নাম করা লেখক শিশির সান্যালের লেখাটা প্রায় শেষের মুখে , হঠাৎ তার ৭ বছরের মেয়ে পান্না একটা ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকে বলল ,
“বাবা তোমাকে সাজিয়ে দেব ? “
শিশির সান্যাল অল্প হেসে বললেন , ” আজ নয় মা ,কাল আমার একটা জরুরি সম্মেলন আছে !”
পান্না বলল , ” কাল তো অনেক দেরী ! মা র ‘ক্লিন এন্ড ক্লিয়ার ‘ ফেস ওয়াশ টাও তো ব্যাগে নিয়ে এসেছি, একটু পরে তুমি বেসিনের সামনে চোখ চেপে বন্ধ করে দাড়িও ,আমি এক মিনিটে সব তুলে দেবো। “
পান্নার বাবা হেসে বললেন , ” সে তো বুঝলাম ,কিন্তু আগের দিনের মত নেল পালিশ না উঠলে এই ভ্যাবসা গরমে কাল আমায় বুট জুতো পরে যেতে হবে মা গো , আর হাত দুটোও যে পকেট থেকে কোনমতেই বার করা চলবে না ! “
পান্না ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট সাদা শিশি বার করে বাবার সামনে ধরে বলল , ” এটা কী ? “
পান্নার বাবা , ” কী বলতো মা ! ? “
পান্না : ” ধ্যুত ! তুমি কিচ্ছু জানো না , এটা হল নেলপালিশ রিমুভার , আর তোমাকে আঙ্গুল দিয়ে ঘষে ঘষে নেলপালিশ তুলতে হবে না , মা যখন সকালে সোফায় বসে নেলপালিশ তুলছিল ,আমি দুধ খেতে খেতে আড়চোখে সবটা দেখে নিয়েছি।
পান্নার বাবা : ” বাহ্ , তাহলে তো ইচ্ছাপূরণের পথে আর কোনো সমস্যাই রইলো না , শুধু খেয়াল রাখিস , আগের দিনের মত ক্রিম বা পাওডারের কৌটো যাতে শেষ না হয়ে যায় ,তাহলে কিন্তু মায়ের ‘দুম দুম’ থেকে তোকে বাঁচানো টা এবার সত্যি কঠিন হবে।
পান্না হেসে বলল , ” আচ্ছা । “
শিশির সান্যাল ছোট্ট হাতের আরামে বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়েই পড়েছিলেন , হঠাৎ পান্নার ধাক্কায় তার ঘুম ভাঙ্গলো ,
সে আদো স্বরে বলছে , ” আইলাইনার অনেকক্ষণ শুকিয়ে গেছে বাবা ! আর তোমাকে চোখ বুজে থাকতে হবে না !”
শিশির সান্যাল বিছানায় উঠে বসে হেসে বললেন , “তা এখন কি পান্নার বাবাকে তার মায়ের মত লাগছে নাকি আরো সময় লাগবে ?”
পান্না তার মুখের সামনে আয়না ধরে বলল , ” শুধু শুয়েছিলে বলে ঝুটি টা একটু বেঁকে গেছে ! “
ঠিক এই সময়ে লাবণী সান্যাল ঘরে ঢুকে বললেন , “একি করেছিস পান্না ?”
শিশির সান্যাল বললেন , ” আহা ! পান্নাকে আমিই বলেছিলাম ! তোমার যে রোজ সাজতে ইচ্ছা করে আর আমি একদিন সাজলেই দোষ ? নিজের চারিদিকে তাকিয়ে দেখো , ‘নারী পুরুষ সমান সমান’ রবে পুরুষ রাও কেমন গলা মিলিয়েছে ,শুধু গলা বললে ভুল হবে যদিও ,কান -নাক- গলা -হাত-চোখ প্রতিটা অঙ্গই তাদের নানা বিভূষণে সেজে উঠেছে।”
লাবণী সান্যাল বললেন , “বাহ্ ! তাহলে তো আর কথাই নেই , দেরী না করে আজকেই পার্লারে গিয়ে ,নাক কান ফুটিয়ে ষোলো কলা পূর্ণ করে ফেলো ! যেমন বাপ তার তেমনি মেয়ে ! আর এই খালি কৌটোগুলো তুমি বরং কালির দোয়াত কোরো ,আমার ড্রেসিং টেবিলে নতুন কৌটো যেন কালকের মধ্যে পৌঁছে যায় !
শিশির সান্যাল : ” সে না হয় পৌঁছে যাবে ,তা তুমি কি আমাকে কিছু বলতে এঘরে এসেছিলে নাকি ড্রেসিং টেবিলে নিখোঁজ উপকরণের খোঁজ করতে করতেই তোমার এই অকস্মাৎ আবির্ভাব ?
লাবণী সান্যাল আরো রেগে গিয়ে বললেন , ” ভৌমিক পাবলিশারের তরফ থেকে একজন ভদ্রলোক তোমার সাথে দেখা করতে এসেছেন,তাই বলতেই আসতে হলো ! নাহলে তোমার আর তোমার গুনধর মেয়ের কীর্তিকলাপ দেখা ছাড়াও, সংসারে আমার অনেক কাজ আছে !”
শিশির সান্যাল ব্যস্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে বললেন , “ওহ ! আমি তো একদম ভুলেই গিয়েছিলাম !” তারপর তাড়াতাড়ি বেসিনের সামনে গিয়ে মুখ ধোয়ার পরও মেকআপ অপরিবর্তিত দেখে চিন্তিত হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকাতেই লাবনী সান্যাল বললেন ,”আমার দিকে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই , এ জিনিস ১৬ ঘন্টার আগে উঠবে না , এগুলো ইমপোর্টেড লং লাস্টিং কসমেটিকস পতিদেব,তোমার হাতের ফেস ওয়াশ এর টিকিটিও বাঁকাতে পারবে না ! “
শিশির সান্যাল কাঁচু মাচু মুখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন , “তাহলে এবার কী হবে ? পাবলিশার ভদ্রলোকের সাথে দেখা করা যে খুব জরুরি ! “
লাবণী সান্যাল : ” সে বরং পান্না কেই জিজ্ঞেস করে দেখো !”
শিশির সান্যাল : “আহা ! ও বেচারী কে আর এ বিপদের মধ্যে টেনো না , কিছু একটা উপায় বল লক্ষীটি ,আমার যে দেরী হয়ে যাচ্ছে ।”
লাবণী সান্যাল দ্রুত পায়ে ঘর থেকে একটা ক্রীম আর তুলো এনে বললেন , “এটা দিয়ে চেষ্টা করো ,পুরোটা না হলেও কিছুটা উঠবে !”
১৫ মিনিটের চেষ্টায় মুখ টা কিছু টা পরিস্কার হলো ঠিকই কিন্তু কিছু জায়গা ঘষায় ঘষায় একেবারে লাল হয়ে এসেছে , জায়গা গুলোতে বরফ ঘষে নিয়ে শিশির সান্যাল মুখ মুছে আয়নায় দেখলেন ,এত চেষ্টার পরও ঠোঁটে এখনো লিপস্টিকের হালকা প্রভাব লেগে আছে, মুখ জুড়ে অস্পষ্ট মেকআপের সাদা দাগের মাঝে কিসব যেন চিকমিক করছে ,আইলানার দাগ টা পরিস্কার না বোঝা গেলেও কালো ভাবটা একেবারেই দূর হয়নি। আবার একবার মুখ টা ধোবেন ভাবছিলেন তখনি লাবণী সান্যাল এসে বললেন , “আমি চা দিতে গেছিলাম ,ভদ্রলোক বলছিলেন ওনার আরো কোথাও একটা যেতে হবে, তাই বেশীক্ষণ বসতে পারবেন না !”
শিশির সান্যাল ব্যস্ত হয়ে বললেন , ” আচ্ছা ,আমি যাচ্ছি এখনি !”
ড্রয়িং রুমে ঢুকে বসে থাকা ভদ্রলোক কে নমস্কার করে শিশির সান্যাল বললেন , ” ক্ষমা করবেন সুকান্ত বাবু ,আপনার অনেক সময় নষ্ট করে দিলাম !”
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ অবাক হয়ে শিশির সান্যাল কে দেখে ,তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে অমায়িক হাসি মেখে বললেন , ” না না ! সে ঠিক আছে , তা যেটা বলতে এসেছিলাম সেটা হলো , আপনার নতুন উপন্যাস টা আমরাই ছাপাবো , আর কারো সাথে যোগাযোগ করা অপ্রয়োজন ! এবারের অন্য স্বাদের গল্প টা মনে হচ্ছে একেবারে বেস্ট সেলার হবে মশাই ! শুধু নতুন গল্পের অনুপ্রেরণা সম্বন্ধে একটু জানার জন্য এসেছিলাম , শুরুতে সে বিষয়ে একটু না লিখলে পাঠকের আগ্রহের ওপর অবিচার করা হয় , আসলে আপনার আগের উপন্যাসে নিজের ছোটবেলার অভিজ্ঞতার ছাপ ছিল কিন্তু এই উপন্যাস টা তো একদম অন্যরকম তাই ….. কিন্তু আর তার দরকার নেই , লেখকের কল্পনার উৎস, জীবন্ত বাস্তব হলে আলাদা করে অনুপ্রেরনা কলম মিথ্যাই সময় নষ্ট ব্যতীত কিছু নয় , সে কল্পনা পাঠকের জীবনের বাস্তবের সাথে মিল খুঁজে পাক অথবা লেখকের নিজের , সে সত্যি মিথ্যার দায়ভার প্রকাশকের না নেওয়াই ভালো ,বুঝলেন কিনা ! হে হে হে ! “
শিশির সান্যাল বললেন , ” সুকান্ত বাবু …..”
তাকে শেষ করতে না দিয়েই ভদ্রলোক বললেন : ” ভয় নেই মশাই , অনুপ্রেরণার কলম উঠিয়ে এবার উৎসর্গ কলম দিয়ে দেব ভাবছি ! তা কাকে উৎসর্গ করতে চান আপনার নতুন উপন্যাস ?”
শিশির সান্যাল বললেন : “আমার মেয়ে ,পান্নাকে। “
ভদ্রলোক : “তা বেশ বেশ ! তাই কথা রইলো তাহলে ,এবার আসি বুঝলেন ! আমার আবার একবার ব্যাঙ্কে যেতে হবে , আপনার আগাম টাকা টা আমি খুব তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেবো ! “
ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর , নেলপলিশ রিমুভার দিয়ে বাবার হাতের নেলপালিশ তুলতে ব্যস্ত থাকা পান্নার পাশে বসে লাবনী সান্যাল বললেন , ” ভদ্রলোক অনুপ্রেরণা কলম টা বাদ দিয়ে দেবে বলল কেন গো ? আর কীসব জীবন্ত বাস্তব ,জীবনের সাথে মিল , সত্যি মিথ্যার দায়ভার ইত্যাদি ইত্যাদি বলছিল ,বাইরে থেকে শুনে আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না,তোমার নতুন উপন্যাস টা কিসের উপরে গো?”
শিশির সান্যাল হেসে বললেন : “জীবনের মাঝামাঝি পৌঁছে একজন পুরুষের লিঙ্গ পরিবর্তনের অদম্য ইচ্ছা আমার নতুন উপন্যাসের প্রধান বিষয়। এখন আর নিশ্চই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না অনুপ্রেরনা কলমের জায়গা কেন ‘উৎসর্গ ‘নিয়ে নিল !”
ধন্যবাদ ,
BongNote
gd job
LikeLike
valo
LikeLiked by 1 person
Valo laglo besh
LikeLiked by 1 person
বেশ ভাল লাগল…….
LikeLiked by 1 person
You write really well…very refreshing…:)
LikeLiked by 1 person