাকাকু : আপনার কি ধারণা আপনার স্ত্রী র ব্যাপারে?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: আমি ভুতে বিশ্বাস করি না ,রোহিনী অসুস্থ ,সঠিক চিকিৎসা হলে সেরে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস।
সোনাকাকু :কিন্তু আপনার স্ত্রী তো আমার সাথে সহযোগিতা করছেন না।
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: আমি জানি।ও বরাবরই খুব জেদী। আমি ওকে বোঝাবার প্রানপন চেষ্টা করবো। আপনার ক্লিনিকের ঠিকানা আমি অনন্তের কাছে নিয়ে নিয়েছি,আমি রোহিনীকে নিয়ে সেখানে যাবো।
সোনাকাকু :আচ্ছা ,তাই আসবেন তাহলে।

সোনাকাকু : তোমার নাম কি ?
বাচ্ছা ছেলেটি : সবুজ ।
সোনাকাকু : বাহ্ ,খুব সুন্দর নাম।
বাচ্ছা ছেলেটি চীৎকার করে বলল :আমার মা ডাইনী নয় ,তোমরা সবাই খারাপ।

কথাটা বলেই বাচ্ছা ছেলেটি দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

সোনাকাকু আর কথা না বলে সকলের সামনে হাত জোড় করে বলল : ” ক্ষমা করবেন ,আমার মনে হয় আমি আপনাদের সমস্যায় কিছু সাহায্য করতে পারবো না। “

তারপর তিতিরের সাথে ওই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গাড়িতে উঠে নিজের বাড়িতে পৌছনো অব্দি সোনা কাকু আর কোনো কথা বলল না।বাড়িতে পৌছে স্নান সেরে তিতির সোনাকাকু র ঘরে ঢুকতেই শুনলো সোনাকাকু তার বন্ধু অনন্তের সাথে কথা বলছে ” ঠিক আছে রে ,ভালো থাকিস। “

তিতির বলল “কি হয়েছে সোনাকাকু ?” সোনাকাকু বলল “কিছু না ,ওই অনন্ত কে বললাম আজকের ঘটনা। “

পরদিন সকালে তিতির সোনা কাকুর ঘরে ঢুকে বই এর তাক থেকে একটা গল্পের বই খুঁজছিল ,ঠিক তখনি সোনাকাকুর ফোনটা বেজে উঠলো। সোনা কাকু হেসে বলল “আরে ঠিক আছে ,ধন্যবাদের কি আছে ? আমি তো কিছুই করিনি। ভালো থাকবেন। “

তিতির বলল “কার ফোন ছিল সোনাকাকু ?” সোনাকাকু বলল “সমীর সাহার ,কালকে আবার জ্যান্ত মাছ কিনে আনার পর আসল সত্যি টা উদ্ধার হয়েছে ,কি জানিস তিতির ,সব একটা ভাম বিড়ালের কান্ড। মাছ আর টিটুর সাথে কাকতালীয় ভাবে রোহিনী দেবীও সেই ভামবিড়ালের স্বীকার ,টিটুকে বিড়াল টার কবল থেকে বাঁচাতে গিয়েই যত বিপত্তি,বাড়ির লোকের অবিশ্বাসের শিকার হয়ে তার মত অভিমানী মেয়ের থেকে গতকালের ব্যবহার ই প্রত্যাশিত।

তিতির কে চুপ করে থাকতে দেখে সোনাকাকু বলল “কিরে তিতির ,তোর ভূত দেখা হলো না বলে মন খারাপ ?”

তিতির :”কাল রাতে তুমি কোথায় গিয়েছিলে সোনাকাকু ?”

সোনাকাকু একবার চমকে উঠে তৎক্ষনাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল “ঘুম আসছিল না বলে ছাদে পায়চারী করছিলাম। “

তিতির :আমি নিজে সকালবেলা ছাদের দরজার তালা খুলেছি সোনাকাকু । সে যাই হোক তোমার রাতের খোলা জামাতে বিড়ালের লোমে ভর্তি আর কেমন একটা বোটকা গন্ধ। ভালো করে স্নান করে নাও আর জামাটা নগেন দা কে কাঁচতে দিয়ে দাও।

সোনাকাকু হেসে বলল :তুই কি ভাবছিস বলতো ?

তিতির : সত্যি টা নিজে চোখে দেখার পর আর কিছু ভাবার অবকাশ নেই ।

সোনাকাকু : তার মানে আমি যেটা বললাম সেটা সত্যি নয় বলছিস ?

তিতির :তোমার কথার মধ্যে শুধু একটাই সত্যি ছিল যে রোহিনী সাহা কে ভুতে ধরেনি। বাকি সত্যিটা আমি তোমাকে বলছি।

আমি তোমাকে যা চিনি তাতে ভালো করেই জানতাম সত্যি জেনে তুমি চুপ করে বসে থাকার লোক নয়,কালকে বাড়ি ফেরার সময়ই তুমি ভেবে নিয়েছিলে তোমার পরবর্তী পদক্ষেপ।খুব তাড়াতাড়িতে ছিলে বলেই বোধহয় খেয়াল করনি রাত্রে তোমার গাড়ির পিছু নেওয়া একটা ট্যাক্সিকে।

সোনাকাকু অবাক হয়ে : দেখেছিলাম কিন্তু একবারও ভাবিনি সেটা তুই!

তিতির বলল : এবার না হয় আমাকেই বাকিটা বলতে দাও ,কিছু ভুল হলে শুধরে দিও।

সোনাকাকু হেসে বলল : বল তবে শুনি ! সবসময়ের মত এবারও আমার মিথ্যে বলা সার্থক করে দে।

কালকে সমীর বাবু তোমার কথাতেই বাজার থেকে জ্যান্ত মাছ কিনে রান্নাঘরের বালতিতে ঢেকে রেখেছিলেন আর রাতে ঘুমের ভান করে রোহিনী দেবীর পাশে শুয়েছিলেন। রাত্রি ১২ টা নাগাদ ওখানে পৌছে পাঁচিল টপকে ও বাড়িতে ঢুকে তুমি ওনাদের রান্না ঘরের পিছনের উঠোনে ভুতের কাঁচা মাছ খাওয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলে । রোহিনী দেবী রান্না ঘর থেকে বেরোনোর পরই তুমি অন্যদিকের রাস্তা দিয়ে ওনার পিছু নিলে। একটু দূরে তোমার পিছনে লুকিয়ে থাকা আমিও দেখেছিলাম উনি পুকুরের সিড়ি দিয়ে নামার পর এদিক ওদিক ভালো করে তাকালেন,তারপর শেষ সিড়িতে বসে আচলের তলা থেকে একটা থালা ঢাকা বাটিতে রাখা জ্যান্ত মাছ গুলোকে পুকুরে ছেড়ে দিলেন। …

রোহিনী দেবীকে সিড়ি দিয়ে উঠে আসতে দেখে তুমি এগিয়ে গেলে ,তারপরের কথা বার্তা অনেকটা এরকম :

তুমি :আপনার মাছ খাওয়া হলো ?

চমকে উঠে রোহিনী দেবী বললেন : এতো রাতে আপনি এখানে ?

তুমি :গতকাল সত্যি টা বলে দিলে আমাকে আজ এত রাতে এভাবে আসতে হত না। মাছ গুলো জলে ছেড়ে দিলেন কেন রোহিনী দেবী ?

রোহিনী দেবী:আমার ছেলের জন্য। কোনো জীবকে কষ্ট পেতে দেখলে ও সহ্য করতে পারে না ,রাতে ভয় কান্নায় ওর জ্বর চলে আসে।

তুমি :তাই টিটুকেও বোধহয় সবুজ ই ছেড়ে দিতে গিয়েছিল আর বাঁধন টা ঠিক মত খুলতে না পারায় পা জড়িয়ে গিয়ে টিটু নীচে পরে যায়,আর তখনি রক্সীর থাবা র কিছুটা গিয়ে পরে তার ওপর আর বাকিটা টিটুকে বাঁচাতে যাওয়া আপনার ওপর,রক্সীর থাবার আঁচড়ে বের হওয়া রক্ত মুহুর্তে আপনাকে ডাইনী বানিয়ে দিল।

রোহিনী দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের চোখের জল মুছে বললেন :হ্যা,সেদিন আমি ঠিক সময়ে না পৌছলে আমার ছেলেটাকে সবাই বাড়ি ছাড়া করে ছাড়তো। আমিই টিটুকে বাঁধন থেকে মুক্ত করে দিয়েছি ,টিটুর স্বাধীন হওয়া দেখে সবুজের চোখে মুখে যে খুশির ছবি আমি সেদিন দেখেছিলাম ,জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি তা ভুলতে পারবো না। তাই দেখতে গিয়েই রক্সীর থাবায় টিটুর খসে যাওয়া অবিন্যস্ত পালকগুলো আমি আর সরানোর সময় পায়নি। রক্সীর রাগ সামলানোর জন্যই আমি ওর গলার বকলেস টা আলগা করার চেষ্টা করছিলাম , আর বাবা মা ভাবলো ….

তুমি :সবুজ আপনার নিজের ছেলে নয় তাই তো ? আমি অনন্তের কাছে সব শুনেছি ,দয়া করে আর আমার কাছে কিছু লোকাবেন না।

রোহিনী দেবী: আমার দিদি জামাইবাবু গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার সময় সবুজের বয়স ছিল মাত্র ২ মাস। তারপর থেকে আমাকেই ও মা বলে জানে ,এ বাড়ির আর কেউ না মানলেও আমি জানি যে সবুজ আমারই ছেলে।আর নিজের ছেলের জন্য সব মা যা করে আমিও তাই করেছি ,জীবনের শেষ দিনেও আমি এই ডাইনী অপবাদ নিয়ে আক্ষেপ করবো না।

তুমি :আমি অনন্তের কাছে কৃতজ্ঞ ,ও না থাকলে আপনার মত মায়ের সান্নিধ্য আর এ জীবনে পেতাম কিনা সন্দেহ।

তারপর তুমি এগিয়ে গিয়ে ওদিকের দেওয়ালের পিছনে দাড়িয়ে থাকা সমীর বাবুকে বললে “আপনি নিশ্চই সব শুনেছেন। দয়া করে আমার সাথে একবার গাড়ির কাছে আসুন। ” সমীর বাবু নিঃশব্দে গাড়ি অব্দি তোমাকে অনুসরণ করলে তুমি গাড়ির ডিকি থেকে একটা ফুটো বস্তা বার করে বললে “একে নিয়ে আপনাদের রান্নাঘরে বন্ধ করে রাখুন। এই আপনার স্ত্রীর ওপর লাগানো কলঙ্ক মোচনে সাহায্য করবে। আমার পাড়ার পুরোনো বন্ধু মাত্র একদিনের অনুরোধে একে পাশের জঙ্গল থেকে ধরে দিয়েছে। ভয় নেই ,আমি ঘুমের ইনজেকশন দিয়েই নিয়ে এসেছি ,কাল সকালের আগে এর ঘুম ভাঙবে না।এরপরের ছোট খাটো খটকা গুলো আপনি নিজেই সবার কাছে পরিস্কার করে দেবেন যেমন রাত্রি বেলা পিপাসা পেলে লোকে তো রান্নাঘরেই যাবে নাকি ! আর আমার নিয়ে আসা এই জন্তুটি অনায়াসে আপনাদের রান্নাঘরের খোলা জানলা র ফাঁক দিয়ে গলতে পারবে,তাই স্বাভাবিক ভাবেই বন্ধ দরজা ওর মাছ খাওয়া আটকাতে পারেনি ।”

শুনে সমীর বাবু বললেন : আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দেবো।….

উত্তরে তুমি বললে :সেটা না দিয়ে পারলে রোহিনী দেবীর কাছে ক্ষমা চাইবেন ,আজ আমি যা করলাম তা হয়তো আপনার কাছ থেকে সে আশা করেছিল। কালকে সকালে সব মিটলে একবার ফোন করে জানাবেন। আমি এগোলাম।

সোনা কাকু এতক্ষণ চুপ করে সবটা শুনে হেসে বলল :”তুই সত্যি প্রদোষ মিত্রের যোগ্য বউ,সারা দুনিয়ার থেকে সত্যি লুকাতে পারলেও সোনাকাকু যে বরাবর তার সত্যান্বেষী তিতিরের কাছে এমনি ভাবেই ধরা পরে যায়। “

তিতির হেসে বলল “ফেলুদা আমাকে বিয়ে করতে রাজী না হলেও এখন আর আমার একটুও মন খারাপ হবে না সোনাকাকু,তার মত গোয়েন্দা না হলেও আমার সোনাকাকু তার থেকে অনেক বেশী ভালো মানুষ। “

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান