সারথী

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

অমলেন্দুবাবু  চোখ খুলতেই তার একমাত্র নাতি সৈকত কে পায়ের কাছে বসে থাকতে দেখে বিস্ময়ে বললেন : একি দাদুভাই ! তুমি কখন এলে ?

সৈকত মৃদু হেসে বলল : তোমার এই ঘরের  প্রতিটা কোণায় জমে থাকা ছোট বেলার স্মৃতি গুলো এমন ভাবে জাপটে ধরেছিল যে ঘড়ির দিকে তাকাবার অবসর হয়নি |

>আহা ! কিন্তু আমাকে কেউ ডাকেনি  তো ! দুপুরে ঘুমের অভ্যেস টা দাদু নাতির কতটা সময় মিছিমিছি নষ্ট করে দিল !

>তুমি যে বলেছিলে মহাভারতের গল্পে অর্জুন শ্রী কৃষ্ণের পায়ের কাছে বসে তার ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষা করেছিল কারণ সে জানতো  ধৈর্য্যের পরীক্ষায় পাশ করলে নষ্ট সময়ও জীবনের হিসেব বদলে দিতে পারে।

>হ্যাঁ সে না হয় বলেছিলাম ! কিন্তু এই বুড়োকে সারথি করে কোন যুদ্ধ জয় করতে চাও তুমি দাদুভাই !

>তুমি তো জানো ,আমি যুদ্ধ থেকে বরাবর পালিয়ে এসেছি , আমার যে হারতে ভয় করে !

>হারা কি ওত সহজ দাদুভাই ? কত মানুষ  যে চেষ্টা করেও হারতে পারে না ।

>কি যে বল তুমি দাদান ! কেউ বুঝি সেচ্ছায় হারতে চায় ?

> চায় বৈকি ! নিঃসঙ্গতার চোখের জলে রাতের বালিশ যখন ভিজে যায় , অতি বড় জয়ীর কানে মহাকাল তখন ফিস ফিস করে বলেন , “এর থেকে তো হেরে যাওয়াই ভালো ছিল , অন্তত দুদন্ড শান্তির ঘুম তো জুটত ভালবাসার মানুষ গুলোর পাশে ” , সেই মুহুর্তের দুর্বলতায় জয়ের মেডেল গুলো ছুঁড়ে ফেলে হারের খোঁজে পা বাড়াতেই  , আরো একবার জেতার ইচ্ছাটা নাগপাশের মত মন কে বেঁধে ফেলে ! সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে  যত শক্ত হয় সে  বাঁধন  , একের পর এক পাশার দানে বিকোতে থাকে সম্পত্তি ও সম্পর্ক !

> তুমি বুঝি হারতে ভয় পাও না ?

> না দাদুভাই ! এখন আর পাই না ,তবে তোমার বয়সে পেতাম বৈকি , আর সেই ভয় থেকে বাঁচতেই  বার বার জেতার লড়াইয়ে সামিল হতাম , আশ্চর্যের বিষয় হল ছোট বড় কোনো জয়ই  আমার সে ভয়কে কখনো দূর করতে পারেনি উপরন্তু শত গুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল।হঠাৎই  একদিন আমার মায়া ত্যাগ করে  বিনা বাক্যব্যয়ে সে চিরতরে নিখোঁজ হল ।

> এতদিনের জাঁকিয়ে ধরা ভয় হঠাৎ একদিন দূর হয়ে গেল ! কবে ? ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন ? তোমার কি মনে আছে দাদান ?

> বাহ্ ! মনে থাকবে না ? সেদিনই তো আমি প্রথমবার বিশ্রী ভাবে হেরে গিয়েছিলাম । ফকিরের মনে সুখের পরিমাপের আন্দাজ পেয়ে সেদিন চমকে উঠেছিলাম আমি ।

>তোমার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে  হারা  ঠিক জেতার মতই কঠিন ?

>মোটেই  না , আরো বেশী ! সর্বকালের জয়ীও অভ্যাসের ব্যতিক্রমে হেরে গেলে , প্রত্যাশা অপূর্ন  রাখার অভিযোগে কৈফিয়তের কাঠগড়া তার আত্মসম্মান কে  বিদ্রুপ মাখা বিশেষণে বার বার আঘাত করে! কজনই বা সে আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা রাখে ! আপাতদৃষ্টিতে দুর্বল মনের আত্ম হত্যার কারণ ক্ষনিকের হার মনে হলেও আসলে তারপরের পাওয়া চিরস্থায়ী অপমান !

>আমি তো ভেবেছিলাম চাইলেই জেতা যায় না কিন্তু হার অন্তত  সহজলভ্য !

>তোমার ভাবনা সত্যি হলে আমার মত কিছু মানুষের আনন্দের পরিসীমা আকাশের প্রস্থ দিয়েও মাপা যেত না ! এই যে  পঙ্গু শরীরটা  রোজ মৃত্যুর কাছে হারতে চায় কিন্তু সেই হার লাভে তপস্যার হিসেবের খাতা সময় বোধহয় হারিয়েই ফেলেছে !

>উফ ! তুমি কি আমাদের একটুও ভালোবাসো না দাদান ?

>বোকা ছেলের কথা শোনো দেখি ! ভালো না বাসলে  , ওই অখাদ্য ওষুধ গুলো আমাকে গেলানোর সাধ্যি বুঝি ওই সুরেন ডাক্তারের ছিল ?

>এরকম আর বোলো না দাদান ! তুমি ছাড়া এই অচেনা ভিড়ে আমি যে হারিয়ে যাবো ! আমি এখনো ঠিক বেঠিকের গোলক ধাঁধায় আটকে পড়ি ,বুঝতে পারিনা কতকিছু ,  নিরন্তর চেষ্টা করেও ভুলতে পারি না কিছু স্মৃতি , অসহায় মন নিদ্রাহীন রাতে ছটফট করে!

>আহা ! ছোটবেলায় কুমীর ডাঙা খেলায় ,গুনতির হারে কুমীর হওয়ার দুর্ভাগ্য , সেই বিকেলে কষ্ট দিলেও আজ  আর দেয় কি !

> কিন্তু দাদান সে  বিকেল ছিল নিষ্পাপ , জীবনের জটিল হিসেব তখনও শুরু হয়নি ! রাত ভোর হতেই যে হারের দুঃখ মন থেকে মুছে যায় ,  তার সাথে আজকের জটিলতার কি তুলনা চলে !

> দূরত্ব বাড়লে দৃষ্টির গণ্ডিতে সর্বোচ্চ পাহাড়ও  ক্রমশ ক্ষুদ্র  হতে থাকে । কি জানতো দাদুভাই! সময়ের  ডাস্টার নিয়ম মত ব্ল্যাকবোর্ডের সকল হিসেবই  মুছে দেয় , তার কাছে জটিল সরলের কোনো ভেদাভেদ নেই !

> সবকিছু মুছে দেয় ? কিছুই থাকে না?

> থাকে নাই তো ! একমুঠো  ছাই  ছাড়া কিচ্ছু থাকে  না , সেটুকুও মা গঙ্গা এক ঢোকে গিলে ফেলে  !

> তাহলে চারিদিকে যে এত লড়াই , উদ্বেগ ,টান টান উত্তেজনা !

> ঘড়ির কাঁটা ঘোরার অপেক্ষা লড়াই করেও করা চলে অথবা আপোষে , তাতে অন্যায় তো কিছু নেই দাদুভাই ! কিন্তু সেই ক্ষনিক  জিত হারের হিসেব কে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা দেখে যদি মহাকাল হাসেন , তাকেও কি  খুব বেশী দোষ দেওয়া চলে ?

>জীবন মানে কি তবে শুধুই মৃত্যুর অপেক্ষা দাদান ?

> তা কেন হবে দাদুভাই !  জীবন মানে শুধুই  জীবন ! সেখানে জেতার লড়াই করাই যেতে পারে কিন্তু হারলেও বিশেষ ক্ষতি নেই , শুধু এই উপলব্ধি টুকুই যথেষ্ঠ যে  এতখানি পথ যদি বিনা জয়লাভে কেটে যেতে পারে বাকিটা আটকানো কোন হারের সাধ্যি!

>সেই হারের ফাঁকে লুকিয়ে ফেলা চোখের জলের মূল্য কেউ চুকিয়ে দিলে হিসেব টা অনেক সহজ হয়ে যেত, তাই না দাদান ?

> নিজের চোখের জলের মূল্য অতি বড় বিধাতার কাছেও আদায় করতে চেও না দাদুভাই ! এর চেয়ে বড় মূর্খামি যে আর হয় না ।সব হিসেবও সহজ করতে নেই নইলে গণিতের আনন্দে ঘাটতি হয় যে ! ডাক্তারের নির্দেশে চিনি ছাড়া কালো চা খাওয়ার বেস্বাদ বিকেল গুলোয় , মাটির ভাড়ে চা খাওয়ার আনন্দের স্মৃতিই শুধু মুখে হাসি আনতে পারে । ফুটো ভাড়ের চা তে হাত পুড়ে যাওয়ার কষ্ট নিদারুণ ছিল বটে কিন্তু তৃপ্তির চুমুকের কাছে সে জ্বালা সেচ্ছায় হার মেনেছে বারবার ! তাই বলি আর দেরী না করে উঠে পড় রথে ,সময় ফুরোনোর আগে জীবনটাকে একটু চেখে দ্যাখো দেখি দাদুভাই ! যুদ্ধে জিত হারের মাশুল না হয় দিলেই কিছু , শেষমেষ আক্ষেপের মাশুল গুণতে না হলেই জীবনের সাথে মৃত্যুও স্বার্থক ।

2 thoughts on “সারথী

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান