হাত খরচ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

রবিবার সকালবেলা দুধের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বিতান বলল : মা ! ‘ হাত খরচ’ মানে কি ? দাদাভাই আজ সকালে বাবার ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমাদের গাড়িটা ধুয়ে চকচকে করে দিয়েছে বলে , আমি দেখলাম তুমি ওর হাতে ৫০০ টাকা দিয়ে বললে ‘এটা তোর হাত খরচ’ ।

স্নিগ্ধা লাহিড়ী তার ৮ বছরের মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন : নিজের হাতের মাপের প্রয়োজন গুলো মেটাতে লাগা খরচ কেই ‘হাত খরচ’ বলে।

বিতান নিজের হাত টা মেপে নিয়ে বলল : হাতের মাপের প্রয়োজন ? হাত টা তো মেপেছি কিন্তু সে মাপের প্রয়োজন টা কি মা ?

বিতানের মা হেসে বললেন : কাল বিকেলে বাবার সাথে ঘুরতে গিয়ে ফিরে আসার সময় তোর জামার পকেট টা ওরকম ফুলে ছিল কেন রে বিতান ? কি ছিল পকেটে?

বিতান মুখ নিচু করে হেসে বলল : এক্লেয়ার্স আর হজমী গুলি।

বিতানের মা বললেন : বুঝলাম। এবার বল , কাল দুপুরে আচার ওয়ালা কে জানলা দিয়ে দাড়াতে বলেও আবার একটু পরে চলে যেতে বললি কেন?

বিতান মন খারাপ করে বলল : কি করব ? বাবা যে ঘুমাচ্ছিল। আর আচার খেতে দেখলেই যে তুমি আমাকে বকো ।

বিতানের মা বললেন :বাবার ঘুম না ভাঙ্গিয়েও আচার টা তুই কাল কিনেই নিতে পারতিস বুঝলি বিতান ! যদি তোর কাছে থাকতো …..

বিতান উত্তেজিত ভাবে বলল : হাত খরচ ?

বিতানের মা হেসে বললেন : ঠিক তাই ! যদিও আমার থেকে কানমলা টাও তারপর তেঁতুলের আচারের মতই এক চোখ বন্ধ করে খেতে হত তোকে ।

বিতান হেসে বলল : আচ্ছা মা ! বাবার হাত তো আমার থেকে কত্ত বড় ,তাই বোধহয় বাবার ‘হাত খরচ’ ও অনেক বেশী তাই না ? তা না হলে আমি আর দাদাভাই যখন যা চাই ,তখনি বাবা তা কি করে কিনে দেয় ?

বিতানের মা : ‘হাত খরচ’ যে আমার বিতানের মতই ছোট্ট একটা মেয়ে, তাই সে শুধু নিজের আয়তনের ছোট্ট ছোট্ট প্রয়োজনই মেটাতে পারে, সে যখন বড় হয়ে যায় তার পুরনো নামে আর তাকে কেউ ডাকে না ,তখন একটা নতুন নাম হয় তার।.

বিতান : কি নাম মা ?

বিতানের মা : ‘রোজগারপাতি ‘। ‘হাত খরচ’ নামের নাগালের বাইরের প্রয়োজনগুলো মেটাতে হঠাৎ একদিন সে নতুন নামে এসে হাজির হয় । কী বুঝলি ?

বিতান : দাদার পাওয়া ৫০০ টাকা ‘হাত খরচ’ হলেও বাবার মানি ব্যাগের সব টাকা হল ‘রোজগার পাতি ‘। ঠিক বলেছি না ?

বিতানের মা হেসে বললেন : একদম ঠিক । তোর ‘হাত খরচ’ দিয়ে শুধু বাড়িতে বসেই এক্লেয়ার্স খাওয়া যাবে ,পূজোর ছুটিতে সবাই মিলে পুরীর সমুদ্রের ধারে বসে এক্লেয়ার্স খেতে হলে যে বাবার ‘রোজগার পাতি’ র সাহায্য লাগবে বিতান সোনা !

বিতান মুখ নিচু করে বলল : আমার কাছে তো হাত খরচ নেই , সে তো দাদাভাই এর কাছে আছে।

বিতানের মা বললেন : তুই চাইলে তোর কাছেও থাকতে পারে। তবে ‘হাত খরচ ‘ পেতে হলে দাদাভাইয়ের মত কাজ করতে হবে কিন্তু ,বিনা পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ, প্রয়োজন মেটালেও তা গ্রহণ কারীর জীবনে ‘পরিশ্রম’ আর ‘অর্থ’ দুটো শব্দকেই মূল্যহীন করে দেয়।

বিতান বলল : একটু সহজ করে বল না মা।

বিতানের মা হেসে বললেন : আজ যদি তুই বিনা পরিশ্রমে ‘হাতখরচ’ পেয়ে যাস, তাহলে কাল বাবা ঘুমিয়ে থাকলেও আচার কিনতে পারবি ঠিকই ,কিন্তু কাক ভোরে উঠে অত বড় গাড়িটা পরিস্কার করে ধুতে দাদাভাইয়ের যে কত কষ্ট হয়েছে তা যে তুই চেষ্টা করেও বুঝতে পারবি না বিতান , তাই এমনি পাওয়া হাতখরচটা যে শুধু তোর ‘আচার কেনার দাম’ বলেই মনে হবে যা তোর অজান্তে কখন দেখবি কেনা আচারের ভালো মন্দ স্বাদের সাথে হজম হয়ে গেছে ।

বিতান বলল : যদি দাদাভাইয়ের মত কাজ করে হাতখরচ পাই তাহলে ?

বিতানের মা : তাহলে একদম অন্যরকম হবে। আচারের স্বাদ খারাপ হলে তোর মন খারাপ করবে ,মনে হবে এর থেকে কত ভালো হত ওই টাকায় ২ টো এক্লেয়ার্স কিনলে বা তোর পছন্দের অন্য কিছু কিনলে ।

বিতান বলল : আর ভালো হলে ?

বিতানের মা : ভালো হলে তো আর কথাই নেই, পরিশ্রমের বিনিময়ে পাওয়া টাকায় কেনা স্বাদ তোর জিভে অল্প স্থায়ী হলেও মনের গভীরে হবে চিরস্থায়ী যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোকে কারণে অকারণে আনন্দ দেবে।

বিতান : তুমি যখন ছোট ছিলে, তখন বুঝি তুমিও দাদাভাইয়ের মত পরিশ্রম করে হাত খরচ পেতে ?

বিতানের মা : পেতাম বৈকি। আমাদের বাড়িতে গাড়ি ছিল না তবে হাত খরচ পাওয়ার অন্য অনেক উপায় ছিল। এই যেমন ধর মায়ের সাথে চাল বাছার সময় যটা কাঁকড় খুঁজে বার করতে পারব তটা ১০ পয়সা আমার লাভের খাতায় ,বেশী কাঁকড় ভরা চাল আনলে মা র কাছে বকা শুনে নগেন কাকার গোমড়া মুখ , আল্হাদে আমার ১০ পয়সার গুনতি দেখে মুহুর্তে হাসিতে বদলে যেত। মাছ কাটতে বসা কাকীমনি বাথরুমে গেলে ,মাছের গন্ধে আশেপাশে ঘুরঘুর করা বিড়ালের থেকে মাছ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পড়ত আমার ওপর , ১ মিনিট পাহাড়া দিলেই ১০ পয়সা, স্বাভাবিক নিয়মে মিনিটের সাথে পয়সার যোগফল ও বাড়তে থাকতো । সবচেয়ে বেশী মজা হত জ্যেঠুমুনির দেওয়া কাজে ।

বিতান : সেটা কি মা ?

বিতানের মা : জ্যেঠুমুনির মাথার প্রত্যেক টা পাকা চুলের দাম ছিল কুড়ি পয়সা ,তখন তো আর চশমা ছিল না ,একটা পাকা চুল তুলতে আমার ৫ সেকেন্ডের বেশী লাগতো না । হজমলা ,আচার ,রঙ বেরঙের কাঠি আইসক্রীম আরো যে কত কিছু নিজেও খেতাম বন্ধুদেরও খাওয়াতাম ,ট্যাক ভরা হাতখরচে আমি তো তখন একেবারে ডাকসাইটে বড়লোক যাকে বলে !

বিতান একটু চুপ করে থেকে বলল : মা ! একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল ,কাল তোমাকে কতবার বলব ভেবেও আবার ভুলে গেছি।

বিতানের মা : কি কথা রে বিতান ?

বিতান : কালকে যখন তুমি আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলে আমি তোমার মাথায় ৩ টে পাকা চুল দেখতে পেয়েছি,তুমি যদি বল তাহলে আজকেই সবকটা তুলে দিতে পারি ! মানে তোমার সুন্দর কালো চুলের মধ্যে ওগুলো একদম খারাপ লাগছে তো , তাই বলছিলাম আর কি !

বিতানের মা হেসে বললেন : দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়ার পর। প্রতিটা পাকা চুলে ৫ টাকা করে পাবি ,তবে মনে থাকে যেন চুল আধা কাঁচা থাকলে কিন্তু হাত খরচ ও অর্ধেক হয়ে যাবে।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান