অফিস থেকে ফিরে সোফায় চা এর কাপ নিয়ে বসতেই বৃষ্টি নেমে এলো । আমার বারান্দার দরজাটা আধখোলা । প্রথমে খানিক টা আলসেমিতেই দরজা টা বন্ধ করতে উঠলাম না , তারপর যখন বৃষ্টির ছাট কার্পেট টা আধ্ভেজা করে দিল অগত্যা অনিচ্ছাতেই উঠে গেলাম। বাইরের দিকে তাকালাম , কেউ নেই রাস্তায় , অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে , পরপর দুটো গাড়ি গেল ,হেডলাইটের আলো দেখে ছোটবেলায় কাকুয়ার সাথে টর্চ জেলে বৃষ্টি দেখার কথা মনে পরে গেল । এটা আমেরিকা , এখানে বৃষ্টির দিন আর এমনি দিনের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই , হঠাৎ বৃষ্টি আমেরিকার নির্ধারিত রুটিন ভেস্তে দিতে পারে না , তৈরি করতে পারে না কোনো অযাচিত উচ্ছাস , দুশ্চিন্তা অথবা অহেতুক সোরগোল । আচমকা ফোনের আওয়াজে চমকে উঠলাম , দেখি weather এলার্ট, প্রচন্ড বৃষ্টি হবে বিকেল ৬ টা থেকে রাত ১১.১৫ অব্দি। সকাল থেকে অনেকবার এসেছে এই একই এলার্ট , ভুলো মন মানুষের জন্যে বুঝি বারে বারে কড়া নাড়ার এই প্রযুক্তি । আজকের প্রযুক্তি র নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী , আমার ছোটবেলার সেই হঠাৎ বৃষ্টির আনন্দের স্মৃতিকে আরো বেশী জুরিহীন করে তোলে । ভিজে ভিজে বন্ধুদের সাথে স্কুল থেকে ফেরা ,বৃষ্টির দিনে বাড়িতে অতিথি আসায় কাকুয়ার সাথে জলে লাফাতে লাফাতে তেলে ভাজা আর মিষ্টি কিনতে যাওয়া , rainy day তে ছুটির আনন্দে স্কুল বাসের মধ্যে বন্ধুদের টিফিন ভাগ করে পিকনিক , হঠাৎ ঠিক হওয়া মেনু খিচুড়ি আর মাছ ভাজা , রাস্তায় অনেক জল জমার জন্য আমাদের বাড়িতে দিদার একদিন বেশি থেকে যাওয়া , আমার ছোটবেলার এই অনাবিল আনন্দ গুলোকে ভেস্তে দিতে পারেনি কোনো weather এলার্ট। দাদুভাই বলত ভগবান খুশি হলে নাকি surprise দেয়. প্রচন্ড গরমে সেই surprise এর অপেক্ষা, ভগবানকে একটা বেশি নকুলদানা ,যদি surprise টা একটু তাড়াতাড়ি দেন সেই আশায় ।
বিকেলে হঠাৎ কাকীমার গলার আওয়াজ “এই রে কাপড় গুলো সব ভিজে যাবে , ছাদে মেলা সব !!!”
দৌড়ে বারান্দা য় গিয়ে দেখি আকাশের এককোণ কালো হয়ে এসেছে , মনে আসছে একটাই কথা “একটা বেশী নকুল দানার surprise”।
সে আনন্দ কে সামাল দিতে দিতেই কাকীমার ডাক , “একটু চল আমার সাথে ছাদে , দৌড়ে কাপড়গুলো নিয়ে আসি ” ।
এক দৌড়ে ছাদে গিয়ে তো অবাক ! আকাশ টা যে অর্ধেকের বেশি কালো হয়ে গেল এর মধ্যে ,মেঘ কি তাহলে আমার থেকেও বেশি জোরে দৌড়ায় ? পরে দাদুভাইকে জিজ্ঞাসা করতে হবে।
কাকীমা দেখলাম বলছে , “এখনো ২ তো শাড়ি আধভেজা , বৃষ্টি র ও বলিহারি ,একটু পরে এলেই আমার শাড়ি দুটো শুকিয়ে যেত।” মনে ভাবলাম , একটা গোটা নকুলদানা দেওয়া ঠিক হলো কি !!! আমার তাড়াতেই কাকীমার দুটো শাড়ি আধ্ভেজা রয়ে গেল !!
কাকীমা বলল ,“চল এবার , নিচে যাই , বৃষ্টি এলো বলে ।”
একটুও নিচে যেতে ইচ্ছা করছে না, কিন্তু কাকীমার হাতে বাঁধা ছোট হাত আর কি বা করে ! গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চললাম কাকীমার পিছন পিছন, হঠাৎ খেয়াল হলো একটা বেশি নকুল দানার কথা , মনে মনে ভগবানকে বললাম “ প্লিস ! কাকীমাকে একটু বলো না তুমি , একটু খানি ভিজেই চলে যাব এবার, আগেরবারের মত জ্বর হবেই না,সবাই বকাতে কাকীমা যখন কাঁদছিল ,আমি শুনেছি কাকুয়া তো কাকীমাকে বলছিল , ‘বুদ্ধি করে ওষুধ দিয়ে দিলেই আর কিছু হত না’, কালকেও আরেকটা বেশি নকুলদানা দেব তোমায় , প্লিস একটু বলো কাকীমাকে ”।
দিদা বলত ভগবান নকুলদানা ভালো খায় , কিন্তু এটাই যে সবচেয়ে প্রিয় খাবার সেটা সেদিনই প্রথম জেনেছিলাম।
কাপড়ের বালতিটা সিড়ি র তলায় রেখে, কাকীমা কানে কানে আমাকে বলল “কিরে যাবি আবার ?”
আমি হেসে বললাম , “আগের দিনের মত?” ,
কাকীমা: “মোটেই না , কাকুয়ার ঘরে রাখা মিষ্টি ওষুধ খায়িয়ে দেব আমার সোনাকে এবার ,কেউ জানতেই পারবে না।”
আমি কাকীমাকে জড়িয়ে ধরলাম আনন্দে , আমরা দৌড়ে ছাদে চলে গেলাম আবার , গুন গুন করে গান গাইছে কাকীমা , অগোছালো চুল গুলো খোপা করে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “চল ছাদের মাঝখানে যাই ,বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে ।”
আমি বললাম, “যদি আবার সবাই তোমায় বকে ?”
(কাকীমা ) “জানবে কি করে সবাই ? আমি আরেকটা শুকনো জামা নিয়ে এসেছি তোর , নিচে যাবার সময় পড়িয়ে দেব আর এই তেলের শিশি দেখিয়ে বলব তেল মাখিয়ে দিয়েছি বলে চুলগুলো অমন , তাছাড়া তুই তো আমার ঘরে থাকবি , এখন তো গরমের ছুটি , আমি বলে দেব আজ আমার সাথে ঘুমাবি” ।
(আমি ) “ঘুমাবো না , গল্প বলবে তুমি , সারা রাত ,আগের দিনের মত , ভুতের গল্প ” ।
(কাকীমা ) “ সে হবে ক্ষণ , এখন বল তোর স্কুলের অনুষ্ঠানে যে নাচ টা করেছিলি সেটা মনে আছে”
(আমি ) “হ্যাঁ , কিন্তু গান জানি না তো ” ।
(কাকীমা) “আমি জানি , তুই শুরু কর ”।
বলতে বলতেই বৃষ্টি নেমে ভিজিয়ে দিল আমাকে আর কাকীমাকে। ছাদে জমা জল গুলোতে পা ফেলে নাচতে লাগলাম কাকিমার গানের সুরে ” হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে , ময়ুরের মত নাচেরে “।
আমার ছোটবেলার বৃষ্টি , আমার একটা বেশি নকুলদানার surprise !!!