বাড়তি

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

প্রথম ধাপ :

তখন কি আর বুঝতে জানি ,

পরিধানের মন্দ ভালো ,

পছন্দসই রং না হলে ,

মুখ টা করে থাকতি কালো।

মাপের বড় জামার কারণ ,

চোখ পাকিয়ে শুধাস আবার ,

মায়ের উপর বলবো কথা ,

তখন কোথায় সাধ্য আমার !

দ্বিতীয় ধাপ :

বয়স না হয় বাড়লো খানিক ,

বদলে গেল সময় নিজে ,

ভালোবাসাও আর ঢাকা নেই ,

যত্নে রাখা চিঠির ভাজে ,

স্বপ্নতে আর নেই না পিছু ,

নাম বলি না ঘুমের ঘোরে ,

আঙ্গুল টা তোর মুঠোয় নিয়ে ,

পাশ ফিরে শুই হঠাৎ ভোরে।

ঝগড়া হলে বন্ধ কথা ,

ভোর না হতেই বাপের বাড়ি ,

ফোন ঘোরালেও অন্যে বলে ,

মেয়েটি তাদের ব্যস্ত ভারী।

শাস্তি দেবার নিঠুর উপায় ,

অভিমানের অঙ্কে কষা ,

নিজের মনেই হাসতি দেখে ,

ভালোবাসার দৈন দশা।

অগত্যা যাই শ্বশুর দুয়ার ,

দানের আশায় সত্য চারণ ,

তাদের প্রাণের রত্নটি যে ,

হয়েছে আমার বাঁচার কারণ।

তৃতীয় ধাপ :

মা হলি তুই দস্যি ছেলের ,

স্নেহের ফাঁকে কঠিন শাসন ,

মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখি ,

দায়িত্ব নেবার ইচ্ছা পূরণ ।

রঙের বাছাই , মাপের হিসাব ,

এখন করিস ইচ্ছে মতন ,

দর্জি আসে হুকুম হলে ,

উলের কাঁটায় মর্জি লালন।

চতুর্থ ধাপ :

নিয়ম তো সেই তেমনি আছে ,

বাড়লে বয়স অসুখ হাজার ,

পারবে না তোর বাক্স ওষুধ ,

বদলে দিতে সময় যাবার।

ভাবলি বুঝি হয়েছে মনে ,

মৃত্যু ভয়ের জবরদখল !

কর্ম ফলের পাপ পুন্য ,

তুই ছাড়া যে মিথ্যে সকল!

তোর মনেতেও ভয়ের দাপট ,

প্রমাণ ঢাকা ঠান্ডা হাতে ,

অভ্যাস যে ঘুমিয়ে পরা ,

আমার বুকে ঝড়ের রাতে ।

চমকে উঠে আমায় খুঁজিস ,

স্বস্তিতে চোখ আবার বুজিস ,

হঠাৎ ভয়ের কারণ খানি ,

মিথ্যা বলে আড়াল করিস।

পুজোর ঘরে সাজিয়ে থালা ,

চাস যে কি তা আমিও জানি ,

প্রার্থনাতে বদলে দিতে ,

মহাকালের নিয়ম খানি।

ফুলটা হাতের মাথায় ঠেকাস,

শান্তি জলে কপাল ভেজাস,

যত্ন করে জমিয়ে রাখা ,

আমার মনের ইচ্ছা শুধাস।

চাওয়ার বাকি নেই যে কিছু ,

এখন বরং সাধ হয় দিতে ,

একা থাকার বাড়তি সময় ,

বলিস তাকে ফিরিয়ে নিতে ।

আগে পরের বদলে হিসেব,

ভালোবাসার ইচ্ছাপূরণ,

ঝড়ের রাতে আলিঙ্গনে ,

মোদের সাধের মৃত্যু বরণ ।

আলোর খোঁজে যাত্রা নতুন ,

জমিয়ে রাখা পুন্য মেপে ,

অজানা পথ ভয় দেখালে ,

হাত টা আমার ধরবি চেপে।

গন্তব্যের নতুন ভোরে ,

জেদকে বেঁধে অবুঝ মনে ,

তোর কোলে মুখ গুজব আমি ,

মহাকালের চিরন্তনে ।

ধন্যবাদ ,

রোমি দাস

ধোঁয়াটে ইঙ্গিত

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

পর্ব এক 
ছাদে একা বসে ছিল গিনি। ডিসেম্বরের শেষের সময়টায় চারিদিকের জগৎ টা যখন উৎসবের আমেজ উপভোগে ব্যস্ত একটা ভীষণ ভয় তাকে যেন আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে। ২ বছরের গিনিকে তার পছন্দ সই  বড়দিনের উপহার কিনে দেবার জন্যই সেদিন  বেড়িয়েছিল মা।  তার কিছু ঘণ্টা পর একটা ঝোপের ধার থেকেজীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে ২ বছরের গিনিকে পুলিশ তার বাবার হাতে তুলেদিয়েছিল। 
প্রকৃতির নিয়মে দুবছরের শিশুর অপরিণত মস্তিস্ক সেই ভয়াবহ স্মৃতির ভার বহনে অক্ষম  , এমনটা মনে হলেও গিনির ক্ষেত্রে সত্যিটা এক অস্বাভাবিক।  এক অদৃশ্য শক্তি  সেই দুর্ঘটনার মুহূর্ত গুলো সবিন্যস্তে গিনির সামনে উল্টে পাল্টে ধরেছে। অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাসারি সেজে উঠেছে  অলৌকিক  নিয়মে  , মায়ের স্পর্শের চেনা অনুভতি , আদো কথা , খিলখিল হাসি,  ভুবন মোহিনী সুরের প্রত্যাশিত ছন্দ পতন।  তখন বুঝতে না পারলেও,বাড়তি বয়সের পরিণত বুদ্ধি দিয়ে গিনি বুঝেছে সুন্দর  মুহূর্ত গুলোর রক্তময় হয়ে ওঠার সেই ভয়াবহ স্মৃতিমন্থনের পিছনে,  লুকিয়ে ছিল  কোনো গর্হিত ইঙ্গিত , খারাপ কিছু ঘটে যাওয়ার আভাস , দূরত্ব বাড়ার আগের মুহূর্তের নিস্তব্দতা।

স্পষ্ট মনে আছে গিনির , রোজের অভ্যাসমত স্কুলের   প্রার্থণা ঘরে  , সকলের অলক্ষ্যে পকেটে লুকিয়ে নিয়ে আসা চক দিয়ে  যীশু মূর্তির গায়ে  লেগে থাকা রক্তের রঙ মুছে দিচ্ছিল সে।  মাত্র আট  বছর  বয়সে সেই বা কি করে জানবে , কিছু দাগ যে মোছা যায় না , কিছু ক্ষতকে ঢাকতে গেলে আরো বেশি করে তা সামনে এসে পড়ে ।  গিনির চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল  এক ভীষণ চেনা মুখ, সে শুনতে পেয়েছিল তার প্রিয় স্বরের গুনগুন গান , দেখেছিল মায়ের বুকে আদরে জড়িয়ে থাকা নিজেকে । ওরা ওই গাড়িটা করে কোথাও যাচ্ছে , রাস্তাটা খুব উঁচুনীচু , গিনি অনুভব করছে অসম্ভব ঝাঁকুনি , মা যেন কি একটা বলল , ভালো শোনা যাচ্ছে না , ভীষণ হওয়ার শব্দ।  একি! সামনে এগিয়ে আসা গাড়িটা থামছে না কেন !   মা যে খুব ভয় পেয়ে যাচ্ছে , আচমকা সেই কান ফাটানো আওয়াজ , বুকের শিশু খোলা জানলা দিয়ে পাশের ঝোঁপে গিয়ে পড়ল , চারদিকে রক্তের ছিটে , সব শেষের গোঙানি , দমবন্ধ করা কালো ধোঁয়া, চোখ বন্ধ করে ফেলল গিনি।

ঘামে ভিজে যাওয়া , ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকা  আট বছরের মেয়েটিকে করা কোনো প্রশ্নেরই উত্তর সেদিন পাননি স্কুল শিক্ষিকা প্রতিমা কর । সবসময় একা থাকতে চাওয়া এই মেয়েটির এমন  অদ্ভুত আচরণ দেখেও  সেদিন চিন্তিত হননি প্রতিমা দেবী ।  অন্যান্য শিক্ষিকারা এমন ঘটনা বাড়িতে জানানোর কথা বলতে তিনি বলেছিলেন , “সব বাচ্চা তো সমান হয় না।  তাদের মাথা , তাদের মন , সবই একে ওপরের থেকে আলাদা।   কোন দোষের আড়ালে কোন গুণ লুকিয়ে আছে বা কোন সমাধানের আড়ালে নতুন সমস্যা, কেউ কি জানে! এ নিয়ে অহেতুক চিন্তা অপ্রয়োজন।” রোজের মত স্কুল বাসে নয় , সেদিন প্রতিমা মিসের হাত ধরে  বাড়ি ফিরে এসেছিল গিনি। ঘরে ঢুকে সবসময় হাসতে থাকা জ্যাঠামণিকে জীবনে প্রথমবার কাঁদতে দেখেছিল সে। সারা রাত ফুঁপিয়ে কাঁদা  গিনির ঘুম , পরদিন ভেঙেছিল জ্যাঠামণিরই ডাকে। ফুলে যাওয়া চোখ নিঃস্পলকে তাকিয়ে পরম স্বস্তিতে দেখেছিল তার জ্যাঠামণি আর কাঁদছে না।  গিনির গলা জড়িয়ে ধরে জ্যাঠামণি বলেছিল, “তোর মায়ের মত জ্যেঠিমাও কাল সকলের সাথে আড়ি করে দিয়েছে রে গিনি ! ওরা খুব বন্ধু ছিল তো , তাই শলাপরামর্শ করেই  এমন ঘটিয়েছে । আমাদের অবস্থা দেখে দুই বন্ধুর খুব হাসির ফোয়ারা ছুটেছে হবে , ঠিক আগের মত । লুডোর গুটি লুকিয়ে জেতাকে জোচ্চুরি বলে , আমি এই হার মানি না। তাই শুনে রাখ , আড়ি বৈ তো কিছু নয় , ওমন হয়েই থাকে , তাতে কাঁদতে আছে নাকি ! আমরাও হাসবো , মজা করবো , সবটা দিয়ে বাঁচবো , ওদের ছাড়াই। হ্যাঁ হ্যাঁ ওদের ছাড়াই। ”

আজ  আরেকটা বড়দিন।  ষোল বছরের গিনি  এখন পরিণত বুদ্ধির অধিকারী , বিজ্ঞানে ঘেরা দিন রাত।  তার পরিশ্রমের  ফর্মুলা আবিষ্কার করেছে তিনটি বিস্ময় ক্ষমতা ধারী  যন্ত্র , ফিরিয়ে দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক , আড়াল করেছে অযাচিত কতকিছু। প্রতি বছরের মত স্কুল ছুটি থাকা সত্ত্বেও  দাড়োয়ানজি গিনির বলে দেওয়া সময় মতই চাবি নিয়ে উপস্থিত ছিল  স্কুলের দরজায়। প্রার্থনা ঘরে যীশু মূর্তির সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে চোখ বন্ধ করতেই আবার ভেসে উঠল সেই ভয়াবহ দৃশ্য।  উল্টানো গাড়ি,মায়ের বাঁচার চেষ্টা  , রক্ত ভরা রাস্তা , ঝোপের মাঝে অসহায় ছোট্ট শিশুর অদম্য কান্না। গিনির দিকভ্রান্ত হয়ে স্কুল থেকে ছুটে বেড়িয়ে যাওয়ার কারণ  বৃদ্ধ দারোয়ানের বোধগম্য হয়নি।

পর্ব দুই 


ভয়ের মোড়কে নিজেকে গুটিয়ে  অস্থির পায়ে ছাদে  পায়চারী করছিল গিনি ।  সিঁড়িতে অচেনা পায়ের শব্দে পিছনে ঘুরল সে ।  আগন্তুকের মুখ অন্ধকারে  অস্পষ্ট।

গিনি : কে ?

আগন্তুক : আমি সময় , আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িংগেস্ট।

গিনি :আপনি এখানে  ?

সময় : সন্ধ্যেবেলার নাকি আপনার দেওয়া একটা ডাক নাম আছে , ছাদবেলা।  দিদার কাছে কথাটা শুনে হাসলেও এখন তা বেশ মানানসই বলেই মনে হচ্ছে।

গিনি :আপনি আমার বাড়ি চিনলেন কি করে ?

সময় : সেদিন লেকের ধারে নেওয়া  আপনার  ফর্মুলার খাতার প্রথম পাতাতেই  নাম , ঠিকানা ,বাড়ির নম্বর এমনকি ইমেইল পর্যন্ত লেখা আছে। কিন্তু তা দেখে আপনার বাড়ি আসতে হলে এত গুলো দিন অপেক্ষা করার কোনো যুক্তি খুঁজে পেলে অবশ্যই বলবেন , ততক্ষণ না হয়  বিশ্বাস করুন  প্রেরকের লিখে দেওয়া ঠিকানা  , এই  চিঠিখানা পৌঁছানোর দায়িত্বপূরণের কাজে আমায় সাহায্য করেছে।

গিনি নিজের অপ্রস্তুত ভাব আড়াল করে কাগজের চিরকুট টা হাতে নিতেই  দেখল মন ভালো করে দেওয়া সেই চেনা হাতের লেখা ।

ওরে মেয়ে ,

কাঁপা হাতে আলুভাজা বেস্বাদ হয় , তাই বলে প্রাণদন্ড ? দিদার মরা মুখ ছাড়া বুঝি দেখবি না পণ করেছিস ?

গিনির শুধু গিনির ( আগে মচমচে  , এখন ন্যাতানো ) আলুভাজা দিদা।

গিনি :সত্যি ! পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে , তারপরে কিছু নিজস্ব কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে আর যাওয়া হয়নি দিদার কাছে , আপনি আছেন বলেই বোধহয় আরো নিশ্চিন্তে ছিলাম, একটা ফোন করার কথাও খেয়াল হয়নি।ক্ষমা চাওয়ার কোনো অজুহাত খুঁজে দেবেন আমাকে?

সময় : নিশ্চই দেব। অভিযোগ ও অজুহাত  মেল করানোই আমার নেশা , এ খেলায়  দাবার থেকেও বেশি বুদ্ধি লাগে।

গিনি : আমি কাল যাবো তাহলে।

সময় : কাল ? কিন্তু তাহলে তো …

এক অজানা ভয় ঘিরে  ধরল গিনিকে , ঠান্ডা হতে শুরু
ইঙ্গিত,অবশ্যম্ভাবী পরিণতি,আতঙ্কে কেঁপে উঠল  কণ্ঠস্বর:তাহলে কী ? দেরী হয়ে যাবে ? দেখা হবে না ? আপনি সব জানেন তাই না ?

সময় : হ্যাঁ  জানি। কখনো বেশিরভাগটা  কখনো বা   সবটাই।

গিনি আর ভয় আড়াল করতে পারছে না , অস্থির স্বরে কাঠিণ্য এনে বলল  : তাহলে শুনে রাখুন আমিও জানি , আমিও সবটা জানি।

সময় রহস্যময় হাসি মেখে বলল :জানতেই পারেন , জানাটাই তো স্বাভাবিক।  ছোটবেলা থেকে দিদার বাড়িতে আপনার নিত্য যাতায়াত । আমি তো মাত্র  এক মাস ধরে দেখছি দিদাকে , তবু যেন মনে হল  প্রতি  মঙ্গলবার দক্ষিণেশ্বরে যাওয়ার অভ্যাসটা  দিদার নতুন নয়।

গিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল : ওহ! তাই তো , কাল মঙ্গলবার।

সময় : MERRY  XMAS । আপনার ঘরের যীশুখ্রীষ্টের ফটো টা খুব জীবন্ত।

গিনি : আপনি আমার ঘরে গিয়েছিলেন ?

সময়: হুম , আপনার বাবা প্রথমে আমাকে আপনার ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন , ওখানে আপনাকে না দেখে খানিক ডাকাডাকি করতেই একজন ভদ্রমহিলা এসে বললেন আপনি সন্ধ্যের এই সময়টা রোজ ছাদে কাটান।  উনি বুঝি আপনার মা ?

গিনি : হুম।

সময় : তাহলে  যীশুখ্রীষ্টের ফটোর পাশে যে  ভদ্রমহিলার ছবি দেখলাম যার সাথে আপনার মুখের ভীষণ মিল , উনি …

গিনি : আমার মা , চোদ্দ বছর আগে এক পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এখন বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীকেই আমি মা বলে জানি। জন্ম দিলে এর থেকে বেশী ভালোবাসা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি না।  আর কিছু জানার আছে আপনার ?

সময় : দুঃখিত।  আমার অকারণ কৌতূহল আপনাকে   বিব্রত করেছে বেশ বুঝতে পারছি।

গিনি : আসলে আমার মনটা ভালো নেই , এরকম অসংযত ব্যবহারের জন্য ক্ষমা করবেন।

সময়:তা না হয় করা যাবে।  কিন্তু এমন দিনে মন খারাপ করতে নেই  গিনি ! আজ যে আপনার যীশুখ্রীষ্টের জন্মদিন।

গিনি : আর আমার মায়ের মৃত্যুদিনও ।

সময় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল :  সান্ত্বনা দেওয়া আমার অভ্যাস নয় , তাছাড়া জীবনে অস্তিত্বর  ভিত্তি হারানোর স্বান্তনা হয় না। ভেবে নিন প্রসঙ্গ বদলাতেই আবার এক অবান্তর প্রশ্ন করছি -ভালো তো কতকিছুই লাগতে পারতো , কৃষ্ণের বাঁশি , শিবের জটা ,  নামাজের টুপি,গুরুর  প্রসাদ । শুধু  সাদা আলখাল্লা ধারণকারী সুদর্শন ব্যক্তিটির উপর বিশেষ পক্ষপাতের  কোনো কারণ আছে কি ?

গিনি :  জন্মদিন সুখময় হয় আমার আপনার , তার মেরীময়। মৃত্যুর অতীত নাড়ির টান।

সময় :ব্যাপারটা আপেক্ষিক , দৃষ্টির পরিধি অনুযায়ী।  সাধারণ দৃষ্টি জীবন সীমার পরিধি অতিক্রম করতে পারে না , তাই মৃত্যুর পরও শুধু জীবনকালটাই আলোচ্য।   কিন্তু হতেও তো পারে মৃত্যুর অতীত জীবনকালের কোনো কিছুই নয় , সত্যিটা সেখানে অনেক বেশী সহজ , দুইয়ের বদলে হয়তো একটাই স্বত্বা , তাই আগে পিছে থাকার প্রয়োজন হয় না কখনো ।

গিনি : হতে তো অনেক কিছুই পারে , আবার অনেক কিছু না হলে ক্ষতি তো বিশেষ ছিল না বলেই মনে হয়। চক দিয়ে  যীশু মূর্তির শরীরে  লেগে থাকা লাল রঙ ঢাকা যায় ঠিকই  কিন্তু  ব্যস্ত রাস্তায় ঘটা  ভীষণ দূর্ঘটনা য়  সারা রাস্তাটা রক্তে  লাল হয়ে যায়  ! , ওত  চক তো আমার  কাছে নেই !

সময় অল্প হেসে বলল : রক্তের দাগ খুবই ক্ষণস্থায়ী।  চলতি গাড়ির চাকা কিংবা হঠাৎ বৃষ্টির জল বেশীক্ষণ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দেয় না। যা থেকে যায় তা হল  ভালোবাসার মানুষের  দীর্ঘশ্বাস  , নিরন্তর ছটফটানি , সত্যিকে মিথ্যা ভাবার ব্যর্থ প্রয়াস ,  স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও আবার হতাশার গভীরে তলিয়ে যাওয়া।তবু শেষমেশ যখন কিছু ই বদলায় না তখন  নিয়তির কালচক্রের অজুহাত দিয়ে নেওয়া হয় জীবনের  গতি  বাড়াবার অবশ্যম্ভাবী সিদ্ধান্তটি।

তাই আমার বিশ্বাস, প্রত্যেকের জীবনসীমা একটি জটিল অঙ্ক কষে নির্ধারিত হয়,তা বিশ্লেষণে  কালব্যয় বৃথা। যে অঙ্কের সমাধানে  আপনার  ভূমিকা নেই , তার  ফলাফল বদলানো আপনার পক্ষে  অসম্ভব। হ্যাঁ অসম্ভব , শুধু আভাস কেন , তারিখ- ক্ষণ-নাম-কারণ  জানলেও অসম্ভব।

গিনি : আপনার কি বিশ্বাস  সব অঙ্কের সমাধান সঠিক ? হিসাব নির্ভুল ?

সময় : তা তো বলিনি।  নিজের সাথে দাবা খেলেছেন কখনো ? দাবার চালে ভুল তো হতেই পারে , সেক্ষেত্রে ভুল বিচারই বলুন বা দান  শুধরানোর দায়িত্ব কিংবা নিজের করা ভুলেরই  সদ্ব্যবহার  , সবটা দাবাড়ু নিজেই করে থাকেন । খেলা শেষে নিশ্চই কোনো জটিল নিয়মে দানের কার্য কারণ ব্যখ্যা হয়  তার মস্তিষ্কে , তার প্রভাবও হয়তো পরের খেলায় প্রতিফলিত হয় , যেখানে দাবাড়ু আরও প্রখর , আরও সাবধানী।  রাজা মন্ত্রীর সাজানো ছকে  ডুবে থাকলেও  দাবাড়ু জানেন  তা ঘণ্টা কয়েকের খেলা বৈ তো নয় , তাই সে অবিচল , নিরুত্তাপ , হার জিতের হিসাব তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক।

নিজের ভিতরে লুকিয়ে রাখা পুরোনো প্রশ্ন টির থেকে আড়াল সরিয়ে , লৌকিকতা ভুলে অস্থির স্বরে গিনি বলল :  যখন এতো কিছু জানো,এটাও নিশ্চই জানো মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় ? তার ভালোবাসার সম্পর্কগুলো সেখানে তাকে অনুসরণ করতে অক্ষম , কিন্তু তার পূরণ না হওয়া  ইচ্ছাগুলো ! কোনোকিছুর টানেই কি সম্ভব নয় ফিরে আসা ? অন্তত  ফিরতে চাওয়া ! মৃত মানুষটি  তো  সবটা দিয়ে চাইবেই  তার সাথে হওয়া অঘটন  ফেলে আসা  ভালোবাসার মানুষ গুলোর সাথে না হোক,কিন্তু সে ইচ্ছাপূরণে বাঁধ সাজছে তার অকর্মণ্য মেয়েটি । বিশ্বাস করো  , ভীতু সে নয় , কোনোদিন ছিল না। আগেও সে  আসন্ন দূর্বিপাকের   ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল ,আজকে আবার সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। শুধু এটুকু জানি , আজকে আবার কারো  চিরবিদায় নেবার সন্ধিক্ষণ উপস্থিত , এর থেকে বেশী কিছু বোঝার শক্তি যে নেই আমার।

সময় নিজের দুর্ভেদ্য দৃষ্টি স্থির করল গিনির জল ভরা অস্থির চোখ দুটিতে , তারপর কঠিন স্বরে আশ্বাস মিশিয়ে বলল : শান্ত হও গিনি ! অকারণে নিজেকে দায়ী কোরো না  এভাবে , প্রতি সন্ধ্যায় ছাদের অন্ধকারে মৃত মায়ের কাছে ক্ষমা চেও না আর । হঠাৎ হাওয়া বা শুকনো পাতার শব্দে মায়ের আত্মার উপস্থিতি খোঁজা বন্ধ করে দাও ,  এটুকু জেনে রাখো  আয়নার কাঁচ  ভেদ করা প্রতিবিম্বর সাধ্যের বাইরে। তবুও  নাড়ির টান তার নিজের জায়গায় অবিচল , তার ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট , যা তোমার বোঝাটা  ভীষণ জরুরি –  আগে যা ঘটেছে ভবিষ্যতে তা আবার ঘটবে।  কাছের বা দূরের কারো সাথে, আজ  যা তোমার  সাথে , কাল  তাই  অন্যের  সাথে  , হয়তো স্থান টা অন্য , ধরণ টা অন্য ,  কিন্তু ঘটনাটা এক , তা ঘটবে, ঘটবেই।  তাই যে এতদিন হয়ে এসেছে , তাই যে নিয়ম। তুমি যার থেকে পালাতে চাইছো ,তার থেকে পালানো যায় না,কারণ সেই যে সত্যি , সেই যে মুক্তি।

গিনি :আর  কখনো দেখা হবে না , তাই তো  ? আদরে ভেজা  গলার স্বর টা আর কখনো শোনা হবে না আমার । কি যে সুন্দর গান গাইতো মা!পুরো গানটা সেদিন শোনা হয়নি , প্রথমদুটো  লাইন গাওয়ার পরই গাড়িটা …

সময় :অপেক্ষান্তে তোমার সত্ত্বা তার থেকে যখন ভিন্ন থাকবেনা , তখন দেখার প্রয়োজন যে হবে না গিনি ! সে না হয় পরের কথা , এখনকার হিসেবে বলছে   তুমি তো মৃত মায়ের বাকি থাকা আদরটুকু  পেয়েছো নতুন মায়ের থেকে , কতজনের তো পুরোটাই বাকি থেকে যায় , পাওয়া হয় না কিছুই , তাদের দাবী কি কম !

গিনি : নাহ ! কম নয় , বরং বেশি। সেই দাবী পূরণের গুরুদায়িত্ব যার ,  তার ক্ষমতায় থাকলে আমাকে যেন শুধু একটু সময় ভিক্ষা দেন , নিজেকে শক্ত করার , নতুন যন্ত্রণা সহ্যের শক্তি সঞ্চয় করার। জানিনা তা সম্ভব কিনা , তবুও আজ না চেয়ে থাকতে পারলাম না যে!

সময় : সব  ইচ্ছা না হলেও কিছু ইচ্ছা তো পূরণ হয় বলেই জানি। আমি এখন আসি গিনি! কিছু জরুরি কাজ বাকি আছে।  তুমি দিদার সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা ভুলো  না কিন্তু।

গিনি : সত্যি ! অনেক কথা বলে দেরী করে দিলাম খুব ! আসলে আমি আর পারছিলাম না , একটা ভীষণ ভয় , অদেখা কালো দেওয়াল..কথাগুলো না বললে ..। জানিনা মাত্র কয়েকদিনের আলাপে আমার থেকেও বেশি করে আমার পরিস্থিতির জটিল  না বলা সত্যি গুলো  বোঝা কিভাবে সম্ভব হল তোমার পক্ষে,  ধন্যবাদ।

সময় অল্প হেসে বলল : ধন্যবাদ ছাদবেলা কে ,  সৌজন্যের “আপনি”  কে বন্ধুত্বের “তুমি” তে করার জন্য । কেউ প্রথম আমার বন্ধু হল কিনা।

গিনি র কানে পৌঁছলো না সময়ের শেষ কথাগুলো , চিন্তার গভীরে তলিয়ে গেল সে। হঠাৎ বাবার ডাকে চমক ভাঙল তার। দ্রুত পায়ে নিচে এসে দ্যাখে লজেন্স কে ঘিরে বাবা মায়ের উৎকন্ঠা। লজেন্স গিনির প্রিয় কুকুর , গত মাসে ওর লিভারের ছোট অপারেশন হয়েছে  , তারপর থেকে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে  ওকে তরল খাবারই দেওয়া হচ্ছে  , ওর পক্ষে শক্ত খাবার হজম করা সম্ভব হবে না আরো দুমাস । সন্ধ্যেবেলা , সময়কে ভিতরে নিয়ে আসার পরে গিনির বাবা বাইরের দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন  , সেই ফাঁকেই লজেন্স বাইরে বেড়িয়ে বাগান থেকে কিছু একটা খেয়ে এসেছে ,যার ফলে তার এই অবস্থা। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পরছে  ওর  শরীর , ডাক্তারকে ফোন করা হয়েছে , তিনি এখনই ওকে পশু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

হাসপাতালের চেয়ারে বসে সেই ভয়ানক সত্যি শোনার অপেক্ষা , গিনি চোখের জল বাঁধ মানছে না , ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে  , সময়ের বলা কথাগুলো তার কানে  বাজছে বারবার ,”প্রত্যেকের জীবনসীমা একটি জটিল অঙ্ক কষে নির্ধারিত হয়,তা বিশ্লেষণে  কালব্যয় বৃথা। যে অঙ্কের সমাধানে  আপনার  ভূমিকা নেই , তার  ফলাফল বদলানো আপনার পক্ষে  অসম্ভব।” লজেন্সকে যে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে , ছোট্টবেলা থেকে সে তার ছায়া সঙ্গী।  গিনি আর কিচ্ছু ভাবতে পারছে না , সব কিছু হারিয়ে যাচ্ছে তার।  মায়ের কোলে মুখ গুঁজে গুমড়ে উঠল সে।

ডাক্তারের গলার  কেঁপে উঠল ওরা তিনজন , ” লজেন্স ভালো আছে , কাগজেরটুকরো খেয়েছিল বলেই এযাত্রায় প্রাণ রক্ষা ! বাকি দুমাস বকে পাথর রেখে হলেও বেঁধে রাখবেন ওকে।”পর্ব তিন সেই রাত টা  ঘুমন্ত  লজেন্সের পাশে হাসপাতালে  কাটিয়েছিল গিনি। লজেন্সের জিভের আদরের ঘুম ভাঙার নিয়ম পরদিন সকালেও যথাসময়ে পালন হল। হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে লজেন্সকে নিয়ে ফিরতে ওদের দুপুর হয়ে গেল। চটপট স্নান করে তৈরী হয়ে নিল গিনি। মা কে “আসছি “বলে দ্রুত পায়ে রওনা দিল আলুভাজা দিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। কড়া নাড়তেই  হাসিমুখে দরজা খুলে  দাঁড়াল তার  ছোটবেলার মুশকিল আসান – আলুভাজা দিদা।গিনি অবাক হয়ে বলল ,”একি ! দক্ষিণেশ্বর যাওনি ? মঙ্গলবার মানেই তো নিজের আলু নিজেই  রাঁধার  দিন।”আলুভাজা দিদা হেসে বললেন ,”আহারে ! পিওন দাদা না গেলে কত যেন আসতো আমার রাঁধুনি। আয় ভিতরে আয় ! আর বলিস না,কাল তোর বাড়ি থেকে ফেরার পথে পাথুরে অন্ধকার গলিটায়  হোঁচট খেয়ে সময় এক ভীষণ কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে , কত যে রক্ত তোকে কি বলবো!বাড়িতে ঢুকেই   আমাকে বলল , আমি যেন এ নিয়ে কোনো না চিন্তা করি ,  এসব নাকি হয়েই থাকে। ভাবতে পারিস  তুই ! ছেলের  অটল  জেদ , জ্ঞানের বুলি ফুটিয়ে  বলে “সময়ের কাছে সব ক্ষত মেলাতে বাধ্য সে তা যত ভয়ানক ই হোক না কেন।” উপায়ান্তে  নিজের মরা মুখের দোহাই দিয়ে কমল ডাক্তারের বাড়িতে নিয়ে গেলাম ছেলেকে । পাথর কুচি বের করতে গিয়ে পায়ের তলার কিছুটা মাংস কেটে বাদ দিয়েছে ডাক্তার ।  কি প্রচন্ড সে ছেলের সহ্যশক্তি ! কাটা ছেড়া , এতগুলো সেলাই , তবুও বাবুর ঠোঁটে কষ্টের  ‘রা’ নেইকো মোটে।গিনি :তারপর ?আলুভাজা দিদা : তার আর পর কি ! ধমক দিয়ে ওষুধ খাইয়ে শুইয়ে দিলাম , শিয়রে বসে  ছিলাম সারারাত , ডাক্তার যা বলেছিল ঠিক তাই!মাঝরাত থেকে ধুম  জ্বর , ভোরের দিকে যা একটু কমেছে। এই অবস্থায় ছেলেটাকে ফেলে মায়ের দুয়ারে গিয়ে শান্তি পাবো আমি !গিনি : হুম। এখন কি ঘুমোচ্ছে ? একটু দেখা করা যাবে?আলুভাজা দিদা : হ্যাঁ যা না ! ঘুম আছে নাকি ওর ? সেই কোন কাকভোরে থেকে জেগে আছে , আমি ততক্ষণ রান্না ঘরে যাই একটু , দুপুরে খেয়ে যাস কিন্তু।গিনি সিঁড়ি দিয়ে  উঠে যেতে যেতে উত্তর দিল , “আচ্ছা “।ব্যান্ডেজ বাঁধা  পা টিকে বালিশের উপর রেখে খাতা কলমের  হিসাবে মগ্ন ছিল সময়।  গিনিকে  ঘরে ঢুকতে দেখে হেসে বলল , “আরে  গিনি যে !   ইচ্ছাপূরণ হল তাহলে ?গিনি অবাক হয়ে বললো : ইচ্ছাপূরণ ? তুমি  কি করে !সময় তার রহস্যময় হাসি আড়াল করে বলল : ওই যে কাল কি  একটা অদ্ভুত ইচ্ছার কথা বলছিলে , কেন যেন আর একটু সময় দরকার ছিল । এখন  তোমার মুখ ভরে যে আনন্দের রেশ  লেগে আছে  ,হলফ করে বলতে পারি কাল  তা ছিল না। তাই মনে হল কোনো সদ্য  ইচ্ছাপূরণই  কি  এই  হঠাৎ খুশির  কারণ।গিনি : উঁহু ! ইচ্ছাপূরণই বটে। সে কথা পরে হবে , আগে বলো , তুমি এমনটা ঘটালে কি ভাবে !সময় : ঘটনা তো ঘটবার জন্যই ! এমন হোক বা তেমন। আচ্ছা, এবার বলো লজেন্স কেমন আছে ?গিনি : লজেন্স ! তুমি  কি করে জানলেন লজেন্সের শরীর খারাপ ?সময় বিস্ময়ের মুখোশ পরে বলল : শরীর খারাপ ? সেকি কবে থেকে ? কি হয়েছে ওর  ?গিনি : তা না জানলে হঠাৎ লজেন্সের কথা জিজ্ঞাসা করলেন যে !সময় :আসলে দিদার কাছে লজেন্সের কথা এতো শুনেছি , তোমার  বাড়িতে গিয়েও কাল ওর সাথে দেখা হল না , কথাচক্রে ওর খবর জানাও হয়নি , তাই আজ মনে করে জিজ্ঞাসা করলাম।গিনি: মাঝে মাঝে তোমাকে  কেমন ধাঁধার মত মনে হয়  , কিছু যেন আড়াল করছো প্রচণ্ড সাবধানী পদক্ষেপে। আবার কখনো তুমি খুব সহজ  যাকে অবিশ্বাস করতে একবারের জন্যও ইচ্ছা হয় না। তুমি কেমন অন্যরকম , সকলের থেকে আলাদা।সময় : আমি এরকমই , জটিল অঙ্ক নিয়ে কারবার করি বলেই হয়তো। তোমার প্রথম ধারণটা ই ঠিক , আমি জটিল , কঠিন , ধোঁয়াটে , প্রচলিত নিয়মে আমাকে বাঁধা অসম্ভব। দিদার কাছে না এলে আমার বোধহয় কখনো সহজ হওয়া শেখা  হত না।  সে যাক , লজেন্স কেমন আছে বললে না ?গিনি : ভালো আছে এখন , কাল শরীর টা খারাপ করেছিল , ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি , ভেবেছিলাম মায়ের মত….সময় : উফ ! তোমার  ভাবনাটা বড় বেশি , যা ঘটে গেছে  তা তো আছেই  , অথবা যা ঘটেনি  তা নিয়েও। তোমার অজানা হলেও , বিশেষ কারণেই হয়তো মহাকাল ঘটিয়ে থাকে কিছু  রক্তক্ষরণ , স্রষ্টার অনুমতি নিয়ে। তাই পকেটে চক নিয়ে ঘোরাটার পিছনে তোমার ভাবনাটা অমূলক। দাগ হালকাই হোক বা গাঢ় , কোনোটাই হিসেবের বাইরে নয়।গিনি : কাল আমার বাড়ি না গেলে সাদা মোড়কে পা ঢাকতে হত না । এই ভাবনাটা নিশ্চই ভুল নয়।সময় :হুম! হত না , সাথে আরো অনেক কিছুই হত না , আবার অনেক কিছু হয়তো হত।ইঙ্গিত বিশ্লেষণে অনুমানের আচ্ছাদন সরিয়ে  দিল  গিনি  : মানে ?সময়ের ঠোঁটে আবার সেই চেনা রহস্যময় হাসি  : মানে দিদার  চিঠিটা  পৌঁছানো হত না , আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সূত্রপাত  হত না , দিদার রান্নাঘরে জমে থাকা আলুগুলোর জীবনকাল স্বার্থক হত না ।গিনি হাসল না , তার  ভিতরের ঠান্ডা হওয়া পুরোনো ভয় আবার তার কন্ঠ স্বরে  হয়ে উঠল স্পষ্ট  : আর কী যেন হতে পারতো বলছিলেন !..সময় তার দুর্ভেদ্য দৃষ্টি সহজ করল এবার : তোমার চিন্তায় দিদার শরীর আরো খারাপ হত  ,দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে , দিদার কাছে বসে তোমার ছোটবেলার অদ্ভুত কান্ডকারখানা শুনতে হত আমাকেই, শেষমেশ আমার অঙ্কের খাতা , বাকি হিসেব পত্র  তোমার প্রিয় লেকের জলে ভেসে যেত  !”আয়রে মাগো ! সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে যে ! ” সময়কে কিছু যেন আরো বলতে চাইছিল গিনি , কিন্তু দিদার ডাকে থামতে হল থাকে।সময় : যাও ! তোমার অপেক্ষার আলুভাজা তৈরী হয়ে গেছে মনে হয়।গিনি : তোমার  খাবার তো ঢাকাই দেখছি। ঘুম তো পায়না তোমার দিদা বলল , খিদেও  কি ….সময় : খিদে ঘুমের সাধারণ নিয়মচক্রে বাঁধা পরলে হিসাবের খাতা অমিলে ভরে যাবে যে ! মাঝে মাঝে মনে হয় , জটিল অঙ্কের সমাধানই আমার যাবতীয় চাহিদা পূরণ করে ।গিনি : উফ ! আবার সেই কঠিন কঠিন কথা ! আলুভাজার গন্ধে বুদ্ধিটাও আবার ভালো কাজ করে না, তোমার আর হিজিবিজি  অঙ্কের মাঝখান থেকে আমার এখন চলে যাওয়াই সমীচীন।দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে চেঁচিয়ে উত্তর দিল গিনি -“আসছি দিদা! “গিনির চলে যাওয়া নিঃস্পলকে দেখে পুরোনো  হিসাবে মগ্ন হল সময়।

কাল-আজ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ক্লান্তি ভুলে রাত জাগানোর নেশা ,
গল্প বইয়ের শেষের পাতা জানে ।
মায়ের বকায় আধভাঙা সে ঘুম ,
ফেলুদাকেই দুষত মনে মনে।

পছন্দের সে হলুদ জামাখানি ,
সাধ্যে আড়াল সাধের হাহাকার,
চোখের জলে দুঃখ ভোলে মন ,
মেনে নেওয়া সহজ ছিল হার।

কাঠবেড়ালির খাঁচার পাশে ঘুম ,
পালিয়ে যাওয়া তবুও অনির্বার ,
প্রতারণার ভুলিয়ে দিতে স্বাদ ,
কুকুর ছানা জায়গা নিল তার।

ব্যার্থ যখন সাজের সরঞ্জাম ,
করতে মলিন বর্ণে মেশা কালো ,
আরশি দেখায় হরিণ চোখের মায়া ,
নিজেকে তার বাসতে শেখা ভালো ,

ভালোবাসার প্রথম চিঠি হাতে ,
জীবন দিল উজাড় করে সুখ ,
বিচ্ছেদেরও ভীষণ ছিল তাড়া ,
অগত্যা সেই শুকিয়ে যাওয়া মুখ।

জমিয়ে রাখা গানের ক্যাসেট গুলো,
অজান্তে যা সবটা করে ভালো ,
বুঝিয়েছিল করতে খুশি মন ,
সঙ্গ শুধু নিজের প্রয়োজন।

মহাকালের লোভ দেখানো পথে ,
বাঁকলো জীবন , অঙ্কে মাপা গতি ,
দায়িত্ব আজের কালের সাথে বাড়ে ,
লাভের যোগে লুকিয়ে হাসে ক্ষতি।

যত্নে রাখা গোলাপ ফুলের তোড়া ,
রোজের জলেও মুখ করে রয় কালো ,
আগাছা ডাল স্বপ্নে এসে বলে ,
“স্বার্থ ছাড়াই বেসেছিলাম ভালো।”

সমস্যা তো আগেও অনেক ছিল ,
আজের গুলো বন্ধ করে শ্বাস ,
বক্র হাসির প্রশ্ন আসে কানে ,
“নিজের উপর আছে তো বিশ্বাস ?”

চাটুকতায় চমকে ওঠে মন ,
মানুষ চেনা জটিল সে এক ধাঁধা ,
অভিমন্যুই শিকার একা নয় ,
চক্রবুহ্যের অব্যাহত ক্ষুধা ।

স্বপ্নতে সে চেনা পথের মোড়ে ,
যেখানে খুব সহজ ছিল বাঁচা ,
হিসাব পেনে কালির মেয়াদ শেষ,
অঙ্কে আবার আগের মত কাঁচা।
খোলা হাওয়ার অদম্য হাতছানি ,
অবহেলায় লুটায় ছদ্মবেশ ,
আজও মনের ইচ্ছা গুলো একই ,
মলিন সেথায় কৃত্রিমতার রেশ ।
অভিজ্ঞতা হওয়ার তালে বয়
কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কয় ,
“পরিস্থিতি বদলানো না গেলে
চুপটি করে পালিয়ে যেতে হয়।”

স্বস্তি ভোরে ভাঙলো রাতের ঘুম ,
হালকা হাসির আমেজ মিশে ঠোঁটে ,
নষ্ট সময় হয়তো অনেক হলো ,
বাকির হিসেবে কম কিছু নয় মোটে।

ধন্যবাদ

রোমি

জাত

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

প্রথম 

অচেতনে ঘুমিয়ে থাকা বছর নয়ের মেয়েটির দিকে  অপলকে তাকিয়ে ছিলেন আগন্তুক।   ঘুম ভাঙতেই মেয়েটির কপালে হাত রেখে আগন্তুক হাসিমুখে বললেন , গুডমর্নিং   !

মেয়েটি  প্রশ্ন বহুল চোখে উঠে বসে বললো : গুডমর্নিং।

আগন্তুক:  এতো গম্ভীর হয়ে থাকলে  মর্নিং র  তো আজ গুড হওয়া হবে না।

মেয়েটি : অচেনা কাউকে দেখে মা হাসতে বারণ করেছে।

আগন্তুক হেসে বললেন :  কিন্তু  অচেনা কেউ টি যদি তোমায় দেখে হাসে তাহলেও কি  নিয়ম টা একই থাকবে ?

মেয়েটি  খানিক নিরুত্তর থেকে বললো , মা কে জিজ্ঞেস করে বলবো  তোমাকে ।

আগন্তুক মৃদু হেসে বললেন , আচ্ছা।

>তুমি বুঝি আমার নতুন ডাক্তার ?

আগন্তুক মন দিয়ে  মিঠির মেডিক্যাল  রিপোর্ট গুলো দেখতে দেখতে বললেন , উঁহু  আমি জাদুকর , তোমাকে ছুমন্তর দিয়ে ভালো করে দিতে এসেছি।

মেয়েটি  :  সত্যি !!! আই  লাভ ম্যাজিক।  আমি মিঠি  আর তুমি ?

আগন্তুক : আমি  তাহলে মিঠির  ম্যাজিসিয়ান ।

দূর থেকে আসা নামাজের শব্দে চোখ বুঝলেন আগন্তুক ।

চোখ খুলতেই  মিঠির তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন  : ম্যাজিসিয়ান! তুমি মুসলমান ?

আগন্তুক অবাক হয়ে তাকাতেই মিঠি বললো  : আমার বাড়ির সামনে একটা পুরোনো মসজিদ আছে,তাই শব্দটা আমি চিনি।

> তুমি গেছো কখনো সে মসজিদে ?

>না।  আমার যাওয়া বারণ ,  আমি যে মুসলমান নই।

> তুমি জানো  মুসলমান  মানে কী ?

>সবাই  বলে মুসলমান মানে খারাপ।

স্তব্ধতা আড়াল করতে আগন্তুক নিরুত্তর রইলেন। তারপর  মিঠির মাথায় হাত রেখে বললেন , একটা গল্প শুনবে , মিঠি ?

>কিসের  গল্প ?

>তিন মিঠির গল্প।  তিনটি মেয়ে , তিনজনের নামই মিঠি , তারা একই স্কুলে পড়ে আর খুব ভালো বন্ধু। তারা তিনজনেই খুব দুষ্টু, ছটফটে। ,  স্কুলের  প্রার্থনার  সময়তেও নিজেদের মধ্যে কথা বলে।  অনেক বকাবকি , শাস্তির পরেও তাদের কোনো পরিবর্তন নেই। সমস্যা যখন দিনদিন বেড়েই চলছিল , সেই সময় ক্লাসে একজন নতুন শিক্ষিকা এলেন , তিনি অনেক ভেবে একটা উপায়  বার করলেন। একদিন ক্লাসের শুরুতে তিনি একটা  ভীষণ সুন্দর কথা বলা পেন্সিল পুরস্কার হিসেবে  ঘোষণা করলেন , এতো সুন্দর পেন্সিল কেউ কখনো দেখেনি , ক্লাসের অন্যদের মতো তিন মিঠিও  সেই  অদ্ভুত পেন্সিল দেখে খুব অবাক  হয়ে গেল , ভীষণ ইচ্ছা হলো তাদের ওই পুরস্কার টি পাওয়ার।

শিক্ষিকা বললেন , “পেন্সিল টি  দেখতে যত সুন্দর , সেটা পাওয়াও কিন্তু  ততই  কঠিন, অনেক কিছু করতে হবে এটা পেতে হলে , তার মধ্যে প্রথম যেটা করতে হবে তা হলো মন দিয়ে প্রার্থনা , মাঝে কথা বললেই পুরস্কার থেকে নাম কাটা যাবে , যে যত বেশী  শান্ত হয়ে  , সুন্দর  করে  প্রাথর্না করতে পারবে পেন্সিল পাওয়ার দৌড়ে সে থাকবে তত এগিয়ে ।”

এই ঘোষণার  পর দিন ই  স্কুলের প্রার্থনা ঘরে ঘটল এক চমৎকার , সকল শিক্ষক শিক্ষিকা অবাক হয়ে দেখলেন সে  দৃশ্য :

প্রথম মিঠি কোনো কথা না বলে  এক মনে হাত জোড়  করে প্রার্থনা করছে , দ্বিতীয় মিঠি  অন্য লাইনে  দাঁড়িয়ে   দুহাত খুলে  পূর্ণ ভক্তিতে মনের আর্জি জানাচ্ছে , ইতিমধ্যে তৃতীয় মিঠি  কখন যেন ধীরে পায়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলে রাখা পেন্সিলের  পাশে ইচ্ছাপূরণের চিরকুট রেখে এসেছে  ।

মজার ব্যাপার হল , তিনজনের নামই মিঠি , তারা একই স্কুলে পড়ে এবং পরস্পরের বন্ধু , তাদের চাওয়া টাও এক -কথা বলা পেন্সিল  , আবার সে ইচ্ছাপূরণের  সিদ্ধান্ত যার হাতে তিনিও ভিন্ন নন  – নতুন  শিক্ষিকা , তাহলে তাদের মধ্যে তফাৎ  টা কী  মিঠি ?

মিঠি : তাদের প্রার্থনা করার ভঙ্গিমা :  হাতজোড় , হাতখোলা , মোমবাতি।

> একদম ঠিক। সেই দিন মিঠিদের  দেখাদেখি ক্লাসের অন্য ছাত্র রাও  পেন্সিল পাওয়ার জন্য  নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থনা  পদ্ধতি বেছে নিল। তিন মিঠির পিছনে পুরো ক্লাস তিনটি লাইনে বিভক্ত হয়ে গেল , কিন্তু সবাই তো মিঠি নয় , তাই সবাই যে মন দিয়ে প্রার্থনা করছে তা কিন্তু নয় , প্রত্যেক  দলে কেউ কেউ দুষ্টুমিও করছে , যেমন পাশের জনকে চিমটি কাটছে , অথবা সামনের জনের চুল টানছে , নিজেদের চোখ বোজা বলে দুষ্টু  বাচ্চারা ভাবছে তাদের দুষ্টুমি কেউ লক্ষ্য করছে না , শিক্ষিকা কিন্তু নিঃশব্দে সবাইকে দেখছেন আর পেন্সিল পাওয়ার দৌড় থেকে দুষ্টু দের নাম কাটা দিয়ে যাচ্ছেন । গল্প শেষ , এবার আরেকটা প্রশ্ন:

এই গল্পে কোন দলকে তোমার খারাপ মনে হচ্ছে  যে  দলের সবার নাম পেন্সিল পাওয়ার লিস্ট থেকে কাটা গেলে তুমি খুশি হবে ? আবার ভালো দলই বা কোনটা  যার সদস্য পেন্সিল টা পেলে তোমার ভালো লাগবে ?

মিঠি একটু চিন্তা করে বললো :  মা বলে যারা মন দিয়ে প্রার্থনা করে তারা কখনো খারাপ হয় না আর তাদের সাথেও  কখনো খারাপ হয় না। তোমার গল্পের কোনো একটাও  দলের সবাই তো দুষ্টু নয় , প্রত্যেক দলের কেউ কেউ দুষ্টু।যারা মন দিয়ে প্রার্থনা করছে তাদের যে কেউ পেন্সিল টা  পেলেই আমি খুশি হব , সে যে দলেরই হোক না কেন  কিন্তু কোনো দলের দুষ্টুদের একজন যদি পেন্সিল টা পেয়ে যায়,তাহলে আমার একটুও ভালো লাগবে না।

আগন্তুক পরিতৃপ্তির হাসি মেখে বললেন : তুমি আজ যা এতো সহজে বুঝলে  , পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষ সারা জীবনের চেষ্টাতেও তা বুঝতে পারে না , অথবা  বুঝতে পারলেও সাহস করে বলতে পারে না। দোষ যদি সবাই  না করে থাকে , দোষী তো সবাইকে করা যায় না মিঠি ! নতুন শিক্ষিকার মতন ভালো খারাপের বিচার শুধুই কাজ  দিয়ে করতে হয়।  যারা  ভালো কাজ করে , অন্যকে  ভালো রাখে, তারা ভালো মানুষ,আর যারা  অন্যের ক্ষতি করে , কষ্ট দেয় তারা খারাপ মানুষ। গল্পের দলের মতই  ধরে নাও মুসলমান একটা দলেরই নাম, সেখানে কেউ  মিঠিকে অনেক ই ঞ্জেকশন  দিতে চাইবে , উউউ! কি ব্যাথা ! কিন্তু সে দলেরই  কারোর জানা আছে  গিলিগিলি ছুমন্তর ম্যাজিক , যা মিঠির সব  ব্যাথাকে মুহূর্তে ভ্যানিশ করে দেবে , এরপরের  বিচার তো মিঠির হাতে।

> “ইঞ্জেকশন খারাপ , ছুমন্তর ভালো।”

মিঠির নিষ্পাপ হাসিতে নিজেকে আরো একবার হারিয়ে ফেললেন আগন্তুক।

দ্বিতীয় 

নিজের কেবিনে বসে মিঠির  পুরোনো  রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে চিন্তায় মগ্ন ছিলেন ডঃ আসিফ । সহকারী  দরজায় আওয়াজ করে বললো  , “ডাক্তার বাবু ! আপনার সাথে মিঠি রায়ের মা একটু কথা বলতে চাইছেন , আপনি অনুমতি দিলে ….”

ডঃ আসিফ : হুম , পাঠিয়ে দাও।

খানিক বাদে দরজার কাছে  অচেনা পায়ের শব্দ শুনে ডঃ আসিফ বললেন , ভিতরে আসুন।

শীর্ন চেহারার ভদ্র মহিলা  ধীরে পায়ে ঘরে ঢুকে অনুমতি নিয়ে সামনের চেয়ারে বসলেন। তারপর খানিক ইতস্ততঃ করে  বললেন , > “মিঠি  ভালো হয়ে যাবে তো ডাক্তারবাবু ?”

>  আমার ডাক্তারি বিদ্যা ও নিজের ওপরে বিশ্বাস  সত্যি হলে নিশ্চই ভালো হয়ে যাবে।

> আপনি তো এতো বছর বিদেশে ছিলেন ,জগৎ জোড়া খ্যাতি আপনার , পরম কৃপাময় ই আপনাকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন ,  সবাই  বলে আপনার অসাধ্য কিচ্ছু নেই।

> সবাই বললেও  মিথ্যা যে মিথ্যাই  থাকে।  আমার সাধ্য  ছুড়ি ,কাঁচি  ও গুটিকয় ওষুধের মধ্যেই সীমিত।

> এভাবে বলবেন না ডাক্তারবাবু , আপনি ই আমাদের শেষ ভরসা। রাতে ঘুমোতে পারি না , ভীষণ ভয় করে,শুনেছি ক্যান্সারের কবল থেকে প্রাণ ফিরিয়ে নিয়ে আসা খুব কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয় , তাই না  ডাক্তারবাবু ?

অস্থির হয়ে টেবিলে রাখা স্টেথোস্কোপ টা হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ডঃ আসিফ বললেন  : শুধু এটুকু জেনে রাখুন মিঠির ভালো হওয়াটা আমার জন্যেও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় 


অপারেশনের ঘর থেকে ডঃ আসিফ বেরোতেই সেদিনের শীর্ন চেহারার ভদ্রমহিলা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বললেন , “মিঠি ! কেমন আছে ডাক্তারবাবু ? ”

ডঃ আসিফ : আমি মিঠির মায়ের সাথে কিছু কথা বলতে চাই।

ভদ্রমহিলা :  ডাক্তারবাবু  !! আপনি বোধহয় আমায় ঠিক চিনতে পারেন নি , আমিই …..”

ডঃ আসিফ এবার চোয়াল শক্ত করে বললেন , ” চেনার ভুল কার হয়েছে তা না হয় অবসর সময়ে কখনো ভেবে দেখবেন। মিঠির  ডাক্তার হিসেবে আমি এখন তার মায়ের সাথে কথা বলতে চাই , দয়া করে তাকে আমার কেবিনে আসতে বলবেন। ”

ডঃ আসিফ নিজের কেবিনের  জানলার  সামনে  দাঁড়িয়েছিলেন , চোখের শান্ত দৃষ্টি ভিতরের তোলপাড় কে অদ্ভুত কৌশলে  আড়াল করে রেখেছে।

অস্থির পায়ে পরিচিতা  সে ঘরে  প্রবেশ করে  প্রশ্ন করলেন , “আমাকে ওরা আই. সি. ইউ তে ঢুকতে দিচ্ছে না কেন?”

দৃষ্টি না ফিরিয়ে ডঃ আসিফ শান্ত গলায় বললেন : “আমি বারণ  করেছি বলে, মিঠির এখন বিশ্রামের প্রয়োজন রানী। ”

পরিচিতা তার কাঁপা কণ্ঠে যথাসম্ভব জোর এনে বললেন  : মিঠি আর বাঁচবেনা তাই না ? সেটা বলার জন্যই মিঠি র  মায়ের সাথে কথা বলাটা  হঠাৎ জরুরি হয়ে পড়লো ? সব কিছু শেষ হয়ে যাবার আগের মুহূর্তের  সান্ত্বনা!  তবে তাই হোক ! জানলার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দেখুন ডঃ আসিফ খান , মিঠি রায়ের  মা আপনার সামনে প্রস্তুত। অবসম্ভাবী  মৃত্যুর জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে  দেরী করে , আর নিজের বহুমূল্য সময়ের সাথে অবিচার করবেন না।

>সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসার যেমন কোনো পরিমাপ নেই , ঠিক তেমনই  এতো বছর পরেও  আমার জন্যে  তোর  মনে ঘৃণার গভীরতা আদি অন্তহীন ।  তাই বোধহয় আমাকে অপমানের জন্য মিঠির জীবনের প্রশ্নেও  বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলি  না।

> দ্বিধা তো সত্যি করিনি, বিশ্ব জুড়ে বারে বারে চমৎকার ঘটিয়ে আসা আলহার  দুলারা ডঃ আসিফ খানের ভারতে আসার খবর পেতেই এক মুহূর্তের জন্যও ভাবিনি তার সামনে আরো একবার হাত পাতার আগে।কেন জানিনা বিশ্বাস হয়েছিল , যে মানুষটির  সাথে লড়াইতে মৃত্যু বার বার হার  নিতে বাধ্য হয়েছে , মিঠির বেলাতেও তার অন্যথা হবে না !  অতীতের  যন্ত্রণা আমার আজকের মিঠিময় জীবনকে স্পর্শ  করে শুধুই দুঃস্বপ্নে ,তা বাস্তব না হতে দেওয়ার চেষ্টাতেই নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলাম। কিন্তু ভিক্ষার কারণ প্রেমই হোক বা প্রাণ , দাতার চোখ ভিক্ষুকের জাত ভালোই চেনে  , তাই বোধহয় মিঠির মায়ের মিথ্যা  এতো সহজে ধরা পড়ে গেল।

> যারা হাত পাততে পারে , নিজের জিনিষকে অধিকারের জোরে  চেয়ে নিতে পারে  তারা তো ভাগ্যবান রানী ! কাঙ্খিত জিনিসের থেকে  স্বেচ্ছায় মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার যন্ত্রনা তাদের বোঝানো বৃথা।  আমার ছোটবেলা যে মেয়েটির  সাথে কেটেছে  , তার সাথে মিঠির আজকের মুখের অমিল খোঁজা কোনো জটিল ধাঁধা র সমতুল্য। মানছি তা বদলানো সম্ভব  ছিল না , কিন্তু নিজেকে আড়াল করা যদি এতই জরুরি ছিল , মিঠির পুরোনো মেডিক্যাল রিপোর্ট গুলোতে মায়ের নাম টা অন্তত মুছে দিতে হত। যুদ্ধ টা বরাবরই আবেগ  দিয়ে করে এলি  রানী!

>যার মেয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে নিজের মস্তিকের পটুতা তার সামনে নাই বা জাহির করলেন ডঃ আসিফ খান ! তাতে আপনার বুদ্ধি  বিন্দুমাত্র স্থানচ্যুত হবে না , বরং বিবেগ নিজের হদিস খুঁজে পেতে পারে।

> বিবেগ নিজের হদিস  খুঁজে পেলে  এতো বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা মনটাও যে জেগে উঠবে , আবার  তার চারিদিকে জমে উঠবে সেই উত্তর না জানা চেনা প্রশ্নের ভিড় !

> এসব বাজে কথা শোনবার প্রবৃত্তি বা মানসিক অবস্থা কোনোটাই আমার নেই।  আপনি হয়তো ভুলে গেছেন ,  মিঠির ব্যাপারে কথা বলার জন্যই  তার মা কে এই কেবিনে আসতে বলা হয়েছিল।

>মিঠি নিশ্চই শুধু তোর একার মেয়ে নয় , ওর বাবা কে দেখছি না রানী!

পরিচিতার কণ্ঠস্বরে কাঠিণ্যের প্রলেপ > মিঠির  শরীরের অবস্থা জানানোর জন্য ওর বাবা মায়ের মিলিত আবেদন পত্র দরকার , তাই তো?

এবার দৃষ্টি ফেরালেন ডঃ আসিফ । আর সে দৃষ্টি তার ভিতরের তোলপাড়কে আড়াল করতে পারছে না।

> যদি তাই হয় , তাহলে নিশ্চই  মিঠির মায়ের মতো মুহূর্ত ব্যয়ে ওর সাজানো বাবা ও হাজির হয়ে যাবে!  আমাকে  মিথ্যা বলছিস না নিজেকে ? সমস্ত সমাজের সামনে নাই বা স্বীকার করলি  একজন খারাপ মুসলমানের রক্ত বইছে মিঠির শরীরে , কিন্তু এই বন্ধ দরজার পিছনেও সে পরিচয়ের সত্যি থেকে আড়াল সরিয়ে নিতে এতো দ্বিধা  রানী !

পরিচিতা ব্যাঙ্গাত্বক হেসে বললেন >  এতক্ষণে বুঝলাম ! রক্তের অধিকার দাবী করতে  এসেছিস ! দশ বছর পর ! যথাযথ প্রমাণ ও আছে নিশ্চই। বৃথা প্রশ্নে আর সময় নষ্ট  নাই বা করলি।

> অধিকার আমি চাইনি রানী ! সেদিনও চাইনি , আজও চাই না । ভুলে যাস না ধর্ম পরিবর্তন না করে সাথে থাকার সিদ্ধান্ত যতটা তোর ছিল ততটাই আমার।  ভালোবাসার সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে জন্মের সম্পর্ক কে অবমাননা করার কঠিন মুহূর্ত , তোর মত সাহসী আমি কোনোদিনই ছিলাম না , দুর্বলতা আড়াল করতেই তোর প্রশ্ন মাখা চাহনির সামনে নিরুত্তর ছিলাম সেদিন । আমার ভিতরের অপরাধ বোধ কে মুহূর্তে ভালোবাসার অ সম্মান ভেবে নিলি তুই।  ক্ষনিকের বিবাদ মাটি  চাপা দিল  এতগুলো বছরের সম্পর্কের কবরে।  ধর্ম ও ভালোবাসার লড়াইতে হার কি শুধু তোর একার  হয়েছিল সেদিন ? সবকিছু দিয়ে আগলে রাখা অনুভূতির সমাধি হল কঠিন আত্মসম্মানের অতল গহ্বরে,অজান্তে তলিয়ে গেল সারাজীবনের প্রতিশ্রুতি। কোন অপরাধের শাস্তি দিতে সেদিন হারিয়ে গেলি  রানী ?  বহু নিদ্রাহীন রাতও তার উত্তর খুঁজে পায়নি। অভিমানের কাঠগড়ায় আজও ঠিক একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছি।  মিঠিকে নিয়ে তোর  একার লড়াইয়ে আমার অস্তিত্বের কোনো অবকাশ নেই । ধর্মের ভার যে ভীষণ, নিজস্ব উপলব্ধিতে জানি , ছোট্ট  মিঠি  তা বইতে পারবে না! ওকে ছোঁয়ার ক্ষণিক মুহূর্তই আমার  বাকি জীবনের জন্য যথেষ্ঠ।  মিঠির ভালো হতে যতটুকু দেরী, শুধু  ততটুকু  সময়  হাতে গুণে ধার্য করিস আমার জন্যে।

ঝাপসা চোখে  ঘর থেকে বেরোনোর আগে ডঃ আসিফ বললেন : মিঠি ভালো আছে রানী! ছোট  একটা টিউমার ছিল  যা আজকের অপারেশনে বাদ দেওয়া হয়েছে  , পুরোনো  রিপোর্টের কথা  সন্দেহ ছিল মাত্র , আর তা ভেবে নিজেকে কষ্ট দিস  না।

এতক্ষনের নিঃশব্দ  চোখের জল  সকলের অজান্তে বাঁধ ভাঙা কান্নায় রূপান্তরিত হল।

চতুর্থ  

ডঃ আসিফ মিঠির ঘরে ঢুকতেই একগাল হেসে মিঠি বললো , “গুডমর্নিং ম্যাজিসিয়ান । ”

>আজকে মর্নিং টা তো সত্যি গুড বলতে হবে, এখন মিঠি মেয়েটা কেমন আছে ?

>একদম ভালো। তুমি কখন ছুমন্তর বললে ?

> মিঠি যখন ঘুমাচ্ছিল , ঠিক তখন।

>আমি কবে বাড়ি যাবো ?

>খুব তাড়াতাড়ি।

>তাহলে তোমার সাথে কিভাবে দেখা হবে ?

> মিঠি ভালো হয়ে যাবে তো , আর দেখা হবার দরকার ই হবে না।

>হবে হবে হবে।

>আচ্ছা সে দেখা যাবে ক্ষণ।

>না , আগে আমাকে ছুঁয়ে বলো তুমি রোজ আমার সাথে দেখা করবে।

মুহূর্তের জন্য স্মৃতির গভীরে হারিয়ে গেলেন ডঃ আসিফ , হুবহু সেই একই জেদ , অবাধ্য ভালোবাসার জোরে একই ভাবে আঁকড়ে বাঁধার চেষ্টা। মিঠির মাথায় হাত রেখে বললেন : “ছুঁয়ে বললেও যে সবাই কথা রাখে না মিঠি!”

দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য উঠতেই মিঠি  তার হাত ধরে বললো : ” তুমি সত্যি চলে যাবে ম্যাজিসিয়ান ?

>তোমার মতো আরও অনেক মিঠির  অসুখ যে এখনো ছুমন্তর  হওয়া বাকি , আমাকে যে যেতেই  হবে  মাগো।

মিঠি জল ভরা চোখে মুখ ঘুরিয়ে বললো : তুমি খারাপ ,আমার বাবার মতো। মিঠি অচেনা কাউকে দেখে আর কখনও হাসবে না ।

ডঃ আসিফ  বিস্ময়বিহ্বল স্বরে  বললেন : তোমার বাবা কে তুমি চেনো মিঠি ?

> না।  তোমার গল্পের মিঠিদের মতো আমার বাবা মায়ের দল আলাদা, আমি মায়ের সাথে থাকি।  ডঃ আসিফ খান , আমার বাবার নাম। মা বলে আমার বাবা নাকি খুব ভালো মানুষ ,   কিন্তু  কষ্ট  তো শুধু খারাপ মানুষ দেয় ,  তাই না  ম্যাজিসিয়ান ?

অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠলেন ডঃ আসিফ , সর্বহারা জীবনের সঞ্চিত সবটুকু সাহস একত্রিত করে মিঠিকে জড়িয়ে ধরে বললেন , “একদম ঠিক। কিন্তু যদি কখনো  জানতে পারো  কষ্ট সে মানুষটাও কিছু কম পায়নি , তাহলেও কি বিচার  টা একই থাকবে মিঠি ?

মিঠি : জানিনা , মা কে জিজ্ঞাসা করে বলবো তোমাকে।

ডঃ আসিফ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন : আচ্ছা।

ঘুমন্ত মিঠির হাত ছাড়িয়ে পরম প্রাপ্তির  সম্বল টুকু নিয়ে  ঘরের বাইরে পা রাখতেই  পরিচিতার   কণ্ঠস্বর,  “অধিকার চাসনি ঠিকই কিন্তু পেয়েছিস কিনা দেখার জন্য ফিরেও তো দেখিসনি কোনোদিন । বন্ধ দরজার প্রয়োজন পাপের হয় , ভালোবাসার নয়। ধর্ম ও ভালোবাসার লড়াইতে আমরা  যেখানে হার স্বীকার করে নিয়েছিলাম ,আমাদের মিঠিকে সেখানেই  জিততে হবে । তাই  মিঠির বাবাকে ছুমন্তর করে ফিরিয়ে না আনা  পর্যন্ত  ম্যাজিসিয়ানের ছুটি কোনোমতেই মঞ্জুর হবে না।”

ধীরে পায়ে  ঘুমিয়ে থাকা মিঠির ঘরে প্রবেশ করলেন পরিচিতা। অঙ্গীকারের পরম আবেশে চোখ বুজলেন ডঃ আসিফ। বহু বছরের  মরচে ধরা স্বপ্ন আরো একবার স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

ধন্যবাদ ,

রোমি

দুর্গতিনাশিনীর ত্রিশূল

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

রোদ্দুর কলেজ লাইব্রেরীর শেষের টেবিলে বসে থাকা ঈশানীকে কে দেখে হাসি মুখে এগিয়ে এসে বললো ,” হ্যাপি ওমেন্স ডে ঈশাণী”।
ঈশাণী অল্প হেসে জবাব দিল : থ্যাঙ্কস রে।
রোদ্দুর: তুই মন্দিরাদির আয়োজন করা নারী সভায় যাচ্ছিস না ?
ঈশাণী: নারী সভা ?
রোদ্দুর: হ্যাঁ , তুই ভালো করে ইমেইল দেখিসনি হবে , নিমন্ত্রণ পেয়েছিস নিশ্চই , মন্দিরাদির শকুনের চোখ , তুচ্ছাতিতুচ্ছ নারীর পক্ষেও তার চোখে ধুলো দেওয়া সম্ভব নয় , তুই তো আবার সাইন্সের ফার্স্ট গার্ল।
ঈশাণী: ইমেইল একটা এসেছে ঠিকই কিন্তু নারী সভা বলে কোনোকিছুর উল্লেখ নেই।
রোদ্দুর: চুক্তির কাগজ দেখিসনি কখনো ? যেটা উহ্য সেটাই হল গিয়ে আসল কথা ।
ঈশাণী: তা কী হয় সে সভায় ?
রোদ্দুর: বিস্তর আলোচনা। কিভাবে সূর্যকে পশ্চিম দিকে ওঠানো যায়,সে পুরুষের প্রতিরূপ বৈ কিছু নয়,তার স্বেচ্ছাচারিতা তো বেশীদিন এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। আবার ধর , কিভাবে জন্মের প্রক্রিয়া থেকে পুরুষকে চিরতরে বাদ দিয়ে দেওয়া যায় , মানে ওই একটা ব্যাপার ছাড়া তো আর কোনো কার্যকারিতাই কোনো পুরুষ ইতিহাসে কোনোদিন প্রমাণ করে উঠতে পারেনি। একটা কথা তো তোকে মানতেই হবে যে ,আজ পৃথিবীর জনসংখ্যার অনুপাতে যে এক ভীষণ বৈষম্য,তার জন্যেও তো এই অত্যাচারী অকর্মন্য জাতিই একমাত্র দায়ী যাদের প্রধান অবসর বিনোদন হল শ্লীলতাহানি।
ঈশাণী: আমি এখানে তৃতীয় ব্যক্তি , তুই আর তোর মন্দিরাদি একমত , এই পৃথিবীর কাছে সেটাই যথেষ্ঠ । তা তুই সে সভায় না গিয়ে এখানে কী করছিস ?
রোদ্দুর: আমি ? মানুষের কথা ছেড়েই দে , মন্দিরাদির দলবল পুংলিঙ্গ বিশেষে পশুদেরও সে সভার কাছে ধারে ঘেষতে দেয় না। অনুষ্ঠান শেষে বাকি থাকা খাবার কোন কুকুর খাবে সেটাও লিঙ্গ বিচার করে তারপর ঠিক করা হয়। পুরুষ হল গিয়ে অচ্ছুৎ জাত , আর পাঁচ টা ছেলেদের মতো হ্যাপি ওমেন্স দের দূর থেকে দেখেই নিজ সম্মান কোনোরকমে বাঁচিয়ে রেখেছি এতদিন পর্যন্ত।
ঈশাণী: বুঝলাম।
রোদ্দুর কী বুঝলি ?
ঈশাণী: এই যে ,তুই মন্দিরাদি ও তার দলবলকে ভয় পাস।
রোদ্দুর: আমি কেন ? কলেজের সব ছেলেই পায়। বুকের পাটা নিজের জায়গায় , মন্দিরাদি নিজের,তার সঙ্গত কারণও আছে। মন্দিরাদি এই কলেজের সবচেয়ে পুরোনো শিক্ষিকা ,উনি যতটা মনোযোগ সহকারে পল সাইন্স পড়ান, ঠিক ততটাই পারদর্শী , পরীক্ষার খাতায় সূক্ষাতি সূক্ষ্ম ভুল খুঁজে বের করে অকারণে ফেল করানোয়।
ঈশাণী: পড়াশোনা না করলে ফেল করানোই উচিত।
রোদ্দুর: উঁহু। তুই অঙ্কে ভালো আমি জানি , কিন্তু কিছু অঙ্ক দেখে আইনস্টাইনও পেন কামড়েছেন হবে ,ব্যাপারটা খানিকটা ওরকমই ধরে না। মন্দিরাদির কাছে আজ পর্যন্ত যারা ফেল করেছে , তাদের আর কখনো পাশ করা হয়ে ওঠেনি। চক্রব্যূহ থেকে বেরোনোর উপায় যে একেবারেই ছিল না তা বললে ভুল হবে , কিন্তু যতদূর শুনেছি লিঙ্গপরিবর্তন অপারেশন খুব ব্যয়সাপেক্ষ , তাছাড়া আনুসাঙ্গিক ঝক্কিও তো কম নেয়। অগত্যা অভিমন্যুর পরিণতি। কাকতালীয় ভাবে বছরের পর বছরে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা নির্বিশেষে ,পল সাইন্স বিষয়ে মেয়েরা অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে , যে বিভাগে কোনো ছেলে আজ পর্যন্ত পাশ করতে পারেনি , সেই একই বিভাগে কলেজের ইতিহাসে কোনো মেয়ে কোনোদিন ফেল করে উঠতে পারেনি ।
ঈশাণী গম্ভীর ভাবে বললো : যতসব বাজে রটনা।
রোদ্দুর: রটনা ? এই কলেজে আজ পলসায়েন্স বিভাগে একটাও যে ছেলে নেই সেটা কাকতালীয় ?
ঈশাণী: তা নয়তো কি ? পলসায়েন্স কোনোদিনই ছেলেদের পছন্দের বিষয় নয়।
রোদ্দুর: মোটেই না। যারা ছিল তাদের কিছু , বছরের পর বছর ফেল করতে করতে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে , আশার আলোরও তো একটা জীবনকাল আছে ! কেউ বা চির অভাগা উপাধি স্বীকার করার আগে ভাগ্যকে আরো একবার বাজিয়ে দেখতে চেয়েছে বলে বিভাগ পরিবর্তন করেছে । শুনেছি কয়েকজন বাড়ির লোকের গালাগালি সহ্য না করতে পেরে আত্মতহত্যাও করেছে । চাকরি না পেলে দেশ কে দায়ী করা যায় ঈশানী! কিন্তু পাশ করতে না পারলে কলেজকে দায়ী করতে পারার সুদিন শুধুই স্বপ্নে, তাছাড়া কেউ তো নারীবাদী মন্দিরাদির ব্যক্তিগত শত্রুতার অজুহাত বিশ্বাস করার জন্য বসে নেই ! তবে এসব এখন অতীত, রণে বনে জঙ্গলে মন্দিরাদির নিরপেক্ষতা এখন সবাই জানে , কোটি টাকার বাজি ধরলেও কোনো ছেলে প্রাণ হাতে করে এই কলেজে পল সায়েন্সে ভর্তি হওয়ার জন্য আসে না।
ঈশানী হাসি চেপে স্বভাব মতো নির্বিকার ভাবে বলল : এভাবে লাইব্রেরীতে নয় বরং হঠাৎ বৃষ্টির দিনে লোডশেডিংয়ে চা মুড়ি খেতে খেতে ,আবেশে চোখ বুজে তোর মন্দিরাদির বাকি গল্প গুলো শুনবো।
রোদ্দুর: কথা দিলি যখন , তাই সই। তুই চল , তোকে সভার দুমাইল দূরে ছেড়ে দিয়ে আমি ক্লাসে যাবো।
ঈশানী : তুই ক্লাসে যা , আমি কোথাও যাবো না।
রোদ্দুর: কেন ? তুই নারীবিদ্বেষী ?
ঈশানী: না , তুই ক্লাসে যা।
রোদ্দুর: তুই তো আমায় ছোট থেকে চিনিস , ঘটনার শেষ দেখে ছাড়ি। কারণ বলে দে , চলে যাচ্ছি।
ঈশানী: তুইও আমাকে ছোট থেকে চিনিস। আমি তখন সেটাই করি যখন যেটা করতে ইচ্ছে করে বা করা করা উচিৎ মনে হয়।
রোদ্দুর:হায় রে পুরুষ ! স্বেচ্ছাচারিতা তোমার স্বভাব কিন্তু তার যে রক্তে। সে যাক ,আমার প্রশ্নের উত্তর এটা নয়।
ঈশানী: তোর প্রশ্নটাই তো স্পষ্ট নয়।
রোদ্দুর:এই তো ! মন্দিরাদির ভাষা। সাতপাঁক কি শুধুই নিয়ম!সেই আদ্যিকাল থেকে পুরুষ নারীকে ঘুরপাক খাইয়ে আসছে নিজের চারিদিকে স্পষ্ট কারণ ছাড়া। এক্ষেত্রে একটু ব্যাতিক্রম আছে , মানে আমার প্রশ্নটা স্পষ্ট। তুই মন্দিরাদির সভায় বিশেষ আমন্ত্রিত দের মধ্যে একজন , না গেলে যে নারীবাদের অপমান হয়। তাই জানতে চাইছিলাম না যাওয়ার আসল কারণ টা।
ঈশানী: আসল কারণ যা তোকে দ্বিতীয় বার বলছি , আমার ইচ্ছা করছে না।
রোদ্দুর:তুই নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করিস ?
ঈশানী:হুম ।
রোদ্দুর:তুই নিশ্চই বিশ্বাস করিস ,যে পুরুষ রা নারীকে নির্যাতন করলে তার একটা বিহিত হওয়া উচিত।
ঈশানী:করি।
রোদ্দুর:এতদিন সমাজে নারীর অশিক্ষা বা পিছিয়ে থাকার পিছনে দায়ী পুরুষ ! তাই তো ?
ঈশানী:কিছুটা।
রোদ্দুর:শ্লীলতাহানির দায়ভার নারীর পোশাকের নয় , পুরুষের বিকৃত মানসিকতার।
ঈশানী:একদম।
রোদ্দুর:সূর্যের পশ্চিম দিকে ওঠা টা মজা ছিল। মন্দিরাদির সভার বিষয় আসলে এসবই থাকে , ক্লাসের মেয়েদের মুখ থেকে শোনা।প্রচুর জানা অজানা তথ্য নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয় , তোকে চিনি বলেই বলছি তোর ভালোলাগবে , তাই এই নাছোড়বান্দা অত্যাচার।
ঈশানী এবার হেসে বলল , তোর বুঝি মনে হয় আমি নারীবাদী ?
রোদ্দুর:ভীষণ রকম , সে নিয়ে কোনো তর্কে তো আজ পর্যন্ত তোকে হারতে দেখিনি।
ঈশানী:তোর মনে আছে ছোটবেলায় মহালয়ার সকাল বেলা আমরা ঘুমোতাম আর সোনাকাকু গরম জিলিপি মুখে দিয়ে জাগিয়ে দিতো ! আধবোজা চোখে দেখা মরমে মিশে যাওয়া সেই ঘটনাক্রমের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য কোনটা মনে কর।
রোদ্দুর:কোনটা আবার ? মা দুর্গার অসুর বধ। ত্রিশূলের গায়ে রক্ত , আমাদের হাততালি , সোনাকাকুর আনা সব জিলিপি শেষ।
ঈশানী: ত্রিশূল টা কিন্তু মা দুর্গার নিজের নয় , ধার করা। শুধু ত্রিশূল কেন বাকি সব অস্ত্রগুলোও তাই ! ব্রম্ভাণ্ডের সৌভাগ্য বা মন্দিরাদির দুর্ভাগ্য যাই বলিস না কেন , অস্ত্র গুলো দিতে মা দূর্গা তাদের বাধ্য করেন নি , তারা স্বেচ্ছায় দিয়েছিলেন। পুরান বলছে, অসুরের দমনে ত্রিদেবের শক্তি পুঞ্জীভূত হয়ে মা দুর্গার সৃষ্টি , তাহলে অঙ্ক টা কি দাড়ালো ? মা দুর্গার সৃষ্টির কারণ ও কারী দুই ই পুরুষ । এত সহজ হিসেব মেলাতে নিশ্চই আইনস্টাইনকে পেন কামড়াতে হবে না।
রোদ্দুর:কিসব বলছিস ? পুরান তো ঘেটে দিবি তুই। তবে হিসেব টা সত্যি সহজ ,যারা পুরান লিখেছেন তারাও তো আসলে পুরুষই ছিলেন তাই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি তেই নারীর মহিমার আড়ালে পুরুষেরই গুনকীর্তন করেছে।
ঈশানী:তা না হয় হল। আদালতে অন্য সাক্ষ্মী প্রস্তুত করার অনুমতি আছে ?
রোদ্দুর:আছে।
ঈশানী:আমি তোর থেকে বেশি ভালো ড্রাইভ করি , গাড়ি হোক বা স্কুটার , সত্যি?
রোদ্দুর:একদম , আর আমিও তো সেটাই বলছিলাম ….
ঈশানী:আমাকে ড্রাইভিং শিখিয়েছে আমার দাদা। প্রথমে স্কুটার তারপরে গাড়ি । দাদা কোনোদিন সকালে উঠতে পারতো না,কত বকা মার খেয়েছে মায়ের থেকে। কিন্তু আমাকে স্কুটার চালানো শেখানোর সময়ে বিনা ডাকে ভোর পাঁচটায় উঠে পড়তো , রাস্তা ফাঁকা থাকে তখন , নইলে যে আমার ভয় -জড়তা কাটানো অসম্ভব ছিল , প্রথমদিন তো স্কুটার চলতে আরম্ভ করলেই চোখ বন্ধ করে ফেলছিলাম। বহুদিন পর্যন্ত সে ভয় আমার কাটেনি ,নিজে মরার থেকেও বেশী ভয় অন্যকে মারার । উফ ! কী দুর্বিষহ সে উপলব্ধি ! সকাল ৭ টায় গানের ছিল ক্লাস , স্কুটার চালানো থেকে বাঁচতে লুকিয়ে পাঁচটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্যারের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম । আমার কারসাজি বুঝতে পেরে একদিন দাদার সে কি বকুনি ! নাচ গানের থেকে এটা অনেক বেশী জরুরি , কতদিন আর মা আমাকে স্কুলে , কোচিংএ দিয়ে আসবে , সংসারের কাজের পরে একটু বিশ্রাম না নিলে মায়ের শরীর যে খারাপ হয়ে যাবে! খুব কেঁদেছিলাম সেদিন। দাদা বকেছে বলে নয় , দাদা মায়ের কষ্ট বুঝতে পেরেছে আর আমি পারিনি বলে। তারপর থেকে নিজ গন্তব্যে অন্যের সাহায্য ছাড়া সময়মতো পৌঁছতে আর কখনো কোনো অসুবিধা হয়নি। নারী স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ, এক পুরুষের তাগিদে ।

রোদ্দুর:আগেরদিন সন্তুদার সাথে রাস্তায় দেখা হয়েছিল , জোর করে গাড়িতে তুলে বাড়ি পৌঁছে দিল , পথে একটা গাড়ি উল্টোপাল্টা চালাচ্ছিল দেখে আমি মজা করে বলেছিলাম ড্রাইভার নিশ্চই মহিলা , সন্তুদা হেসে যে উত্তর টা দিয়েছিল তা আমার এখনও মনে আছে , “ড্রাইভারের কোনো লিঙ্গভেদ হয় না, ভালো হোক বা খারাপ । ”

ঈশানী: আমি ভেবেছিলাম বিএসসি র পরে চাকরী করবো , তুই তো জানিস পেয়েও ছিলাম। করিনি কারণ বাবা চেয়েছিল আমি মাস্টার্স করি , দাদা যেমন করেছে , ঠিক তেমন । রোজ সে তর্ক বিতর্কে র পর রাত ১টা বেজে যেত শুতে যেতে । শোয়া মাত্র ফোন আসতো দাদার , আমেরিকাতে তো তখন সকাল। বুঝতাম বাবা দাদাকে বলেছে আমাকে বোঝাতে উচ্চশিক্ষার প্ৰয়োজনীতা , বাবার ছেলেও অবিলম্বে সে দায়িত্ব পূরণে লেগে পড়তো ,কাজ কর্ম ভুলে । মায়ের নিরলস কাকুতিমিনতি , বাবা যা চায় তাই করলেই তো পারি , তাহলেই আমেরিকা ও ভারতে একসাথে শান্তি ফিরে আসে , ফলস্বরূপ দেখতেই তো পাচ্ছিস , তোর কলেজে ঠাঁই নিয়েছি । সমাজে নারীর অশিক্ষার জন্য কিছু পুরুষ নিশ্চই দায়ী , আবার আমার মতো নারী কে উচ্চ শিক্ষা নিতে যে বাধ্য করে সেও তো পুরুষই ।

রোদ্দুর হেসে বললো : ভাগ্যিস !

ঈশানী :আমার আজকের নিরপক্ষ স্বাধীন ধরন ধারনের জন্য দায়ী আরো একজন পুরুষ ,আপনি স্ময়ং মাননীয় মহাশয়।ছোটবেলা থেকে আমাকে না জানিয়ে আমার নামে ডিবেটের ফর্ম ভরে দিতিস । স্বভাবমত আজকেও তাই মন্দিরাদির আয়োজিত অনুষ্ঠানে পাঠাতে চাইছিলিস , আমার সাফল্যে খুঁজে পাস কী যে অজানা অলৌকিক আনন্দ । সেই ছোট থেকে চর্চা অজানা বিষয় , নতুন তথ্য , অদম্য কৌতূহল , অজান্তে অর্জিত শিক্ষা ,বুঝতে শেখা যা ঠিক তা বলতে হবে , সহজভাবে , নির্ভয়ে। অকাট্য যুক্তি প্রমাণের যোগ্যতা তর্কের পরিণাম নির্দিষ্ট করবে , সামনে বসা বিচারক বা প্রতিপক্ষের লিঙ্গ নয় । আত্মবিশ্বাসের অভাব হলে ভাবতাম আমার জয় নিয়ে তুই যদি এতটা নিশ্চিত হতে পারিস তাহলে আমার হতে অসুবিধা কোথায় ! হয়তো অজান্তেই একসময় তুই ধরালি ত্রিশূল – আমাকে , আমার চিন্তাকে ।নিষ্পাপ কিশোরী মনের সে অসামান্য ছন্দপতন , রাত জাগানো উপলব্ধি , একটা ছেলে হয়ে যদি ছেলেদের করা নিন্দনীয় অপরাধ গুলো তোর অসহ্য হয়ে থাকে, তবে মেয়েদের অপরাধে আমি প্রতিবাদ করলে দোষ কি ? বুঝতে শেখা বন্ধুর মতো অপরাধীর ও কোনো লিঙ্গভেদ হয় না । সময়ের সাথে সাথে বাড়ল বয়স , তবু বাড়ি ফিরতে আমার কখনো ভয় লাগেনি,বাসে ট্রামে রাস্তায় অযাচিত স্পর্শের প্রতিবাদ করতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠা বোধ হয় না , অন্যের অসংযমকে নিজের লজ্জার কারণ বলতে আমার বাঁধে। মনের গভীরে বাসা করা আশ্বাস , অনুচ্চারিত প্রতিশ্রুতি – আমার ক্ষতি কেউ করলে তাকে শাস্তি দেবার মানুষগুলোর নাম আমার জন্মের মুহূর্ত থেকে নির্দিষ্ট । নিজের যোগ্যতা নিয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই । তর্ক হোক বা পড়াশোনা , যেকোনো প্রতিযোগিতার একঘেয়ে সাফল্যে আমি নির্বিকার , তবুও আমার চাপা অহংকার অনিচ্ছাসত্বেও কখনো প্রকাশ হয়ে পড়ে , কারণ পুরুষ আমার দেহরক্ষী নয় , ছায়াসঙ্গী হিসেবে বিচরণ করে।
আমি তার দায়িত্ব বা কর্তব্য কোনোটাই নই, বরং বাঁচার তাগিদ । আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো অজান্তে নারীর পক্ষপাত দুষ্ট কখনো হতে পারি কিন্তু পুরুষবিদ্বেষী চিতায় উঠলেও হতে পারব না ,অকৃতজ্ঞ হতে পারবো না , অসঙ্কোচে মিথ্যা বলতে পারবো না , নিজ সত্ত্বাকে অস্বীকার করতে পারবো না ।

রোদ্দুর মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল ঈশানীর দিকে । অজান্তে এসে যাওয়া চোখের জল আড়াল করে বলল : তুই ছোট থেকেই খু ব সাহসী ঈশানী, আমার থেকে অনেক বেশী , ত্রিশূল আগলে রেখে কী লাভ বল যদি নির্ভয়ে চালানোর নিদারুণ দক্ষতা ই না থাকে ! তাই যে তোকে প্রয়োজন , নিত্য , আদি-অনন্তকাল । আমি যা পারিনা তুই যে তা পারিস , আমার স্বপ্ন তোর নিপুণতায় মুহূর্তে হয় বাস্তবের প্রতিরূপ । কোনটা আসল , কোনটা প্রতিবিম্ব সে সত্য বরং ঝাপসাই থাক , শক্তি ও সাহসের চিরন্তন নির্ভরতার আয়ু মহাকালের জ্ঞানের অতীত । শুধু এটুকু জেনে রাখ , যা চিরকাল হয়ে আসছে , তাই যে নিয়ম ।

ধন্যবাদ ,
রোমি

কাঠগড়া

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

 

আপনি সর্বকালের বিতর্কিত চরিত্র বাসুদেব ! আপনার কথা ও কাজের গূঢ় অর্থ ঘিরে  গড়ে উঠেছে যুক্তি তর্কের সমুদ্র।  আপনি বিশ্ব ব্রম্ভাণ্ডের অধীশ্বর  , একাধারে কঠিন , জটিল , রহস্যময় , আপনাকে বুঝতে পারা আর  মোক্ষলাভের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই । আপনার কৃত কর্মের  বিশ্লেষণ জগৎ সংসারের  সাধ্যের অতীত, সে গুরুদায়িত্ব যে আপনাকেই নিতে হবে।আপনার নির্দেশ অনুযায়ী তিনটি অভিযোগের চিঠি আজকের সভায় উপস্থাপন করবার জন্য আমি প্রস্তুত।জ্ঞাত কারণে তিনজন অভিযোগকারীর প্রত্যেকেই নিজেদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জ্ঞাপন করেছেন। তাদের দাবী ,অভিযোগের শব্দ গুচ্ছ ই নাকি তাদের পরিচয় আপনার কাছে স্পষ্ট করে তুলবে।  আপনার উত্তরবন্দি চিঠি অভিযোগকারীদের কাছে যথাসময়ে পৌঁছে দেবেন মহাকাল। 

 

বাসুদেব কৃষ্ণ  চেনা ভুবনমোহিনী হাসি মেখে কাঠগড়াতে পদার্পন করে বললেন : বেশ , আমি প্রস্তুত ।

 

প্রথম অভিযোগ  :

সারথী সে আমার হলে বদলে যেত ভাগ্য ,
বাঁধবে আমার রথের চাকা , কার তা ছিল সাধ্য ?
শক্তির শেষ পরীক্ষাতে সাজল যে সে বাঁধ ,
সবটা জেনেও বাড়িয়ে দিল পক্ষপাতের কাঁধ।

 

বাসুদেব কৃষ্ণ :

রথের লাগাম ধরলে আমি , মিথ্যা হত শ্রম ,
অনুদানের ভিক্ষা ঝুলি পাতে যে অক্ষম ,
গান্ডীবকে আড়াল করে সুদর্শনের শক্তি ,
নিরপেক্ষ ইতিহাসের পাতায় লেখা সত্যি।
নিরস্ত্র সে মৃত্যু বরণ , যুদ্ধনীতির হার ,
কর্ণ!  আমি পক্ষপাতী , কিন্তু ভেবো কার !

 

দ্বিতীয় অভিযোগ  :

করলি মায়ের ধন্য জীবন , পাঁচ পুত্রের বরে,
দুঃখ গোপন যত্নে লালন ,গরীব সূতের ঘরে ,
পুত্র শোকই ভাগ্যে যদি , মিথ্যা সকল জয় ,
পাইনি যাকে তাকেই ভীষণ হারিয়ে ফেলার ভয় ।
ইচ্ছামতন বিধান লিখিস , ভাগ্যে ফলাস জোর ,
পাঁচের হিসেব খন্ড করার, সাধ্য ছিল তোর !

 

বাসুদেব কৃষ্ণ :

ধর্মরাজের ছদ্মবেশে লুকিয়ে ছিল পাপ।
ইতিহাসকে পুড়িয়ে দিল নারীর অভিশাপ ,
অস্থির মন, মায়ার বাঁধন, দিলাম প্রতিশ্রুতি ,
স্ময়ং হলাম যুদ্ধ চালক , কুটিল রণনীতি !
ধর্মচ্যুতির দোহাই দিয়ে , দিলাম যাদের শিক্ষা ,
তাদের মা যে পায়নি কেঁদে একটি প্রাণও ভিক্ষা।
পাঁচের হিসাব খন্ডাতে চায় কুন্তী মায়ের সুখ ?
বিচার হলে নিরপেক্ষ,মা তোর শূন্য হত বুক।

তৃতীয় অভিযোগ :

ভালোবাসার দোহাই দিয়ে, আগলে ছিলাম পথ ,
পাথর সমান সিদ্ধান্ত , থামলো না তার রথ ।
কাটল জীবন মনের কোণে প্রশ্নটিকে ঘিরে ,
কলঙ্কিনীর অবৈধ প্রেম আসবে কি আর ফিরে ?
অভিমানের প্রশ্ন সরল , “লাভ কী থেকে জমা “?
যমুনাকে তাই সাক্ষী রেখে , করেই দিলাম ক্ষমা ।

 

বিস্ময়ে কিছুক্ষণ মৌন থাকলেন বিচারক , চোখের কোণে চিক চিক করে উঠল জল  , তা আড়াল করে আবার মোহিনীমোহন হাসিতে ভরিয়ে দিলেন সভা।

 

বাসুদেব কৃষ্ণ :

করলি ক্ষমা , ভুললি সকল , মুক্তি পেলি রাধে !
আমায় তবু রাখলি আজও , নামের সাথে বেঁধে !
পূরণ হওয়ার আশাই বৃথা ,স্বপ্ন এমন কত ,
সব কথা তো যায় না রাখা ,ইচ্ছা থাকুক যত।
আত্মভোলা অবৈধ প্রেম , স্বপ্নেতে যায় ফিরে ,
বাঁশির সুরে স্বস্তি খোঁজে , বৃন্দাবনের ভিড়ে !
ভলোবাসা তোরই থাকুক, আমি নিলাম দোষ ,
আজন্মকাল পুড়বো একা , অনুতাপের রোষ ।

ধন্যবাদ ,

রোমি

চিঠি

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

মহাকাল দুটো চিঠি হাতে সন্তুষ্টির হাসি মেখে ঘরে ঢুকে জটিল হিসেবে মগ্ন ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বললেন : “আমার সামান্য কূটনীতির কাছে আপনার সৃষ্টি ভালোবাসার আরো একবার মর্মান্তিক পরিণতি !”

মহাকালের অপ্রাসঙ্গিক গল্পের ফাঁকে ঈশ্বর টেবিলে রাখা চিঠি দুটো হাতে নিলেন , ক্ষণিক চোখ বুজলেন, জেদ রাগের অন্ধকারে ঢাকা মন দুটিকে নিরীক্ষণ করলেন , প্রত্যক্ষ করলেন আঘাত হওয়া চরম মুহূর্তটিকে,কলমে টানা পরিণতির শব্দ গুলো উচ্চারণ করলেন ঈশ্বর:

মেয়েটি চিঠি :
“কাজের শেষে ক্ষণিক সময় , অবসরের দান ,
ব্যস্ত দিনে গুমরে কাঁদুক সুপ্ত অভিমান !
অপমানের রাত্রি শেষে ছোট্ট ক্ষমার ভোর ,
সকল ভুলে আবার সে ঠিক সঙ্গী হবে তোর ।
সঙ্কোচহীন লজ্জাবিহীন, অযৌক্তিক এ দাবি ,
অহংকারে যত্নে রাখা মনের ঘরের চাবি ,
ওতই সহজ নাগাল পাওয়া , যোগ্যতা কি তোর ?
নিয়ম বহুল অবহেলায় লুকানো উত্তর ।
শর্তাবলী উহ্য হলেও স্পষ্ট দৃশ্যমান ,
মানলে তবেই থাকবে টিকে সম্পর্কের টান ,
হিসেব বিহীন লাগাম টানিস , স্বার্থে ছোটাস রথ ,
সত্ত্বা দিল নিজের দোহাই , বদলে নিলাম পথ ।”

ছেলেটির কঠিন উত্তর:

“বাঁধবো তোকে কিসের জোরে , সম্পর্কের শক্তি কোথায় !
চাওয়া পাওয়ার কষতে হিসেব , মনের আজও ভুল হয়ে যায় ।
সবটুখানি চিনলি যখন , আড়াল করা মুখোশ টাকে ,
বাঁচলো সময় তোরও অনেক , দোষের ভাগী করবো কাকে!
চোখের জলে রাস্তা পিছল , করবো না যে ভালোই জানিস ,
ভিক্ষা করে করলে আদায় , হয় কি সে আর নিজের জিনিস !
হারিয়ে ফেলার ভয় হতো খুব , অভ্যাসই যে আঁকড়ে থাকার ,
এখন তা আর হয় না জানিস ! নেই তো কিছু হারিয়ে যাবার ।
আগাছা ওই দেওয়াল জুড়ে , সরাই যাকে তবুও ফেরে ,
যত্ন ছাড়াই দিনের শেষে , জেদ কে ফলায় অধিকারে,
বোঝায় আমায় , ব্যর্থ জগৎ ইচ্ছাটা তার আনতে বশে ,
থাকার যে সে তেমনি থাকে , শেষের দিনেও চিতার পাশে ।
করেই দিলাম আলগা সুতো , সুখের মেয়াদ বছর খানেক ,
সময় বাকি দিব্যি যাবে , যেমন গেল আগেও অনেক।”

চোখ খুললেন ঈশ্বর |এক ভীষণ অপ্রাপ্তির স্বাদ তার মুখের অকৃত্রিম সৌম্যতার ছাপকে অবিচল রাখতে পারলো না , তার হাতের মুঠোতে বন্দি অন্তরালের তলানিতে অবশিষ্ট ভালোবাসা।

কিছুদিন পর অচেনা ডাকবাহকের হাত থেকে ছেলেটি চিঠি টা নিয়ে বললো , “আপনাকে তো আগে কখনো দেখিনি “।
ডাকবাহক সাইকেলে চড়ে স্মিত হেসে বললেন :”হাতে লেখা চিঠির বাজার তো আজকাল মন্দা , তাই বোধহয় ।”

ছেলেটি নিশ্চিন্ত হয়ে খামটা খুলতেই পাতায় লেখা শব্দ গুলো তাকে গ্রাস করলো ।

“তাকে ছাড়াই দিব্যি জীবন, বদলাবে না কিছু ?
স্মৃতিও কি আর স্বভাব দোষে করবে না তোর পিছু ?
সব কিছু শেষ , অহম তবু তেমনি আছে জমা ,
নিজের ভেবে পাতলে দুহাত , করতো না কি ক্ষমা ?
সাধের সুতো আলগা থাকুক , সত্যি আসল শোন,
বাঁধার মতো বাঁধতে লাগে , নাছোড়বান্দা মন ।
পথখানি তার আগলে দাড়াস ,ভালোবাসার জোর ,
বন্দি হারায় সত্বা নিজের , সবটা হবে তোর ।”

অচেনা ডাকবাহক হাসিমুখে এবার মেয়েটির দরজায় । চিঠির পাতার স্বর্গীয় গন্ধে মুগ্ধ্ব মেয়েটি শব্দ গুচ্ছের ভিড়ে আরো একবার হারিয়ে ফেললো নিজেকে ।

“না হয় করে দেখতি পূরণ ,অযোক্তিক সে দাবী ,
মনের ঘরে রাখলি শুধু অহংকারের চাবি !
শাস্তি দিতে ভাঙলি যে ঘর , লাভের খাতায় ফাঁকি ,
ফিরিয়ে নিলি সবকিছু তোর , মনটা শুধু বাকি।
কঠিন মনে সময় করে বদলে যাবার আশা ,
অপেক্ষাতে চিতায় উঠুক দোষের ভালোবাসা ।”

মহাকাল দাবার গুটিগুলো নতুন ভাবে সাজিয়ে নিতে নিতে বললেন ,

মহাকাল : আপনার এই স্বেচ্ছাচারিতার কারণ জানতে পারি ?

ডাকবাহক অল্প হেসে বললেন : ছেঁড়া কাগজ কি শুধুই ক্লান্ত কলমের হেরে যাওয়া ব্যক্ত করে ? উঁহু!বার বার ছন্দ মেলানোর চেষ্টা কেও তো ব্যক্ত করে। ছন্দ মেলানো বড় কঠিন , সবসময় যে তা মেলে না , কিন্তু যখন মেলে তখন যে কবিতাটি অসম্পূর্ণ রাখা অপরাধ , সে দায় স্ময়ং কবিকেই নিতে হয় বৈকি। সমাপ্তি লাইনে সুখ মাখানো দাড়ি টানতে যে কি পরম প্রাপ্তি তা সহস্র বছর তপস্যা উর্দ্ধে মোক্ষ লাভী কে জিজ্ঞাসা কোরো না হয় ! সে অমৃত আস্বাদনের লোভ থেকে ঈশ্বর নামক সেচ্ছাচারীর যে মুক্তি নেই।

প্রাপ্তি

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

দরজা টা দমকা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল । ঘটনার আকস্মিকতায় শেষের শোনা কটু কথা গুলো কিছুতেই বোধগম্য হল না রিনির । চোখের জলের আড়ালে মনের ভিতরের অনুভূতিগুলো নিংড়ে বেরোতে থাকলো অনর্গল । অবিশ্বাসী মন আরো একবার দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই এক অকল্পনীয় ভয় তাকে ধাক্কা দিয়ে পথের একধারে এনে ফেলল , বাস্তবের সম্মুখীন হওয়ার চেয়ে যেন এখন মৃত্যু ই পরম কাঙ্খিত ।

ঘটনার এক অচেনা প্রত্যক্ষদর্শী কে লক্ষ্য করে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালো রিনি । ভদ্রলোক সহাস্যে এগিয়ে এসে বললেন , “তোমার কি কোনো সাহায্যের প্রয়োজন ?”
রিনি ঘোরের মধ্যে দরজার দিকে ফিরে তাকাতেই ভদ্রলোক বললেন , “ওটা তো আর খুলবে না , আমি যা একবার বন্ধ করে দি, সময় তাকে আর খুলতে পারে না ।”
রিনি : আপনি ?
প্রত্যক্ষদর্শী হেসে বললেন : ওহ! ওটা আমার এক আপত্তিজনক মুদ্রা দোষ ! বিশ্ব ব্রহ্মণ্ডের সবকিছুকেই বরাবর আমার নিজের বলে মনে হয় , বিশাল কর্মকান্ডও তার উর্দ্ধে নয় ।
রিনি ভীষণ ব্যস্ত হয়ে বলল : কিন্তু শেষ বারের জন্য আমাকে যে ভিতরে যেতেই হবে ।
প্রত্যক্ষদর্শী: উহু ! শেষবারের হিসেব টা যে অন্য কেউ রাখে রিনি ! শুধু চৌকাঠের এপার ওপার বলে নয় , যেকোনো কিছুরই শুরুর সাথে শেষের হিসেব নিশ্চিত করাই তার দায়িত্ব । আপাতদৃষ্টিতে কিছু ঘটনা আকস্মিক মনে হলেও আসলে তা সময়ের খাপে ছক কেটে মিনিট সেকেন্ডের খেলা ।
রিনি : খেলা ? কে জেতে এমন খেলায় ?
প্রত্যক্ষদর্শী: খেলা বৈকি ! টান টান উত্তেজনা পূর্ন খেলা ! সেকেন্ডে সেকেন্ডে বদলে যাচ্ছে গুটি , সাথে তাদের চাওয়া পাওয়া , কী ভীষণ জটিল হিসেবী চাল , পরিণতি সুখকর বা মর্মান্তিক যেমনই হোক শেষের দাড়ি কেটে গেলে ফিরে যাওয়া অসম্ভব । আমার কাছে যে পেন্সিল রাবারের বড় অভাব , অগত্যা পেনের মোটা কালিতেই অমর হয় অক্ষর । তবে হার জিতের ব্যাপারটা আপেক্ষিক ।
রিনি : আপনার কথা যদি সত্যি হয় , আমি কী তবে হেরে গেলাম ?
প্রত্যক্ষদর্শী: সে বড় কঠিন প্রশ্ন , আমি বরং সহজ ভাবে বলি । ওই দরজার ভিতরের মানুষের কাছে তোমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে । দরজার দমকা আওয়াজ একেবারেই আকস্মিক নয় বরং বহুদিনের মুলতুবী রায় । তোমার যাকে আজীবন
প্রয়োজন , তার ইচ্ছার গুরুত্ব দেওয়াও যে আবশ্যক ! আর সম্পর্কের সময়সীমার অবধি ইচ্ছামতো কল্পনা দিয়ে মাপার মতো মূর্খামি আর হয় না। বুদ্ধিমতীর ইঙ্গিতই যথেষ্ঠ হলেও অবিশ্বাসীর কাছে আয়নাও মিথ্যেবাদী , দ্বিতীয় নির্ণয়ে পৌঁছাতে স্ময়ং ঈশ্বর ও বেশ খানিকটা সময় লাগালেন ।
রিনি অবুঝের মত বললো : কিন্তু আমি যে এতকাল ওখানেই ছিলাম । আমার আমিত্ব , অধিকার , প্রত্যাশা , সবই যে চৌকাঠের ওপারে । যেখানে স্বেচ্ছায় ঢুকেছিলাম , পরিস্থিতি বা সময়ের প্রয়োজনে নয় , স্বেচ্ছায় বেরোনোর জন্য আমার আরো একবার ভিতরে যাওয়ার খুব প্রয়োজন ।
প্রত্যক্ষদর্শী: স্বেচ্ছাচারিতার কদর যে আমি করি না তা নয় ! তবে সে বরদান লাভের জন্য বিচক্ষণ হওয়া প্রয়োজন , সময়ের ইঙ্গিত বুঝতে হবে রিনি! মনবদলের হাওয়ার আঁচ পেতে হবে । স্থান বিশেষে প্রয়োজনের সময়সীমা নির্ধারিত , তা ফুরোবার আগেই নিজেকে স্থানান্তর করে ফেলতে হবে , কেউ বলার বা বোঝার আগেই । তবেই টিকে থাকবে আমিত্ব , নিজস্বতা , অযাচিত চৌকাঠের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া থেকে তবেই তার নিষ্কৃতি ।
রিনি : আর আমার অনুভূতি ? আমার চাওয়া পাওয়া ? তার বুঝি কোনো দাম নেই ?
প্রত্যক্ষদর্শী: দাম তো বাজারে বেঁচতে চাওয়া জিনিসের হয় রিনি ! তুমি যা হারিয়েছো তা যে বিক্রি হয়নি ।
রিনি : কিন্তু আমি যে নিজের সবটুকু দিয়েছি , একটুও কার্পণ্য করিনি , আজ কড়ায় গন্ডায় ফেরৎ চাইলে বুঝি অধিকারের অবমাননা হবে?
প্রত্যক্ষদর্শী: যারা সবটা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে , হাত পাতা যে তাদের আর শিখে হওয়া ওঠে না রিনি! অত্মসম্মানের ঘেরাটোপে সুপ্ত ইচ্ছার সলিল সমাধি ঘটে ।
রিনি : কিন্তু এখনো যে মুখের উপর দরজা বন্ধের আগে তার শেষ প্রশ্ন টা কানে বাজছে , উপহাস পূর্ণ অপমান বাক্য, “তোমার আরও কথা বলার আছে ? ” উত্তরটা দেওয়ার মতো শক্তি তখন ছিল না , নিজের সাথে লড়াই টা বড় দুর্নিবার হয়ে পড়েছিল ।
প্রত্যক্ষদর্শী: মৌনতার চেয়ে জোড়ালো উত্তর কিছু হয় না রিনি ! আর কখনো সাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে সম্পর্কের মৃত্যুদন্ড বলে , যা প্রতিশ্রুত হয়েছে তোমার ভিতর থেকে , আমি পরিষ্কার শুনলাম যে , চোখের জলের সে দৃঢ় ঘোষণা। দরজার ওপারে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় ফেলে আসা কোনোকিছুই আর তোমার নয় , সময় ভিক্ষার চাল রান্না করে পরম তৃপ্তিতে ভাত ঘুম দিচ্ছে । তাই আর অপেক্ষা না করে নিজেকে আবার নতুন করে তৈরী করো রিনি , এবার কিন্তু শক্ত হাতে বেঁধো সূক্ষ্ম অনুভূতির গাঁটগুলো , নতুন রিনির চোখের জল দেখার ইচ্ছা যেন দেবাদিদেব মহাদেবেরও অপূর্ন থাকে ।
রিনি : কিন্তু আমার গন্তব্য যে অনিশ্চিত , প্রয়োজনের পরিধি মাপতে নতুন দরজা র ঠিকানা জানা আবশ্যক ।
প্রত্যক্ষদর্শী: নিজের ভিতরের দরজাটা খুলতে অন্যের অনুমুতি নিষ্প্রয়োজন , মেয়েটার যে তোমায় ভীষণ দরকার , স্বার্থের হিসেবের সকল স্মৃতি বিলীন হতেই হারিয়ে যেও নতুন সত্তার পরম গভীরে । আর দেরী কোরো না রিনি! আমার যে মেলা কাজ বাকি আছে ।

রিনি স্বস্তির আবেশে চোখ বন্ধ করল , মুখে ফুটে উঠলো সকল প্রাপ্তির হাসি ।

কিছু সময় পর বন্ধ দরজার ভিতর থেকে পুরোনো অভ্যাসের ভুলে ক্ষনিকের আবেশে কেউ ডেকে উঠলো , ” রিনি !”

রিনির আবেশের ব্যাঘাত ঘটানোর ক্ষমতা আর কোনো জাগতিক স্বরের যে নেই তা বলা অনাবশ্যক ।

রসিক প্রত্যক্ষদর্শীর কেন যেন মনে হল এক্ষেত্রে মৌনতা একেবারেই বেমানান , তাই সে দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল , ” শেষ প্রশ্নে অপমানের পরিমাপ বোঝাই করার ব্যস্ততায় স্পষ্ট উত্তরটা অশ্রুত থেকে গেল যে ! হারিয়ে যাওয়া আর হারিয়ে ফেলার মাঝে যে বিস্তর ব্যবধান ,মশাই !ফিরে পাওয়ার বরদান শুধু প্রথম টির জন্য প্রযোজ্য তাও ক্ষেত্র বিশেষে , যতদূর জানি তা বিচারের মাপকাঠির দৈর্ঘ্য ও পরিধি সাধারণের অপরিমেয় , প্রয়োজনের ঘড়ি বাঁধা সম্পর্কের পক্ষে তার নাগাল পাওয়া অসম্ভব।

সম্পর্ক

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

মেঘার আজ জন্মদিন তবুও তার মন ভীষণ রকম খারাপ। সকাল থেকে নিরন্তর অপেক্ষা , একজন বন্ধুরও ফোন আসেনি , যাদের ফোন এসেছে তাদের সে বন্ধু বলে মনে করে না ।

স্কুল কলেজের দিন গুলোতে অজান্তে তৈরী হওয়া সম্পর্ক গুলোর পরীক্ষা নিতে হয়তো ভীষণ দেরী হয়ে গেল । তা হলেই বা কী ! সম্পর্ক যদি গভীর হয় , জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার ভিত তো অটুট থাকার কথা ! আর কিছু না ভেবেই ডায়াল করে ফেলল ভীষণ চেনা কিছু নম্বর । কথা বেশ খানিক ক্ষণ হল বটে কিন্তু ফল আশানুরূপ হল না , পরিবর্তে মন খারাপের মেঘ আরো জমাট বেঁধে গেল।

যে মানুষ টা আড়াল থেকে এসব নজর রাখছিলেন , এবার তিনি অবস্থা সামাল দিতে ঘরে ঢুকতে বাধ্য হলেন ।

মেঘা :মানুষ চেনা কি এতই কঠিন দাদান !

দাদান : আহা ! অল্পতেই বড় ব্যাস্ত হয়ে পড়িস তুই দিদিভাই! কঠিন সহজের বিচার তো তখন হবে যখন কাজটা করার চেষ্টা করবি !

মেঘা : তোমার বুঝি মনে হচ্ছে যে আমি তা করি না ?

দাদান : বলছিস যখন করিস হবে নিশ্চই , তা কটা মানুষ চিনলি এখনো পর্যন্ত ?

মেঘা : প্রথমে ভেবেছিলাম অনেক , তারপর হিসেবে করে দেখলাম হাতে গোনা , এখন তাও যে বড় জোর গলায় বলতে পারছি না ।

দাদান :সেই বরং ভালো , জটিল হিসেবে যত কম করা যায় বুঝলি কিনা !

মেঘা : সবাই যে একসাথে বদলে গেল , কত বছর ধরে জমানো মুহূর্ত দিয়ে গড়া গুটিকতক সম্পর্ক , শত টানা পোড়েনের মাঝখানেও ক্ষনিকের স্বস্তি , হারিয়ে গেল ! তা বুঝি হয় ? সকাল টাতেই গন্ডগোল , কাল রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগেও তো ঠিক একই রকম ছিল ।

দাদান : হয়তো ছিল না , মানে যাচাই তো তুই সকাল বেলায় করলি কিনা তাই বলছিলাম !

মেঘা : তোমার বুঝি খুব আনন্দ হচ্ছে ?

দাদান : ভীষণ ! তোর কোনো বন্ধু ফোন করেনি বলেই কিনা আজ দাদানের জন্য এতটা সময় । আর কদিন বাদে বিয়ে করে অন্য ঘরে চলে যাবি তখন তো তোর গুটিকয়েক পোষ্য র সাথে এই বুড়োকে একাই থাকতে হবে ।

মেঘা একটুও না হেসে আরো গম্ভীর হয়ে গেল ।

দাদান : শোন দিদি ! মানুষের যেমন বয়স হয় , সম্পর্কেরও তো হয় , সময়ের সাথে যেকোনো গাঁট ই দুর্বল হয়ে পড়ে যে ! নতুন বাঁধনের উত্তেজনা সেখানে কোথায় ! আমার মতো বুড়ো মানুষেরা যেমন সুস্থ থাকার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও পারে না , বয়স বাড়লে সম্পর্কের ও হয় সেই একই অবস্থা , তখন অস্তিত্বের তাগিদে তার শক্তি চাই , যত্ন চাই। বৃদ্ধ শরীর যাকে পথ্য বলে থাকে , সম্পর্কের ভাষায় তা হল সময় , না পেলে ফাটল অনিবার্য ।

মেঘা : সময় যে আর আগের মতন অনেক নেই দাদান ! সবাই যে ব্যস্ত !

দাদান : সমস্যা টা তো সেখানেই দিদি ! তুই যে সময় গাঁট গুলো বেঁধেছিলি তখন তো জীবন শুরু ই হয়নি , আর এখন যে সূর্য দেব ঘুম থেকে উঠে আপিস রওনা দিয়েছেন বলে কথা । কিন্তু জন্মদিনে হাসি বাতিলের মত শক্ত অজুহাত এটা নয় , ফোন টা নিয়ে আয় দেখি , ছোটবেলার মতো দাদান ই অগত্যা বন্ধুদের মাঝের সমস্যা মেটাক ।

মেঘা : কোনো দরকার নেই ! আমি ফোন করেছিলাম ।

দাদান : একজনকে করেছিলি হবে , বাকি দের করতে দোষ কোথায় !

মেঘা : না ! তিন জনকে করেছিলাম , কারোর কিছু মনে নেই । তৃনাকে কলেজে একটা বেশী ক্লাস নিতে হচ্ছে , বাড়ি ফিরে ফোন করবে বললেও আমি জানি সেটা কথার কথা । স্মৃতি র ছেলে খুব ছোট ও কাঁদুনে,শাশুড়ির নিন্দা ছাড়া আর কিছু করার ওর সময় নেই । সঞ্জু প্রেমিকা পরিবর্তনে ব্যস্ত , নতুন প্রেমিকা , নতুন পরিশ্রম , নতুন মিথ্যা,মেয়েরা কী উপহারে খুশি হয় তা জানতেই মাঝে মধ্যে আমার দরকার পড়ে ।

দাদান :আর পৃথা ? খুব হাসি খুশি মেয়েটা , আমার বেশ মনে আছে , প্রায়ই আমাদের বাড়ি আসতো ।

মেঘা :ও আর হাসি খুশি নেই দাদান , ভীষণ রকম সন্দেহ বাতিক ও বদমেজাজী হয়ে গেছে , বেশীর ভাগ সময় ফোন ধরে না , নিজের থেকে অম্লানের ফোনের দিকেই খেয়াল বেশী । এমনটাই তো হওয়ার ছিল , স্কুলের সময় থেকেই অম্লানের চরিত্র ভালো ছিল না , অনেক বারণ করেছিলাম , অগণিত ঝগড়া , শেষমেশ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতেই মুখে কুলুপ আটলাম ।

দাদান : তবু খবর তো নিতে হবে দিদিভাই ! কাছের মানুষদের ভালো মন্দ জানা টা যে ভীষণ জরুরি । সকলকে ভালো রাখতে না পারিস কিন্তু জানান তো দিতেই হবে যে তুই আছিস , যেমন টা কথা হয়েছিল , তেমনটাই । সবাই না রাখলেও কেউ কেউ তো কথা রাখেই।

মেঘা : তা তো রাখেই ! তাছাড়া নতুন হাতগুলো স্বার্থে ভরপুর দাদান , বন্ধুত্বের মুখোশে কি ভয়ানক চরিত্র কে না আড়াল করে ।

দাদান : নতুন সম্পর্কের বড় জ্বালা রে দিদি ! নতুন করে হিসেবে নিকেশ , কথার মার প্যাচ , সত্যি মিথ্যার বচসা , নিজেকে গোড়া থেকে প্রমাণ করার তাগিদ । আরো বয়স হলে বুঝবি পুরোনো গুলোই অভ্যাস , ভালোবাসা । অভাব অভিযোগ যেমন তেমন , মরচে সরলেই একদম তাজা , নির্ভেজাল , এপার ওপার দেখার জন্য আতস কাঁচ অপ্রয়োজন,আমার বন্ধু গুলো যখন একে একে চলে যাচ্ছে, খুব ইচ্ছা করে জানিস দিদি ! গন্তব্য না জানেই পিছু নি ঠিক আগের মতন , বলা কি যায় হঠাৎ খেয়াল করে আবার যদি আনন্দে পাগল হয়ে জড়িয়ে ধরে !

মেঘা দাদুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল আড়াল করল আর অস্ফুটে বলল , “প্লিজ !”

দাদান অল্প হেসে তার মাথায় হাত দিয়ে বলল ,

মনে রাখিস দিদি , কলেজে একদিন ছুটি পড়বে ই , কোনো কাঁদুনে ছেলেই চিরকাল ছোট্টটি থাকে না , এক্ষেত্রে ভীষ্ম লোচন শর্মার ব্যাপারটা ধরিস না । স্ত্রী ভাগ্য প্রাপ্তি হলেই অতি বড় প্রেমিকেরও প্রেমিকার খোঁজ ফুরাতে বাধ্য , সবশেষে সন্দেহ বড় এক ঘেয়ে বিষণ্ণতা আনে , একসময় ক্লান্তি আসতে বাধ্য।

অজান্তেই মেঘার মুখের হাসি মিশে গেল স্বস্তির নিঃশাসে ।

ছদ্মবেশী

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

চঞ্চল কাঠবিড়ালীর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভগবান রোজের মতন আজও মন দিয়ে নিরীক্ষণ করছিলেন মেয়েটিকে। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া নিশ্চই জরুরি , কিন্তু তার গুরুত্বের মাত্রা কি ঈশ্বরকেও ব্যাকুল করে ? কিন্তু তা কি করে সম্ভব! তিনি তো ত্রিকাল জ্ঞানী , কৌতূহল যে তাকে স্পর্শ করতে পারে না ! তবুও অসাধারণের মোড়ক খুলে স্বয়ং স্রষ্টাকে অতিসাধারণ ছদ্মবেশের আড়াল নিতে হয়, সে প্রয়োজনের সন্ধান দিতেই বুঝি তিনি মৌনতা ভাঙলেন আজ।

ছদ্মবেশী নদীর পারে একলা দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন ,

ছদ্মবেশী> তোমাকে প্রায়ই এইসময় নদীর পারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি , তুমি বুঝি কারো অপেক্ষা করো ?

মেয়েটি > হুম , নিজের । ভিড়ের মাঝে নিজেকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টাতেই এই বিপত্তি । আসলে আমি তো আলাদা নই,আশেপাশের চেনা শতকরা ৯০ জনের সাথেই মিল খুঁজে পাবেন আমার , অতি সাধারণ চাওয়া পাওয়ার ঘেরাটোপের আড়ালে অসাধারণের মুখোশ পরে থাকা কি সহজ বলুন !

ছদ্মবেশী> একদম সহজ নয় , তা কেন পড়লে এমন বেমানান মুখোশ ?

মেয়েটি >সাধারণের মূল্য ধার্য করার সময় যে কারো হয়নি । অসাধারণ বলেই কিনা দ্রৌপদী শ্লীলতাহানি থেকে রক্ষা পেল, সবাই কি পায়!

ছদ্মবেশী > তোমার নিজেকে ফিরে পেতে ইচ্ছা করে না ?

মেয়েটি > সে ইচ্ছার টানেই তো রোজকার এই সময় বাঁধা নিয়ম । খুব অদ্ভুত হলেও ব্যাপারটা সত্যি । চোখের জলের ফোঁটা নদীর জলে একবার মিশতেই নিজেকে ফিরে পাই আমি , একদম খাঁটি নির্ভেজাল সত্ত্বা ।

ছদ্মবেশী > তাহলে কী আর সমস্যা! , সকালে যা হারালে বিকেলে তা কড়ায় গন্ডায় ফেরৎ ।

মেয়েটি >সমস্যা একটু আছে বৈকি , চোখের জল জমতে যে সময় লাগে ,কখনো কয়েক মাস , কখনো বা বছর , সহ্যের সীমা ছাড়ানোর নিরন্তর অপেক্ষা , অভ্যাসের জীবনে দুঃখ দুর্লভ কিনা !

ছদ্মবেশী > বুঝলাম ! তা তুমি কি করো ?

মেয়েটি > বিক্রি ,যা আসলে পুঁথি পড়া বিদ্যা কিন্তু পেশার কারণে গুণ বলতে হয় ।

ছদ্মবেশী >তাতে অভাব মেটে ?

মেয়েটি > টাকার ? তা মেটে , বাকি কিছুর অভাব কোনো পেশাই মেটাতে পারে না ।

ছদ্মবেশী >কখনো নিজেকে অসহায় মনে হয় ?

মেয়েটি > ভালোবাসার মানুষ গুলোকে সময় দেওয়া যখন বিলাসিতা মনে হয় , ঠিক তখন ।

ছদ্মবেশী >তুমি ভগবানে বিশ্বাস করো ?

মেয়েটি > না , আস্তিকদের ভিড় আমাকে বুঝিয়েছে স্বার্থের সম্পর্কে বিশ্বাসের ভিত নড়বড়ে হয়ে থাকে ।

ছদ্মবেশী >যদি তিনি সত্যি থেকে থাকেন আর তুমি তাকে হঠাৎ দেখতে পাও তাহলে কিছু চাইবে ?

মেয়েটি > চাইবো না , দেবো , তার অস্তিত্বে আমার স্বার্থহীন বিশ্বাস ।

ছদ্মবেশী >কিছু চাইবে না ? তার যে অদেয় কিছুই নেই । সুখ , অর্থ অথবা মোক্ষ , চাইতে দোষ কি ?
মেয়েটি >এক সুখ এক মানুষকে বেশীদিন সুখী রাখে না , অর্থ উপায়ের জন্য ভগবানের প্রয়োজন নেই,মোক্ষ ব্যাপারটা লোভনীয় হলেও ক্ষতির পরিমাণ টা বড় বেশী ।

ছদ্মবেশী > মোক্ষ লাভে ক্ষতি ?

মেয়েটি > ক্ষতি নয় ? বাকি জীবনের চাওয়া পাওয়া , সমস্যার লক্ষণরেখা , সমাধানের শক্তিশেল , নিংড়ে নেওয়া অভিজ্ঞতা ,সময়ের চাল বদল , গোনা কয়েক মুহূর্ত , ভালোবাসার গাট ছড়া , এসকলই যে দিয়ে দিতে হবে বিনিময় প্রথা অনুযায়ী , তাতেও সাফল্য প্রতিশ্রুত নয় । তাছাড়া চিরস্থায়ী যখন নয় আর পুরোটাই আমার , স্বাদ যেমনই হোক চেখে নিতে দোষ কি ? মানে জীবনের কথা বলছিলাম ।

ছদ্মবেশী (হেসে)> কখনো মনে মনে প্রার্থনা কোরো , নিজ সৃষ্টি র জন্য স্রষ্টার গর্ব যেন চিরস্থায়ী হয় , হৃদয় যেন সহস্র কোটি বছর । নিশ্চিত থেকো এতে তোমার স্বার্থ নেই , আছে অন্য কারো ।

ধন্যবাদ ,
রোমি

বাকরুদ্ধ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বোঝার যদি ইচ্ছা থাকে, শব্দ রাশি ব্যর্থ খোঁজা ,
বাক্যে মেপে গন্ডি মনের নাগাল পাওয়া ওতই সোজা ?
সদ্য জাত শিশু যখন মাকে প্রথম স্পর্শ  করে,
অভিধানের স্পর্ধা কোথায় , মনের ভিতর আয়না ধরে ?

মৃত্যু যখন অপেক্ষাতে , ঝাপসা যখন জগৎ বাকি ,
বুঝতে পারা, যায়নি দেওয়া সময়কে তার অঙ্কে ফাঁকি ,
“আসছি আমি , ভালো থেকো “, শব্দে বলা নাই বা গেল ,
ভালোবাসার শেষ পাতা টা , নাই বা  কথায়  ব্যক্ত হল।

হাত টা চেনা  ছাড়ল যখন, নতুন হাতের অমোঘ টানে ,
কষ্ট  কী আর ভার হারাতো   ক্ষণিক কটু বাক্য বাণে ?
দোষ ছিল কার ,  ব্যাখ্যা হাজার , আর কী হত প্রশ্ন করে ,
শব্দ ভিড়ে ভাগ্য লিখন  বদলে দিতে কেউ কি পারে ?
সুখের হিসেব মিলিয়ে দিতে  , চায়নি সে আর ডাকতে পিছু ,
চোখের জলের নীরব ধারায় লুকিয়ে ছিল হয়তো  কিছু।

একলা না হয় সবাই থাকে ,বন্ধু তবু ভীষণ  প্রিয় ,
স্বার্থ এমন হানবে আঘাত ,কক্ষনো তা  জানতো না ও !
গড়তে যাহা বছর গেল , মুহূর্ত তার  সবটা  কাড়ে ,
বিশ্বাসেতে লাগলে মোচড় , শব্দ কি আর জুড়তে পারে ?

সেই যে বিশেষ ইচ্ছাখানি , হঠাৎ করেই পূরণ হল ,
যুগের শেষে বন্দি যেন খাঁচার থেকে মুক্তি পেল ,
স্বপ্ন সুখে বিভোর হৃদয় , হারিয়ে গেল  শান্তি ঘুমে ,
পারল না সে চুকিয়ে দিতে সুখের হিসেব শব্দ গুনে ,
হাসির স্রোতে  ভাসিয়ে দিল সবটুকু তার উজাড় করে ,
শব্দ হারায় স্বত্বা নিজের , হৃদয় ভরা খুশির ঘোরে।

ঈশ্বরও তো মৌন থাকে , তোর ডাকে সে দেয় কি সাড়া ?
অধিকারের প্রশ্ন বিনাই অন্তরে তার বিরাজ করা ,
যত্নে তবু করিস পুজো , চাস যা খুশি ইচ্ছা হলে  ,
চাওয়া পাওয়ার টানাপোড়েন ,শব্দ ছাড়াই দিব্যি চলে ।

আমার বেলাই অন্য নিয়ম , অপেক্ষাতে থাকিস বসে,
খুলবো কখন মনের খাতা , নিখুঁত কটি বাক্য কষে ।
মিথ্যা জমা অভিযোগের  আঁচল থাকে শব্দে ভরা ,
গভীর যখন অনুভূতি , যায় না কথায় প্রকাশ করা ,
মনকে ছুঁতে মন ই পারে , শব্দ কেন খুঁজিস বৃথা ?
চাস না দিতে বদলে নিয়ম ,  অটুট থাকুক নিজস্বতা ।

লুকোচুরি

Comments 3 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বিনি দৌড়ে এসে তার আদরের ছোট পিসির  পাশে শুয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগলো ।

পিপি : কে ? বিনি সোনা  নাকি ? একি ! মাগো ! চোখে জল কেন ?

বিনি : সবাই যে বলছে যে তুমি চলে যাবে আর কক্ষনো ফিরবে না ।

পিপি অল্প হেসে বললো : ও তাই বুঝি বোকা মেয়ের চোখে জল ? এমন আবার বুঝি সত্যি হয় ! পিপি কি বিনি সোনাকে ফেলে কোথাও যেতে পারে !

বিনি : তাহলে তুমি আমায় ছেড়ে যাবে না ? সবাই তাহলে মিথ্যে কথা বলছে ?

পিপি : যাবো নাই তো , মিথ্যা ছাড়া আর কী ! কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলে গেল আমার সোনার ,এদিকে আয় দেখি চোখ মুছিয়ে দি ।

বিনি পিপিকে জড়িয়ে ধরে বললো : জানো পিপি ডাক্তার কাকু খুব খারাপ ! উনিই  তো এই মিথ্যা কথাটা সকলকে বলেছেন । ঠাম্মি , মা , কাকামনি , বাবা , জেঠ্যুমনি  তাই তো কাঁদছে । আমি সবাইকে  গিয়ে সত্যি টা বলে দি পিপি ? তাহলেই সব আবার আগের মতন হয়ে যাবে।

পিপি : হুম সে বলতে পারিস কিন্তু তাহলে আর নতুন খেলাটায় মজা হবে না যে ।

বিনি : নতুন খেলা ? সেটা কী  পিপি?

পিপি : সে এক ভীষণ মজার খেলা । তুই খেলবি ?

বিনি : হ্যাঁ খেলবো না কেন ? কী খেলা গো ? আমায় বলো না পিপি ।

পিপি : লুকোচুরি ।

বিনি: এমা ! এটা আবার নতুন খেলা নাকি ? আমি তো কতবার তোমার সাথে খেলেছি , তুমি তো লুকোতেই পারো না , আমি তো প্রতিবারই এক চান্সে তোমায় খুঁজে বার করে ফেলি ।

পিপি : ওই তো ! এবার আর পারবি না , অনেক খুঁজতে হবে ,হাফিয়ে গেলে চলবে না কিন্তু , হেরে গেলেও চলবে না ।মনে রাখিস পিপি কিন্তু আছে, দেখতে পাচ্ছিস না কারণ লুকিয়ে আছে । যে যাই বলুক কারো কথা বিশ্বাস করবি না , সত্যি সেটাই যেটা আমি তোকে বলছি। সময় যতই পার হয়ে যাক, পিপি কিন্তু তোর ধাপ্পা দেবার অপেক্ষা করতেই থাকবে।

বিনি : আর আমি যদি তোমায় খুঁজে না পাই তাহলে কী হবে ?

পিপি : ওমা ! তাই আবার হয় নাকি ? সাপসিঁড়ি হোক অথবা লুকোচুরি , সব তো খেলাই নাকি ! শুরু যখন হয়েছে  শেষ তো একদিন না একদিন হতেই হবে ,  আর ঠিক তখনি বিনি খুঁজে পাবে তার পিপিকে , পেতেই হবে , যেমনটা এতদিন হয়ে এসেছে , তেমনটাই যে নিয়ম।

বিনি : কিন্তু আমি তো তোমাকে ছাড়া থাকিনি কখনো , আমার খুব ভয় করছে যে  , তোমার বুঝি করছে না ?

পিপি : আমারও তো করছে , কিন্তু ভয় পেলে যে খেলা যাবে না আর না খেললে যে শেখা হবে না।

বিনি :কী শেখা হবে না পিপি ?

পিপি : ভয় না পেতে শেখা হৰে না বোকা মেয়ে !

বিনি : তুমি হারিয়ে যাবে না তো পিপি ?

পিপি : ধ্যুর! পাগল মেয়ে ! যত বড় হবি তত বুঝবি যে হারিয়ে যাওয়াটা খুব বড় মিথ্যা ,সবশেষে ফিরে পাওয়াটাই  হল আসল সত্যি ।কি রে ! এখনো ভয় লাগছে ?

বিনি : তুমি যে কী  বল পিপি ! যে খোঁজে তার আবার ভয় লাগে নাকি ! যে লোকায় তার তো ধাপ্পা খাওয়ার ভয় লাগে । এবার তো খুঁজতে অনেক টা সময় লাগবে তাই ধাপ্পা টা এতো জোরে দেবো যে কানে তালা পরে যাবে তোমার ।

পিপির খিলখিল হাসির সাথে বিনি সকল কষ্ট পিপির শাড়ি তে মুছে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল ।

মামাবাড়ি থেকে ফেরার পথে বিনি শুনতে পেল মা গাড়িতে বাবাকে বলছে ,”বাড়ি তো এসে গেল ! বিনি পৌঁছেই তো আগে  দিদির ঘরে যাবে।তুমি কী এখনও চুপ করে থাকবে ?” নিরুত্তর বাবা ঝাপসা চোখে জানলার বাইরের দিকে দেখতে লাগলো ।

গাড়িটা বাড়ির সামনে থামতেই  বিনি দৌড়ে পিপির ঘরে গিয়ে ডাকলো : “পিপি !”

খালি ঘরে বার বার ডেকে কোনো সাড়া না পেয়ে চিন্তিত বিনি খাটের পাশে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইল , তারপর হঠাৎ হেসে বললো : ও বুঝেছি! খেলাটা শুরু হয়ে গেছে । তুমি একদম ভয় পেও না পিপি , বিনি  তোমাকে  খুঁজে বার করবেই  ।

 

ইচ্ছা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

নামিয়ে মাথা মৌন থাকি ,চাই কী আমার  শুধাস  যখন,
উপহারেও মন ওঠে না , এমন কী হয় সত্যি  এখন  !
ভাবিস আরো  অনেক কিছু , ভাবিস তোকে দিচ্ছি ফাঁকি ,
নয়তো কেন ইচ্ছা নিজের  , যত্ন করে  লুকিয়ে রাখি !
যখন ভাবি বলবো কথা , কাজের ভিড়ে ব্যস্ত থাকিস ,
চিঠির ভাঁজে দিলাম রেখে , ইচ্ছা জমাট মনের হদিস ।

সিগারেটের ধোঁয়ার খেয়াল , হারাস  চেনা পথের মোড়  ,
ইচ্ছা আমার, বৃষ্টি হঠাৎ , নেভাক আগুন , কাটাক ঘোর !
ভয়ের লাগাম চাই না দিতে,  স্বাধীন চেতা হৃদয় টাকে ,
তবুও বলি মৃত্যুর চেয়ে  ,বাঁচার নেশাই মানায় তোকে !

বইয়ের স্তূপে বুঁদ হয়ে তুই , ভুলিস যখন জগৎ  বাকি ,
দমকা হাওয়ায় উড়ুক পাতা , মনে প্রাণে চাইতে থাকি ।
চশমা ভাঙুক , মেঝের উপর কলম সারির  লুটোপুটি ,
তখন শুধুই গল্প হবে ,ঝড় হলে তো পড়ার ছুটি ।

মনখারাপের চোখের জলে , সাধের  কাজল নষ্ট হলে  ,
হারিয়ে যাওয়ার মন্ত্র বলে  ,লুকোতে চাই  তোর আড়ালে !
মনভোলানো জাদুর কাঠি  ,রাজপুত্রের সাদা ঘোড়া ,
মিথ্যে  যখন রূপকথারা ,  জীবন শুধু ই তোকে ঘেরা  ।

দামী শাড়ি , গয়না পড়ে  ,তোর সামনে দাড়াই আমি ,
“ভালোই তো বেশ  “,  বলেই আবার বইতে হারাস সবটুখানি ,
ইচ্ছা পূরণ হঠাৎ হল , খোলা চুলে স্নানের পরে ,
মুগ্দ্ধ চোখে দেখলি আমায়  , সেদিন যখন পুজোর ঘরে ।

ভবিষ্যতের ভাবনা টানে , অনিশ্চিতেই  চিঠির ইতি ,
হ্যাঁচকা টানে ছোটোবেলা , চিন্তাবিহীন দিনের স্মৃতি ।
শান্তি ঘেরা রাত্রি  গুলো , নির্ঝঞ্ঝাট বিকেল আমার,
ইচ্ছা ভীষণ, দায়িত্ব শেষে,তোর ই সাথে খুঁজবো আবার।

যুগপৎ

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ফর্মুলার খাতায় আরো একবার চোখ বুলিয়ে নিল গিনি । গত কয়েক মাসের নিরলস পরিশ্রম স্বার্থক হলে ,তার তৈরী নতুন যন্ত্র টি দূর করতে পারবে একাকিত্ব , নিঃসঙ্গতা  প্রভাবিত হবে ফর্মুলার যাদু কাঠিতে , জীবনের হিসেব মুহুর্তে বদলে দিয়ে অসাধ্য সাধন করবে যন্ত্রটির ইচ্ছা বোতাম ,  তবে আগের  যন্ত্র গুলোর  মতন সম্পূর্ণ গিনির ইচ্ছায় পরিচালিত হবে না এটি , নিজের প্রয়োগ স্থান এবং পদ্ধতি নির্দিষ্ট করবে এটির ভিতরের ইচ্ছা বোতাম। যদিও তার অন্য আবিষ্কারের মত এটির কার্যকারিতাও পরীক্ষা সাপেক্ষ, তবুও গিনির চিন্তা জুড়ে অবাধে যাতায়াত করে চলল নতুন আবিষ্কারের উত্তেজনা। যন্ত্রটিকে টেবিলের উপরে রেখে বিছানার উপরে শুয়ে পড়তেই প্রিয় লজেন্সের আদরে ভিজে গেল গিনির ক্লান্ত শরীর।

শনিবার সকালে উঠে যন্ত্রটি হাতে নিয়ে মা কে বলে আলুভাজা দিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ল গিনি । রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সেই ছোটবেলা থেকে পাড়ার এই প্রবীণার সাথে এক অলৌকিক  মায়ার বাধনে বাঁধা সে, তার ছোট্টবেলার গোসাঘর হল দিদার চিলেকোঠার ধারের সিড়ির তলা । সেই গোসা ভাঙ্গানোর একমাত্র ওষুধ ছিল দিদার হাতে তৈরী ঝিরঝিরে আলুভাজা । দিদার কাছে নানা রঙের গল্প শুনে রাগের কারণ ভুলে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ত ছোট্ট গিনি , নিজের অজান্তে বাবার কোলে বাড়ি ফিরতো ঘুমন্ত মেয়েটা । খুব অল্প বয়সে বিধবা নিঃসন্তান এই মহিলার ভিতরের সীমাহীন ভালবাসা গিনির ছোটবেলার স্মৃতিকে আজকের ব্যস্ততার ভিড়েও ম্লান হতে দেয়না । বয়সের কারণে এখন প্রায় গৃহবন্দী একসময়কার ভীষণ কর্মঠ  মহিলা  নিহারী গুহ ওরফে গিনির আলুভাজা দিদা । প্রতিবেশীদের  থেকে শহরের নাম করা বৃদ্ধাশ্রম গুলোর সুযোগ সুবিধা অনেকবার শুনেও কিছুতেই এই বাড়িটার মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেননি নিহারী দেবী , ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী রক্ষনশীল পরিবারের মেয়েটি  কলেজে পড়াকালীন সকলের অমতে  বিয়ে করেন তার ভালবাসার  মানুষকে  , স্বামীর হাত ধরেই  বিয়ের রাতে প্রথম বার পা দেন  শ্বশুরের তৈরী করা এই বাড়িটি তে। বাড়িটির পবিত্রতা নিহারী দেবীর  কাছে মন্দিরের চেয়েও বেশী । ছোটবেলায় মা হারানো  একটি ছেলের  বড় হওয়ার নির্বাক সাক্ষী এই বাড়িটি, বাকি সকলে মুখ ফিরিয়ে নিলেও, ছেলেটির  স্ত্রীকে  প্রথম দেখাতেই   নিজের সবটা দিয়ে আপন করে নিয়েছিল এই বাড়ির প্রতিটা কোণা ,নিজের সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে  বেঁধে নিয়েছিল অলৌকিক মায়ার বাঁধনে । বিয়ের পরের কাটানো রঙীন দিন গুলোর স্মৃতি আজও বাড়িটার সর্বত্র লেগে আছে , হঠাৎ অসুখে স্বামীকে হারিয়ে সেই স্মৃতি আঁকড়েই  নিহারী দেবী কাটাতে পেরেছেন এতগুলো বছর , তাই কিছুতেই এই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন না  তিনি , তবে সারা জীবনে জুড়ে  তৈরী করা নিঃস্বার্থ সম্পর্ক গুলোর  গাঁট  আজও একই রকম অক্ষত, গিনির মত ভক্তের সংখ্যা  তার অগনিত কিন্তু  ব্যস্ত জীবনের চাপে স্বাভাবিক কারণেই  যখন তখন  স্বনিমন্ত্রিত অতিথির  সংখ্যা আজকাল হ্রাস পেয়েছে, শারীরিক অক্ষমতার কারণে নিজেও আর কারো বাড়ি বেশী যান  না , অভ্যাসের বলে এই বয়সেও সংসারের দৈনন্দিন  কাজ গুলো নিজেই করে থাকেন তাই বলা বাহুল্য কাজের লোকের  প্রয়োজন তার কখনো ই পড়েনি ,তাই নিহারী দেবীর  এখনের  একাকিত্বের দায়ভার শুধুই  যেন সময়ের । প্রিয় আলুভাজা দিদার  শারীরিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার উপায়  গিনির অজানা হলেও তার শেষ বয়সের একাকিত্ব দূরের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রমে সে তৈরী করেছে ‘যুগপৎ’ নামের এই নতুন যন্ত্রটি।

দিদার বাড়ির কড়া নাড়তেই দেখা মিলল সেই ছোট্টবেলা থেকে পরিচিত হাসি মুখ টার , পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রনাম করেই গিনি বলল,  “কী করব ? সকাল সকাল আলুভাজা খেতে ইচ্ছা হল যে ! ” নিহারী দেবী হেসে বললেন “ভাগ্যি আমার ! তাই না সোনা মেয়েটার দেখা পেলাম !” দিদাকে জড়িয়ে ধরে গিনি বলল , ” আমি বুঝি খুব স্বার্থপর?” সাথে  সাথে  দিদার শক্ত গলার  আদর জড়ানো  প্রত্যুত্তর “বালাই শাঠ!কান টা  যে অনেকদিন মোলা হয়নি  কথা শুনে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।” গিনি খিলখিল হেসে ছোটবেলার অজস্র স্মৃতি  জড়ানো বাড়িটাতে ধীর পায়ে মিশিয়ে দিল নিজের উপস্থিতি ।

আলুভাজা ভাজতে ব্যস্ত নিহারী দেবীর পিছনে  দাড়িয়ে গিনি ব্যাগ থেকে যন্ত্রটি বার করল, ইচ্ছা বোতামে আঙ্গুল ছোঁয়ানো  মাত্র  যন্ত্র থেকে বেরোনো আলো রশ্মি নিহারী দেবীকে স্পর্শ করলো ,নিহারী দেবী চমকে উঠে পিছন ফিরতেই গিনি যন্ত্রটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে ব্যাগের পিছনে আড়াল করে নিল। নিহারী মৃদু হেসে বললেন , “কি রে ! দিনের বেলায় টর্চ জ্বালছিস কেন ? ভাবছিস বুঝি দিদার চোখ টা একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে , ঝাপসা দৃষ্টি তে সাধের আলুভাজা বেস্বাদ হয়ে গেল বুঝি !” গিনি খানিকটা সামলে নিয়ে বলল ,”ধ্যুর ! তা কেন হবে ! আলুভাজার গন্ধে তাড়াতাড়ি আসতে গিয়ে অসাবধানে টর্চে হাত পড়ে গিয়েছিল ।কখনো কখনো কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতে দেরী হয় বলে মা এটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছে ।” নিহারী দেবীর উত্তর না শুনেই রান্নাঘর থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল  গিনি , বসার ঘরে ঢুকে যন্ত্রটা সামনে আনতেই  তা থেকে বিচ্ছুরিত আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল  তার , কয়েক সেকেন্ড পর ইচ্ছা বোতাম ভিতরে ঢুকে যেতে যন্ত্রের  আলো নিজে থেকে নিভে গেল । যন্ত্রটি নিহারী দেবীকে পর্যাপ্ত নিরীক্ষণের সুযোগ পেল না তাই তার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে উদ্বেগে গিনির মন ভরে  গেল।

দিদার সাথে সারাদিন অনেক গল্প করে সন্ধ্যে বেলা বাড়ি ফিরল গিনি।টেবিলের ওপর চিন্তায় অবশ  মাথা রেখে  নিজের অজান্তেই  সে  কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল ,মা ঘরে ঢুকে মাথায় হাত রেখে বললেন , “ক্লান্ত লাগছে  খুব , তাই না ? কতবার বলেছি এদিক সেদিক ঘুরিস না  ছুটির দিনগুলো তে।” গিনি চোখ কচলে উঠে খাটে শুয়ে বলল , “ক্লান্ত না হলে যে তুমি  তো আদর ই কর না !” মা হেসে পাশে বসে বললেন , “তাই বুঝি ! তোর লজেন্স কে জিজ্ঞাসা কর ! আজ সারা দুপুর আমার আদর খেয়েছে । ” নিজের নাম শুনে আল্হাদে গদগদ লজেন্স দৌড়ে  বিছানায়  উঠে গিনি আর মায়ের মাঝে ঠেলে  নিজের জায়গা করে আদরের বিশেষণ গুলো কে আরো একবার  লালাময় করতে লাগল ।

দুটো দিন বেশ চিন্তায় কাটল গিনির, অনেকবার ভেবেও আলুভাজা দিদার বাড়ি যেতে পারেনি সে , গিনি গেলেই দুর্বল শরীর নিয়ে দিদা রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্য কোনো উপায়ও তো নেই  , দুদিন আগে ঘুরে এসে ,এখনই ফোন করে খবর নিলে দিদার অদ্ভূত লাগতে পারে । সকালে জলখাবারের টেবিলে পৌঁছে বাবাকে একটা বই মনোযোগ সহ পড়তে দেখে  গিনি বলল , ” বাবা ! তুমি না শিখিয়েছ খাবার সময় অন্য কাজ করতে নেই ! ”

মা : তুই তো এখন দেখছিস ! এ চলছে কাল রাত থেকে , সারারাত ঘরে আলো  জ্বালিয়ে রেখেছিল তোর বাবা ! দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি মোটে , তোমার না হয় অফিসে না গেলে  চলবে , আমার সংসারের কাজে তো আর ছুটি নেই বাপু !

বাবা:  আরে ! এই বইটার কি অদম্য আকর্ষণ তোমাদের কী বলব! শেষ না করে এটার থেকে চোখ সরানো  এখন অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে ।

গিনি: তাই ? কী বই এটা ?

বাবা : মনস্ত্ব ত্ব কেন্দ্রিক  এমন জটিল কিছু তথ্য লেখা যা আমার মত ঘুম কাতুরে লোকেরও ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ !

গিনি : মনস্ত্ব ত্ব ? কই দেখি ! উহু !  আমার বইয়ের তাকের সদস্য তো নয় এটি , তাহলে বই টা কে দিল তোমাকে ?

বাবা : নিহারী মাসিমার  বাড়িতে আসা নতুন ছেলেটি !

গিনির চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল  : আলুভাজা দিদার বাড়িতে কেউ এসেছে?

বাবা : ওহ ! তোকে তো বলতে ভুলেই গেছি ! কাল অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় ভাবলাম মাসিমার খবর টা নিয়ে আসি , বাড়ি যেতেই উনি এই নতুন ছেলেটির  সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন ,বললেন  পেয়িং গেস্ট । ছেলেটি ব্যবহার যেমন  চমৎকার তেমনি

প্রশংসনীয় ওর সংগ্রহের বইগুলো ! এত সুদর্শন যুবক আমি আগে  দেখেছি বলে মনে পড়ে না , কিন্তু নিষ্পাপ মুখের মধ্যে কোথাও যেন একটা জটিল রহস্যের ছায়া ! আমি নিহারী দেবীকে আড়ালে বলে এলাম , ছেলেটির ব্যাপারে ভালো করে খোঁজ নিয়ে নিতে ,এখন যা দিনকাল পড়েছে !

গিনিকে অন্যমনস্ক দেখে মা ধাক্কা দিয়ে বললেন , ” খাবার টা খেয়ে নিয়ে বিজ্ঞানে মনোনিবেশ করলে ভালো হয় !”

গিনি : এখন আর সময় নেই মা ! আমাকে এখনি বেরোতে হবে ।

গিনি রুদ্ধশ্বাসে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই , মা খাবার গুলো ঢাকা দিতে দিতে বললেন , ” যেমন বাপ্ তার তেমনি মেয়ে ! তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস গিনি ! তুই না এলে কিন্তু আমি খাব না !”

আলুভাজা দিদার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তেই অচেনা ছেলেটি দরজা খুলে দাড়ালো ।

গিনি : আপনি ?

ছেলেটি : আমি আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িং গেস্ট ।

গিনি বিস্ময় আড়াল করে বলল, ” আপনি আমাকে চিনলেন কী করে   ?”

ছেলেটি : আমি চিনিনি তো ! দরজায় লাগানো যন্ত্র টা  চিনেছে ।

গিনি: যন্ত্র ?

ছেলেটি : হুম ! দিদার কাছের মানুষদের নাম , ছবি , আর কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে আমি এতে ঢুকিয়ে রেখেছি , কালকেই আপনার বাবা দিদাকে বলছিলেন আজকাল দিনকাল বিশেষ ভালো নয় , সাবধানের মার নেই । তাই ভাবলাম দরজা খোলার আগেই যদি দিদাকে আগন্তুকের পরিচয় জানিয়ে দেওয়া যায় ।

গিনি নিজের থতমত ভাবটা কাটিয়ে যন্ত্রটি খুঁটিয়ে দেখে বুঝল এটি দোকান থেকে কেনা নয় , তাই রাখঢাক না করেই প্রশ্ন করল , :

যন্ত্রটি আপনি বানিয়েছেন ?

ছেলেটি : হুম ।

গিনি : আপনি তো ২ দিন হবে এসেছেন , এর মধ্যে প্রয়োজন বুঝে যন্ত্রটা বানিয়ে ফেললেন ? নাকি অন্য কোনো

প্রয়োজনে এটা আগেই বানিয়েছিলেন ?

ছেলেটি : সে হিসেব না হয় আপনি কষে দেখুন , আমার জন্যে অন্য অনেক জরুরি অঙ্ক অপেক্ষায় আছে ।

গিনির উত্তরের আগেই  নিহারী দেবী দরজায় এসে বললেন , ” আমি অনেক ক্ষণ থেকে তোর গলার আওয়াজ শুনছি , এখনও ভিতরে আসছিস না দেখে শেষমেষ বুড়িকে আসতেই হল , আলুভাজা ভাগ হওয়ার ভয়ে  আর কত ঝগড়া করবি ? ভিতরে আয় তাড়াতাড়ি ।”

গিনি : আহ দিদা ! তুমি বুঝতে পারছ না , এরকম অচেনা অজানা কাউকে হুট করে পেয়িং গেস্ট রাখা আজকাল একদম উচিত নয়,কাগজে তো প্রায়ই  দেখা যায় পুলিশের চোখ এড়াতে সন্ত্রাসবাদীরা ছদ্মবেশে নিরিবিলি জায়গায় গা ঢাকা দেয়।

নিহারী দেবী ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত ভাবে বললেন , “এই পাগলী মেয়েটার কথা শুনে তুমি কিছু মনে কোরো না বাবা !”

ছেলেটি কোনো জবাব না দিয়ে মৃদু  হাসল ।

নিহারী দেবী এবার গিনির দিকে তাকিয়ে রাগের ভান করে বললেন , ” এত লেখা পড়া করে একি ব্যবহার গিনি ! এমন বুঝি কাউকে বলতে আছে ? ও সন্ত্রাসবাদী হতে যাবে কেন ? ও তোর মতই ভীষণ মেধাবী ছাত্র, মনস্তত্ব ও আরো কিছু জটিল বিষয়ে রিসার্চ করছে,সেই কাজেই কিছুদিন এখানে এসেছে ।”

গিনি : তুমি কী ভাবছ সন্ত্রাস বাদীরা মেধাবী হয় না ? ওদের মত মেধা বড় বড় বৈজ্ঞানিকেরও নেই । তাছাড়া তুমি তো কোথাও বিজ্ঞাপন দাওনি , ও কোথা থেকে জানল যে তুমি পেয়িং গেস্ট রাখতে চাও ? সন্দেহের আরো কারণ আছে ,  দুদিনের মধ্যে দরজায় লাগানো যন্ত্রটা বানানো কিছুতেই সম্ভব নয় , তাছাড়া তোমার মত নির্ঝ ঞ্ঝাট  মানুষের বাড়ির দরজায় ক্যামেরা লাগানোর কী প্রয়োজন !

নিহারী দেবী : আহ গিনি ! বিজ্ঞাপন না দিলেও আমি পাড়ায় অনেক কে বলেছিলাম পেয়িং গেস্টের কথা , সুনীতার কাকুর সুত্রে ও আমার

বাড়ি এসেছে , এভাবে ভাবতে নেই মাগো ! যাই হোক ঝগড়ার বহর তো দেখলাম , ওর সাথে পরিচয় করেছিস কী ?

গিনি অস্তত্বি ভাবটা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে না পেরে অসম্মতি সূচক মাথা নাড়ল ।

নিহারী দেবী ভিতরে যাবার আগে অমায়িক হেসে দরজার পাশে চুপ করে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললেন , “এই পাগল মেয়ের সন্দেহ দূর করার দায়ভার তোমার উপরে রইল  সময় ।

গিনি : সময় ?

ছেলেটি এবার মৃদু হেসে গিনির দিকে রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল , “হুম ! আমার নাম ।”

উপরের ঘরে ছেলেটির বইয়ের সংগ্রহ থেকে গিনি মনে মনে প্রশংসা না করে পারল না , কিন্তু  দিদার এই নতুন অতিথির হঠাৎ আগমন যুগপৎ  র  ইচ্ছা বোতামের সাফল্য নাকি নিতান্তই কাকতালীয়  ঘটনা তা না জানা অব্দি সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না ।

সে হঠাৎ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো  : আপনি এখানে কেন এসেছেন ?

সময় : ওই যে তখন দিদা বলল , রিসার্চের প্রয়োজনে ।

গিনি  উদ্বেগ ভরা গলায়  আবার প্রশ্ন করল : শুধু কি তাই ?

ছেলেটির নিষ্পাপ মুখে আবার রহস্যময় হাসি ফুটল  : না ।

গিনির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো  : তাহলে ?

সময় : সময়ের উদ্দেশ্য জানতে হলে যে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয় গিনি !

গিনি ম্লান দৃষ্টি আড়াল করে পিছনে ঘুরে প্রশ্ন করল : তা কতদিন থাকবেন ?

সময় : অনন্ত কাল ..

গিনি চমকে তাকাতেই ছেলেটি হেসে বলল : অনন্ত কাল নয় ! সময় হলেই চলে যাব ।

গিনি : পরিচয়ের জন্য শুধু নাম যথেষ্ঠ নয় ,আপনি কোথা থেকে এসেছেন ? আপনার পদবী কী ?

সময় : আমার জন্ম পরিচয় নিজেরই অজানা , জটিল হিসেব মেলাতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরি ফিরি , এখানে আসার আগে নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা ছিল না । আপনার সন্দেহ স্বাভাবিক , সন্ত্রান্সবাদী যে নই তার প্রমাণও আপাতত নেই, কিন্তু বিশ্বাস করুন দিদার সাথে কাটানো এই অল্প মুহুর্তের মায়া কাল যুগের অতীত সমান ভারী মনে হচ্ছে , একা থাকার পুরনো অভ্যেস ফিরে পেতে আর কিছুতেই মন চাইছে না ।

গিনি : দিদা এরকমই । খুব অল্প সময়ে পর কে আপন করে নেয় , সে জন্যই তো ভয় ..

সময় : ভয় পাবেন না । আলুভাজা আমি খাই না ।

গিনি হাসলো না , চিন্তায় ডুবে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল ।

হঠাৎ টর্চের আলো চোখে পড়ায় চমকে তাকাতে ছেলেটি বলল : দেখুন দেওয়ালে আপনার ছায়া পড়েছে ।

গিনি : এ তে দেখবার কি আছে ? আলো জ্বললে ছায়া তো পড়বেই ।

সময় : হুম তা ঠিক , কিন্তু আমি আপনার নয় ,পাশে রাখা ফুলদানি টার ছায়া ফেলতে চেয়েছিলাম । তার মানে আলো যার যার গায়ে পড়বে ছায়াও তারই পড়বে , এখানে আলোর ইচ্ছা শুধু একটাই , অন্ধকার দূর করা ,কিন্তু সেটার পরিধি নির্দির্ষ্ট করার দায়িত্ব যে তার নয় । তবে দীর্ঘ অন্ধকারের একাকিত্ব দূরের জন্য আলোর প্রথম ঝলক অস্বস্তি র কারণ তো বটেই ।

গিনির মনে পড়ে গেল  যুগপৎ র আলোয়  তার চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার কথা , সে ভীষণ ভয় পেয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল ,”আপনি কী বলতে চাইছেন ?”

ছেলেটি আবার সেই রহস্যময় হাসি মেখে বলল ,”বলছিলাম দিদার মত মানুষের স্নেহের পরিধি মাপা অসম্ভব , আপনার পাশে রাখা ফুলদানি টার মত অল্প স্বাদ না হয় আমিও পেলাম , এতে আপনার ভাগ যে কম পড়বে না সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন ।

বাড়ি ফিরে চিন্তার মধ্যেও এক অদ্ভূত স্বস্তিতে গিনির মন ভরে গেল , যুগপৎ র ফর্মুলা তাহলে সফল , দিদা আর একা নেই , নতুন ছেলেটি যতই অদ্ভূত হোক এই অল্প সময়েই দিদাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছে । হঠাৎ  মায়ের ডাকে চমক ভেঙ্গে পাশের ঘরে যেতেই যে অপ্রত্যাশিত খুশিতে সে লাফিয়ে উঠল , “জ্যাঠামনি তুমি!”  অমায়িক ভদ্রলোক দুহাতে গিনিকে জড়িয়ে বললেন , “হুম রে  ! আমিই তো ! তোদের জন্য মন কেমন করছিল ,তাই চলে এলাম !”

গিনি : এবার কিন্তু না বলে চলে গেলে আর কোনোদিনও কথা বলবো না ।

জ্যাঠামনি : বললে যে তুই যেতে দিস না মাগো ।

গিনি : “দেবই না তো । জেম্মা থাকতে তুমি তো এমন ….”

গিনির অসম্পূর্ন কথার উত্তরে জ্যাঠামনি মৃদু হেসে বলল , “ধ্যুর পাগল মেয়ে ! তোর জেম্মা থাকবে না কেন? সে না থাকলে তোর জ্যাঠামনি থাকতো বুঝি ? চোখের দেখা একরকম বিলাসিতা বলতে পারিস , সময়ের সাথে সে বদভ্যাস কেটে গেলেই আর কোনো অসুবিধা হয় না । ”

নিরুত্তর গিনি চিন্তার গভীরে আরো একবার হারিয়ে গেল । কয়েক বছর আগে জেম্মার হঠাৎ মৃত্যুতে জ্যাঠামনিকেও কখন যেন হারিয়ে ফেলেছে সে  । চাকরীতে সময়ের আগে অবসর নিয়ে বছরের বেশীর ভাগ সময় টাই জানা অজানা জায়গায় ঘুরে কাটায় জ্যাঠামনি , জরুরি দরকারেও যোগাযোগের কোনো মাধ্যম বা উপায় কোনোটাই নেই , অগত্যা এভাবে জ্যাঠামনির হঠাৎ ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গোনাই তাদের শেষ কবছরের অভ্যাস। গিনির মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল, একাকিত্বের এই ভীষণ দমবন্ধ মায়াজাল থেকে বার করে যুগপৎ নিশ্চই পারবে ফিরিয়ে দিতে তার জ্যাঠামনিকে পুরোনো জীবন , পালিয়ে বেড়ানোর প্রয়োজন ফুরালেই জ্যাঠামনির ভিতরের প্রাণখোলা আত্মভোলা মানুষটার হাসির আওয়াজে এ বাড়ির দেওয়াল গুলো আরো একবার ঝনঝন করে উঠবে ।

সারাদিন জ্যাঠামনির সাথে অনেক গল্প করেও প্রতিবারের মতো এবারেও গিনির স্বাদ মেটেনি , তবুও আজ তার কোনো তাড়া নেই ,মনে ভয় নেই , জ্যাঠামনি তো এখানেই থাকবে, সবসময় । আর কখনো গিনিকে জ্যাঠামনির ফিরে আসার অপেক্ষা করতে হবে না । জ্যাঠামনির ভিতরে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো মানুষটার সাথে  ফিরে আসবে গিনির ছোটবেলা । প্রহর শেষের আগেই  তা নিশ্চিত করবে গিনি , সব কিছু ঠিক আগের মতো করে দেবে ফর্মুলার জাদু কাঠিতে । ভাবনা মতই সকলে ঘুমিয়ে পড়লে গিনি জ্যাঠামনির ঘরে  যন্ত্রটা নিয়ে এসে তার ইচ্ছা বোতাম টা টিপতেই জ্যাঠামনির সারা শরীর যন্ত্রের  বিচ্ছুরিত আলোতে ভরে গেল, তার সাথে  অসীম পূর্ণতার আনন্দে আলোড়িত হল গিনির মন ।লজেন্স কে জড়িয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে ভিতরের ভীষণ আনন্দে তার চোখ জলে ভরে উঠলো  ,আরো একবার তার  আবিষ্কার  তাকে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক   নতুন করে ফিরিয়ে দেবে।

সকালে মায়ের  ডাকে  ঘুম  ভাঙলো গিনির । গিনি হাসিমুখে মা কে জড়িয়ে ধরে বললো , “আমি আজ খুব খুশী মা । জ্যাঠামনি আর কখনো আমাদের ছেড়ে যাবে না দেখো । জ্যাঠামনি কে আর কখনো একা থাকতে হবে না ।”

নিরুত্তর মায়ের চোখের দিকে তাকাতেই গিনি চমকে উঠলো , “মা ! তুমি কাঁদছো ? তবে কী !” গিনি দৌড়ে জ্যাঠামনির ঘরে যেতেই  তার মনে হল খালি ঘরটার  দেওয়াল গুলো থেকে যেন তার বিশ্রী ভাবে হেরে যাওয়ার ছবি প্রতিফলিত হচ্ছে । অসম্ভব কে সম্ভব করার স্বপ্ন তাকে এতটাই বিভোর করে দিয়েছিল ব্যর্থতার বিদ্রুপ চাহনী আজ তার অসহ্য মনে হচ্ছে । মুহূর্তে তার সমস্ত চিন্তাশক্তিকে ভর্ৎসনা করে নিজের ওপর প্রচন্ড রাগে গিনি যন্ত্র টা ব্যাগে নিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল । বাড়ির সামনের লেকের ধারে পৌঁছে যন্ত্রটা জলে ফেলতে যেতেই একটি অচেনা হাত তার থেকে যন্ত্র টা কেড়ে নিয়ে নিল , বিস্ময়ে তাকাতেই আগন্তুক টিকে চিনতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হল না ।

গিনি :  আপনি ?

ছেলেটি : কিছু  অঙ্ক মিলছিল না , ভাবলাম লেকের ধারের  স্নিগ্ধ হাওয়ায় মাথাটা খুলে যেতে পারে  ,তাই এদিকে এসেছিলাম , হঠাৎ আপনাকে দেখে..

গিনি : বুঝলাম ! কিন্তু আমি এখন একটু একা থাকতে চাই ।

ছেলেটি : তা তো আর হয় না ।

গিনি: মানে ?

ছেলেটি : বলছিলাম যন্ত্রটা ফেলে দিচ্ছেন  যখন এটা নিশ্চই আর আপনার দরকার নেই , তাই এটা আমার কাছে থাকলে  আপনার কোনো আপত্তি থাকার কথা নয় ।

গিনি : ও যন্ত্র কোনো কাজের নয় ।

ছেলেটি :আপনার না হতে পারে , আমার  কাজের।

গিনি : আহ ! বললাম তো আমার নয় , আপনার নয় ,কারোর কাজের নয়  ওটা ।

ছেলেটি : তাহলে সবটাই কাকতালীয় বলছেন ?

গিনি রাগে অস্থির হয়ে বললো : তাছাড়া আবার কী ? যদি সত্যি ই  এতে একাকিত্ব দূরের ক্ষমতা থাকতো তাহলে কি আমার জ্যাঠামনিকে মুক্তি দিতে পারতো না  ? ভিতরের যন্ত্রনা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে যে মানুষটা পালিয়ে বেড়াচ্ছে , ফর্মুলার জাদুকাঠিতে পারতো না তাকে কাছের মানুষগুলোর কাছে ফিরিয়ে দিতে ?

ছেলেটি : যুগপৎ শক্তির অধিকারী ঠিকই কিন্তু তার শক্তি একাকিত্ব দূর করাতেই সীমিত ,মৃত ব্যক্তিকে জীবন দান তার ক্ষমতার  উর্ধ্বে । একাকিত্ব দূরের চেষ্টায় যুগপৎ সফল হয়নি কারণ আপনার জ্যাঠামনি একা নন , উনি আজও নিজেকে ওনার স্ত্রীর থেকে আলাদা মনে করেন না । স্ত্রীর মৃত্যু শুধু ওনার  বেঁচে থাকার গণ্ডি ভাঙতে পেরেছে , একা করতে পারেনি । দেহের মৃত্যু মেনে নিলেও ভালোবাসার মৃত্যু উনি এক মুহূর্তের জন্যেও মানেন নি গিনি ! সেই ভালোবাসার মোড়কে তার যাযাবর জীবন সমাজের অযাচিত হস্তক্ষেপে পাচ্ছে অস্বস্তি বোধ করে , তাই তার এই পালিয়ে বেড়ানো ।

গিনি দুচোখ ঢেকে অসহায় কান্নায় গুমড়ে উঠলো ।

ছেলেটি তার কাছে এসে বলল , “বৈজ্ঞানিকের চোখের জলে ফর্মুলা ধুয়ে গেলে আমাকেও যে ফিরে যেতে হবে গিনি !”

দুর্বলতা কাটিয়ে  চিন্তাশক্তি ফিরে আসতেই গিনি চমকে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অস্থির ভাবে প্রশ্ন করলো , “আপনি আমার ব্যাপারে এতো কিছু জানলেন কী করে ?  আপনি ..আপনি  কে ?

ছেলেটি  চেনা রহস্যময় হাসি হেসে বলল : আমি ? আমি সময় । আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িং গেস্ট । দিদার থেকেই শুনেছি হবে, নাহলে আর কী করে জানবো বলুন !

গিনি : কিন্তু আলুভাজা দিদা তো এতকিছু …

গিনিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ছেলেটি কানের কাছে এসে বললো , ” করুন না , যা আপনি সবসময় করেন , অপেক্ষা ! সময়ের অপেক্ষা !”

বিস্মিত গিনি নিজের সবটুকু  দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত প্রশ্ন করলো , ” সময় ? মানে আপনার  অপেক্ষা ?”

চলে যাওয়ার আগে ছেলেটি পিছন ঘুরে আরো একবার রহস্যময় হাসি হেসে বললো , “করবেন না  ? তাহলে না হয়  যুগপৎ র  ফর্মুলার কার্যকারিতা  প্রমাণের অপেক্ষা করুন , লেকের জলে পড়া থেকে বাঁচানোর পর এটুকু দায়িত্ব তো তার উপর আমার থেকেই যায় । ”

 

নিন্দুক

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

কাঠগড়া তে মুখের বদল , অপরাধের নতুন নালিশ ,
বিচারকের আসনে তুই ,তেমনি যেমন আগেও  ছিলিস,
পরের দোষে ভাঙিস  কলম, কালির দাগে  ঢাকিস রক্ত,
জীবন বইয়ের শেষের পাতায় অপেক্ষাতে প্রায়শ্চিত্ত!

 

ভরা সভায় নাম কুড়াতে , দিলি  যাকে “বেশ্যা ” আখ্যা ,
পরিস্থিতির স্বীকার নারী , চেয়েছিল তোর বিচার ভিক্ষা !
কর্তব্যের পুতুল সেজে , অপমানে মিশিয়ে  ঘৃনা ,
জুয়ার দানে বিকিয়ে দিতে বেশ্যা বলেই পারলি কিনা !

 

তোর  হিসেবে  আগুন নাকি করবে  দেহের শুদ্ধি বিচার ,
নিবার্সনই  ভাগ্যে যখন  , শুদ্ধিতে কি  লাভ হবে তার ?
আগুন যদি সত্যি পারে , পবিত্রতা ফিরিয়ে দিতে,
তোর কদাকার মনটাকে তো পারিস খানিক ঝলসে নিতে!

 

স্ময়ং ভুলে ভালোবেসে মেয়েটি হল   কলঙ্কিনী ,
হারিয়েছে সব কিন্তু তবু তোর কাছে সে  হাত পাতেনি,
চরিত্রে তার ঢালিস কালি  ,উপাখ্যানের  মন্দ ভালো ,
ঠিক বেঠিকের হিসাব খানি তোকেই বা কে কষতে দিল ?

 

যার তীক্ষ্ণ কলম করে  দিকভ্রান্ত ধর্মে আঘাত ,
তোর বানানো শহরে সে ,লুকিয়ে কাটায় সারাটা  রাত ,
অধিকারের কোন হিসেবে,  পেয়েছিলি বর স্পর্ধা মাপার ?
দোষ যদি সে করেও থাকে ,তুই কে তাকে শাস্তি দেবার !

 

হলই  বা সে অহংকারী , উদ্ধত মন ছন্নছাড়া ,
নিজের শাসন নিজেই করে  , নিয়ম মানে নিজের গড়া ,
তোর কী তাতে ঘটল ব্যাঘাত ? নিন্দা ভরা আঙ্গুল তুলিস ,
গন্ডি যদি এতই প্রিয় , নিজেও সেটার মধ্যে থাকিস    !

 

সত্যি বোঝা শক্ত অনেক , বৃথাই শুধু চেষ্টা করিস ,
সহজ হবে হিসেব যদি  মিথ্যাটাকে বুঝতে পারিস ,
মনের ভিতর শিকড় গেড়ে  করছে যা তোর দৃষ্টি  কালো ,
উপড়ে সেটা দ্যাখ না যদি পাস খুঁজে তুই একটু  আলো !

বহুরুপী মনখারাপ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

মন খারাপের  গন্ধ কেমন অজানা এক আবেশ আনে ,
বারণ ভুলে মন ভেসে যায়  ভীষণ চেনা স্মৃতির টানে ।
বাজের আওয়াজ চমক ভাঙ্গায় , আকাশ জুড়ে মেঘের কালো ,
মরচে ধরা প্রশ্ন মনে , “সব টা  তবে মিথ্যে ছিল  ?”
চোখের জলে বৃষ্টি মিশে , ঠোটের কোণে  ফোটায় হাসি ,
খাতার পাতায় লুকিয়ে লেখা নামের পাশে “ভালোবাসি।

 

মন খারাপের নাম বুঝি হয় ? জানিস কি তুই তার ঠিকানা ?
অনুরোধে র  আর্জি যাবে ,করতে  তাকে আসতে মানা ।
চালের ঘটি উল্টে দিয়ে ,ঢুকলো মেয়ে নতুন ঘরে ,
পুরনো সেই ঘরের মায়া মনখারাপের আঁচল ধরে ,
ঘুমিয়ে থাকা স্বামীর পাশে ,স্মৃতির ভিড়ে রাত্রি যাপন ,
মনখারাপের চাদর নিয়ে ,পাশ ফিরে শোয় নতুন জীবন ।

 

নতুন শহর  ,অচেনা মুখ ,ছড়িয়ে থাকা বইয়ের সারি ,
যখন তখন মারছে  উঁকি ,মনখারাপের বলিহারি ,
তেল মাখানো খাবার যখন, হচ্ছে হজম নির্বিবাদে ,
মায়ের রাঁধা রান্না জাগায়  স্মৃতির আবেশ মুখের স্বাদে ।
হাতের কড়ে গুনতি দিনের , আগাম কবে আসবে ছুটি ,
মনখারাপের রাস্তা ভুলে , মায়ের কোলে লুটোপুটি ।

 

দিন টা তবু যেমন তেমন , রাত্রে ঘড়ির নেইকো তাড়া,
নিস্পলকে  কাটাই প্রহর , শ্বাসের মেয়াদ  তোমায় ছাড়া,
ছাই করলো যেদিন আগুন  , চিতায় শোয়া ভালবাসা ,
মনখারাপে বন্দি আমি , ফুরিয়ে গ্যাছে বাঁচার আশা,
আর কটা দিন ! কটাই বা রাত ! তুমিও আছো অপেক্ষাতে,
শুধুই এখন মৃত্যু পারে,জীবন আমার ফিরিয়ে দিতে !

 

মনখারাপের রঙ হয় কি ? লাল বা সবুজ চিহ্ন কোনো ?
রঙীন হতে চাইনা আমি , সাদাই প্রিয় আমার জেনো ,
জানলা খোলা ,নজর কাড়ে , পথের ধারের ক্ষুধার্ত মুখ ,
অসহায়ের হাতছানিতে বাড়তে থাকে মনের অসুখ ,
গুলির আওয়াজ,জটিল হিসেব,কাঙ্খিত জিত,অপ্রিয় হার ,
আমার  কিছুই হয়না বদল ,মনখারাপ ই ভরসা আমার !

 

অলস মনের বিলাসিতা  , খাঁচা ভাঙার ব্যর্থ উপায় ,
মনই তখন মনখারাপের কারণ খানি আমায় শুধায় ,
স্মৃতির মোড়ক ফেলে আসা , চেনা পথে ফিরতে চাওয়া ,
সম্ভব আর অসম্ভবের মধ্যেখানে হারিয়ে যাওয়া ,
“কী হয়েছে ? কী চাই তোর ? সন্ধান দে খুশির চাবির ”
বালিশ খানি জাপটে ধরে , মৌন থাকে ক্লান্ত শরীর !

সারথী

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

অমলেন্দুবাবু  চোখ খুলতেই তার একমাত্র নাতি সৈকত কে পায়ের কাছে বসে থাকতে দেখে বিস্ময়ে বললেন : একি দাদুভাই ! তুমি কখন এলে ?

সৈকত মৃদু হেসে বলল : তোমার এই ঘরের  প্রতিটা কোণায় জমে থাকা ছোট বেলার স্মৃতি গুলো এমন ভাবে জাপটে ধরেছিল যে ঘড়ির দিকে তাকাবার অবসর হয়নি |

>আহা ! কিন্তু আমাকে কেউ ডাকেনি  তো ! দুপুরে ঘুমের অভ্যেস টা দাদু নাতির কতটা সময় মিছিমিছি নষ্ট করে দিল !

>তুমি যে বলেছিলে মহাভারতের গল্পে অর্জুন শ্রী কৃষ্ণের পায়ের কাছে বসে তার ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষা করেছিল কারণ সে জানতো  ধৈর্য্যের পরীক্ষায় পাশ করলে নষ্ট সময়ও জীবনের হিসেব বদলে দিতে পারে।

>হ্যাঁ সে না হয় বলেছিলাম ! কিন্তু এই বুড়োকে সারথি করে কোন যুদ্ধ জয় করতে চাও তুমি দাদুভাই !

>তুমি তো জানো ,আমি যুদ্ধ থেকে বরাবর পালিয়ে এসেছি , আমার যে হারতে ভয় করে !

>হারা কি ওত সহজ দাদুভাই ? কত মানুষ  যে চেষ্টা করেও হারতে পারে না ।

>কি যে বল তুমি দাদান ! কেউ বুঝি সেচ্ছায় হারতে চায় ?

> চায় বৈকি ! নিঃসঙ্গতার চোখের জলে রাতের বালিশ যখন ভিজে যায় , অতি বড় জয়ীর কানে মহাকাল তখন ফিস ফিস করে বলেন , “এর থেকে তো হেরে যাওয়াই ভালো ছিল , অন্তত দুদন্ড শান্তির ঘুম তো জুটত ভালবাসার মানুষ গুলোর পাশে ” , সেই মুহুর্তের দুর্বলতায় জয়ের মেডেল গুলো ছুঁড়ে ফেলে হারের খোঁজে পা বাড়াতেই  , আরো একবার জেতার ইচ্ছাটা নাগপাশের মত মন কে বেঁধে ফেলে ! সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে  যত শক্ত হয় সে  বাঁধন  , একের পর এক পাশার দানে বিকোতে থাকে সম্পত্তি ও সম্পর্ক !

> তুমি বুঝি হারতে ভয় পাও না ?

> না দাদুভাই ! এখন আর পাই না ,তবে তোমার বয়সে পেতাম বৈকি , আর সেই ভয় থেকে বাঁচতেই  বার বার জেতার লড়াইয়ে সামিল হতাম , আশ্চর্যের বিষয় হল ছোট বড় কোনো জয়ই  আমার সে ভয়কে কখনো দূর করতে পারেনি উপরন্তু শত গুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল।হঠাৎই  একদিন আমার মায়া ত্যাগ করে  বিনা বাক্যব্যয়ে সে চিরতরে নিখোঁজ হল ।

> এতদিনের জাঁকিয়ে ধরা ভয় হঠাৎ একদিন দূর হয়ে গেল ! কবে ? ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন ? তোমার কি মনে আছে দাদান ?

> বাহ্ ! মনে থাকবে না ? সেদিনই তো আমি প্রথমবার বিশ্রী ভাবে হেরে গিয়েছিলাম । ফকিরের মনে সুখের পরিমাপের আন্দাজ পেয়ে সেদিন চমকে উঠেছিলাম আমি ।

>তোমার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে  হারা  ঠিক জেতার মতই কঠিন ?

>মোটেই  না , আরো বেশী ! সর্বকালের জয়ীও অভ্যাসের ব্যতিক্রমে হেরে গেলে , প্রত্যাশা অপূর্ন  রাখার অভিযোগে কৈফিয়তের কাঠগড়া তার আত্মসম্মান কে  বিদ্রুপ মাখা বিশেষণে বার বার আঘাত করে! কজনই বা সে আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা রাখে ! আপাতদৃষ্টিতে দুর্বল মনের আত্ম হত্যার কারণ ক্ষনিকের হার মনে হলেও আসলে তারপরের পাওয়া চিরস্থায়ী অপমান !

>আমি তো ভেবেছিলাম চাইলেই জেতা যায় না কিন্তু হার অন্তত  সহজলভ্য !

>তোমার ভাবনা সত্যি হলে আমার মত কিছু মানুষের আনন্দের পরিসীমা আকাশের প্রস্থ দিয়েও মাপা যেত না ! এই যে  পঙ্গু শরীরটা  রোজ মৃত্যুর কাছে হারতে চায় কিন্তু সেই হার লাভে তপস্যার হিসেবের খাতা সময় বোধহয় হারিয়েই ফেলেছে !

>উফ ! তুমি কি আমাদের একটুও ভালোবাসো না দাদান ?

>বোকা ছেলের কথা শোনো দেখি ! ভালো না বাসলে  , ওই অখাদ্য ওষুধ গুলো আমাকে গেলানোর সাধ্যি বুঝি ওই সুরেন ডাক্তারের ছিল ?

>এরকম আর বোলো না দাদান ! তুমি ছাড়া এই অচেনা ভিড়ে আমি যে হারিয়ে যাবো ! আমি এখনো ঠিক বেঠিকের গোলক ধাঁধায় আটকে পড়ি ,বুঝতে পারিনা কতকিছু ,  নিরন্তর চেষ্টা করেও ভুলতে পারি না কিছু স্মৃতি , অসহায় মন নিদ্রাহীন রাতে ছটফট করে!

>আহা ! ছোটবেলায় কুমীর ডাঙা খেলায় ,গুনতির হারে কুমীর হওয়ার দুর্ভাগ্য , সেই বিকেলে কষ্ট দিলেও আজ  আর দেয় কি !

> কিন্তু দাদান সে  বিকেল ছিল নিষ্পাপ , জীবনের জটিল হিসেব তখনও শুরু হয়নি ! রাত ভোর হতেই যে হারের দুঃখ মন থেকে মুছে যায় ,  তার সাথে আজকের জটিলতার কি তুলনা চলে !

> দূরত্ব বাড়লে দৃষ্টির গণ্ডিতে সর্বোচ্চ পাহাড়ও  ক্রমশ ক্ষুদ্র  হতে থাকে । কি জানতো দাদুভাই! সময়ের  ডাস্টার নিয়ম মত ব্ল্যাকবোর্ডের সকল হিসেবই  মুছে দেয় , তার কাছে জটিল সরলের কোনো ভেদাভেদ নেই !

> সবকিছু মুছে দেয় ? কিছুই থাকে না?

> থাকে নাই তো ! একমুঠো  ছাই  ছাড়া কিচ্ছু থাকে  না , সেটুকুও মা গঙ্গা এক ঢোকে গিলে ফেলে  !

> তাহলে চারিদিকে যে এত লড়াই , উদ্বেগ ,টান টান উত্তেজনা !

> ঘড়ির কাঁটা ঘোরার অপেক্ষা লড়াই করেও করা চলে অথবা আপোষে , তাতে অন্যায় তো কিছু নেই দাদুভাই ! কিন্তু সেই ক্ষনিক  জিত হারের হিসেব কে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা দেখে যদি মহাকাল হাসেন , তাকেও কি  খুব বেশী দোষ দেওয়া চলে ?

>জীবন মানে কি তবে শুধুই মৃত্যুর অপেক্ষা দাদান ?

> তা কেন হবে দাদুভাই !  জীবন মানে শুধুই  জীবন ! সেখানে জেতার লড়াই করাই যেতে পারে কিন্তু হারলেও বিশেষ ক্ষতি নেই , শুধু এই উপলব্ধি টুকুই যথেষ্ঠ যে  এতখানি পথ যদি বিনা জয়লাভে কেটে যেতে পারে বাকিটা আটকানো কোন হারের সাধ্যি!

>সেই হারের ফাঁকে লুকিয়ে ফেলা চোখের জলের মূল্য কেউ চুকিয়ে দিলে হিসেব টা অনেক সহজ হয়ে যেত, তাই না দাদান ?

> নিজের চোখের জলের মূল্য অতি বড় বিধাতার কাছেও আদায় করতে চেও না দাদুভাই ! এর চেয়ে বড় মূর্খামি যে আর হয় না ।সব হিসেবও সহজ করতে নেই নইলে গণিতের আনন্দে ঘাটতি হয় যে ! ডাক্তারের নির্দেশে চিনি ছাড়া কালো চা খাওয়ার বেস্বাদ বিকেল গুলোয় , মাটির ভাড়ে চা খাওয়ার আনন্দের স্মৃতিই শুধু মুখে হাসি আনতে পারে । ফুটো ভাড়ের চা তে হাত পুড়ে যাওয়ার কষ্ট নিদারুণ ছিল বটে কিন্তু তৃপ্তির চুমুকের কাছে সে জ্বালা সেচ্ছায় হার মেনেছে বারবার ! তাই বলি আর দেরী না করে উঠে পড় রথে ,সময় ফুরোনোর আগে জীবনটাকে একটু চেখে দ্যাখো দেখি দাদুভাই ! যুদ্ধে জিত হারের মাশুল না হয় দিলেই কিছু , শেষমেষ আক্ষেপের মাশুল গুণতে না হলেই জীবনের সাথে মৃত্যুও স্বার্থক ।

Act of God’

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

> ‘Act of God’ ! তার মানে কাজটা আপনি করেছেন ?

> না !

>মানে ? তাহলে কে করেছে ?

>আহা ! তারই তো চুল চেরা বিশ্লেষণ চলছে । দেখছো না ,দফায় দফায় বিচার সভা বসছে ! ইতিহাসের পাতা উল্টে প্রমাণ খোঁজা চলছে! টান টান উত্তেজনার মুহূর্ত  ! জটিলতার ঘোরপ্যাচে সৃষ্টিকর্তার চোখ পর্যন্ত ধাঁধিয়ে যাচ্ছে । ‘নিরীহ’ প্রমাণের দৌড়ে সামিল হওয়ার আগে পাপের ঘড়া  লোকানোর বৃথা চেষ্টা ! ওত বড় জিনিস টা ওই টুকু পৃথিবীতে বুঝি লোকানো যায় ? তাছাড়া কাদের থেকেই বা লুকোতে চায় ? অন্ধের কি বা দিন কি বা রাত !

>আপনি এখন এইসব নোংরা রাজনীতির কলাকৌশলে মশগুল ? আর ওদিকে তো ওরা এখনো ধ্বংস স্তূপের নীচে !

>ওরা কারা ?

>যারা প্রকৃত অর্থে  ‘নিরীহ’  ! ‘পাঁচ লাখ’ অনেক বড় মূল্য হলেও যারা  সে দামে নিজেদের অতি সাধারণ জীবন টাকে বেঁচে দিতে চায় না তাই এত কিছুর পরও নিজের সবটুকু  দিয়ে চেষ্টা করছে মৃত্যুর কবল থেকে বেরিয়ে আসতে ।

>হুম ! সবাইকে সম্ভব না হলেও কিছু মানুষকে আমি বাঁচিয়েছি বৈকি ।

>এভাবে মিথ্যে বলা আপনাকে মানায় কি ! অক্লান্ত পরিশ্রমে মানুষই মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে,আপনি শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ দর্শী ছিলেন !

>’প্রাণ ‘ তো বলিনি ,তবে দলাদলি  -মারামারি থেকে বাঁচিয়েছি , বিকৃত রাজনীতি থেকে বাঁচিয়েছি , অতিসাধারণ হয়ে থাকার অভিশাপ থেকে বাঁচিয়েছি , অহর্নিশ ভাগ্যের হাতে গিনিপিগ হওয়া থেকে বাঁচিয়েছি , রোজের  মৃত্যু ভয় থেকে বাঁচিয়েছি ! ক্ষনিকের দুর্বলতায় নরক থেকে মুক্তি দানের দায়, আমি এবারও চেষ্টা করে এড়াতে পারিনি , স্বজন হারা হৃদয়ের অভিশাপে না হয় আরো একবার জলের গভীরে তলিয়ে যাবে আমার অস্তিত্ব !

মনের মানুষ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

উপহার তো ছেড়েই দিলাম  , ফুলের তোড়াও দিসনি এনে ,

কবির লেখা ধারের সুদে , চাসনি নিতে হৃদয় কিনে ,

জন্মদিনও যেতিস ভুলে , চোখের জলে রাত্রি ভারী ,

তবুও কেন মন  দিয়েছি , আজকে তোকে বলতে পারি ।

ভাবলি বুঝি হারিয়ে যাব , মেলার ওই অল্প ভিড়ে ?

নইলে কেন ধরলি আমার  হাতটা  ওমন শক্ত করে !

যখন হাঁটি  তোর  পাশে  ওই অচেনা সব  রাস্তা ধরে ,

আমায় রাখিস বাদিক ঘেষে , বিপদ থেকে অনেক দূরে !

মন খারাপের দিন গুলোতে, “কি হয়েছে” শুধোস নি তো ,

দৌড়ে গিয়ে আনিস কিনে , আমার প্রিয় খাবার যত ।

“খেলে কাঁদার শক্তি পাবি ” , দুঃসাহসী কথার ছুরি ,

তবুও ফিরে অন্য দিকে , মুখের হাসি আড়াল করি ।

রাগ ভাঙ্গাতে পারিস না তুই , করলে আশা কষ্ট বাড়ে,

সত্যি কথা স্পষ্ট করে , বলতে এমন কজন পারে !

ঝগড়া হলে বন্ধ কথা ,নিজের মত একলা থাকিস ,

খেয়েছি কিনা , ঘুমোই  কখন , আড়াল থেকে  খেয়াল রাখিস।

মন্দিরের বাইরে দাড়াস , আজও  আমার অপেক্ষাতে ,

নিজের মনে নাস্তিকতা , দিসনি তাকে আমায় ছুঁতে ।

চিন্তিত মন , নিদ্রা বিহীন , ভয় পেয়েছে সাহসী মেয়ে ,

চোখের জলের অবুঝ ফোঁটা, উঠলি কেঁপে স্পর্শ পেয়ে,

শরীর নাকি যন্ত্র জটিল , খারাপ তো সে হতেই পারে ,

শক্ত গলায় বললি আমায় ,হাড় কাঁপানো জ্বরের ঘোরে।

আমায় যখন ধরল জ্বরে  , রাত কাটালি প্রহর গুণে ,

কপাল জুড়ে  ঘামের কনা ,তখন কেন উঠলো জমে ?

উত্তর টা দিসনি আজও ,জোর করিনি স্বভাব দোষে ,

অধিকারের সহজ হিসেব ,মনে মনেই নিলাম কষে ।

ঘুমের মাঝে অচেতনে , বাহুডোরে আমায় বাঁধিস ,

হয়তো ভেবে মোহর কলস, সাপের  মত আগলে রাখিস !

দেওয়া নেওয়ার জটিল হিসেব , করছে যখন হৃদয় কালো ,

সহজ ভাবে  শিখিয়ে দিলি  , কিভাবে হয় বাসতে ভালো ।

ধন্যবাদ ,

রোমি

দেবনারী

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

>আপনি আমাকে নিশ্চই চিনতে পারছেন ! সেই ছোট্ট বেলা থেকে , শিবরাত্রির দিন গঙ্গায় স্নান করে আপনার মাথায় জল ঢেলে  সারাদিনের উপোষ ভেঙ্গে এসেছি আমি ।

>হ্যাঁ চিনি বৈকি ! তুমি তো সেই মেয়ে যে প্রথমে আমাকে স্বামী রূপে চাইলে ,তারপর সমগ্র ব্রম্ভান্ডের সৃষ্টিকর্তাকে অবাক করে দিয়ে নিজের ছেলে রূপেও আমাকেই চেয়ে বসলে।

>যখন বুঝতে পারলাম , কোনো ইচ্ছাই আপনি আমার পূর্ণ করেন নি ,আমিও অবাক হয়েছি বৈকি !

>শোন মেয়ে !পূরণ করার যোগ্য ইচ্ছা না হলে এমন অভিযোগ অর্থহীন !

>অভিযোগ অর্থহীন ? আচার অনুষ্ঠানে কমতি থাকতে পারে,ওদিকে ওতটা নজর দিইনি কারণ ঠাকুমা বলেছিল আপনার ভোলা মন , নিয়ম নিষ্ঠা  ব্রতপালনের জটিল হিসেব আপনি মেলাতে পারেন  না , আপনাকে পাওয়ার ওই একটাই পথ , ‘ভালবাসা’! আরো শুনেছিলাম যদি শেষ ভক্তি বিন্দুউজার করে দিতে পারি , আপনি নাকি আমার জন্য অসাধ্য সাধন করতেও পিছপা হবেন না ! আমার মত সাধারণ মেয়ে আপনার সাধ্যের সীমানা মাপার ধৃষ্টতা কখনই করেনি , বরাবর  আপনার কাছে শুধু তাই  চেয়ে এসেছি  যা দেওয়া সবচেয়ে সহজ , যা দিতে গেলে অধিকার বিচারের প্রয়োজন নেই , যার জন্য কোনো সাধ্য অসাধ্যের জটিল হিসেব কষতে হত  না আপনাকে ।

> তাই তো সবচেয়ে বেশী অবাক করে আমাকে ! আমার মত চালচুলো হীন সন্ন্যাসী কোন উপকারে লাগতো তোমার ! তুমি তো জানতে সংসারের চাওয়া পাওয়া আমার নেশার ঘোর কাটাতে পারে না , আমি সব হারানোয় বিশ্বাসী ,অমোঘ মায়ায় আমায় বাঁধা যায় না ! এমন  ইচ্ছা কী করতে আছে  যা পূরণে সুখের দ্বার তো খোলেই না ,উপরন্তু দুঃখের আয়ু  শত গুণে  বেড়ে যায় !

>গঙ্গার উচ্ছসিত জলরাশি যার ধ্যান ভাঙ্গাতে অক্ষম , আমার কয়েক ফোঁটা চোখের জলের মূল্য সে  কেমন  করে দেবে বলুন ! তাই সুখের আশায় আপনাকে পাশে চাইনি আমি !

>তাহলে ! কী পাওয়ার আশায় , ভিজে কাপড়ে অনন্ত প্রহর অপেক্ষার পর হাত পাততে  বার বার ?

> হাত পেতেছি বৈকি ! তবে পাওয়ার আশায় নয় ,দেবার আশায়!

>দেবার আশায় ? আমাকে ! সমগ্র  বিশ্ব ব্রম্ভান্ডের অধিপতিকে কী  এমন দিতে চাও তুমি !

>বিষ ! বন্য জগতের লোভাতুর দৃষ্টির বিষ , বন্ধ দরজার পিছনে হওয়া নিরন্তর পাপের বিষ , ভালো থাকার অভিনয় করে জমতে থাকা অজস্র মিথ্যের বিষ , পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর লড়াই তে বিশ্রী ভাবে হেরে যাওয়ার বিষ , অহর্নিশ অন্যায়ের সাথে অপোষ করা অভ্যাসের বিষ , গোটা মেয়েজন্মে সহ্য করা  অপমানের বিষ ! আপনি তো নীলকন্ঠ ! শুনেছি বিষের প্রভাব আপনার দেহের রং বদলেই সীমিত,  নারী হৃদয়ের বিষের  স্তূপ গ্রহনের ক্ষমতা একমাত্র আপনারই  আছে । বিবস্ত্র হওয়ার ভয় দ্রৌপদীকে রাতে ঘুমোতে দেয় না , রান্নাঘরে আগুনের সামনে দাড়িয়ে যা কাঁপে তা সীতার হাত মনে হলেও , আসলে তার অস্তিত্ব !আমরা অশুচি ,মোক্ষ লাভের স্বপ্ন দেখি না , কিন্তু মুক্তি ! তাও কি নেই ভাগ্যে !

ভালবাসার দিন

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

পথের ধারে  লাল বেলুনের মেলা

প্রেমের গন্ধে মনগুলো রঙীন ,

গোলাপের দাম মানুষের চেয়ে বেশী ,

পালন হচ্ছে ভালবাসার দিন !

>”আমিও তোকে দিতে চাই উপহার ,

বল না আমায় ,চাইছে কী তোর মন ,

কথা দিলাম সকল উজাড় করে ,

ভালবাসায় করব সমর্পণ !”

>”মন তো আমার কত কিছুই চায় ,

ইচ্ছাপূরণ মোটেই সহজ নয় ,

তবুও যখন জানতে চাইলি তুই,

লোক খাওয়ালে আজকে কেমন হয় ?”

>”হৃৎপিন্ড তোর ই কথায় চলে ,

করব আমি সকল আয়োজন ,

যাকে যাকে ডাকতে ইচ্ছা করে ,

বিনা দ্বিধায় করিস নিমন্ত্রণ !”

>”যে ছেলেটি ল্যাম্প পোস্টের নীচে ,

জুতো ই পালিশ করে নিয়মিত ,

কিন্তু আজ বেলুন নিয়ে বসে ,

ওই আমার প্রথম নিমন্ত্রিত ।

স্টেশনের যে কচি কাঁচার দল ,

হাতের বাটি ,মোহর রাশি ভরা ,

সব কটাকে আসবি নিয়ে ধরে ,

আমার জন্যে হ না ছেলে ধরা !

মন্দিরের ওই চাতাল জুড়ে শুয়ে,

মানুষ টি যার বাঁশির সুরে যাদু ,

আজকে আমি তাকে বোঝাবই ,

মদের  চেয়েও পায়েস সুস্বাদু ।

ওই মেয়েকে ডাকতে ভুলিস না ,

যে প্রতি রাতে ভেবেছে  বারবার ,

প্রাণের চেয়ে দেহের দাম বেশী ,

ভুল টা  তার ভাঙানো দরকার ।”

> “নিজের উপর গর্ব হত খুব ,

ভালবাসায়  স্বার্থ   আমার কই ,

আজকে প্রথম সত্যি টা বুঝলাম ,

ভালবাসার যোগ্য আমি নই !

যেমনটি চাস তেমনি হবে  আজ  ,

স্বার্থ নয় , একটি মাত্র আশা ,

কখনো ভুলের বিয়োগ মেলাতে,

ক্ষমা করবে আমায় ‘ভালবাসা’ !”

হাসির পাহারা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট
  • আপনার কাছে গণতন্ত্র মানে কী  ?

     সহজ ভাবে হাসতে পারি , বলতে পারি মনের কথা ,

      রাজনীতি বা ধর্ম ভয়েও অটুট যখন  নিজস্বতা ।

  • আপনি কী সহজ ভাবে হাসতে পারেন ?

ধর্ম গুরুর ভীষণ শাষণ , হাসির উপর খবরদারি ,

 কারাগারের পদধ্বনি , পালাও ‘হাসি’ তাড়াতাড়ি !

  • মানে আপনার দেশে ধর্ম গুরু ঠিক করেন যে আপনি কখন হাসবেন , অন্যথা কারাবাসও হতে পারে ! তা ধর্ম গুরু টা কে?

ধর্ম গুরুই মানুষ একা , জটিল হিসেব  ‘মান-অপমান’ ,

 ক্ষণিক ভুলেই ভক্তের দল করিয়ে দেবে রক্তস্নান ।

  •  আপনার দেশে কি আইন কানুন নেই নাকি ?

    আইন আছে লুকিয়ে কোথাও ,ডাকলে গুরু বেরিয়ে আসে ,

    রাতবিরেতে পথের ধারে নির্ভয়া দের  কাপড় হাসে !

  •  আপনি কি সত্যি কোনো গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক ?

->      মিথ্যা তো নয় , সত্যি বটে , সেই প্রথম থেকেই, সবাই জানে ,

           তবে গণতন্ত্রের  উপস্থিতি শুধুই আমার সংবিধানে !

নিরপেক্ষতা

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট
বিস্মিত মুখে ফোনের রিসিভার টা রেখে , জানলার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা  স্ত্রীকে , রমেনের শক্ত চোয়ালের প্রশ্ন  : এটা তুমি কেন করলে মালা?
> বিদ্রুপ মাখা হাসি তে চোখের জল ঢেকে মালা বলল : নার্সিং হোম থেকে ফোন করেছিল বুঝি ?

> শুনতেই তো পেলে , আমার স্ত্রীর গর্ভপাতের খবর দেওয়ার জন্য অচেনা কন্ঠস্বরকে কিভাবে বলিষ্ঠ ভাবে ধন্যবাদ দিলাম !

> খবরের মধ্যে নতুনের গন্ধ না থাকলে আকস্মিকতা যে বিনয়ের মুখোশ কে আড়াল করতে পারবে না ,সেটাই  কি  স্বাভাবিক নয় !আসলে এর আগের দু বার , তুমি তো আমাকে বুঝিয়েই দিয়েছিলে কী করতে হবে ,তাই এবার আর তার অবকাশ দিলাম না , শুধু শুধু দিন বাড়লে তারও কষ্ট আর আমারও ।

> তোমাকে তো বলেছিলাম , আমি নিজে ভ্রুণ পরীক্ষা করেছি !  এবার আর আগের দু বারের ব্যাপার এক নয় , এবার আমাদের ছেলে  হত মালা ! তোমার কি আমার ডাক্তারি বিদ্যার ওপর একেবারেই বিশ্বাস নেই ?
> তোমার বিদ্যের উপর সম্পুর্ন আস্থা আছে আমার , আর ঠিক সেই জন্যেই তোমার মৃত সন্তানদের কাছে আমি আজ নিরপেক্ষ মা !

স্বার্থক মৃত্যু

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

->চলুন এবার , সব তো শেষ , আর কি পিছন ঘুরে দেখছেন ওত ?

->মানে বলছিলাম কিছুই কি সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাবে না ?

->আপনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানে জাগতিক কিছুর দরকার হয় না মশাই  ,আর শুনুন আপনার মত মানুষের মায়া করা সাজে না।

->মানে ঠিক বুঝলাম না ।

-> মানে অতই যদি বেঁচে থাকার সখ , এত পেশা থাকতে যুদ্ধকে বেছে নিলেন কেন ?

->নিয়তি আমাকে যোগ্য মনে করেছে  অজস্র প্রানের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে । শত্রুর বন্দুকের সামনে , মন্দিরের পুতুল রক্ষকের থেকে মুখ ফিরিয়ে  , প্রচন্ড বিশ্বাসে আমার উর্দি ই  জাপটে ধরে অসহায় হাত , সেই সম্মানের সাথে আর যাই হোক আপোষ চলে না।

->আপনার স্ত্রী , ওইটুকু মেয়ে , তাদের কথা একবারও ভাবলেন না ?  যে দেশের মানুষের জন্য আপনি শত্রুর বুলেট গর্বের সাথে হজম করে নিলেন , আপনি কি ভাবছেন  দুদিন বাদে  তারা আপনাকে বা আপনার পরিবারকে মনে রাখবে ?

-> কই  তা ভাবিনি তো , তবে এটুকু জানি মৃত্যুশোকের যন্ত্রণা , কফিন ছোয়ার গর্বের কাছে  একসময় ঠিক ফিকে হয়ে যাবে ।

-> অজস্র কোটি নামের সাথে আপনার নামও অদরকারী স্মৃতির তলানিতে গিয়ে ঠেকবে , কিছুদিন পরই আপনার নাম বেরোনো খবরের  কাগজের ঠোঙায় , নবদম্পতি পার্কে বসে  ছোলা  খেতে খেতে প্রেমালাপ করবে , শহীদের প্রানের থেকে সলমন খানের সিনেমার টিকিটের দাম এখানে বেশী , এই তো আপনার দেশ, তার জন্য খামোখা তেজী প্রাণ টা দিয়ে বসলেন !

-> বলছিলাম শুধু ওই পতাকা টা সাথে নিয়ে গেলে খুব আপত্তি আছে ? দেশের গন্ধের যে খুব মায়া ।

-> দেশ মানে ঠিক কি বলুন তো ! আপনাকে দ্বার রক্ষী নিযুক্ত কারী নাকি আপনার মৃত্যুর অসহায় দর্শক ? আপনার মত শহীদ যদি তার সন্তান হত , প্রতিশোধের আগুনে এতদিনে জগৎ সংসার ছাই করে দিত সে , ঠান্ডা ঘরে  কফিতে চুমুক দিয়ে উষ্ণ শোকপ্রকাশের  ফাঁকে ফাঁকে ,  রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার হিসেব নিকেশ কোনো সন্তান হারা মা কে মানায় কি !

-> এত কঠিন ভাবে তো ভাবিনি কখনো , আমার কাছে দেশ মানে ওই অচেনা ছেলেগুলো ,যাদের সাথে আমার  কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই কিন্তু  আমার মৃত্যুতে তাদের গরম রক্ত , শত্রুর ভবিষ্যৎ কে মুহুর্তে ঝাপসা করে দেয় । দেশ মানে ওই মেয়েটা , এইবারের জন্মদিনের আনন্দ যাকে অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই ছুতে পারেনি , তার চোখের জল শহীদের চিতার আগুন না নিভাতে পারলেও মৃত্যুযন্ত্রনার স্মৃতি একেবারে বিলীন করে দিয়েছে  , অথবা বলতে পারেন আমার কাছে দেশ মানে ওই ভদ্রলোক  যিনি  কাল অব্দি ভাবছিলেন  আত্মহত্যা করবেন  ,  কিন্তু আজ অন্তরাত্মার প্রশ্নের গভীরতায় সে ভাবনা চিরতরে ত্যাগ করলেন !

->  কী প্রশ্ন ?

-> জীবন নিরর্থক হলই বা , তাই বলে কি  মৃত্যুও স্বার্থক হবে না ?

নম্বরের হিসেব

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

নগেন মল্লিক অফিস যাচ্ছিলেন ,হঠাৎ দেখলেন পথের ধারে জটলা। ‘ওখানে কী হয়েছে ভাই?’ ,জটলার ধারে দাড়িয়ে থাকা এক অচেনা মানুষকে তার কৌতুহল পূর্ণ প্রশ্ন । ‘ওই একটা পকেট মার ধরা পড়েছে , তাই লোকে মার ধোর করছে আর কি ! ‘ কথাটা নগেন বাবু র সাধারণ  একঘেয়ে সকালকে একটা নতুন মাত্রা এনে দিল ,তার হাতের তালুটা পুরনো অভ্যাসে  নিসপিস করে উঠলো , প্রচন্ড উৎসাহে ভিড় ঠেলে এগিয়ে, মাটিতে নেতিয়ে পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে হাতের ঘুষি পাকিয়ে মারতে উদ্যোগী হতেই , কে যেন তার কানের কাছে এসে বলল, “নম্বর কাটা যাবে কিন্তু!” নগেন বাবু খানিক  থমকে গেলেন , পিছন থেকে আচমকা ভিড়ের ধাক্কা য় সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার ঘুষি পাকাতেই  সেই একই গলার স্বর, “নম্বর কাটা যাবে কিন্তু  আপনার !” এবার খানিকটা ভয় পেয়েই পিছিয়ে এলেন নগেন মল্লিক, নিজের আশেপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন , সকলের মনোযোগ মাটিতে অবশ হয়ে পড়ে থাকা বছর চব্বিশের ছেলেটার দিকে ,এই অচেনা লোকগুলোর মধ্যে কেউ তার সাথে মশকরা করে কেনই বা সময় নষ্ট করতে যাবে ! তাহলে কি সবটাই তার মনের ভুল ? না! না ! তা কি করে হয় ? পর পর দু বার যে তিনি ওই কথা স্পষ্ট শুনলেন। ঘড়ির কাটার দিকে চোখ পড়ায় , অগত্যা নিজের মনোবাঞ্ছা অপূর্ন রেখে সামনের দিকে পা বাড়াতেই দেখলেন পকেটমার ছেলেটি একটু দূরে  হাসি মুখে  দাড়িয়ে আছে। “যার পকেট থেকে টাকা চুরি গিয়েছিল  সে কি আপনার সাহায্য চেয়েছিল ? পেটের দায়ে অসৎ উপায় বেছে নেওয়া  আধমরা ছেলে টিকে মেরে আত্মতৃপ্তি ছাড়া আর কিছু হত কি ?  মাঝখান থেকে অনেকগুলো নম্বর  কাটা যেত শুধু  শুধু ”  কথাটা বলেই পথ চলতি  মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল ছেলেটি , নগেন মল্লিক নিজের চোখ কে বিশ্বাস না করতে পেরে আবার ঘটনাস্থলে  ফিরে গিয়ে  দেখলেন সেখানে কিছুই বদলায়নি , ছেলেটি আগের মতই মাটিতে নেতিয়ে পড়ে আছে , ভয়ে  তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো ।

অশেষ সাহা ব্যস্ত পায়ে ১৫ নম্বর বাস ধরতে দৌড় তেই  ট্রাফিক সিগনালে দাড়িয়ে থাকা একজন অচেনা বৃদ্ধা আচমকা তার হাত ধরে বললেন ,”আমাকে একটু রাস্তাটা পার করে দেবে বাবা ? বয়সের দোষে চোখে ভালো দেখতে পাই না। “অশেষ সাহা  মাথার ঘাম মুছে  বেশ বিরক্তি ভরা স্বরে  বললেন , “অফিসের দেরী হয়ে গেছে দিদিমা, ক্ষমা করবেন!”

“দশ নম্বর কাটা গেল তোমার ” , কথাটা বলার পরই  এক রহস্যময় দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে  বৃদ্ধা মহিলা অবলীলায় রাস্তা পার হয়ে গেলেন । অবাক চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন অশেষ সাহা ,১৫ নম্বর বাসটা অনেক্ষণ দাড়িয়ে ,নতুন যাত্রী নিয়ে চলে গেল , চিন্তায় মগ্ন অশেষ বাবু র তা চোখেই পড়ল না ।

বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে সামনের চায়ের দোকানে বিস্কুট  হাতে নিয়ে বসলেন বিনয় ভৌমিক । হঠাৎ তার চোখ পড়ল বিস্কুটের দিকে লোভাতুর চোখে তাকিয়ে থাকা রাস্তার ঘেয়ো কুকুর টার দিকে , সমস্ত মন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি তে ভরে গেল তার ,প্রচন্ড রাগে নিজের ছাতা টা উঠিয়ে কুকুরটাকে মারতে যেতেই গরম চায়ের ছ্যাকায় পা জ্বলে পুড়ে গেল তার । “ওরে বাবা রে !” বলে চিৎ কার করে উঠে সামনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকা কিশোর ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললেন ,”তুই বুঝি নতুন কাজে ঢুকেছিস ? নবারণ কে বলে আজকেই তোর ছুটির ব্যবস্থা করছি ,চায়ের কাপ টাও ঠিক করে ধরতে জানিস না ছোকড়া ! খরিদ্দার কে  পুড়িয়ে মেরে নবারনের এতদিনের ব্যবসার  দফারফা করে ছাড়বি তো তুই  !”  ছেলেটি একটু চুপ করে থেকে বলল , “একটু গরম  ছ্যাঁকাই সহ্য করতে পারছেন না ,সেতুকে মারলে যখন অতগুলো নম্বর কাটা যেত তখন কি হত ? কম নম্বরের  শাস্তি  যে কত ভয়ানক হতে পারে  সে বিষয়ে কোনো ধারণা আছে আপনার বিনয়বাবু ? শরীর থাকলেই খিদে পাবে , অবলা জীবও সে নিয়মের ব্যতিক্রম নয় , একটু ভেবে দেখুন তো, সেতু  কি মার খাওয়ার মত কোনো দোষ করেছিল ?” কিশোর ছেলেটির আস্পর্ধা দেখে বিনয়বাবুর রাগের পারদ মাথায় চড়ে গেল , চিৎ কার করে ডেকে উঠলেন , “নবারণ !” একটি মাঝ বয়সী লোক দৌড়ে আসতেই বিনয় ভৌমিক  সামনে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটির থেকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন ,” এই বেয়াদপ টাকে যদি এখনি দূর না করিস তবে তোর দোকানে আজই আমার শেষ দিন!” নবারণ নামের লোকটি অবাক হয়ে বললেন , “আপনি কার কথা বলছেন বিনয়বাবু ? বিনয় ভৌমিক আরো রেগে বললেন ,” চোখের মাথা খেয়েছিস নাকি ? তোর নতুন চাকুরে,নির্লজ্জের মত দাড়িয়ে থাকা এই অপদার্থের কথা বলছি ! প্রথমে আমার পায়ে গরম চা ফেলল ,ক্ষমা চাওয়ার বদলে তারপরে আবার মুখে ভাষণের পাঁচ কান্ড! ” নবারণ নামের লোকটি কাছে এসে বললেন , “আমি কিছু বুঝতে পারছি না বিনয় বাবু , আমি আর আপনি ছাড়া  এখানে আর কেউ তো দাড়িয়ে নেই ,তাছাড়া দোকানে নতুন লোক রাখার মত আমার সামর্থ্য কোথায় !” সামনে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটির মতই দোকানে বসে থাকা অন্যান্য খরিদ্দারের চোখে মুখে বিদ্রুপের হাসি  বিনয়বাবুর ভিতরের ভয়কে আরো  বাড়িয়ে দিল , তাহলে কি তার মাথার কিছু গন্ডগোল ? আর কিছু ভাবতে না পেরে চিন্তিত মুখে দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য  পা বাড়াতেই ছেলেটি বিনয় বাবুর কানের সামনে এসে বলল , “নম্বরের ব্যাপারটা ভুলবেন না কিন্তু , বাড়াতে না পারেন ,খামোকা কমিয়ে নিজের বিপদ বাড়াতে যাবেন কেন !”  বিনয়বাবু ভয়ার্ত চোখে তাকাতেই ছেলেটি অল্প হেসে অদৃশ্য হয়ে গেল ।

বাস থেকে নেমে মৌমি গোস্বামী একটু এগোতেই দেখলেন একটি যুবক রাস্তার ধারে উল্টে থাকা বাইকের পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে , আশেপাশের পথচলতি মানুষের মতই এই দৃশ্যতে একটুও বিচলিত না হয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই আবার সেই ভৎসনা পূর্ণ কন্ঠস্বর  বেজে উঠলো তার কানে , “অনেক নম্বর কাটা গেল মৌমি ! তোমার জীবনের কিছু টা সময়   কি  আহত  যুবকটির বাকি জীবনের থেকেও বেশী মূল্যবান ? ” মৌমি গোস্বামী ভীষণ ভয়ে চারিদিকে তাকাতেই দেখলেন রাস্তাটা তখনও একইরকম শুনশান , রক্তাক্ত ছেলেটার দিকে দুপা এগিয়েও আবার পিছিয়ে গিয়ে বাড়ির পথ ধরতেই সেই আগের কন্ঠস্বর , এবার তা আরো উত্তেজিত ও ভৎসনা পূর্ণ,  ” যুবকটির মুখের দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখো মৌমি , এবার হয়তো চোখ ফেরানো ওতটা সহজ হবে না !” মৌমি গোস্বামী এক অলৌকিক শক্তির আবেশে অনিচ্ছাসত্তেও ছেলেটির দিকে ফিরে তাকাতেই ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন ,অচেনা যুবকটির জায়গায় রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে তার স্বামী মিলন গোস্বামী , নিজের কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থা কাটিয়ে পাগলের মত স্বামীর কাছে দৌড়ে গিয়ে দেখলেন  দেহে তখনও ক্ষীন প্রানের স্পন্দন বর্তমান । নার্সিং হোমের চেয়ারে বসে প্রার্থনারত মৌমি গোস্বামীর দুঃস্বপ্নের ঘড়ি থেমে গেল  অপেরাসন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসা ডাক্তারের গলার স্বরে যার সাথে গত রাতের অলৌকিক কন্ঠস্বরের হুবহু মিল ,”আপনার স্বামী এখন সম্পূর্ণ  বিপদমুক্ত। সকলের জীবনের দাম যে সমান মৌমি দেবী , সে জীবন পথে পড়ে থাকা অচেনা যুবকের হোক অথবা আপনার স্বামী মিলন গোস্বামীর । নম্বরের  যোগ টা ঠিক করে বুঝতে শিখুন , বিয়োগের অভিশাপ যে বড় ভয়ানক!”

দুধের বাটি হাতে রান্নাঘর থেকে পা টিপে টিপে বেরিয়ে বিনি দৌড়ে বাড়ির পিছনে রাস্তায় গিয়ে , কোচড় খুলে ধরল অপেক্ষারত কালু ভুলু দের সামনে , সবাই  যাতে দুধ রুটির ভাগ সমান পায় তা দেখা বিনির দায়িত্ব , বিনির কালু ভুলুরা ভাগ নিয়ে মারামারি করতে শেখেনি , বিনি যার সামনে যেমন পরিবেশন করে , ততটা খেয়ে আবার পরের পাতের জন্য  বিনির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে , বিনিকে যেমন তারা ভালবাসে তেমন ভয় ও করে খুব । ভুলু আস্তে আস্তে খায় বলে একদিন বুটু নিজের খাবার শেষ করে ওর পাতের দিকে শুধু  তাকিয়েছিল , তাতেই বিনি চিৎকার করে বলেছিল , “বুটু তোর ৫ নম্বর কাটা গেল !” নম্বরের হিসেব না বুঝলেও পর পর পাঁচদিন বিনির আদর না পাওয়ার দুঃখ  বুটু আজও ভুলতে পারেনি ।

খাওয়া শেষের পর আদর পর্ব সাঙ্গ করে বিনি  ঘরে ঢুকতেই মা বলল ,”মালতী বলছিল ,রান্না ঘরের রুটির হিসেব আজও মিলছে না ,কোথায় গিয়েছিলি বিনি ?”

বিনি মুখ নিচু করে বলল , “কোথাও না !”

মা হেসে বলল , “মা কে মিথ্যে বললে বুঝি নম্বর কাটা যায় না ?”

বিনি চিন্তিত মুখে বলল : “বাবা যে বলেছে , যে মিথ্যে কারোর ক্ষতি না করে শুধু অন্যের ভালোর জন্য বলা হয় তাতে একটুও নম্বর কাটা যায় না!”

মা : “সে অন্যের সংখ্যা যে দিনদিন বেড়েই চলছে বিনি !”

বিনি হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তার সাথে আমার নম্বরও !”

বিনির মা রান্না ঘরে ফিরে এসে বললেন , “রাতেও কয়েকটা রুটি বেশী বানিয়ো মালতী দি ! আমার বিনির যোগের হিসেব ভুল হয়ে যাবে নাহলে !”

মালতী দি হেসে বলল , “সে আর বলতে ! নইলে বিনি দিদি আমারও নম্বর কেটে দেবে !”

বিনির মা  : “তোমার দাদাবাবুর কথা মত জীবন টা যদি পরীক্ষা হয় নম্বরের হিসেব রাখাটা সত্যি খুব জরুরি  , মনের ভিতরের সুক্ষ্ম অনুভূতি গুলো নষ্ট হয়ে গেলে এ পোড়া জীবনের আর কতটুকুই বা দাম থাকে বলো! নিজের আখের গোছাতে এই অল্প সময় টুকু ফুরিয়ে গেলে,লাল কালি ভরা রেসাল্ট হাতে ,পরীক্ষকের বেতের সামনে  মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকতে হবে যে ! ”

মালতী দি : আমাদের বিনি দিদি সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা , তার সামনে অতি বড় পরীক্ষক কেও  মাথা নীচু করে দাড়িয়ে থাকতে হবে বৌদিমনি  !

বিনির মা : তোমার কথাই যেন সত্যি হয় মালতী দি ! আসলে কি জানো ,বয়সের সাথে সাথে হিসেবের বুদ্ধি পূর্ণতা পেলেও , মানুষের মন ভালো মন্দের সহজ বিচার শক্তি হারিয়ে ফেলে ,বলতে পারো স্কুল জীবনের নম্বর কাটার ভয়টা আর তার মনে থাকে না ,সেই সময়ে যদি  কেউ একবার জীবনের আসল সত্যি টা তাকে মনে করিয়ে দিতে পারে ,তাহলে হয়তো সময় শেষে নম্বরের যোগফলের  হিসেব টা অনেকটাই বদলে যাবে  ।

বিনির মা য়ের কথা শুনে অদৃশ্য কেউ অলক্ষ্যে হাসলেন ! তার চারিদিকে ছড়ানো অগনিত হিসেবের খাতা  ,নতুন বেশে প্রস্তুত হয়ে নিলেন তিনি  নিজের সৃষ্টির  নম্বরের হিসেব আরো একবার বদলে দিতে।

 

ধন্যবাদ

Bongnote

অন্তরাল

Comments 3 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

তিতির পূজাবার্ষিকী টা হাতে নিয়ে সোনা কাকুকে বলল , ” এবার পুজোর পাঁচ দিন তোমার কিন্তু ডাক্তারি করা চলবে না !”

সোনা কাকু : সে তোর দূর্গা ঠাকুর যদি  ওই পাঁচদিন কাউকে ডাক্তারের প্রয়োজন অনুভব না করায় ,তাহলে আমি আর আপত্তি করার কে!

তিতির : ভুলে যেও না ,আমি কিন্তু কাল তোমাকে দাবার খেলায় হারিয়ে দিয়েছি , আর তোমার দেওয়া কথা মত আমি যা চাইব তাই তোমাকে দিতে হবে ।

সোনা কাকু  : তিতির ! তোর বয়স চোদ্দ না হয়ে পাঁচ হলে ,এই অযৌক্তিক আবদারের তবু কোনো ব্যাখ্যা থাকত আমার কাছে ।

তিতির : আমি তো শুনলাম তুমি জয়ন্ত কাকুকে ফোনে বলছিলে , মুর্শিদাবাদ না কোথায় যাবে পুজোতে ! সবসময় আমাকে না জানিয়ে প্ল্যান করো বলে ,আমার কিন্তু আড়ি পাতা স্বভাব হয়ে যাচ্ছে  সোনাকাকু !

সোনা কাকু  : আরে সে কি ঘুরতে  যাবো নাকি ? মুর্শিদাবাদের বলরামপুর গ্রামে একজন ভদ্রলোক  বহুদিনের চেষ্টায় একটা  প্রাইভেট  নার্সিং হোম তৈরী করছেন , ওত দূর বলে  ওনার বারবার অনুরোধ সত্তেও এতদিন আমাদের যাওয়া হয়ে  ওঠেনি , কিন্তু একবার না গেলে এতো বড় একটা উদ্যোগ কে  যে অপমান করা হয় , তাই এবার পুজোর  সময় যাব বলেছি । শুনেছি ভদ্রলোক অনেক অর্থ ব্যয় করে বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি এনে সাজাচ্ছেন নার্সিংহোমটা, সেটা একবার শুরু হলে আশেপাশের শহর- গ্রামের মানুষগুলোকে,  অত্যাধুনিক চিকিৎসার খোঁজে আর প্রাণ হাতে নিয়ে কলকাতা আসতে হবে না ।

তিতির  গম্ভীর হয়ে বলল : তাহলে তো সব ঠিকই হয়ে গেছে , আমার পুজোর নতুন জামাগুলো না হয় আলমারিতেই  পচবে এবার ।

সোনা কাকু  : বললেই হল ? তোর এবারের জামাগুলো কলকাতার বদলে বলরামপুর কে আলোড়িত করবে , ভেবেছিলাম যাওয়ার একদিন আগে বলব তোকে ,কিন্তু আড়ি পাতা  মেয়েদের সারপ্রাইজ যে শুধু ঘরের দেওয়ালই দিতে পারে ।

তিতির  পূজা বার্ষিকী টা  দিয়ে মুখটা  আড়াল করে হাসলো ।

ষষ্ঠী :

সকাল ৮ টায় যখন গাড়িটা  একটা  পুরনো  আমলের  বনেদি  বাড়ির সামনে এসে দাড়ালো ,তখন ওরা  তিনজনেই খুব ক্লান্ত। ভোর রাতে  রওনা দেওয়ার তাড়ায় রাতে  ভালো ঘুম হয়নি , তার ওপরে এতক্ষণ গাড়িতে বসে থাকায় কোমরও  বেশ জোরালো বিদ্রোহ জানাচ্ছিল। শরীরের অস্বস্তি মুখের ভাবে প্রকাশ করার কোনো উপায় ছিল না  কারণ ওরা গাড়ি থেকে নামতেই, বাড়ির সামনে দাড়িয়ে থাকা একজন বয়স্ক ভদ্রলোক  হাসি মুখে এগিয়ে এলেন , ভদ্রলোকের বয়স  আন্দাজ ৭০ হবে, কিন্তু তার শক্ত  চেহারায় বার্ধ্যকের লেশ মাত্র নেই ,পোশাকে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট ।

ভদ্রলোক বললেন  ,”নমস্কার , আমি রণজয় ব্যানার্জী , আপনাদের পরিচয় দেওয়া একেবারেই অনাবশ্যক । আমার মত ছাপোষা মানুষের অনুরোধ যে আপনাদের কাছে এত গুরুত্ব পাবে ,তা আমি কখনো ভাবিনি  , এখানকার লোক খুব একটা মিথ্যে বলে না , আমি সত্যি মা দূর্গার কৃপা ধন্য ।”

সোনা কাকুর বন্ধু জয়ন্ত লাহা  অমায়িক হেসে বললেন , “এভাবে  বলে আমাদের লজ্জিত করবেন না রণজয় বাবু , আপনার মত মানুষের সান্নিধ্য লাভের লোভ সামলাতে না পেরেই কলকাতার পুজো ছেড়ে এখানে আসা , পয়সার জন্য নার্সিং হোম খুলতে হলে আপনি নিশ্চই  এই গ্রাম কে বেছে নিতেন না , এমন মানুষকে সামনে থেকে দেখার সৌভাগ্য আজকাল আর কজনের হয় বলুন ! ”

ভদ্রলোক কিছু বলার আগেই সোনা কাকু বললেন , “জয়ন্ত একদম ঠিক বলেছে রণজয় বাবু  তাছাড়া কলকাতার পুজোর ভিড় দেখে আমাদের চোখ অভ্যস্ত  , তার থেকে  এই নির্ভেজাল পরিবেশে  এবার আমাদের শান্তির উৎ সব দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ । আমার ভাইজি তিতির কোনদিন বাড়ির দুর্গাপুজো দেখেনি, যখন শুনলাম আপনাদের বাড়িতে দূর্গা পুজো হয় , মন্ডপের মা কে  ঘরের মেয়ে  ভাবার স্বর্গীয় উপলব্ধি করাতেই ওকে সাথে করে  নিয়ে এসেছি ।”

তিতির হাসি মুখে এগিয়ে গিয়ে  বয়স্ক ভদ্রলোক কে প্রনাম করল । ভদ্রলোক তার মাথায় হাত রেখে  বললেন , “দীর্ঘজীবি হও মা । দূর্গা মায়ের কাছে প্রার্থনা  করি , এই পাঁচদিনে তোমার  কাকুর  কথা আমি যেন সত্যি করতে পারি, এখান থেকে নিয়ে যাওয়া স্মৃ তি  তোমার সামনের দীর্ঘ জীবনে যেন কখনো আবছা না হয়  তা দেখা যে আমারই দায়িত্ব ।   …. আপনারা নিশ্চই খুব ক্লান্ত , নীলকান্ত আপনাদের ঘরে নিয়ে যাবে , জল খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম করে নিন , তারপর দুপুরের খাবারের টেবিলে আমার পরিবারের সকলের সাথে আপনাদের আলাপ করিয়ে দেব।”

নীলকান্ত নামের পৌঢ় ভদ্রলোকের সাথে ওরা যে ঘরটায় পৌঁছলো তার সজ্জাশিল্পীর প্রতিভা সত্যি প্রশংসনীয় , বিশাল আকৃতির ঘরটার দুদিকে দুটো খাট রাখা যার একটিতেই ৪ জন মানুষ আরাম করে ঘুমাতে পারে । দেওয়ালে ঝোলানো ছবি , পুরাতন জিনিসের অভূতপূর্ব সংগ্রহ  ব্যানার্জী পরিবারের আর্থিক প্রাচুর্য কে আরো স্পষ্ট করে দেয় । ঘরের  রঙ, আসবাবপত্রের নকশা , সবকিছুতেই  গাঢ় আভিজাত্যের ছাপ ।

নীলকান্ত বলল , ” এটা আপনাদের ঘর , কিছু লাগলে দয়া করে আমাকে ডাকবেন, আমি আশেপাশেই থাকব ।”

লোকটি চলে গেলে জয়ন্ত লাহা বললেন , “স্বাগ্নিক প্রথমে  তোর পুজোয় কলকাতার বাইরে কাটানোর প্রস্তাবে আমি রাজী হইনি ঠিকই, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এখানে না এলে আমার নাম লোকসানের খাতায় লাল হরফে লেখা থাকত । নিজেকে কেমন যেন  রাজার অতিথি বলে মনে হচ্ছে ।”

হঠাৎ ঢাকের আওয়াজ শুনে তিতির দৌড়ে বারান্দায় গেল । সোনাকাকু তার পাশে দাড়িয়ে বলল , “প্রথমবার মায়ের বোধন দেখছিস তিতির!” নিরুত্তর তিতির নিস্পলকে  নিচের ঠাকুর দালানে  ঘটা  আন্তরিকতার আবেশ পূর্ণ এক অপরূপ দৃশ্যের সাক্ষী রইলো ।

দুপুর  ১২:৩০ টা  : জলখাবারের  লুচি তরকারী  খেয়ে  , স্বর্গীয় বিছানার স্পর্শে কোমরের বিদ্রোহ অনেক ক্ষণ শান্ত হয়েছিল । তিতির আর সোনাকাকুর পর এবার জয়ন্ত লাহা  স্নান সেরে  বেরিয়ে বলল , “তোরা ঠিকই বলেছিলি, এখানকার জলের  স্পর্শে  সব পাপ ধুয়ে যাওয়ার মত একটা অনুভূতি হলো , আমার এখন আবার  খিদে পাচ্ছে ।” তার কথা শেষ না হতেই  নীলকান্ত নামের  লোকটি  ঘরের দরজায় আওয়াজ করে বলল , “আজ্ঞে বাবু আপনাদের জন্য খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছেন।” তার  উত্তরে  “আচ্ছা  ,আমরা আসছি ” বলে সোনাকাকু  তিতিরের কানের কাছে মুখ এনে বলল , “নীলকান্ত দা কে এর মধ্যেই আড়ি পাতা শিখিয়ে দিলি তিতির?”

তিতির ( হেসে ): হ্যাঁ,  আমি যখন ঠাকুর দালানে মন দিয়ে দুর্গাপূজা দেখব , নীলকান্ত কাকুই আমার কাজটা করবে।

নীলকান্তের সাথে ওরা তিনজন খাবার ঘরে প্রবেশ করতেই রণজয় সাহা সেই চেনা হাসি মেখে বললেন , “আসুন, আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা  করছিলাম।”

সোনাকাকু লজ্জিত মুখে বলল ,”আসলে আমাদের স্নান সারতে একটু দেরী হয়ে গেল , এরকম জলের মায়া কাটিয়ে ওঠা খুব কঠিন ,এটা নিশ্চই  সাধারণ কলের জল নয় ! ”

ভদ্রলোক হেসে বললেন , ” ঠিক ধরেছেন , এটা আমার বাপ ঠাকুরদার আমলে তৈরী করা পাতকুয়ার জল , মাটির অনেক গভীর থেকে আসা  এই জল ,প্রথম স্পর্শেই তার  আলৌকিকতার পরিচয় দেয় ,আমাদের বাড়িতে আসা সকল অথিতির ই একই রকম অভিজ্ঞতা । আপনারা দয়া করে বসুন , সকালের ওত টুকু জলখাবারের  পর আর তো কিছু  ই  খান নি, নিশ্চই খুব খিদে পেয়েছে ।”

“এত সব সাজানো খাবার দেখে ভর পেটেও  খিদের  ঘুম ভেঙ্গে গেলে তাকে তো আর দোষ দেওয়া চলে না  রণজয় বাবু!” কথাটা বলার পর  জয়ন্ত লাহার পাশের  চেয়ারে বসে  ঘরের বাকিদের উদ্দেশ্যে  জোড়হাতে সোনাকাকু বলল, “নমস্কার! আমি স্বাগ্নিক মুখার্জী  আর ও আমার ভাইজি তিতির , আমার পাশে বসা  স্বল্পভাষী ভদ্রলোকটিকে  শুধু সহকর্মী বললে ভুল হবে  , জয়ন্ত আমার অনেকদিনের ভালো বন্ধু।  রণজয় বাবুকে আমাদের পরিচয় দেবার সুযোগ দিলাম না কারণ উনি এত বাড়িয়ে বলবেন যে এত ভালো ভালো খাবারগুলো তারপরে আমাদের লজ্জা করেই খেতে হবে। ”

ঘরের বাকি সকলের মত রণজয় ব্যানার্জী হেসে বললেন  “প্রকৃত গুনীদের মধ্যে যে গর্বের লেশমাত্র থাকে না , তা আরো একবার অভিজ্ঞতা করলাম , আপনাদের  সাথে বাকি সকলের পরিচয় করিয়ে দি :

টেবিলের উল্টোদিকে ,বাদিকের ধারের চেয়ারে বসা ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন , “ও আমার বড় ছেলে অরুণ।” আন্দাজ বছর চল্লিশ বয়সী  , চশমা পড়া , মোটা ভদ্রলোকটি হাতজোড় করে বললেন “নমস্কার “।

“তার পাশে  অরুণের স্ত্রী ,ঋতু , ।” পাশের চেয়ারে বসা বাচ্চা ছেলেটির থালায়  ভাত মাখতে ব্যস্ত  ,মাঝ বয়সী সুন্দরী  ভদ্রমহিলা স্মিত হাসলেন ।

“ওর কোলে সৌনক ,আমার নাতি ।” বছর পাঁচের ছেলেটি নিজের মনে মোবাইলে গেম খেলায় ব্যস্ত , এই পরিচয় পালা তার মনোনিবেশ নষ্ট  করতে পারল না  ।

“তার পাশে আমার ছোট ছেলে ,নিলয় ।”  বয়স আন্দাজ ৩২ , ছিমছাম, চেহারার ভদ্রলোকটি  অল্প হেসে  হাতজোড়   করে নমস্কার করলেন ।

“আমার পরিবারের  দুজন সদস্য এখানে অনুপস্থিত , আমার স্ত্রী রমলা , ঠাকুর দালানে মাকে একা ফেলে উপরে আসতে রাজী হননি , আর আমার ছোট ছেলের স্ত্রী অমিতা , ও নিজের ঘরে আছে । অমিতা সন্তান সম্ভবা , মা দূর্গা কৃপা করলে দশমীর দিন এ বাড়িতে নতুন অতিথির  পা দেওয়ার কথা  ।”

সোনাকাকু হেসে বলল , ” বাহ্ , ঠাকুর দালানের শুন্যতা, মা দূর্গা  এবার তাহলে  আপনাদের পরিবারকে অনুভব করতে দেবেন না!” কথা টা  শুনে রণজয় ব্যানার্জী স্মিত হাসলেও তার মুখে এক অজানা বিষাদের ছায়া পড়ল । তিতির সেটা লক্ষ্য করে আবার খাবারে মনোনিবেশ করলো ।

বিকেল ৫ টা  : সোনাকাকু আরমোড়া  ভেঙ্গে বলল ” দুপুরে দারুণ ভাত ঘুমের পর শরীরের  ক্লান্ত ভাব টা আর একদম নেই।”

জয়ন্ত লাহা পাশ ফিরে শুয়ে বলল : “যা বলেছিস স্বাগ্নিক , অনেকদিন পর এতো শান্তির ঘুম ঘুমালাম,কলকাতা ফিরে গিয়েও  অনেকদিন এই বিছানা , রাজসিক আতিথেয়তাকে মনে পড়বে  ।”

তিতির ব্যস্ত হয়ে বলল , ” ঘুম  ভাঙ্গলো তোমাদের ? চলো এবার নিচে গিয়ে সামনে থেকে সন্ধ্যার পুজো দেখি ।”

জয়ন্ত লাহা : “স্বাগ্নিক ! তুই বরং  তিতিরকে নিয়ে ঘুরে আয় , আমি ব্যালকনির টিকিট কেটেই পুজো দেখব ভাবছি ।”

ওদের কথা শেষ না হতেই নীলকান্ত ঘরে ঢুকে চায়ের ট্রে  টা  টেবিলের উপর  রেখে দিল , তারপর তিতিরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “তোমার জন্যও এনেছি কিন্তু , তুমি চা খাও তো? ”

তিতির স্মিত হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল ।

সন্ধে  ৬ টা  : তিতির নতুন জামা পড়ে সোনাকাকুর সাথে ঠাকুর দালানে পৌঁছলো । অরুণ ব্যানার্জী তাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে বললেন , “আপনারা বিশ্রাম করছিলেন তাই আর বিরক্ত করিনি , নীলকান্ত চা দিয়েছে আপনাদের ?”

সোনাকাকু : “হ্যাঁ ,তিতিরের খুব ইচ্ছা কাছ থেকে পুজো দেখার তাই  চা খেয়েই নিচে চলে এলাম  ।”

অরুণ ব্যানার্জী (হেসে): ” নিশ্চই ,তার আগে চলুন আপনাদের মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দি ।”

আন্দাজ  ৬৫ বছরের একজন বয়স্ক  ভদ্রমহিলার সামনে গিয়ে অরুণ ব্যানার্জী  বললেন , “মা !  ইনি  Dr স্বাগ্নিক মুখার্জী আর সাথে ওনার ভাইজি তিতির ।”

ভদ্রমহিলা হেসে বললেন , “নমস্কার , আমি রমলা ব্যানার্জী , আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন , অনেক ইচ্ছা থাকতেও কিছুতেই দুপুরে আপনাদের সাথে দেখা করতে যেতে পারিনি , পুজোর পাঁচদিন যে আমাদের  কি করে কাটে তা  শুধু মা দুর্গাই জানেন,আমাদের বাড়িতে তো বেশী লোক নেই ,নিজেরাই কোনরকমে নাওয়া খাওয়া ভুলে  এই মহা পুজোর জোগার করি,এবার তো অমিতা অসুস্থ , তাই আমার আর ঋতুর উপর চাপ টা  একটু বেশি , এই যে এত পাড়া প্রতিবেশী দেখছেন,  সবাই পুজো দেখতে আসে কিন্তু কাজের সময় কাউকে পাওয়া যায় না  ।”

সোনাকাকু : “আমি আপনার ছেলের বয়সী ,’আপনি’ বলে লজ্জা দেবেন না । ক্ষমা তো আপনাদের কাছে আমাদের চাওয়া উচিত ,এই ভীষণ ব্যস্ততার সময় এভাবে এসে আপনাদের বিব্রত করলাম , আসলে পুজোর সময় যা একটু সময়  থাকে , এখন না আসলে আপনার স্বামীর মহাযজ্ঞ দেখার সৌভাগ্য আবার কবে হত  তা সত্যি জানা নেই ।”

ভদ্রমহিলা (হেসে) : ” তোমরা আসাতে আমার খুশী বলে বোঝানোর নয়  , মায়ের মত যখন বললে  তখন লজ্জা না করে যখন যা লাগবে বিনা সঙ্কোচে নিজে এসে চেয়ে নিও কিন্তু ।”

সোনাকাকু হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ।

অরুণ ব্যানার্জী , ঠাকুর দালানে মা দূর্গার একচালা মূর্তির সবচেয়ে কাছের চেয়ারে তাদের বসিয়ে দিয়ে চলে যেতেই তিতির সোনাকাকুর কানে বলল  ” নীলকান্ত কাকুর মত বয়স্ক মানুষকে নাম ধরে ডাকাকে তুমি সমর্থন করো ? অরুণ ব্যানার্জীর এই সম্বোধন কে  তুমি কী  বলবে , আভিজাত্য না ঔদ্ধত্য ?”

সোনাকাকু : “তোকে অন্যায় সমর্থন না করা যে শিখিয়েছে তা সে নিজে কি করে সমর্থন করবে বল ? আমার মতে এটা আভিজাত্য বা ঔদ্ধত্য কোনটাই নয় বরং প্রকৃত শিক্ষা ও রুচির অভাব বলতে পারিস ।”

রাত্রি ১০ টা : মন্ডপে সকলের সাথে খিচুড়ি ভোগ  খেয়ে সোনাকাকু ও তিতির ঘরে ঢুকতে দেখলো জয়ন্ত লাহা মন দিয়ে একটা বই পড়ছেন ।

সোনাকাকু :  জয়ন্ত খেয়েছিস তো ?

জয়ন্ত  লাহা : সে আর বলতে , খিচুড়ি টা সত্যি ভালো হয়েছিল।  তা এতক্ষণ ধরে কি করছিলি তোরা ?

সোনাকাকু :  এই পুজো দেখছিলাম ,সকলের সাথে কথা বলছিলাম , তোর মত ঘরকুনোই শুধু জানে নতুন জায়গায় এসে ঘরবন্দী হয়ে থাকার  সুখ !

জয়ন্ত  লাহা : তুই তো জানিস আমার বেশী কথা বলতে  ভালো লাগে না ,তাছাড়া একটু আগে রণজয় ব্যানার্জী এসেছিলেন ,বললেন কাল সকাল বেলা  আমাদের নার্সিং হোম দেখাতে  নিয়ে যাবেন । আরামের সময় যে বড় কম আমার বন্ধু, তিতিরের বয়সটা ফিরে পেলে তাও ভাবা যেত ।

তিতির : আমি কাল  তোমাদের সাথে নার্সিং হোম যাব না , ওখানে তো আমার কোনো কাজ নেই , বরং পুজো দেখে সময়টা কাটিয়ে দেব  ।

সোনাকাকু : তথাস্তু । এবার চটপট শুয়ে পর দেখি , ভোর ভোর ঢাকের আওয়াজ তাহলে আর বেদনাদায়ক লাগবে না।

সপ্তমী


ভোর ৫:৩০  : দরজায় বার বার ধাক্কার আওয়াজে সোনাকাকুর ঘুম ভেঙ্গে গেল । দরজা খুলতেই রণজয় ব্যানার্জী চিন্তিত স্বরে বললেন  ,”স্বাগ্নিক বাবু ! ক্ষমা করবেন এত ভোরে বিরক্ত করার জন্যে ,একবার আসবেন ? আমার স্ত্রীর শরীর টা হঠাৎ খুব খারাপ করেছে ।”

“সেকি !  আমি আসছি এখনি । ” কথাটা বলে সোনাকাকু একটা ব্যাগ  ও টেবিলে রাখা চশমা টা নিয়ে রণজয় ব্যানার্জীর সাথে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল । তিতিরের ঘুম ও ভেঙ্গে গিয়েছিল , সে তাড়াতাড়ি উঠে সোনাকাকুর পিছু নিল  ।

সোনাকাকু  ঘরে  ঢুকে দেখলো রমলা ব্যানার্জীর পরনের  কাপড়ের অর্দ্ধেকের বেশী জলে ভেজা , মাথার কোনায় ,দু হাতের পিছনে বিশ্রী ভাবে কেটে গিয়ে রক্ত ঝড়ছে । বড় ছেলের স্ত্রী  ঋতু  ,সংজ্ঞাহীন ভদ্রমহিলার মাথার কাছে ফার্স্ট এইড বাক্স  নিয়ে বসে ডেটল দিয়ে কাটা জায়গা গুলো পরিষ্কার করে দিচ্ছেন ।

প্রেসার মাপার পর , বিন্দুমাত্র  সময় নষ্ট না করে সোনাকাকু  ব্যাগে রাখা একটা ওষুধ ভদ্রমহিলার হাতে ইঞ্জেক্ট করলো, তারপর একটা ট্যাবলেট  জিভের তলায় দিয়ে ঘরের বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল , “এটা কিভাবে হল ?”

রনজয় ব্যানার্জী চিন্তিত মুখে বললেন : ঠিক জানিনা , সকালে নীলকান্তের ডাকে আমার ঘুম ভাঙ্গলো , কুয়ো তলা পরিষ্কার করতে গিয়ে ও রমলা কে উপুর হয়ে পড়ে থাকতে দেখতে পেয়েছে । রমলা  কখন বা কেন ওখানে গিয়েছিল তা আমি  কিছুতেই বুঝতে পারছি না । ওর কিছু হবে না তো স্বাগ্নিক বাবু  ?

সোনাকাকু  চিন্তিত মুখে বলল  ,”আপনাদের বাড়ি থেকে হাসপাতাল  কতদূর? ”

রনজয় ব্যানার্জী : তা গাড়িতে ৪৫ মিনিট মতন লাগবে  ।

সোনাকাকু  গম্ভীর মুখে বললেন , ” হুম ! আর পনেরো মিনিটের মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে বিনা চিকিৎসায় বাড়িতে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করা ঠিক হবে বলে আমার মনে হয় না ।”

“আমরা এখনি গাড়ির ব্যবস্থা করছি । ”  কথাটা বলেই রনজয় ব্যানার্জী  ও তার বড় ছেলে অরুণ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন ।

এতক্ষণ মায়ের মাথার সামনে নিঃশব্দে দাড়িয়ে থাকা নিলয়  ব্যানার্জী  বললেন : “মা র কি হয়েছে স্বাগ্নিক বাবু  ?”

সোনাকাকু : মাইল্ড হলেও হার্ট এটাক বলেই মনে হচ্ছে ,পরীক্ষা করলে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব ।

ভোর ৬ টা  : সকলের উদ্বেগের দাড়ি টেনে রমলা ব্যানার্জীর জ্ঞান ফিরে এলো । রণজয় ব্যানার্জী কিছু বলতে চাওয়ায় তাকে বাঁধা দিয়ে সোনাকাকু বলল , “Mrs ব্যানার্জীর এখন বিশ্রাম দরকার , যেকোনো একজন বাদে বাকিরা দয়া করে নিজেদের  ঘরে চলে যান ।

রণজয় ব্যানার্জী ছাড়া বাকি সকলে একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে দরজার সামনে এসে উনি সোনাকাকুকে বললেন, “আর চিন্তার কোনো কারণ নেই তো স্বাগ্নিক বাবু ? ”

সোনাকাকু : “না , তবে দুপুর বেলার আগে ওনাকে বিব্রত করলে হিতে বিপরীত হতে পারে । আপনি সেদিক টা খেয়াল রাখবেন , আর কিছু  অসুবিধা হলেই বিনা সঙ্কোচে আমাকে ডাকবেন।”

সোনাকাকুর সাথে ঘরে ফেরার সময় তিতির বলল , “আমি যখন সাড়ে চার টে  নাগাদ  বাথরুমে উঠে কিছুক্ষণের জন্য বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলাম , Mrs ব্যানার্জীকে চিন্তিত মুখে ওদিকটায় যেতে দেখেছিলাম ।”

সোনাকাকু : হুম ! আর কাউকে দেখেছিলি কি ?

তিতির : না , তোমার কি মনে হয় উনি কারো পিছু নিচ্ছিলেন ?

সোনাকাকু : ওনার ডান  হাতের কব্জিতে  স্পষ্ট  আঙ্গুলের দাগ , সেটা  কোনো পুরুষের বলেই আমার মনে হল ।

রাত্রি  ৯  টা :দুপুরের খাবার  ও বিকেলের  চা  নীলকান্ত ঘরেই দিয়ে গেছে । Mrs রমলা ব্যানার্জী সকালের চেয়ে এখন অনেকটা ভালো আছেন ,বেশ  কিছুদিন লাগবে ওনার সম্পুর্ন সুস্থ হতে , সোনাকাকুর পরামর্শ মত রণজয় ব্যানার্জী মন্ডপের  ঢাকি দের পয়সা মিটিয়ে ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছেন  । সকলের প্রশ্নের উত্তরে Mrs ব্যানার্জী বলেছেন, ভোর রাতের দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে উনি বারান্দায় আসেন, পিছনের দরজাটা খোলা থাকায় , একটা রাস্তার কুকুর   সেখান দিয়ে  ঢুকে ,মন্ডপে রাখা প্রসাদের থালায় মুখ দিচ্ছিল , তাই তাকে তাড়া করতে গিয়ে ঘুম চোখে কুয়ো তলার শেওলা ওনার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে ।

জয়ন্ত লাহা ও সোনাকাকু বিছানায় বসে বই পড়ছিল, তিতিরের চোখ বিছানায় শুয়ে জানলা দিয়ে  রাতের পরিস্কার আকাশ দেখতে ব্যস্ত । হঠাৎ দরজার আওয়াজে তিনজনে একসাথে বাইরের দিকে তাকালো ।

রনজয় ব্যানার্জী তার ছোট ছেলে নিলয় ব্যানার্জী কে নিয়ে ঘরে ঢুকে বললেন, “আপনাদের সাথে একটু দরকারী কথা

ছিল ।”

সোনাকাকু : হ্যাঁ , বলুন না রনজয় বাবু । আপনার স্ত্রী ভালো আছেন তো ?

রনজয় ব্যানার্জী  : হ্যাঁ  , আজকের বিপত্তির কারণ শুধু ওই রাস্তার কুকুরটা নয় , আসলে  রমলার হার্টের অসুখটা  গত কয়েক বছর ধরে মাঝে মাঝেই বেড়ে যায় , তার ওপরে এখন  আমার ছোট ছেলের স্ত্রী  অমিতাকে নিয়ে  ও খুব চিন্তায় আছে ,আপনাদের সাথে অমিতার এখনো পরিচয় হয়নি। পারিবারিক  দুঃখের কথা কি বলব আপনাদের ,অমিতা  এবার নিয়ে চার বার সন্তান সম্ভবা , এর আগের তিন বার ও মৃত সন্তান প্রসব করেছে ,এইবারেও ওর শরীর বিশেষ ভালো নয়। তাই ভাবলাম জয়ন্ত বাবু  তো  তো খুব বড় gynecologist,  যদি অমিতাকে একবার দেখেন …

জয়ন্ত লাহা ইতস্তত করে বললেন : হ্যাঁ , কিন্তু এভাবে উপর থেকে দেখে তো কিছু বোঝা সম্ভব নয় ,তবে ওনার রিপোর্ট গুলো দেখলে হয়তো  একটু হলেও আপনাদের সাহায্য করতে পারব ।

সোনাকাকু  : আপনারা অমিতাদেবীকে  কলকাতা নিয়ে যাননি কেন ?

নিলয় ব্যানার্জী : ও যে কিছুতেই যেতে চায় না ,অমিতার বাবা  একজন ডাক্তারের অবহেলায় কলকাতার নার্সিং হোমে মারা গিয়েছিলেন , সেই থেকে ওখানকার ডাক্তারের উপর ওর খুব অবিশ্বাস  ।

জয়ন্ত লাহা : রণজয় বাবুর নার্সিং হোম তো এখনো ওপেন হয়নি , তাহলে অমিতা দেবীর চিকিৎসা এখন কোথায় করাচ্ছেন ?

নিলয় ব্যানার্জী : এখানকার সরকারী হাসপাতালে পুলক বর্মন  নামে একজন ডাক্তার আমাদের অনেকদিনের জানাশোনা , অমিতা ওনার  আন্ডারেই আছে ।

জয়ন্ত লাহা : তা উনি কী বলছেন ,বার বার এরকম হওয়ার কি কারণ ?

নিলয় ব্যানার্জী : ডাক্তারের কোনো দোষ নেই জয়ন্ত বাবু , আসলে কাকতালীয় ভাবে তিনবারই ভরা মাসে অমিতা পড়ে গিয়েছিল , প্রথমবার  সিড়ি থেকে , দ্বিতীয় বার বাথরুমে , তৃতীয় বার কুয়োর ধারে । এবার তাই বিছানা থেকে ওকে আর নামতে দেওয়া হচ্ছে  না  , গতকালের রিপোর্ট অনুযায়ী আমাদের সন্তান এখনো সুস্থ আছে কিন্তু প্রসবের  দিন যত এগিয়ে আসছে একটা ভীষণ অবসাদ অমিতাকে ঘিরে ধরছে, হয়তো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাই  তার এই অবস্থার কারণ  ।

সোনাকাকু : হুম বুঝতে পারছি , আপনি বরং আপনার স্ত্রীর রিপোর্ট গুলো জয়ন্তকে দেখান , তারপর না হয় ওনাকে একবার দেখে আসা যাবে , তার সাথে আলাপ টাও সেরে নেব  ।

নিলয় ব্যানার্জী  অল্প হেসে বললেন , “তাহলে  আমি আজকে রাত্রে  পুরনো রিপোর্ট গুলো বার করে রাখছি , কাল সকালে সব একসাথে নিয়ে আসবো ।

জয়ন্ত লাহা : আচ্ছা ।

রণজয় ব্যানার্জী : আজকে যা বিপদ গেল , স্বাগ্নিক বাবু না থাকলে যে কি হত কে জানে , আপনাদের নার্সিং হোম দেখানো তো ছেড়েই দিন, সারাদিন আপনাদের কোনো  খবর পর্যন্ত আসতে পারিনি । কালকে সকালে আমি না যেতে পারলেও অরুণ বা নিলয় আপনাদের নার্সিং হোম দেখিয়ে নিয়ে আসবে,বার বার  তো  আসতে পারবেন না ,

অনেক খুটিনাটি বিষয়ে আপনাদের মতামত জানাটা খুব জরুরি ।

জয়ন্ত লাহা : আরে এভাবে ভাবছেন কেন ! এরকম শান্ত পরিবেশে বিশ্রামের দিন ডাক্তারদের অনেক ভাগ্য করে পেতে হয় , আমাদের কোনো অসুবিধা হয়নি , নীলকান্ত দা  সারাদিন সময়ে সময়ে এসে খিদের আগেই খাবার দিয়ে গেছেন । আমাদের নিয়ে অত চিন্তা করবেন না , আগে আপনি Mrs ব্যানার্জীর  খেয়াল রাখুন,সব ঠিক হলে যাওয়া যাবে ক্ষণ নার্সিং হোম দেখতে , আমরা তো দশমী পর্যন্ত আছি  এখানে ।

সোনাকাকু : আমিও জয়ন্তর সাথে একমত  , আশা করি  এই মঙ্গল উৎসবে ,সকল  বিপদ কেটে গিয়ে আনন্দে ভরে উঠুক আপনার পরিবার ।

রণজয় ব্যানার্জী : আপনাদের ব্যবহার দেখে আমি সত্যি মুগ্ধ ,আন্তরিক ধন্যবাদ এই বিপদে আমাদের পাশে থাকার জন্য, মা দূর্গা বোধহয় সব ভেবেই আপনাদের আসার সময় নির্ধারণ করেছেন । আর বিরক্ত করব না , এখন আসি , আবার কাল সকালে দেখা হবে ।

রাতের খাবার খেয়ে সোনা কাকু আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল , তিতিরের মন কিছুতেই গল্পের বইতে বসছে না , জয়ন্ত লাহা একই রকম নির্বিকার ভাবে অনেক ক্ষণ  জার্নালের পাতা উল্টে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লেন ।

অষ্টমী 


ভোর ৪ টে : সোনাকাকুর ঘুম  হঠাৎ ভাঙ্গতেই দেখল তিতির বিছানায় নেই । তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে বারান্দা আর বাথরুমেও তাকে না দেখে , পায়ে চটিটা গলিয়ে সিড়ি দিয়ে ঠাকুর দালানে নেমে এলো  সোনাকাকু । মন্ডপে দুর্গামূর্তি আর ঘুমন্ত চাকর স্থানীয় মানুষ  ছাড়া আর কিছু  চোখে পড়ল না । সোনাকাকু ভীষণ উদ্বেগে মন্ডপের পিছনের গলিতে পা বাড়াতেই দেখল তিতির হন্তদন্ত করে হেঁটে আসছে ।

সোনাকাকু উদ্বেগ চেপে রেখে কঠিন গলায় বলল , “কিরে কোথায় গেছিলিস ? কতবার বলেছি এভাবে আমাকে না বলে কোথাও যাবি না, একটা বিপদ না ঘটিয়ে শান্তি নেই তোর ,তাই না ?

তিতির : “আহ । ওত রাগ তোমায় মানায় না ,তুমিও অনেক কিছু আমাকে না জানিয়ে করো , অনেক কথা আছে , উপরে চলো ।”

সোনাকাকু আরো কিছু বলতে চাওয়ায় তিতির  মুখে আঙ্গুল দেখিয়ে তার হাত টেনে উপরে নিয়ে গেল ।

ঘরের ভিতর ঢুকে সোনাকাকু বলল : জয়ন্ত  ঘুমাচ্ছে , বারান্দায় চল ।

তিতির বারান্দায় গিয়ে সোনাকাকুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল , “আমার রাত্রে কিছুতেই ঘুম আসছিল না , তাই ৪ টে নাগাদ উঠে বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলাম , হঠাৎ ঋতু ব্যানার্জী কে মন্ডপের পিছনের গলিতে যেতে দেখলাম , ভাবলাম গত কালের মত আবার যদি কিছু অনিষ্ট হয় , তাই ওনার পিছু নিয়েছিলাম ।”

সোনাকাকু : তিতির ….

তিতির : আহ ! পুরোটা শুনে তারপর চিৎকার করো । ঋতু ব্যানার্জী কুয়োর পাড়ে গিয়েছিলেন , আমি একটু দূরের দেওয়ালের পিছন থেকে পরিস্কার দেখেছি , উনি কুয়োর চারিদিকে ঘুরছিলেন ও ভিতরের দিকে দেখছিলেন বার বার , মনে হল কিছু একটা খুঁজছেন । কিছু বোঝার আগেই অরুণ ব্যানার্জী ওখানে চলে এলেন , ওত ভোরে ঋতু  ব্যানার্জীর কুয়োর পাড়ে ঘোরাঘুরি তার স্বামীর কাছে যেন প্রত্যাশিত ব্যাপার। একটুও বিস্ময় প্রকাশ না করে প্রথমে উনি নিজের  স্ত্রীকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন , তাতে সফল না হওয়ায় দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ঝগড়া হল , আমি দূরে থাকায় কোনো কথা শুনতে পাইনি ,শুধু মুখের ভাব দেখেই আন্দাজ করতে হয়েছে ,তাও সবে ফোঁটা আলোতে যা দেখেছি ,তাই বললাম। ওরা চলে আসার পরও কিছুক্ষণ ওখানে লুকিয়ে ছিলাম ,বলা কি যায় যদি দুজনের মধ্যে কেউ ফিরে আসে ! তাই একটু দেরী হয়ে গেল । ব্যাপারটা একদম সহজ নয় সোনাকাকু ।

সোনাকাকু : তার মানে তুই বলছিস কালকে রমলা ব্যানার্জীর দুর্ঘটনার পিছনে ঋতু ব্যানার্জীর হাত আছে ! ধস্তা ধস্তিতে কিছু পড়ে যাওয়ায় আজ উনি সেটা ওখানে খুঁজতে গেছিলেন !আর  রমলা ব্যানার্জী পারিবারিক ঝামেলা সকলের থেকে লোকাতেই মিথ্যে বলেছেন ।

তিতির : সেই ফর্মুলায়  দুটো ব্যাপার হতে পারে , অরুণ ব্যানার্জী হয় সত্যি টা জানেন অথবা জানেন না । যদি না জেনে থাকেন ,তাহলে স্ত্রীকে  ওত ভোরে ওখানে দেখে একটুও বিস্ময় প্রকাশ করলেন না কেন ? তাছাড়া হঠাৎ স্বামীকে দেখে তো ঋতু ব্যানার্জীর ভয় পাওয়ার কথা , তা তো উনি পাননি ।  আর যদি ধরে নি , অরুণ ব্যানার্জী কোনো অজানা উদ্দেশ্যে কালকের ঘটনায় তার স্ত্রীকে সঙ্গ দিয়েছিলেন , তাহলে আজকের ঝগড়ার কারণ কী !

সোনাকাকু : এই ফেলুদাই সব সর্বনাশের ভুল , ঘুমো গিয়ে এখন তুই । পরে এসব নিয়ে কথা বলা যাবে , আমরা এখানে দু দিনের অতিথি, এসব পারিবারিক ঝামেলায় না পড়াই ভালো ।

তিতির  গম্ভীর ভাবে ভিতরে যাওয়ার সময়  বলল , “২ দিন নয় , ৫ দিন সোনাকাকু ,এত সহজ হিসেবে ভুল তোমার মত বিজ্ঞানের ছাত্রকে মানায় না ।”

সকাল ১১ টা : নীলকান্তের নিয়ে আসা জলখাবার খেয়ে সোনাকাকু আর তার বন্ধু, রণজয় ব্যানার্জীর গাড়িতে নার্সিং হোম দেখতে বেরিয়ে গেল । সকালবেলা  তিতির ঠাকুর দালানে গিয়ে অঞ্জলি দিয়ে এসেছে , বাড়ির মহিলাদের মধ্যে শুধু ঋতু ব্যানার্জী ই উপস্থিত ছিল,আর বাকি সব আশেপাশের বাড়ির লোকজন । অঞ্জলির ফাঁকে সে লক্ষ্য করেছিল ঋতু ব্যানার্জীর চোখে মুখে ভীষণ বিষাদের  চাপ । এখন একা বারান্দায় দাড়িয়ে , প্রায় খালি মন্ডপের দিকে তাকিয়ে  কলকাতার কথা তিতিরের খুব মনে পড়ছিল । ফেলুদার গল্পের মতই, পাড়ার বন্ধুদের সাথে অষ্টমীর সকালে পুজো প্যান্ডেলে হুল্লোড়ের কোনো  বিকল্প নেই ।

দুপুর ২ টো : সোনাকাকু আর জয়ন্ত লাহা ঘরে ঢুকতেই তিতির বলল , “এতক্ষণ লাগলো একটা নার্সিং হোম দেখতে ?”

সোনাকাকু (হেসে) : তুই তো গেলি না ! গেলে দেখতিস ভদ্রলোক সত্যি অনেক যত্ন ও খরচা করে নার্সিং হোম টাকে তৈরী করছেন ,একসময় এটা  কলকাতার নাম করা নার্সিং হোমের সাথে পাল্লা দেবে  ,তবে এখানে ভালো ডাক্তার পাওয়া মুশকিল , সেটা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল , আমি আর জয়ন্ত যেটুকু পেরেছি নিজেদের মতামত দিলাম , চেষ্টা করব ভবিষ্যতেও যদি আরো কোনোভাবে ওনাকে সাহায্য করতে পারি ।

তিতির : তা সে নার্সিং হোমে চিকিৎসা  কবে থেকে শুরু হবে  ?

সোনাকাকু : রণজয় বাবু তো বললেন ৬ মাসের মধ্যেই ,ভদ্রলোক কে দেখে তো মনে হয় না যে উনি বাজে কথা বলার লোক , আর যে গতিতে  সব কাজ চলছে দেখলাম , আমার তো মনে হয় ভালো ডাক্তারের গ্রুপ পেলে তার আগেই শুরু হয়ে যেতে পারে ।

তিতির ‘হুম’ বলে উপন্যাসে মনোনিবেশ করলো ।

সন্ধ্যে ৭ টা : দুপুরের ভাত ঘুমের পর চা বিস্কুট খেয়ে তিতির যখন সোনাকাকু আর তার বন্ধুর সাথে তাদের ডাক্তারী জীবনের বিভিন্ন গল্প শুনতে ব্যস্ত , দরজার বাইরে নিলয় ব্যানার্জীর গলার আওয়াজ , ” আসতে পারি ? ”

সোনাকাকু : হ্যাঁ, আসুন না !

নিলয় ব্যানার্জী : আসলে আমি ওই অমিতার রিপোর্ট গুলো নিয়ে এসেছিলাম ! জয়ন্ত বাবু যদি একটু দেখেন !

জয়ন্ত লাহা উঠে গিয়ে রিপোর্ট গুলো হাতে নিয়ে অল্প হেসে বললেন : হ্যাঁ নিশ্চই , আজ রাতে দেখে নি ,তারপর আমার সাধ্যমত যথাসম্ভব চেষ্টা করব আপনাদের সাহায্য করতে !

নিলয় ব্যানার্জী কৃতজ্ঞতার হাসি মেখে বললেন : অনেক ধন্যবাদ ! আমি এখন আসি , অমিতা  ঘরে একা আছে।

জয়ন্ত লাহা :আচ্ছা ।

রাত্রি বারোটা : জয়ন্ত লাহা মন দিয়ে অমিতা ব্যানার্জীর রিপোর্ট গুলো পড়তে ব্যস্ত, সোনাকাকু খাওয়া দাওয়ার পর অভ্যাস মত বারান্দায় পায়চারী করছে , তিতিরের  হাতের উপন্যাস টা প্রায় শেষের মুখে ।

সোনাকাকু ঘরে ঢুকতেই জয়ন্ত লাহা বলল , “এই ছুটিতে এসেও ডাক্তারী থেকে মুক্তি নেই , নিজেও জড়ালি  আর আমাকেও ঝামেলায় ফেললি !”

সোনাকাকু হেসে বলল , “তা কতদূর এগোলি ?”

জয়ন্ত লাহা : এখনি কি ! আজকে মনে হচ্ছে সারারাত জাগতে হবে ।

সোনাকাকু : তা তুই জেগে থাক , আমি ঘুমোতে গেলাম , আমার ভাইজি টির আবার  রাত বিরেতে  ঘুম চোখে চলার অভ্যেস ! তাকে খুঁজতে কখন আবার উঠতে হয় ঠিক নেই ।

নিরুত্তর তিতির মুখ বেঁকিয়ে পাশ ফিরে শুলো ।

নবমী 


ভোর ৬ টা : ঠাকুর দালানে ভয়ানক শোরগোলে তিতিরের  ঘুম ভেঙ্গে গেল । তিতির উঠে বারান্দায় যাওয়ার আগেই দরজায় উদ্বেগের টোকা পড়ল । সোনাকাকু ঘুম চোখে উঠে দরজা খুলতেই নিলয় ব্যানার্জী বললেন , “অমিতার ব্যথা উঠেছে স্বাগ্নিক বাবু ! আমরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি , আপনি যদি  দয়া করে জয়ন্ত বাবুকে নিয়ে আসেন  !

“হ্যাঁ , নিশ্চই ! আপনারা এগোন ,আমি জয়ন্তকে নিয়ে আসছি। ” কথাটা বলেই  সোনাকাকু দ্রুত বিছানার কাছে গিয়ে ঘুমন্ত  জয়ন্ত লাহাকে  ধাক্কা দিয়ে বলল  , “জয়ন্ত ওঠ তাড়াতাড়ি ! অমিতা দেবীর লেবার পেইন উঠেছে ! আমাদের হাসপাতালে যেতে হবে । ”

জয়ন্ত লাহা চমকে বিছানায় উঠে বসলেন , তারপর রাত জেগে পড়া রিপোর্ট গুলো দ্রুত ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে তৈরী হয়ে নিলেন ।”

তিতির : “সোনাকাকু আমিও যাব তোমাদের সাথে। ”

সোনাকাকু : “আচ্ছা !”

বেলা ৯ টা : একজন মাঝবয়সী  ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন , “আমরা সবরকম পরীক্ষা করে দেখেছি , মা আর বাচ্চা দুজনেই ভালো আছে, এটা লেবার পেইন নয়  ,তবে  আজ কালের  মধ্যেই ব্যথা ওঠার কথা,নর্মাল ডেলিভারি হবে আশা করছি  ,চিন্তার কোনো কারণ নেই, আপনারা বাড়ি যেতে পারেন , কোনো খবর হলে আমি নিজে আপনাদের ফোন করে দেবো ।”  ব্যানার্জী  পরিবারের সকলের মুখে স্বস্তির হাসি নেমে এলো ।

জয়ন্ত লাহা ডাক্তারের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন ,

>”নমস্কার , আমি Dr  জয়ন্ত লাহা , আমি পেশেন্ট কে একবার দেখতে চাই ।”

>ওহ আমি ,Dr পুলক বর্মন, নিলয়ের সাথে আমার কথা হয়েছে । আপনি নিশ্চই দেখতে পারেন  কিন্তু অমিতা দেবী

এখন ঘুমাচ্ছেন ,আমার মনে হয় ওনাকে এখন বিব্রত না করাই ভালো ।

> ঠিক আছে , আমি তাহলে অপেক্ষা করছি  , ওনার ঘুম ভাঙলে আমাকে ডাকবেন ।

>আচ্ছা ।

বেলা ১১ টা : নিলয় ব্যানার্জী পরিবারের  বাকি লোকজনদের বাড়ি পাঠিয়ে  নিজে জয়ন্ত লাহার পাশে বসে অপেক্ষা করছেন ,তিতির উল্টোদিকের বেঞ্চে বসে আছে, সোনাকাকু করিডোরে  পায়চারী করছে । Dr পুলক বর্মন এসে বললেন, “আপনারা এখন অমিতা দেবীকে যেতে পারেন।”

জয়ন্ত লাহা : ধন্যবাদ ।

পুলক বর্মন যে তার চিকিৎসায় শহরের ডাক্তারের নাক গলানোতে খুশী নন , সেটা তার নিরুত্তর চলে যাওয়া আরো বেশী করে স্পষ্ট করে দিল । এতদিনের পরিচিত  নিলয় ব্যানার্জীর সাথেও তিনি কোনো  কথা বললেন না  ।

সরকারী হাসপাতাল হলেও অমিতা দেবী যে ঘর টি তে শুয়ে আছেন , সেটা বেশ  পরিষ্কার  । নিলয় ব্যানার্জী তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললেন , “অমিতা ! বাড়িতে তোমার সাথে পরিচয় করানো হয়নি ,ইনি Dr স্বাগ্নিক মুখার্জী ,বিখ্যাত হার্ট সার্জেন , উনি Dr জয়ন্ত লাহা , নাম করা gynecologist আর ও তিতির , Dr মুখার্জীর ভাইজি ।”

অমিতা ব্যানার্জী বিছানায় শোয়া অবস্থায় হাসি মুখে হাত জোড় করে বললেন , “নমস্কার , আপনারা কদিনের অতিথি , আমার জন্য শুধু শুধু এত দূর কষ্ট করে এলেন  ! এ নিশ্চই আমার স্বামীর অনুরোধে ।

সোনাকাকু : আমাদের পেশা যে তাই করতে শেখায় অমিতাদেবী ,আপনার স্বামী এখানে নির্দোষ ।

জয়ন্ত লাহা :আপনার রিপোর্ট গুলো আমি দেখেছি অমিতা দেবী , কোনো দিক থেকেই আপনার কেস আমার জটিল মনে হয়নি ,আগে যা হয়েছে তা ভাগ্য দোষ  ছাড়া কিছুই নয় , আপনি মিথ্যা ভয় পাবেন না , আপনার ডেলিভারি খুব সুষ্ট ভাবে হবে এবার । আপনার পরিবার আপনাকে খুব ভালবাসে , অন্তত তাদের কথা ভেবে মনে জোর আনুন ,এই সময় মায়ের মন শক্ত হওয়া খুব দরকার !

অমিতা ব্যানার্জী : ধন্যবাদ ! আপনার কথা শুনে সত্যি ভরসা পেলাম জয়ন্ত বাবু ।

জয়ন্ত লাহা : Dr পুলক বর্মনের  কথা অনুযায়ী আপনার বাচ্চা এখন ভালো আছে, আশা করি সুখবর টা শুনেই কলকাতা ফিরতে পারব ।

অমিতা ব্যানার্জী : আপনারা আর কষ্ট করবেন না , ওই ডাক্তার বাবুই বরাবর আমার চিকিৎসা করে এসেছেন , আমার মৃত সন্তানের জন্য তার ডাক্তারী বিদ্যাকে দায়ী করা অন্যায় হবে , আমার বাড়ির লোকের তার ওপরে ভরসা না থাকতে পারে , কিন্তু আমার আছে।আমার কপালে যদি মা হওয়া না থাকে তাহলে কলকাতার ডাক্তার  কেন, শুনেছি ভগবান নিজেও তার লেখা  ভাগ্যলিখন বদলাতে পারেন না ।

কথাটা বলেই অমিতা ব্যানার্জী ওপাশ ফিরে শুলেন ।

নিলয় ব্যানার্জী  লজ্জিত মুখে হাত জোড় করে বললেন , “ক্ষমা করবেন জয়ন্ত বাবু , আপনাদের তো বলেছিলাম কলকাতার ডাক্তারের ওপর ওর রাগের কারণ ,এত বছরেও আমি কিছুতেই ওকে বুঝিয়ে উঠতে পারিনি যে ভালো মন্দ সব জায়গাতেই  হয় , ওর হয়ে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি,দয়া করে কিছু মনে করবেন না  ।”

জয়ন্ত লাহা : না না ঠিক আছে ! এসময়ে ওনাকে আর বিব্রত করা ঠিক হবে না ,আমরা বরং এখন আসি ।

জয়ন্ত লাহার সাথে সোনাকাকু ও তিতির ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।

বিকেল ৫ টা : চা এর কাপে  চুমুক দিয়ে সোনাকাকু বলল , ” জয়ন্ত ! এখনো তো কোনো খবর এলো না রে , একবার  আমাদের গিয়ে দেখে আসা উচিত,কি বলিস  ?”

জয়ন্ত লাহা : তোর যাওয়ার হলে তুই যা , আজ পর্যন্ত বিনা কারণে এরকম অপমান আমাকে কেউ করেনি ।

সোনাকাকু : আরে নিজের বাবার মৃত্যুর  জন্যেই হয়তো ভদ্রমহিলা …….

জয়ন্ত লাহা : বললাম তো ,আমি আর এর মধ্যে নেই ….

সোনাকাকু :  হুম বুঝলাম ।

রাত সাড়ে এগারোটা : জয়ন্ত লাহার কানের কাছে গিয়ে সোনাকাকু বলল , “আমরা ঠিক দশমী শুরু হওয়ার মহেন্দ্রক্ষণে বেরোব ,চটপট তৈরী হয়ে নে ।”

জয়ন্ত লাহা : মানে কোথায় ?

সোনাকাকু : হাসপাতালে ।

জয়ন্ত লাহা : কেউ কিছু বলেছে নাকি ?

সোনাকাকু : না ! ডাক্তার পেশার কর্তব্য ভুললে চলবে কি করে !

জয়ন্ত লাহা  আরো কিছু বলতে চাওয়ায় সোনাকাকু বলল , “আর কিন্তু ২৫ মিনিট বাকি !”

দশমী 


রাত বারোটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে  প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে একটা ট্যাক্সি তে উঠলো ওরা । ১ টা নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছে সোনাকাকু বলল , “আমরা যেহেতু কাউকে বলে আসিনি , কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে  ব্যানার্জী পরিবারের নাম না নিয়ে  ID কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে ।”

জয়ন্ত লাহা :আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না এভাবে লুকিয়ে আসার মানে কি !

সোনাকাকু : ব্যাপারটা সেটা নয় , আজ সকালের ঘটনার পর ওনারা হয়তো আমাদের সাহায্য নিতে সঙ্কোচ করবেন, আচ্ছা শোন ! তুই অমিতা দেবীর কেবিনে যা , আমি তিতিরকে নিয়ে Dr পুলক বর্মনের সাথে কথা বলে আসি ,ওনার তো এখন হাসপাতালেই থাকার কথা ।

জয়ন্ত লাহা : আচ্ছা ।

সোনাকাকু রিসেপশনে গিয়ে  Dr পুলক বর্মনের  খোঁজ  করায় ওখানে বসা ভদ্রলোকটি তাকে অপেক্ষা করতে বললেন , ডাক্তার এলে উনি ডেকে নেবেন । তিতির জয়ন্ত  লাহাকে দ্রুত পায়ে এদিকে ফিরে আসতে দেখে সোনাকাকুর হাতে হালকা ধাক্কা দিল । বন্ধুর মুখের ঘৃণার অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে সোনাকাকু এগিয়ে গিয়ে বলল , ” কি হয়েছে  জয়ন্ত ?”

জয়ন্ত  লাহা নিজের মোবাইলে একটা ছবি দেখিয়ে বলল , “দ্যাখ ! এই হল অমিতা দেবীর গ্রামের ডাক্তারের চিকিৎসা । শুধু তুই  যাতে এটা আমার অজুহাত না ভাবিস ,লজ্জার মাথা খেয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে এই ছবিটা তাই আমাকে তুলতে হয়েছে ,তোর কি এরপরেও আরো কিছু জানার আছে ? ”

সোনাকাকু চোয়াল শক্ত করে বলল : আছে বৈকি ।

অমিতা ব্যানার্জীর কেবিনের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সোনাকাকু , তিতির বিনা বাক্য ব্যয় তার পিছু নিল ।

সোনাকাকু অমিতা ব্যানার্জীর কেবিনের দরজায় আওয়াজ করতেই , অমিতা দেবী নিজের অসংলগ্ন কাপড় সামলে নিলেন , Dr  বর্মনের কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থা উপেক্ষা করে সোনাকাকু ঘরে ঢুকে বলল :

“আপনার সকালের ব্যবহারের ব্যাখ্যা আমার কাছে থাকলেও Dr  বর্মনের ব্যবহারে খটকা লেগেছিল বৈকি ! ডাক্তারী পেশায় অন্য ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করাকে কখনোই নিজের অজ্ঞতা বলে ভাবা হয় না । আপনাদের সম্পর্ক  Mrs রমলা ব্যানার্জী জেনে ফেলেছিলেন বলেই কি তার এই অকারণ শাস্তি ? আর সকালে নিজের মৃত সন্তানের কথা বলতে গিয়ে আপনার চোখে যখন বিন্দুমাত্র জলের চিহ্ন দেখতে পেলাম না তখন সম্মানের সকল গন্ডি ভেঙ্গে সত্যি জানার আগ্রহ আমার অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। আপনি ইচ্ছা করেই আপনার স্বামীর সন্তান ধারণ করতে চাননি , ‘কাকতালীয়’ শব্দ টা নিতান্তই আপনার ভালো মানুষ স্বামীর বিশ্বাস , তাই না ? নিলয় বাবুর সাথে  তারা তো আপনার অংশ ও ছিল , মা হয়ে বার বার সুকৌশলে নিজের সন্তান হত্যা করার ইতিহাস আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব কে নাড়া দিয়েছে অমিতাদেবী ! আমি এখন বুঝতে পারছি আপনি কেন রাতে ঘুমাতে পারেন না ,পাপের ভার ই বোধহয় আপনার সকল ভয়ের কারণ !”

নিরুত্তর অমিতা ব্যানার্জীর উত্তরের অপেক্ষা না করে তিতির বলল : তুমি ভুল করছ সোনাকাকু ! তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে বলে শোননি,জয়ন্ত কাকু কাল রাতে ওনার রিপোর্ট গুলো দেখে তোমাকে বলছিল যে শুধু একটা জায়গায় তার ভীষণ  খটকা লেগেছে  : অকস্মাৎ পড়ে যাওয়া , তিন তিনবার পেটের সন্তানের মৃত্যুর কারণ হলেও কোনো রিপোর্টে ওনার ইন্টারনাল আঘাতের কথা উল্লেখ নেই বা শরীরের বাইরে  এমন কোনো  জায়গাতেও কখনো আঘাত লাগেনি যা  এমন অনিষ্ট ঘটাতে পারে । তাছাড়া আরেকটা কথা ভেবে দেখো সোনাকাকু , সন্তান হত্যা করতে হলে ভ্রুণ অবস্থায় কেন করেন নি ? শুধু শুধু  ১০ মাস পেটে ধরার যন্ত্রণা সইতে গেলেন  কেন !

সোনাকাকু বিস্মিত হয়ে তিতিরের দিকে তাকাতে সে বলল , ” আমাদের জানা দরকার তিনবারের মধ্যে একবারও ওনাকে পড়ে যেতে অন্য কেউ দেখেছে কি ?”

অমিতা ব্যানার্জী এবার ঘামতে লাগলেন , ওনার কঠিন দৃষ্টি মুহুর্তে কাকুতিতে বদলে গেল ।

সোনাকাকু : কিন্তু আপনার মৃত সন্তান তো সকলে দেখেছে , তাহলে সত্যি টা কি অমিতা দেবী ? কথা দিচ্ছি যদি সঙ্গত কারণ থাকে তা এই ঘরের বাইরে যাবে না ।

অমিতা ব্যানার্জী ভাঙ্গা গলায় বললেন , “তিতির ঠিকই বলেছে স্বাগ্নিক  বাবু , সকলের জানা সত্যি ,পড়ে যাওয়ার কথাটা আসলে নিতান্তই মিথ্যে । নিজের সন্তান কে বাঁচাতে এছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না, নাহলে ঋতু দিদির মত আমার তিনটি মেয়ে সন্তানেরও সমাধি  হত ব্যানার্জী বাড়ির গভীর পাত কুয়ো। Dr বর্মনের সাহায্য ছাড়া ভ্রুণের লিঙ্গ আগে থেকে জানা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না ,উনি আমার তিনটি মেয়েকে সকলের অগোচরে  তিনটি নিঃসন্তান  দম্পতির হাতে তুলে  দিয়েছেন , আমি নিজের পরিচয় গোপন করে ,বিভিন্ন ছদ্মবেশে তাদের সাথে মাঝে মাঝে দেখাও করতে যাই । অন্য জায়গা থেকে সময় মত মৃত শিশুদেহ   Dr বর্মন ই তিনবার  নিয়ে এসেছেন, আমি যে ওনার কাছে চিরঋণী। এত উপকারের বদলে যদি উনি আমার কাছে  সামান্য কিছু দাবী করেন ,তাতে  না বলার সামর্থ্য যে এই মায়ের নেই স্বাগ্নিক বাবু ! ”

সোনাকাকু পিছনে ঘুরে চোখের জল আড়াল করে বলল , “এবার তাহলে আপনার ছেলে হবে ?”

অমিতা ব্যানার্জী : “তাহলে আর সত্যি লুকোতে  আপনার বন্ধুকে বিনা দোষে সকালে এভাবে অপমান করতাম না স্বাগ্নিক বাবু !এবার আমার পেটে যমজ সন্তান , মেয়েটির জন্য একজন নতুন দম্পতি অপেক্ষা করছেন , শুধু এবার আর মৃত শিশুর প্রয়োজন হবে না,আমার ছেলে ব্যানার্জী পরিবারের মনস্কামনা পূরণ করবে । পরম করুণাময় ঈশ্বর অবশেষে এই অসহায় মায়ের কথা শুনেছেন , পরের বছর , বাবার নার্সিং হোমের যন্ত্রের কাছে সত্যি লুকোনো অসম্ভব হত ।

আর একটা কথা , ঋতু দির মত আমার শাশুড়ি মা ও  প্রায়ই কুয়োর পাড়ে  নিজের রক্তের সম্পর্ক গুলোর কাছে কাছে ক্ষমা চাইতে যান। মা  আমাকে নিজের মেয়ের মতই ভালবাসেন,তাই সেদিন আমার সাথে ডাক্তার বর্মন কে দেখে উনি আর মাথার ঠিক রাখতে পারেন নি। ডাক্তারবাবুও নিজেকে বাঁচাতে ভীষণ বড়  ভুল করে ফেলেছিলেন , এই অবস্থায় তাকে বাঁধা দেওয়ার শক্তি আমার ছিল না , তাই কোনভাবে ফিরে এসে নীলকান্ত দা কে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলাম , তার থেকে বেশী বিশ্বাস আমি নিজেকেও করি না , ছোটবেলা থেকে দেখা ব্যানার্জী পরিবারের অগণিত অপরাধের আগুনে জ্বলছে তার শরীর মন , তবু  আমাদের মত হতভাগীদের  মায়ার বাঁধন কাটিয়ে মুক্তির হাতছানিতে সে কখনো সাড়া দেয়নি । ”

সোনাকাকু আর দাড়িয়ে থাকতে না পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল , তিতির চোখের জল মুছে  অমিতা ব্যানার্জীর  পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে বলল , “এবার আমার মেয়ে জন্ম  স্বার্থক হল ।” দ্রুত পায়ে বাইরে এসে দেখলো জয়ন্ত লাহা নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে দরজার পাশে দাড়িয়ে আছেন  ।

দশমীর সকাল ১১ টা  : ঠাকুর দালানে হৈ  হৈ রবে কান পাতা দায় , রণজয় ব্যানার্জী  ঘরে ঢুকে বললেন , জয়ন্ত  বাবু! স্বাগ্নিক বাবু ! সুখবর আছে , হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল , নিলয়ের ছেলে হয়েছে । আপনারা সত্যি আমার বাড়ি মা দুর্গার আশীর্বাদ হয়ে এসেছেন, আজ কিন্তু কিছুতেই আপনাদের ফিরে যাওয়া চলবে না।

জয়ন্ত লাহা গম্ভীর মুখে বলল , বাহ্  ! খুব আনন্দের খবর , আপনাকে অনেক অনেক অভিনন্দন ,কিন্তু ক্ষমা করবেন , আমাকে আজ কলকাতায় পৌঁছতেই  হবে, বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান আছে ,তাই দুপুরে না  বেরোলে দেরী হয়ে যাবে ।

রণজয় ব্যানার্জী : ওহ , বিজয়া র শুভেচ্ছার কোলাকুলি  তাহলে পরের বছরের জন্য তোলা থাকলো । আসলে নদী টা অনেকটা দূর তো , প্রতিমা ভাসান দিয়ে ফিরে আসতে সন্ধ্যে হয়ে যায় ।

তিতির বিদ্রুপের স্বরে বলল, “বাড়িতে এত বড় পাতকুয়ো থাকতে ভাসানের জন্য ওত দূরে যাওয়ার কি দরকার  !”

কথাটা শুনে ভদ্রলোক মুহুর্তের জন্য বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন ।

সোনাকাকু পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল , “ওর কথা ছাড়ুন তো ,ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে তো তাই বাংলার নিয়ম কানুন কিছু জানে না । নদীর জলের বিস্তৃতি দূর্গা  মায়ের চোখের জলকে আপন করে নিয়ে  , বিদায়ের আন্তরিকতার মধ্যে দিয়ে তার শক্তিরূপ ফিরিয়ে দেয় তিতির  আর সেই রূপকেই ধারণ করে সকল পাপের বিনাশ করতে আবির্ভূত হন মা কালী।

ভদ্রলোক হেসে বললেন , “সত্যি আপনার কথা শুনে মন ভরে গেল স্বাগ্নিক বাবু ! ভাবছি পরের বছর থেকে ব্যানার্জী বাড়িতে কালী পুজোও শুরু করব।”

দুপুর ২ টো  : ওদের তিনজন কে নিয়ে গাড়ি টা কলকাতার দিকে রওনা হতেই তিতির বলল , “অমিতা ব্যানার্জীর কাছে স্বামীর পদবী টা কি ভীষণ গুরুত্বপূর্ন ?”

সোনাকাকু : হয়তো হ্যাঁ , এখনো আমাদের দেশের সব মেয়েরা যে তোর মত স্বাধীন নয় তিতির ! পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাদের খাঁচার দরজা শক্ত করে আটকে দেয় ,কিন্তু অমিতা দেবীর মত মেয়েরা সে খাঁচার মধ্যে থেকেও স্বাধীনতার নতুন মানে অবিষ্কার করেন , আজকের সমাজ তাদের কাছে কৃতজ্ঞ ।

ধর্মের খাবার

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ক্ষুধার্ত ছেলেটি একলা রাস্তায় হাঁটছে । খিদের জ্বালায় চোখের সামনে মাঝে মাঝে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসছে , ভিড়ের পিছনে চলতে চলতে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল  ,জায়গা টা সে চেনে না , কেউ তাড়িয়ে দেবার আগের সময়টুকু যদি জিড়িয়ে নেওয়া যায় ।

হঠাৎ একজন তার সামনে একটা শালপাতা রেখে  দিয়ে গেল , কিছু বোঝার আগেই  আরেকজন ভদ্রলোক সামনে রাখা শালপাতায় ভাতের হাতা কাত করার চেষ্টা করতেই  ছেলেটি  অস্ফুটে  বাঁধা  দিয়ে  বলল , “আমাকে দেবেন না ! ধর্মের খাবারে আমার অধিকার নেই ,  মিথ্যাচারের বিনিময়ে লাথি সহ্যের ক্ষমতাও এই মুহুর্তে  আমার শরীর  হারিয়েছে । “

ভদ্রলোক হেসে বললেন  : তোমার বুঝি খিদে নেই ?

ছেলেটি : আমি জানি না আমার জাত কি , ধর্মের নাম ও অজানা , কোনো অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব আছে বলেও কখনো মালুম হয়নি , তাই বিশ্বাসের প্রশ্ন অবান্তর ।

ভদ্রলোক  : আমার প্রশ্নটা বোধহয় তুমি  ঠিক করে শুনতে পাওনি , বলছি এত বেলাতেও তোমার খিদে পায়নি  ?

ছেলেটি  : আর কিছুক্ষণ না খেলে হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাব কিন্তু …

ভদ্রলোক  : তাহলে আর দেরী না করে চটপট খেয়ে নাও । আর একটা কথা , এখানে খাবার জন্যে খিদে থাকাই যথেষ্ঠ  ।

খাবারের প্রথম গ্রাস মুখে দিয়ে ছেলেটির কানে স্মৃ তির  কথাগুলো আবার বেজে উঠলো ….”তোর নাম কি  রে ছোকড়া  ? দেখে তো মনে হচ্ছে মুসলিমের বাচ্চা ! ….এই  সোমনাথ ! কয়েকটা লাথি ঘুষি মেরে ব্যাটাকে ছেড়ে দে এবার ,আবার কোনদিন  মন্দিরে চত্তরে ঘুরঘুর করতে দেখলে  হাত পা ভেঙ্গে দিবি !  “

” সালাম আলাইকুম বলতে জানে না শুধু গান্ডে পিন্ডে গেলার জন্য  মুসলিম সাজার সখ ! পেদিয়ে ধুনে  দে  ওটাকে , আলহার  বান্দারা ধর্মের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার সহ্য করে না , এই সত্যি  যেন ও কোনদিন ভুলতে  না পারে !”

“আরে এখানে খাবার দাবার  পাওয়া যায় না তবে এই গেটের বাইরে আমার মোমবাতির ব্যবসা দারুন চলে ,ওই হাড়ি কাঠে   ঝোলা লোকটার কাছে গিয়ে মোমবাতি কেন দাবানল জ্বালালেও কিছু হবার নয় , আরে যে নিজেই হাড়ি কাঠে …সে যাই হোক , এই সব কথা বলিয়ে আমার রোজের কাস্টমার না তাড়ালে  তোর শান্তি নেই  দেখছি ! যা ভাগ এখান থেকে !”

“শোন রে ছেলে !  কৃষ্ণ , মহম্মদ  , যীশুর কথা  ছাড় দেখিনি , সবাইকে দলে পাওয়ার একটাই উপায় ,  ‘অদৃশ্য শক্তি’ শব্দ টার প্রয়োগ , হ্যাঁ  হ্যাঁ  !  খাবারের প্যাকেট পাবি , আগে আমাদের  নতুন ধর্মের ব্যবসার খরিদ্দার ধরে দে কটা !অফিস টাইমে শিয়ালদহ  স্টেশনে দাড়িয়ে লোকের হাতে এই  প্যাম্ফ্লেট গুলো  ধরাবি , সে যতই ব্যস্ত থাকুক অথবা  রেগে যাক ,ফ্রি তে লাড্ডু খাওয়ার মতই গালাগালি -চড় চাপড় খাওয়ার অভ্যাস  নিশ্চই হয়ে গেছে এতদিনে।”

খিদের জ্বালা মেটায় ছেলেটার অবসন্ন শরীর খানিক  চাঙ্গা হল । সে অবাক হয়ে  তাকিয়ে দেখল , কোনো অজানা কারণে  তার আশেপাশের বেশীরভাগ মানুষগুলোর মাথা কাপড়ে ঢাকা , কেউ রুমালে ঢেকেছে , কেউ  শাড়িতে , কেউ বা গায়ের ওরনা দিয়ে । কিছু ছাড়া ছাড়া কথা ছেলেটির  কানে ভেসে এলো ,  ‘রাত্রের লাঙ্গারের সময়টা জানিস তো !’  , “সত শ্রী অকাল !’ , ‘ওয়াহে গুরু ‘ ,  এসবের মানে বুঝতে না পেরে শালপাতার বাকি খাবারে মনোনিবেশ করলো সে  । ধর্মের  নাম না জেনেই পেট  তার গুনগান গাইছে , প্রথমবার কেউ স্মৃতির চোখ ঢেকে বলছে , ‘ধর্ম  মানে খুনখারাপি বা ধান্ধাবাজি নয় ,ধর্ম মানে ক্ষুধার্ত পেটে বিনা কৈফিয়তে ডাল ভাতের শান্তি মিছিল ।’

প্রত্যাবর্তন

Comments 6 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

নিজের আবিষ্কৃত মাইন্ড রিডার যন্ত্রটি , গিনিকে তার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উপলব্ধি করিয়েছে। ছোট বেলায় মা হারানো মেয়েটা , এক অচেনা নারীর মধ্যে মায়ের মমতার সন্ধান পাওয়ায় , তার সম্পূর্ণ  অস্তিত্ব , এক অসম্ভব পরিতৃপ্তিতে ভরে উঠেছে , সেই স্বর্গী য় অনুভূতি ই তাকে এক  নতুন ফর্মুলা তৈরীর অনুপ্রেরণা দিয়েছে । গিনির ব্যস্ত আঙ্গুল  সেই ফর্মুলায় তৈরী নতুন যন্ত্রের শেষ  স্ক্রু টা আটকে দিল । যন্ত্রটির বিশেষত্ব হল  , হারানো জিনিস ফিরিয়ে দেওয়ার অলৌকিক ক্ষমতা,  তবে সেই ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত , জন প্রতি যেকোনো একটি  জিনিসই এটি ফিরিয়ে দিতে পারবে। এখন নতুন যন্ত্রটি  প্রত্যাশা মত  কাজ করবে কিনা আর যদি করেও তাতে কতটা সময় নেবে, তা পরীক্ষা সাপেক্ষ ।

মাইন্ড রিডার যন্ত্রটিকে হাতে নিয়ে  বিছানায় তার প্রিয় কুকুর লজেন্সের পাশে  শুয়ে পড়ল গিনি। লজেন্স তখন  গিনির নতুন কিনে দেওয়া প্লাস্টিকের হাড় টা আপন মনে কামড়াতে ব্যস্ত , গিনি তার গায়ে হাত রেখে আদর করে বলল , “লজেন্স! তোর ভীষণ প্রিয় কোনো কিছু  কি হারিয়ে গেছে  ?” মাইন্ড রিডার  যন্ত্র টা থেকে উত্তর  ভেসে এলো , “গেছেই  তো , তোর কিনে দেওয়া লাল বল টা । তুই যখন বাড়ি থাকতিস না , আমি তো ওটাকেই গিনি ভেবে জড়িয়ে শুয়ে থাকতাম । হতচ্ছাড়া লালুর বড় লোভ ছিল ওটার ওপর, আমার তো ওকেই বল লোপাটের পিছনে  সবচেয়ে বেশী  সন্দেহ হয় ।” গিনি দ্রুত বিছানা থেকে উঠে গিয়ে টেবিলে রাখা  নতুন যন্ত্রের ‘ON’ বোতাম টা টিপে দিয়ে বলল, “লজেন্সের লাল বল ফিরিয়ে দাও প্রত্যাবর্তন ।” প্রত্যাশা মতই যন্ত্রটি সাথে সাথে লজেন্সের সারা শরীর ক্ষনিকের বৈদ্যুতিক আলো দিয়ে স্ক্যান করে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল । এরপর শুধু ইচ্ছাপূরণের অপেক্ষা ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার নেই ।

পরদিন সকালে গিনি ঘুম থেকে উঠে  দেখলো , লজেন্স তার সেই খেলনা হাড় টা নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে , ঘরের চারিদিকে তাকিয়েও লজেন্সের হারিয়ে যাওয়া বলের ফিরে আসার কোনো চিহ্ন গিনি দেখতে পেল না।

“না ! না ! এত তাড়াতাড়ি  হার মানলে চলবে না” , নিজের মনেই বলে উঠলো সে । চটপট মুখ ধুয়ে ব্রেকফাস্টের টেবিলে গিয়ে বলল , ” মা ! তোমার কি কিছু হারিয়ে গেছে ?”

টেবিলে খাবার সাজাতে ব্যস্ত ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে বলল , ” কই না তো ! কেন বলতো ? “

গিনি : “ভেবে বলো , এমন কিছু , যা তুমি ফেরৎ চাও , যা না পেলে তোমার জীবন অসম্পূর্ণ ।”

মা : “না আমার কিছু হারায়নি , স্বামী  সন্তান  নিয়ে সুখী পরিবার আমার , ওত চাই চাই করলে ভগবান রাগ করবেন যে! তা তুই বা হঠাৎ একথা জিজ্ঞাসা করছিস কেন ! লজেন্স নিশ্চই আবার কিছু মুখে করে নিয়ে গিয়ে তোর ঘরে রেখেছে !”

গিনি : “আরে না না ! সে তোমায় পরে সব খুলে বলব ক্ষণ ,এখন আমায় একটু প্রতিমা মিসের বাড়ি যেতে হবে ।”

মা : “সে যা কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস । “

নতুন যন্ত্রটা হাতে নিয়ে  প্রতিমা মিসের বাড়ির উদ্দ্যেশে বেরিয়ে গেল গিনি। প্রতিমা মিস গিনির সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষিকা, উনি না থাকলে, বিজ্ঞান কে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে , গিনির বোধহয় আর শেখা হত না। মিসের বাড়িতে কয়েকবার তার ছেলেকে গিনি দেখেছে । কাজের সুত্রে আমেরিকা নিবাসী ছেলের অনেক অনুরোধ সত্তেও  মিস এই বাড়ি ছেড়ে বিদেশ যেতে রাজী না হওয়ায়  ,শেষমেষ মায়ের জেদের কাছে হার মেনে খুব শিগগিরি পরিবার  নিয়ে তার স্থায়ী ভাবে দেশে ফেরার কথা । স্কুলের  বন্ধুদের মুখে গিনি  শুনেছে , প্রতিমা মিসের  একটি মেয়েও ছিল । ২৫ বছর আগে সেই ষোড়শী মেয়েটি ,হঠাৎ সকালে নিজের পছন্দের ভালবাসার হাত ধরে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার আগে নিজের বাবা মায়ের জন্য রেখে গিয়েছিল ,একটি  চিঠি আর বাকি জীবনে সীমাহীন কষ্টের কঠিন অভিশাপ। এতদিন এত কথার মধ্যেও মিসকে  কখনো কাউকে সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়ের কথা  বলতে গিনি শোনেনি ,তার মত মায়ের দুঃখ সইবার ক্ষমতা অতি বড় বিধাতার ভাগ্যলিখন কে যে অবলীলায় বিদ্রুপ করতে পারে , সেই নির্মম সত্যি ব্যক্ত করে মিসের মুখে নিরন্তর হাসি। তবুও সেই হাসির আড়ালে লোকানো ,বছর পুরনো কষ্ট , গিনির সংবেদনশীল মনের কাছে  বার বার ধরা পড়েছে। মিসের  অনুপস্থিতিতে সে মেয়ে যদি কোনদিন বাড়ি এসে  বন্ধ তালা দেখে  আবার  ফিরে যায় , সেই ভয় ই যে মিসকে  এ  বাড়ি ছেড়ে কখনো কোথাও যেতে দেয়নি , তা আরো অনেকের মত  গিনিও  জানে । গিনির যন্ত্রটার অলৌকিক শক্তি কি পারবে সেই অভিশাপের যন্ত্রণার বদলে বৃদ্ধা  মায়ের মুখে এক চিলতে হাসি ফিরিয়ে দিতে? “নিশ্চই পারবে”, ভিতর থেকে জবাব পেল সে ।

দরজার কলিং বেল টা বাজতে প্রতিমা মিস দরজা খুলে দিলেন , এত বয়সেও উনি কারোর উপর নির্ভর করতে পছন্দ করেন না , বিদেশ থেকে ছেলের পাঠানো এই  অত্যাধুনিক স্বয়ং ক্রিয় হুইলচেয়ার টি ,তার মায়ের স্বনির্ভর থাকার ইচ্ছাপূরণে অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।

প্রতিমা মিস হেসে বললেন , “ভেতরে আয় ! কেমন আছিস গিনি ? এতদিন বাদে বুঝি মিসকে মনে পড়ল !”

গিনি ভিতরে ঢুকে বলল : “কদিন আগেই তো এসেছিলাম ,  আমার ভুলোমনের রোগ টা আপনার থেকেই পাওয়া ।”

প্রতিমা মিস : “তোর আর আমার বয়স বুঝি এক ?”

গিনি :”এখন এক না হলেও , খুব তাড়াতাড়ি আমি আপনার বয়সে পৌঁছে যাবো ,আমার বয়স তো আর আপনার মত এক জায়গায় থেমে  নেই !”

প্রতিমা মিস হেসে বললেন : “সেই ! আমার বয়স বাড়ছে না ! চোখ কানের শক্তি এমনি এমনি কমে আসছে , আমার বৈজ্ঞানিকের বুদ্ধির উপর ভালবাসার মরচে পড়েছে । “

গিনি একটু চুপ করে থেকে বলল : আচ্ছা মিস ! হঠাৎ যদি আপনার নিজের মেয়ে ফিরে আসে আপনি কি আমাকে ভুলে যাবেন ?

কথাটা শুনে প্রতিমা মিসের মুখে এক  মুহুর্তের জন্য বিষাদের অন্ধকার ছায়া পড়ল, পরক্ষণেই চেনা হাসি ফিরিয়ে এনে বললেন , “তোর কথা আমাকে শ্মশানের আগুনও ভুলিয়ে দিতে পারবে না গিনি ,তুই একটু বস দেখিনি ,আমি তোর প্রিয় গুজিয়া নিয়ে আসি ।”

হুইল চেয়ার টা পিছনে ঘুরতেই  গিনি নতুন যন্ত্রটা ব্যাগ থেকে বার করে বলল ,”প্রতিমা মিসের মেয়ে ওনাকে ফিরিয়ে দাও প্রত্যাবর্তন !” যন্ত্রের  ভিতর থেকে একটা হালকা আলো বেরিয়ে দরজার কাছে চলে যাওয়া মিসের শরীর ছুয়ে আবার ফিরে এলো ।

গুজিয়া খেতে খেতে অনেক ক্ষণ গল্প করার পর , প্রতিমা মিসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু পথ যেতেই , গিনির সাথে তার বাবার ছোটবেলার বন্ধুর মেয়ে অনামিকা দিদির দেখা হয়ে গেল ,মেয়েটি  তাকে জড়িয়ে ধরে বলল ,”কতদিন বাদে তোকে দেখলাম গিনি ! বাবার দিল্লী ট্রান্সফারের পর আমার আর কলকাতা আসাই হয়নি ,কলেজের পর ওখানেই চাকরি ,এবার ছুটি নিয়ে মায়ের সাথে মামাবাড়ি এসেছি,দেখা যখন হয়েই গেল , চল না কোথাও বসে গল্প করি।”

বয়সে ১০ বছরের বড় এই মেয়েটি ছোট থেকেই  গিনির খুব প্রিয়,বছর চারেক তাদের দেখা না হলেও  চেনা আন্তরিকতার স্পর্শে গিনির মন ভীষণ খুশীতে ভরে উঠলো । সামনের  সি. সি.ডি  তে কফি খেতে খেতে গিনি বলল ,”বাবা বলছিল তোমার আর জয়ন্ত দার  নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে।”

অনামিকা দিদি অল্প হেসে বলল ,” কাকু ঠিকই শুনেছিলেন রে , আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে আবার ক্যানসেল হয়ে গেছে । “

গিনি : সেকি ! কেন ?

অনামিকা : জয়ন্তের সাথে আমার অনেকদিন ধরেই সমস্যা চলছিল রে , দুদিকের পরিবারের চাপে দুজনে  বিয়েতে রাজী হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু  দিন দিন সমস্যা আরো জটিল হয়ে আসছিল , ওর মত  নির্বিকার স্বভাবের ছেলের কাছে আত্মসম্মান জলান্জ্বলি  দিয়ে ভালবাসার দাবিতে বার বার হাত পাতা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না তাই এই  চূড়ান্ত  সিদ্ধান্ত যা মুহুর্তে আমার জীবনের সব কিছু বদলে দিয়েছে গিনি ! সবটা হয়তো জয়ন্তের  দোষ  ছিল না  , আমিও শেষের দিকে খুব অধৈর্য হয়ে পড়েছিলাম । এখন সবসময় মনে হয় জানিস ,১২ বছরের পুরনো সম্পর্ক কে এভাবে শেষ করে দেওয়ার আগে আরো একটু সময় নেওয়া উচিত ছিল , সবকিছু হয়তো ততটা খারাপ ছিল না যতটা তখন মনে হয়েছিল ,আরো খানিকটা চেষ্টা করলে হয়তো এরকম টা হত না । যাক ওসব আর ভেবে লাভ নেই ..

অনামিকা দির চোখের কোণে জল লক্ষ্য করে গিনি বলল : জয়ন্ত দা যদি তোমার জীবনে ফিরে আসে তাহলে  …

অনামিকা : জয়ন্তের সাথে আমার অনেকদিন যোগাযোগ নেই রে , যা চলে যায় ,তা যে আর ফিরে আসে না গিনি , সময়ও না , তার সাথে হারিয়ে যাওয়া মানুষজনও না । এখন উঠি রে , খুব ভালো লাগলো তোর সাথে দেখা হয়ে , এখনো ১৫ দিন  আছি এখানে , যাওয়ার আগে আরেকবার দেখা করব তোর সাথে ।

গিনি অল্প হেসে বলল , “আচ্ছা !”

অনামিকা দিদি দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে গিনি যেই বলল , “অনামিকা দিদির জীবনে জয়ন্ত দা কে ফিরিয়ে দাও প্রত্যাবর্তন”, হাতের যন্ত্রটা স্বভাব মত অনামিকা নামের মেয়েটির গায়ে নিজের আলো ছুইয়ে ফিরে এলো ।

বাড়িতে ফিরে  স্নান সেরে , দুপুরের খাবার খেয়ে , মা আর লজেম্সের সাথে একটু ঘুমিয়ে নিল গিনি । সন্ধ্যে বেলা পড়াশোনার চেষ্টা করলেও বইতে তার মন বসলো না । দেখতে দেখতে রাত হয়ে এলো , গিনির মনে হল ফর্মুলাটা বোধহয় কাজ করছে না , আবার নতুন করে ভাবতে হবে তাকে । বিছানায় লজেন্সের পাশে শুয়ে গিনি  বলল ,”তোর বুঝি লাল বলটার কথা খুব মনে পড়ে লজেন্স ? তুই চিন্তা করিস না ,আমি তোকে ওইরকমই আরেকটা বল কিনে দেব ।”

লজেন্স মাথাটা গিনির  হাতে রেখে ,থাবা দিয়ে তাকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল ।

সকালে ঘুম ভাঙতেই , রোজের মত ব্রেকফাস্টের টেবিলে গিয়ে বসলো  গিনি ।তার সামনে প্লেট রেখে মা বলল , “আমি একটু আজকে রিনি দির বাড়ি যাবো , সন্ধ্যের আগেই ফিরে আসবো । দুপুরের খাবার গুলো যেন প্লেটে ঢাকা না পড়ে থাকে গিনি !

গিনি হেসে বলল : আচ্ছা !

বেলা  এগারটার দিকে গিনির ফোনটা বেজে উঠলো , ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সুনন্দার  কন্ঠস্বর ,”গিনি ! প্রতিমা মিস বেলভিউ নার্সিং হোমে ভর্তি ! কাল রাতে হার্ট এটাক হয়েছে , অবস্থা ভালো নয় ,এখন কাউকে দেখা করতে দিচ্ছে না ।আমাদের বুলা মাসি তো প্রতিমা মিসের বাড়িতেও রান্না করে ,ওর থেকেই আজকে খবর পেলাম ,কাল দুপুরে নাকি মিসের মেয়ে নিজের স্বামীকে নিয়ে এতদিন পরে হঠাৎ  এসে হাজির , কোনো রাখ ঢাক না করে সম্পত্তির সমান ভাগের দাবীতে উকিলের চিঠি ধরিয়েছে । মিসের শরীর বিশেষ ভালো ছিল না ,তার ওপরে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে চলা এই জোরজুলুম না নিতে পেরে , গতকাল রাত আট টার দিকে ওনার হার্ট এটাক হয় । ওই মেয়ের স্বামী নাকি ফন্দি আটছিল ,মিস হঠাৎ মারা গেলে তাদের কেস নাকি আরো অনেক সহজ হয়ে যাবে । বেগতিক দেখে বুলা মাসিই পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে , পাড়া প্রতিবেশীকে খবর দিতে সবাই এসে মিসকে নার্সিং হোমে নিয়ে যায় । ওনার ছেলেকেও খবর দেওয়া হয়েছে , আজকে রাত্রেই এসে পৌঁছানোর কথা ….”

গিনি  ফোনটা কেটে দিয়ে ভেজা চোখে বিছানায় বসে পড়ল । এসবের জন্য তার নিজেকেই দায়ী মনে হচ্ছে , সে যে কেন বুঝতে পারেনি যে কিছু জিনিস, কিছু সম্পর্ক , চির তরে হারিয়ে যাওয়াই ভালো। যারা ভালবাসার মূল্য  বোঝে না ,আত্মহননের কঠিন পণ করে ভালবাসা তাদেরই প্রানপনে জাপটে ধরে থাকে , এই নির্মম সত্যির এভাবে সামনে আসার কি খুব  দরকার ছিল !   বৃদ্ধা মায়ের  মুখে এক চিলতে হাসি  ফিরিয়ে দেবার খেলায় ,সবকিছু আগের মত হয়ে যাওয়ার মিথ্যা আশাটাও , তার কাছ থেকে আজ কেড়ে নিয়েছে গিনি ! কিন্তু এ যে সে চায়নি , প্রত্যাবর্তন যে শুধু ফিরিয়ে দিতেই জানে, দিয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার কৌশল শুধু যে ভগবানের আয়ত্তে । কথাটা মনে হতেই ঠাকুর ঘরে ছুটে গিয়ে মায়ের বসানো কৃষ্ণমূর্তি র সামনে হাত জোড় করে গিনি বলল , “প্রত্যাবর্তনের অভিশাপ ফিরিয়ে নাও ভগবান , প্রতিমা মিসের মৃত্যুর কারণ তার ভালবাসার বিজ্ঞান কে কিছুতেই হতে দিও না ।” গিনির অবিরাম চোখের জলে ভাবলেশ হীন পিতলের মূর্তির পা ভিজে যেতে লাগলো ।

হঠাৎ দরজার কলিং বেলের আওয়াজে চমকে উঠলো গিনি । চোখের জল মুছে দরজা খুলতেই দেখলো অনামিকা দিদি হাসিমুখে দাড়িয়ে আছে । গিনিকে গতকালের মতই জড়িয়ে ধরে সে বলল , “সব ঠিক হয়ে গেছে গিনি ,কালকে তোর সাথে কথা বলে ফেরার পথে হঠাৎ জয়ন্তের সাথে দেখা হয়ে গেল ।’কাকতালীয়’ শব্দের ব্যবহার এখানে ঠিক পর্যাপ্ত নয় , কোনো এক মায়াবী শক্তির যাদুতেই বোধহয় এতদিন পরে জয়ন্তও আমার মত  ছুটি নিয়ে কলকাতার বাড়িতে এসেছিল আর ঠিক ওই সময়েই  পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা করে বাড়ির পথে এগোচ্ছিল ।আমরা চেষ্টা করেও কাল একে ওপর কে এড়িয়ে যেতে পারিনি । একসাথে সারা সন্ধ্যে কাটানোর পর , আমাদের মধ্যে অতীতের ভুল বোঝাবুঝির বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব নেই । ভালবাসা হারানোর পরই , তাকে ছাড়া জীবনের মূল্যহীনতা চোখে পড়লেও আর সকলের মতো সময়ের কাছে আমরাও খুব অসহায় ছিলাম রে ! ওই নির্বিকার স্বভাবের পিছনের সহজ মানুষটা  কেই  যে আমি ভালো বেসেছিলাম , দৈনন্দিন চাওয়া পাওয়ার জটিলতায় সেই সত্যিটা আমি  নিজের অজান্তেই কখন যেন ভুলে গিয়েছিলাম ,তাই হয়তো জয়ন্তেরও মনে হয়েছিল  যে  ওর ওপর আমার অনুভূতি , ক্ষনিকের মতিভ্রম ছাড়া কিছুই নয় যা সারাজীবন দুটো মানুষকে একসাথে রাখার জন্য যথেষ্ঠ নয়। সব পাওয়ার আশায় কোনো কিছু হারানোই আর বাকি ছিল না,কালকের দিন টা না এলে ভাগ্যের পরিহাসের সাথে আপোষ করা ছাড়া আর হয়তো কোনো উপায়ই থাকত না। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না গিনি ! তুই হলি আমার লাকি চার্ম । তোকে ফোনে জানাতে কিছুতেই যে মন চাইল না , তাই এভাবে  ছুটে এলাম ।

গিনি মুখে অল্প হাসি এনে বলল , “তোমরা  খুব ভালো থাকো অনামিকা দিদি । ফেরৎ  পাওয়া সম্পর্কের  মুখ ,  স্মৃ তির আয়নায় চেনা লাগলে তার আনন্দ যে সীমাহীন হবে সেটাই প্রত্যাশিত কিন্তু সবার আর সে ভাগ্য কোথায় ! আমাকে এখনি একটু বেরোতে হবে অনামিকা দিদি,আমি সময় করে তোমাদের বাড়ি গিয়ে বাকি গল্প শুনব ক্ষণ ।

অনামিকা নামের মেয়েটি হেসে বলল , “আচ্ছা ! ঠিক আসিস কিন্তু , আমি এলাম এখন ।”

না খেয়ে দেয়ে , নার্সিং হোমে সন্ধ্যে অব্দি বসে থাকার পর ,ডাক্তার যখন বলল প্রতিমা মিস এখন সম্পুর্ন বিপদমুক্ত , গিনির স্বস্তির নিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞান তার পাপের ভার থেকে মুক্তি পেল । কাল সকালের আগে মিসের সাথে কারও দেখা করা বারণ ,তাই অগত্যা বাড়ির পথ ধরলো গিনি। প্রচন্ড বৃষ্টিতে স্নান করে বাড়ি ঢুকে দেখলো মা এখনো ফেরেনি ।বাবার  আসানসোল থেকে ফিরতে পরশু হযে যাবে , বাড়ি একদম ফাঁকা । লজেন্সের আদর সামলে ভিজে জামা ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল গিনি ,তার ক্লান্ত মন আনমনা হয়ে গেল আকাশ পাতাল চিন্তায় । হঠাৎ ল্যান্ড ফোন টা বেজে উঠলো , গিনি ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে মায়ের গলা , “গিনি ! সারাদিন কোথায় ছিলি ? কতবার ফোন করেছি তোকে , ফোনটা বন্ধ রেখেছিলি কেন ? আচ্ছা শোন ! প্রচন্ড বৃষ্টিতে রাস্তায় আটকে পড়েছি ,জায়গাটা ভালো চিনিও না , সব যানবাহন বন্ধ হয়ে গেছে , সামনে  নাকি বাজ পড়ে  বড়সর দুর্ঘটনা হয়েছে , কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না ।মালতীকে বলেছি আমি না ফেরা পর্যন্ত ও আমাদের বাড়িতে থাকবে , আমার ফোনে বেশী চার্জ নেই….”

গিনি কিছু বলার আগেই লাইন টা কেটে গেল, মায়ের জন্য ভীষণ চিন্তায় আবার  নম্বর টা ডায়াল করতেই বুঝলো  মায়ের ফোন বন্ধ হয়ে গেছে । রাত বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টিও বেড়ে চলল । গিনি বাড়ি ফেরার পরে মালতী দি কে দেখেনি , বাইরে বাজ পড়ার শব্দে লজেন্সও ভয়ে লেজ গুটিয়ে  শুয়ে আছে বিছানায় । মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করছে গিনির , বাবার কাছে সে শুনেছে এরকমই এক জল ঝড়ের রাতে গাড়ি দুর্ঘটনায় তার মায়ের মৃত্যু হয়েছিল , ২ বছরের গিনিকে সেই আতঙ্ক ছুতে না পারলেও আজ তার সারা শরীর ভয়ে অবশ হয়ে আসছে । এই বৃষ্টিতে একা রাতে মার যদি কোনো বিপদ হয়  , তার নতুন মা ও যদি তাকে  ছেড়ে। … “না না ! তা কিছুতেই হতে পারে না ”  কথাটা বলেই এক অজানা ভয়ে টেবিলে রাখা যন্ত্রের কাছে গিয়ে গিনি বলল , “আমার মা কে বাড়ি ফিরিয়ে দাও প্রত্যাবর্তন !”  যন্ত্রের আলো গিনিকে ছুয়ে  বন্ধ হয়ে গেল ।

“এ কি করলি গিনি !” তার ভিতরের মেয়েটা আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠলো ! ” বিজ্ঞানের কাছে মা মানে তো রক্তের সম্পর্ক ! তুই তো নিজের অজান্তে নিজের মৃত মা কে ফেরৎ চেয়ে বসলি ! এখন বাকি হিসেব মেলাতে পারবি তো ?” এক প্রচন্ড ভয়ে গিনি দরদর করে ঘামতে লাগলো ,  সত্যিই তো ! মা বলে এখন যাকে জানে , সে তো তাকে জন্ম দেয়নি , প্রত্যাবর্তন যদি অলৌকিক শক্তিতে সত্যি তার  নিজের  মৃত মা কে ফেরৎ নিয়ে আসে তাহলে গিনির বর্তমান পৃথিবী যে মুহুর্তে লন্ড ভন্ড হয়ে যাবে।

মাথা ব্যথা টা  আরো বাড়তে লাগলো , নিজেকে এত অসহায় এর আগে  কখনো লাগেনি তার, বাইরের বিদ্যুতের চমকানি ভিতরের ভয় কে ক্রমান্বয় বাড়াতে লাগলো । দরজা খোলার হঠাৎ আওয়াজে চমকে উঠলো গিনি । ভয়ে চোখ বুজে বালিশ আঁকড়ে শুয়ে রইলো সে , ঘরের ভিতরে আসা পায়ের শব্দ আরো বেশী করে স্পষ্ট হয়ে এলো। ঘর জুড়ে সব শেষ হয়ে যাওয়ার আগের নিস্তব্ধতা। চোখ জুড়ে ঘুমের আবেশ  নাকি সংজ্ঞা হীন হওয়ার পূর্বের সঙ্কেত !

সকালে গিনির যখন ঘুম ভাঙ্গলো, মার কোলে তার মাথা । মা তাকে আদর করে বললেন , ” এখন আর একটুও জ্বর নেই ,ভ্যাগিস বৃষ্টি থামার অপেক্ষা না করে হেঁটে হলেও আমি ভোর রাতে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম ,না হলে যে আমার মেয়েটার কি হত !  মালতীকে আমি আজই ছাড়িয়ে দেব , মিথ্যেবাদী কোথাকার ! “

গিনি মায়ের চেনা মুখটা দেখে স্বস্তির নিঃ শ্বাস ফেলে বলল  : আমার বুঝি জ্বর হয়েছিল ?

মা : তা নয়তো কি ! আমি এসে দেখলাম , তোর  গা আগুনের মত গরম । জ্বরের ঘোরে কিসব আবোল তাবোল লিখেছিস দ্যাখ ,আমি তো মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না , টেবিলের উপরে পাতাটা রাখা ছিল ।

মায়ের হাতের সাদা পাতাটা হাতে নিয়ে গিনি এক নিঃশ্বাসে লেখাটা পড়ল ,

“ফিরে আসার সময় যে নির্দিষ্ট, গিনি ! তা পেরিয়ে গেলে সময় নিজে হাতে সে দরজা বন্ধ করে দেয় , অলৌকিক শক্তি বলে জোর করে নিয়মের অবমাননা করলেও , সে শক্তি যে অন্যের অধিকৃত নিজের সবকিছু ফিরিয়ে দিতে অক্ষম ! “

লেখাটার ধরন গিনির সাথে মিললেও , গিনি বুঝতে পারলো এটা তার নিজের লেখা নয় ,মায়ের কোল আঁকড়ে ধরে , চোখের জলে অজানা কারো যন্ত্রণা উপলব্ধি করলো  গিনি।

লজেন্সের হঠাৎ  উল্লাসে চমকে উঠলো মা ও গিনি দুজনেই , লাল বলটা মুখে নিয়ে সোফার উপরে পাগলের মত লম্ফ ঝম্পের পর বিছানায় উঠে গিনিকে অবিরাম আদর করে চলল সে,তার চোখে মুখে বিশ্ব জয়ের আনন্দ । গিনি লজেন্সের কানের সামনে মুখ এনে বলল, “কোথায় পেলি এটা ? “

“রিঙ্কু দের বাড়ির গুদামে , শুধু শুধুই লালুকে সন্দেহ করছিলাম জানিস গিনি !  রিঙ্কুর হতচ্ছাড়া মানুষ ভাইটা  লালুর চেয়ে অনেক বেশী লোভী ,আমি ভালো করেই জানি ও  কখন স্কুল   থেকে  ফেরে , কালুদার গ্যাং কে বলে ওর জন্য জবর কামড়ের না ব্যবস্থা করিয়েছি তো আমার ‘লজেন্স চৌধুরী’ নাম বদলে ‘তুলসী গাছ চৌধুরী’ রাখিস  !”

ফিরে দেখা

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

তারিখ টা আজ সত্যি মনে নেই ,
রোজের মতই সকাল হয়েছিল ,
“তুই আমার বন্ধু হবি কি ? ” ,
অজানা এক আওয়াজ ভেসে এলো ।

হতেই পারি , আপত্তি কি !
একলা চলা যায় কি সারাক্ষণ ?
আমার আছে আবোল তাবোল গল্প ,
আর আছে বন্ধু হওয়ার মন ।

“দেবার মত যদি হিসেব করি ,
আমার আছে মন খারাপের ঝুড়ি ,
হাসির বাক্সে জমা অনেক ধুলো ।”
আমার কানে বাজলো কথাগুলো ।

বললাম , “চাইনা আমার এমন উপহার ,
দুঃখ দিতে বন্ধু কি দরকার ?
তার চেয়ে দিস হাসির বাক্স খানি ,
যত্নে ধুলো সরিয়ে দেব আমি ।”

এমন ভাবেই বছর ঘুরে গেল ,
অজানা মন বন্ধু হয়ে এলো ,
ঝগড়া হাসির শব্দ ভেসে আসে ,
বন্ধু তুই থাকিস আমার পাশে ।

সময় বাড়ায় নিজের চলার গতি ,
ব্যস্ত জীবন পাতা বদলে যায় ,
মহাকালের ভীষণ অট্টহাসি ,
বলেন ,”সবসময়ের জন্য কিছু নয় ।”

ব্যস্ত সকাল ,নিঝুম রাতের ঘোরে ,
হঠাৎ যদি আমায় মনে পড়ে ,
আবার যদি বন্ধু হতে চাস ,
বদলে দিয়ে কালের ইতিহাস ,
ডাকিস আমায় , ইচ্ছে যখন তোর ,
বলছি দেখিস ,ঠিক পাবি উত্তর ।

সময় যদি বদলে অনেক যায় ,
আমরাও নয় বদলে গেলাম অল্প ,
তবুও আবার হাসবো অকারণে ,
আবার হবে আবোল তাবোল গল্প ।

ধন্যবাদ ,
BongNote

উপহার 

Comments 3 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

দাদাভাই : হ্যাপি বার্থডে তিন্নি  ।

তিন্নি : থ্যাঙ্ক ইউ দাদাভাই ।

দাদাভাই :  পূর্ণবয়স্কা  হতে আর মাত্র ২ বছর দেরী ,মনে রাখিস টিভির রিমোট নিয়ে মারামারি এই বয়সে আর তোকে মানায় না।

তিন্নি : কথাটা আয়নার সামনে দাড়িয়ে বল ।

দাদাভাই : আয়তন তো বাড়ছে না , মাথাটা এখনো আমার কাঁধে পৌঁছয় নি , তবু  তোর  বুদ্ধিদীপ্ত  কথার খেলায় আমি যে এখনো দুধেভাতে তিন্নি !

তিন্নি : আয়তনের সাথে বুদ্ধির সম্পর্ক থাকলে পিপড়ের বদলে হাতিকেই সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী বলা হত দাদাভাই !

দাদাভাই : আমাকে হাতি বললি ! তোর দৈর্ঘ্য কম বলেছি , প্রস্থের বিচারে পিপড়ের থেকে হাতির দিকেই পাল্লা ভারী কিন্তু তোর !

তিন্নি : এই যদি আমার কথার ব্যাখ্যা হয় , ইঞ্জিয়ারিং পড়ার ফাঁকে বাংলা ক্লাসে ভর্তি হ , প্রযুক্তির আগে মাতৃভাষার উপর দখল হওয়াই  বেশী  দরকার ।

দাদাভাই হেসে বলল  : বুঝলাম !  তা জন্মদিনে মা কী দিল তোকে ?

তিন্নি : কুন্দনের সেট ।

দাদাভাই: সেকি গয়না তো তুই পড়িস না । মা তো বলে তুই ভিখিরীর মত খালি কান গলায় ঘুরে বেড়াস বলে মার ও সাধের গয়না গুলো পড়া হয় না ।  খুব চিন্তিত ভাবে বাবাকে বলছিল সেদিন , সামনে রিনি দির বিয়ে , তার ছন্নছাড়া মেয়েটাকে দেখে লোকে কি বলবে , সেই মেয়ের পাশে তার পরিপাটি মাকে দেখে “নিজের বেলায় আটিসুটি ,মেয়ের বেলায় দাত কপাটি ” ধরনের মন্তব্য যে কেউ করবে না ,তা যদি বাবা লিখে দিতে পারে , তবেই মা যাবে রিনিদির বিয়েতে ।

তিন্নি (হেসে ): তা বাবা লিখে দিল   ?

দাদাভাই : না , বরং  নির্বিকার ভাবে বলল “সে না হয় দেওয়া যাবে ,বিয়ে তো এখনো দেরী আছে ,আর কাগজ কলমও তো পালিয়ে যাচ্ছে না।” বাবার উত্তর শুনে রাগের মধ্যেও মার চিন্তাটা যে আরো বেশী জোরালো  হলো তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল । তোর জন্মদিনের  কুন্দন সেট সেই চিন্তারই  ফলপ্রসু বলে আমার বিশ্বাস  ।

তিন্নি : জানি , তুই জন্মদিনে কি দিবি আমায় দাদাভাই ?

দাদাভাই : বহুদিন ধরে  বাবার মাথা খেয়ে আদায় করা  iPad টা ১ মাসের জন্য ব্যবহার করার অনুমতি ।

তিন্নি : দরকার নেই , তোর গয়না তুই পড় ।

দাদাভাই : ভেবে দ্যাখ ,অনেক ভালো ভালো গেম আছে কিন্তু , temple run খেলা শুরু করলে ‘সত্যজিত রায়’ নাম টা  মুহুর্তে ভুলে যাবি ।

তিন্নি : অনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পিছনে আমি দৌড়ই না , একঘেয়েমি তে আমার যে বড় আপত্তি । তাই সে লোকের দেখানো বৈচিত্রময়  জগৎ  ভুলে তোর temple run র সাথে আপোষ করা , বোধহয় এ জন্মে আমার আর হয়ে উঠলো না। স্টিভ জবস এর কাছে আমার হয়ে এতদিনে নিশ্চই ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন Mr রায় ।

দাদাভাই : গেমের কথা ছাড় , আমার ডাউনলোড করা দারুন  দারুন  ebook পড়ার সুযোগও কিন্তু হারাচ্ছিস ।

তিন্নি : ebook আমার ভালো লাগে না , বইয়ের গন্ধ নাকে না এলে আমার নেশা হয় না , বইয়ের পাতা কে ছোঁয়ার মধ্যে দিয়ে লেখা গল্পের চরিত্রকে ছোঁয়ার স্বাদ তোর ebook দিতে পারলে ,বইমেলার মাঠ প্রতিবছর  কুম্ভের মেলার মত ভিড়ের সাক্ষী হত না  দাদাভাই !

দাদাভাই :উফ ! কি যুক্তি ! আমার আর মায়ের কপাল তাহলে  চিরকালের পোড়া , এবার বল বাবা তার আদরের মেয়েকে কী দিল ?

তিন্নির উত্তরের আগেই  একজন ভদ্রলোক ঘরে প্রবেশ করলেন , তাকে দেখে তিন্নি বলল ,”কিছু বলবে বাবা ?”

ভদ্রলোক হাসি মুখে কয়েকটা বই তিন্নির হাতে দিয়ে বললেন , ” এনাদের জন্য একটু জায়গা বের কর দেখি মা ! উপরের তাকে  ধরে যাবে মনে হয় ,সত্যজিত ও  শরৎ বাবুকে একটু অনুরোধ করলেই সরে বসবেন । “

তিন্নির চোখ খুশীতে জ্বলজ্বল করে উঠলো , সে  বইগুলোর নাম এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলল ,

  • ‘কাছের মানুষ’ ,
  • ‘লোটাকম্বল’ ,
  • ‘বাবলি’ ,
  • ‘আমার মেয়েবেলা’

তারপর বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল , ” আমার দোষ নেই , তোমার জন্যেই আর কারো দেওয়া উপহার আমার কখনো পছন্দ হয় না ! “

মা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

আমার শ্বাস প্রশ্বাসে ধ্বনিত হচ্ছে কৃতজ্ঞতার ছন্দ ,
তোমার স্বার্থহীন ভালবাসার ঢেউ ,আমার রক্তে বহমান ,
আমি এই বিশাল পৃথিবীতে তোমার ই প্রতিচ্ছবি ,
এ সত্য চিরন্তন ,অকৃত্তিম ,অম্লান ।
তোমার প্রতিনিয়ত চেষ্টা ,আমার দুর্গম পথকে সুগম করে তোলার ,
আমার হারের দুঃখকে যাদুস্পর্শে করে তোলো জেতার আনন্দ ,
তোমার সুস্পষ্ট চেতনার অনুভূতি স্পর্শে ,
ভেঙ্গে দাও আমার চাপা অহংকার ,মুছে দাও আমার দ্বন্দ ।

তোমার আদি অন্ত নেই ,নেই কোনো সংজ্ঞা ,
দিশাহীন অচেনা ভিড়ে ,তুমি খুব চেনা বিশ্বাস ,
তুমি এক অভঙ্গুর স্নেহময় প্রাচীর রূপে বিরাজমান ,
ক্লান্ত জীবনপথে শান্তিময় আশ্বাস ।
তুমি অচেতন শিশুর মনের মাঝের সুপ্ত সান্ত্বনা ,
রক্তের টানে সীমাবদ্ধ তোমার কামনা বাসনা ,
তোমার সৃষ্টিতে বিস্মিত স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ,
তুমি সকল প্রেরণার উৎস ,তুমি মা !

ধন্যবাদ,
BongNote

উত্তরাধিকারী

Comments 6 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

আর ২ ঘন্টার মধ্যেই কার্শিয়াং পৌঁছে যাবে সমীর। দশ বছর আগে নিউইয়র্কের  প্লেনে ওঠার সময় সে ভেবেছিল আর কখনো সে এখানে ফিরবে না । স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার পর , প্রতিবছর নিয়ম করে একমাসের ছুটিতে বাড়িতে আসার তার একমাত্র কারণ, দশ বছর আগে নিজের হাতে পৃথিবীতে নিজের সকল অস্তিত্ব মিটিয়ে দিয়েছিল । নিজের মায়ের অকস্মাৎ মৃত্যুর স্মৃতি আজও অহর্নিশ তার মনকে তাড়া করে বেরায়। পুলিশের কাছে সে মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হলেও সমীর জানে তা হল আসলে বছরের পর বছর ধরে শানিয়ে নেওয়া, অবহেলার হাতিয়ারে ঠান্ডা মাথায় খুন। সে পরিচিত খুনীর সাথে আবার মুখোমুখি  হবার বিতৃষ্ণাই সমীরকে দশ বছর আগের নেওয়া ,দেশে না ফেরার সিদ্ধান্তকে ,কখনো পুনর্বিবেচনা করতে দেয়নি । সেই মানুষটার মৃত্যুর খবর পেয়েও আজ সে আসতো না যদি না আইনের হাত তাকে এভাবে বাধ্য করত।

সন্ধ্যে ৬:১০ ,কার্শিয়াং  এর বাড়ির কাছে পৌঁছে মনটা অস্থির হয়ে উঠলো সমীরের । মায়ের অজস্র স্মৃতির ,তাকে গিলে খাবার এতদিনের অপেক্ষা আজ শেষ হবে, সুদূর আমেরিকায় বসেও যা তাকে দুদন্ড শান্তি দেয়নি আজ কি এত কাছে পেয়ে তা তাকে মুক্তি দেবে ! বাড়ির দরজার সামনে ট্যাক্সি থেকে নামতেই  সেখানে অপেক্ষারত তার বাবার পুরনো উকিল সামনে এসে বলল , “এসে গেছ ! লম্বা যার্নি তে ক্লান্ত নিশ্চই !” সমীর বলল ,”না সেরকম নয় ! রমেশ জ্যেঠু,  আমার হাতে সময় কিন্তু খুব কম !” বৃদ্ধ রমেশ কর্মকার হেসে বললেন , “আমি জানি তুমি খুব ব্যস্ত ! নইলে তোমার বাবার শেষ সময়ে ,আমার লেখা এতগুলো চিঠির মধ্যে একটার উত্তর তুমি নিশ্চই দিতে পারতে  , সে যাইহোক আমি সব কাগজ পত্র তৈরী করে রেখেছি যেখানে তোমার সই লাগবে, সরকারী ফর্মালিটি পূরণ করতে নিরুপায় হয়ে তোমাকে এখানে আসতে বাধ্য করায়, তোমার বাবার চেয়েও বয়সে বড় এই রমেশ কর্মকার , তোমার কাছে জোড়হাতে ক্ষমাপ্রার্থী! ভিতরে টেবিলে তোমার জন্য আমার স্ত্রীর বানানো খাবার ঢাকা আছে ,সেটা খেয়ে তুমি আজ রাতটা বিশ্রাম নিয়ে নাও, কাল সকালে আমি এসে তোমাকে স্কুলে নিয়ে যাব ,সরকারী  উকিলও ওখানেই আসবেন ।”

রমেশ কর্মকারের দেওয়া  চাবি খুলে বাড়ির ভিতরে পা রাখতেই সমীর বিস্ময়ে চমকে উঠলো ,সময় যেন ১০ বছর আগে স্থির হয়ে আছে সেখানে,আলনাতে তার মায়ের ভাজ করা শাড়ি ,টেবিলের উপরে রাখা মায়ের ব্যবহার করা সিঁদুর কৌটোর সাথে অন্যান্য সরঞ্জাম, পিতলের জলের গ্লাসটাও নিজের জায়গা এতটুকু বদলায়নি ,সমীরের সাথে মায়ের ফটো যার ওপর একটুও ধুলোর চিহ্ন নেই , আয়নায় লাগানো মায়ের কপালের টিপ ,ঘরের কোনায় খোলা মায়ের পায়ের চটি ,এমনকি ঘরের ক্যালেন্ডার টাও দশ বছর আগের সময়ই নির্দেশ করছে। সে উদ্ভ্রান্তের মত মায়ের ঘরে দৌড়ে  গিয়ে দেখলো, আজ ও মায়ের বিছানায় দুটো দুরকমের বালিশ পাতা , মায়ের বালিশ টা নরম সাদা , সমীরের বালিশ টা শক্ত আর উঁচু ,তার গল্পের বই পড়ার সুবিধার জন্য। সমীর বাইরে পড়তে চলে যাওয়ার পরও মা তার বালিশটা বিছানা থেকে সরায়নি, ছুটিতে এলেই সে ওই বালিশে শুয়ে মায়ের আদর খেত। মায়ের মৃত্যুর ২ দিন পরে কার্শিয়াং এ পৌঁছে মা কে শেষ বার দেখার আসা আর তার পূর্ণ হয়নি ,মা বিহীন এই বাড়িতে পা দেওয়ার  শক্তি সেদিন তার ছিল না ,তাই তার এক পুরনো বন্ধুর বাড়িতে ২ দিন থেকে , সে ফিরে গিয়েছিল আমেরিকা ।

সমীর এবার ধীরে পায়ে পাশের ঘরের দিকে গেল , এটাই তার মায়ের খুনীর ঘর যে মাসের পর মাস রাতে বাড়ি ফিরত না সেই একই অজুহাতে, সংসারের কোনো দায়িত্ব কর্তব্য যে এক দিনের জন্যও পালন করেনি , যার নিরন্তর অবহেলা তার মাকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে । এই ঘরের পরিবর্তন সত্যি চোখে পরার মত , সময় যেন দেরীতে হলেও অনুভব করেছে যে এবাড়িতে সেই লোকটির বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই, তাই নিজে হাতে তার সকল সরঞ্জাম,আসবাবপত্র সরিয়ে ,এই  ঘরটি সে একেবারে খালি করে দিয়েছে। সমীর বাইরের ঘরে রাখা সোফায় নিজের ক্লান্ত শরীর রেখে চোখ বুজে ফেলল , নিঃশব্দে তার চোখের জল সোফায় রাখা বালিশ ভিজিয়ে দিতে লাগল।

সকালে দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজে সমীরের ঘুম ভাঙ্গলো । দরজা খুলতেই বাইরে দাড়িয়ে থাকা রমেশ কর্মকার বললেন, “সমীর ! এখন আমাদের যেতে হবে !” সমীর বলল , “হ্যাঁ ,আপনি বসুন ,আমি এখনি আসছি ।” ভিতর থেকে জামা বদলে এসে সমীর ,রমেশ কর্মকারের গাড়িতে উঠে বসলো।

রমেশ কর্মকার : “টেবিলে ঢাকা খাবার টা রাতে খাওনি দেখলাম ,স্কুলে পৌঁছে অল্প কিছু খেয়ে বাকি কাজ করা যাবে না হয়। ”

সমীর : ” বাড়িতে কোনো জিনিসের স্থান বদল হয়নি  , সবকিছু ঠিক আগের মতই আছে, এ বিষয়ে আপনি কিছু জানেন ?”

রমেশ কর্মকার: “তোমার মায়ের মৃত্যুর পর ,তোমার বাবা রোজ সকালে এসে, নিজে হাতে যত্ন করে সব জিনিসের ওপর  জমা ধুলো সরিয়ে দিতেন , এখন আমার স্ত্রী তার সেই দায়িত্ব পালন করে , সে মানুষটাকে কমলা নিজের দাদার মত শ্রদ্ধা করত ।”

সমীর : “সারাজীবন ধরে  কারো ওপর করা অন্যায়ের পাপ, সে মরে গেলে আদিখ্যেতার প্রায়শ্চিত্তে  কি মেটে রমেশ জ্যেঠু ? সে যাই হোক ,আমাকে ঠিক আপনার কি কাজে লাগবে তা আমি এখনো জানিনা  , মানে বাবার স্কুলের সাথে আমার আর মায়ের কখনো কোনো সম্পর্ক ছিল না  তাই সেই কাগজপত্রে আজকে আমার সই কেন লাগবে সেটা জানতে পারলে সুবিধা হত |”

রমেশ কর্মকার :”তোমার বাবা সর্বস্ব দিয়ে এই স্কুল টাকে আজ এই জায়গায় দাড় করিয়েছেন, তুমি হয়তো জানো না , এই স্কুলে একটা একটা ল্যাবরেটরি আছে  যেখানে ছাত্রদের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার  করতে শেখানো হয়, স্কুলে পাঠ্য বিষয়ের মধ্যে  রোবটিক্স  অন্যতম , অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত অজস্র গবেষনার বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে , এই স্কুলের ছাত্ররা মহাকাশ নিয়ে ছোটবেলার নানা রকম জল্পনা কল্পনাকে অনেক পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে , কিন্তু এই বিশাল যজ্ঞের আগুন জ্বালিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ঘি যে ফুরিয়ে এসেছিল ,অর্থ সাহায্য লাভের অনেকদিনের চেষ্টায় অবশেষে এই  স্কুল  সরকারী অনুমোদন পেতে চলেছে, কিন্তু তুমি না এলে তোমার বাবার নিরলস পরিশ্রমের কোনো কদর না করেই আজ সরকারের উকিল বিনা বাক্য ব্যয়ে ফিরে যেত । স্কুলের অগনিত ছাত্র সেই মানুষ টাকে পিতৃ জ্ঞানে শ্রদ্ধা করলেও ,আইন যে উত্তরাধিকারীর কলম ছাড়া অন্য কারো সাক্ষর নেয় না সমীর ।”

সমীর বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল : “উত্তরাধিকারী? যিনি সারা জীবনে মুহুর্তের জন্য নিজের কাটা গন্ডি কাউকে পেরোতে দেননি ,আশেপাশের সম্পর্ক গুলোকে প্রাপ্য অধিকার থেকে অহর্নিশ বিনা দ্বিধায় বঞ্চিত করেছেন, নিজের পারিবারিক দায়িত্ব সম্বন্ধে শেষ দিন পর্যন্ত নির্বিকার হয়ে  থেকে গেলেন অন্যকে দায়িত্ববান হবার পাঠ  শেখাতে হবে বলে , সেই স্বেচ্ছাচারী  মানুষের মৃত্যুর  পর উত্তরাধিকারীর খোঁজ যে  শুধু আইনই আপনাকে দিতে পারতো রমেশ জ্যেঠু ! ”

গাড়িটা একটা স্কুলের গেটের সামনে দাড়ালো । রমেশ কর্মকার সমীরের উদ্দেশ্যে বললেন ,”এসো !” স্কুল কম্পাউন্ডে ঢুকে সমীর চারিদিকে তাকিয়ে তার প্রশস্তি আর বৈচিত্র দেখে অবাক হলেও তা প্রকাশ করলো না ! সেই মানুষটার প্রতি ঘৃণায় সে আজকের আগে কোনদিন এই গেট পেরোয়নি ! মায়ের পছন্দের দার্জিলিঙের বোর্ডিং স্কুলে পড়েছে সে , তার পড়ার খরচের টাকার হিসেব সে অনেক ছোটবেলা থেকে রেখেছে , ২ বছর আগের পাঠানো বাবার নামে  তার সই করা চেক, সেই সব হিসেব কড়ায় গন্ডায় চুকিয়ে দিয়েছে ,যদিও সে টাকার অঙ্ক তার ব্যাঙ্কে এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে তবুও  এই হিসেব মেটানোর প্রচেষ্টাই তার মনকে এক অসম্ভব শান্তি দিয়েছিল , বছরের পর বছর ধরে বিনা দোষে তার মায়ের সহ্য  করা অপমান, সে কিছু টা হলেও ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল সেই অগনিত অপরাধে অপরাধী মানুষটার দিকে ।

রমেশ কর্মকার একটা ঘরে প্রবেশ করে বললেন ,”এখানে বসো সমীর ! তোমার বাবা গত দশ বছর এঘরেই থাকতেন। সরকারী উকিলের আসতে সময় লাগবে ,আমি তোমার জন্য কিছু খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি । ”  সমীর  ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো , একটা টেবিল ,বইয়ের তাক ,গদিবিহীন খাট আর ছোট আলমারি ছাড়া ঘরে আর বিশেষ কিছু নেই। সে বইয়ের তাকের দিকে এগিয়ে গেল , বিভিন্ন বিষয় লেখা সাজানো বইয়ের বৈচিত্র লক্ষ্য করার মত । বইয়ের তাকের মতই এই ঘরের সবকিছুই তার কাছে নতুন ,তার বাবা যে চিরকাল এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি ছাড়া তার কাছে আর কিছুই ছিলেন না, সেটা আরো একবার উপলব্ধি করলো সমীর । হঠাৎ একটা ছেলের গলার আওয়াজে সমীর পিছনে তাকালো , “আপনার খাবার !” ছেলেটার বয়স আন্দাজ ১০ বছর হবে , এত নিষ্পাপ সুন্দর মুখ অনেকদিন সমীর দেখেনি ।

সে ছেলেটির কাছে গিয়ে বলল , “তোমার নাম কী  ?”

ছেলেটি : , “শঙ্কর”!

সমীর : ,” তুমি নিশ্চই বাঙালি ?”

ছেলেটি : “না ,তবে আমি মাতৃভাষা ছাড়াও আরো ৬ টি ভাষা বলতে ও লিখতে পারি ,বাংলা তার মধ্যে একটা।”

সমীর : “বাহ্ ! তুমি এই স্কুলে পড়াশোনা করো ?”

ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ।

সমীর : “এখন তো তোমাদের ছুটি চলছে তাই না ? ”

ছেলেটি আবার মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ।

সমীর বলল , “তবে আজ  স্কুলে এসেছো যে !”

ছেলেটি : “স্যার বলতেন স্কুল  ছুটি থাকলেও আমরা যখন খুশি স্কুলে আসতে পারি, তাছাড়া স্কুলে না এলে আমার ভালো লাগে না । ”

সমীর হাত বাড়িয়ে ছেলেটির হাত থেকে থালাটা নিতেই  সে  বলল : “আপনার ঘড়ি তো বন্ধ হয়ে গেছে !”

সমীর হেসে বলল : “বন্ধ হয়নি ,প্লেনে ধাক্কা লেগে খারাপ হয়ে গেছে ,আমার সময় বোধহয় আরো কিছুদিন থেমেই  থাকবে শঙ্কর  ,এটা বিদেশী ঘড়ি ,এর রকম সকম আমি যে বুঝি না !”

ছেলেটি : “আমি বুঝি , দিন না আমাকে , আপনার নিশ্চই সময় দেখতে অসুবিধা হচ্ছে ,আমি এখনি ঠিক করে দিচ্ছি!”

সমীর হেসে তার হাত ঘড়ি টা খুলে দিল ,ছেলেটা দৌড়ে গিয়ে ঘরের আলমারি থেকে একটা বাক্স বার করলো যার ভিতরে ছোট বড় মাঝারি আয়তনের  বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ঠাসা। মুহুর্তে সমীরের হাত ঘড়ির কল কব্জা খুলে ফেলে শঙ্কর হারিয়ে গেল যন্ত্রের জটিল দুনিয়ায়। সমীর খোলা আলমারি টা বন্ধ করতে  গিয়ে একটা বাক্সের দিকে চোখ পরায় চমকে উঠলো , এই বাক্স টা তো তার মা তাকে দিয়েছিল। কোনো অন্যায় করলে ভগবানের কাছে ক্ষমা চেয়ে লেখা চিঠি এই বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে মায়ের বালিশের তলায় রেখে আসত সমীর  ,মায়ের হাসিমুখ ফিরে পাওয়ার এটা ই ছিল তার একমাত্র উপায়। মা বলত, ক্ষমা মন থেকে না চাইলে ,সেই বাক্স নাকি চিঠির কথা বদলে দেয় যাতে ভগবান দ্বিগুন রেগে গিয়ে ,দোষীর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কেড়ে নিতে পারে। সে কথা সত্যি না মিথ্যা ,তা পরীক্ষা করার সাহস , সমীর কখনো জুটিয়ে উঠতে পারেনি। বাক্স টা  আলমারি থেকে দ্রুত নামিয়ে ফেলল সে,তার আঙ্গুল বাক্স খোলার মুখস্থ নম্বর পরপর টিপে দিল   ‘৯২৯০’, প্রত্যাশিত মতই বাক্সের তালা বেঁকে গিয়ে খুলে যাওয়ার চেনা ইঙ্গিত দিল   , কাঁপা হাতে বাক্সে রাখা চিঠিটা  খুলে ফেলল সমীর ,

শ্রীচরণেশু প্রসূন বাবু ,

এই বাক্স টাই  একমাত্র  আমার এই চিঠির ভার বহন করতে পারত , সে রহস্য  না হয় একটা ছোট্ট  ছেলে  আর তার মার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাক। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর  হাতে ,আপনি যখন স্কুলের দরজায় পাওয়া একটি অজ্ঞাত পরিচয় শিশু কে তুলে দিয়েছিলেন, আপনার মত মানুষকে চেনার অক্ষমতা , সেই সাধারণ হতভাগ্য মেয়েকে ভাবতে বাধ্য করেছিল,  সকলের অগোচরে করা নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্য করতেই আপনি এই দায়ভার স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছেন । অন্যের সংসারে বড় হওয়া অনাথ মেয়েটির, আর কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না বলেই ,মুখ বুজে সেদিন সে মেনে নিয়েছিল আপনার ব্যাভিচার, কিন্তু তার মনের মধ্যে ওঠা নিদারুন বিদ্রোহের আঁচ টের পেতে ,আপনার মত বিচক্ষণ মানুষের যে অসুবিধা হবে না সেটাই ছিল প্রত্যাশিত , সে সত্যি  উপলব্ধিতেই সময়ের সাথে , সেই মেয়ে এবং তার সংসার থেকে আপনি নিজের অস্তিত্বকে নিপুন হাতে সরিয়ে নিয়েছিলেন । তারপর দিনরাত নিজের ভগবান আর ভাগ্যকে দোষারোপ করলেও, মেয়েটি তার দায়ভার কিছুতেই সেই অজ্ঞাত পরিচয় অসহায় শিশুটির  উপর চাপিয়ে দিতে পারেনি , অনিচ্ছা সত্তেও শিশুটির  হাসি কান্না , স্নান , খিদের হিসেব নিকেশই হয়ে উঠেছিল তার একলা জীবন যাপনের একমাত্র অভ্যাস । তার কিছু দিনের মধ্যে, হঠাৎ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে যখন নিজের সন্তান ধারণের অক্ষমতার নিষ্ঠুর সত্যি তার সামনে এলো  , তখন  ওই  ১ বছরের শিশুই হয়ে উঠলো তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ ও সম্বল। আপনার দেওয়া শাস্তির দহনে অহর্নিশ জ্বলতে থাকা বোকা মেয়েমানুষ , এরপর তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছিল , সেই শাস্তি শত গুনে আপনাকে ফিরিয়ে দিতে ,আপনারই  দেওয়া সন্তানের ওপর আপনার সকল অধিকার সে অস্বীকার করে বসলো , আপনার রাখা ‘দিগন্ত’ নামটিও সে সকলের অজান্তে  সরকারী কাগজ থেকে মুছে দিয়ে ,নিজের দেওয়া নাম ‘সমীর’ লিখে দিয়েছিল । তারপরও সময়ে অসময়ে আপনার ছায়া সে তার সন্তানকে  মাড়াতে দিতে চায়নি, আপনি ভগবানের মতই নির্বিকার আর অন্তর্যামী ,তাই বোধহয় যে বাড়িতে সে ছেলে বড় হয়ে উঠছিল ,পারতপক্ষে সেখানে নিজের ছায়া আপনি পড়তে দিতেন না । নিজের বাবার বিরুদ্ধে ছেলের মনে  বেড়ে ওঠা বিরূপ মনোভাব ,সেই মেয়েটির নিরন্তর বিবেক দংশনের কারণ হলেও ,তার  ভিতরের মায়ের একছত্র অধিকার হারানোর ভয়ের কাছে ,সে দংশন কোনদিন মাথা তুলে দাড়াতে পারেনি । দীর্ঘ ২৫ বছর পর সেই স্থুল বুদ্ধি মেয়েমানুষের এটুকু বোঝার ক্ষমতা হয়েছিল যে, আপনার স্ত্রী  হিসেবে নিজের পরিচয় দেবার কোনো যোগ্যতাই তার  নেই , তাই নিজের শরীরে বেড়ে ওঠা ক্যান্সারের মত মরণ রোগের কথা জানিয়ে আপনার নিরলস সাধনার কোনো ব্যঘাত সে ঘটাতে চায়নি।  কিন্তু সাধেই কি বলি আপনি অন্তর্যামী! সকলের অগোচরে নিজের সর্বস্ব খুইয়ে ,শরীর মন ঢেলে তৈরী করা প্রানের চেয়ে প্রিয়  স্কুল বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন, সেই স্বার্থপর নিচ মনের মেয়ে মানুষের চিকিৎসার জন্য ! সেদিন যদি আপনার টেবিলে, ভুলে ফেলে  যাওয়া ওই কাগজ পড়ার বিদ্যে তার  না থাকত ,তাহলে তার  মৃত্যুও জীবনের মতই মূল্যহীন হয়ে যেত,পরম করুনাময় তাকে সেই ভয়ানক লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন  । আপনাকে বাঁধা দেওয়ার সামর্থ্য বা অধিকার কোনটাই তার ছিল না , তাই তার আত্মহত্যার সিদ্ধান্তই একমাত্র পারতো , এই চরম সর্বনাশ থেকে সমীরের মতন অজস্র হতভাগ্য শিশুর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে ,অন্য কোনো উপায় থাকলে তার  মত স্বার্থপর মা  নিশ্চই সেটাই বেছে নিত । আজ ক্ষমা চেয়ে আপনাকে আর  ছোট করার বোকামি সে করবে না , অন্যায় যতই অসহ্য ও  বেদনাদায়ক হোক, ভগবানের কাছে ক্ষমা করা ছাড়া যে আর কোনো পথই খোলা থাকে না, তা আমার থেকে ভালো আর কেউ জানে না। আমার ছেলেটার কোনো দোষ  নেই , সব তার হতভাগী মায়ের পাপের ফল , যদি পারেন তাকে  নিজের সান্নিধ্য থেকে আর বঞ্চিত করবেন না , সেজন্য যদি মায়ের সকল সত্যি তার ছেলের কাছে প্রকাশ করতে হয় ,জানবেন অভিমানী ছেলের দোষীজ্ঞানে ওঠা আঙ্গুলও  সেই  মৃত মায়ের আত্মা কে চির শান্তি দেবে, অধিকার ভাগ করে নিতে আজ আর তার ভয় করে না ।

ভালো থাকবেন ,

বিভা।

সমীরের চোখের জল চিঠির পাতাটা ভিজিয়ে দিতে লাগলো। তার মন কে শান্ত করার কোনো উপায়ই সে জানে না , যে দুটো মানুষ এই মুহুর্তে  তার মনের অবস্থা বুঝতে পারতো  তারা  দুজনের কেউই আর পৃথিবীতে  নেই , বাকি জীবন এই দায়ভার বহন করার শক্তি কোথায় পাবে সে !

হঠাৎ কাঁধে রাখা ছোট্ট হাতের ছোঁয়ায় সে চোখ মুছে ফিরে তাকালো , শঙ্কর হাসি মুখে দাড়িয়ে আছে তার সামনে , ঘড়িটা সমীরের হাতে দিয়ে শঙ্কর বলল ” আপনার ঘড়ি একদম ঠিক হয়ে গেছে ,আর আপনার সময় থেমে থাকবে না ! ”

সমীর অল্প হেসে বলল: ” ঘড়ির কাটা দিয়ে যদি সময়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করা  যেত,  তাহলে তো আজ আমি এভাবে সর্বস্ব হারিয়ে অসহায় হয়ে যেতাম না শঙ্কর! আমি যা বললাম তা তোমার বুঝতে হলে  ঘড়িকে আরো কিছু বছর চলতে হবে ,ততদিন তুমি  বরং মন দিয়ে পড়াশোনা কর , সময় হলে তোমাকে আমি আমার সাথে আমেরিকা নিয়ে যাব , ওখানে আরো পড়াশোনা শিখে অনেক বড় হবে তুমি  ,তোমার স্যারের বাক্স টায় যে আরো অনেক যন্ত্রপাতি আটবে , সেগুলো তো বিভিন্ন দেশ ঘুরে তোমাকেই খুঁজে পেতে নিয়ে ভরতে হবে ! ”

শঙ্কর অসম্মতি সূচক মাথা নেড়ে বলল : “না  ! আমাকে এখানেই থাকতে হবে ,নইলে… ! ”

সমীর অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল : “নইলে কী  ?”

শঙ্কর নিষ্পাপ হেসে উত্তর দিল , ” নইলে আমার দেশের বন্ধ ঘড়ি যে সবসময় বন্ধই থেকে যাবে ! অন্যের দেশে গিয়ে নিজের দেশের সময়কে থামিয়ে রাখা যে অন্যায় হবে ।”

নিরুত্তর সমীর জানলার দিকে তাকিয়ে তার  জল ভরা চোখ কে শঙ্করের থেকে আড়াল করে নিজের মনে বলল , “সুবিচার বোধহয় একেই বলে,এত সহজে শঙ্করের মনে স্বার্থের ছায়া পড়লে নিরলস পরিশ্রমে সে মানুষটার দেওয়া সকল শিক্ষাই যে মুহুর্তে ব্যর্থ হয়ে যেত।”

রমেশ কর্মকার একজন ভদ্রলোক কে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন । কাগজ পত্র হাতে সে ভদ্রলোক সমীরের দিকে তাকিয়ে বললেন , “আপনি কি প্রসূন আচার্য র উত্তরাধিকারী ?” সমীর শঙ্করের হাত টা নিজের হাতে নিয়ে বলল , “হ্যাঁ, তবে  শুধুই  আপনার আইনের চোখে ।যোগ্যতার বিচারে উত্তরাধিকারী বাছার দায়িত্ব ,সেই বিচক্ষণ মানুষটি নিজে হাতে পূরণ করে গেছেন ,সময় তাকে নিজের নিয়মে প্রকাশ্যে নিয়ে আসবে । ”

অভিন্নতা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

সুমন : পূজো তে কটা জামা হল তোর ?

আত্রেয়ী : ১২ টা।

সুমন : সেকি রে ? পূজো তো ৫ দিন , হিসেব মিলাতে হলে  তো ২ বেলা নিয়ম করে জামা বদলাতে হবে !

আত্রেয়ী : তা কেন ? দুর্গাপূজার পরেও তো আরো কত পূজো  আছে , সেগুলোর হিসেব ভুললে চলবে কেন ,তাছাড়া ছোটবেলায়

আরো অনেক বেশী জামা হত , এই হিসেব মিলাতে আমার কখনই কোনো অসুবিধা হয়নি !

সুমন :  অক্সিজেন যেখানে নাকের ফুটো খুঁজে পায় না ওই  চিড়ে চ্যাপটা ভিড়ে ,সেখানে কে দেখবে তোর রঙ বেরঙের জামা ?

আত্রেয়ী  : দুগ্গা ঠাকুর ! বাড়ির লোকজনের সাথে পাড়ার  একই  ঠাকুর  বার বার দেখতে গেলেও অতি বড় মহিষাসুরও বলতে পারবে না

আমার একদিনের জামার সাথে অন্যদিনের জামার কোনোদিন মিল ছিল।

সুমন : বুঝলাম ! তা কে দিল তোকে এত জামা ?

আত্রেয়ী  : শুধু আমাকে দেবে কেন ? দিদিভাই কে দিয়েছে  ৬ টা , বোনকে ৪ টে ,আমাকে ২টো !পূজোর কটা দিন প্রতিবার আমরা তিন বোন একসাথে কাটাই। দিদিভাইয়ের মামা আর মাসির সংখ্যা বেশী হবার লাভ ,আমি আর বোন সেই ছোট থেকে চুটিয়ে ভোগ করছি , বোনের মামা থাকলেও মাসি নেই , আমার মা তো এক মেয়ে তাই অগত্যা বাবাই ভরসা । সর্বসাকুল্যে তাই আমাদের ১২ টা জামা হয়েছে পুজোতে।

সুমন : মানে তোরা একই জামা তিনজনে পড়িস ?

আত্রেয়ী  : তাতে কি ! আরে দিন টা তো আলাদা ! লক্ষীর কোনদিন সাদা শাড়ি পড়তে ইচ্ছা করলে সরস্বতীর আলমাড়ি কি তার সে ইচ্ছাপূরণ করবে না ? শ্মশানচারী শিব ঠাকুরের রোজগার আমার বাবার চেয়ে কম বই বেশী তো হবে না তাই দুগ্গা ঠাকুরও নিশ্চই নিজের সাংসারিক অভিজ্ঞতায় আমার মা -জ্যেঠিমা -কাকীমার মত নিজের ছেলেমেয়েকে ‘আমার’ এর বদলে সবসময়  ‘আমাদের’ ভাবা শিখিয়েছেন।স্বার্থের হিসেব যে যোগের থেকে বিয়োগ ই বেশী করে সে সত্যি আমার মা জানলে দুগ্গা ঠাকুর কি

জানে না ভেবেছিস ?

সুমন : সে না হয় জানেন উনি ! কিন্তু তোদের জামা ছোট বড় হয় না ? যতদুর জানি তোরা তিনজন তো একই বয়সী নস।

আত্রেয়ী  : ছোট হয় না কখনো কারণ সবাই কে  দিদিভাইয়ের মাপ বলা , আমি আর বোন পরার আগে পাশ মুড়ে নি , তাতে ১৫ মিনিটের বেশী লাগে না।

সুমন হেসে বলল : যাক তাহলে  ‘uniqueness’ র বাজার  লক্ষী সরস্বতীর মত তোর মাথাটাও এখনো খায়নি দেখছি। সুকুমার রায়ের আমলে গোঁফ দিয়ে লোক চেনা যেত , লোকজন যেভাবে ডিসাইনার পোশাকের পিছনে ছুটছে তাতে মনে হচ্ছে  কিছুদিন পর পাসপোর্ট আর লাগবে না ,তার বদলে পরনের পোশাক ই যথেষ্ঠ হবে ।

আত্রেয়ী : তাহলে তো প্যান্টালুনস , ওয়েস্টসাইট  ,শপার’স স্টপ  ইত্যাদি পাইকারী স্টকের ব্র্যান্ড নামগুলো অনশনে বসবে আর রাস্তার  বদলে ব্যাঙের ছাতার মত রাতারাতি গজিয়ে ওঠা  ডিসাইনার বুটিকের  ছাদ দিয়ে  আমাদের  চলাচল করতে হবে।তবে পোশাকের ‘uniqueness’ কনসেপ্ট টা ইমপ্লিমেন্ট হলে অলৌকিক হেরফের হবে আমাদের দেশের জনসংখ্যার হিসেবের খাতায়!

সুমন: মানে ঠিক বুঝলাম না , কিরকম হেরফের ?

আত্রেয়ী : হালকা সবুজ শাড়ির আঁচলে সাদা রঙে করীনা কাপুর লেখা –  ১ জন    , what an uniquness!  একই পোশাকে অন্য কাউকে দেখা গেলে চুরির অভিযোগের সাথে সাথে কপিরাইটের কেসও যোগ হবে,idenitity নিয়ে মজা করা বেরিয়ে যাবে।

লাল জামার কলারে লেখা ‘S K’  – ১ জন , আরে শাহরুখ খান নয় ,ওনার S ছোট , এটা হল সলমন খান।  জনসংখ্যার হিসেবের খাতায় আরো ১ যোগ হল।

কোনো পোশাক কেনার সামর্থ নেই তাই যেকোনো উৎসব ও সাধারণ দিনে বিনা ব্যতিক্রমে খালি গা  – ১২০ কোটি , ওহ! থুড়ি , ‘uniquness’  র হিসেবে ১ হবে তো!

এবার বুঝলি তো হেরফের টা কোথায় হবে !

ধন্যবাদ ,

BongNote

মাইন্ড রিডার

Comments 5 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

যন্ত্র টা মোটামুটি বানিয়ে ফেলেছে গিনি । আজ রাত্রেই বাকি কাজ টুকু শেষ করে ভোর রাত্রে মহড়া । বিজ্ঞানের অসম্ভব কে সম্ভব করার  অদম্য ইচ্ছা তার ভিতরের মেয়েটাকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায়। আজ সে প্রথমবার তার কাল্পনিক চিন্তাকে  যন্ত্রের আকার দিতে চলেছে। গিনির ফর্মুলা যদি ঠিকমত কাজ করে তাহলে তার  বানানো আঙুরের মত ছোট্ট যন্ত্রটা ভোর রাতের দিকে আয়ত্ব করে ফেলবে অন্যের মনের ভাবনা মুহুর্তে পড়ে ফেলার অলৌকিক কৌশল।

গিনির মা তার অনেক ছোটবেলায় গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন , সেই একই গাড়িতে থাকা সত্তেও অলৌকিক ভাবে একটা ঝোপের ধার থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে, ২ বছরের গিনি কে পুলিশ তার বাবা র হাতে তুলে দিয়েছিল। তার ৩ বছরের মাথায় একাকীত্বের বোঝা সামলাতে না পেরে তার বাবার নিয়ে আসা এ বাড়ির স্থায়ী সদস্য কে, গিনি তার বাবার স্ত্রী বলেই মনে করে এসেছে বরাবর ,নিজের মা য়ের জায়গা চেষ্টা করেও তাকে সে কখনো দিতে পারেনি। গিনির সাথে সে মহিলার বিশেষ কথাবার্তা হয় না ,সেই প্রথম দিন থেকেই পারস্পরিক বোঝাপড়ায় তারা একে ওপরকে এড়িয়ে চলে, গিনির বাবাই তাদের দুজনের মধ্যে একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম, গিনির জীবনে ভালো খারাপের প্রভাব যে সেই অজ্ঞাত মহিলার উপরে পড়বে না , সেটাই গিনির কাছে খুব স্বাভাবিক বলে মনে হয়।গিনির মায়ের প্রতি তার বাবার ভালাবাসার গভীরতা নিয়ে তার মনে প্রশ্ন থাকলেও,নিজের মেয়ের প্রতি সেই মানুষটার আন্তরিকতা বা দায়িত্ব বোধ নিয়ে গিনি কখনো সন্দেহ প্রকাশ করেনি। বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার ইচ্ছা ,খামখেয়ালী পনা , যন্ত্রের সাথে ভালবাসা , যেমনি ভাবা তেমনি কাজ করার অবাধ স্বাধীনতা, এ সবকিছু গিনির বাবার অর্থ ব্যয় আর সমর্থন ছাড়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না।নিজের বয়সের তুলনায় গিনির মেধার মাত্রা অন্যের কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হওয়ার অস্বস্তি থেকে দূরে থাকার জন্যেই বোধহয় তার ১৬ বছরের জীবনে বন্ধু বলতে মাত্র একটি নাম ,সীমা। যদিও গিনির আরো একটি বন্ধু আছে কিন্তু সে মানুষ নয় , তার পোষা ল্যাব্রেডর কুকুর ,’লজেন্স ‘ যে দিবারাত্রি গিনির ছায়াসঙ্গী।

ভোর ৪ টে ৫৫ । যন্ত্রটা গলার হারের মধ্যে লকেটের মত ঢুকিয়ে যন্ত্রের ‘ON’ বোতাম টা টিপে দিল গিনি। কই কিছু শুনতে পাচ্ছে না তো ! এত চেষ্টার পরও তাহলে কি তার যন্ত্র টা কাজ করছে না ? কিন্তু তাই বা সে বলে কি করে ? আশেপাশে তো কেউ কোথাও নেই।সকাল হবার আগে যন্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার কোনো উপায়ও তো আর নেই । হঠাৎ রাস্তার কুকুর গুলো ডেকে উঠলো। লজেন্স চমকে ঘুম থেকে উঠে পড়ে বারান্দার দিকে যাবার জন্য প্রস্তুত ,ইতিমধ্যে গিনি পরিস্কার শুনতে পেল কে যেন বলছে , “ধ্যুর তেরি ! রোজ রাতে একই ব্যাপার ! শান্তিতে নিজেরাও ঘুমাবে না আর আমাকেও ঘুমোতে দেবে না ! যাই দেখি গিয়ে সত্যিই কিছু ঘটলো ,নাকি বাতিকগ্রস্ত লালুর অকারণ খ্যাক খ্যাক ! ওই ব্যাটার জন্য কুকুর সমাজের উপর মানুষের বিশ্বাসই উঠে যাবে এবার !” লজেন্স দৌড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যেতেই আবার চারিদিকে সব চুপচাপ। গিনি আনন্দে লাফিয়ে উঠলো , “কাজ করছে ! কাজ করছে ! ” এ যে আর কারো নয়, , যা সে একটু আগে শুনলো তা যে তার লজেন্সের মনের কথা ! লজেন্স ঘরে ফিরে এসে আবার বিছানায় উঠে পড়ল ,গিনি কান পেতে শুনলো এবারের কথাগুলো, “কালকে কালুদা কে বলে লালু ব্যাটার শায়েস্তা না করে আমি ছাড়ব না, রাত বিরেতে এভাবে অকারণে জ্বালানো ,লজেন্স চৌধুরী আর কিছুতেই সহ্য করবে না , একবার ঘুম ভেঙ্গে গেলে আবার ঘুম আসা যে কি মুশকিল সে আর ওই নিশাচর হতচ্ছাড়া লালু বুঝবে কি করে !”

পরদিন সকালবেলা গিনির ঘুম ভাঙ্গলো মালতীদির ডাকে , “দিদিমনি ওঠো ! চা নিয়ে এসেছি ,আজ একেবারে আদা দিয়ে তোমার প্রিয় চা বানিয়েছি ,কত রাত অব্দি তুমি পড়াশোনা করো রোজ ,সকালের দিকে মাথাটা নিশ্চই ধরে থাকে তোমার !” গিনি চোখ কচলে বিছানায় উঠে বলল, “Good Morning মালতী দি ! Thanks ! কাপ টা রেখে দাও টেবিলের ওপর!” গিনি শুনলো মালতী দি বলছে ,”মরে যাই! মরে যাই! সূর্য ডুবতে যায় ,এতক্ষণে সকাল হল ইংলিশ ইস্কুলে  পড়া বড়লোকের মেয়ের ! এত বড় ধিঙ্গি মেয়ের নিজের জিনিসের কোনো তালের ঠিক নেইকো ! তবে আমার তো ভালোই ! ঘুম ভাঙ্গার আগে ড্রয়ার থেকে জিনিস গুলো না সরাতে পারলে আমার যে এ মাসে কত খরচা বেড়ে যেত ! বাপ্পার  জন্য পেন্সিল ,পেন,রবার সব ই প্রায় পেয়ে গেছি , শুধু  কয়েকটা খাতা আরো লাগবে, কালকে অন্য ড্রয়ার টা ঘেটে নিশ্চই পেয়ে যাবো!” চমকে উঠে মালতী দির দিকে তাকালো গিনি , মালতী দির ঠোঁট নড়ছে না তবুও গিনি শুনতে পেল , “এভাবে তাকাচ্ছে কেন রে বাবা ! আঁচল টা আবার খুলে যায়নি তো! ” গিনি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নিল। মুখ ধুয়ে এসে চা টা  চটপট খেয়ে  নিল গিনি। নিজের ভুলোমন কে বিশ্বাস না করে তখনি তাক থেকে কয়েকটা নতুন খাতা বার করে সামনের ড্রয়ারে রেখে দিল সে! তারপর দ্রুত স্নান সেরে তৈরী হয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল গিনি!

সীমার বাড়ি পৌঁছে দরজার বেল বাজাতেই সীমার মা দরজা খুললেন । গিনি হেসে বলল , “কাকীমা! সীমা বাড়িতে আছে ? খুব জরুরি একটা দরকার আছে তাই এত সকালে এভাবে আসতে হল !” সীমার মা হাসি মুখে বললেন ,”ওমা !তাতে কি হয়েছে ?তুমি তো আমার ঘরের মেয়ে ! নিজের বাড়িতে কি ঘড়ি দেখে আসতে আছে! ভিতরে চলে এসো  তাড়াতাড়ি ! আমার কপাল কি তোমার মায়ের মত ওত ভালো গিনি ! দেখো গিয়ে আমার মেয়েটা এখনো ঠিক নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে  হবে !” গিনি হেসে ভিতরে ঢুকে সিড়িতে পা রাখতেই  শুনতে পেল কথাগুলো “বলা নেই কওয়া নেই, রবিবার কাক ভোরে এসে হাজির বৈজ্ঞানিক ,এখন আবার অতিথি সেবার ঝক্কি ! মরণ হয় না আমার ! সীমা টারও বলিহারি !বন্ধুত্ব করার জন্য এই আধ পাগল তাল জ্ঞান হীন মেয়েটাই চোখে পড়ল তোর ! কোন দুনিয়ায় থাকে কে জানে ,দু পায়ে দুরঙের চটি গলিয়ে চলে এলো সকাল সকাল আমার গতরের হাড়মাস  জ্বালাতে !”

গিনির ইচ্ছা করছিল এই মুহুর্তে  সীমার বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে , সেই ছোট্টবেলা থেকে কারণে অকারণে যখন তখন সে চলে আসে সীমার বাড়ি , তা কি শুধুই  সীমার জন্য? সীমা তার একমাত্র বন্ধু ঠিকই  কিন্তু গিনির  এ বাড়িতে ছুটে ছুটে আসার পিছনে আরো একটা অনেক গভীর কারণ ছিল যা সে সীমাকেও কখনো বলতে পারেনি ,আজকের পর আর সে কারণ টার কোনো অস্তিত্বই থাকবে না ! নিজের মরা মায়ের ছবি দেখতো সে যার মধ্যে, আজ তার মনের কথা শুনে, গিনির ভিতরে সবকিছু যেন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, উফ!কি অসহ্য যন্ত্রণা ! চোখের জল মুছে ,কোনরকমে অসহায় পায়ে গিনি সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল !

সীমার ঘরে ঢোকার মুহুর্তে আচমকা একটা হাতের হ্যাঁচকা টান গিনিকে অন্য একটা ঘরে টেনে নিয়ে গেল ! গিনি হাত টা ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল ,”সৈকত দা ! কী করছ ! ছাড়ো আমাকে !” ছেলেটি দেওয়ালে ঠেস দেওয়া গিনির খুব কাছে এসে বলল, “কালকে আমার ফোন ওঠালি না যে বড়! রাতে ঘুম হয়নি আমার জানিস ! আমার রাগ ভাঙ্গাতেই বুঝি এত সকাল সকাল রাজকন্যার আগমন ? ”  গিনি বলল ,”একটা দরকারী কাজ করছিলাম , ফোন টা সাইলেন্ট করা ছিল !” ছেলেটি গিনির আরো কাছে এসে বলল ,”আর তোর মন টা ? সেটাও সাইলেন্ট করা ছিল ? তুই কি এতদিনেও আমাকে একটুও ভালোবাসিস নি গিনি?” গিনি কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলো ! ছেলেটি তার ঠোঁটের কাছে মুখ আনতেই গিনি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল , “আমার সীমার সাথে দরকার আছে সৈকত দা ,প্লিস ! যেতে দাও আমাকে !” দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরোনোর আগে গিনি কথাটা শুনে ভয়ে শিউরে  উঠলো ,”আর কতদিন পালাবি গিনি ! আমার বিছানায় একদিন তোর ওই গুমোর না ভাঙলে লজেন্সের নাম বদলে সৈকত বিশ্বাস রাখিস !” গিনি দরজার মুখে দাড়িয়ে পিছনে ফিরতেই দেখলো ,ছেলেটি  মায়া ভরা মুখে তখনো তার দিকে একই ভাবে তাকিয়ে আছে,এতদিনের ভালাবাসার মুখোশের পিছনে  একটা ক্ষুধার্ত  সিংহের চেহারা আজ আর গিনির দৃষ্টি এড়াতে পারল না । সময়ে অসময়ে গিনি অনেকবার ভেবেছে সৈকত দা তাকে সত্যি ভালোবাসে ,নাহলে এত বছর ধরে গিনির থেকে কোনো উত্তর না পেয়েও ,নিজের ভালোবাসাকে অপরিবর্তিত রেখে কেন করে সে এই নিরন্তর প্রতীক্ষা ! গিনির নির্বিকার মন ,সৈকত দার এই  একপেশে ভালাবাসার ওপর বছরের পর বছর  নিষ্ঠুর অবিচার করে এসেছে বলেই সে বিশ্বাস করত কিন্তু আজ সেই বিশ্বাসের পরিনতি দেখে তার ভিতরে কে যেন বিদ্রুপের অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে !

সীমার ঘরে ঢুকে  গিনি দেখল সীমা আয়নার সামনে দাড়িয়ে তৈরী হচ্ছে । গিনি বলল ,”কোথাও বেরোবি সীমা? তোর সাথে আমার কিছু কথা ছিল !” সীমা গিনির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল ,”গিনি! তুই এত সকালে ? আরে সোহম কি একটা কথা বলবে বলে আজকে আমাকে দেখা করতে ডেকেছে ,তুইও চল না আমার সাথে , আমার একা যেতে কেমন যেন ভয় করছে ,যাবি ?”  গিনি একটু ভেবে তারপর এগিয়ে গিয়ে সীমার পাশে দাড়িয়ে বলল,”আচ্ছা চল ! তোর তো এখন আমার কথা শোনার সময় নেই কিন্তু কথাটা তোকে বলাটা যে খুব জরুরি, তাই রাস্তায় যেতে যেতেই  বলে দেব না হয়!” গিনি আয়নায় দেখতে পেল সীমা হাসি মুখে চুল টা খুলে আরেকবার আঁচড়াচ্ছে ,সীমার মুখের ভাবটা একটুও পরিবর্তন হলো না কিন্তু গিনি স্পষ্ট শুনতে পেল কথা গুলো ,”অন্যদিন  কত বলি কোথাও যায় না ! আজ ওমনি একবার বলতেই রাজী হয়ে গেল ! এত সাজলাম তবু গিনির এলমেলো চুল আর যত্নহীন মুখটাই বেশী সুন্দর লাগছে । যা একটা মেয়ের চোখকে অস্বস্তি দিচ্ছে সেটা কি সোহমের মত ছেলের চোখে পড়বে না? আর তাহলে তো আমার এতদিনের অপেক্ষার অবসান হয়েও হবে না । গিনি তো যন্ত্রপাতি ছাড়া কিছুই বোঝে না! নিশ্চই যন্ত্র নিয়ে কিছু বলবে বলেই সাত সকালে ছুটতে ছুটতে এসেছে আমার বাড়ি  ,সময়ও বেশী হাতে নেই যে ওর ইতিহাস বাড়িতে বসেই শুনবো ,এখন আমি যে কি করি ! ”

গিনি আর দাড়িয়ে থাকতে পারছে না , সবকিছু চারিদিকে যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে তার। কোনরকমে সে সীমাকে বলল “সীমা একটা জরুরি কাজ মনে পড়ে গেছে রে ,এখনি যেতে হবে আমাকে !” সীমার ঘর থেকে উদ্ভ্রান্তের মত বেরোনোর আগে ‘বাঁচা গেছে উফ!’ কথাটা গিনির কানে গিয়ে প্রচন্ড গতিবেগে ধাক্কা মারলো। এক নিঃশ্বাসে গিনি বাড়ি পৌঁছে, নিজের ঘরে ঢুকে ,বিছানার ওপর ভীষণ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল । এতদিন সে যা সত্যি ভেবে এসেছে ,তার সবটাই তো মিথ্যা, তার উজার করে ভালাবাসার বদলে তার জন্য এক ফোঁটা সহনাভূতিও নেই সেই ভালাবাসার মানুষ গুলোর মধ্যে , এ সত্যির যন্ত্রণা যে অসহ্য , এর থেকে তো অনেক ভালো হত যদি সে সারাজীবন মিথ্যে আঁকড়ে কাটিয়ে দিত । গিনির সব রাগ গিয়ে পড়ল গলায় ঝোলানো যন্ত্র টার ওপর ,ওটা টেনে ভেঙ্গে ফেলার আগের মুহুর্তে সে শুনতে পেল , “একি ! গিনি কখন এলো ? আমি তো সেই কখন থেকে ঠায় সামনের বারান্দায় বসে ছিলাম ,পিছনের দরজা দিয়ে এসেছে কি তাহলে ! আজ সীমার বাড়ি থেকে এত তাড়াতাড়ি কেন চলে এলো ও ? আর এভাবে বিছানার ওপর অসময়ে শুয়েই বা আছে কেন ? যাই দেখি শরীর খারাপ হল না তো আবার ! না না ,আমি গেলে এই শরীর নিয়ে আবার যদি রেগে বেরিয়ে যায়, আমাকে তো একেবারে সহ্যই করতে পারে না ,মালতী ও তো চলে গেছে আর ওর বাবাও তো একটু আগে কাজে বেরোলেন ! আমি যে এখন কি করি! আমাকে জিজ্ঞাসা করতেই হবে , অপমানই করুক না হয়, পেটে ধরিনি বলে মা নই জানি কিন্তু তাই বলে কি ক্ষনিকের গালাগালিও হজম করতে পারব না !”

ভদ্রমহিলা বিছানায় বসে গিনির পিঠে হাত দিয়ে আরষ্ট স্বরে বললেন ,”গিনি! কী হয়েছে তোমার ?শরীর খারাপ ?”গিনি কোনো উত্তর না দিয়ে তার কোলের উপর মুখ গুঁজে বলল , ” মানুষ চেনা বড় কঠিন ,তাই না মা ? ” ভদ্রমহিলার পুরো শরীর কেঁপে উঠলো ,মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরোলো না , গিনি শুনতে পেল ,”মা ? আমি গিনির মা ? না না , এ নিশ্চই আমার শোনার ভুল ! নাকি জ্বরের ঘোরে মায়ের স্বপ্ন দেখছিল আর আমি আসাতে ….” গিনি বলল , “মা র কোলে শুয়ে ,জেগে জেগে, কেউ মায়ের স্বপ্ন দেখে বুঝি ? আর আমার জ্বর কোথায় ! তোমার গায়ের থেকে আমার গা অনেক ঠান্ডা ! একটা কথা বলছি তোমাকে ,কাউকে বোলো না কখনো ,তোমার গিনি মাইন্ড রিডার । জানো মা ! বিজ্ঞান বোধহয় ইচ্ছা করেই কিছু জিনিসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে না , মানুষ যা বিজ্ঞানের অক্ষমতা বলে ভুল করছে সে ক্ষমতা বিজ্ঞান সর্বসমক্ষে কোনদিন প্রকাশ করলে ,পৃথিবীর মানুষ যে তার ভার সইতে পারবে না ,সে সত্যি আমার থেকে ভালো আজ আর কেউ জানে না!”

মায়ের কোল গিনির চোখের জলে আর মায়ের চোখের জলে গিনির হাতের পাতা নিঃশব্দে ভিজে যেতে লাগলো ,হঠাৎ বিছানায় লাফিয়ে ওঠা লজেন্সের জিভের আদরে গিনি ভেজা চোখেই হেসে উঠলো ,গিনি শুনতে পেল লজেন্স বলছে ,”আমার গিনি ! আমার গিনি ! আমার গিনি! আদর করে ভিজিয়ে দেব তোকে !”

ধন্যবাদ,

BongNote

ক্যাসানোভা

Comments 3 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িটা স্টার্ট  দিল  সায়ন ! মেজাজ টা আজ একেবারে সপ্তমে চড়ে আছে তার। হাওয়ার বেগে পার্কিং লট পেরিয়ে সামনের বড় রাস্তা ধরে নিল সে  ! শেষে মালিনী ও ? একটা নয় ,২ টো নয় ,চার চার টে সম্পর্কের একই রকম পরিণতি  ! ‘কাকতালীয়’ শব্দ টা কোনো ভাবেই আর তার মনকে শান্তি দিতে পারছে না।  তবে কি নিখিলের কথাই ঠিক ? সে নিজেই দায়ী তার জীবনে বার বার  ঘটা এই ব্যর্থতার জন্য ?

তার প্রথম প্রেমিকা নীলিমা , ক্লাস ৯ এ পড়া মেয়েটার লম্বা চুলের বেণীর হেলদোলের সাথে  সাথে উথাল পাতাল হয়ে যেত সায়নের  মন।ছেলেদের জন্য রুদ্ররূপ আর মেয়ে দেখলেই মিন মিনে বিড়ালসুলভ স্বভাবের জন্য  অজিত স্যার কে ক্লাসের অন্য সকল ছেলেদের মতই  কিছুতেই সহ্য করতে পারতো না সায়ন ,তবুও তার কাছেই ভূগোল পড়তে ভর্তি হয়েছিল  শুধুমাত্র  স্কুলের পরে নীলিমাকে আরো কিছু সময় দেখতে পাবে বলে , এর জন্য বন্ধু মহলে একেবারে একঘরে  হয়ে গিয়েছিল সে। নীলিমা কিন্তু তার এই মহান ত্যাগের অমর্যাদা করেনি, সায়নের প্রেম প্রস্তাবে মুহুর্তে সম্মতি জানিয়েছিল।কিন্তু সে বয়সের বাকি ছেলেদের মতই তার বোঝার শক্তি ছিল না যে প্রেম পাওয়ার আগের বলিদানের চেয়েও তার পরের হিসেব অনেক  বেশী জটিল । তাই ১৫ ই আগস্টের দিন , নীলিমার সাথে ঘুরতে যাওয়ার থেকেও সায়নের কাছে পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলাই বেশী গুরুত্ব পেয়েছিল,তারপর হারানো বন্ধু মহল ফিরে পেতে অজিত স্যারের কোচিং এ  মাঝে মাঝেই সে তার টিকি দেখাতো না আর  নীলিমার প্রশ্নের উত্তরে দিয়ে দিত একঘেয়ে সাজানো অজুহাত।ব্রিটিশ দের অগোচরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা সিপাহী বিদ্রোহের মতই ,সায়নের অজান্তে বেড়ে ওঠা নীলিমার মনে ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ পরিণাম লাভ করলো মাধ্যমিকের রেসাল্টের  মহা সন্ধিক্ষণে,সেই পরিণাম কে সহজ করে দিয়েছিল সায়নের ভূগোলে পাওয়া মাত্র ৫২ নম্বর।তার পর  বেথুনে সাইন্স নিয়ে ভর্তি হওয়া মেয়ে তার মত কমার্স পড়া ছেলের দিকে যে ফিরেও চায়নি তা বলা বাহুল্য ! এরপর থেকে সায়ন ঠিক করে নিয়েছিল আর যাই হোক লম্বা চুলের মেয়েকে আর কখনো সে তার জীবনে আসতে দেবে না , যত লম্বা বেণী ,তত জোরালো তার বিদ্রোহ!

সায়নের দ্বিতীয় প্রেমিকা শ্বেতা ,সুন্দরী বললে তাকে খুব কম বলা হয়। সায়ন কে যে তার কেন পছন্দ হয়েছিল এখনো তা ভেবে দু তিন ঘন্টা সায়ন অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারে।শ্বেতার ভালবাসার স্বাদ বোঝার অবকাশ সে কখনো পায়নি ,অন্যের দৃষ্টি থেকে তার সৌন্দর্যকে বাঁচাতে সে এতোটাই  ব্যস্ত থাকতো  যে , ‘প্রেমিক’ থেকে ‘দেহরক্ষী’ পদেই  তাকে বেশী মানাতো। সেই একই উপলব্ধিতে শ্বেতা পথ বদলালে সায়ন মা কালীর দিব্যি খেয়ে শপথ করেছিল ,পৃথিবী এদিক থেকে ওদিক হয়ে যাক ,অতি বড় সুন্দরীর ছায়া আর সে ভুলেও মাড়াবে না ।

এরপর একেবারে জাত ধর্ম খুইয়ে ইংলিশ অনার্স পড়া পাঞ্জাবী মেয়ের প্রেমে হাবু ডুবু খাওয়ার কিছুদিন পরই সায়ন বুঝলো বাঙালি পেটে রোজ রোজ পরোটা হজম হওয়াটা বেশ মুশকিল। তাছাড়া কাহাতক আর ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দীতে প্রেমালাপ সম্ভব ! রাগিনীর বাংলা শেখার চেষ্টা দেখে প্রথম দিকে সায়ন বেশ খুশিই  হয়েছিল কিন্তু  একদিন যখন  রাগিনীকে  ‘অপ্রত্যাশিত ‘ শব্দের  মানে বোঝাতে  ইংলিশ সমার্থক কিছুতেই তার মনে আসছিল না , তখনই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল , তার পেটের বিদ্যার ঘটি রাগিনীর সামনে উল্টে যাওয়ার আগেই তাকে মানে মানে সরে পড়তে হবে।তার মন ও বুঝতে পেরে গিয়েছিল বাঙালী জাতের বাইরের সৌন্দর্য তাকে দূর থেকে দেখেই উপভোগ করতে হবে ।

চাকরী জীবন শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মালিনীর সাথে তার আলাপ। মেয়েটা দেখতে শুনতে সাধারণ হলেও আশেপাশের বেশীর ভাগ মেয়ের থেকে অনেক বেশী আধুনিক।মালিনীর হাসিখুশি খোলামেলা স্বভাব খুব অল্প দিনেই তাকে সায়নের খুব কাছে এনে দিয়েছিল। অফিসের পরও তার সাথে ফেসবুক ওহাটসআপে অহর্নিশ চ্যাটের পর , সায়নের  কিছুদিন ধরে  মনে হতে শুরু হয়েছিল মালিনীর জীবনে কোনকিছুই আর তার অজানা নয়। আজকে অফিসে নিচের তলায় বসা অতনু ,চা খেতে খেতে সায়নের ডেস্কে  এসে নিজের মোবাইল ফেলে যাওয়ায় , তার ফোনে আসা নতুন ম্যাসেজের ওপর না চাইতেও সায়নের চোখ পড়ে গিয়েছিল। সেই ম্যাসেজে  লেখা ভালবাসার কথার সাথে একটু আগে সায়নের পাওয়া ম্যাসেজের কথার মধ্যে হুবহু মিল , দুটো ফোনে ম্যাসেজ প্রেরকের মোবাইল নম্বরের   ১০ টা সংখ্যার মধ্যেও কোনো তফাৎ নেই  । মালিনীকে এই নিয়ে প্রশ্ন করে যে কোনো লাভ নেই তা সায়ন জানে ,জগৎ সংসারে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল পুরুষই মালিনীর বন্ধু,এরপরও প্রশ্ন করলে লাভের লাভ যা হতো  ,সায়নের চরিত্র বিবরণে আরো একটা বিশেষণ বাড়তো  :”সন্দেহবাতিক !” যাইহোক, মালিনীর মত আধুনিক মেয়ের সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ,তার মত ছাপোষা রক্ষনশীল ছেলের যে মানায় না তা সায়ন এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে।

বৃষ্টি জোরে শুরু হওয়ায় গাড়ির গতিবেগ একটু কমিয়ে দিল সায়ন। গাড়িতে গান বাজছে  ‘রহেনে দো ছোড়ো ভি যানে দো ইয়ার ,হাম না করেঙ্গে প্যেয়ার !’ না ! না ! অনেক হয়েছে ,আর নয় , এবার শুধু মন দিয়ে কাজ করবে সায়ন ।  প্রেম ট্রেম সবার জন্য নয় , চেষ্টা তো কম করেনি সে ,আর সম্ভব না , ব্যর্থতার স্মৃতির ভারে সত্যি সে খুব   ক্লান্ত  , সময় হলে ,বাবা মা যাকে দেখে দেবে ,চোখ বুজে তার গলায় মালা দিয়েই  বংশের চোদ্দ পুরুষকে উদ্ধার করবে,এই তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। প্রেমের ফাঁদে আর যেই পরুক সায়ন কর্মকার আর পরবে না! যতসব ফালতু সময় নষ্ট,প্রেমিকার উপহারের পিছনে ব্যয় হওয়া টাকা থাকলে আর কিছু না হোক, একটা Apple র ল্যাপটপ হয়ে যেতো সায়নের ,শুধু ল্যাপটপ বললে ভুল হবে ,iphone ipod ,ipad ,আরো যাবতীয় ‘i’ মার্কা জিনিস কিনে বাড়িতে পুরো আপেল গাছ লাগিয়ে ছাড়ত সে ।

হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের আলোতে দেখতে পাওয়া একটা হাত সায়নের ভাবনাতে লাল আলো দেখালো ! গাড়িটা রাস্তার পাশে নিয়ে গিয়ে দাড় করালো সায়ন ! বন্ধ গাড়ির সামনে দাড়ানো মেয়েটাকে সায়ন খুব ভালো করে চেনে , তার অফিসের পুরুষ মহলে ভীষণ পরিচিত নাম ‘নিধি আগারয়াল’, যেমন ডাকসাইটে সুন্দরী তেমনি  স্মার্ট , শরীর জুড়ে আধুনিকতার অলংকার সৌন্দর্য বিবরণের সকল বিশেষণকে একসাথে অস্থির করে দেয়।গাড়ির জানলার কাঁচের কাছে মুখ এনে মেয়েটি বলল , “My car suddenly broke down ,সামনে এক ট্যাক্সি স্ট্যান্ড হ্যায় , if you can drop me there I will be really grateful to you !”

সায়নের অজান্তেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো শব্দগুলো, “offcourse mam , Please get in my car !”

পাশে বসা নিধি আগারওয়ালের কোমর অব্দি লম্বা চুলের বৃষ্টি ভেজা জল সায়নের গাড়িকে স্নান করিয়ে দিল প্রায়।অলোকিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ তার ভিতরের পুরুষ সে ক্ষুদ্র  ক্ষতির কথা ভেবে  বেশীক্ষণ সময় ব্যয় না করে বলল ,”You live in tollygunge right ? I also live nearby ,I can drop you home.As the rain is heavy ,it will be difficult to get taxi now and Kolkata is not at all safe now a days  “.

নিধি আগারওয়াল কৃতজ্ঞতার হাসি মেখে বলল , “No Thanks is enough for you ,my phone battery was also dead ,I was so tensed … “

টালিগঞ্জ থেকে ব্যারাকপুর ফিরতে কত রাত হবে তার হিসেব করে নিয়ে ,সময় টা জানিয়ে দ্রুত বোনকে একটা sms করে দিল সায়ন আর বলে দিল তার দেরী দেখে মা যেন  চিন্তা না করে , অফিসে অনেক কাজ ,ডেডলাইন মিটের আজই শেষ দিন।

তারপর গাড়ি স্টার্ট করে তার প্রিয় গানটা চালিয়ে দিল সায়ন। বাইরে বৃষ্টির তালে গাড়িতে গান বাজছে ,”আব মুঝে রাত দিন তুমহারা হি খেয়াল হ্যয় !” সোনু নিগমের গলা আর নিধি আগারওয়ালের সৌন্দর্য ,এই অভূতপূর্ব সংমিশ্রণে তার মন এখন অতীতের সব ব্যর্থতার স্মৃতি ভুলে একটাই চেনা ডায়লগ বার বার আওরাচ্ছে : “পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত !”

আর নয়

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

অনুরাগ  : আমি তোর কাছে ফিরে এসেছি  রিনি , তোর ভালবাসার মূল্য আমার মত মহা মুর্খ যে দিতে পারবে না , তা বোধহয় তুই আগেই জানতিস ,তাই সেদিন আমাকে  আটকানোর কোনো চেষ্টাই তুই  করিসনি, কি বল ?

রিনি  : না তা নয় ,যে সেচ্ছায়  চলে যেতে চায় ,তাকে আটকানোর ক্ষমতা বিধাতার থাকলেও আমার নেই।

অনুরাগ  : কিন্তু আমি তো এখন ফিরে এসেছি ,তুই ডাকিস নি ,তবুও ফিরে এসেছি। যে ভালবাসা স্বাধীন করে দেওয়ার পরও ফিরে আসে সেই তো চির সত্য।

রিনি  : আমার কাছে ভালবাসার সত্যতা তখনি যখন সে কোনো অবস্থাতেই তার ভালবাসার মানুষ কে ছেড়ে চলে যায় না।

অনুরাগ : তার মানে একটা ক্ষনিকের ভুলের শাস্তি আমাকে সারাজীবন ধরে পেতে হবে ?

রিনি  : তুই তো ভাগ্যবান অনুরাগ ! কত মানুষ তো নিজের ভুল না জেনেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শাস্তি ভোগ করে যায় !

অনুরাগ : তাহলে তুই আমাকে কিছুতেই ফিরিয়ে নিবি না ? এটাই তোর শেষ সিদ্ধান্ত ?

রিনি  :  তুই নিজের ইচ্ছায়  চলে গিয়েছিলি  আবার  নিজের ইচ্ছাতেই ফিরে এসেছিস ,এখানে আর যাই হোক  ‘আমার সিদ্ধান্ত ‘ শব্দটার প্রয়োগ একেবারেই যথাযত নয়। একটা উহ্য  শব্দকে হঠাৎ  অনেক  গুরুত্ব দিলে সে তার অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবে ,সেটাই কি প্রত্যাশিত নয় ?

অনুরাগ :  কিন্তু আমি যে সত্যি ভিতর থেকে জবাব পেয়েছি রিনি  ,তোকে যে সবকিছু দিয়ে ভালোবাসি আমি ,তুই ছাড়া বেঁচে থাকার যে কোনো মানেই  নেই আমার কাছে ।

রিনি  : নাই বা থাকলো। যদি সত্যি কাউকে ভালোবেসে থাকিস তবে মানে ছাড়া হলেও বেঁচেই  বরং থাক ,মরে গিয়ে শান্তি লাভের আশ্বাস নিতান্তই কাল্পনিক ।

অনুরাগ : একটু ভেবে দ্যাখ রিনি   , আমার ওপর রাগ করে তুই কিন্তু আমাদের দুজনের জীবন ই নষ্ট করে ফেলছিস।

রিনি  : জীবন নষ্ট করা কি ওতই সহজ ? ও তো শুধুই  কথার কথা , নাহলে পতিতা পল্লীর নষ্ট মেয়ের জীবনের দাগে ভরা মাটির  প্রলেপ মেখে  মা দূর্গা নিজেকে কিভাবেই বা  মুহুর্তে পবিত্র করে নিতেন  বল ?

অনুরাগ : আমাদের একসাথে কাটানো অজস্র মুহুর্তের আর কোনো মূল্যই নেই তোর কাছে ?

রিনি  : ঠিক তা নয় ,বলতে পারিস সে মূল্য  মেটানোর সামর্থ্য আজ আর আমার নেই।

অনুরাগ : যা ঘটেছে তার জন্য তুইও কি দায়ী নস ? একবারও আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিস ? আমার ভালবাসার দিকে আঙ্গুল ওঠানোর আগে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখিস পারলে , তোকে ছাড়া আমি কেমন আছি একবারও জানতে ইচ্ছা করেনি ?

রিনি  : কারো  মৃত্যুর পর তার প্রতি ভালবাসা অপরিবর্তিত থাকলেও তার  সাথে যোগাযোগের  চেষ্টা ,সত্যিকে অস্বীকার করতে চাওয়া দুর্বল মনের অসম্ভব ইচ্ছা ছাড়া  আর কিছু বলা যায় না ! ভেবে নিস সেই অসম্ভবের পিছনে দৌড়তে আমার মন চায় নি ।

অনুরাগ : তার মানে তোর কাছে আমি মৃত ?

রিনি  : মৃত্যু শুধু মানুষের হয় বুঝি ! সম্পর্কের হয় না ?

অনুরাগ : তাহলে তুই আমাকে ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারবি ? এই মৃত সম্পর্ক তোর  কাছে  দুঃস্বপ্ন ব্যতীত আর কিছুই নয় !

রিনি  : তুই আমার জীবনে আসার আগেও তো আমি বেঁচেই ছিলাম ! তোর জন্য মরে গেলে যে  নাড়ির সম্পর্কের ওপরঅবিচার করা হত ,সে সম্পর্কে  কোনো স্বার্থের হিসেব নেই অনুরাগ ,আমার অস্তিত্বকে ঘিরেই  তাদের চাওয়ার শুরু, পাওয়ার শেষ ! তোর ক্ষনিকের ভালবাসা সে সম্পর্কের কাছে যে কখনো মাথা তুলে দাড়াতেই পারেনি !

অনুরাগ : রিনি  একটা সত্যি কথার উত্তর দে   ,তুই বোধহয় এখন  অন্য কাউকে ….

রিনি  হেসে বলল  : এ ভগবানের ভারী অন্যায়  জানিস অনুরাগ ! সবাইকে একইরকম ভাবে ভাবার ক্ষমতা কেন যে উনি দেন নি নাহলে তোর এই নির্লজ্জ প্রশ্নের উত্তরে এভাবে আমাকে চুপ করে থাকতে হত না।

অনুরাগ জানলার দিকে তাকিয়ে থাকা  রিনি র  পাশে এসে দাড়াতেই রিনি  ঘর থেকে দ্রুত পায়ে  বেরিয়ে গেল ,আর ভগবানও  বোধহয় সেই মুহুর্তে তার কৌতুক রসের পরিচয় না দিয়ে আর কিছুতেই থাকতে পারলেন না ,তাই রিনি র ফেলে রেখে যাওয়া মোবাইলের  রিংটোন বেজে উঠলো ,অনুরাগের কানে ভেসে এলো সোমলতা আচার্যর কন্ঠস্মর  :

“সেই হারানো চড়ুই এর ডাক ,বলে যে গেছে সে চলে যাক ,নিজেকে ভালোবাসো তুমি এবার।”

মেকআপ কান্ড

Comments 5 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

নাম করা লেখক শিশির সান্যালের লেখাটা প্রায় শেষের মুখে , হঠাৎ তার ৭ বছরের মেয়ে পান্না একটা ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকে বলল ,

“বাবা তোমাকে সাজিয়ে দেব ? “

শিশির সান্যাল অল্প হেসে বললেন , ” আজ নয় মা ,কাল আমার একটা জরুরি সম্মেলন আছে !”

পান্না বলল , ” কাল তো অনেক দেরী ! মা র ‘ক্লিন এন্ড ক্লিয়ার ‘ ফেস ওয়াশ টাও তো ব্যাগে নিয়ে এসেছি, একটু পরে তুমি  বেসিনের সামনে চোখ চেপে বন্ধ করে  দাড়িও ,আমি এক মিনিটে সব তুলে দেবো।  “

পান্নার বাবা হেসে বললেন , ” সে তো বুঝলাম ,কিন্তু আগের দিনের মত নেল পালিশ না উঠলে এই ভ্যাবসা গরমে কাল আমায় বুট জুতো পরে যেতে হবে মা গো , আর হাত দুটোও যে পকেট থেকে কোনমতেই বার করা চলবে না ! “

পান্না ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট সাদা শিশি বার করে  বাবার সামনে ধরে  বলল , ” এটা কী ? “

পান্নার বাবা , ” কী বলতো মা ! ? “

পান্না :  ” ধ্যুত ! তুমি কিচ্ছু জানো না , এটা হল নেলপালিশ রিমুভার , আর তোমাকে আঙ্গুল দিয়ে ঘষে ঘষে নেলপালিশ তুলতে হবে না ,  মা যখন সকালে সোফায় বসে নেলপালিশ তুলছিল ,আমি দুধ খেতে খেতে আড়চোখে সবটা দেখে নিয়েছি।

পান্নার বাবা : ” বাহ্ , তাহলে তো ইচ্ছাপূরণের পথে আর কোনো সমস্যাই রইলো না , শুধু খেয়াল রাখিস , আগের দিনের মত ক্রিম বা পাওডারের কৌটো যাতে শেষ না হয়ে যায় ,তাহলে কিন্তু মায়ের ‘দুম দুম’ থেকে তোকে বাঁচানো টা এবার সত্যি কঠিন হবে।

পান্না হেসে বলল , ” আচ্ছা । “

শিশির সান্যাল ছোট্ট হাতের আরামে বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়েই পড়েছিলেন , হঠাৎ  পান্নার ধাক্কায় তার ঘুম ভাঙ্গলো ,

সে আদো স্বরে বলছে , ” আইলাইনার  অনেকক্ষণ শুকিয়ে গেছে  বাবা ! আর তোমাকে চোখ বুজে  থাকতে হবে না !”

শিশির সান্যাল বিছানায় উঠে বসে হেসে বললেন , “তা এখন কি পান্নার বাবাকে তার মায়ের মত লাগছে নাকি আরো সময় লাগবে ?”

পান্না তার মুখের সামনে আয়না ধরে বলল , ” শুধু শুয়েছিলে বলে ঝুটি টা একটু বেঁকে গেছে ! “

ঠিক এই সময়ে লাবণী সান্যাল ঘরে ঢুকে বললেন , “একি করেছিস পান্না ?”

শিশির সান্যাল  বললেন , ” আহা ! পান্নাকে আমিই বলেছিলাম ! তোমার যে রোজ সাজতে ইচ্ছা করে আর আমি একদিন সাজলেই দোষ  ? নিজের চারিদিকে তাকিয়ে দেখো , ‘নারী পুরুষ সমান সমান’ রবে পুরুষ রাও কেমন গলা মিলিয়েছে ,শুধু গলা বললে ভুল হবে যদিও ,কান -নাক- গলা -হাত-চোখ প্রতিটা অঙ্গই তাদের নানা বিভূষণে সেজে উঠেছে।”

লাবণী সান্যাল বললেন , “বাহ্ ! তাহলে তো আর কথাই নেই , দেরী না করে আজকেই পার্লারে গিয়ে ,নাক কান ফুটিয়ে ষোলো কলা পূর্ণ করে ফেলো ! যেমন বাপ তার তেমনি মেয়ে ! আর এই খালি কৌটোগুলো তুমি বরং কালির দোয়াত কোরো ,আমার ড্রেসিং টেবিলে নতুন কৌটো যেন কালকের মধ্যে পৌঁছে যায় !

শিশির সান্যাল : ” সে না হয় পৌঁছে যাবে ,তা তুমি কি আমাকে  কিছু বলতে এঘরে এসেছিলে  নাকি ড্রেসিং টেবিলে নিখোঁজ উপকরণের খোঁজ করতে করতেই তোমার এই অকস্মাৎ আবির্ভাব  ?

লাবণী সান্যাল আরো রেগে গিয়ে বললেন , ” ভৌমিক পাবলিশারের তরফ থেকে একজন ভদ্রলোক তোমার সাথে দেখা করতে এসেছেন,তাই বলতেই আসতে হলো ! নাহলে তোমার আর তোমার গুনধর মেয়ের কীর্তিকলাপ দেখা ছাড়াও, সংসারে আমার অনেক কাজ আছে !”

শিশির সান্যাল ব্যস্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে বললেন , “ওহ ! আমি তো একদম ভুলেই গিয়েছিলাম !” তারপর তাড়াতাড়ি বেসিনের সামনে গিয়ে মুখ ধোয়ার পরও মেকআপ অপরিবর্তিত দেখে চিন্তিত হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকাতেই লাবনী সান্যাল বললেন ,”আমার দিকে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই , এ জিনিস ১৬ ঘন্টার আগে উঠবে না , এগুলো ইমপোর্টেড লং লাস্টিং কসমেটিকস পতিদেব,তোমার হাতের  ফেস ওয়াশ এর টিকিটিও বাঁকাতে পারবে না ! “

শিশির সান্যাল  কাঁচু মাচু মুখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন , “তাহলে এবার কী  হবে ? পাবলিশার ভদ্রলোকের সাথে দেখা করা যে খুব জরুরি ! “

লাবণী সান্যাল : ” সে বরং পান্না কেই জিজ্ঞেস করে দেখো !”

শিশির সান্যাল : “আহা ! ও বেচারী  কে আর এ বিপদের মধ্যে টেনো না , কিছু  একটা উপায় বল লক্ষীটি ,আমার যে দেরী হয়ে যাচ্ছে ।”

লাবণী সান্যাল দ্রুত পায়ে ঘর থেকে একটা ক্রীম আর তুলো এনে বললেন , “এটা দিয়ে চেষ্টা করো ,পুরোটা না হলেও কিছুটা উঠবে !”

১৫ মিনিটের চেষ্টায় মুখ টা  কিছু টা  পরিস্কার হলো ঠিকই  কিন্তু কিছু জায়গা ঘষায় ঘষায় একেবারে লাল হয়ে এসেছে , জায়গা গুলোতে বরফ ঘষে নিয়ে শিশির সান্যাল মুখ মুছে আয়নায় দেখলেন ,এত চেষ্টার পরও ঠোঁটে এখনো লিপস্টিকের হালকা প্রভাব লেগে আছে, মুখ জুড়ে অস্পষ্ট মেকআপের সাদা  দাগের মাঝে কিসব যেন চিকমিক করছে ,আইলানার  দাগ টা পরিস্কার না বোঝা গেলেও কালো ভাবটা একেবারেই দূর হয়নি। আবার একবার মুখ টা ধোবেন ভাবছিলেন তখনি লাবণী সান্যাল এসে বললেন , “আমি চা দিতে গেছিলাম ,ভদ্রলোক বলছিলেন ওনার আরো কোথাও একটা যেতে হবে, তাই বেশীক্ষণ বসতে পারবেন না  !”

শিশির সান্যাল ব্যস্ত হয়ে বললেন , ” আচ্ছা ,আমি যাচ্ছি এখনি !”

ড্রয়িং রুমে ঢুকে বসে থাকা ভদ্রলোক কে নমস্কার করে শিশির সান্যাল বললেন , ” ক্ষমা করবেন সুকান্ত বাবু ,আপনার অনেক সময় নষ্ট করে দিলাম !”

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ অবাক হয়ে শিশির সান্যাল কে দেখে ,তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে অমায়িক হাসি মেখে বললেন , ” না না ! সে ঠিক আছে , তা যেটা বলতে এসেছিলাম সেটা হলো , আপনার নতুন উপন্যাস টা আমরাই ছাপাবো , আর কারো সাথে যোগাযোগ করা অপ্রয়োজন ! এবারের অন্য স্বাদের গল্প টা মনে হচ্ছে একেবারে বেস্ট সেলার হবে মশাই ! শুধু  নতুন গল্পের অনুপ্রেরণা সম্বন্ধে একটু জানার জন্য এসেছিলাম , শুরুতে সে বিষয়ে একটু না লিখলে পাঠকের আগ্রহের ওপর অবিচার করা হয় , আসলে আপনার আগের উপন্যাসে নিজের ছোটবেলার অভিজ্ঞতার ছাপ ছিল কিন্তু  এই উপন্যাস টা তো একদম অন্যরকম তাই ….. কিন্তু আর তার দরকার নেই , লেখকের কল্পনার উৎস, জীবন্ত বাস্তব হলে আলাদা করে অনুপ্রেরনা কলম মিথ্যাই সময় নষ্ট  ব্যতীত কিছু নয় , সে কল্পনা পাঠকের জীবনের বাস্তবের সাথে মিল খুঁজে পাক অথবা লেখকের নিজের , সে সত্যি মিথ্যার দায়ভার প্রকাশকের না নেওয়াই ভালো ,বুঝলেন কিনা ! হে হে হে ! “

শিশির সান্যাল  বললেন , ” সুকান্ত বাবু  …..”

তাকে শেষ করতে না দিয়েই ভদ্রলোক বললেন  : ” ভয় নেই মশাই , অনুপ্রেরণার কলম উঠিয়ে এবার উৎসর্গ কলম দিয়ে দেব ভাবছি ! তা কাকে উৎসর্গ  করতে চান আপনার নতুন উপন্যাস ?”

শিশির সান্যাল  বললেন : “আমার মেয়ে ,পান্নাকে। “

ভদ্রলোক  : “তা বেশ বেশ ! তাই কথা রইলো তাহলে ,এবার আসি বুঝলেন ! আমার আবার একবার ব্যাঙ্কে যেতে হবে , আপনার আগাম টাকা টা আমি খুব তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেবো ! “

ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর , নেলপলিশ রিমুভার দিয়ে বাবার হাতের নেলপালিশ তুলতে ব্যস্ত থাকা পান্নার পাশে বসে লাবনী সান্যাল বললেন , ” ভদ্রলোক অনুপ্রেরণা কলম টা বাদ দিয়ে দেবে বলল কেন গো ? আর কীসব জীবন্ত বাস্তব ,জীবনের সাথে মিল , সত্যি মিথ্যার দায়ভার ইত্যাদি ইত্যাদি বলছিল ,বাইরে থেকে শুনে আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না,তোমার নতুন উপন্যাস টা  কিসের উপরে গো?”

শিশির সান্যাল হেসে বললেন  :  “জীবনের মাঝামাঝি  পৌঁছে  একজন পুরুষের লিঙ্গ পরিবর্তনের অদম্য ইচ্ছা আমার নতুন উপন্যাসের প্রধান বিষয়।  এখন আর নিশ্চই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না অনুপ্রেরনা কলমের জায়গা কেন ‘উৎসর্গ ‘নিয়ে নিল !”

ধন্যবাদ ,

BongNote

সিংহাসন

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

সিংহাসন : আপনি কোথায় চললেন মহারাজ ?

রাজা অস্থির হয়ে বললেন : জানিনা ,তবে এটুকু জানি ওই গদিতে  বসার যোগ্যতা আমার নেই।

সিংহাসন : একি বলছেন মহারাজ ? ঈশ্বরের যোগ্যতা বিচার হয় বলে তো কখনো শুনিনি।

রাজা বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন : কে  ঈশ্বর ? আমি তো একজন সাধারণ মানুষ যার ছোট্ট ভুলের খেসারত দেশ সুদ্ধ অসহায় মানুষকে দিতে হয় !

সিংহাসন : তাই বুঝি ? আপনি যখন বলছেন তাই হবে হয়তো ,আসলে আমি তো কখনো ঈশ্বর দেখিনি তবে লোকমুখে শুনেছি তার কথা, একই দেহে রক্ষক আর ভক্ষকের সহাবস্থানই বোধহয় আমার এই ভ্রমের কারণ।

রাজা : কার দেহে রক্ষক আর ভক্ষকের একই সাথে সহাবস্থান ?  তুমি কি আমাকেই কটাক্ষ করছো ?

সিংহাসন : লোকমুখে শুনেছি দ্বাপর যুগে আপনার মতই এক ভীষণ প্রতাপশালী  রাজা ছিলেন , একদিকে রাজনৈতিক কুটিলতা ও অন্যদিকে মোহিনী মোহন রূপ তাকে মহাকাব্যের প্রধান পুরুষ বানিয়েছিল ঠিকই কিন্তু তার ‘ভগবান’ উপাধি লাভের পিছনে ছিল ওই একটাই  কারণ  ‘একই দেহে রক্ষক আর ভক্ষকের সহাবস্থান’। গোবর্ধন পর্বতের আড়ালে তিনি যেমন ছিলেন বৃন্দবাসীর রক্ষক আবার কুরুক্ষেত্রের  মহাযুদ্ধে , নিরস্ত্র সারথী বেসে ছিলেন তেমনি নৃশংস  ভক্ষক , যার খিদের আয়ু ছিল পুরো ১৮ দিন । আপানার মধ্যেও সেই

একই গুণ প্রথম দিকে আমাকে শিহরিত করলেও শেষমেষ সর্বশক্তিমানের গুনগানই ছিল আমার বাঁচার সম্বল।

রাজা হতাশ হয়ে বললেন : মানে তুমিও আমাকে ভালোবাসো না ? ভয় করো শুধু ?

সিংহাসন : কি যে বলেন রাজা মশাই ! সিংহাসনের আবার  ভালবাসা ! সে পেতে তো অনেক ভাগ্য লাগে শুনেছি !

যাকে ভালো বাসি ,যার একবার ফিরে দেখবার অপেক্ষায় অনন্ত কাল ধরে একইভাবে বসে আছি  , কখনো  ভ্রম বশত  মুহুর্তের জন্যও সে কখনো ফিরে চায়নি আমার মনি মানিক্য ভরা শরীরের দিকে, তার মোহ মায়াহীন হৃদয়,অন্তর্নিহিত  প্রকৃত রাজা হওয়ার সকল গুনগুলো উপেক্ষা করে, অজানা কোনো শক্তির ধ্যান মগ্ন হয়ে আছে সেই কোন আদি অন্তহীন সময় ধরে,আর যোগ্যের অহর্নিশ প্রতীক্ষার ফলস্বরূপ আমার কপালে জোটে সব লোভী ক্ষুধার্তের দল ,যাদের নিরন্তর খাই খাই দেখে আমার চোখ এখন এতটাই অভ্যস্ত যে তার ব্যতিক্রমের আশা কেউ করলে আমি আড়ালে মুখ চেপে হাসি।

রাজা : শুধু তুমি কেন ! আমি নিজেই এখন আর আমাকে সিংহাসনের যোগ্য মনে করি না , তাই তো চলে যাচ্ছি , কিন্তু একটা সত্যি কথা জানতে ইচ্ছা করছে , এই ভয়ানক ভুল টা করার আগেও কি আমি যোগ্য রাজা ছিলাম না বলেই তোমার বিশ্বাস?

সিংহাসন : এই মুহুর্তে সিংহাসনে না বসে থাকলেও আপনি রাজা ,যার ওপরে বসে আপনি অন্যের যোগ্যতা বিচার করেন, সে কি করে আপনার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করবে বলুন ! তবে এটুকু বলতে পারি  ক্ষনিকের জন্য হলেও কিছু মানুষের নিশ্চই মনে হয়েছিল আপনি তাদের রাজা হবার যোগ্য আর তাদের সেই মনে হওয়া যতই স্বল্পস্থায়ী হোক ,সেই চরম  মুহুর্তের সিদ্ধান্তই আপনাকে বসিয়ে দিয়েছিল

এই পরম কাঙ্খিত আসনে নাহলে আপনিও আরও অজস্র  রাজা হবার দৌড়ে সামিল মানুষের মত , সময় শেষে আমাকে দূর থেকে দেখেই  দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন  ।

রাজা পাপ বোধে বিচলিত হয়ে বললেন : শুধু একটা ভুলের জন্য সবকিছু বদলে গেল ! কেন যে আমি সাড়া দিলাম এই  সর্বনাশা যুদ্ধের হাতছানিতে ,কেন যে সকল লাভের খেলায় ক্ষতির হিসেব টাই একেবারের জন্যও চোখে পরেনি ! আসলে ভয়ঙ্কর জেতার নেশাটাই আজ আমাকে এভাবে সর্বহারা করে দিল।

সিংহাসন : আপনাকে সর্বহারা করে দিল !  কি হারিয়েছেন আপনি ? সিংহাসন ? ব্যাস ? ওটুকুই আপনাকে সর্বহারা করে দিল ?

একবার ফিরে গিয়ে দেখুন সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রে , সাদা লালের মাঝখানে মরা পঁচা গন্ধে জ্ঞান হারানোর আগে নিজের অন্তর্যামী কে জিজ্ঞ্যেস করবেন সর্বহারার মানে , এই মুহুর্তে  সে উত্তর আপনি  শুনেও বুঝতে পারবেন না।

রাজা : আমি আর পারছি না ! এখনি আমার ভুলের প্রায়শ্চিও করতে চাই ! আচ্ছা ,ক্ষতিপূরণ দিলে কেমন হয় ? আমি রাজকোষ ফাঁকা করে দিতেও রাজি।

সিংহাসন : আপনি কী ক্ষতি করেছেন তা জানেন কি ? তা না জানলে মিথ্যা ই ক্ষতিপূরণের চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত হচ্ছেন !

রাজা কটাক্ষ করে বললেন : বিদ্রুপ করছো ? প্রাণ ফেরানোর কোনো উপায় জানা থাকলে কি আমি এখানে এভাবে বসে থাকতাম ?

সিংহাসন : প্রাণ ফেরানোর উপায় নাই বা জানলেন , প্রাণ নেবার অগনিত উপায় তো জানেন ,  এইসব দুর্বল , অসহায় ,সর্বহারাদের মরে যাওয়াই ভালো , তাদের নিরন্তর বুক চাপড়ে কান্না  রাজার অস্বস্তির কারণ হলে শাস্তি পেতে হবে বৈকি ! শ্বাস বন্ধ হওয়ার আগে, তাদের মধ্যে মৃত্যুভয়হীন কিছু মানুষ ,শিরদাড়ার জোরে আপনার দিকে আঙ্গুল তোলার চেষ্টা করলেও তা  সোজাসুজি আপনার দিকে  ওঠার আগেই আপনার প্রহরীর কাটারীর কোপে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাবে। কোনো ভয় নেই আপনার,  রাজার সিদ্ধান্তের বিচার হয় না পৃথিবীর কোনো আদালতে!

রাজা : তোমাকে ভালোবাসাই আমার কাল হয়েছে , যাবো ভেবেও কিছুতেই যেতে পারছি না ,কোন এক অমোঘ শক্তিতে আমাকে যেন কেউ বেঁধে রেখেছে তোমার সাথে !

সিংহাসন :  সেই শক্তির নাম  ‘লোভ’ , মহাকালের মতই সেও অন্তহীন। আপনি মিথ্যাই এত ভাবছেন ,আপনার ক্ষনিকের বিচলিত মন দু এক গ্লাস সুরাপানেই  শান্ত হয়ে যাবে মহারাজ !

রাজা উত্তেজিত হয়ে টেবিলে রাখা সোনার গ্লাসে সুরা ঢেলে বললেন : সত্যি বলছো ? এই দুঃস্বপ্নের দায়ভার আর আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে না বাকি জীবন ? রাত্রি কাটলেই সব আগের মত হয়ে যাবে?

সিংহাসন :  নিশ্চই হয়ে যাবে মহারাজ , একদম সব আগের মত, কিন্তু শুধু আপনার জীবনে !

রাজা : আর বাকি দের ?

সিংহাসন : কাদের কথা বলছেন ? যুদ্ধ ক্ষেত্রে পড়ে থাকা লাশ গুলো নাকি মৃতের সমান বেঁচে থাকা আত্মীয় স্বজন? নিশ্চই এদের মধ্যে কারো সব ঠিক হওয়ার আশা আপনি করছেন না মহারাজ! আর বাদ বাকিদের তো কিছু  বেঠিক ই হয়নি , তাই ঠিক হওয়ার

চিন্তা টা সময় নষ্ট ব্যতীত কিছুই নয় !

সুরার নেশায় মগ্ন রাজা বললেন : মোক্ষম উপায় বাতলেছো! মাত্র ৪ গ্লাসেই অস্থিরতা টা কমেছে  , লাল রঙ টা তেমনি স্পষ্ট  কিন্তু সাদা রঙ টা আবছা হয়ে আসছে! আমি ভেবে পাচ্ছি না এমন নিশ্চিত ভাবে তুমি বললে কি করে ? এরকম অভিজ্ঞতা কি তোমার আগে কখনো হয়েছে ?

সিংহাসন : বহুবার ! এই আসনে বসা  রাজারা তো সেই একই ইতিহাসের বিনা ব্যতিক্রমে পুরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলেছেন সেই প্রথম দিন থেকে।আপনার মতই তাদের ক্ষনিকের  পাপবোধ  দূর করতে , একরাত্রি ভরপেট সুরাপানের পর আরামায়ক বিছানাই যথেষ্ঠ ছিল ,আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখুন মহারাজ , কিছু দেখতে পাচ্ছেন ?

রাজা  নেশাতুর চোখে তাকিয়ে দেখলেন একের পর এক মুখ বদল হচ্ছে তার  সাধের সিংহাসনে ! বিস্ময়ে।,ভয়ে , উদ্ভ্রান্তের

মত সিংহাসনের কাছে দৌড়ে গিয়ে   , গদির ওপরে বসে থাকা ভদ্রলোক কে বললেন , ” আপনি ? জার্মান ইতিহাসের পাতায়  একটা খুব চেনা ছবির সাথে আপনার মুখের আদল টা যে হুবহু মিলে যাচ্ছে বিশেষ করে আপনার এই   গোঁফ টা !

একি আপনি আবার কে ? আগের জন কোথায় গেলেন ? আমার মাথাটা কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে  ! ওহ মনে পড়েছে , আপনি তো সেই ইরাকের রাজা ! কিন্তু এটা  তো আমার সিংহাসন ,আপনারা কী করছেন এখানে ? কী  চান বলুন তো ? আমার কথার উত্তর না দিয়ে কোথায় চলে গেলেন?

আবার নতুন মুখ ! আপনি তো সেই কুখ্যাত আমেরিকার অধিপতি ,আপনার হাত তো বিষাক্ত মাকড়সার জাল মশাই ,পুরো পৃথিবীকে গিলে  ফিলতে  ক গ্লাস সুরা লেগেছিল আপনার ? আমার ভিতরে খুব কষ্ট হচ্ছে যে ! যদিও  সিংহাসন বলছিল কাল সকালেই  সব ঠিক হয়ে যাবে তবুও আমার ঘুমাতে খুব ভয় করছে , নিজের অভিজ্ঞতা হাতড়ে  একটা সত্যি কথা বলুন তো ,সুরা পানের পরে  ঠান্ডা ঘরে স্বর্গী য়  বিছানায় আপনার ঘুম একবারের জন্যও লাল আর সাদা রঙের ভয়ঙ্কর স্ম্র্তি ভাঙ্গিয়ে দেয়নি ? কী  হলো ? কিছু বলছেন না  যে ?

বিশ্বাস করুন ,উত্তর টা আমার জানা খুব জরুরি!

সুরা হাতে খালি সিংহাসনের সামনে বসে থাকা রাজা জ্ঞান হারানোর আগে অদৃশ্য কাউকে অস্ফুটে  বললেন , “আপনি ? আগের জন

কো ……”

বাস্তব কল্পনা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

শিকাগো থেকে কলকাতার একটানা লম্বা সফর প্রায় শেষ , আন্তর্জাতিক প্লেনটা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস এয়ারপোর্টে নামার আগে iphone এ মুখ গুঁজে পাশে বসা ছেলেটিকে ভদ্রলোক বললেন ” সানি! ফোন টা রেখে একবার জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দ্যাখ!”

ছেলেটি ফোন থেকে মুখ না তুলেই নির্বিকার ভাবে জিজ্ঞেস করল : ” What ? I mean কী দেখবো ?”

ভদ্রলোক বললেন “এ যে বড় আপনার জিনিস বাবা! তোর নিজের দেশ , নিজের শহর !”

ছেলেটি নিজের নীল রঙের পাসপোর্ট টা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে বলল ” Its yours , I left my country 16 hours back to waste my summer vacation in this bloody place only because of you ! “

কথাটা শুনে ভদ্রলোক ক্ষনিকের জন্য চমকে উঠলেন , পরক্ষনেই স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন ” শুনলে তো কি বলল ?”

ভদ্রমহিলা শান্ত গলায় বললেন ” ওত emotional হবার কিছু হয়নি , যেকোনো মা নাড়ির টানে শুধু নিজের সন্তানদেরই বাঁধতে পারে, কলকাতাও তার ব্যতিক্রম নয় , ১৪ বছরের আমেরিকার নাগরিককে বাঁধার মত সাধ্য কোথায় তার !”

ভদ্রলোক : তোমাকে বার বার বলেছিলাম ওকে নিয়ে আসার দরকার নেই , এখন যদি বাড়ির লোকের সামনে এসব বলতে থাকে ,তাহলে কি হবে একবার ভাবো দেখি !”

ভদ্রমহিলা রেগে বললেন : কি কথা ! নিয়ে আসার দরকার নেই ! তা কি করতে শুনি? মেম দের কোলে শুয়ে দিয়ে আসতে আমার পেটের ছেলেটাকে ? ১ দিন বা ২ দিনের ব্যাপার হলে তাও বুঝতাম ,পুরো একটা মাস ! সানি একদিন বাড়িতে দেরী করে ফিরলেই, আমার দিকে তোমার চাওনি দেখে তো মনে হয় তোমার বারণ করা সত্তেও মিশিগান লেকে ভাসতে থাকা অন্যের ছানা কে পুষ্যি করার ভুলের কৈফিয়ত চাইছো! গত এগারো মাস ধরে ,ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে দু দন্ডের শান্তির অপেক্ষা, তোমার আমেরিকান ছেলে না বুঝলেও আমি তো বুঝি নাকি ! তাই আমি চাইনি আমার ছেলের নাচন কোদনের চিন্তা , তোমার মায়ের হাতের মুড়ি ঘন্টের অমৃত সমান স্বাদলাভে ব্যাঘাত ঘটাক ! আর আমার ছেলের মুখের ১০ টা শব্দের মধ্যে ৮ টাই আমেরিকান অ্যাকসেন্টে উচ্চারিত ইংরাজী শব্দ যা মাঝে মাঝে তুমি নিজে বুঝতেই খাবি খাও,তাই সে কথা শুনে তোমার মা কাকীমাদের অভিমানের ‘চিন্তা’ র আগে ‘আকাশকুসুম’ বিশেষণ টা ভালো মানাবে।

এবার জানলার ধারের ছেলেটি, চোখ বুজে বসে থাকা ভদ্রলোককে বলল : I am sorry বাবা! You know me enough to understand that I dint mean to hurt you, I just hate crowd . Please stop talking with mom’s pic in public place , if any stupid indian people make fun of your true emotion and your american son cant keep his promise ‘to be a gentleman at least for 1 month’, all of your anger will again point to my dead mom in no time. তোমার কথা অনুযায়ী , If I am bad its because she left us without performing her responsibility and if I am good then সেটা ভগবানের দয়ায়,what kind of logic is this ? its high time you should think differently. আমি জানি , I am not like that ,the way you want me to be , because I grew up in a completely different environment and circumstances, but কখনো নিজের সাথে আমাকে relate করতে পারলে বা আমার ভিতরে কোন ছোট কিছু ভালো লাগলেও মনে কোরো ,its only because you left no stone unturned to make me a good person . Just understand a simple thing বাবা ,whatever happens I cant let you go. আমি মা কে খুব ভালোবাসি ,ঠিক আগের মতই কিন্তু তোমার মত করে ভাবতে পারি না যে মা এখনো আমার কাছেই আছে। I am taught to be practical from very beginning ,তাই imagination power আমার নেই বললেই চলে, সেটা থাকলে বোধহয় ভিতরের কষ্ট টা অনেক টাই কমে যেত।
I understand your sufferings , তাই যখন তখন তোমাকে এভাবে মা র সাথে কথা বলতে দেখি , কেউ যেন আমার টেবিলে রাখা মা র ছবির উপর জমা ধুলো গুলো সরিয়ে দেয়.This one feeling worth everything I own ,সত্যি টা যাই হোক না কেন, at least you think মা din’t left us,she just cant . এবার চলো বাবা , প্লেন থেকে নামতে হবে আমাদের ,আমি আস্তে আস্তে হ্যান্ড লাগেজ গুলো নামাই ওপর থেকে ।

ভদ্রলোক আবছা চোখে স্ত্রীর ফটোর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন : এই না হলে বাঙালী মা ? ওত অল্প সময়ে নিজের আমেরিকান ছেলেকে কলকাতাকে ভালবাসতে না শেখাতে পারলেও যা শিখিয়েছো তা না থাকলে আমার ভিতরের মানুষটার বেঁচে থাকা যে আরো অনেক কঠিন হয়ে যেত । সানির কথা শুনে তার মা তো দেখেছি আনন্দে একেবারে আটখানা ! চশমা ছাড়াই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে , ছেলের ভালোবাসা শেষ পাতে মুসুরির ডালের মত সুরুত সুরুত শব্দে চুমুক দিয়ে খাওয়া হচ্ছে !

হাত খরচ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

রবিবার সকালবেলা দুধের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বিতান বলল : মা ! ‘ হাত খরচ’ মানে কি ? দাদাভাই আজ সকালে বাবার ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমাদের গাড়িটা ধুয়ে চকচকে করে দিয়েছে বলে , আমি দেখলাম তুমি ওর হাতে ৫০০ টাকা দিয়ে বললে ‘এটা তোর হাত খরচ’ ।

স্নিগ্ধা লাহিড়ী তার ৮ বছরের মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন : নিজের হাতের মাপের প্রয়োজন গুলো মেটাতে লাগা খরচ কেই ‘হাত খরচ’ বলে।

বিতান নিজের হাত টা মেপে নিয়ে বলল : হাতের মাপের প্রয়োজন ? হাত টা তো মেপেছি কিন্তু সে মাপের প্রয়োজন টা কি মা ?

বিতানের মা হেসে বললেন : কাল বিকেলে বাবার সাথে ঘুরতে গিয়ে ফিরে আসার সময় তোর জামার পকেট টা ওরকম ফুলে ছিল কেন রে বিতান ? কি ছিল পকেটে?

বিতান মুখ নিচু করে হেসে বলল : এক্লেয়ার্স আর হজমী গুলি।

বিতানের মা বললেন : বুঝলাম। এবার বল , কাল দুপুরে আচার ওয়ালা কে জানলা দিয়ে দাড়াতে বলেও আবার একটু পরে চলে যেতে বললি কেন?

বিতান মন খারাপ করে বলল : কি করব ? বাবা যে ঘুমাচ্ছিল। আর আচার খেতে দেখলেই যে তুমি আমাকে বকো ।

বিতানের মা বললেন :বাবার ঘুম না ভাঙ্গিয়েও আচার টা তুই কাল কিনেই নিতে পারতিস বুঝলি বিতান ! যদি তোর কাছে থাকতো …..

বিতান উত্তেজিত ভাবে বলল : হাত খরচ ?

বিতানের মা হেসে বললেন : ঠিক তাই ! যদিও আমার থেকে কানমলা টাও তারপর তেঁতুলের আচারের মতই এক চোখ বন্ধ করে খেতে হত তোকে ।

বিতান হেসে বলল : আচ্ছা মা ! বাবার হাত তো আমার থেকে কত্ত বড় ,তাই বোধহয় বাবার ‘হাত খরচ’ ও অনেক বেশী তাই না ? তা না হলে আমি আর দাদাভাই যখন যা চাই ,তখনি বাবা তা কি করে কিনে দেয় ?

বিতানের মা : ‘হাত খরচ’ যে আমার বিতানের মতই ছোট্ট একটা মেয়ে, তাই সে শুধু নিজের আয়তনের ছোট্ট ছোট্ট প্রয়োজনই মেটাতে পারে, সে যখন বড় হয়ে যায় তার পুরনো নামে আর তাকে কেউ ডাকে না ,তখন একটা নতুন নাম হয় তার।.

বিতান : কি নাম মা ?

বিতানের মা : ‘রোজগারপাতি ‘। ‘হাত খরচ’ নামের নাগালের বাইরের প্রয়োজনগুলো মেটাতে হঠাৎ একদিন সে নতুন নামে এসে হাজির হয় । কী বুঝলি ?

বিতান : দাদার পাওয়া ৫০০ টাকা ‘হাত খরচ’ হলেও বাবার মানি ব্যাগের সব টাকা হল ‘রোজগার পাতি ‘। ঠিক বলেছি না ?

বিতানের মা হেসে বললেন : একদম ঠিক । তোর ‘হাত খরচ’ দিয়ে শুধু বাড়িতে বসেই এক্লেয়ার্স খাওয়া যাবে ,পূজোর ছুটিতে সবাই মিলে পুরীর সমুদ্রের ধারে বসে এক্লেয়ার্স খেতে হলে যে বাবার ‘রোজগার পাতি’ র সাহায্য লাগবে বিতান সোনা !

বিতান মুখ নিচু করে বলল : আমার কাছে তো হাত খরচ নেই , সে তো দাদাভাই এর কাছে আছে।

বিতানের মা বললেন : তুই চাইলে তোর কাছেও থাকতে পারে। তবে ‘হাত খরচ ‘ পেতে হলে দাদাভাইয়ের মত কাজ করতে হবে কিন্তু ,বিনা পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ, প্রয়োজন মেটালেও তা গ্রহণ কারীর জীবনে ‘পরিশ্রম’ আর ‘অর্থ’ দুটো শব্দকেই মূল্যহীন করে দেয়।

বিতান বলল : একটু সহজ করে বল না মা।

বিতানের মা হেসে বললেন : আজ যদি তুই বিনা পরিশ্রমে ‘হাতখরচ’ পেয়ে যাস, তাহলে কাল বাবা ঘুমিয়ে থাকলেও আচার কিনতে পারবি ঠিকই ,কিন্তু কাক ভোরে উঠে অত বড় গাড়িটা পরিস্কার করে ধুতে দাদাভাইয়ের যে কত কষ্ট হয়েছে তা যে তুই চেষ্টা করেও বুঝতে পারবি না বিতান , তাই এমনি পাওয়া হাতখরচটা যে শুধু তোর ‘আচার কেনার দাম’ বলেই মনে হবে যা তোর অজান্তে কখন দেখবি কেনা আচারের ভালো মন্দ স্বাদের সাথে হজম হয়ে গেছে ।

বিতান বলল : যদি দাদাভাইয়ের মত কাজ করে হাতখরচ পাই তাহলে ?

বিতানের মা : তাহলে একদম অন্যরকম হবে। আচারের স্বাদ খারাপ হলে তোর মন খারাপ করবে ,মনে হবে এর থেকে কত ভালো হত ওই টাকায় ২ টো এক্লেয়ার্স কিনলে বা তোর পছন্দের অন্য কিছু কিনলে ।

বিতান বলল : আর ভালো হলে ?

বিতানের মা : ভালো হলে তো আর কথাই নেই, পরিশ্রমের বিনিময়ে পাওয়া টাকায় কেনা স্বাদ তোর জিভে অল্প স্থায়ী হলেও মনের গভীরে হবে চিরস্থায়ী যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোকে কারণে অকারণে আনন্দ দেবে।

বিতান : তুমি যখন ছোট ছিলে, তখন বুঝি তুমিও দাদাভাইয়ের মত পরিশ্রম করে হাত খরচ পেতে ?

বিতানের মা : পেতাম বৈকি। আমাদের বাড়িতে গাড়ি ছিল না তবে হাত খরচ পাওয়ার অন্য অনেক উপায় ছিল। এই যেমন ধর মায়ের সাথে চাল বাছার সময় যটা কাঁকড় খুঁজে বার করতে পারব তটা ১০ পয়সা আমার লাভের খাতায় ,বেশী কাঁকড় ভরা চাল আনলে মা র কাছে বকা শুনে নগেন কাকার গোমড়া মুখ , আল্হাদে আমার ১০ পয়সার গুনতি দেখে মুহুর্তে হাসিতে বদলে যেত। মাছ কাটতে বসা কাকীমনি বাথরুমে গেলে ,মাছের গন্ধে আশেপাশে ঘুরঘুর করা বিড়ালের থেকে মাছ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পড়ত আমার ওপর , ১ মিনিট পাহাড়া দিলেই ১০ পয়সা, স্বাভাবিক নিয়মে মিনিটের সাথে পয়সার যোগফল ও বাড়তে থাকতো । সবচেয়ে বেশী মজা হত জ্যেঠুমুনির দেওয়া কাজে ।

বিতান : সেটা কি মা ?

বিতানের মা : জ্যেঠুমুনির মাথার প্রত্যেক টা পাকা চুলের দাম ছিল কুড়ি পয়সা ,তখন তো আর চশমা ছিল না ,একটা পাকা চুল তুলতে আমার ৫ সেকেন্ডের বেশী লাগতো না । হজমলা ,আচার ,রঙ বেরঙের কাঠি আইসক্রীম আরো যে কত কিছু নিজেও খেতাম বন্ধুদেরও খাওয়াতাম ,ট্যাক ভরা হাতখরচে আমি তো তখন একেবারে ডাকসাইটে বড়লোক যাকে বলে !

বিতান একটু চুপ করে থেকে বলল : মা ! একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল ,কাল তোমাকে কতবার বলব ভেবেও আবার ভুলে গেছি।

বিতানের মা : কি কথা রে বিতান ?

বিতান : কালকে যখন তুমি আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলে আমি তোমার মাথায় ৩ টে পাকা চুল দেখতে পেয়েছি,তুমি যদি বল তাহলে আজকেই সবকটা তুলে দিতে পারি ! মানে তোমার সুন্দর কালো চুলের মধ্যে ওগুলো একদম খারাপ লাগছে তো , তাই বলছিলাম আর কি !

বিতানের মা হেসে বললেন : দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়ার পর। প্রতিটা পাকা চুলে ৫ টাকা করে পাবি ,তবে মনে থাকে যেন চুল আধা কাঁচা থাকলে কিন্তু হাত খরচ ও অর্ধেক হয়ে যাবে।

মোহিনীমোহন

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

দেওয়াল জুড়ে মনভোলানো কারুকার্য করা একটা ভীষণ সুন্দর ঘরে প্রবেশ করে, জনৈক ভদ্রলোক কাউকে উদ্দেশ্য করে বললেন : একা ঘরে আপনাকে দেখে কথা বলার লোভ কিছুতেই সামলাতে পারলাম না কৃষ্ণ স্যার ! আমাকে দেওয়া অল্প সময়, আপনার বড়সড় কোনো হিসেবের গোলমাল না করে দিলে ,একটু বসতে পারি ?

কৃষ্ণ : হ্যাঁ! বসুন না , স্বর্গে থাকলেও আমি বরাবরই খুব ‘Down To Earth’।

জনৈক ভদ্রলোক : Many Many Thank You কৃষ্ণ স্যার! মানে মরার পর হাত একেবারে খালি করে দেয় তো ,আপনার জন্য নিজের হাতে করে মাখন নিয়ে আসার আজন্ম ইচ্ছাটা পূরণ করার কি কোনো উপায় ছিল বলুন ? মানে আপনার প্রিয় খাবার যে ‘ওইটাই’ ,তা প্রতিবছর জন্মাষ্টমীর দিন সকালে ,টাটকা মাখন লাভের আশায় ঘন্টার পর ঘন্টা দোকানে দাড়িয়ে থাকার সময় আমার শরীরের প্রতিটা মজ্জা নতুন করে উপলব্ধি করতো ।

কৃষ্ণ : উহু! আপনার মজ্জারাশির এত বছরের উপলব্ধি একেবারেই ভুল।

জনৈক ভদ্রলোক : ভুল ? মাখন আপনার প্রিয় খাবার নয় ? আপনার সুনজরে থাকতে মাখনের পিছনে আমার এত বছরের বিনিয়োগ শুধুই অপচয় বলছেন ? ওহ ! আবার সেই পুরনো বুকের ব্যথাটা শুরু হয়ে যাবে মনে হচ্ছে ! তাহলে আপনার প্রিয় খাবার কি কৃষ্ণ স্যার ?

কৃষ্ণ : আমার কাছে খাবারের নামের থেকেও তাতে মেশানো উপকরণ বেশী গুরুত্বপূর্ণ । ভালবাসা , রাগ-অভিমান ,ক্ষোভ বিদ্বেষ ইত্যাদির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিমাপ আর কি! যশোদা মা র হাতের মাখন আর আপনার বাড়ির পাশের দোকানের মাখনের মধ্যেকার উপকরণের যে বিস্তর ফারাক মশাই ! এই যেমন গতকালকের ঘটনা , শ্যামল বাবুর মেয়ে অঙ্কে কম নম্বর পেয়েছে বলে ,সকলের অজান্তে ঠাকুর ঘরে ঢুকে, সে আমার রোজের বরাদ্দ একটা পুরো বাতাসা কে অর্ধেক করে দিল । আপনাকে মিথ্যা বলব না ,সেই অর্ধেক বাতাসার স্বাদ ,হাড়ি ভর্তি অমৃতর চেয়েও আমাকে অনেক বেশী তৃপ্তি দিয়েছে ,আসলে কি জানেন! সহজ সরল চাওয়া পাওয়ার নিরন্তর বাহুডোর , বন্ধ ঘরে করা আমার ওপর মান অভিমান ,ক্ষনিকের জন্য হলেও দমবন্ধ করা ‘ভগবান’ ইমেজ থেকে আমাকে মুক্তি দেয়।

জনৈক ভদ্রলোক : মানে ? এই রকম স্পর্ধা আপনি মুখ বুজে সহ্য করলেন ? অঙ্কে নম্বর তো মেয়েটির নিজের ফাঁকিবাজি স্বভাব দোষে কমেছে, তার জন্য আপনার মধ্যাহ্নভোজ একেবারে সে অর্ধেক করে দিল ? আপনি তক্কে তক্কে থাকুন কৃষ্ণ স্যার, পরেরবার একেবারে ডাহা ফেল করিয়ে ছাড়বেন।

কৃষ্ণ : ‘ভালোবাসার অভিমান’ কে ‘অকারণ ভয়’ তে পরিবর্তন করার এরকম অব্যর্থ কৌশল শুনে আপনার নির্বুদ্ধিতার প্রশংসা না করে সত্যি পারছি না।

জনৈক ভদ্রলোক : ক্ষমা করবেন ,মানে আমি আপনার ইমেজের কথা ভেবেই ….সে যাই হোক ,এই সুযোগে একটা ভালো প্রশ্ন মনে পড়ে গেল । আচ্ছা আপনি যদি যুগ যুগান্তর ধরে চলে আসা টিপিকাল ‘কৃষ্ণ’ ইমেজের যেকোনো একটা বৈশিষ্ট পরিবর্তনের সুযোগ পান, তাহলে কোনটা বাছবেন ?

কৃষ্ণ : আমার গায়ের রঙ ।

জনৈক ভদ্রলোক : সেকি ? আপনি তো কালো রঙের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ মশাই ! সুঠাম দেহের গর্বিত অধিকারী রা নিজেদের বর্ণনায় যে বিশেষণের প্রয়োগ করে, আপনিই যে তার কর্ণধার ,মানে আমি ‘Tall ,Dark ,Handsome’ ট্যাগের কথা বলছিলাম।

কৃষ্ণ : নারী পুরুষের মধ্যে বর্ণ বৈষম্যের এই অদ্ভূত চলনের উত্তরদায়ী যে স্বয়ং আমি| গায়ের কালো রঙ আমার ‘মোহিনীমোহন’ ইমেজের ওপর কখনো কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি , নিজে কালো হলেও কাকতালীয় ভাবে আমার জীবনজুড়ে উজ্জ্বলবর্না সুন্দরীদের ভিড় , সেখান থেকেই বোধহয় পুরুষ সমাজ একটা অদ্ভুত ধারণার বশবর্তী হয়েছে যে , সে নিজে যতই কিম্ভূত কিমাকার হোক না কেন ,তার পছন্দের নারীকে সুন্দরী এবং অবশ্যই উজ্জ্বলবর্না হতে হবে।

জনৈক ভদ্রলোক :না না ,এভাবে অকারণ পাপ বোধে ভুগবেন না কৃষ্ণ স্যার , মানে ওই মেয়েদের কথাই যদি বলেন ,মা কালীর গায়ের রঙও তো কালো,তা উনি মা দুর্গার সাথে কম্পিটিশনে কমতি কোথায় যান !

কৃষ্ণ : আহা ! দেব দেবীর কথা ছাড়ুন ,মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবুন, আপনার জীবনের ফ্ল্যাশ ব্যাকে আমি পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি, নিজের কালো কুষ্টি ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়ে , একের পর এক মা কালীর গায়ের রঙের সুন্দর মেয়েকে গুণ বিচার না করেই মুহুর্তে নাকচ করে দিচ্ছেন । তা এখানে আপনার দোষ ধরলে চলবে কেন বলুন ! চলন টাই যে আমার সৃষ্টি।

জনৈক ভদ্রলোক : ভগবান হয়েও আপনার আত্মসমালোচনা আমাকে সত্যি বিস্মিত করছে। আচ্ছা কৃষ্ণ স্যার ,অনেকে বলে মহাভারতের যুদ্ধ টা নাকি আপনি ইচ্ছাকৃত ভাবে করিয়েছেন,সেটা কি সত্যি ?

কৃষ্ণ হেসে বলল : সে তো নিন্দুকেরা কতকিছুই বলে থাকে ,আর পাপমুক্তির সবচেয়ে সহজ উপায় হলো একটা মনগড়া কথার উপর অপরিমিত বিশ্বাস: ‘সব ই তার ইচ্ছা ‘| মহাভারতের ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে, আমি শুধু মানুষকে এটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম যে নিজের ভিতরের শক্তি র উচিত অনুচিতের নিরপেক্ষ উপলব্ধিকে সকলের সামনে সত্যি হিসেবে প্রমান করার ইচ্ছাপূরণের জন্য কোনো ‘মিরাকেল’ র অপেক্ষা করা নিষ্প্রয়োজন ,আশেপাশের অতি পরিচিত অবস্থার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সে সুযোগ । ‘ভাই ভাইয়ের মধ্যে যুদ্ধ বিবাদ ‘ অথবা ‘নারী সম্মানের অবমাননা’ কি মহাভারতের আগে বা পরে আর কখনো ঘটেনি ? সর্বসমক্ষে দৈনন্দিন ঘটা এই চিরপরিচিত উদাহরণের বিনা ব্যতিক্রমে পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছিল পান্ডব ও কৌরব দল। যেখানে আমার ভূমিকা সংক্ষেপে বলতে হলে বলব : যুদ্ধ থামানোর ব্যর্থ প্রয়াসের পর কুরুক্ষেত্রে ঘটা ভয়ঙ্কর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আমি নিজের মতাদর্শ কে জগত সংসারের সামনে তুলে ধরেছিলাম।

জনৈক ভদ্রলোক : আচ্ছা আপনার মৃত্যুর কারণ কি সত্যি গান্ধারীর দেওয়া অভিশাপ? মানে খুব জানতে ইচ্ছা করছে কৃষ্ণ স্যার,ভগবান হয়েও এই শাপমোচনের কোনো উপায়ই কি আপনার জানা ছিল না ?

কৃষ্ণ বলল : দেখুন আমার জীবনকালে কত মানুষই তো আমাকে কতভাবে অভিশাপ দিয়েছে ,আমার শত্রুদলের বিস্তারিত বিবরণে আর নাই বা গেলাম । তবে এটুকু বলতে পারি ,বাকিদের মধ্যে অভিশাপ দেওয়ার প্রবণতা অথবা হাস্যকর প্রয়াস থাকলেও, যা ছিল না বলে আমার বিশ্বাস তা হলো ‘ন্যুনতম যোগ্যতা’। আপনার প্রশ্নের উত্তর আরো সহজ করতে বলব ,গান্ধারীর মধ্যে একাধারে অসাধারণ নারীত্ব ও অতিসাধারণ মাতৃ হৃদয়ের সমন্বয় দেখে , তার স্রষ্টা স্বয়ং বিস্ময়ে বার বার বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন , তাই তার মতন বক্তিত্বময়ীর অভিশাপ , আমার মৃত্যুকে জীবনের চেয়েও অনেক বেশী গৌরবান্বিত করেছে । ভগবান হয়ে শেষ দানে কিস্তিমাতের সুযোগ আমি কি করেই বা ছাড়তাম বলুন!

জনৈক ভদ্রলোক :আপনি তো সর্বশক্তিমান ,আপনার সিদ্ধান্তর উপর প্রশ্ন করার আমার মত সদ্য মৃত সাধারণ মানুষের কি বা যোগ্যতা। আমার পরবর্তী প্রশ্ন টা একটু ব্যক্তিগত আবার বিতর্কিতও বটে। রাধাকে কি আপনি সত্যি ভালো বাসতেন ? নাকি পরস্ত্রীর অপরূপ সৌন্দর্যের হাতছানি ভগবানের পক্ষেও উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি ? মানে যদি ভালোই বাসতেন,তাহলে রাধাকে বিয়ে করলেন না কেন ? তখনকার দিনে তো বিবাহ বিচ্ছেদের এত জটিলতা ছিল বলে শুনিনি।

কৃষ্ণ হেসে বলল : বিবাহের জন্য দুটি ভিন্ন সত্তার প্রয়োজন ,তখনও যেমন ছিল, আজও তেমন আছে । এই প্রয়োজন যে অপরিহার্য , চিরন্তন ।

জনৈক ভদ্রলোক : মানে ঠিক বুঝলাম না কৃষ্ণ স্যার ।

হঠাৎ ভদ্রলোক বিস্ময়ের চোখে দেখলেন এতক্ষণ তার সামনে বসে থাকা ভুবনমোহন সৌন্দর্যের অধিকারী দিব্যপুরুষ আর নিজস্থানে নেই, তার জায়গায় বসে আছেন এক অপরুপা নারী যার সৌন্দর্যের বিবরণ দেওয়া এককথায় অসম্ভব । ভদ্রলোক ভীষণ অবিশ্বাসে চোখ বন্ধ করে ফেললেন । বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ খুলতেই তার সামনে দৃশ্যমান হল হাসিমুখে বসে থাকা সেই চেনা দিব্যপুরুষটি ,যে হয়তো তার মনের আদ্যপ্রান্ত দেখতে পেয়ে কৌতুক মাখা স্বরে প্রশ্ন করল ,”কি বুঝলেন মশাই ? “

জনৈক ভদ্রলোক : মানে রাধা শুধুই পৃথিবীর ভ্রম মাত্র ? রাধার আড়ালে আপনি আসলে নিজেকেই ভালবাসতেন ?

কৃষ্ণ হেসে বলল : ধ্যুর মশাই ! ভ্রমের নাম হলো ‘কৃষ্ণ’ ,আসলে সবটাই যে রাধা,অনন্ত সৃষ্টিকে নিজ গর্ভে ধারনকারিনী আদ্যাশক্তি, আমি তো তার প্রতিবিম্ব মাত্র । কেউ হয়তো এই সত্যি উপলব্ধি করে পৃথিবীর দরবারে ‘রাধা’ কে সবসময় ‘কৃষ্ণে’ র আগেই রেখেছেন , সে আপনি ‘রাধাকৃষ্ণ’ ই বলুন অথবা ‘রাধেকিষণ’ , সত্যি সুপ্ত হলেও তা কিন্তু দিব্যচক্ষুতে অবলীলায় দৃশ্যমান।

অদ্ভুত

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

২৯ বছর বয়সী কলকাতার সনামধন্য ডাক্তার স্বাগ্নিক মুখার্জী রোজকার ব্যস্ত জীবন থেকে ক্ষনিকের মুক্তি পেতে, তার চেয়ে বয়সে খানিক বড় কিন্তু খুব কাছের বন্ধু, ব্যবসা সুত্রে দার্জিলিং নিবাসী অনিমেষ সান্যালের নিমন্ত্রণ স্বীকার করেই নিলেন শেষমেষ। কিন্তু তার নিমন্ত্রণ রক্ষায় যে বাধ সাধলো সে হলো তার চোদ্দ বছর বয়সী আদরের ভাইজি তিতির ,সে বেশী কথায় না গিয়ে সোজাসুজি বলে দিল, “তোমার কাছে আপাতত দুটোই অপসন আছে সোনাকাকু :এক : তুমি দার্জিলিং যাবার নিমন্ত্রণে কোনো রাখ ঢাক না করে সটান না বলে দাও ,দুই :তোমার বন্ধুর সাথে কথা বলে নিজের সাথে আমার নিমন্ত্রণও তার কাছ থেকে আদায় করে নাও। “

সোনাকাকু হেসে বলল ,” যে শান্তি ও স্বাধীনতার লোভে পরে সারাজীবন বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি ,তোর কল্যাণে সে আশার বাটি আমার একেবারেই শূন্য থাকবে চিরকাল তা আমি ভালোই বুঝতে পারছি।”

তিতিরের নিবির্কার উত্তর ” তা সবই যখন জানো তাহলে আর কেন মিথ্যা দেরী করছো ,আমার দেওয়া অপসন দুটোর মধ্যে তাড়াতাড়ি ভেবে নাও কোনটা করবে। “

সোনা কাকু বলল ,” তোর কিন্তু ৩ মাস বাদে পরীক্ষা তিতির ,আবার অঙ্কে কম নম্বর পেলে বৌদি আগের বারের মতই এবারও আমার কানটাই মুলবে ,তাই বলছি একটু মাঝামাঝি কিছু ভাব মানে তোরও রইলো আর আমারও থাকলো গোছের “।

তিতির বলল ” তুমি তো আমাকে অঙ্ক করাচ্ছ এবার ,নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসের এতো অভাব হলে ,কাউকে গরীব মনে হলেই ড্রয়ার থেকে ফ্রি তে ওষুধ না দিয়ে, তাকের বইগুলো তো দিয়ে দিতে পারো ,তোমার ওষুধের দামের চেয়ে ওগুলো বেচে অনেক বেশী টাকা পাবে সে ,আর প্লিস ‘তোরও রইলো আমারও থাকলো’ এসব বাজে বার্গেনিং করতে এসো না আমার কাছে ,এখন নিজে ভুলে গেলেও তুমি ই আমাকে শিখিয়েছো ,যে বারে বারে কথা বদলায় তাকে আর যাই হোক ভদ্র বলা চলে না ।”

সোনাকাকু হেসে বলল ,”তবে চল, আর কি ! আমি অনিমেষকে ফোনে বলে দেব যে নির্দিষ্ট পাহারাদারনী ছাড়া আমার কোথাও যাওয়ার অনুমতি নেই । “

শুক্র বার , রাত্রি ৯:১৫ ,কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস প্রায় ৩ ঘন্টা লেটে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে এসে দাড়াতেই তিতির দেখলো সোনাকাকু জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তার বন্ধু কে খোঁজার চেষ্টা করছে , তিতির কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সোনাকাকু বলল, “মোবাইলে চার্জ নেই ,চার্জার বাড়িতে ভুলে ফেলে এসেছি। “

তিতির হেসে বলল ,” ঠিক আছে ,ট্রেন থেকে নেমে তোমার বন্ধুকে খুঁজে নেওয়া যাবে ক্ষণ ,একি আর হাওড়া স্টেশন !”

তিতির সোনাকাকুর পিছন পিছন ট্রেন থেকে নামতেই একজন ভদ্রলোক হাসিমুখে ওদের দিকে এগিয়ে এলেন। ভদ্রলোক লম্বায় প্রায় ৬ ফুট মতন ,শক্ত চোয়াল, বয়স আন্দাজ ৩৪ এর আশেপাশে ,প্রথম নজরেই নিয়মিত শরীরচর্চার প্রায় সব প্রমান ই দৃষ্টি গোচর হয় ।

ভদ্রলোক তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললেন , “তুমি নিশ্চই তিতির ?” তিতির হেসে “হ্যাঁ” বলতেই ভদ্রলোক বললেন , “তোমার গল্প স্বাগ্নিকের কাছে এত শুনেছি যে তোমাকে কখনো না দেখলেও আজ আমার চিনতে একেবারে অসুবিধা হয়নি। “

তারপর ভদ্রলোক সোনাকাকুকে জড়িয়ে ধরে বললেন ,”তুই ঠিক একইরকম আছিস স্বাগ্নিক,এতদিন পর তোকে দেখে যে কি ভালো লাগছে আমার ,তা বলে বোঝাতে পারব না। “

এতক্ষণে সোনাকাকু ভদ্রলোকের আলিঙ্গনের উত্তর দিয়ে বলল, “কিন্তু আমি যে তোকে ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখতে পেয়েও চিনতে পারিনি রে অনিমেষ ,এতো সুঠাম দেহ কবে বানালি তুই ? আর তোর গোলগাল মুখটাও তো আর নেই। “

অনিমেষ সান্যাল হেসে বললেন ,”কলকাতায় বসে পাহাড়ী জায়গায় থাকার কষ্ট তুই আর কি করে বুঝবি বল ,যাইহোক লম্বা ট্রেন যার্নি তে তোরা নিশ্চই খুব ক্লান্ত ,এখান থেকে দার্জিলিং পৌছতে আরো প্রায় ৩ ঘন্টা লেগে যাবে,আমার গাড়ি স্টেশনের বাইরে রাখা আছে। আর একটা কথা ,আমি তোদের আজ একা নিতে আসিনি কিন্তু, গাড়িতে তোদের জন্য অপেক্ষা করছে আমার স্ত্রী মিতা ,আমাদের ২ বছরের ছেলে অনি ,আর আমার পি.এ. শান্তনু ভৌমিক ।”

সোনাকাকু বলল ,”করেছিস কি ?আমাকে তো সেলেব্রিটি বানিয়ে ছাড়লি একেবারে”।

উত্তরে অনিমেষ সান্যাল হেসে বললেন “এতে আমার দোষ নেই স্বাগ্নিক ,সুস্থ পত্রিকায় নিয়মিত তোর লেখা বেরোনোর ফলে এই পাহাড়ী অঞ্চলেও তুই কলকাতার মতই জনপ্রিয় । আসলে কি জানিস ,মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাঁচার ইচ্ছাটাও যে দ্বিগুন হারে বাড়তে থাকে আর সে ইচ্ছাপূরণের জাদুকর হয়ে ওঠে তোর মতই খ্যাতনামা ডাক্তারদল। তাই ডাক্তারী থেকে বিশ্রাম নিতে তোর মনে হয় অন্য কোনো জায়গা বাছা উচিত ছিল ,শান্তনু বাবু কিন্তু তার হাঁটুর ব্যথার যাবতীয় চিকিৎসার প্রেসক্রিপসন আজকেই সাথে নিয়ে এসেছেন তোকে দেখাবে বলে। “

সোনা কাকু বলল “হাঁটুর ব্যথা ? কিন্তু আমি তো হার্টের … !”

সোনা কাকুর কথা শেষ না হতেই অনিমেষ সান্যাল বললেন ,”আমি জানি ,ওনাকে বলেও ছিলাম ,কিন্তু উনি শুনে বললেন ‘এত বড় ডাক্তার যখন শুধু কি হার্টেই আটকে আছে ভেবেছেন ,হাঁটু পেরিয়ে পায়ের গোড়ালিতেও নিশ্চই পৌঁছে গেছেন হবে ।হ্যাঁ, হার্টের উপরেও অনেক যন্ত্রপাতি আছে আমি জানি ,কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ বলেও তো কিছু হয় নাকি ! ‘।” কথাটা শুনে সোনাকাকু আর তিতির দুজনেই সজোরে হেসে উঠলো ।

তিতির সোনাকাকুর পাশাপাশি অনিমেষ সান্যাল কে অনুসরণ করলো ,স্টেশনের বাইরে দাড়ানো একটা ইনোভা গাড়ির সামনে এসে অনিমেষ সান্যাল সোনাকাকুকে বললেন, “এই যে ,এই গাড়িটা। ” সম্ভবত তাকে দেখতে পেয়েই গাড়ি র পিছনের সীট থেকে হাসিমুখে নেমে এলেন একজন ভদ্রমহিলা আর সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক। রাতের অন্ধকারেও বেশ বোঝা যাচ্ছে ভদ্রমহিলাকে ডাকসাইটে সুন্দরী বললেও কম বলা হবে ,আর তার সামনে মাঝ বয়সী ভদ্রলোকের বেঁটে খাটো মোটা চেহারা কেমন যেন ভগবানের ভারসাম্য রক্ষার অভাবনীয় নিদর্শন বলেই মনে হয়।

সোনাকাকুকে দেখে ভদ্রমহিলা হেসে বললেন ,”নমস্কার স্বাগ্নিক বাবু ,আমি মিতা সান্যাল,আপনার খ্যাতি অন্য কাউকে আপনার পরিচয় দেবার অবকাশ দেয় না ,আর আপনার বন্ধুর মুখে তিতিরের গল্প এত শুনেছি ,আমি তো ভেবেই নিয়েছি ওর বুদ্ধির কিছুটা আমার ছেলেটার জন্য ধার নেব ।”

সোনাকাকু হেসে বলল ,”সে নেবেন না হয় ,আমি তো ওর কাছ থেকে বুদ্ধি আর সাহস দুটোই ধার নিয়ে থাকি !”

তিতির রেগে বলল ,”সোনাকাকু এটা কিন্তু কথা ছিল না ,পাহাড়ে এসেও তুমি কলকাতার মত দলভারী করছো। “

অনিমেষ সান্যাল হেসে মাঝ বয়সী ভদ্রলোকের দিকে ঘুরে বললেন ,” স্বাগ্নিক আরেকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দি, ইনি হলেন শান্তনু ভৌমিক ,আমার ব্যবসার হিসেব নিকেশ সব ওনার দায়িত্বে ।”

শান্তনু ভৌমিক হেসে বললেন ,” হে হে ,মানে ওই একটা জিনিসই আমি পারি কিনা, ‘হিসেব’ ,আর ঠিক সেই জন্যই তো আজ আপনার সাথে দেখা করতে আসা ,এই হাঁটুর ব্যথায় সারা জীবনে যা হয়নি তাই হচ্ছে ডাক্তার বাবু ,হিসেবে আমার ভুল হচ্ছে প্রায়।”

অনিমেষ সান্যাল বেগতিক বুঝে এগিয়ে এসে বললেন ,”ওসব পরে হবে শান্তনু বাবু, একে ট্রেন লেট হওয়ায় এখন প্রায় ১০ টা বেজে গেছে ,বাংলো তে পৌছতে আরো ঘন্টা তিনেক লাগবে , অনিও দেখছি গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছে ,আর দেরী না করে চটপট গাড়িতে উঠে পড়াই ভালো,বাকি গল্প রাস্তায় যেতে যেতে হবে না হয় । “

গাড়িতে প্রায় ১ ঘন্টা পেরিয়ে গেলো ,গাড়ির ঘড়িতে চোখ যেতেই তিতির দেখল ১১ টা বাজতে ৫ মিনিট বাকি। রাত্রে বাইরের সৌন্দর্য উপভোগ করার কোনো উপায় নেই তবুও সকলের সাথে বিভিন্ন এলোমেলো গল্পে তার ক্লান্তি টাও কেমন যেন ক্রমশঃ দূর হয়ে যাচ্ছে ।পাহাড়ী রাস্তায় রাত্রে গাড়ি চালানো বেশ শক্ত তবুও স্টিয়ারিং র পিছনে অনিমেষ সান্যালের দক্ষ হাত সেটা এতক্ষণ কাউকে মালুমই হতে দেয়নি। হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে অজানা কারণে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ গাড়িতে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট করার ব্যর্থ চেষ্টা করার পর ,বাকি সকলকে গাড়ির ভিতরেই বসে থাকতে অনুরোধ করে অনিমেষ সান্যাল নিজে গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন ,তার অনুরোধ উপেক্ষা করে সোনাকাকুও গাড়ি থেকে নেমে পড়ল, প্রায় আধঘন্টা চেষ্টা করার পরও যখন কিছুই ফল হলো না তখন সকলের কপালেই চিন্তার ভাজ দেখা দিল। এত রাতে এই নির্জন পাহাড়ী রাস্তায় একদিকে যেমন কোনো গাড়ির দেখা পাওয়া মুশকিল অন্যদিকে ফোনে নেটওয়ার্ক ও আসছে না যে সাহায্যের জন্য কাউকে ফোন করা যাবে। রাত বাড়ার সাথে সাথে স্বাভাবিক নিয়মেই পাহাড়ে ঠান্ডা টা ও ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে,গন্তব্যের দূরত্ব পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা কোনো মতেই সম্ভব না জেনে অবস্থার প্রতিকূলতা আরো বেশী জটিল হয়ে উঠলো । অনি তার মায়ের কোলে মাথা রেখে এখনো ঘুমিয়েই আছে ,গাড়ির আলো জ্বালাতে তিতির লক্ষ্য করলো অনির মুখের আদল একেবারে তার মায়ের মতন , এখন অনি জেগে থাকলে সমস্যা টা আরো কত কঠিন হয়ে যেত সকলের জন্য, সেটা ভেবে তিতির মনে মনে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।

এরকম অসহায় পরিস্থিতে শান্তনু ভৌমিক হঠাৎ বললেন ,”রাত বারোটা তো প্রায় বাজতে গেল ,বিপদ মুক্তির কোনো আশাই তো দেখছি না মশাই !”

অনিমেষ সান্যাল হালকা ভাবে বললেন ,”রোজ ই তো বাড়িতে ঘুমান ,আজ না হয় আমার গাড়িতেই ঘুমালেন,এটাকে হাওয়া বদল না বলা গেলেও বিছানা বদল বলে নিশ্চই চালানো যাবে। “

শান্তনু ভৌমিক বললেন ,” সেটা না মশাই ! এক রাত কেন ,অনেক রাত ই আমি না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে পারি ,কিন্তু এই জায়গাটা খুব একটা সুবিধের নয় বুঝলেন কিনা! তার ওপর সাথে ছোট বাচ্ছা আছে বলেই চিন্তা টা আরো বেশী হচ্ছে !”

অনিমেষ সান্যাল কিছু বলার আগেই সোনা কাকু বলল ,”ঠিক বুঝলাম না শান্তনু বাবু, এখানে চোর ডাকাতের উপদ্রব আছে বলে আপনি জানেন নাকি !”

শান্তনু ভৌমিক এবার আওয়াজ নীচু করে বললেন ,”না না মশাই , চোর ডাকাতের ভয় আমার মতন ছাপোষা লোক কেন পাবে বলুন ! এটা হলো যাকে বলে একেবারে তেনাদের রাজত্ব ,অনেক গল্প শুনেছি কিনা ,তাই বলছিলাম।”

তিতির তা শুনে বলল ,”ভূত ? সত্যি ভূত মানে চোখে দেখা যায় এমন ভূত ?”

সোনাকাকু গম্ভীর ভাবে বলল ,”এরমধ্যে অনি উঠে গেলে কিন্তু আরো মুশকিল বাড়বে, পাহাড়ী ভূত ঘুমপাড়ানি গান জানে কিনা আমার কিন্তু জানা নেই। ” কথা টা শুনে শান্তনু ভৌমিক ছাড়া বাকিরা সকলে হেসে উঠলো।

হঠাৎ একটু দূরে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখতে পেয়ে অনিমেষ সান্যাল আর সোনাকাকু দুজনেই তৎক্ষনাৎ রাস্তায় নেমে গাড়িটা থামানোর জন্য হাত দেখাতে লাগলো ,অপ্রত্যাশিত হলেও গাড়িটা সত্যি ওদের সামনে এসে থেমে গেল।

অনিমেষ সান্যাল গাড়িটার অল্প খোলা জানলার কাঁচের কাছে মুখ নামিয়ে বললেন ,” স্টেশন সে ওয়াপসি কে টাইম অচানক গাড়ি খারাপ হো গয়া হামারা ,সাথমে ছোটা বাচ্ছা হ্যয় ,ইতনে রাত মে ইহা কিসিকা মদত মিলনা মুশকিল হ্যয় ,আগার আপ মেরে ফ্যামিলি কো দার্জিলিং মে মেরে বাংলো তক ছোড় দেনগে ,হাম আপকা বহুত বহুত আভারী হোঙ্গে , হাম পয়সা দেনে কে লিয়ে ভি তৈয়ার হ্যয় , থোড়া মদত কর দিজিয়ে প্লিস ভাইসাহাব । “

গাড়ির ড্রাইভার উত্তরে বলল ,”হা জরুর ,বৈঠ যাইয়ে। “

গাড়িটা ছোট হওয়ায় ৪ জনের বেশী ধরা সম্ভব ছিল না তাই বোধ হয় অনিমেষ সান্যাল তার স্ত্রী কে বললেন , “এভাবে মাঝ রাস্তায় গাড়ি রেখে আমার যাওয়া টা ঠিক হবে না,তুমি বাকিদের নিয়ে বাড়ি পৌছে সীতারাম আর ডমরু কে অন্য গাড়িতে এখানে পাঠিয়ে দাও ,খুব বেশী কিছু না বিগড়ালে ওরাই ঠিক করে দিতে পারবে নাহলে সকাল অব্দি অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই ,এত রাতে মেকানিক খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ই বলা চলে । সে যাইহোক আপাতত তোমাদের ঠিকমত বাড়ি পৌঁছানো আগে দরকার। আমার কত অনুরোধের পর স্বাগ্নিক এখানে এসেছে, আমার আরো সাবধানতা নেওয়া উচিত ছিল ,এভাবে ক্লান্ত শরীরে নিয়ে আমার দোষেই ওদের এই বিপত্তি হল ,ভাগ্যিস ভদ্রলোক আমাদের সাহায্য করতে রাজি হল নাহলে যে কি হত ! “

সোনাকাকু কিছুতেই রাজি না হওয়া সত্বেও সকলের বার বার অনুরোধে শেষমেষ একটা শর্ত রেখে গাড়িতে উঠে বসলো সেটা হলো বাকিদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সীতারাম আর ডমরু র সাথে সোনাকাকুও আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে ফিরে আসবে । গাড়ির পিছনের সীটে তিতির আর সোনা কাকুর সাথে কোলে ঘুমন্ত অনিকে নিয়ে বসলেন মিতা সান্যাল ,আর সামনে ড্রাইভারের পাশের সীটে বসলেন শান্তনু ভৌমিক। অন্ধকার টা এত গাঢ় হয়ে এসেছে যে তিতির চেষ্টা করেও ড্রাইভারের মুখ দেখতে পেল না ,আপাদমস্তক শীত পোশাকে ঢাকা চেহারার আন্দাজ করাও বেশ অসম্ভব বলেই মনে হলো তার। গাড়িতে বসেই একটা বোঁটকা গন্ধ নাকে এলো তিতিরের ,সোনা কাকুর দিকে তাকিয়ে সেটা বলতে যাওয়ায় সোনা কাকু মুখে আঙুল দেখিয়ে ঘুমিয়ে থাকা অনির দিকে ইঙ্গিত করল।

গাড়ি কিছুক্ষণ চলার পর শান্তনু ভৌমিক ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বললেন “আপকো পাতা হ্যয় হামলোগ কিধার জায়েনগে ,মতলব বিনা পাতা পুছে হি আপ ইতনে দূর চলা আয়া। “

ড্রাইভার ভাঙা গলায় উত্তর দিল ,”দার্জিলিং পাহৌচকে পাতা জরুর পুছেঙ্গে ,ইধার রাস্তা ঠিক নাহি হ্যয় ,ইসিলিয়ে ধীরে যানা পর রাহা হ্যয়।”

শান্তনু ভৌমিক উত্তরে শুধু বললেন “ও ” ।

আরো প্রায় পনেরো মিনিট বাদে ড্রাইভার হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে বলল ,”আপলোগ থোড়া বৈঠিয়ে,ম্যয় আভি আয়া। ” গাড়ি থেকে নেমে সামনে একটা গেট দিয়ে তাকে ভিতরে ঢুকতে দেখা গেল।

শান্তনু ভৌমিক এবার পিছনে ঘুরে সোনাকাকুকে বললেন ,”এভাবে অচেনা লোকের গাড়িতে ওঠা আমাদের মোটেই উচিত হয়নি, ড্রাইভারের ভাবগতিক আমার মোটেই সুবিধার লাগছে না ডাক্তার বাবু। “

মিতা সান্যাল ও সাথে সাথে বলে উঠলেন ,”সত্যি কথা বলতে আমারও শুরু থেকেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে,আপনারা পেয়েছেন কিনা জানিনা ,গাড়িতে উঠে একটা বোঁটকা গন্ধে প্রথমে তো আমার বমি এসে গিয়েছিল ,এতটা রাস্তায় শান্তনু বাবুর কথার উত্তর ছাড়া একটা শব্দ আর ড্রাইভার টার মুখ থেকে বেরোয়নি ,আর এখন নামার আগে যা একটু আবার বলল ।”

তিতির কিছু বলতে যাওয়ায় সোনাকাকু ওর হাতের পাতা চেপে ধরলো ,তিতির ইঙ্গিত টা বুঝতে পেরেই আর কিছু বলল না।

সোনাকাকু বলল ,” কই আমি কোনো গন্ধ পাই নি তো” তারপর তিতিরের হাতে হালকা চাপ দিয়ে জিজ্ঞেস করলো “কিরে তিতির তুই পেয়েছিস নাকি ?”

তিতির উত্তর দিল ,” না ,আমিও কিছু পাইনি ।”

সোনাকাকু বলল ,” আমার মনে হয় ,আপনারা মিথ্যা ভয় পাচ্ছেন ,আমরা বাঙালী জেনেই বোধহয় ড্রাইভার ভদ্রলোক কোনো কথা বিশেষ বলছেন না ।”

শান্তনু বাবু বললেন ,” নাক বন্ধ থাকায় বৌদির মত কোনো গন্ধ আমি পাইনি ঠিকই, কিন্তু ডাক্তার বাবু ব্যাপারটা একেবারেই আমার স্বাভাবিক ঠেকছে না । “

সোনাকাকু বলল , “ঠিক বুঝলাম না শান্তনু বাবু ,কি আবার আপনার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকলো !”

শান্তনু ভৌমিক এবার গলা নামিয়ে পিছনে ঘুরে ফিসফিস করে বললেন ,” আমি হেডলাইটের আলোতে পরিস্কার দেখেছি, ড্রাইভারের চোখের পাতা একবারও পড়ছে না। আপনি তো ডাক্তার ,আপনি বলুন তো কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কতক্ষনই বা চোখের পাতা না ফেলে থাকা সম্ভব ? “

মিতা সান্যাল ভয়ার্ত স্বরে বললেন ,” সেকি ? বোঁটকা গন্ধ আর ওরকম ভাঙা গলার আওয়াজ শুনে আমার প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিল ,এখন আমরা কি করব স্বাগ্নিক বাবু?”

সোনাকাকু বলল , “আহা ! ওত ব্যস্ত হবেন না বৌদি ,শান্তনু বাবুর দেখার ভুলও হতে পারে ,আগে আমাদের জানা দরকার আমরা এখন কোথায় আছি ,গন্তব্যে পৌঁছতে আর কত সময় লাগবে,শান্তনু বাবু আপনার হাতে তো ঘড়ি আছে ,একটু সময় টা দেখে বলুন না।”

শান্তনু বাবু বললেন, “আপনি তো আমার কথা বিশ্বাসই করছেন না , আমার ঘড়ির সময় টাও ভুলই বলবেন নিশ্চই। “

সোনাকাকু বলল,” আপনি ভুল ভাবছেন শান্তনু বাবু , ব্যাপারটা বিশ্বাস অবিশ্বাসের নয় , আপনার কথা সত্যি হলেও আমরা তো এই গাড়ি থেকে এখনি নেমে যেতে পারবো না ,তাই মিথ্যা উদ্বেগ বাড়িয়ে কি লাভ আছে বলুন, আমাদের এখন একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গন্তব্যে পৌঁছানো ,সেজন্যই আপনাকে ঘড়িতে সময় দেখতে অনুরোধ করলাম ,রাস্তা জানিনা ঠিকই কিন্তু সময় জানতে পারলে আর কতক্ষণের রাস্তা বাকি তার একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। “

শান্তনু বাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একেবারে স্থির হয়ে গেলেন ,তাকে কিছু না বলতে দেখে সোনা কাকু বলল , “কি হল? অন্ধকারে বুঝি আপনার ঘড়ি দেখতে অসুবিধা হচ্ছে ?”

শান্তনু বাবু কোনরকমে ঢোক গিলে বললেন ,” সময় এগোচ্ছে না ডাক্তারবাবু,গাড়িতে ওঠার সময় যা ছিল এখনো তাই ,কাটায় কাটায় সাড়ে বারোটা। “

সোনা কাকু বলল , “আপনার ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে শান্তনু বাবু ,অন্যকিছু ভাবার এখানে কোনো অবকাশ নেই। “

মিতা সান্যাল একইরকম ভয়ার্ত স্বরে বললেন ,”আমার শরীর টা একদম ভালো লাগছে না স্বাগ্নিক বাবু ,গা টা খুব গোলাচ্ছে ,বমি হবে মনে হয়,আপনাদের কাছে কোনো প্লাস্টিক হবে? এই অবস্থায় আমি গাড়ির থেকে নামতে একদম সাহস পাচ্ছি না ।”

সোনাকাকু বলল ,”আমার আর তিতিরের ব্যাগ তো অনিমেষের গাড়িতেই রয়ে গেছে ” তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে বলল ” শান্তনুবাবু এদিক ওদিক একটু হাতড়ে দেখুন না ,ড্রাইভার নিজের প্রয়োজনে অনেক সময় কিছু জিনিস রেখে থাকতে পারে ।”

শান্তনু বাবু জবুথবু অবস্থা কোনরকমে কাটিয়ে প্লাস্টিক খুঁজতে তৎ পর হলেন, ড্রাইভারের সীটের সামনের ড্যাসবোর্ডে একটা প্লাষ্টিক হাতে লাগায় উনি বললেন ,
“পেয়েছি একটা ,কিন্তু খালি প্লাস্টিক নয় ,কিছু কাগজ পত্র আছে।” তারপর পকেট থেকে একটা টর্চ বার করে প্লাস্টিকের কাগজ গুলো নিজের কোলের উপর রেখে পিছনে ঘুরে মিতা সান্যালের হাতে খালি প্লাস্টিক টা দিলেন ।

মিতা সান্যাল পাশে বসা তিতিরকে বললেন ,”তিতির একটু অনি কে ধরতে পারবে?”

তিতির বলল “কেন পারবো না ? আপনি আস্তে করে ওকে আমার কোলে দিয়ে দিন, আমি নিতে গেলে অচেনা হাতের ছোঁয়ায় ওর ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে। “

তিতিরের কথা মত অনিকে তার কোলে দিয়ে মিতা সান্যাল প্লাস্টিক টা হাতে নিয়ে বমি করতে যাবেন ঠিক তখনি শান্তনু ভৌমিক বললেন, ” ডাক্তারবাবু !” ভয়ে তার গলার আওয়াজ একেবারে শুকিয়ে গেছে।

সোনাকাকু বলল, “আবার কি হলো শান্তনু বাবু ? “

শান্তনু ভৌমিক একইরকমভাবে ভয় জড়ানো স্বরে বললেন ,”আর সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই ,গাড়ির ব্লু বুকে লেখা নামের সাথে আমার হাতের ডেথ সার্টিফিকেটের নামের হুবহু মিল ,তাছাড়াও ছবির সাথে ড্রাইভারের মুখেরও কোনো অমিল দেখছি না ,আমার কথা বিশ্বাস না হলে নিজের চোখেই দেখুন। “

কথাটা বলে শান্তনু ভৌমিক হাতের কাগজ গুলো আর টর্চ টা পিছনে ঘুরে সোনাকাকুর হাতে দিলেন । সোনাকাকু টর্চ জ্বালিয়ে কাগজ গুলোতে চোখ বোলাতে শুরু করতেই মিতা সান্যালের মুখ থেকে বেরোনো গোঁ গোঁ শব্দে ব্যস্ত হয়ে তিতিরকে বলল ,” কি রে ? কি হল বৌদির ?”

ঘুমন্ত অনিকে কোলে নিয়ে তিতিরের নড়ার মত অবস্থা ছিল না , সে বলল , ” আমি দেখতে গেলে অনি উঠে যাবে সোনাকাকু ,মনে হচ্ছে শান্তনু আঙ্কেলের কথা শুনে মিতা আন্টি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। “

সোনাকাকু তাড়াতাড়ি টর্চ টা মিতা সান্যালের মুখের ওপর ধরায় বুঝতে পারলো তিতিরের আশঙ্কাই সত্যি। ডাক্তার বলেই হয়তো এখনকার অসহায় অবস্থাটা আরো বেশী অসহ্য হয়ে উঠলো তার কাছে ,তাও তিতিরকে সাবধানে টপকে মিতা সান্যালের কপালে হাত দিয়ে দেখে সোনাকাকু বলল , “না ,গা ঠান্ডাই আছে ,একটু জল দিলেই জ্ঞান টা ফিরে আসবে বলেই আমার মনে হয় ,কিন্তু গাড়িতে জল আছে কিনা সেটা দেখতে হবে।”

সোনাকাকু নিজের দিকের দরজাটা খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে খানিক বাধ্য হয়েই নিজের সীট থেকে উঠে দাড়িয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, “শান্তনু বাবু আপনি আরেকবার যদি দয়া করে ওদিকটা দেখেন ,গাড়িতে একটা জলের বোতল নিশ্চই থাকার কথা ।”

শান্তনু ভৌমিক রামনাম জপ বন্ধ করে ,শুধু সোনাকাকুর অনুরোধ রাখতেই বোধহয় জলের খোঁজে হাত পা এদিক ওদিক নাড়তে লাগলেন। হঠাৎ ওনার ‘বাবারে !’ বলে ভয়ানক চিৎকারে সোনাকাকু চমকে উঠে বলল ,”কি হল শান্তনু বাবু ?”

শান্তনু ভৌমিক কিছু বলার মত অবস্থায় ছিলেন না , অন্ধকার টা এতক্ষণে চোখ সওয়া হয়ে গেছিল বলেই সোনাকাকু বুঝতে পারলো উনি আঙ্গুল নির্দেশ করে সোনাকাকুকে কিছু দেখানোর চেষ্টা করছেন , সোনাকাকু সেই দিকে তাকাতেই দেখতে পেল ড্রাইভারের সিটের তলায় ২ টো চোখ জ্বলজ্বল করছে ।

সোনাকাকু ক্ষনিকের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় বোধ করলো ,হঠাৎ তিতিরের হাতের হ্যাঁচকা টান আর তাকে ওভাবে দাড়িয়ে থাকতে দিল না। সোনাকাকুর কানের কাছে মুখ টা নিয়ে গিয়ে তিতির বলল , ” বোঁটকা গন্ধটা খুব চেনা লেগেছিল আমার, অনেকটা রোহিনী সাহার কলঙ্কমোচনে তোমার দেওয়া ভাম বিড়ালের গায়ের গন্ধের মত (বিস্তারিত জানতে পড়ুন ‘ফেলুদার যোগ্য বউ ‘ গল্পটি “) সেটাই তখন তোমাকে আমি বলার চেষ্টা করছিলাম ,সামনের সীটের তলায় জন্তুটি এর আগেও কয়েকবার নড়াচড়া করেছে , আমি ইচ্ছা করেই পা টা এগিয়ে রেখেছিলাম ,তাই মিতা আন্টি র পা অব্দি না পৌছে বার বার আমার পায়েই তার লোমের ঘষা লেগেছে।”

সোনাকাকু আবার সীট থেকে উঠে শান্তনু ভৌমিকের দিকে ঝুঁকে বলল ,”ভয় পাবেন না শান্তনু বাবু ,ওটা বিড়াল বৈ আর কিছু না। ” শান্তনু ভৌমিকের অবস্থা যে শোচনীয় সেটা বুঝতে পেরে কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই সোনাকাকু আবার বলল ,”আপনি দরজাটা খুলে গাড়ি থেকে আস্তে আস্তে নামতে চেষ্টা করুন। ” এরপরও শান্তনু ভৌমিক কে একইভাবে বসে থাকতে দেখে সোনাকাকু নিজের দিকের দরজাটা বার বার ধাক্কা দিয়ে খোলার চেষ্টা করতে লাগলো।

অনির ঘুমটা ভেঙ্গে যেতে দেখে তিতির বলল , ” আস্তে সোনাকাকু ! ওটা মনে হয় খোলে না ,ঢোকার সময় তো আমরা তাড়াতাড়ি তে ওদিকের দরজা দিয়ে সবাই পর পর ঢুকে পড়লাম ,আমি অনিকে নিয়ে পিছনে সরছি ,তুমি ওই পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও ,মিতা আন্টি র মাথাটা আমার কাঁধে রেখে দিয়ে তুমি সাবধানে নেমে যাও। “

সোনাকাকু তিতিরের কথামত গাড়ি থেকে নেমে সামনের সীটের দরজাটা খুলে বলল, ” গাড়ি থেকে নেমে আসুন শান্তনু বাবু ,আমি আছি, আপনার কোনো ভয় নেই। “

এতক্ষণ পাথর হয়ে বসে থাকা শান্তনু ভৌমিক নিজের হাতটা কোনরকমে সোনাকাকুর দিকে বাড়ালো ,ওনার হাতটা ধরে সোনাকাকু বুঝতে পারল এত ঠান্ডাতেও শান্তনু ভৌমিক ঘেমে জল হয়ে গেছেন,ওনাকে ধরে গাড়ি থেকে নামাবার পর সোনাকাকু পকেট থেকে টর্চ টা বের করে সামনের সীটের দিকে ফেলতেই দেখতে পেল একটা কালো লোমশ বেড়াল আলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, শান্তনু ভৌমিকের থেকে সে দৃশ্য আড়াল করতেই সোনাকাকু তাড়াতাড়ি টর্চ টা নিভিয়ে দিলেন, তারপর চোখ বুজে দাড়িয়ে রামনাম জপ করা শান্তনু ভৌমিকের দিকে তাকিয়ে বললেন ,”আপনি আমার সীটে গিয়ে বসুন, আমি একটু এগিয়ে দেখি কাউকে পাই কিনা ,এভাবে আর কতক্ষণ ই বা ড্রাইভারের ফিরে আসার ভরসায় বসে থাকা যাবে ! আমরা না পৌঁছাতে পারলে অনিমেষ কেও সারা রাত্রি গাড়িতে বসেই কাটাতে হবে ,তাই আর দেরী করবেন না ,চটপট পিছনের সীটে উঠে বসে পড়ুন ।”

শান্তনু ভৌমিক সোনাকাকুর হাত চেপে ধরে কোনরকমে বললেন , ” আমিও আপনার সাথে যাবো , আমি এভাবে একা কিছুতেই……”

সোনাকাকু বলল ,” একা কোথায় ? তিতির ,অনি ,বৌদি সবাই তো গাড়িতে ,আর ওদেরকে এভাবে একা ফেলে আমাদের দুজনের যাওয়া টা ঠিক হবে বলে আমার মনে হয় না ।”

তিতির গাড়ির কাঁচ টা অল্প নামিয়ে বলল , “তোমরা যাও সোনাকাকু ,আমি গাড়িতে আছি ,অনি আর মিতা আন্টির কিচ্ছু হবে না,সে দায়িত্ব আমার। এখানে দাড়িয়ে যত দেরী করবে ,সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। “

সোনাকাকু নিরুপায় হয়ে বলল ,” দরজা দুটো ভালো করে লক করে দে ,আর আমি না আসা পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই জানলার কাঁচ খুলবি না । আমি সামনেই যাচ্ছি, এখনি চলে আসবো ,কোনো বিপদের আঁচ পেলে ই আমাকে ডাকবি বুঝলি? নিজে পাকামি মেরে সামলাতে যাবি না। “

তিতির মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে সোনাকাকু সামনে এগিয়ে গেল ,শান্তনু ভৌমিকও ছায়ার মতন তার পিছু নিল ,যে গেট টা দিয়ে ড্রাইভার কে ঢুকতে দেখা গিয়েছিল, সেই গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই সোনাকাকু নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারল না ,নিজের মনেই বলে উঠলো “এটা তো কবরস্থান,তার মানে কি বাকিদের আশঙ্কা ই …….”
হঠাৎ আওয়াজে পিছনে ঘুরে তাকাতেই সোনাকাকু দেখলো শান্তনু ভৌমিক মাটিতে পড়ে আছেন , নিচে বসে তার দিকে ঝুঁকতেই সোনাকাকু বুঝলো শান্তনু ভৌমিকও এবার জ্ঞান হারিয়েছেন। কোনরকমে ওনাকে উঠিয়ে নিজের কাঁধে ভর দিইয়ে গাড়ির সামনে এসে দরজা খুলতেই সোনাকাকু দেখল মিতা সান্যাল অচৈতন্য অবস্থায় একা বসে আছেন গাড়িতে। দ্রুত শান্তনু ভৌমিক কে গাড়িতে বসিয়ে সীটবেল্ট আটকে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল সোনাকাকু ,তারপর একটা অজানা ভয়ের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে চিৎকার করে উঠলো “তিতির!”

শনিবার সকাল ১০ টা , অনিমেষ সান্যালের বাড়িতে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে আছে সোনাকাকু ,তিতির ,অনি ,মিতা সান্যাল ,শান্তনু ভৌমিক আর অনিমেষ সান্যাল নিজে।

শান্তনু ভৌমিক কৃতজ্ঞতাপূর্ণ স্বরে বললেন ,” আজকের দিনটা আমাদের পুনর্জন্মের প্রথম দিনও বলা চলে ,আপনি যে কিভাবে সেই ভয়ানক অবস্থা থেকে আমাদের বাঁচিয়ে ফেরৎ আনলেন সেটা না জানতে পারলে যে মরেও শান্তি পাবো না ডাক্তারবাবু ।”

অনিমেষ সান্যাল হেসে বললেন ,”আমি কিন্তু এই কৃতজ্ঞতার লিস্ট থেকে বাদ স্বাগ্নিক, আমাকে ডমরুর খোঁজা মেকানিক বাঁচিয়েছে ,তুই ডমরুকে নিয়ে না গেলেও গাড়িতে আমার বেশ ভালোই ঘুম হচ্ছিল । “

মিতা সান্যাল অনির মুখে সেদ্ধ ডিমের টুকরো দিয়ে বলল ,”আহ তুমি চুপ করো তো! সব ব্যাপারে মজা তোমার। কালকে স্বাগ্নিক বাবু না থাকলে ওই ভূতের কবল থেকে আমাদের কারোরই নিস্তার ছিল না , আমি নেহাত আগেই অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম, নাহলে হার্ট ফেল হয়ে কাল আমার মৃত্যু ছিল অনিবার্য। সকালে তোমরা ফেরার আগে আমি শান্তনু বাবুর কাছে বাকিটা শুনেছি ,এখনো আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আছে। “

অনিমেষ সান্যাল বললেন ,”গল্পটা পুরোটা শুনতে হবে তো! তারপর না হয় ভূতের ক্ষমতা নিয়ে বিচার করা যাবে। “

শান্তনু ভৌমিক রেগে বললেন , “আপনার ঠাট্টা আমি ভালোই বুঝতে পারছি অনিমেষ বাবু ,এত ঘটনার পরও আপনার এত অবিশ্বাস ? আমরা কেউ ফিরে না এলেও বোধহয় আপনার মতবদল হত না ! কি বলেন ?”

অনিমেষ সান্যাল বলল ,”আহা ! অবিশ্বাস কে বলল ? আমি শুধু বললাম বিশ্বাস করার আগে জানতে হবে তো কি বিশ্বাস করব ! “

শান্তনু ভৌমিক একইরকম ভাবে রেগে বললেন ,”আমাকে না হয় ডাক্তারবাবু কে তো বিশ্বাস করেন ! ওনাকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন না, কালকের ‘মানুষ’ ড্রাইভারের একবারও চোখের পাতা না পড়ার কি কারণ !”

তিতির বলল ,”পাথরের চোখের যে পাতা পড়ে না শান্তনু আঙ্কেল ।”

শান্তনু ভৌমিক বিস্ময় ভরা স্বরে বললেন , “পাথরের চোখ ?”

সোনাকাকু বলল ,”তিতির ঠিকই বলছে ,কালকের ড্রাইভারের বাদিকের চোখটা পাথরের ছিল।”

শান্তনু ভৌমিক বললেন ,”তা না হয় বুঝলাম কিন্তু ওই ড্রাইভারের ডেথ সার্টিফিকেট আর ব্লু বুকের ছবির সাথে তার মুখের হুবহু মিলের ও নিশ্চই ব্যাখ্যা আছে আপনাদের কাছে ?”

সোনাকাকু বলল , “আছে বৈকি ,যে গাড়িটা উনি কাল রাতে চালাচ্ছিলেন সেটা ওনার নিজের গাড়ি নয় ,ওনার বাবার গাড়ি ,যিনি কয়েকদিন আগে মারা গেছেন , অন্যের থেকে তার বাবার ধার নেওয়া টাকা পয়সার হিসেব মেটাতেই কাল উনি এসেছিলেন ,
প্রমান স্বরূপ নিয়ে আসা তার বাবার ডকুমেন্টসের কপি আপনার চোখে পড়েছিল। “

শান্তনু ভৌমিক বললেন ,”তা ওনার বাবা কি কবরস্থানের কোনো কবরের মালিকের থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন ? “

সোনাকাকু বলল, “কবরের মালিক নয় , ওই কবরস্থানের দেখাশোনা করেন একজন ভদ্রলোকের থেকে , যিনি বহুবছর থেকে ওনার বাবার কাছের বন্ধু,কবরস্থানের ওপাশের দিকে একটা ঝুপড়ি মত ঘরে নিজের পরিবার নিয়ে থাকেন। “

শান্তনু ভৌমিক বললেন ,”সত্যি কথা বলুন তো ডাক্তার বাবু , আপনার কাল এক মূহুর্তর জন্য ভয় লাগেনি ?”

সোনাকাকু বলল ,”লেগেছিল বৈকি ,আপনাকে অজ্ঞান অবস্থায় নিয়ে গাড়িতে ফিরে তিতির আর অনিকে না দেখতে পেয়ে আমি ভয়ে পাগল হয়ে গেছিলাম প্রায় ,আমার ভয়ার্ত চিৎকার শুনেই তো ঝোপের ধারে হিসি করা বন্ধ করে তিতিতের কোলে থাকা অনি কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিল ,সেই দেখে আমাকে কি বকা তিতিরের। তার ৫ মিনিটের মধ্যেই আপনার ‘ভূত’ ড্রাইভার গাড়িতে ফিরে এসে আমাদের কাছে তার অপ্রত্যাশিত দেরীর জন্য বারবার ক্ষমা চেয়েছিলেন। “

শান্তনু ভৌমিক অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বললেন ,”তার মানে কাল রাতের ড্রাইভারকে আপনার সাধারণ মানুষ বলেই মনে হয় ?”

সোনাকাকুর উত্তরের অপেক্ষা না করে তিতির বলল ,” মোটেই না, সোনাকাকুর ওনাকে সাধারণ মানুষ মনে হয়েছে কিনা জানিনা তবে আমার কিন্তু একেবারের জন্যও হয়নি। যে মানুষ রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটা আহত বুনো বিড়ালকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে পারেন ,তারপর ডাক্তারের উপদেশ মত প্রয়োজনীয় শুশ্রুষা করবেন বলে তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন , তিনি আর যাই হোক,আমাদের মত সাধারণ মানুষ তো কিছুতেই নন। “

প্রিয় শিক্ষক

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

সেমিস্টার শেষের ছুটিতে মামাবাড়িতে বেড়াতে আসা তৃতন তার মামাতো দিদি স্বাগতার ঘরে ঢুকে বলল : কি করছিস দিদিভাই ? আজকে তো sunday, তোর অফিস নিশ্চই ছুটি ,তাই না ?

স্বাগতা গল্পের বই থেকে মুখ তুলে হেসে বলল : হ্যাঁ রে। multinational কোম্পানি গুলোর এই এক সুবিধা ,সোম থেকে শুক্র রক্ত নিঙ্গড়ে নিলেও শনি-রবি শরীরকে সেই রক্তভান্ডারের শূন্যস্থান পূরণের সময় দেয় ,অনেকটা ওই রক্তদান শিবিরের মতন বুঝলি! বোতল ভরা রক্ত নেবার পর গ্লাস ভরা দুধ খাওয়ানোর চলন ।

তৃতন হেসে বলল : কেন ? তোর বুঝি অফিস যেতে ভালো লাগে না ?

স্বাগতা : না তা নয় ,আসলে ভালোলাগা যে কখন অভ্যেসে বদলে যায় আর অভ্যেসের স্থান যে কবে প্রয়োজন নিয়ে বসে ,তার হিসেব রাখাটা একটু মুশকিল বৈকি।

তৃতন হেসে বলল : তার মানে তুই প্রয়োজনে চাকরী করিস , ভালোবেসে নয় ?

স্বাগতা : প্রয়োজন তো বটেই , বেতনের অঙ্কের সাথে নিজের অজান্তেই খরচের হাতটাও যে এতদিনে অনেকটা লম্বা হয়ে গেছে বোনটি, আর শিক্ষকের খবরদারি কে ভালবাসা গেলেও অফিস বসের টহলদারীকে কিছুতেই যে যায় না।

তৃতন : তোর কথায় মনে পড়লো ,জানিস দিদিভাই স্কুল থেকে বেরোনোর পর কতবার ভেবেও তনিমা মিসের সাথে একবারও আর দেখা করতে যাওয়া হয়নি । এই সেমিস্টারের চাপ , প্রজেক্ট জমা দেওয়ার তাড়ায় সবকিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। একবার তো ফুলের তোড়া আর মিষ্টি কিনে ওনাকে হঠাৎ গিয়ে সারপ্রাইজ দেওয়ার প্ল্যান করেই ফেলেছিলাম ,কিন্তু শেষ মুহুর্তে কলেজে স্পেশাল ক্লাসের নোটিশটা সবকিছু ভেস্তে দিল।

স্বাগতা : তনিমা মিস ই বুঝি তোর সবচেয়ে ফেভারিট টিচার ?

তৃতন হেসে বলল : হ্যাঁ, সেই ক্লাস ১ এ স্কুলের প্রথম দিনে ওনাকে দেখেছিলাম, কখন যে নিজের অজান্তেই এতটা ভালোবেসে ফেলেছি ,এখন ভাবলে সত্যি অবাক হয়ে যাই।

স্বাগতা হেসে বলল: কেন ? উনি বুঝি সবার থেকে আলাদা ? নিশ্চই পড়া না পারলেও কিছু বলতেন না!

তৃতন হেসে বলল : না রে দিদিভাই ,তা নয় ! হেড মিসের কাছে আমাদের নামে অন্যদের করা বিভিন্ন অভিযোগ শুনলেই তনিমা মিস ভীষণ রেগে ক্লাসে এসে বলতেন, “আমি আর কি করবো ! আমি তো আর কোনো ক্লাস টিচার নই , আমি তো চিড়িয়াখানার ম্যানেজার ! আমি তো আজ হেড মিসকে বলে দিয়েছি ,এক এক করে নাম ডেকে ,হাতে TC ধরিয়ে সবকটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দিন , লোকের বাড়ি রান্না করাই যদি ভগবান কপালে লিখে দিয়ে থাকেন ,আমি তো আর ডাস্টার দিয়ে সে লিখন মুছে দিতে পারবো না ! “

কিন্ত আসলে সত্যি টা ছিল একদম অন্যরকম ,আমাদের হয়ে হেডমিসের সাথে তর্ক করতেও তনিমা মিস কখনো পিছপা হতেন না ,ওনার ক্লাস টিচার পদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলায় একদিন তো সবার সামনেই উনি হেড মিসকে বলে দিয়েছিলেন “যে বয়সের যা ধর্ম তা করতে না দিলে জীবনের অর্থটাই যে মূল্যহীন হয়ে যাবে,যদি ১২ বছরের ছেলেমেয়েরা রাতারাতি ম্যাচিওর হয়ে যায় ,তাহলে আর কৈশোর কথাটার যৌক্তিকতা কোথায় ! ” চিরকাল উনি হেডমিসের চক্ষুশূল ছিলেন ,নিজের যোগ্যতার জন্যেই কোনমতে চাকরীটা টিকে ছিল এই যা ,তাও কতদিন টিকেছে জানি না, শুনেছিলাম অসুস্থতার কারণে তাড়াতাড়ি রিটায়ার করেছেন ,আসল সত্যি তো অন্যকিছু বলেই আমার মনে হয়।

স্বাগতা : বুঝলাম ! চাকরীর যাওয়ার ভয়কে অবলীলায় উপেক্ষা করে , নিজের ভাবনাকে কেউ এভাবে সোজাসুজি বলতে পারলে, ভালবাসার দরজা তার জন্য যে অজান্তে খুলতে বাধ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই তবুও কেন জানি না খুব জানতে ইচ্ছা করছে, শুধু কি তাই ছিল তার বিশেষত্ব ?

তৃতন : মোটেই না। ওনার বাংলা ক্লাস না করলে আমি যে নিজের ভাষাকে কোনদিন ভালোই বাসতে পারতাম না দিদিভাই ,চিরকাল আমার কাছে সেটা থার্ড সাবজেক্ট হয়েই থেকে যেত ,অনেকটা উচ্চমাধ্যমিকে নেওয়া এডিশনালের মতন ,ওটাতে ফেল করলে নম্বর হয়তো কমবে কিন্তু ওভারঅলে পাশ হওয়া আটকানোর কোনো ভয় নেই।

স্বাগতা হেসে বলল : আরো মজার উধাহরণ হবে ছোটবেলার খেলায় ‘দুধভাতের’ মত, সে ভাবছে আছে কিন্তু বাকিরা সকলে জানে তার জানা সত্যিটা আসলে কত বড় মিথ্যা।

তৃতন হেসে বলল :একদম ঠিক ! জানিস দিদিভাই ,শুধু বোধহয় তনিমা মিসের জন্যই ‘কনভেন্টে পড়েছি বলে বাংলা জানিনা’, মুখে মুখে এই গর্বিত স্বীকারোক্তি শুনে আজও আশ্চর্যের চেয়ে লজ্জাই বেশী লাগে ।

স্বাগতা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল : তুই বরং এই ছুটিতেই তনিমা মিসের সাথে দেখা করে নিস। আবার কলেজ খুললে স্বাভাবিক নিয়মে ব্যস্ত হয়ে পড়বি।
‘যেমনি ভাবা ,তেমনি কাজ ‘ নিয়মে চলবি ,তাহলে দেখবি সব না হলেও বেশীরভাগ কাজ গুলোই শেষ করতে পারছিস।

তৃতন : সে না হয় একদিন দেখা করে নেওয়া যাবে ঠিক , অনেকদিন বাকি এখনো ছুটির ,তনিমা মিসের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে বেশী দূর নয় ।আচ্ছা দিদিভাই আমি তো বললাম ,এবার তুই তোর ফেভারিট টিচারের ব্যাপারে বল।

স্বাগতা বলল : আমার ফেভারিট টিচার স্কুলে পড়াতো না ,সেই ছোট থেকে স্কুলের শেষ দিন অব্দি আমার ওই একজনই প্রাইভেট টিউটর, আমাকে বিজ্ঞান পড়াতেন, বাকি সাবজেক্ট গুলো মা র কাছেই পড়তাম।

তৃতন : ওহ ,গোপাল স্যার ! ছুটিতে মামাবাড়ি এসে আমিও তো দেখেছি ওনাকে কতবার । একবার পড়াতে বসলে সময় জ্ঞান ই থাকতো না ওনার ,কি যে রাগ হত আমার ,সেই সময়টুকু একা একা আমার যে কাটতেই চাইতো না ,তাই তো আমি দরজার বাইরে লুকিয়ে ওনাকে ভেঙচি কাটতাম ,উল্টোদিকের চেয়ারে বসে তুই আমাকে দেখতে পেয়ে জোর করে হাসি চেপে রাখতিস।

স্বাগতা হেসে বলল : হ্যাঁ,আর মনে আছে ,স্যার বাথরুমে গেলেই টেবিলে রাখা ওনার ভাজা মৌরির প্রায় অর্ধেকের বেশী আমরা দুজনে শেষ করে দিতাম ? নিশ্চই বুঝতে পারতেন কিন্তু আজও ভেবে পাই না, কেন কোনদিনও আমাকে সেই ব্যাপারে একেবারের জন্যও জিজ্ঞাসা করেননি ।

তৃতন : আচ্ছা তুই ওনার সাথে শেষ কবে দেখা করেছিলি ?

স্বাগতা : উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে।

তৃতন : তারপর রেসাল্ট বেরোনোর পর আর দেখা করিসনি ? যতদূর মনে পড়ছে তুই তো সাইন্সের সব সাবজেক্টে ই লেটার পেয়েছিলি !

স্বাগতা : হ্যাঁ তা পেয়েছিলাম বটে কিন্তু সেইসময় আর ওনার সাথে দেখা করতে যাওয়া হয়নি ,বিভিন্ন কলেজে ফর্ম তুলতে ,কি নিয়ে পড়বো সেটা ঠিক করতে এত ব্যস্ত ছিলাম যে, ইচ্ছা থাকলেও কিছুতেই আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি ,তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ব্যস্ততা তোর মত আমারও সব ওলটপালট করে দিয়েছিল। তবে ক্যাম্পাসিং এ চাকরি পাওয়ার পরদিন সকালে ,কাউকে কিছু না জানিয়েই ওনার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম ,আমার হাতে ছিল একটা মিষ্টির প্যাকেট আর প্রথম পাওয়া চাকরীর এপয়েন্টমেন্ট লেটার। কিন্তু সেদিন উনি আমার সাথে দেখা করতে কিছুতেই রাজী না হওয়ায় ফিরে এসেছিলাম ,আর কখনো ওমুখো হইনি।

তৃতন : কেন ? দেখা করতে রাজি হলেন না কেন ? এতদিন যাসনি বলে তোর ওপর রেগে গিয়েছিলেন ?

স্বাগতা : তাই হবে হয়তো অথবা আমার সাথে দেখা করলে এত বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমে আমাকে দেওয়া সব শিক্ষাই যে মিথ্যা প্রমাণিত হতো ,সেই ভয় থেকেই বোধ হয় এড়িয়ে গেলেন।

তৃতন : মিথ্যা প্রমাণিত হতো ? মানে ঠিক বুঝলাম না দিদিভাই।

স্বাগতা : উনি যে বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন তৃতন,সবশেষে পঞ্চভূতের ছাই হওয়াতে বিশ্বাসী,বইমেলা থেকে কেনা আমার সাধের ভূতের গল্পের বইগুলোকে টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিতেন , সেই মানুষ পরলোক বলে কিছু আছে জানতে পারলেও আমাকে এত সহজে তা কি করেই বা জানতে দিতেন বল!

দিদার বাড়ি

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বিকেল বেলা সমীক স্কুল থেকে ফিরে রানার বাড়ি গিয়ে বলল “কোচিং এ যাবার আগে আজকে আমাকে একবার দিদার বাড়ি ঘুরে যেতে হবে বুঝলি ! মা একটা জিনিস দিয়েছে ,সেটা দিতে। বলছিলাম কি রানা তুইও আমার সাথে চল ,ওখান থেকেই একেবারে আমরা কোচিং এ চলে যাবো।

ইতিমধ্যে রানার মা ঘরে এসে সমীক কে দেখে হেসে বললেন “তুমি কি খাবে সমীক?মিষ্টি ,নোনতা ,কোল্ডড্রিংক ,সরবত সব আছে কিন্তু।” সমীক বলল , ” কিচ্ছুনা কাকীমা , স্কুল থেকে ফিরে এইমাত্র ভাত খেয়ে এলাম ,পেটে একদম জায়গা নেই, পরের দিন যা দেবেন সব খেয়ে নেবো। ” রানার মা হেসে বললেন , ” আচ্ছা , তাহলে আর জোর করছি না , কিন্তু কথামত আরেকদিন এসে যা দেবো খেতে হবে কিন্তু। ” সমীক হেসে বলল ” হ্যা কাকীমা , সে আর বলতে ! “

ওরা দুজনে সাইকেলে বসে গল্প করতে করতে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌছে গেলো সমীকের দিদার বাড়ি। কলিং বেল একবার বাজতেই দরজা খুলে হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন একজন বৃদ্ধা ।সমীক কিছু বলার আগেই রানা বৃদ্ধাকে প্রনাম করে বলল “আমি সমীকের স্কুলের বন্ধু দিদা , সমীকের টিফিন বাক্স থেকে আপনার বানানো দারুন দারুন খাবার খেয়েছি সেই ছোটবেলা থেকে ,আজকে সমীকের জন্য আপনাকে অনেকদিনের দেখার ইচ্ছাও আমার পূর্ণ হয়ে গেলো। ” বৃদ্ধা রানার মাথায় হাত রেখে বললেন , “যারা বলে যে আজকাল কার ছেলেমেয়েরা একদম আলাদা ,ভালবাসা ও সম্মান তাদের কাছে বইয়ের পাতার শব্দ মাত্র ,তারা যে কতটা মিথ্যে কথা বলে, তা আমার থেকে ভালো বোধ হয় আর কেউ জানে না। ” তারপর সমীকের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন ,” এই যে সবেধন নীলমনি ,ভিতরে না এসে বন্ধুকে নিয়ে বুঝি এখানেই দাড়িয়ে থাকবি ? আমি জানি দিদার বাড়ির পুরনো দরজাটা বরাবরই খুব পছন্দ তোর ,বন্ধুর সামনে সমসময়ের মত আজকেও কি তাহলে কানটা ধরে ভিতরে নিয়ে যাবো ? ” সমীক হেসে বলল , ” আপনি আদেশ করুন মহারানী ,যাহা বলিবেন ,যতদূর বলিবেন আপনাকে ছায়ার মতন অনুসরণ করিব,সেই আদি অনন্ত কালের অভ্যাসমতই। ” বৃদ্ধা হেসে বললেন, ” তবে তাই করো আমার আজ্ঞাধারী মানিক জোড় ।”

রানা আর সমীককে ড্রয়িং রুমের সোফাতে বসিয়ে বৃদ্ধা বললেন ,”বস তোরা ,আমি আসছি এখনি। ” সমীক ব্যাগ থেকে দিদার জন্য মায়ের দেওয়া প্লাস্টিক বের করে সামনের টেবিলে রেখে রানাকে বলল ,”এবার হবে আসল মজা “। রানা কিছু না বুঝতে পেরে সমীক কে জিজ্ঞেস করতে যেতেই বৃদ্ধা একটা ট্রে হাতে ঘরে ঢুকলেন ,সেটা টেবিলে রাখতেই দুজনে দেখলো ট্রে তে রাখা আছে দু বাটি ভর্তি পায়েস ,অন্য দুটো প্লেটে রঙ বেরঙের মিষ্টির সাথে বিপুল পরিমান নিমকি রাশি। ” বৃদ্ধা ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন ,”আমি জানি তোরা স্কুল থেকে ফিরে খালি পেটে আমার বাড়ি আসিসনি ,তাই একদম অল্পই দিয়েছি,কথা না বলে খেয়ে নে চটপট ,আবার পড়তে যেতে হবে তো। ” রানা বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাওয়ায় সমীক ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল ,”কোনো লাভ নেই , এনার মত নির্দয়ী মহিলা ইহজগতে আর একটাও আছে বলে আমার মনে হয় না ,চুপচাপ যা পারিস যেভাবে পারিস খেয়ে নে , নাহলে আজকে এখানেই সারা রাত কাকুতি মিনতি তে কেটে যাবে তোর,সকাল হলে বুঝবি তার সবটাই ছিল পন্ডশ্রম। ” রানা এরপর আর কথা না বাড়িয়ে সামনে রাখা পায়েসের বাটিটা হাতে তুলে নিল ,আইঢাই পেট নিয়ে কষ্ট হলেও মনে মনে একটা কথা স্বীকার না করে সে পারল না ,ভরা পেটেও যে কোনকিছুর স্বাদ এরকম তৃপ্তি দিতে পারে তা সে আজকের আগে কোনদিনও উপলব্ধি করেনি।

ওবাড়ি থেকে বেরিয়ে কোচিং এর পথে চলার সময় রানাকে চুপ করে হাঁটতে দেখে সমীক বলল ,”কিরে রানা ,কথা না বলার সাথে তাড়াতাড়ি হজমের কোনো সম্পর্ক আছে বলে তুই জানিস নাকি ?” রানা এতক্ষণের জমা রাগ আর চেপে না রেখে সমীককে বলল ,”তোর এত খিদে ছিল যখন তুই আমাদের বাড়িতে কিছু খেলি না কেন ? আমার মা কে কেন এভাবে মিথ্যে বললি যে তুই খেয়ে এসেছিস ? ” সমীক হেসে বলল ,” ও এই ব্যাপার ! তোকে এখনি আমার মায়ের সাথে কথা বলিয়ে দিতে পারি যা তোর মিথ্যে সন্দেহ মুহুর্তে দূর করে দেবে ,তবে এটা সত্যি যে ভাত খাওয়ার আগে যদি আমি জানতাম যে আজকে আমাকে দিদার বাড়ি আসতে হবে তাহলে নিশ্চই ব্যাপারটা তোর ভাবনা মতই হত ,জেনে শুনে এত বড় মূর্খামি করার বয়স আর আমার নেই ,কিন্তু এমন মায়ের যোগ্য মেয়ে আমার মা ,টাইমিং নিয়ে সে কোনো ভুল করবেনা সেটাই তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত। ” রানা বলল , “তাহলে… তুই দিদাকে বাধা দেওয়ার ..মানে বোঝাবার একটা চেষ্টা পর্যন্ত করলি না,তাই ভাবলাম ….” | সমীক হেসে বলল ,”আজ না করলেও সেই ছোট থেকে অনেকদিন অনেকভাবে চেষ্টা করেছি বলেই আমি জানি ,হার যখন মানতেই হবে তা প্রথমেই মেনে নেওয়া ভালো ,বিনা যুদ্ধে জয়লাভের আনন্দে তার উজ্জ্বল মুখ আমার যাই যাই করা প্রাণ পাখিকে যেভাবেই হোক শিকল ঠিক পরিয়েই দেবে,কতবার যে দিদার টেবিলে রাখা জোয়ানের আরক শেষ মুহুর্তে আমাকে স্বর্গলাভের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করেছে ,তার হিসাব চিত্রগুপ্ত নিশ্চই অনেক চেষ্টা করেও শেষমেষ আর রেখে উঠতে পারেননি ।” রানা হেসে বলল , ” দিদা কি সবাইকেই এত এত খাবার ….” সমীক হেসে বলল “একদম! ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাড়িতে আসা সবাইকে। পাড়ার মাঠে খেলতে আসা ছেলেগুলো তেষ্টা পেলে দিদার বাড়ি আসলে, সেদিন আর তাদের বাকি খেলার মায়া ত্যাগ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না ,কোনমতে নিজেদের পেট নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেই জীবনের অসাধ্যসাধনের ব্যাপারে একটা নিদারুন আত্মবিশ্বাস তাদের বেশ কিছুদিন চনমনে করে রাখে। রানা হেসে বলল “সত্যি আজকাল কার দিনে এমন মানুষ….” তাকে শেষ করতে না দিয়েই সমীক বলল ,”জানিস রানা ,আমার দিদার বাড়িতে কোনো কাজের লোক নেই ,এই বয়সেও সব কাজ দিদা নিজের হাতে করে , মা অনেক বলেও কখনো কিছু বদলাতে পারেনি। দিদার মতে ওই ডাক্তারের লিখে দেওয়া অসুধ নাকি শুধু শ্বাস প্রশ্বাসই যা বন্ধ হতে দেয় না , মন কে ভালো রেখে শরীর কে বাঁচার মত বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র অসুধ হল কাজ ,ব্যস্ততাই মানুষকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সকল রকম অক্ষমতা ভুলিয়ে রাখতে পারে। তবে একটা মজার ব্যাপার আছে জানিস রানা ,দিদা একা বাজারে যায় ঠিকই ,রোজকার দরকারী জিনিসও কেনে আর সকলের মত কিন্তু দোকান থেকে ফেরার সময় দিদার হাতে কোনো জিনিস কখনো থাকে না ,থাকে দিদার পাশে হাঁটা অন্য কারো হাতে ,সে হাত পাড়ার চিন্টু,সবুজ,পাখিরও হতে পারে অথবা অজস্র অজানা হাতের মধ্যে কোনো একজনের যে দিদার সাথে একটা অলৌকিক বাঁধনে বাঁধা ..এ বাঁধন শুধু মিষ্টি নিমকি খাইয়েই হয় ভেবেছিস ? আমার মনে হয় ,এ হল পরকে আপন করার এক অকৃত্তিম কৌশল যা আয়ত্ত করতে হলে দিদার মতই জীবনকে লাভ ক্ষতির হিসেব নিকেশ থেকে একদম আলাদা করে ফেলতে হয় আর মনের ভিতর রাখতে হয় এক সীমাহীন ভালবাসার সমুদ্র ,যার ভাগ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সকলকে উজার করে দিতে থাকলেও তাতে কখনো কোনদিন এক বিন্দু ঘাটতি অতি বড় ভগবানের আতস কাঁচেও ধরা পরবে না।

জীবনের শেষ সময়

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

৪৫ বছর বয়সী অনন্ত চাটুজ্যে একদিন অন্য গ্রামে যাওয়ার পথে তার মৃত বন্ধু নির্মল বিশ্বাসকে উল্টো দিক থেকে হেঁটে আসতে দেখে কিছুটা ভয় পেয়েই বললেন ,” নির্মল তুই তো গত বছর কলেরায় …”

নির্মল বিশ্বাস অল্প হেসে বললেন : ঠিকই জানিস ,আমি এখন যমদূতের চাকরী করি ,সুনীল কর্মকারের স্ত্রী আর এক ঘন্টা বাদেই মারা যাবে ,অনেক দিন থেকে কষ্ট পাচ্ছিলেন ভদ্র মহিলা, আমি ওনাকে নিতেই আজ এসেছি।

অনন্ত চাটুজ্যে বেশ কৌতুহল পূর্বক বললেন : তাহলে এই নতুন চাকরীর দৌলতে তুই আগে থেকেই সব জানতে পারিস বল ,কার কবে মৃত্যু ?

নির্মল বিশ্বাস বললেন : হ্যা তা পারি বটে ,তবে সারা পৃথিবীতে অগনিত প্রাণীর মৃত্যু একজন যমদূত কি করে সামলাবে বল ,তাই আমাদেরও আবার রিজিওন ভাগ করা থাকে ,এই যেমন আমার দায়িত্ব আমার নিজের গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের কয়েকটা গ্রাম।

অনন্ত চাটুজ্যে এবার আশ্বস্ত হয়ে বললেন ” দ্যাখ নির্মল , পরলোক সম্বন্ধে জানার আমার বিন্দুমাত্র কৌতুহল নেই ,কোনদিন ছিলও না ,আমার যাবতীয় আকাঙ্ক্ষা এজীবনেই সীমিত ,কিন্তু তুই ছোটবেলার বন্ধু বলে তোর কাছে একটা আবদার রাখছি ,তুই নিশ্চই জানবি আমার কবে মৃত্যু হবে ,না না এখন বলতে হবে না ,এখন থেকেই মৃত্যুভয় আমার সাধের জীবনযাপনে বাধ সাধবে তা আমি চাই না ,তাই আমার মৃত্যুর অল্প কয়েক বছর আগে যদি আমাকে একবার ওয়ার্নিং দিস ,ঠিক তারপর থেকেই আমি যাবতীয় পুণ্য সঞ্চয় শুরু করে দেব ,এই ধর দান ধ্যান ,নামগান ইত্যাদি ইত্যাদি ,তাতে সুবিধা হলো এই যে ,শেষ কটা দিন ছাড়া বাকি জীবন টাও আমি আমোদ আল্হাদে কাটাতে পারবো আর এদিকে বিনা পুন্যে নরক বাসের কোনো ভয়ও আমাকে বিচলিত করতে পারবে না।

নির্মল বিশ্বাস হেসে বললেন: তোর আবদার শিরোধার্য করলাম ,সময় মত আমি নিশ্চই তোকে ওয়ার্নিং দেবো অনন্ত ,এখন আমি এগোই বুঝলি ,পরলোকে সময়ের অবমাননার শাস্তি বড়ই কঠিন ।

তারপর বহু বছর কেটে গেছে। নাতি নাতনী নিয়ে আশি বছর বয়সী অনন্ত চাটুজ্যের ভরা সংসার , এরকমই একদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই সে দেখলো তার বাল্যবন্ধু নির্মল বিশ্বাস হাসিমুখে তার মাথার কাছে দাড়িয়ে আছে। অনন্ত চাটুজ্যে বিছানায় উঠে বসে হেসে বললেন, ” বুঝেছি নির্মল ,তুই নিশ্চই আমাকে ওয়ার্নিং দিতে এসেছিস ? “

নির্মল বিশ্বাস অবাক হয়ে বললেন , ” না তো। আজ আমি তোকে পরলোকে নিয়ে যেতে এসেছি ,৫ মিনিট আগে যে তোর মৃত্যু হয়েছে। “

এ কথা শুনে অনন্ত চাটুজ্যে ভীষণ রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠে বললেন , “বিশ্বাসঘাতক ! আমি যে তোকে বলেছিলাম মৃত্যুর কয়েক বছর আগে আমাকে ওয়ার্নিং দিতে ,আমার যে কিছুই পুণ্য সঞ্চয় হল না ,বাল্যবন্ধুর নরকবাস দেখার ইচ্ছা তুই কিছুতেই সম্বরণ করতে পারলি না ,কি বল ?”

নির্মল বিশ্বাস অবাক হয়ে বললেন , “এ তোর কেমন অভিযোগ অনন্ত ?একবার নয়, আমি তো তোকে বহুবার ওয়ার্নিং দিয়েছি । “

অনন্ত চাটুজ্যে রেগে গিয়ে বললেন , ” পরলোকে গিয়েও তোর মিথ্যাচার কমেনি দেখছি। কবে দিয়েছিস তুই আমাকে ওয়ার্নিং ? আমি বৃদ্ধ হয়েছি ঠিকই কিন্তু স্মৃতিভ্রষ্ঠ হইনি এখনো। “

নির্মল বিশ্বাস শান্ত স্মরে বললেন, ” এই যে গত কয়েক বছর ধরে তুই বাতের ব্যথায় পঙ্গু ,চোখে ভালো দেখতে পাস না , চীৎকার না করলে কানে প্রায় কিছুই শুনতে পাস না ,একটাও দাঁত আর তোর অবশিষ্ট নেই , কিছু ধরতে গেলেই হাত কাঁপে,শরীরকে কোনরকমে চলনসই করতে ডাক্তারের দেওয়া পাতার পর পাতা প্রেসক্রিপশন , এসব ই যে সময় শেষের একেকটা ওয়ার্নিং।”

(এই গল্পটা ছোটবেলায় দাদুভাইয়ের কাছে শোনা ,আমি নিজের ভাষায় একটু অন্যভাবে লিখলাম। কেউ কেউ হয়তো শুনে থাকতে পারেন ,যারা শোনেননি ,আমার মনে হয় তাদের ভালো লাগবে।আমি যখন শুনেছিলাম তখন না হলেও আজ এই গল্পের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নির্মম সত্যি আমাকে সত্যি ভাবিয়ে তোলে , তখন নিজের অজান্তেই আরো বেশী করে আঁকড়ে ধরি আশেপাশের ভালবাসার মানুষদেরকে )

244-1139

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

পাখি কলেজ লাইব্রেরীতে ঢুকে অম্লানকে দেখতে পেয়ে ওর সামনের চেয়ারে বসে বলল , “তোর কাছে বেলা ম্যাডামের নম্বর টা আছে ?”

অম্লান অল্প হেসে বলল : কেন থাকবে না ?একেবারে মনের মনিকোঠায় সেভড আছে সেই কবে থেকে ,টুকে নে ,244-1139 ।

পাখি অবাক হয়ে বলল : এটা কি ? মোবাইল নম্বর দে।

অম্লান নির্বিকার ভাবে বলল : মোবাইল নম্বর তো জানি না ,ওই একটাই নম্বর উনি বার বার বলেছেন।

পাখি এবার রেগে গিয়ে বলল : কিসব উল্টো পাল্টা ,আমি কার কথা বলছি বলতো ?

অম্লান : তা জানি না তবে ওই নামে একজনের নম্বর ই আমার কাছে আছে ,বেলা বোস ,চিনিস নিশ্চই ?

পাখি : না ,সে আবার কে ? তোর নতুন গার্ল ফ্রেন্ড ?

অম্লান : না রে ,আমার নারী ভাগ্য বরাবর মন্দ। পা ভাঙার ভয়ে রঞ্জনার পাড়াতেও আর যাওয়া হল না আর কালো সাহেবের মেয়ে খ্রীস্টান বলে বাড়িতে সবাই বাগড়া দিল , শেষে বেলার সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় পাকা হয়েই এসেছিল কিন্তু ভেঙে দিল টেলিফোন দপ্তর, বার বার এভাবে wrong number এর অজুহাতে যেকোনো মেয়েরই সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক।তাও আবার ওদের নিজেদের বাড়িতে ফোন নেই ,পাশের বাড়ির কাকিমা বাতের ব্যথা নিয়ে ওকে ডাকতে যেতেই ফোন কেটে যেত। এভাবে কি আর সম্পর্ক টেকে !তারপর আর কি !এগারোশো টাকার চাকরী ছেড়ে অগত্যা আবার কলেজে ঢুকলাম ,প্রেম ই যখন নেই তখন আর ১০ টা ৫ টার চাকরীতে মোটিভেশন কোথায় !

পাখি : নামগুলো খুব চেনা চেনা লাগছে ,সে যাই হোক তোর প্রেমের ইতিহাস শোনার আমার সময় নেই ,একজন টিচারের নম্বর চাওয়াতে এত সব বিপত্তি।

অম্লান : তোর মত সব সাবজেক্ট এর জন্য আমি কোচিং এ দৌড়ই না বুঝলি ! আমার কাছে টিচার মানে একজনই ,সে হলো Mr Hall , পকেটে আধখাওয়া ফলের এনার্জি নিয়ে পেদিয়ে লাট করে দিত তবুও একটা ভীষন ভালবাসার টান , আজও একটুর জন্য বেরিয়ে যাওয়া ট্রেনের হুইসেলের শব্দ মনটা কেমন আনমনা করে দেয়,খুব মনে হয় জানিস পাখি ,মাঝ রাস্তায় এর ওর সাথে ধাক্কা না লাগলেই ট্রেনে ওনার সাথে শেষ দেখাটা ঠিক হয়েই যেত আমার।

পাখি : Mr Hall বলে এ কলেজে কেউ পড়ায় বলে তো শুনিনি, এ নিশ্চই তোর রাত জেগে টিভিতে সিনেমা দেখার ফল !

অম্লান :মোটেই না ,উনি বারণ করার পর আমি একদম আর টিভি দেখি না।

পাখি : এই উনি টা কে ? নিশ্চই ভগবানের স্বপ্নাদেশ পাসনি ! সে যাই হোক টিভি দেখিস না তো একা থাকলে করিস টা কি ?

অম্লান : একা তো আমি থাকি না ,একা লাগলেই আব্দুল মানান হোসেনের রিক্সা চড়ে আলতাভ ফকিরের বাঁশি শুনতে চলে যাই। আর কোনদিন বৃষ্টিতে বাড়ির সামনের ম্যাকলয়েড স্ট্রিট হাঁটু জল হয়ে থাকলে তো বেরোবার উপায় থাকে না ,তখন জানলা খুলে আকাশ দেখি।

পাখি : মাথাটা একেবারে গেছে মনে হচ্ছে ,ভালো ডাক্তার দেখা।

অম্লান : দেখিয়েছি তো ,বলেছে হাওয়া বদল লাগবে।

পাখি : আমি প্রথমেই আঁচ করেছিলাম ,রাঁচির টিকিট বেশ সস্তা এখন ,যা গিয়ে ঘুরে আয় চটপট ,আর বেশী দেরী করলে ভীষন বিপদ, তোর না হলেও আশে পাশের লোক জনের।

অম্লান : রাঁচি নয় ,রাঁচি নয় , পাহাড় ! ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে পরিস্কার লেখা দার্জিলিং র কাঞ্চনজঙ্ঘাই শুধু আমাকে দিতে পারে সঞ্জীবনী সুধা ,তোর বোঝার সুবিধার জন্য বলি ব্যাপরটা অনেকটা ওই বিশল্যকরণীর মত।

হঠা ৎ লাইব্রেরী ম্যাডাম ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় করে মুখে আঙ্গুল দেখাতেই অম্লান মুখ টা পাখির কানের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল “এবার ওনার লেটেস্ট সিনেমার মত একদম নির্বাক হয়ে যা। “

পাখি রেগে উঠে যেতেই অম্লান হেসে ওর পিছু নিয়ে বলল “এভাবে যাস না পাখি ,তুই না থাকলে কালকের সকালবেলার চা তে পুরো চিনির প্যাকেট ঢেলে দিলেও যে পানসে ভাবটা কিছুতেই যাবে না । “

চাওয়া পাওয়া

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লেকের ধারে একা একা চুপ করে বসে থাকা রাত্রির পাশে গিয়ে বসলো মৃগাঙ্ক। রাত্রি তাকে দেখেও না দেখার ভান করতে সে বলল , “কিরে রাত্রি মন খারাপ ? কারোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না ?”

রাত্রি মৃগাঙ্কর দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিল “বলতে পারিস।”

মৃগাঙ্ক : কেন ? মন খারাপ কেন তোর ? কেউ কিছু বলেছে ?

রাত্রি : সবসময় কেউ কিছু বললেই বুঝি মন খারাপ হয় ?

মৃগাঙ্ক : বুঝলাম। তা মন খারাপের কারণ যখন বলবি না ,তখন অন্য কথা বলি,ভালো না লাগলে বলিস চলে যাবো।

রাত্রি : পৃথিবীর সব মেয়ের মন ভালো করার গুরু দায়িত্ব বুঝি তোর উপর ?

মৃগাঙ্ক হেসে বলল : আগে পাশে বসে থাকা মেয়েটার মন ভালো করার চেষ্টাতে তো সফল হই তারপর না হয় বাকিদের কথা ভাবা যাবে।

রাত্রি : আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছিস কিরকম মেঘ করে এসেছে ! এখনি বৃষ্টি নামবে মনে হয়।

মৃগাঙ্ক : যাক ,আমি না পারলেও বৃষ্টি তোর মন ভালো করে দেবে ,আর সকলের মত তুইও নিশ্চই বৃষ্টি ভিজতে ভালোবাসিস ?

রাত্রি : না।

মৃগাঙ্ক : তোর বৃষ্টি ভিজতে ভালো লাগে না ?

রাত্রি : বৃষ্টিতে ভেজা কাপড়ে মাইলের পর মাইল হাঁটার সময় অজস্র লোভী চোখের লালসাময় দৃষ্টির শিকার হয়েছিস কখনো ? যদি হতিস তাহলে ওই কাব্যিক ভালবাসার বদলে যা থাকতো তা হলো শুধুই দুঃস্বপ্ন।

মৃগাঙ্ক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল : আচ্ছা ওই ফুল টা কিরকম অন্যরকম দেখ,তুলে নিয়ে আসবো তোর জন্য?

রাত্রি : না। তোর ভালো লাগলে তুই রাখ , আমি তার সৌন্দর্যের যোগ্য কদর করতে পারবো না।

মৃগাঙ্ক : তোকে বুঝি ফুল ও আনন্দ দেয় না ?

রাত্রি : না , আমার পাওয়া সব ফুলের মধ্যে প্রেরকের সুপ্ত বাসনার স্বার্থ ফুলের সৌন্দর্য অব্দি আমাকে কখনো পৌছাতে দেয়নি।

মৃগাঙ্ক (হেসে) : আমাকেও তাহলে তুই সেই দলেই ফেলিস।

রাত্রি : তা নাহলেও অনেকদিনের ভালো না লাগার অভ্যেস হঠাৎ কি করে বদলাই বল ?

মৃগাঙ্ক : রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনবি ? ভয় নেই আমি গাইব না ,মোবাইলে বাজাবো।

রাত্রি : একদম না, জমা মনখারাপ কে মুহুর্তে চোখের জলে রুপান্তরের কৌশল রবীন্দ্রনাথের থেকে ভালো কেউ জানে না।

মৃগাঙ্ক: তবে আর কি ! বারবিকিউ চিকেনের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে ,চল এবার ,খাবি তো ?

রাত্রি : না ,এখন আমার চিকেন খেতে ইচ্ছা করছে না ,তুই গিয়ে বাকিদের সাথে খাওয়া দাওয়া কর ,এভাবে আমার কাছে বসে পিকনিকের আনন্দ নষ্ট করিস না।

মৃগাঙ্ক: চিকেন আমারও বিশেষ পছন্দ নয় ,তার বদলে যদি মায়ের হাতের মুড়ি ঘন্ট হতো আহা ! আমাকে বিদায় করার তোর এতক্ষণের চেষ্টা আমি নিজের অজান্তেই সফল করে দিতাম।

রাত্রি হেসে বলল : আর তার সাথে আমার মায়ের হাতের আলু বড়ি দিয়ে তৈরী সাদা সুক্ত যা আমাকে কিছুতেই এখানে একা একা বসে থাকতে দিত না।

মৃগাঙ্ক: তুই ঠিক আমার মতই পেটুক গোছের।

রাত্রি হেসে বলল : তোর থেকে অনেক অনেক বেশী। জিরো ফিগারের হাতছানি আমি অবলীলায় উপেক্ষা করলেও থালা ভরা রঙ বেরঙের মিষ্টি র স্বপ্ন মাঝরাতে আমার ঘুম ভাঙিয়ে ঠিক ফ্রিজের দরজার সামনে দাড় করিয়ে ছাড়ে।

মৃগাঙ্ক (সজোরে হেসে ) : যা বললি তারপর এই প্রশ্ন টা সত্যি অপ্রয়োজন ,তবুও করছি ,তুই বুঝি মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসিস ?

রাত্রি : ভীষণ ।আমার বাবার তো মিষ্টির দোকান ,স্কুলের গরমের ছুটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল রাত জেগে সবার সাথে মিষ্টি বানানো, তার মধ্যে ক খানা যে সবার অগোচরে মুখে পুরে ফেলতাম তার হিসেব সত্যি কখনো করিনি।

মৃগাঙ্ক : কিছু হিসাব বোধ হয় না করাই ভালো নাহলে যোগ বিয়োগের সীমাবদ্ধতা সকলের দৃষ্টিগোচর হয়ে যাবে।

রাত্রি : একদম ঠিক। ছোটবেলার বেহিসাবী মন আর নিশ্চিন্ত ঘুমের রাতগুলোর জুরি মেলা ভার।

মৃগাঙ্ক : আচ্ছা তুই লক্ষী পুজোতে আল্পনা দিয়েছিস কখনো ?

রাত্রি : কতবার দিয়েছি কিন্তু সে আল্পনায় লক্ষীর পাঁচটা আঙ্গুল হয় থেবড়ে গিয়ে আলাদা ভাবে বোঝা যেত না অথবা এতটাই দূরে দূরে থাকতো যে হঠাৎ দেখলে গোরিলার পায়ের ছাপ মনে হতে পারে।

মৃগাঙ্ক হেসে বলল : গোরিলার হলেও পা তো আঁকতে পারতিস ,আমি চেষ্টা করেও যখন পা ,ফুল ,পাতা কিছুই আঁকতে পারতাম না তখন সব জল ন্যাকরা দিয়ে মুছে দিতাম কিন্তু শোকাবার পর বুঝতে পারতাম ঠিক মত মুছতেও পারিনি , মেঝে জুড়ে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য হয়ে থাকা সাদা দাগ দেখে বাড়ির লোকজন আমাকে পেলেই গম্ভীর ভাবে প্রশ্ন করত ” এত সুন্দর আল্পনা কে করলো বলত টুটুল ? “

রাত্রির খিল খিল হাসি কিছুক্ষণ উপভোগ করে মৃগাঙ্ক বলল ” জানিস রাত্রি আমার কাছে মায়ের পাঠানো একটা জিনিস সবসময় মজুত থাকে যা শেষের দিকে হলেই মা নগেন কাকা কে দিয়ে আবার পাঠিয়ে দেয় ,আজও তা আছে আমার পকেটে ,তুই যদি বলিস তোকে তার থেকে ভাগ দিতে পারি। “

রাত্রি হাসি থামিয়ে বলল ” কি জিনিস রে ?”

মৃগাঙ্ক বলল : নাম বলছি না তবে ক্লু দিচ্ছি ,সেটা হল লক্ষী পূজার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

রাত্রির চোখ খুশিতে জ্বল জ্বল করে উঠলো ,পকেট থেকে বার হওয়া মৃগাঙ্কর হাতের মুঠো রাত্রি নিজের হাতে মুহুর্তে খুলে ফেলে সব কটা একসাথে মুখে পুরে চোখ বন্ধ করে বলল : আহ ! অমৃতর আরেক নাম বোধহয় নারকেলের নাড়ু ,বুঝলি মৃগাঙ্ক ?

মৃগাঙ্ক হেসে বলল : সব মন খারাপ তুই একসাথে গিলে ফেললি ?

রাত্রি চোখ বুজেই বলল : গিলে তো তোর আল্পনার গল্পের সাথেই ফেলেছিলাম ,নাড়ুর স্বাদে তা হজম হল মাত্র !

ফেলুদার যোগ্য বউ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

“তুই কাকে বিয়ে করবি তিতির ? ” সোনা কাকুর প্রশ্নের উত্তরে গল্পের বই থেকে মুখ না তুলেই তিতির জবাব দিল “ফেলুদাকে !”সোনা কাকু হেসে বলল ” সামনের চায়ের দোকানের ফেলুদা ? ” তিতির মাথাটা দুদিকে নাড়িয়ে বলল “না! সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা !” সোনা কাকু বলল “আচ্ছা , কিন্তু কোন ফেলুদা ? সৌমিত্র চ্যাটার্জী ,সব্যসাচী চক্রবর্তী নাকি আবীর চ্যাটার্জী ? ” তিতির নির্বিকার ভাবে বলল “প্রদোষ মিত্র!” সোনা কাকু এবার আপাত গম্ভীর ভাবে বলল “তোর পছন্দ সত্যি প্রশংসনীয় তিতির ,পাত্র হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়ে আমার কেন, কারোর কোনো সন্দেহের অবকাশ সে রাখেনি কিন্তু তাকে তোর মনের কথা জানিয়েছিস কি ?” তিতির বলল ” না !সরাসরি বলিনি তবে তার প্রত্যেকটা গল্প এভাবে বার বার করে পড়া , বিশেষ করে তার মুখ থেকে বেরোনো কথা গুলো একেবারে মুখস্থ করে ফেলার কারণ আর যার হোক তার মত বুদ্ধিমান মানুষের তো না বোঝার কথা নয় !” সোনা কাকু বলল ” তা সে ও কি তোকে বিয়ে করতে রাজী ?” তিতির নির্বিকার ভাবে বলল ” নাহলে সাতাশ বছর বয়স অব্দি তার কোনো মেয়ে বন্ধু না থাকার কারণ আর কি বা হতে পারে তুমি ই বল সোনা কাকু ?” সোনা কাকু গম্ভীর ভাবে বলল “তা বটে !!”

হঠাৎ সোনা কাকুর ফোনটা বেজে উঠলো। তিতির শুনলো সোনাকাকুর চিন্তিত গলার স্মর “আচ্ছা,আমি নিশ্চই যাব !” তিতির বই টা নামিয়ে রেখে বলল ” কি হয়েছে সোনা কাকু ?” সোনা কাকু বলল “অনন্তের ফোন ছিল ,ওর মাসতুতো বোন নাকি খুব অসুস্থ ,খুব করে বলল আমি যদি পারি তাহলে যেন একবার গিয়ে দেখে আসি !” তিতির বলল ” তা এতে চিন্তিত হবার কি আছে ? এত বড় ডাক্তার তুমি আর অনন্ত কাকু তো তোমার পুরনো বন্ধু!” সোনাকাকু বলল ” না রে তিতির, ব্যাপারটা অত সহজ নয় ,যে অসুখের কথা অনন্ত বলল তার চিকিৎসা ডাক্তারি শাস্ত্রে আছে বলে আমার জানা নেই! তাই আমি গিয়ে কতটা কি করতে পারব সন্দেহ হচ্ছে !” তিতির বলল “মানে ? কি অসুখ ?” সোনাকাকু চিন্তিত মুখে বলল “অনন্তের বোনকে নাকি ভুতে ধরেছে !” তিতির অল্প হেসে বলল ” তাই নাকি ? আমার যে ভূত দেখার ইচ্ছা সেই ছোটবেলা থেকে ,আমাকেও সাথে নিয়ে চলো সোনাকাকু ,রথ দেখা আর কলা বেচা দুই হবে !” সোনাকাকু বলল ” রথ দেখা আর কলা বেচা ? স্কুলে যে কি শেখাচ্ছে তোকে কে জানে ! এই কথা টার মানে তখনি হয় যখন ২ টো কাজ একটা লোকই করে ,আর এখানে আমি করব চিকিৎসা আর তুই দেখবি ভূত ! ” তিতির হেসে বলল “ওই হল ,তুমি আর আমি কি আলাদা নাকি ?” সেই শুনে সোনা কাকু আবার আপাত গম্ভীর ভাবে বলল “বুঝলাম !!”

তিতির আর সোনাকাকু গাড়ি থেকে নেমে একটা বাড়ির সামনে এসে দাড়ালো ,সোনাকাকু বলল “অনন্তের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী এই বাড়িটাই মনে হচ্ছে বুঝলি তিতির ?” সেটা শুনে তিতির দৌড়ে গিয়ে দরজায় আটকানো কলিং বেল টা বাজিয়ে দিয়ে এসে আবার সোনাকাকুর পাশে দাড়ালো।

একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এসে দরজা খুলে বললেন , “ক্ষমা করবেন ,আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না !” সোনাকাকু হাত জোড় করে বলল ” নমস্কার ,আমি Dr. স্বাগ্নিক মুখার্জী ,আর ও হলো তিতির ,আমার ভাইঝি ,আমাকে অনন্ত ফোন করেছিল।” বয়স্ক ভদ্রলোক এবার লজ্জিত হয়ে বললেন ” ও! আসলে আপনার নাম বহুবার শুনলেও কোনদিন চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। অনন্ত আমাদের বলেছিল বটে কিন্তু আপনি যে বাড়িতে আসতে রাজী হবেন তা একবারও ভাবতে পারিনি ! দয়া করে ভিতরে আসুন। “

সোনাকাকুর সাথে যেকোনো জায়গায় গেলে এক অভাবনীয় আতিথেয়তা তিতির আগেও বহুবার উপভোগ করেছে,এটা কতটা আন্তরিক তা নিয়ে সে কোনদিন মাথা ঘামায়নি ,গুনের বা গুনীর আদর সব মানুষই করে বলে তার বিশ্বাস। যদিও সোনাকাকু তাকে বার বার বলেছে “পেটের দায়ে কয়েকটা পুথি পড়া লোক কে কখনোই গুনী বলা চলে না ,গুন হল জন্মগত জিনিস, একেবারে ভিতরের ,যাকে কেবল সময়ের সাথে শানিয়ে নেওয়া যায় !” তবুও তিতিরের চোখে সোনাকাকুই তার দেখা সবচেয়ে গুনী মানুষ।

তিতির সোনাকাকুর সাথে ভদ্রলোক কে অনুসরন করলো ।একটা ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে ভদ্রলোক সোনাকাকুর দিকে তাকিয়ে বললেন “আপনারা একটু বসুন ,রোহিনী মানে আমার ছেলের বউ ওদিকের ঘরে থাকে। আমি একবার ওকে গিয়ে বলে আসি ,তারপর আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি। ” সোনাকাকু বলল ” সে ঠিক আছে কিন্তু তার আগে আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল ! ” বয়স্ক ভদ্রলোক দরজার সামনে থেকে ফিরে এসে বললেন “আমার সাথে ? হ্যা নিশ্চই ! বলুন না। ” সোনা কাকু বলল ” কিছু মনে করবেন না মিস্টার সাহা,আপনার পুত্রবধু কে দেখতে যাওয়ার আগে আমার সবটা জানা দরকার,সব শুনে যদি আমার মনে হয় আমি সত্যি আপনাদের কিছু সাহায্য করতে পারব তাহলেই আমি এগোবো নাহলে শুধু শুধু সকলের মূল্যবান সময় নষ্ট করাতে আমার অমত! ” বয়স্ক ভদ্রলোক এবার সামনের সোফায় বসে বললেন “বুঝতে পারছি। আমি যথা সম্ভব চেষ্টা করব আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে। ” তারপরের কথাবার্তা এরকম :

সোনাকাকু : আমাকে খোলাখুলি বলুন আপনার কেন মনে হয় যে আপনার পুত্রবধুকে ভূতে ধরেছে।

ভদ্রলোক : এটা মাস দুই আগেকার ঘটনা। প্রায় একবছর পর সমীর মানে আমার ছেলের বিদেশ থেকে ফেরার আগের দিন বাজার থেকে জ্যান্ত মাছ কিনে আনা হয়েছিল। কিন্তু অবিশ্বাস্য ভাবে বন্ধ রান্না ঘরে বালতি ঢাকা মাছ পরের দিন সকালে একেবারে ভ্যানিশ যাকে বলে। এর কারণ নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে আবার নতুন মাছ কিনে আনায় পরদিন সকালে সেই একই ঘটনা ঘটল । মানদা হলো আমাদের পুরনো কাজের মেয়ে,সে নাকি ওই দুদিনই রোহিনীকে রান্না ঘরে ঢুকে কাঁচা মাছ খেতে দেখেছিল । শুধু তাই নয় ,তার কথা অনুযায়ী রোহিনী নাকি যখন তখন সামনের পুকুর ধারে ঘুরে বেড়ায় ,আর আশে পাশে কাউকে না দেখলেই পারের ধারে বসে পুকুরের কাঁচা মাছ ধরে খায়। সেদিন আমি মানদার কথায় কান না দিলেও তারপর কিছুদিন মাছ আনা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। হঠাৎ সমীর একদিন আবার সবার জন্য জ্যান্ত মাছ কিনে আনলো বাজার থেকে। সত্যি জানার কৌতুহলে সেদিন রাতে আমি আর আমার স্ত্রী কিছুতেই ঘুমাতে পারিনি। স্ত্রীর সাথে রান্নাঘরের পিছনের উঠোনে দেওয়ালের ধারে লুকিয়ে রান্না ঘরের দিকে চোখ রেখে অপেক্ষা করছিলাম। ক্লান্ত হয়ে প্রায় ঘুমিয়েই পরেছিলাম, কিন্তু মাঝরাতের দিকে রান্নাঘর থেকে আসা আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল ,এখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি স্বাগ্নিক বাবু ,রান্না ঘরে মাছের বালতির দিকে তাকিয়ে যে দাড়িয়ে ছিল ,সে আর কেউ নয় ,আমার পুত্রবধু রোহিনী। বেশ কিছুক্ষণ পর সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলে আমি আর আমার স্ত্রী রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম বালতি তে একটাও মাছ নেই। কিন্তু ছেলের মুখ চেয়ে একথা আমরা আর কাউকে বলতে পারিনি। কিন্তু এরপর যেটা হলো তাতে আর চুপ করে থাকা সম্ভব হলো না। আমাদের বাড়িতে আমার স্ত্রী র নিয়ে আসা সাধের কাকাতুয়া ‘টিটু’ ওই বারান্দায় দাড়ের উপর রাখা থাকতো। গত রবিবার দুপুরে আমাদের এলসেশিয়ান কুকুর রক্সীর চিৎকারে আমাদের ভাত ঘুম ভেঙে গেলে দৌড়ে বাইরে বারান্দায় গিয়ে দেখি ,টিটুর পালক গুলো অবিন্যস্ত ভাবে বারান্দা জুড়ে ছড়িয়ে আছে ,আর হাতে মুখে রক্ত মেখে বসে থাকা রোহিনী প্রাণপণে রক্সীর গলা টিপে ধরার চেষ্টা করছে। সে দৃশ্য একবার দেখলে আপনিও আমাদের মত আর রাতে ঘুমাতে পারতেন না স্বাগ্নিক বাবু। টিটুকে না বাঁচাতে পারলেও রক্সী কে কোনো ভাবে রোহিনীর কবল থেকে ছাড়িয়ে আমরা রোহিনীকে ওপাশের ঘরে নিয়ে গেছিলাম। তারপর থেকেই ওই তালা বন্ধ ঘর থেকে আমরা আর রোহিনীকে বেরোতে দিতে পারিনি ,খুব অসহায় লাগছে নিজেকে কিন্তু আমাদের আর কি বা করার আছে বলুন। ছেলেটার মুখের দিকে তাকাতে পারি না স্বাগ্নিক বাবু,একদিকে লোক লজ্জার ভয় অন্যদিকে এই বিপদ থেকে বের হওয়ার জন্য আকুলি বিকুলি প্রাণ ,আমরা যে কি করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। ইতিমধ্যে গতকাল অনন্ত আসায় লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও ওকে সব খুলে বলেছি। এখন যা আইন কানুন ,হয়তো লোক জানাজানি হলে অনেকেই ভাববে আমরা এসব বানিয়ে বানিয়ে বলছি ,ছেলে বউ কে জব্দ করার জন্য নিজেদের আটা ফন্দি ,কিন্তু বিশ্বাস করুন রোহিনী কে আমরা ভীষণ ভালোবাসি ,ওর মত ভালো মেয়ে আজকাল কার দিনে দেখা যায় না।আপনি যদি ওকে চিকিৎসা করে ভালো করে তুলতে পারেন,আপনার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ থাকবে না! “

সোনাকাকু : হুম বুঝলাম। আপনারা বাড়িতে কজন থাকেন ?

ভদ্রলোক :আমি ,আমার স্ত্রী ,সমীর ,রোহিনী ,সবুজ ,মানদা ,শ্যামচরণ আর রক্সী। সবুজ হল আমার নাতি আর শ্যামচরণও মানদার মত আমাদের অনেক পুরনো কাজের লোক।

সোনাকাকু :আমার সকলের সাথে পরিচয় হওয়া প্রয়োজন। আপনার কথা তো শুনলাম ,বাকিদের মতামতও জানা আবশ্যক। আসলে বুঝতেই পারছেন যে অসুখের কথা আপনি বলছেন সেটা সরানোর ক্ষমতা আমি কেন কোনো ডাক্তারেরই নেই ,তাই আমার জানা দরকার যদি এমন কিছু থেকে থাকে যেখানে আমি আপনাদের একটু হলেও সাহায্য করতে পারবো। তার আগে আপনার পুত্রবধুর সাথে একবার দেখা করতে চাই।

ভদ্রলোক :হ্যা নিশ্চই। আপনারা বসুন। আমি রোহিনী কে বলে আসছি ।

প্রায় ৫ মিনিট বাদে ভদ্রলোক আবার ঘরে এসে আমাদেরকে ওনাকে অনুসরন করতে অনুরোধ করলেন।লম্বা করিডোর পেরিয়ে একটা ঘরের সামনে এসে উনি বললেন “এই ঘরটা ,আপনারা যান ,আমি এখনি আসছি। ” তিতির সোনাকাকুর সাথে ঘরে ঢুকতেই দেখল একজন মাঝ বয়সী ভদ্রমহিলা খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে আছেন। সোনাকাকু বলল “নমস্কার। আমার নাম স্বাগ্নিক মুখার্জী ,আমি অনন্তের বন্ধু। ” ভদ্রমহিলা এবার সোনাকাকুর দিকে ঘুরে অল্প হেসে বললেন , “জানি ,বসুন।” তারপর তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললেন “এই বুঝি তিতির ? অনন্ত দার কাছে আপনাদের অনেক গল্প শুনেছি। ” সোনাকাকু হেসে বলল ” আপনি ঠিক ধরেছেন। ওই আমার ভাইঝি তিতির।” তারপর কিছক্ষন চুপ করে সোনাকাকু বলল “আপনি নিশ্চই জানেন আমি কেন এখানে এসেছি !” ভদ্রমহিলা হেসে বললেন ,”ডাইনীর চিকিৎসা কি আর মানুষের ডাক্তার করতে পারবে ?” সোনাকাকু বললেন ” সত্যি টা আমাকে বলুন রোহিনী দেবী , কথা দিচ্ছি আমি আপনার সাহায্য না করতে পারলে সহনাভূতি দিয়ে বিব্রত করবো না। ” ভদ্রমহিলা বললেন , “আপনি যা শুনেছেন সবই সত্যি। কাঁচা মাছ দেখলে আমি লোভ সামলাতে পারি না , আর টিটুকেও আমি খেয়েছি ,নেহাত সবাই এসে পরেছিল বলে নাহলে রক্সীকেও আপনারা দেখতে পেতেন না।” সোনাকাকু তিতিরের হাত ধরে উঠে দাড়িয়ে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন “নমস্কার ,এখন আমরা আসি ,আবার যদি কখনো আসার সুযোগ হয় নিশ্চই দেখা হবে। “

তারপরে সোনাকাকুর অনুরোধে বাড়ির বাকি লোকজন একে একে ড্রয়িং রুমে এলে তাদের সাথে সোনাকাকুর প্রশ্ন উত্তর পালা এরকম :

সোনাকাকু : আপনার পরিচয় ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : আমি মানদা ,এ বাড়িতে অনেকদিন কাজ করি।
সোনাকাকু :Mr সাহার কথা অনুযায়ী আপনি রোহিনী দেবীকে কাঁচা মাছ খেতে দেখেছেন,সেটা কি সত্যি ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : মিথ্যে কেন বলতে যাবো ডাক্তার বাবু ? একবার নয় বহুবার দেখেছি।
সোনাকাকু : আপনি এখন আসতে পারেন ।

সোনাকাকু : আপনি নিশ্চই Mrs সাহা !
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : হ্যা।
সোনাকাকু :আপনিও কি মনে করেন রোহিনী দেবীকে ভুতে ধরেছে ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : না মনে করার কোনো উপায় কি সে রেখেছে ? নিজের পেটের মেয়ের মত ভালোবাসি তাকে ডাক্তার বাবু,আপনি যে ভাবে হোক আমাদের এ বিপদ থেকে রক্ষা করুন।
সোনাকাকু : কথা দিতে পারছি না কিন্তু চেষ্টা করব। আপনি এখন আসুন।

সোনাকাকু : আপনি?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক : ডাক্তার বাবু আমি শ্যামাচরণ। আপনি মানদার কথা শুনবেন না ডাক্তার বাবু ,ও খুব মিথ্যে কথা বলে।
সোনাকাকু : তাহলে সত্যি টা কি তুমি জানো ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: তা না জানলেও আমি জানি বৌদিমুনিকে ভুতে ধরতে পারে না। তিনি যে দেবী ,তাকে কি করে ভুতে ধরবে!
সোনাকাকু :দেবী? ঠিক বুঝলাম না। খুলে বল।
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: তা আমি বলতে পারবো না ডাক্তার বাবু কিন্তু আপনি দয়া করে মানদার কথা বিশ্বাস করবেন না।
সোনাকাকু :তুমি এখন এসো।

সোনাকাকু : আপনি নিশ্চই সমীর সাহা ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক : হ্যা।
সোনাকাকু : আপনার কি ধারণা আপনার স্ত্রী র ব্যাপারে?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: আমি ভুতে বিশ্বাস করি না ,রোহিনী অসুস্থ ,সঠিক চিকিৎসা হলে সেরে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস।
সোনাকাকু :কিন্তু আপনার স্ত্রী তো আমার সাথে সহযোগিতা করছেন না।
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: আমি জানি।ও বরাবরই খুব জেদী। আমি ওকে বোঝাবার প্রানপন চেষ্টা করবো। আপনার ক্লিনিকের ঠিকানা আমি অনন্তের কাছে নিয়ে নিয়েছি,আমি রোহিনীকে নিয়ে সেখানে যাবো।
সোনাকাকু :আচ্ছা ,তাই আসবেন তাহলে।

সোনাকাকু : তোমার নাম কি ?
বাচ্ছা ছেলেটি : সবুজ ।
সোনাকাকু : বাহ্ ,খুব সুন্দর নাম।
বাচ্ছা ছেলেটি চীৎকার করে বলল :আমার মা ডাইনী নয় ,তোমরা সবাই খারাপ।

কথাটা বলেই বাচ্ছা ছেলেটি দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

সোনাকাকু আর কথা না বলে সকলের সামনে হাত জোড় করে বলল : ” ক্ষমা করবেন ,আমার মনে হয় আমি আপনাদের সমস্যায় কিছু সাহায্য করতে পারবো না। “

তারপর তিতিরের সাথে ওই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গাড়িতে উঠে নিজের বাড়িতে পৌছনো অব্দি সোনা কাকু আর কোনো কথা বলল না।বাড়িতে পৌছে স্নান সেরে তিতির সোনাকাকু র ঘরে ঢুকতেই শুনলো সোনাকাকু তার বন্ধু অনন্তের সাথে কথা বলছে ” ঠিক আছে রে ,ভালো থাকিস। “

তিতির বলল “কি হয়েছে সোনাকাকু ?” সোনাকাকু বলল “কিছু না ,ওই অনন্ত কে বললাম আজকের ঘটনা। “

পরদিন সকালে তিতির সোনা কাকুর ঘরে ঢুকে বই এর তাক থেকে একটা গল্পের বই খুঁজছিল ,ঠিক তখনি সোনাকাকুর ফোনটা বেজে উঠলো। সোনা কাকু হেসে বলল “আরে ঠিক আছে ,ধন্যবাদের কি আছে ? আমি তো কিছুই করিনি। ভালো থাকবেন। “

তিতির বলল “কার ফোন ছিল সোনাকাকু ?” সোনাকাকু বলল “সমীর সাহার ,কালকে আবার জ্যান্ত মাছ কিনে আনার পর আসল সত্যি টা উদ্ধার হয়েছে ,কি জানিস তিতির ,সব একটা ভাম বিড়ালের কান্ড। মাছ আর টিটুর সাথে কাকতালীয় ভাবে রোহিনী দেবীও সেই ভামবিড়ালের স্বীকার ,টিটুকে বিড়াল টার কবল থেকে বাঁচাতে গিয়েই যত বিপত্তি,বাড়ির লোকের অবিশ্বাসের শিকার হয়ে তার মত অভিমানী মেয়ের থেকে গতকালের ব্যবহার ই প্রত্যাশিত।

তিতির কে চুপ করে থাকতে দেখে সোনাকাকু বলল “কিরে তিতির ,তোর ভূত দেখা হলো না বলে মন খারাপ ?”

তিতির :”কাল রাতে তুমি কোথায় গিয়েছিলে সোনাকাকু ?”

সোনাকাকু একবার চমকে উঠে তৎক্ষনাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল “ঘুম আসছিল না বলে ছাদে পায়চারী করছিলাম। “

তিতির :আমি নিজে সকালবেলা ছাদের দরজার তালা খুলেছি সোনাকাকু । সে যাই হোক তোমার রাতের খোলা জামাতে বিড়ালের লোমে ভর্তি আর কেমন একটা বোটকা গন্ধ। ভালো করে স্নান করে নাও আর জামাটা নগেন দা কে কাঁচতে দিয়ে দাও।

সোনাকাকু হেসে বলল :তুই কি ভাবছিস বলতো ?

তিতির : সত্যি টা নিজে চোখে দেখার পর আর কিছু ভাবার অবকাশ নেই ।

সোনাকাকু : তার মানে আমি যেটা বললাম সেটা সত্যি নয় বলছিস ?

তিতির :তোমার কথার মধ্যে শুধু একটাই সত্যি ছিল যে রোহিনী সাহা কে ভুতে ধরেনি। বাকি সত্যিটা আমি তোমাকে বলছি।

আমি তোমাকে যা চিনি তাতে ভালো করেই জানতাম সত্যি জেনে তুমি চুপ করে বসে থাকার লোক নয়,কালকে বাড়ি ফেরার সময়ই তুমি ভেবে নিয়েছিলে তোমার পরবর্তী পদক্ষেপ।খুব তাড়াতাড়িতে ছিলে বলেই বোধহয় খেয়াল করনি রাত্রে তোমার গাড়ির পিছু নেওয়া একটা ট্যাক্সিকে।

সোনাকাকু অবাক হয়ে : দেখেছিলাম কিন্তু একবারও ভাবিনি সেটা তুই!

তিতির বলল : এবার না হয় আমাকেই বাকিটা বলতে দাও ,কিছু ভুল হলে শুধরে দিও।

সোনাকাকু হেসে বলল : বল তবে শুনি ! সবসময়ের মত এবারও আমার মিথ্যে বলা সার্থক করে দে।

কালকে সমীর বাবু তোমার কথাতেই বাজার থেকে জ্যান্ত মাছ কিনে রান্নাঘরের বালতিতে ঢেকে রেখেছিলেন আর রাতে ঘুমের ভান করে রোহিনী দেবীর পাশে শুয়েছিলেন। রাত্রি ১২ টা নাগাদ ওখানে পৌছে পাঁচিল টপকে ও বাড়িতে ঢুকে তুমি ওনাদের রান্না ঘরের পিছনের উঠোনে ভুতের কাঁচা মাছ খাওয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলে । রোহিনী দেবী রান্না ঘর থেকে বেরোনোর পরই তুমি অন্যদিকের রাস্তা দিয়ে ওনার পিছু নিলে। একটু দূরে তোমার পিছনে লুকিয়ে থাকা আমিও দেখেছিলাম উনি পুকুরের সিড়ি দিয়ে নামার পর এদিক ওদিক ভালো করে তাকালেন,তারপর শেষ সিড়িতে বসে আচলের তলা থেকে একটা থালা ঢাকা বাটিতে রাখা জ্যান্ত মাছ গুলোকে পুকুরে ছেড়ে দিলেন। …

রোহিনী দেবীকে সিড়ি দিয়ে উঠে আসতে দেখে তুমি এগিয়ে গেলে ,তারপরের কথা বার্তা অনেকটা এরকম :

তুমি :আপনার মাছ খাওয়া হলো ?

চমকে উঠে রোহিনী দেবী বললেন : এতো রাতে আপনি এখানে ?

তুমি :গতকাল সত্যি টা বলে দিলে আমাকে আজ এত রাতে এভাবে আসতে হত না। মাছ গুলো জলে ছেড়ে দিলেন কেন রোহিনী দেবী ?

রোহিনী দেবী:আমার ছেলের জন্য। কোনো জীবকে কষ্ট পেতে দেখলে ও সহ্য করতে পারে না ,রাতে ভয় কান্নায় ওর জ্বর চলে আসে।

তুমি :তাই টিটুকেও বোধহয় সবুজ ই ছেড়ে দিতে গিয়েছিল আর বাঁধন টা ঠিক মত খুলতে না পারায় পা জড়িয়ে গিয়ে টিটু নীচে পরে যায়,আর তখনি রক্সীর থাবা র কিছুটা গিয়ে পরে তার ওপর আর বাকিটা টিটুকে বাঁচাতে যাওয়া আপনার ওপর,রক্সীর থাবার আঁচড়ে বের হওয়া রক্ত মুহুর্তে আপনাকে ডাইনী বানিয়ে দিল।

রোহিনী দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের চোখের জল মুছে বললেন :হ্যা,সেদিন আমি ঠিক সময়ে না পৌছলে আমার ছেলেটাকে সবাই বাড়ি ছাড়া করে ছাড়তো। আমিই টিটুকে বাঁধন থেকে মুক্ত করে দিয়েছি ,টিটুর স্বাধীন হওয়া দেখে সবুজের চোখে মুখে যে খুশির ছবি আমি সেদিন দেখেছিলাম ,জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি তা ভুলতে পারবো না। তাই দেখতে গিয়েই রক্সীর থাবায় টিটুর খসে যাওয়া অবিন্যস্ত পালকগুলো আমি আর সরানোর সময় পায়নি। রক্সীর রাগ সামলানোর জন্যই আমি ওর গলার বকলেস টা আলগা করার চেষ্টা করছিলাম , আর বাবা মা ভাবলো ….

তুমি :সবুজ আপনার নিজের ছেলে নয় তাই তো ? আমি অনন্তের কাছে সব শুনেছি ,দয়া করে আর আমার কাছে কিছু লোকাবেন না।

রোহিনী দেবী: আমার দিদি জামাইবাবু গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার সময় সবুজের বয়স ছিল মাত্র ২ মাস। তারপর থেকে আমাকেই ও মা বলে জানে ,এ বাড়ির আর কেউ না মানলেও আমি জানি যে সবুজ আমারই ছেলে।আর নিজের ছেলের জন্য সব মা যা করে আমিও তাই করেছি ,জীবনের শেষ দিনেও আমি এই ডাইনী অপবাদ নিয়ে আক্ষেপ করবো না।

তুমি :আমি অনন্তের কাছে কৃতজ্ঞ ,ও না থাকলে আপনার মত মায়ের সান্নিধ্য আর এ জীবনে পেতাম কিনা সন্দেহ।

তারপর তুমি এগিয়ে গিয়ে ওদিকের দেওয়ালের পিছনে দাড়িয়ে থাকা সমীর বাবুকে বললে “আপনি নিশ্চই সব শুনেছেন। দয়া করে আমার সাথে একবার গাড়ির কাছে আসুন। ” সমীর বাবু নিঃশব্দে গাড়ি অব্দি তোমাকে অনুসরণ করলে তুমি গাড়ির ডিকি থেকে একটা ফুটো বস্তা বার করে বললে “একে নিয়ে আপনাদের রান্নাঘরে বন্ধ করে রাখুন। এই আপনার স্ত্রীর ওপর লাগানো কলঙ্ক মোচনে সাহায্য করবে। আমার পাড়ার পুরোনো বন্ধু মাত্র একদিনের অনুরোধে একে পাশের জঙ্গল থেকে ধরে দিয়েছে। ভয় নেই ,আমি ঘুমের ইনজেকশন দিয়েই নিয়ে এসেছি ,কাল সকালের আগে এর ঘুম ভাঙবে না।এরপরের ছোট খাটো খটকা গুলো আপনি নিজেই সবার কাছে পরিস্কার করে দেবেন যেমন রাত্রি বেলা পিপাসা পেলে লোকে তো রান্নাঘরেই যাবে নাকি ! আর আমার নিয়ে আসা এই জন্তুটি অনায়াসে আপনাদের রান্নাঘরের খোলা জানলা র ফাঁক দিয়ে গলতে পারবে,তাই স্বাভাবিক ভাবেই বন্ধ দরজা ওর মাছ খাওয়া আটকাতে পারেনি ।”

শুনে সমীর বাবু বললেন : আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দেবো।….

উত্তরে তুমি বললে :সেটা না দিয়ে পারলে রোহিনী দেবীর কাছে ক্ষমা চাইবেন ,আজ আমি যা করলাম তা হয়তো আপনার কাছ থেকে সে আশা করেছিল। কালকে সকালে সব মিটলে একবার ফোন করে জানাবেন। আমি এগোলাম।

সোনা কাকু এতক্ষণ চুপ করে সবটা শুনে হেসে বলল :”তুই সত্যি প্রদোষ মিত্রের যোগ্য বউ,সারা দুনিয়ার থেকে সত্যি লুকাতে পারলেও সোনাকাকু যে বরাবর তার সত্যান্বেষী তিতিরের কাছে এমনি ভাবেই ধরা পরে যায়। “

তিতির হেসে বলল “ফেলুদা আমাকে বিয়ে করতে রাজী না হলেও এখন আর আমার একটুও মন খারাপ হবে না সোনাকাকু,তার মত গোয়েন্দা না হলেও আমার সোনাকাকু তার থেকে অনেক বেশী ভালো মানুষ। “

ভালোবাসার রাখী

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

পাঞ্জাবী ছেলেটি হাতে একটা রাখী নিয়ে ঘরে ঢুকে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকা বাঙালী মেয়েটার কাছে গিয়ে বলল :মেরে হাত মে ইয়ে বান্ধ দেগী ? মেরে বহেন নে স্পীডপোস্ট সে ভেজী আজ সুভা।

মেয়েটি হেসে রাখীটা ছেলেটির হাতে বেঁধে দিতে দিতে বলল , ” মনে রাখিস আমাকে দিয়ে রাখী বাঁধালি কিন্তু ,আজ থেকে আমি তোর বোন হই সম্পর্কে।

ছেলেটি : আগার মেরে বহেন বান্ধ্তি তো ইয়ে জরুর রাখী হোতা লকিন অব ইয়ে ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড হ্যয়।

মেয়েটি হেসে: বাহ্ ! কি অভাবনীয় কনসেপ্ট ! তোর মতই যাতাকলে পরা কেউ বোধহয় এই “ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড” ব্যাপারটা মাথা থেকে বার করেছিল।

ছেলেটি : Don’t say a word about the person ,he is the saviour of mankind.

মেয়েটি : সেই ! সম্পর্কের দই না বানালে আর ‘ saviour of mankind’ এর তকমা পাওয়া কিভাবেই বা সম্ভব।

ছেলেটি : দহি ? ইউ মিন মিষ্টি দহি ? auntyজি নে লাই হয় কয়া ?

মেয়েটি : ধুর তেরি ! একটু কঠিন কিছু বললেই হলো ব্যাস বাংলা ভাষার একেবারে সৎকার করে তবেই ছাড়বে।

ছেলেটি : যা না থোড়া মিষ্টি দহি লেকে আ মেরে লিয়ে।

মেয়েটি : কোনো দই টই নেই ,আর থাকলেও তোকে দিতাম না,আগে বাংলা শেখ তারপর বাংলার দই খাবি।

ছেলেটি :আজ রাখী কে দিন ,ফিরভি তু..

মেয়েটি : “রাখী কে দিন ” মানে কি ? এটা কি তোদের দিন নাকি ? এটা এখানে কে শুরু করেছিল জানিস ?

ছেলেটি : I know ,দ্যাট ইস Tagore .

মেয়েটি : যাক ! এটুকু জেনে রবীন্দ্রনাথের জন্ম সার্থক করে দিলি। হ্যা যেটা বলছিলাম, এই দিনটা রবীন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন আর যেহেতু উনি বাঙালি ছিলেন,তাই রাখীর দিন টা আমাদের মানে বাঙালীদের দিন যেটা তোরা অবাঙালীরা কপি করেছিস।

ছেলেটি নিজের হাতে বাঁধা রাখীর একটা ছবি তুলে মোবাইলে সেটা বোনের নম্বরে পাঠিয়ে বলল :অবাঙালীরা ? For you only two type of people exist in this world : বাঙালী ওর অবাঙালী ? রাইট ?

মেয়েটি : হ্যা তাই। পাঞ্জাবী ,গুজরাতি না মারওয়াড়ি এত চুলচেরা বিশ্লেষণে আমরা যাই না, বাঙালী নয় ব্যাস।

ছেলেটি : Don’t you think you people are too proud to argue ?

মেয়েটি : একটা বাঙালির শুরু করা ফেস্টিভালে এভাবে ছুটি নিয়ে মন্ডা মিঠাই খেয়ে ভাংড়া নেচে এনজয় করছিস ,আর সত্যি বললেই argument হয়ে যায় কি বল ?

ছেলেটির ফোন বেজে উঠলো ,ওপাশে বোনের কন্ঠস্বর : “হ্যাপি Rakhi ভাইয়া ,থাঙ্কস for sending picture wearing my Rakhi ,you look awesome ।”

মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ছেলেটি বোনকে হেসে উত্তর দিল “Be grateful to Rabindranath ,It’s all about him ,otherwise the picture would not exist as well as Rakhi ,I doubt if we ,I mean all ‘অবাঙালী’ nonsense people would exist or not “.

মেয়েটি রেগে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ভগবান ও জাতিস্মর

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ভগবানের সামনে দাড়িয়ে থাকা মৃত জাতিস্মর বলল : ” আপনি কিভাবে এটা করতে পারলেন ? শুধুমাত্র একটা জন্মের গ্লানি মানুষের কাছে কি ভীষণ অসহ্য আপনি জানেন না ? তা সত্বেও আমাকে আপনি এভাবে গত জন্মের স্ম্র্তি নিয়ে পুনর্জন্ম দান করে দিলেন ?

ভগবান : ওটা ভুল না ভেবে সুযোগ কেন ভাবছো না ?

জাতিস্মর :সুযোগ ?

ভগবান : হ্যা ,গত জন্মের ভুল গুলো শুধরে নেওয়ার সুযোগ।

জাতিস্মর : মোটেই না। আমি এঘরে ঢোকার আগে শুনেছি আপনি নিজের মনে নিজের করা ভুল আওরাচ্ছিলেন ,ভুলে যাবেন না আমি আর জীবিত মানুষ নই ,আমি এখন অশরীরী ,আপনার মত না হলেও আমারও কিছু বিশেষ ক্ষমতা আছে। নিজের ভুল স্বীকার করতে না পারলে আপনি কেমন ভগবান ?

ভগবান :তুমি বুঝতে ভুল করছো ,আসলে আমার তৈরী একটা যন্ত্র আমাকে আশানুরূপ ফল না দিয়ে বারবার অবাক করে দিচ্ছে । তাই সেই ক্যালকুলেশন টাই নতুন করে করার চেষ্টা করছিলাম।

জাতিস্মর : কিসের ক্যালকুলেশন?

ভগবান :আমার স্ম্র্তি যন্ত্রের ক্যালকুলেশন।

জাতিস্মর : স্ম্র্তি যন্ত্র টা আবার কি ?

ভগবান : আমার স্ম্র্তি যন্ত্রের পৃথিবীর দেওয়া নাম মস্তিষ্ক।

জাতিস্মর : ওটাই তো যত গন্ডগোলের মূল। আপনার ক্যালকুলেশনের ভুলের খেসারত কত লোক দিচ্ছে জানেন ? এভাবে অঙ্কে কাঁচা হলে কি আর ভগবান হওয়া যায় ?

ভগবান :আহ ! বিব্রত কোরো না,সকালবেলা ২ ঘন্টা ছাড়া আমি কোনো অভিযোগ শুনি না। এখন তুমি এসো। আমি ভুল টা কোথায় আবার বোঝার চেষ্টা করি ।

জাতিস্মর : আসবো মানে ? আপনার যমদূতের কাছে শুনলাম আমার আবার পুনর্জন্ম হবে। আপনার যন্ত্রের ডিফেক্ট না ঠিক হলে আমি আর কোনো রিস্ক নিতে চাই না। নাহলে এবার ২ জন্মের স্ম্র্তি নিয়ে না জন্মে যাই আমি!

ভগবান :তা হবে না ,আমি তোমার হবু মস্তিস্কে নিজে হাতে “সকল অতীত বিনাশ” বোতাম টিপে দিয়েছি ,একেবারে খালি পরীক্ষা করে তবে ই হ্যান্ড ওভার দেওয়া হয়েছে।

জাতিস্মর : তবে আবার এখন কি করছেন ?

ভগবান : এটা অন্য ব্যাপার। তুমি বুঝবে না। তুমি এসো এখন। তোমার সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে।

জাতিস্মর : আমাকে একবার বলেই দেখুন না। আপনার ভুলের অসীম কৃপায় পরপর ২ জন্মের অঙ্কবিদ্যা আমি একবর্ণ ভুলিনি। আপনার সব ক্যালকুলেশন পারফেক্ট না করে দিলে আমার নাম শ্যামাচরণ চাটুজ্যে নয় ,হে হে লেটেস্ট জন্মের নাম টাই বললাম,আপনি এমনিতেই যা কনফিউসড ,আর করতে চাই না।

ভগবান : বেশ বেশ। তা গোলমাল টা হচ্ছে যন্ত্রের মেমরি আইডেন্টিফিকেশন ক্ষমতা নিয়ে। মানে যা মনে রাখার কথা তা মনে রাখতে পারে না আবার যা ভুলতে চায় বা ভুলে যাওয়া উচিত বলেই আমার বিশ্বাস ,তাই বেশী করে মনে রাখে।

জাতিস্মর : একবার reboot করে দেখুন না।

ভগবান : ধুর ,তুমি যাও তো বাছা। যতসব উল্টোপাল্টা।

জাতিস্মর : কেন ? ভুল বললাম ?

ভগবান : তুমি ২ জন্মে কি শিখেছ কে জানে ! আর যেই জানুক ভগবান তো জানে না। প্রতিবার নতুন জন্মের আগে আমি নিজে বসে যন্ত্র reboot করি , “সব অতীত বিনাশ” বোতামের ওটাই কাজ ! অসুবিধা হচ্ছে এটা সিলেক্টিভ বিনাশ করতে পারে না ,একবার করতে শুরু করলে একসাথে সব করবে যদি না মাঝখানে বিগড়ে যায় ,সেটা যদিও খুবই কম হয়,তবুও যন্ত্র যখন ,বিগড়ানো স্বাভাবিক সে ভগবানের বানোনো হলেও।

জাতিস্মর : তা আমি এত কি করে জানব ? আমার বেলায় তো আর আপনি “সব অতীত বিনাশ” করেননি।

ভগবান : শুধু একবার করতে পারিনি ,তাও করছিলাম,প্রায় শেষের দিকে ছিল,ডাক্তারের তাড়া থাকায় আগেই তোমাকে মায়ের পেট থেকে বার করে নিল।

জাতিস্মর : তা ঠিক ,মা বলেছিল বটে ,আমি প্রি ম্যাচিওর বেবি ।

ভগবান : যাইহোক তোমাকে আগেই বলেছিলাম ,ভুল না ভেবে ওটাকে সুযোগ ভাবো যদিও গত জন্মের ভুলের পুনরাবৃত্তি ছাড়া তুমি আর কিছুই করে উঠতে পারোনি।

জাতিস্মর :শুনুন অন্যের ভুলের খেসারত দিতে হলে আর সুযোগের সদব্যবহার করা যায় না,সে ডাক্তারের করা ভুল আর ভগবানের দেওয়া সুযোগ ,যাই হোক না কেন!

ভগবান :আহ ! বললাম না ,অভিযোগের সময় সকালবেলা দুঘন্টা।

জাতিস্মর : তার আগেই যদি আমার পুনর্জন্ম হয়ে যায়! বলা কি যায় ? আমার বর দান চাই।

ভগবান :মানে ? কি বরদান ? আর বরদান লাভের কি বা যোগ্যতা তোমার ?

জাতিস্মর : যোগ্যতার প্রশ্ন ছাড়ুন ,আমি অন্যের ভুলের শিকার। পেনাল্টি র বদলে বরদান। আমাকে দিতেই হবে। দিয়ে দিন ,আমি চলে যাচ্ছি।

ভগবান :মহা মুশকিল হলো তো ! এদিকে ক্যালকুলেশন টা …আচ্ছা তাড়াতাড়ি বলো কি চাই তোমার ?

জাতিস্মর :নতুন জন্মে এক অমোঘ শক্তি।

ভগবান : কি শক্তি ?

জাতিস্মর :”যখন যা চাইবো মুহুর্তে ভুলে যাবো। ” ব্যাস তাহলেই নতুন জীবন একেবারে দুঃখ কষ্টহীন,এক কথায় স্বর্গপ্রাপ্তির সুখ বুঝলেন কিনা ! তথাস্তু বলে দিন , এক্ষুনি চলে যাচ্ছি!

ভগবান রেগে উঠে দাড়িয়ে জাতিস্মরকে মুহুর্তে টেনে নিয়ে গেলো একটা বিশালাকায় জানলার কাছে ,জাতিস্মর অবাক হয়ে দেখছে একটা ক্লাস ঘর, অনেক ছেলে মেয়ে সেখানে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে ,তার মাঝে একজন শিক্ষকের কড়া পায়ে টহলদারী । জাতিস্মর কিছু বলার আগেই ভগবান কঠিন কন্ঠস্মরে বলল “ভালো করে তাকিয়ে দেখো শেষ বেঞ্চিতে বসা ওই ছেলেটার দিকে। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ হলো ,ও এখনো কিছুই লিখে উঠতে পারেনি ,ওর জল ভরা চোখের ভিতর উথালপাতাল প্রশ্নের ভিড় দেখতে পাচ্ছো ? ২ বছর আগে ক্লাসের এই সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটি একবার নয় বারবার চেষ্টা করে চলেছে পরীক্ষার শেষ দিন তাকে স্কুল থেকে নিতে আসার সময় দুর্ঘটনায় মৃত মায়ের স্ম্র্তি ভুলতে। কিন্তু পারছে কি ? কেন পারছেনা বলে তোমার মনে হয় ? আমি যে এই পাগলের মত দিনরাত নিজের মনে ক্যালকুলেশন আওরাচ্ছি তা কি আমার স্বভাব দোষ বলে তোমার বিশ্বাস ? এখনো যদি কিছুই বোঝার ক্ষমতা না থাকে ২ জন্ম কেন ,হাজার জন্মের স্ম্র্তিও মূল্যহীন। “

নিথর হয়ে দাড়িয়ে থাকা জাতিস্ম্ররের পাশ থেকে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে ভগবান বললেন , “প্রহরী! আমাকে এখন একা থাকতে হবে ,কেউ যেন কিছুতেই আমাকে বিব্রত না করতে পারে। “

তারপরের কথাগুলো ভগবান নিজের মনে আওড়ালেন তবুও অশরীরী শক্তিবলে জাতিস্মর শুনতে পেল ভগবান বলছেন “কোথায় একটা ছোট্ট ভুল এতবার দেখেও কেন যে কিছুতেই বুঝতে পারছি না ,যেভাবেই হোক আমাকে খুঁজে বার করতেই হবে , নাহলে যে ছেলেটা ….”

দোভাষী রবীন্দ্রনাথ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বাঙালী মেয়েটি (দ্রুত ঘরে ঢুকে ) : আমি তোকে বিয়ে করবো না !

পাঞ্জাবী ছেলেটি : কিউ ? ফির কয়া হো গয়া ? ম্যায়নে “লার্ন বেঙ্গলি ইন ৩০ ডেস ” বুক ভি পড়লি তেরে মুর্শিদাবাদ রহেনেয়ালি নানীমা সে বাত করনেকে লিয়ে। I know লাস্ট টাইম উনকে ‘ঘুম পেয়েছে ? ‘ সাওয়াল বিনা সামঝে আনসার মে ম্যয় আমেরিকা ,জাপান , অউর সব জাগা যাহা বিসনেস ট্রিপ কে লিয়ে গয়া থা গলতিসে বল দিয়া,ইসিলিয়ে মুজসে গুদসা হ্যয় তু। পর ম্যয় কিতনি বার মাফি তো মাঙ লি ,ফিরভি তু..

বাঙালী মেয়েটি: ওটা ছাড়াও অন্য কারণ আছে।

পাঞ্জাবী ছেলেটি : ও কয়া ?

বাঙালী মেয়েটি: : তুই রবীন্দ্রনাথ বুঝিস না।

পাঞ্জাবী ছেলেটি : রবীন্দ্রনাথ ? ইউ মিন রবীন্দ্রনাথ টেগোর ?

বাঙালী মেয়েটি: দেখলি তো ? তোর কাছে যা টেগোর আমার কাছে তা ঠাকুর। এই জন্যেই আমি ঠিক করে নিয়েছি তোকে বিয়ে করবো না ।

পাঞ্জাবী ছেলেটি : let me understand properly , ইংলিশ মে ঠাকুর কো লোগ টেগোর কহেতে হ্যায় ইসিলিয়ে তু মুঝসে শাদি নাহি করনা চাহাতি?

বাঙালী মেয়েটি: দেখেছিস তো ?কিরকম কিছুই বুঝতে পারিস না তুই ! সারাজীবন এভাবে উল্টো গনেশের সাথে আমি ঘর করতে পারব না। হ্যা ১৫ বছর আগে তোর আধো আধো বাংলা শুনে হাসি পেলেও এখন আর পাচ্ছে না ,বরং রাগে গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে।

পাঞ্জাবী ছেলেটি : Still I need a valid reason ,Only Tagore is just not acceptable .

বাঙালী মেয়েটি: What do you mean by only Tagore ?এতদিন একটা বাঙালী মেয়ের সাথে থেকে রবীন্দ্রনাথের আগে “ONLY” লাগানোর তোর সাহস হলো কি করে ?

পাঞ্জাবী ছেলেটি : টেগোরের আগে লাগিয়েছি ,ঠাকুরের আগে নয়।

বাঙালী মেয়েটি:আমার মত এরকম একটা মনেপ্রাণে বাঙালী মেয়েকে বিয়ে করার কোনো যোগ্যতাই তোর নেই। এটা তোর কাছে না হলেও আমার কাছে valid reason.এতদিনে বাংলার ‘ব’ ও ভালবাসতে পারলি না। আমি জানি শেষ দিন অব্দি ওই পাঞ্জাবের ‘প’ তেই আটকে থাকবি।

পাঞ্জাবী ছেলেটি :তুই ভুল জানিস ,I love রসগুল্লা। I just love it রে।

বাঙালী মেয়েটি: মিষ্টির নাম টা ‘রসগুল্লা’ নয় রসোগোল্লা। আর তোকে কে বলল শুধু ‘রসোগোল্লা’ খেতে ভাললাগলেই বাংলাকে ভালবাসা হয়ে গেল ?

পাঞ্জাবী ছেলেটি : আরো আছে, ফেলুদা ,ব্যোমকেশ এন্ড মাই ফেভারিট লালমোহন বাবু। সবকটা সিনেমা আমি তোর সাথে দেখেছি ভুলে যাস না।

বাঙালী মেয়েটি:নিচে ইংলিশ subtitle দেখে আমিও স্প্যানিশ সিনেমা দেখে থাকি। আমি আর জানিনা তোর পেটে পেটে কত বাঙালিয়ানা।

পাঞ্জাবী ছেলেটি :বাঙালিয়ানা কাকে বলে জানি না তবে , বাংলার খাবার খেতে ভালোলাগে ,বাংলায় তৈরী সিনেমা ভালোলাগে ,রবীন্দ্রনাথ বাংলায় না পড়লেও ইংরাজীতে পড়েছি বৈকি ,আর সেই ছোট্ট বেলা থেকে ভালো লাগে একটা বাঙালী পাগল মেয়ে যে এখন ঝগড়া করতে এতটাই ব্যস্ত যে এতক্ষণ খেয়ালই করেনি তার পাঞ্জাবী বন্ধুর ক্রমান্যয় বাংলা সংলাপ।

বাঙালী মেয়েটি:সত্যি তো।একদম খেয়াল হয়নি।তুই বুঝি শুধু আমার জন্যে বাংলা শিখলি ?

পাঞ্জাবী ছেলেটি : না। Only Tagore compelled me .

বাঙালী মেয়েটি (রাগের ভান করে ): তোর বাজে কথা শোনার সময় নেই আমার ,বিয়ের অনেক শপিং বাকি।

পাঞ্জাবী ছেলেটি : সে যা তবে “লার্ন বেঙ্গলি ইন ৩০ ডেস ” এর উপর কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে পারছি না। সেই তো তীরে এসে নৌকা ডুবি হওয়া এ যাত্রায় বাঁচালো।

বাঙালী মেয়েটি (হেসে): ওটা ‘তীরে এসে তরী ডোবা’ হবে। রবীন্দ্রনাথ আর ‘লার্ন বেঙ্গলি ইন ৩০ ডেস’ থেকে শেখা শব্দ কেমন চমৎকার গুলিয়ে ফেললি ,এই না হলে বাঙালী মেয়ের হবু পাঞ্জাবী বর !

Moment of Lifetime

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

৬৪ বছরের বাঙালী ভদ্রলোক তার বিদেশিনী স্ত্রীর সামনে একটা অনেক পুরনো ছবি ধরে বলল:

A Beautiful Lake , A Young Childish Girl smiling indefinitely looking at my camera , An ordinary but splendid afternoon ,What should it be called ?

৬৩ তে পা দেওয়া বিদেশিনী: তোমার কুবেরের সকল ধন রাশি যার কাছে তুচ্ছ ,”A Moment Of Lifetime”.

মুক্তি দে

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

একটা গোল করা কাগজের টুকরোর সরু দিকটা ঘুমন্ত তীর্থ র কানে ঢুকতেই ,তীর্থ বলল:”আহ ! সকাল সকাল এভাবে জ্বালাস না মৌনী ,আরেকটু ঘুমাতে দে প্লিস।”

একটা আদো আদো কন্ঠস্বর তার উত্তরে বলল ” মৌনী কে বাবা? আমি তো তাতান !”

তাতানের গলায় চমকে উঠে তীর্থ ওকে লেপের তলায় নিয়ে আদর করে বলল ,” আমার তাতান সোনা দেখছি ভীষণ দুষ্টু হচ্ছে দিন দিন !” তাতানের খিলখিল হাসির মধ্যে তীর্থ চোখ বুজে বালিশে মুখ চেপে নিজের মনেই বলে উঠলো :

“আর কত দিন ? মুহুর্তের জন্য হলেও এবার আমায় মুক্তি দে , দোহাই তোর! ”

সত্যি মিথ্যা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

রীনা : তুমি কি বিয়ের আগে কাউকে ভালোবেসেছো ?

অমল : না ! আর তুমি ?

রীনা : না।

কিছুক্ষণ পরে রীনা তার কাপড়ের বাক্সে সবচেয়ে তলার শাড়ির ভাজে রাখা চিঠি গুলোর উপর হাত দিয়ে মনে মনে বলল : আর সকলের মত আমিও চেষ্টা করব বাকি জীবনটা এই নতুন সংসার আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে কিন্তু আমার কাছে ভালবাসার মানে চিরকাল এই পুরোনো কাগজের টুকরো গুলোই থাকবে। এই সত্যি যে কাউকে বলার নয় , আমার অন্তরের মেয়েটা ছাড়া তো এ আর কেউ বুঝবে না।

রীনাকে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখে ঝাপসা চোখে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকা অমল একটা পুরনো রঙ ওঠা ছবি সযত্নে মানি ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে রাখল।

রীনা : তোমার চোখে কি জল ?

অমল (চশমা টা পরে নিয়ে অল্প হেসে ) : কই না তো। ওই চশমাটা খুললেই অসুবিধা, চোখের পাওয়ার টা বদলাতে হবে, এবার একটা ডাক্তার না দেখালেই নয়।

মৃত মানুষ ও যমদূত গোছের কেউ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

মৃত মানুষ : আমি ভগবানের সাথে দেখা করতে চাই।

যমদূত গোছের কেউ : ওনাকে দেখা যায় না ,উনি নিরাকার।

মৃত মানুষ :আকার না দেখা যাক ,সাদা আলখাল্লা ধরনের পোশাক অথবা গাড়ির হেডলাইটের মত চোখ ধাধানো আলো ,কিছু তো দেখা যাবে !

যমদূত গোছের কেউ : সে আবার কি ? নিরাকারের পোশাক কি প্রয়োজন আর এখানে কখনো অন্ধকার হয় না যে ভগবান নিজেই আলো হয়ে ঘুরবেন।

মৃত মানুষ : ও তাহলে বোধ হয় সবটাই বুজরুকি। সে যাই হোক ,আমার ভগবানের সাথে কথা বলা দরকার। উনি কথা তো বলেন নাকি তাও বলেন না ?

যমদূত গোছের কেউ : তা বলেন তবে জন বিশেষে ,এভাবে সবার সাথে নয়।

মৃত মানুষ : ও এখানেও বাছ বিচার ? সামান্য প্রশ্ন করতে হলেও আগে যোগ্যতা বিচার করতে হবে ?

যমদূত গোছের কেউ : তা তো বটেই ! ওনাকে প্রশ্ন যে খুশি করতে পারলেও উত্তর উনি জন বিশেষেই দিয়ে থাকেন।

মৃত মানুষ : তা কি সেই যোগ্যতা প্রমানের মাপকাঠি ? পাপ পুন্যের হিসেব ?

যমদূত গোছের কেউ : পাপ পুন্যের হিসেব বলে কিছু হয় না।

মৃত মানুষ : সেকি ? শুধু নরক যাবার ভয় কত ইচ্ছাই যে অপূর্ন রয়ে গেল। আর শুধু পুণ্য লাভের আশায় বুকে পাথর রেখে দান ধ্যানে কত অপচয় না করেছি ,আর আপনি এখন বলছেন পাপ পুন্য বলে কিছু হয় না!

যমদূত গোছের কেউ: আপনি ভুল করছেন। হিসেব মানে তো যোগ বিয়োগ তাই তো ? একটা ছাগল আর ২ টো ঘোড়ার মধ্যে কি যোগ বিয়োগ হয় ?

মৃত মানুষ :মানে ঠিক বুঝলাম না !

যমদূত গোছের কেউ: মানে মানুষের করা প্রতিটা পাপ অথবা পুণ্য একেবারে আলাদা সত্বা ! একে অপরের সাথে যোগ বিয়োগ করার জন্য সমগোত্রীয় হওয়া আবশ্যক। এই ধরুন ঠাকুমার আঁচারের বোতল থেকে আঁচার চুরি করার জন্য হওয়া পাপের সাথে সেই ঠাকুমাকে শেষ সময় একবারও না দেখতে যাওয়ার পাপের কিভাবে যোগ করা যায় তা ভগবানের জানা নেই! আবার ধরুন রাস্তার কুকুর কে বিস্কুট দেওয়ার পুন্যের থেকে কিভাবে স্ত্রী র পেটের কন্যা ভ্রুণ হত্যা করার পাপ কে বিয়োগ করা যায় তাও ভগবানের অজানা। তাই প্রথম দিকে চেষ্টা করলেও ভগবানের আর হিসাব কষা হয়নি।

মৃত মানুষ : তাহলে বিচার টা কিভাবে হয় ? তার থেকেও বেশি যেটা জানা জরুরী সেটা হলো কত সময় ধরে হয় ?

যমদূত গোছের কেউ: বিচার তো হয়ে গেছে ! তৎক্ষনাৎ , মুহুর্তে ! একি আপনাদের হাইকোর্ট সুপ্রিমকোর্ট পেয়েছেন নাকি ? নাটক দেখার অবসর আপনাদের থাকতে পারে মশাই ,ভগবানের নেই।

মৃত মানুষ : তবে এখন শুধু ই ফল প্রকাশের অপেক্ষা ? একটা কথা বলুন বিচার যখন হয়েই গেছে তখন অপরাধীর শাস্তিও তৎক্ষনাৎ হলে কি ক্ষতি হত ? ভগবানের বিচার তো সবাই টিকিট কেটে দেখতো মশাই ,সারাজীবন শুধু কথার কথা হয়ে থাকত না ব্যাপারটা ,আপনি নিশ্চই জানবেন পরলোক ব্যাপারটা অনেকেই এখনো ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি তাই ব্যাপারটা জীবদ্দশায় চালু করতে পারলে ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট র উপর চাপটা বেশ অনেকটাই কমত!

যমদূত গোছের কেউ: সবই তো বুঝলাম কিন্তু শাস্তি দেওয়ার জন্য যে যন্ত্র টা প্রয়োজন সেটা বেশির ভাগ মানুষই বিনা ব্যবহারে একেবারে খারাপ করে ফেলে ,তাই ভগবানের ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই। মাঝ রাস্তায় গাড়ি দাড় করিয়ে তো আর মেরামত করা যায় না মশাই , গ্যারেজ না করলে অতি বড় মেকানিকও যে ভীষণ অসহায় ! তাই পেট্রোল শেষ হবার অপেক্ষা ছাড়া কিছুই বিশেষ করার থাকে না, এখানে এলে সেই যন্ত্রকে আবার নতুন করে ইনস্টল করা হয় আর যেকোনো কাউকে শাস্তি দেবার আগে তার কার্যকারিতা ভগবান নিজের উপর পরীক্ষা করে দেখে নেন ।

মৃত মানুষ: কি সেই যন্ত্র ? আর পাপের শাস্তি টাই বা কি ?

যমদূত গোছের কেউ: যন্ত্রটার নাম হলো ‘বিবেক’ আর শাস্তির নাম হল ‘বিবেক দংশন’। অপরাধীর পাপের পরিমাপ অনুযায়ী নির্ধারিত হয় দংশনের তীব্রতা ! সামনে অপরাধের ফ্ল্যাশব্যাকের সাথে ক্রমান্যয়ে বাড়তে থাকে এই দংশনের ধ্রুপদী নৃত্য , জন বিশেষে কতক্ষণ চলবে তা মহাকালেরও অজানা , আমার মনে হয় ঠিক ততক্ষণ অব্দি যতক্ষণ না সেই অপরাধের শিকার হওয়াতে বেরোনো চোখের জলের শেষ বিন্দু টা পর্যন্ত মুক্তির বাষ্প হয়ে উড়ে যায়।

মৃত মানুষ (ঢোক গিলে ): সে তো অগনিত চোখের জল ,সমুদ্রের শেষ বিন্দু কোথায় তা কি আর কারো জানা আছে ! ইস ,আগে যদি একটু ধারণা থাকত ব্যাপারটা নিয়ে ! ‘বিবেকের দংশন’ তো নিদারুন যন্ত্রণা মশাই ,অনেক ছোটবেলায় আমার একবার হয়েছিল ,আমার অন্যায়ের জন্য যখন বড়দা মায়ের কাছে মার খেয়েছিল। সে দংশনের দায়ভার কারণে অকারণে সারা জীবনের অগণিত মুহুর্তে বয়ে বেরিয়েছি।

যমদূত গোছের কেউ: এখানে একেবারে ধুলো ময়লা হীন ঝকঝকে নতুন ইনস্টল করা বিবেক মশাই ,সদ্যজাত শিশুর নিষ্পাপ মুখের মতই সতেজ আর প্রানবন্ত,নিজের দোষ আড়াল করার কৌশল যার একেবারেই অজানা, এর দংশন একবার অনুভব করলে ওই সব আগুনের গহ্বর ,গরম তেলের কড়াই ,নরক নামক কাল্পনিক জায়গার জ্বালা যন্ত্রণাকে বেশ আরামদায়ক বলেই মনে হবে !

মৃত মানুষ : আচ্ছা ,ক্ষমা চাইলে কেমন হবে ? ভগবান তো শুনেছি খুব দয়ালু ,শাস্তি কম করে দেবেন নিশ্চই তাহলে একটু হলেও,কি বলেন ?

যমদূত গোছের কেউ:যার কাছে অপরাধ করেছিলেন তার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন কি ? সে যদি না করে থাকতে পারে তাহলে ভগবান কি করে করবে বলুন ,উনি বরাবরই ভীষণ ইনসেনসিটিভ!

মৃত মানুষ : আচ্ছা ,উনি নিজের উপর বিবেক যন্ত্রের কার্যকারিতা কিভাবে পরীক্ষা করেন ? ভগবান নিজেও কি পাপ করেন নাকি ?

যমদূত গোছের কেউ:এই ধরুন আপনার মতন মানুষকে সৃষ্টি করার দায়ভার কার ? সেই দংশনের ভাগীদার নিশ্চই আপনি বা আপনার জন্মদাত্রী মা নন !

মৃত মানুষ : তার মানে আপনি বললেন আমি খারাপ মানুষ ? আপনি জানেন আমি জীবন ভর কত কষ্ট করেছি ? হ্যা পাপ না হয় করেছি অনেক কিন্তু পুণ্যও তো কম করিনি।

যমদূত গোছের কেউ: আমি কিছুই জানি না। আপনি ভালো না খারাপ একটু পরেই ওই সামনের ঘর থেকে আসা আর্তনাদ বলবে ,তা সে খুশিরও হতে পারে অথবা ত্রাহি ত্রাহি রব ।

মৃত মানুষ : খুশির আর্তনাদ ? মানে পুণ্য ফল ?

যমদূত গোছের কেউ: হ্যা। তবে সেটা সবার জন্য এক। ভগবানের কাছে এর কোনো জন বিশেষে প্রকারভেদ নেই।

মৃত মানুষ : সেটা কিরকম যদি একটু বলেন।

যমদূত গোছের কেউ: যার জন্য সবচেয়ে ভীষন মুহূর্তেও এই কষ্টকর জীবনকে একবারও মুল্যহীন বলে মনে হয়নি ,কে যেন ভিতর থেকে বলেছে বারবার আপনাকে , এই জীবন না থাকলে তো সেও থাকতো না ,যার ক্ষনিকের সান্নিধ্য আপনাকে ভুলিয়ে দিত জীবনে অজস্র না পাওয়ার ক্ষোভ ! খিদের জ্বালায় , ব্যর্থতায় ,জীবনের প্রতিটা ক্ষণে , এমনকি মৃত্যুর পর পর্যন্ত যার মুখ আপনি একবারের জন্যেও ভুলতে পারেননি,সকল পুন্যের ফল স্বরূপ আপনি তার সঙ্গে কাটাতে পারবেন একটি সুখকর মুহূর্ত!

মৃত মানুষ : মাত্র একটি মুহূর্ত ? মাত্র একটি ?

যমদূত গোছের কেউ: মনে রাখবেন এখানে কিন্তু ঘড়ি নেই ,সময় এখানে চিরকাল নিশ্চল ,অপরিবর্তিত। তাই আপনার অজান্তেই ওই একটি মুহূর্ত ই হয়ে উঠবে চিরন্তন।

পছন্দের বই

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

জনৈক ভদ্রলোক : নমস্কার দাদা ! আপনি শুনেছি ভালো লেখেন।

লেখক: না সেরকম কিছু নয় ,ওই অল্প আধটু লেখার চেষ্টা করি আর কি !

জনৈক ভদ্রলোক : হে হে ! মানে আমার না খুব বই পড়ার সখ কিন্তু কোনো গল্পই আমার ঠিক মনের মত হয় না। কিসব ছাই ভস্ম চারিদিকে ! কখনো বিরহ বেদনা নাহলে রক্ত মাখা রাজনীতি অথবা সেই বস্তা পঁচা সুখ দুঃখ তা নাহলে চশমা পরা সখের ডিটেকটিভ ,ধুর ধুর ! তাই সবার মুখে আপনার খুব নাম শুনে আপনার কাছে এভাবে না বলে চলে এলাম ,আপনার এই ঘরে তো তাক ভরা বই ,একটা ভালো বই দিতে পারেন আমার মনের মত?

লেখক :তা আপনি কি ধরনের গল্প খুঁজছেন যদি খোলসা করে বলেন তাহলে একটু সুবিধা হয়।

জনৈক ভদ্রলোক : মানে হাসি কান্না ভরা বেশ একটা টান টান উত্তেজনাপূর্ণ রহস্য রোমাঞ্চকর কাহিনী যার শেষে প্রেমিক প্রেমিকার মিলন হবে, যাকে বলে হবেই,মশাই আপনাকে বলতে লজ্জা নেই বিচ্ছেদ টা আমি ঠিক মেনে নিতে পারি না।

লেখক (খাতা থেকে মুখ না তুলে ) : সোজা গিয়ে ডানদিকে।

জনৈক ভদ্রলোক (ঘরের ডানদিকে একটা বইয়ের তাকের সামনে দাড়িয়ে) : ডানদিকের তাকের কত নম্বর বইটা যদি একটু বলেন।

লেখক : উহু! সামনের রাস্তার সোজা গিয়ে ডানদিকে ! নতুন খুললে কি হবে ,বায়স্কোপ টা সবসময়ই প্রায় হাউসফুল।

ভগবান ভূত

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

প্রথম জন : তুই ভূতে বিশ্বাস করিস ?

দ্বিতীয় জন : হ্যা।

প্রথম জন : আর ভগবানে ?

দ্বিতীয় জন : হ্যা।

প্রথম জন : কোনটায় বেশি বিশ্বাস ?

দ্বিতীয় জন : এ আবার কেমন প্রশ্ন ? বলছি তো দুজনকেই বিশ্বাস করি।

প্রথম জন : তবুও ,বল না বেশি কাকে ?

দ্বিতীয় জন : চাপে পরলে ভগবানকে আর অন্ধকারে ভূতকে।

প্রথম জন : তোর কি মনে হয় ভগবান আর ভূতের মধ্যে কোনো লিঙ্ক আছে ?

দ্বিতীয় জন : তা আছেই তো , ভূতে ধরলে একমাত্র ভগবানই ভরসা আর ভগবানের সাক্ষাৎ পেতে ভূত হওয়া আবশ্যক।

প্রথম জন : দুজনের কাউকে কি দেখেছিস ?

দ্বিতীয় জন : না সে সৌভাগ্য হয়নি।

প্রথম জন : তবে বিশ্বাস করিস যে ?

দ্বিতীয় জন : অবিশ্বাস করলে তো কোনো লাভ নেই তবে বিশ্বাস করলে তারা যদি সত্যি থেকে থাকেন তবে আমার উপর তুষ্ট থাকবেন।

প্রথম জন : যদি ধর মরে গিয়ে দেখলি দুদলের মধ্যে একদম বনিবনা নেই। একজনকে ছেড়ে অন্যকে বিশ্বাস করেছিস বলে দুজনেই ক্ষেপে গেল তোর ওপর।

দ্বিতীয় জন : তা হবে না। যত ঝামেলা তলানিতে ,গদির উপরে বসা সবাই এক পরিবার ,নইলে ভাগের হিসেব কষতে অসুবিধা।

প্রথম জন : মানে রাজনীতি ? মরে গিয়েও রাজনীতি থেকে মুক্তি নেই বলছিস ?

দ্বিতীয় জন : কে জানে ? বলা কি যায় ? শুনেছি ঢেকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভাঙ্গে। যাওয়ার জায়গা যদি একটাই হয় এত ঢেকি একসাথে গিয়ে এতদিন কি একটা ধান ও আস্ত রাখবে ? তাই সব ভেবেচিন্তেই আমার এই সর্বতুষ্টি প্ল্যান।

প্রথম জন : ইয়ে বলছিস কিছুই বদলাবে না ? শুনেছি ওই দুনিয়ায় কোনো কিছুর অভাব বোধ হয় না।

দ্বিতীয় জন : সে তো এখানেও হয় না ,কতদিন থেকে যে একটা জিনিস তোর ,আমার ,আশেপাশের সবার থেকেও নেই ,কই কোনদিন তো অভাব বোধ হয় না।

প্রথম জন : বুঝলাম না তো ,ঠিক কি জিনিস বলত ?

দ্বিতীয় জন : ওই পিঠের মাঝে লম্বা একটা হাড় ,ডাক্তার রা কি যেন বলে ,ও হ্যা শিরদাঁড়া  ।

ইতি ভালোবাসা

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

মেয়েটি : শোন ! আজ থেকে তোকে আমি ভালবাসি না ,বলতে পারিস এই মুহূর্ত থেকে!

ছেলেটি :আচ্ছা।

মেয়েটি :কারণ জিজ্ঞাসা করবি না ?

ছেলেটি :না।

মেয়েটি :তবুও আমি বলছি। আমি চাই না এ নিয়ে তোর মনে কোনো প্রশ্ন থাকুক। আমি ভেবে দেখেছি বুঝলি ,তোর থেকে বরুন আমাকে অনেক বেশি ভালবাসে। অনেক অনেক বেশী। আমাকে সে দিনে কতবার ‘ভালোবাসি’ বলে তা গুনে শেষ করা যায় না। আমাকে কত উপহার দিয়েছে ,আমি কখন খেয়েছি, কতক্ষন ঘুমিয়েছি ,এই সব ছোট ছোট ব্যাপার নিয়েও তার চিন্তার শেষ নেই ,তার কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে বলে দিন রাত্রি সে যে শুধু আমার কথাই ভাবে ,আমি যে তার জীবন ,আমাকে ছাড়া সে বাঁচবে না। সে আগে যে মেয়েটিকে ভালবাসত ,সে তার ভালবাসার যোগ্য ছিল না ,তাই তো তাকে সরিয়ে দিয়ে বরুন আমাকে দিয়েছে তার নতুন ভালোবাসার সিংহাসন,আমার থেকে বেশী মূল্য তার আর কেউ দিতে পারবে না.।তাছাড়া তোকে ভালোবেসে আমি কি বা পেয়েছি ?ওই তাকে সাজানো নানান মলাটের সতীন দল ছাড়া? তুই কি বুঝিস ভালবাসার মানে ?

ছেলেটি :ভালবাসার মানে ? তা আর বোঝার অবকাশ কোথায় পেলাম ?তার আগেই তো সে গিলে খেয়ে নিল আমাকে।

মেয়েটি :কি যে বলিস কিছুই বুঝি না ,ওই বই পড়ে পড়ে মাথাটা একদম খারাপ হয়ে গেছে। যাইহোক,তুই চাইলে এখনো আমাকে আটকাতে পারিস ,তুই যদি আমাকে বরুণের চেয়েও বেশি ভালবাসতে পারিস , তাহলেই আমি আর তোকে ছেড়ে যাব না। ভেবে দ্যাখ,পারবি কি ?

ছেলেটি :না । এতদিন যখন পারিনি ,ভবিষ্যতেও পারব বলে মনে হয় না। তাছাড়া আমার ভালবাসা মাপার যন্ত্র টা একদম বিকল ,তার বেশী কমের কাটা আর নড়ে না ,সবসময় কেমন স্থির হয়ে একজায়গায় দাড়িয়ে থাকে।

মেয়েটি :তার মানে তুই আর আমাকে ভালোবাসিস না ? সেই জন্যই আমার থাকা না থাকাতে কিছুই যায় আসেনা তোর!

ছেলেটি (অল্প হেসে ) : বলতে পারিস তোর থাকা না থাকায় আমার ভালবাসার কিছু যায় আসে না। সে যেমন আছে ,সবসময় তেমনি থাকবে।

মেয়েটি :একই রকম থাকবে ? আমি চলে গেলেও একই রকম থাকবে? তা কি করে হয় ?

ছেলেটি: তা জানি না ,তবে এটুকু জানি তাকে জোর করে সরিয়ে দেওয়ার সাধ্য আর সকলের মত আমারও নেই!

মেয়েটি:আমি বরুণের কাছে চলে গেলে কি তুই অন্য কাউকে ভালোবাসবি ?

ছেলেটি: না ! ভালাবাসার মুখ বদলের উপায় আমার জানা নেই।

মেয়েটি:তাহলে কি আমার ফিরে আসার অপেক্ষা করবি?

ছেলেটি: না ! তবে কোনদিন যদি ফিরে আসিস ,আমাকে এখানেই দেখতে পাবি ।কতদিন জানিনা কিন্তু এটুকু জানি এ দেহ থেকে ওত সহজে আমার মুক্তি নেই।

মেয়েটি:কিন্তু একা একা কি করে থাকবি তুই ?তোর জন্য তো আমার খুব চিন্তা হচ্ছে।

ছেলেটি:একাকিত্ব কারো মৃত্যুর কারণ বলে তো শুনিনি নাহলে এতগুলো বছর পৃথিবীতে আমার মত মানুষের কাটে কিভাবে ?

মেয়েটি:কিন্তু আমি যে শুনেছি একা থাকার বড় যন্ত্রণা ,তুই কি পারবি তা সহ্য করতে? না পারলে যে আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।

ছেলেটি: ওত ভাবিস না। আমি চাইলেও একটা মুখ ,অনেক স্মৃতি ,এই তাকের সাজানো বইগুলো, কিছুতেই আমাকে একা থাকতে দেবে না.জোকের মত আঁকড়ে ধরে থাকবে আমার শরীর মন।

মেয়েটি:মুখ ? কার মুখ ? আমার ?

ছেলেটি:না। ভালবাসার।

মেয়েটি: ভালবাসার বুঝি কোনো মুখ হয়?সেটা তো অনুভূতি মাত্র।

ছেলেটি:হয় বৈকি !বরুণের ঘরের আয়নার সামনে দাড়াস ,দেখতে পাবি।

মেয়েটি:আমি তবে চললাম ! এখনো কি বলবি না আমাকে তুই ভালোবাসিস ,আমাকে ছাড়া তুই বাঁচবি না ?

ছেলেটি :না.তুই ভালো থাকলেই আমার বাঁচার কারণের কোনো অভাব হবে না !

মেয়েটি:কথা দিলাম ,যদি কখনো আমার মনে হয় বরুন আমাকে ভালবাসে না আমি আবার তোর কাছে ফিরে আসার কথা নিশ্চই ভাববো ।

ছেলেটি :ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি সে ভাবার সুযোগ যেন সে তোকে কখনো না দেয়।

মেয়েটি:কেন? তুই চাস না আমি তোর কাছে ফিরে আসি ?

ছেলেটি :আমি তো অনেক কিছু চাই, আমি চাই পৃথিবী এই মুহুর্তে ধ্বংস হয়ে যাক ,কিন্তু তা হবে কি ?তবে চেয়ে কি লাভ ?

মেয়েটি:তবুও এক বার না হয় হাত পেতে দেখলি। যা চাস তা না পেলেও অন্য কিছু পাওয়ার আশায়।

ছেলেটি :হাত পাততে পারলে অনেক সমস্যার যে সমাধান হয়ে যেত সেই কবেই। সে যাক ,কিছু সমস্যা না থাকলে জীবনের কোনো মানে থাকে না।তোর মনে হয় দেরী হয়ে যাচ্ছে,বাইরে খুব বৃষ্টি পরছে ,একা যাস না।,চল শেষ বারের মত বৃষ্টি ভিজে তোকে বাড়ি পৌছে দিয়ে আসি।

মেয়েটি:শেষ বারের মত ?আর কখনো তুই বৃষ্টিতে ভিজবি না ?

ছেলেটি : তা কেন ?তবে সব বৃষ্টি তো চোখে দেখা যায় না।

বৃষ্টি ভেজা মেয়েটি (বাড়িতে ঢোকার আগে ):আমাকে কি তুই ভুলে যাবি ?কখনো কোনদিন ,এক মুহুর্তের জন্য আর আমার কথা মনে পরবে না ?

বৃষ্টি ভেজা ছেলেটি (অল্প হেসে) :ভুলতে পারলে নিশ্চই মনে পরবে। আমি এগোলাম। আর এখানে দাড়িয়ে থাকা আমার ঠিক হবে না।ভালো থাকিস।

 

তিতাসের সুখের সন্ধান

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বার বার ফোনের শব্দে তিতাসের বিরক্তি যেন এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল! ফোন টা সাইলেন্ট করে ডেস্ক থেকে উঠে হাতে কফি নিয়ে করিডোরের জানলার সামনে দাড়ালো সে! সামনে রাস্তার অগনিত চলন্ত গাড়ি র দিকে তাকিয়ে তিতাসের মনে হলো সবকিছু যেন কিছুক্ষণের জন্য একদম থেমে যায় ,সবকিছু মানে সবকিছু !এই ব্যস্ত দৈনন্দিন জীবন ,আশেপাশে বসে থাকা মানুষ গুলোর অবান্তর বাক্যালাপ , তার জীবনের ওপর চারিদিকের এই নতুন প্রযুক্তির নিরন্তর টহলদারী ,সব কিছু থেকে যেন মুহুর্তের জন্য হলেও মুক্তি চায় তিতাস!

হঠাৎ বর্ণালী দি তার পিঠে হাত রেখে বলল ” কিরে তিতাস! এখানে একা একা দাড়িয়ে আছিস যে ? মন খারাপ ?”

একদম কথা বলতে ইচ্ছা করছে না তিতাসের আর বিশেষ করে বর্ণালী দির সাথে তো নয় ই , অন্যের জীবনের ওপর সবসময় বর্ণালী দির এই অদম্য কৌতুহলের কোনো কারণ এতদিনেও খুঁজে পায়নি তিতাস !

যথাসম্ভব ভদ্রতার হাসি মেখে সে জবাব দিল , “কই না তো ! এই একটু ক্লান্ত বলতে পারো !”

এবার বর্ণালী দি তিতাসের অনেকদিনের চেনা সবজান্তার হাসি মেখে বলল , ” আমি সব শুনেছি রে তিতাস! এবার তোদের টিমে নীলিমা আর শুভঙ্কর ছাড়া আর কারোর প্রমোশন হয়নি ,আমি জানি তুই ওদের চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য কিন্তু তোর নিশ্চই জানতে বাকি নেই নীলিমার সাথে বড়কর্তার মাখামাখির কথা আর শুভঙ্করের কথা যদি বলিস ,ও তো শুনেছি বড়কর্তার রোজের ফাই ফরমাস অব্দি খেটে দেয় ! তাহলে কেন তুই এই নিয়ে বেকার এত মন খারাপ করছিস ?”

এবার চেষ্টা করেও তিতাস আর হাসতে পারল না ,বর্ণালী দির দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি তো তোমাকে আগেই বললাম বর্ণালী দি ,আমার মন খারাপ নয় ! নীলিমার সাথে আমার খুব ই অল্প কথা হয় ,কাউকে না জেনে তার চরিত্র নিয়ে কোনো মন্তব্য করা অন্যায় হবে আর শুভঙ্করের সাথে আমি অনেকদিন কাজ করছি ,শুধু colleague বললে ভুল হবে ,ও আমার খুব ভালো বন্ধু,তাই ওর প্রমোশন পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে অন্য কারো থাকতে পারে কিন্তু আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই ! ”

বর্ণালী দি আবার কিছু বলতে যাওয়ায় তিতাস একটু হেসে বলল , ” এখন আমাকে ডেস্ক এ ফিরতে হবে বর্ণালী দি ,একটা মিটিং আছে একটু পরে ,আবার পরে কথা বলছি তোমার সাথে! ”

অফিস বাসে র জানলা দিয়ে বাইরে দেখতে দেখতে তিতাস আবার ভাবনায় তলিয়ে গেল ! রোজকারের একঘেয়েমি নিয়মের ঘেরাটোপে নিজেকে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলছে তিতাস ,তার নিজের মত বাঁচতে চাওয়া মন যে কি পেলে খুশি হবে ,এত চেষ্টা করেও তার উত্তর কিছুতেই সে খুঁজে পায় না ! ভালো রেসাল্ট র পর ভালো চাকরি , সচ্ছল আর্থিক অবস্থা , অল্প সময়ে পাওয়া এত সাফল্য তিতাসকে তার বয়সী অনেকের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে নিয়ে গেছে ! তবুও কেন কোনোকিছুই মিটিয়ে দিতে পারে না তার মনের সেই অজানা অদৃশ্য আকাঙ্খাকে ! বর্ণালী দির কথা অনুযায়ী এবারে প্রমোশন না পাওয়াই যদি তার মন খারাপের কারণ হয় ,তাহলে এর আগে যখন প্রমোশন পেয়েছে সে , সেই খুশির হাসিতে আশেপাশের সকলে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিয়ে আশ্বাস দিলেও , একটি বার ও কেন সে সাড়া পায় নি তার ভিতরের মেয়ে টার থেকে !একমাত্র বাবা ই তার এই নিরন্তর অস্বস্তি বুঝতে পেরে বলে,

“মনের খিদে মেটানো কি আর অত সহজ রে মা ? বেশির ভাগ মানুষ ই তো সেই খিদের সাথে আপোস করে কাটিয়ে দেয় সারা টা জীবন ! কিন্তু তুই চেষ্টা ছাড়িস না ! শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খুঁজে বেড়াতে থাক কিসে তার মুক্তি ,কোথায় তার চিরন্তন আনন্দ ,হাতে সময় যে খুব কম !”

শনিবারের সকালে তিতাসের ঘুম ভাঙ্গলো ফোনে সমুদ্রের গলার আওয়াজে , ” উঠুন Madam! সূর্য দেবের উপর কৃপা করুন এবার !”

তিতাস চোখ না খুলেই হেসে বলল ” তুই বাড়িতে এসেছিস বুঝি ?”

সমুদ্র : ” তা নয় তো কি ? তোর মত তো বাড়ি তে থেকে আরামের ১০ টা – ৫ টা অফিস না আমার , সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয় কোনো রকমে মেসের খাবার গলা দিয়ে নামালেও শনি রবিতে আর পারলাম না ,তাই ভোর ভোর চলে এসেছি বাড়ি ,মা র হাতের রান্না খেতে ! ছাপোষা ,অতিসাধারণ ,ঘরকুনো বাঙালি আমি ,বুঝলি কিনা !”

তিতাস (এবার চোখ বুজে আবার পাশ ফিরে শুয়ে বলল ) : ” সবই তো বুঝলাম ,শুধু অতিসাধারণ বিশেষণ টা IIT খরগপুর থেকে পিএইচডি করছে যে ছেলে ,তাকে মানায় না ! ”

সমুদ্র (প্রচন্ড হেসে) : ” তাই বুঝি ? তোর কি তবে আশেপাশের ডিগ্রী ধারী সব মানুষ কেই খুব অসাধারণ বলে মনে হয় ? যত বেশি তাগড়াই ডিগ্রী ,অসাধারণের দৌড়ে তত বেশি উচুতে তার সিংহাসন ,তাই তো ? ”

তিতাস : ” অসাধারণ না হলেই যে অতিসাধারণ হতে হবে তার কি কোনো মানে আছে সমুদ্র ? মাঝামাঝি বলেও তো একটা কথা হয় !”

সমুদ্র : ” বাহ! একটা যন্ত্র বানালে হয় ! ভাবছি পিএইচডি র সাবজেক্ট টা বদলে দেব ,একটা অভিনব মানুষ বিচার করার যন্ত্র বুঝলি তিতাস ! সাধারণ মানুষের জন্য মানে এই ধর ব্যাচেলর ডিগ্রী ধারণ কারী দের জন্য, যন্ত্রের কাটা টা সবসময় মাঝ বরাবর থাকবে !একবার ভাব সেই উত্তেজনার মুহূর্ত , যন্ত্রে কেউ ডিগ্রী এন্ট্রি করছে :মাস্টার্স ,পিএইচডি ,পোস্ট পিএইচডি ,অনেক সাবজেক্ট এ পিএইচডি ,আর প্রচন্ড টেনসনে তাকিয়ে আছে যন্ত্রের কাটার দিকে , যন্ত্রের কাটা ঠিক কতটা টা ডানদিকে সরবে নাহলে কিভাবে পাবে সে বিশ্বদরবারে অসাধারনের সিংহাসন ! কপাল খারাপ মুর্খ গরিব মানুষদের জন্য যন্ত্রের কাটা বন্ধ ঘড়ির মত সবসময় বাদিকে ঘেষেই থাকবে , তাই এখনকার মতই তাদের হেট মাথা হেট ই থাকবে , আমার যন্ত্র ওদের জন্য নয় ,যতসব অতিসাধারনের দল ! কিছুই হবে না এদের !বার্ষিক রোজগার আর সম্পত্তির হিসেব দেবার সুবিধাও রাখব বুঝলি ,নাহলে নামকরা ব্যবসায়ী ,মন্ত্রিবর্গরা তো এই দৌড়ে পিছিয়ে পরবে ,তাদের রাগ আমার এই অভূতপূর্ব যন্ত্র টাকে ভালো বাজার করতে দেবে না ! ”

তিতাস (এবার হেসে ফেলে বলল) : ” হয়েছে ? সকাল সকাল ঘুম ভাঙিয়ে হল না শুধু ,এইসব বাজে বকে মাথা টা ব্যথা করে দিলি !এবার বল কি চাই তোর ? ”

সমুদ্র : “দেখা করবি ?আমার বাড়িতে চলে আসিস বিকেলের দিকে ,এই ধর ৬ টা ! ”

তিতাস : “আচ্ছা ,পৌছে যাব ,এবার ঘুমোতে দে আমাকে ,রাখলাম!”

সমুদ্রের মত কাছের বন্ধু তিতাসের খুব কম ই আছে তাই তার কোনো আবদারেই তিতাস না বলতে পারে না ! অগত্যা কথামতো সময়ে সমুদ্রের বাড়ি পৌঁছাল তিতাস।

সমুদ্রের মা দরজা খুলে খুব চেনা হাসি মেখে বলল ” ভিতরে এসো তিতাস ! বাপান আমাকে বলে গেছে তুমি আসবে ,একটু বসো ,ও চলে আসবে এখনি!”

(সমুদ্রের মা ওর ঘরের আলো জ্বেলে জানলা টা খুলে দিয়ে বলল) ” তুমি একটু বসো ,আমি চট করে সন্ধ্যে দিয়ে আসি !”

তিতাস (অল্প হেসে ) “আচ্ছা কাকিমা !”

সমুদ্রের মা চলে যেতেই তিতাস তাক থেকে একটা বই নিয়ে পাতা ওল্টাতে লাগলো , কিছুক্ষণ পর টেবিলের সোজাসুজি খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে দেখল সামনের মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছে !আরো যা দেখল তাতে তার মনে হলো এখনি সে সমু দ্রের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে , আর এক মুহূর্ত অপেক্ষার কোনো মানে হয় না ! তিতাস ব্যাগ টা নিয়ে বেরোতে যাবে তখনি সমুদ্রের মা হাসিমুখে একটা মিষ্টির প্লেট নিয়ে ঘরে এসে ঢুকলো !

প্লেট টা তিতাসের সামনে রেখে বলল “এটুকু খেয়ে নাও !আর বোলো না ,গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তো ছেলের কোনো পাত্তাই নেই ,ফোনেই কথা হচ্ছিল ,বলে কি একটা রিসার্চ এর কাজে ব্যস্ত তাই আসতে পারছে না ,তাই যথারীতি মন টা খুবই খারাপ ছিল কদিন ,আজ একেবারে ভোরবেলা দরজা খুলে দেখি মূর্তিমান না বলে কয়ে এসে হাজির , এমন ভাবে জড়িয়ে ধরল এতদিনের জমে থাকা রাগ আর দেখাতেই পারলাম না ! আমাকে বলে কি আমার হাতের খাবার জন্য মন কেমন করছিল তাই সব ছেড়ে পালিয়ে এসেছে ! হ্যাঁ ! তাই আর কি ! ও বোঝালেই আমি বুঝব ! মাকে ঠকানো র চেষ্টাই শুধু করা যায় , নিজের পেটের ছেলেকে চিনতে যেন আমার এখনো বাকি আছে ! ঠিক যা ভেবেছি ! , একটু পরই পাড়া র ক্লাবের ছেলেদের হাক ডাক ” ও কাকিমা! বাপান দা আসেনি ? ১৫ ই আগস্ট র ম্যাচ আছে তো !”

ও মনি দেখি মূর্তিমান জার্সি পরে নিচে এসে বলে ‘মা একটু ঘুরে আসি বুঝলে ! এসেই যখন গেছি আর ওরা এতবার ডাকছে আমাকে ,একবার না যাওয়া টা অন্যায় হবে ! তোমার ভয় নেই ,এবার পা মচকালে আর চুন হলুদ লাগবে না ,দারুন স্প্রে কিনে এনেছি আমি !”

সামনে দাড়িয়ে থাকা পাড়ার ছেলেদের মুখ চিপে হাসি দেখে আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না কিছু ! কিন্তু পাগল ছেলের মা রা তো বরাবরই আমার মত অসহায় তিতাস ,এখন আবার সেই হাত পা ভেঙ্গে ফিরে আসার অপেক্ষা ছাড়া কিছুই করার নেই !”

তিতাস (এবার হেসে জানলার দিকে তাকিয়ে বলল) ” আজ হাত পা অক্ষত আছে বলেই মনে হয় কাকিমা ,নাহলে ভাঙ্গা হাত পা নিয়ে এইভাবে বাদর নাচা সম্ভব হত না !”

সমুদ্রের মা জানলা দিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল “দেখেছ কান্ড ! বয়স টাই বেড়েছে শুধু !”

সমুদ্র কাদা জামায় হাতে একটা কাপ নিয়ে হাফাতে হাফাতে ঘরে ঢুকে টেবিলে বসে বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা তিতাসের সামনে কাপ টা রেখে বলল ” আমাদের ক্লাব আজ ৩ গোলে জিতে চ্যাম্পিয়ন তিতাস !আর আমি ২ বছর পর আবার ম্যান অফ দ্য ম্যাচ ! আমি তোকে বলে বোঝাতে পারব না এই মুহুর্তে আমার মনের অবস্থা !”

তিতাস হাত ঘড়িতে সময় টা দেখে নিল , রাত ৭ : ৩০ ! তারপর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে জোর করে হেসে বলল “বাহ ! অভাবনীয় সাফল্য! Congratulation!”

সমুদ্র তিতাসের রাগ বুঝতে পেরে বলল “সরি রে ,খুব দেরী হয়ে গেল ! মা বলেই বোধহয় তোকে

এতক্ষ ন বসিয়ে রাখতে পেরেছে , নাহলে জানলা দিয়ে আমাকে খেলতে দেখার পর , হাসিমুখে আমার অপেক্ষা করার মেয়ে তো তুই নস তিতাস! নয় নয় করে হলেও অন্তত ১৫ দিন আমার ফোন ধরতিস না ! বিশ্বাস কর আমি বুঝতে পারিনি এত দেরী হয়ে যাবে ,আসলে ফাইনাল ম্যাচের ওভারটাইম টা সব হিসেব গন্ডগোল করে দিল !”

তিতাস যথাসম্ভব রাগ চেপে নির্বিকার ভাবে বলল ” তুই শুধু শুধু পিএইচডি করে নিজের সময় নষ্ট করছিস সমুদ্র , ফুটবলে তো শুনেছি এখন ভালো খেলোয়ারের খুব অভাব !”

সমুদ্র বিদ্রুপ টা বুঝেও না বোঝার ভান করে বলল ” এসব বাজে কথা কে বলল তোকে ? ফুটবলে ভালো দলে চান্স পাওয়া পিএইচডি করার থেকেও অনেক বেশি কঠিন ,পিএইচডি পড়াশোনা র ইচ্ছা আর ধৈর্য্য থাকলেই করা যায় ,কিন্তু ভালো ফুটবল খেলতে হলে জন্মগত প্রতিভা লাগে, বুঝলি ? ”

তিতাস (একইরকম নির্বিকার ভাবে জবাব দিল): “আমি সেটাই তো বলছি সমুদ্র ! প্রতিভা যখন তোর আছে ,সেটা ঠিক জায়গায় ব্যবহার কর!”

সমুদ্র এবার অল্প হেসে বলল ” আমার তো সেই প্রতিভা নেই তিতাস,কোনদিন ছিল ও না ! তবে প্রচন্ড এক ভালবাসা আছে ,তাই খেলি ! ফুটবল মাঠের মত আনন্দ আমি যে আর কোনো কিছুতেই পাই না রে ! পিএইচডি আমার পেটের খিদে মেটাবে ঠিকই কিন্তু আমার মনের খিদের কি হবে ! তার ব্যবস্থা ও তো আমাকেই করতে হবে ,নাহলে তো এই যান্ত্রিক জগতে আমি বাঁচতে পারব না !”

এবার তিতাস কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল,কেমন যেন সেই এলোমেলো চিন্তা গুলো আবার ঘিরে ধরল তাকে !

টেবিল থেকে উঠে সমুদ্রকে বলল ,”আমাকে এখন বাড়ি যেতে হবে সমুদ্র ,অনেক রাত হয়ে গেছে!”

সমুদ্র (কি বলবে কিছু বুঝতে না পেরে বলল) : ” তিতাস ,আমার ওপর আর রেগে থাকিস না please,আরেকটু অপেক্ষা কর ,আমি ২ মিনিটে স্নান সেরেই তোকে বাড়ি পৌছে দিয়ে আসবো ,আর রাস্তায় যেতে যেতে তোকে এতদিনের জমা কথাগুলো বলাও হয়ে যাবে !”

চিন্তায় মগ্ন তিতাস যেন শুনতেই পেল না সমুদ্রের কথাগুলো , শুধু বলল , “এখন আমি আসি রে সমুদ্র ! নাহলে সত্যি অনেক দেরী হয়ে যাবে !”

ঝড়ের বেগে সমুদ্রের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল তিতাস ,প্রায় এক নিশ্বাসে দৌড়ে বাড়ি ফিরে উদ্ভ্রান্তের মত নিজের পড়ার ঘরের আলমারি খুলে একটা পুরনো বাক্স টেনে বের করে আনলো !বাক্সের উপর জমে যাওয়া ধুলোগুলো সযত্নে হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তিতাস খুলে ফেলল বাক্স টা ,নিজের অজান্তেই চোখে ভিজে গেল তার নিজের লেখা বাক্সবন্দী কবিতার খাতা গুলো দেখে ! উচ্চমাধ্যমিকে অঙ্কে লেটার পায়নি তিতাস ,তাই অনেক ভালো কলেজেই সাইন্স বিভাগে জায়গা হয়নি তার আর এজন্যে প্রায় সকলেই দায়ী করেছিল তার সাহিত্যের ওপর অকারণ ভালবাসা কে, যা কিছুতেই তাকে সাফল্যের সহজ পথের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত না ! তার ওপর শিক্ষক দের অগাধ বিশ্বাস , মাধ্যমিকের মতই উচ্চমাধ্যমিকেও স্কুল র মুখোজ্বল করার প্রচন্ড আশা ,অনেক চেষ্টা করেও পূরণ করতে পারেনি তিতাস ,আর তার জন্যে আর সকলের মত সে নিজেও দায়ী করেছিল তার আলমারির তাকে সাজিয়ে রাখা শরৎচন্দ্র ,বঙ্কিম চন্দ্র ,বিভূতিভূষণ ,সত্যজিৎ রায় ,তারাশঙ্করের বইগুলোকে ! আর তার থেকেও বেশি অপরাধী হয়ে উঠেছিল তার এই কবিতার খাতাগুলো যার অনির্বার হাতছানি একদিনের জন্যও এড়াতে পারতনা তিতাস ,কোন এক মোহনী শক্তির টানে বিনা প্রতিবাদে সে হারিয়ে যেত এক অনন্ত শব্দ মিলের জগতে ! সে এক এমন অন্তহীন ভালবাসা র দুনিয়া যার নেশা তিতাস অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারেনি ! সেই অন্তরের ভালোবাসাকে সকলের চোখে কিভাবে অপরাধী হয়ে থাকতে দিত তিতাস ? তাই সকল যন্ত্রণা কে উপেক্ষা করে নিজের হাতে সে বাক্সবন্দী করে ফেলেছিল তার সকল ভালবাসার মুহূর্ত ,তার জীবনে সহজ সাফল্যের রাস্তা পরিষ্কার করতে তিতাস নিশ্চিত করেছিল তার নিজের সৃষ্টির এই অনন্ত নির্বাসন ! আর সত্যি তার পর আর কখনো পিছন ফিরে দেখতে হয়নি তিতাসকে ,এরপরের রেসাল্ট র দিনগুলোতে আর কেউ কোনদিন অপরাধী করতে পারেনি তার ভালোবাসাকে ! একের পর এক পাওয়া সাফল্য তিতাস কে কখন ভুলিয়ে দিয়েছিল সেই কিশোরী মেয়েটার নির্বাসিত ভালবাসার কথা! এতদিন পর সে বুকে জড়িয়ে ধরল আবার সেই হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে ! এক চিরন্তন শান্তি আর সীমাহীন আনন্দে তিতাসের চোখ দিয়ে বয়ে চলল ভালবাসার সমুদ্র!

হঠাৎ বাবা কে ঘরে ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে নিল তিতাস। তারপর নিজেকে সামলে বাবাকে বলল “ওই একটা পুরোনো জিনিস খুঁজে পাচ্ছিলাম না তাই এই বাক্স গুলো একবার নামিয়েছিলাম ,আমাকে কিছু বলবে তুমি ?”

তিতাসের বাবা (অল্প হেসে বলল )” আমি জানতাম সেই হারিয়ে যাওয়া জিনিস কোথায় আছে ! কিন্তু কি জানিস মা ,কিছু জিনিস যে শুধু নিজেকেই খুঁজে পেতে হয় ,অন্য কেউ তার সন্ধান বলে দিলে সত্যিকারের খোঁজের ওপর অবিচার করা হয় যে !”

তিতাস আর কান্না চেপে রাখতে পারল না ,বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল “আমি এই অচেনা জগতে আর কিছুতেই নিজেকে হারিয়ে যেতে দেব না বাবা ,তোমার তিতাস এখন জানে তার মন কি চায় ,কিসে তার আনন্দ ,কোথায় তার মুক্তি! শুধু একটু দেরী হয়ে গেল এই যা !”

বাবা এবার জোরে হেসে উঠলো ,তারপর তিতাসের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল “ধুর! বোকা মেয়ে ,নিজের অন্তরাত্মা র সুখের চাবি যে কোথায় লোকানো ,সেই তো আমাদের এই ছোট্ট জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য ,জীবনের শেষ দিনেও তার সন্ধান পাওয়াকে কিছুতেই যে দেরী বলা চলে না। ”

ধন্যবাদ ,

রোমি

ফিরব আবার

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

একটা খুব চেনা গলার স্বর : মিলি ফুচকা খাবি ? মুন্না কাকুকে বলে প্রচন্ড ঝাল দিয়ে মাখিয়েছি ,পাগল করা স্বাদ হয়েছে রে!

মিলি চিৎকার করে বলল : তেঁতুল জলে লেবুটা ঠিক আছে কিনা একবার দেখে নে, আমি আসছি এখনি।

মিলি দৌড়ে বারান্দায় আসতেই মেয়েটি ওর হাত চেপে ধরে বললো  : শোন ! আমি কুল আর চালতার আচারও কিনে এনেছি বুঝলি ! ফুচকা খেয়েই আমরা ছাদে চলে যাবো,কুলের বীচি মুখ থেকে দূরে ছুঁড়ে ফেলার কম্পিটিশনে আজকে আমি তোকে হারিয়েই ছাড়বো। আগের বার হাওয়ার পার্শিয়ালটির জন্যই তো তুই হারতে হারতেও জিতে গেলি।

(মিলি হেসে) : সে না হয় হবে কিন্তু তুই আচার টা দিলীপ কাকুর থেকে এনেছিস তো ? পাশের নতুন লোকটা কিন্তু একদম ভালো বানায় না।

(মেয়েটি) : না তো কি ? ১৫ মিনিট লাইনে দাড়িয়ে থেকে “কাকু ,আমাকে এবার দাও প্লিস” বলতে বলতে গলা শুকিয়ে যাবার পরই হাতে পেয়েছি এই অমৃত ,মাছি মারা লোকের কাছ থেকে ভ্যাজাল কেনার শর্টকাট আর যেই করুক এই শর্মা মরে গেলেও করবে না।

(মিলি):আমার কাছেও একটা জিনিস আছে ,কালকে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় বাবা ট্রেন থেকে কিনে এনেছে :টক ঝাল মিষ্টি হজমি গুলি। একটা মুখে দিলেই রত্না মিসের সব গালাগালি মাথা থেকে একেবারে কর্পুরের মত উবে যাবে।

(মেয়েটি ): বলছিস ! তাহলে তো আর কথাই নেই ,ওহ মিলি আরো আছে ,আজকে বিকেলে কাকাই বলছে নুন লঙ্কা দিয়ে বাতাবিলেবু মাখবে ,কোনরকমে এগুলো শেষ করেই তোকে নিয়ে এক নিমেষে পৌছে যাবো আমাদের বাড়ির রান্নাঘরে।

(মিলি): উফ ! ভেবেই গায়ে শিহরণ দিচ্ছে এখনি ,সত্যি কাকাই এর হাতে যে কি আছে ,বাতাবি লেবুই বল অথবা শসা কুচি, নাহলে তোদের গাছের ডাসা পেয়ারা ,সব কিছুই কাকাই এর হাতের জাদুতে অসম্ভব রকম লোভনীয় হয়ে ওঠে,সে লোভ এতটাই দুর্নিবার যে পরদিন সকালে ঘন্টার পর ঘন্টা বাথরুমে বসে থাকার কষ্টের স্মৃতি যতই স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে আসুক না কেন ,তা এক মুহুর্তের জন্যও কাকাই এর থালা থেকে আমার হাতকে দূরে রাখতে পারে না।

(মেয়েটি মিলির কানের মুখ এনে বলল): মুন্নাকাকুর তেঁতুল জলের হাঁড়িটা এখনো অর্ধেকের বেশী ভর্তি ! ঝাল বাতাবি লেবুর সাথে তেঁতুল জল চুমুক দিয়ে খেতে যা লাগবে না !

(মিলি) : আহা ! তুই যেন জানিস না ! মুন্না কাকু একের বদলে দুটো ফুচকা ফাউ দিলেও শেষ পাতে তেঁতুল জল চাইলেই নোংরা দাঁত করে বলে  “ফুচকার আগে জল ফুরিয়ে গেলে ব্যবসার ক্ষেতি হবেগো দিদিমনি !”

(মেয়েটি ): আরে ! জানি বলেই তো বলছি । ফুচকার আগে জল ফুরিয়ে গেলে তবে তো ক্ষতি  কিন্তু অন্যটা হলে তো কোনো ক্ষতি নেই বরং লাভ , আমাদের ! বাক্সতে বড় জোর আর পঞ্চাশ টা ফুচকা পরে আছে ! তা তো আমরাই  ! ….

(মিলি) : কিন্তু ভিতরে তো আরো থাকতে পারে !

(মেয়েটি): নেই ! তুই আসার আগেই সে তদন্ত শেষ !   “এবাবা! এই কটা ফুচকা মাত্র! ”  বলতেই মুননাকাকু মুখ কাঁচুমাচু করে বলল “সকাল থেকে মেঘের গজরানি দেখে বিষ্টির ভয়ে আজ কম ভাজছি দিদিমণি , দ্যাখেন তো কত খেতি হল !”

(মিলি  হেসে ) : ফেলুদা বই থেকে বেরিয়ে এসে নিশ্চই আজ তোর পিঠ চাপড়ে যাবে ! আমি  ভিতর থেকে  চটপট একটা বাটি নিয়ে আসি।

(মেয়েটি ): সবচেয়ে বড় বাটিটা আনিস কিন্তু !
(মিলি) : সে আর বলতে ! তুই দাঁড়া ..
……(দূরে চলে যাওয়া পায়ের শব্দ )……………………

(মেয়েটি): কিরে আর কতক্ষণ ? কি করছিস বল তো ? তাড়াতাড়ি আয় না মিলি ,মুন্না কাকুর যে দেরী হয়ে যাচ্ছে।

(মিলি চিৎকার করে বলল) : যাই !

হঠাৎ ঘড়ির এলার্মের শব্দে বিছানায় উঠে বসলো মিলি । ঘড়িতে তখন সকাল ৮ টা । ফোনের ক্যালেন্ডার মনে করিয়ে দিল অফিসে ৯.৩০ থেকে তার জরুরি মিটিং। দ্রুত স্নান সেরে তৈরী হয়ে টিফিন বক্সে ভরে নিল গত রাতের বানানো পাস্তা। তাড়াতাড়ি গাড়ি চালিয়ে অফিস পৌছে মিলি দেখল সবে ৯:১০ বাজে,মিটিং শুরু হতে এখনো কুড়ি মিনিট বাকি। ব্যাগ টা ডেস্কে রেখে , মোবাইল ফোন টা হাতে নিয়ে একটা নম্বর ডায়াল করলো সে , খুব চেনা গলার ‘হ্যালো’ কথাটা ফোনের ওদিক থেকে ভেসে আসতেই মিলি বলল : ” এই রিনি ! ওইসব সংসার টংসার ছাড় দেখিনি ! একদিন না হয় নিজের ভাত ওদের নিজেদেরই রাঁধতে দে ,তুই আমার সাথে চল এখনি ,মুন্না কাকুর যে সত্যি অনেক দেরী হয়ে যাচ্ছে। “

রিইউনিয়ন

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

তিন্নি আর সৃজা আজ একসাথে যাবে ওদের স্কুলের রিইউনিয়নে ! প্রথমে কিছুতেই রাজী হয়নি তিন্নি কিন্তু সৃজার নাছোরবান্দা জেদের কাছে শেষমেষ তাকে হার মানতেই হলো ! তিন্নি র বন্ধু বলতে বরাবর ওই একটাই নাম “সৃজা” তাও সৃজার একার চেষ্টা তেই বোধহয় এতদিন টিকে আছে এই ছোটবেলার বন্ধুত্ব ! তিন্নি যে সৃজার থেকে একদম আলাদা,সে অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই পারে না সৃজার মতন অমন সহজ সরল ভাবে সকলের সাথে মন খুলে গল্প করতে !স্কুলের শেষ দিনের পর তিন্নির সাথে কারোর কখনো কথা না হলেও সে জানে ,সৃজার সাথে স্কুলের অনেকের ই নিয়মিত যোগাযোগ আছে ,আর থাকবে না ই বা কেন ! সৃজার মত এত সুন্দর আর খোলা মনের মেয়ে তিন্নি আর একটাও দেখেনি ! সৃজা আর তিন্নি এক পাড়াতেই থাকে সেই ছোট্টবেলা থেকে ,স্কুলের মত তাদের কলেজ ও এক! এক সাথেই দুজনে কলেজ যাতায়াত করে ! সৃজার হরেক রকম মন ভোলানো গল্পের ঝুড়ি তিন্নির অগোচরেই তাদের গন্তব্যে পৌছে দেয় রোজ ! এছাড়াও ছুটির দিনের বেশিরভাগ টাই তিন্নির বাড়িতেই সময় কাটায় সৃজা ! তিন্নির বাবা মা ও খুব ভালবাসে সৃজাকে ,তাদের একমাত্র মেয়েটার মনের খোঁজ অনেক চেষ্টা করেও তারা কখনো পায়নি আর সৃজার উপস্থিতি তাদের এই না পারা কে কখনোই ভীষণ চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে দেয়নি ! তিন্নির অল্প কথাতেই সৃজা কেমন ভাবে যেন সেটাও বুঝে যায় যেটা চেষ্টা করেও তিন্নি ওকে বলতে পারেনি ! তাই দেখে অবাক হয়ে যাওয়া তিন্নিকে সৃজা হেসে উত্তর দেয় , “সেই ছোট থেকেই কিভাবে একই আছিস রে তুই তিন্নি ? এখনো যা ভাবিস তা কিছুতেই ঠিক ভাবে বলতে পারিস না ! যদিও আমার সাথে কথা বলতে তোর এত কষ্ট করে শব্দ উচ্চারণ করার কোনো দরকার নেই ,হাত পা নাড়িয়ে দিবি ,তাহলেই চলবে !” সৃজা না থাকলে বন্ধু কথাটা সম্পূর্ন অর্থহীন থেকে যেত তিন্নির জীবনে, সেই কৃতজ্ঞতা তেই নিজের অজ্ঞাতে সে সৃজাকে দিয়েছে তার জীবনের ওপর অবাধ অধিকার ! সেই অধিকারের অপব্যবহার সৃজা প্রায়ই করে থাকে ,এই যেমন আজকে সে তিন্নি কে প্রায় জোর করেই স্কুল রিইউনিয়নে নিয়ে যাচ্ছে এক অন্যরকম ভালোলাগার অজুহাত দেখিয়ে ! ভালোলাগা তো দূরের কথা ,সেই চেনা কিন্তু অচেনা মুখের ভিড়ের মধ্যে তার পুরনো অস্বস্তি র কথা ভেবেই অনিচ্ছা টা যেন আরো বেশী করে ঘিরে ধরছে তিন্নিকে ! সে কথা সৃজাকে বোঝাতে তিন্নি একবার চেষ্টা করেছিল যার উত্তরে সৃজা বলেছিল ” এতই যখন অসুবিধা তখন তুই যাস না তিন্নি আর আমিও যাব না ! আমার জন্য এত কষ্ট নাই বা করলি তুই ! আর সত্যি বলতে কি আমারও অত ইচ্ছা নেই কারোর সাথে দেখা করার ,নেহাত সবাই বার বার ফোন করছে তাই ! অনেকে তো শুনেছি বিদেশ থেকেও ছুটি নিয়ে আসছে শুধু এই রিইউনিয়নের জন্যে ,আর আমরা না হয় স্কুলের দু হাত দূর থেকেও গেলাম না , তাতে কার বা কি আসবে যাবে বল ! আমি এখনি ফোন করে তনিমা কে জানিয়ে দিচ্ছি আমরা দুজনে যেতে পারব না !” তিন্নি বাধ্য হয়েই তখন তার সকল অস্বস্তিকে আড়াল করে জোর করে হেসে বলেছিল “আমি না কোথায় বললাম সৃজা ?তুই তো আমাকে জানিস ,কাউকে ফোন করার দরকার নেই ,আমি যাব তোর সাথে রিইউনিয়নে !”

স্কুলে পৌছে একদম অবাক হয়ে গেল তিন্নি ,সব তো কেমন বদলে গেছে ,দেওয়ালের রং ,স্কুলে ঢোকার রাস্তা টা , ঢুকেই ডানদিকে যে বই য়ের দোকান টা ছিল সেটাও তো নেই আর ওই গেটের ডানদিকে যে একটা ছোট ঘরে বাহাদুর তার পরিবার নিয়ে থাকত ,কোথায় গেল ওরা ?এত অল্প সময়ে সব কিছু কি করে বদলে গেল ? কেমন যেন চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না তিন্নির ! হঠাৎ তার ঘোর ভাঙলো সৃজার হাতের হ্যাচকা টানে ,অধৈর্য্য গলায় বলল সৃজা” কিরে তিন্নি এখানেই দাড়িয়ে থাকবি নাকি ? চল সবাই বোধহয় এসে গেছে হবে এতক্ষণে ,আমার যে আর তর সইছে না রে ! ” বিনা প্রতিবাদে তিন্নি এগোতেই ওকে সবসময়ের মত অবাক করে দিয়ে সৃজা বলল “তুই যা ভাবছিস তা নয় তিন্নি ,সব আগের মতই আছে ,মোড়ক টা যা একটু পাল্টেছে ! ভিতরে আরো বড় একটা বইয়ের দোকান হয়েছে , বাহাদুর তার পরিবার নিয়ে এখন ওইদিক টায় থাকে ,বেশ বড় একটা দালান ঘর বানিয়ে দিয়েছে স্কুল ওদের জন্য ,ওই তো পুকুর ধারটা র দিকে গেলেই দেখতে পাবি,শুনেছি ঢোকার রাস্তা টা চওড়া খানিক টা বাধ্য হয়েই করেছে ,নাহলে বাড়তি ছাত্রের ভিড়ে প্রায়ই ছুটির সময় এখানে জ্যাম যট হত ,বাকি রইলো দেওয়ালের রং, সে তো আমাদের সময় তেও মাঝে মাঝে নতুন করে হত , তোরও মনে নেই ?এবার চল মা আমার !” তিন্নি এবার একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অল্প হেসে এগিয়ে গেল সৃজার সাথে !

“বাবারে!” স্কুলের মাঠে অগনিত মুখের ভিড় দেখে নিজের অজান্তেই অস্ফুটে বলে উঠলো তিন্নি ! সৃজা ওর হাত টা আরো শক্ত করে ধরে বলল “চল তো ,কিছু হবে না ,আমি তো আছি নাকি? তুই তো একা নস ! ভিড় দেখে মনে হচ্ছে সবাই প্রায় এসেছে ,একবছর ধরে প্ল্যান করা হয়েছে এই রিইউনিয়ন বুঝলি তিন্নি ? একবার ভাব ,কত কষ্ট করে খুঁজে বার করতে হয়েছে এত জনের ফোন নম্বর ,ইমেইল আইডি ,সবাইকে তো আর সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এ পাওয়া যায়নি ! এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এতোগুলো মাথা এক জায়গায় করা মোটেই সহজ কাজ নয় ,সত্যি তনিমাকে বাহবা না দিলে চলে না ,ওই তো প্রথম উদ্যোগী হয়েছিল এ মহাযজ্ঞে ,তারপর আরো সকলে এগিয়ে এসেছিল যদিও ,স্কুল কেও আগে থেকে জানিয়েছে ওরা ,তাই তো করা সম্ভব হয়েছে বিশাল আয়োজন ,সে যাই বলুক স্কুলের মাঠ টাই আরো বেশি নস্টালজিক করে দিচ্ছে,এই একই ব্যাপার অন্য কোথাও করলে এতটা ভাললাগা কিছুতেই আসত না ,তাই না বল তিন্নি ? !” তিন্নি শুধু মাথা নাড়িয়ে সৃজার কথায় সম্মতি জানালো।

হঠাৎ তনিমা এগিয়ে এসে সৃজা কে জড়িয়ে ধরে বলল ” কখন থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করছি আমরা  ! এত দেরী কেন করলি ? চল তাড়াতাড়ি ! আরে কি বলব ,কাউকে কাউকে তো চেনাই যাচ্ছে না সৃজা ,একেবারে পুরো চেঞ্জ ,চোখে না দেখলে তুই বিশ্বাস করতে পারবি না ,কি যে মজা আর গল্প হচ্ছে ,উফ ! এত আনন্দ হবে আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি রে ! এবার আর সৃজার হ্যাচকা টানের জবাবে সাড়া দিল না তিন্নি ,শুধু বলল ” তুই যা সৃজা ,আমি এখানেই আছি ,আমি বরং একটু আশপাশ টা ঘুরে দেখি ,অত ভিড়ে আমার দমবন্ধ হয়ে যাবে রে !” সৃজা তিন্নির অবস্থা বুঝতে পেরে এবার আর জেদ না করে বলল ” ঠিক আছে ! আমরা এখানে বেশিক্ষণ থাকব না ,একটু দেখা করে আসি সবার সাথে তারপর ই চলে যাব ,ভিড়ে আমাকে খুঁজে না পেলে আমার নম্বরে মিসড কল দিস বুঝলি ? তিন্নি হেসে মাথা নাড়াতেই সৃজা তার এতক্ষণ শক্ত করে ধরা হাত ছেড়ে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল তনিমার সাথে! তিন্নি স্কুল করিডোর পেরিয়ে এগিয়ে গেল সামনের রাস্তা দিয়ে , একটু এগোতেই তার চোখে পড়ল তার সেই চেনা পুকুর ধার । স্কুল র এই জায়গাটা ই তার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল ! নিস্তব্দ ,জনবিহীন এই শান্ত প্রকৃতির কোল তিন্নির এতক্ষণের সব অস্বস্তি ভুলিয়ে দিয়ে তার মন এক ভীষণ সুন্দর স্মৃতিতে ভরিয়ে দিল , সৃজা যখন টিফিনে বাকি দের সাথে গল্প করতে ব্যস্ত থাকত এই পুকুরের মাছ আর জলে ভাসতে থাকা রাজহাঁসের সাথেই টিফিন ভাগ করে খাওয়া ছিল তিন্নির রোজকার অভ্যেস ! তিন্নি এগিয়ে গিয়ে নতুন করে বাধানো সিড়ির উপরে বসে পরল ,পুকুরের শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে একটা নিশ্চিন্তের হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে !

হঠাৎ হাতের উপর একটা স্পর্শে চমকে উঠলো তিন্নি ! তাকাতেই দেখল একটা এলসেশিয়ান কুকুর তার হাত শুকে দেখছে। কুকুরটাকে দেখেই এক অনাবিল আনন্দে ভরে গেল তিন্নির মন ,অস্ফুটে সে বলে উঠলো “বাঘা ! আমাকে চিনতে পেরেছিস ?” কুকুরটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে তার চোখ জলে ভরে উঠলো ,তার মনে পরে গেল তার সাথে জড়িয়ে থাকা বাঘার সব স্ম্র্তি। তিন্নি যখন টিফিনের সময় এই পুকুর ধারে এসে বসত ,মাছ আর রাজহাঁস ছাড়াও তার সঙ্গী হত বাহাদুরের পোষা একটা এলসেশিয়ান কুকুর, বাঘা। প্রচন্ড তেজী হওয়া সত্তেও তিন্নির কোলের কাছে বাঘা তার মায়াভরা চোখ নিয়ে এক্কেবারে শান্ত হয়ে বসে থাকত। কোনো চাওয়া পাওয়া ছাড়াই ওরা দুজনে স্কুলের টিফিনের এই অল্প সময়টা একে অপরের পাশে বসে দিব্বি কাটিয়ে দিত। বাঘা কে বোঝানোর জন্য যেমন তিন্নিকে কোনো শব্দ ব্যবহার করতে হত না ঠিক তেমনি বাঘার চোখের ভাষা তিন্নির কাছে ছিল খুব স্পষ্ট। তিন্নি যেমন চেষ্টা করেও কাউকে কিছুতেই তার ভাবনার কথা বলতে পারে না , কেউ তাকে ভালোবেসে তার না বলা কথা বুঝে না নিলে সে যেমন অসহায় ,বাঘারও যেন সেই একই অবস্থা ,তাই বাঘার সাথে কাটানো সময়ে সে তার অক্ষমতা কে ভুলে গিয়ে এক চিরন্তন বন্ধুত্বে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিল যেখানে শব্দ ছিল একেবারেই নিষ্প্রয়োজন। আজ আবার সেই বাঘার স্পর্শে তিন্নি যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলল সেই ফেলে আসা দুপর বেলায়।

কিছুক্ষন পর তিন্নির ঘোর কাটতেই সে বুঝতে পারল বাঘা তার ভালবাসার আলিঙ্গনে সাড়া দিচ্ছে না ,তিন্নি তার চোখের দিকে তাকাতেই বুঝলো বাঘা তাকে চিনতে পারেনি ,তিন্নির এই ব্যবহার তার কাছে যেন একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তিন্নি কিছুতেই সেটা মেনে নিতে না পেরে বাঘাকে আবার জড়িয়ে ধরে বলল , “বাঘা ! আমি তিন্নি !আমাকে ভুলে গেলি তুই ?” এল্সেশ্যিয়ান কুকুরটা এবার কিছুটা অস্বস্তি প্রকাশ করে তিন্নির বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যোগী হলো ,কিছুটা এগিয়ে আরেকবার পিছনে ফিরে দেখে নিল সে তিন্নিকে ,তার চোখের চাওনি তিন্নিকে বুঝিয়ে দিল তার ভীষণ আশ্চর্য হওয়ার অভিজ্ঞতা। তিন্নির মনে হলো এ যেন কিছুতেই হতে পারে না ,বাঘার পক্ষে তিন্নিকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব , তবে কেন তিন্নির সাথে এরকম করল বাঘা , স্কুলের শেষ দিন দেখা না করার জন্য নাকি আর কোনদিন ফিরে না আসার জন্য তার এই কঠিন অভিমান ? তিন্নি উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়ে গেল বাঘার পিছন পিছন। এল্সেশ্যিয়ান কুকুরটা সেটা বুঝতে পেরে আবার তিন্নির কঠিন বাহুডোর এড়াতেই বোধহয় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়তে লাগলো।হঠাৎ সৃজার হাত তিন্নিকে টেনে ধরে বলল “তিন্নি ,এভাবে কোথায় যাচ্ছিস দৌড়ে ? আর ঘেমে নেয়ে একি অবস্থা হয়েছে তোর ?সব শেষে পুকুর ধারেও তোকে না দেখতে পেয়ে আমি তো চিন্তা করছিলাম !” তিন্নি সৃজার হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল “আমার উপর অভিমান করে ও যে এভাবে আমাকে না চেনার ভান করছে সৃজা ,আমাকে ওর কাছে ক্ষমা চাইতেই হবে। ” সৃজা তিন্নিকে ঝাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো “কি বলছিস তিন্নি ? কে তোকে চিনতে পারেনি ? ” তিন্নি জলভরা চোখে অসহায় ভাবে সৃজার দিকে তাকিয়ে বলল “বাঘা !” সৃজা বলল “তুই কি পাগল হয়ে গেছিস ? এটা কি কখনো হতে পারে ? অবলা জীবদের অত মান অভিমান বোধ থাকে নাকি ? আর কুকুর যাকে একবার দ্যাখে তাকে আর কোনোদিন ভুলতে পারে না। ” তিন্নি অস্থির ভাবে বলে উঠলো “তুই যে কেন আমাকে বিশ্বাস করছিস না ! আমার হাত ছাড় সৃজা ! ও যে ওইদিকে চলে গেল ,আমাকে যে যেতে হবে। ” সৃজা হাত না ছেড়েই বলল “তুই আমার সাথে চল ,আমি তোকে বাঘার কাছে নিয়ে যাচ্ছি ,দেখি কেমন ও তোকে চিনতে না পারে !” সৃজা তিন্নির হাত ধরে একটা দালান ঘরের সামনে নিয়ে গিয়ে ডাক দিল “বাহাদুর !” একজন নেপালী লোক বেরিয়ে আসতেই সৃজা বলল “হাম লোগকো বাঘা সে মিলনা হ্যায় ! থোরা লে চলোগে ?” নেপালী ভদ্রলোক অমায়িক হেসে জবাব দিল “জরুর দিদিমনি ! আইয়ে !” সৃজা আর তিন্নি নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করলো ,একটু পর একটা ছোট্ট ঘরের সামনে পৌছে বাহাদুর বলল ” অন্দর আইয়ে দিদিমনি!” তিন্নির পায়ের শব্দের সাথে সাথে স্পস্ট হয়ে উঠলো ঘরের ভিতরে এক আনন্দের আর্তনাদ ! তিন্নি মুহুর্তে সৃজার হাত ছাড়িয়ে ঘরে ঢুকতেই তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল তার এক অনেক চেনা ভালবাসা। তিন্নির চোখের জল ঢেকে গেল বাঘার অন্তহীন চুম্বনে। বাঘাকে জড়িয়ে ধরে তিন্নি এক পরম শান্তি অনুভব করে বলল “রাগ কমল তোর ?আমার যে বড় অন্যায় হয়ে গেছে রে বাঘা ! স্কুলের গন্ডি পেরোতেই এক ভীষণ ব্যস্ততায় আমি যে সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলাম , একবারও তোর কাছে আসার কথা আমার মনে পরেনি ,আজও সৃজা না থাকলে আমি যে কিছুতেই আসতাম না ,আর কোনদিন দেখা হত না আমাদের , তোর কাছে ক্ষমা চাওয়া যে বাকি থেকে যেত চিরকালের মত।আমাদের বন্ধুত্ব ক্ষনিকের ছিল না রে বাঘা ,আমি যে আজও তোকে ঠিক আগের মতই ভালোবাসি ,আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না সময়ের মায়াডোর আমাকে কিভাবে ভুলিয়ে দিয়েছিল তোর কাছে ফিরে আসার চেনা পথ। ” সৃজার চোখও জলে ভরে উঠলো এই চিরন্তন মুহুর্তের সাক্ষী হয়ে। বাহাদুর বলে উঠলো, ” লাগতা হ্যায় বহুত দিন বাদ দোস্ত মিল্নেকি খুশিমে বাঘা কো আপনা দরদ ইয়াদ নাহি হ্যয় !” তিন্নি অস্ফুটে বলে উঠলো “দরদ ? ” বাহাদুর বলল “হা জি দিদিমনি ! উসকা পেটমে এক অপারেশন হুয়া ,ইসিলিয়ে কুছ দিনসে উসকা বাহার নিকালনা বন্ধ করা দিয়া ,ওয়াসেভি উমার কে ওজাসে অব ও যাদা বাহার নাহি যাতা। ইসিলিয়ে হামনে এক নয়া এলসেশিয়ান বাচ্ছা লে আয়া পিছলে সাল ,ইতনা বারা কম্পাউন্ড কা সিকিউরিটি করনে কি শক্তি আব বাঘা মে নাহি রাহা!” এবার ব্যাপারটা তিন্নি আর সৃজার কাছে জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল ,বাঘাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা তিন্নির কানে সৃজা বলল “তুই সত্যি পাগল তিন্নি ! মোড়কের বদলে যাওয়া রঙ দেখেই এত ভয় পেলে হবে ? ভিতর অব্দি না গেলে বুঝবি কি করে চেনা জিনিসটা সত্যি অচেনা হয়েছে কিনা !”

সৃজার হাত ধরে বাড়ির পথে হাঁট তে থাকা তিন্নি বলল , ” আমরা এরপর মাঝে মাঝেই স্কুলে আসবো সৃজা ,বাঘার জমে থাকা কথাগুলো আজ যে সবটা শোনা হলো না !” সৃজা অল্প হেসে বলল , ” নিশ্চই আসবো!কি জানিস তিন্নি আমরা জীবনে এগিয়ে যেতে যেতে কিছু এমন সম্পর্ক কে পিছনে ফেলে যাই যারা সারাজীবন আমাদের শুধু একবার ফিরে আসার অপেক্ষায় নিস্পলকে বসে থাকে।প্রচন্ড ব্যস্ততায় নিজের মুখ অনেকদিন না দেখার পর হঠাৎ একদিন সকালে আয়নার সামনে দাড়িয়ে কোনো মানুষ যেমন নিজের অস্তি ত্ব নিয়ে মুহুর্তের জন্য হলেও সন্দেহ প্রকাশ করে ,ঠিক তেমনি আমাদের ভুলে যাওয়া সম্পর্ক গুলো হঠাৎ চোখের সামনে চলে এলে আমাদের মন নিজের প্রতি এক ভীষণ অবিশ্বাসে একেবারে দিশেহারা হয়ে পরে । জীবনে এগিয়ে যাওয়াটাই নিয়ম হলেও , কিছু সময় যে হাতে রাখতে হয় ফিরে দেখার জন্য ,অনেক দেরী হয়ে গেলে নিজেকে যে কিছুতেই ক্ষমা করা যায় না রে তিন্নি।”

তিন্নি সৃজাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেদে বলল ” আমি কি খুব দেরী করে ফেলেছি সৃজা ? বাঘা সব অভিমান ভুলে আমাকে সত্যি ক্ষমা করে দেবে তো ? ” সৃজা অল্প হেসে বলল ” ধুর বোকা মেয়ে ! সত্যি দেরী হয়ে গেলে আজকের রিইউনিয়ন যে অসম্পূর্ণ থেকে যেত আর অভিমান করে চিরকাল দূরে সরে থাকতে শুধু যে মানুষ ই পারে ,তোর বাঘার যে সে কৌশল জানা নেই। “

ভোজন রসিক ভগবান

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

সোমবার সকালবেলা বাড়ির সামনের শিব মন্দির থেকে প্রনাম করে বেরোতেই তাথৈ দেখল ,হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে অটোর লাইনে দাড়িয়ে আছে মেঘ ! তাথৈ হেসে ওর দিকে এগিয়ে যেতেই ,মেঘ বলল “কিরে তাথৈ ! সামনে পরীক্ষা বলে এভাবে সকাল সকাল গুড়ের রসগোল্লা ভগবানের সহ্য হবে তো ? যাই বলিস ভদ্রলোক বেশ ভোজন রসিক বলতে হবে,গ্যাস অম্বলের বালাই নেই ,যে যা দেয় কোনো কথা না বলে খেয়ে নেন গপাগপ !” তাথৈ হেসে বলল , “এবার বোধহয় আর পরীক্ষায় পাশ করা হলো না রে মেঘ ,তোর লোভ দেওয়া গুড়ের রসগোল্লা ভগবানের খেতে বয়েই গেছে ,আজ আবার শিবরাত্রি ,আমার হাড়ির ঠিক পিছনেই কে.সি দাসের নাম লেখা প্যাকেটের ভিতর চারগুন বড় হাড়ি দেখে আমার আগেই মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল ,এখন তোর কথা শুনে আর কোনো আশাই বাকি রইলো না!” মেঘ বলল ” শুধু কে.সি দাস ? তুই তাহলে ভালো করে দেখিস নি তাথৈ ! গুপ্তা ব্রাদার্স ,হিন্দুস্তান সুইটস ,হলদিরাম,মৌচাক আরো কত নামী দামী প্যাকেটও নিশ্চই এই খুশি করার দৌড়ে সামিল হয়ে প্রচন্ড উত্তেজনায় সেই ভদ্রলোকের একবার চেখে দেখার অপেক্ষায় কাক ভোর থেকে প্রহর গুনছে! তোর হয়তো আমাকে লোভী বেয়াদপ মনে হচ্ছে কিন্তু সত্যি বলতে কি ,ওই প্লেট ভর্তি হরেক রকম মিষ্টির সামনে হাত জোর করে দাড়িয়ে শুধু ব্লাড সুগারের রোগী কেন যেকোনো সাধারণ মানুষেরই জিভ শুকনো রাখা অসম্ভব।মহাপুরুষ রাই বা পিছ পা কোথায় ? রামকৃষ্ণ দেব তো শুনেছি কোনো রাখ ঢাক না করে আগে নিজে চেখে তবেই তার প্রানের মা কে শেয়ার দিতেন !” উত্তরে তাথৈ বলল ” তোর মত নাস্তিকেরা ভগবানকে ভালবাসার কদর যে বুঝবে না তাতে আর আশ্চর্য কি ,তাই বলে ওত বড় মহাপুরুষের নাম নিয়ে এসব আজে বাজে বললে কোনদিন গণধোলাই না খেয়ে যাস । ” মেঘ বলল “কেন গণধোলাই কেন ? আমি কি মিথ্যা বলছি নাকি ? আমি রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র ! রামকৃষ্ণ দেবের কোলে পিঠেই মানুষ,তাই ওনার ব্যাগগ্রাউন্ড আমার থেকে তোর মত সেন্জিভিয়ার্সের পাশ করা মেয়ে বেশি জানবে ?” তাথৈ জিজ্ঞাসা করলো ,” কেন ? সেন্জিভিয়ার্সের পাশ করা মেয়েরা কি বাংলার মহাপুরুষ নিয়ে কিছু জানে না নাকি ? ” মেঘ হেসে বলল ,” মহাপুরুষ ছাড় , তোরা তো প্রচন্ড ইম্পর্টান্ট একটা সম্পর্ক নিয়েই কনফিউসড , নিজের বাবাও ফাদার ,স্কুলের প্রিন্সিপাল ও ফাদার আবার ভগবানও ফাদার ,তোদের ফাদার ডাকায় একসাথে কজনের হেচকি ওঠে একবার ভেবে দ্যাখ তো । ” তাথৈ বলল , “ভালো যা ! তোদের মত গেরুয়া পোশাক পরা লোক দেখলেই তো আর ‘মহারাজ ‘ বলে পায়ে পরে যাই না । ” মেঘ বলল “তা গেরুয়া রং যে সে রং নাকি ! ভুলে যাস না আমাদের জাতীয় পতাকাতে সবচেয়ে উপরে গেরুয়া রং!” তাথৈ বিদ্রুপের স্মরে বলল “তা সেটাও কি তোদের মহারাজ দের সাজেসন বলতে চাস ? ” মে ঘ হেসে বলল “ত্যাগ বুঝিস ত্যাগ? সাধে কি বলি সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে ? গেরুয়া হলো ত্যাগের প্রতীক।সে আর তুই কি বুঝবি? সকাল সকাল গুড়ের রসগোল্লার প্রসাদ খেয়ে শুধু ভোগ ই করে গেলি !” তাথৈ বলল “উফ ! তোর সাথে আমি তর্কে পেরে উঠব না।তা এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস ?”মে ঘ বলল “আগে বল সাথে যাবি ,তবে বলব। ” তাথৈ বলল “এখন যদিও কোনো কাজ নেই ,তা কখন ফিরবি ?”মে ঘ একটু ভেবে নিয়ে বলল “তা ঘন্টা তিনেক তো লাগবেই !” তাথৈ বলল “ওরে বাবা ! তাহলে মা কে বলে দেখতে হবে ।” মে ঘ বলল “সে আমি কাকিমাকে বলে দেব খন ,রাস্তা ঘাট ভালো না ,একটা সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে সাথে থাকলে ভরসা পাব বলে নিয়ে গিয়েছিলাম। ” তাথৈ বলল ,”মনে থাকে যেন ! মায়ের বকার সামনে তুই আমার ঢাল ,তখন কিন্তু তাড়া আছে বলে পালাতে চাইলে শুনবো না। “

অটো থেকে নেমে বেশ অনেকটা হেঁটে তাথৈ ক্লান্ত হয়ে বলল “তা আমরা কোথায় যাচ্ছি একটু বলবি? আর যে পারছি না” | মেঘ বলল “ব্যাস আরেকটু কষ্ট করে চল ! প্রায় এসে গেছি । ” একটু পরেই মেঘ একটা বাড়ির সামনে এসে বেল বাজাতেই একজন বয়স্ক লোক এসে দরজা খুলল। মেঘ বলল “নগেন কাকা ,স্যার বাড়িতে আছেন ? ” নগেন কাকা হাসিমুখে মাথা নাড়তেই মেঘ তাথৈ এর হাত ধরে বলল “চল !” ওরা দুজনে দোতলার একটা ঘরে ঢুকতেই দেখল একজন বয়স্ক মানুষ হুইল চেয়ারে বসে বই পড়ছেন। মেঘকে ঢুকতে দেখেই তিনি হেসে বললেন , “গাধা !এবারও ভুলিস নি ?” মেঘ বলল “সে আর কি করব ? নগেন কাকার হাতের রান্না খেতে আপনার বাড়িতে আসার লোভ যে কিছুতেই সামলাতে পারি না। ” মেঘের পিছনে হাত ধরা তাথৈ কে দেখে ভদ্রলোক আবার হেসে বললেন ? ” এ কে ?তোর গার্লফ্রেন্ড বুঝি ?” মেঘ বলল “পাগল হয়েছেন ?একটা সেন্জিভিয়ার্সের মেয়েকে গার্লফ্রেন্ড করলে আমার তাকে রাখা সাধের বাংলা বই গুলো যে আত্মহত্যা করবে !” ভদ্রলোক হা হা করে হেসে তাথৈ এর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন ” তা ওর কথায় তুমি কিছু মনে কোরো না মা ! এ আমার ই দোষ ,বেয়াদপ ছাত্রের হয়ে এই লজ্জিত শিক্ষক তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী । তোমার নাম কি মা ?” তাথৈ হেসে বলল ” না না ,এরকম ভাবে বলবেন না ,গীতবিতান কে যদি কেউ পেপার ওয়েট হিসেবে ব্যবহার করে ,তার জন্যে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার ওপর সন্দেহ করার মত মেয়ে তাথৈ নয় ! ” ভদ্রলোক মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল “কি সুন্দর উত্তর। আর নাম টাই বা কম যায় কিসে ? তাথৈ !এত সুন্দর নাম ছেড়ে তুই বুঝি ওকে সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে বলে ডাকিস ?” মেঘ হেসে বলল ” ওর বাংলার যুক্তাক্ষর লেখা দেখলে আপনিও বলবেন। ” মেঘের কথা শেষ না হতেই নগেন কাকা মিষ্টির প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকলো ,তাকে দেখে চেয়ারে বসে থাকা ভদ্রলোক বললেন , ” নগেন ,ওদের কে দিয়েছিস তো ? দেখিস কারো খিদে যেন বাকি না থেকে যায় ” । নগেন কাকা অল্প হেসে বলল ” তা আর বলতে ? এমন সুখের চাকরির ওপর আমার যে ভারী লোভ। ভোলাকে ওখানে দাড় করিয়ে তবে এসেছি, ওদের তো সময় লাগবে,মেঘ দাদা তো আর রোজ রোজ আসে না ,এই বিশেষ দিনে আর কতক্ষণ তাকে কিছু না খাইয়ে বসিয়ে রাখব? । ” তাথৈ কিছু বুঝতে না পেরে মেঘের দিকে তাকাতেই মেঘ ওর হাত ধরে টেনে বারান্দায় নিয়ে গেল , তাথৈ দেখল বাড়ির উঠোনে প্রায় ২৫ টা কুকুর একসাথে ভাত খাচ্ছে আর একটা কম বয়সী ছেলে কারো থালায় ভাত শেষের দিকে দেখতে পেলেই দৌড়ে গিয়ে ভরে দিয়ে আসছে । মেঘ বলল “ওরা রাস্তার কুকুর। স্যার ওদের তিন বেলা এভাবেই খেতে দেন ,শরীর খারাপ হলে চিকিৎসা করান ,বর্ষা আর শীতের দিনে প্লাস্টিক আর চাদর দিয়ে পুরো উঠোন টা ঢেকে ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন।” তাথৈ অবাক হয়ে মেঘের দিকে তাকাতেই মেঘ হেসে বলল “তুই ভুল জানতিস। আমি নাস্তিক নই তবে আমার ভগবান তোর বাড়ির পাশের মন্দিরে থাকে না তাথৈ । তাকে দেখা যায় ,ছোয়া যায় ,পায়ে হাত দিয়ে প্রনামও করা যায়।এবার চল একটা ছোট্ট কাজ বাকি আছে ।” মেঘ ঘরে ঢুকে প্যাকেট থেকে একটা টিফিন বাক্স বের করে চেয়ারে বসা ভদ্রলোকের সামনে রেখে বলল “আপনার কথা মত এবার আর মাকে হাত লাগাতে দিইনি ,নিজেই বানিয়েছি আপনার পছন্দের নলেন গুড়ের পায়েস ,কোনমতে চোখ কান বুজে কষ্ট করে খেয়ে নিন । এবারেও মোমবাতি আনিনি কারণ আমার মতে আপনার বয়স বাড়ে না,কোনদিন বাড়বে না । ” ভদ্রলোক হেসে তখনি টিফিন বাক্স টা খুলে এক চামচ মুখে দিয়ে বলল “আহ্ ! অমৃত ,এই চরম প্রাপ্তিতে আমার শিক্ষক জীবন সার্থক হল মেঘ”। তারপর তাথৈ আর মেঘের মুখে অল্প পায়েস দিয়ে তিনি হাসিমুখে বললেন ” মেঘ !তাহলে এবার তোর হ্যাপি বার্থডে গান টা হেড়ে গলায় গেয়ে ফ্যাল প্রতি বছরের মত,সেই ফাকে আমি তোর এত সুন্দর করে বানানো পায়েস টা এক নিশ্বাসে শেষ করে নি । ” মেঘ বলল “না ,আপনার এই বিদ্রুপ বছরের পর বছর আর সহ্য হচ্ছে না তাই এবার গান গাওয়ার লোক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি ” । তারপর তাথৈ র দিকে তাকিয়ে হেসে বলল ,”এই যে সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে ! একটা সুন্দর গান গেয়ে শোনা আমার ভগবান কে ,তোকে এতদূর খরচা করে নিয়ে আসার কষ্ট আমায় ভুলিয়ে দে দেখি ! ” তাথৈ মেঘের কথার উত্তর না দিয়ে হুইল চেয়ারে বসে থাকা ভদ্রলোক কে প্রনাম করে গেয়ে উঠলো :

“May God bless and keep you always
May your wishes all come true
May you always do for others
And let others do for you
May you build a ladder to the stars
And climb on every rung
May you stay forever young
Forever young, forever young
May you stay forever young।।”

ভদ্রলোক তাথৈ এর মাথায় হাত রেখে জল ভরা চোখে বলল “নিশ্চই থাকব !এত মিষ্টি মেয়ের আবদার ফেলে দেওয়ার সাধ্য যে আমার নেই। মেঘের দলে যে এবার আরো একজন সামিল হলো ,আজ থেকে আমার বুড়ো হওয়া এক্কেবারে বন্ধ । আর মেঘের ওই আবোল তাবোল কথায় তুমি একদম কান দিও না মা ,ও আমাকে খুব ভালবাসে বলেই বোধহয় এতটা বাড়িয়ে বলে। আমি একজন খুব সাধারণ অসহায় মানুষ যে নিজের পায়ে হাটতে পর্যন্ত পারে না ,ওই অবলা জীব গুলো না থাকলে আমার বেঁচে থাকা যে অসম্ভব হয়ে উঠত। আপাতদৃষ্টিতে যাই মনে হোক না কেন আসল সত্যি টা হলো আমি ওদের নয় ,ওরাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। “

তাথৈ চোখের জল আড়াল করে মেঘের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে বলল ,”মোটেই না ! আসল সত্যি টা হলো কোনো নামী দামী দোকান থেকে কেনা মিষ্টি নয় , কাঁচা হাতে তৈরী, মিষ্টি কম,পুড়ে যাওয়া পায়েস ই ভগবানের মনে এরকম সকল প্রাপ্তির অনুভূতি আনতে পারে ! ভদ্রলোক সত্যি ভোজন রসিক বলেই হয়ত ভালবাসার স্বাদকে অমৃত বলে চিনে নিতে তার এতটুকু দেরী হয় না।”

ঘুমের দাম

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

রবিবারের অলস সকাল ! সবে একটা গল্প পড়া শেষ করে  খোলা জানলার  দিয়ে তাকিয়ে গুনগুন করছিল রিমঝিম  ।

(রিমিঝিম ): আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়  ….

দরজা খুলে ঢোকার আওয়াজ :

(রিমিঝিম ): কিরে  আকাশ তুই ? এভাবে না বলে কয়ে এত সকালে আমার বাড়ি চলে এলি যে ! তোর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কাকিমা নিশ্চই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দিয়েছেন!

(আকাশ) : একদম ঠিক ধরেছিস ! আর সাথে এও বলেছে আবার ঢোকার চেষ্টা করলে ব্যাপার টা মোটেই আর ঘাড় অব্দি থেমে থাকবে না, কোনরকমে অন্যের কাঁধে হাসপাতালে পৌছেও শান্তি নেই ,সেই হাসপাতালের বিল নাকি আমাকেই মেটাতে হবে লোকের বাড়ি কাজ করে! তাই বাড়ি যাওয়ার সময় কাকিমাকেও আগাম কাজের কথা বলে যাব ভেবেছি ! এটুকু বলতে পারি নলিনী দি র থেকে অন্তত একদিন হলেও কম কামাই করব আমি !”

(রিমঝিম) : হাসি।

(আকাশ): ”হ্যাটা করছিস ? ভাবছিস পারব না ? রাতের খাওয়া থালা আছে নিশ্চই ? ওরই একটা ধুয়ে আমি তোকে ডেমো দেখিয়েই ছাড়ব আজ ,তারপর দেখিস তুই আয়নার বদলে সবসময় আমার ধোওয়া থালা নিয়ে ঘুরবি !”

(রিমঝিম প্রচন্ড হাসি অল্প থামিয়ে ) : “আচ্ছা একটা কথা বল ! তুই কি করে জানলি নলিনী দি খুব কামাই করে ?

(আকাশ) : “ওই তো ! নলিনী দির ডিমান্ড নিয়ে তোর কোনো আইডিয়া নেই রিমঝিম ! আমাদের পদ্মা মাসি সেই যে পদ্মার ইলিশ খেতে বাংলাদেশে গেল তারপর আর এলো না। গত কবছর পদ্মা মাসির অনাথ করে চলে যাওয়া আমাদের সং সার নলিনী দির ই হাতে ,তার একদিন কামাই তেই মার রাগের পারদ যেভাবে উপরে চরে ,আমি ভয়ে দৌড়ে গিয়ে সামনের কালী বাড়িতে একশো টাকার মিষ্টি কিনে দিয়ে আসি,পরপর দুদিন কামাই এর ধাক্কা আমরা পিতা পুত্র মিলেও সামলাতে পারব না রে ! পদ্মা মাসির ইলিশ প্রাপ্তির পর কাকিমা ই তো নলিনী দি কে আমাদের বাড়ির কাজ টা ধরিয়ে দিয়েছে আর সেই কৃতজ্ঞতা তেই তোর মতো পেত্নী কেও আমার মা তার সোনার টুকরো ছেলের গলায় ঝোলাতে রাজি ! “

(রিমঝিম  রাগের ভান করে) :  “হ্যাঁ তবে আর কি ! আমার যেন কলসী দড়ির অভাব হয়েছে !”

(আকাশ হেসে) ” আমি চটপট নিচের বাথরুম থেকে ঘুরে আসছি ,প্রকৃতির ডাক বুঝতেই পারছিস !”

(রিমঝিম হেসে) : “আচ্ছা !”

আকাশ বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই রিমঝিমের মনে পরল তাদের নিচের বাথরুমের আলো টা কাল রাত থেকেই জ্বলছে না ,আর জানলা টাও অনেকদিন বন্ধ বলে সকালবেলা তেও ভিতর টা একদম অন্ধকার,একটা টর্চ হাতে নিয়ে এগিয়ে যেতেই নিচের করিডোরের কাছে দেখল আকাশ আর নলিনী দি কথা বলছে ! রিমঝিম কে সিড়ি দিয়ে নামতে দেখেই নলিনী দি দ্রুত চলে গেল রান্না ঘরের দিকে। রিমঝিম কিছু বুঝতে না পেরে সামনে এসে দাড়াতেই  , আকাশ নিজের অপ্রস্তুত ভাব আড়াল করে বলল :

(আকাশ) “সত্যি রিমঝিম! তোদের বাড়ির এই নকশা টা যে লোকটা বানিয়েছে ,তাকে একবার দেখলে কোনো কথা না বলে আমি সাষ্টাঙ্গে প্রনাম করতাম ! কদিন না এসেই পুরো ব্যাপরটা মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। নিচের বাথরুমের যেতে গিয়ে আমি যখন এই ভুলভুলাইয়ার অসহায় শিকার ঠিক তখনি নলিনী দির সাথে দেখা ! তা না হলে তোকেই বোধহয় এই করিডোরের উপর আমার বইয়ে দেওয়া গঙ্গা যমুনা পরিস্কার করতে হত ,আমি আর দাড়াতে পারছি না রিমঝিম, ঘরে যা ,আমি আসছি !”

( দূরে হেঁটে চলে যাওয়া পায়ের শব্দ)….

রিমঝিমের মনের উথালপাতাল প্রশ্ন তার নিচে আসার আসল কারণ টাই ভুলিয়ে দিল। আকাশ তার ছোট বেলার বন্ধু ,এই বাড়িতে তার নিত্য যাতায়াত ! রিমঝিমদের বাড়ি পুরনো রাজবাড়ির ছাচে হলেও সে জানে এ বাড়ির প্রতিটা কোণা আকাশের নখদর্পনে ! ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলাতে সে আকাশকে কোনদিন হারাতে পারেনি , এমন এমন নতুন জায়গায় সে লোকাতো ,রিমঝিম কে শেষমেষ হার মানতেই হত ! সেই আকাশের আজকের কথা আর যেই হোক রিমঝিম কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারবে না ! তাহলে সত্যি টা কি ? আকাশ কেন এভাবে মিথ্যা বলল রিমঝিমকে?  শুধু একজনই পারে রিমঝিমের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ! রিমঝিম দ্রুত পায়ে রান্না ঘরের সামনে এসে  নলিনী র উদ্যেশ্যে বলল:

(রিমিঝিম ) : আমাকে যদি সত্যি টা বল নলিনী দি, কথা দিচ্ছি আমি কাউকে বলব না ! ওটা কি নলিনী দি ? ওই যে তোমার আঁচলের তলায়? দেখাও আমাকে ।

মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকা নলিনী দি এবার আঁচলের আড়াল থেকে  একটা প্যাকেট বার করে রিমঝিমের দিকে এগিয়ে দিল !

(প্যাকেট খোলার আওয়াজ)

(রিমঝিম ):  “পঞ্চম শ্রেনীর বুক লিস্ট ! আর এই বইগুলা  কার নলিনী দি ?”

(নলিনী দি) : “আমার ছেলের ! আকাশ দাদাবাবু ই গত দুবছর ধরে আমার ছোট ছেলের স্কুলের বই গুলো কিনে দেয় ! আমার বড় ছেলের পড়ার খরচ আর সংসারের হাল টানার পর মাসের শেষে হাতে আর একদম কিছুই থাকে না দিদিমণি ! ২ বছর আগে বিজয়ার দিন আকাশ দাদা বাবুদের বাড়িতে ছোট ছেলেটাকে নিয়ে গেছিলাম ,আমার কাজের ফাঁকে কখন গিয়ে ও আকাশ দাদাবাবুর ঘরে ঢুকে পরেছিল | সবসময় বকবক করা আমার রানা , আকাশ দাদাবাবুর একটাই প্রশ্নের শুধু উত্তর দিতে পারেনি ,ওর স্কুলের নাম !তারপরদিন আমি যখন ও বাড়িতে কাজ করতে যাই , আকাশ দাদাবাবু আমাকে ঘরে ডেকে বলেছিল …..

(আকাশ ) : “তুমি রানাকে বাড়ির সামনের সরকারী স্কুল টায় ভর্তি করে দাও নলিনী দি ,কিন্তু ওর খরচের টাকা আমি তোমার হাতে দেব না , আমি ওর বই কিনে দেব আর স্কুলের মাইনা ও প্রতি মাসে আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসবো , কিছু মনে কোরো না নলিনী দি,তুমি তো রানার মা , খাবার আর বইয়ের মধ্যে কখনো বাছতে হলে আমি জানি তুমি টাকা দিয়ে সবসময় ওর খাবার টাই কিনবে !“

(রিমঝিম) : “এটা আর কেউ জানে ?”

(নলিনী দি কাকুতির স্মরে) ” না দিদিমণি ! আমি আর আকাশ দাদাবাবু ছাড়া একথা আর কেউ জানে না ,আজ তুমি জানলে। আমার রানার মুখ চেয়ে একথা কাউকে বোলো না দিদিমণি,আকাশ দাদাবাবু আমাকে বলেছে অন্যের মুখে রানা একথা জানতে পারলে , শিক্ষার উপর তার জন্মগত অধিকারকে পরের দেওয়া ভিক্ষা বলে ভুল হতে পারে ,সে যে বড় যন্ত্রণা! আমি কালকেই আকাশ দাদাবাবুকে রানার বুক লিস্ট দিয়ে এসেছিলাম ,আজকে আমি যখন সকালে কাজে গেছিলাম ,দাদাবাবু ঘুমাচ্ছিল , এখন তোমাদের বাড়িতে এসে বইগুলো আমার হাতে দিয়ে বলল  “আমি কাল রাতেই কিনে রেখেছিলাম নলিনী দি ,সকালে ঘুম থেকে উঠতে খুব দেরী হয়ে গেল আমার , বিকেল অব্দি মা য়ের থেকে এই বইগুলো লুকোনোর জায়গা আমার জানা নেই ,তাই সাত সকালে রিমঝিমের বাড়িতে আসতে হলো তোমাকে এগুলো দিতে! “

(নলিনী দি একটু থেমে ) ” আর ঠিক তখনি তুমি এসে পরলে দিদিমনি ! আকাশ দাদাবাবুর চোখের ইশারায় আমি ওভাবে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম। “

রিমঝিম ভেজা চোখে আর দাড়িয়ে থাকতে না পেরে নিজের ঘরে ফিরে এসে দেখল আকাশ ওর বিছানার পাশে র চেয়ারে বসে আছে ! (আকাশ হেসে বলল)  “কিরে ? পেট পরিষ্কার করতে হল ? এবার ব্রেকফাস্ট টা জমিয়ে খাবি কি বল !”

রিমঝিম এবার আর হাসলো না , আকাশের পাশে বসে বলল ” তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব আকাশ ? “

(আকাশ ) ” এইরে! কি কথা ? প্রপোস করার প্ল্যান করিসনি তো আবার ? বলা যায় না এত সকাল সকাল তোর বাড়িতে এসেছি বলে হয়ত ভেবে বসেছিস আমার আর মেয়ে জুটছে না ,তাই মেয়ের খোঁজে এভাবে হন্যে হয়ে ঘুরছি !”

(রিমঝিম অল্প হেসে ) ,” আজকে না হলেও যদি সত্যি একদিন প্রপোস করি তাহলে কি করবি ? পালিয়ে যাবি ?”

(আকাশ  রিমঝিমের কাছে এসে বলল) ” পালাতে তো হবেই ,তবে একা পালাব না ! ভুল যে করছে উসুল তো তাকেই গুনতে হবে,এটাই যে নিয়ম !তাই আমার জ্বালায় পাগল হয়ে যখন তুই নিজের কপাল চাপড়ে ভগবানকে দুষবি ,তখন আমি হাত পা ছড়িয়ে হা হা করে হাসব! ভেবে দ্যাখ রাজি তো ?”

(রিমঝিম  খোলা জানলার দিকে মুখ করে বলল) “সময় করে ভেবে দেখব ক্ষণ !”

(আকাশ ): ” হাজার বছর সময় দিলাম তোকে ,তার মধ্যে জানালেই হবে ! এবার কি একটা প্রশ্ন আছে বলছিলি ,তাড়াতাড়ি করে ফ্যাল ,তোর যা ভুলো মন ,আমার আবার টেনসনে বিরিয়ানি হজম হয় না ,আজকে তো নেপুদার বিয়ের নেমন্তন্ন ” ।

(রিমঝিম আকাশের দিকে না তাকিয়েই বলল ) : “তোর নাম টা কে রেখেছিল রে ?”

(আকাশ 🙂 ” কোন নামটা ? আমার তো অনেক নাম ! এই যেমন হনুমান নাম টা মায়ের দেওয়া,গাধা- শুয়োর এগুলো বাবার দেওয়া,ছোট মামা র দেওয়া অনেক আদরের নাম ‘কুলাঙ্গার’! ..”

রিমঝিম এবার হাসি চেপে রাগের ভান করে আকাশের দিকে তাকাতেই সে বলল ” আরেকটা নাম আছে বুঝলি রিমঝিম ? মা বলে আমার ঠাকুমা নাকি প্রথম দিন আমাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে আমাকে ‘আকাশ দাদাভাই’ বলে আদর করেছিল ,আর সে শুনে ওই ২ ঘন্টা বয়সেই আমার আনন্দের আর কোনো সীমা পরিসীমা ছিল না ,সারা বিছানা জলে ভাসিয়ে হাত পা ছড়িয়ে গদগদ হয়ে লুটোপুটি যাকে বলে !”

(রিমঝিম খিলখিল হাসি )….

(আকাশ তার কানের কাছে মুখ এনে বলল ) ” খুব তাড়াতাড়ি তে কি বলব ভেবে না পেয়ে একদম বাজে ছড়িয়ে ফেলেছি রিমঝিম ! তোর বাড়ির দেওয়াল গুলো পর্যন্ত আমার অজুহাত শুনে একেবারে অট্টহাসিতে ফেটে পরছিল ! উপরে ওঠার সময় তোকে নলিনী দির সাথে কথা বলতে আমি দেখেছি। তাই একটা ছোট রিকোয়েস্ট আছে ! রানার কথা যেন আর কেউ জানতে না পারে ,বুঝতেই পারছিস, নলিনী দিকে পার্মানেন্ট করতে এই বুদ্ধি টা অনেক রাত জেগে মাথা থেকে বার করেছি ,সবাই জেনে গেলে আবার নতুন করে innovation এর ঝক্কি ! আমার stipend এর তুলনায় সরকারী স্কুলের আর কতই বা খরচা বল ,পদ্মা মাসি চলে যাওয়ার পর বাবার লুঙ্গি ধোয়ার ভয়ে রাত ভর ঘুম আসত না আমার , আসল কথা হলো ওই কটা টাকা দিয়ে আমি রানার জন্য বই নয় নিজের জন্য ঘুম কিনেছি,তুই তো জানিস ,আমি ছোটবেলা থেকেই ঘুমোতে বড় ভালোবাসি রে রিমঝিম । “

রিমঝিম এবার আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি ,এরকম ঘুম কেনার ইচ্ছা তোর মত যেন আরো অনেকের হয় আকাশ,তাহলেই সবার অগোচরে অনেক রানার বইয়ের খরচ উঠে যাবে !”

স্বাধীনতা

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বৃষ্টি ব্রেকফাস্টের থালা টা হাতে নিয়ে জানলার পাশে বসে রাস্তার দিকে তাকালো , সবসময়ের মতো রবিবার সকালের ব্যস্ত রাস্তা। দৈনন্দিন জীবনের একফালি টুকরো, প্রতি রবিবার এই বারান্দায় বসেই মন ভরে উপভোগ করে বৃষ্টি। আজকে অন্য দিনের থেকে রাস্তা টা একটু বেশি ব্যস্ত কারণ আজ হল ১৫ ই আগস্ট । বৃষ্টি দের বাড়ি থেকে একটু দূরেই একটা প্রাইমারি স্কুল , প্রচুর ছোটো ছেলে মেয়ের দল তাদের বাবা মায়ের সাথে আজকে স্কুলে এসেছে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগদান করতে , তাতানও ওই স্কুলে ই পরে, ওকে ভোরবেলা পৌঁছে  দিয়ে এসেছে মনিমা । তাতান বৃষ্টির ছোট কাকুর ছেলে , ক্লাস থ্রি তে উঠেছে এবার , বয়সে প্রায় দশ  বছরের ছোট সে বৃষ্টি র চেয়ে তবুও বাড়িতে থাকার বেশির ভাগ সময়টাই ওর সঙ্গে গল্প করে কাটায় বৃষ্টি  , অন্য কারোর সাথে বেশি কথা না বলা তাতান , বৃষ্টির সাথে দিনরাত এত কি করে গ ল্প করে ,বাড়ির সবাই প্রায় এই নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে। এই তো সেদিন রাতে খাবার টেবিলে তাতানকে খাইয়ে দিতে দিতে মনিমা যখন ওকে জিজ্ঞাসা করছিল ,” তোর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে রে তাতান ? রানা ,অর্ঘ্য না অনুসুয়া ? ” তাতান  আঁকার  খাতা থেকে মুখ না তুলেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে গম্ভীর ভাবে জবাব দিয়েছিল “দিদিভাই”।

কালকে রাতে ঘুমাতে যাবার আগে তাতানকে করা প্রমিস রাখতে, আজকে বৃষ্টি যাবে তাতান কে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে । প্রতি বছরের মত এবারেও সকাল দশ টায় অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবে আর তারপরই স্কুল ছুটি । তাড়াতাড়ি স্নান সেরে আয়নার সামনে চুল আচড়ানো শেষ করতেই বৃষ্টির মোবাইল টা বেজে উঠল ,চুলের ক্লিপ  টা লাগাতে লাগাতে ফোন টা ধরে বৃষ্টি বলল ,”বল”।

ওপাশে তন্ময়ের ভাঙ্গা গলা  : বৃষ্টি ! আমার খুব জ্বর হয়েছিল রে ,সেজন্য কালকে কোচিং এ যেতে পারিনি , D.K.D র কালকের ক্লাস টা খুব জরুরি  ছিল ,তোর থেকে নোটস টা নেব ,বুঝতে না পারলে তুই বুঝিয়ে দিবি তো ?

বৃষ্টি হেসে বলল : না দেব না ,আমার সময়ের অনেক দাম।  তুই কি এখনি নিবি না পরে ? আসলে আমি একটু বেরোচ্ছি তাতানকে স্কুল থেকে আনতে ,বিকেলের দিকে হলে অসুবিধা নেই তো ? এখন বরং রেস্ট নে তুই ,জ্বর টা কমলে ক্ষণ D.K.D র কথা ভাবিস,গলার যা অবস্থা ,ফোনে নম্বর সেভ  না থাকলে তো বুঝতেই পারতাম না যে আমি মাধ্যমিকের ফার্স্ট বয় তন্ময় মজুমদারের সাথে কথা বলছি ।

তন্ময় :  জ্বরে কাহিল অসহায় ছেলেটাকে খোঁচা  মেরে প্রাণ জুড়োলো তো বৃষ্টি চক্রবর্তী ? বিকেলে মা আমাকে জোর করে হলেও ডাক্তার দেখিয়েই ছাড়বে বলেছে ,২ দিন কোনভাবে কাটাতে পারলেও আজ আর বাগে আনতে পারব না সেই প্রচন্ড প্রতাপশালী মহিলা কে ,তাই আমি এখনি যাচ্ছি তাতানের স্কুলে র সামনে ,তুই আসার সময় নোটস টা নিয়ে আসিস ,দুপুরে আমার ঘুম আসে না ,ওটাতে চোখ বুলিয়ে নেব একবার ,কিছু বুঝতে না পারলে বিকেলে ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার সময় তোর বাড়িতে হানা দেব ,আর কি !

বৃষ্টি  : আচ্ছা ,সবসময়ের মত দেরী করিস না কিন্তু ,স্কুল ঠিক ১০ টায় ছুটি হবে ,রোদের মধ্যে তাতানকে নিয়ে আমি কিন্তু বেশীক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে পারব না ।

স্কুলের  সামনে পৌঁছে  হাত ঘড়ি টা দেখে নিল বৃষ্টি , ছুটি হতে এখনো পাঁচ মিনিট বাকি । দূর থেকে ছাতা মাথায় দিয়ে তন্ময় কে হেঁটে  আসতে দেখে বৃষ্টি মনে মনে ভাবলো , ” সত্যি বাবা ! জ্বরের ঘোরে ফিসিক্সের নোট , এর মত পাগল ছাড়া কার ই বা মাথায় ঢোকা সম্ভব  ,সাধে কি সবাই আইনস্টাইন বলে !” ব্যাগ থেকে খাতা টা বের করে নিল বৃষ্টি ,তন্ময় আসতেই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল ,”নে ,তোর D.K.D র অমৃত ! জ্বরের মধ্যে আর রোদে দাড়িয়ে না থেকে এবার বাড়ি যা !” তন্ময় হেসে বলল  , “আমার এখন আর জ্বর নেই ,কাল রাতের পর এখনো আর আসেনি , তোর সাথে তোর বাড়ির দিকেই একবার যাব কয়েকটা জিনিস জেরক্স করতে হবে,আমাদের ওদিকের দোকানের জেরক্স  টা খারাপ ।” বৃষ্টি এরপরে আর কি বলবে বুঝতে না পেরে শুধু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল !

তাতান ভিড়ের মধ্যে দৌড়ে এসে বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে বলল ,” Happy Independence Day দিদিভাই! ” তন্ময়ের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত বৃষ্টি একদম খেয়াল ই করেনি কখন স্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছে তাতান , ভিড়ে তাতানের উল্টে যাওয়া টাই টা ঠিক করে দিতে দিতে হেসে বৃষ্টি বলল,”আগে বল , Independence এর বাংলা কি ? “

তাতান  : স্বাধীনতা , তুই তো কালকেই শেখালি !

বৃষ্টি হেসে বলল : একদম ঠিক ।

ইংলিশ মিডিয়াম এ পড়া  তাতানকে কিছুতেই বাংলা থেকে আলাদা হতে দেবে না বৃষ্টি ,নিজের ভাষা কে ভালবাসতে যেভাবেই হোক তাতানকে শেখাতেই হবে বৃষ্টিকে ।

তন্ময় :  আচ্ছা তাতান , এবার বল তো স্বাধীনতা মানে কি ?

তাতান মুখ নিচু করে বলল : জানিনা , এটা দিদিভাই শেখায়নি !

বৃষ্টি এবার হেসে ফেলে বলল  :  সত্যি, খুব ভুল হয়ে গেছে তাতান ! স্বাধীনতা মানে হল নিজের ওপর নিজের শাসন ,নিজের ইচ্ছা মত কথা বলতে পারা ,কাজ করতে পারাকেই বলে স্বাধীনতা ! তবে যা ইচ্ছা তাই করলে চলবে না ,তাহলে নিজেকে শাসন করা হলো না কিন্তু ,আগে তোকে ভাবতে হবে ,তোর যা করতে বা বলতে ইচ্ছা করছে ,সেটা কি ঠিক না ভুল ,কারণ নিজের ইচ্ছা যদি অন্যের ওপর হওয়ার অন্যায়ের কারণ হয়ে যায় সেই ইচ্ছা মত কাজ করা টাকে তখন আর স্বাধীনতা বলে না , সেটাকে বলে সেচ্ছ্বাচারিতা ! বুঝলি?

তাতান  : পুরোটা নয় , একটু সহজ  করে বুঝিয়ে  দে না  রোজের মত।

বৃষ্টি একটু ভেবে বলল : এই যে সেদিন বলছিলি তোর ক্লাসের  অরিন্দমের একটা বাক্য বলতে অনেক সময় লাগে ,আটকে আটকে যায় বার বার ,তাই ক্লাসে সবাই ওকে নিয়ে মজা করে ,রানা প্রায়ই ওর দলের সব বন্ধু নিয়ে টিফিন টাইমে আরিন্দম কে ঘিরে ধরে ইচ্ছা করে সিলেবাসের সবচেয়ে শক্ত ইংরাজী পদ্য  টা বলতে বলে ,তবুও অরিন্দম টিচার কে কখনো রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে না। কেন বল ?

তাতান :  রানা তো আমাদের ক্লাসের মনিটর ,সবাই ওর দলে ,ও বোর্ড এ নাম লিখে দিলে টিচার তো প্রচন্ড শাস্তি  দেয় ।

বৃষ্টি বলল : এর মানে হলো অরিন্দম স্বাধীন নয় কারণ সে রানা কে ভয় পেয়ে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও সেই কাজ টা করছে ,যেটা রানা ওকে করতে বলছে ।

তাতান :  তাহলে রানা কি স্বাধীন দিদিভাই ?

বৃষ্টি : ওই যে তোকে বললাম নিজের যা খুশি তাই করাকে স্বাধীনতা বলে না ,আগে দেখতে হবে সেটা ঠিক না ভুল , রানা নিজের মজার জন্য অরিন্দমের ওপর যে অন্যায় করে সেটাকে কখনই স্বাধীনতা বলে না ,বলে সেচ্ছ্বাচারিতা ।

তাতান একটু ভেবে বলল : তাহলে দিদিভাই ,আমি কি স্বাধীন ? আমি তো অরিন্দম কথা বললে কখনো হাসি না ,ওকে আমার টিফিন ও দি মাঝে মাঝে।

বৃষ্টি : না তাতান , এক্ষেত্রে তুইও স্বাধীন নস ,তোর নিজের ওপর শাসন আছে ঠিকই কিন্তু তোর ইচ্ছা থাকলেও রানার ভয়ে অরিন্দম কে সমর্থন বা করতে পারিস না ,অরিন্দমের জন্য তোর খারাপ লাগলেও ওর সাহায্য  করতে টিচার কেও কখনো রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ করিসনি। অন্যায় দেখেও,নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ,শুধু ভয়ের কারণে চুপ করে থাকিস তুই ,স্বাধীন হতে গেলে তো ভয় পেলে চলবে না তাতান ,তুই যদি নিজের ভয় কাটিয়ে একদিন স্বাধীন হয়ে যাস ,যেটা উচিত সেটা করতে পারিস আর যেটা অনুচিত সেটাকে আটকাতে পারিস ,হতে পারে তোকে দেখে আরো অনেকে তোর ক্লাসে তোর মত স্বাধীন হতে চাইবে , সেটা অরিন্দমও হতে পারে অথবা অন্য কেউ ।

তাতানের সাথে কথা বলতে বলতে বাড়ির দিকে অনেকটা চলে এসেছে বৃষ্টি , তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে দেখল ,সেও তাতানের পাশে চুপ করে হাটছে।বৃষ্টি হেসে বলল ,”বুঝলি তন্ময় ! এবার আমার তাতান কিন্ত স্বাধীনতার মানে জানে ,আর সিলেবাসের বাইরে প্রশ্ন করে ঠকানো যাবে না !”

তন্ময় হেসে বলল  : জেরক্সের  দোকান এসে গেছে ,আমার সময় লাগবে একটু ,তোরা চলে যা ।

তাতান হঠাৎ বলল : দিদিভাই ! ওই মিষ্টি লজেন্স টা কিনে দে না আগের দিনের মত ,এই দোকানেই তো পাওয়া যায় ।

বৃষ্টি হেসে বলল : আচ্ছা ,চল ।

তন্ময়ের জেরক্সের অর্ডার বুঝে নেবার পর দোকানদার বৃষ্টিকে লজেন্স দিতেই সে দেখল পাশে তাতান নেই ,বাইরে তাকাতেই দেখল উল্টো দিকে চায়ের দোকানে জটলা করে বসে থাকা পার্টির  ছেলে দের দিকে যাচ্ছে তাতান । বৃষ্টি কিছু বুঝতে না পেরে এগিয়ে যেতেই শুনলো তাতান রাস্তায় শুয়ে থাকা একটা কুকুরের দিকে হাত দেখিয়ে দোকানের অনেকের সাথে বসে থাকা মাঝখানের ছেলেটাকে বলছে ” কাকু ? তুমি ওকে ফুলঝুড়ি  জালিয়ে ভয় দেখাচ্ছ কেন? তুমি কি স্বাধীনতার মানে জানো  না?যা ইচ্ছা তাই করলে চলবে না ,নিজের ইচ্ছা যদি অন্যের ওপর হওয়া অন্যায়ের কারণ হয় সেটাকে আর স্বাধীনতা বলে না , বলে সেচ্ছ্বাচারিতা !” ছেলেটা প্রথমে খানিক টা অবাক হয়ে তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে তাতানকে বলে , ” ওরে ব্বাস! এইটুকু ছেলে হলে কি হবে,কি তেজ দেখেছিস ! বাবা র নাম কি রে তোর ?” পাশে বসে থাকা বাকিরা হেসে উঠলো ।

বৃষ্টি দৌড়ে এসে তাতানের হাত ধরে টেনে বলে ,” চলে এসো তাতান ! কতবার বলেছি এভাবে অচেনা মানুষদের সাথে কথা বলতে নেই ।”

তাতান : কিন্তু দিদিভাই ! তুই যে একটু আগেই আমাকে ..

তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বৃষ্টি উচু গলায় বলল : তাতান! মুখে মুখে তর্ক করবে না একদম ।  বাড়ি পৌঁছনো  অব্দি আমি যেন তোমার মুখে আর একটাও কথা না শুনি ।

হঠা ৎ তন্ময় এগিয়ে এসে চায়ের দোকানের ছেলেটা কে বলল ,” আরে বাবাই দা ! কেমন আছো গো ? বাড়িতে সব ভালো ?”

ছেলেটা একগাল হেসে বলল , ” ওই চলছে রে ভাই ,তুই তো আমাদের পাড়ার গর্ব , মাধ্যমিকের রেসাল্টের  দিন টিভি র লোকে এসেছিল তোর বাড়িতে শুনলাম ,আমার ওই সেদিন ই M L A শৈলেশ দার ইমার্জেন্সি কাজ পরাতে থাকতেই পারলাম না ধ্যুর  ! তোর সাথে আমাকেও টিভি তে দেখাত ,নেপুকে তো একঝলক দেখিয়েছে শুনলাম কোন একটা চ্যানেল ,মালটা ঠিক সময় জায়গায় গিয়ে দাড়িয়ে পরেছে মাইরি !এত আপসোস হয় রে আমার কি বলব , যাইহোক তুই তো সামনের বছর উচ্চমাধ্যমিক – জয়েন্ট না আরো কি কি পরীক্ষা দিবি সবাই বলছিল , এবার কিন্তু আমার টিভি তে এন্ট্রি চাই ! পাড়ার অনুষ্ঠানে  এবার তোকে একটা প্রাইজ দেওয়া হবে সবার তরফ থেকে।”

মাত্রাহীন রাগে তন্ময়ের দিকে পুড়িয়ে দেওয়া চাহনি তে দেখে বৃষ্টি বিদ্রুপের স্বরে বলল , “তাহলে মাধ্যমিকের ফার্স্ট বয় ! তুই তোর অভূতপূর্ব সাফল্য নিয়ে প্রানের বন্ধুদের সাথে আলোচনা কর ,আমরা এগোলাম।”

তন্ময় শুধু বলল ” না দাড়া ,আমিও যাব !” , তারপর বাবাই দার দিকে দেখে তন্ময় বলল , “ধন্যবাদ  বাবাই দা ! আর বলছিলাম ,তাতান আমার ভাইয়ের মত ,ওর কথায় তুমি কিছু মনে করো না ! “

আর সহ্য করতে পারছিল না বৃষ্টি,রাগে সারা শরীর তার জ্বালা করছিল, নিজের ঠোঁট কামড়ে মাটির দিকে তাকালো সে ,হাতে শক্ত করে ধরা তাতানের হাত |

বাবাই দা  :  ধ্যুর ! কি যে বলিস ! ও বোধহয় কুকুর বেড়াল ভালবাসে ,আসলে আজকে তো স্বাধীনতা দিবস ,পাপ্পু বাজি কিনে আনতে ওই লালু র সাথে একটু মজা করছিলাম !

তন্ময় এবার শক্ত হয়ে বলল :  এটা তোমার মজা হলেও কুকুর টার মজা নয় বাবাই দা , সব জীব জন্তুই আগুন দেখলে আর শব্দ শুনলে ভয় পায়,এভাবে অবলা জীবকে কষ্ট দেওয়া খুব অন্যায় বাবাই দা ,তোমার মত পরোপকারী মানুষ কে তো এসব মানায় না ।

বাবাই দা এবার একটু লজ্জা র ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে জিভ কেটে বলল : আরে ! এটা পাপ্পুর বুদ্ধি ! এই আমি প্রথমে বারণ করেছিলাম কিনা বল ?

পাপ্পু নামের ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই বাবাই দা বলল :দেখলি তো ! যত নচ্ছার জুটেছে দলে ,এ তদিনের রেপুটেশন টাই মাটি করে ছাড়বে ,এই নারান দা ! লালুকে ৪ টে বিসকুট দাও তো , আর হিসেব টা আমার খাতায় লিখে রাখো ।

তন্ময় হেসে বাবাই দা র কাধে হাত রেখে বলল “আচ্ছা বাবাই দা ! এগোলাম তাহলে ।

বাবাই দা এক গাল হেসে বলল : আচ্ছা ভাই ! ভালো থাক ,আবার দেখা হবে !

বৃষ্টি তাতানের হাত ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতে  লাগলো । তাতান হঠাৎ বলল , ” তন্ময় দা স্বাধীন , তাই না দিদিভাই ? “

বৃষ্টি উত্তর না দিয়ে বলল ,”ওই বাড়ির গেট দেখা যাচ্ছে ,সোজা গিয়ে একদম বাড়িতে ঢুকে যাও , আমি আসছি এখনি !”

তাতান মাথা নাড়িয়ে এগিয়ে যেতেই বৃষ্টি তন্ময় কে উঁচু  গলায় বলল  : এসব নাটকের কি দরকার ছিল ? যতসব লোফার ছেলের দল ! ওদেরকে ঐসব লেকচার দিয়ে কি লাভ হল তোর ?তোর কি মনে হয়! ওরা রাতারাতি সব বুঝে গেল ? এখন গিয়ে দেখ! আবার একই কাজ করছে হবে !

তন্ময় শান্ত গলায় বলল : জানি।

এবার বৃষ্টি আরো রেগে গিয়ে বলল : জানিস তো নিজের ,আমার ,তাতানের এতটা সময় নষ্ট করলি কেন তুই ? গায়ে জ্বর নিয়ে রোদের মধ্যে দাড়িয়ে এইসব জঘন্য  লোকজনদের ভাষন না দিলে তোর কি চলতো না ?

তন্ময় এবার ভারী গলায় বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল : না ,চলতো না । আজ আমি যা বলেছি বা করেছি ,তা না করলে তোর তাতানকে শেখানো স্বাধীনতার মানে সারাজীবন ওর কাছে মিথ্যে হয়ে থেকে যেতো বৃষ্টি ! বাবাই দা রা না বুঝতে পারলেও তাতান পেরেছে। বৃষ্টি  ! বাংলা শেখার মত স্বাধীন হওয়াও যে ওকে শিখতেই হবে !

 বৃষ্টি র চোখ ভিজে এলো , তন্ময়ের দিকে আর না তাকিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে ।

iPhone vs ভালবাসা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ফোনের অ্যালার্ম এর শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল রিয়ার। Snooze বোতাম এ চাপ দিয়ে আধখোলা চোখে বিছানার সোজাসুজি জানলার দিকে তাকালো সে। তার এপার্টমেন্ট টা একদম সাধারণ হলেও বেডরুমের বিছানায় শুয়ে অনেকখানি আকাশ দেখা যায় , কি যে ভালো লাগে তার সকালের এই অল্প সময় টুকু ! আলসেমি ভরা আধখোলা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে রিয়া ,আজ আকাশ টা বেশ পরিষ্কার গত কদিনের চেয়ে। এয়ারপোর্ট এর খুব কাছেই তার এপার্টমেন্ট ,তাই নিরন্তর প্লেন এর আনাগোনা তার এই একফালি আকাশে ! এতদিন পরেও প্লেন র শব্দে একটুও বিরক্ত হয় না রিয়া , জানলা দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ অব্দি প্লেন র back wings এর শেষ বিন্দুটা পর্যন্ত চোখে ধরা পরে! ছোটবেলায় ছাদে দৌড়ে গিয়ে প্লেন দেখার সেই অদম্য রোমাঞ্চময় স্মৃতিকে তার এই এপার্টমেন্টর জানলা আজও জীবন্ত করে রেখেছে !

এলার্ম র আবার শব্দে বিছানায় উঠে বসলো রিয়া , ফোন টা হাতে নিয়ে অ্যালার্ম বন্ধ করে পাশে রাখতেই Door Bell টা বেজে উঠলো,দরজা খুলে দেখল একটা fedex এর পার্সেল পরে আছে দরজার সামনে |

রিয়া পার্সেল টা উঠিয়ে নিয়ে নিজের মনেই বলে উঠলো , “এখন কে পার্সেল পাঠাল ? জন্মদিন তো অনেক দেরী আর recently কিছু অনলাইন শপিংও তো করিনি।”  তাড়াতাড়ি প্যাকেট টা খুলে ফেলে যা দেখল , তা ওর মত short tempered মেয়ের রাগের পারদ মাত্রাহীন করতে যথেষ্ঠ। একটা iphoner বাক্স আর একটা কয়েক লাইনের চিঠি:

” রিয়া ,

আমার জন্মদিনের সকালে  তোর শব্দে “এই ছোট Gift ” তোর শুভেচ্ছা নিয়ে ঠিক সময়ে পৌঁছে  গিয়েছিল আমার ঠিকানায়। তুই বলেই কোনো সঙ্কোচ না করে বলতে পারি , তোর এই ছোট গিফ্ট র উজ্জল রং , over sized আয়তন , একগুচ্ছ জোর করে necessary করে দেওয়া application , oversensitive touch screen , আমার অতি সাধারণ পকেটে মানাবে না রে ! সবসময়ের অসাবধানী , ঝুট ঝামেলাহীন ছাপোষা আমি যে এই গুরু দায়িত্ব বহন করতে অক্ষম , সে আর কেউ না হলেও আমাকে ছোট থেকে চেনা মেয়েটার বোঝা উচিত ছিল ! যাইহোক ,বলাই বাহুল্য তোর এই ছোট গিফট একেবারে নিরাপরাধ । মুহুর্তের সিদ্ধ্বান্তে অবিচার করে ফেলিস না অসংখ্য মানুষের এই ছোট গিফট একবার পাবার আকাঙ্খার ওপর ! যদি এর পর ও কখনো কিছু আমাকে দেওয়া র কথা ভাবিস ,এমন কিছু দিস যা আমার সত্যি দরকার ,যা ছাড়া আমার এক মুহূর্ত চলবে না !

খুব ভালো থাকিস !
কৌশিক ”

রিয়া প্রচন্ড রাগে অভিমানে বিছানার বালিশ টা র উপর মুখ রেখে শুয়ে পড়ল ,তার চোখের জল ভিজিয়ে দিতে থাকলো হাতে মুঠ করে ধরা চিঠি টা কে !

কৌশিক রিয়ার ছোটবেলার স্কুল র বন্ধু ! এখন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটের ছাত্র! কৌশিকের  সাথে  শেষ বার দেখা হয়েছিল এক  বছর আগে , তার পনেরো দিন পর কলকাতা থেকে সিঙ্গাপুর রওনা দিয়েছিল রিয়া ! কলেজ পাশ করার পরেই নাম করা multinational কোম্পানি তে নতুন চাকরি ,মুহুর্তে রিয়ার থেকে কেড়ে নিয়েছিল তার নিজের সবকিছু । কৌশিককে যে সে কবে থেকে ভালবাসে তা ঠিক জানে না রিয়া , কিন্তু এইটুকু জানে , একবছরের ব্যবধান , নতুন শহরের ব্যস্ততা , অফিস এ চেনা অচেনা বন্ধুদের সাথে আড্ডা , নিত্যনতুন বিনোদন , কোনকিছুই রিয়ার মন থেকে মুছে দিতে পারেনি ছোট থেকে চেনা ওই বাড়ির পাশের ছেলেটাকে ! এরকম একগুয়ে , জেদী , অনুভূতিহীন  একটা ছেলেকে কেন যে সব উজার করে ভালবাসে রিয়া , কতদিন কতভাবে সেই প্রশ্ন নিজেকেই বারবার করেছে সে । সবার থেকে আলাদা ,ব ই নিয়ে বসে থাকা ছেলেটার দিকে সেই তো প্রথম বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। বন্ধ লাইব্রেরির মত কৌশিকের একাকিত্বের জগতে প্রায় জোর করেই ঢুকে পরেছিল সে !

একদিন স্কুলে রিয়ার এলোমেলো করে করা বইয়ের মলাট খুলে কৌশিক যখন নিপুন হাতে নতুন করে পরিয়ে দিয়েছিল আর কারণ জিজ্ঞাসা করাতে বলেছিল,  “তোকে যদি বিশ্রী ভাবে জামা পরিয়ে দেওয়া হয়,তোর মনখারাপ হবে না ? ”

সেই সেদিন থেকেই কৌশিক তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। রিয়ার অবান্তর বকবক মন দিয়ে শোনার ধৈর্য্য একমাত্র সেই রাখত! কৌশিক কোনদিন মুখে বলেনি রিয়াকে যে ওকে ও ভালবাসে , কিন্তু রিয়ার থেকে ভালো করে তাকে তো আর কেউ চেনে না , সেই চেনাই বারবার রিয়ার কানে কানে বলেছে “তুই আর গন্ডাখানেক বইছাড়া আর কিছুই নেই সে ছেলের অধিকারে! ” সেই জন্যেই তো রিয়া চাকরির এপয়েন্টমেন্ট লেটার পাওয়ার পর কিছু বলতে পারেনি কৌশিক কে ,কিছুতেই বুঝতে পারছিল না কিভাবে সব ছেড়ে চলে যাবে সে অত দূরে ! কৌশিকের কথাতেই অভিজ্ঞতার জন্য ইন্টারভিউ দিতে রাজি হয়েছিল সে ,তার নিজের ওপর অত বিশ্বাস ছিল না যতটা কৌশিকের ছিল ওর উপর !

এই দোটানার মধ্যে নিজের সব শক্তি দিয়ে যখন সাহস জোগার করছে রিয়া , একদিন সন্ধ্যায় কৌশিকের হঠাৎ ফোন, ” কাকিমার সাথে দেখা হয়েছিল রাস্তায়,তোর চাকরির খবর টা শুনলাম ! আর তো ৭ দিন বাকি মাত্র ,নতুন শহরে ব্যস্ত জীবন ,ভয় পাস না একদম , আমি জানি তুই ঠিক পারবি ,আমি সবসময় জানতাম! যাইহোক রাখি রে ,একটু বেরোতে হবে ,খুব ভালো থাকিস রিয়া !”

রিয়া অনেক চেষ্টা করেও আর কিছু বলতে পারেনি সেদিন | কৌশিক কে সে যতটুকু চেনে ,সে জানত আর কিছু বলে কোনো লাভ ও ছিল না! আসার দিন এয়ারপোর্ট এ অনেকক্ষন অপেক্ষা করে ছিল সে ,কিন্তু কৌশিক আসেনি ! এই একবছরে লেখা রিয়ার অগনিত ইমেইলের কোনো উত্তর দেয়নি কৌশিক ! এতদিনেও কি তার অভিমান একটুও কমেনি ? তার ভালবাসার কি কোনো দাম নেই কৌশিকের কাছে ? থাকলে একবার ও কি এতদিনে সে খোঁজ  নিত না রিয়ার ? রাতের পর রাত কৌশিকের নম্বর ডায়াল করেও মুছে দিয়েছে রিয়া , তার ভালবাসা কি ফেলনা নাকি ? সেই বা কেন হাত পাতবে বারবার? কৌশিকের জন্মদিনের গিফট রিয়া হঠাৎ করে কেনেনি ,অনেক দিন ভেবেও সে যখন কিছুই খুঁজে পাচ্ছিল না এই সিঙ্গাপুর শহরের বিভিন্ন শপিং মল এ ঘুরে ঘুরে ,তখন একদিন তার অফিসের  বন্ধু বরুন , নতুন কেনা iphone এর অভিনব বৈশিষ্ট  দেখাচ্ছিল ক্যান্টিনে বসে ,আর সেই মুহুর্তে রিয়া ভেবে নিয়েছিল ঠিক এই মোবাইল ই কিনে দেবে সে কৌশিক কে জন্মদিনে ! এতদিনে পরে সে রিয়াকে আর ভুল বুঝে থাকতে পারবে না ,সব ঠিক হয়ে যাবে আবার , ঠিক আগের মতন ! নিজের বোকামির কথা ভেবে বালিশ চেপে গুঁমড়ে কেঁদে  উঠলো রিয়া , না না এ কিছুতেই হয় না! কিছুতেই মুখ বুজে মেনে নেবে না সে ভালবাসার এই চরম অপমান ,তার কৈফিয়ত চাই ! সবকিছু শেষ করে দেওয়ার আগে একবার দেখা করতেই হবে তাকে কৌশিকের সাথে! কোনো দোষ না করা সত্তেও নিজের আত্বসম্মান জলান্জ্বলি দিয়ে করা রিয়ার এই শেষ চেষ্টার উত্তরে এভাবে তাকে কেন অপমান করলো কৌশিক ,তাকে জানতেই হবে !

অফিসে বলে ৭ দিনের ছুটি নিয়ে নিল রিয়া , ছুটি মঞ্জুর  হতেই book করে ফেলল প্লেনের টিকিট | এয়ারপোর্ট এ বাড়ির সবাইকে এতদিন পরে দেখে কিছুক্ষণের জন্য হলেও শান্ত হলো তার অস্থির মন ! বাড়িতে ঢোকার আগে কৌশিকদের বাড়ির দিকে তাকালো রিয়া,রাস্তার দিকের ঘরেই থাকে কৌশিক , ঘরের জানলা টা বন্ধ !

মনে মনে বলল ” সারাদিন শুধু আলো বাতাস হীন অন্ধকার ঘরে বই নিয়ে বসে থাকা !”

রিয়া তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে মা কে বলল “আমাকে একটু বেরোতে হবে এখনি ,দরকার আছে,তাড়াতাড়ি চলে আসব , চিন্তা কোরো না !”

মায়ের  উত্তরের অপেক্ষা না করেই বেড়িয়ে পড়ল রিয়া ! নিজের অস্থিরতাকে আর সামলাতে পারছেনা সে ! কৌশিকের বাড়িতে কড়া নাড়তেই যমুনা মাসি দরজা খুলে দিল | যমুনা মাসি  অনেক বছর থেকে কৌশিকদের বাড়িতে কাজ করে ,রিয়া আর কৌশিক কে তোযমুনা মাসি  ই বাস স্ট্যান্ড এ পৌছে দিত স্কুলে যাওয়ার সময় !

যমুনা মাসি একগাল হেসে বলল  ” আরে রিয়া দিদিমনি যে ! বাব্বা ,কতদিন বাদে দেখলাম তোমাকে ,ছুটিতে বাড়ি এসেছ বুঝি ? ”

(রিয়া হেসে বলল)  “হ্যাঁ  ,আজি এলাম ,কৌশিক আছে গো বাড়িতে ?”

(যমুনা মাসি)  : দাদাবাবু উপরের ঘরে পড়াশোনা করছে |

রিয়া দৌড়ে উঠে গেল সিড়ি দিয়ে উপরের ঘরের দিকে ! কৌশিকের ঘরের দরজাটা ভেজানো |

(রিয়া দরজার বাইরে থেকে আওয়াজ করে বলল) “আসব ? ”

কৌশিক টেবিলে  বসে পিছনে না তাকিয়েই বলল  ” বাহ ! বিদেশে গিয়ে খুব আদব কায়দা  শিখেছিস দেখছি! এক বছর আগে তো আমি ঘুমিয়ে থাকলেও ,দরজা ভেঙ্গে হলেও ঢুকে পরতিস !”

রিয়ার রাগ মাত্রা ছাড়িয়ে গেল , টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে ,দুহাতে কৌশিকের জামা ধরে টেনে বলল ,” তুই ভেবেছিস কি ? যখন খুশি যেভাবে খুশি আমাকে অপমান করবি ? আমার গিফট ফেরৎ দিয়ে, ওই অসভ্যের মত চিঠি লিখেও তোর গায়ের জ্বালা জুরায়নি ? এখন তোর বাড়িতে এসেছি বলেও বিদ্রুপ করবি ? আমার দোষের মধ্যে কি !  না চাকরি পাবার পর এত কষ্ট হচ্ছিল সব ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তায় , বুঝতে পারিনি কিভাবে তোকে এসে বলব যে আমি এটা কোনদিন চাইনি ,আমি পারব না সব ছেড়ে থাকতে ,আমাকে কিছুতেই তুই যেতে দিস না! কিন্তু পরে জানলাম , তুই আমার মা বাবাকে বুঝিয়েছিস এসুযোগ সবাই পায় না ,ছেড়ে দেওয়া বোকামি হবে | আমি জেদ করেই চলে গেছিলাম তখন , কেন বার বার তোর কাছে হাত পাতব বলতে পারিস !”

(বলতে বলতে রিয়ার চোখ ভিজে উঠলো !) ( কৌশিক রিয়ার দিকে না তাকিয়েই বলল ) ” ভুল কি বলেছি ? মাস্টার্স  তো তুই করতিস না ,চাকরি ই যখন করবি তখন ভালো চাকরি পেয়ে ছেড়ে দেওয়ার মানে কি ? যে তোর resume বানানো থেকে ,ইন্টারভিউ এর ফর্ম পর্যন্ত ভরে দিয়েছিল ,সেই ছেলেটা সুখবর শুনল তুই বিদেশ পারি দেবার মাত্র ৭ দিন আগে আর তাও আবার অন্য কারো কাছে | এর আগে পর্যন্ত তো কোনো কষ্ট আলাদা ছিল না রিয়া ! সেদিন কেন হয়ে গেল শুধু তোর একার ? আর আমার কাছে হাত তো তুই পাতিস নি কখনো , বরঞ্চ আমাকে ৫০০০০ টাকার মোবাইল ফোন গিফট করেছিস আমার একবছরের রাতজাগা কষ্টের মুল্য স্বরূপ| ফোন করে ‘শুভ জন্মদিন’ বলা কি কোনভাবেই সম্ভব ছিল না তোর পক্ষে ? !”

(রিয়া কান্না ভেজা গলায় বলে উঠলো) ” ফোন কাকে করব ? দিনের পর দিন যে আমার ইমেইলের  উত্তর দেয় না তাকে ? আমাকে কি তোর পাগল মনে হয় ?”

(কৌশিক এবার রিয়ার দিকে তাকালো ,তারপর হেসে বলল) “তুই সত্যি পাগল রিয়া ! তোকে ইন্টারভিউ প্রিপারেশন এর সময় যে খাতা টা দিয়েছিলাম ,তার শেষের পাতায় তুই নিজেই লিখে দিয়েছিলিস আমার ইমেইল এর পাসওয়ার্ড ,আমি কিছুতেই মনে রাখতে পারি না তাই , সেই খাতাটা এখনো তোর কাছেই আছে যদি না ফেলে দিয়ে থাকিস ,হ্যাঁ এটা বলতে পারিস নিজের দরকারে আমিও তোর কাছে হাত পাতিনি ! আমার নতুন ইমেইল id এর পাসওয়ার্ড এ তোর নাম যা ভোলার উপায় আমার জানা নেই!”

রিয়া আর কোনো কথা বলতে পারছে না ,কান্নায় দুহাতে মুখ ঢেকে বিছানায় বসে পরেছে সে !

কৌশিক তার পাশে বসে হেসে বলল,  “যে সে মোবাইল পছন্দ করিসনি তুই আমার জন্য, নিজের মূল্য উসুল করিয়ে ছাড়লএ কদম |সেদিন কাকিমার মুখে শুনে ,তোর হঠাৎ আসার কারণ বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হয়নি ! এভাবে কলার  ধরে কৈফিয়ত নেওয়ার জন্যই তো তোর এই ঝটিকা সফর ,কিরে তাই না ?”

রিয়া চোখ মুছে পার্স থেকে iphoner বাক্স টা টেবিল এ রেখে বলল ,”এখানে পাসওয়ার্ড সেভ করে রাখা যায়  ,আর তোর mathematics ক্যালকুলেশন এর জন্য আমি কিছু application installed করে দিয়েছি।”

কৌশিক (শুধু বলল ) ,”জানি ,দেখেছিলাম তখনি !”

রিয়া (বলল ) ” তুই তো সবই জানিস ,শুধু .. ”

(তাকে শেষ করতে না দিয়েই কৌশিক বলল )” না ! তা কেন? কত কিছুই তো জানি না ,আবার কত কিছুই নতুন করে জানতে পারি , এই যেমন আজকে জানলাম তুই আমাকে ..”

রিয়া লজ্জায় পিছনে ঘুরে মুখ নামিয়ে ফেলল ,কৌশিক সেটা লক্ষ্য করে হেসে বলল,  ” ওই জানলাম ,তুই আমাকে ভুলে গেলেও ,আমার ম্যাথমেটিক্স ক্যালকুলেশন এর প্রয়োজন টা ভুলিস নি |”

রিয়া এবার হেসে টেবিল এর iphone টা হাতে নিয়ে বলল ” একদম ঠিক। তোর চিঠির কথা মত যদি বলি তাহলে এটা ই এমন জিনিস যা তোর সত্যি দরকার ,যা ছাড়া তোর এক মুহূর্ত চলবে না ! তাই তো ? নাকি আরো কিছু আছে যার প্রয়োজন এর থেকেও বেশি ?”

মিটিমিটি হেসে কৌশিকের দিকে তাকালো রিয়া , উত্তরে কৌশিক রিয়ার খুব কাছে এসে বলল ” তা আছে বৈকি , আর সেটা হলো আমার নতুন ইমেইল এর Password “!

প্রত্যাখ্যান

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

প্রেমিক ছেলেটি : আমার ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান করিস না দোহাই তোর ।
নির্বিকার মেয়েটি : কেন ভালোবাসিস আমাকে ?
প্রেমিক ছেলেটি : তা জানি না ,তবে ভালোবাসি ,মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি।
নির্বিকার মেয়েটি : সে তো বুঝলাম কিন্তু কারণটা কি ?আমার মধ্যে এমন কি দেখলি যা আর কারো মধ্যে নেই ?
প্রেমিক ছেলেটি : যদি বলি তোর ওই নীলচে চোখের মায়া আমাকে পাগল করে দেয় !
নির্বিকার মেয়েটি : ওটা কন্টাক্ট লেন্স! আর কোনো কারণ ?
প্রেমিক ছেলেটি : তোর এই ঘন কালো চুলের হাতছানি কে উপেক্ষা করা আমার কেমন যেন অসম্ভব মনে হয়।
নির্বিকার মেয়েটি : আমার চুল এত সুন্দর ছিল না ,তোকে বলিনি সম্প্রতি মাত্র ১২ টা সাক্ষাতে শহরের সবচেয়ে বড় হেয়ার স্পেশালিস্ট র জাদু স্পর্শ আমার চুলকে তোর মত অনেককেই হাতছানি দেওয়ার শক্তি দান করেছে।
প্রেমিক ছেলেটি : আমার অনেকদিনের চেনা তোর শরীরের গন্ধ ,সেটাও কি নকল বলতে চাস ?
নির্বিকার মেয়েটি : নকল কেন হবে ? সেটা তো আমার আমেরিকা নিবাসী মাসির প্রতি বছর ভালবাসা স্বরূপ পাঠানো ব্র্যান্ডেড সুগন্ধির মোহনী শক্তি ! নকল হলে বুঝি এতদিন ব্যবহার করতাম !
প্রেমিক ছেলেটি : আমি যে কিভাবে তোকে বোঝাব ? মানে তোর পা থেকে মাথা পর্যন্ত সবটুকুই আমার ভীষন ভালোলাগে ,আসল নকলের বিচার কখনো করিনি ,করার কথা ভাবতেও পারিনি ,তার আগেই বাঁধা পরে গেছি তোর এই অপরূপ সৌন্দর্যের মায়াজালে।
নির্বিকার মেয়েটি (সজোরে হেসে ): আমার সৌন্দর্য? আমার শরীর জুড়ে অত্যাধুনিক চোখ ধাধানো গয়না , পরনে প্রখ্যাত ডিসাইনারের শাড়ি,দামী প্রসাধনে উজ্জ্বল মুখ ,যত্ন করে করা নেল আর্ট ,কালো রং করা মায়াবী চোখের চাহনী , অনেকদিনের চেষ্টায় রপ্ত করা সুন্দর করে কথা বলার কায়দা ,এসবের কথাই বলছিস তো ? কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবি এ সবই যে কৃত্রিম !
প্রেমিক ছেলেটি : প্রত্যাখ্যান কর কিন্তু এভাবে বিদ্রুপ করিস না ! কৃত্রিম মানে কি ? কোনো কিছুই কি তাহলে তোর আসল নয় ? তবে কি তোর কথা মত তুই একটা মাংসের দলা ছাড়া আর কিছুই নস ?
নির্বিকার মেয়েটি (হেসে ) : ভালো বলেছিস ,মাংসের দলা ,আমারও তাই মনে হয় !
প্রেমিক ছেলেটি : বুঝেছি ! আমাকে কেন আর ভালোবাসবি তুই ? তোকে ভালবাসার লোকের তো আর অভাব নেই ,আমি কি আর দেখিনি ভেবেছিস তোর সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এ গন্ডা গন্ডা ছেলের প্রকাশ্যে প্রেম নিবেদন ,তার মধ্যে তো কতজন আবার N R I ! ওদের মধ্যেই কাউকে বোধহয় তোর মনে ধরেছে কি বল ?
নির্বিকার মেয়েটি : না !
প্রেমিক ছেলেটি : তবে কি পক্ষীরাজে চড়া রাজপুত্রের অপেক্ষা তে আছিস ?
নির্বিকার মেয়েটি : মোটেই না ! রাজপুত্রের দৃষ্টিও যে সিংহাসনের চাকচিক্যতেই আটকে থাকবে চিরকাল।
প্রেমিক ছেলেটি : তাহলে কি চাস তুই ?
নির্বিকার মেয়েটি : সে তুই বুঝবি না ! তবে এটুকু জেনে রাখ ,তা যদি কেউ দিতে পারে কোনো বাক্যালাপের অবকাশ তাকে আমি দেব না ,তার হাত ধরে হারিয়ে যাব এক অনন্ত জীবনে ,আর কোনদিন পিছনে তাকিয়ে দেখবনা ফেলে রেখে যাওয়া মাংসের দলার দিকে ।
ধন্যবাদ ,
BongNote

বাড়ি ফেরা

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

তিতিরের প্লেন টা ১ ঘন্টা লেট। প্রায় ২ বছর বাদে ১ মাসের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে সে। জানলা দিয়ে দেখতে পেল সে তার নিজের শহর। একটা অদ্ভুত আনন্দে মন টা ভরে গেল তার। অনেকবার অনেক আলোচনায় কলকাতার পিঠ যখন কোনঠাসা তার বিরুদ্ধে ওঠা জ্যাম জট, রাজনীতি ,সাধারণের নিরাপত্তা ,চাকুরীভাব ইত্যাদি নানারকম অভিযোগে, তিতির মুখে কিছু না বললেও মনে মনে কলকাতা কে বলেছে “তা হোক,তবু তুমি আমার , সেই ছোট থেকেই যে ভালোবাসি তোমাকে ,তুমি না থাকলে তো কিছুই থাকবে না, আমার ছোটবেলা,আমার নিজের মানুষ গুলো,আমার করা অগনিত ভুলের হিসেব,জীবনে সফল হবার সেই লম্বা পথ ,সব কিছু যে মুহুর্তে হারিয়ে যাবে।”
তিতির প্লেন থেকে নেমে একটা ট্যাক্সি ধরে নিল।,বাড়িতে কেউ জানে না তিতির আসছে আজকে,সবার চোখে অপ্রত্যাশিত আনন্দ দেখার লোভ তিতির কিছুতেই সামলাতে পারেনি ।

নিজের শহর কে সে প্রাণ ভরে দেখতে লাগলো ট্যাক্সির জানলার বাইরে দিয়ে , কিছুই তো বদলায়নি এই ২ বছরে , ওই তো ওই রাস্তা টা দিয়ে একটু এগোলেই ডানদিকে পরবে তিতিরের কলেজ।

ট্যাক্সি টা আরেকটু এগোতেই তিতির ভ্রু কুচকে ট্যাক্সি ড্রাইভার কে বলল ” এটা কবে হলো এখানে?”

ট্যাক্সি ড্রাইভার একগাল হাসি নিয়ে উত্তর দিল  “এটা তো শপিং মল দিদিমনি , সিনেমা হল ও আছে ভিতরে , তা আমি তো সেই প্রথম দিন থেকেই দেখে আসছি ,আপনি বোধহয় কলকাতায় থাকেন না , তাই না দিদিমনি?”

তিতির এবার প্রচন্ড বিরক্তিতে উঁচু  গলায় বলল ,  “তুমি এখানে কতদিন আছো শুনি? ”

প্রচন্ড ভিড়ে ড্রাইভার তিতিরের বিরক্তি লক্ষ্য না করে আবার অমায়িক হাসি হেসে বলল, ”তা দিদিমনি ১ বছরের উপর হয়ে গেল আমার এখানে ।”

তিতির উপেক্ষার হাসি মেখে বলল, ” ও তাই বলো , সবে ১ বছর হয়েছে কলকাতায় এসেছো , ঐজন্যই ! এখানে আগে শপিং মল ছিল না, একটা বইয়ের দোকান ছিল তার পাশে একটা প্রিন্টার আর xerox এর দোকান, আর তোমার কেন মনে হলো আমি কলকাতায় থাকি না ? এই শপিং মল টা চিনি না বলে ? হ্যাঁ  ,আমি কদিন এখানে ছিলাম না ঠিকই , কিন্তু আমাদের আদি বাড়ি কলকাতায় , আমার ঠাকুরদাদা সেই ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় সপরিবারে চলে এসেছিল কলকাতাতে , তখন থেকে এটাই আমাদের শহর ! আমার জন্ম , পড়াশোনা , চাকরি সব এই কলকাতায় , আর কালকের একটা শপিং মল চিনিনা বলে তুমি বলছ আমি কলকাতার মেয়ে নই ?”

হতকচিত ড্রাইভার তিতিরের এই রাগের কারণ বিন্দু বিসর্গ বুঝতে না পেরে ,অল্প হেসে বলল ” না দিদিমনি ! তা হবে কেন ? এটা তো আপনাদেরই শহর , আমরা গ্রামের মানুষ পেটের দায়ে পরে আছি।”

এবার তিতিরের মন খারাপ করে উঠলো , সত্যি এভাবে বলাটা একদম উচিত হয়নি তার , একটা অচেনা মানুষের পক্ষে কিভাবেই বা জানা সম্ভব এ শহর তার কতটা আপন , কি প্রচন্ড অভিমানে তার মন ভরে যায় কলকাতার সাথে তার সম্পর্ককে মুহুর্তের জন্য কেউ অস্বীকার করলে , এ তার অধিকারের জায়গা , হোক শত বছরের ফারাক , যা তার নিজের তা সমসময় নিজেরই থাকবে ।

তিতির ব্যাগ থেকে একটা চকলেট বার করে ড্রাইভার এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “খাবেন ? আমার কথায় কিছু মনে করবেন না প্লিস , আসলে লম্বা প্লেন জার্নি তে আমি খুব ক্লান্ত !”

ড্রাইভার চকলেট  টা হাতে নিয়ে বলল , ” কি যে বলেন দিদিমনি ! নিজের মাটির টান কার বা নেই বলুন , আমিও তো ভিটে বাটি ছেড়ে এখানে পরে আছি কিছু বেশি রোজগারের জন্য , তাই বলে কি আমি নিজের জায়গা ভুলে গেছি ? কলকাতা আমার কাছে সবসময় আপনাদের শহর হয়েই থাকবে , আমার নিজের কোনদিন হবে না !”

তিতির খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়েই আবার জানলার বাইরে দেখতে লাগলো আর কলকাতাকে মনে মনে বলল  “দেখলে কত ভালোবাসি তোমাকে!আমার একছত্র অধিকারে আপাতত আর কেউ ভাগ বসানোর নেই !”

বাড়ির সামনে ট্যাক্সি দাড়াতেই তিতির দেখল কুট্টুস একেবারে গেট এর বাইরে চলে এসেছে ,প্রবল বেগে লেজ নাড়ছে আর আনন্দের চিৎকারে তিতির কে যেন সে বলছে “ওমনি ভাবলেই হলো ? আমাকে ফাঁকি দেওয়া ওত সহজ নয় ,আমাকে যখন ড্রপার দিয়ে দুধ খাওয়াতে,তখনই তোমার গন্ধ আমি প্রানের ভিতরে নিয়ে নিয়েছি সারাজীবনের মত ।” কুট্টুস তিতিরের আদরের কুকুর ,তার রাত্রিবেলার ভুতের ভয়ের একমাত্র ভরসা ,সবরকম খাবারের নির্বিকার ভাগীদার,নিমেষে মন ভালো করে দেবার মোক্ষম ওষুধ ,প্রচন্ড ভালবাসে তিতির ওকে।

কুট্টুসের আনন্দের কারণ জানতে মা বেরিয়ে এসে তিতির কে দেখতে পেয়ে একেবারে কেঁদে  কেটে অস্থির, কাঁদতে কাঁদতে  যা বলল তা তিতিরের সাধের surprise এর excitement ঠান্ডা করতে যথেষ্ঠ । তিতিরের ফোন অনেকক্ষণ বন্ধ পেয়ে দিশেহারা হয়ে মা নাকি তিতিরের অফিসের সব বন্ধুকে ফোন করে ফেলেছে,শুধু তাই করেই শান্ত হয় নি সে মহিলা ,তিতির যাদেরকে প্রচন্ড ইমার্জেন্সি ছাড়া call করতে বারবার করে মানা করেছিল ,যেমন তার অফিসের ম্যানেজার,এপার্টমেন্ট মালিক ,তাদেরও নম্বর  একবার নয় ,বহুবার ঘুরিয়ে ফেলেছে এর মধ্যেই।

তিতির কিছু বলার আগেই মা রাগী গলায় বলল “আমার দিকে অমন করে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই , নিজে মা হও ,তখন বুঝবে হতচ্ছারি, এ কি জ্বালা।” এই কথাটা সেই ছোটবেলা থেকে কারণে অকারণে শুনে আসছে তিতির ,শব্দ sequence ছেড়ে দিলেও ,বলার ভঙ্গি টাও অবিশ্বাস্য ভাবে প্রতিবার সেই একই রকম । তিতির মা কে যেই surprise এর বাপারটা বোঝাতে গেল ,তাকে শেষ না করতে দিয়েই মা বলে চলল , ” বুঝেছি আমি ! আজকালকার কি এক হয়েছে ! সব ব্যাপারে surprise, মা মরে গেলে surprise এর জল মিষ্টি দিও।”

মা এর গলার আওয়াজে বাড়ির বাকি সকলে একে একে বেরিয়ে এলো। সকলের আশ্চর্যের অভিপ্রকাশ ,প্রাণ খোলা আনন্দে মায়ের  প্রথম রাউন্ড বকুনি টা ভুলেই গেল তিতির | গোটা বাড়ি একেবারে গমগম করে উঠেছে তিতিরকে ফিরে পাওয়া র আনন্দে! কাকু , কাকিমা , ভাইয়ের সাথে গল্পের ফাঁকে  তিতির বলল “বাবাকে দেখছিনা তো,কোথায় গেলো এতো সকালে ?”

(মা বলল ) “বাবা তোর গলার আওয়াজ পেয়েই পিছনের দরজা দিয়ে বেড়িয়ে গেছে বাজারে ,আজ তো রবিবার ,বাজার বন্ধ হবার সময় হয়ে গেল,আর দেরী হলে কিছুই পাবে না,তোর সাথে কথা বলতে গেলে যদি মাছ মাংসের দোকান বন্ধ হয়ে যায় ,সেই আফসোসের দায় আমাকে বইতে হবে সারাদিন গজর গজর শুনে ,তাই বাপু আমি আটকাতে যায়নি। ”

তিতির অবাক হয়ে ভাবলো কিছু মানুষ , কিছু সম্পর্ক কেমন সারাজীবন একই থেকে যায় ,সময় চেষ্টা করেও একটু পরিবর্তনের দাগ কাটতে পারে না। ভাগ্যিস পারে না ,নাহলে তিতির তো এই অচেনা পৃথিবীতে কবেই হারিয়ে যেত,কোনো কিছুরই যে হিসেব মিলত না কখনো ।

নিজের চেনা বিছানার ওপর কুট্টুসের সাথে খানিক গড়িয়ে নিল তিতির , তারপর দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে মাসিমনির বানানো তেতুলের আঁচার খেতে খেতে তিতির জিজ্ঞাসা করলো “ব্রেকফাস্ট এর মেনু কি মা ?”

রান্নাঘর থেকে ভেসে এলো মায়ের গলার স্বর  “রবিবার যা হয় মা গো ,লুচি আর ছোলার ডাল!”

The Surprise for One extra Sugar Nut

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

On a soothing summer evening, back from a hectic routine at office when I sat on my comfy sofa sipping delicious hot sugary syrup we call tea, it seemed as though the summer rain was awaiting my return to home today. My balcony door was half open and I was too lazy to close the same. Was it my laziness or the weight of my childhood memories which were stopping me to get up and close the door, rather sit and continue gazing forward to my balcony, or backward in the Memory Lane!

Suddenly my silent gaze outside was interrupted when my eyes were drawn to the carpet adjacent to the balcony, which was almost half wet by then. So the lazy girl inside me was compelled to overcome the magnetic force of sofa and be a savior of my carpet playing hide and seek with the increasing rain.I got up to close the balcony door, and looked outside, the rain had become heavier by now, and there was no one to be seen out on the silent street across my apartment on that rainy summer eve. In this silence, as my eyes were following one car after another zooming through the road afar, sidelining the heavy rain, the headlight flash of one of the cars reminded me of the torch light my uncle used to flash on the falling rain from our drawing room when there used to be no power. It flashed an image of my innocent childhood, a small me jumping with excitement of stepping outside and saying “Hi” to the falling rain!!

The heavy rain outside, which by now, as per my conscience should have interrupted the normal way of life or at least would have brought about some change in the entropy and could have given me a chance to experience an altogether  different face of my American town, but it could not become that much generous like always,it seemed though everything else was sidelining the thunderous rain and life was running through the high speedways and the comforts of home were still intact! The power was still on and the sound of rain was intermittently interrupted by my TV running in the background. I suddenly came back to present and realized this is far away from my home, where the unleashing rains  cannot interrupt the way of life, it cannot ruin planned routine or create unwanted excitement or a reason to worry for anybody.

Suddenly, my phone beeped, a Weather Alert popped up on my smartphone “The Rain will start at 6 pm and continue till 11.15 pm” ,the same alert which had popped up on my phone several times since morning, this accurate prediction by technology made something even more precious to me – The Excitement of Sudden Rains in my Childhood, The memory of getting drenched in rain while returning back from school, the tiffin sharing game in school bus after the day being declared a rainy day at the closed school gate, the in-situ kitchen menu change to ‘Khichdi and Fish fry’! Moreover Only the knee high water all around from the beautiful and unrelenting rainfall could compel granny to extend her stay in my home for one more day. Fortunately, there used to be no weather alerts and smartphones back in those days to ruin those priceless childhood moments for me.

Back then when Grandpa used to secretly reveal “God gives surprise if we can make him Happy”, Awaiting that much anticipated surprise, I bribed my God with an extra sugar nut, praying intensely to shower the surprise a bit sooner! Suddenly, hearing my aunt’s voice coming from a distance “Oh God! all the washed clothes would become wet again now!!!” I immediately got ready to rush above and help my aunt.The emerging black cloud cover in one corner of the afternoon sky whispered in my ears “your surprise for an extra sugar nut child..!” I could not gather myself enough out of this surprise and was too busy accumulating the joy within for the celebration, suddenly my aunt called up again “Come with me! Need to bring all the clothes from the roof!” With another excited gaze at the afternoon sky from my balcony (which was almost half-black sky by now), holding my breath I started running upstairs to help my aunt, a question in my heart puzzling me all the way up to the roof  “How come the black cloud covered so much distance in such a less time! Did it run faster than me?” I would need to ask Grandpa later. When I finally reached the rooftop, I heard aunt saying “if this rain could have waited for another half an hour, these two of my sarees could have also been dry like rest”.It triggered an innocent inherent pride in me of knowing why the rains came in early today and an innocent guilt of knowing who the little culprit was!

“Let’s go down, rain will start in a few minutes now” aunt said ignoring my unwilling nod of the head,she quickly held my little hand, so my little feet had to follow helplessly behind. And then, someone suddenly whispered in my head again “One more extra sugar nut child!” I could not wait to make the deal with my God “Please let me stand in the rain for a while today ,this time I will not fall sick. Last time when I was down with fever and everybody was scolding aunt ,I recalled uncle telling her ,if she would have given me a precaution medicine beforehand, all the mess could have been avoided.Only You can convince aunt this time, If you do that, I promise ,you will get one extra sugar Nut tomorrow as well.”

Grandma used to tell me, ‘God likes Sugar Nut’ but I had no idea before that day that it was only His favorite food!! Half way down from the roof, my aunt puts down her tub of semi dry clothes, and whispers in my ear “Want to go there again?!” “Like last time?!!” I jumped with a smile. “Not at all”, my aunt added, “Unlike last time, today I will give you a medicine kept in your uncle’s drawer and nobody will know anything”. I hugged my aunt with infinite excitement and we rushed back up the flight of stairs to the roof again. My aunt was humming a song after making a chignon with her messy hair, she looked at me with a smile and said “let’s go to the middle of the roof,The rain has started”. I told with a scared voice, “And everyone will scold you again!”. She answered with a smile childishly, “How would anyone get to know sweetheart, I have brought another dress for you, will make you wear the same before going downstairs, if anybody asks the reason for your messy hair, we will tell it is because of the hair oil I have applied onto your hair. Moreover, your summer vacation has already started so you will be in my room only, and I will tell everybody that you are going to sleep with us tonight in our room”. With such an elaborate back up plan to avoid the scolding, I was confident the bribe of another extra sugar nut had definitely worked! I whispered to her ears “No, I will not sleep, I will listen story from you, Ghost Story!”

We could not end our talk, suddenly the rain arrived and drenched both of us instantly. My aunt asked “Do you remember the dance you performed at last year’s school function?” I told “Yes! But don’t know the song”. She answered, “I know the song, you start!” I started dancing with her Rabindra Sangeet in the chorus, my little feet rejoicing the touch of water accumulated on the roof floor. The aura, the moment was nothing less than the feeling of a Peacock dancing towards the first summer rain, ‘My Childhood Rain, The Surprise for One extra Sugar Nut’.

Thanks,

BongNote

একটা বেশি নকুলদানার Surprise

Comments 3 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

অফিস থেকে ফিরে সোফায় চা এর কাপ নিয়ে বসতেই বৃষ্টি নেমে এলো । আমার বারান্দার দরজাটা আধখোলা । প্রথমে খানিক টা আলসেমিতেই দরজা টা বন্ধ করতে উঠলাম না , তারপর যখন বৃষ্টির ছাট কার্পেট টা আধ্ভেজা করে দিল অগত্যা অনিচ্ছাতেই উঠে গেলাম। বাইরের দিকে তাকালাম , কেউ নেই রাস্তায় , অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে , পরপর দুটো গাড়ি গেল ,হেডলাইটের আলো দেখে ছোটবেলায় কাকুয়ার সাথে টর্চ জেলে বৃষ্টি দেখার কথা মনে পরে গেল । এটা আমেরিকা , এখানে বৃষ্টির দিন আর এমনি দিনের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই , হঠাৎ বৃষ্টি আমেরিকার নির্ধারিত রুটিন ভেস্তে দিতে পারে না , তৈরি করতে পারে না কোনো অযাচিত উচ্ছাস , দুশ্চিন্তা অথবা অহেতুক সোরগোল । আচমকা ফোনের আওয়াজে চমকে উঠলাম , দেখি weather এলার্ট, প্রচন্ড বৃষ্টি হবে বিকেল ৬ টা থেকে রাত ১১.১৫ অব্দি। সকাল থেকে অনেকবার এসেছে এই একই  এলার্ট , ভুলো মন মানুষের জন্যে বুঝি বারে বারে কড়া নাড়ার এই প্রযুক্তি । আজকের প্রযুক্তি র নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী , আমার ছোটবেলার সেই হঠাৎ বৃষ্টির আনন্দের স্মৃতিকে আরো বেশী  জুরিহীন করে তোলে । ভিজে ভিজে বন্ধুদের সাথে স্কুল  থেকে ফেরা ,বৃষ্টির দিনে বাড়িতে অতিথি  আসায় কাকুয়ার সাথে জলে লাফাতে লাফাতে তেলে ভাজা আর মিষ্টি কিনতে যাওয়া , rainy day তে ছুটির আনন্দে স্কুল বাসের মধ্যে বন্ধুদের টিফিন ভাগ  করে পিকনিক , হঠাৎ ঠিক হওয়া  মেনু খিচুড়ি আর মাছ ভাজা , রাস্তায় অনেক জল জমার জন্য আমাদের বাড়িতে দিদার একদিন বেশি থেকে যাওয়া , আমার ছোটবেলার এই অনাবিল আনন্দ গুলোকে ভেস্তে দিতে পারেনি কোনো weather এলার্ট। দাদুভাই বলত ভগবান খুশি হলে নাকি surprise দেয়. প্রচন্ড গরমে সেই surprise এর অপেক্ষা, ভগবানকে একটা বেশি নকুলদানা ,যদি surprise টা একটু তাড়াতাড়ি দেন সেই আশায় ।

বিকেলে হঠাৎ কাকীমার গলার আওয়াজ  “এই রে কাপড় গুলো সব ভিজে যাবে , ছাদে মেলা সব !!!”

দৌড়ে বারান্দা য় গিয়ে দেখি আকাশের এককোণ কালো হয়ে এসেছে , মনে আসছে একটাই কথা  “একটা বেশী নকুল দানার surprise”।

সে আনন্দ কে সামাল দিতে দিতেই কাকীমার ডাক , “একটু চল আমার সাথে ছাদে , দৌড়ে কাপড়গুলো নিয়ে আসি ” ।

এক দৌড়ে ছাদে গিয়ে তো অবাক ! আকাশ টা যে অর্ধেকের বেশি কালো হয়ে গেল এর মধ্যে ,মেঘ কি তাহলে আমার থেকেও বেশি জোরে দৌড়ায় ? পরে দাদুভাইকে জিজ্ঞাসা  করতে হবে।

কাকীমা দেখলাম বলছে , “এখনো ২ তো শাড়ি আধভেজা , বৃষ্টি র ও বলিহারি ,একটু পরে এলেই আমার শাড়ি দুটো শুকিয়ে যেত।” মনে ভাবলাম , একটা গোটা নকুলদানা দেওয়া ঠিক হলো কি !!! আমার তাড়াতেই কাকীমার দুটো শাড়ি আধ্ভেজা রয়ে গেল !!

কাকীমা বলল ,“চল এবার , নিচে যাই , বৃষ্টি এলো বলে ।”

একটুও নিচে যেতে ইচ্ছা করছে না, কিন্তু কাকীমার হাতে বাঁধা ছোট হাত আর কি বা করে ! গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চললাম কাকীমার পিছন পিছন, হঠাৎ খেয়াল হলো একটা বেশি নকুল দানার কথা , মনে মনে ভগবানকে বললাম “ প্লিস ! কাকীমাকে একটু বলো না তুমি , একটু খানি ভিজেই চলে যাব এবার, আগেরবারের মত জ্বর হবেই না,সবাই বকাতে কাকীমা যখন কাঁদছিল ,আমি শুনেছি কাকুয়া তো কাকীমাকে বলছিল , ‘বুদ্ধি করে ওষুধ দিয়ে দিলেই আর কিছু হত না’, কালকেও আরেকটা বেশি নকুলদানা দেব তোমায় , প্লিস একটু বলো কাকীমাকে ”।

দিদা বলত ভগবান নকুলদানা ভালো খায় , কিন্তু এটাই যে সবচেয়ে প্রিয় খাবার সেটা সেদিনই প্রথম জেনেছিলাম।

কাপড়ের বালতিটা সিড়ি র তলায় রেখে, কাকীমা কানে কানে আমাকে বলল  “কিরে যাবি আবার ?”
আমি হেসে বললাম ,  “আগের দিনের মত?” ,
কাকীমা: “মোটেই না , কাকুয়ার ঘরে রাখা মিষ্টি ওষুধ খায়িয়ে দেব আমার সোনাকে এবার ,কেউ জানতেই পারবে না।”

আমি কাকীমাকে জড়িয়ে ধরলাম আনন্দে , আমরা দৌড়ে ছাদে চলে গেলাম আবার , গুন গুন করে গান গাইছে কাকীমা , অগোছালো চুল গুলো খোপা করে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “চল ছাদের মাঝখানে যাই ,বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে ।”
আমি বললাম, “যদি আবার সবাই তোমায় বকে ?”
(কাকীমা ) “জানবে কি করে সবাই ? আমি আরেকটা শুকনো জামা নিয়ে এসেছি তোর , নিচে যাবার সময় পড়িয়ে দেব আর এই তেলের শিশি দেখিয়ে বলব তেল মাখিয়ে দিয়েছি বলে চুলগুলো অমন , তাছাড়া তুই তো আমার ঘরে থাকবি , এখন তো গরমের ছুটি , আমি বলে দেব আজ আমার সাথে ঘুমাবি” ।
(আমি ) “ঘুমাবো না , গল্প বলবে তুমি , সারা রাত ,আগের দিনের মত , ভুতের গল্প ” ।
(কাকীমা ) “ সে হবে ক্ষণ , এখন বল তোর স্কুলের অনুষ্ঠানে যে নাচ টা করেছিলি সেটা মনে আছে”
(আমি ) “হ্যাঁ , কিন্তু গান জানি না তো ” ।
(কাকীমা) “আমি জানি , তুই শুরু কর ”।

বলতে বলতেই বৃষ্টি নেমে ভিজিয়ে দিল আমাকে আর কাকীমাকে। ছাদে জমা জল গুলোতে পা ফেলে নাচতে লাগলাম কাকিমার গানের সুরে ” হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে , ময়ুরের মত নাচেরে “।

আমার ছোটবেলার বৃষ্টি , আমার একটা বেশি নকুলদানার surprise !!!