ক্যাসানোভা

Comments 3 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িটা স্টার্ট  দিল  সায়ন ! মেজাজ টা আজ একেবারে সপ্তমে চড়ে আছে তার। হাওয়ার বেগে পার্কিং লট পেরিয়ে সামনের বড় রাস্তা ধরে নিল সে  ! শেষে মালিনী ও ? একটা নয় ,২ টো নয় ,চার চার টে সম্পর্কের একই রকম পরিণতি  ! ‘কাকতালীয়’ শব্দ টা কোনো ভাবেই আর তার মনকে শান্তি দিতে পারছে না।  তবে কি নিখিলের কথাই ঠিক ? সে নিজেই দায়ী তার জীবনে বার বার  ঘটা এই ব্যর্থতার জন্য ?

তার প্রথম প্রেমিকা নীলিমা , ক্লাস ৯ এ পড়া মেয়েটার লম্বা চুলের বেণীর হেলদোলের সাথে  সাথে উথাল পাতাল হয়ে যেত সায়নের  মন।ছেলেদের জন্য রুদ্ররূপ আর মেয়ে দেখলেই মিন মিনে বিড়ালসুলভ স্বভাবের জন্য  অজিত স্যার কে ক্লাসের অন্য সকল ছেলেদের মতই  কিছুতেই সহ্য করতে পারতো না সায়ন ,তবুও তার কাছেই ভূগোল পড়তে ভর্তি হয়েছিল  শুধুমাত্র  স্কুলের পরে নীলিমাকে আরো কিছু সময় দেখতে পাবে বলে , এর জন্য বন্ধু মহলে একেবারে একঘরে  হয়ে গিয়েছিল সে। নীলিমা কিন্তু তার এই মহান ত্যাগের অমর্যাদা করেনি, সায়নের প্রেম প্রস্তাবে মুহুর্তে সম্মতি জানিয়েছিল।কিন্তু সে বয়সের বাকি ছেলেদের মতই তার বোঝার শক্তি ছিল না যে প্রেম পাওয়ার আগের বলিদানের চেয়েও তার পরের হিসেব অনেক  বেশী জটিল । তাই ১৫ ই আগস্টের দিন , নীলিমার সাথে ঘুরতে যাওয়ার থেকেও সায়নের কাছে পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলাই বেশী গুরুত্ব পেয়েছিল,তারপর হারানো বন্ধু মহল ফিরে পেতে অজিত স্যারের কোচিং এ  মাঝে মাঝেই সে তার টিকি দেখাতো না আর  নীলিমার প্রশ্নের উত্তরে দিয়ে দিত একঘেয়ে সাজানো অজুহাত।ব্রিটিশ দের অগোচরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা সিপাহী বিদ্রোহের মতই ,সায়নের অজান্তে বেড়ে ওঠা নীলিমার মনে ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ পরিণাম লাভ করলো মাধ্যমিকের রেসাল্টের  মহা সন্ধিক্ষণে,সেই পরিণাম কে সহজ করে দিয়েছিল সায়নের ভূগোলে পাওয়া মাত্র ৫২ নম্বর।তার পর  বেথুনে সাইন্স নিয়ে ভর্তি হওয়া মেয়ে তার মত কমার্স পড়া ছেলের দিকে যে ফিরেও চায়নি তা বলা বাহুল্য ! এরপর থেকে সায়ন ঠিক করে নিয়েছিল আর যাই হোক লম্বা চুলের মেয়েকে আর কখনো সে তার জীবনে আসতে দেবে না , যত লম্বা বেণী ,তত জোরালো তার বিদ্রোহ!

সায়নের দ্বিতীয় প্রেমিকা শ্বেতা ,সুন্দরী বললে তাকে খুব কম বলা হয়। সায়ন কে যে তার কেন পছন্দ হয়েছিল এখনো তা ভেবে দু তিন ঘন্টা সায়ন অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারে।শ্বেতার ভালবাসার স্বাদ বোঝার অবকাশ সে কখনো পায়নি ,অন্যের দৃষ্টি থেকে তার সৌন্দর্যকে বাঁচাতে সে এতোটাই  ব্যস্ত থাকতো  যে , ‘প্রেমিক’ থেকে ‘দেহরক্ষী’ পদেই  তাকে বেশী মানাতো। সেই একই উপলব্ধিতে শ্বেতা পথ বদলালে সায়ন মা কালীর দিব্যি খেয়ে শপথ করেছিল ,পৃথিবী এদিক থেকে ওদিক হয়ে যাক ,অতি বড় সুন্দরীর ছায়া আর সে ভুলেও মাড়াবে না ।

এরপর একেবারে জাত ধর্ম খুইয়ে ইংলিশ অনার্স পড়া পাঞ্জাবী মেয়ের প্রেমে হাবু ডুবু খাওয়ার কিছুদিন পরই সায়ন বুঝলো বাঙালি পেটে রোজ রোজ পরোটা হজম হওয়াটা বেশ মুশকিল। তাছাড়া কাহাতক আর ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দীতে প্রেমালাপ সম্ভব ! রাগিনীর বাংলা শেখার চেষ্টা দেখে প্রথম দিকে সায়ন বেশ খুশিই  হয়েছিল কিন্তু  একদিন যখন  রাগিনীকে  ‘অপ্রত্যাশিত ‘ শব্দের  মানে বোঝাতে  ইংলিশ সমার্থক কিছুতেই তার মনে আসছিল না , তখনই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল , তার পেটের বিদ্যার ঘটি রাগিনীর সামনে উল্টে যাওয়ার আগেই তাকে মানে মানে সরে পড়তে হবে।তার মন ও বুঝতে পেরে গিয়েছিল বাঙালী জাতের বাইরের সৌন্দর্য তাকে দূর থেকে দেখেই উপভোগ করতে হবে ।

চাকরী জীবন শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মালিনীর সাথে তার আলাপ। মেয়েটা দেখতে শুনতে সাধারণ হলেও আশেপাশের বেশীর ভাগ মেয়ের থেকে অনেক বেশী আধুনিক।মালিনীর হাসিখুশি খোলামেলা স্বভাব খুব অল্প দিনেই তাকে সায়নের খুব কাছে এনে দিয়েছিল। অফিসের পরও তার সাথে ফেসবুক ওহাটসআপে অহর্নিশ চ্যাটের পর , সায়নের  কিছুদিন ধরে  মনে হতে শুরু হয়েছিল মালিনীর জীবনে কোনকিছুই আর তার অজানা নয়। আজকে অফিসে নিচের তলায় বসা অতনু ,চা খেতে খেতে সায়নের ডেস্কে  এসে নিজের মোবাইল ফেলে যাওয়ায় , তার ফোনে আসা নতুন ম্যাসেজের ওপর না চাইতেও সায়নের চোখ পড়ে গিয়েছিল। সেই ম্যাসেজে  লেখা ভালবাসার কথার সাথে একটু আগে সায়নের পাওয়া ম্যাসেজের কথার মধ্যে হুবহু মিল , দুটো ফোনে ম্যাসেজ প্রেরকের মোবাইল নম্বরের   ১০ টা সংখ্যার মধ্যেও কোনো তফাৎ নেই  । মালিনীকে এই নিয়ে প্রশ্ন করে যে কোনো লাভ নেই তা সায়ন জানে ,জগৎ সংসারে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল পুরুষই মালিনীর বন্ধু,এরপরও প্রশ্ন করলে লাভের লাভ যা হতো  ,সায়নের চরিত্র বিবরণে আরো একটা বিশেষণ বাড়তো  :”সন্দেহবাতিক !” যাইহোক, মালিনীর মত আধুনিক মেয়ের সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ,তার মত ছাপোষা রক্ষনশীল ছেলের যে মানায় না তা সায়ন এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে।

বৃষ্টি জোরে শুরু হওয়ায় গাড়ির গতিবেগ একটু কমিয়ে দিল সায়ন। গাড়িতে গান বাজছে  ‘রহেনে দো ছোড়ো ভি যানে দো ইয়ার ,হাম না করেঙ্গে প্যেয়ার !’ না ! না ! অনেক হয়েছে ,আর নয় , এবার শুধু মন দিয়ে কাজ করবে সায়ন ।  প্রেম ট্রেম সবার জন্য নয় , চেষ্টা তো কম করেনি সে ,আর সম্ভব না , ব্যর্থতার স্মৃতির ভারে সত্যি সে খুব   ক্লান্ত  , সময় হলে ,বাবা মা যাকে দেখে দেবে ,চোখ বুজে তার গলায় মালা দিয়েই  বংশের চোদ্দ পুরুষকে উদ্ধার করবে,এই তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। প্রেমের ফাঁদে আর যেই পরুক সায়ন কর্মকার আর পরবে না! যতসব ফালতু সময় নষ্ট,প্রেমিকার উপহারের পিছনে ব্যয় হওয়া টাকা থাকলে আর কিছু না হোক, একটা Apple র ল্যাপটপ হয়ে যেতো সায়নের ,শুধু ল্যাপটপ বললে ভুল হবে ,iphone ipod ,ipad ,আরো যাবতীয় ‘i’ মার্কা জিনিস কিনে বাড়িতে পুরো আপেল গাছ লাগিয়ে ছাড়ত সে ।

হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের আলোতে দেখতে পাওয়া একটা হাত সায়নের ভাবনাতে লাল আলো দেখালো ! গাড়িটা রাস্তার পাশে নিয়ে গিয়ে দাড় করালো সায়ন ! বন্ধ গাড়ির সামনে দাড়ানো মেয়েটাকে সায়ন খুব ভালো করে চেনে , তার অফিসের পুরুষ মহলে ভীষণ পরিচিত নাম ‘নিধি আগারয়াল’, যেমন ডাকসাইটে সুন্দরী তেমনি  স্মার্ট , শরীর জুড়ে আধুনিকতার অলংকার সৌন্দর্য বিবরণের সকল বিশেষণকে একসাথে অস্থির করে দেয়।গাড়ির জানলার কাঁচের কাছে মুখ এনে মেয়েটি বলল , “My car suddenly broke down ,সামনে এক ট্যাক্সি স্ট্যান্ড হ্যায় , if you can drop me there I will be really grateful to you !”

সায়নের অজান্তেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো শব্দগুলো, “offcourse mam , Please get in my car !”

পাশে বসা নিধি আগারওয়ালের কোমর অব্দি লম্বা চুলের বৃষ্টি ভেজা জল সায়নের গাড়িকে স্নান করিয়ে দিল প্রায়।অলোকিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ তার ভিতরের পুরুষ সে ক্ষুদ্র  ক্ষতির কথা ভেবে  বেশীক্ষণ সময় ব্যয় না করে বলল ,”You live in tollygunge right ? I also live nearby ,I can drop you home.As the rain is heavy ,it will be difficult to get taxi now and Kolkata is not at all safe now a days  “.

নিধি আগারওয়াল কৃতজ্ঞতার হাসি মেখে বলল , “No Thanks is enough for you ,my phone battery was also dead ,I was so tensed … “

টালিগঞ্জ থেকে ব্যারাকপুর ফিরতে কত রাত হবে তার হিসেব করে নিয়ে ,সময় টা জানিয়ে দ্রুত বোনকে একটা sms করে দিল সায়ন আর বলে দিল তার দেরী দেখে মা যেন  চিন্তা না করে , অফিসে অনেক কাজ ,ডেডলাইন মিটের আজই শেষ দিন।

তারপর গাড়ি স্টার্ট করে তার প্রিয় গানটা চালিয়ে দিল সায়ন। বাইরে বৃষ্টির তালে গাড়িতে গান বাজছে ,”আব মুঝে রাত দিন তুমহারা হি খেয়াল হ্যয় !” সোনু নিগমের গলা আর নিধি আগারওয়ালের সৌন্দর্য ,এই অভূতপূর্ব সংমিশ্রণে তার মন এখন অতীতের সব ব্যর্থতার স্মৃতি ভুলে একটাই চেনা ডায়লগ বার বার আওরাচ্ছে : “পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত !”

3 thoughts on “ক্যাসানোভা

  1. Sourendra Nath Kundu's avatar

    খারাপ বলব না। ভাল হয়েছে। কিন্তু বাক্যগুলো পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল যে সাজানো টা বোধহয় আরো আঁট সাঁট হতে পারত।
    দড়ির টানে কোথাও কোথাও ছুরি চালালে যেমন হয় সেইরকম হয়ে আছে আর কি।
    বাক্যগুলো আরো সোজা গিটে বাঁধা চাই।
    আরো ভাল লাগবে।

    Like

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান