প্রাপ্তি

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

দরজা টা দমকা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল । ঘটনার আকস্মিকতায় শেষের শোনা কটু কথা গুলো কিছুতেই বোধগম্য হল না রিনির । চোখের জলের আড়ালে মনের ভিতরের অনুভূতিগুলো নিংড়ে বেরোতে থাকলো অনর্গল । অবিশ্বাসী মন আরো একবার দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই এক অকল্পনীয় ভয় তাকে ধাক্কা দিয়ে পথের একধারে এনে ফেলল , বাস্তবের সম্মুখীন হওয়ার চেয়ে যেন এখন মৃত্যু ই পরম কাঙ্খিত ।

ঘটনার এক অচেনা প্রত্যক্ষদর্শী কে লক্ষ্য করে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালো রিনি । ভদ্রলোক সহাস্যে এগিয়ে এসে বললেন , “তোমার কি কোনো সাহায্যের প্রয়োজন ?”
রিনি ঘোরের মধ্যে দরজার দিকে ফিরে তাকাতেই ভদ্রলোক বললেন , “ওটা তো আর খুলবে না , আমি যা একবার বন্ধ করে দি, সময় তাকে আর খুলতে পারে না ।”
রিনি : আপনি ?
প্রত্যক্ষদর্শী হেসে বললেন : ওহ! ওটা আমার এক আপত্তিজনক মুদ্রা দোষ ! বিশ্ব ব্রহ্মণ্ডের সবকিছুকেই বরাবর আমার নিজের বলে মনে হয় , বিশাল কর্মকান্ডও তার উর্দ্ধে নয় ।
রিনি ভীষণ ব্যস্ত হয়ে বলল : কিন্তু শেষ বারের জন্য আমাকে যে ভিতরে যেতেই হবে ।
প্রত্যক্ষদর্শী: উহু ! শেষবারের হিসেব টা যে অন্য কেউ রাখে রিনি ! শুধু চৌকাঠের এপার ওপার বলে নয় , যেকোনো কিছুরই শুরুর সাথে শেষের হিসেব নিশ্চিত করাই তার দায়িত্ব । আপাতদৃষ্টিতে কিছু ঘটনা আকস্মিক মনে হলেও আসলে তা সময়ের খাপে ছক কেটে মিনিট সেকেন্ডের খেলা ।
রিনি : খেলা ? কে জেতে এমন খেলায় ?
প্রত্যক্ষদর্শী: খেলা বৈকি ! টান টান উত্তেজনা পূর্ন খেলা ! সেকেন্ডে সেকেন্ডে বদলে যাচ্ছে গুটি , সাথে তাদের চাওয়া পাওয়া , কী ভীষণ জটিল হিসেবী চাল , পরিণতি সুখকর বা মর্মান্তিক যেমনই হোক শেষের দাড়ি কেটে গেলে ফিরে যাওয়া অসম্ভব । আমার কাছে যে পেন্সিল রাবারের বড় অভাব , অগত্যা পেনের মোটা কালিতেই অমর হয় অক্ষর । তবে হার জিতের ব্যাপারটা আপেক্ষিক ।
রিনি : আপনার কথা যদি সত্যি হয় , আমি কী তবে হেরে গেলাম ?
প্রত্যক্ষদর্শী: সে বড় কঠিন প্রশ্ন , আমি বরং সহজ ভাবে বলি । ওই দরজার ভিতরের মানুষের কাছে তোমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে । দরজার দমকা আওয়াজ একেবারেই আকস্মিক নয় বরং বহুদিনের মুলতুবী রায় । তোমার যাকে আজীবন
প্রয়োজন , তার ইচ্ছার গুরুত্ব দেওয়াও যে আবশ্যক ! আর সম্পর্কের সময়সীমার অবধি ইচ্ছামতো কল্পনা দিয়ে মাপার মতো মূর্খামি আর হয় না। বুদ্ধিমতীর ইঙ্গিতই যথেষ্ঠ হলেও অবিশ্বাসীর কাছে আয়নাও মিথ্যেবাদী , দ্বিতীয় নির্ণয়ে পৌঁছাতে স্ময়ং ঈশ্বর ও বেশ খানিকটা সময় লাগালেন ।
রিনি অবুঝের মত বললো : কিন্তু আমি যে এতকাল ওখানেই ছিলাম । আমার আমিত্ব , অধিকার , প্রত্যাশা , সবই যে চৌকাঠের ওপারে । যেখানে স্বেচ্ছায় ঢুকেছিলাম , পরিস্থিতি বা সময়ের প্রয়োজনে নয় , স্বেচ্ছায় বেরোনোর জন্য আমার আরো একবার ভিতরে যাওয়ার খুব প্রয়োজন ।
প্রত্যক্ষদর্শী: স্বেচ্ছাচারিতার কদর যে আমি করি না তা নয় ! তবে সে বরদান লাভের জন্য বিচক্ষণ হওয়া প্রয়োজন , সময়ের ইঙ্গিত বুঝতে হবে রিনি! মনবদলের হাওয়ার আঁচ পেতে হবে । স্থান বিশেষে প্রয়োজনের সময়সীমা নির্ধারিত , তা ফুরোবার আগেই নিজেকে স্থানান্তর করে ফেলতে হবে , কেউ বলার বা বোঝার আগেই । তবেই টিকে থাকবে আমিত্ব , নিজস্বতা , অযাচিত চৌকাঠের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া থেকে তবেই তার নিষ্কৃতি ।
রিনি : আর আমার অনুভূতি ? আমার চাওয়া পাওয়া ? তার বুঝি কোনো দাম নেই ?
প্রত্যক্ষদর্শী: দাম তো বাজারে বেঁচতে চাওয়া জিনিসের হয় রিনি ! তুমি যা হারিয়েছো তা যে বিক্রি হয়নি ।
রিনি : কিন্তু আমি যে নিজের সবটুকু দিয়েছি , একটুও কার্পণ্য করিনি , আজ কড়ায় গন্ডায় ফেরৎ চাইলে বুঝি অধিকারের অবমাননা হবে?
প্রত্যক্ষদর্শী: যারা সবটা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে , হাত পাতা যে তাদের আর শিখে হওয়া ওঠে না রিনি! অত্মসম্মানের ঘেরাটোপে সুপ্ত ইচ্ছার সলিল সমাধি ঘটে ।
রিনি : কিন্তু এখনো যে মুখের উপর দরজা বন্ধের আগে তার শেষ প্রশ্ন টা কানে বাজছে , উপহাস পূর্ণ অপমান বাক্য, “তোমার আরও কথা বলার আছে ? ” উত্তরটা দেওয়ার মতো শক্তি তখন ছিল না , নিজের সাথে লড়াই টা বড় দুর্নিবার হয়ে পড়েছিল ।
প্রত্যক্ষদর্শী: মৌনতার চেয়ে জোড়ালো উত্তর কিছু হয় না রিনি ! আর কখনো সাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে সম্পর্কের মৃত্যুদন্ড বলে , যা প্রতিশ্রুত হয়েছে তোমার ভিতর থেকে , আমি পরিষ্কার শুনলাম যে , চোখের জলের সে দৃঢ় ঘোষণা। দরজার ওপারে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় ফেলে আসা কোনোকিছুই আর তোমার নয় , সময় ভিক্ষার চাল রান্না করে পরম তৃপ্তিতে ভাত ঘুম দিচ্ছে । তাই আর অপেক্ষা না করে নিজেকে আবার নতুন করে তৈরী করো রিনি , এবার কিন্তু শক্ত হাতে বেঁধো সূক্ষ্ম অনুভূতির গাঁটগুলো , নতুন রিনির চোখের জল দেখার ইচ্ছা যেন দেবাদিদেব মহাদেবেরও অপূর্ন থাকে ।
রিনি : কিন্তু আমার গন্তব্য যে অনিশ্চিত , প্রয়োজনের পরিধি মাপতে নতুন দরজা র ঠিকানা জানা আবশ্যক ।
প্রত্যক্ষদর্শী: নিজের ভিতরের দরজাটা খুলতে অন্যের অনুমুতি নিষ্প্রয়োজন , মেয়েটার যে তোমায় ভীষণ দরকার , স্বার্থের হিসেবের সকল স্মৃতি বিলীন হতেই হারিয়ে যেও নতুন সত্তার পরম গভীরে । আর দেরী কোরো না রিনি! আমার যে মেলা কাজ বাকি আছে ।

রিনি স্বস্তির আবেশে চোখ বন্ধ করল , মুখে ফুটে উঠলো সকল প্রাপ্তির হাসি ।

কিছু সময় পর বন্ধ দরজার ভিতর থেকে পুরোনো অভ্যাসের ভুলে ক্ষনিকের আবেশে কেউ ডেকে উঠলো , ” রিনি !”

রিনির আবেশের ব্যাঘাত ঘটানোর ক্ষমতা আর কোনো জাগতিক স্বরের যে নেই তা বলা অনাবশ্যক ।

রসিক প্রত্যক্ষদর্শীর কেন যেন মনে হল এক্ষেত্রে মৌনতা একেবারেই বেমানান , তাই সে দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল , ” শেষ প্রশ্নে অপমানের পরিমাপ বোঝাই করার ব্যস্ততায় স্পষ্ট উত্তরটা অশ্রুত থেকে গেল যে ! হারিয়ে যাওয়া আর হারিয়ে ফেলার মাঝে যে বিস্তর ব্যবধান ,মশাই !ফিরে পাওয়ার বরদান শুধু প্রথম টির জন্য প্রযোজ্য তাও ক্ষেত্র বিশেষে , যতদূর জানি তা বিচারের মাপকাঠির দৈর্ঘ্য ও পরিধি সাধারণের অপরিমেয় , প্রয়োজনের ঘড়ি বাঁধা সম্পর্কের পক্ষে তার নাগাল পাওয়া অসম্ভব।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান