যুগপৎ

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ফর্মুলার খাতায় আরো একবার চোখ বুলিয়ে নিল গিনি । গত কয়েক মাসের নিরলস পরিশ্রম স্বার্থক হলে ,তার তৈরী নতুন যন্ত্র টি দূর করতে পারবে একাকিত্ব , নিঃসঙ্গতা  প্রভাবিত হবে ফর্মুলার যাদু কাঠিতে , জীবনের হিসেব মুহুর্তে বদলে দিয়ে অসাধ্য সাধন করবে যন্ত্রটির ইচ্ছা বোতাম ,  তবে আগের  যন্ত্র গুলোর  মতন সম্পূর্ণ গিনির ইচ্ছায় পরিচালিত হবে না এটি , নিজের প্রয়োগ স্থান এবং পদ্ধতি নির্দিষ্ট করবে এটির ভিতরের ইচ্ছা বোতাম। যদিও তার অন্য আবিষ্কারের মত এটির কার্যকারিতাও পরীক্ষা সাপেক্ষ, তবুও গিনির চিন্তা জুড়ে অবাধে যাতায়াত করে চলল নতুন আবিষ্কারের উত্তেজনা। যন্ত্রটিকে টেবিলের উপরে রেখে বিছানার উপরে শুয়ে পড়তেই প্রিয় লজেন্সের আদরে ভিজে গেল গিনির ক্লান্ত শরীর।

শনিবার সকালে উঠে যন্ত্রটি হাতে নিয়ে মা কে বলে আলুভাজা দিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ল গিনি । রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সেই ছোটবেলা থেকে পাড়ার এই প্রবীণার সাথে এক অলৌকিক  মায়ার বাধনে বাঁধা সে, তার ছোট্টবেলার গোসাঘর হল দিদার চিলেকোঠার ধারের সিড়ির তলা । সেই গোসা ভাঙ্গানোর একমাত্র ওষুধ ছিল দিদার হাতে তৈরী ঝিরঝিরে আলুভাজা । দিদার কাছে নানা রঙের গল্প শুনে রাগের কারণ ভুলে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ত ছোট্ট গিনি , নিজের অজান্তে বাবার কোলে বাড়ি ফিরতো ঘুমন্ত মেয়েটা । খুব অল্প বয়সে বিধবা নিঃসন্তান এই মহিলার ভিতরের সীমাহীন ভালবাসা গিনির ছোটবেলার স্মৃতিকে আজকের ব্যস্ততার ভিড়েও ম্লান হতে দেয়না । বয়সের কারণে এখন প্রায় গৃহবন্দী একসময়কার ভীষণ কর্মঠ  মহিলা  নিহারী গুহ ওরফে গিনির আলুভাজা দিদা । প্রতিবেশীদের  থেকে শহরের নাম করা বৃদ্ধাশ্রম গুলোর সুযোগ সুবিধা অনেকবার শুনেও কিছুতেই এই বাড়িটার মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেননি নিহারী দেবী , ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী রক্ষনশীল পরিবারের মেয়েটি  কলেজে পড়াকালীন সকলের অমতে  বিয়ে করেন তার ভালবাসার  মানুষকে  , স্বামীর হাত ধরেই  বিয়ের রাতে প্রথম বার পা দেন  শ্বশুরের তৈরী করা এই বাড়িটি তে। বাড়িটির পবিত্রতা নিহারী দেবীর  কাছে মন্দিরের চেয়েও বেশী । ছোটবেলায় মা হারানো  একটি ছেলের  বড় হওয়ার নির্বাক সাক্ষী এই বাড়িটি, বাকি সকলে মুখ ফিরিয়ে নিলেও, ছেলেটির  স্ত্রীকে  প্রথম দেখাতেই   নিজের সবটা দিয়ে আপন করে নিয়েছিল এই বাড়ির প্রতিটা কোণা ,নিজের সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে  বেঁধে নিয়েছিল অলৌকিক মায়ার বাঁধনে । বিয়ের পরের কাটানো রঙীন দিন গুলোর স্মৃতি আজও বাড়িটার সর্বত্র লেগে আছে , হঠাৎ অসুখে স্বামীকে হারিয়ে সেই স্মৃতি আঁকড়েই  নিহারী দেবী কাটাতে পেরেছেন এতগুলো বছর , তাই কিছুতেই এই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন না  তিনি , তবে সারা জীবনে জুড়ে  তৈরী করা নিঃস্বার্থ সম্পর্ক গুলোর  গাঁট  আজও একই রকম অক্ষত, গিনির মত ভক্তের সংখ্যা  তার অগনিত কিন্তু  ব্যস্ত জীবনের চাপে স্বাভাবিক কারণেই  যখন তখন  স্বনিমন্ত্রিত অতিথির  সংখ্যা আজকাল হ্রাস পেয়েছে, শারীরিক অক্ষমতার কারণে নিজেও আর কারো বাড়ি বেশী যান  না , অভ্যাসের বলে এই বয়সেও সংসারের দৈনন্দিন  কাজ গুলো নিজেই করে থাকেন তাই বলা বাহুল্য কাজের লোকের  প্রয়োজন তার কখনো ই পড়েনি ,তাই নিহারী দেবীর  এখনের  একাকিত্বের দায়ভার শুধুই  যেন সময়ের । প্রিয় আলুভাজা দিদার  শারীরিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার উপায়  গিনির অজানা হলেও তার শেষ বয়সের একাকিত্ব দূরের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রমে সে তৈরী করেছে ‘যুগপৎ’ নামের এই নতুন যন্ত্রটি।

দিদার বাড়ির কড়া নাড়তেই দেখা মিলল সেই ছোট্টবেলা থেকে পরিচিত হাসি মুখ টার , পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রনাম করেই গিনি বলল,  “কী করব ? সকাল সকাল আলুভাজা খেতে ইচ্ছা হল যে ! ” নিহারী দেবী হেসে বললেন “ভাগ্যি আমার ! তাই না সোনা মেয়েটার দেখা পেলাম !” দিদাকে জড়িয়ে ধরে গিনি বলল , ” আমি বুঝি খুব স্বার্থপর?” সাথে  সাথে  দিদার শক্ত গলার  আদর জড়ানো  প্রত্যুত্তর “বালাই শাঠ!কান টা  যে অনেকদিন মোলা হয়নি  কথা শুনে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।” গিনি খিলখিল হেসে ছোটবেলার অজস্র স্মৃতি  জড়ানো বাড়িটাতে ধীর পায়ে মিশিয়ে দিল নিজের উপস্থিতি ।

আলুভাজা ভাজতে ব্যস্ত নিহারী দেবীর পিছনে  দাড়িয়ে গিনি ব্যাগ থেকে যন্ত্রটি বার করল, ইচ্ছা বোতামে আঙ্গুল ছোঁয়ানো  মাত্র  যন্ত্র থেকে বেরোনো আলো রশ্মি নিহারী দেবীকে স্পর্শ করলো ,নিহারী দেবী চমকে উঠে পিছন ফিরতেই গিনি যন্ত্রটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে ব্যাগের পিছনে আড়াল করে নিল। নিহারী মৃদু হেসে বললেন , “কি রে ! দিনের বেলায় টর্চ জ্বালছিস কেন ? ভাবছিস বুঝি দিদার চোখ টা একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে , ঝাপসা দৃষ্টি তে সাধের আলুভাজা বেস্বাদ হয়ে গেল বুঝি !” গিনি খানিকটা সামলে নিয়ে বলল ,”ধ্যুর ! তা কেন হবে ! আলুভাজার গন্ধে তাড়াতাড়ি আসতে গিয়ে অসাবধানে টর্চে হাত পড়ে গিয়েছিল ।কখনো কখনো কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতে দেরী হয় বলে মা এটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছে ।” নিহারী দেবীর উত্তর না শুনেই রান্নাঘর থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল  গিনি , বসার ঘরে ঢুকে যন্ত্রটা সামনে আনতেই  তা থেকে বিচ্ছুরিত আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল  তার , কয়েক সেকেন্ড পর ইচ্ছা বোতাম ভিতরে ঢুকে যেতে যন্ত্রের  আলো নিজে থেকে নিভে গেল । যন্ত্রটি নিহারী দেবীকে পর্যাপ্ত নিরীক্ষণের সুযোগ পেল না তাই তার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে উদ্বেগে গিনির মন ভরে  গেল।

দিদার সাথে সারাদিন অনেক গল্প করে সন্ধ্যে বেলা বাড়ি ফিরল গিনি।টেবিলের ওপর চিন্তায় অবশ  মাথা রেখে  নিজের অজান্তেই  সে  কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল ,মা ঘরে ঢুকে মাথায় হাত রেখে বললেন , “ক্লান্ত লাগছে  খুব , তাই না ? কতবার বলেছি এদিক সেদিক ঘুরিস না  ছুটির দিনগুলো তে।” গিনি চোখ কচলে উঠে খাটে শুয়ে বলল , “ক্লান্ত না হলে যে তুমি  তো আদর ই কর না !” মা হেসে পাশে বসে বললেন , “তাই বুঝি ! তোর লজেন্স কে জিজ্ঞাসা কর ! আজ সারা দুপুর আমার আদর খেয়েছে । ” নিজের নাম শুনে আল্হাদে গদগদ লজেন্স দৌড়ে  বিছানায়  উঠে গিনি আর মায়ের মাঝে ঠেলে  নিজের জায়গা করে আদরের বিশেষণ গুলো কে আরো একবার  লালাময় করতে লাগল ।

দুটো দিন বেশ চিন্তায় কাটল গিনির, অনেকবার ভেবেও আলুভাজা দিদার বাড়ি যেতে পারেনি সে , গিনি গেলেই দুর্বল শরীর নিয়ে দিদা রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্য কোনো উপায়ও তো নেই  , দুদিন আগে ঘুরে এসে ,এখনই ফোন করে খবর নিলে দিদার অদ্ভূত লাগতে পারে । সকালে জলখাবারের টেবিলে পৌঁছে বাবাকে একটা বই মনোযোগ সহ পড়তে দেখে  গিনি বলল , ” বাবা ! তুমি না শিখিয়েছ খাবার সময় অন্য কাজ করতে নেই ! ”

মা : তুই তো এখন দেখছিস ! এ চলছে কাল রাত থেকে , সারারাত ঘরে আলো  জ্বালিয়ে রেখেছিল তোর বাবা ! দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি মোটে , তোমার না হয় অফিসে না গেলে  চলবে , আমার সংসারের কাজে তো আর ছুটি নেই বাপু !

বাবা:  আরে ! এই বইটার কি অদম্য আকর্ষণ তোমাদের কী বলব! শেষ না করে এটার থেকে চোখ সরানো  এখন অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে ।

গিনি: তাই ? কী বই এটা ?

বাবা : মনস্ত্ব ত্ব কেন্দ্রিক  এমন জটিল কিছু তথ্য লেখা যা আমার মত ঘুম কাতুরে লোকেরও ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ !

গিনি : মনস্ত্ব ত্ব ? কই দেখি ! উহু !  আমার বইয়ের তাকের সদস্য তো নয় এটি , তাহলে বই টা কে দিল তোমাকে ?

বাবা : নিহারী মাসিমার  বাড়িতে আসা নতুন ছেলেটি !

গিনির চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল  : আলুভাজা দিদার বাড়িতে কেউ এসেছে?

বাবা : ওহ ! তোকে তো বলতে ভুলেই গেছি ! কাল অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় ভাবলাম মাসিমার খবর টা নিয়ে আসি , বাড়ি যেতেই উনি এই নতুন ছেলেটির  সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন ,বললেন  পেয়িং গেস্ট । ছেলেটি ব্যবহার যেমন  চমৎকার তেমনি

প্রশংসনীয় ওর সংগ্রহের বইগুলো ! এত সুদর্শন যুবক আমি আগে  দেখেছি বলে মনে পড়ে না , কিন্তু নিষ্পাপ মুখের মধ্যে কোথাও যেন একটা জটিল রহস্যের ছায়া ! আমি নিহারী দেবীকে আড়ালে বলে এলাম , ছেলেটির ব্যাপারে ভালো করে খোঁজ নিয়ে নিতে ,এখন যা দিনকাল পড়েছে !

গিনিকে অন্যমনস্ক দেখে মা ধাক্কা দিয়ে বললেন , ” খাবার টা খেয়ে নিয়ে বিজ্ঞানে মনোনিবেশ করলে ভালো হয় !”

গিনি : এখন আর সময় নেই মা ! আমাকে এখনি বেরোতে হবে ।

গিনি রুদ্ধশ্বাসে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই , মা খাবার গুলো ঢাকা দিতে দিতে বললেন , ” যেমন বাপ্ তার তেমনি মেয়ে ! তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস গিনি ! তুই না এলে কিন্তু আমি খাব না !”

আলুভাজা দিদার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তেই অচেনা ছেলেটি দরজা খুলে দাড়ালো ।

গিনি : আপনি ?

ছেলেটি : আমি আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িং গেস্ট ।

গিনি বিস্ময় আড়াল করে বলল, ” আপনি আমাকে চিনলেন কী করে   ?”

ছেলেটি : আমি চিনিনি তো ! দরজায় লাগানো যন্ত্র টা  চিনেছে ।

গিনি: যন্ত্র ?

ছেলেটি : হুম ! দিদার কাছের মানুষদের নাম , ছবি , আর কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে আমি এতে ঢুকিয়ে রেখেছি , কালকেই আপনার বাবা দিদাকে বলছিলেন আজকাল দিনকাল বিশেষ ভালো নয় , সাবধানের মার নেই । তাই ভাবলাম দরজা খোলার আগেই যদি দিদাকে আগন্তুকের পরিচয় জানিয়ে দেওয়া যায় ।

গিনি নিজের থতমত ভাবটা কাটিয়ে যন্ত্রটি খুঁটিয়ে দেখে বুঝল এটি দোকান থেকে কেনা নয় , তাই রাখঢাক না করেই প্রশ্ন করল , :

যন্ত্রটি আপনি বানিয়েছেন ?

ছেলেটি : হুম ।

গিনি : আপনি তো ২ দিন হবে এসেছেন , এর মধ্যে প্রয়োজন বুঝে যন্ত্রটা বানিয়ে ফেললেন ? নাকি অন্য কোনো

প্রয়োজনে এটা আগেই বানিয়েছিলেন ?

ছেলেটি : সে হিসেব না হয় আপনি কষে দেখুন , আমার জন্যে অন্য অনেক জরুরি অঙ্ক অপেক্ষায় আছে ।

গিনির উত্তরের আগেই  নিহারী দেবী দরজায় এসে বললেন , ” আমি অনেক ক্ষণ থেকে তোর গলার আওয়াজ শুনছি , এখনও ভিতরে আসছিস না দেখে শেষমেষ বুড়িকে আসতেই হল , আলুভাজা ভাগ হওয়ার ভয়ে  আর কত ঝগড়া করবি ? ভিতরে আয় তাড়াতাড়ি ।”

গিনি : আহ দিদা ! তুমি বুঝতে পারছ না , এরকম অচেনা অজানা কাউকে হুট করে পেয়িং গেস্ট রাখা আজকাল একদম উচিত নয়,কাগজে তো প্রায়ই  দেখা যায় পুলিশের চোখ এড়াতে সন্ত্রাসবাদীরা ছদ্মবেশে নিরিবিলি জায়গায় গা ঢাকা দেয়।

নিহারী দেবী ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত ভাবে বললেন , “এই পাগলী মেয়েটার কথা শুনে তুমি কিছু মনে কোরো না বাবা !”

ছেলেটি কোনো জবাব না দিয়ে মৃদু  হাসল ।

নিহারী দেবী এবার গিনির দিকে তাকিয়ে রাগের ভান করে বললেন , ” এত লেখা পড়া করে একি ব্যবহার গিনি ! এমন বুঝি কাউকে বলতে আছে ? ও সন্ত্রাসবাদী হতে যাবে কেন ? ও তোর মতই ভীষণ মেধাবী ছাত্র, মনস্তত্ব ও আরো কিছু জটিল বিষয়ে রিসার্চ করছে,সেই কাজেই কিছুদিন এখানে এসেছে ।”

গিনি : তুমি কী ভাবছ সন্ত্রাস বাদীরা মেধাবী হয় না ? ওদের মত মেধা বড় বড় বৈজ্ঞানিকেরও নেই । তাছাড়া তুমি তো কোথাও বিজ্ঞাপন দাওনি , ও কোথা থেকে জানল যে তুমি পেয়িং গেস্ট রাখতে চাও ? সন্দেহের আরো কারণ আছে ,  দুদিনের মধ্যে দরজায় লাগানো যন্ত্রটা বানানো কিছুতেই সম্ভব নয় , তাছাড়া তোমার মত নির্ঝ ঞ্ঝাট  মানুষের বাড়ির দরজায় ক্যামেরা লাগানোর কী প্রয়োজন !

নিহারী দেবী : আহ গিনি ! বিজ্ঞাপন না দিলেও আমি পাড়ায় অনেক কে বলেছিলাম পেয়িং গেস্টের কথা , সুনীতার কাকুর সুত্রে ও আমার

বাড়ি এসেছে , এভাবে ভাবতে নেই মাগো ! যাই হোক ঝগড়ার বহর তো দেখলাম , ওর সাথে পরিচয় করেছিস কী ?

গিনি অস্তত্বি ভাবটা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে না পেরে অসম্মতি সূচক মাথা নাড়ল ।

নিহারী দেবী ভিতরে যাবার আগে অমায়িক হেসে দরজার পাশে চুপ করে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললেন , “এই পাগল মেয়ের সন্দেহ দূর করার দায়ভার তোমার উপরে রইল  সময় ।

গিনি : সময় ?

ছেলেটি এবার মৃদু হেসে গিনির দিকে রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল , “হুম ! আমার নাম ।”

উপরের ঘরে ছেলেটির বইয়ের সংগ্রহ থেকে গিনি মনে মনে প্রশংসা না করে পারল না , কিন্তু  দিদার এই নতুন অতিথির হঠাৎ আগমন যুগপৎ  র  ইচ্ছা বোতামের সাফল্য নাকি নিতান্তই কাকতালীয়  ঘটনা তা না জানা অব্দি সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না ।

সে হঠাৎ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো  : আপনি এখানে কেন এসেছেন ?

সময় : ওই যে তখন দিদা বলল , রিসার্চের প্রয়োজনে ।

গিনি  উদ্বেগ ভরা গলায়  আবার প্রশ্ন করল : শুধু কি তাই ?

ছেলেটির নিষ্পাপ মুখে আবার রহস্যময় হাসি ফুটল  : না ।

গিনির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো  : তাহলে ?

সময় : সময়ের উদ্দেশ্য জানতে হলে যে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয় গিনি !

গিনি ম্লান দৃষ্টি আড়াল করে পিছনে ঘুরে প্রশ্ন করল : তা কতদিন থাকবেন ?

সময় : অনন্ত কাল ..

গিনি চমকে তাকাতেই ছেলেটি হেসে বলল : অনন্ত কাল নয় ! সময় হলেই চলে যাব ।

গিনি : পরিচয়ের জন্য শুধু নাম যথেষ্ঠ নয় ,আপনি কোথা থেকে এসেছেন ? আপনার পদবী কী ?

সময় : আমার জন্ম পরিচয় নিজেরই অজানা , জটিল হিসেব মেলাতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরি ফিরি , এখানে আসার আগে নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা ছিল না । আপনার সন্দেহ স্বাভাবিক , সন্ত্রান্সবাদী যে নই তার প্রমাণও আপাতত নেই, কিন্তু বিশ্বাস করুন দিদার সাথে কাটানো এই অল্প মুহুর্তের মায়া কাল যুগের অতীত সমান ভারী মনে হচ্ছে , একা থাকার পুরনো অভ্যেস ফিরে পেতে আর কিছুতেই মন চাইছে না ।

গিনি : দিদা এরকমই । খুব অল্প সময়ে পর কে আপন করে নেয় , সে জন্যই তো ভয় ..

সময় : ভয় পাবেন না । আলুভাজা আমি খাই না ।

গিনি হাসলো না , চিন্তায় ডুবে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল ।

হঠাৎ টর্চের আলো চোখে পড়ায় চমকে তাকাতে ছেলেটি বলল : দেখুন দেওয়ালে আপনার ছায়া পড়েছে ।

গিনি : এ তে দেখবার কি আছে ? আলো জ্বললে ছায়া তো পড়বেই ।

সময় : হুম তা ঠিক , কিন্তু আমি আপনার নয় ,পাশে রাখা ফুলদানি টার ছায়া ফেলতে চেয়েছিলাম । তার মানে আলো যার যার গায়ে পড়বে ছায়াও তারই পড়বে , এখানে আলোর ইচ্ছা শুধু একটাই , অন্ধকার দূর করা ,কিন্তু সেটার পরিধি নির্দির্ষ্ট করার দায়িত্ব যে তার নয় । তবে দীর্ঘ অন্ধকারের একাকিত্ব দূরের জন্য আলোর প্রথম ঝলক অস্বস্তি র কারণ তো বটেই ।

গিনির মনে পড়ে গেল  যুগপৎ র আলোয়  তার চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার কথা , সে ভীষণ ভয় পেয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল ,”আপনি কী বলতে চাইছেন ?”

ছেলেটি আবার সেই রহস্যময় হাসি মেখে বলল ,”বলছিলাম দিদার মত মানুষের স্নেহের পরিধি মাপা অসম্ভব , আপনার পাশে রাখা ফুলদানি টার মত অল্প স্বাদ না হয় আমিও পেলাম , এতে আপনার ভাগ যে কম পড়বে না সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন ।

বাড়ি ফিরে চিন্তার মধ্যেও এক অদ্ভূত স্বস্তিতে গিনির মন ভরে গেল , যুগপৎ র ফর্মুলা তাহলে সফল , দিদা আর একা নেই , নতুন ছেলেটি যতই অদ্ভূত হোক এই অল্প সময়েই দিদাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছে । হঠাৎ  মায়ের ডাকে চমক ভেঙ্গে পাশের ঘরে যেতেই যে অপ্রত্যাশিত খুশিতে সে লাফিয়ে উঠল , “জ্যাঠামনি তুমি!”  অমায়িক ভদ্রলোক দুহাতে গিনিকে জড়িয়ে বললেন , “হুম রে  ! আমিই তো ! তোদের জন্য মন কেমন করছিল ,তাই চলে এলাম !”

গিনি : এবার কিন্তু না বলে চলে গেলে আর কোনোদিনও কথা বলবো না ।

জ্যাঠামনি : বললে যে তুই যেতে দিস না মাগো ।

গিনি : “দেবই না তো । জেম্মা থাকতে তুমি তো এমন ….”

গিনির অসম্পূর্ন কথার উত্তরে জ্যাঠামনি মৃদু হেসে বলল , “ধ্যুর পাগল মেয়ে ! তোর জেম্মা থাকবে না কেন? সে না থাকলে তোর জ্যাঠামনি থাকতো বুঝি ? চোখের দেখা একরকম বিলাসিতা বলতে পারিস , সময়ের সাথে সে বদভ্যাস কেটে গেলেই আর কোনো অসুবিধা হয় না । ”

নিরুত্তর গিনি চিন্তার গভীরে আরো একবার হারিয়ে গেল । কয়েক বছর আগে জেম্মার হঠাৎ মৃত্যুতে জ্যাঠামনিকেও কখন যেন হারিয়ে ফেলেছে সে  । চাকরীতে সময়ের আগে অবসর নিয়ে বছরের বেশীর ভাগ সময় টাই জানা অজানা জায়গায় ঘুরে কাটায় জ্যাঠামনি , জরুরি দরকারেও যোগাযোগের কোনো মাধ্যম বা উপায় কোনোটাই নেই , অগত্যা এভাবে জ্যাঠামনির হঠাৎ ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গোনাই তাদের শেষ কবছরের অভ্যাস। গিনির মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল, একাকিত্বের এই ভীষণ দমবন্ধ মায়াজাল থেকে বার করে যুগপৎ নিশ্চই পারবে ফিরিয়ে দিতে তার জ্যাঠামনিকে পুরোনো জীবন , পালিয়ে বেড়ানোর প্রয়োজন ফুরালেই জ্যাঠামনির ভিতরের প্রাণখোলা আত্মভোলা মানুষটার হাসির আওয়াজে এ বাড়ির দেওয়াল গুলো আরো একবার ঝনঝন করে উঠবে ।

সারাদিন জ্যাঠামনির সাথে অনেক গল্প করেও প্রতিবারের মতো এবারেও গিনির স্বাদ মেটেনি , তবুও আজ তার কোনো তাড়া নেই ,মনে ভয় নেই , জ্যাঠামনি তো এখানেই থাকবে, সবসময় । আর কখনো গিনিকে জ্যাঠামনির ফিরে আসার অপেক্ষা করতে হবে না । জ্যাঠামনির ভিতরে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো মানুষটার সাথে  ফিরে আসবে গিনির ছোটবেলা । প্রহর শেষের আগেই  তা নিশ্চিত করবে গিনি , সব কিছু ঠিক আগের মতো করে দেবে ফর্মুলার জাদু কাঠিতে । ভাবনা মতই সকলে ঘুমিয়ে পড়লে গিনি জ্যাঠামনির ঘরে  যন্ত্রটা নিয়ে এসে তার ইচ্ছা বোতাম টা টিপতেই জ্যাঠামনির সারা শরীর যন্ত্রের  বিচ্ছুরিত আলোতে ভরে গেল, তার সাথে  অসীম পূর্ণতার আনন্দে আলোড়িত হল গিনির মন ।লজেন্স কে জড়িয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে ভিতরের ভীষণ আনন্দে তার চোখ জলে ভরে উঠলো  ,আরো একবার তার  আবিষ্কার  তাকে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক   নতুন করে ফিরিয়ে দেবে।

সকালে মায়ের  ডাকে  ঘুম  ভাঙলো গিনির । গিনি হাসিমুখে মা কে জড়িয়ে ধরে বললো , “আমি আজ খুব খুশী মা । জ্যাঠামনি আর কখনো আমাদের ছেড়ে যাবে না দেখো । জ্যাঠামনি কে আর কখনো একা থাকতে হবে না ।”

নিরুত্তর মায়ের চোখের দিকে তাকাতেই গিনি চমকে উঠলো , “মা ! তুমি কাঁদছো ? তবে কী !” গিনি দৌড়ে জ্যাঠামনির ঘরে যেতেই  তার মনে হল খালি ঘরটার  দেওয়াল গুলো থেকে যেন তার বিশ্রী ভাবে হেরে যাওয়ার ছবি প্রতিফলিত হচ্ছে । অসম্ভব কে সম্ভব করার স্বপ্ন তাকে এতটাই বিভোর করে দিয়েছিল ব্যর্থতার বিদ্রুপ চাহনী আজ তার অসহ্য মনে হচ্ছে । মুহূর্তে তার সমস্ত চিন্তাশক্তিকে ভর্ৎসনা করে নিজের ওপর প্রচন্ড রাগে গিনি যন্ত্র টা ব্যাগে নিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল । বাড়ির সামনের লেকের ধারে পৌঁছে যন্ত্রটা জলে ফেলতে যেতেই একটি অচেনা হাত তার থেকে যন্ত্র টা কেড়ে নিয়ে নিল , বিস্ময়ে তাকাতেই আগন্তুক টিকে চিনতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হল না ।

গিনি :  আপনি ?

ছেলেটি : কিছু  অঙ্ক মিলছিল না , ভাবলাম লেকের ধারের  স্নিগ্ধ হাওয়ায় মাথাটা খুলে যেতে পারে  ,তাই এদিকে এসেছিলাম , হঠাৎ আপনাকে দেখে..

গিনি : বুঝলাম ! কিন্তু আমি এখন একটু একা থাকতে চাই ।

ছেলেটি : তা তো আর হয় না ।

গিনি: মানে ?

ছেলেটি : বলছিলাম যন্ত্রটা ফেলে দিচ্ছেন  যখন এটা নিশ্চই আর আপনার দরকার নেই , তাই এটা আমার কাছে থাকলে  আপনার কোনো আপত্তি থাকার কথা নয় ।

গিনি : ও যন্ত্র কোনো কাজের নয় ।

ছেলেটি :আপনার না হতে পারে , আমার  কাজের।

গিনি : আহ ! বললাম তো আমার নয় , আপনার নয় ,কারোর কাজের নয়  ওটা ।

ছেলেটি : তাহলে সবটাই কাকতালীয় বলছেন ?

গিনি রাগে অস্থির হয়ে বললো : তাছাড়া আবার কী ? যদি সত্যি ই  এতে একাকিত্ব দূরের ক্ষমতা থাকতো তাহলে কি আমার জ্যাঠামনিকে মুক্তি দিতে পারতো না  ? ভিতরের যন্ত্রনা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে যে মানুষটা পালিয়ে বেড়াচ্ছে , ফর্মুলার জাদুকাঠিতে পারতো না তাকে কাছের মানুষগুলোর কাছে ফিরিয়ে দিতে ?

ছেলেটি : যুগপৎ শক্তির অধিকারী ঠিকই কিন্তু তার শক্তি একাকিত্ব দূর করাতেই সীমিত ,মৃত ব্যক্তিকে জীবন দান তার ক্ষমতার  উর্ধ্বে । একাকিত্ব দূরের চেষ্টায় যুগপৎ সফল হয়নি কারণ আপনার জ্যাঠামনি একা নন , উনি আজও নিজেকে ওনার স্ত্রীর থেকে আলাদা মনে করেন না । স্ত্রীর মৃত্যু শুধু ওনার  বেঁচে থাকার গণ্ডি ভাঙতে পেরেছে , একা করতে পারেনি । দেহের মৃত্যু মেনে নিলেও ভালোবাসার মৃত্যু উনি এক মুহূর্তের জন্যেও মানেন নি গিনি ! সেই ভালোবাসার মোড়কে তার যাযাবর জীবন সমাজের অযাচিত হস্তক্ষেপে পাচ্ছে অস্বস্তি বোধ করে , তাই তার এই পালিয়ে বেড়ানো ।

গিনি দুচোখ ঢেকে অসহায় কান্নায় গুমড়ে উঠলো ।

ছেলেটি তার কাছে এসে বলল , “বৈজ্ঞানিকের চোখের জলে ফর্মুলা ধুয়ে গেলে আমাকেও যে ফিরে যেতে হবে গিনি !”

দুর্বলতা কাটিয়ে  চিন্তাশক্তি ফিরে আসতেই গিনি চমকে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অস্থির ভাবে প্রশ্ন করলো , “আপনি আমার ব্যাপারে এতো কিছু জানলেন কী করে ?  আপনি ..আপনি  কে ?

ছেলেটি  চেনা রহস্যময় হাসি হেসে বলল : আমি ? আমি সময় । আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িং গেস্ট । দিদার থেকেই শুনেছি হবে, নাহলে আর কী করে জানবো বলুন !

গিনি : কিন্তু আলুভাজা দিদা তো এতকিছু …

গিনিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ছেলেটি কানের কাছে এসে বললো , ” করুন না , যা আপনি সবসময় করেন , অপেক্ষা ! সময়ের অপেক্ষা !”

বিস্মিত গিনি নিজের সবটুকু  দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত প্রশ্ন করলো , ” সময় ? মানে আপনার  অপেক্ষা ?”

চলে যাওয়ার আগে ছেলেটি পিছন ঘুরে আরো একবার রহস্যময় হাসি হেসে বললো , “করবেন না  ? তাহলে না হয়  যুগপৎ র  ফর্মুলার কার্যকারিতা  প্রমাণের অপেক্ষা করুন , লেকের জলে পড়া থেকে বাঁচানোর পর এটুকু দায়িত্ব তো তার উপর আমার থেকেই যায় । ”

 

One thought on “যুগপৎ

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান