চিঠি

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

মহাকাল দুটো চিঠি হাতে সন্তুষ্টির হাসি মেখে ঘরে ঢুকে জটিল হিসেবে মগ্ন ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বললেন : “আমার সামান্য কূটনীতির কাছে আপনার সৃষ্টি ভালোবাসার আরো একবার মর্মান্তিক পরিণতি !”

মহাকালের অপ্রাসঙ্গিক গল্পের ফাঁকে ঈশ্বর টেবিলে রাখা চিঠি দুটো হাতে নিলেন , ক্ষণিক চোখ বুজলেন, জেদ রাগের অন্ধকারে ঢাকা মন দুটিকে নিরীক্ষণ করলেন , প্রত্যক্ষ করলেন আঘাত হওয়া চরম মুহূর্তটিকে,কলমে টানা পরিণতির শব্দ গুলো উচ্চারণ করলেন ঈশ্বর:

মেয়েটি চিঠি :
“কাজের শেষে ক্ষণিক সময় , অবসরের দান ,
ব্যস্ত দিনে গুমরে কাঁদুক সুপ্ত অভিমান !
অপমানের রাত্রি শেষে ছোট্ট ক্ষমার ভোর ,
সকল ভুলে আবার সে ঠিক সঙ্গী হবে তোর ।
সঙ্কোচহীন লজ্জাবিহীন, অযৌক্তিক এ দাবি ,
অহংকারে যত্নে রাখা মনের ঘরের চাবি ,
ওতই সহজ নাগাল পাওয়া , যোগ্যতা কি তোর ?
নিয়ম বহুল অবহেলায় লুকানো উত্তর ।
শর্তাবলী উহ্য হলেও স্পষ্ট দৃশ্যমান ,
মানলে তবেই থাকবে টিকে সম্পর্কের টান ,
হিসেব বিহীন লাগাম টানিস , স্বার্থে ছোটাস রথ ,
সত্ত্বা দিল নিজের দোহাই , বদলে নিলাম পথ ।”

ছেলেটির কঠিন উত্তর:

“বাঁধবো তোকে কিসের জোরে , সম্পর্কের শক্তি কোথায় !
চাওয়া পাওয়ার কষতে হিসেব , মনের আজও ভুল হয়ে যায় ।
সবটুখানি চিনলি যখন , আড়াল করা মুখোশ টাকে ,
বাঁচলো সময় তোরও অনেক , দোষের ভাগী করবো কাকে!
চোখের জলে রাস্তা পিছল , করবো না যে ভালোই জানিস ,
ভিক্ষা করে করলে আদায় , হয় কি সে আর নিজের জিনিস !
হারিয়ে ফেলার ভয় হতো খুব , অভ্যাসই যে আঁকড়ে থাকার ,
এখন তা আর হয় না জানিস ! নেই তো কিছু হারিয়ে যাবার ।
আগাছা ওই দেওয়াল জুড়ে , সরাই যাকে তবুও ফেরে ,
যত্ন ছাড়াই দিনের শেষে , জেদ কে ফলায় অধিকারে,
বোঝায় আমায় , ব্যর্থ জগৎ ইচ্ছাটা তার আনতে বশে ,
থাকার যে সে তেমনি থাকে , শেষের দিনেও চিতার পাশে ।
করেই দিলাম আলগা সুতো , সুখের মেয়াদ বছর খানেক ,
সময় বাকি দিব্যি যাবে , যেমন গেল আগেও অনেক।”

চোখ খুললেন ঈশ্বর |এক ভীষণ অপ্রাপ্তির স্বাদ তার মুখের অকৃত্রিম সৌম্যতার ছাপকে অবিচল রাখতে পারলো না , তার হাতের মুঠোতে বন্দি অন্তরালের তলানিতে অবশিষ্ট ভালোবাসা।

কিছুদিন পর অচেনা ডাকবাহকের হাত থেকে ছেলেটি চিঠি টা নিয়ে বললো , “আপনাকে তো আগে কখনো দেখিনি “।
ডাকবাহক সাইকেলে চড়ে স্মিত হেসে বললেন :”হাতে লেখা চিঠির বাজার তো আজকাল মন্দা , তাই বোধহয় ।”

ছেলেটি নিশ্চিন্ত হয়ে খামটা খুলতেই পাতায় লেখা শব্দ গুলো তাকে গ্রাস করলো ।

“তাকে ছাড়াই দিব্যি জীবন, বদলাবে না কিছু ?
স্মৃতিও কি আর স্বভাব দোষে করবে না তোর পিছু ?
সব কিছু শেষ , অহম তবু তেমনি আছে জমা ,
নিজের ভেবে পাতলে দুহাত , করতো না কি ক্ষমা ?
সাধের সুতো আলগা থাকুক , সত্যি আসল শোন,
বাঁধার মতো বাঁধতে লাগে , নাছোড়বান্দা মন ।
পথখানি তার আগলে দাড়াস ,ভালোবাসার জোর ,
বন্দি হারায় সত্বা নিজের , সবটা হবে তোর ।”

অচেনা ডাকবাহক হাসিমুখে এবার মেয়েটির দরজায় । চিঠির পাতার স্বর্গীয় গন্ধে মুগ্ধ্ব মেয়েটি শব্দ গুচ্ছের ভিড়ে আরো একবার হারিয়ে ফেললো নিজেকে ।

“না হয় করে দেখতি পূরণ ,অযোক্তিক সে দাবী ,
মনের ঘরে রাখলি শুধু অহংকারের চাবি !
শাস্তি দিতে ভাঙলি যে ঘর , লাভের খাতায় ফাঁকি ,
ফিরিয়ে নিলি সবকিছু তোর , মনটা শুধু বাকি।
কঠিন মনে সময় করে বদলে যাবার আশা ,
অপেক্ষাতে চিতায় উঠুক দোষের ভালোবাসা ।”

মহাকাল দাবার গুটিগুলো নতুন ভাবে সাজিয়ে নিতে নিতে বললেন ,

মহাকাল : আপনার এই স্বেচ্ছাচারিতার কারণ জানতে পারি ?

ডাকবাহক অল্প হেসে বললেন : ছেঁড়া কাগজ কি শুধুই ক্লান্ত কলমের হেরে যাওয়া ব্যক্ত করে ? উঁহু!বার বার ছন্দ মেলানোর চেষ্টা কেও তো ব্যক্ত করে। ছন্দ মেলানো বড় কঠিন , সবসময় যে তা মেলে না , কিন্তু যখন মেলে তখন যে কবিতাটি অসম্পূর্ণ রাখা অপরাধ , সে দায় স্ময়ং কবিকেই নিতে হয় বৈকি। সমাপ্তি লাইনে সুখ মাখানো দাড়ি টানতে যে কি পরম প্রাপ্তি তা সহস্র বছর তপস্যা উর্দ্ধে মোক্ষ লাভী কে জিজ্ঞাসা কোরো না হয় ! সে অমৃত আস্বাদনের লোভ থেকে ঈশ্বর নামক সেচ্ছাচারীর যে মুক্তি নেই।