আর ২ ঘন্টার মধ্যেই কার্শিয়াং পৌঁছে যাবে সমীর। দশ বছর আগে নিউইয়র্কের প্লেনে ওঠার সময় সে ভেবেছিল আর কখনো সে এখানে ফিরবে না । স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার পর , প্রতিবছর নিয়ম করে একমাসের ছুটিতে বাড়িতে আসার তার একমাত্র কারণ, দশ বছর আগে নিজের হাতে পৃথিবীতে নিজের সকল অস্তিত্ব মিটিয়ে দিয়েছিল । নিজের মায়ের অকস্মাৎ মৃত্যুর স্মৃতি আজও অহর্নিশ তার মনকে তাড়া করে বেরায়। পুলিশের কাছে সে মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হলেও সমীর জানে তা হল আসলে বছরের পর বছর ধরে শানিয়ে নেওয়া, অবহেলার হাতিয়ারে ঠান্ডা মাথায় খুন। সে পরিচিত খুনীর সাথে আবার মুখোমুখি হবার বিতৃষ্ণাই সমীরকে দশ বছর আগের নেওয়া ,দেশে না ফেরার সিদ্ধান্তকে ,কখনো পুনর্বিবেচনা করতে দেয়নি । সেই মানুষটার মৃত্যুর খবর পেয়েও আজ সে আসতো না যদি না আইনের হাত তাকে এভাবে বাধ্য করত।
সন্ধ্যে ৬:১০ ,কার্শিয়াং এর বাড়ির কাছে পৌঁছে মনটা অস্থির হয়ে উঠলো সমীরের । মায়ের অজস্র স্মৃতির ,তাকে গিলে খাবার এতদিনের অপেক্ষা আজ শেষ হবে, সুদূর আমেরিকায় বসেও যা তাকে দুদন্ড শান্তি দেয়নি আজ কি এত কাছে পেয়ে তা তাকে মুক্তি দেবে ! বাড়ির দরজার সামনে ট্যাক্সি থেকে নামতেই সেখানে অপেক্ষারত তার বাবার পুরনো উকিল সামনে এসে বলল , “এসে গেছ ! লম্বা যার্নি তে ক্লান্ত নিশ্চই !” সমীর বলল ,”না সেরকম নয় ! রমেশ জ্যেঠু, আমার হাতে সময় কিন্তু খুব কম !” বৃদ্ধ রমেশ কর্মকার হেসে বললেন , “আমি জানি তুমি খুব ব্যস্ত ! নইলে তোমার বাবার শেষ সময়ে ,আমার লেখা এতগুলো চিঠির মধ্যে একটার উত্তর তুমি নিশ্চই দিতে পারতে , সে যাইহোক আমি সব কাগজ পত্র তৈরী করে রেখেছি যেখানে তোমার সই লাগবে, সরকারী ফর্মালিটি পূরণ করতে নিরুপায় হয়ে তোমাকে এখানে আসতে বাধ্য করায়, তোমার বাবার চেয়েও বয়সে বড় এই রমেশ কর্মকার , তোমার কাছে জোড়হাতে ক্ষমাপ্রার্থী! ভিতরে টেবিলে তোমার জন্য আমার স্ত্রীর বানানো খাবার ঢাকা আছে ,সেটা খেয়ে তুমি আজ রাতটা বিশ্রাম নিয়ে নাও, কাল সকালে আমি এসে তোমাকে স্কুলে নিয়ে যাব ,সরকারী উকিলও ওখানেই আসবেন ।”
রমেশ কর্মকারের দেওয়া চাবি খুলে বাড়ির ভিতরে পা রাখতেই সমীর বিস্ময়ে চমকে উঠলো ,সময় যেন ১০ বছর আগে স্থির হয়ে আছে সেখানে,আলনাতে তার মায়ের ভাজ করা শাড়ি ,টেবিলের উপরে রাখা মায়ের ব্যবহার করা সিঁদুর কৌটোর সাথে অন্যান্য সরঞ্জাম, পিতলের জলের গ্লাসটাও নিজের জায়গা এতটুকু বদলায়নি ,সমীরের সাথে মায়ের ফটো যার ওপর একটুও ধুলোর চিহ্ন নেই , আয়নায় লাগানো মায়ের কপালের টিপ ,ঘরের কোনায় খোলা মায়ের পায়ের চটি ,এমনকি ঘরের ক্যালেন্ডার টাও দশ বছর আগের সময়ই নির্দেশ করছে। সে উদ্ভ্রান্তের মত মায়ের ঘরে দৌড়ে গিয়ে দেখলো, আজ ও মায়ের বিছানায় দুটো দুরকমের বালিশ পাতা , মায়ের বালিশ টা নরম সাদা , সমীরের বালিশ টা শক্ত আর উঁচু ,তার গল্পের বই পড়ার সুবিধার জন্য। সমীর বাইরে পড়তে চলে যাওয়ার পরও মা তার বালিশটা বিছানা থেকে সরায়নি, ছুটিতে এলেই সে ওই বালিশে শুয়ে মায়ের আদর খেত। মায়ের মৃত্যুর ২ দিন পরে কার্শিয়াং এ পৌঁছে মা কে শেষ বার দেখার আসা আর তার পূর্ণ হয়নি ,মা বিহীন এই বাড়িতে পা দেওয়ার শক্তি সেদিন তার ছিল না ,তাই তার এক পুরনো বন্ধুর বাড়িতে ২ দিন থেকে , সে ফিরে গিয়েছিল আমেরিকা ।
সমীর এবার ধীরে পায়ে পাশের ঘরের দিকে গেল , এটাই তার মায়ের খুনীর ঘর যে মাসের পর মাস রাতে বাড়ি ফিরত না সেই একই অজুহাতে, সংসারের কোনো দায়িত্ব কর্তব্য যে এক দিনের জন্যও পালন করেনি , যার নিরন্তর অবহেলা তার মাকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে । এই ঘরের পরিবর্তন সত্যি চোখে পরার মত , সময় যেন দেরীতে হলেও অনুভব করেছে যে এবাড়িতে সেই লোকটির বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই, তাই নিজে হাতে তার সকল সরঞ্জাম,আসবাবপত্র সরিয়ে ,এই ঘরটি সে একেবারে খালি করে দিয়েছে। সমীর বাইরের ঘরে রাখা সোফায় নিজের ক্লান্ত শরীর রেখে চোখ বুজে ফেলল , নিঃশব্দে তার চোখের জল সোফায় রাখা বালিশ ভিজিয়ে দিতে লাগল।
সকালে দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজে সমীরের ঘুম ভাঙ্গলো । দরজা খুলতেই বাইরে দাড়িয়ে থাকা রমেশ কর্মকার বললেন, “সমীর ! এখন আমাদের যেতে হবে !” সমীর বলল , “হ্যাঁ ,আপনি বসুন ,আমি এখনি আসছি ।” ভিতর থেকে জামা বদলে এসে সমীর ,রমেশ কর্মকারের গাড়িতে উঠে বসলো।
রমেশ কর্মকার : “টেবিলে ঢাকা খাবার টা রাতে খাওনি দেখলাম ,স্কুলে পৌঁছে অল্প কিছু খেয়ে বাকি কাজ করা যাবে না হয়। ”
সমীর : ” বাড়িতে কোনো জিনিসের স্থান বদল হয়নি , সবকিছু ঠিক আগের মতই আছে, এ বিষয়ে আপনি কিছু জানেন ?”
রমেশ কর্মকার: “তোমার মায়ের মৃত্যুর পর ,তোমার বাবা রোজ সকালে এসে, নিজে হাতে যত্ন করে সব জিনিসের ওপর জমা ধুলো সরিয়ে দিতেন , এখন আমার স্ত্রী তার সেই দায়িত্ব পালন করে , সে মানুষটাকে কমলা নিজের দাদার মত শ্রদ্ধা করত ।”
সমীর : “সারাজীবন ধরে কারো ওপর করা অন্যায়ের পাপ, সে মরে গেলে আদিখ্যেতার প্রায়শ্চিত্তে কি মেটে রমেশ জ্যেঠু ? সে যাই হোক ,আমাকে ঠিক আপনার কি কাজে লাগবে তা আমি এখনো জানিনা , মানে বাবার স্কুলের সাথে আমার আর মায়ের কখনো কোনো সম্পর্ক ছিল না তাই সেই কাগজপত্রে আজকে আমার সই কেন লাগবে সেটা জানতে পারলে সুবিধা হত |”
রমেশ কর্মকার :”তোমার বাবা সর্বস্ব দিয়ে এই স্কুল টাকে আজ এই জায়গায় দাড় করিয়েছেন, তুমি হয়তো জানো না , এই স্কুলে একটা একটা ল্যাবরেটরি আছে যেখানে ছাত্রদের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে শেখানো হয়, স্কুলে পাঠ্য বিষয়ের মধ্যে রোবটিক্স অন্যতম , অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত অজস্র গবেষনার বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে , এই স্কুলের ছাত্ররা মহাকাশ নিয়ে ছোটবেলার নানা রকম জল্পনা কল্পনাকে অনেক পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে , কিন্তু এই বিশাল যজ্ঞের আগুন জ্বালিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ঘি যে ফুরিয়ে এসেছিল ,অর্থ সাহায্য লাভের অনেকদিনের চেষ্টায় অবশেষে এই স্কুল সরকারী অনুমোদন পেতে চলেছে, কিন্তু তুমি না এলে তোমার বাবার নিরলস পরিশ্রমের কোনো কদর না করেই আজ সরকারের উকিল বিনা বাক্য ব্যয়ে ফিরে যেত । স্কুলের অগনিত ছাত্র সেই মানুষ টাকে পিতৃ জ্ঞানে শ্রদ্ধা করলেও ,আইন যে উত্তরাধিকারীর কলম ছাড়া অন্য কারো সাক্ষর নেয় না সমীর ।”
সমীর বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল : “উত্তরাধিকারী? যিনি সারা জীবনে মুহুর্তের জন্য নিজের কাটা গন্ডি কাউকে পেরোতে দেননি ,আশেপাশের সম্পর্ক গুলোকে প্রাপ্য অধিকার থেকে অহর্নিশ বিনা দ্বিধায় বঞ্চিত করেছেন, নিজের পারিবারিক দায়িত্ব সম্বন্ধে শেষ দিন পর্যন্ত নির্বিকার হয়ে থেকে গেলেন অন্যকে দায়িত্ববান হবার পাঠ শেখাতে হবে বলে , সেই স্বেচ্ছাচারী মানুষের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীর খোঁজ যে শুধু আইনই আপনাকে দিতে পারতো রমেশ জ্যেঠু ! ”
গাড়িটা একটা স্কুলের গেটের সামনে দাড়ালো । রমেশ কর্মকার সমীরের উদ্দেশ্যে বললেন ,”এসো !” স্কুল কম্পাউন্ডে ঢুকে সমীর চারিদিকে তাকিয়ে তার প্রশস্তি আর বৈচিত্র দেখে অবাক হলেও তা প্রকাশ করলো না ! সেই মানুষটার প্রতি ঘৃণায় সে আজকের আগে কোনদিন এই গেট পেরোয়নি ! মায়ের পছন্দের দার্জিলিঙের বোর্ডিং স্কুলে পড়েছে সে , তার পড়ার খরচের টাকার হিসেব সে অনেক ছোটবেলা থেকে রেখেছে , ২ বছর আগের পাঠানো বাবার নামে তার সই করা চেক, সেই সব হিসেব কড়ায় গন্ডায় চুকিয়ে দিয়েছে ,যদিও সে টাকার অঙ্ক তার ব্যাঙ্কে এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে তবুও এই হিসেব মেটানোর প্রচেষ্টাই তার মনকে এক অসম্ভব শান্তি দিয়েছিল , বছরের পর বছর ধরে বিনা দোষে তার মায়ের সহ্য করা অপমান, সে কিছু টা হলেও ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল সেই অগনিত অপরাধে অপরাধী মানুষটার দিকে ।
রমেশ কর্মকার একটা ঘরে প্রবেশ করে বললেন ,”এখানে বসো সমীর ! তোমার বাবা গত দশ বছর এঘরেই থাকতেন। সরকারী উকিলের আসতে সময় লাগবে ,আমি তোমার জন্য কিছু খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি । ” সমীর ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো , একটা টেবিল ,বইয়ের তাক ,গদিবিহীন খাট আর ছোট আলমারি ছাড়া ঘরে আর বিশেষ কিছু নেই। সে বইয়ের তাকের দিকে এগিয়ে গেল , বিভিন্ন বিষয় লেখা সাজানো বইয়ের বৈচিত্র লক্ষ্য করার মত । বইয়ের তাকের মতই এই ঘরের সবকিছুই তার কাছে নতুন ,তার বাবা যে চিরকাল এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি ছাড়া তার কাছে আর কিছুই ছিলেন না, সেটা আরো একবার উপলব্ধি করলো সমীর । হঠাৎ একটা ছেলের গলার আওয়াজে সমীর পিছনে তাকালো , “আপনার খাবার !” ছেলেটার বয়স আন্দাজ ১০ বছর হবে , এত নিষ্পাপ সুন্দর মুখ অনেকদিন সমীর দেখেনি ।
সে ছেলেটির কাছে গিয়ে বলল , “তোমার নাম কী ?”
ছেলেটি : , “শঙ্কর”!
সমীর : ,” তুমি নিশ্চই বাঙালি ?”
ছেলেটি : “না ,তবে আমি মাতৃভাষা ছাড়াও আরো ৬ টি ভাষা বলতে ও লিখতে পারি ,বাংলা তার মধ্যে একটা।”
সমীর : “বাহ্ ! তুমি এই স্কুলে পড়াশোনা করো ?”
ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ।
সমীর : “এখন তো তোমাদের ছুটি চলছে তাই না ? ”
ছেলেটি আবার মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ।
সমীর বলল , “তবে আজ স্কুলে এসেছো যে !”
ছেলেটি : “স্যার বলতেন স্কুল ছুটি থাকলেও আমরা যখন খুশি স্কুলে আসতে পারি, তাছাড়া স্কুলে না এলে আমার ভালো লাগে না । ”
সমীর হাত বাড়িয়ে ছেলেটির হাত থেকে থালাটা নিতেই সে বলল : “আপনার ঘড়ি তো বন্ধ হয়ে গেছে !”
সমীর হেসে বলল : “বন্ধ হয়নি ,প্লেনে ধাক্কা লেগে খারাপ হয়ে গেছে ,আমার সময় বোধহয় আরো কিছুদিন থেমেই থাকবে শঙ্কর ,এটা বিদেশী ঘড়ি ,এর রকম সকম আমি যে বুঝি না !”
ছেলেটি : “আমি বুঝি , দিন না আমাকে , আপনার নিশ্চই সময় দেখতে অসুবিধা হচ্ছে ,আমি এখনি ঠিক করে দিচ্ছি!”
সমীর হেসে তার হাত ঘড়ি টা খুলে দিল ,ছেলেটা দৌড়ে গিয়ে ঘরের আলমারি থেকে একটা বাক্স বার করলো যার ভিতরে ছোট বড় মাঝারি আয়তনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ঠাসা। মুহুর্তে সমীরের হাত ঘড়ির কল কব্জা খুলে ফেলে শঙ্কর হারিয়ে গেল যন্ত্রের জটিল দুনিয়ায়। সমীর খোলা আলমারি টা বন্ধ করতে গিয়ে একটা বাক্সের দিকে চোখ পরায় চমকে উঠলো , এই বাক্স টা তো তার মা তাকে দিয়েছিল। কোনো অন্যায় করলে ভগবানের কাছে ক্ষমা চেয়ে লেখা চিঠি এই বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে মায়ের বালিশের তলায় রেখে আসত সমীর ,মায়ের হাসিমুখ ফিরে পাওয়ার এটা ই ছিল তার একমাত্র উপায়। মা বলত, ক্ষমা মন থেকে না চাইলে ,সেই বাক্স নাকি চিঠির কথা বদলে দেয় যাতে ভগবান দ্বিগুন রেগে গিয়ে ,দোষীর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কেড়ে নিতে পারে। সে কথা সত্যি না মিথ্যা ,তা পরীক্ষা করার সাহস , সমীর কখনো জুটিয়ে উঠতে পারেনি। বাক্স টা আলমারি থেকে দ্রুত নামিয়ে ফেলল সে,তার আঙ্গুল বাক্স খোলার মুখস্থ নম্বর পরপর টিপে দিল ‘৯২৯০’, প্রত্যাশিত মতই বাক্সের তালা বেঁকে গিয়ে খুলে যাওয়ার চেনা ইঙ্গিত দিল , কাঁপা হাতে বাক্সে রাখা চিঠিটা খুলে ফেলল সমীর ,
শ্রীচরণেশু প্রসূন বাবু ,
এই বাক্স টাই একমাত্র আমার এই চিঠির ভার বহন করতে পারত , সে রহস্য না হয় একটা ছোট্ট ছেলে আর তার মার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাক। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর হাতে ,আপনি যখন স্কুলের দরজায় পাওয়া একটি অজ্ঞাত পরিচয় শিশু কে তুলে দিয়েছিলেন, আপনার মত মানুষকে চেনার অক্ষমতা , সেই সাধারণ হতভাগ্য মেয়েকে ভাবতে বাধ্য করেছিল, সকলের অগোচরে করা নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্য করতেই আপনি এই দায়ভার স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছেন । অন্যের সংসারে বড় হওয়া অনাথ মেয়েটির, আর কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না বলেই ,মুখ বুজে সেদিন সে মেনে নিয়েছিল আপনার ব্যাভিচার, কিন্তু তার মনের মধ্যে ওঠা নিদারুন বিদ্রোহের আঁচ টের পেতে ,আপনার মত বিচক্ষণ মানুষের যে অসুবিধা হবে না সেটাই ছিল প্রত্যাশিত , সে সত্যি উপলব্ধিতেই সময়ের সাথে , সেই মেয়ে এবং তার সংসার থেকে আপনি নিজের অস্তিত্বকে নিপুন হাতে সরিয়ে নিয়েছিলেন । তারপর দিনরাত নিজের ভগবান আর ভাগ্যকে দোষারোপ করলেও, মেয়েটি তার দায়ভার কিছুতেই সেই অজ্ঞাত পরিচয় অসহায় শিশুটির উপর চাপিয়ে দিতে পারেনি , অনিচ্ছা সত্তেও শিশুটির হাসি কান্না , স্নান , খিদের হিসেব নিকেশই হয়ে উঠেছিল তার একলা জীবন যাপনের একমাত্র অভ্যাস । তার কিছু দিনের মধ্যে, হঠাৎ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে যখন নিজের সন্তান ধারণের অক্ষমতার নিষ্ঠুর সত্যি তার সামনে এলো , তখন ওই ১ বছরের শিশুই হয়ে উঠলো তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ ও সম্বল। আপনার দেওয়া শাস্তির দহনে অহর্নিশ জ্বলতে থাকা বোকা মেয়েমানুষ , এরপর তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছিল , সেই শাস্তি শত গুনে আপনাকে ফিরিয়ে দিতে ,আপনারই দেওয়া সন্তানের ওপর আপনার সকল অধিকার সে অস্বীকার করে বসলো , আপনার রাখা ‘দিগন্ত’ নামটিও সে সকলের অজান্তে সরকারী কাগজ থেকে মুছে দিয়ে ,নিজের দেওয়া নাম ‘সমীর’ লিখে দিয়েছিল । তারপরও সময়ে অসময়ে আপনার ছায়া সে তার সন্তানকে মাড়াতে দিতে চায়নি, আপনি ভগবানের মতই নির্বিকার আর অন্তর্যামী ,তাই বোধহয় যে বাড়িতে সে ছেলে বড় হয়ে উঠছিল ,পারতপক্ষে সেখানে নিজের ছায়া আপনি পড়তে দিতেন না । নিজের বাবার বিরুদ্ধে ছেলের মনে বেড়ে ওঠা বিরূপ মনোভাব ,সেই মেয়েটির নিরন্তর বিবেক দংশনের কারণ হলেও ,তার ভিতরের মায়ের একছত্র অধিকার হারানোর ভয়ের কাছে ,সে দংশন কোনদিন মাথা তুলে দাড়াতে পারেনি । দীর্ঘ ২৫ বছর পর সেই স্থুল বুদ্ধি মেয়েমানুষের এটুকু বোঝার ক্ষমতা হয়েছিল যে, আপনার স্ত্রী হিসেবে নিজের পরিচয় দেবার কোনো যোগ্যতাই তার নেই , তাই নিজের শরীরে বেড়ে ওঠা ক্যান্সারের মত মরণ রোগের কথা জানিয়ে আপনার নিরলস সাধনার কোনো ব্যঘাত সে ঘটাতে চায়নি। কিন্তু সাধেই কি বলি আপনি অন্তর্যামী! সকলের অগোচরে নিজের সর্বস্ব খুইয়ে ,শরীর মন ঢেলে তৈরী করা প্রানের চেয়ে প্রিয় স্কুল বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন, সেই স্বার্থপর নিচ মনের মেয়ে মানুষের চিকিৎসার জন্য ! সেদিন যদি আপনার টেবিলে, ভুলে ফেলে যাওয়া ওই কাগজ পড়ার বিদ্যে তার না থাকত ,তাহলে তার মৃত্যুও জীবনের মতই মূল্যহীন হয়ে যেত,পরম করুনাময় তাকে সেই ভয়ানক লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন । আপনাকে বাঁধা দেওয়ার সামর্থ্য বা অধিকার কোনটাই তার ছিল না , তাই তার আত্মহত্যার সিদ্ধান্তই একমাত্র পারতো , এই চরম সর্বনাশ থেকে সমীরের মতন অজস্র হতভাগ্য শিশুর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে ,অন্য কোনো উপায় থাকলে তার মত স্বার্থপর মা নিশ্চই সেটাই বেছে নিত । আজ ক্ষমা চেয়ে আপনাকে আর ছোট করার বোকামি সে করবে না , অন্যায় যতই অসহ্য ও বেদনাদায়ক হোক, ভগবানের কাছে ক্ষমা করা ছাড়া যে আর কোনো পথই খোলা থাকে না, তা আমার থেকে ভালো আর কেউ জানে না। আমার ছেলেটার কোনো দোষ নেই , সব তার হতভাগী মায়ের পাপের ফল , যদি পারেন তাকে নিজের সান্নিধ্য থেকে আর বঞ্চিত করবেন না , সেজন্য যদি মায়ের সকল সত্যি তার ছেলের কাছে প্রকাশ করতে হয় ,জানবেন অভিমানী ছেলের দোষীজ্ঞানে ওঠা আঙ্গুলও সেই মৃত মায়ের আত্মা কে চির শান্তি দেবে, অধিকার ভাগ করে নিতে আজ আর তার ভয় করে না ।
ভালো থাকবেন ,
বিভা।
সমীরের চোখের জল চিঠির পাতাটা ভিজিয়ে দিতে লাগলো। তার মন কে শান্ত করার কোনো উপায়ই সে জানে না , যে দুটো মানুষ এই মুহুর্তে তার মনের অবস্থা বুঝতে পারতো তারা দুজনের কেউই আর পৃথিবীতে নেই , বাকি জীবন এই দায়ভার বহন করার শক্তি কোথায় পাবে সে !
হঠাৎ কাঁধে রাখা ছোট্ট হাতের ছোঁয়ায় সে চোখ মুছে ফিরে তাকালো , শঙ্কর হাসি মুখে দাড়িয়ে আছে তার সামনে , ঘড়িটা সমীরের হাতে দিয়ে শঙ্কর বলল ” আপনার ঘড়ি একদম ঠিক হয়ে গেছে ,আর আপনার সময় থেমে থাকবে না ! ”
সমীর অল্প হেসে বলল: ” ঘড়ির কাটা দিয়ে যদি সময়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তাহলে তো আজ আমি এভাবে সর্বস্ব হারিয়ে অসহায় হয়ে যেতাম না শঙ্কর! আমি যা বললাম তা তোমার বুঝতে হলে ঘড়িকে আরো কিছু বছর চলতে হবে ,ততদিন তুমি বরং মন দিয়ে পড়াশোনা কর , সময় হলে তোমাকে আমি আমার সাথে আমেরিকা নিয়ে যাব , ওখানে আরো পড়াশোনা শিখে অনেক বড় হবে তুমি ,তোমার স্যারের বাক্স টায় যে আরো অনেক যন্ত্রপাতি আটবে , সেগুলো তো বিভিন্ন দেশ ঘুরে তোমাকেই খুঁজে পেতে নিয়ে ভরতে হবে ! ”
শঙ্কর অসম্মতি সূচক মাথা নেড়ে বলল : “না ! আমাকে এখানেই থাকতে হবে ,নইলে… ! ”
সমীর অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল : “নইলে কী ?”
শঙ্কর নিষ্পাপ হেসে উত্তর দিল , ” নইলে আমার দেশের বন্ধ ঘড়ি যে সবসময় বন্ধই থেকে যাবে ! অন্যের দেশে গিয়ে নিজের দেশের সময়কে থামিয়ে রাখা যে অন্যায় হবে ।”
নিরুত্তর সমীর জানলার দিকে তাকিয়ে তার জল ভরা চোখ কে শঙ্করের থেকে আড়াল করে নিজের মনে বলল , “সুবিচার বোধহয় একেই বলে,এত সহজে শঙ্করের মনে স্বার্থের ছায়া পড়লে নিরলস পরিশ্রমে সে মানুষটার দেওয়া সকল শিক্ষাই যে মুহুর্তে ব্যর্থ হয়ে যেত।”
রমেশ কর্মকার একজন ভদ্রলোক কে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন । কাগজ পত্র হাতে সে ভদ্রলোক সমীরের দিকে তাকিয়ে বললেন , “আপনি কি প্রসূন আচার্য র উত্তরাধিকারী ?” সমীর শঙ্করের হাত টা নিজের হাতে নিয়ে বলল , “হ্যাঁ, তবে শুধুই আপনার আইনের চোখে ।যোগ্যতার বিচারে উত্তরাধিকারী বাছার দায়িত্ব ,সেই বিচক্ষণ মানুষটি নিজে হাতে পূরণ করে গেছেন ,সময় তাকে নিজের নিয়মে প্রকাশ্যে নিয়ে আসবে । ”
Khub valo…
We should never b so judgemental..
LikeLike
No comment.. . just awsm..
LikeLiked by 1 person
Darun
LikeLiked by 1 person
Darun build up…
Dinke din ekha gulo aro sabolil hcche
… chaliye jan… aro.lekha chai 😀
LikeLiked by 2 people
ভালো গল্প। একটা কথা বলি , এটা ঠিক কি না তুমি বিচার করে দেখো। গল্পের চরিত্রগুলি পৃথক পৃথক মানুষ ,তাই তাদের কথা বলার ধরনে কিছু কিছু তফাৎ থাকা স্বাভাবিক। এ দিকটায় নজর দিলে গল্পগুলি আরও প্রাণবন্ত হবে বলে মনে হয়। তবে এটা আমার কথা। হয়ত তুমি তোমার মত লিখে যাচ্ছো , এটাই তোমার পক্ষে ভালো। স্নেহ জেনো।
LikeLiked by 2 people
awesome. keu keu amar ei priyo lekhika ke konosomoy naribadi bole comment diechilo. tara ki porechen golpota .
LikeLiked by 1 person