ধোঁয়াটে ইঙ্গিত

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

পর্ব এক 
ছাদে একা বসে ছিল গিনি। ডিসেম্বরের শেষের সময়টায় চারিদিকের জগৎ টা যখন উৎসবের আমেজ উপভোগে ব্যস্ত একটা ভীষণ ভয় তাকে যেন আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে। ২ বছরের গিনিকে তার পছন্দ সই  বড়দিনের উপহার কিনে দেবার জন্যই সেদিন  বেড়িয়েছিল মা।  তার কিছু ঘণ্টা পর একটা ঝোপের ধার থেকেজীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে ২ বছরের গিনিকে পুলিশ তার বাবার হাতে তুলেদিয়েছিল। 
প্রকৃতির নিয়মে দুবছরের শিশুর অপরিণত মস্তিস্ক সেই ভয়াবহ স্মৃতির ভার বহনে অক্ষম  , এমনটা মনে হলেও গিনির ক্ষেত্রে সত্যিটা এক অস্বাভাবিক।  এক অদৃশ্য শক্তি  সেই দুর্ঘটনার মুহূর্ত গুলো সবিন্যস্তে গিনির সামনে উল্টে পাল্টে ধরেছে। অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাসারি সেজে উঠেছে  অলৌকিক  নিয়মে  , মায়ের স্পর্শের চেনা অনুভতি , আদো কথা , খিলখিল হাসি,  ভুবন মোহিনী সুরের প্রত্যাশিত ছন্দ পতন।  তখন বুঝতে না পারলেও,বাড়তি বয়সের পরিণত বুদ্ধি দিয়ে গিনি বুঝেছে সুন্দর  মুহূর্ত গুলোর রক্তময় হয়ে ওঠার সেই ভয়াবহ স্মৃতিমন্থনের পিছনে,  লুকিয়ে ছিল  কোনো গর্হিত ইঙ্গিত , খারাপ কিছু ঘটে যাওয়ার আভাস , দূরত্ব বাড়ার আগের মুহূর্তের নিস্তব্দতা।

স্পষ্ট মনে আছে গিনির , রোজের অভ্যাসমত স্কুলের   প্রার্থণা ঘরে  , সকলের অলক্ষ্যে পকেটে লুকিয়ে নিয়ে আসা চক দিয়ে  যীশু মূর্তির গায়ে  লেগে থাকা রক্তের রঙ মুছে দিচ্ছিল সে।  মাত্র আট  বছর  বয়সে সেই বা কি করে জানবে , কিছু দাগ যে মোছা যায় না , কিছু ক্ষতকে ঢাকতে গেলে আরো বেশি করে তা সামনে এসে পড়ে ।  গিনির চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল  এক ভীষণ চেনা মুখ, সে শুনতে পেয়েছিল তার প্রিয় স্বরের গুনগুন গান , দেখেছিল মায়ের বুকে আদরে জড়িয়ে থাকা নিজেকে । ওরা ওই গাড়িটা করে কোথাও যাচ্ছে , রাস্তাটা খুব উঁচুনীচু , গিনি অনুভব করছে অসম্ভব ঝাঁকুনি , মা যেন কি একটা বলল , ভালো শোনা যাচ্ছে না , ভীষণ হওয়ার শব্দ।  একি! সামনে এগিয়ে আসা গাড়িটা থামছে না কেন !   মা যে খুব ভয় পেয়ে যাচ্ছে , আচমকা সেই কান ফাটানো আওয়াজ , বুকের শিশু খোলা জানলা দিয়ে পাশের ঝোঁপে গিয়ে পড়ল , চারদিকে রক্তের ছিটে , সব শেষের গোঙানি , দমবন্ধ করা কালো ধোঁয়া, চোখ বন্ধ করে ফেলল গিনি।

ঘামে ভিজে যাওয়া , ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকা  আট বছরের মেয়েটিকে করা কোনো প্রশ্নেরই উত্তর সেদিন পাননি স্কুল শিক্ষিকা প্রতিমা কর । সবসময় একা থাকতে চাওয়া এই মেয়েটির এমন  অদ্ভুত আচরণ দেখেও  সেদিন চিন্তিত হননি প্রতিমা দেবী ।  অন্যান্য শিক্ষিকারা এমন ঘটনা বাড়িতে জানানোর কথা বলতে তিনি বলেছিলেন , “সব বাচ্চা তো সমান হয় না।  তাদের মাথা , তাদের মন , সবই একে ওপরের থেকে আলাদা।   কোন দোষের আড়ালে কোন গুণ লুকিয়ে আছে বা কোন সমাধানের আড়ালে নতুন সমস্যা, কেউ কি জানে! এ নিয়ে অহেতুক চিন্তা অপ্রয়োজন।” রোজের মত স্কুল বাসে নয় , সেদিন প্রতিমা মিসের হাত ধরে  বাড়ি ফিরে এসেছিল গিনি। ঘরে ঢুকে সবসময় হাসতে থাকা জ্যাঠামণিকে জীবনে প্রথমবার কাঁদতে দেখেছিল সে। সারা রাত ফুঁপিয়ে কাঁদা  গিনির ঘুম , পরদিন ভেঙেছিল জ্যাঠামণিরই ডাকে। ফুলে যাওয়া চোখ নিঃস্পলকে তাকিয়ে পরম স্বস্তিতে দেখেছিল তার জ্যাঠামণি আর কাঁদছে না।  গিনির গলা জড়িয়ে ধরে জ্যাঠামণি বলেছিল, “তোর মায়ের মত জ্যেঠিমাও কাল সকলের সাথে আড়ি করে দিয়েছে রে গিনি ! ওরা খুব বন্ধু ছিল তো , তাই শলাপরামর্শ করেই  এমন ঘটিয়েছে । আমাদের অবস্থা দেখে দুই বন্ধুর খুব হাসির ফোয়ারা ছুটেছে হবে , ঠিক আগের মত । লুডোর গুটি লুকিয়ে জেতাকে জোচ্চুরি বলে , আমি এই হার মানি না। তাই শুনে রাখ , আড়ি বৈ তো কিছু নয় , ওমন হয়েই থাকে , তাতে কাঁদতে আছে নাকি ! আমরাও হাসবো , মজা করবো , সবটা দিয়ে বাঁচবো , ওদের ছাড়াই। হ্যাঁ হ্যাঁ ওদের ছাড়াই। ”

আজ  আরেকটা বড়দিন।  ষোল বছরের গিনি  এখন পরিণত বুদ্ধির অধিকারী , বিজ্ঞানে ঘেরা দিন রাত।  তার পরিশ্রমের  ফর্মুলা আবিষ্কার করেছে তিনটি বিস্ময় ক্ষমতা ধারী  যন্ত্র , ফিরিয়ে দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক , আড়াল করেছে অযাচিত কতকিছু। প্রতি বছরের মত স্কুল ছুটি থাকা সত্ত্বেও  দাড়োয়ানজি গিনির বলে দেওয়া সময় মতই চাবি নিয়ে উপস্থিত ছিল  স্কুলের দরজায়। প্রার্থনা ঘরে যীশু মূর্তির সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে চোখ বন্ধ করতেই আবার ভেসে উঠল সেই ভয়াবহ দৃশ্য।  উল্টানো গাড়ি,মায়ের বাঁচার চেষ্টা  , রক্ত ভরা রাস্তা , ঝোপের মাঝে অসহায় ছোট্ট শিশুর অদম্য কান্না। গিনির দিকভ্রান্ত হয়ে স্কুল থেকে ছুটে বেড়িয়ে যাওয়ার কারণ  বৃদ্ধ দারোয়ানের বোধগম্য হয়নি।

পর্ব দুই 


ভয়ের মোড়কে নিজেকে গুটিয়ে  অস্থির পায়ে ছাদে  পায়চারী করছিল গিনি ।  সিঁড়িতে অচেনা পায়ের শব্দে পিছনে ঘুরল সে ।  আগন্তুকের মুখ অন্ধকারে  অস্পষ্ট।

গিনি : কে ?

আগন্তুক : আমি সময় , আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িংগেস্ট।

গিনি :আপনি এখানে  ?

সময় : সন্ধ্যেবেলার নাকি আপনার দেওয়া একটা ডাক নাম আছে , ছাদবেলা।  দিদার কাছে কথাটা শুনে হাসলেও এখন তা বেশ মানানসই বলেই মনে হচ্ছে।

গিনি :আপনি আমার বাড়ি চিনলেন কি করে ?

সময় : সেদিন লেকের ধারে নেওয়া  আপনার  ফর্মুলার খাতার প্রথম পাতাতেই  নাম , ঠিকানা ,বাড়ির নম্বর এমনকি ইমেইল পর্যন্ত লেখা আছে। কিন্তু তা দেখে আপনার বাড়ি আসতে হলে এত গুলো দিন অপেক্ষা করার কোনো যুক্তি খুঁজে পেলে অবশ্যই বলবেন , ততক্ষণ না হয়  বিশ্বাস করুন  প্রেরকের লিখে দেওয়া ঠিকানা  , এই  চিঠিখানা পৌঁছানোর দায়িত্বপূরণের কাজে আমায় সাহায্য করেছে।

গিনি নিজের অপ্রস্তুত ভাব আড়াল করে কাগজের চিরকুট টা হাতে নিতেই  দেখল মন ভালো করে দেওয়া সেই চেনা হাতের লেখা ।

ওরে মেয়ে ,

কাঁপা হাতে আলুভাজা বেস্বাদ হয় , তাই বলে প্রাণদন্ড ? দিদার মরা মুখ ছাড়া বুঝি দেখবি না পণ করেছিস ?

গিনির শুধু গিনির ( আগে মচমচে  , এখন ন্যাতানো ) আলুভাজা দিদা।

গিনি :সত্যি ! পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে , তারপরে কিছু নিজস্ব কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে আর যাওয়া হয়নি দিদার কাছে , আপনি আছেন বলেই বোধহয় আরো নিশ্চিন্তে ছিলাম, একটা ফোন করার কথাও খেয়াল হয়নি।ক্ষমা চাওয়ার কোনো অজুহাত খুঁজে দেবেন আমাকে?

সময় : নিশ্চই দেব। অভিযোগ ও অজুহাত  মেল করানোই আমার নেশা , এ খেলায়  দাবার থেকেও বেশি বুদ্ধি লাগে।

গিনি : আমি কাল যাবো তাহলে।

সময় : কাল ? কিন্তু তাহলে তো …

এক অজানা ভয় ঘিরে  ধরল গিনিকে , ঠান্ডা হতে শুরু
ইঙ্গিত,অবশ্যম্ভাবী পরিণতি,আতঙ্কে কেঁপে উঠল  কণ্ঠস্বর:তাহলে কী ? দেরী হয়ে যাবে ? দেখা হবে না ? আপনি সব জানেন তাই না ?

সময় : হ্যাঁ  জানি। কখনো বেশিরভাগটা  কখনো বা   সবটাই।

গিনি আর ভয় আড়াল করতে পারছে না , অস্থির স্বরে কাঠিণ্য এনে বলল  : তাহলে শুনে রাখুন আমিও জানি , আমিও সবটা জানি।

সময় রহস্যময় হাসি মেখে বলল :জানতেই পারেন , জানাটাই তো স্বাভাবিক।  ছোটবেলা থেকে দিদার বাড়িতে আপনার নিত্য যাতায়াত । আমি তো মাত্র  এক মাস ধরে দেখছি দিদাকে , তবু যেন মনে হল  প্রতি  মঙ্গলবার দক্ষিণেশ্বরে যাওয়ার অভ্যাসটা  দিদার নতুন নয়।

গিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল : ওহ! তাই তো , কাল মঙ্গলবার।

সময় : MERRY  XMAS । আপনার ঘরের যীশুখ্রীষ্টের ফটো টা খুব জীবন্ত।

গিনি : আপনি আমার ঘরে গিয়েছিলেন ?

সময়: হুম , আপনার বাবা প্রথমে আমাকে আপনার ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন , ওখানে আপনাকে না দেখে খানিক ডাকাডাকি করতেই একজন ভদ্রমহিলা এসে বললেন আপনি সন্ধ্যের এই সময়টা রোজ ছাদে কাটান।  উনি বুঝি আপনার মা ?

গিনি : হুম।

সময় : তাহলে  যীশুখ্রীষ্টের ফটোর পাশে যে  ভদ্রমহিলার ছবি দেখলাম যার সাথে আপনার মুখের ভীষণ মিল , উনি …

গিনি : আমার মা , চোদ্দ বছর আগে এক পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এখন বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীকেই আমি মা বলে জানি। জন্ম দিলে এর থেকে বেশী ভালোবাসা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি না।  আর কিছু জানার আছে আপনার ?

সময় : দুঃখিত।  আমার অকারণ কৌতূহল আপনাকে   বিব্রত করেছে বেশ বুঝতে পারছি।

গিনি : আসলে আমার মনটা ভালো নেই , এরকম অসংযত ব্যবহারের জন্য ক্ষমা করবেন।

সময়:তা না হয় করা যাবে।  কিন্তু এমন দিনে মন খারাপ করতে নেই  গিনি ! আজ যে আপনার যীশুখ্রীষ্টের জন্মদিন।

গিনি : আর আমার মায়ের মৃত্যুদিনও ।

সময় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল :  সান্ত্বনা দেওয়া আমার অভ্যাস নয় , তাছাড়া জীবনে অস্তিত্বর  ভিত্তি হারানোর স্বান্তনা হয় না। ভেবে নিন প্রসঙ্গ বদলাতেই আবার এক অবান্তর প্রশ্ন করছি -ভালো তো কতকিছুই লাগতে পারতো , কৃষ্ণের বাঁশি , শিবের জটা ,  নামাজের টুপি,গুরুর  প্রসাদ । শুধু  সাদা আলখাল্লা ধারণকারী সুদর্শন ব্যক্তিটির উপর বিশেষ পক্ষপাতের  কোনো কারণ আছে কি ?

গিনি :  জন্মদিন সুখময় হয় আমার আপনার , তার মেরীময়। মৃত্যুর অতীত নাড়ির টান।

সময় :ব্যাপারটা আপেক্ষিক , দৃষ্টির পরিধি অনুযায়ী।  সাধারণ দৃষ্টি জীবন সীমার পরিধি অতিক্রম করতে পারে না , তাই মৃত্যুর পরও শুধু জীবনকালটাই আলোচ্য।   কিন্তু হতেও তো পারে মৃত্যুর অতীত জীবনকালের কোনো কিছুই নয় , সত্যিটা সেখানে অনেক বেশী সহজ , দুইয়ের বদলে হয়তো একটাই স্বত্বা , তাই আগে পিছে থাকার প্রয়োজন হয় না কখনো ।

গিনি : হতে তো অনেক কিছুই পারে , আবার অনেক কিছু না হলে ক্ষতি তো বিশেষ ছিল না বলেই মনে হয়। চক দিয়ে  যীশু মূর্তির শরীরে  লেগে থাকা লাল রঙ ঢাকা যায় ঠিকই  কিন্তু  ব্যস্ত রাস্তায় ঘটা  ভীষণ দূর্ঘটনা য়  সারা রাস্তাটা রক্তে  লাল হয়ে যায়  ! , ওত  চক তো আমার  কাছে নেই !

সময় অল্প হেসে বলল : রক্তের দাগ খুবই ক্ষণস্থায়ী।  চলতি গাড়ির চাকা কিংবা হঠাৎ বৃষ্টির জল বেশীক্ষণ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দেয় না। যা থেকে যায় তা হল  ভালোবাসার মানুষের  দীর্ঘশ্বাস  , নিরন্তর ছটফটানি , সত্যিকে মিথ্যা ভাবার ব্যর্থ প্রয়াস ,  স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও আবার হতাশার গভীরে তলিয়ে যাওয়া।তবু শেষমেশ যখন কিছু ই বদলায় না তখন  নিয়তির কালচক্রের অজুহাত দিয়ে নেওয়া হয় জীবনের  গতি  বাড়াবার অবশ্যম্ভাবী সিদ্ধান্তটি।

তাই আমার বিশ্বাস, প্রত্যেকের জীবনসীমা একটি জটিল অঙ্ক কষে নির্ধারিত হয়,তা বিশ্লেষণে  কালব্যয় বৃথা। যে অঙ্কের সমাধানে  আপনার  ভূমিকা নেই , তার  ফলাফল বদলানো আপনার পক্ষে  অসম্ভব। হ্যাঁ অসম্ভব , শুধু আভাস কেন , তারিখ- ক্ষণ-নাম-কারণ  জানলেও অসম্ভব।

গিনি : আপনার কি বিশ্বাস  সব অঙ্কের সমাধান সঠিক ? হিসাব নির্ভুল ?

সময় : তা তো বলিনি।  নিজের সাথে দাবা খেলেছেন কখনো ? দাবার চালে ভুল তো হতেই পারে , সেক্ষেত্রে ভুল বিচারই বলুন বা দান  শুধরানোর দায়িত্ব কিংবা নিজের করা ভুলেরই  সদ্ব্যবহার  , সবটা দাবাড়ু নিজেই করে থাকেন । খেলা শেষে নিশ্চই কোনো জটিল নিয়মে দানের কার্য কারণ ব্যখ্যা হয়  তার মস্তিষ্কে , তার প্রভাবও হয়তো পরের খেলায় প্রতিফলিত হয় , যেখানে দাবাড়ু আরও প্রখর , আরও সাবধানী।  রাজা মন্ত্রীর সাজানো ছকে  ডুবে থাকলেও  দাবাড়ু জানেন  তা ঘণ্টা কয়েকের খেলা বৈ তো নয় , তাই সে অবিচল , নিরুত্তাপ , হার জিতের হিসাব তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক।

নিজের ভিতরে লুকিয়ে রাখা পুরোনো প্রশ্ন টির থেকে আড়াল সরিয়ে , লৌকিকতা ভুলে অস্থির স্বরে গিনি বলল :  যখন এতো কিছু জানো,এটাও নিশ্চই জানো মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় ? তার ভালোবাসার সম্পর্কগুলো সেখানে তাকে অনুসরণ করতে অক্ষম , কিন্তু তার পূরণ না হওয়া  ইচ্ছাগুলো ! কোনোকিছুর টানেই কি সম্ভব নয় ফিরে আসা ? অন্তত  ফিরতে চাওয়া ! মৃত মানুষটি  তো  সবটা দিয়ে চাইবেই  তার সাথে হওয়া অঘটন  ফেলে আসা  ভালোবাসার মানুষ গুলোর সাথে না হোক,কিন্তু সে ইচ্ছাপূরণে বাঁধ সাজছে তার অকর্মণ্য মেয়েটি । বিশ্বাস করো  , ভীতু সে নয় , কোনোদিন ছিল না। আগেও সে  আসন্ন দূর্বিপাকের   ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল ,আজকে আবার সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। শুধু এটুকু জানি , আজকে আবার কারো  চিরবিদায় নেবার সন্ধিক্ষণ উপস্থিত , এর থেকে বেশী কিছু বোঝার শক্তি যে নেই আমার।

সময় নিজের দুর্ভেদ্য দৃষ্টি স্থির করল গিনির জল ভরা অস্থির চোখ দুটিতে , তারপর কঠিন স্বরে আশ্বাস মিশিয়ে বলল : শান্ত হও গিনি ! অকারণে নিজেকে দায়ী কোরো না  এভাবে , প্রতি সন্ধ্যায় ছাদের অন্ধকারে মৃত মায়ের কাছে ক্ষমা চেও না আর । হঠাৎ হাওয়া বা শুকনো পাতার শব্দে মায়ের আত্মার উপস্থিতি খোঁজা বন্ধ করে দাও ,  এটুকু জেনে রাখো  আয়নার কাঁচ  ভেদ করা প্রতিবিম্বর সাধ্যের বাইরে। তবুও  নাড়ির টান তার নিজের জায়গায় অবিচল , তার ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট , যা তোমার বোঝাটা  ভীষণ জরুরি –  আগে যা ঘটেছে ভবিষ্যতে তা আবার ঘটবে।  কাছের বা দূরের কারো সাথে, আজ  যা তোমার  সাথে , কাল  তাই  অন্যের  সাথে  , হয়তো স্থান টা অন্য , ধরণ টা অন্য ,  কিন্তু ঘটনাটা এক , তা ঘটবে, ঘটবেই।  তাই যে এতদিন হয়ে এসেছে , তাই যে নিয়ম। তুমি যার থেকে পালাতে চাইছো ,তার থেকে পালানো যায় না,কারণ সেই যে সত্যি , সেই যে মুক্তি।

গিনি :আর  কখনো দেখা হবে না , তাই তো  ? আদরে ভেজা  গলার স্বর টা আর কখনো শোনা হবে না আমার । কি যে সুন্দর গান গাইতো মা!পুরো গানটা সেদিন শোনা হয়নি , প্রথমদুটো  লাইন গাওয়ার পরই গাড়িটা …

সময় :অপেক্ষান্তে তোমার সত্ত্বা তার থেকে যখন ভিন্ন থাকবেনা , তখন দেখার প্রয়োজন যে হবে না গিনি ! সে না হয় পরের কথা , এখনকার হিসেবে বলছে   তুমি তো মৃত মায়ের বাকি থাকা আদরটুকু  পেয়েছো নতুন মায়ের থেকে , কতজনের তো পুরোটাই বাকি থেকে যায় , পাওয়া হয় না কিছুই , তাদের দাবী কি কম !

গিনি : নাহ ! কম নয় , বরং বেশি। সেই দাবী পূরণের গুরুদায়িত্ব যার ,  তার ক্ষমতায় থাকলে আমাকে যেন শুধু একটু সময় ভিক্ষা দেন , নিজেকে শক্ত করার , নতুন যন্ত্রণা সহ্যের শক্তি সঞ্চয় করার। জানিনা তা সম্ভব কিনা , তবুও আজ না চেয়ে থাকতে পারলাম না যে!

সময় : সব  ইচ্ছা না হলেও কিছু ইচ্ছা তো পূরণ হয় বলেই জানি। আমি এখন আসি গিনি! কিছু জরুরি কাজ বাকি আছে।  তুমি দিদার সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা ভুলো  না কিন্তু।

গিনি : সত্যি ! অনেক কথা বলে দেরী করে দিলাম খুব ! আসলে আমি আর পারছিলাম না , একটা ভীষণ ভয় , অদেখা কালো দেওয়াল..কথাগুলো না বললে ..। জানিনা মাত্র কয়েকদিনের আলাপে আমার থেকেও বেশি করে আমার পরিস্থিতির জটিল  না বলা সত্যি গুলো  বোঝা কিভাবে সম্ভব হল তোমার পক্ষে,  ধন্যবাদ।

সময় অল্প হেসে বলল : ধন্যবাদ ছাদবেলা কে ,  সৌজন্যের “আপনি”  কে বন্ধুত্বের “তুমি” তে করার জন্য । কেউ প্রথম আমার বন্ধু হল কিনা।

গিনি র কানে পৌঁছলো না সময়ের শেষ কথাগুলো , চিন্তার গভীরে তলিয়ে গেল সে। হঠাৎ বাবার ডাকে চমক ভাঙল তার। দ্রুত পায়ে নিচে এসে দ্যাখে লজেন্স কে ঘিরে বাবা মায়ের উৎকন্ঠা। লজেন্স গিনির প্রিয় কুকুর , গত মাসে ওর লিভারের ছোট অপারেশন হয়েছে  , তারপর থেকে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে  ওকে তরল খাবারই দেওয়া হচ্ছে  , ওর পক্ষে শক্ত খাবার হজম করা সম্ভব হবে না আরো দুমাস । সন্ধ্যেবেলা , সময়কে ভিতরে নিয়ে আসার পরে গিনির বাবা বাইরের দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন  , সেই ফাঁকেই লজেন্স বাইরে বেড়িয়ে বাগান থেকে কিছু একটা খেয়ে এসেছে ,যার ফলে তার এই অবস্থা। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পরছে  ওর  শরীর , ডাক্তারকে ফোন করা হয়েছে , তিনি এখনই ওকে পশু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

হাসপাতালের চেয়ারে বসে সেই ভয়ানক সত্যি শোনার অপেক্ষা , গিনি চোখের জল বাঁধ মানছে না , ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে  , সময়ের বলা কথাগুলো তার কানে  বাজছে বারবার ,”প্রত্যেকের জীবনসীমা একটি জটিল অঙ্ক কষে নির্ধারিত হয়,তা বিশ্লেষণে  কালব্যয় বৃথা। যে অঙ্কের সমাধানে  আপনার  ভূমিকা নেই , তার  ফলাফল বদলানো আপনার পক্ষে  অসম্ভব।” লজেন্সকে যে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে , ছোট্টবেলা থেকে সে তার ছায়া সঙ্গী।  গিনি আর কিচ্ছু ভাবতে পারছে না , সব কিছু হারিয়ে যাচ্ছে তার।  মায়ের কোলে মুখ গুঁজে গুমড়ে উঠল সে।

ডাক্তারের গলার  কেঁপে উঠল ওরা তিনজন , ” লজেন্স ভালো আছে , কাগজেরটুকরো খেয়েছিল বলেই এযাত্রায় প্রাণ রক্ষা ! বাকি দুমাস বকে পাথর রেখে হলেও বেঁধে রাখবেন ওকে।”পর্ব তিন সেই রাত টা  ঘুমন্ত  লজেন্সের পাশে হাসপাতালে  কাটিয়েছিল গিনি। লজেন্সের জিভের আদরের ঘুম ভাঙার নিয়ম পরদিন সকালেও যথাসময়ে পালন হল। হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে লজেন্সকে নিয়ে ফিরতে ওদের দুপুর হয়ে গেল। চটপট স্নান করে তৈরী হয়ে নিল গিনি। মা কে “আসছি “বলে দ্রুত পায়ে রওনা দিল আলুভাজা দিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। কড়া নাড়তেই  হাসিমুখে দরজা খুলে  দাঁড়াল তার  ছোটবেলার মুশকিল আসান – আলুভাজা দিদা।গিনি অবাক হয়ে বলল ,”একি ! দক্ষিণেশ্বর যাওনি ? মঙ্গলবার মানেই তো নিজের আলু নিজেই  রাঁধার  দিন।”আলুভাজা দিদা হেসে বললেন ,”আহারে ! পিওন দাদা না গেলে কত যেন আসতো আমার রাঁধুনি। আয় ভিতরে আয় ! আর বলিস না,কাল তোর বাড়ি থেকে ফেরার পথে পাথুরে অন্ধকার গলিটায়  হোঁচট খেয়ে সময় এক ভীষণ কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে , কত যে রক্ত তোকে কি বলবো!বাড়িতে ঢুকেই   আমাকে বলল , আমি যেন এ নিয়ে কোনো না চিন্তা করি ,  এসব নাকি হয়েই থাকে। ভাবতে পারিস  তুই ! ছেলের  অটল  জেদ , জ্ঞানের বুলি ফুটিয়ে  বলে “সময়ের কাছে সব ক্ষত মেলাতে বাধ্য সে তা যত ভয়ানক ই হোক না কেন।” উপায়ান্তে  নিজের মরা মুখের দোহাই দিয়ে কমল ডাক্তারের বাড়িতে নিয়ে গেলাম ছেলেকে । পাথর কুচি বের করতে গিয়ে পায়ের তলার কিছুটা মাংস কেটে বাদ দিয়েছে ডাক্তার ।  কি প্রচন্ড সে ছেলের সহ্যশক্তি ! কাটা ছেড়া , এতগুলো সেলাই , তবুও বাবুর ঠোঁটে কষ্টের  ‘রা’ নেইকো মোটে।গিনি :তারপর ?আলুভাজা দিদা : তার আর পর কি ! ধমক দিয়ে ওষুধ খাইয়ে শুইয়ে দিলাম , শিয়রে বসে  ছিলাম সারারাত , ডাক্তার যা বলেছিল ঠিক তাই!মাঝরাত থেকে ধুম  জ্বর , ভোরের দিকে যা একটু কমেছে। এই অবস্থায় ছেলেটাকে ফেলে মায়ের দুয়ারে গিয়ে শান্তি পাবো আমি !গিনি : হুম। এখন কি ঘুমোচ্ছে ? একটু দেখা করা যাবে?আলুভাজা দিদা : হ্যাঁ যা না ! ঘুম আছে নাকি ওর ? সেই কোন কাকভোরে থেকে জেগে আছে , আমি ততক্ষণ রান্না ঘরে যাই একটু , দুপুরে খেয়ে যাস কিন্তু।গিনি সিঁড়ি দিয়ে  উঠে যেতে যেতে উত্তর দিল , “আচ্ছা “।ব্যান্ডেজ বাঁধা  পা টিকে বালিশের উপর রেখে খাতা কলমের  হিসাবে মগ্ন ছিল সময়।  গিনিকে  ঘরে ঢুকতে দেখে হেসে বলল , “আরে  গিনি যে !   ইচ্ছাপূরণ হল তাহলে ?গিনি অবাক হয়ে বললো : ইচ্ছাপূরণ ? তুমি  কি করে !সময় তার রহস্যময় হাসি আড়াল করে বলল : ওই যে কাল কি  একটা অদ্ভুত ইচ্ছার কথা বলছিলে , কেন যেন আর একটু সময় দরকার ছিল । এখন  তোমার মুখ ভরে যে আনন্দের রেশ  লেগে আছে  ,হলফ করে বলতে পারি কাল  তা ছিল না। তাই মনে হল কোনো সদ্য  ইচ্ছাপূরণই  কি  এই  হঠাৎ খুশির  কারণ।গিনি : উঁহু ! ইচ্ছাপূরণই বটে। সে কথা পরে হবে , আগে বলো , তুমি এমনটা ঘটালে কি ভাবে !সময় : ঘটনা তো ঘটবার জন্যই ! এমন হোক বা তেমন। আচ্ছা, এবার বলো লজেন্স কেমন আছে ?গিনি : লজেন্স ! তুমি  কি করে জানলেন লজেন্সের শরীর খারাপ ?সময় বিস্ময়ের মুখোশ পরে বলল : শরীর খারাপ ? সেকি কবে থেকে ? কি হয়েছে ওর  ?গিনি : তা না জানলে হঠাৎ লজেন্সের কথা জিজ্ঞাসা করলেন যে !সময় :আসলে দিদার কাছে লজেন্সের কথা এতো শুনেছি , তোমার  বাড়িতে গিয়েও কাল ওর সাথে দেখা হল না , কথাচক্রে ওর খবর জানাও হয়নি , তাই আজ মনে করে জিজ্ঞাসা করলাম।গিনি: মাঝে মাঝে তোমাকে  কেমন ধাঁধার মত মনে হয়  , কিছু যেন আড়াল করছো প্রচণ্ড সাবধানী পদক্ষেপে। আবার কখনো তুমি খুব সহজ  যাকে অবিশ্বাস করতে একবারের জন্যও ইচ্ছা হয় না। তুমি কেমন অন্যরকম , সকলের থেকে আলাদা।সময় : আমি এরকমই , জটিল অঙ্ক নিয়ে কারবার করি বলেই হয়তো। তোমার প্রথম ধারণটা ই ঠিক , আমি জটিল , কঠিন , ধোঁয়াটে , প্রচলিত নিয়মে আমাকে বাঁধা অসম্ভব। দিদার কাছে না এলে আমার বোধহয় কখনো সহজ হওয়া শেখা  হত না।  সে যাক , লজেন্স কেমন আছে বললে না ?গিনি : ভালো আছে এখন , কাল শরীর টা খারাপ করেছিল , ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি , ভেবেছিলাম মায়ের মত….সময় : উফ ! তোমার  ভাবনাটা বড় বেশি , যা ঘটে গেছে  তা তো আছেই  , অথবা যা ঘটেনি  তা নিয়েও। তোমার অজানা হলেও , বিশেষ কারণেই হয়তো মহাকাল ঘটিয়ে থাকে কিছু  রক্তক্ষরণ , স্রষ্টার অনুমতি নিয়ে। তাই পকেটে চক নিয়ে ঘোরাটার পিছনে তোমার ভাবনাটা অমূলক। দাগ হালকাই হোক বা গাঢ় , কোনোটাই হিসেবের বাইরে নয়।গিনি : কাল আমার বাড়ি না গেলে সাদা মোড়কে পা ঢাকতে হত না । এই ভাবনাটা নিশ্চই ভুল নয়।সময় :হুম! হত না , সাথে আরো অনেক কিছুই হত না , আবার অনেক কিছু হয়তো হত।ইঙ্গিত বিশ্লেষণে অনুমানের আচ্ছাদন সরিয়ে  দিল  গিনি  : মানে ?সময়ের ঠোঁটে আবার সেই চেনা রহস্যময় হাসি  : মানে দিদার  চিঠিটা  পৌঁছানো হত না , আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সূত্রপাত  হত না , দিদার রান্নাঘরে জমে থাকা আলুগুলোর জীবনকাল স্বার্থক হত না ।গিনি হাসল না , তার  ভিতরের ঠান্ডা হওয়া পুরোনো ভয় আবার তার কন্ঠ স্বরে  হয়ে উঠল স্পষ্ট  : আর কী যেন হতে পারতো বলছিলেন !..সময় তার দুর্ভেদ্য দৃষ্টি সহজ করল এবার : তোমার চিন্তায় দিদার শরীর আরো খারাপ হত  ,দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে , দিদার কাছে বসে তোমার ছোটবেলার অদ্ভুত কান্ডকারখানা শুনতে হত আমাকেই, শেষমেশ আমার অঙ্কের খাতা , বাকি হিসেব পত্র  তোমার প্রিয় লেকের জলে ভেসে যেত  !”আয়রে মাগো ! সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে যে ! ” সময়কে কিছু যেন আরো বলতে চাইছিল গিনি , কিন্তু দিদার ডাকে থামতে হল থাকে।সময় : যাও ! তোমার অপেক্ষার আলুভাজা তৈরী হয়ে গেছে মনে হয়।গিনি : তোমার  খাবার তো ঢাকাই দেখছি। ঘুম তো পায়না তোমার দিদা বলল , খিদেও  কি ….সময় : খিদে ঘুমের সাধারণ নিয়মচক্রে বাঁধা পরলে হিসাবের খাতা অমিলে ভরে যাবে যে ! মাঝে মাঝে মনে হয় , জটিল অঙ্কের সমাধানই আমার যাবতীয় চাহিদা পূরণ করে ।গিনি : উফ ! আবার সেই কঠিন কঠিন কথা ! আলুভাজার গন্ধে বুদ্ধিটাও আবার ভালো কাজ করে না, তোমার আর হিজিবিজি  অঙ্কের মাঝখান থেকে আমার এখন চলে যাওয়াই সমীচীন।দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে চেঁচিয়ে উত্তর দিল গিনি -“আসছি দিদা! “গিনির চলে যাওয়া নিঃস্পলকে দেখে পুরোনো  হিসাবে মগ্ন হল সময়।

কাল-আজ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ক্লান্তি ভুলে রাত জাগানোর নেশা ,
গল্প বইয়ের শেষের পাতা জানে ।
মায়ের বকায় আধভাঙা সে ঘুম ,
ফেলুদাকেই দুষত মনে মনে।

পছন্দের সে হলুদ জামাখানি ,
সাধ্যে আড়াল সাধের হাহাকার,
চোখের জলে দুঃখ ভোলে মন ,
মেনে নেওয়া সহজ ছিল হার।

কাঠবেড়ালির খাঁচার পাশে ঘুম ,
পালিয়ে যাওয়া তবুও অনির্বার ,
প্রতারণার ভুলিয়ে দিতে স্বাদ ,
কুকুর ছানা জায়গা নিল তার।

ব্যার্থ যখন সাজের সরঞ্জাম ,
করতে মলিন বর্ণে মেশা কালো ,
আরশি দেখায় হরিণ চোখের মায়া ,
নিজেকে তার বাসতে শেখা ভালো ,

ভালোবাসার প্রথম চিঠি হাতে ,
জীবন দিল উজাড় করে সুখ ,
বিচ্ছেদেরও ভীষণ ছিল তাড়া ,
অগত্যা সেই শুকিয়ে যাওয়া মুখ।

জমিয়ে রাখা গানের ক্যাসেট গুলো,
অজান্তে যা সবটা করে ভালো ,
বুঝিয়েছিল করতে খুশি মন ,
সঙ্গ শুধু নিজের প্রয়োজন।

মহাকালের লোভ দেখানো পথে ,
বাঁকলো জীবন , অঙ্কে মাপা গতি ,
দায়িত্ব আজের কালের সাথে বাড়ে ,
লাভের যোগে লুকিয়ে হাসে ক্ষতি।

যত্নে রাখা গোলাপ ফুলের তোড়া ,
রোজের জলেও মুখ করে রয় কালো ,
আগাছা ডাল স্বপ্নে এসে বলে ,
“স্বার্থ ছাড়াই বেসেছিলাম ভালো।”

সমস্যা তো আগেও অনেক ছিল ,
আজের গুলো বন্ধ করে শ্বাস ,
বক্র হাসির প্রশ্ন আসে কানে ,
“নিজের উপর আছে তো বিশ্বাস ?”

চাটুকতায় চমকে ওঠে মন ,
মানুষ চেনা জটিল সে এক ধাঁধা ,
অভিমন্যুই শিকার একা নয় ,
চক্রবুহ্যের অব্যাহত ক্ষুধা ।

স্বপ্নতে সে চেনা পথের মোড়ে ,
যেখানে খুব সহজ ছিল বাঁচা ,
হিসাব পেনে কালির মেয়াদ শেষ,
অঙ্কে আবার আগের মত কাঁচা।
খোলা হাওয়ার অদম্য হাতছানি ,
অবহেলায় লুটায় ছদ্মবেশ ,
আজও মনের ইচ্ছা গুলো একই ,
মলিন সেথায় কৃত্রিমতার রেশ ।
অভিজ্ঞতা হওয়ার তালে বয়
কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কয় ,
“পরিস্থিতি বদলানো না গেলে
চুপটি করে পালিয়ে যেতে হয়।”

স্বস্তি ভোরে ভাঙলো রাতের ঘুম ,
হালকা হাসির আমেজ মিশে ঠোঁটে ,
নষ্ট সময় হয়তো অনেক হলো ,
বাকির হিসেবে কম কিছু নয় মোটে।

ধন্যবাদ

রোমি

জাত

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

প্রথম 

অচেতনে ঘুমিয়ে থাকা বছর নয়ের মেয়েটির দিকে  অপলকে তাকিয়ে ছিলেন আগন্তুক।   ঘুম ভাঙতেই মেয়েটির কপালে হাত রেখে আগন্তুক হাসিমুখে বললেন , গুডমর্নিং   !

মেয়েটি  প্রশ্ন বহুল চোখে উঠে বসে বললো : গুডমর্নিং।

আগন্তুক:  এতো গম্ভীর হয়ে থাকলে  মর্নিং র  তো আজ গুড হওয়া হবে না।

মেয়েটি : অচেনা কাউকে দেখে মা হাসতে বারণ করেছে।

আগন্তুক হেসে বললেন :  কিন্তু  অচেনা কেউ টি যদি তোমায় দেখে হাসে তাহলেও কি  নিয়ম টা একই থাকবে ?

মেয়েটি  খানিক নিরুত্তর থেকে বললো , মা কে জিজ্ঞেস করে বলবো  তোমাকে ।

আগন্তুক মৃদু হেসে বললেন , আচ্ছা।

>তুমি বুঝি আমার নতুন ডাক্তার ?

আগন্তুক মন দিয়ে  মিঠির মেডিক্যাল  রিপোর্ট গুলো দেখতে দেখতে বললেন , উঁহু  আমি জাদুকর , তোমাকে ছুমন্তর দিয়ে ভালো করে দিতে এসেছি।

মেয়েটি  :  সত্যি !!! আই  লাভ ম্যাজিক।  আমি মিঠি  আর তুমি ?

আগন্তুক : আমি  তাহলে মিঠির  ম্যাজিসিয়ান ।

দূর থেকে আসা নামাজের শব্দে চোখ বুঝলেন আগন্তুক ।

চোখ খুলতেই  মিঠির তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন  : ম্যাজিসিয়ান! তুমি মুসলমান ?

আগন্তুক অবাক হয়ে তাকাতেই মিঠি বললো  : আমার বাড়ির সামনে একটা পুরোনো মসজিদ আছে,তাই শব্দটা আমি চিনি।

> তুমি গেছো কখনো সে মসজিদে ?

>না।  আমার যাওয়া বারণ ,  আমি যে মুসলমান নই।

> তুমি জানো  মুসলমান  মানে কী ?

>সবাই  বলে মুসলমান মানে খারাপ।

স্তব্ধতা আড়াল করতে আগন্তুক নিরুত্তর রইলেন। তারপর  মিঠির মাথায় হাত রেখে বললেন , একটা গল্প শুনবে , মিঠি ?

>কিসের  গল্প ?

>তিন মিঠির গল্প।  তিনটি মেয়ে , তিনজনের নামই মিঠি , তারা একই স্কুলে পড়ে আর খুব ভালো বন্ধু। তারা তিনজনেই খুব দুষ্টু, ছটফটে। ,  স্কুলের  প্রার্থনার  সময়তেও নিজেদের মধ্যে কথা বলে।  অনেক বকাবকি , শাস্তির পরেও তাদের কোনো পরিবর্তন নেই। সমস্যা যখন দিনদিন বেড়েই চলছিল , সেই সময় ক্লাসে একজন নতুন শিক্ষিকা এলেন , তিনি অনেক ভেবে একটা উপায়  বার করলেন। একদিন ক্লাসের শুরুতে তিনি একটা  ভীষণ সুন্দর কথা বলা পেন্সিল পুরস্কার হিসেবে  ঘোষণা করলেন , এতো সুন্দর পেন্সিল কেউ কখনো দেখেনি , ক্লাসের অন্যদের মতো তিন মিঠিও  সেই  অদ্ভুত পেন্সিল দেখে খুব অবাক  হয়ে গেল , ভীষণ ইচ্ছা হলো তাদের ওই পুরস্কার টি পাওয়ার।

শিক্ষিকা বললেন , “পেন্সিল টি  দেখতে যত সুন্দর , সেটা পাওয়াও কিন্তু  ততই  কঠিন, অনেক কিছু করতে হবে এটা পেতে হলে , তার মধ্যে প্রথম যেটা করতে হবে তা হলো মন দিয়ে প্রার্থনা , মাঝে কথা বললেই পুরস্কার থেকে নাম কাটা যাবে , যে যত বেশী  শান্ত হয়ে  , সুন্দর  করে  প্রাথর্না করতে পারবে পেন্সিল পাওয়ার দৌড়ে সে থাকবে তত এগিয়ে ।”

এই ঘোষণার  পর দিন ই  স্কুলের প্রার্থনা ঘরে ঘটল এক চমৎকার , সকল শিক্ষক শিক্ষিকা অবাক হয়ে দেখলেন সে  দৃশ্য :

প্রথম মিঠি কোনো কথা না বলে  এক মনে হাত জোড়  করে প্রার্থনা করছে , দ্বিতীয় মিঠি  অন্য লাইনে  দাঁড়িয়ে   দুহাত খুলে  পূর্ণ ভক্তিতে মনের আর্জি জানাচ্ছে , ইতিমধ্যে তৃতীয় মিঠি  কখন যেন ধীরে পায়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলে রাখা পেন্সিলের  পাশে ইচ্ছাপূরণের চিরকুট রেখে এসেছে  ।

মজার ব্যাপার হল , তিনজনের নামই মিঠি , তারা একই স্কুলে পড়ে এবং পরস্পরের বন্ধু , তাদের চাওয়া টাও এক -কথা বলা পেন্সিল  , আবার সে ইচ্ছাপূরণের  সিদ্ধান্ত যার হাতে তিনিও ভিন্ন নন  – নতুন  শিক্ষিকা , তাহলে তাদের মধ্যে তফাৎ  টা কী  মিঠি ?

মিঠি : তাদের প্রার্থনা করার ভঙ্গিমা :  হাতজোড় , হাতখোলা , মোমবাতি।

> একদম ঠিক। সেই দিন মিঠিদের  দেখাদেখি ক্লাসের অন্য ছাত্র রাও  পেন্সিল পাওয়ার জন্য  নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থনা  পদ্ধতি বেছে নিল। তিন মিঠির পিছনে পুরো ক্লাস তিনটি লাইনে বিভক্ত হয়ে গেল , কিন্তু সবাই তো মিঠি নয় , তাই সবাই যে মন দিয়ে প্রার্থনা করছে তা কিন্তু নয় , প্রত্যেক  দলে কেউ কেউ দুষ্টুমিও করছে , যেমন পাশের জনকে চিমটি কাটছে , অথবা সামনের জনের চুল টানছে , নিজেদের চোখ বোজা বলে দুষ্টু  বাচ্চারা ভাবছে তাদের দুষ্টুমি কেউ লক্ষ্য করছে না , শিক্ষিকা কিন্তু নিঃশব্দে সবাইকে দেখছেন আর পেন্সিল পাওয়ার দৌড় থেকে দুষ্টু দের নাম কাটা দিয়ে যাচ্ছেন । গল্প শেষ , এবার আরেকটা প্রশ্ন:

এই গল্পে কোন দলকে তোমার খারাপ মনে হচ্ছে  যে  দলের সবার নাম পেন্সিল পাওয়ার লিস্ট থেকে কাটা গেলে তুমি খুশি হবে ? আবার ভালো দলই বা কোনটা  যার সদস্য পেন্সিল টা পেলে তোমার ভালো লাগবে ?

মিঠি একটু চিন্তা করে বললো :  মা বলে যারা মন দিয়ে প্রার্থনা করে তারা কখনো খারাপ হয় না আর তাদের সাথেও  কখনো খারাপ হয় না। তোমার গল্পের কোনো একটাও  দলের সবাই তো দুষ্টু নয় , প্রত্যেক দলের কেউ কেউ দুষ্টু।যারা মন দিয়ে প্রার্থনা করছে তাদের যে কেউ পেন্সিল টা  পেলেই আমি খুশি হব , সে যে দলেরই হোক না কেন  কিন্তু কোনো দলের দুষ্টুদের একজন যদি পেন্সিল টা পেয়ে যায়,তাহলে আমার একটুও ভালো লাগবে না।

আগন্তুক পরিতৃপ্তির হাসি মেখে বললেন : তুমি আজ যা এতো সহজে বুঝলে  , পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষ সারা জীবনের চেষ্টাতেও তা বুঝতে পারে না , অথবা  বুঝতে পারলেও সাহস করে বলতে পারে না। দোষ যদি সবাই  না করে থাকে , দোষী তো সবাইকে করা যায় না মিঠি ! নতুন শিক্ষিকার মতন ভালো খারাপের বিচার শুধুই কাজ  দিয়ে করতে হয়।  যারা  ভালো কাজ করে , অন্যকে  ভালো রাখে, তারা ভালো মানুষ,আর যারা  অন্যের ক্ষতি করে , কষ্ট দেয় তারা খারাপ মানুষ। গল্পের দলের মতই  ধরে নাও মুসলমান একটা দলেরই নাম, সেখানে কেউ  মিঠিকে অনেক ই ঞ্জেকশন  দিতে চাইবে , উউউ! কি ব্যাথা ! কিন্তু সে দলেরই  কারোর জানা আছে  গিলিগিলি ছুমন্তর ম্যাজিক , যা মিঠির সব  ব্যাথাকে মুহূর্তে ভ্যানিশ করে দেবে , এরপরের  বিচার তো মিঠির হাতে।

> “ইঞ্জেকশন খারাপ , ছুমন্তর ভালো।”

মিঠির নিষ্পাপ হাসিতে নিজেকে আরো একবার হারিয়ে ফেললেন আগন্তুক।

দ্বিতীয় 

নিজের কেবিনে বসে মিঠির  পুরোনো  রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে চিন্তায় মগ্ন ছিলেন ডঃ আসিফ । সহকারী  দরজায় আওয়াজ করে বললো  , “ডাক্তার বাবু ! আপনার সাথে মিঠি রায়ের মা একটু কথা বলতে চাইছেন , আপনি অনুমতি দিলে ….”

ডঃ আসিফ : হুম , পাঠিয়ে দাও।

খানিক বাদে দরজার কাছে  অচেনা পায়ের শব্দ শুনে ডঃ আসিফ বললেন , ভিতরে আসুন।

শীর্ন চেহারার ভদ্র মহিলা  ধীরে পায়ে ঘরে ঢুকে অনুমতি নিয়ে সামনের চেয়ারে বসলেন। তারপর খানিক ইতস্ততঃ করে  বললেন , > “মিঠি  ভালো হয়ে যাবে তো ডাক্তারবাবু ?”

>  আমার ডাক্তারি বিদ্যা ও নিজের ওপরে বিশ্বাস  সত্যি হলে নিশ্চই ভালো হয়ে যাবে।

> আপনি তো এতো বছর বিদেশে ছিলেন ,জগৎ জোড়া খ্যাতি আপনার , পরম কৃপাময় ই আপনাকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন ,  সবাই  বলে আপনার অসাধ্য কিচ্ছু নেই।

> সবাই বললেও  মিথ্যা যে মিথ্যাই  থাকে।  আমার সাধ্য  ছুড়ি ,কাঁচি  ও গুটিকয় ওষুধের মধ্যেই সীমিত।

> এভাবে বলবেন না ডাক্তারবাবু , আপনি ই আমাদের শেষ ভরসা। রাতে ঘুমোতে পারি না , ভীষণ ভয় করে,শুনেছি ক্যান্সারের কবল থেকে প্রাণ ফিরিয়ে নিয়ে আসা খুব কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয় , তাই না  ডাক্তারবাবু ?

অস্থির হয়ে টেবিলে রাখা স্টেথোস্কোপ টা হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ডঃ আসিফ বললেন  : শুধু এটুকু জেনে রাখুন মিঠির ভালো হওয়াটা আমার জন্যেও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় 


অপারেশনের ঘর থেকে ডঃ আসিফ বেরোতেই সেদিনের শীর্ন চেহারার ভদ্রমহিলা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বললেন , “মিঠি ! কেমন আছে ডাক্তারবাবু ? ”

ডঃ আসিফ : আমি মিঠির মায়ের সাথে কিছু কথা বলতে চাই।

ভদ্রমহিলা :  ডাক্তারবাবু  !! আপনি বোধহয় আমায় ঠিক চিনতে পারেন নি , আমিই …..”

ডঃ আসিফ এবার চোয়াল শক্ত করে বললেন , ” চেনার ভুল কার হয়েছে তা না হয় অবসর সময়ে কখনো ভেবে দেখবেন। মিঠির  ডাক্তার হিসেবে আমি এখন তার মায়ের সাথে কথা বলতে চাই , দয়া করে তাকে আমার কেবিনে আসতে বলবেন। ”

ডঃ আসিফ নিজের কেবিনের  জানলার  সামনে  দাঁড়িয়েছিলেন , চোখের শান্ত দৃষ্টি ভিতরের তোলপাড় কে অদ্ভুত কৌশলে  আড়াল করে রেখেছে।

অস্থির পায়ে পরিচিতা  সে ঘরে  প্রবেশ করে  প্রশ্ন করলেন , “আমাকে ওরা আই. সি. ইউ তে ঢুকতে দিচ্ছে না কেন?”

দৃষ্টি না ফিরিয়ে ডঃ আসিফ শান্ত গলায় বললেন : “আমি বারণ  করেছি বলে, মিঠির এখন বিশ্রামের প্রয়োজন রানী। ”

পরিচিতা তার কাঁপা কণ্ঠে যথাসম্ভব জোর এনে বললেন  : মিঠি আর বাঁচবেনা তাই না ? সেটা বলার জন্যই মিঠি র  মায়ের সাথে কথা বলাটা  হঠাৎ জরুরি হয়ে পড়লো ? সব কিছু শেষ হয়ে যাবার আগের মুহূর্তের  সান্ত্বনা!  তবে তাই হোক ! জানলার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দেখুন ডঃ আসিফ খান , মিঠি রায়ের  মা আপনার সামনে প্রস্তুত। অবসম্ভাবী  মৃত্যুর জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে  দেরী করে , আর নিজের বহুমূল্য সময়ের সাথে অবিচার করবেন না।

>সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসার যেমন কোনো পরিমাপ নেই , ঠিক তেমনই  এতো বছর পরেও  আমার জন্যে  তোর  মনে ঘৃণার গভীরতা আদি অন্তহীন ।  তাই বোধহয় আমাকে অপমানের জন্য মিঠির জীবনের প্রশ্নেও  বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলি  না।

> দ্বিধা তো সত্যি করিনি, বিশ্ব জুড়ে বারে বারে চমৎকার ঘটিয়ে আসা আলহার  দুলারা ডঃ আসিফ খানের ভারতে আসার খবর পেতেই এক মুহূর্তের জন্যও ভাবিনি তার সামনে আরো একবার হাত পাতার আগে।কেন জানিনা বিশ্বাস হয়েছিল , যে মানুষটির  সাথে লড়াইতে মৃত্যু বার বার হার  নিতে বাধ্য হয়েছে , মিঠির বেলাতেও তার অন্যথা হবে না !  অতীতের  যন্ত্রণা আমার আজকের মিঠিময় জীবনকে স্পর্শ  করে শুধুই দুঃস্বপ্নে ,তা বাস্তব না হতে দেওয়ার চেষ্টাতেই নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলাম। কিন্তু ভিক্ষার কারণ প্রেমই হোক বা প্রাণ , দাতার চোখ ভিক্ষুকের জাত ভালোই চেনে  , তাই বোধহয় মিঠির মায়ের মিথ্যা  এতো সহজে ধরা পড়ে গেল।

> যারা হাত পাততে পারে , নিজের জিনিষকে অধিকারের জোরে  চেয়ে নিতে পারে  তারা তো ভাগ্যবান রানী ! কাঙ্খিত জিনিসের থেকে  স্বেচ্ছায় মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার যন্ত্রনা তাদের বোঝানো বৃথা।  আমার ছোটবেলা যে মেয়েটির  সাথে কেটেছে  , তার সাথে মিঠির আজকের মুখের অমিল খোঁজা কোনো জটিল ধাঁধা র সমতুল্য। মানছি তা বদলানো সম্ভব  ছিল না , কিন্তু নিজেকে আড়াল করা যদি এতই জরুরি ছিল , মিঠির পুরোনো মেডিক্যাল রিপোর্ট গুলোতে মায়ের নাম টা অন্তত মুছে দিতে হত। যুদ্ধ টা বরাবরই আবেগ  দিয়ে করে এলি  রানী!

>যার মেয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে নিজের মস্তিকের পটুতা তার সামনে নাই বা জাহির করলেন ডঃ আসিফ খান ! তাতে আপনার বুদ্ধি  বিন্দুমাত্র স্থানচ্যুত হবে না , বরং বিবেগ নিজের হদিস খুঁজে পেতে পারে।

> বিবেগ নিজের হদিস  খুঁজে পেলে  এতো বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা মনটাও যে জেগে উঠবে , আবার  তার চারিদিকে জমে উঠবে সেই উত্তর না জানা চেনা প্রশ্নের ভিড় !

> এসব বাজে কথা শোনবার প্রবৃত্তি বা মানসিক অবস্থা কোনোটাই আমার নেই।  আপনি হয়তো ভুলে গেছেন ,  মিঠির ব্যাপারে কথা বলার জন্যই  তার মা কে এই কেবিনে আসতে বলা হয়েছিল।

>মিঠি নিশ্চই শুধু তোর একার মেয়ে নয় , ওর বাবা কে দেখছি না রানী!

পরিচিতার কণ্ঠস্বরে কাঠিণ্যের প্রলেপ > মিঠির  শরীরের অবস্থা জানানোর জন্য ওর বাবা মায়ের মিলিত আবেদন পত্র দরকার , তাই তো?

এবার দৃষ্টি ফেরালেন ডঃ আসিফ । আর সে দৃষ্টি তার ভিতরের তোলপাড়কে আড়াল করতে পারছে না।

> যদি তাই হয় , তাহলে নিশ্চই  মিঠির মায়ের মতো মুহূর্ত ব্যয়ে ওর সাজানো বাবা ও হাজির হয়ে যাবে!  আমাকে  মিথ্যা বলছিস না নিজেকে ? সমস্ত সমাজের সামনে নাই বা স্বীকার করলি  একজন খারাপ মুসলমানের রক্ত বইছে মিঠির শরীরে , কিন্তু এই বন্ধ দরজার পিছনেও সে পরিচয়ের সত্যি থেকে আড়াল সরিয়ে নিতে এতো দ্বিধা  রানী !

পরিচিতা ব্যাঙ্গাত্বক হেসে বললেন >  এতক্ষণে বুঝলাম ! রক্তের অধিকার দাবী করতে  এসেছিস ! দশ বছর পর ! যথাযথ প্রমাণ ও আছে নিশ্চই। বৃথা প্রশ্নে আর সময় নষ্ট  নাই বা করলি।

> অধিকার আমি চাইনি রানী ! সেদিনও চাইনি , আজও চাই না । ভুলে যাস না ধর্ম পরিবর্তন না করে সাথে থাকার সিদ্ধান্ত যতটা তোর ছিল ততটাই আমার।  ভালোবাসার সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে জন্মের সম্পর্ক কে অবমাননা করার কঠিন মুহূর্ত , তোর মত সাহসী আমি কোনোদিনই ছিলাম না , দুর্বলতা আড়াল করতেই তোর প্রশ্ন মাখা চাহনির সামনে নিরুত্তর ছিলাম সেদিন । আমার ভিতরের অপরাধ বোধ কে মুহূর্তে ভালোবাসার অ সম্মান ভেবে নিলি তুই।  ক্ষনিকের বিবাদ মাটি  চাপা দিল  এতগুলো বছরের সম্পর্কের কবরে।  ধর্ম ও ভালোবাসার লড়াইতে হার কি শুধু তোর একার  হয়েছিল সেদিন ? সবকিছু দিয়ে আগলে রাখা অনুভূতির সমাধি হল কঠিন আত্মসম্মানের অতল গহ্বরে,অজান্তে তলিয়ে গেল সারাজীবনের প্রতিশ্রুতি। কোন অপরাধের শাস্তি দিতে সেদিন হারিয়ে গেলি  রানী ?  বহু নিদ্রাহীন রাতও তার উত্তর খুঁজে পায়নি। অভিমানের কাঠগড়ায় আজও ঠিক একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছি।  মিঠিকে নিয়ে তোর  একার লড়াইয়ে আমার অস্তিত্বের কোনো অবকাশ নেই । ধর্মের ভার যে ভীষণ, নিজস্ব উপলব্ধিতে জানি , ছোট্ট  মিঠি  তা বইতে পারবে না! ওকে ছোঁয়ার ক্ষণিক মুহূর্তই আমার  বাকি জীবনের জন্য যথেষ্ঠ।  মিঠির ভালো হতে যতটুকু দেরী, শুধু  ততটুকু  সময়  হাতে গুণে ধার্য করিস আমার জন্যে।

ঝাপসা চোখে  ঘর থেকে বেরোনোর আগে ডঃ আসিফ বললেন : মিঠি ভালো আছে রানী! ছোট  একটা টিউমার ছিল  যা আজকের অপারেশনে বাদ দেওয়া হয়েছে  , পুরোনো  রিপোর্টের কথা  সন্দেহ ছিল মাত্র , আর তা ভেবে নিজেকে কষ্ট দিস  না।

এতক্ষনের নিঃশব্দ  চোখের জল  সকলের অজান্তে বাঁধ ভাঙা কান্নায় রূপান্তরিত হল।

চতুর্থ  

ডঃ আসিফ মিঠির ঘরে ঢুকতেই একগাল হেসে মিঠি বললো , “গুডমর্নিং ম্যাজিসিয়ান । ”

>আজকে মর্নিং টা তো সত্যি গুড বলতে হবে, এখন মিঠি মেয়েটা কেমন আছে ?

>একদম ভালো। তুমি কখন ছুমন্তর বললে ?

> মিঠি যখন ঘুমাচ্ছিল , ঠিক তখন।

>আমি কবে বাড়ি যাবো ?

>খুব তাড়াতাড়ি।

>তাহলে তোমার সাথে কিভাবে দেখা হবে ?

> মিঠি ভালো হয়ে যাবে তো , আর দেখা হবার দরকার ই হবে না।

>হবে হবে হবে।

>আচ্ছা সে দেখা যাবে ক্ষণ।

>না , আগে আমাকে ছুঁয়ে বলো তুমি রোজ আমার সাথে দেখা করবে।

মুহূর্তের জন্য স্মৃতির গভীরে হারিয়ে গেলেন ডঃ আসিফ , হুবহু সেই একই জেদ , অবাধ্য ভালোবাসার জোরে একই ভাবে আঁকড়ে বাঁধার চেষ্টা। মিঠির মাথায় হাত রেখে বললেন : “ছুঁয়ে বললেও যে সবাই কথা রাখে না মিঠি!”

দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য উঠতেই মিঠি  তার হাত ধরে বললো : ” তুমি সত্যি চলে যাবে ম্যাজিসিয়ান ?

>তোমার মতো আরও অনেক মিঠির  অসুখ যে এখনো ছুমন্তর  হওয়া বাকি , আমাকে যে যেতেই  হবে  মাগো।

মিঠি জল ভরা চোখে মুখ ঘুরিয়ে বললো : তুমি খারাপ ,আমার বাবার মতো। মিঠি অচেনা কাউকে দেখে আর কখনও হাসবে না ।

ডঃ আসিফ  বিস্ময়বিহ্বল স্বরে  বললেন : তোমার বাবা কে তুমি চেনো মিঠি ?

> না।  তোমার গল্পের মিঠিদের মতো আমার বাবা মায়ের দল আলাদা, আমি মায়ের সাথে থাকি।  ডঃ আসিফ খান , আমার বাবার নাম। মা বলে আমার বাবা নাকি খুব ভালো মানুষ ,   কিন্তু  কষ্ট  তো শুধু খারাপ মানুষ দেয় ,  তাই না  ম্যাজিসিয়ান ?

অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠলেন ডঃ আসিফ , সর্বহারা জীবনের সঞ্চিত সবটুকু সাহস একত্রিত করে মিঠিকে জড়িয়ে ধরে বললেন , “একদম ঠিক। কিন্তু যদি কখনো  জানতে পারো  কষ্ট সে মানুষটাও কিছু কম পায়নি , তাহলেও কি বিচার  টা একই থাকবে মিঠি ?

মিঠি : জানিনা , মা কে জিজ্ঞাসা করে বলবো তোমাকে।

ডঃ আসিফ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন : আচ্ছা।

ঘুমন্ত মিঠির হাত ছাড়িয়ে পরম প্রাপ্তির  সম্বল টুকু নিয়ে  ঘরের বাইরে পা রাখতেই  পরিচিতার   কণ্ঠস্বর,  “অধিকার চাসনি ঠিকই কিন্তু পেয়েছিস কিনা দেখার জন্য ফিরেও তো দেখিসনি কোনোদিন । বন্ধ দরজার প্রয়োজন পাপের হয় , ভালোবাসার নয়। ধর্ম ও ভালোবাসার লড়াইতে আমরা  যেখানে হার স্বীকার করে নিয়েছিলাম ,আমাদের মিঠিকে সেখানেই  জিততে হবে । তাই  মিঠির বাবাকে ছুমন্তর করে ফিরিয়ে না আনা  পর্যন্ত  ম্যাজিসিয়ানের ছুটি কোনোমতেই মঞ্জুর হবে না।”

ধীরে পায়ে  ঘুমিয়ে থাকা মিঠির ঘরে প্রবেশ করলেন পরিচিতা। অঙ্গীকারের পরম আবেশে চোখ বুজলেন ডঃ আসিফ। বহু বছরের  মরচে ধরা স্বপ্ন আরো একবার স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

ধন্যবাদ ,

রোমি

দুর্গতিনাশিনীর ত্রিশূল

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

রোদ্দুর কলেজ লাইব্রেরীর শেষের টেবিলে বসে থাকা ঈশানীকে কে দেখে হাসি মুখে এগিয়ে এসে বললো ,” হ্যাপি ওমেন্স ডে ঈশাণী”।
ঈশাণী অল্প হেসে জবাব দিল : থ্যাঙ্কস রে।
রোদ্দুর: তুই মন্দিরাদির আয়োজন করা নারী সভায় যাচ্ছিস না ?
ঈশাণী: নারী সভা ?
রোদ্দুর: হ্যাঁ , তুই ভালো করে ইমেইল দেখিসনি হবে , নিমন্ত্রণ পেয়েছিস নিশ্চই , মন্দিরাদির শকুনের চোখ , তুচ্ছাতিতুচ্ছ নারীর পক্ষেও তার চোখে ধুলো দেওয়া সম্ভব নয় , তুই তো আবার সাইন্সের ফার্স্ট গার্ল।
ঈশাণী: ইমেইল একটা এসেছে ঠিকই কিন্তু নারী সভা বলে কোনোকিছুর উল্লেখ নেই।
রোদ্দুর: চুক্তির কাগজ দেখিসনি কখনো ? যেটা উহ্য সেটাই হল গিয়ে আসল কথা ।
ঈশাণী: তা কী হয় সে সভায় ?
রোদ্দুর: বিস্তর আলোচনা। কিভাবে সূর্যকে পশ্চিম দিকে ওঠানো যায়,সে পুরুষের প্রতিরূপ বৈ কিছু নয়,তার স্বেচ্ছাচারিতা তো বেশীদিন এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। আবার ধর , কিভাবে জন্মের প্রক্রিয়া থেকে পুরুষকে চিরতরে বাদ দিয়ে দেওয়া যায় , মানে ওই একটা ব্যাপার ছাড়া তো আর কোনো কার্যকারিতাই কোনো পুরুষ ইতিহাসে কোনোদিন প্রমাণ করে উঠতে পারেনি। একটা কথা তো তোকে মানতেই হবে যে ,আজ পৃথিবীর জনসংখ্যার অনুপাতে যে এক ভীষণ বৈষম্য,তার জন্যেও তো এই অত্যাচারী অকর্মন্য জাতিই একমাত্র দায়ী যাদের প্রধান অবসর বিনোদন হল শ্লীলতাহানি।
ঈশাণী: আমি এখানে তৃতীয় ব্যক্তি , তুই আর তোর মন্দিরাদি একমত , এই পৃথিবীর কাছে সেটাই যথেষ্ঠ । তা তুই সে সভায় না গিয়ে এখানে কী করছিস ?
রোদ্দুর: আমি ? মানুষের কথা ছেড়েই দে , মন্দিরাদির দলবল পুংলিঙ্গ বিশেষে পশুদেরও সে সভার কাছে ধারে ঘেষতে দেয় না। অনুষ্ঠান শেষে বাকি থাকা খাবার কোন কুকুর খাবে সেটাও লিঙ্গ বিচার করে তারপর ঠিক করা হয়। পুরুষ হল গিয়ে অচ্ছুৎ জাত , আর পাঁচ টা ছেলেদের মতো হ্যাপি ওমেন্স দের দূর থেকে দেখেই নিজ সম্মান কোনোরকমে বাঁচিয়ে রেখেছি এতদিন পর্যন্ত।
ঈশাণী: বুঝলাম।
রোদ্দুর কী বুঝলি ?
ঈশাণী: এই যে ,তুই মন্দিরাদি ও তার দলবলকে ভয় পাস।
রোদ্দুর: আমি কেন ? কলেজের সব ছেলেই পায়। বুকের পাটা নিজের জায়গায় , মন্দিরাদি নিজের,তার সঙ্গত কারণও আছে। মন্দিরাদি এই কলেজের সবচেয়ে পুরোনো শিক্ষিকা ,উনি যতটা মনোযোগ সহকারে পল সাইন্স পড়ান, ঠিক ততটাই পারদর্শী , পরীক্ষার খাতায় সূক্ষাতি সূক্ষ্ম ভুল খুঁজে বের করে অকারণে ফেল করানোয়।
ঈশাণী: পড়াশোনা না করলে ফেল করানোই উচিত।
রোদ্দুর: উঁহু। তুই অঙ্কে ভালো আমি জানি , কিন্তু কিছু অঙ্ক দেখে আইনস্টাইনও পেন কামড়েছেন হবে ,ব্যাপারটা খানিকটা ওরকমই ধরে না। মন্দিরাদির কাছে আজ পর্যন্ত যারা ফেল করেছে , তাদের আর কখনো পাশ করা হয়ে ওঠেনি। চক্রব্যূহ থেকে বেরোনোর উপায় যে একেবারেই ছিল না তা বললে ভুল হবে , কিন্তু যতদূর শুনেছি লিঙ্গপরিবর্তন অপারেশন খুব ব্যয়সাপেক্ষ , তাছাড়া আনুসাঙ্গিক ঝক্কিও তো কম নেয়। অগত্যা অভিমন্যুর পরিণতি। কাকতালীয় ভাবে বছরের পর বছরে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা নির্বিশেষে ,পল সাইন্স বিষয়ে মেয়েরা অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে , যে বিভাগে কোনো ছেলে আজ পর্যন্ত পাশ করতে পারেনি , সেই একই বিভাগে কলেজের ইতিহাসে কোনো মেয়ে কোনোদিন ফেল করে উঠতে পারেনি ।
ঈশাণী গম্ভীর ভাবে বললো : যতসব বাজে রটনা।
রোদ্দুর: রটনা ? এই কলেজে আজ পলসায়েন্স বিভাগে একটাও যে ছেলে নেই সেটা কাকতালীয় ?
ঈশাণী: তা নয়তো কি ? পলসায়েন্স কোনোদিনই ছেলেদের পছন্দের বিষয় নয়।
রোদ্দুর: মোটেই না। যারা ছিল তাদের কিছু , বছরের পর বছর ফেল করতে করতে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে , আশার আলোরও তো একটা জীবনকাল আছে ! কেউ বা চির অভাগা উপাধি স্বীকার করার আগে ভাগ্যকে আরো একবার বাজিয়ে দেখতে চেয়েছে বলে বিভাগ পরিবর্তন করেছে । শুনেছি কয়েকজন বাড়ির লোকের গালাগালি সহ্য না করতে পেরে আত্মতহত্যাও করেছে । চাকরি না পেলে দেশ কে দায়ী করা যায় ঈশানী! কিন্তু পাশ করতে না পারলে কলেজকে দায়ী করতে পারার সুদিন শুধুই স্বপ্নে, তাছাড়া কেউ তো নারীবাদী মন্দিরাদির ব্যক্তিগত শত্রুতার অজুহাত বিশ্বাস করার জন্য বসে নেই ! তবে এসব এখন অতীত, রণে বনে জঙ্গলে মন্দিরাদির নিরপেক্ষতা এখন সবাই জানে , কোটি টাকার বাজি ধরলেও কোনো ছেলে প্রাণ হাতে করে এই কলেজে পল সায়েন্সে ভর্তি হওয়ার জন্য আসে না।
ঈশানী হাসি চেপে স্বভাব মতো নির্বিকার ভাবে বলল : এভাবে লাইব্রেরীতে নয় বরং হঠাৎ বৃষ্টির দিনে লোডশেডিংয়ে চা মুড়ি খেতে খেতে ,আবেশে চোখ বুজে তোর মন্দিরাদির বাকি গল্প গুলো শুনবো।
রোদ্দুর: কথা দিলি যখন , তাই সই। তুই চল , তোকে সভার দুমাইল দূরে ছেড়ে দিয়ে আমি ক্লাসে যাবো।
ঈশানী : তুই ক্লাসে যা , আমি কোথাও যাবো না।
রোদ্দুর: কেন ? তুই নারীবিদ্বেষী ?
ঈশানী: না , তুই ক্লাসে যা।
রোদ্দুর: তুই তো আমায় ছোট থেকে চিনিস , ঘটনার শেষ দেখে ছাড়ি। কারণ বলে দে , চলে যাচ্ছি।
ঈশানী: তুইও আমাকে ছোট থেকে চিনিস। আমি তখন সেটাই করি যখন যেটা করতে ইচ্ছে করে বা করা করা উচিৎ মনে হয়।
রোদ্দুর:হায় রে পুরুষ ! স্বেচ্ছাচারিতা তোমার স্বভাব কিন্তু তার যে রক্তে। সে যাক ,আমার প্রশ্নের উত্তর এটা নয়।
ঈশানী: তোর প্রশ্নটাই তো স্পষ্ট নয়।
রোদ্দুর:এই তো ! মন্দিরাদির ভাষা। সাতপাঁক কি শুধুই নিয়ম!সেই আদ্যিকাল থেকে পুরুষ নারীকে ঘুরপাক খাইয়ে আসছে নিজের চারিদিকে স্পষ্ট কারণ ছাড়া। এক্ষেত্রে একটু ব্যাতিক্রম আছে , মানে আমার প্রশ্নটা স্পষ্ট। তুই মন্দিরাদির সভায় বিশেষ আমন্ত্রিত দের মধ্যে একজন , না গেলে যে নারীবাদের অপমান হয়। তাই জানতে চাইছিলাম না যাওয়ার আসল কারণ টা।
ঈশানী: আসল কারণ যা তোকে দ্বিতীয় বার বলছি , আমার ইচ্ছা করছে না।
রোদ্দুর:তুই নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করিস ?
ঈশানী:হুম ।
রোদ্দুর:তুই নিশ্চই বিশ্বাস করিস ,যে পুরুষ রা নারীকে নির্যাতন করলে তার একটা বিহিত হওয়া উচিত।
ঈশানী:করি।
রোদ্দুর:এতদিন সমাজে নারীর অশিক্ষা বা পিছিয়ে থাকার পিছনে দায়ী পুরুষ ! তাই তো ?
ঈশানী:কিছুটা।
রোদ্দুর:শ্লীলতাহানির দায়ভার নারীর পোশাকের নয় , পুরুষের বিকৃত মানসিকতার।
ঈশানী:একদম।
রোদ্দুর:সূর্যের পশ্চিম দিকে ওঠা টা মজা ছিল। মন্দিরাদির সভার বিষয় আসলে এসবই থাকে , ক্লাসের মেয়েদের মুখ থেকে শোনা।প্রচুর জানা অজানা তথ্য নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয় , তোকে চিনি বলেই বলছি তোর ভালোলাগবে , তাই এই নাছোড়বান্দা অত্যাচার।
ঈশানী এবার হেসে বলল , তোর বুঝি মনে হয় আমি নারীবাদী ?
রোদ্দুর:ভীষণ রকম , সে নিয়ে কোনো তর্কে তো আজ পর্যন্ত তোকে হারতে দেখিনি।
ঈশানী:তোর মনে আছে ছোটবেলায় মহালয়ার সকাল বেলা আমরা ঘুমোতাম আর সোনাকাকু গরম জিলিপি মুখে দিয়ে জাগিয়ে দিতো ! আধবোজা চোখে দেখা মরমে মিশে যাওয়া সেই ঘটনাক্রমের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য কোনটা মনে কর।
রোদ্দুর:কোনটা আবার ? মা দুর্গার অসুর বধ। ত্রিশূলের গায়ে রক্ত , আমাদের হাততালি , সোনাকাকুর আনা সব জিলিপি শেষ।
ঈশানী: ত্রিশূল টা কিন্তু মা দুর্গার নিজের নয় , ধার করা। শুধু ত্রিশূল কেন বাকি সব অস্ত্রগুলোও তাই ! ব্রম্ভাণ্ডের সৌভাগ্য বা মন্দিরাদির দুর্ভাগ্য যাই বলিস না কেন , অস্ত্র গুলো দিতে মা দূর্গা তাদের বাধ্য করেন নি , তারা স্বেচ্ছায় দিয়েছিলেন। পুরান বলছে, অসুরের দমনে ত্রিদেবের শক্তি পুঞ্জীভূত হয়ে মা দুর্গার সৃষ্টি , তাহলে অঙ্ক টা কি দাড়ালো ? মা দুর্গার সৃষ্টির কারণ ও কারী দুই ই পুরুষ । এত সহজ হিসেব মেলাতে নিশ্চই আইনস্টাইনকে পেন কামড়াতে হবে না।
রোদ্দুর:কিসব বলছিস ? পুরান তো ঘেটে দিবি তুই। তবে হিসেব টা সত্যি সহজ ,যারা পুরান লিখেছেন তারাও তো আসলে পুরুষই ছিলেন তাই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি তেই নারীর মহিমার আড়ালে পুরুষেরই গুনকীর্তন করেছে।
ঈশানী:তা না হয় হল। আদালতে অন্য সাক্ষ্মী প্রস্তুত করার অনুমতি আছে ?
রোদ্দুর:আছে।
ঈশানী:আমি তোর থেকে বেশি ভালো ড্রাইভ করি , গাড়ি হোক বা স্কুটার , সত্যি?
রোদ্দুর:একদম , আর আমিও তো সেটাই বলছিলাম ….
ঈশানী:আমাকে ড্রাইভিং শিখিয়েছে আমার দাদা। প্রথমে স্কুটার তারপরে গাড়ি । দাদা কোনোদিন সকালে উঠতে পারতো না,কত বকা মার খেয়েছে মায়ের থেকে। কিন্তু আমাকে স্কুটার চালানো শেখানোর সময়ে বিনা ডাকে ভোর পাঁচটায় উঠে পড়তো , রাস্তা ফাঁকা থাকে তখন , নইলে যে আমার ভয় -জড়তা কাটানো অসম্ভব ছিল , প্রথমদিন তো স্কুটার চলতে আরম্ভ করলেই চোখ বন্ধ করে ফেলছিলাম। বহুদিন পর্যন্ত সে ভয় আমার কাটেনি ,নিজে মরার থেকেও বেশী ভয় অন্যকে মারার । উফ ! কী দুর্বিষহ সে উপলব্ধি ! সকাল ৭ টায় গানের ছিল ক্লাস , স্কুটার চালানো থেকে বাঁচতে লুকিয়ে পাঁচটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্যারের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম । আমার কারসাজি বুঝতে পেরে একদিন দাদার সে কি বকুনি ! নাচ গানের থেকে এটা অনেক বেশী জরুরি , কতদিন আর মা আমাকে স্কুলে , কোচিংএ দিয়ে আসবে , সংসারের কাজের পরে একটু বিশ্রাম না নিলে মায়ের শরীর যে খারাপ হয়ে যাবে! খুব কেঁদেছিলাম সেদিন। দাদা বকেছে বলে নয় , দাদা মায়ের কষ্ট বুঝতে পেরেছে আর আমি পারিনি বলে। তারপর থেকে নিজ গন্তব্যে অন্যের সাহায্য ছাড়া সময়মতো পৌঁছতে আর কখনো কোনো অসুবিধা হয়নি। নারী স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ, এক পুরুষের তাগিদে ।

রোদ্দুর:আগেরদিন সন্তুদার সাথে রাস্তায় দেখা হয়েছিল , জোর করে গাড়িতে তুলে বাড়ি পৌঁছে দিল , পথে একটা গাড়ি উল্টোপাল্টা চালাচ্ছিল দেখে আমি মজা করে বলেছিলাম ড্রাইভার নিশ্চই মহিলা , সন্তুদা হেসে যে উত্তর টা দিয়েছিল তা আমার এখনও মনে আছে , “ড্রাইভারের কোনো লিঙ্গভেদ হয় না, ভালো হোক বা খারাপ । ”

ঈশানী: আমি ভেবেছিলাম বিএসসি র পরে চাকরী করবো , তুই তো জানিস পেয়েও ছিলাম। করিনি কারণ বাবা চেয়েছিল আমি মাস্টার্স করি , দাদা যেমন করেছে , ঠিক তেমন । রোজ সে তর্ক বিতর্কে র পর রাত ১টা বেজে যেত শুতে যেতে । শোয়া মাত্র ফোন আসতো দাদার , আমেরিকাতে তো তখন সকাল। বুঝতাম বাবা দাদাকে বলেছে আমাকে বোঝাতে উচ্চশিক্ষার প্ৰয়োজনীতা , বাবার ছেলেও অবিলম্বে সে দায়িত্ব পূরণে লেগে পড়তো ,কাজ কর্ম ভুলে । মায়ের নিরলস কাকুতিমিনতি , বাবা যা চায় তাই করলেই তো পারি , তাহলেই আমেরিকা ও ভারতে একসাথে শান্তি ফিরে আসে , ফলস্বরূপ দেখতেই তো পাচ্ছিস , তোর কলেজে ঠাঁই নিয়েছি । সমাজে নারীর অশিক্ষার জন্য কিছু পুরুষ নিশ্চই দায়ী , আবার আমার মতো নারী কে উচ্চ শিক্ষা নিতে যে বাধ্য করে সেও তো পুরুষই ।

রোদ্দুর হেসে বললো : ভাগ্যিস !

ঈশানী :আমার আজকের নিরপক্ষ স্বাধীন ধরন ধারনের জন্য দায়ী আরো একজন পুরুষ ,আপনি স্ময়ং মাননীয় মহাশয়।ছোটবেলা থেকে আমাকে না জানিয়ে আমার নামে ডিবেটের ফর্ম ভরে দিতিস । স্বভাবমত আজকেও তাই মন্দিরাদির আয়োজিত অনুষ্ঠানে পাঠাতে চাইছিলিস , আমার সাফল্যে খুঁজে পাস কী যে অজানা অলৌকিক আনন্দ । সেই ছোট থেকে চর্চা অজানা বিষয় , নতুন তথ্য , অদম্য কৌতূহল , অজান্তে অর্জিত শিক্ষা ,বুঝতে শেখা যা ঠিক তা বলতে হবে , সহজভাবে , নির্ভয়ে। অকাট্য যুক্তি প্রমাণের যোগ্যতা তর্কের পরিণাম নির্দিষ্ট করবে , সামনে বসা বিচারক বা প্রতিপক্ষের লিঙ্গ নয় । আত্মবিশ্বাসের অভাব হলে ভাবতাম আমার জয় নিয়ে তুই যদি এতটা নিশ্চিত হতে পারিস তাহলে আমার হতে অসুবিধা কোথায় ! হয়তো অজান্তেই একসময় তুই ধরালি ত্রিশূল – আমাকে , আমার চিন্তাকে ।নিষ্পাপ কিশোরী মনের সে অসামান্য ছন্দপতন , রাত জাগানো উপলব্ধি , একটা ছেলে হয়ে যদি ছেলেদের করা নিন্দনীয় অপরাধ গুলো তোর অসহ্য হয়ে থাকে, তবে মেয়েদের অপরাধে আমি প্রতিবাদ করলে দোষ কি ? বুঝতে শেখা বন্ধুর মতো অপরাধীর ও কোনো লিঙ্গভেদ হয় না । সময়ের সাথে সাথে বাড়ল বয়স , তবু বাড়ি ফিরতে আমার কখনো ভয় লাগেনি,বাসে ট্রামে রাস্তায় অযাচিত স্পর্শের প্রতিবাদ করতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠা বোধ হয় না , অন্যের অসংযমকে নিজের লজ্জার কারণ বলতে আমার বাঁধে। মনের গভীরে বাসা করা আশ্বাস , অনুচ্চারিত প্রতিশ্রুতি – আমার ক্ষতি কেউ করলে তাকে শাস্তি দেবার মানুষগুলোর নাম আমার জন্মের মুহূর্ত থেকে নির্দিষ্ট । নিজের যোগ্যতা নিয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই । তর্ক হোক বা পড়াশোনা , যেকোনো প্রতিযোগিতার একঘেয়ে সাফল্যে আমি নির্বিকার , তবুও আমার চাপা অহংকার অনিচ্ছাসত্বেও কখনো প্রকাশ হয়ে পড়ে , কারণ পুরুষ আমার দেহরক্ষী নয় , ছায়াসঙ্গী হিসেবে বিচরণ করে।
আমি তার দায়িত্ব বা কর্তব্য কোনোটাই নই, বরং বাঁচার তাগিদ । আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো অজান্তে নারীর পক্ষপাত দুষ্ট কখনো হতে পারি কিন্তু পুরুষবিদ্বেষী চিতায় উঠলেও হতে পারব না ,অকৃতজ্ঞ হতে পারবো না , অসঙ্কোচে মিথ্যা বলতে পারবো না , নিজ সত্ত্বাকে অস্বীকার করতে পারবো না ।

রোদ্দুর মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল ঈশানীর দিকে । অজান্তে এসে যাওয়া চোখের জল আড়াল করে বলল : তুই ছোট থেকেই খু ব সাহসী ঈশানী, আমার থেকে অনেক বেশী , ত্রিশূল আগলে রেখে কী লাভ বল যদি নির্ভয়ে চালানোর নিদারুণ দক্ষতা ই না থাকে ! তাই যে তোকে প্রয়োজন , নিত্য , আদি-অনন্তকাল । আমি যা পারিনা তুই যে তা পারিস , আমার স্বপ্ন তোর নিপুণতায় মুহূর্তে হয় বাস্তবের প্রতিরূপ । কোনটা আসল , কোনটা প্রতিবিম্ব সে সত্য বরং ঝাপসাই থাক , শক্তি ও সাহসের চিরন্তন নির্ভরতার আয়ু মহাকালের জ্ঞানের অতীত । শুধু এটুকু জেনে রাখ , যা চিরকাল হয়ে আসছে , তাই যে নিয়ম ।

ধন্যবাদ ,
রোমি

কাঠগড়া

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

 

আপনি সর্বকালের বিতর্কিত চরিত্র বাসুদেব ! আপনার কথা ও কাজের গূঢ় অর্থ ঘিরে  গড়ে উঠেছে যুক্তি তর্কের সমুদ্র।  আপনি বিশ্ব ব্রম্ভাণ্ডের অধীশ্বর  , একাধারে কঠিন , জটিল , রহস্যময় , আপনাকে বুঝতে পারা আর  মোক্ষলাভের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই । আপনার কৃত কর্মের  বিশ্লেষণ জগৎ সংসারের  সাধ্যের অতীত, সে গুরুদায়িত্ব যে আপনাকেই নিতে হবে।আপনার নির্দেশ অনুযায়ী তিনটি অভিযোগের চিঠি আজকের সভায় উপস্থাপন করবার জন্য আমি প্রস্তুত।জ্ঞাত কারণে তিনজন অভিযোগকারীর প্রত্যেকেই নিজেদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জ্ঞাপন করেছেন। তাদের দাবী ,অভিযোগের শব্দ গুচ্ছ ই নাকি তাদের পরিচয় আপনার কাছে স্পষ্ট করে তুলবে।  আপনার উত্তরবন্দি চিঠি অভিযোগকারীদের কাছে যথাসময়ে পৌঁছে দেবেন মহাকাল। 

 

বাসুদেব কৃষ্ণ  চেনা ভুবনমোহিনী হাসি মেখে কাঠগড়াতে পদার্পন করে বললেন : বেশ , আমি প্রস্তুত ।

 

প্রথম অভিযোগ  :

সারথী সে আমার হলে বদলে যেত ভাগ্য ,
বাঁধবে আমার রথের চাকা , কার তা ছিল সাধ্য ?
শক্তির শেষ পরীক্ষাতে সাজল যে সে বাঁধ ,
সবটা জেনেও বাড়িয়ে দিল পক্ষপাতের কাঁধ।

 

বাসুদেব কৃষ্ণ :

রথের লাগাম ধরলে আমি , মিথ্যা হত শ্রম ,
অনুদানের ভিক্ষা ঝুলি পাতে যে অক্ষম ,
গান্ডীবকে আড়াল করে সুদর্শনের শক্তি ,
নিরপেক্ষ ইতিহাসের পাতায় লেখা সত্যি।
নিরস্ত্র সে মৃত্যু বরণ , যুদ্ধনীতির হার ,
কর্ণ!  আমি পক্ষপাতী , কিন্তু ভেবো কার !

 

দ্বিতীয় অভিযোগ  :

করলি মায়ের ধন্য জীবন , পাঁচ পুত্রের বরে,
দুঃখ গোপন যত্নে লালন ,গরীব সূতের ঘরে ,
পুত্র শোকই ভাগ্যে যদি , মিথ্যা সকল জয় ,
পাইনি যাকে তাকেই ভীষণ হারিয়ে ফেলার ভয় ।
ইচ্ছামতন বিধান লিখিস , ভাগ্যে ফলাস জোর ,
পাঁচের হিসেব খন্ড করার, সাধ্য ছিল তোর !

 

বাসুদেব কৃষ্ণ :

ধর্মরাজের ছদ্মবেশে লুকিয়ে ছিল পাপ।
ইতিহাসকে পুড়িয়ে দিল নারীর অভিশাপ ,
অস্থির মন, মায়ার বাঁধন, দিলাম প্রতিশ্রুতি ,
স্ময়ং হলাম যুদ্ধ চালক , কুটিল রণনীতি !
ধর্মচ্যুতির দোহাই দিয়ে , দিলাম যাদের শিক্ষা ,
তাদের মা যে পায়নি কেঁদে একটি প্রাণও ভিক্ষা।
পাঁচের হিসাব খন্ডাতে চায় কুন্তী মায়ের সুখ ?
বিচার হলে নিরপেক্ষ,মা তোর শূন্য হত বুক।

তৃতীয় অভিযোগ :

ভালোবাসার দোহাই দিয়ে, আগলে ছিলাম পথ ,
পাথর সমান সিদ্ধান্ত , থামলো না তার রথ ।
কাটল জীবন মনের কোণে প্রশ্নটিকে ঘিরে ,
কলঙ্কিনীর অবৈধ প্রেম আসবে কি আর ফিরে ?
অভিমানের প্রশ্ন সরল , “লাভ কী থেকে জমা “?
যমুনাকে তাই সাক্ষী রেখে , করেই দিলাম ক্ষমা ।

 

বিস্ময়ে কিছুক্ষণ মৌন থাকলেন বিচারক , চোখের কোণে চিক চিক করে উঠল জল  , তা আড়াল করে আবার মোহিনীমোহন হাসিতে ভরিয়ে দিলেন সভা।

 

বাসুদেব কৃষ্ণ :

করলি ক্ষমা , ভুললি সকল , মুক্তি পেলি রাধে !
আমায় তবু রাখলি আজও , নামের সাথে বেঁধে !
পূরণ হওয়ার আশাই বৃথা ,স্বপ্ন এমন কত ,
সব কথা তো যায় না রাখা ,ইচ্ছা থাকুক যত।
আত্মভোলা অবৈধ প্রেম , স্বপ্নেতে যায় ফিরে ,
বাঁশির সুরে স্বস্তি খোঁজে , বৃন্দাবনের ভিড়ে !
ভলোবাসা তোরই থাকুক, আমি নিলাম দোষ ,
আজন্মকাল পুড়বো একা , অনুতাপের রোষ ।

ধন্যবাদ ,

রোমি

চিঠি

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

মহাকাল দুটো চিঠি হাতে সন্তুষ্টির হাসি মেখে ঘরে ঢুকে জটিল হিসেবে মগ্ন ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বললেন : “আমার সামান্য কূটনীতির কাছে আপনার সৃষ্টি ভালোবাসার আরো একবার মর্মান্তিক পরিণতি !”

মহাকালের অপ্রাসঙ্গিক গল্পের ফাঁকে ঈশ্বর টেবিলে রাখা চিঠি দুটো হাতে নিলেন , ক্ষণিক চোখ বুজলেন, জেদ রাগের অন্ধকারে ঢাকা মন দুটিকে নিরীক্ষণ করলেন , প্রত্যক্ষ করলেন আঘাত হওয়া চরম মুহূর্তটিকে,কলমে টানা পরিণতির শব্দ গুলো উচ্চারণ করলেন ঈশ্বর:

মেয়েটি চিঠি :
“কাজের শেষে ক্ষণিক সময় , অবসরের দান ,
ব্যস্ত দিনে গুমরে কাঁদুক সুপ্ত অভিমান !
অপমানের রাত্রি শেষে ছোট্ট ক্ষমার ভোর ,
সকল ভুলে আবার সে ঠিক সঙ্গী হবে তোর ।
সঙ্কোচহীন লজ্জাবিহীন, অযৌক্তিক এ দাবি ,
অহংকারে যত্নে রাখা মনের ঘরের চাবি ,
ওতই সহজ নাগাল পাওয়া , যোগ্যতা কি তোর ?
নিয়ম বহুল অবহেলায় লুকানো উত্তর ।
শর্তাবলী উহ্য হলেও স্পষ্ট দৃশ্যমান ,
মানলে তবেই থাকবে টিকে সম্পর্কের টান ,
হিসেব বিহীন লাগাম টানিস , স্বার্থে ছোটাস রথ ,
সত্ত্বা দিল নিজের দোহাই , বদলে নিলাম পথ ।”

ছেলেটির কঠিন উত্তর:

“বাঁধবো তোকে কিসের জোরে , সম্পর্কের শক্তি কোথায় !
চাওয়া পাওয়ার কষতে হিসেব , মনের আজও ভুল হয়ে যায় ।
সবটুখানি চিনলি যখন , আড়াল করা মুখোশ টাকে ,
বাঁচলো সময় তোরও অনেক , দোষের ভাগী করবো কাকে!
চোখের জলে রাস্তা পিছল , করবো না যে ভালোই জানিস ,
ভিক্ষা করে করলে আদায় , হয় কি সে আর নিজের জিনিস !
হারিয়ে ফেলার ভয় হতো খুব , অভ্যাসই যে আঁকড়ে থাকার ,
এখন তা আর হয় না জানিস ! নেই তো কিছু হারিয়ে যাবার ।
আগাছা ওই দেওয়াল জুড়ে , সরাই যাকে তবুও ফেরে ,
যত্ন ছাড়াই দিনের শেষে , জেদ কে ফলায় অধিকারে,
বোঝায় আমায় , ব্যর্থ জগৎ ইচ্ছাটা তার আনতে বশে ,
থাকার যে সে তেমনি থাকে , শেষের দিনেও চিতার পাশে ।
করেই দিলাম আলগা সুতো , সুখের মেয়াদ বছর খানেক ,
সময় বাকি দিব্যি যাবে , যেমন গেল আগেও অনেক।”

চোখ খুললেন ঈশ্বর |এক ভীষণ অপ্রাপ্তির স্বাদ তার মুখের অকৃত্রিম সৌম্যতার ছাপকে অবিচল রাখতে পারলো না , তার হাতের মুঠোতে বন্দি অন্তরালের তলানিতে অবশিষ্ট ভালোবাসা।

কিছুদিন পর অচেনা ডাকবাহকের হাত থেকে ছেলেটি চিঠি টা নিয়ে বললো , “আপনাকে তো আগে কখনো দেখিনি “।
ডাকবাহক সাইকেলে চড়ে স্মিত হেসে বললেন :”হাতে লেখা চিঠির বাজার তো আজকাল মন্দা , তাই বোধহয় ।”

ছেলেটি নিশ্চিন্ত হয়ে খামটা খুলতেই পাতায় লেখা শব্দ গুলো তাকে গ্রাস করলো ।

“তাকে ছাড়াই দিব্যি জীবন, বদলাবে না কিছু ?
স্মৃতিও কি আর স্বভাব দোষে করবে না তোর পিছু ?
সব কিছু শেষ , অহম তবু তেমনি আছে জমা ,
নিজের ভেবে পাতলে দুহাত , করতো না কি ক্ষমা ?
সাধের সুতো আলগা থাকুক , সত্যি আসল শোন,
বাঁধার মতো বাঁধতে লাগে , নাছোড়বান্দা মন ।
পথখানি তার আগলে দাড়াস ,ভালোবাসার জোর ,
বন্দি হারায় সত্বা নিজের , সবটা হবে তোর ।”

অচেনা ডাকবাহক হাসিমুখে এবার মেয়েটির দরজায় । চিঠির পাতার স্বর্গীয় গন্ধে মুগ্ধ্ব মেয়েটি শব্দ গুচ্ছের ভিড়ে আরো একবার হারিয়ে ফেললো নিজেকে ।

“না হয় করে দেখতি পূরণ ,অযোক্তিক সে দাবী ,
মনের ঘরে রাখলি শুধু অহংকারের চাবি !
শাস্তি দিতে ভাঙলি যে ঘর , লাভের খাতায় ফাঁকি ,
ফিরিয়ে নিলি সবকিছু তোর , মনটা শুধু বাকি।
কঠিন মনে সময় করে বদলে যাবার আশা ,
অপেক্ষাতে চিতায় উঠুক দোষের ভালোবাসা ।”

মহাকাল দাবার গুটিগুলো নতুন ভাবে সাজিয়ে নিতে নিতে বললেন ,

মহাকাল : আপনার এই স্বেচ্ছাচারিতার কারণ জানতে পারি ?

ডাকবাহক অল্প হেসে বললেন : ছেঁড়া কাগজ কি শুধুই ক্লান্ত কলমের হেরে যাওয়া ব্যক্ত করে ? উঁহু!বার বার ছন্দ মেলানোর চেষ্টা কেও তো ব্যক্ত করে। ছন্দ মেলানো বড় কঠিন , সবসময় যে তা মেলে না , কিন্তু যখন মেলে তখন যে কবিতাটি অসম্পূর্ণ রাখা অপরাধ , সে দায় স্ময়ং কবিকেই নিতে হয় বৈকি। সমাপ্তি লাইনে সুখ মাখানো দাড়ি টানতে যে কি পরম প্রাপ্তি তা সহস্র বছর তপস্যা উর্দ্ধে মোক্ষ লাভী কে জিজ্ঞাসা কোরো না হয় ! সে অমৃত আস্বাদনের লোভ থেকে ঈশ্বর নামক সেচ্ছাচারীর যে মুক্তি নেই।

প্রাপ্তি

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

দরজা টা দমকা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল । ঘটনার আকস্মিকতায় শেষের শোনা কটু কথা গুলো কিছুতেই বোধগম্য হল না রিনির । চোখের জলের আড়ালে মনের ভিতরের অনুভূতিগুলো নিংড়ে বেরোতে থাকলো অনর্গল । অবিশ্বাসী মন আরো একবার দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই এক অকল্পনীয় ভয় তাকে ধাক্কা দিয়ে পথের একধারে এনে ফেলল , বাস্তবের সম্মুখীন হওয়ার চেয়ে যেন এখন মৃত্যু ই পরম কাঙ্খিত ।

ঘটনার এক অচেনা প্রত্যক্ষদর্শী কে লক্ষ্য করে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালো রিনি । ভদ্রলোক সহাস্যে এগিয়ে এসে বললেন , “তোমার কি কোনো সাহায্যের প্রয়োজন ?”
রিনি ঘোরের মধ্যে দরজার দিকে ফিরে তাকাতেই ভদ্রলোক বললেন , “ওটা তো আর খুলবে না , আমি যা একবার বন্ধ করে দি, সময় তাকে আর খুলতে পারে না ।”
রিনি : আপনি ?
প্রত্যক্ষদর্শী হেসে বললেন : ওহ! ওটা আমার এক আপত্তিজনক মুদ্রা দোষ ! বিশ্ব ব্রহ্মণ্ডের সবকিছুকেই বরাবর আমার নিজের বলে মনে হয় , বিশাল কর্মকান্ডও তার উর্দ্ধে নয় ।
রিনি ভীষণ ব্যস্ত হয়ে বলল : কিন্তু শেষ বারের জন্য আমাকে যে ভিতরে যেতেই হবে ।
প্রত্যক্ষদর্শী: উহু ! শেষবারের হিসেব টা যে অন্য কেউ রাখে রিনি ! শুধু চৌকাঠের এপার ওপার বলে নয় , যেকোনো কিছুরই শুরুর সাথে শেষের হিসেব নিশ্চিত করাই তার দায়িত্ব । আপাতদৃষ্টিতে কিছু ঘটনা আকস্মিক মনে হলেও আসলে তা সময়ের খাপে ছক কেটে মিনিট সেকেন্ডের খেলা ।
রিনি : খেলা ? কে জেতে এমন খেলায় ?
প্রত্যক্ষদর্শী: খেলা বৈকি ! টান টান উত্তেজনা পূর্ন খেলা ! সেকেন্ডে সেকেন্ডে বদলে যাচ্ছে গুটি , সাথে তাদের চাওয়া পাওয়া , কী ভীষণ জটিল হিসেবী চাল , পরিণতি সুখকর বা মর্মান্তিক যেমনই হোক শেষের দাড়ি কেটে গেলে ফিরে যাওয়া অসম্ভব । আমার কাছে যে পেন্সিল রাবারের বড় অভাব , অগত্যা পেনের মোটা কালিতেই অমর হয় অক্ষর । তবে হার জিতের ব্যাপারটা আপেক্ষিক ।
রিনি : আপনার কথা যদি সত্যি হয় , আমি কী তবে হেরে গেলাম ?
প্রত্যক্ষদর্শী: সে বড় কঠিন প্রশ্ন , আমি বরং সহজ ভাবে বলি । ওই দরজার ভিতরের মানুষের কাছে তোমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে । দরজার দমকা আওয়াজ একেবারেই আকস্মিক নয় বরং বহুদিনের মুলতুবী রায় । তোমার যাকে আজীবন
প্রয়োজন , তার ইচ্ছার গুরুত্ব দেওয়াও যে আবশ্যক ! আর সম্পর্কের সময়সীমার অবধি ইচ্ছামতো কল্পনা দিয়ে মাপার মতো মূর্খামি আর হয় না। বুদ্ধিমতীর ইঙ্গিতই যথেষ্ঠ হলেও অবিশ্বাসীর কাছে আয়নাও মিথ্যেবাদী , দ্বিতীয় নির্ণয়ে পৌঁছাতে স্ময়ং ঈশ্বর ও বেশ খানিকটা সময় লাগালেন ।
রিনি অবুঝের মত বললো : কিন্তু আমি যে এতকাল ওখানেই ছিলাম । আমার আমিত্ব , অধিকার , প্রত্যাশা , সবই যে চৌকাঠের ওপারে । যেখানে স্বেচ্ছায় ঢুকেছিলাম , পরিস্থিতি বা সময়ের প্রয়োজনে নয় , স্বেচ্ছায় বেরোনোর জন্য আমার আরো একবার ভিতরে যাওয়ার খুব প্রয়োজন ।
প্রত্যক্ষদর্শী: স্বেচ্ছাচারিতার কদর যে আমি করি না তা নয় ! তবে সে বরদান লাভের জন্য বিচক্ষণ হওয়া প্রয়োজন , সময়ের ইঙ্গিত বুঝতে হবে রিনি! মনবদলের হাওয়ার আঁচ পেতে হবে । স্থান বিশেষে প্রয়োজনের সময়সীমা নির্ধারিত , তা ফুরোবার আগেই নিজেকে স্থানান্তর করে ফেলতে হবে , কেউ বলার বা বোঝার আগেই । তবেই টিকে থাকবে আমিত্ব , নিজস্বতা , অযাচিত চৌকাঠের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া থেকে তবেই তার নিষ্কৃতি ।
রিনি : আর আমার অনুভূতি ? আমার চাওয়া পাওয়া ? তার বুঝি কোনো দাম নেই ?
প্রত্যক্ষদর্শী: দাম তো বাজারে বেঁচতে চাওয়া জিনিসের হয় রিনি ! তুমি যা হারিয়েছো তা যে বিক্রি হয়নি ।
রিনি : কিন্তু আমি যে নিজের সবটুকু দিয়েছি , একটুও কার্পণ্য করিনি , আজ কড়ায় গন্ডায় ফেরৎ চাইলে বুঝি অধিকারের অবমাননা হবে?
প্রত্যক্ষদর্শী: যারা সবটা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে , হাত পাতা যে তাদের আর শিখে হওয়া ওঠে না রিনি! অত্মসম্মানের ঘেরাটোপে সুপ্ত ইচ্ছার সলিল সমাধি ঘটে ।
রিনি : কিন্তু এখনো যে মুখের উপর দরজা বন্ধের আগে তার শেষ প্রশ্ন টা কানে বাজছে , উপহাস পূর্ণ অপমান বাক্য, “তোমার আরও কথা বলার আছে ? ” উত্তরটা দেওয়ার মতো শক্তি তখন ছিল না , নিজের সাথে লড়াই টা বড় দুর্নিবার হয়ে পড়েছিল ।
প্রত্যক্ষদর্শী: মৌনতার চেয়ে জোড়ালো উত্তর কিছু হয় না রিনি ! আর কখনো সাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে সম্পর্কের মৃত্যুদন্ড বলে , যা প্রতিশ্রুত হয়েছে তোমার ভিতর থেকে , আমি পরিষ্কার শুনলাম যে , চোখের জলের সে দৃঢ় ঘোষণা। দরজার ওপারে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় ফেলে আসা কোনোকিছুই আর তোমার নয় , সময় ভিক্ষার চাল রান্না করে পরম তৃপ্তিতে ভাত ঘুম দিচ্ছে । তাই আর অপেক্ষা না করে নিজেকে আবার নতুন করে তৈরী করো রিনি , এবার কিন্তু শক্ত হাতে বেঁধো সূক্ষ্ম অনুভূতির গাঁটগুলো , নতুন রিনির চোখের জল দেখার ইচ্ছা যেন দেবাদিদেব মহাদেবেরও অপূর্ন থাকে ।
রিনি : কিন্তু আমার গন্তব্য যে অনিশ্চিত , প্রয়োজনের পরিধি মাপতে নতুন দরজা র ঠিকানা জানা আবশ্যক ।
প্রত্যক্ষদর্শী: নিজের ভিতরের দরজাটা খুলতে অন্যের অনুমুতি নিষ্প্রয়োজন , মেয়েটার যে তোমায় ভীষণ দরকার , স্বার্থের হিসেবের সকল স্মৃতি বিলীন হতেই হারিয়ে যেও নতুন সত্তার পরম গভীরে । আর দেরী কোরো না রিনি! আমার যে মেলা কাজ বাকি আছে ।

রিনি স্বস্তির আবেশে চোখ বন্ধ করল , মুখে ফুটে উঠলো সকল প্রাপ্তির হাসি ।

কিছু সময় পর বন্ধ দরজার ভিতর থেকে পুরোনো অভ্যাসের ভুলে ক্ষনিকের আবেশে কেউ ডেকে উঠলো , ” রিনি !”

রিনির আবেশের ব্যাঘাত ঘটানোর ক্ষমতা আর কোনো জাগতিক স্বরের যে নেই তা বলা অনাবশ্যক ।

রসিক প্রত্যক্ষদর্শীর কেন যেন মনে হল এক্ষেত্রে মৌনতা একেবারেই বেমানান , তাই সে দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল , ” শেষ প্রশ্নে অপমানের পরিমাপ বোঝাই করার ব্যস্ততায় স্পষ্ট উত্তরটা অশ্রুত থেকে গেল যে ! হারিয়ে যাওয়া আর হারিয়ে ফেলার মাঝে যে বিস্তর ব্যবধান ,মশাই !ফিরে পাওয়ার বরদান শুধু প্রথম টির জন্য প্রযোজ্য তাও ক্ষেত্র বিশেষে , যতদূর জানি তা বিচারের মাপকাঠির দৈর্ঘ্য ও পরিধি সাধারণের অপরিমেয় , প্রয়োজনের ঘড়ি বাঁধা সম্পর্কের পক্ষে তার নাগাল পাওয়া অসম্ভব।

সম্পর্ক

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

মেঘার আজ জন্মদিন তবুও তার মন ভীষণ রকম খারাপ। সকাল থেকে নিরন্তর অপেক্ষা , একজন বন্ধুরও ফোন আসেনি , যাদের ফোন এসেছে তাদের সে বন্ধু বলে মনে করে না ।

স্কুল কলেজের দিন গুলোতে অজান্তে তৈরী হওয়া সম্পর্ক গুলোর পরীক্ষা নিতে হয়তো ভীষণ দেরী হয়ে গেল । তা হলেই বা কী ! সম্পর্ক যদি গভীর হয় , জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার ভিত তো অটুট থাকার কথা ! আর কিছু না ভেবেই ডায়াল করে ফেলল ভীষণ চেনা কিছু নম্বর । কথা বেশ খানিক ক্ষণ হল বটে কিন্তু ফল আশানুরূপ হল না , পরিবর্তে মন খারাপের মেঘ আরো জমাট বেঁধে গেল।

যে মানুষ টা আড়াল থেকে এসব নজর রাখছিলেন , এবার তিনি অবস্থা সামাল দিতে ঘরে ঢুকতে বাধ্য হলেন ।

মেঘা :মানুষ চেনা কি এতই কঠিন দাদান !

দাদান : আহা ! অল্পতেই বড় ব্যাস্ত হয়ে পড়িস তুই দিদিভাই! কঠিন সহজের বিচার তো তখন হবে যখন কাজটা করার চেষ্টা করবি !

মেঘা : তোমার বুঝি মনে হচ্ছে যে আমি তা করি না ?

দাদান : বলছিস যখন করিস হবে নিশ্চই , তা কটা মানুষ চিনলি এখনো পর্যন্ত ?

মেঘা : প্রথমে ভেবেছিলাম অনেক , তারপর হিসেবে করে দেখলাম হাতে গোনা , এখন তাও যে বড় জোর গলায় বলতে পারছি না ।

দাদান :সেই বরং ভালো , জটিল হিসেবে যত কম করা যায় বুঝলি কিনা !

মেঘা : সবাই যে একসাথে বদলে গেল , কত বছর ধরে জমানো মুহূর্ত দিয়ে গড়া গুটিকতক সম্পর্ক , শত টানা পোড়েনের মাঝখানেও ক্ষনিকের স্বস্তি , হারিয়ে গেল ! তা বুঝি হয় ? সকাল টাতেই গন্ডগোল , কাল রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগেও তো ঠিক একই রকম ছিল ।

দাদান : হয়তো ছিল না , মানে যাচাই তো তুই সকাল বেলায় করলি কিনা তাই বলছিলাম !

মেঘা : তোমার বুঝি খুব আনন্দ হচ্ছে ?

দাদান : ভীষণ ! তোর কোনো বন্ধু ফোন করেনি বলেই কিনা আজ দাদানের জন্য এতটা সময় । আর কদিন বাদে বিয়ে করে অন্য ঘরে চলে যাবি তখন তো তোর গুটিকয়েক পোষ্য র সাথে এই বুড়োকে একাই থাকতে হবে ।

মেঘা একটুও না হেসে আরো গম্ভীর হয়ে গেল ।

দাদান : শোন দিদি ! মানুষের যেমন বয়স হয় , সম্পর্কেরও তো হয় , সময়ের সাথে যেকোনো গাঁট ই দুর্বল হয়ে পড়ে যে ! নতুন বাঁধনের উত্তেজনা সেখানে কোথায় ! আমার মতো বুড়ো মানুষেরা যেমন সুস্থ থাকার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও পারে না , বয়স বাড়লে সম্পর্কের ও হয় সেই একই অবস্থা , তখন অস্তিত্বের তাগিদে তার শক্তি চাই , যত্ন চাই। বৃদ্ধ শরীর যাকে পথ্য বলে থাকে , সম্পর্কের ভাষায় তা হল সময় , না পেলে ফাটল অনিবার্য ।

মেঘা : সময় যে আর আগের মতন অনেক নেই দাদান ! সবাই যে ব্যস্ত !

দাদান : সমস্যা টা তো সেখানেই দিদি ! তুই যে সময় গাঁট গুলো বেঁধেছিলি তখন তো জীবন শুরু ই হয়নি , আর এখন যে সূর্য দেব ঘুম থেকে উঠে আপিস রওনা দিয়েছেন বলে কথা । কিন্তু জন্মদিনে হাসি বাতিলের মত শক্ত অজুহাত এটা নয় , ফোন টা নিয়ে আয় দেখি , ছোটবেলার মতো দাদান ই অগত্যা বন্ধুদের মাঝের সমস্যা মেটাক ।

মেঘা : কোনো দরকার নেই ! আমি ফোন করেছিলাম ।

দাদান : একজনকে করেছিলি হবে , বাকি দের করতে দোষ কোথায় !

মেঘা : না ! তিন জনকে করেছিলাম , কারোর কিছু মনে নেই । তৃনাকে কলেজে একটা বেশী ক্লাস নিতে হচ্ছে , বাড়ি ফিরে ফোন করবে বললেও আমি জানি সেটা কথার কথা । স্মৃতি র ছেলে খুব ছোট ও কাঁদুনে,শাশুড়ির নিন্দা ছাড়া আর কিছু করার ওর সময় নেই । সঞ্জু প্রেমিকা পরিবর্তনে ব্যস্ত , নতুন প্রেমিকা , নতুন পরিশ্রম , নতুন মিথ্যা,মেয়েরা কী উপহারে খুশি হয় তা জানতেই মাঝে মধ্যে আমার দরকার পড়ে ।

দাদান :আর পৃথা ? খুব হাসি খুশি মেয়েটা , আমার বেশ মনে আছে , প্রায়ই আমাদের বাড়ি আসতো ।

মেঘা :ও আর হাসি খুশি নেই দাদান , ভীষণ রকম সন্দেহ বাতিক ও বদমেজাজী হয়ে গেছে , বেশীর ভাগ সময় ফোন ধরে না , নিজের থেকে অম্লানের ফোনের দিকেই খেয়াল বেশী । এমনটাই তো হওয়ার ছিল , স্কুলের সময় থেকেই অম্লানের চরিত্র ভালো ছিল না , অনেক বারণ করেছিলাম , অগণিত ঝগড়া , শেষমেশ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতেই মুখে কুলুপ আটলাম ।

দাদান : তবু খবর তো নিতে হবে দিদিভাই ! কাছের মানুষদের ভালো মন্দ জানা টা যে ভীষণ জরুরি । সকলকে ভালো রাখতে না পারিস কিন্তু জানান তো দিতেই হবে যে তুই আছিস , যেমন টা কথা হয়েছিল , তেমনটাই । সবাই না রাখলেও কেউ কেউ তো কথা রাখেই।

মেঘা : তা তো রাখেই ! তাছাড়া নতুন হাতগুলো স্বার্থে ভরপুর দাদান , বন্ধুত্বের মুখোশে কি ভয়ানক চরিত্র কে না আড়াল করে ।

দাদান : নতুন সম্পর্কের বড় জ্বালা রে দিদি ! নতুন করে হিসেবে নিকেশ , কথার মার প্যাচ , সত্যি মিথ্যার বচসা , নিজেকে গোড়া থেকে প্রমাণ করার তাগিদ । আরো বয়স হলে বুঝবি পুরোনো গুলোই অভ্যাস , ভালোবাসা । অভাব অভিযোগ যেমন তেমন , মরচে সরলেই একদম তাজা , নির্ভেজাল , এপার ওপার দেখার জন্য আতস কাঁচ অপ্রয়োজন,আমার বন্ধু গুলো যখন একে একে চলে যাচ্ছে, খুব ইচ্ছা করে জানিস দিদি ! গন্তব্য না জানেই পিছু নি ঠিক আগের মতন , বলা কি যায় হঠাৎ খেয়াল করে আবার যদি আনন্দে পাগল হয়ে জড়িয়ে ধরে !

মেঘা দাদুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল আড়াল করল আর অস্ফুটে বলল , “প্লিজ !”

দাদান অল্প হেসে তার মাথায় হাত দিয়ে বলল ,

মনে রাখিস দিদি , কলেজে একদিন ছুটি পড়বে ই , কোনো কাঁদুনে ছেলেই চিরকাল ছোট্টটি থাকে না , এক্ষেত্রে ভীষ্ম লোচন শর্মার ব্যাপারটা ধরিস না । স্ত্রী ভাগ্য প্রাপ্তি হলেই অতি বড় প্রেমিকেরও প্রেমিকার খোঁজ ফুরাতে বাধ্য , সবশেষে সন্দেহ বড় এক ঘেয়ে বিষণ্ণতা আনে , একসময় ক্লান্তি আসতে বাধ্য।

অজান্তেই মেঘার মুখের হাসি মিশে গেল স্বস্তির নিঃশাসে ।

ছদ্মবেশী

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

চঞ্চল কাঠবিড়ালীর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভগবান রোজের মতন আজও মন দিয়ে নিরীক্ষণ করছিলেন মেয়েটিকে। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া নিশ্চই জরুরি , কিন্তু তার গুরুত্বের মাত্রা কি ঈশ্বরকেও ব্যাকুল করে ? কিন্তু তা কি করে সম্ভব! তিনি তো ত্রিকাল জ্ঞানী , কৌতূহল যে তাকে স্পর্শ করতে পারে না ! তবুও অসাধারণের মোড়ক খুলে স্বয়ং স্রষ্টাকে অতিসাধারণ ছদ্মবেশের আড়াল নিতে হয়, সে প্রয়োজনের সন্ধান দিতেই বুঝি তিনি মৌনতা ভাঙলেন আজ।

ছদ্মবেশী নদীর পারে একলা দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন ,

ছদ্মবেশী> তোমাকে প্রায়ই এইসময় নদীর পারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি , তুমি বুঝি কারো অপেক্ষা করো ?

মেয়েটি > হুম , নিজের । ভিড়ের মাঝে নিজেকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টাতেই এই বিপত্তি । আসলে আমি তো আলাদা নই,আশেপাশের চেনা শতকরা ৯০ জনের সাথেই মিল খুঁজে পাবেন আমার , অতি সাধারণ চাওয়া পাওয়ার ঘেরাটোপের আড়ালে অসাধারণের মুখোশ পরে থাকা কি সহজ বলুন !

ছদ্মবেশী> একদম সহজ নয় , তা কেন পড়লে এমন বেমানান মুখোশ ?

মেয়েটি >সাধারণের মূল্য ধার্য করার সময় যে কারো হয়নি । অসাধারণ বলেই কিনা দ্রৌপদী শ্লীলতাহানি থেকে রক্ষা পেল, সবাই কি পায়!

ছদ্মবেশী > তোমার নিজেকে ফিরে পেতে ইচ্ছা করে না ?

মেয়েটি > সে ইচ্ছার টানেই তো রোজকার এই সময় বাঁধা নিয়ম । খুব অদ্ভুত হলেও ব্যাপারটা সত্যি । চোখের জলের ফোঁটা নদীর জলে একবার মিশতেই নিজেকে ফিরে পাই আমি , একদম খাঁটি নির্ভেজাল সত্ত্বা ।

ছদ্মবেশী > তাহলে কী আর সমস্যা! , সকালে যা হারালে বিকেলে তা কড়ায় গন্ডায় ফেরৎ ।

মেয়েটি >সমস্যা একটু আছে বৈকি , চোখের জল জমতে যে সময় লাগে ,কখনো কয়েক মাস , কখনো বা বছর , সহ্যের সীমা ছাড়ানোর নিরন্তর অপেক্ষা , অভ্যাসের জীবনে দুঃখ দুর্লভ কিনা !

ছদ্মবেশী > বুঝলাম ! তা তুমি কি করো ?

মেয়েটি > বিক্রি ,যা আসলে পুঁথি পড়া বিদ্যা কিন্তু পেশার কারণে গুণ বলতে হয় ।

ছদ্মবেশী >তাতে অভাব মেটে ?

মেয়েটি > টাকার ? তা মেটে , বাকি কিছুর অভাব কোনো পেশাই মেটাতে পারে না ।

ছদ্মবেশী >কখনো নিজেকে অসহায় মনে হয় ?

মেয়েটি > ভালোবাসার মানুষ গুলোকে সময় দেওয়া যখন বিলাসিতা মনে হয় , ঠিক তখন ।

ছদ্মবেশী >তুমি ভগবানে বিশ্বাস করো ?

মেয়েটি > না , আস্তিকদের ভিড় আমাকে বুঝিয়েছে স্বার্থের সম্পর্কে বিশ্বাসের ভিত নড়বড়ে হয়ে থাকে ।

ছদ্মবেশী >যদি তিনি সত্যি থেকে থাকেন আর তুমি তাকে হঠাৎ দেখতে পাও তাহলে কিছু চাইবে ?

মেয়েটি > চাইবো না , দেবো , তার অস্তিত্বে আমার স্বার্থহীন বিশ্বাস ।

ছদ্মবেশী >কিছু চাইবে না ? তার যে অদেয় কিছুই নেই । সুখ , অর্থ অথবা মোক্ষ , চাইতে দোষ কি ?
মেয়েটি >এক সুখ এক মানুষকে বেশীদিন সুখী রাখে না , অর্থ উপায়ের জন্য ভগবানের প্রয়োজন নেই,মোক্ষ ব্যাপারটা লোভনীয় হলেও ক্ষতির পরিমাণ টা বড় বেশী ।

ছদ্মবেশী > মোক্ষ লাভে ক্ষতি ?

মেয়েটি > ক্ষতি নয় ? বাকি জীবনের চাওয়া পাওয়া , সমস্যার লক্ষণরেখা , সমাধানের শক্তিশেল , নিংড়ে নেওয়া অভিজ্ঞতা ,সময়ের চাল বদল , গোনা কয়েক মুহূর্ত , ভালোবাসার গাট ছড়া , এসকলই যে দিয়ে দিতে হবে বিনিময় প্রথা অনুযায়ী , তাতেও সাফল্য প্রতিশ্রুত নয় । তাছাড়া চিরস্থায়ী যখন নয় আর পুরোটাই আমার , স্বাদ যেমনই হোক চেখে নিতে দোষ কি ? মানে জীবনের কথা বলছিলাম ।

ছদ্মবেশী (হেসে)> কখনো মনে মনে প্রার্থনা কোরো , নিজ সৃষ্টি র জন্য স্রষ্টার গর্ব যেন চিরস্থায়ী হয় , হৃদয় যেন সহস্র কোটি বছর । নিশ্চিত থেকো এতে তোমার স্বার্থ নেই , আছে অন্য কারো ।

ধন্যবাদ ,
রোমি

বাকরুদ্ধ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বোঝার যদি ইচ্ছা থাকে, শব্দ রাশি ব্যর্থ খোঁজা ,
বাক্যে মেপে গন্ডি মনের নাগাল পাওয়া ওতই সোজা ?
সদ্য জাত শিশু যখন মাকে প্রথম স্পর্শ  করে,
অভিধানের স্পর্ধা কোথায় , মনের ভিতর আয়না ধরে ?

মৃত্যু যখন অপেক্ষাতে , ঝাপসা যখন জগৎ বাকি ,
বুঝতে পারা, যায়নি দেওয়া সময়কে তার অঙ্কে ফাঁকি ,
“আসছি আমি , ভালো থেকো “, শব্দে বলা নাই বা গেল ,
ভালোবাসার শেষ পাতা টা , নাই বা  কথায়  ব্যক্ত হল।

হাত টা চেনা  ছাড়ল যখন, নতুন হাতের অমোঘ টানে ,
কষ্ট  কী আর ভার হারাতো   ক্ষণিক কটু বাক্য বাণে ?
দোষ ছিল কার ,  ব্যাখ্যা হাজার , আর কী হত প্রশ্ন করে ,
শব্দ ভিড়ে ভাগ্য লিখন  বদলে দিতে কেউ কি পারে ?
সুখের হিসেব মিলিয়ে দিতে  , চায়নি সে আর ডাকতে পিছু ,
চোখের জলের নীরব ধারায় লুকিয়ে ছিল হয়তো  কিছু।

একলা না হয় সবাই থাকে ,বন্ধু তবু ভীষণ  প্রিয় ,
স্বার্থ এমন হানবে আঘাত ,কক্ষনো তা  জানতো না ও !
গড়তে যাহা বছর গেল , মুহূর্ত তার  সবটা  কাড়ে ,
বিশ্বাসেতে লাগলে মোচড় , শব্দ কি আর জুড়তে পারে ?

সেই যে বিশেষ ইচ্ছাখানি , হঠাৎ করেই পূরণ হল ,
যুগের শেষে বন্দি যেন খাঁচার থেকে মুক্তি পেল ,
স্বপ্ন সুখে বিভোর হৃদয় , হারিয়ে গেল  শান্তি ঘুমে ,
পারল না সে চুকিয়ে দিতে সুখের হিসেব শব্দ গুনে ,
হাসির স্রোতে  ভাসিয়ে দিল সবটুকু তার উজাড় করে ,
শব্দ হারায় স্বত্বা নিজের , হৃদয় ভরা খুশির ঘোরে।

ঈশ্বরও তো মৌন থাকে , তোর ডাকে সে দেয় কি সাড়া ?
অধিকারের প্রশ্ন বিনাই অন্তরে তার বিরাজ করা ,
যত্নে তবু করিস পুজো , চাস যা খুশি ইচ্ছা হলে  ,
চাওয়া পাওয়ার টানাপোড়েন ,শব্দ ছাড়াই দিব্যি চলে ।

আমার বেলাই অন্য নিয়ম , অপেক্ষাতে থাকিস বসে,
খুলবো কখন মনের খাতা , নিখুঁত কটি বাক্য কষে ।
মিথ্যা জমা অভিযোগের  আঁচল থাকে শব্দে ভরা ,
গভীর যখন অনুভূতি , যায় না কথায় প্রকাশ করা ,
মনকে ছুঁতে মন ই পারে , শব্দ কেন খুঁজিস বৃথা ?
চাস না দিতে বদলে নিয়ম ,  অটুট থাকুক নিজস্বতা ।

লুকোচুরি

Comments 3 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বিনি দৌড়ে এসে তার আদরের ছোট পিসির  পাশে শুয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগলো ।

পিপি : কে ? বিনি সোনা  নাকি ? একি ! মাগো ! চোখে জল কেন ?

বিনি : সবাই যে বলছে যে তুমি চলে যাবে আর কক্ষনো ফিরবে না ।

পিপি অল্প হেসে বললো : ও তাই বুঝি বোকা মেয়ের চোখে জল ? এমন আবার বুঝি সত্যি হয় ! পিপি কি বিনি সোনাকে ফেলে কোথাও যেতে পারে !

বিনি : তাহলে তুমি আমায় ছেড়ে যাবে না ? সবাই তাহলে মিথ্যে কথা বলছে ?

পিপি : যাবো নাই তো , মিথ্যা ছাড়া আর কী ! কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলে গেল আমার সোনার ,এদিকে আয় দেখি চোখ মুছিয়ে দি ।

বিনি পিপিকে জড়িয়ে ধরে বললো : জানো পিপি ডাক্তার কাকু খুব খারাপ ! উনিই  তো এই মিথ্যা কথাটা সকলকে বলেছেন । ঠাম্মি , মা , কাকামনি , বাবা , জেঠ্যুমনি  তাই তো কাঁদছে । আমি সবাইকে  গিয়ে সত্যি টা বলে দি পিপি ? তাহলেই সব আবার আগের মতন হয়ে যাবে।

পিপি : হুম সে বলতে পারিস কিন্তু তাহলে আর নতুন খেলাটায় মজা হবে না যে ।

বিনি : নতুন খেলা ? সেটা কী  পিপি?

পিপি : সে এক ভীষণ মজার খেলা । তুই খেলবি ?

বিনি : হ্যাঁ খেলবো না কেন ? কী খেলা গো ? আমায় বলো না পিপি ।

পিপি : লুকোচুরি ।

বিনি: এমা ! এটা আবার নতুন খেলা নাকি ? আমি তো কতবার তোমার সাথে খেলেছি , তুমি তো লুকোতেই পারো না , আমি তো প্রতিবারই এক চান্সে তোমায় খুঁজে বার করে ফেলি ।

পিপি : ওই তো ! এবার আর পারবি না , অনেক খুঁজতে হবে ,হাফিয়ে গেলে চলবে না কিন্তু , হেরে গেলেও চলবে না ।মনে রাখিস পিপি কিন্তু আছে, দেখতে পাচ্ছিস না কারণ লুকিয়ে আছে । যে যাই বলুক কারো কথা বিশ্বাস করবি না , সত্যি সেটাই যেটা আমি তোকে বলছি। সময় যতই পার হয়ে যাক, পিপি কিন্তু তোর ধাপ্পা দেবার অপেক্ষা করতেই থাকবে।

বিনি : আর আমি যদি তোমায় খুঁজে না পাই তাহলে কী হবে ?

পিপি : ওমা ! তাই আবার হয় নাকি ? সাপসিঁড়ি হোক অথবা লুকোচুরি , সব তো খেলাই নাকি ! শুরু যখন হয়েছে  শেষ তো একদিন না একদিন হতেই হবে ,  আর ঠিক তখনি বিনি খুঁজে পাবে তার পিপিকে , পেতেই হবে , যেমনটা এতদিন হয়ে এসেছে , তেমনটাই যে নিয়ম।

বিনি : কিন্তু আমি তো তোমাকে ছাড়া থাকিনি কখনো , আমার খুব ভয় করছে যে  , তোমার বুঝি করছে না ?

পিপি : আমারও তো করছে , কিন্তু ভয় পেলে যে খেলা যাবে না আর না খেললে যে শেখা হবে না।

বিনি :কী শেখা হবে না পিপি ?

পিপি : ভয় না পেতে শেখা হৰে না বোকা মেয়ে !

বিনি : তুমি হারিয়ে যাবে না তো পিপি ?

পিপি : ধ্যুর! পাগল মেয়ে ! যত বড় হবি তত বুঝবি যে হারিয়ে যাওয়াটা খুব বড় মিথ্যা ,সবশেষে ফিরে পাওয়াটাই  হল আসল সত্যি ।কি রে ! এখনো ভয় লাগছে ?

বিনি : তুমি যে কী  বল পিপি ! যে খোঁজে তার আবার ভয় লাগে নাকি ! যে লোকায় তার তো ধাপ্পা খাওয়ার ভয় লাগে । এবার তো খুঁজতে অনেক টা সময় লাগবে তাই ধাপ্পা টা এতো জোরে দেবো যে কানে তালা পরে যাবে তোমার ।

পিপির খিলখিল হাসির সাথে বিনি সকল কষ্ট পিপির শাড়ি তে মুছে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল ।

মামাবাড়ি থেকে ফেরার পথে বিনি শুনতে পেল মা গাড়িতে বাবাকে বলছে ,”বাড়ি তো এসে গেল ! বিনি পৌঁছেই তো আগে  দিদির ঘরে যাবে।তুমি কী এখনও চুপ করে থাকবে ?” নিরুত্তর বাবা ঝাপসা চোখে জানলার বাইরের দিকে দেখতে লাগলো ।

গাড়িটা বাড়ির সামনে থামতেই  বিনি দৌড়ে পিপির ঘরে গিয়ে ডাকলো : “পিপি !”

খালি ঘরে বার বার ডেকে কোনো সাড়া না পেয়ে চিন্তিত বিনি খাটের পাশে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইল , তারপর হঠাৎ হেসে বললো : ও বুঝেছি! খেলাটা শুরু হয়ে গেছে । তুমি একদম ভয় পেও না পিপি , বিনি  তোমাকে  খুঁজে বার করবেই  ।

 

ইচ্ছা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

নামিয়ে মাথা মৌন থাকি ,চাই কী আমার  শুধাস  যখন,
উপহারেও মন ওঠে না , এমন কী হয় সত্যি  এখন  !
ভাবিস আরো  অনেক কিছু , ভাবিস তোকে দিচ্ছি ফাঁকি ,
নয়তো কেন ইচ্ছা নিজের  , যত্ন করে  লুকিয়ে রাখি !
যখন ভাবি বলবো কথা , কাজের ভিড়ে ব্যস্ত থাকিস ,
চিঠির ভাঁজে দিলাম রেখে , ইচ্ছা জমাট মনের হদিস ।

সিগারেটের ধোঁয়ার খেয়াল , হারাস  চেনা পথের মোড়  ,
ইচ্ছা আমার, বৃষ্টি হঠাৎ , নেভাক আগুন , কাটাক ঘোর !
ভয়ের লাগাম চাই না দিতে,  স্বাধীন চেতা হৃদয় টাকে ,
তবুও বলি মৃত্যুর চেয়ে  ,বাঁচার নেশাই মানায় তোকে !

বইয়ের স্তূপে বুঁদ হয়ে তুই , ভুলিস যখন জগৎ  বাকি ,
দমকা হাওয়ায় উড়ুক পাতা , মনে প্রাণে চাইতে থাকি ।
চশমা ভাঙুক , মেঝের উপর কলম সারির  লুটোপুটি ,
তখন শুধুই গল্প হবে ,ঝড় হলে তো পড়ার ছুটি ।

মনখারাপের চোখের জলে , সাধের  কাজল নষ্ট হলে  ,
হারিয়ে যাওয়ার মন্ত্র বলে  ,লুকোতে চাই  তোর আড়ালে !
মনভোলানো জাদুর কাঠি  ,রাজপুত্রের সাদা ঘোড়া ,
মিথ্যে  যখন রূপকথারা ,  জীবন শুধু ই তোকে ঘেরা  ।

দামী শাড়ি , গয়না পড়ে  ,তোর সামনে দাড়াই আমি ,
“ভালোই তো বেশ  “,  বলেই আবার বইতে হারাস সবটুখানি ,
ইচ্ছা পূরণ হঠাৎ হল , খোলা চুলে স্নানের পরে ,
মুগ্দ্ধ চোখে দেখলি আমায়  , সেদিন যখন পুজোর ঘরে ।

ভবিষ্যতের ভাবনা টানে , অনিশ্চিতেই  চিঠির ইতি ,
হ্যাঁচকা টানে ছোটোবেলা , চিন্তাবিহীন দিনের স্মৃতি ।
শান্তি ঘেরা রাত্রি  গুলো , নির্ঝঞ্ঝাট বিকেল আমার,
ইচ্ছা ভীষণ, দায়িত্ব শেষে,তোর ই সাথে খুঁজবো আবার।

যুগপৎ

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ফর্মুলার খাতায় আরো একবার চোখ বুলিয়ে নিল গিনি । গত কয়েক মাসের নিরলস পরিশ্রম স্বার্থক হলে ,তার তৈরী নতুন যন্ত্র টি দূর করতে পারবে একাকিত্ব , নিঃসঙ্গতা  প্রভাবিত হবে ফর্মুলার যাদু কাঠিতে , জীবনের হিসেব মুহুর্তে বদলে দিয়ে অসাধ্য সাধন করবে যন্ত্রটির ইচ্ছা বোতাম ,  তবে আগের  যন্ত্র গুলোর  মতন সম্পূর্ণ গিনির ইচ্ছায় পরিচালিত হবে না এটি , নিজের প্রয়োগ স্থান এবং পদ্ধতি নির্দিষ্ট করবে এটির ভিতরের ইচ্ছা বোতাম। যদিও তার অন্য আবিষ্কারের মত এটির কার্যকারিতাও পরীক্ষা সাপেক্ষ, তবুও গিনির চিন্তা জুড়ে অবাধে যাতায়াত করে চলল নতুন আবিষ্কারের উত্তেজনা। যন্ত্রটিকে টেবিলের উপরে রেখে বিছানার উপরে শুয়ে পড়তেই প্রিয় লজেন্সের আদরে ভিজে গেল গিনির ক্লান্ত শরীর।

শনিবার সকালে উঠে যন্ত্রটি হাতে নিয়ে মা কে বলে আলুভাজা দিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ল গিনি । রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সেই ছোটবেলা থেকে পাড়ার এই প্রবীণার সাথে এক অলৌকিক  মায়ার বাধনে বাঁধা সে, তার ছোট্টবেলার গোসাঘর হল দিদার চিলেকোঠার ধারের সিড়ির তলা । সেই গোসা ভাঙ্গানোর একমাত্র ওষুধ ছিল দিদার হাতে তৈরী ঝিরঝিরে আলুভাজা । দিদার কাছে নানা রঙের গল্প শুনে রাগের কারণ ভুলে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ত ছোট্ট গিনি , নিজের অজান্তে বাবার কোলে বাড়ি ফিরতো ঘুমন্ত মেয়েটা । খুব অল্প বয়সে বিধবা নিঃসন্তান এই মহিলার ভিতরের সীমাহীন ভালবাসা গিনির ছোটবেলার স্মৃতিকে আজকের ব্যস্ততার ভিড়েও ম্লান হতে দেয়না । বয়সের কারণে এখন প্রায় গৃহবন্দী একসময়কার ভীষণ কর্মঠ  মহিলা  নিহারী গুহ ওরফে গিনির আলুভাজা দিদা । প্রতিবেশীদের  থেকে শহরের নাম করা বৃদ্ধাশ্রম গুলোর সুযোগ সুবিধা অনেকবার শুনেও কিছুতেই এই বাড়িটার মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেননি নিহারী দেবী , ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী রক্ষনশীল পরিবারের মেয়েটি  কলেজে পড়াকালীন সকলের অমতে  বিয়ে করেন তার ভালবাসার  মানুষকে  , স্বামীর হাত ধরেই  বিয়ের রাতে প্রথম বার পা দেন  শ্বশুরের তৈরী করা এই বাড়িটি তে। বাড়িটির পবিত্রতা নিহারী দেবীর  কাছে মন্দিরের চেয়েও বেশী । ছোটবেলায় মা হারানো  একটি ছেলের  বড় হওয়ার নির্বাক সাক্ষী এই বাড়িটি, বাকি সকলে মুখ ফিরিয়ে নিলেও, ছেলেটির  স্ত্রীকে  প্রথম দেখাতেই   নিজের সবটা দিয়ে আপন করে নিয়েছিল এই বাড়ির প্রতিটা কোণা ,নিজের সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে  বেঁধে নিয়েছিল অলৌকিক মায়ার বাঁধনে । বিয়ের পরের কাটানো রঙীন দিন গুলোর স্মৃতি আজও বাড়িটার সর্বত্র লেগে আছে , হঠাৎ অসুখে স্বামীকে হারিয়ে সেই স্মৃতি আঁকড়েই  নিহারী দেবী কাটাতে পেরেছেন এতগুলো বছর , তাই কিছুতেই এই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন না  তিনি , তবে সারা জীবনে জুড়ে  তৈরী করা নিঃস্বার্থ সম্পর্ক গুলোর  গাঁট  আজও একই রকম অক্ষত, গিনির মত ভক্তের সংখ্যা  তার অগনিত কিন্তু  ব্যস্ত জীবনের চাপে স্বাভাবিক কারণেই  যখন তখন  স্বনিমন্ত্রিত অতিথির  সংখ্যা আজকাল হ্রাস পেয়েছে, শারীরিক অক্ষমতার কারণে নিজেও আর কারো বাড়ি বেশী যান  না , অভ্যাসের বলে এই বয়সেও সংসারের দৈনন্দিন  কাজ গুলো নিজেই করে থাকেন তাই বলা বাহুল্য কাজের লোকের  প্রয়োজন তার কখনো ই পড়েনি ,তাই নিহারী দেবীর  এখনের  একাকিত্বের দায়ভার শুধুই  যেন সময়ের । প্রিয় আলুভাজা দিদার  শারীরিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার উপায়  গিনির অজানা হলেও তার শেষ বয়সের একাকিত্ব দূরের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রমে সে তৈরী করেছে ‘যুগপৎ’ নামের এই নতুন যন্ত্রটি।

দিদার বাড়ির কড়া নাড়তেই দেখা মিলল সেই ছোট্টবেলা থেকে পরিচিত হাসি মুখ টার , পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রনাম করেই গিনি বলল,  “কী করব ? সকাল সকাল আলুভাজা খেতে ইচ্ছা হল যে ! ” নিহারী দেবী হেসে বললেন “ভাগ্যি আমার ! তাই না সোনা মেয়েটার দেখা পেলাম !” দিদাকে জড়িয়ে ধরে গিনি বলল , ” আমি বুঝি খুব স্বার্থপর?” সাথে  সাথে  দিদার শক্ত গলার  আদর জড়ানো  প্রত্যুত্তর “বালাই শাঠ!কান টা  যে অনেকদিন মোলা হয়নি  কথা শুনে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।” গিনি খিলখিল হেসে ছোটবেলার অজস্র স্মৃতি  জড়ানো বাড়িটাতে ধীর পায়ে মিশিয়ে দিল নিজের উপস্থিতি ।

আলুভাজা ভাজতে ব্যস্ত নিহারী দেবীর পিছনে  দাড়িয়ে গিনি ব্যাগ থেকে যন্ত্রটি বার করল, ইচ্ছা বোতামে আঙ্গুল ছোঁয়ানো  মাত্র  যন্ত্র থেকে বেরোনো আলো রশ্মি নিহারী দেবীকে স্পর্শ করলো ,নিহারী দেবী চমকে উঠে পিছন ফিরতেই গিনি যন্ত্রটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে ব্যাগের পিছনে আড়াল করে নিল। নিহারী মৃদু হেসে বললেন , “কি রে ! দিনের বেলায় টর্চ জ্বালছিস কেন ? ভাবছিস বুঝি দিদার চোখ টা একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে , ঝাপসা দৃষ্টি তে সাধের আলুভাজা বেস্বাদ হয়ে গেল বুঝি !” গিনি খানিকটা সামলে নিয়ে বলল ,”ধ্যুর ! তা কেন হবে ! আলুভাজার গন্ধে তাড়াতাড়ি আসতে গিয়ে অসাবধানে টর্চে হাত পড়ে গিয়েছিল ।কখনো কখনো কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতে দেরী হয় বলে মা এটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছে ।” নিহারী দেবীর উত্তর না শুনেই রান্নাঘর থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল  গিনি , বসার ঘরে ঢুকে যন্ত্রটা সামনে আনতেই  তা থেকে বিচ্ছুরিত আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল  তার , কয়েক সেকেন্ড পর ইচ্ছা বোতাম ভিতরে ঢুকে যেতে যন্ত্রের  আলো নিজে থেকে নিভে গেল । যন্ত্রটি নিহারী দেবীকে পর্যাপ্ত নিরীক্ষণের সুযোগ পেল না তাই তার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে উদ্বেগে গিনির মন ভরে  গেল।

দিদার সাথে সারাদিন অনেক গল্প করে সন্ধ্যে বেলা বাড়ি ফিরল গিনি।টেবিলের ওপর চিন্তায় অবশ  মাথা রেখে  নিজের অজান্তেই  সে  কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল ,মা ঘরে ঢুকে মাথায় হাত রেখে বললেন , “ক্লান্ত লাগছে  খুব , তাই না ? কতবার বলেছি এদিক সেদিক ঘুরিস না  ছুটির দিনগুলো তে।” গিনি চোখ কচলে উঠে খাটে শুয়ে বলল , “ক্লান্ত না হলে যে তুমি  তো আদর ই কর না !” মা হেসে পাশে বসে বললেন , “তাই বুঝি ! তোর লজেন্স কে জিজ্ঞাসা কর ! আজ সারা দুপুর আমার আদর খেয়েছে । ” নিজের নাম শুনে আল্হাদে গদগদ লজেন্স দৌড়ে  বিছানায়  উঠে গিনি আর মায়ের মাঝে ঠেলে  নিজের জায়গা করে আদরের বিশেষণ গুলো কে আরো একবার  লালাময় করতে লাগল ।

দুটো দিন বেশ চিন্তায় কাটল গিনির, অনেকবার ভেবেও আলুভাজা দিদার বাড়ি যেতে পারেনি সে , গিনি গেলেই দুর্বল শরীর নিয়ে দিদা রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্য কোনো উপায়ও তো নেই  , দুদিন আগে ঘুরে এসে ,এখনই ফোন করে খবর নিলে দিদার অদ্ভূত লাগতে পারে । সকালে জলখাবারের টেবিলে পৌঁছে বাবাকে একটা বই মনোযোগ সহ পড়তে দেখে  গিনি বলল , ” বাবা ! তুমি না শিখিয়েছ খাবার সময় অন্য কাজ করতে নেই ! ”

মা : তুই তো এখন দেখছিস ! এ চলছে কাল রাত থেকে , সারারাত ঘরে আলো  জ্বালিয়ে রেখেছিল তোর বাবা ! দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি মোটে , তোমার না হয় অফিসে না গেলে  চলবে , আমার সংসারের কাজে তো আর ছুটি নেই বাপু !

বাবা:  আরে ! এই বইটার কি অদম্য আকর্ষণ তোমাদের কী বলব! শেষ না করে এটার থেকে চোখ সরানো  এখন অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে ।

গিনি: তাই ? কী বই এটা ?

বাবা : মনস্ত্ব ত্ব কেন্দ্রিক  এমন জটিল কিছু তথ্য লেখা যা আমার মত ঘুম কাতুরে লোকেরও ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ !

গিনি : মনস্ত্ব ত্ব ? কই দেখি ! উহু !  আমার বইয়ের তাকের সদস্য তো নয় এটি , তাহলে বই টা কে দিল তোমাকে ?

বাবা : নিহারী মাসিমার  বাড়িতে আসা নতুন ছেলেটি !

গিনির চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল  : আলুভাজা দিদার বাড়িতে কেউ এসেছে?

বাবা : ওহ ! তোকে তো বলতে ভুলেই গেছি ! কাল অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় ভাবলাম মাসিমার খবর টা নিয়ে আসি , বাড়ি যেতেই উনি এই নতুন ছেলেটির  সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন ,বললেন  পেয়িং গেস্ট । ছেলেটি ব্যবহার যেমন  চমৎকার তেমনি

প্রশংসনীয় ওর সংগ্রহের বইগুলো ! এত সুদর্শন যুবক আমি আগে  দেখেছি বলে মনে পড়ে না , কিন্তু নিষ্পাপ মুখের মধ্যে কোথাও যেন একটা জটিল রহস্যের ছায়া ! আমি নিহারী দেবীকে আড়ালে বলে এলাম , ছেলেটির ব্যাপারে ভালো করে খোঁজ নিয়ে নিতে ,এখন যা দিনকাল পড়েছে !

গিনিকে অন্যমনস্ক দেখে মা ধাক্কা দিয়ে বললেন , ” খাবার টা খেয়ে নিয়ে বিজ্ঞানে মনোনিবেশ করলে ভালো হয় !”

গিনি : এখন আর সময় নেই মা ! আমাকে এখনি বেরোতে হবে ।

গিনি রুদ্ধশ্বাসে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই , মা খাবার গুলো ঢাকা দিতে দিতে বললেন , ” যেমন বাপ্ তার তেমনি মেয়ে ! তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস গিনি ! তুই না এলে কিন্তু আমি খাব না !”

আলুভাজা দিদার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তেই অচেনা ছেলেটি দরজা খুলে দাড়ালো ।

গিনি : আপনি ?

ছেলেটি : আমি আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িং গেস্ট ।

গিনি বিস্ময় আড়াল করে বলল, ” আপনি আমাকে চিনলেন কী করে   ?”

ছেলেটি : আমি চিনিনি তো ! দরজায় লাগানো যন্ত্র টা  চিনেছে ।

গিনি: যন্ত্র ?

ছেলেটি : হুম ! দিদার কাছের মানুষদের নাম , ছবি , আর কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে আমি এতে ঢুকিয়ে রেখেছি , কালকেই আপনার বাবা দিদাকে বলছিলেন আজকাল দিনকাল বিশেষ ভালো নয় , সাবধানের মার নেই । তাই ভাবলাম দরজা খোলার আগেই যদি দিদাকে আগন্তুকের পরিচয় জানিয়ে দেওয়া যায় ।

গিনি নিজের থতমত ভাবটা কাটিয়ে যন্ত্রটি খুঁটিয়ে দেখে বুঝল এটি দোকান থেকে কেনা নয় , তাই রাখঢাক না করেই প্রশ্ন করল , :

যন্ত্রটি আপনি বানিয়েছেন ?

ছেলেটি : হুম ।

গিনি : আপনি তো ২ দিন হবে এসেছেন , এর মধ্যে প্রয়োজন বুঝে যন্ত্রটা বানিয়ে ফেললেন ? নাকি অন্য কোনো

প্রয়োজনে এটা আগেই বানিয়েছিলেন ?

ছেলেটি : সে হিসেব না হয় আপনি কষে দেখুন , আমার জন্যে অন্য অনেক জরুরি অঙ্ক অপেক্ষায় আছে ।

গিনির উত্তরের আগেই  নিহারী দেবী দরজায় এসে বললেন , ” আমি অনেক ক্ষণ থেকে তোর গলার আওয়াজ শুনছি , এখনও ভিতরে আসছিস না দেখে শেষমেষ বুড়িকে আসতেই হল , আলুভাজা ভাগ হওয়ার ভয়ে  আর কত ঝগড়া করবি ? ভিতরে আয় তাড়াতাড়ি ।”

গিনি : আহ দিদা ! তুমি বুঝতে পারছ না , এরকম অচেনা অজানা কাউকে হুট করে পেয়িং গেস্ট রাখা আজকাল একদম উচিত নয়,কাগজে তো প্রায়ই  দেখা যায় পুলিশের চোখ এড়াতে সন্ত্রাসবাদীরা ছদ্মবেশে নিরিবিলি জায়গায় গা ঢাকা দেয়।

নিহারী দেবী ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত ভাবে বললেন , “এই পাগলী মেয়েটার কথা শুনে তুমি কিছু মনে কোরো না বাবা !”

ছেলেটি কোনো জবাব না দিয়ে মৃদু  হাসল ।

নিহারী দেবী এবার গিনির দিকে তাকিয়ে রাগের ভান করে বললেন , ” এত লেখা পড়া করে একি ব্যবহার গিনি ! এমন বুঝি কাউকে বলতে আছে ? ও সন্ত্রাসবাদী হতে যাবে কেন ? ও তোর মতই ভীষণ মেধাবী ছাত্র, মনস্তত্ব ও আরো কিছু জটিল বিষয়ে রিসার্চ করছে,সেই কাজেই কিছুদিন এখানে এসেছে ।”

গিনি : তুমি কী ভাবছ সন্ত্রাস বাদীরা মেধাবী হয় না ? ওদের মত মেধা বড় বড় বৈজ্ঞানিকেরও নেই । তাছাড়া তুমি তো কোথাও বিজ্ঞাপন দাওনি , ও কোথা থেকে জানল যে তুমি পেয়িং গেস্ট রাখতে চাও ? সন্দেহের আরো কারণ আছে ,  দুদিনের মধ্যে দরজায় লাগানো যন্ত্রটা বানানো কিছুতেই সম্ভব নয় , তাছাড়া তোমার মত নির্ঝ ঞ্ঝাট  মানুষের বাড়ির দরজায় ক্যামেরা লাগানোর কী প্রয়োজন !

নিহারী দেবী : আহ গিনি ! বিজ্ঞাপন না দিলেও আমি পাড়ায় অনেক কে বলেছিলাম পেয়িং গেস্টের কথা , সুনীতার কাকুর সুত্রে ও আমার

বাড়ি এসেছে , এভাবে ভাবতে নেই মাগো ! যাই হোক ঝগড়ার বহর তো দেখলাম , ওর সাথে পরিচয় করেছিস কী ?

গিনি অস্তত্বি ভাবটা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে না পেরে অসম্মতি সূচক মাথা নাড়ল ।

নিহারী দেবী ভিতরে যাবার আগে অমায়িক হেসে দরজার পাশে চুপ করে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললেন , “এই পাগল মেয়ের সন্দেহ দূর করার দায়ভার তোমার উপরে রইল  সময় ।

গিনি : সময় ?

ছেলেটি এবার মৃদু হেসে গিনির দিকে রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল , “হুম ! আমার নাম ।”

উপরের ঘরে ছেলেটির বইয়ের সংগ্রহ থেকে গিনি মনে মনে প্রশংসা না করে পারল না , কিন্তু  দিদার এই নতুন অতিথির হঠাৎ আগমন যুগপৎ  র  ইচ্ছা বোতামের সাফল্য নাকি নিতান্তই কাকতালীয়  ঘটনা তা না জানা অব্দি সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না ।

সে হঠাৎ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো  : আপনি এখানে কেন এসেছেন ?

সময় : ওই যে তখন দিদা বলল , রিসার্চের প্রয়োজনে ।

গিনি  উদ্বেগ ভরা গলায়  আবার প্রশ্ন করল : শুধু কি তাই ?

ছেলেটির নিষ্পাপ মুখে আবার রহস্যময় হাসি ফুটল  : না ।

গিনির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো  : তাহলে ?

সময় : সময়ের উদ্দেশ্য জানতে হলে যে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয় গিনি !

গিনি ম্লান দৃষ্টি আড়াল করে পিছনে ঘুরে প্রশ্ন করল : তা কতদিন থাকবেন ?

সময় : অনন্ত কাল ..

গিনি চমকে তাকাতেই ছেলেটি হেসে বলল : অনন্ত কাল নয় ! সময় হলেই চলে যাব ।

গিনি : পরিচয়ের জন্য শুধু নাম যথেষ্ঠ নয় ,আপনি কোথা থেকে এসেছেন ? আপনার পদবী কী ?

সময় : আমার জন্ম পরিচয় নিজেরই অজানা , জটিল হিসেব মেলাতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরি ফিরি , এখানে আসার আগে নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা ছিল না । আপনার সন্দেহ স্বাভাবিক , সন্ত্রান্সবাদী যে নই তার প্রমাণও আপাতত নেই, কিন্তু বিশ্বাস করুন দিদার সাথে কাটানো এই অল্প মুহুর্তের মায়া কাল যুগের অতীত সমান ভারী মনে হচ্ছে , একা থাকার পুরনো অভ্যেস ফিরে পেতে আর কিছুতেই মন চাইছে না ।

গিনি : দিদা এরকমই । খুব অল্প সময়ে পর কে আপন করে নেয় , সে জন্যই তো ভয় ..

সময় : ভয় পাবেন না । আলুভাজা আমি খাই না ।

গিনি হাসলো না , চিন্তায় ডুবে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল ।

হঠাৎ টর্চের আলো চোখে পড়ায় চমকে তাকাতে ছেলেটি বলল : দেখুন দেওয়ালে আপনার ছায়া পড়েছে ।

গিনি : এ তে দেখবার কি আছে ? আলো জ্বললে ছায়া তো পড়বেই ।

সময় : হুম তা ঠিক , কিন্তু আমি আপনার নয় ,পাশে রাখা ফুলদানি টার ছায়া ফেলতে চেয়েছিলাম । তার মানে আলো যার যার গায়ে পড়বে ছায়াও তারই পড়বে , এখানে আলোর ইচ্ছা শুধু একটাই , অন্ধকার দূর করা ,কিন্তু সেটার পরিধি নির্দির্ষ্ট করার দায়িত্ব যে তার নয় । তবে দীর্ঘ অন্ধকারের একাকিত্ব দূরের জন্য আলোর প্রথম ঝলক অস্বস্তি র কারণ তো বটেই ।

গিনির মনে পড়ে গেল  যুগপৎ র আলোয়  তার চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার কথা , সে ভীষণ ভয় পেয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল ,”আপনি কী বলতে চাইছেন ?”

ছেলেটি আবার সেই রহস্যময় হাসি মেখে বলল ,”বলছিলাম দিদার মত মানুষের স্নেহের পরিধি মাপা অসম্ভব , আপনার পাশে রাখা ফুলদানি টার মত অল্প স্বাদ না হয় আমিও পেলাম , এতে আপনার ভাগ যে কম পড়বে না সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন ।

বাড়ি ফিরে চিন্তার মধ্যেও এক অদ্ভূত স্বস্তিতে গিনির মন ভরে গেল , যুগপৎ র ফর্মুলা তাহলে সফল , দিদা আর একা নেই , নতুন ছেলেটি যতই অদ্ভূত হোক এই অল্প সময়েই দিদাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছে । হঠাৎ  মায়ের ডাকে চমক ভেঙ্গে পাশের ঘরে যেতেই যে অপ্রত্যাশিত খুশিতে সে লাফিয়ে উঠল , “জ্যাঠামনি তুমি!”  অমায়িক ভদ্রলোক দুহাতে গিনিকে জড়িয়ে বললেন , “হুম রে  ! আমিই তো ! তোদের জন্য মন কেমন করছিল ,তাই চলে এলাম !”

গিনি : এবার কিন্তু না বলে চলে গেলে আর কোনোদিনও কথা বলবো না ।

জ্যাঠামনি : বললে যে তুই যেতে দিস না মাগো ।

গিনি : “দেবই না তো । জেম্মা থাকতে তুমি তো এমন ….”

গিনির অসম্পূর্ন কথার উত্তরে জ্যাঠামনি মৃদু হেসে বলল , “ধ্যুর পাগল মেয়ে ! তোর জেম্মা থাকবে না কেন? সে না থাকলে তোর জ্যাঠামনি থাকতো বুঝি ? চোখের দেখা একরকম বিলাসিতা বলতে পারিস , সময়ের সাথে সে বদভ্যাস কেটে গেলেই আর কোনো অসুবিধা হয় না । ”

নিরুত্তর গিনি চিন্তার গভীরে আরো একবার হারিয়ে গেল । কয়েক বছর আগে জেম্মার হঠাৎ মৃত্যুতে জ্যাঠামনিকেও কখন যেন হারিয়ে ফেলেছে সে  । চাকরীতে সময়ের আগে অবসর নিয়ে বছরের বেশীর ভাগ সময় টাই জানা অজানা জায়গায় ঘুরে কাটায় জ্যাঠামনি , জরুরি দরকারেও যোগাযোগের কোনো মাধ্যম বা উপায় কোনোটাই নেই , অগত্যা এভাবে জ্যাঠামনির হঠাৎ ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গোনাই তাদের শেষ কবছরের অভ্যাস। গিনির মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল, একাকিত্বের এই ভীষণ দমবন্ধ মায়াজাল থেকে বার করে যুগপৎ নিশ্চই পারবে ফিরিয়ে দিতে তার জ্যাঠামনিকে পুরোনো জীবন , পালিয়ে বেড়ানোর প্রয়োজন ফুরালেই জ্যাঠামনির ভিতরের প্রাণখোলা আত্মভোলা মানুষটার হাসির আওয়াজে এ বাড়ির দেওয়াল গুলো আরো একবার ঝনঝন করে উঠবে ।

সারাদিন জ্যাঠামনির সাথে অনেক গল্প করেও প্রতিবারের মতো এবারেও গিনির স্বাদ মেটেনি , তবুও আজ তার কোনো তাড়া নেই ,মনে ভয় নেই , জ্যাঠামনি তো এখানেই থাকবে, সবসময় । আর কখনো গিনিকে জ্যাঠামনির ফিরে আসার অপেক্ষা করতে হবে না । জ্যাঠামনির ভিতরে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো মানুষটার সাথে  ফিরে আসবে গিনির ছোটবেলা । প্রহর শেষের আগেই  তা নিশ্চিত করবে গিনি , সব কিছু ঠিক আগের মতো করে দেবে ফর্মুলার জাদু কাঠিতে । ভাবনা মতই সকলে ঘুমিয়ে পড়লে গিনি জ্যাঠামনির ঘরে  যন্ত্রটা নিয়ে এসে তার ইচ্ছা বোতাম টা টিপতেই জ্যাঠামনির সারা শরীর যন্ত্রের  বিচ্ছুরিত আলোতে ভরে গেল, তার সাথে  অসীম পূর্ণতার আনন্দে আলোড়িত হল গিনির মন ।লজেন্স কে জড়িয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে ভিতরের ভীষণ আনন্দে তার চোখ জলে ভরে উঠলো  ,আরো একবার তার  আবিষ্কার  তাকে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক   নতুন করে ফিরিয়ে দেবে।

সকালে মায়ের  ডাকে  ঘুম  ভাঙলো গিনির । গিনি হাসিমুখে মা কে জড়িয়ে ধরে বললো , “আমি আজ খুব খুশী মা । জ্যাঠামনি আর কখনো আমাদের ছেড়ে যাবে না দেখো । জ্যাঠামনি কে আর কখনো একা থাকতে হবে না ।”

নিরুত্তর মায়ের চোখের দিকে তাকাতেই গিনি চমকে উঠলো , “মা ! তুমি কাঁদছো ? তবে কী !” গিনি দৌড়ে জ্যাঠামনির ঘরে যেতেই  তার মনে হল খালি ঘরটার  দেওয়াল গুলো থেকে যেন তার বিশ্রী ভাবে হেরে যাওয়ার ছবি প্রতিফলিত হচ্ছে । অসম্ভব কে সম্ভব করার স্বপ্ন তাকে এতটাই বিভোর করে দিয়েছিল ব্যর্থতার বিদ্রুপ চাহনী আজ তার অসহ্য মনে হচ্ছে । মুহূর্তে তার সমস্ত চিন্তাশক্তিকে ভর্ৎসনা করে নিজের ওপর প্রচন্ড রাগে গিনি যন্ত্র টা ব্যাগে নিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল । বাড়ির সামনের লেকের ধারে পৌঁছে যন্ত্রটা জলে ফেলতে যেতেই একটি অচেনা হাত তার থেকে যন্ত্র টা কেড়ে নিয়ে নিল , বিস্ময়ে তাকাতেই আগন্তুক টিকে চিনতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হল না ।

গিনি :  আপনি ?

ছেলেটি : কিছু  অঙ্ক মিলছিল না , ভাবলাম লেকের ধারের  স্নিগ্ধ হাওয়ায় মাথাটা খুলে যেতে পারে  ,তাই এদিকে এসেছিলাম , হঠাৎ আপনাকে দেখে..

গিনি : বুঝলাম ! কিন্তু আমি এখন একটু একা থাকতে চাই ।

ছেলেটি : তা তো আর হয় না ।

গিনি: মানে ?

ছেলেটি : বলছিলাম যন্ত্রটা ফেলে দিচ্ছেন  যখন এটা নিশ্চই আর আপনার দরকার নেই , তাই এটা আমার কাছে থাকলে  আপনার কোনো আপত্তি থাকার কথা নয় ।

গিনি : ও যন্ত্র কোনো কাজের নয় ।

ছেলেটি :আপনার না হতে পারে , আমার  কাজের।

গিনি : আহ ! বললাম তো আমার নয় , আপনার নয় ,কারোর কাজের নয়  ওটা ।

ছেলেটি : তাহলে সবটাই কাকতালীয় বলছেন ?

গিনি রাগে অস্থির হয়ে বললো : তাছাড়া আবার কী ? যদি সত্যি ই  এতে একাকিত্ব দূরের ক্ষমতা থাকতো তাহলে কি আমার জ্যাঠামনিকে মুক্তি দিতে পারতো না  ? ভিতরের যন্ত্রনা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে যে মানুষটা পালিয়ে বেড়াচ্ছে , ফর্মুলার জাদুকাঠিতে পারতো না তাকে কাছের মানুষগুলোর কাছে ফিরিয়ে দিতে ?

ছেলেটি : যুগপৎ শক্তির অধিকারী ঠিকই কিন্তু তার শক্তি একাকিত্ব দূর করাতেই সীমিত ,মৃত ব্যক্তিকে জীবন দান তার ক্ষমতার  উর্ধ্বে । একাকিত্ব দূরের চেষ্টায় যুগপৎ সফল হয়নি কারণ আপনার জ্যাঠামনি একা নন , উনি আজও নিজেকে ওনার স্ত্রীর থেকে আলাদা মনে করেন না । স্ত্রীর মৃত্যু শুধু ওনার  বেঁচে থাকার গণ্ডি ভাঙতে পেরেছে , একা করতে পারেনি । দেহের মৃত্যু মেনে নিলেও ভালোবাসার মৃত্যু উনি এক মুহূর্তের জন্যেও মানেন নি গিনি ! সেই ভালোবাসার মোড়কে তার যাযাবর জীবন সমাজের অযাচিত হস্তক্ষেপে পাচ্ছে অস্বস্তি বোধ করে , তাই তার এই পালিয়ে বেড়ানো ।

গিনি দুচোখ ঢেকে অসহায় কান্নায় গুমড়ে উঠলো ।

ছেলেটি তার কাছে এসে বলল , “বৈজ্ঞানিকের চোখের জলে ফর্মুলা ধুয়ে গেলে আমাকেও যে ফিরে যেতে হবে গিনি !”

দুর্বলতা কাটিয়ে  চিন্তাশক্তি ফিরে আসতেই গিনি চমকে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অস্থির ভাবে প্রশ্ন করলো , “আপনি আমার ব্যাপারে এতো কিছু জানলেন কী করে ?  আপনি ..আপনি  কে ?

ছেলেটি  চেনা রহস্যময় হাসি হেসে বলল : আমি ? আমি সময় । আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িং গেস্ট । দিদার থেকেই শুনেছি হবে, নাহলে আর কী করে জানবো বলুন !

গিনি : কিন্তু আলুভাজা দিদা তো এতকিছু …

গিনিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ছেলেটি কানের কাছে এসে বললো , ” করুন না , যা আপনি সবসময় করেন , অপেক্ষা ! সময়ের অপেক্ষা !”

বিস্মিত গিনি নিজের সবটুকু  দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত প্রশ্ন করলো , ” সময় ? মানে আপনার  অপেক্ষা ?”

চলে যাওয়ার আগে ছেলেটি পিছন ঘুরে আরো একবার রহস্যময় হাসি হেসে বললো , “করবেন না  ? তাহলে না হয়  যুগপৎ র  ফর্মুলার কার্যকারিতা  প্রমাণের অপেক্ষা করুন , লেকের জলে পড়া থেকে বাঁচানোর পর এটুকু দায়িত্ব তো তার উপর আমার থেকেই যায় । ”

 

নিন্দুক

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

কাঠগড়া তে মুখের বদল , অপরাধের নতুন নালিশ ,
বিচারকের আসনে তুই ,তেমনি যেমন আগেও  ছিলিস,
পরের দোষে ভাঙিস  কলম, কালির দাগে  ঢাকিস রক্ত,
জীবন বইয়ের শেষের পাতায় অপেক্ষাতে প্রায়শ্চিত্ত!

 

ভরা সভায় নাম কুড়াতে , দিলি  যাকে “বেশ্যা ” আখ্যা ,
পরিস্থিতির স্বীকার নারী , চেয়েছিল তোর বিচার ভিক্ষা !
কর্তব্যের পুতুল সেজে , অপমানে মিশিয়ে  ঘৃনা ,
জুয়ার দানে বিকিয়ে দিতে বেশ্যা বলেই পারলি কিনা !

 

তোর  হিসেবে  আগুন নাকি করবে  দেহের শুদ্ধি বিচার ,
নিবার্সনই  ভাগ্যে যখন  , শুদ্ধিতে কি  লাভ হবে তার ?
আগুন যদি সত্যি পারে , পবিত্রতা ফিরিয়ে দিতে,
তোর কদাকার মনটাকে তো পারিস খানিক ঝলসে নিতে!

 

স্ময়ং ভুলে ভালোবেসে মেয়েটি হল   কলঙ্কিনী ,
হারিয়েছে সব কিন্তু তবু তোর কাছে সে  হাত পাতেনি,
চরিত্রে তার ঢালিস কালি  ,উপাখ্যানের  মন্দ ভালো ,
ঠিক বেঠিকের হিসাব খানি তোকেই বা কে কষতে দিল ?

 

যার তীক্ষ্ণ কলম করে  দিকভ্রান্ত ধর্মে আঘাত ,
তোর বানানো শহরে সে ,লুকিয়ে কাটায় সারাটা  রাত ,
অধিকারের কোন হিসেবে,  পেয়েছিলি বর স্পর্ধা মাপার ?
দোষ যদি সে করেও থাকে ,তুই কে তাকে শাস্তি দেবার !

 

হলই  বা সে অহংকারী , উদ্ধত মন ছন্নছাড়া ,
নিজের শাসন নিজেই করে  , নিয়ম মানে নিজের গড়া ,
তোর কী তাতে ঘটল ব্যাঘাত ? নিন্দা ভরা আঙ্গুল তুলিস ,
গন্ডি যদি এতই প্রিয় , নিজেও সেটার মধ্যে থাকিস    !

 

সত্যি বোঝা শক্ত অনেক , বৃথাই শুধু চেষ্টা করিস ,
সহজ হবে হিসেব যদি  মিথ্যাটাকে বুঝতে পারিস ,
মনের ভিতর শিকড় গেড়ে  করছে যা তোর দৃষ্টি  কালো ,
উপড়ে সেটা দ্যাখ না যদি পাস খুঁজে তুই একটু  আলো !

বহুরুপী মনখারাপ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

মন খারাপের  গন্ধ কেমন অজানা এক আবেশ আনে ,
বারণ ভুলে মন ভেসে যায়  ভীষণ চেনা স্মৃতির টানে ।
বাজের আওয়াজ চমক ভাঙ্গায় , আকাশ জুড়ে মেঘের কালো ,
মরচে ধরা প্রশ্ন মনে , “সব টা  তবে মিথ্যে ছিল  ?”
চোখের জলে বৃষ্টি মিশে , ঠোটের কোণে  ফোটায় হাসি ,
খাতার পাতায় লুকিয়ে লেখা নামের পাশে “ভালোবাসি।

 

মন খারাপের নাম বুঝি হয় ? জানিস কি তুই তার ঠিকানা ?
অনুরোধে র  আর্জি যাবে ,করতে  তাকে আসতে মানা ।
চালের ঘটি উল্টে দিয়ে ,ঢুকলো মেয়ে নতুন ঘরে ,
পুরনো সেই ঘরের মায়া মনখারাপের আঁচল ধরে ,
ঘুমিয়ে থাকা স্বামীর পাশে ,স্মৃতির ভিড়ে রাত্রি যাপন ,
মনখারাপের চাদর নিয়ে ,পাশ ফিরে শোয় নতুন জীবন ।

 

নতুন শহর  ,অচেনা মুখ ,ছড়িয়ে থাকা বইয়ের সারি ,
যখন তখন মারছে  উঁকি ,মনখারাপের বলিহারি ,
তেল মাখানো খাবার যখন, হচ্ছে হজম নির্বিবাদে ,
মায়ের রাঁধা রান্না জাগায়  স্মৃতির আবেশ মুখের স্বাদে ।
হাতের কড়ে গুনতি দিনের , আগাম কবে আসবে ছুটি ,
মনখারাপের রাস্তা ভুলে , মায়ের কোলে লুটোপুটি ।

 

দিন টা তবু যেমন তেমন , রাত্রে ঘড়ির নেইকো তাড়া,
নিস্পলকে  কাটাই প্রহর , শ্বাসের মেয়াদ  তোমায় ছাড়া,
ছাই করলো যেদিন আগুন  , চিতায় শোয়া ভালবাসা ,
মনখারাপে বন্দি আমি , ফুরিয়ে গ্যাছে বাঁচার আশা,
আর কটা দিন ! কটাই বা রাত ! তুমিও আছো অপেক্ষাতে,
শুধুই এখন মৃত্যু পারে,জীবন আমার ফিরিয়ে দিতে !

 

মনখারাপের রঙ হয় কি ? লাল বা সবুজ চিহ্ন কোনো ?
রঙীন হতে চাইনা আমি , সাদাই প্রিয় আমার জেনো ,
জানলা খোলা ,নজর কাড়ে , পথের ধারের ক্ষুধার্ত মুখ ,
অসহায়ের হাতছানিতে বাড়তে থাকে মনের অসুখ ,
গুলির আওয়াজ,জটিল হিসেব,কাঙ্খিত জিত,অপ্রিয় হার ,
আমার  কিছুই হয়না বদল ,মনখারাপ ই ভরসা আমার !

 

অলস মনের বিলাসিতা  , খাঁচা ভাঙার ব্যর্থ উপায় ,
মনই তখন মনখারাপের কারণ খানি আমায় শুধায় ,
স্মৃতির মোড়ক ফেলে আসা , চেনা পথে ফিরতে চাওয়া ,
সম্ভব আর অসম্ভবের মধ্যেখানে হারিয়ে যাওয়া ,
“কী হয়েছে ? কী চাই তোর ? সন্ধান দে খুশির চাবির ”
বালিশ খানি জাপটে ধরে , মৌন থাকে ক্লান্ত শরীর !

সারথী

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

অমলেন্দুবাবু  চোখ খুলতেই তার একমাত্র নাতি সৈকত কে পায়ের কাছে বসে থাকতে দেখে বিস্ময়ে বললেন : একি দাদুভাই ! তুমি কখন এলে ?

সৈকত মৃদু হেসে বলল : তোমার এই ঘরের  প্রতিটা কোণায় জমে থাকা ছোট বেলার স্মৃতি গুলো এমন ভাবে জাপটে ধরেছিল যে ঘড়ির দিকে তাকাবার অবসর হয়নি |

>আহা ! কিন্তু আমাকে কেউ ডাকেনি  তো ! দুপুরে ঘুমের অভ্যেস টা দাদু নাতির কতটা সময় মিছিমিছি নষ্ট করে দিল !

>তুমি যে বলেছিলে মহাভারতের গল্পে অর্জুন শ্রী কৃষ্ণের পায়ের কাছে বসে তার ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষা করেছিল কারণ সে জানতো  ধৈর্য্যের পরীক্ষায় পাশ করলে নষ্ট সময়ও জীবনের হিসেব বদলে দিতে পারে।

>হ্যাঁ সে না হয় বলেছিলাম ! কিন্তু এই বুড়োকে সারথি করে কোন যুদ্ধ জয় করতে চাও তুমি দাদুভাই !

>তুমি তো জানো ,আমি যুদ্ধ থেকে বরাবর পালিয়ে এসেছি , আমার যে হারতে ভয় করে !

>হারা কি ওত সহজ দাদুভাই ? কত মানুষ  যে চেষ্টা করেও হারতে পারে না ।

>কি যে বল তুমি দাদান ! কেউ বুঝি সেচ্ছায় হারতে চায় ?

> চায় বৈকি ! নিঃসঙ্গতার চোখের জলে রাতের বালিশ যখন ভিজে যায় , অতি বড় জয়ীর কানে মহাকাল তখন ফিস ফিস করে বলেন , “এর থেকে তো হেরে যাওয়াই ভালো ছিল , অন্তত দুদন্ড শান্তির ঘুম তো জুটত ভালবাসার মানুষ গুলোর পাশে ” , সেই মুহুর্তের দুর্বলতায় জয়ের মেডেল গুলো ছুঁড়ে ফেলে হারের খোঁজে পা বাড়াতেই  , আরো একবার জেতার ইচ্ছাটা নাগপাশের মত মন কে বেঁধে ফেলে ! সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে  যত শক্ত হয় সে  বাঁধন  , একের পর এক পাশার দানে বিকোতে থাকে সম্পত্তি ও সম্পর্ক !

> তুমি বুঝি হারতে ভয় পাও না ?

> না দাদুভাই ! এখন আর পাই না ,তবে তোমার বয়সে পেতাম বৈকি , আর সেই ভয় থেকে বাঁচতেই  বার বার জেতার লড়াইয়ে সামিল হতাম , আশ্চর্যের বিষয় হল ছোট বড় কোনো জয়ই  আমার সে ভয়কে কখনো দূর করতে পারেনি উপরন্তু শত গুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল।হঠাৎই  একদিন আমার মায়া ত্যাগ করে  বিনা বাক্যব্যয়ে সে চিরতরে নিখোঁজ হল ।

> এতদিনের জাঁকিয়ে ধরা ভয় হঠাৎ একদিন দূর হয়ে গেল ! কবে ? ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন ? তোমার কি মনে আছে দাদান ?

> বাহ্ ! মনে থাকবে না ? সেদিনই তো আমি প্রথমবার বিশ্রী ভাবে হেরে গিয়েছিলাম । ফকিরের মনে সুখের পরিমাপের আন্দাজ পেয়ে সেদিন চমকে উঠেছিলাম আমি ।

>তোমার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে  হারা  ঠিক জেতার মতই কঠিন ?

>মোটেই  না , আরো বেশী ! সর্বকালের জয়ীও অভ্যাসের ব্যতিক্রমে হেরে গেলে , প্রত্যাশা অপূর্ন  রাখার অভিযোগে কৈফিয়তের কাঠগড়া তার আত্মসম্মান কে  বিদ্রুপ মাখা বিশেষণে বার বার আঘাত করে! কজনই বা সে আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা রাখে ! আপাতদৃষ্টিতে দুর্বল মনের আত্ম হত্যার কারণ ক্ষনিকের হার মনে হলেও আসলে তারপরের পাওয়া চিরস্থায়ী অপমান !

>আমি তো ভেবেছিলাম চাইলেই জেতা যায় না কিন্তু হার অন্তত  সহজলভ্য !

>তোমার ভাবনা সত্যি হলে আমার মত কিছু মানুষের আনন্দের পরিসীমা আকাশের প্রস্থ দিয়েও মাপা যেত না ! এই যে  পঙ্গু শরীরটা  রোজ মৃত্যুর কাছে হারতে চায় কিন্তু সেই হার লাভে তপস্যার হিসেবের খাতা সময় বোধহয় হারিয়েই ফেলেছে !

>উফ ! তুমি কি আমাদের একটুও ভালোবাসো না দাদান ?

>বোকা ছেলের কথা শোনো দেখি ! ভালো না বাসলে  , ওই অখাদ্য ওষুধ গুলো আমাকে গেলানোর সাধ্যি বুঝি ওই সুরেন ডাক্তারের ছিল ?

>এরকম আর বোলো না দাদান ! তুমি ছাড়া এই অচেনা ভিড়ে আমি যে হারিয়ে যাবো ! আমি এখনো ঠিক বেঠিকের গোলক ধাঁধায় আটকে পড়ি ,বুঝতে পারিনা কতকিছু ,  নিরন্তর চেষ্টা করেও ভুলতে পারি না কিছু স্মৃতি , অসহায় মন নিদ্রাহীন রাতে ছটফট করে!

>আহা ! ছোটবেলায় কুমীর ডাঙা খেলায় ,গুনতির হারে কুমীর হওয়ার দুর্ভাগ্য , সেই বিকেলে কষ্ট দিলেও আজ  আর দেয় কি !

> কিন্তু দাদান সে  বিকেল ছিল নিষ্পাপ , জীবনের জটিল হিসেব তখনও শুরু হয়নি ! রাত ভোর হতেই যে হারের দুঃখ মন থেকে মুছে যায় ,  তার সাথে আজকের জটিলতার কি তুলনা চলে !

> দূরত্ব বাড়লে দৃষ্টির গণ্ডিতে সর্বোচ্চ পাহাড়ও  ক্রমশ ক্ষুদ্র  হতে থাকে । কি জানতো দাদুভাই! সময়ের  ডাস্টার নিয়ম মত ব্ল্যাকবোর্ডের সকল হিসেবই  মুছে দেয় , তার কাছে জটিল সরলের কোনো ভেদাভেদ নেই !

> সবকিছু মুছে দেয় ? কিছুই থাকে না?

> থাকে নাই তো ! একমুঠো  ছাই  ছাড়া কিচ্ছু থাকে  না , সেটুকুও মা গঙ্গা এক ঢোকে গিলে ফেলে  !

> তাহলে চারিদিকে যে এত লড়াই , উদ্বেগ ,টান টান উত্তেজনা !

> ঘড়ির কাঁটা ঘোরার অপেক্ষা লড়াই করেও করা চলে অথবা আপোষে , তাতে অন্যায় তো কিছু নেই দাদুভাই ! কিন্তু সেই ক্ষনিক  জিত হারের হিসেব কে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা দেখে যদি মহাকাল হাসেন , তাকেও কি  খুব বেশী দোষ দেওয়া চলে ?

>জীবন মানে কি তবে শুধুই মৃত্যুর অপেক্ষা দাদান ?

> তা কেন হবে দাদুভাই !  জীবন মানে শুধুই  জীবন ! সেখানে জেতার লড়াই করাই যেতে পারে কিন্তু হারলেও বিশেষ ক্ষতি নেই , শুধু এই উপলব্ধি টুকুই যথেষ্ঠ যে  এতখানি পথ যদি বিনা জয়লাভে কেটে যেতে পারে বাকিটা আটকানো কোন হারের সাধ্যি!

>সেই হারের ফাঁকে লুকিয়ে ফেলা চোখের জলের মূল্য কেউ চুকিয়ে দিলে হিসেব টা অনেক সহজ হয়ে যেত, তাই না দাদান ?

> নিজের চোখের জলের মূল্য অতি বড় বিধাতার কাছেও আদায় করতে চেও না দাদুভাই ! এর চেয়ে বড় মূর্খামি যে আর হয় না ।সব হিসেবও সহজ করতে নেই নইলে গণিতের আনন্দে ঘাটতি হয় যে ! ডাক্তারের নির্দেশে চিনি ছাড়া কালো চা খাওয়ার বেস্বাদ বিকেল গুলোয় , মাটির ভাড়ে চা খাওয়ার আনন্দের স্মৃতিই শুধু মুখে হাসি আনতে পারে । ফুটো ভাড়ের চা তে হাত পুড়ে যাওয়ার কষ্ট নিদারুণ ছিল বটে কিন্তু তৃপ্তির চুমুকের কাছে সে জ্বালা সেচ্ছায় হার মেনেছে বারবার ! তাই বলি আর দেরী না করে উঠে পড় রথে ,সময় ফুরোনোর আগে জীবনটাকে একটু চেখে দ্যাখো দেখি দাদুভাই ! যুদ্ধে জিত হারের মাশুল না হয় দিলেই কিছু , শেষমেষ আক্ষেপের মাশুল গুণতে না হলেই জীবনের সাথে মৃত্যুও স্বার্থক ।

Act of God’

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

> ‘Act of God’ ! তার মানে কাজটা আপনি করেছেন ?

> না !

>মানে ? তাহলে কে করেছে ?

>আহা ! তারই তো চুল চেরা বিশ্লেষণ চলছে । দেখছো না ,দফায় দফায় বিচার সভা বসছে ! ইতিহাসের পাতা উল্টে প্রমাণ খোঁজা চলছে! টান টান উত্তেজনার মুহূর্ত  ! জটিলতার ঘোরপ্যাচে সৃষ্টিকর্তার চোখ পর্যন্ত ধাঁধিয়ে যাচ্ছে । ‘নিরীহ’ প্রমাণের দৌড়ে সামিল হওয়ার আগে পাপের ঘড়া  লোকানোর বৃথা চেষ্টা ! ওত বড় জিনিস টা ওই টুকু পৃথিবীতে বুঝি লোকানো যায় ? তাছাড়া কাদের থেকেই বা লুকোতে চায় ? অন্ধের কি বা দিন কি বা রাত !

>আপনি এখন এইসব নোংরা রাজনীতির কলাকৌশলে মশগুল ? আর ওদিকে তো ওরা এখনো ধ্বংস স্তূপের নীচে !

>ওরা কারা ?

>যারা প্রকৃত অর্থে  ‘নিরীহ’  ! ‘পাঁচ লাখ’ অনেক বড় মূল্য হলেও যারা  সে দামে নিজেদের অতি সাধারণ জীবন টাকে বেঁচে দিতে চায় না তাই এত কিছুর পরও নিজের সবটুকু  দিয়ে চেষ্টা করছে মৃত্যুর কবল থেকে বেরিয়ে আসতে ।

>হুম ! সবাইকে সম্ভব না হলেও কিছু মানুষকে আমি বাঁচিয়েছি বৈকি ।

>এভাবে মিথ্যে বলা আপনাকে মানায় কি ! অক্লান্ত পরিশ্রমে মানুষই মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে,আপনি শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ দর্শী ছিলেন !

>’প্রাণ ‘ তো বলিনি ,তবে দলাদলি  -মারামারি থেকে বাঁচিয়েছি , বিকৃত রাজনীতি থেকে বাঁচিয়েছি , অতিসাধারণ হয়ে থাকার অভিশাপ থেকে বাঁচিয়েছি , অহর্নিশ ভাগ্যের হাতে গিনিপিগ হওয়া থেকে বাঁচিয়েছি , রোজের  মৃত্যু ভয় থেকে বাঁচিয়েছি ! ক্ষনিকের দুর্বলতায় নরক থেকে মুক্তি দানের দায়, আমি এবারও চেষ্টা করে এড়াতে পারিনি , স্বজন হারা হৃদয়ের অভিশাপে না হয় আরো একবার জলের গভীরে তলিয়ে যাবে আমার অস্তিত্ব !

দেবনারী

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

>আপনি আমাকে নিশ্চই চিনতে পারছেন ! সেই ছোট্ট বেলা থেকে , শিবরাত্রির দিন গঙ্গায় স্নান করে আপনার মাথায় জল ঢেলে  সারাদিনের উপোষ ভেঙ্গে এসেছি আমি ।

>হ্যাঁ চিনি বৈকি ! তুমি তো সেই মেয়ে যে প্রথমে আমাকে স্বামী রূপে চাইলে ,তারপর সমগ্র ব্রম্ভান্ডের সৃষ্টিকর্তাকে অবাক করে দিয়ে নিজের ছেলে রূপেও আমাকেই চেয়ে বসলে।

>যখন বুঝতে পারলাম , কোনো ইচ্ছাই আপনি আমার পূর্ণ করেন নি ,আমিও অবাক হয়েছি বৈকি !

>শোন মেয়ে !পূরণ করার যোগ্য ইচ্ছা না হলে এমন অভিযোগ অর্থহীন !

>অভিযোগ অর্থহীন ? আচার অনুষ্ঠানে কমতি থাকতে পারে,ওদিকে ওতটা নজর দিইনি কারণ ঠাকুমা বলেছিল আপনার ভোলা মন , নিয়ম নিষ্ঠা  ব্রতপালনের জটিল হিসেব আপনি মেলাতে পারেন  না , আপনাকে পাওয়ার ওই একটাই পথ , ‘ভালবাসা’! আরো শুনেছিলাম যদি শেষ ভক্তি বিন্দুউজার করে দিতে পারি , আপনি নাকি আমার জন্য অসাধ্য সাধন করতেও পিছপা হবেন না ! আমার মত সাধারণ মেয়ে আপনার সাধ্যের সীমানা মাপার ধৃষ্টতা কখনই করেনি , বরাবর  আপনার কাছে শুধু তাই  চেয়ে এসেছি  যা দেওয়া সবচেয়ে সহজ , যা দিতে গেলে অধিকার বিচারের প্রয়োজন নেই , যার জন্য কোনো সাধ্য অসাধ্যের জটিল হিসেব কষতে হত  না আপনাকে ।

> তাই তো সবচেয়ে বেশী অবাক করে আমাকে ! আমার মত চালচুলো হীন সন্ন্যাসী কোন উপকারে লাগতো তোমার ! তুমি তো জানতে সংসারের চাওয়া পাওয়া আমার নেশার ঘোর কাটাতে পারে না , আমি সব হারানোয় বিশ্বাসী ,অমোঘ মায়ায় আমায় বাঁধা যায় না ! এমন  ইচ্ছা কী করতে আছে  যা পূরণে সুখের দ্বার তো খোলেই না ,উপরন্তু দুঃখের আয়ু  শত গুণে  বেড়ে যায় !

>গঙ্গার উচ্ছসিত জলরাশি যার ধ্যান ভাঙ্গাতে অক্ষম , আমার কয়েক ফোঁটা চোখের জলের মূল্য সে  কেমন  করে দেবে বলুন ! তাই সুখের আশায় আপনাকে পাশে চাইনি আমি !

>তাহলে ! কী পাওয়ার আশায় , ভিজে কাপড়ে অনন্ত প্রহর অপেক্ষার পর হাত পাততে  বার বার ?

> হাত পেতেছি বৈকি ! তবে পাওয়ার আশায় নয় ,দেবার আশায়!

>দেবার আশায় ? আমাকে ! সমগ্র  বিশ্ব ব্রম্ভান্ডের অধিপতিকে কী  এমন দিতে চাও তুমি !

>বিষ ! বন্য জগতের লোভাতুর দৃষ্টির বিষ , বন্ধ দরজার পিছনে হওয়া নিরন্তর পাপের বিষ , ভালো থাকার অভিনয় করে জমতে থাকা অজস্র মিথ্যের বিষ , পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর লড়াই তে বিশ্রী ভাবে হেরে যাওয়ার বিষ , অহর্নিশ অন্যায়ের সাথে অপোষ করা অভ্যাসের বিষ , গোটা মেয়েজন্মে সহ্য করা  অপমানের বিষ ! আপনি তো নীলকন্ঠ ! শুনেছি বিষের প্রভাব আপনার দেহের রং বদলেই সীমিত,  নারী হৃদয়ের বিষের  স্তূপ গ্রহনের ক্ষমতা একমাত্র আপনারই  আছে । বিবস্ত্র হওয়ার ভয় দ্রৌপদীকে রাতে ঘুমোতে দেয় না , রান্নাঘরে আগুনের সামনে দাড়িয়ে যা কাঁপে তা সীতার হাত মনে হলেও , আসলে তার অস্তিত্ব !আমরা অশুচি ,মোক্ষ লাভের স্বপ্ন দেখি না , কিন্তু মুক্তি ! তাও কি নেই ভাগ্যে !

ভালবাসার দিন

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

পথের ধারে  লাল বেলুনের মেলা

প্রেমের গন্ধে মনগুলো রঙীন ,

গোলাপের দাম মানুষের চেয়ে বেশী ,

পালন হচ্ছে ভালবাসার দিন !

>”আমিও তোকে দিতে চাই উপহার ,

বল না আমায় ,চাইছে কী তোর মন ,

কথা দিলাম সকল উজাড় করে ,

ভালবাসায় করব সমর্পণ !”

>”মন তো আমার কত কিছুই চায় ,

ইচ্ছাপূরণ মোটেই সহজ নয় ,

তবুও যখন জানতে চাইলি তুই,

লোক খাওয়ালে আজকে কেমন হয় ?”

>”হৃৎপিন্ড তোর ই কথায় চলে ,

করব আমি সকল আয়োজন ,

যাকে যাকে ডাকতে ইচ্ছা করে ,

বিনা দ্বিধায় করিস নিমন্ত্রণ !”

>”যে ছেলেটি ল্যাম্প পোস্টের নীচে ,

জুতো ই পালিশ করে নিয়মিত ,

কিন্তু আজ বেলুন নিয়ে বসে ,

ওই আমার প্রথম নিমন্ত্রিত ।

স্টেশনের যে কচি কাঁচার দল ,

হাতের বাটি ,মোহর রাশি ভরা ,

সব কটাকে আসবি নিয়ে ধরে ,

আমার জন্যে হ না ছেলে ধরা !

মন্দিরের ওই চাতাল জুড়ে শুয়ে,

মানুষ টি যার বাঁশির সুরে যাদু ,

আজকে আমি তাকে বোঝাবই ,

মদের  চেয়েও পায়েস সুস্বাদু ।

ওই মেয়েকে ডাকতে ভুলিস না ,

যে প্রতি রাতে ভেবেছে  বারবার ,

প্রাণের চেয়ে দেহের দাম বেশী ,

ভুল টা  তার ভাঙানো দরকার ।”

> “নিজের উপর গর্ব হত খুব ,

ভালবাসায়  স্বার্থ   আমার কই ,

আজকে প্রথম সত্যি টা বুঝলাম ,

ভালবাসার যোগ্য আমি নই !

যেমনটি চাস তেমনি হবে  আজ  ,

স্বার্থ নয় , একটি মাত্র আশা ,

কখনো ভুলের বিয়োগ মেলাতে,

ক্ষমা করবে আমায় ‘ভালবাসা’ !”

হাসির পাহারা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট
  • আপনার কাছে গণতন্ত্র মানে কী  ?

     সহজ ভাবে হাসতে পারি , বলতে পারি মনের কথা ,

      রাজনীতি বা ধর্ম ভয়েও অটুট যখন  নিজস্বতা ।

  • আপনি কী সহজ ভাবে হাসতে পারেন ?

ধর্ম গুরুর ভীষণ শাষণ , হাসির উপর খবরদারি ,

 কারাগারের পদধ্বনি , পালাও ‘হাসি’ তাড়াতাড়ি !

  • মানে আপনার দেশে ধর্ম গুরু ঠিক করেন যে আপনি কখন হাসবেন , অন্যথা কারাবাসও হতে পারে ! তা ধর্ম গুরু টা কে?

ধর্ম গুরুই মানুষ একা , জটিল হিসেব  ‘মান-অপমান’ ,

 ক্ষণিক ভুলেই ভক্তের দল করিয়ে দেবে রক্তস্নান ।

  •  আপনার দেশে কি আইন কানুন নেই নাকি ?

    আইন আছে লুকিয়ে কোথাও ,ডাকলে গুরু বেরিয়ে আসে ,

    রাতবিরেতে পথের ধারে নির্ভয়া দের  কাপড় হাসে !

  •  আপনি কি সত্যি কোনো গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক ?

->      মিথ্যা তো নয় , সত্যি বটে , সেই প্রথম থেকেই, সবাই জানে ,

           তবে গণতন্ত্রের  উপস্থিতি শুধুই আমার সংবিধানে !

নিরপেক্ষতা

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট
বিস্মিত মুখে ফোনের রিসিভার টা রেখে , জানলার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা  স্ত্রীকে , রমেনের শক্ত চোয়ালের প্রশ্ন  : এটা তুমি কেন করলে মালা?
> বিদ্রুপ মাখা হাসি তে চোখের জল ঢেকে মালা বলল : নার্সিং হোম থেকে ফোন করেছিল বুঝি ?

> শুনতেই তো পেলে , আমার স্ত্রীর গর্ভপাতের খবর দেওয়ার জন্য অচেনা কন্ঠস্বরকে কিভাবে বলিষ্ঠ ভাবে ধন্যবাদ দিলাম !

> খবরের মধ্যে নতুনের গন্ধ না থাকলে আকস্মিকতা যে বিনয়ের মুখোশ কে আড়াল করতে পারবে না ,সেটাই  কি  স্বাভাবিক নয় !আসলে এর আগের দু বার , তুমি তো আমাকে বুঝিয়েই দিয়েছিলে কী করতে হবে ,তাই এবার আর তার অবকাশ দিলাম না , শুধু শুধু দিন বাড়লে তারও কষ্ট আর আমারও ।

> তোমাকে তো বলেছিলাম , আমি নিজে ভ্রুণ পরীক্ষা করেছি !  এবার আর আগের দু বারের ব্যাপার এক নয় , এবার আমাদের ছেলে  হত মালা ! তোমার কি আমার ডাক্তারি বিদ্যার ওপর একেবারেই বিশ্বাস নেই ?
> তোমার বিদ্যের উপর সম্পুর্ন আস্থা আছে আমার , আর ঠিক সেই জন্যেই তোমার মৃত সন্তানদের কাছে আমি আজ নিরপেক্ষ মা !

স্বার্থক মৃত্যু

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

->চলুন এবার , সব তো শেষ , আর কি পিছন ঘুরে দেখছেন ওত ?

->মানে বলছিলাম কিছুই কি সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাবে না ?

->আপনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানে জাগতিক কিছুর দরকার হয় না মশাই  ,আর শুনুন আপনার মত মানুষের মায়া করা সাজে না।

->মানে ঠিক বুঝলাম না ।

-> মানে অতই যদি বেঁচে থাকার সখ , এত পেশা থাকতে যুদ্ধকে বেছে নিলেন কেন ?

->নিয়তি আমাকে যোগ্য মনে করেছে  অজস্র প্রানের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে । শত্রুর বন্দুকের সামনে , মন্দিরের পুতুল রক্ষকের থেকে মুখ ফিরিয়ে  , প্রচন্ড বিশ্বাসে আমার উর্দি ই  জাপটে ধরে অসহায় হাত , সেই সম্মানের সাথে আর যাই হোক আপোষ চলে না।

->আপনার স্ত্রী , ওইটুকু মেয়ে , তাদের কথা একবারও ভাবলেন না ?  যে দেশের মানুষের জন্য আপনি শত্রুর বুলেট গর্বের সাথে হজম করে নিলেন , আপনি কি ভাবছেন  দুদিন বাদে  তারা আপনাকে বা আপনার পরিবারকে মনে রাখবে ?

-> কই  তা ভাবিনি তো , তবে এটুকু জানি মৃত্যুশোকের যন্ত্রণা , কফিন ছোয়ার গর্বের কাছে  একসময় ঠিক ফিকে হয়ে যাবে ।

-> অজস্র কোটি নামের সাথে আপনার নামও অদরকারী স্মৃতির তলানিতে গিয়ে ঠেকবে , কিছুদিন পরই আপনার নাম বেরোনো খবরের  কাগজের ঠোঙায় , নবদম্পতি পার্কে বসে  ছোলা  খেতে খেতে প্রেমালাপ করবে , শহীদের প্রানের থেকে সলমন খানের সিনেমার টিকিটের দাম এখানে বেশী , এই তো আপনার দেশ, তার জন্য খামোখা তেজী প্রাণ টা দিয়ে বসলেন !

-> বলছিলাম শুধু ওই পতাকা টা সাথে নিয়ে গেলে খুব আপত্তি আছে ? দেশের গন্ধের যে খুব মায়া ।

-> দেশ মানে ঠিক কি বলুন তো ! আপনাকে দ্বার রক্ষী নিযুক্ত কারী নাকি আপনার মৃত্যুর অসহায় দর্শক ? আপনার মত শহীদ যদি তার সন্তান হত , প্রতিশোধের আগুনে এতদিনে জগৎ সংসার ছাই করে দিত সে , ঠান্ডা ঘরে  কফিতে চুমুক দিয়ে উষ্ণ শোকপ্রকাশের  ফাঁকে ফাঁকে ,  রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার হিসেব নিকেশ কোনো সন্তান হারা মা কে মানায় কি !

-> এত কঠিন ভাবে তো ভাবিনি কখনো , আমার কাছে দেশ মানে ওই অচেনা ছেলেগুলো ,যাদের সাথে আমার  কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই কিন্তু  আমার মৃত্যুতে তাদের গরম রক্ত , শত্রুর ভবিষ্যৎ কে মুহুর্তে ঝাপসা করে দেয় । দেশ মানে ওই মেয়েটা , এইবারের জন্মদিনের আনন্দ যাকে অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই ছুতে পারেনি , তার চোখের জল শহীদের চিতার আগুন না নিভাতে পারলেও মৃত্যুযন্ত্রনার স্মৃতি একেবারে বিলীন করে দিয়েছে  , অথবা বলতে পারেন আমার কাছে দেশ মানে ওই ভদ্রলোক  যিনি  কাল অব্দি ভাবছিলেন  আত্মহত্যা করবেন  ,  কিন্তু আজ অন্তরাত্মার প্রশ্নের গভীরতায় সে ভাবনা চিরতরে ত্যাগ করলেন !

->  কী প্রশ্ন ?

-> জীবন নিরর্থক হলই বা , তাই বলে কি  মৃত্যুও স্বার্থক হবে না ?

নম্বরের হিসেব

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

নগেন মল্লিক অফিস যাচ্ছিলেন ,হঠাৎ দেখলেন পথের ধারে জটলা। ‘ওখানে কী হয়েছে ভাই?’ ,জটলার ধারে দাড়িয়ে থাকা এক অচেনা মানুষকে তার কৌতুহল পূর্ণ প্রশ্ন । ‘ওই একটা পকেট মার ধরা পড়েছে , তাই লোকে মার ধোর করছে আর কি ! ‘ কথাটা নগেন বাবু র সাধারণ  একঘেয়ে সকালকে একটা নতুন মাত্রা এনে দিল ,তার হাতের তালুটা পুরনো অভ্যাসে  নিসপিস করে উঠলো , প্রচন্ড উৎসাহে ভিড় ঠেলে এগিয়ে, মাটিতে নেতিয়ে পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে হাতের ঘুষি পাকিয়ে মারতে উদ্যোগী হতেই , কে যেন তার কানের কাছে এসে বলল, “নম্বর কাটা যাবে কিন্তু!” নগেন বাবু খানিক  থমকে গেলেন , পিছন থেকে আচমকা ভিড়ের ধাক্কা য় সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার ঘুষি পাকাতেই  সেই একই গলার স্বর, “নম্বর কাটা যাবে কিন্তু  আপনার !” এবার খানিকটা ভয় পেয়েই পিছিয়ে এলেন নগেন মল্লিক, নিজের আশেপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন , সকলের মনোযোগ মাটিতে অবশ হয়ে পড়ে থাকা বছর চব্বিশের ছেলেটার দিকে ,এই অচেনা লোকগুলোর মধ্যে কেউ তার সাথে মশকরা করে কেনই বা সময় নষ্ট করতে যাবে ! তাহলে কি সবটাই তার মনের ভুল ? না! না ! তা কি করে হয় ? পর পর দু বার যে তিনি ওই কথা স্পষ্ট শুনলেন। ঘড়ির কাটার দিকে চোখ পড়ায় , অগত্যা নিজের মনোবাঞ্ছা অপূর্ন রেখে সামনের দিকে পা বাড়াতেই দেখলেন পকেটমার ছেলেটি একটু দূরে  হাসি মুখে  দাড়িয়ে আছে। “যার পকেট থেকে টাকা চুরি গিয়েছিল  সে কি আপনার সাহায্য চেয়েছিল ? পেটের দায়ে অসৎ উপায় বেছে নেওয়া  আধমরা ছেলে টিকে মেরে আত্মতৃপ্তি ছাড়া আর কিছু হত কি ?  মাঝখান থেকে অনেকগুলো নম্বর  কাটা যেত শুধু  শুধু ”  কথাটা বলেই পথ চলতি  মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল ছেলেটি , নগেন মল্লিক নিজের চোখ কে বিশ্বাস না করতে পেরে আবার ঘটনাস্থলে  ফিরে গিয়ে  দেখলেন সেখানে কিছুই বদলায়নি , ছেলেটি আগের মতই মাটিতে নেতিয়ে পড়ে আছে , ভয়ে  তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো ।

অশেষ সাহা ব্যস্ত পায়ে ১৫ নম্বর বাস ধরতে দৌড় তেই  ট্রাফিক সিগনালে দাড়িয়ে থাকা একজন অচেনা বৃদ্ধা আচমকা তার হাত ধরে বললেন ,”আমাকে একটু রাস্তাটা পার করে দেবে বাবা ? বয়সের দোষে চোখে ভালো দেখতে পাই না। “অশেষ সাহা  মাথার ঘাম মুছে  বেশ বিরক্তি ভরা স্বরে  বললেন , “অফিসের দেরী হয়ে গেছে দিদিমা, ক্ষমা করবেন!”

“দশ নম্বর কাটা গেল তোমার ” , কথাটা বলার পরই  এক রহস্যময় দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে  বৃদ্ধা মহিলা অবলীলায় রাস্তা পার হয়ে গেলেন । অবাক চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন অশেষ সাহা ,১৫ নম্বর বাসটা অনেক্ষণ দাড়িয়ে ,নতুন যাত্রী নিয়ে চলে গেল , চিন্তায় মগ্ন অশেষ বাবু র তা চোখেই পড়ল না ।

বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে সামনের চায়ের দোকানে বিস্কুট  হাতে নিয়ে বসলেন বিনয় ভৌমিক । হঠাৎ তার চোখ পড়ল বিস্কুটের দিকে লোভাতুর চোখে তাকিয়ে থাকা রাস্তার ঘেয়ো কুকুর টার দিকে , সমস্ত মন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি তে ভরে গেল তার ,প্রচন্ড রাগে নিজের ছাতা টা উঠিয়ে কুকুরটাকে মারতে যেতেই গরম চায়ের ছ্যাকায় পা জ্বলে পুড়ে গেল তার । “ওরে বাবা রে !” বলে চিৎ কার করে উঠে সামনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকা কিশোর ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললেন ,”তুই বুঝি নতুন কাজে ঢুকেছিস ? নবারণ কে বলে আজকেই তোর ছুটির ব্যবস্থা করছি ,চায়ের কাপ টাও ঠিক করে ধরতে জানিস না ছোকড়া ! খরিদ্দার কে  পুড়িয়ে মেরে নবারনের এতদিনের ব্যবসার  দফারফা করে ছাড়বি তো তুই  !”  ছেলেটি একটু চুপ করে থেকে বলল , “একটু গরম  ছ্যাঁকাই সহ্য করতে পারছেন না ,সেতুকে মারলে যখন অতগুলো নম্বর কাটা যেত তখন কি হত ? কম নম্বরের  শাস্তি  যে কত ভয়ানক হতে পারে  সে বিষয়ে কোনো ধারণা আছে আপনার বিনয়বাবু ? শরীর থাকলেই খিদে পাবে , অবলা জীবও সে নিয়মের ব্যতিক্রম নয় , একটু ভেবে দেখুন তো, সেতু  কি মার খাওয়ার মত কোনো দোষ করেছিল ?” কিশোর ছেলেটির আস্পর্ধা দেখে বিনয়বাবুর রাগের পারদ মাথায় চড়ে গেল , চিৎ কার করে ডেকে উঠলেন , “নবারণ !” একটি মাঝ বয়সী লোক দৌড়ে আসতেই বিনয় ভৌমিক  সামনে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটির থেকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন ,” এই বেয়াদপ টাকে যদি এখনি দূর না করিস তবে তোর দোকানে আজই আমার শেষ দিন!” নবারণ নামের লোকটি অবাক হয়ে বললেন , “আপনি কার কথা বলছেন বিনয়বাবু ? বিনয় ভৌমিক আরো রেগে বললেন ,” চোখের মাথা খেয়েছিস নাকি ? তোর নতুন চাকুরে,নির্লজ্জের মত দাড়িয়ে থাকা এই অপদার্থের কথা বলছি ! প্রথমে আমার পায়ে গরম চা ফেলল ,ক্ষমা চাওয়ার বদলে তারপরে আবার মুখে ভাষণের পাঁচ কান্ড! ” নবারণ নামের লোকটি কাছে এসে বললেন , “আমি কিছু বুঝতে পারছি না বিনয় বাবু , আমি আর আপনি ছাড়া  এখানে আর কেউ তো দাড়িয়ে নেই ,তাছাড়া দোকানে নতুন লোক রাখার মত আমার সামর্থ্য কোথায় !” সামনে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটির মতই দোকানে বসে থাকা অন্যান্য খরিদ্দারের চোখে মুখে বিদ্রুপের হাসি  বিনয়বাবুর ভিতরের ভয়কে আরো  বাড়িয়ে দিল , তাহলে কি তার মাথার কিছু গন্ডগোল ? আর কিছু ভাবতে না পেরে চিন্তিত মুখে দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য  পা বাড়াতেই ছেলেটি বিনয় বাবুর কানের সামনে এসে বলল , “নম্বরের ব্যাপারটা ভুলবেন না কিন্তু , বাড়াতে না পারেন ,খামোকা কমিয়ে নিজের বিপদ বাড়াতে যাবেন কেন !”  বিনয়বাবু ভয়ার্ত চোখে তাকাতেই ছেলেটি অল্প হেসে অদৃশ্য হয়ে গেল ।

বাস থেকে নেমে মৌমি গোস্বামী একটু এগোতেই দেখলেন একটি যুবক রাস্তার ধারে উল্টে থাকা বাইকের পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে , আশেপাশের পথচলতি মানুষের মতই এই দৃশ্যতে একটুও বিচলিত না হয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই আবার সেই ভৎসনা পূর্ণ কন্ঠস্বর  বেজে উঠলো তার কানে , “অনেক নম্বর কাটা গেল মৌমি ! তোমার জীবনের কিছু টা সময়   কি  আহত  যুবকটির বাকি জীবনের থেকেও বেশী মূল্যবান ? ” মৌমি গোস্বামী ভীষণ ভয়ে চারিদিকে তাকাতেই দেখলেন রাস্তাটা তখনও একইরকম শুনশান , রক্তাক্ত ছেলেটার দিকে দুপা এগিয়েও আবার পিছিয়ে গিয়ে বাড়ির পথ ধরতেই সেই আগের কন্ঠস্বর , এবার তা আরো উত্তেজিত ও ভৎসনা পূর্ণ,  ” যুবকটির মুখের দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখো মৌমি , এবার হয়তো চোখ ফেরানো ওতটা সহজ হবে না !” মৌমি গোস্বামী এক অলৌকিক শক্তির আবেশে অনিচ্ছাসত্তেও ছেলেটির দিকে ফিরে তাকাতেই ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন ,অচেনা যুবকটির জায়গায় রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে তার স্বামী মিলন গোস্বামী , নিজের কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থা কাটিয়ে পাগলের মত স্বামীর কাছে দৌড়ে গিয়ে দেখলেন  দেহে তখনও ক্ষীন প্রানের স্পন্দন বর্তমান । নার্সিং হোমের চেয়ারে বসে প্রার্থনারত মৌমি গোস্বামীর দুঃস্বপ্নের ঘড়ি থেমে গেল  অপেরাসন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসা ডাক্তারের গলার স্বরে যার সাথে গত রাতের অলৌকিক কন্ঠস্বরের হুবহু মিল ,”আপনার স্বামী এখন সম্পূর্ণ  বিপদমুক্ত। সকলের জীবনের দাম যে সমান মৌমি দেবী , সে জীবন পথে পড়ে থাকা অচেনা যুবকের হোক অথবা আপনার স্বামী মিলন গোস্বামীর । নম্বরের  যোগ টা ঠিক করে বুঝতে শিখুন , বিয়োগের অভিশাপ যে বড় ভয়ানক!”

দুধের বাটি হাতে রান্নাঘর থেকে পা টিপে টিপে বেরিয়ে বিনি দৌড়ে বাড়ির পিছনে রাস্তায় গিয়ে , কোচড় খুলে ধরল অপেক্ষারত কালু ভুলু দের সামনে , সবাই  যাতে দুধ রুটির ভাগ সমান পায় তা দেখা বিনির দায়িত্ব , বিনির কালু ভুলুরা ভাগ নিয়ে মারামারি করতে শেখেনি , বিনি যার সামনে যেমন পরিবেশন করে , ততটা খেয়ে আবার পরের পাতের জন্য  বিনির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে , বিনিকে যেমন তারা ভালবাসে তেমন ভয় ও করে খুব । ভুলু আস্তে আস্তে খায় বলে একদিন বুটু নিজের খাবার শেষ করে ওর পাতের দিকে শুধু  তাকিয়েছিল , তাতেই বিনি চিৎকার করে বলেছিল , “বুটু তোর ৫ নম্বর কাটা গেল !” নম্বরের হিসেব না বুঝলেও পর পর পাঁচদিন বিনির আদর না পাওয়ার দুঃখ  বুটু আজও ভুলতে পারেনি ।

খাওয়া শেষের পর আদর পর্ব সাঙ্গ করে বিনি  ঘরে ঢুকতেই মা বলল ,”মালতী বলছিল ,রান্না ঘরের রুটির হিসেব আজও মিলছে না ,কোথায় গিয়েছিলি বিনি ?”

বিনি মুখ নিচু করে বলল , “কোথাও না !”

মা হেসে বলল , “মা কে মিথ্যে বললে বুঝি নম্বর কাটা যায় না ?”

বিনি চিন্তিত মুখে বলল : “বাবা যে বলেছে , যে মিথ্যে কারোর ক্ষতি না করে শুধু অন্যের ভালোর জন্য বলা হয় তাতে একটুও নম্বর কাটা যায় না!”

মা : “সে অন্যের সংখ্যা যে দিনদিন বেড়েই চলছে বিনি !”

বিনি হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তার সাথে আমার নম্বরও !”

বিনির মা রান্না ঘরে ফিরে এসে বললেন , “রাতেও কয়েকটা রুটি বেশী বানিয়ো মালতী দি ! আমার বিনির যোগের হিসেব ভুল হয়ে যাবে নাহলে !”

মালতী দি হেসে বলল , “সে আর বলতে ! নইলে বিনি দিদি আমারও নম্বর কেটে দেবে !”

বিনির মা  : “তোমার দাদাবাবুর কথা মত জীবন টা যদি পরীক্ষা হয় নম্বরের হিসেব রাখাটা সত্যি খুব জরুরি  , মনের ভিতরের সুক্ষ্ম অনুভূতি গুলো নষ্ট হয়ে গেলে এ পোড়া জীবনের আর কতটুকুই বা দাম থাকে বলো! নিজের আখের গোছাতে এই অল্প সময় টুকু ফুরিয়ে গেলে,লাল কালি ভরা রেসাল্ট হাতে ,পরীক্ষকের বেতের সামনে  মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকতে হবে যে ! ”

মালতী দি : আমাদের বিনি দিদি সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা , তার সামনে অতি বড় পরীক্ষক কেও  মাথা নীচু করে দাড়িয়ে থাকতে হবে বৌদিমনি  !

বিনির মা : তোমার কথাই যেন সত্যি হয় মালতী দি ! আসলে কি জানো ,বয়সের সাথে সাথে হিসেবের বুদ্ধি পূর্ণতা পেলেও , মানুষের মন ভালো মন্দের সহজ বিচার শক্তি হারিয়ে ফেলে ,বলতে পারো স্কুল জীবনের নম্বর কাটার ভয়টা আর তার মনে থাকে না ,সেই সময়ে যদি  কেউ একবার জীবনের আসল সত্যি টা তাকে মনে করিয়ে দিতে পারে ,তাহলে হয়তো সময় শেষে নম্বরের যোগফলের  হিসেব টা অনেকটাই বদলে যাবে  ।

বিনির মা য়ের কথা শুনে অদৃশ্য কেউ অলক্ষ্যে হাসলেন ! তার চারিদিকে ছড়ানো অগনিত হিসেবের খাতা  ,নতুন বেশে প্রস্তুত হয়ে নিলেন তিনি  নিজের সৃষ্টির  নম্বরের হিসেব আরো একবার বদলে দিতে।

 

ধন্যবাদ

Bongnote

ধর্মের খাবার

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ক্ষুধার্ত ছেলেটি একলা রাস্তায় হাঁটছে । খিদের জ্বালায় চোখের সামনে মাঝে মাঝে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসছে , ভিড়ের পিছনে চলতে চলতে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল  ,জায়গা টা সে চেনে না , কেউ তাড়িয়ে দেবার আগের সময়টুকু যদি জিড়িয়ে নেওয়া যায় ।

হঠাৎ একজন তার সামনে একটা শালপাতা রেখে  দিয়ে গেল , কিছু বোঝার আগেই  আরেকজন ভদ্রলোক সামনে রাখা শালপাতায় ভাতের হাতা কাত করার চেষ্টা করতেই  ছেলেটি  অস্ফুটে  বাঁধা  দিয়ে  বলল , “আমাকে দেবেন না ! ধর্মের খাবারে আমার অধিকার নেই ,  মিথ্যাচারের বিনিময়ে লাথি সহ্যের ক্ষমতাও এই মুহুর্তে  আমার শরীর  হারিয়েছে । “

ভদ্রলোক হেসে বললেন  : তোমার বুঝি খিদে নেই ?

ছেলেটি : আমি জানি না আমার জাত কি , ধর্মের নাম ও অজানা , কোনো অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব আছে বলেও কখনো মালুম হয়নি , তাই বিশ্বাসের প্রশ্ন অবান্তর ।

ভদ্রলোক  : আমার প্রশ্নটা বোধহয় তুমি  ঠিক করে শুনতে পাওনি , বলছি এত বেলাতেও তোমার খিদে পায়নি  ?

ছেলেটি  : আর কিছুক্ষণ না খেলে হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাব কিন্তু …

ভদ্রলোক  : তাহলে আর দেরী না করে চটপট খেয়ে নাও । আর একটা কথা , এখানে খাবার জন্যে খিদে থাকাই যথেষ্ঠ  ।

খাবারের প্রথম গ্রাস মুখে দিয়ে ছেলেটির কানে স্মৃ তির  কথাগুলো আবার বেজে উঠলো ….”তোর নাম কি  রে ছোকড়া  ? দেখে তো মনে হচ্ছে মুসলিমের বাচ্চা ! ….এই  সোমনাথ ! কয়েকটা লাথি ঘুষি মেরে ব্যাটাকে ছেড়ে দে এবার ,আবার কোনদিন  মন্দিরে চত্তরে ঘুরঘুর করতে দেখলে  হাত পা ভেঙ্গে দিবি !  “

” সালাম আলাইকুম বলতে জানে না শুধু গান্ডে পিন্ডে গেলার জন্য  মুসলিম সাজার সখ ! পেদিয়ে ধুনে  দে  ওটাকে , আলহার  বান্দারা ধর্মের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার সহ্য করে না , এই সত্যি  যেন ও কোনদিন ভুলতে  না পারে !”

“আরে এখানে খাবার দাবার  পাওয়া যায় না তবে এই গেটের বাইরে আমার মোমবাতির ব্যবসা দারুন চলে ,ওই হাড়ি কাঠে   ঝোলা লোকটার কাছে গিয়ে মোমবাতি কেন দাবানল জ্বালালেও কিছু হবার নয় , আরে যে নিজেই হাড়ি কাঠে …সে যাই হোক , এই সব কথা বলিয়ে আমার রোজের কাস্টমার না তাড়ালে  তোর শান্তি নেই  দেখছি ! যা ভাগ এখান থেকে !”

“শোন রে ছেলে !  কৃষ্ণ , মহম্মদ  , যীশুর কথা  ছাড় দেখিনি , সবাইকে দলে পাওয়ার একটাই উপায় ,  ‘অদৃশ্য শক্তি’ শব্দ টার প্রয়োগ , হ্যাঁ  হ্যাঁ  !  খাবারের প্যাকেট পাবি , আগে আমাদের  নতুন ধর্মের ব্যবসার খরিদ্দার ধরে দে কটা !অফিস টাইমে শিয়ালদহ  স্টেশনে দাড়িয়ে লোকের হাতে এই  প্যাম্ফ্লেট গুলো  ধরাবি , সে যতই ব্যস্ত থাকুক অথবা  রেগে যাক ,ফ্রি তে লাড্ডু খাওয়ার মতই গালাগালি -চড় চাপড় খাওয়ার অভ্যাস  নিশ্চই হয়ে গেছে এতদিনে।”

খিদের জ্বালা মেটায় ছেলেটার অবসন্ন শরীর খানিক  চাঙ্গা হল । সে অবাক হয়ে  তাকিয়ে দেখল , কোনো অজানা কারণে  তার আশেপাশের বেশীরভাগ মানুষগুলোর মাথা কাপড়ে ঢাকা , কেউ রুমালে ঢেকেছে , কেউ  শাড়িতে , কেউ বা গায়ের ওরনা দিয়ে । কিছু ছাড়া ছাড়া কথা ছেলেটির  কানে ভেসে এলো ,  ‘রাত্রের লাঙ্গারের সময়টা জানিস তো !’  , “সত শ্রী অকাল !’ , ‘ওয়াহে গুরু ‘ ,  এসবের মানে বুঝতে না পেরে শালপাতার বাকি খাবারে মনোনিবেশ করলো সে  । ধর্মের  নাম না জেনেই পেট  তার গুনগান গাইছে , প্রথমবার কেউ স্মৃতির চোখ ঢেকে বলছে , ‘ধর্ম  মানে খুনখারাপি বা ধান্ধাবাজি নয় ,ধর্ম মানে ক্ষুধার্ত পেটে বিনা কৈফিয়তে ডাল ভাতের শান্তি মিছিল ।’

উত্তরাধিকারী

Comments 6 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

আর ২ ঘন্টার মধ্যেই কার্শিয়াং পৌঁছে যাবে সমীর। দশ বছর আগে নিউইয়র্কের  প্লেনে ওঠার সময় সে ভেবেছিল আর কখনো সে এখানে ফিরবে না । স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার পর , প্রতিবছর নিয়ম করে একমাসের ছুটিতে বাড়িতে আসার তার একমাত্র কারণ, দশ বছর আগে নিজের হাতে পৃথিবীতে নিজের সকল অস্তিত্ব মিটিয়ে দিয়েছিল । নিজের মায়ের অকস্মাৎ মৃত্যুর স্মৃতি আজও অহর্নিশ তার মনকে তাড়া করে বেরায়। পুলিশের কাছে সে মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হলেও সমীর জানে তা হল আসলে বছরের পর বছর ধরে শানিয়ে নেওয়া, অবহেলার হাতিয়ারে ঠান্ডা মাথায় খুন। সে পরিচিত খুনীর সাথে আবার মুখোমুখি  হবার বিতৃষ্ণাই সমীরকে দশ বছর আগের নেওয়া ,দেশে না ফেরার সিদ্ধান্তকে ,কখনো পুনর্বিবেচনা করতে দেয়নি । সেই মানুষটার মৃত্যুর খবর পেয়েও আজ সে আসতো না যদি না আইনের হাত তাকে এভাবে বাধ্য করত।

সন্ধ্যে ৬:১০ ,কার্শিয়াং  এর বাড়ির কাছে পৌঁছে মনটা অস্থির হয়ে উঠলো সমীরের । মায়ের অজস্র স্মৃতির ,তাকে গিলে খাবার এতদিনের অপেক্ষা আজ শেষ হবে, সুদূর আমেরিকায় বসেও যা তাকে দুদন্ড শান্তি দেয়নি আজ কি এত কাছে পেয়ে তা তাকে মুক্তি দেবে ! বাড়ির দরজার সামনে ট্যাক্সি থেকে নামতেই  সেখানে অপেক্ষারত তার বাবার পুরনো উকিল সামনে এসে বলল , “এসে গেছ ! লম্বা যার্নি তে ক্লান্ত নিশ্চই !” সমীর বলল ,”না সেরকম নয় ! রমেশ জ্যেঠু,  আমার হাতে সময় কিন্তু খুব কম !” বৃদ্ধ রমেশ কর্মকার হেসে বললেন , “আমি জানি তুমি খুব ব্যস্ত ! নইলে তোমার বাবার শেষ সময়ে ,আমার লেখা এতগুলো চিঠির মধ্যে একটার উত্তর তুমি নিশ্চই দিতে পারতে  , সে যাইহোক আমি সব কাগজ পত্র তৈরী করে রেখেছি যেখানে তোমার সই লাগবে, সরকারী ফর্মালিটি পূরণ করতে নিরুপায় হয়ে তোমাকে এখানে আসতে বাধ্য করায়, তোমার বাবার চেয়েও বয়সে বড় এই রমেশ কর্মকার , তোমার কাছে জোড়হাতে ক্ষমাপ্রার্থী! ভিতরে টেবিলে তোমার জন্য আমার স্ত্রীর বানানো খাবার ঢাকা আছে ,সেটা খেয়ে তুমি আজ রাতটা বিশ্রাম নিয়ে নাও, কাল সকালে আমি এসে তোমাকে স্কুলে নিয়ে যাব ,সরকারী  উকিলও ওখানেই আসবেন ।”

রমেশ কর্মকারের দেওয়া  চাবি খুলে বাড়ির ভিতরে পা রাখতেই সমীর বিস্ময়ে চমকে উঠলো ,সময় যেন ১০ বছর আগে স্থির হয়ে আছে সেখানে,আলনাতে তার মায়ের ভাজ করা শাড়ি ,টেবিলের উপরে রাখা মায়ের ব্যবহার করা সিঁদুর কৌটোর সাথে অন্যান্য সরঞ্জাম, পিতলের জলের গ্লাসটাও নিজের জায়গা এতটুকু বদলায়নি ,সমীরের সাথে মায়ের ফটো যার ওপর একটুও ধুলোর চিহ্ন নেই , আয়নায় লাগানো মায়ের কপালের টিপ ,ঘরের কোনায় খোলা মায়ের পায়ের চটি ,এমনকি ঘরের ক্যালেন্ডার টাও দশ বছর আগের সময়ই নির্দেশ করছে। সে উদ্ভ্রান্তের মত মায়ের ঘরে দৌড়ে  গিয়ে দেখলো, আজ ও মায়ের বিছানায় দুটো দুরকমের বালিশ পাতা , মায়ের বালিশ টা নরম সাদা , সমীরের বালিশ টা শক্ত আর উঁচু ,তার গল্পের বই পড়ার সুবিধার জন্য। সমীর বাইরে পড়তে চলে যাওয়ার পরও মা তার বালিশটা বিছানা থেকে সরায়নি, ছুটিতে এলেই সে ওই বালিশে শুয়ে মায়ের আদর খেত। মায়ের মৃত্যুর ২ দিন পরে কার্শিয়াং এ পৌঁছে মা কে শেষ বার দেখার আসা আর তার পূর্ণ হয়নি ,মা বিহীন এই বাড়িতে পা দেওয়ার  শক্তি সেদিন তার ছিল না ,তাই তার এক পুরনো বন্ধুর বাড়িতে ২ দিন থেকে , সে ফিরে গিয়েছিল আমেরিকা ।

সমীর এবার ধীরে পায়ে পাশের ঘরের দিকে গেল , এটাই তার মায়ের খুনীর ঘর যে মাসের পর মাস রাতে বাড়ি ফিরত না সেই একই অজুহাতে, সংসারের কোনো দায়িত্ব কর্তব্য যে এক দিনের জন্যও পালন করেনি , যার নিরন্তর অবহেলা তার মাকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে । এই ঘরের পরিবর্তন সত্যি চোখে পরার মত , সময় যেন দেরীতে হলেও অনুভব করেছে যে এবাড়িতে সেই লোকটির বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই, তাই নিজে হাতে তার সকল সরঞ্জাম,আসবাবপত্র সরিয়ে ,এই  ঘরটি সে একেবারে খালি করে দিয়েছে। সমীর বাইরের ঘরে রাখা সোফায় নিজের ক্লান্ত শরীর রেখে চোখ বুজে ফেলল , নিঃশব্দে তার চোখের জল সোফায় রাখা বালিশ ভিজিয়ে দিতে লাগল।

সকালে দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজে সমীরের ঘুম ভাঙ্গলো । দরজা খুলতেই বাইরে দাড়িয়ে থাকা রমেশ কর্মকার বললেন, “সমীর ! এখন আমাদের যেতে হবে !” সমীর বলল , “হ্যাঁ ,আপনি বসুন ,আমি এখনি আসছি ।” ভিতর থেকে জামা বদলে এসে সমীর ,রমেশ কর্মকারের গাড়িতে উঠে বসলো।

রমেশ কর্মকার : “টেবিলে ঢাকা খাবার টা রাতে খাওনি দেখলাম ,স্কুলে পৌঁছে অল্প কিছু খেয়ে বাকি কাজ করা যাবে না হয়। ”

সমীর : ” বাড়িতে কোনো জিনিসের স্থান বদল হয়নি  , সবকিছু ঠিক আগের মতই আছে, এ বিষয়ে আপনি কিছু জানেন ?”

রমেশ কর্মকার: “তোমার মায়ের মৃত্যুর পর ,তোমার বাবা রোজ সকালে এসে, নিজে হাতে যত্ন করে সব জিনিসের ওপর  জমা ধুলো সরিয়ে দিতেন , এখন আমার স্ত্রী তার সেই দায়িত্ব পালন করে , সে মানুষটাকে কমলা নিজের দাদার মত শ্রদ্ধা করত ।”

সমীর : “সারাজীবন ধরে  কারো ওপর করা অন্যায়ের পাপ, সে মরে গেলে আদিখ্যেতার প্রায়শ্চিত্তে  কি মেটে রমেশ জ্যেঠু ? সে যাই হোক ,আমাকে ঠিক আপনার কি কাজে লাগবে তা আমি এখনো জানিনা  , মানে বাবার স্কুলের সাথে আমার আর মায়ের কখনো কোনো সম্পর্ক ছিল না  তাই সেই কাগজপত্রে আজকে আমার সই কেন লাগবে সেটা জানতে পারলে সুবিধা হত |”

রমেশ কর্মকার :”তোমার বাবা সর্বস্ব দিয়ে এই স্কুল টাকে আজ এই জায়গায় দাড় করিয়েছেন, তুমি হয়তো জানো না , এই স্কুলে একটা একটা ল্যাবরেটরি আছে  যেখানে ছাত্রদের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার  করতে শেখানো হয়, স্কুলে পাঠ্য বিষয়ের মধ্যে  রোবটিক্স  অন্যতম , অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত অজস্র গবেষনার বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে , এই স্কুলের ছাত্ররা মহাকাশ নিয়ে ছোটবেলার নানা রকম জল্পনা কল্পনাকে অনেক পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে , কিন্তু এই বিশাল যজ্ঞের আগুন জ্বালিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ঘি যে ফুরিয়ে এসেছিল ,অর্থ সাহায্য লাভের অনেকদিনের চেষ্টায় অবশেষে এই  স্কুল  সরকারী অনুমোদন পেতে চলেছে, কিন্তু তুমি না এলে তোমার বাবার নিরলস পরিশ্রমের কোনো কদর না করেই আজ সরকারের উকিল বিনা বাক্য ব্যয়ে ফিরে যেত । স্কুলের অগনিত ছাত্র সেই মানুষ টাকে পিতৃ জ্ঞানে শ্রদ্ধা করলেও ,আইন যে উত্তরাধিকারীর কলম ছাড়া অন্য কারো সাক্ষর নেয় না সমীর ।”

সমীর বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল : “উত্তরাধিকারী? যিনি সারা জীবনে মুহুর্তের জন্য নিজের কাটা গন্ডি কাউকে পেরোতে দেননি ,আশেপাশের সম্পর্ক গুলোকে প্রাপ্য অধিকার থেকে অহর্নিশ বিনা দ্বিধায় বঞ্চিত করেছেন, নিজের পারিবারিক দায়িত্ব সম্বন্ধে শেষ দিন পর্যন্ত নির্বিকার হয়ে  থেকে গেলেন অন্যকে দায়িত্ববান হবার পাঠ  শেখাতে হবে বলে , সেই স্বেচ্ছাচারী  মানুষের মৃত্যুর  পর উত্তরাধিকারীর খোঁজ যে  শুধু আইনই আপনাকে দিতে পারতো রমেশ জ্যেঠু ! ”

গাড়িটা একটা স্কুলের গেটের সামনে দাড়ালো । রমেশ কর্মকার সমীরের উদ্দেশ্যে বললেন ,”এসো !” স্কুল কম্পাউন্ডে ঢুকে সমীর চারিদিকে তাকিয়ে তার প্রশস্তি আর বৈচিত্র দেখে অবাক হলেও তা প্রকাশ করলো না ! সেই মানুষটার প্রতি ঘৃণায় সে আজকের আগে কোনদিন এই গেট পেরোয়নি ! মায়ের পছন্দের দার্জিলিঙের বোর্ডিং স্কুলে পড়েছে সে , তার পড়ার খরচের টাকার হিসেব সে অনেক ছোটবেলা থেকে রেখেছে , ২ বছর আগের পাঠানো বাবার নামে  তার সই করা চেক, সেই সব হিসেব কড়ায় গন্ডায় চুকিয়ে দিয়েছে ,যদিও সে টাকার অঙ্ক তার ব্যাঙ্কে এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে তবুও  এই হিসেব মেটানোর প্রচেষ্টাই তার মনকে এক অসম্ভব শান্তি দিয়েছিল , বছরের পর বছর ধরে বিনা দোষে তার মায়ের সহ্য  করা অপমান, সে কিছু টা হলেও ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল সেই অগনিত অপরাধে অপরাধী মানুষটার দিকে ।

রমেশ কর্মকার একটা ঘরে প্রবেশ করে বললেন ,”এখানে বসো সমীর ! তোমার বাবা গত দশ বছর এঘরেই থাকতেন। সরকারী উকিলের আসতে সময় লাগবে ,আমি তোমার জন্য কিছু খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি । ”  সমীর  ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো , একটা টেবিল ,বইয়ের তাক ,গদিবিহীন খাট আর ছোট আলমারি ছাড়া ঘরে আর বিশেষ কিছু নেই। সে বইয়ের তাকের দিকে এগিয়ে গেল , বিভিন্ন বিষয় লেখা সাজানো বইয়ের বৈচিত্র লক্ষ্য করার মত । বইয়ের তাকের মতই এই ঘরের সবকিছুই তার কাছে নতুন ,তার বাবা যে চিরকাল এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি ছাড়া তার কাছে আর কিছুই ছিলেন না, সেটা আরো একবার উপলব্ধি করলো সমীর । হঠাৎ একটা ছেলের গলার আওয়াজে সমীর পিছনে তাকালো , “আপনার খাবার !” ছেলেটার বয়স আন্দাজ ১০ বছর হবে , এত নিষ্পাপ সুন্দর মুখ অনেকদিন সমীর দেখেনি ।

সে ছেলেটির কাছে গিয়ে বলল , “তোমার নাম কী  ?”

ছেলেটি : , “শঙ্কর”!

সমীর : ,” তুমি নিশ্চই বাঙালি ?”

ছেলেটি : “না ,তবে আমি মাতৃভাষা ছাড়াও আরো ৬ টি ভাষা বলতে ও লিখতে পারি ,বাংলা তার মধ্যে একটা।”

সমীর : “বাহ্ ! তুমি এই স্কুলে পড়াশোনা করো ?”

ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ।

সমীর : “এখন তো তোমাদের ছুটি চলছে তাই না ? ”

ছেলেটি আবার মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ।

সমীর বলল , “তবে আজ  স্কুলে এসেছো যে !”

ছেলেটি : “স্যার বলতেন স্কুল  ছুটি থাকলেও আমরা যখন খুশি স্কুলে আসতে পারি, তাছাড়া স্কুলে না এলে আমার ভালো লাগে না । ”

সমীর হাত বাড়িয়ে ছেলেটির হাত থেকে থালাটা নিতেই  সে  বলল : “আপনার ঘড়ি তো বন্ধ হয়ে গেছে !”

সমীর হেসে বলল : “বন্ধ হয়নি ,প্লেনে ধাক্কা লেগে খারাপ হয়ে গেছে ,আমার সময় বোধহয় আরো কিছুদিন থেমেই  থাকবে শঙ্কর  ,এটা বিদেশী ঘড়ি ,এর রকম সকম আমি যে বুঝি না !”

ছেলেটি : “আমি বুঝি , দিন না আমাকে , আপনার নিশ্চই সময় দেখতে অসুবিধা হচ্ছে ,আমি এখনি ঠিক করে দিচ্ছি!”

সমীর হেসে তার হাত ঘড়ি টা খুলে দিল ,ছেলেটা দৌড়ে গিয়ে ঘরের আলমারি থেকে একটা বাক্স বার করলো যার ভিতরে ছোট বড় মাঝারি আয়তনের  বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ঠাসা। মুহুর্তে সমীরের হাত ঘড়ির কল কব্জা খুলে ফেলে শঙ্কর হারিয়ে গেল যন্ত্রের জটিল দুনিয়ায়। সমীর খোলা আলমারি টা বন্ধ করতে  গিয়ে একটা বাক্সের দিকে চোখ পরায় চমকে উঠলো , এই বাক্স টা তো তার মা তাকে দিয়েছিল। কোনো অন্যায় করলে ভগবানের কাছে ক্ষমা চেয়ে লেখা চিঠি এই বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে মায়ের বালিশের তলায় রেখে আসত সমীর  ,মায়ের হাসিমুখ ফিরে পাওয়ার এটা ই ছিল তার একমাত্র উপায়। মা বলত, ক্ষমা মন থেকে না চাইলে ,সেই বাক্স নাকি চিঠির কথা বদলে দেয় যাতে ভগবান দ্বিগুন রেগে গিয়ে ,দোষীর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কেড়ে নিতে পারে। সে কথা সত্যি না মিথ্যা ,তা পরীক্ষা করার সাহস , সমীর কখনো জুটিয়ে উঠতে পারেনি। বাক্স টা  আলমারি থেকে দ্রুত নামিয়ে ফেলল সে,তার আঙ্গুল বাক্স খোলার মুখস্থ নম্বর পরপর টিপে দিল   ‘৯২৯০’, প্রত্যাশিত মতই বাক্সের তালা বেঁকে গিয়ে খুলে যাওয়ার চেনা ইঙ্গিত দিল   , কাঁপা হাতে বাক্সে রাখা চিঠিটা  খুলে ফেলল সমীর ,

শ্রীচরণেশু প্রসূন বাবু ,

এই বাক্স টাই  একমাত্র  আমার এই চিঠির ভার বহন করতে পারত , সে রহস্য  না হয় একটা ছোট্ট  ছেলে  আর তার মার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাক। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর  হাতে ,আপনি যখন স্কুলের দরজায় পাওয়া একটি অজ্ঞাত পরিচয় শিশু কে তুলে দিয়েছিলেন, আপনার মত মানুষকে চেনার অক্ষমতা , সেই সাধারণ হতভাগ্য মেয়েকে ভাবতে বাধ্য করেছিল,  সকলের অগোচরে করা নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্য করতেই আপনি এই দায়ভার স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছেন । অন্যের সংসারে বড় হওয়া অনাথ মেয়েটির, আর কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না বলেই ,মুখ বুজে সেদিন সে মেনে নিয়েছিল আপনার ব্যাভিচার, কিন্তু তার মনের মধ্যে ওঠা নিদারুন বিদ্রোহের আঁচ টের পেতে ,আপনার মত বিচক্ষণ মানুষের যে অসুবিধা হবে না সেটাই ছিল প্রত্যাশিত , সে সত্যি  উপলব্ধিতেই সময়ের সাথে , সেই মেয়ে এবং তার সংসার থেকে আপনি নিজের অস্তিত্বকে নিপুন হাতে সরিয়ে নিয়েছিলেন । তারপর দিনরাত নিজের ভগবান আর ভাগ্যকে দোষারোপ করলেও, মেয়েটি তার দায়ভার কিছুতেই সেই অজ্ঞাত পরিচয় অসহায় শিশুটির  উপর চাপিয়ে দিতে পারেনি , অনিচ্ছা সত্তেও শিশুটির  হাসি কান্না , স্নান , খিদের হিসেব নিকেশই হয়ে উঠেছিল তার একলা জীবন যাপনের একমাত্র অভ্যাস । তার কিছু দিনের মধ্যে, হঠাৎ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে যখন নিজের সন্তান ধারণের অক্ষমতার নিষ্ঠুর সত্যি তার সামনে এলো  , তখন  ওই  ১ বছরের শিশুই হয়ে উঠলো তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ ও সম্বল। আপনার দেওয়া শাস্তির দহনে অহর্নিশ জ্বলতে থাকা বোকা মেয়েমানুষ , এরপর তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছিল , সেই শাস্তি শত গুনে আপনাকে ফিরিয়ে দিতে ,আপনারই  দেওয়া সন্তানের ওপর আপনার সকল অধিকার সে অস্বীকার করে বসলো , আপনার রাখা ‘দিগন্ত’ নামটিও সে সকলের অজান্তে  সরকারী কাগজ থেকে মুছে দিয়ে ,নিজের দেওয়া নাম ‘সমীর’ লিখে দিয়েছিল । তারপরও সময়ে অসময়ে আপনার ছায়া সে তার সন্তানকে  মাড়াতে দিতে চায়নি, আপনি ভগবানের মতই নির্বিকার আর অন্তর্যামী ,তাই বোধহয় যে বাড়িতে সে ছেলে বড় হয়ে উঠছিল ,পারতপক্ষে সেখানে নিজের ছায়া আপনি পড়তে দিতেন না । নিজের বাবার বিরুদ্ধে ছেলের মনে  বেড়ে ওঠা বিরূপ মনোভাব ,সেই মেয়েটির নিরন্তর বিবেক দংশনের কারণ হলেও ,তার  ভিতরের মায়ের একছত্র অধিকার হারানোর ভয়ের কাছে ,সে দংশন কোনদিন মাথা তুলে দাড়াতে পারেনি । দীর্ঘ ২৫ বছর পর সেই স্থুল বুদ্ধি মেয়েমানুষের এটুকু বোঝার ক্ষমতা হয়েছিল যে, আপনার স্ত্রী  হিসেবে নিজের পরিচয় দেবার কোনো যোগ্যতাই তার  নেই , তাই নিজের শরীরে বেড়ে ওঠা ক্যান্সারের মত মরণ রোগের কথা জানিয়ে আপনার নিরলস সাধনার কোনো ব্যঘাত সে ঘটাতে চায়নি।  কিন্তু সাধেই কি বলি আপনি অন্তর্যামী! সকলের অগোচরে নিজের সর্বস্ব খুইয়ে ,শরীর মন ঢেলে তৈরী করা প্রানের চেয়ে প্রিয়  স্কুল বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন, সেই স্বার্থপর নিচ মনের মেয়ে মানুষের চিকিৎসার জন্য ! সেদিন যদি আপনার টেবিলে, ভুলে ফেলে  যাওয়া ওই কাগজ পড়ার বিদ্যে তার  না থাকত ,তাহলে তার  মৃত্যুও জীবনের মতই মূল্যহীন হয়ে যেত,পরম করুনাময় তাকে সেই ভয়ানক লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন  । আপনাকে বাঁধা দেওয়ার সামর্থ্য বা অধিকার কোনটাই তার ছিল না , তাই তার আত্মহত্যার সিদ্ধান্তই একমাত্র পারতো , এই চরম সর্বনাশ থেকে সমীরের মতন অজস্র হতভাগ্য শিশুর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে ,অন্য কোনো উপায় থাকলে তার  মত স্বার্থপর মা  নিশ্চই সেটাই বেছে নিত । আজ ক্ষমা চেয়ে আপনাকে আর  ছোট করার বোকামি সে করবে না , অন্যায় যতই অসহ্য ও  বেদনাদায়ক হোক, ভগবানের কাছে ক্ষমা করা ছাড়া যে আর কোনো পথই খোলা থাকে না, তা আমার থেকে ভালো আর কেউ জানে না। আমার ছেলেটার কোনো দোষ  নেই , সব তার হতভাগী মায়ের পাপের ফল , যদি পারেন তাকে  নিজের সান্নিধ্য থেকে আর বঞ্চিত করবেন না , সেজন্য যদি মায়ের সকল সত্যি তার ছেলের কাছে প্রকাশ করতে হয় ,জানবেন অভিমানী ছেলের দোষীজ্ঞানে ওঠা আঙ্গুলও  সেই  মৃত মায়ের আত্মা কে চির শান্তি দেবে, অধিকার ভাগ করে নিতে আজ আর তার ভয় করে না ।

ভালো থাকবেন ,

বিভা।

সমীরের চোখের জল চিঠির পাতাটা ভিজিয়ে দিতে লাগলো। তার মন কে শান্ত করার কোনো উপায়ই সে জানে না , যে দুটো মানুষ এই মুহুর্তে  তার মনের অবস্থা বুঝতে পারতো  তারা  দুজনের কেউই আর পৃথিবীতে  নেই , বাকি জীবন এই দায়ভার বহন করার শক্তি কোথায় পাবে সে !

হঠাৎ কাঁধে রাখা ছোট্ট হাতের ছোঁয়ায় সে চোখ মুছে ফিরে তাকালো , শঙ্কর হাসি মুখে দাড়িয়ে আছে তার সামনে , ঘড়িটা সমীরের হাতে দিয়ে শঙ্কর বলল ” আপনার ঘড়ি একদম ঠিক হয়ে গেছে ,আর আপনার সময় থেমে থাকবে না ! ”

সমীর অল্প হেসে বলল: ” ঘড়ির কাটা দিয়ে যদি সময়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করা  যেত,  তাহলে তো আজ আমি এভাবে সর্বস্ব হারিয়ে অসহায় হয়ে যেতাম না শঙ্কর! আমি যা বললাম তা তোমার বুঝতে হলে  ঘড়িকে আরো কিছু বছর চলতে হবে ,ততদিন তুমি  বরং মন দিয়ে পড়াশোনা কর , সময় হলে তোমাকে আমি আমার সাথে আমেরিকা নিয়ে যাব , ওখানে আরো পড়াশোনা শিখে অনেক বড় হবে তুমি  ,তোমার স্যারের বাক্স টায় যে আরো অনেক যন্ত্রপাতি আটবে , সেগুলো তো বিভিন্ন দেশ ঘুরে তোমাকেই খুঁজে পেতে নিয়ে ভরতে হবে ! ”

শঙ্কর অসম্মতি সূচক মাথা নেড়ে বলল : “না  ! আমাকে এখানেই থাকতে হবে ,নইলে… ! ”

সমীর অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল : “নইলে কী  ?”

শঙ্কর নিষ্পাপ হেসে উত্তর দিল , ” নইলে আমার দেশের বন্ধ ঘড়ি যে সবসময় বন্ধই থেকে যাবে ! অন্যের দেশে গিয়ে নিজের দেশের সময়কে থামিয়ে রাখা যে অন্যায় হবে ।”

নিরুত্তর সমীর জানলার দিকে তাকিয়ে তার  জল ভরা চোখ কে শঙ্করের থেকে আড়াল করে নিজের মনে বলল , “সুবিচার বোধহয় একেই বলে,এত সহজে শঙ্করের মনে স্বার্থের ছায়া পড়লে নিরলস পরিশ্রমে সে মানুষটার দেওয়া সকল শিক্ষাই যে মুহুর্তে ব্যর্থ হয়ে যেত।”

রমেশ কর্মকার একজন ভদ্রলোক কে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন । কাগজ পত্র হাতে সে ভদ্রলোক সমীরের দিকে তাকিয়ে বললেন , “আপনি কি প্রসূন আচার্য র উত্তরাধিকারী ?” সমীর শঙ্করের হাত টা নিজের হাতে নিয়ে বলল , “হ্যাঁ, তবে  শুধুই  আপনার আইনের চোখে ।যোগ্যতার বিচারে উত্তরাধিকারী বাছার দায়িত্ব ,সেই বিচক্ষণ মানুষটি নিজে হাতে পূরণ করে গেছেন ,সময় তাকে নিজের নিয়মে প্রকাশ্যে নিয়ে আসবে । ”

ক্যাসানোভা

Comments 3 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িটা স্টার্ট  দিল  সায়ন ! মেজাজ টা আজ একেবারে সপ্তমে চড়ে আছে তার। হাওয়ার বেগে পার্কিং লট পেরিয়ে সামনের বড় রাস্তা ধরে নিল সে  ! শেষে মালিনী ও ? একটা নয় ,২ টো নয় ,চার চার টে সম্পর্কের একই রকম পরিণতি  ! ‘কাকতালীয়’ শব্দ টা কোনো ভাবেই আর তার মনকে শান্তি দিতে পারছে না।  তবে কি নিখিলের কথাই ঠিক ? সে নিজেই দায়ী তার জীবনে বার বার  ঘটা এই ব্যর্থতার জন্য ?

তার প্রথম প্রেমিকা নীলিমা , ক্লাস ৯ এ পড়া মেয়েটার লম্বা চুলের বেণীর হেলদোলের সাথে  সাথে উথাল পাতাল হয়ে যেত সায়নের  মন।ছেলেদের জন্য রুদ্ররূপ আর মেয়ে দেখলেই মিন মিনে বিড়ালসুলভ স্বভাবের জন্য  অজিত স্যার কে ক্লাসের অন্য সকল ছেলেদের মতই  কিছুতেই সহ্য করতে পারতো না সায়ন ,তবুও তার কাছেই ভূগোল পড়তে ভর্তি হয়েছিল  শুধুমাত্র  স্কুলের পরে নীলিমাকে আরো কিছু সময় দেখতে পাবে বলে , এর জন্য বন্ধু মহলে একেবারে একঘরে  হয়ে গিয়েছিল সে। নীলিমা কিন্তু তার এই মহান ত্যাগের অমর্যাদা করেনি, সায়নের প্রেম প্রস্তাবে মুহুর্তে সম্মতি জানিয়েছিল।কিন্তু সে বয়সের বাকি ছেলেদের মতই তার বোঝার শক্তি ছিল না যে প্রেম পাওয়ার আগের বলিদানের চেয়েও তার পরের হিসেব অনেক  বেশী জটিল । তাই ১৫ ই আগস্টের দিন , নীলিমার সাথে ঘুরতে যাওয়ার থেকেও সায়নের কাছে পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলাই বেশী গুরুত্ব পেয়েছিল,তারপর হারানো বন্ধু মহল ফিরে পেতে অজিত স্যারের কোচিং এ  মাঝে মাঝেই সে তার টিকি দেখাতো না আর  নীলিমার প্রশ্নের উত্তরে দিয়ে দিত একঘেয়ে সাজানো অজুহাত।ব্রিটিশ দের অগোচরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা সিপাহী বিদ্রোহের মতই ,সায়নের অজান্তে বেড়ে ওঠা নীলিমার মনে ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ পরিণাম লাভ করলো মাধ্যমিকের রেসাল্টের  মহা সন্ধিক্ষণে,সেই পরিণাম কে সহজ করে দিয়েছিল সায়নের ভূগোলে পাওয়া মাত্র ৫২ নম্বর।তার পর  বেথুনে সাইন্স নিয়ে ভর্তি হওয়া মেয়ে তার মত কমার্স পড়া ছেলের দিকে যে ফিরেও চায়নি তা বলা বাহুল্য ! এরপর থেকে সায়ন ঠিক করে নিয়েছিল আর যাই হোক লম্বা চুলের মেয়েকে আর কখনো সে তার জীবনে আসতে দেবে না , যত লম্বা বেণী ,তত জোরালো তার বিদ্রোহ!

সায়নের দ্বিতীয় প্রেমিকা শ্বেতা ,সুন্দরী বললে তাকে খুব কম বলা হয়। সায়ন কে যে তার কেন পছন্দ হয়েছিল এখনো তা ভেবে দু তিন ঘন্টা সায়ন অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারে।শ্বেতার ভালবাসার স্বাদ বোঝার অবকাশ সে কখনো পায়নি ,অন্যের দৃষ্টি থেকে তার সৌন্দর্যকে বাঁচাতে সে এতোটাই  ব্যস্ত থাকতো  যে , ‘প্রেমিক’ থেকে ‘দেহরক্ষী’ পদেই  তাকে বেশী মানাতো। সেই একই উপলব্ধিতে শ্বেতা পথ বদলালে সায়ন মা কালীর দিব্যি খেয়ে শপথ করেছিল ,পৃথিবী এদিক থেকে ওদিক হয়ে যাক ,অতি বড় সুন্দরীর ছায়া আর সে ভুলেও মাড়াবে না ।

এরপর একেবারে জাত ধর্ম খুইয়ে ইংলিশ অনার্স পড়া পাঞ্জাবী মেয়ের প্রেমে হাবু ডুবু খাওয়ার কিছুদিন পরই সায়ন বুঝলো বাঙালি পেটে রোজ রোজ পরোটা হজম হওয়াটা বেশ মুশকিল। তাছাড়া কাহাতক আর ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দীতে প্রেমালাপ সম্ভব ! রাগিনীর বাংলা শেখার চেষ্টা দেখে প্রথম দিকে সায়ন বেশ খুশিই  হয়েছিল কিন্তু  একদিন যখন  রাগিনীকে  ‘অপ্রত্যাশিত ‘ শব্দের  মানে বোঝাতে  ইংলিশ সমার্থক কিছুতেই তার মনে আসছিল না , তখনই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল , তার পেটের বিদ্যার ঘটি রাগিনীর সামনে উল্টে যাওয়ার আগেই তাকে মানে মানে সরে পড়তে হবে।তার মন ও বুঝতে পেরে গিয়েছিল বাঙালী জাতের বাইরের সৌন্দর্য তাকে দূর থেকে দেখেই উপভোগ করতে হবে ।

চাকরী জীবন শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মালিনীর সাথে তার আলাপ। মেয়েটা দেখতে শুনতে সাধারণ হলেও আশেপাশের বেশীর ভাগ মেয়ের থেকে অনেক বেশী আধুনিক।মালিনীর হাসিখুশি খোলামেলা স্বভাব খুব অল্প দিনেই তাকে সায়নের খুব কাছে এনে দিয়েছিল। অফিসের পরও তার সাথে ফেসবুক ওহাটসআপে অহর্নিশ চ্যাটের পর , সায়নের  কিছুদিন ধরে  মনে হতে শুরু হয়েছিল মালিনীর জীবনে কোনকিছুই আর তার অজানা নয়। আজকে অফিসে নিচের তলায় বসা অতনু ,চা খেতে খেতে সায়নের ডেস্কে  এসে নিজের মোবাইল ফেলে যাওয়ায় , তার ফোনে আসা নতুন ম্যাসেজের ওপর না চাইতেও সায়নের চোখ পড়ে গিয়েছিল। সেই ম্যাসেজে  লেখা ভালবাসার কথার সাথে একটু আগে সায়নের পাওয়া ম্যাসেজের কথার মধ্যে হুবহু মিল , দুটো ফোনে ম্যাসেজ প্রেরকের মোবাইল নম্বরের   ১০ টা সংখ্যার মধ্যেও কোনো তফাৎ নেই  । মালিনীকে এই নিয়ে প্রশ্ন করে যে কোনো লাভ নেই তা সায়ন জানে ,জগৎ সংসারে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল পুরুষই মালিনীর বন্ধু,এরপরও প্রশ্ন করলে লাভের লাভ যা হতো  ,সায়নের চরিত্র বিবরণে আরো একটা বিশেষণ বাড়তো  :”সন্দেহবাতিক !” যাইহোক, মালিনীর মত আধুনিক মেয়ের সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ,তার মত ছাপোষা রক্ষনশীল ছেলের যে মানায় না তা সায়ন এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে।

বৃষ্টি জোরে শুরু হওয়ায় গাড়ির গতিবেগ একটু কমিয়ে দিল সায়ন। গাড়িতে গান বাজছে  ‘রহেনে দো ছোড়ো ভি যানে দো ইয়ার ,হাম না করেঙ্গে প্যেয়ার !’ না ! না ! অনেক হয়েছে ,আর নয় , এবার শুধু মন দিয়ে কাজ করবে সায়ন ।  প্রেম ট্রেম সবার জন্য নয় , চেষ্টা তো কম করেনি সে ,আর সম্ভব না , ব্যর্থতার স্মৃতির ভারে সত্যি সে খুব   ক্লান্ত  , সময় হলে ,বাবা মা যাকে দেখে দেবে ,চোখ বুজে তার গলায় মালা দিয়েই  বংশের চোদ্দ পুরুষকে উদ্ধার করবে,এই তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। প্রেমের ফাঁদে আর যেই পরুক সায়ন কর্মকার আর পরবে না! যতসব ফালতু সময় নষ্ট,প্রেমিকার উপহারের পিছনে ব্যয় হওয়া টাকা থাকলে আর কিছু না হোক, একটা Apple র ল্যাপটপ হয়ে যেতো সায়নের ,শুধু ল্যাপটপ বললে ভুল হবে ,iphone ipod ,ipad ,আরো যাবতীয় ‘i’ মার্কা জিনিস কিনে বাড়িতে পুরো আপেল গাছ লাগিয়ে ছাড়ত সে ।

হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের আলোতে দেখতে পাওয়া একটা হাত সায়নের ভাবনাতে লাল আলো দেখালো ! গাড়িটা রাস্তার পাশে নিয়ে গিয়ে দাড় করালো সায়ন ! বন্ধ গাড়ির সামনে দাড়ানো মেয়েটাকে সায়ন খুব ভালো করে চেনে , তার অফিসের পুরুষ মহলে ভীষণ পরিচিত নাম ‘নিধি আগারয়াল’, যেমন ডাকসাইটে সুন্দরী তেমনি  স্মার্ট , শরীর জুড়ে আধুনিকতার অলংকার সৌন্দর্য বিবরণের সকল বিশেষণকে একসাথে অস্থির করে দেয়।গাড়ির জানলার কাঁচের কাছে মুখ এনে মেয়েটি বলল , “My car suddenly broke down ,সামনে এক ট্যাক্সি স্ট্যান্ড হ্যায় , if you can drop me there I will be really grateful to you !”

সায়নের অজান্তেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো শব্দগুলো, “offcourse mam , Please get in my car !”

পাশে বসা নিধি আগারওয়ালের কোমর অব্দি লম্বা চুলের বৃষ্টি ভেজা জল সায়নের গাড়িকে স্নান করিয়ে দিল প্রায়।অলোকিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ তার ভিতরের পুরুষ সে ক্ষুদ্র  ক্ষতির কথা ভেবে  বেশীক্ষণ সময় ব্যয় না করে বলল ,”You live in tollygunge right ? I also live nearby ,I can drop you home.As the rain is heavy ,it will be difficult to get taxi now and Kolkata is not at all safe now a days  “.

নিধি আগারওয়াল কৃতজ্ঞতার হাসি মেখে বলল , “No Thanks is enough for you ,my phone battery was also dead ,I was so tensed … “

টালিগঞ্জ থেকে ব্যারাকপুর ফিরতে কত রাত হবে তার হিসেব করে নিয়ে ,সময় টা জানিয়ে দ্রুত বোনকে একটা sms করে দিল সায়ন আর বলে দিল তার দেরী দেখে মা যেন  চিন্তা না করে , অফিসে অনেক কাজ ,ডেডলাইন মিটের আজই শেষ দিন।

তারপর গাড়ি স্টার্ট করে তার প্রিয় গানটা চালিয়ে দিল সায়ন। বাইরে বৃষ্টির তালে গাড়িতে গান বাজছে ,”আব মুঝে রাত দিন তুমহারা হি খেয়াল হ্যয় !” সোনু নিগমের গলা আর নিধি আগারওয়ালের সৌন্দর্য ,এই অভূতপূর্ব সংমিশ্রণে তার মন এখন অতীতের সব ব্যর্থতার স্মৃতি ভুলে একটাই চেনা ডায়লগ বার বার আওরাচ্ছে : “পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত !”

মেকআপ কান্ড

Comments 5 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

নাম করা লেখক শিশির সান্যালের লেখাটা প্রায় শেষের মুখে , হঠাৎ তার ৭ বছরের মেয়ে পান্না একটা ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকে বলল ,

“বাবা তোমাকে সাজিয়ে দেব ? “

শিশির সান্যাল অল্প হেসে বললেন , ” আজ নয় মা ,কাল আমার একটা জরুরি সম্মেলন আছে !”

পান্না বলল , ” কাল তো অনেক দেরী ! মা র ‘ক্লিন এন্ড ক্লিয়ার ‘ ফেস ওয়াশ টাও তো ব্যাগে নিয়ে এসেছি, একটু পরে তুমি  বেসিনের সামনে চোখ চেপে বন্ধ করে  দাড়িও ,আমি এক মিনিটে সব তুলে দেবো।  “

পান্নার বাবা হেসে বললেন , ” সে তো বুঝলাম ,কিন্তু আগের দিনের মত নেল পালিশ না উঠলে এই ভ্যাবসা গরমে কাল আমায় বুট জুতো পরে যেতে হবে মা গো , আর হাত দুটোও যে পকেট থেকে কোনমতেই বার করা চলবে না ! “

পান্না ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট সাদা শিশি বার করে  বাবার সামনে ধরে  বলল , ” এটা কী ? “

পান্নার বাবা , ” কী বলতো মা ! ? “

পান্না :  ” ধ্যুত ! তুমি কিচ্ছু জানো না , এটা হল নেলপালিশ রিমুভার , আর তোমাকে আঙ্গুল দিয়ে ঘষে ঘষে নেলপালিশ তুলতে হবে না ,  মা যখন সকালে সোফায় বসে নেলপালিশ তুলছিল ,আমি দুধ খেতে খেতে আড়চোখে সবটা দেখে নিয়েছি।

পান্নার বাবা : ” বাহ্ , তাহলে তো ইচ্ছাপূরণের পথে আর কোনো সমস্যাই রইলো না , শুধু খেয়াল রাখিস , আগের দিনের মত ক্রিম বা পাওডারের কৌটো যাতে শেষ না হয়ে যায় ,তাহলে কিন্তু মায়ের ‘দুম দুম’ থেকে তোকে বাঁচানো টা এবার সত্যি কঠিন হবে।

পান্না হেসে বলল , ” আচ্ছা । “

শিশির সান্যাল ছোট্ট হাতের আরামে বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়েই পড়েছিলেন , হঠাৎ  পান্নার ধাক্কায় তার ঘুম ভাঙ্গলো ,

সে আদো স্বরে বলছে , ” আইলাইনার  অনেকক্ষণ শুকিয়ে গেছে  বাবা ! আর তোমাকে চোখ বুজে  থাকতে হবে না !”

শিশির সান্যাল বিছানায় উঠে বসে হেসে বললেন , “তা এখন কি পান্নার বাবাকে তার মায়ের মত লাগছে নাকি আরো সময় লাগবে ?”

পান্না তার মুখের সামনে আয়না ধরে বলল , ” শুধু শুয়েছিলে বলে ঝুটি টা একটু বেঁকে গেছে ! “

ঠিক এই সময়ে লাবণী সান্যাল ঘরে ঢুকে বললেন , “একি করেছিস পান্না ?”

শিশির সান্যাল  বললেন , ” আহা ! পান্নাকে আমিই বলেছিলাম ! তোমার যে রোজ সাজতে ইচ্ছা করে আর আমি একদিন সাজলেই দোষ  ? নিজের চারিদিকে তাকিয়ে দেখো , ‘নারী পুরুষ সমান সমান’ রবে পুরুষ রাও কেমন গলা মিলিয়েছে ,শুধু গলা বললে ভুল হবে যদিও ,কান -নাক- গলা -হাত-চোখ প্রতিটা অঙ্গই তাদের নানা বিভূষণে সেজে উঠেছে।”

লাবণী সান্যাল বললেন , “বাহ্ ! তাহলে তো আর কথাই নেই , দেরী না করে আজকেই পার্লারে গিয়ে ,নাক কান ফুটিয়ে ষোলো কলা পূর্ণ করে ফেলো ! যেমন বাপ তার তেমনি মেয়ে ! আর এই খালি কৌটোগুলো তুমি বরং কালির দোয়াত কোরো ,আমার ড্রেসিং টেবিলে নতুন কৌটো যেন কালকের মধ্যে পৌঁছে যায় !

শিশির সান্যাল : ” সে না হয় পৌঁছে যাবে ,তা তুমি কি আমাকে  কিছু বলতে এঘরে এসেছিলে  নাকি ড্রেসিং টেবিলে নিখোঁজ উপকরণের খোঁজ করতে করতেই তোমার এই অকস্মাৎ আবির্ভাব  ?

লাবণী সান্যাল আরো রেগে গিয়ে বললেন , ” ভৌমিক পাবলিশারের তরফ থেকে একজন ভদ্রলোক তোমার সাথে দেখা করতে এসেছেন,তাই বলতেই আসতে হলো ! নাহলে তোমার আর তোমার গুনধর মেয়ের কীর্তিকলাপ দেখা ছাড়াও, সংসারে আমার অনেক কাজ আছে !”

শিশির সান্যাল ব্যস্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে বললেন , “ওহ ! আমি তো একদম ভুলেই গিয়েছিলাম !” তারপর তাড়াতাড়ি বেসিনের সামনে গিয়ে মুখ ধোয়ার পরও মেকআপ অপরিবর্তিত দেখে চিন্তিত হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকাতেই লাবনী সান্যাল বললেন ,”আমার দিকে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই , এ জিনিস ১৬ ঘন্টার আগে উঠবে না , এগুলো ইমপোর্টেড লং লাস্টিং কসমেটিকস পতিদেব,তোমার হাতের  ফেস ওয়াশ এর টিকিটিও বাঁকাতে পারবে না ! “

শিশির সান্যাল  কাঁচু মাচু মুখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন , “তাহলে এবার কী  হবে ? পাবলিশার ভদ্রলোকের সাথে দেখা করা যে খুব জরুরি ! “

লাবণী সান্যাল : ” সে বরং পান্না কেই জিজ্ঞেস করে দেখো !”

শিশির সান্যাল : “আহা ! ও বেচারী  কে আর এ বিপদের মধ্যে টেনো না , কিছু  একটা উপায় বল লক্ষীটি ,আমার যে দেরী হয়ে যাচ্ছে ।”

লাবণী সান্যাল দ্রুত পায়ে ঘর থেকে একটা ক্রীম আর তুলো এনে বললেন , “এটা দিয়ে চেষ্টা করো ,পুরোটা না হলেও কিছুটা উঠবে !”

১৫ মিনিটের চেষ্টায় মুখ টা  কিছু টা  পরিস্কার হলো ঠিকই  কিন্তু কিছু জায়গা ঘষায় ঘষায় একেবারে লাল হয়ে এসেছে , জায়গা গুলোতে বরফ ঘষে নিয়ে শিশির সান্যাল মুখ মুছে আয়নায় দেখলেন ,এত চেষ্টার পরও ঠোঁটে এখনো লিপস্টিকের হালকা প্রভাব লেগে আছে, মুখ জুড়ে অস্পষ্ট মেকআপের সাদা  দাগের মাঝে কিসব যেন চিকমিক করছে ,আইলানার  দাগ টা পরিস্কার না বোঝা গেলেও কালো ভাবটা একেবারেই দূর হয়নি। আবার একবার মুখ টা ধোবেন ভাবছিলেন তখনি লাবণী সান্যাল এসে বললেন , “আমি চা দিতে গেছিলাম ,ভদ্রলোক বলছিলেন ওনার আরো কোথাও একটা যেতে হবে, তাই বেশীক্ষণ বসতে পারবেন না  !”

শিশির সান্যাল ব্যস্ত হয়ে বললেন , ” আচ্ছা ,আমি যাচ্ছি এখনি !”

ড্রয়িং রুমে ঢুকে বসে থাকা ভদ্রলোক কে নমস্কার করে শিশির সান্যাল বললেন , ” ক্ষমা করবেন সুকান্ত বাবু ,আপনার অনেক সময় নষ্ট করে দিলাম !”

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ অবাক হয়ে শিশির সান্যাল কে দেখে ,তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে অমায়িক হাসি মেখে বললেন , ” না না ! সে ঠিক আছে , তা যেটা বলতে এসেছিলাম সেটা হলো , আপনার নতুন উপন্যাস টা আমরাই ছাপাবো , আর কারো সাথে যোগাযোগ করা অপ্রয়োজন ! এবারের অন্য স্বাদের গল্প টা মনে হচ্ছে একেবারে বেস্ট সেলার হবে মশাই ! শুধু  নতুন গল্পের অনুপ্রেরণা সম্বন্ধে একটু জানার জন্য এসেছিলাম , শুরুতে সে বিষয়ে একটু না লিখলে পাঠকের আগ্রহের ওপর অবিচার করা হয় , আসলে আপনার আগের উপন্যাসে নিজের ছোটবেলার অভিজ্ঞতার ছাপ ছিল কিন্তু  এই উপন্যাস টা তো একদম অন্যরকম তাই ….. কিন্তু আর তার দরকার নেই , লেখকের কল্পনার উৎস, জীবন্ত বাস্তব হলে আলাদা করে অনুপ্রেরনা কলম মিথ্যাই সময় নষ্ট  ব্যতীত কিছু নয় , সে কল্পনা পাঠকের জীবনের বাস্তবের সাথে মিল খুঁজে পাক অথবা লেখকের নিজের , সে সত্যি মিথ্যার দায়ভার প্রকাশকের না নেওয়াই ভালো ,বুঝলেন কিনা ! হে হে হে ! “

শিশির সান্যাল  বললেন , ” সুকান্ত বাবু  …..”

তাকে শেষ করতে না দিয়েই ভদ্রলোক বললেন  : ” ভয় নেই মশাই , অনুপ্রেরণার কলম উঠিয়ে এবার উৎসর্গ কলম দিয়ে দেব ভাবছি ! তা কাকে উৎসর্গ  করতে চান আপনার নতুন উপন্যাস ?”

শিশির সান্যাল  বললেন : “আমার মেয়ে ,পান্নাকে। “

ভদ্রলোক  : “তা বেশ বেশ ! তাই কথা রইলো তাহলে ,এবার আসি বুঝলেন ! আমার আবার একবার ব্যাঙ্কে যেতে হবে , আপনার আগাম টাকা টা আমি খুব তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেবো ! “

ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর , নেলপলিশ রিমুভার দিয়ে বাবার হাতের নেলপালিশ তুলতে ব্যস্ত থাকা পান্নার পাশে বসে লাবনী সান্যাল বললেন , ” ভদ্রলোক অনুপ্রেরণা কলম টা বাদ দিয়ে দেবে বলল কেন গো ? আর কীসব জীবন্ত বাস্তব ,জীবনের সাথে মিল , সত্যি মিথ্যার দায়ভার ইত্যাদি ইত্যাদি বলছিল ,বাইরে থেকে শুনে আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না,তোমার নতুন উপন্যাস টা  কিসের উপরে গো?”

শিশির সান্যাল হেসে বললেন  :  “জীবনের মাঝামাঝি  পৌঁছে  একজন পুরুষের লিঙ্গ পরিবর্তনের অদম্য ইচ্ছা আমার নতুন উপন্যাসের প্রধান বিষয়।  এখন আর নিশ্চই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না অনুপ্রেরনা কলমের জায়গা কেন ‘উৎসর্গ ‘নিয়ে নিল !”

ধন্যবাদ ,

BongNote

বাস্তব কল্পনা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

শিকাগো থেকে কলকাতার একটানা লম্বা সফর প্রায় শেষ , আন্তর্জাতিক প্লেনটা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস এয়ারপোর্টে নামার আগে iphone এ মুখ গুঁজে পাশে বসা ছেলেটিকে ভদ্রলোক বললেন ” সানি! ফোন টা রেখে একবার জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দ্যাখ!”

ছেলেটি ফোন থেকে মুখ না তুলেই নির্বিকার ভাবে জিজ্ঞেস করল : ” What ? I mean কী দেখবো ?”

ভদ্রলোক বললেন “এ যে বড় আপনার জিনিস বাবা! তোর নিজের দেশ , নিজের শহর !”

ছেলেটি নিজের নীল রঙের পাসপোর্ট টা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে বলল ” Its yours , I left my country 16 hours back to waste my summer vacation in this bloody place only because of you ! “

কথাটা শুনে ভদ্রলোক ক্ষনিকের জন্য চমকে উঠলেন , পরক্ষনেই স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন ” শুনলে তো কি বলল ?”

ভদ্রমহিলা শান্ত গলায় বললেন ” ওত emotional হবার কিছু হয়নি , যেকোনো মা নাড়ির টানে শুধু নিজের সন্তানদেরই বাঁধতে পারে, কলকাতাও তার ব্যতিক্রম নয় , ১৪ বছরের আমেরিকার নাগরিককে বাঁধার মত সাধ্য কোথায় তার !”

ভদ্রলোক : তোমাকে বার বার বলেছিলাম ওকে নিয়ে আসার দরকার নেই , এখন যদি বাড়ির লোকের সামনে এসব বলতে থাকে ,তাহলে কি হবে একবার ভাবো দেখি !”

ভদ্রমহিলা রেগে বললেন : কি কথা ! নিয়ে আসার দরকার নেই ! তা কি করতে শুনি? মেম দের কোলে শুয়ে দিয়ে আসতে আমার পেটের ছেলেটাকে ? ১ দিন বা ২ দিনের ব্যাপার হলে তাও বুঝতাম ,পুরো একটা মাস ! সানি একদিন বাড়িতে দেরী করে ফিরলেই, আমার দিকে তোমার চাওনি দেখে তো মনে হয় তোমার বারণ করা সত্তেও মিশিগান লেকে ভাসতে থাকা অন্যের ছানা কে পুষ্যি করার ভুলের কৈফিয়ত চাইছো! গত এগারো মাস ধরে ,ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে দু দন্ডের শান্তির অপেক্ষা, তোমার আমেরিকান ছেলে না বুঝলেও আমি তো বুঝি নাকি ! তাই আমি চাইনি আমার ছেলের নাচন কোদনের চিন্তা , তোমার মায়ের হাতের মুড়ি ঘন্টের অমৃত সমান স্বাদলাভে ব্যাঘাত ঘটাক ! আর আমার ছেলের মুখের ১০ টা শব্দের মধ্যে ৮ টাই আমেরিকান অ্যাকসেন্টে উচ্চারিত ইংরাজী শব্দ যা মাঝে মাঝে তুমি নিজে বুঝতেই খাবি খাও,তাই সে কথা শুনে তোমার মা কাকীমাদের অভিমানের ‘চিন্তা’ র আগে ‘আকাশকুসুম’ বিশেষণ টা ভালো মানাবে।

এবার জানলার ধারের ছেলেটি, চোখ বুজে বসে থাকা ভদ্রলোককে বলল : I am sorry বাবা! You know me enough to understand that I dint mean to hurt you, I just hate crowd . Please stop talking with mom’s pic in public place , if any stupid indian people make fun of your true emotion and your american son cant keep his promise ‘to be a gentleman at least for 1 month’, all of your anger will again point to my dead mom in no time. তোমার কথা অনুযায়ী , If I am bad its because she left us without performing her responsibility and if I am good then সেটা ভগবানের দয়ায়,what kind of logic is this ? its high time you should think differently. আমি জানি , I am not like that ,the way you want me to be , because I grew up in a completely different environment and circumstances, but কখনো নিজের সাথে আমাকে relate করতে পারলে বা আমার ভিতরে কোন ছোট কিছু ভালো লাগলেও মনে কোরো ,its only because you left no stone unturned to make me a good person . Just understand a simple thing বাবা ,whatever happens I cant let you go. আমি মা কে খুব ভালোবাসি ,ঠিক আগের মতই কিন্তু তোমার মত করে ভাবতে পারি না যে মা এখনো আমার কাছেই আছে। I am taught to be practical from very beginning ,তাই imagination power আমার নেই বললেই চলে, সেটা থাকলে বোধহয় ভিতরের কষ্ট টা অনেক টাই কমে যেত।
I understand your sufferings , তাই যখন তখন তোমাকে এভাবে মা র সাথে কথা বলতে দেখি , কেউ যেন আমার টেবিলে রাখা মা র ছবির উপর জমা ধুলো গুলো সরিয়ে দেয়.This one feeling worth everything I own ,সত্যি টা যাই হোক না কেন, at least you think মা din’t left us,she just cant . এবার চলো বাবা , প্লেন থেকে নামতে হবে আমাদের ,আমি আস্তে আস্তে হ্যান্ড লাগেজ গুলো নামাই ওপর থেকে ।

ভদ্রলোক আবছা চোখে স্ত্রীর ফটোর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন : এই না হলে বাঙালী মা ? ওত অল্প সময়ে নিজের আমেরিকান ছেলেকে কলকাতাকে ভালবাসতে না শেখাতে পারলেও যা শিখিয়েছো তা না থাকলে আমার ভিতরের মানুষটার বেঁচে থাকা যে আরো অনেক কঠিন হয়ে যেত । সানির কথা শুনে তার মা তো দেখেছি আনন্দে একেবারে আটখানা ! চশমা ছাড়াই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে , ছেলের ভালোবাসা শেষ পাতে মুসুরির ডালের মত সুরুত সুরুত শব্দে চুমুক দিয়ে খাওয়া হচ্ছে !

হাত খরচ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

রবিবার সকালবেলা দুধের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বিতান বলল : মা ! ‘ হাত খরচ’ মানে কি ? দাদাভাই আজ সকালে বাবার ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমাদের গাড়িটা ধুয়ে চকচকে করে দিয়েছে বলে , আমি দেখলাম তুমি ওর হাতে ৫০০ টাকা দিয়ে বললে ‘এটা তোর হাত খরচ’ ।

স্নিগ্ধা লাহিড়ী তার ৮ বছরের মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন : নিজের হাতের মাপের প্রয়োজন গুলো মেটাতে লাগা খরচ কেই ‘হাত খরচ’ বলে।

বিতান নিজের হাত টা মেপে নিয়ে বলল : হাতের মাপের প্রয়োজন ? হাত টা তো মেপেছি কিন্তু সে মাপের প্রয়োজন টা কি মা ?

বিতানের মা হেসে বললেন : কাল বিকেলে বাবার সাথে ঘুরতে গিয়ে ফিরে আসার সময় তোর জামার পকেট টা ওরকম ফুলে ছিল কেন রে বিতান ? কি ছিল পকেটে?

বিতান মুখ নিচু করে হেসে বলল : এক্লেয়ার্স আর হজমী গুলি।

বিতানের মা বললেন : বুঝলাম। এবার বল , কাল দুপুরে আচার ওয়ালা কে জানলা দিয়ে দাড়াতে বলেও আবার একটু পরে চলে যেতে বললি কেন?

বিতান মন খারাপ করে বলল : কি করব ? বাবা যে ঘুমাচ্ছিল। আর আচার খেতে দেখলেই যে তুমি আমাকে বকো ।

বিতানের মা বললেন :বাবার ঘুম না ভাঙ্গিয়েও আচার টা তুই কাল কিনেই নিতে পারতিস বুঝলি বিতান ! যদি তোর কাছে থাকতো …..

বিতান উত্তেজিত ভাবে বলল : হাত খরচ ?

বিতানের মা হেসে বললেন : ঠিক তাই ! যদিও আমার থেকে কানমলা টাও তারপর তেঁতুলের আচারের মতই এক চোখ বন্ধ করে খেতে হত তোকে ।

বিতান হেসে বলল : আচ্ছা মা ! বাবার হাত তো আমার থেকে কত্ত বড় ,তাই বোধহয় বাবার ‘হাত খরচ’ ও অনেক বেশী তাই না ? তা না হলে আমি আর দাদাভাই যখন যা চাই ,তখনি বাবা তা কি করে কিনে দেয় ?

বিতানের মা : ‘হাত খরচ’ যে আমার বিতানের মতই ছোট্ট একটা মেয়ে, তাই সে শুধু নিজের আয়তনের ছোট্ট ছোট্ট প্রয়োজনই মেটাতে পারে, সে যখন বড় হয়ে যায় তার পুরনো নামে আর তাকে কেউ ডাকে না ,তখন একটা নতুন নাম হয় তার।.

বিতান : কি নাম মা ?

বিতানের মা : ‘রোজগারপাতি ‘। ‘হাত খরচ’ নামের নাগালের বাইরের প্রয়োজনগুলো মেটাতে হঠাৎ একদিন সে নতুন নামে এসে হাজির হয় । কী বুঝলি ?

বিতান : দাদার পাওয়া ৫০০ টাকা ‘হাত খরচ’ হলেও বাবার মানি ব্যাগের সব টাকা হল ‘রোজগার পাতি ‘। ঠিক বলেছি না ?

বিতানের মা হেসে বললেন : একদম ঠিক । তোর ‘হাত খরচ’ দিয়ে শুধু বাড়িতে বসেই এক্লেয়ার্স খাওয়া যাবে ,পূজোর ছুটিতে সবাই মিলে পুরীর সমুদ্রের ধারে বসে এক্লেয়ার্স খেতে হলে যে বাবার ‘রোজগার পাতি’ র সাহায্য লাগবে বিতান সোনা !

বিতান মুখ নিচু করে বলল : আমার কাছে তো হাত খরচ নেই , সে তো দাদাভাই এর কাছে আছে।

বিতানের মা বললেন : তুই চাইলে তোর কাছেও থাকতে পারে। তবে ‘হাত খরচ ‘ পেতে হলে দাদাভাইয়ের মত কাজ করতে হবে কিন্তু ,বিনা পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ, প্রয়োজন মেটালেও তা গ্রহণ কারীর জীবনে ‘পরিশ্রম’ আর ‘অর্থ’ দুটো শব্দকেই মূল্যহীন করে দেয়।

বিতান বলল : একটু সহজ করে বল না মা।

বিতানের মা হেসে বললেন : আজ যদি তুই বিনা পরিশ্রমে ‘হাতখরচ’ পেয়ে যাস, তাহলে কাল বাবা ঘুমিয়ে থাকলেও আচার কিনতে পারবি ঠিকই ,কিন্তু কাক ভোরে উঠে অত বড় গাড়িটা পরিস্কার করে ধুতে দাদাভাইয়ের যে কত কষ্ট হয়েছে তা যে তুই চেষ্টা করেও বুঝতে পারবি না বিতান , তাই এমনি পাওয়া হাতখরচটা যে শুধু তোর ‘আচার কেনার দাম’ বলেই মনে হবে যা তোর অজান্তে কখন দেখবি কেনা আচারের ভালো মন্দ স্বাদের সাথে হজম হয়ে গেছে ।

বিতান বলল : যদি দাদাভাইয়ের মত কাজ করে হাতখরচ পাই তাহলে ?

বিতানের মা : তাহলে একদম অন্যরকম হবে। আচারের স্বাদ খারাপ হলে তোর মন খারাপ করবে ,মনে হবে এর থেকে কত ভালো হত ওই টাকায় ২ টো এক্লেয়ার্স কিনলে বা তোর পছন্দের অন্য কিছু কিনলে ।

বিতান বলল : আর ভালো হলে ?

বিতানের মা : ভালো হলে তো আর কথাই নেই, পরিশ্রমের বিনিময়ে পাওয়া টাকায় কেনা স্বাদ তোর জিভে অল্প স্থায়ী হলেও মনের গভীরে হবে চিরস্থায়ী যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোকে কারণে অকারণে আনন্দ দেবে।

বিতান : তুমি যখন ছোট ছিলে, তখন বুঝি তুমিও দাদাভাইয়ের মত পরিশ্রম করে হাত খরচ পেতে ?

বিতানের মা : পেতাম বৈকি। আমাদের বাড়িতে গাড়ি ছিল না তবে হাত খরচ পাওয়ার অন্য অনেক উপায় ছিল। এই যেমন ধর মায়ের সাথে চাল বাছার সময় যটা কাঁকড় খুঁজে বার করতে পারব তটা ১০ পয়সা আমার লাভের খাতায় ,বেশী কাঁকড় ভরা চাল আনলে মা র কাছে বকা শুনে নগেন কাকার গোমড়া মুখ , আল্হাদে আমার ১০ পয়সার গুনতি দেখে মুহুর্তে হাসিতে বদলে যেত। মাছ কাটতে বসা কাকীমনি বাথরুমে গেলে ,মাছের গন্ধে আশেপাশে ঘুরঘুর করা বিড়ালের থেকে মাছ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পড়ত আমার ওপর , ১ মিনিট পাহাড়া দিলেই ১০ পয়সা, স্বাভাবিক নিয়মে মিনিটের সাথে পয়সার যোগফল ও বাড়তে থাকতো । সবচেয়ে বেশী মজা হত জ্যেঠুমুনির দেওয়া কাজে ।

বিতান : সেটা কি মা ?

বিতানের মা : জ্যেঠুমুনির মাথার প্রত্যেক টা পাকা চুলের দাম ছিল কুড়ি পয়সা ,তখন তো আর চশমা ছিল না ,একটা পাকা চুল তুলতে আমার ৫ সেকেন্ডের বেশী লাগতো না । হজমলা ,আচার ,রঙ বেরঙের কাঠি আইসক্রীম আরো যে কত কিছু নিজেও খেতাম বন্ধুদেরও খাওয়াতাম ,ট্যাক ভরা হাতখরচে আমি তো তখন একেবারে ডাকসাইটে বড়লোক যাকে বলে !

বিতান একটু চুপ করে থেকে বলল : মা ! একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল ,কাল তোমাকে কতবার বলব ভেবেও আবার ভুলে গেছি।

বিতানের মা : কি কথা রে বিতান ?

বিতান : কালকে যখন তুমি আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলে আমি তোমার মাথায় ৩ টে পাকা চুল দেখতে পেয়েছি,তুমি যদি বল তাহলে আজকেই সবকটা তুলে দিতে পারি ! মানে তোমার সুন্দর কালো চুলের মধ্যে ওগুলো একদম খারাপ লাগছে তো , তাই বলছিলাম আর কি !

বিতানের মা হেসে বললেন : দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়ার পর। প্রতিটা পাকা চুলে ৫ টাকা করে পাবি ,তবে মনে থাকে যেন চুল আধা কাঁচা থাকলে কিন্তু হাত খরচ ও অর্ধেক হয়ে যাবে।

দিদার বাড়ি

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বিকেল বেলা সমীক স্কুল থেকে ফিরে রানার বাড়ি গিয়ে বলল “কোচিং এ যাবার আগে আজকে আমাকে একবার দিদার বাড়ি ঘুরে যেতে হবে বুঝলি ! মা একটা জিনিস দিয়েছে ,সেটা দিতে। বলছিলাম কি রানা তুইও আমার সাথে চল ,ওখান থেকেই একেবারে আমরা কোচিং এ চলে যাবো।

ইতিমধ্যে রানার মা ঘরে এসে সমীক কে দেখে হেসে বললেন “তুমি কি খাবে সমীক?মিষ্টি ,নোনতা ,কোল্ডড্রিংক ,সরবত সব আছে কিন্তু।” সমীক বলল , ” কিচ্ছুনা কাকীমা , স্কুল থেকে ফিরে এইমাত্র ভাত খেয়ে এলাম ,পেটে একদম জায়গা নেই, পরের দিন যা দেবেন সব খেয়ে নেবো। ” রানার মা হেসে বললেন , ” আচ্ছা , তাহলে আর জোর করছি না , কিন্তু কথামত আরেকদিন এসে যা দেবো খেতে হবে কিন্তু। ” সমীক হেসে বলল ” হ্যা কাকীমা , সে আর বলতে ! “

ওরা দুজনে সাইকেলে বসে গল্প করতে করতে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌছে গেলো সমীকের দিদার বাড়ি। কলিং বেল একবার বাজতেই দরজা খুলে হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন একজন বৃদ্ধা ।সমীক কিছু বলার আগেই রানা বৃদ্ধাকে প্রনাম করে বলল “আমি সমীকের স্কুলের বন্ধু দিদা , সমীকের টিফিন বাক্স থেকে আপনার বানানো দারুন দারুন খাবার খেয়েছি সেই ছোটবেলা থেকে ,আজকে সমীকের জন্য আপনাকে অনেকদিনের দেখার ইচ্ছাও আমার পূর্ণ হয়ে গেলো। ” বৃদ্ধা রানার মাথায় হাত রেখে বললেন , “যারা বলে যে আজকাল কার ছেলেমেয়েরা একদম আলাদা ,ভালবাসা ও সম্মান তাদের কাছে বইয়ের পাতার শব্দ মাত্র ,তারা যে কতটা মিথ্যে কথা বলে, তা আমার থেকে ভালো বোধ হয় আর কেউ জানে না। ” তারপর সমীকের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন ,” এই যে সবেধন নীলমনি ,ভিতরে না এসে বন্ধুকে নিয়ে বুঝি এখানেই দাড়িয়ে থাকবি ? আমি জানি দিদার বাড়ির পুরনো দরজাটা বরাবরই খুব পছন্দ তোর ,বন্ধুর সামনে সমসময়ের মত আজকেও কি তাহলে কানটা ধরে ভিতরে নিয়ে যাবো ? ” সমীক হেসে বলল , ” আপনি আদেশ করুন মহারানী ,যাহা বলিবেন ,যতদূর বলিবেন আপনাকে ছায়ার মতন অনুসরণ করিব,সেই আদি অনন্ত কালের অভ্যাসমতই। ” বৃদ্ধা হেসে বললেন, ” তবে তাই করো আমার আজ্ঞাধারী মানিক জোড় ।”

রানা আর সমীককে ড্রয়িং রুমের সোফাতে বসিয়ে বৃদ্ধা বললেন ,”বস তোরা ,আমি আসছি এখনি। ” সমীক ব্যাগ থেকে দিদার জন্য মায়ের দেওয়া প্লাস্টিক বের করে সামনের টেবিলে রেখে রানাকে বলল ,”এবার হবে আসল মজা “। রানা কিছু না বুঝতে পেরে সমীক কে জিজ্ঞেস করতে যেতেই বৃদ্ধা একটা ট্রে হাতে ঘরে ঢুকলেন ,সেটা টেবিলে রাখতেই দুজনে দেখলো ট্রে তে রাখা আছে দু বাটি ভর্তি পায়েস ,অন্য দুটো প্লেটে রঙ বেরঙের মিষ্টির সাথে বিপুল পরিমান নিমকি রাশি। ” বৃদ্ধা ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন ,”আমি জানি তোরা স্কুল থেকে ফিরে খালি পেটে আমার বাড়ি আসিসনি ,তাই একদম অল্পই দিয়েছি,কথা না বলে খেয়ে নে চটপট ,আবার পড়তে যেতে হবে তো। ” রানা বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাওয়ায় সমীক ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল ,”কোনো লাভ নেই , এনার মত নির্দয়ী মহিলা ইহজগতে আর একটাও আছে বলে আমার মনে হয় না ,চুপচাপ যা পারিস যেভাবে পারিস খেয়ে নে , নাহলে আজকে এখানেই সারা রাত কাকুতি মিনতি তে কেটে যাবে তোর,সকাল হলে বুঝবি তার সবটাই ছিল পন্ডশ্রম। ” রানা এরপর আর কথা না বাড়িয়ে সামনে রাখা পায়েসের বাটিটা হাতে তুলে নিল ,আইঢাই পেট নিয়ে কষ্ট হলেও মনে মনে একটা কথা স্বীকার না করে সে পারল না ,ভরা পেটেও যে কোনকিছুর স্বাদ এরকম তৃপ্তি দিতে পারে তা সে আজকের আগে কোনদিনও উপলব্ধি করেনি।

ওবাড়ি থেকে বেরিয়ে কোচিং এর পথে চলার সময় রানাকে চুপ করে হাঁটতে দেখে সমীক বলল ,”কিরে রানা ,কথা না বলার সাথে তাড়াতাড়ি হজমের কোনো সম্পর্ক আছে বলে তুই জানিস নাকি ?” রানা এতক্ষণের জমা রাগ আর চেপে না রেখে সমীককে বলল ,”তোর এত খিদে ছিল যখন তুই আমাদের বাড়িতে কিছু খেলি না কেন ? আমার মা কে কেন এভাবে মিথ্যে বললি যে তুই খেয়ে এসেছিস ? ” সমীক হেসে বলল ,” ও এই ব্যাপার ! তোকে এখনি আমার মায়ের সাথে কথা বলিয়ে দিতে পারি যা তোর মিথ্যে সন্দেহ মুহুর্তে দূর করে দেবে ,তবে এটা সত্যি যে ভাত খাওয়ার আগে যদি আমি জানতাম যে আজকে আমাকে দিদার বাড়ি আসতে হবে তাহলে নিশ্চই ব্যাপারটা তোর ভাবনা মতই হত ,জেনে শুনে এত বড় মূর্খামি করার বয়স আর আমার নেই ,কিন্তু এমন মায়ের যোগ্য মেয়ে আমার মা ,টাইমিং নিয়ে সে কোনো ভুল করবেনা সেটাই তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত। ” রানা বলল , “তাহলে… তুই দিদাকে বাধা দেওয়ার ..মানে বোঝাবার একটা চেষ্টা পর্যন্ত করলি না,তাই ভাবলাম ….” | সমীক হেসে বলল ,”আজ না করলেও সেই ছোট থেকে অনেকদিন অনেকভাবে চেষ্টা করেছি বলেই আমি জানি ,হার যখন মানতেই হবে তা প্রথমেই মেনে নেওয়া ভালো ,বিনা যুদ্ধে জয়লাভের আনন্দে তার উজ্জ্বল মুখ আমার যাই যাই করা প্রাণ পাখিকে যেভাবেই হোক শিকল ঠিক পরিয়েই দেবে,কতবার যে দিদার টেবিলে রাখা জোয়ানের আরক শেষ মুহুর্তে আমাকে স্বর্গলাভের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করেছে ,তার হিসাব চিত্রগুপ্ত নিশ্চই অনেক চেষ্টা করেও শেষমেষ আর রেখে উঠতে পারেননি ।” রানা হেসে বলল , ” দিদা কি সবাইকেই এত এত খাবার ….” সমীক হেসে বলল “একদম! ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাড়িতে আসা সবাইকে। পাড়ার মাঠে খেলতে আসা ছেলেগুলো তেষ্টা পেলে দিদার বাড়ি আসলে, সেদিন আর তাদের বাকি খেলার মায়া ত্যাগ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না ,কোনমতে নিজেদের পেট নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেই জীবনের অসাধ্যসাধনের ব্যাপারে একটা নিদারুন আত্মবিশ্বাস তাদের বেশ কিছুদিন চনমনে করে রাখে। রানা হেসে বলল “সত্যি আজকাল কার দিনে এমন মানুষ….” তাকে শেষ করতে না দিয়েই সমীক বলল ,”জানিস রানা ,আমার দিদার বাড়িতে কোনো কাজের লোক নেই ,এই বয়সেও সব কাজ দিদা নিজের হাতে করে , মা অনেক বলেও কখনো কিছু বদলাতে পারেনি। দিদার মতে ওই ডাক্তারের লিখে দেওয়া অসুধ নাকি শুধু শ্বাস প্রশ্বাসই যা বন্ধ হতে দেয় না , মন কে ভালো রেখে শরীর কে বাঁচার মত বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র অসুধ হল কাজ ,ব্যস্ততাই মানুষকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সকল রকম অক্ষমতা ভুলিয়ে রাখতে পারে। তবে একটা মজার ব্যাপার আছে জানিস রানা ,দিদা একা বাজারে যায় ঠিকই ,রোজকার দরকারী জিনিসও কেনে আর সকলের মত কিন্তু দোকান থেকে ফেরার সময় দিদার হাতে কোনো জিনিস কখনো থাকে না ,থাকে দিদার পাশে হাঁটা অন্য কারো হাতে ,সে হাত পাড়ার চিন্টু,সবুজ,পাখিরও হতে পারে অথবা অজস্র অজানা হাতের মধ্যে কোনো একজনের যে দিদার সাথে একটা অলৌকিক বাঁধনে বাঁধা ..এ বাঁধন শুধু মিষ্টি নিমকি খাইয়েই হয় ভেবেছিস ? আমার মনে হয় ,এ হল পরকে আপন করার এক অকৃত্তিম কৌশল যা আয়ত্ত করতে হলে দিদার মতই জীবনকে লাভ ক্ষতির হিসেব নিকেশ থেকে একদম আলাদা করে ফেলতে হয় আর মনের ভিতর রাখতে হয় এক সীমাহীন ভালবাসার সমুদ্র ,যার ভাগ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সকলকে উজার করে দিতে থাকলেও তাতে কখনো কোনদিন এক বিন্দু ঘাটতি অতি বড় ভগবানের আতস কাঁচেও ধরা পরবে না।

জীবনের শেষ সময়

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

৪৫ বছর বয়সী অনন্ত চাটুজ্যে একদিন অন্য গ্রামে যাওয়ার পথে তার মৃত বন্ধু নির্মল বিশ্বাসকে উল্টো দিক থেকে হেঁটে আসতে দেখে কিছুটা ভয় পেয়েই বললেন ,” নির্মল তুই তো গত বছর কলেরায় …”

নির্মল বিশ্বাস অল্প হেসে বললেন : ঠিকই জানিস ,আমি এখন যমদূতের চাকরী করি ,সুনীল কর্মকারের স্ত্রী আর এক ঘন্টা বাদেই মারা যাবে ,অনেক দিন থেকে কষ্ট পাচ্ছিলেন ভদ্র মহিলা, আমি ওনাকে নিতেই আজ এসেছি।

অনন্ত চাটুজ্যে বেশ কৌতুহল পূর্বক বললেন : তাহলে এই নতুন চাকরীর দৌলতে তুই আগে থেকেই সব জানতে পারিস বল ,কার কবে মৃত্যু ?

নির্মল বিশ্বাস বললেন : হ্যা তা পারি বটে ,তবে সারা পৃথিবীতে অগনিত প্রাণীর মৃত্যু একজন যমদূত কি করে সামলাবে বল ,তাই আমাদেরও আবার রিজিওন ভাগ করা থাকে ,এই যেমন আমার দায়িত্ব আমার নিজের গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের কয়েকটা গ্রাম।

অনন্ত চাটুজ্যে এবার আশ্বস্ত হয়ে বললেন ” দ্যাখ নির্মল , পরলোক সম্বন্ধে জানার আমার বিন্দুমাত্র কৌতুহল নেই ,কোনদিন ছিলও না ,আমার যাবতীয় আকাঙ্ক্ষা এজীবনেই সীমিত ,কিন্তু তুই ছোটবেলার বন্ধু বলে তোর কাছে একটা আবদার রাখছি ,তুই নিশ্চই জানবি আমার কবে মৃত্যু হবে ,না না এখন বলতে হবে না ,এখন থেকেই মৃত্যুভয় আমার সাধের জীবনযাপনে বাধ সাধবে তা আমি চাই না ,তাই আমার মৃত্যুর অল্প কয়েক বছর আগে যদি আমাকে একবার ওয়ার্নিং দিস ,ঠিক তারপর থেকেই আমি যাবতীয় পুণ্য সঞ্চয় শুরু করে দেব ,এই ধর দান ধ্যান ,নামগান ইত্যাদি ইত্যাদি ,তাতে সুবিধা হলো এই যে ,শেষ কটা দিন ছাড়া বাকি জীবন টাও আমি আমোদ আল্হাদে কাটাতে পারবো আর এদিকে বিনা পুন্যে নরক বাসের কোনো ভয়ও আমাকে বিচলিত করতে পারবে না।

নির্মল বিশ্বাস হেসে বললেন: তোর আবদার শিরোধার্য করলাম ,সময় মত আমি নিশ্চই তোকে ওয়ার্নিং দেবো অনন্ত ,এখন আমি এগোই বুঝলি ,পরলোকে সময়ের অবমাননার শাস্তি বড়ই কঠিন ।

তারপর বহু বছর কেটে গেছে। নাতি নাতনী নিয়ে আশি বছর বয়সী অনন্ত চাটুজ্যের ভরা সংসার , এরকমই একদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই সে দেখলো তার বাল্যবন্ধু নির্মল বিশ্বাস হাসিমুখে তার মাথার কাছে দাড়িয়ে আছে। অনন্ত চাটুজ্যে বিছানায় উঠে বসে হেসে বললেন, ” বুঝেছি নির্মল ,তুই নিশ্চই আমাকে ওয়ার্নিং দিতে এসেছিস ? “

নির্মল বিশ্বাস অবাক হয়ে বললেন , ” না তো। আজ আমি তোকে পরলোকে নিয়ে যেতে এসেছি ,৫ মিনিট আগে যে তোর মৃত্যু হয়েছে। “

এ কথা শুনে অনন্ত চাটুজ্যে ভীষণ রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠে বললেন , “বিশ্বাসঘাতক ! আমি যে তোকে বলেছিলাম মৃত্যুর কয়েক বছর আগে আমাকে ওয়ার্নিং দিতে ,আমার যে কিছুই পুণ্য সঞ্চয় হল না ,বাল্যবন্ধুর নরকবাস দেখার ইচ্ছা তুই কিছুতেই সম্বরণ করতে পারলি না ,কি বল ?”

নির্মল বিশ্বাস অবাক হয়ে বললেন , “এ তোর কেমন অভিযোগ অনন্ত ?একবার নয়, আমি তো তোকে বহুবার ওয়ার্নিং দিয়েছি । “

অনন্ত চাটুজ্যে রেগে গিয়ে বললেন , ” পরলোকে গিয়েও তোর মিথ্যাচার কমেনি দেখছি। কবে দিয়েছিস তুই আমাকে ওয়ার্নিং ? আমি বৃদ্ধ হয়েছি ঠিকই কিন্তু স্মৃতিভ্রষ্ঠ হইনি এখনো। “

নির্মল বিশ্বাস শান্ত স্মরে বললেন, ” এই যে গত কয়েক বছর ধরে তুই বাতের ব্যথায় পঙ্গু ,চোখে ভালো দেখতে পাস না , চীৎকার না করলে কানে প্রায় কিছুই শুনতে পাস না ,একটাও দাঁত আর তোর অবশিষ্ট নেই , কিছু ধরতে গেলেই হাত কাঁপে,শরীরকে কোনরকমে চলনসই করতে ডাক্তারের দেওয়া পাতার পর পাতা প্রেসক্রিপশন , এসব ই যে সময় শেষের একেকটা ওয়ার্নিং।”

(এই গল্পটা ছোটবেলায় দাদুভাইয়ের কাছে শোনা ,আমি নিজের ভাষায় একটু অন্যভাবে লিখলাম। কেউ কেউ হয়তো শুনে থাকতে পারেন ,যারা শোনেননি ,আমার মনে হয় তাদের ভালো লাগবে।আমি যখন শুনেছিলাম তখন না হলেও আজ এই গল্পের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নির্মম সত্যি আমাকে সত্যি ভাবিয়ে তোলে , তখন নিজের অজান্তেই আরো বেশী করে আঁকড়ে ধরি আশেপাশের ভালবাসার মানুষদেরকে )

তিতাসের সুখের সন্ধান

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বার বার ফোনের শব্দে তিতাসের বিরক্তি যেন এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল! ফোন টা সাইলেন্ট করে ডেস্ক থেকে উঠে হাতে কফি নিয়ে করিডোরের জানলার সামনে দাড়ালো সে! সামনে রাস্তার অগনিত চলন্ত গাড়ি র দিকে তাকিয়ে তিতাসের মনে হলো সবকিছু যেন কিছুক্ষণের জন্য একদম থেমে যায় ,সবকিছু মানে সবকিছু !এই ব্যস্ত দৈনন্দিন জীবন ,আশেপাশে বসে থাকা মানুষ গুলোর অবান্তর বাক্যালাপ , তার জীবনের ওপর চারিদিকের এই নতুন প্রযুক্তির নিরন্তর টহলদারী ,সব কিছু থেকে যেন মুহুর্তের জন্য হলেও মুক্তি চায় তিতাস!

হঠাৎ বর্ণালী দি তার পিঠে হাত রেখে বলল ” কিরে তিতাস! এখানে একা একা দাড়িয়ে আছিস যে ? মন খারাপ ?”

একদম কথা বলতে ইচ্ছা করছে না তিতাসের আর বিশেষ করে বর্ণালী দির সাথে তো নয় ই , অন্যের জীবনের ওপর সবসময় বর্ণালী দির এই অদম্য কৌতুহলের কোনো কারণ এতদিনেও খুঁজে পায়নি তিতাস !

যথাসম্ভব ভদ্রতার হাসি মেখে সে জবাব দিল , “কই না তো ! এই একটু ক্লান্ত বলতে পারো !”

এবার বর্ণালী দি তিতাসের অনেকদিনের চেনা সবজান্তার হাসি মেখে বলল , ” আমি সব শুনেছি রে তিতাস! এবার তোদের টিমে নীলিমা আর শুভঙ্কর ছাড়া আর কারোর প্রমোশন হয়নি ,আমি জানি তুই ওদের চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য কিন্তু তোর নিশ্চই জানতে বাকি নেই নীলিমার সাথে বড়কর্তার মাখামাখির কথা আর শুভঙ্করের কথা যদি বলিস ,ও তো শুনেছি বড়কর্তার রোজের ফাই ফরমাস অব্দি খেটে দেয় ! তাহলে কেন তুই এই নিয়ে বেকার এত মন খারাপ করছিস ?”

এবার চেষ্টা করেও তিতাস আর হাসতে পারল না ,বর্ণালী দির দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি তো তোমাকে আগেই বললাম বর্ণালী দি ,আমার মন খারাপ নয় ! নীলিমার সাথে আমার খুব ই অল্প কথা হয় ,কাউকে না জেনে তার চরিত্র নিয়ে কোনো মন্তব্য করা অন্যায় হবে আর শুভঙ্করের সাথে আমি অনেকদিন কাজ করছি ,শুধু colleague বললে ভুল হবে ,ও আমার খুব ভালো বন্ধু,তাই ওর প্রমোশন পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে অন্য কারো থাকতে পারে কিন্তু আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই ! ”

বর্ণালী দি আবার কিছু বলতে যাওয়ায় তিতাস একটু হেসে বলল , ” এখন আমাকে ডেস্ক এ ফিরতে হবে বর্ণালী দি ,একটা মিটিং আছে একটু পরে ,আবার পরে কথা বলছি তোমার সাথে! ”

অফিস বাসে র জানলা দিয়ে বাইরে দেখতে দেখতে তিতাস আবার ভাবনায় তলিয়ে গেল ! রোজকারের একঘেয়েমি নিয়মের ঘেরাটোপে নিজেকে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলছে তিতাস ,তার নিজের মত বাঁচতে চাওয়া মন যে কি পেলে খুশি হবে ,এত চেষ্টা করেও তার উত্তর কিছুতেই সে খুঁজে পায় না ! ভালো রেসাল্ট র পর ভালো চাকরি , সচ্ছল আর্থিক অবস্থা , অল্প সময়ে পাওয়া এত সাফল্য তিতাসকে তার বয়সী অনেকের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে নিয়ে গেছে ! তবুও কেন কোনোকিছুই মিটিয়ে দিতে পারে না তার মনের সেই অজানা অদৃশ্য আকাঙ্খাকে ! বর্ণালী দির কথা অনুযায়ী এবারে প্রমোশন না পাওয়াই যদি তার মন খারাপের কারণ হয় ,তাহলে এর আগে যখন প্রমোশন পেয়েছে সে , সেই খুশির হাসিতে আশেপাশের সকলে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিয়ে আশ্বাস দিলেও , একটি বার ও কেন সে সাড়া পায় নি তার ভিতরের মেয়ে টার থেকে !একমাত্র বাবা ই তার এই নিরন্তর অস্বস্তি বুঝতে পেরে বলে,

“মনের খিদে মেটানো কি আর অত সহজ রে মা ? বেশির ভাগ মানুষ ই তো সেই খিদের সাথে আপোস করে কাটিয়ে দেয় সারা টা জীবন ! কিন্তু তুই চেষ্টা ছাড়িস না ! শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খুঁজে বেড়াতে থাক কিসে তার মুক্তি ,কোথায় তার চিরন্তন আনন্দ ,হাতে সময় যে খুব কম !”

শনিবারের সকালে তিতাসের ঘুম ভাঙ্গলো ফোনে সমুদ্রের গলার আওয়াজে , ” উঠুন Madam! সূর্য দেবের উপর কৃপা করুন এবার !”

তিতাস চোখ না খুলেই হেসে বলল ” তুই বাড়িতে এসেছিস বুঝি ?”

সমুদ্র : ” তা নয় তো কি ? তোর মত তো বাড়ি তে থেকে আরামের ১০ টা – ৫ টা অফিস না আমার , সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয় কোনো রকমে মেসের খাবার গলা দিয়ে নামালেও শনি রবিতে আর পারলাম না ,তাই ভোর ভোর চলে এসেছি বাড়ি ,মা র হাতের রান্না খেতে ! ছাপোষা ,অতিসাধারণ ,ঘরকুনো বাঙালি আমি ,বুঝলি কিনা !”

তিতাস (এবার চোখ বুজে আবার পাশ ফিরে শুয়ে বলল ) : ” সবই তো বুঝলাম ,শুধু অতিসাধারণ বিশেষণ টা IIT খরগপুর থেকে পিএইচডি করছে যে ছেলে ,তাকে মানায় না ! ”

সমুদ্র (প্রচন্ড হেসে) : ” তাই বুঝি ? তোর কি তবে আশেপাশের ডিগ্রী ধারী সব মানুষ কেই খুব অসাধারণ বলে মনে হয় ? যত বেশি তাগড়াই ডিগ্রী ,অসাধারণের দৌড়ে তত বেশি উচুতে তার সিংহাসন ,তাই তো ? ”

তিতাস : ” অসাধারণ না হলেই যে অতিসাধারণ হতে হবে তার কি কোনো মানে আছে সমুদ্র ? মাঝামাঝি বলেও তো একটা কথা হয় !”

সমুদ্র : ” বাহ! একটা যন্ত্র বানালে হয় ! ভাবছি পিএইচডি র সাবজেক্ট টা বদলে দেব ,একটা অভিনব মানুষ বিচার করার যন্ত্র বুঝলি তিতাস ! সাধারণ মানুষের জন্য মানে এই ধর ব্যাচেলর ডিগ্রী ধারণ কারী দের জন্য, যন্ত্রের কাটা টা সবসময় মাঝ বরাবর থাকবে !একবার ভাব সেই উত্তেজনার মুহূর্ত , যন্ত্রে কেউ ডিগ্রী এন্ট্রি করছে :মাস্টার্স ,পিএইচডি ,পোস্ট পিএইচডি ,অনেক সাবজেক্ট এ পিএইচডি ,আর প্রচন্ড টেনসনে তাকিয়ে আছে যন্ত্রের কাটার দিকে , যন্ত্রের কাটা ঠিক কতটা টা ডানদিকে সরবে নাহলে কিভাবে পাবে সে বিশ্বদরবারে অসাধারনের সিংহাসন ! কপাল খারাপ মুর্খ গরিব মানুষদের জন্য যন্ত্রের কাটা বন্ধ ঘড়ির মত সবসময় বাদিকে ঘেষেই থাকবে , তাই এখনকার মতই তাদের হেট মাথা হেট ই থাকবে , আমার যন্ত্র ওদের জন্য নয় ,যতসব অতিসাধারনের দল ! কিছুই হবে না এদের !বার্ষিক রোজগার আর সম্পত্তির হিসেব দেবার সুবিধাও রাখব বুঝলি ,নাহলে নামকরা ব্যবসায়ী ,মন্ত্রিবর্গরা তো এই দৌড়ে পিছিয়ে পরবে ,তাদের রাগ আমার এই অভূতপূর্ব যন্ত্র টাকে ভালো বাজার করতে দেবে না ! ”

তিতাস (এবার হেসে ফেলে বলল) : ” হয়েছে ? সকাল সকাল ঘুম ভাঙিয়ে হল না শুধু ,এইসব বাজে বকে মাথা টা ব্যথা করে দিলি !এবার বল কি চাই তোর ? ”

সমুদ্র : “দেখা করবি ?আমার বাড়িতে চলে আসিস বিকেলের দিকে ,এই ধর ৬ টা ! ”

তিতাস : “আচ্ছা ,পৌছে যাব ,এবার ঘুমোতে দে আমাকে ,রাখলাম!”

সমুদ্রের মত কাছের বন্ধু তিতাসের খুব কম ই আছে তাই তার কোনো আবদারেই তিতাস না বলতে পারে না ! অগত্যা কথামতো সময়ে সমুদ্রের বাড়ি পৌঁছাল তিতাস।

সমুদ্রের মা দরজা খুলে খুব চেনা হাসি মেখে বলল ” ভিতরে এসো তিতাস ! বাপান আমাকে বলে গেছে তুমি আসবে ,একটু বসো ,ও চলে আসবে এখনি!”

(সমুদ্রের মা ওর ঘরের আলো জ্বেলে জানলা টা খুলে দিয়ে বলল) ” তুমি একটু বসো ,আমি চট করে সন্ধ্যে দিয়ে আসি !”

তিতাস (অল্প হেসে ) “আচ্ছা কাকিমা !”

সমুদ্রের মা চলে যেতেই তিতাস তাক থেকে একটা বই নিয়ে পাতা ওল্টাতে লাগলো , কিছুক্ষণ পর টেবিলের সোজাসুজি খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে দেখল সামনের মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছে !আরো যা দেখল তাতে তার মনে হলো এখনি সে সমু দ্রের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে , আর এক মুহূর্ত অপেক্ষার কোনো মানে হয় না ! তিতাস ব্যাগ টা নিয়ে বেরোতে যাবে তখনি সমুদ্রের মা হাসিমুখে একটা মিষ্টির প্লেট নিয়ে ঘরে এসে ঢুকলো !

প্লেট টা তিতাসের সামনে রেখে বলল “এটুকু খেয়ে নাও !আর বোলো না ,গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তো ছেলের কোনো পাত্তাই নেই ,ফোনেই কথা হচ্ছিল ,বলে কি একটা রিসার্চ এর কাজে ব্যস্ত তাই আসতে পারছে না ,তাই যথারীতি মন টা খুবই খারাপ ছিল কদিন ,আজ একেবারে ভোরবেলা দরজা খুলে দেখি মূর্তিমান না বলে কয়ে এসে হাজির , এমন ভাবে জড়িয়ে ধরল এতদিনের জমে থাকা রাগ আর দেখাতেই পারলাম না ! আমাকে বলে কি আমার হাতের খাবার জন্য মন কেমন করছিল তাই সব ছেড়ে পালিয়ে এসেছে ! হ্যাঁ ! তাই আর কি ! ও বোঝালেই আমি বুঝব ! মাকে ঠকানো র চেষ্টাই শুধু করা যায় , নিজের পেটের ছেলেকে চিনতে যেন আমার এখনো বাকি আছে ! ঠিক যা ভেবেছি ! , একটু পরই পাড়া র ক্লাবের ছেলেদের হাক ডাক ” ও কাকিমা! বাপান দা আসেনি ? ১৫ ই আগস্ট র ম্যাচ আছে তো !”

ও মনি দেখি মূর্তিমান জার্সি পরে নিচে এসে বলে ‘মা একটু ঘুরে আসি বুঝলে ! এসেই যখন গেছি আর ওরা এতবার ডাকছে আমাকে ,একবার না যাওয়া টা অন্যায় হবে ! তোমার ভয় নেই ,এবার পা মচকালে আর চুন হলুদ লাগবে না ,দারুন স্প্রে কিনে এনেছি আমি !”

সামনে দাড়িয়ে থাকা পাড়ার ছেলেদের মুখ চিপে হাসি দেখে আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না কিছু ! কিন্তু পাগল ছেলের মা রা তো বরাবরই আমার মত অসহায় তিতাস ,এখন আবার সেই হাত পা ভেঙ্গে ফিরে আসার অপেক্ষা ছাড়া কিছুই করার নেই !”

তিতাস (এবার হেসে জানলার দিকে তাকিয়ে বলল) ” আজ হাত পা অক্ষত আছে বলেই মনে হয় কাকিমা ,নাহলে ভাঙ্গা হাত পা নিয়ে এইভাবে বাদর নাচা সম্ভব হত না !”

সমুদ্রের মা জানলা দিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল “দেখেছ কান্ড ! বয়স টাই বেড়েছে শুধু !”

সমুদ্র কাদা জামায় হাতে একটা কাপ নিয়ে হাফাতে হাফাতে ঘরে ঢুকে টেবিলে বসে বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা তিতাসের সামনে কাপ টা রেখে বলল ” আমাদের ক্লাব আজ ৩ গোলে জিতে চ্যাম্পিয়ন তিতাস !আর আমি ২ বছর পর আবার ম্যান অফ দ্য ম্যাচ ! আমি তোকে বলে বোঝাতে পারব না এই মুহুর্তে আমার মনের অবস্থা !”

তিতাস হাত ঘড়িতে সময় টা দেখে নিল , রাত ৭ : ৩০ ! তারপর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে জোর করে হেসে বলল “বাহ ! অভাবনীয় সাফল্য! Congratulation!”

সমুদ্র তিতাসের রাগ বুঝতে পেরে বলল “সরি রে ,খুব দেরী হয়ে গেল ! মা বলেই বোধহয় তোকে

এতক্ষ ন বসিয়ে রাখতে পেরেছে , নাহলে জানলা দিয়ে আমাকে খেলতে দেখার পর , হাসিমুখে আমার অপেক্ষা করার মেয়ে তো তুই নস তিতাস! নয় নয় করে হলেও অন্তত ১৫ দিন আমার ফোন ধরতিস না ! বিশ্বাস কর আমি বুঝতে পারিনি এত দেরী হয়ে যাবে ,আসলে ফাইনাল ম্যাচের ওভারটাইম টা সব হিসেব গন্ডগোল করে দিল !”

তিতাস যথাসম্ভব রাগ চেপে নির্বিকার ভাবে বলল ” তুই শুধু শুধু পিএইচডি করে নিজের সময় নষ্ট করছিস সমুদ্র , ফুটবলে তো শুনেছি এখন ভালো খেলোয়ারের খুব অভাব !”

সমুদ্র বিদ্রুপ টা বুঝেও না বোঝার ভান করে বলল ” এসব বাজে কথা কে বলল তোকে ? ফুটবলে ভালো দলে চান্স পাওয়া পিএইচডি করার থেকেও অনেক বেশি কঠিন ,পিএইচডি পড়াশোনা র ইচ্ছা আর ধৈর্য্য থাকলেই করা যায় ,কিন্তু ভালো ফুটবল খেলতে হলে জন্মগত প্রতিভা লাগে, বুঝলি ? ”

তিতাস (একইরকম নির্বিকার ভাবে জবাব দিল): “আমি সেটাই তো বলছি সমুদ্র ! প্রতিভা যখন তোর আছে ,সেটা ঠিক জায়গায় ব্যবহার কর!”

সমুদ্র এবার অল্প হেসে বলল ” আমার তো সেই প্রতিভা নেই তিতাস,কোনদিন ছিল ও না ! তবে প্রচন্ড এক ভালবাসা আছে ,তাই খেলি ! ফুটবল মাঠের মত আনন্দ আমি যে আর কোনো কিছুতেই পাই না রে ! পিএইচডি আমার পেটের খিদে মেটাবে ঠিকই কিন্তু আমার মনের খিদের কি হবে ! তার ব্যবস্থা ও তো আমাকেই করতে হবে ,নাহলে তো এই যান্ত্রিক জগতে আমি বাঁচতে পারব না !”

এবার তিতাস কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল,কেমন যেন সেই এলোমেলো চিন্তা গুলো আবার ঘিরে ধরল তাকে !

টেবিল থেকে উঠে সমুদ্রকে বলল ,”আমাকে এখন বাড়ি যেতে হবে সমুদ্র ,অনেক রাত হয়ে গেছে!”

সমুদ্র (কি বলবে কিছু বুঝতে না পেরে বলল) : ” তিতাস ,আমার ওপর আর রেগে থাকিস না please,আরেকটু অপেক্ষা কর ,আমি ২ মিনিটে স্নান সেরেই তোকে বাড়ি পৌছে দিয়ে আসবো ,আর রাস্তায় যেতে যেতে তোকে এতদিনের জমা কথাগুলো বলাও হয়ে যাবে !”

চিন্তায় মগ্ন তিতাস যেন শুনতেই পেল না সমুদ্রের কথাগুলো , শুধু বলল , “এখন আমি আসি রে সমুদ্র ! নাহলে সত্যি অনেক দেরী হয়ে যাবে !”

ঝড়ের বেগে সমুদ্রের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল তিতাস ,প্রায় এক নিশ্বাসে দৌড়ে বাড়ি ফিরে উদ্ভ্রান্তের মত নিজের পড়ার ঘরের আলমারি খুলে একটা পুরনো বাক্স টেনে বের করে আনলো !বাক্সের উপর জমে যাওয়া ধুলোগুলো সযত্নে হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তিতাস খুলে ফেলল বাক্স টা ,নিজের অজান্তেই চোখে ভিজে গেল তার নিজের লেখা বাক্সবন্দী কবিতার খাতা গুলো দেখে ! উচ্চমাধ্যমিকে অঙ্কে লেটার পায়নি তিতাস ,তাই অনেক ভালো কলেজেই সাইন্স বিভাগে জায়গা হয়নি তার আর এজন্যে প্রায় সকলেই দায়ী করেছিল তার সাহিত্যের ওপর অকারণ ভালবাসা কে, যা কিছুতেই তাকে সাফল্যের সহজ পথের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত না ! তার ওপর শিক্ষক দের অগাধ বিশ্বাস , মাধ্যমিকের মতই উচ্চমাধ্যমিকেও স্কুল র মুখোজ্বল করার প্রচন্ড আশা ,অনেক চেষ্টা করেও পূরণ করতে পারেনি তিতাস ,আর তার জন্যে আর সকলের মত সে নিজেও দায়ী করেছিল তার আলমারির তাকে সাজিয়ে রাখা শরৎচন্দ্র ,বঙ্কিম চন্দ্র ,বিভূতিভূষণ ,সত্যজিৎ রায় ,তারাশঙ্করের বইগুলোকে ! আর তার থেকেও বেশি অপরাধী হয়ে উঠেছিল তার এই কবিতার খাতাগুলো যার অনির্বার হাতছানি একদিনের জন্যও এড়াতে পারতনা তিতাস ,কোন এক মোহনী শক্তির টানে বিনা প্রতিবাদে সে হারিয়ে যেত এক অনন্ত শব্দ মিলের জগতে ! সে এক এমন অন্তহীন ভালবাসা র দুনিয়া যার নেশা তিতাস অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারেনি ! সেই অন্তরের ভালোবাসাকে সকলের চোখে কিভাবে অপরাধী হয়ে থাকতে দিত তিতাস ? তাই সকল যন্ত্রণা কে উপেক্ষা করে নিজের হাতে সে বাক্সবন্দী করে ফেলেছিল তার সকল ভালবাসার মুহূর্ত ,তার জীবনে সহজ সাফল্যের রাস্তা পরিষ্কার করতে তিতাস নিশ্চিত করেছিল তার নিজের সৃষ্টির এই অনন্ত নির্বাসন ! আর সত্যি তার পর আর কখনো পিছন ফিরে দেখতে হয়নি তিতাসকে ,এরপরের রেসাল্ট র দিনগুলোতে আর কেউ কোনদিন অপরাধী করতে পারেনি তার ভালোবাসাকে ! একের পর এক পাওয়া সাফল্য তিতাস কে কখন ভুলিয়ে দিয়েছিল সেই কিশোরী মেয়েটার নির্বাসিত ভালবাসার কথা! এতদিন পর সে বুকে জড়িয়ে ধরল আবার সেই হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে ! এক চিরন্তন শান্তি আর সীমাহীন আনন্দে তিতাসের চোখ দিয়ে বয়ে চলল ভালবাসার সমুদ্র!

হঠাৎ বাবা কে ঘরে ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে নিল তিতাস। তারপর নিজেকে সামলে বাবাকে বলল “ওই একটা পুরোনো জিনিস খুঁজে পাচ্ছিলাম না তাই এই বাক্স গুলো একবার নামিয়েছিলাম ,আমাকে কিছু বলবে তুমি ?”

তিতাসের বাবা (অল্প হেসে বলল )” আমি জানতাম সেই হারিয়ে যাওয়া জিনিস কোথায় আছে ! কিন্তু কি জানিস মা ,কিছু জিনিস যে শুধু নিজেকেই খুঁজে পেতে হয় ,অন্য কেউ তার সন্ধান বলে দিলে সত্যিকারের খোঁজের ওপর অবিচার করা হয় যে !”

তিতাস আর কান্না চেপে রাখতে পারল না ,বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল “আমি এই অচেনা জগতে আর কিছুতেই নিজেকে হারিয়ে যেতে দেব না বাবা ,তোমার তিতাস এখন জানে তার মন কি চায় ,কিসে তার আনন্দ ,কোথায় তার মুক্তি! শুধু একটু দেরী হয়ে গেল এই যা !”

বাবা এবার জোরে হেসে উঠলো ,তারপর তিতাসের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল “ধুর! বোকা মেয়ে ,নিজের অন্তরাত্মা র সুখের চাবি যে কোথায় লোকানো ,সেই তো আমাদের এই ছোট্ট জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য ,জীবনের শেষ দিনেও তার সন্ধান পাওয়াকে কিছুতেই যে দেরী বলা চলে না। ”

ধন্যবাদ ,

রোমি

রিইউনিয়ন

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

তিন্নি আর সৃজা আজ একসাথে যাবে ওদের স্কুলের রিইউনিয়নে ! প্রথমে কিছুতেই রাজী হয়নি তিন্নি কিন্তু সৃজার নাছোরবান্দা জেদের কাছে শেষমেষ তাকে হার মানতেই হলো ! তিন্নি র বন্ধু বলতে বরাবর ওই একটাই নাম “সৃজা” তাও সৃজার একার চেষ্টা তেই বোধহয় এতদিন টিকে আছে এই ছোটবেলার বন্ধুত্ব ! তিন্নি যে সৃজার থেকে একদম আলাদা,সে অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই পারে না সৃজার মতন অমন সহজ সরল ভাবে সকলের সাথে মন খুলে গল্প করতে !স্কুলের শেষ দিনের পর তিন্নির সাথে কারোর কখনো কথা না হলেও সে জানে ,সৃজার সাথে স্কুলের অনেকের ই নিয়মিত যোগাযোগ আছে ,আর থাকবে না ই বা কেন ! সৃজার মত এত সুন্দর আর খোলা মনের মেয়ে তিন্নি আর একটাও দেখেনি ! সৃজা আর তিন্নি এক পাড়াতেই থাকে সেই ছোট্টবেলা থেকে ,স্কুলের মত তাদের কলেজ ও এক! এক সাথেই দুজনে কলেজ যাতায়াত করে ! সৃজার হরেক রকম মন ভোলানো গল্পের ঝুড়ি তিন্নির অগোচরেই তাদের গন্তব্যে পৌছে দেয় রোজ ! এছাড়াও ছুটির দিনের বেশিরভাগ টাই তিন্নির বাড়িতেই সময় কাটায় সৃজা ! তিন্নির বাবা মা ও খুব ভালবাসে সৃজাকে ,তাদের একমাত্র মেয়েটার মনের খোঁজ অনেক চেষ্টা করেও তারা কখনো পায়নি আর সৃজার উপস্থিতি তাদের এই না পারা কে কখনোই ভীষণ চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে দেয়নি ! তিন্নির অল্প কথাতেই সৃজা কেমন ভাবে যেন সেটাও বুঝে যায় যেটা চেষ্টা করেও তিন্নি ওকে বলতে পারেনি ! তাই দেখে অবাক হয়ে যাওয়া তিন্নিকে সৃজা হেসে উত্তর দেয় , “সেই ছোট থেকেই কিভাবে একই আছিস রে তুই তিন্নি ? এখনো যা ভাবিস তা কিছুতেই ঠিক ভাবে বলতে পারিস না ! যদিও আমার সাথে কথা বলতে তোর এত কষ্ট করে শব্দ উচ্চারণ করার কোনো দরকার নেই ,হাত পা নাড়িয়ে দিবি ,তাহলেই চলবে !” সৃজা না থাকলে বন্ধু কথাটা সম্পূর্ন অর্থহীন থেকে যেত তিন্নির জীবনে, সেই কৃতজ্ঞতা তেই নিজের অজ্ঞাতে সে সৃজাকে দিয়েছে তার জীবনের ওপর অবাধ অধিকার ! সেই অধিকারের অপব্যবহার সৃজা প্রায়ই করে থাকে ,এই যেমন আজকে সে তিন্নি কে প্রায় জোর করেই স্কুল রিইউনিয়নে নিয়ে যাচ্ছে এক অন্যরকম ভালোলাগার অজুহাত দেখিয়ে ! ভালোলাগা তো দূরের কথা ,সেই চেনা কিন্তু অচেনা মুখের ভিড়ের মধ্যে তার পুরনো অস্বস্তি র কথা ভেবেই অনিচ্ছা টা যেন আরো বেশী করে ঘিরে ধরছে তিন্নিকে ! সে কথা সৃজাকে বোঝাতে তিন্নি একবার চেষ্টা করেছিল যার উত্তরে সৃজা বলেছিল ” এতই যখন অসুবিধা তখন তুই যাস না তিন্নি আর আমিও যাব না ! আমার জন্য এত কষ্ট নাই বা করলি তুই ! আর সত্যি বলতে কি আমারও অত ইচ্ছা নেই কারোর সাথে দেখা করার ,নেহাত সবাই বার বার ফোন করছে তাই ! অনেকে তো শুনেছি বিদেশ থেকেও ছুটি নিয়ে আসছে শুধু এই রিইউনিয়নের জন্যে ,আর আমরা না হয় স্কুলের দু হাত দূর থেকেও গেলাম না , তাতে কার বা কি আসবে যাবে বল ! আমি এখনি ফোন করে তনিমা কে জানিয়ে দিচ্ছি আমরা দুজনে যেতে পারব না !” তিন্নি বাধ্য হয়েই তখন তার সকল অস্বস্তিকে আড়াল করে জোর করে হেসে বলেছিল “আমি না কোথায় বললাম সৃজা ?তুই তো আমাকে জানিস ,কাউকে ফোন করার দরকার নেই ,আমি যাব তোর সাথে রিইউনিয়নে !”

স্কুলে পৌছে একদম অবাক হয়ে গেল তিন্নি ,সব তো কেমন বদলে গেছে ,দেওয়ালের রং ,স্কুলে ঢোকার রাস্তা টা , ঢুকেই ডানদিকে যে বই য়ের দোকান টা ছিল সেটাও তো নেই আর ওই গেটের ডানদিকে যে একটা ছোট ঘরে বাহাদুর তার পরিবার নিয়ে থাকত ,কোথায় গেল ওরা ?এত অল্প সময়ে সব কিছু কি করে বদলে গেল ? কেমন যেন চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না তিন্নির ! হঠাৎ তার ঘোর ভাঙলো সৃজার হাতের হ্যাচকা টানে ,অধৈর্য্য গলায় বলল সৃজা” কিরে তিন্নি এখানেই দাড়িয়ে থাকবি নাকি ? চল সবাই বোধহয় এসে গেছে হবে এতক্ষণে ,আমার যে আর তর সইছে না রে ! ” বিনা প্রতিবাদে তিন্নি এগোতেই ওকে সবসময়ের মত অবাক করে দিয়ে সৃজা বলল “তুই যা ভাবছিস তা নয় তিন্নি ,সব আগের মতই আছে ,মোড়ক টা যা একটু পাল্টেছে ! ভিতরে আরো বড় একটা বইয়ের দোকান হয়েছে , বাহাদুর তার পরিবার নিয়ে এখন ওইদিক টায় থাকে ,বেশ বড় একটা দালান ঘর বানিয়ে দিয়েছে স্কুল ওদের জন্য ,ওই তো পুকুর ধারটা র দিকে গেলেই দেখতে পাবি,শুনেছি ঢোকার রাস্তা টা চওড়া খানিক টা বাধ্য হয়েই করেছে ,নাহলে বাড়তি ছাত্রের ভিড়ে প্রায়ই ছুটির সময় এখানে জ্যাম যট হত ,বাকি রইলো দেওয়ালের রং, সে তো আমাদের সময় তেও মাঝে মাঝে নতুন করে হত , তোরও মনে নেই ?এবার চল মা আমার !” তিন্নি এবার একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অল্প হেসে এগিয়ে গেল সৃজার সাথে !

“বাবারে!” স্কুলের মাঠে অগনিত মুখের ভিড় দেখে নিজের অজান্তেই অস্ফুটে বলে উঠলো তিন্নি ! সৃজা ওর হাত টা আরো শক্ত করে ধরে বলল “চল তো ,কিছু হবে না ,আমি তো আছি নাকি? তুই তো একা নস ! ভিড় দেখে মনে হচ্ছে সবাই প্রায় এসেছে ,একবছর ধরে প্ল্যান করা হয়েছে এই রিইউনিয়ন বুঝলি তিন্নি ? একবার ভাব ,কত কষ্ট করে খুঁজে বার করতে হয়েছে এত জনের ফোন নম্বর ,ইমেইল আইডি ,সবাইকে তো আর সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এ পাওয়া যায়নি ! এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এতোগুলো মাথা এক জায়গায় করা মোটেই সহজ কাজ নয় ,সত্যি তনিমাকে বাহবা না দিলে চলে না ,ওই তো প্রথম উদ্যোগী হয়েছিল এ মহাযজ্ঞে ,তারপর আরো সকলে এগিয়ে এসেছিল যদিও ,স্কুল কেও আগে থেকে জানিয়েছে ওরা ,তাই তো করা সম্ভব হয়েছে বিশাল আয়োজন ,সে যাই বলুক স্কুলের মাঠ টাই আরো বেশি নস্টালজিক করে দিচ্ছে,এই একই ব্যাপার অন্য কোথাও করলে এতটা ভাললাগা কিছুতেই আসত না ,তাই না বল তিন্নি ? !” তিন্নি শুধু মাথা নাড়িয়ে সৃজার কথায় সম্মতি জানালো।

হঠাৎ তনিমা এগিয়ে এসে সৃজা কে জড়িয়ে ধরে বলল ” কখন থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করছি আমরা  ! এত দেরী কেন করলি ? চল তাড়াতাড়ি ! আরে কি বলব ,কাউকে কাউকে তো চেনাই যাচ্ছে না সৃজা ,একেবারে পুরো চেঞ্জ ,চোখে না দেখলে তুই বিশ্বাস করতে পারবি না ,কি যে মজা আর গল্প হচ্ছে ,উফ ! এত আনন্দ হবে আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি রে ! এবার আর সৃজার হ্যাচকা টানের জবাবে সাড়া দিল না তিন্নি ,শুধু বলল ” তুই যা সৃজা ,আমি এখানেই আছি ,আমি বরং একটু আশপাশ টা ঘুরে দেখি ,অত ভিড়ে আমার দমবন্ধ হয়ে যাবে রে !” সৃজা তিন্নির অবস্থা বুঝতে পেরে এবার আর জেদ না করে বলল ” ঠিক আছে ! আমরা এখানে বেশিক্ষণ থাকব না ,একটু দেখা করে আসি সবার সাথে তারপর ই চলে যাব ,ভিড়ে আমাকে খুঁজে না পেলে আমার নম্বরে মিসড কল দিস বুঝলি ? তিন্নি হেসে মাথা নাড়াতেই সৃজা তার এতক্ষণ শক্ত করে ধরা হাত ছেড়ে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল তনিমার সাথে! তিন্নি স্কুল করিডোর পেরিয়ে এগিয়ে গেল সামনের রাস্তা দিয়ে , একটু এগোতেই তার চোখে পড়ল তার সেই চেনা পুকুর ধার । স্কুল র এই জায়গাটা ই তার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল ! নিস্তব্দ ,জনবিহীন এই শান্ত প্রকৃতির কোল তিন্নির এতক্ষণের সব অস্বস্তি ভুলিয়ে দিয়ে তার মন এক ভীষণ সুন্দর স্মৃতিতে ভরিয়ে দিল , সৃজা যখন টিফিনে বাকি দের সাথে গল্প করতে ব্যস্ত থাকত এই পুকুরের মাছ আর জলে ভাসতে থাকা রাজহাঁসের সাথেই টিফিন ভাগ করে খাওয়া ছিল তিন্নির রোজকার অভ্যেস ! তিন্নি এগিয়ে গিয়ে নতুন করে বাধানো সিড়ির উপরে বসে পরল ,পুকুরের শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে একটা নিশ্চিন্তের হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে !

হঠাৎ হাতের উপর একটা স্পর্শে চমকে উঠলো তিন্নি ! তাকাতেই দেখল একটা এলসেশিয়ান কুকুর তার হাত শুকে দেখছে। কুকুরটাকে দেখেই এক অনাবিল আনন্দে ভরে গেল তিন্নির মন ,অস্ফুটে সে বলে উঠলো “বাঘা ! আমাকে চিনতে পেরেছিস ?” কুকুরটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে তার চোখ জলে ভরে উঠলো ,তার মনে পরে গেল তার সাথে জড়িয়ে থাকা বাঘার সব স্ম্র্তি। তিন্নি যখন টিফিনের সময় এই পুকুর ধারে এসে বসত ,মাছ আর রাজহাঁস ছাড়াও তার সঙ্গী হত বাহাদুরের পোষা একটা এলসেশিয়ান কুকুর, বাঘা। প্রচন্ড তেজী হওয়া সত্তেও তিন্নির কোলের কাছে বাঘা তার মায়াভরা চোখ নিয়ে এক্কেবারে শান্ত হয়ে বসে থাকত। কোনো চাওয়া পাওয়া ছাড়াই ওরা দুজনে স্কুলের টিফিনের এই অল্প সময়টা একে অপরের পাশে বসে দিব্বি কাটিয়ে দিত। বাঘা কে বোঝানোর জন্য যেমন তিন্নিকে কোনো শব্দ ব্যবহার করতে হত না ঠিক তেমনি বাঘার চোখের ভাষা তিন্নির কাছে ছিল খুব স্পষ্ট। তিন্নি যেমন চেষ্টা করেও কাউকে কিছুতেই তার ভাবনার কথা বলতে পারে না , কেউ তাকে ভালোবেসে তার না বলা কথা বুঝে না নিলে সে যেমন অসহায় ,বাঘারও যেন সেই একই অবস্থা ,তাই বাঘার সাথে কাটানো সময়ে সে তার অক্ষমতা কে ভুলে গিয়ে এক চিরন্তন বন্ধুত্বে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিল যেখানে শব্দ ছিল একেবারেই নিষ্প্রয়োজন। আজ আবার সেই বাঘার স্পর্শে তিন্নি যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলল সেই ফেলে আসা দুপর বেলায়।

কিছুক্ষন পর তিন্নির ঘোর কাটতেই সে বুঝতে পারল বাঘা তার ভালবাসার আলিঙ্গনে সাড়া দিচ্ছে না ,তিন্নি তার চোখের দিকে তাকাতেই বুঝলো বাঘা তাকে চিনতে পারেনি ,তিন্নির এই ব্যবহার তার কাছে যেন একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তিন্নি কিছুতেই সেটা মেনে নিতে না পেরে বাঘাকে আবার জড়িয়ে ধরে বলল , “বাঘা ! আমি তিন্নি !আমাকে ভুলে গেলি তুই ?” এল্সেশ্যিয়ান কুকুরটা এবার কিছুটা অস্বস্তি প্রকাশ করে তিন্নির বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যোগী হলো ,কিছুটা এগিয়ে আরেকবার পিছনে ফিরে দেখে নিল সে তিন্নিকে ,তার চোখের চাওনি তিন্নিকে বুঝিয়ে দিল তার ভীষণ আশ্চর্য হওয়ার অভিজ্ঞতা। তিন্নির মনে হলো এ যেন কিছুতেই হতে পারে না ,বাঘার পক্ষে তিন্নিকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব , তবে কেন তিন্নির সাথে এরকম করল বাঘা , স্কুলের শেষ দিন দেখা না করার জন্য নাকি আর কোনদিন ফিরে না আসার জন্য তার এই কঠিন অভিমান ? তিন্নি উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়ে গেল বাঘার পিছন পিছন। এল্সেশ্যিয়ান কুকুরটা সেটা বুঝতে পেরে আবার তিন্নির কঠিন বাহুডোর এড়াতেই বোধহয় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়তে লাগলো।হঠাৎ সৃজার হাত তিন্নিকে টেনে ধরে বলল “তিন্নি ,এভাবে কোথায় যাচ্ছিস দৌড়ে ? আর ঘেমে নেয়ে একি অবস্থা হয়েছে তোর ?সব শেষে পুকুর ধারেও তোকে না দেখতে পেয়ে আমি তো চিন্তা করছিলাম !” তিন্নি সৃজার হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল “আমার উপর অভিমান করে ও যে এভাবে আমাকে না চেনার ভান করছে সৃজা ,আমাকে ওর কাছে ক্ষমা চাইতেই হবে। ” সৃজা তিন্নিকে ঝাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো “কি বলছিস তিন্নি ? কে তোকে চিনতে পারেনি ? ” তিন্নি জলভরা চোখে অসহায় ভাবে সৃজার দিকে তাকিয়ে বলল “বাঘা !” সৃজা বলল “তুই কি পাগল হয়ে গেছিস ? এটা কি কখনো হতে পারে ? অবলা জীবদের অত মান অভিমান বোধ থাকে নাকি ? আর কুকুর যাকে একবার দ্যাখে তাকে আর কোনোদিন ভুলতে পারে না। ” তিন্নি অস্থির ভাবে বলে উঠলো “তুই যে কেন আমাকে বিশ্বাস করছিস না ! আমার হাত ছাড় সৃজা ! ও যে ওইদিকে চলে গেল ,আমাকে যে যেতে হবে। ” সৃজা হাত না ছেড়েই বলল “তুই আমার সাথে চল ,আমি তোকে বাঘার কাছে নিয়ে যাচ্ছি ,দেখি কেমন ও তোকে চিনতে না পারে !” সৃজা তিন্নির হাত ধরে একটা দালান ঘরের সামনে নিয়ে গিয়ে ডাক দিল “বাহাদুর !” একজন নেপালী লোক বেরিয়ে আসতেই সৃজা বলল “হাম লোগকো বাঘা সে মিলনা হ্যায় ! থোরা লে চলোগে ?” নেপালী ভদ্রলোক অমায়িক হেসে জবাব দিল “জরুর দিদিমনি ! আইয়ে !” সৃজা আর তিন্নি নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করলো ,একটু পর একটা ছোট্ট ঘরের সামনে পৌছে বাহাদুর বলল ” অন্দর আইয়ে দিদিমনি!” তিন্নির পায়ের শব্দের সাথে সাথে স্পস্ট হয়ে উঠলো ঘরের ভিতরে এক আনন্দের আর্তনাদ ! তিন্নি মুহুর্তে সৃজার হাত ছাড়িয়ে ঘরে ঢুকতেই তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল তার এক অনেক চেনা ভালবাসা। তিন্নির চোখের জল ঢেকে গেল বাঘার অন্তহীন চুম্বনে। বাঘাকে জড়িয়ে ধরে তিন্নি এক পরম শান্তি অনুভব করে বলল “রাগ কমল তোর ?আমার যে বড় অন্যায় হয়ে গেছে রে বাঘা ! স্কুলের গন্ডি পেরোতেই এক ভীষণ ব্যস্ততায় আমি যে সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলাম , একবারও তোর কাছে আসার কথা আমার মনে পরেনি ,আজও সৃজা না থাকলে আমি যে কিছুতেই আসতাম না ,আর কোনদিন দেখা হত না আমাদের , তোর কাছে ক্ষমা চাওয়া যে বাকি থেকে যেত চিরকালের মত।আমাদের বন্ধুত্ব ক্ষনিকের ছিল না রে বাঘা ,আমি যে আজও তোকে ঠিক আগের মতই ভালোবাসি ,আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না সময়ের মায়াডোর আমাকে কিভাবে ভুলিয়ে দিয়েছিল তোর কাছে ফিরে আসার চেনা পথ। ” সৃজার চোখও জলে ভরে উঠলো এই চিরন্তন মুহুর্তের সাক্ষী হয়ে। বাহাদুর বলে উঠলো, ” লাগতা হ্যায় বহুত দিন বাদ দোস্ত মিল্নেকি খুশিমে বাঘা কো আপনা দরদ ইয়াদ নাহি হ্যয় !” তিন্নি অস্ফুটে বলে উঠলো “দরদ ? ” বাহাদুর বলল “হা জি দিদিমনি ! উসকা পেটমে এক অপারেশন হুয়া ,ইসিলিয়ে কুছ দিনসে উসকা বাহার নিকালনা বন্ধ করা দিয়া ,ওয়াসেভি উমার কে ওজাসে অব ও যাদা বাহার নাহি যাতা। ইসিলিয়ে হামনে এক নয়া এলসেশিয়ান বাচ্ছা লে আয়া পিছলে সাল ,ইতনা বারা কম্পাউন্ড কা সিকিউরিটি করনে কি শক্তি আব বাঘা মে নাহি রাহা!” এবার ব্যাপারটা তিন্নি আর সৃজার কাছে জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল ,বাঘাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা তিন্নির কানে সৃজা বলল “তুই সত্যি পাগল তিন্নি ! মোড়কের বদলে যাওয়া রঙ দেখেই এত ভয় পেলে হবে ? ভিতর অব্দি না গেলে বুঝবি কি করে চেনা জিনিসটা সত্যি অচেনা হয়েছে কিনা !”

সৃজার হাত ধরে বাড়ির পথে হাঁট তে থাকা তিন্নি বলল , ” আমরা এরপর মাঝে মাঝেই স্কুলে আসবো সৃজা ,বাঘার জমে থাকা কথাগুলো আজ যে সবটা শোনা হলো না !” সৃজা অল্প হেসে বলল , ” নিশ্চই আসবো!কি জানিস তিন্নি আমরা জীবনে এগিয়ে যেতে যেতে কিছু এমন সম্পর্ক কে পিছনে ফেলে যাই যারা সারাজীবন আমাদের শুধু একবার ফিরে আসার অপেক্ষায় নিস্পলকে বসে থাকে।প্রচন্ড ব্যস্ততায় নিজের মুখ অনেকদিন না দেখার পর হঠাৎ একদিন সকালে আয়নার সামনে দাড়িয়ে কোনো মানুষ যেমন নিজের অস্তি ত্ব নিয়ে মুহুর্তের জন্য হলেও সন্দেহ প্রকাশ করে ,ঠিক তেমনি আমাদের ভুলে যাওয়া সম্পর্ক গুলো হঠাৎ চোখের সামনে চলে এলে আমাদের মন নিজের প্রতি এক ভীষণ অবিশ্বাসে একেবারে দিশেহারা হয়ে পরে । জীবনে এগিয়ে যাওয়াটাই নিয়ম হলেও , কিছু সময় যে হাতে রাখতে হয় ফিরে দেখার জন্য ,অনেক দেরী হয়ে গেলে নিজেকে যে কিছুতেই ক্ষমা করা যায় না রে তিন্নি।”

তিন্নি সৃজাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেদে বলল ” আমি কি খুব দেরী করে ফেলেছি সৃজা ? বাঘা সব অভিমান ভুলে আমাকে সত্যি ক্ষমা করে দেবে তো ? ” সৃজা অল্প হেসে বলল ” ধুর বোকা মেয়ে ! সত্যি দেরী হয়ে গেলে আজকের রিইউনিয়ন যে অসম্পূর্ণ থেকে যেত আর অভিমান করে চিরকাল দূরে সরে থাকতে শুধু যে মানুষ ই পারে ,তোর বাঘার যে সে কৌশল জানা নেই। “

ভোজন রসিক ভগবান

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

সোমবার সকালবেলা বাড়ির সামনের শিব মন্দির থেকে প্রনাম করে বেরোতেই তাথৈ দেখল ,হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে অটোর লাইনে দাড়িয়ে আছে মেঘ ! তাথৈ হেসে ওর দিকে এগিয়ে যেতেই ,মেঘ বলল “কিরে তাথৈ ! সামনে পরীক্ষা বলে এভাবে সকাল সকাল গুড়ের রসগোল্লা ভগবানের সহ্য হবে তো ? যাই বলিস ভদ্রলোক বেশ ভোজন রসিক বলতে হবে,গ্যাস অম্বলের বালাই নেই ,যে যা দেয় কোনো কথা না বলে খেয়ে নেন গপাগপ !” তাথৈ হেসে বলল , “এবার বোধহয় আর পরীক্ষায় পাশ করা হলো না রে মেঘ ,তোর লোভ দেওয়া গুড়ের রসগোল্লা ভগবানের খেতে বয়েই গেছে ,আজ আবার শিবরাত্রি ,আমার হাড়ির ঠিক পিছনেই কে.সি দাসের নাম লেখা প্যাকেটের ভিতর চারগুন বড় হাড়ি দেখে আমার আগেই মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল ,এখন তোর কথা শুনে আর কোনো আশাই বাকি রইলো না!” মেঘ বলল ” শুধু কে.সি দাস ? তুই তাহলে ভালো করে দেখিস নি তাথৈ ! গুপ্তা ব্রাদার্স ,হিন্দুস্তান সুইটস ,হলদিরাম,মৌচাক আরো কত নামী দামী প্যাকেটও নিশ্চই এই খুশি করার দৌড়ে সামিল হয়ে প্রচন্ড উত্তেজনায় সেই ভদ্রলোকের একবার চেখে দেখার অপেক্ষায় কাক ভোর থেকে প্রহর গুনছে! তোর হয়তো আমাকে লোভী বেয়াদপ মনে হচ্ছে কিন্তু সত্যি বলতে কি ,ওই প্লেট ভর্তি হরেক রকম মিষ্টির সামনে হাত জোর করে দাড়িয়ে শুধু ব্লাড সুগারের রোগী কেন যেকোনো সাধারণ মানুষেরই জিভ শুকনো রাখা অসম্ভব।মহাপুরুষ রাই বা পিছ পা কোথায় ? রামকৃষ্ণ দেব তো শুনেছি কোনো রাখ ঢাক না করে আগে নিজে চেখে তবেই তার প্রানের মা কে শেয়ার দিতেন !” উত্তরে তাথৈ বলল ” তোর মত নাস্তিকেরা ভগবানকে ভালবাসার কদর যে বুঝবে না তাতে আর আশ্চর্য কি ,তাই বলে ওত বড় মহাপুরুষের নাম নিয়ে এসব আজে বাজে বললে কোনদিন গণধোলাই না খেয়ে যাস । ” মেঘ বলল “কেন গণধোলাই কেন ? আমি কি মিথ্যা বলছি নাকি ? আমি রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র ! রামকৃষ্ণ দেবের কোলে পিঠেই মানুষ,তাই ওনার ব্যাগগ্রাউন্ড আমার থেকে তোর মত সেন্জিভিয়ার্সের পাশ করা মেয়ে বেশি জানবে ?” তাথৈ জিজ্ঞাসা করলো ,” কেন ? সেন্জিভিয়ার্সের পাশ করা মেয়েরা কি বাংলার মহাপুরুষ নিয়ে কিছু জানে না নাকি ? ” মেঘ হেসে বলল ,” মহাপুরুষ ছাড় , তোরা তো প্রচন্ড ইম্পর্টান্ট একটা সম্পর্ক নিয়েই কনফিউসড , নিজের বাবাও ফাদার ,স্কুলের প্রিন্সিপাল ও ফাদার আবার ভগবানও ফাদার ,তোদের ফাদার ডাকায় একসাথে কজনের হেচকি ওঠে একবার ভেবে দ্যাখ তো । ” তাথৈ বলল , “ভালো যা ! তোদের মত গেরুয়া পোশাক পরা লোক দেখলেই তো আর ‘মহারাজ ‘ বলে পায়ে পরে যাই না । ” মেঘ বলল “তা গেরুয়া রং যে সে রং নাকি ! ভুলে যাস না আমাদের জাতীয় পতাকাতে সবচেয়ে উপরে গেরুয়া রং!” তাথৈ বিদ্রুপের স্মরে বলল “তা সেটাও কি তোদের মহারাজ দের সাজেসন বলতে চাস ? ” মে ঘ হেসে বলল “ত্যাগ বুঝিস ত্যাগ? সাধে কি বলি সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে ? গেরুয়া হলো ত্যাগের প্রতীক।সে আর তুই কি বুঝবি? সকাল সকাল গুড়ের রসগোল্লার প্রসাদ খেয়ে শুধু ভোগ ই করে গেলি !” তাথৈ বলল “উফ ! তোর সাথে আমি তর্কে পেরে উঠব না।তা এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস ?”মে ঘ বলল “আগে বল সাথে যাবি ,তবে বলব। ” তাথৈ বলল “এখন যদিও কোনো কাজ নেই ,তা কখন ফিরবি ?”মে ঘ একটু ভেবে নিয়ে বলল “তা ঘন্টা তিনেক তো লাগবেই !” তাথৈ বলল “ওরে বাবা ! তাহলে মা কে বলে দেখতে হবে ।” মে ঘ বলল “সে আমি কাকিমাকে বলে দেব খন ,রাস্তা ঘাট ভালো না ,একটা সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে সাথে থাকলে ভরসা পাব বলে নিয়ে গিয়েছিলাম। ” তাথৈ বলল ,”মনে থাকে যেন ! মায়ের বকার সামনে তুই আমার ঢাল ,তখন কিন্তু তাড়া আছে বলে পালাতে চাইলে শুনবো না। “

অটো থেকে নেমে বেশ অনেকটা হেঁটে তাথৈ ক্লান্ত হয়ে বলল “তা আমরা কোথায় যাচ্ছি একটু বলবি? আর যে পারছি না” | মেঘ বলল “ব্যাস আরেকটু কষ্ট করে চল ! প্রায় এসে গেছি । ” একটু পরেই মেঘ একটা বাড়ির সামনে এসে বেল বাজাতেই একজন বয়স্ক লোক এসে দরজা খুলল। মেঘ বলল “নগেন কাকা ,স্যার বাড়িতে আছেন ? ” নগেন কাকা হাসিমুখে মাথা নাড়তেই মেঘ তাথৈ এর হাত ধরে বলল “চল !” ওরা দুজনে দোতলার একটা ঘরে ঢুকতেই দেখল একজন বয়স্ক মানুষ হুইল চেয়ারে বসে বই পড়ছেন। মেঘকে ঢুকতে দেখেই তিনি হেসে বললেন , “গাধা !এবারও ভুলিস নি ?” মেঘ বলল “সে আর কি করব ? নগেন কাকার হাতের রান্না খেতে আপনার বাড়িতে আসার লোভ যে কিছুতেই সামলাতে পারি না। ” মেঘের পিছনে হাত ধরা তাথৈ কে দেখে ভদ্রলোক আবার হেসে বললেন ? ” এ কে ?তোর গার্লফ্রেন্ড বুঝি ?” মেঘ বলল “পাগল হয়েছেন ?একটা সেন্জিভিয়ার্সের মেয়েকে গার্লফ্রেন্ড করলে আমার তাকে রাখা সাধের বাংলা বই গুলো যে আত্মহত্যা করবে !” ভদ্রলোক হা হা করে হেসে তাথৈ এর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন ” তা ওর কথায় তুমি কিছু মনে কোরো না মা ! এ আমার ই দোষ ,বেয়াদপ ছাত্রের হয়ে এই লজ্জিত শিক্ষক তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী । তোমার নাম কি মা ?” তাথৈ হেসে বলল ” না না ,এরকম ভাবে বলবেন না ,গীতবিতান কে যদি কেউ পেপার ওয়েট হিসেবে ব্যবহার করে ,তার জন্যে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার ওপর সন্দেহ করার মত মেয়ে তাথৈ নয় ! ” ভদ্রলোক মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল “কি সুন্দর উত্তর। আর নাম টাই বা কম যায় কিসে ? তাথৈ !এত সুন্দর নাম ছেড়ে তুই বুঝি ওকে সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে বলে ডাকিস ?” মেঘ হেসে বলল ” ওর বাংলার যুক্তাক্ষর লেখা দেখলে আপনিও বলবেন। ” মেঘের কথা শেষ না হতেই নগেন কাকা মিষ্টির প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকলো ,তাকে দেখে চেয়ারে বসে থাকা ভদ্রলোক বললেন , ” নগেন ,ওদের কে দিয়েছিস তো ? দেখিস কারো খিদে যেন বাকি না থেকে যায় ” । নগেন কাকা অল্প হেসে বলল ” তা আর বলতে ? এমন সুখের চাকরির ওপর আমার যে ভারী লোভ। ভোলাকে ওখানে দাড় করিয়ে তবে এসেছি, ওদের তো সময় লাগবে,মেঘ দাদা তো আর রোজ রোজ আসে না ,এই বিশেষ দিনে আর কতক্ষণ তাকে কিছু না খাইয়ে বসিয়ে রাখব? । ” তাথৈ কিছু বুঝতে না পেরে মেঘের দিকে তাকাতেই মেঘ ওর হাত ধরে টেনে বারান্দায় নিয়ে গেল , তাথৈ দেখল বাড়ির উঠোনে প্রায় ২৫ টা কুকুর একসাথে ভাত খাচ্ছে আর একটা কম বয়সী ছেলে কারো থালায় ভাত শেষের দিকে দেখতে পেলেই দৌড়ে গিয়ে ভরে দিয়ে আসছে । মেঘ বলল “ওরা রাস্তার কুকুর। স্যার ওদের তিন বেলা এভাবেই খেতে দেন ,শরীর খারাপ হলে চিকিৎসা করান ,বর্ষা আর শীতের দিনে প্লাস্টিক আর চাদর দিয়ে পুরো উঠোন টা ঢেকে ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন।” তাথৈ অবাক হয়ে মেঘের দিকে তাকাতেই মেঘ হেসে বলল “তুই ভুল জানতিস। আমি নাস্তিক নই তবে আমার ভগবান তোর বাড়ির পাশের মন্দিরে থাকে না তাথৈ । তাকে দেখা যায় ,ছোয়া যায় ,পায়ে হাত দিয়ে প্রনামও করা যায়।এবার চল একটা ছোট্ট কাজ বাকি আছে ।” মেঘ ঘরে ঢুকে প্যাকেট থেকে একটা টিফিন বাক্স বের করে চেয়ারে বসা ভদ্রলোকের সামনে রেখে বলল “আপনার কথা মত এবার আর মাকে হাত লাগাতে দিইনি ,নিজেই বানিয়েছি আপনার পছন্দের নলেন গুড়ের পায়েস ,কোনমতে চোখ কান বুজে কষ্ট করে খেয়ে নিন । এবারেও মোমবাতি আনিনি কারণ আমার মতে আপনার বয়স বাড়ে না,কোনদিন বাড়বে না । ” ভদ্রলোক হেসে তখনি টিফিন বাক্স টা খুলে এক চামচ মুখে দিয়ে বলল “আহ্ ! অমৃত ,এই চরম প্রাপ্তিতে আমার শিক্ষক জীবন সার্থক হল মেঘ”। তারপর তাথৈ আর মেঘের মুখে অল্প পায়েস দিয়ে তিনি হাসিমুখে বললেন ” মেঘ !তাহলে এবার তোর হ্যাপি বার্থডে গান টা হেড়ে গলায় গেয়ে ফ্যাল প্রতি বছরের মত,সেই ফাকে আমি তোর এত সুন্দর করে বানানো পায়েস টা এক নিশ্বাসে শেষ করে নি । ” মেঘ বলল “না ,আপনার এই বিদ্রুপ বছরের পর বছর আর সহ্য হচ্ছে না তাই এবার গান গাওয়ার লোক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি ” । তারপর তাথৈ র দিকে তাকিয়ে হেসে বলল ,”এই যে সেন্জিভিয়ার্সের মেয়ে ! একটা সুন্দর গান গেয়ে শোনা আমার ভগবান কে ,তোকে এতদূর খরচা করে নিয়ে আসার কষ্ট আমায় ভুলিয়ে দে দেখি ! ” তাথৈ মেঘের কথার উত্তর না দিয়ে হুইল চেয়ারে বসে থাকা ভদ্রলোক কে প্রনাম করে গেয়ে উঠলো :

“May God bless and keep you always
May your wishes all come true
May you always do for others
And let others do for you
May you build a ladder to the stars
And climb on every rung
May you stay forever young
Forever young, forever young
May you stay forever young।।”

ভদ্রলোক তাথৈ এর মাথায় হাত রেখে জল ভরা চোখে বলল “নিশ্চই থাকব !এত মিষ্টি মেয়ের আবদার ফেলে দেওয়ার সাধ্য যে আমার নেই। মেঘের দলে যে এবার আরো একজন সামিল হলো ,আজ থেকে আমার বুড়ো হওয়া এক্কেবারে বন্ধ । আর মেঘের ওই আবোল তাবোল কথায় তুমি একদম কান দিও না মা ,ও আমাকে খুব ভালবাসে বলেই বোধহয় এতটা বাড়িয়ে বলে। আমি একজন খুব সাধারণ অসহায় মানুষ যে নিজের পায়ে হাটতে পর্যন্ত পারে না ,ওই অবলা জীব গুলো না থাকলে আমার বেঁচে থাকা যে অসম্ভব হয়ে উঠত। আপাতদৃষ্টিতে যাই মনে হোক না কেন আসল সত্যি টা হলো আমি ওদের নয় ,ওরাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। “

তাথৈ চোখের জল আড়াল করে মেঘের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে বলল ,”মোটেই না ! আসল সত্যি টা হলো কোনো নামী দামী দোকান থেকে কেনা মিষ্টি নয় , কাঁচা হাতে তৈরী, মিষ্টি কম,পুড়ে যাওয়া পায়েস ই ভগবানের মনে এরকম সকল প্রাপ্তির অনুভূতি আনতে পারে ! ভদ্রলোক সত্যি ভোজন রসিক বলেই হয়ত ভালবাসার স্বাদকে অমৃত বলে চিনে নিতে তার এতটুকু দেরী হয় না।”

ঘুমের দাম

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

রবিবারের অলস সকাল ! সবে একটা গল্প পড়া শেষ করে  খোলা জানলার  দিয়ে তাকিয়ে গুনগুন করছিল রিমঝিম  ।

(রিমিঝিম ): আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়  ….

দরজা খুলে ঢোকার আওয়াজ :

(রিমিঝিম ): কিরে  আকাশ তুই ? এভাবে না বলে কয়ে এত সকালে আমার বাড়ি চলে এলি যে ! তোর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কাকিমা নিশ্চই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দিয়েছেন!

(আকাশ) : একদম ঠিক ধরেছিস ! আর সাথে এও বলেছে আবার ঢোকার চেষ্টা করলে ব্যাপার টা মোটেই আর ঘাড় অব্দি থেমে থাকবে না, কোনরকমে অন্যের কাঁধে হাসপাতালে পৌছেও শান্তি নেই ,সেই হাসপাতালের বিল নাকি আমাকেই মেটাতে হবে লোকের বাড়ি কাজ করে! তাই বাড়ি যাওয়ার সময় কাকিমাকেও আগাম কাজের কথা বলে যাব ভেবেছি ! এটুকু বলতে পারি নলিনী দি র থেকে অন্তত একদিন হলেও কম কামাই করব আমি !”

(রিমঝিম) : হাসি।

(আকাশ): ”হ্যাটা করছিস ? ভাবছিস পারব না ? রাতের খাওয়া থালা আছে নিশ্চই ? ওরই একটা ধুয়ে আমি তোকে ডেমো দেখিয়েই ছাড়ব আজ ,তারপর দেখিস তুই আয়নার বদলে সবসময় আমার ধোওয়া থালা নিয়ে ঘুরবি !”

(রিমঝিম প্রচন্ড হাসি অল্প থামিয়ে ) : “আচ্ছা একটা কথা বল ! তুই কি করে জানলি নলিনী দি খুব কামাই করে ?

(আকাশ) : “ওই তো ! নলিনী দির ডিমান্ড নিয়ে তোর কোনো আইডিয়া নেই রিমঝিম ! আমাদের পদ্মা মাসি সেই যে পদ্মার ইলিশ খেতে বাংলাদেশে গেল তারপর আর এলো না। গত কবছর পদ্মা মাসির অনাথ করে চলে যাওয়া আমাদের সং সার নলিনী দির ই হাতে ,তার একদিন কামাই তেই মার রাগের পারদ যেভাবে উপরে চরে ,আমি ভয়ে দৌড়ে গিয়ে সামনের কালী বাড়িতে একশো টাকার মিষ্টি কিনে দিয়ে আসি,পরপর দুদিন কামাই এর ধাক্কা আমরা পিতা পুত্র মিলেও সামলাতে পারব না রে ! পদ্মা মাসির ইলিশ প্রাপ্তির পর কাকিমা ই তো নলিনী দি কে আমাদের বাড়ির কাজ টা ধরিয়ে দিয়েছে আর সেই কৃতজ্ঞতা তেই তোর মতো পেত্নী কেও আমার মা তার সোনার টুকরো ছেলের গলায় ঝোলাতে রাজি ! “

(রিমঝিম  রাগের ভান করে) :  “হ্যাঁ তবে আর কি ! আমার যেন কলসী দড়ির অভাব হয়েছে !”

(আকাশ হেসে) ” আমি চটপট নিচের বাথরুম থেকে ঘুরে আসছি ,প্রকৃতির ডাক বুঝতেই পারছিস !”

(রিমঝিম হেসে) : “আচ্ছা !”

আকাশ বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই রিমঝিমের মনে পরল তাদের নিচের বাথরুমের আলো টা কাল রাত থেকেই জ্বলছে না ,আর জানলা টাও অনেকদিন বন্ধ বলে সকালবেলা তেও ভিতর টা একদম অন্ধকার,একটা টর্চ হাতে নিয়ে এগিয়ে যেতেই নিচের করিডোরের কাছে দেখল আকাশ আর নলিনী দি কথা বলছে ! রিমঝিম কে সিড়ি দিয়ে নামতে দেখেই নলিনী দি দ্রুত চলে গেল রান্না ঘরের দিকে। রিমঝিম কিছু বুঝতে না পেরে সামনে এসে দাড়াতেই  , আকাশ নিজের অপ্রস্তুত ভাব আড়াল করে বলল :

(আকাশ) “সত্যি রিমঝিম! তোদের বাড়ির এই নকশা টা যে লোকটা বানিয়েছে ,তাকে একবার দেখলে কোনো কথা না বলে আমি সাষ্টাঙ্গে প্রনাম করতাম ! কদিন না এসেই পুরো ব্যাপরটা মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। নিচের বাথরুমের যেতে গিয়ে আমি যখন এই ভুলভুলাইয়ার অসহায় শিকার ঠিক তখনি নলিনী দির সাথে দেখা ! তা না হলে তোকেই বোধহয় এই করিডোরের উপর আমার বইয়ে দেওয়া গঙ্গা যমুনা পরিস্কার করতে হত ,আমি আর দাড়াতে পারছি না রিমঝিম, ঘরে যা ,আমি আসছি !”

( দূরে হেঁটে চলে যাওয়া পায়ের শব্দ)….

রিমঝিমের মনের উথালপাতাল প্রশ্ন তার নিচে আসার আসল কারণ টাই ভুলিয়ে দিল। আকাশ তার ছোট বেলার বন্ধু ,এই বাড়িতে তার নিত্য যাতায়াত ! রিমঝিমদের বাড়ি পুরনো রাজবাড়ির ছাচে হলেও সে জানে এ বাড়ির প্রতিটা কোণা আকাশের নখদর্পনে ! ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলাতে সে আকাশকে কোনদিন হারাতে পারেনি , এমন এমন নতুন জায়গায় সে লোকাতো ,রিমঝিম কে শেষমেষ হার মানতেই হত ! সেই আকাশের আজকের কথা আর যেই হোক রিমঝিম কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারবে না ! তাহলে সত্যি টা কি ? আকাশ কেন এভাবে মিথ্যা বলল রিমঝিমকে?  শুধু একজনই পারে রিমঝিমের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ! রিমঝিম দ্রুত পায়ে রান্না ঘরের সামনে এসে  নলিনী র উদ্যেশ্যে বলল:

(রিমিঝিম ) : আমাকে যদি সত্যি টা বল নলিনী দি, কথা দিচ্ছি আমি কাউকে বলব না ! ওটা কি নলিনী দি ? ওই যে তোমার আঁচলের তলায়? দেখাও আমাকে ।

মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকা নলিনী দি এবার আঁচলের আড়াল থেকে  একটা প্যাকেট বার করে রিমঝিমের দিকে এগিয়ে দিল !

(প্যাকেট খোলার আওয়াজ)

(রিমঝিম ):  “পঞ্চম শ্রেনীর বুক লিস্ট ! আর এই বইগুলা  কার নলিনী দি ?”

(নলিনী দি) : “আমার ছেলের ! আকাশ দাদাবাবু ই গত দুবছর ধরে আমার ছোট ছেলের স্কুলের বই গুলো কিনে দেয় ! আমার বড় ছেলের পড়ার খরচ আর সংসারের হাল টানার পর মাসের শেষে হাতে আর একদম কিছুই থাকে না দিদিমণি ! ২ বছর আগে বিজয়ার দিন আকাশ দাদা বাবুদের বাড়িতে ছোট ছেলেটাকে নিয়ে গেছিলাম ,আমার কাজের ফাঁকে কখন গিয়ে ও আকাশ দাদাবাবুর ঘরে ঢুকে পরেছিল | সবসময় বকবক করা আমার রানা , আকাশ দাদাবাবুর একটাই প্রশ্নের শুধু উত্তর দিতে পারেনি ,ওর স্কুলের নাম !তারপরদিন আমি যখন ও বাড়িতে কাজ করতে যাই , আকাশ দাদাবাবু আমাকে ঘরে ডেকে বলেছিল …..

(আকাশ ) : “তুমি রানাকে বাড়ির সামনের সরকারী স্কুল টায় ভর্তি করে দাও নলিনী দি ,কিন্তু ওর খরচের টাকা আমি তোমার হাতে দেব না , আমি ওর বই কিনে দেব আর স্কুলের মাইনা ও প্রতি মাসে আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসবো , কিছু মনে কোরো না নলিনী দি,তুমি তো রানার মা , খাবার আর বইয়ের মধ্যে কখনো বাছতে হলে আমি জানি তুমি টাকা দিয়ে সবসময় ওর খাবার টাই কিনবে !“

(রিমঝিম) : “এটা আর কেউ জানে ?”

(নলিনী দি কাকুতির স্মরে) ” না দিদিমণি ! আমি আর আকাশ দাদাবাবু ছাড়া একথা আর কেউ জানে না ,আজ তুমি জানলে। আমার রানার মুখ চেয়ে একথা কাউকে বোলো না দিদিমণি,আকাশ দাদাবাবু আমাকে বলেছে অন্যের মুখে রানা একথা জানতে পারলে , শিক্ষার উপর তার জন্মগত অধিকারকে পরের দেওয়া ভিক্ষা বলে ভুল হতে পারে ,সে যে বড় যন্ত্রণা! আমি কালকেই আকাশ দাদাবাবুকে রানার বুক লিস্ট দিয়ে এসেছিলাম ,আজকে আমি যখন সকালে কাজে গেছিলাম ,দাদাবাবু ঘুমাচ্ছিল , এখন তোমাদের বাড়িতে এসে বইগুলো আমার হাতে দিয়ে বলল  “আমি কাল রাতেই কিনে রেখেছিলাম নলিনী দি ,সকালে ঘুম থেকে উঠতে খুব দেরী হয়ে গেল আমার , বিকেল অব্দি মা য়ের থেকে এই বইগুলো লুকোনোর জায়গা আমার জানা নেই ,তাই সাত সকালে রিমঝিমের বাড়িতে আসতে হলো তোমাকে এগুলো দিতে! “

(নলিনী দি একটু থেমে ) ” আর ঠিক তখনি তুমি এসে পরলে দিদিমনি ! আকাশ দাদাবাবুর চোখের ইশারায় আমি ওভাবে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম। “

রিমঝিম ভেজা চোখে আর দাড়িয়ে থাকতে না পেরে নিজের ঘরে ফিরে এসে দেখল আকাশ ওর বিছানার পাশে র চেয়ারে বসে আছে ! (আকাশ হেসে বলল)  “কিরে ? পেট পরিষ্কার করতে হল ? এবার ব্রেকফাস্ট টা জমিয়ে খাবি কি বল !”

রিমঝিম এবার আর হাসলো না , আকাশের পাশে বসে বলল ” তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব আকাশ ? “

(আকাশ ) ” এইরে! কি কথা ? প্রপোস করার প্ল্যান করিসনি তো আবার ? বলা যায় না এত সকাল সকাল তোর বাড়িতে এসেছি বলে হয়ত ভেবে বসেছিস আমার আর মেয়ে জুটছে না ,তাই মেয়ের খোঁজে এভাবে হন্যে হয়ে ঘুরছি !”

(রিমঝিম অল্প হেসে ) ,” আজকে না হলেও যদি সত্যি একদিন প্রপোস করি তাহলে কি করবি ? পালিয়ে যাবি ?”

(আকাশ  রিমঝিমের কাছে এসে বলল) ” পালাতে তো হবেই ,তবে একা পালাব না ! ভুল যে করছে উসুল তো তাকেই গুনতে হবে,এটাই যে নিয়ম !তাই আমার জ্বালায় পাগল হয়ে যখন তুই নিজের কপাল চাপড়ে ভগবানকে দুষবি ,তখন আমি হাত পা ছড়িয়ে হা হা করে হাসব! ভেবে দ্যাখ রাজি তো ?”

(রিমঝিম  খোলা জানলার দিকে মুখ করে বলল) “সময় করে ভেবে দেখব ক্ষণ !”

(আকাশ ): ” হাজার বছর সময় দিলাম তোকে ,তার মধ্যে জানালেই হবে ! এবার কি একটা প্রশ্ন আছে বলছিলি ,তাড়াতাড়ি করে ফ্যাল ,তোর যা ভুলো মন ,আমার আবার টেনসনে বিরিয়ানি হজম হয় না ,আজকে তো নেপুদার বিয়ের নেমন্তন্ন ” ।

(রিমঝিম আকাশের দিকে না তাকিয়েই বলল ) : “তোর নাম টা কে রেখেছিল রে ?”

(আকাশ 🙂 ” কোন নামটা ? আমার তো অনেক নাম ! এই যেমন হনুমান নাম টা মায়ের দেওয়া,গাধা- শুয়োর এগুলো বাবার দেওয়া,ছোট মামা র দেওয়া অনেক আদরের নাম ‘কুলাঙ্গার’! ..”

রিমঝিম এবার হাসি চেপে রাগের ভান করে আকাশের দিকে তাকাতেই সে বলল ” আরেকটা নাম আছে বুঝলি রিমঝিম ? মা বলে আমার ঠাকুমা নাকি প্রথম দিন আমাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে আমাকে ‘আকাশ দাদাভাই’ বলে আদর করেছিল ,আর সে শুনে ওই ২ ঘন্টা বয়সেই আমার আনন্দের আর কোনো সীমা পরিসীমা ছিল না ,সারা বিছানা জলে ভাসিয়ে হাত পা ছড়িয়ে গদগদ হয়ে লুটোপুটি যাকে বলে !”

(রিমঝিম খিলখিল হাসি )….

(আকাশ তার কানের কাছে মুখ এনে বলল ) ” খুব তাড়াতাড়ি তে কি বলব ভেবে না পেয়ে একদম বাজে ছড়িয়ে ফেলেছি রিমঝিম ! তোর বাড়ির দেওয়াল গুলো পর্যন্ত আমার অজুহাত শুনে একেবারে অট্টহাসিতে ফেটে পরছিল ! উপরে ওঠার সময় তোকে নলিনী দির সাথে কথা বলতে আমি দেখেছি। তাই একটা ছোট রিকোয়েস্ট আছে ! রানার কথা যেন আর কেউ জানতে না পারে ,বুঝতেই পারছিস, নলিনী দিকে পার্মানেন্ট করতে এই বুদ্ধি টা অনেক রাত জেগে মাথা থেকে বার করেছি ,সবাই জেনে গেলে আবার নতুন করে innovation এর ঝক্কি ! আমার stipend এর তুলনায় সরকারী স্কুলের আর কতই বা খরচা বল ,পদ্মা মাসি চলে যাওয়ার পর বাবার লুঙ্গি ধোয়ার ভয়ে রাত ভর ঘুম আসত না আমার , আসল কথা হলো ওই কটা টাকা দিয়ে আমি রানার জন্য বই নয় নিজের জন্য ঘুম কিনেছি,তুই তো জানিস ,আমি ছোটবেলা থেকেই ঘুমোতে বড় ভালোবাসি রে রিমঝিম । “

রিমঝিম এবার আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি ,এরকম ঘুম কেনার ইচ্ছা তোর মত যেন আরো অনেকের হয় আকাশ,তাহলেই সবার অগোচরে অনেক রানার বইয়ের খরচ উঠে যাবে !”

স্বাধীনতা

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বৃষ্টি ব্রেকফাস্টের থালা টা হাতে নিয়ে জানলার পাশে বসে রাস্তার দিকে তাকালো , সবসময়ের মতো রবিবার সকালের ব্যস্ত রাস্তা। দৈনন্দিন জীবনের একফালি টুকরো, প্রতি রবিবার এই বারান্দায় বসেই মন ভরে উপভোগ করে বৃষ্টি। আজকে অন্য দিনের থেকে রাস্তা টা একটু বেশি ব্যস্ত কারণ আজ হল ১৫ ই আগস্ট । বৃষ্টি দের বাড়ি থেকে একটু দূরেই একটা প্রাইমারি স্কুল , প্রচুর ছোটো ছেলে মেয়ের দল তাদের বাবা মায়ের সাথে আজকে স্কুলে এসেছে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগদান করতে , তাতানও ওই স্কুলে ই পরে, ওকে ভোরবেলা পৌঁছে  দিয়ে এসেছে মনিমা । তাতান বৃষ্টির ছোট কাকুর ছেলে , ক্লাস থ্রি তে উঠেছে এবার , বয়সে প্রায় দশ  বছরের ছোট সে বৃষ্টি র চেয়ে তবুও বাড়িতে থাকার বেশির ভাগ সময়টাই ওর সঙ্গে গল্প করে কাটায় বৃষ্টি  , অন্য কারোর সাথে বেশি কথা না বলা তাতান , বৃষ্টির সাথে দিনরাত এত কি করে গ ল্প করে ,বাড়ির সবাই প্রায় এই নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে। এই তো সেদিন রাতে খাবার টেবিলে তাতানকে খাইয়ে দিতে দিতে মনিমা যখন ওকে জিজ্ঞাসা করছিল ,” তোর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে রে তাতান ? রানা ,অর্ঘ্য না অনুসুয়া ? ” তাতান  আঁকার  খাতা থেকে মুখ না তুলেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে গম্ভীর ভাবে জবাব দিয়েছিল “দিদিভাই”।

কালকে রাতে ঘুমাতে যাবার আগে তাতানকে করা প্রমিস রাখতে, আজকে বৃষ্টি যাবে তাতান কে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে । প্রতি বছরের মত এবারেও সকাল দশ টায় অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবে আর তারপরই স্কুল ছুটি । তাড়াতাড়ি স্নান সেরে আয়নার সামনে চুল আচড়ানো শেষ করতেই বৃষ্টির মোবাইল টা বেজে উঠল ,চুলের ক্লিপ  টা লাগাতে লাগাতে ফোন টা ধরে বৃষ্টি বলল ,”বল”।

ওপাশে তন্ময়ের ভাঙ্গা গলা  : বৃষ্টি ! আমার খুব জ্বর হয়েছিল রে ,সেজন্য কালকে কোচিং এ যেতে পারিনি , D.K.D র কালকের ক্লাস টা খুব জরুরি  ছিল ,তোর থেকে নোটস টা নেব ,বুঝতে না পারলে তুই বুঝিয়ে দিবি তো ?

বৃষ্টি হেসে বলল : না দেব না ,আমার সময়ের অনেক দাম।  তুই কি এখনি নিবি না পরে ? আসলে আমি একটু বেরোচ্ছি তাতানকে স্কুল থেকে আনতে ,বিকেলের দিকে হলে অসুবিধা নেই তো ? এখন বরং রেস্ট নে তুই ,জ্বর টা কমলে ক্ষণ D.K.D র কথা ভাবিস,গলার যা অবস্থা ,ফোনে নম্বর সেভ  না থাকলে তো বুঝতেই পারতাম না যে আমি মাধ্যমিকের ফার্স্ট বয় তন্ময় মজুমদারের সাথে কথা বলছি ।

তন্ময় :  জ্বরে কাহিল অসহায় ছেলেটাকে খোঁচা  মেরে প্রাণ জুড়োলো তো বৃষ্টি চক্রবর্তী ? বিকেলে মা আমাকে জোর করে হলেও ডাক্তার দেখিয়েই ছাড়বে বলেছে ,২ দিন কোনভাবে কাটাতে পারলেও আজ আর বাগে আনতে পারব না সেই প্রচন্ড প্রতাপশালী মহিলা কে ,তাই আমি এখনি যাচ্ছি তাতানের স্কুলে র সামনে ,তুই আসার সময় নোটস টা নিয়ে আসিস ,দুপুরে আমার ঘুম আসে না ,ওটাতে চোখ বুলিয়ে নেব একবার ,কিছু বুঝতে না পারলে বিকেলে ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার সময় তোর বাড়িতে হানা দেব ,আর কি !

বৃষ্টি  : আচ্ছা ,সবসময়ের মত দেরী করিস না কিন্তু ,স্কুল ঠিক ১০ টায় ছুটি হবে ,রোদের মধ্যে তাতানকে নিয়ে আমি কিন্তু বেশীক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে পারব না ।

স্কুলের  সামনে পৌঁছে  হাত ঘড়ি টা দেখে নিল বৃষ্টি , ছুটি হতে এখনো পাঁচ মিনিট বাকি । দূর থেকে ছাতা মাথায় দিয়ে তন্ময় কে হেঁটে  আসতে দেখে বৃষ্টি মনে মনে ভাবলো , ” সত্যি বাবা ! জ্বরের ঘোরে ফিসিক্সের নোট , এর মত পাগল ছাড়া কার ই বা মাথায় ঢোকা সম্ভব  ,সাধে কি সবাই আইনস্টাইন বলে !” ব্যাগ থেকে খাতা টা বের করে নিল বৃষ্টি ,তন্ময় আসতেই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল ,”নে ,তোর D.K.D র অমৃত ! জ্বরের মধ্যে আর রোদে দাড়িয়ে না থেকে এবার বাড়ি যা !” তন্ময় হেসে বলল  , “আমার এখন আর জ্বর নেই ,কাল রাতের পর এখনো আর আসেনি , তোর সাথে তোর বাড়ির দিকেই একবার যাব কয়েকটা জিনিস জেরক্স করতে হবে,আমাদের ওদিকের দোকানের জেরক্স  টা খারাপ ।” বৃষ্টি এরপরে আর কি বলবে বুঝতে না পেরে শুধু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল !

তাতান ভিড়ের মধ্যে দৌড়ে এসে বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে বলল ,” Happy Independence Day দিদিভাই! ” তন্ময়ের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত বৃষ্টি একদম খেয়াল ই করেনি কখন স্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছে তাতান , ভিড়ে তাতানের উল্টে যাওয়া টাই টা ঠিক করে দিতে দিতে হেসে বৃষ্টি বলল,”আগে বল , Independence এর বাংলা কি ? “

তাতান  : স্বাধীনতা , তুই তো কালকেই শেখালি !

বৃষ্টি হেসে বলল : একদম ঠিক ।

ইংলিশ মিডিয়াম এ পড়া  তাতানকে কিছুতেই বাংলা থেকে আলাদা হতে দেবে না বৃষ্টি ,নিজের ভাষা কে ভালবাসতে যেভাবেই হোক তাতানকে শেখাতেই হবে বৃষ্টিকে ।

তন্ময় :  আচ্ছা তাতান , এবার বল তো স্বাধীনতা মানে কি ?

তাতান মুখ নিচু করে বলল : জানিনা , এটা দিদিভাই শেখায়নি !

বৃষ্টি এবার হেসে ফেলে বলল  :  সত্যি, খুব ভুল হয়ে গেছে তাতান ! স্বাধীনতা মানে হল নিজের ওপর নিজের শাসন ,নিজের ইচ্ছা মত কথা বলতে পারা ,কাজ করতে পারাকেই বলে স্বাধীনতা ! তবে যা ইচ্ছা তাই করলে চলবে না ,তাহলে নিজেকে শাসন করা হলো না কিন্তু ,আগে তোকে ভাবতে হবে ,তোর যা করতে বা বলতে ইচ্ছা করছে ,সেটা কি ঠিক না ভুল ,কারণ নিজের ইচ্ছা যদি অন্যের ওপর হওয়ার অন্যায়ের কারণ হয়ে যায় সেই ইচ্ছা মত কাজ করা টাকে তখন আর স্বাধীনতা বলে না , সেটাকে বলে সেচ্ছ্বাচারিতা ! বুঝলি?

তাতান  : পুরোটা নয় , একটু সহজ  করে বুঝিয়ে  দে না  রোজের মত।

বৃষ্টি একটু ভেবে বলল : এই যে সেদিন বলছিলি তোর ক্লাসের  অরিন্দমের একটা বাক্য বলতে অনেক সময় লাগে ,আটকে আটকে যায় বার বার ,তাই ক্লাসে সবাই ওকে নিয়ে মজা করে ,রানা প্রায়ই ওর দলের সব বন্ধু নিয়ে টিফিন টাইমে আরিন্দম কে ঘিরে ধরে ইচ্ছা করে সিলেবাসের সবচেয়ে শক্ত ইংরাজী পদ্য  টা বলতে বলে ,তবুও অরিন্দম টিচার কে কখনো রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে না। কেন বল ?

তাতান :  রানা তো আমাদের ক্লাসের মনিটর ,সবাই ওর দলে ,ও বোর্ড এ নাম লিখে দিলে টিচার তো প্রচন্ড শাস্তি  দেয় ।

বৃষ্টি বলল : এর মানে হলো অরিন্দম স্বাধীন নয় কারণ সে রানা কে ভয় পেয়ে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও সেই কাজ টা করছে ,যেটা রানা ওকে করতে বলছে ।

তাতান :  তাহলে রানা কি স্বাধীন দিদিভাই ?

বৃষ্টি : ওই যে তোকে বললাম নিজের যা খুশি তাই করাকে স্বাধীনতা বলে না ,আগে দেখতে হবে সেটা ঠিক না ভুল , রানা নিজের মজার জন্য অরিন্দমের ওপর যে অন্যায় করে সেটাকে কখনই স্বাধীনতা বলে না ,বলে সেচ্ছ্বাচারিতা ।

তাতান একটু ভেবে বলল : তাহলে দিদিভাই ,আমি কি স্বাধীন ? আমি তো অরিন্দম কথা বললে কখনো হাসি না ,ওকে আমার টিফিন ও দি মাঝে মাঝে।

বৃষ্টি : না তাতান , এক্ষেত্রে তুইও স্বাধীন নস ,তোর নিজের ওপর শাসন আছে ঠিকই কিন্তু তোর ইচ্ছা থাকলেও রানার ভয়ে অরিন্দম কে সমর্থন বা করতে পারিস না ,অরিন্দমের জন্য তোর খারাপ লাগলেও ওর সাহায্য  করতে টিচার কেও কখনো রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ করিসনি। অন্যায় দেখেও,নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ,শুধু ভয়ের কারণে চুপ করে থাকিস তুই ,স্বাধীন হতে গেলে তো ভয় পেলে চলবে না তাতান ,তুই যদি নিজের ভয় কাটিয়ে একদিন স্বাধীন হয়ে যাস ,যেটা উচিত সেটা করতে পারিস আর যেটা অনুচিত সেটাকে আটকাতে পারিস ,হতে পারে তোকে দেখে আরো অনেকে তোর ক্লাসে তোর মত স্বাধীন হতে চাইবে , সেটা অরিন্দমও হতে পারে অথবা অন্য কেউ ।

তাতানের সাথে কথা বলতে বলতে বাড়ির দিকে অনেকটা চলে এসেছে বৃষ্টি , তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে দেখল ,সেও তাতানের পাশে চুপ করে হাটছে।বৃষ্টি হেসে বলল ,”বুঝলি তন্ময় ! এবার আমার তাতান কিন্ত স্বাধীনতার মানে জানে ,আর সিলেবাসের বাইরে প্রশ্ন করে ঠকানো যাবে না !”

তন্ময় হেসে বলল  : জেরক্সের  দোকান এসে গেছে ,আমার সময় লাগবে একটু ,তোরা চলে যা ।

তাতান হঠাৎ বলল : দিদিভাই ! ওই মিষ্টি লজেন্স টা কিনে দে না আগের দিনের মত ,এই দোকানেই তো পাওয়া যায় ।

বৃষ্টি হেসে বলল : আচ্ছা ,চল ।

তন্ময়ের জেরক্সের অর্ডার বুঝে নেবার পর দোকানদার বৃষ্টিকে লজেন্স দিতেই সে দেখল পাশে তাতান নেই ,বাইরে তাকাতেই দেখল উল্টো দিকে চায়ের দোকানে জটলা করে বসে থাকা পার্টির  ছেলে দের দিকে যাচ্ছে তাতান । বৃষ্টি কিছু বুঝতে না পেরে এগিয়ে যেতেই শুনলো তাতান রাস্তায় শুয়ে থাকা একটা কুকুরের দিকে হাত দেখিয়ে দোকানের অনেকের সাথে বসে থাকা মাঝখানের ছেলেটাকে বলছে ” কাকু ? তুমি ওকে ফুলঝুড়ি  জালিয়ে ভয় দেখাচ্ছ কেন? তুমি কি স্বাধীনতার মানে জানো  না?যা ইচ্ছা তাই করলে চলবে না ,নিজের ইচ্ছা যদি অন্যের ওপর হওয়া অন্যায়ের কারণ হয় সেটাকে আর স্বাধীনতা বলে না , বলে সেচ্ছ্বাচারিতা !” ছেলেটা প্রথমে খানিক টা অবাক হয়ে তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে তাতানকে বলে , ” ওরে ব্বাস! এইটুকু ছেলে হলে কি হবে,কি তেজ দেখেছিস ! বাবা র নাম কি রে তোর ?” পাশে বসে থাকা বাকিরা হেসে উঠলো ।

বৃষ্টি দৌড়ে এসে তাতানের হাত ধরে টেনে বলে ,” চলে এসো তাতান ! কতবার বলেছি এভাবে অচেনা মানুষদের সাথে কথা বলতে নেই ।”

তাতান : কিন্তু দিদিভাই ! তুই যে একটু আগেই আমাকে ..

তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বৃষ্টি উচু গলায় বলল : তাতান! মুখে মুখে তর্ক করবে না একদম ।  বাড়ি পৌঁছনো  অব্দি আমি যেন তোমার মুখে আর একটাও কথা না শুনি ।

হঠা ৎ তন্ময় এগিয়ে এসে চায়ের দোকানের ছেলেটা কে বলল ,” আরে বাবাই দা ! কেমন আছো গো ? বাড়িতে সব ভালো ?”

ছেলেটা একগাল হেসে বলল , ” ওই চলছে রে ভাই ,তুই তো আমাদের পাড়ার গর্ব , মাধ্যমিকের রেসাল্টের  দিন টিভি র লোকে এসেছিল তোর বাড়িতে শুনলাম ,আমার ওই সেদিন ই M L A শৈলেশ দার ইমার্জেন্সি কাজ পরাতে থাকতেই পারলাম না ধ্যুর  ! তোর সাথে আমাকেও টিভি তে দেখাত ,নেপুকে তো একঝলক দেখিয়েছে শুনলাম কোন একটা চ্যানেল ,মালটা ঠিক সময় জায়গায় গিয়ে দাড়িয়ে পরেছে মাইরি !এত আপসোস হয় রে আমার কি বলব , যাইহোক তুই তো সামনের বছর উচ্চমাধ্যমিক – জয়েন্ট না আরো কি কি পরীক্ষা দিবি সবাই বলছিল , এবার কিন্তু আমার টিভি তে এন্ট্রি চাই ! পাড়ার অনুষ্ঠানে  এবার তোকে একটা প্রাইজ দেওয়া হবে সবার তরফ থেকে।”

মাত্রাহীন রাগে তন্ময়ের দিকে পুড়িয়ে দেওয়া চাহনি তে দেখে বৃষ্টি বিদ্রুপের স্বরে বলল , “তাহলে মাধ্যমিকের ফার্স্ট বয় ! তুই তোর অভূতপূর্ব সাফল্য নিয়ে প্রানের বন্ধুদের সাথে আলোচনা কর ,আমরা এগোলাম।”

তন্ময় শুধু বলল ” না দাড়া ,আমিও যাব !” , তারপর বাবাই দার দিকে দেখে তন্ময় বলল , “ধন্যবাদ  বাবাই দা ! আর বলছিলাম ,তাতান আমার ভাইয়ের মত ,ওর কথায় তুমি কিছু মনে করো না ! “

আর সহ্য করতে পারছিল না বৃষ্টি,রাগে সারা শরীর তার জ্বালা করছিল, নিজের ঠোঁট কামড়ে মাটির দিকে তাকালো সে ,হাতে শক্ত করে ধরা তাতানের হাত |

বাবাই দা  :  ধ্যুর ! কি যে বলিস ! ও বোধহয় কুকুর বেড়াল ভালবাসে ,আসলে আজকে তো স্বাধীনতা দিবস ,পাপ্পু বাজি কিনে আনতে ওই লালু র সাথে একটু মজা করছিলাম !

তন্ময় এবার শক্ত হয়ে বলল :  এটা তোমার মজা হলেও কুকুর টার মজা নয় বাবাই দা , সব জীব জন্তুই আগুন দেখলে আর শব্দ শুনলে ভয় পায়,এভাবে অবলা জীবকে কষ্ট দেওয়া খুব অন্যায় বাবাই দা ,তোমার মত পরোপকারী মানুষ কে তো এসব মানায় না ।

বাবাই দা এবার একটু লজ্জা র ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে জিভ কেটে বলল : আরে ! এটা পাপ্পুর বুদ্ধি ! এই আমি প্রথমে বারণ করেছিলাম কিনা বল ?

পাপ্পু নামের ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই বাবাই দা বলল :দেখলি তো ! যত নচ্ছার জুটেছে দলে ,এ তদিনের রেপুটেশন টাই মাটি করে ছাড়বে ,এই নারান দা ! লালুকে ৪ টে বিসকুট দাও তো , আর হিসেব টা আমার খাতায় লিখে রাখো ।

তন্ময় হেসে বাবাই দা র কাধে হাত রেখে বলল “আচ্ছা বাবাই দা ! এগোলাম তাহলে ।

বাবাই দা এক গাল হেসে বলল : আচ্ছা ভাই ! ভালো থাক ,আবার দেখা হবে !

বৃষ্টি তাতানের হাত ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতে  লাগলো । তাতান হঠাৎ বলল , ” তন্ময় দা স্বাধীন , তাই না দিদিভাই ? “

বৃষ্টি উত্তর না দিয়ে বলল ,”ওই বাড়ির গেট দেখা যাচ্ছে ,সোজা গিয়ে একদম বাড়িতে ঢুকে যাও , আমি আসছি এখনি !”

তাতান মাথা নাড়িয়ে এগিয়ে যেতেই বৃষ্টি তন্ময় কে উঁচু  গলায় বলল  : এসব নাটকের কি দরকার ছিল ? যতসব লোফার ছেলের দল ! ওদেরকে ঐসব লেকচার দিয়ে কি লাভ হল তোর ?তোর কি মনে হয়! ওরা রাতারাতি সব বুঝে গেল ? এখন গিয়ে দেখ! আবার একই কাজ করছে হবে !

তন্ময় শান্ত গলায় বলল : জানি।

এবার বৃষ্টি আরো রেগে গিয়ে বলল : জানিস তো নিজের ,আমার ,তাতানের এতটা সময় নষ্ট করলি কেন তুই ? গায়ে জ্বর নিয়ে রোদের মধ্যে দাড়িয়ে এইসব জঘন্য  লোকজনদের ভাষন না দিলে তোর কি চলতো না ?

তন্ময় এবার ভারী গলায় বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল : না ,চলতো না । আজ আমি যা বলেছি বা করেছি ,তা না করলে তোর তাতানকে শেখানো স্বাধীনতার মানে সারাজীবন ওর কাছে মিথ্যে হয়ে থেকে যেতো বৃষ্টি ! বাবাই দা রা না বুঝতে পারলেও তাতান পেরেছে। বৃষ্টি  ! বাংলা শেখার মত স্বাধীন হওয়াও যে ওকে শিখতেই হবে !

 বৃষ্টি র চোখ ভিজে এলো , তন্ময়ের দিকে আর না তাকিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে ।

iPhone vs ভালবাসা

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ফোনের অ্যালার্ম এর শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল রিয়ার। Snooze বোতাম এ চাপ দিয়ে আধখোলা চোখে বিছানার সোজাসুজি জানলার দিকে তাকালো সে। তার এপার্টমেন্ট টা একদম সাধারণ হলেও বেডরুমের বিছানায় শুয়ে অনেকখানি আকাশ দেখা যায় , কি যে ভালো লাগে তার সকালের এই অল্প সময় টুকু ! আলসেমি ভরা আধখোলা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে রিয়া ,আজ আকাশ টা বেশ পরিষ্কার গত কদিনের চেয়ে। এয়ারপোর্ট এর খুব কাছেই তার এপার্টমেন্ট ,তাই নিরন্তর প্লেন এর আনাগোনা তার এই একফালি আকাশে ! এতদিন পরেও প্লেন র শব্দে একটুও বিরক্ত হয় না রিয়া , জানলা দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ অব্দি প্লেন র back wings এর শেষ বিন্দুটা পর্যন্ত চোখে ধরা পরে! ছোটবেলায় ছাদে দৌড়ে গিয়ে প্লেন দেখার সেই অদম্য রোমাঞ্চময় স্মৃতিকে তার এই এপার্টমেন্টর জানলা আজও জীবন্ত করে রেখেছে !

এলার্ম র আবার শব্দে বিছানায় উঠে বসলো রিয়া , ফোন টা হাতে নিয়ে অ্যালার্ম বন্ধ করে পাশে রাখতেই Door Bell টা বেজে উঠলো,দরজা খুলে দেখল একটা fedex এর পার্সেল পরে আছে দরজার সামনে |

রিয়া পার্সেল টা উঠিয়ে নিয়ে নিজের মনেই বলে উঠলো , “এখন কে পার্সেল পাঠাল ? জন্মদিন তো অনেক দেরী আর recently কিছু অনলাইন শপিংও তো করিনি।”  তাড়াতাড়ি প্যাকেট টা খুলে ফেলে যা দেখল , তা ওর মত short tempered মেয়ের রাগের পারদ মাত্রাহীন করতে যথেষ্ঠ। একটা iphoner বাক্স আর একটা কয়েক লাইনের চিঠি:

” রিয়া ,

আমার জন্মদিনের সকালে  তোর শব্দে “এই ছোট Gift ” তোর শুভেচ্ছা নিয়ে ঠিক সময়ে পৌঁছে  গিয়েছিল আমার ঠিকানায়। তুই বলেই কোনো সঙ্কোচ না করে বলতে পারি , তোর এই ছোট গিফ্ট র উজ্জল রং , over sized আয়তন , একগুচ্ছ জোর করে necessary করে দেওয়া application , oversensitive touch screen , আমার অতি সাধারণ পকেটে মানাবে না রে ! সবসময়ের অসাবধানী , ঝুট ঝামেলাহীন ছাপোষা আমি যে এই গুরু দায়িত্ব বহন করতে অক্ষম , সে আর কেউ না হলেও আমাকে ছোট থেকে চেনা মেয়েটার বোঝা উচিত ছিল ! যাইহোক ,বলাই বাহুল্য তোর এই ছোট গিফট একেবারে নিরাপরাধ । মুহুর্তের সিদ্ধ্বান্তে অবিচার করে ফেলিস না অসংখ্য মানুষের এই ছোট গিফট একবার পাবার আকাঙ্খার ওপর ! যদি এর পর ও কখনো কিছু আমাকে দেওয়া র কথা ভাবিস ,এমন কিছু দিস যা আমার সত্যি দরকার ,যা ছাড়া আমার এক মুহূর্ত চলবে না !

খুব ভালো থাকিস !
কৌশিক ”

রিয়া প্রচন্ড রাগে অভিমানে বিছানার বালিশ টা র উপর মুখ রেখে শুয়ে পড়ল ,তার চোখের জল ভিজিয়ে দিতে থাকলো হাতে মুঠ করে ধরা চিঠি টা কে !

কৌশিক রিয়ার ছোটবেলার স্কুল র বন্ধু ! এখন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটের ছাত্র! কৌশিকের  সাথে  শেষ বার দেখা হয়েছিল এক  বছর আগে , তার পনেরো দিন পর কলকাতা থেকে সিঙ্গাপুর রওনা দিয়েছিল রিয়া ! কলেজ পাশ করার পরেই নাম করা multinational কোম্পানি তে নতুন চাকরি ,মুহুর্তে রিয়ার থেকে কেড়ে নিয়েছিল তার নিজের সবকিছু । কৌশিককে যে সে কবে থেকে ভালবাসে তা ঠিক জানে না রিয়া , কিন্তু এইটুকু জানে , একবছরের ব্যবধান , নতুন শহরের ব্যস্ততা , অফিস এ চেনা অচেনা বন্ধুদের সাথে আড্ডা , নিত্যনতুন বিনোদন , কোনকিছুই রিয়ার মন থেকে মুছে দিতে পারেনি ছোট থেকে চেনা ওই বাড়ির পাশের ছেলেটাকে ! এরকম একগুয়ে , জেদী , অনুভূতিহীন  একটা ছেলেকে কেন যে সব উজার করে ভালবাসে রিয়া , কতদিন কতভাবে সেই প্রশ্ন নিজেকেই বারবার করেছে সে । সবার থেকে আলাদা ,ব ই নিয়ে বসে থাকা ছেলেটার দিকে সেই তো প্রথম বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। বন্ধ লাইব্রেরির মত কৌশিকের একাকিত্বের জগতে প্রায় জোর করেই ঢুকে পরেছিল সে !

একদিন স্কুলে রিয়ার এলোমেলো করে করা বইয়ের মলাট খুলে কৌশিক যখন নিপুন হাতে নতুন করে পরিয়ে দিয়েছিল আর কারণ জিজ্ঞাসা করাতে বলেছিল,  “তোকে যদি বিশ্রী ভাবে জামা পরিয়ে দেওয়া হয়,তোর মনখারাপ হবে না ? ”

সেই সেদিন থেকেই কৌশিক তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। রিয়ার অবান্তর বকবক মন দিয়ে শোনার ধৈর্য্য একমাত্র সেই রাখত! কৌশিক কোনদিন মুখে বলেনি রিয়াকে যে ওকে ও ভালবাসে , কিন্তু রিয়ার থেকে ভালো করে তাকে তো আর কেউ চেনে না , সেই চেনাই বারবার রিয়ার কানে কানে বলেছে “তুই আর গন্ডাখানেক বইছাড়া আর কিছুই নেই সে ছেলের অধিকারে! ” সেই জন্যেই তো রিয়া চাকরির এপয়েন্টমেন্ট লেটার পাওয়ার পর কিছু বলতে পারেনি কৌশিক কে ,কিছুতেই বুঝতে পারছিল না কিভাবে সব ছেড়ে চলে যাবে সে অত দূরে ! কৌশিকের কথাতেই অভিজ্ঞতার জন্য ইন্টারভিউ দিতে রাজি হয়েছিল সে ,তার নিজের ওপর অত বিশ্বাস ছিল না যতটা কৌশিকের ছিল ওর উপর !

এই দোটানার মধ্যে নিজের সব শক্তি দিয়ে যখন সাহস জোগার করছে রিয়া , একদিন সন্ধ্যায় কৌশিকের হঠাৎ ফোন, ” কাকিমার সাথে দেখা হয়েছিল রাস্তায়,তোর চাকরির খবর টা শুনলাম ! আর তো ৭ দিন বাকি মাত্র ,নতুন শহরে ব্যস্ত জীবন ,ভয় পাস না একদম , আমি জানি তুই ঠিক পারবি ,আমি সবসময় জানতাম! যাইহোক রাখি রে ,একটু বেরোতে হবে ,খুব ভালো থাকিস রিয়া !”

রিয়া অনেক চেষ্টা করেও আর কিছু বলতে পারেনি সেদিন | কৌশিক কে সে যতটুকু চেনে ,সে জানত আর কিছু বলে কোনো লাভ ও ছিল না! আসার দিন এয়ারপোর্ট এ অনেকক্ষন অপেক্ষা করে ছিল সে ,কিন্তু কৌশিক আসেনি ! এই একবছরে লেখা রিয়ার অগনিত ইমেইলের কোনো উত্তর দেয়নি কৌশিক ! এতদিনেও কি তার অভিমান একটুও কমেনি ? তার ভালবাসার কি কোনো দাম নেই কৌশিকের কাছে ? থাকলে একবার ও কি এতদিনে সে খোঁজ  নিত না রিয়ার ? রাতের পর রাত কৌশিকের নম্বর ডায়াল করেও মুছে দিয়েছে রিয়া , তার ভালবাসা কি ফেলনা নাকি ? সেই বা কেন হাত পাতবে বারবার? কৌশিকের জন্মদিনের গিফট রিয়া হঠাৎ করে কেনেনি ,অনেক দিন ভেবেও সে যখন কিছুই খুঁজে পাচ্ছিল না এই সিঙ্গাপুর শহরের বিভিন্ন শপিং মল এ ঘুরে ঘুরে ,তখন একদিন তার অফিসের  বন্ধু বরুন , নতুন কেনা iphone এর অভিনব বৈশিষ্ট  দেখাচ্ছিল ক্যান্টিনে বসে ,আর সেই মুহুর্তে রিয়া ভেবে নিয়েছিল ঠিক এই মোবাইল ই কিনে দেবে সে কৌশিক কে জন্মদিনে ! এতদিনে পরে সে রিয়াকে আর ভুল বুঝে থাকতে পারবে না ,সব ঠিক হয়ে যাবে আবার , ঠিক আগের মতন ! নিজের বোকামির কথা ভেবে বালিশ চেপে গুঁমড়ে কেঁদে  উঠলো রিয়া , না না এ কিছুতেই হয় না! কিছুতেই মুখ বুজে মেনে নেবে না সে ভালবাসার এই চরম অপমান ,তার কৈফিয়ত চাই ! সবকিছু শেষ করে দেওয়ার আগে একবার দেখা করতেই হবে তাকে কৌশিকের সাথে! কোনো দোষ না করা সত্তেও নিজের আত্বসম্মান জলান্জ্বলি দিয়ে করা রিয়ার এই শেষ চেষ্টার উত্তরে এভাবে তাকে কেন অপমান করলো কৌশিক ,তাকে জানতেই হবে !

অফিসে বলে ৭ দিনের ছুটি নিয়ে নিল রিয়া , ছুটি মঞ্জুর  হতেই book করে ফেলল প্লেনের টিকিট | এয়ারপোর্ট এ বাড়ির সবাইকে এতদিন পরে দেখে কিছুক্ষণের জন্য হলেও শান্ত হলো তার অস্থির মন ! বাড়িতে ঢোকার আগে কৌশিকদের বাড়ির দিকে তাকালো রিয়া,রাস্তার দিকের ঘরেই থাকে কৌশিক , ঘরের জানলা টা বন্ধ !

মনে মনে বলল ” সারাদিন শুধু আলো বাতাস হীন অন্ধকার ঘরে বই নিয়ে বসে থাকা !”

রিয়া তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে মা কে বলল “আমাকে একটু বেরোতে হবে এখনি ,দরকার আছে,তাড়াতাড়ি চলে আসব , চিন্তা কোরো না !”

মায়ের  উত্তরের অপেক্ষা না করেই বেড়িয়ে পড়ল রিয়া ! নিজের অস্থিরতাকে আর সামলাতে পারছেনা সে ! কৌশিকের বাড়িতে কড়া নাড়তেই যমুনা মাসি দরজা খুলে দিল | যমুনা মাসি  অনেক বছর থেকে কৌশিকদের বাড়িতে কাজ করে ,রিয়া আর কৌশিক কে তোযমুনা মাসি  ই বাস স্ট্যান্ড এ পৌছে দিত স্কুলে যাওয়ার সময় !

যমুনা মাসি একগাল হেসে বলল  ” আরে রিয়া দিদিমনি যে ! বাব্বা ,কতদিন বাদে দেখলাম তোমাকে ,ছুটিতে বাড়ি এসেছ বুঝি ? ”

(রিয়া হেসে বলল)  “হ্যাঁ  ,আজি এলাম ,কৌশিক আছে গো বাড়িতে ?”

(যমুনা মাসি)  : দাদাবাবু উপরের ঘরে পড়াশোনা করছে |

রিয়া দৌড়ে উঠে গেল সিড়ি দিয়ে উপরের ঘরের দিকে ! কৌশিকের ঘরের দরজাটা ভেজানো |

(রিয়া দরজার বাইরে থেকে আওয়াজ করে বলল) “আসব ? ”

কৌশিক টেবিলে  বসে পিছনে না তাকিয়েই বলল  ” বাহ ! বিদেশে গিয়ে খুব আদব কায়দা  শিখেছিস দেখছি! এক বছর আগে তো আমি ঘুমিয়ে থাকলেও ,দরজা ভেঙ্গে হলেও ঢুকে পরতিস !”

রিয়ার রাগ মাত্রা ছাড়িয়ে গেল , টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে ,দুহাতে কৌশিকের জামা ধরে টেনে বলল ,” তুই ভেবেছিস কি ? যখন খুশি যেভাবে খুশি আমাকে অপমান করবি ? আমার গিফট ফেরৎ দিয়ে, ওই অসভ্যের মত চিঠি লিখেও তোর গায়ের জ্বালা জুরায়নি ? এখন তোর বাড়িতে এসেছি বলেও বিদ্রুপ করবি ? আমার দোষের মধ্যে কি !  না চাকরি পাবার পর এত কষ্ট হচ্ছিল সব ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তায় , বুঝতে পারিনি কিভাবে তোকে এসে বলব যে আমি এটা কোনদিন চাইনি ,আমি পারব না সব ছেড়ে থাকতে ,আমাকে কিছুতেই তুই যেতে দিস না! কিন্তু পরে জানলাম , তুই আমার মা বাবাকে বুঝিয়েছিস এসুযোগ সবাই পায় না ,ছেড়ে দেওয়া বোকামি হবে | আমি জেদ করেই চলে গেছিলাম তখন , কেন বার বার তোর কাছে হাত পাতব বলতে পারিস !”

(বলতে বলতে রিয়ার চোখ ভিজে উঠলো !) ( কৌশিক রিয়ার দিকে না তাকিয়েই বলল ) ” ভুল কি বলেছি ? মাস্টার্স  তো তুই করতিস না ,চাকরি ই যখন করবি তখন ভালো চাকরি পেয়ে ছেড়ে দেওয়ার মানে কি ? যে তোর resume বানানো থেকে ,ইন্টারভিউ এর ফর্ম পর্যন্ত ভরে দিয়েছিল ,সেই ছেলেটা সুখবর শুনল তুই বিদেশ পারি দেবার মাত্র ৭ দিন আগে আর তাও আবার অন্য কারো কাছে | এর আগে পর্যন্ত তো কোনো কষ্ট আলাদা ছিল না রিয়া ! সেদিন কেন হয়ে গেল শুধু তোর একার ? আর আমার কাছে হাত তো তুই পাতিস নি কখনো , বরঞ্চ আমাকে ৫০০০০ টাকার মোবাইল ফোন গিফট করেছিস আমার একবছরের রাতজাগা কষ্টের মুল্য স্বরূপ| ফোন করে ‘শুভ জন্মদিন’ বলা কি কোনভাবেই সম্ভব ছিল না তোর পক্ষে ? !”

(রিয়া কান্না ভেজা গলায় বলে উঠলো) ” ফোন কাকে করব ? দিনের পর দিন যে আমার ইমেইলের  উত্তর দেয় না তাকে ? আমাকে কি তোর পাগল মনে হয় ?”

(কৌশিক এবার রিয়ার দিকে তাকালো ,তারপর হেসে বলল) “তুই সত্যি পাগল রিয়া ! তোকে ইন্টারভিউ প্রিপারেশন এর সময় যে খাতা টা দিয়েছিলাম ,তার শেষের পাতায় তুই নিজেই লিখে দিয়েছিলিস আমার ইমেইল এর পাসওয়ার্ড ,আমি কিছুতেই মনে রাখতে পারি না তাই , সেই খাতাটা এখনো তোর কাছেই আছে যদি না ফেলে দিয়ে থাকিস ,হ্যাঁ এটা বলতে পারিস নিজের দরকারে আমিও তোর কাছে হাত পাতিনি ! আমার নতুন ইমেইল id এর পাসওয়ার্ড এ তোর নাম যা ভোলার উপায় আমার জানা নেই!”

রিয়া আর কোনো কথা বলতে পারছে না ,কান্নায় দুহাতে মুখ ঢেকে বিছানায় বসে পরেছে সে !

কৌশিক তার পাশে বসে হেসে বলল,  “যে সে মোবাইল পছন্দ করিসনি তুই আমার জন্য, নিজের মূল্য উসুল করিয়ে ছাড়লএ কদম |সেদিন কাকিমার মুখে শুনে ,তোর হঠাৎ আসার কারণ বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হয়নি ! এভাবে কলার  ধরে কৈফিয়ত নেওয়ার জন্যই তো তোর এই ঝটিকা সফর ,কিরে তাই না ?”

রিয়া চোখ মুছে পার্স থেকে iphoner বাক্স টা টেবিল এ রেখে বলল ,”এখানে পাসওয়ার্ড সেভ করে রাখা যায়  ,আর তোর mathematics ক্যালকুলেশন এর জন্য আমি কিছু application installed করে দিয়েছি।”

কৌশিক (শুধু বলল ) ,”জানি ,দেখেছিলাম তখনি !”

রিয়া (বলল ) ” তুই তো সবই জানিস ,শুধু .. ”

(তাকে শেষ করতে না দিয়েই কৌশিক বলল )” না ! তা কেন? কত কিছুই তো জানি না ,আবার কত কিছুই নতুন করে জানতে পারি , এই যেমন আজকে জানলাম তুই আমাকে ..”

রিয়া লজ্জায় পিছনে ঘুরে মুখ নামিয়ে ফেলল ,কৌশিক সেটা লক্ষ্য করে হেসে বলল,  ” ওই জানলাম ,তুই আমাকে ভুলে গেলেও ,আমার ম্যাথমেটিক্স ক্যালকুলেশন এর প্রয়োজন টা ভুলিস নি |”

রিয়া এবার হেসে টেবিল এর iphone টা হাতে নিয়ে বলল ” একদম ঠিক। তোর চিঠির কথা মত যদি বলি তাহলে এটা ই এমন জিনিস যা তোর সত্যি দরকার ,যা ছাড়া তোর এক মুহূর্ত চলবে না ! তাই তো ? নাকি আরো কিছু আছে যার প্রয়োজন এর থেকেও বেশি ?”

মিটিমিটি হেসে কৌশিকের দিকে তাকালো রিয়া , উত্তরে কৌশিক রিয়ার খুব কাছে এসে বলল ” তা আছে বৈকি , আর সেটা হলো আমার নতুন ইমেইল এর Password “!

বাড়ি ফেরা

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

তিতিরের প্লেন টা ১ ঘন্টা লেট। প্রায় ২ বছর বাদে ১ মাসের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে সে। জানলা দিয়ে দেখতে পেল সে তার নিজের শহর। একটা অদ্ভুত আনন্দে মন টা ভরে গেল তার। অনেকবার অনেক আলোচনায় কলকাতার পিঠ যখন কোনঠাসা তার বিরুদ্ধে ওঠা জ্যাম জট, রাজনীতি ,সাধারণের নিরাপত্তা ,চাকুরীভাব ইত্যাদি নানারকম অভিযোগে, তিতির মুখে কিছু না বললেও মনে মনে কলকাতা কে বলেছে “তা হোক,তবু তুমি আমার , সেই ছোট থেকেই যে ভালোবাসি তোমাকে ,তুমি না থাকলে তো কিছুই থাকবে না, আমার ছোটবেলা,আমার নিজের মানুষ গুলো,আমার করা অগনিত ভুলের হিসেব,জীবনে সফল হবার সেই লম্বা পথ ,সব কিছু যে মুহুর্তে হারিয়ে যাবে।”
তিতির প্লেন থেকে নেমে একটা ট্যাক্সি ধরে নিল।,বাড়িতে কেউ জানে না তিতির আসছে আজকে,সবার চোখে অপ্রত্যাশিত আনন্দ দেখার লোভ তিতির কিছুতেই সামলাতে পারেনি ।

নিজের শহর কে সে প্রাণ ভরে দেখতে লাগলো ট্যাক্সির জানলার বাইরে দিয়ে , কিছুই তো বদলায়নি এই ২ বছরে , ওই তো ওই রাস্তা টা দিয়ে একটু এগোলেই ডানদিকে পরবে তিতিরের কলেজ।

ট্যাক্সি টা আরেকটু এগোতেই তিতির ভ্রু কুচকে ট্যাক্সি ড্রাইভার কে বলল ” এটা কবে হলো এখানে?”

ট্যাক্সি ড্রাইভার একগাল হাসি নিয়ে উত্তর দিল  “এটা তো শপিং মল দিদিমনি , সিনেমা হল ও আছে ভিতরে , তা আমি তো সেই প্রথম দিন থেকেই দেখে আসছি ,আপনি বোধহয় কলকাতায় থাকেন না , তাই না দিদিমনি?”

তিতির এবার প্রচন্ড বিরক্তিতে উঁচু  গলায় বলল ,  “তুমি এখানে কতদিন আছো শুনি? ”

প্রচন্ড ভিড়ে ড্রাইভার তিতিরের বিরক্তি লক্ষ্য না করে আবার অমায়িক হাসি হেসে বলল, ”তা দিদিমনি ১ বছরের উপর হয়ে গেল আমার এখানে ।”

তিতির উপেক্ষার হাসি মেখে বলল, ” ও তাই বলো , সবে ১ বছর হয়েছে কলকাতায় এসেছো , ঐজন্যই ! এখানে আগে শপিং মল ছিল না, একটা বইয়ের দোকান ছিল তার পাশে একটা প্রিন্টার আর xerox এর দোকান, আর তোমার কেন মনে হলো আমি কলকাতায় থাকি না ? এই শপিং মল টা চিনি না বলে ? হ্যাঁ  ,আমি কদিন এখানে ছিলাম না ঠিকই , কিন্তু আমাদের আদি বাড়ি কলকাতায় , আমার ঠাকুরদাদা সেই ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় সপরিবারে চলে এসেছিল কলকাতাতে , তখন থেকে এটাই আমাদের শহর ! আমার জন্ম , পড়াশোনা , চাকরি সব এই কলকাতায় , আর কালকের একটা শপিং মল চিনিনা বলে তুমি বলছ আমি কলকাতার মেয়ে নই ?”

হতকচিত ড্রাইভার তিতিরের এই রাগের কারণ বিন্দু বিসর্গ বুঝতে না পেরে ,অল্প হেসে বলল ” না দিদিমনি ! তা হবে কেন ? এটা তো আপনাদেরই শহর , আমরা গ্রামের মানুষ পেটের দায়ে পরে আছি।”

এবার তিতিরের মন খারাপ করে উঠলো , সত্যি এভাবে বলাটা একদম উচিত হয়নি তার , একটা অচেনা মানুষের পক্ষে কিভাবেই বা জানা সম্ভব এ শহর তার কতটা আপন , কি প্রচন্ড অভিমানে তার মন ভরে যায় কলকাতার সাথে তার সম্পর্ককে মুহুর্তের জন্য কেউ অস্বীকার করলে , এ তার অধিকারের জায়গা , হোক শত বছরের ফারাক , যা তার নিজের তা সমসময় নিজেরই থাকবে ।

তিতির ব্যাগ থেকে একটা চকলেট বার করে ড্রাইভার এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “খাবেন ? আমার কথায় কিছু মনে করবেন না প্লিস , আসলে লম্বা প্লেন জার্নি তে আমি খুব ক্লান্ত !”

ড্রাইভার চকলেট  টা হাতে নিয়ে বলল , ” কি যে বলেন দিদিমনি ! নিজের মাটির টান কার বা নেই বলুন , আমিও তো ভিটে বাটি ছেড়ে এখানে পরে আছি কিছু বেশি রোজগারের জন্য , তাই বলে কি আমি নিজের জায়গা ভুলে গেছি ? কলকাতা আমার কাছে সবসময় আপনাদের শহর হয়েই থাকবে , আমার নিজের কোনদিন হবে না !”

তিতির খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়েই আবার জানলার বাইরে দেখতে লাগলো আর কলকাতাকে মনে মনে বলল  “দেখলে কত ভালোবাসি তোমাকে!আমার একছত্র অধিকারে আপাতত আর কেউ ভাগ বসানোর নেই !”

বাড়ির সামনে ট্যাক্সি দাড়াতেই তিতির দেখল কুট্টুস একেবারে গেট এর বাইরে চলে এসেছে ,প্রবল বেগে লেজ নাড়ছে আর আনন্দের চিৎকারে তিতির কে যেন সে বলছে “ওমনি ভাবলেই হলো ? আমাকে ফাঁকি দেওয়া ওত সহজ নয় ,আমাকে যখন ড্রপার দিয়ে দুধ খাওয়াতে,তখনই তোমার গন্ধ আমি প্রানের ভিতরে নিয়ে নিয়েছি সারাজীবনের মত ।” কুট্টুস তিতিরের আদরের কুকুর ,তার রাত্রিবেলার ভুতের ভয়ের একমাত্র ভরসা ,সবরকম খাবারের নির্বিকার ভাগীদার,নিমেষে মন ভালো করে দেবার মোক্ষম ওষুধ ,প্রচন্ড ভালবাসে তিতির ওকে।

কুট্টুসের আনন্দের কারণ জানতে মা বেরিয়ে এসে তিতির কে দেখতে পেয়ে একেবারে কেঁদে  কেটে অস্থির, কাঁদতে কাঁদতে  যা বলল তা তিতিরের সাধের surprise এর excitement ঠান্ডা করতে যথেষ্ঠ । তিতিরের ফোন অনেকক্ষণ বন্ধ পেয়ে দিশেহারা হয়ে মা নাকি তিতিরের অফিসের সব বন্ধুকে ফোন করে ফেলেছে,শুধু তাই করেই শান্ত হয় নি সে মহিলা ,তিতির যাদেরকে প্রচন্ড ইমার্জেন্সি ছাড়া call করতে বারবার করে মানা করেছিল ,যেমন তার অফিসের ম্যানেজার,এপার্টমেন্ট মালিক ,তাদেরও নম্বর  একবার নয় ,বহুবার ঘুরিয়ে ফেলেছে এর মধ্যেই।

তিতির কিছু বলার আগেই মা রাগী গলায় বলল “আমার দিকে অমন করে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই , নিজে মা হও ,তখন বুঝবে হতচ্ছারি, এ কি জ্বালা।” এই কথাটা সেই ছোটবেলা থেকে কারণে অকারণে শুনে আসছে তিতির ,শব্দ sequence ছেড়ে দিলেও ,বলার ভঙ্গি টাও অবিশ্বাস্য ভাবে প্রতিবার সেই একই রকম । তিতির মা কে যেই surprise এর বাপারটা বোঝাতে গেল ,তাকে শেষ না করতে দিয়েই মা বলে চলল , ” বুঝেছি আমি ! আজকালকার কি এক হয়েছে ! সব ব্যাপারে surprise, মা মরে গেলে surprise এর জল মিষ্টি দিও।”

মা এর গলার আওয়াজে বাড়ির বাকি সকলে একে একে বেরিয়ে এলো। সকলের আশ্চর্যের অভিপ্রকাশ ,প্রাণ খোলা আনন্দে মায়ের  প্রথম রাউন্ড বকুনি টা ভুলেই গেল তিতির | গোটা বাড়ি একেবারে গমগম করে উঠেছে তিতিরকে ফিরে পাওয়া র আনন্দে! কাকু , কাকিমা , ভাইয়ের সাথে গল্পের ফাঁকে  তিতির বলল “বাবাকে দেখছিনা তো,কোথায় গেলো এতো সকালে ?”

(মা বলল ) “বাবা তোর গলার আওয়াজ পেয়েই পিছনের দরজা দিয়ে বেড়িয়ে গেছে বাজারে ,আজ তো রবিবার ,বাজার বন্ধ হবার সময় হয়ে গেল,আর দেরী হলে কিছুই পাবে না,তোর সাথে কথা বলতে গেলে যদি মাছ মাংসের দোকান বন্ধ হয়ে যায় ,সেই আফসোসের দায় আমাকে বইতে হবে সারাদিন গজর গজর শুনে ,তাই বাপু আমি আটকাতে যায়নি। ”

তিতির অবাক হয়ে ভাবলো কিছু মানুষ , কিছু সম্পর্ক কেমন সারাজীবন একই থেকে যায় ,সময় চেষ্টা করেও একটু পরিবর্তনের দাগ কাটতে পারে না। ভাগ্যিস পারে না ,নাহলে তিতির তো এই অচেনা পৃথিবীতে কবেই হারিয়ে যেত,কোনো কিছুরই যে হিসেব মিলত না কখনো ।

নিজের চেনা বিছানার ওপর কুট্টুসের সাথে খানিক গড়িয়ে নিল তিতির , তারপর দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে মাসিমনির বানানো তেতুলের আঁচার খেতে খেতে তিতির জিজ্ঞাসা করলো “ব্রেকফাস্ট এর মেনু কি মা ?”

রান্নাঘর থেকে ভেসে এলো মায়ের গলার স্বর  “রবিবার যা হয় মা গো ,লুচি আর ছোলার ডাল!”

একটা বেশি নকুলদানার Surprise

Comments 3 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

অফিস থেকে ফিরে সোফায় চা এর কাপ নিয়ে বসতেই বৃষ্টি নেমে এলো । আমার বারান্দার দরজাটা আধখোলা । প্রথমে খানিক টা আলসেমিতেই দরজা টা বন্ধ করতে উঠলাম না , তারপর যখন বৃষ্টির ছাট কার্পেট টা আধ্ভেজা করে দিল অগত্যা অনিচ্ছাতেই উঠে গেলাম। বাইরের দিকে তাকালাম , কেউ নেই রাস্তায় , অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে , পরপর দুটো গাড়ি গেল ,হেডলাইটের আলো দেখে ছোটবেলায় কাকুয়ার সাথে টর্চ জেলে বৃষ্টি দেখার কথা মনে পরে গেল । এটা আমেরিকা , এখানে বৃষ্টির দিন আর এমনি দিনের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই , হঠাৎ বৃষ্টি আমেরিকার নির্ধারিত রুটিন ভেস্তে দিতে পারে না , তৈরি করতে পারে না কোনো অযাচিত উচ্ছাস , দুশ্চিন্তা অথবা অহেতুক সোরগোল । আচমকা ফোনের আওয়াজে চমকে উঠলাম , দেখি weather এলার্ট, প্রচন্ড বৃষ্টি হবে বিকেল ৬ টা থেকে রাত ১১.১৫ অব্দি। সকাল থেকে অনেকবার এসেছে এই একই  এলার্ট , ভুলো মন মানুষের জন্যে বুঝি বারে বারে কড়া নাড়ার এই প্রযুক্তি । আজকের প্রযুক্তি র নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী , আমার ছোটবেলার সেই হঠাৎ বৃষ্টির আনন্দের স্মৃতিকে আরো বেশী  জুরিহীন করে তোলে । ভিজে ভিজে বন্ধুদের সাথে স্কুল  থেকে ফেরা ,বৃষ্টির দিনে বাড়িতে অতিথি  আসায় কাকুয়ার সাথে জলে লাফাতে লাফাতে তেলে ভাজা আর মিষ্টি কিনতে যাওয়া , rainy day তে ছুটির আনন্দে স্কুল বাসের মধ্যে বন্ধুদের টিফিন ভাগ  করে পিকনিক , হঠাৎ ঠিক হওয়া  মেনু খিচুড়ি আর মাছ ভাজা , রাস্তায় অনেক জল জমার জন্য আমাদের বাড়িতে দিদার একদিন বেশি থেকে যাওয়া , আমার ছোটবেলার এই অনাবিল আনন্দ গুলোকে ভেস্তে দিতে পারেনি কোনো weather এলার্ট। দাদুভাই বলত ভগবান খুশি হলে নাকি surprise দেয়. প্রচন্ড গরমে সেই surprise এর অপেক্ষা, ভগবানকে একটা বেশি নকুলদানা ,যদি surprise টা একটু তাড়াতাড়ি দেন সেই আশায় ।

বিকেলে হঠাৎ কাকীমার গলার আওয়াজ  “এই রে কাপড় গুলো সব ভিজে যাবে , ছাদে মেলা সব !!!”

দৌড়ে বারান্দা য় গিয়ে দেখি আকাশের এককোণ কালো হয়ে এসেছে , মনে আসছে একটাই কথা  “একটা বেশী নকুল দানার surprise”।

সে আনন্দ কে সামাল দিতে দিতেই কাকীমার ডাক , “একটু চল আমার সাথে ছাদে , দৌড়ে কাপড়গুলো নিয়ে আসি ” ।

এক দৌড়ে ছাদে গিয়ে তো অবাক ! আকাশ টা যে অর্ধেকের বেশি কালো হয়ে গেল এর মধ্যে ,মেঘ কি তাহলে আমার থেকেও বেশি জোরে দৌড়ায় ? পরে দাদুভাইকে জিজ্ঞাসা  করতে হবে।

কাকীমা দেখলাম বলছে , “এখনো ২ তো শাড়ি আধভেজা , বৃষ্টি র ও বলিহারি ,একটু পরে এলেই আমার শাড়ি দুটো শুকিয়ে যেত।” মনে ভাবলাম , একটা গোটা নকুলদানা দেওয়া ঠিক হলো কি !!! আমার তাড়াতেই কাকীমার দুটো শাড়ি আধ্ভেজা রয়ে গেল !!

কাকীমা বলল ,“চল এবার , নিচে যাই , বৃষ্টি এলো বলে ।”

একটুও নিচে যেতে ইচ্ছা করছে না, কিন্তু কাকীমার হাতে বাঁধা ছোট হাত আর কি বা করে ! গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চললাম কাকীমার পিছন পিছন, হঠাৎ খেয়াল হলো একটা বেশি নকুল দানার কথা , মনে মনে ভগবানকে বললাম “ প্লিস ! কাকীমাকে একটু বলো না তুমি , একটু খানি ভিজেই চলে যাব এবার, আগেরবারের মত জ্বর হবেই না,সবাই বকাতে কাকীমা যখন কাঁদছিল ,আমি শুনেছি কাকুয়া তো কাকীমাকে বলছিল , ‘বুদ্ধি করে ওষুধ দিয়ে দিলেই আর কিছু হত না’, কালকেও আরেকটা বেশি নকুলদানা দেব তোমায় , প্লিস একটু বলো কাকীমাকে ”।

দিদা বলত ভগবান নকুলদানা ভালো খায় , কিন্তু এটাই যে সবচেয়ে প্রিয় খাবার সেটা সেদিনই প্রথম জেনেছিলাম।

কাপড়ের বালতিটা সিড়ি র তলায় রেখে, কাকীমা কানে কানে আমাকে বলল  “কিরে যাবি আবার ?”
আমি হেসে বললাম ,  “আগের দিনের মত?” ,
কাকীমা: “মোটেই না , কাকুয়ার ঘরে রাখা মিষ্টি ওষুধ খায়িয়ে দেব আমার সোনাকে এবার ,কেউ জানতেই পারবে না।”

আমি কাকীমাকে জড়িয়ে ধরলাম আনন্দে , আমরা দৌড়ে ছাদে চলে গেলাম আবার , গুন গুন করে গান গাইছে কাকীমা , অগোছালো চুল গুলো খোপা করে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “চল ছাদের মাঝখানে যাই ,বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে ।”
আমি বললাম, “যদি আবার সবাই তোমায় বকে ?”
(কাকীমা ) “জানবে কি করে সবাই ? আমি আরেকটা শুকনো জামা নিয়ে এসেছি তোর , নিচে যাবার সময় পড়িয়ে দেব আর এই তেলের শিশি দেখিয়ে বলব তেল মাখিয়ে দিয়েছি বলে চুলগুলো অমন , তাছাড়া তুই তো আমার ঘরে থাকবি , এখন তো গরমের ছুটি , আমি বলে দেব আজ আমার সাথে ঘুমাবি” ।
(আমি ) “ঘুমাবো না , গল্প বলবে তুমি , সারা রাত ,আগের দিনের মত , ভুতের গল্প ” ।
(কাকীমা ) “ সে হবে ক্ষণ , এখন বল তোর স্কুলের অনুষ্ঠানে যে নাচ টা করেছিলি সেটা মনে আছে”
(আমি ) “হ্যাঁ , কিন্তু গান জানি না তো ” ।
(কাকীমা) “আমি জানি , তুই শুরু কর ”।

বলতে বলতেই বৃষ্টি নেমে ভিজিয়ে দিল আমাকে আর কাকীমাকে। ছাদে জমা জল গুলোতে পা ফেলে নাচতে লাগলাম কাকিমার গানের সুরে ” হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে , ময়ুরের মত নাচেরে “।

আমার ছোটবেলার বৃষ্টি , আমার একটা বেশি নকুলদানার surprise !!!