মোহিনীমোহন

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

দেওয়াল জুড়ে মনভোলানো কারুকার্য করা একটা ভীষণ সুন্দর ঘরে প্রবেশ করে, জনৈক ভদ্রলোক কাউকে উদ্দেশ্য করে বললেন : একা ঘরে আপনাকে দেখে কথা বলার লোভ কিছুতেই সামলাতে পারলাম না কৃষ্ণ স্যার ! আমাকে দেওয়া অল্প সময়, আপনার বড়সড় কোনো হিসেবের গোলমাল না করে দিলে ,একটু বসতে পারি ?

কৃষ্ণ : হ্যাঁ! বসুন না , স্বর্গে থাকলেও আমি বরাবরই খুব ‘Down To Earth’।

জনৈক ভদ্রলোক : Many Many Thank You কৃষ্ণ স্যার! মানে মরার পর হাত একেবারে খালি করে দেয় তো ,আপনার জন্য নিজের হাতে করে মাখন নিয়ে আসার আজন্ম ইচ্ছাটা পূরণ করার কি কোনো উপায় ছিল বলুন ? মানে আপনার প্রিয় খাবার যে ‘ওইটাই’ ,তা প্রতিবছর জন্মাষ্টমীর দিন সকালে ,টাটকা মাখন লাভের আশায় ঘন্টার পর ঘন্টা দোকানে দাড়িয়ে থাকার সময় আমার শরীরের প্রতিটা মজ্জা নতুন করে উপলব্ধি করতো ।

কৃষ্ণ : উহু! আপনার মজ্জারাশির এত বছরের উপলব্ধি একেবারেই ভুল।

জনৈক ভদ্রলোক : ভুল ? মাখন আপনার প্রিয় খাবার নয় ? আপনার সুনজরে থাকতে মাখনের পিছনে আমার এত বছরের বিনিয়োগ শুধুই অপচয় বলছেন ? ওহ ! আবার সেই পুরনো বুকের ব্যথাটা শুরু হয়ে যাবে মনে হচ্ছে ! তাহলে আপনার প্রিয় খাবার কি কৃষ্ণ স্যার ?

কৃষ্ণ : আমার কাছে খাবারের নামের থেকেও তাতে মেশানো উপকরণ বেশী গুরুত্বপূর্ণ । ভালবাসা , রাগ-অভিমান ,ক্ষোভ বিদ্বেষ ইত্যাদির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিমাপ আর কি! যশোদা মা র হাতের মাখন আর আপনার বাড়ির পাশের দোকানের মাখনের মধ্যেকার উপকরণের যে বিস্তর ফারাক মশাই ! এই যেমন গতকালকের ঘটনা , শ্যামল বাবুর মেয়ে অঙ্কে কম নম্বর পেয়েছে বলে ,সকলের অজান্তে ঠাকুর ঘরে ঢুকে, সে আমার রোজের বরাদ্দ একটা পুরো বাতাসা কে অর্ধেক করে দিল । আপনাকে মিথ্যা বলব না ,সেই অর্ধেক বাতাসার স্বাদ ,হাড়ি ভর্তি অমৃতর চেয়েও আমাকে অনেক বেশী তৃপ্তি দিয়েছে ,আসলে কি জানেন! সহজ সরল চাওয়া পাওয়ার নিরন্তর বাহুডোর , বন্ধ ঘরে করা আমার ওপর মান অভিমান ,ক্ষনিকের জন্য হলেও দমবন্ধ করা ‘ভগবান’ ইমেজ থেকে আমাকে মুক্তি দেয়।

জনৈক ভদ্রলোক : মানে ? এই রকম স্পর্ধা আপনি মুখ বুজে সহ্য করলেন ? অঙ্কে নম্বর তো মেয়েটির নিজের ফাঁকিবাজি স্বভাব দোষে কমেছে, তার জন্য আপনার মধ্যাহ্নভোজ একেবারে সে অর্ধেক করে দিল ? আপনি তক্কে তক্কে থাকুন কৃষ্ণ স্যার, পরেরবার একেবারে ডাহা ফেল করিয়ে ছাড়বেন।

কৃষ্ণ : ‘ভালোবাসার অভিমান’ কে ‘অকারণ ভয়’ তে পরিবর্তন করার এরকম অব্যর্থ কৌশল শুনে আপনার নির্বুদ্ধিতার প্রশংসা না করে সত্যি পারছি না।

জনৈক ভদ্রলোক : ক্ষমা করবেন ,মানে আমি আপনার ইমেজের কথা ভেবেই ….সে যাই হোক ,এই সুযোগে একটা ভালো প্রশ্ন মনে পড়ে গেল । আচ্ছা আপনি যদি যুগ যুগান্তর ধরে চলে আসা টিপিকাল ‘কৃষ্ণ’ ইমেজের যেকোনো একটা বৈশিষ্ট পরিবর্তনের সুযোগ পান, তাহলে কোনটা বাছবেন ?

কৃষ্ণ : আমার গায়ের রঙ ।

জনৈক ভদ্রলোক : সেকি ? আপনি তো কালো রঙের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ মশাই ! সুঠাম দেহের গর্বিত অধিকারী রা নিজেদের বর্ণনায় যে বিশেষণের প্রয়োগ করে, আপনিই যে তার কর্ণধার ,মানে আমি ‘Tall ,Dark ,Handsome’ ট্যাগের কথা বলছিলাম।

কৃষ্ণ : নারী পুরুষের মধ্যে বর্ণ বৈষম্যের এই অদ্ভূত চলনের উত্তরদায়ী যে স্বয়ং আমি| গায়ের কালো রঙ আমার ‘মোহিনীমোহন’ ইমেজের ওপর কখনো কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি , নিজে কালো হলেও কাকতালীয় ভাবে আমার জীবনজুড়ে উজ্জ্বলবর্না সুন্দরীদের ভিড় , সেখান থেকেই বোধহয় পুরুষ সমাজ একটা অদ্ভুত ধারণার বশবর্তী হয়েছে যে , সে নিজে যতই কিম্ভূত কিমাকার হোক না কেন ,তার পছন্দের নারীকে সুন্দরী এবং অবশ্যই উজ্জ্বলবর্না হতে হবে।

জনৈক ভদ্রলোক :না না ,এভাবে অকারণ পাপ বোধে ভুগবেন না কৃষ্ণ স্যার , মানে ওই মেয়েদের কথাই যদি বলেন ,মা কালীর গায়ের রঙও তো কালো,তা উনি মা দুর্গার সাথে কম্পিটিশনে কমতি কোথায় যান !

কৃষ্ণ : আহা ! দেব দেবীর কথা ছাড়ুন ,মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবুন, আপনার জীবনের ফ্ল্যাশ ব্যাকে আমি পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি, নিজের কালো কুষ্টি ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়ে , একের পর এক মা কালীর গায়ের রঙের সুন্দর মেয়েকে গুণ বিচার না করেই মুহুর্তে নাকচ করে দিচ্ছেন । তা এখানে আপনার দোষ ধরলে চলবে কেন বলুন ! চলন টাই যে আমার সৃষ্টি।

জনৈক ভদ্রলোক : ভগবান হয়েও আপনার আত্মসমালোচনা আমাকে সত্যি বিস্মিত করছে। আচ্ছা কৃষ্ণ স্যার ,অনেকে বলে মহাভারতের যুদ্ধ টা নাকি আপনি ইচ্ছাকৃত ভাবে করিয়েছেন,সেটা কি সত্যি ?

কৃষ্ণ হেসে বলল : সে তো নিন্দুকেরা কতকিছুই বলে থাকে ,আর পাপমুক্তির সবচেয়ে সহজ উপায় হলো একটা মনগড়া কথার উপর অপরিমিত বিশ্বাস: ‘সব ই তার ইচ্ছা ‘| মহাভারতের ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে, আমি শুধু মানুষকে এটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম যে নিজের ভিতরের শক্তি র উচিত অনুচিতের নিরপেক্ষ উপলব্ধিকে সকলের সামনে সত্যি হিসেবে প্রমান করার ইচ্ছাপূরণের জন্য কোনো ‘মিরাকেল’ র অপেক্ষা করা নিষ্প্রয়োজন ,আশেপাশের অতি পরিচিত অবস্থার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সে সুযোগ । ‘ভাই ভাইয়ের মধ্যে যুদ্ধ বিবাদ ‘ অথবা ‘নারী সম্মানের অবমাননা’ কি মহাভারতের আগে বা পরে আর কখনো ঘটেনি ? সর্বসমক্ষে দৈনন্দিন ঘটা এই চিরপরিচিত উদাহরণের বিনা ব্যতিক্রমে পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছিল পান্ডব ও কৌরব দল। যেখানে আমার ভূমিকা সংক্ষেপে বলতে হলে বলব : যুদ্ধ থামানোর ব্যর্থ প্রয়াসের পর কুরুক্ষেত্রে ঘটা ভয়ঙ্কর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আমি নিজের মতাদর্শ কে জগত সংসারের সামনে তুলে ধরেছিলাম।

জনৈক ভদ্রলোক : আচ্ছা আপনার মৃত্যুর কারণ কি সত্যি গান্ধারীর দেওয়া অভিশাপ? মানে খুব জানতে ইচ্ছা করছে কৃষ্ণ স্যার,ভগবান হয়েও এই শাপমোচনের কোনো উপায়ই কি আপনার জানা ছিল না ?

কৃষ্ণ বলল : দেখুন আমার জীবনকালে কত মানুষই তো আমাকে কতভাবে অভিশাপ দিয়েছে ,আমার শত্রুদলের বিস্তারিত বিবরণে আর নাই বা গেলাম । তবে এটুকু বলতে পারি ,বাকিদের মধ্যে অভিশাপ দেওয়ার প্রবণতা অথবা হাস্যকর প্রয়াস থাকলেও, যা ছিল না বলে আমার বিশ্বাস তা হলো ‘ন্যুনতম যোগ্যতা’। আপনার প্রশ্নের উত্তর আরো সহজ করতে বলব ,গান্ধারীর মধ্যে একাধারে অসাধারণ নারীত্ব ও অতিসাধারণ মাতৃ হৃদয়ের সমন্বয় দেখে , তার স্রষ্টা স্বয়ং বিস্ময়ে বার বার বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন , তাই তার মতন বক্তিত্বময়ীর অভিশাপ , আমার মৃত্যুকে জীবনের চেয়েও অনেক বেশী গৌরবান্বিত করেছে । ভগবান হয়ে শেষ দানে কিস্তিমাতের সুযোগ আমি কি করেই বা ছাড়তাম বলুন!

জনৈক ভদ্রলোক :আপনি তো সর্বশক্তিমান ,আপনার সিদ্ধান্তর উপর প্রশ্ন করার আমার মত সদ্য মৃত সাধারণ মানুষের কি বা যোগ্যতা। আমার পরবর্তী প্রশ্ন টা একটু ব্যক্তিগত আবার বিতর্কিতও বটে। রাধাকে কি আপনি সত্যি ভালো বাসতেন ? নাকি পরস্ত্রীর অপরূপ সৌন্দর্যের হাতছানি ভগবানের পক্ষেও উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি ? মানে যদি ভালোই বাসতেন,তাহলে রাধাকে বিয়ে করলেন না কেন ? তখনকার দিনে তো বিবাহ বিচ্ছেদের এত জটিলতা ছিল বলে শুনিনি।

কৃষ্ণ হেসে বলল : বিবাহের জন্য দুটি ভিন্ন সত্তার প্রয়োজন ,তখনও যেমন ছিল, আজও তেমন আছে । এই প্রয়োজন যে অপরিহার্য , চিরন্তন ।

জনৈক ভদ্রলোক : মানে ঠিক বুঝলাম না কৃষ্ণ স্যার ।

হঠাৎ ভদ্রলোক বিস্ময়ের চোখে দেখলেন এতক্ষণ তার সামনে বসে থাকা ভুবনমোহন সৌন্দর্যের অধিকারী দিব্যপুরুষ আর নিজস্থানে নেই, তার জায়গায় বসে আছেন এক অপরুপা নারী যার সৌন্দর্যের বিবরণ দেওয়া এককথায় অসম্ভব । ভদ্রলোক ভীষণ অবিশ্বাসে চোখ বন্ধ করে ফেললেন । বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ খুলতেই তার সামনে দৃশ্যমান হল হাসিমুখে বসে থাকা সেই চেনা দিব্যপুরুষটি ,যে হয়তো তার মনের আদ্যপ্রান্ত দেখতে পেয়ে কৌতুক মাখা স্বরে প্রশ্ন করল ,”কি বুঝলেন মশাই ? “

জনৈক ভদ্রলোক : মানে রাধা শুধুই পৃথিবীর ভ্রম মাত্র ? রাধার আড়ালে আপনি আসলে নিজেকেই ভালবাসতেন ?

কৃষ্ণ হেসে বলল : ধ্যুর মশাই ! ভ্রমের নাম হলো ‘কৃষ্ণ’ ,আসলে সবটাই যে রাধা,অনন্ত সৃষ্টিকে নিজ গর্ভে ধারনকারিনী আদ্যাশক্তি, আমি তো তার প্রতিবিম্ব মাত্র । কেউ হয়তো এই সত্যি উপলব্ধি করে পৃথিবীর দরবারে ‘রাধা’ কে সবসময় ‘কৃষ্ণে’ র আগেই রেখেছেন , সে আপনি ‘রাধাকৃষ্ণ’ ই বলুন অথবা ‘রাধেকিষণ’ , সত্যি সুপ্ত হলেও তা কিন্তু দিব্যচক্ষুতে অবলীলায় দৃশ্যমান।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান