প্রথম
অচেতনে ঘুমিয়ে থাকা বছর নয়ের মেয়েটির দিকে অপলকে তাকিয়ে ছিলেন আগন্তুক। ঘুম ভাঙতেই মেয়েটির কপালে হাত রেখে আগন্তুক হাসিমুখে বললেন , গুডমর্নিং !
মেয়েটি প্রশ্ন বহুল চোখে উঠে বসে বললো : গুডমর্নিং।
আগন্তুক: এতো গম্ভীর হয়ে থাকলে মর্নিং র তো আজ গুড হওয়া হবে না।
মেয়েটি : অচেনা কাউকে দেখে মা হাসতে বারণ করেছে।
আগন্তুক হেসে বললেন : কিন্তু অচেনা কেউ টি যদি তোমায় দেখে হাসে তাহলেও কি নিয়ম টা একই থাকবে ?
মেয়েটি খানিক নিরুত্তর থেকে বললো , মা কে জিজ্ঞেস করে বলবো তোমাকে ।
আগন্তুক মৃদু হেসে বললেন , আচ্ছা।
>তুমি বুঝি আমার নতুন ডাক্তার ?
আগন্তুক মন দিয়ে মিঠির মেডিক্যাল রিপোর্ট গুলো দেখতে দেখতে বললেন , উঁহু আমি জাদুকর , তোমাকে ছুমন্তর দিয়ে ভালো করে দিতে এসেছি।
মেয়েটি : সত্যি !!! আই লাভ ম্যাজিক। আমি মিঠি আর তুমি ?
আগন্তুক : আমি তাহলে মিঠির ম্যাজিসিয়ান ।
দূর থেকে আসা নামাজের শব্দে চোখ বুঝলেন আগন্তুক ।
চোখ খুলতেই মিঠির তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন : ম্যাজিসিয়ান! তুমি মুসলমান ?
আগন্তুক অবাক হয়ে তাকাতেই মিঠি বললো : আমার বাড়ির সামনে একটা পুরোনো মসজিদ আছে,তাই শব্দটা আমি চিনি।
> তুমি গেছো কখনো সে মসজিদে ?
>না। আমার যাওয়া বারণ , আমি যে মুসলমান নই।
> তুমি জানো মুসলমান মানে কী ?
>সবাই বলে মুসলমান মানে খারাপ।
স্তব্ধতা আড়াল করতে আগন্তুক নিরুত্তর রইলেন। তারপর মিঠির মাথায় হাত রেখে বললেন , একটা গল্প শুনবে , মিঠি ?
>কিসের গল্প ?
>তিন মিঠির গল্প। তিনটি মেয়ে , তিনজনের নামই মিঠি , তারা একই স্কুলে পড়ে আর খুব ভালো বন্ধু। তারা তিনজনেই খুব দুষ্টু, ছটফটে। , স্কুলের প্রার্থনার সময়তেও নিজেদের মধ্যে কথা বলে। অনেক বকাবকি , শাস্তির পরেও তাদের কোনো পরিবর্তন নেই। সমস্যা যখন দিনদিন বেড়েই চলছিল , সেই সময় ক্লাসে একজন নতুন শিক্ষিকা এলেন , তিনি অনেক ভেবে একটা উপায় বার করলেন। একদিন ক্লাসের শুরুতে তিনি একটা ভীষণ সুন্দর কথা বলা পেন্সিল পুরস্কার হিসেবে ঘোষণা করলেন , এতো সুন্দর পেন্সিল কেউ কখনো দেখেনি , ক্লাসের অন্যদের মতো তিন মিঠিও সেই অদ্ভুত পেন্সিল দেখে খুব অবাক হয়ে গেল , ভীষণ ইচ্ছা হলো তাদের ওই পুরস্কার টি পাওয়ার।
শিক্ষিকা বললেন , “পেন্সিল টি দেখতে যত সুন্দর , সেটা পাওয়াও কিন্তু ততই কঠিন, অনেক কিছু করতে হবে এটা পেতে হলে , তার মধ্যে প্রথম যেটা করতে হবে তা হলো মন দিয়ে প্রার্থনা , মাঝে কথা বললেই পুরস্কার থেকে নাম কাটা যাবে , যে যত বেশী শান্ত হয়ে , সুন্দর করে প্রাথর্না করতে পারবে পেন্সিল পাওয়ার দৌড়ে সে থাকবে তত এগিয়ে ।”
এই ঘোষণার পর দিন ই স্কুলের প্রার্থনা ঘরে ঘটল এক চমৎকার , সকল শিক্ষক শিক্ষিকা অবাক হয়ে দেখলেন সে দৃশ্য :
প্রথম মিঠি কোনো কথা না বলে এক মনে হাত জোড় করে প্রার্থনা করছে , দ্বিতীয় মিঠি অন্য লাইনে দাঁড়িয়ে দুহাত খুলে পূর্ণ ভক্তিতে মনের আর্জি জানাচ্ছে , ইতিমধ্যে তৃতীয় মিঠি কখন যেন ধীরে পায়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলে রাখা পেন্সিলের পাশে ইচ্ছাপূরণের চিরকুট রেখে এসেছে ।
মজার ব্যাপার হল , তিনজনের নামই মিঠি , তারা একই স্কুলে পড়ে এবং পরস্পরের বন্ধু , তাদের চাওয়া টাও এক -কথা বলা পেন্সিল , আবার সে ইচ্ছাপূরণের সিদ্ধান্ত যার হাতে তিনিও ভিন্ন নন – নতুন শিক্ষিকা , তাহলে তাদের মধ্যে তফাৎ টা কী মিঠি ?
মিঠি : তাদের প্রার্থনা করার ভঙ্গিমা : হাতজোড় , হাতখোলা , মোমবাতি।
> একদম ঠিক। সেই দিন মিঠিদের দেখাদেখি ক্লাসের অন্য ছাত্র রাও পেন্সিল পাওয়ার জন্য নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থনা পদ্ধতি বেছে নিল। তিন মিঠির পিছনে পুরো ক্লাস তিনটি লাইনে বিভক্ত হয়ে গেল , কিন্তু সবাই তো মিঠি নয় , তাই সবাই যে মন দিয়ে প্রার্থনা করছে তা কিন্তু নয় , প্রত্যেক দলে কেউ কেউ দুষ্টুমিও করছে , যেমন পাশের জনকে চিমটি কাটছে , অথবা সামনের জনের চুল টানছে , নিজেদের চোখ বোজা বলে দুষ্টু বাচ্চারা ভাবছে তাদের দুষ্টুমি কেউ লক্ষ্য করছে না , শিক্ষিকা কিন্তু নিঃশব্দে সবাইকে দেখছেন আর পেন্সিল পাওয়ার দৌড় থেকে দুষ্টু দের নাম কাটা দিয়ে যাচ্ছেন । গল্প শেষ , এবার আরেকটা প্রশ্ন:
এই গল্পে কোন দলকে তোমার খারাপ মনে হচ্ছে যে দলের সবার নাম পেন্সিল পাওয়ার লিস্ট থেকে কাটা গেলে তুমি খুশি হবে ? আবার ভালো দলই বা কোনটা যার সদস্য পেন্সিল টা পেলে তোমার ভালো লাগবে ?
মিঠি একটু চিন্তা করে বললো : মা বলে যারা মন দিয়ে প্রার্থনা করে তারা কখনো খারাপ হয় না আর তাদের সাথেও কখনো খারাপ হয় না। তোমার গল্পের কোনো একটাও দলের সবাই তো দুষ্টু নয় , প্রত্যেক দলের কেউ কেউ দুষ্টু।যারা মন দিয়ে প্রার্থনা করছে তাদের যে কেউ পেন্সিল টা পেলেই আমি খুশি হব , সে যে দলেরই হোক না কেন কিন্তু কোনো দলের দুষ্টুদের একজন যদি পেন্সিল টা পেয়ে যায়,তাহলে আমার একটুও ভালো লাগবে না।
আগন্তুক পরিতৃপ্তির হাসি মেখে বললেন : তুমি আজ যা এতো সহজে বুঝলে , পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষ সারা জীবনের চেষ্টাতেও তা বুঝতে পারে না , অথবা বুঝতে পারলেও সাহস করে বলতে পারে না। দোষ যদি সবাই না করে থাকে , দোষী তো সবাইকে করা যায় না মিঠি ! নতুন শিক্ষিকার মতন ভালো খারাপের বিচার শুধুই কাজ দিয়ে করতে হয়। যারা ভালো কাজ করে , অন্যকে ভালো রাখে, তারা ভালো মানুষ,আর যারা অন্যের ক্ষতি করে , কষ্ট দেয় তারা খারাপ মানুষ। গল্পের দলের মতই ধরে নাও মুসলমান একটা দলেরই নাম, সেখানে কেউ মিঠিকে অনেক ই ঞ্জেকশন দিতে চাইবে , উউউ! কি ব্যাথা ! কিন্তু সে দলেরই কারোর জানা আছে গিলিগিলি ছুমন্তর ম্যাজিক , যা মিঠির সব ব্যাথাকে মুহূর্তে ভ্যানিশ করে দেবে , এরপরের বিচার তো মিঠির হাতে।
> “ইঞ্জেকশন খারাপ , ছুমন্তর ভালো।”
মিঠির নিষ্পাপ হাসিতে নিজেকে আরো একবার হারিয়ে ফেললেন আগন্তুক।
দ্বিতীয়
নিজের কেবিনে বসে মিঠির পুরোনো রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে চিন্তায় মগ্ন ছিলেন ডঃ আসিফ । সহকারী দরজায় আওয়াজ করে বললো , “ডাক্তার বাবু ! আপনার সাথে মিঠি রায়ের মা একটু কথা বলতে চাইছেন , আপনি অনুমতি দিলে ….”
ডঃ আসিফ : হুম , পাঠিয়ে দাও।
খানিক বাদে দরজার কাছে অচেনা পায়ের শব্দ শুনে ডঃ আসিফ বললেন , ভিতরে আসুন।
শীর্ন চেহারার ভদ্র মহিলা ধীরে পায়ে ঘরে ঢুকে অনুমতি নিয়ে সামনের চেয়ারে বসলেন। তারপর খানিক ইতস্ততঃ করে বললেন , > “মিঠি ভালো হয়ে যাবে তো ডাক্তারবাবু ?”
> আমার ডাক্তারি বিদ্যা ও নিজের ওপরে বিশ্বাস সত্যি হলে নিশ্চই ভালো হয়ে যাবে।
> আপনি তো এতো বছর বিদেশে ছিলেন ,জগৎ জোড়া খ্যাতি আপনার , পরম কৃপাময় ই আপনাকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন , সবাই বলে আপনার অসাধ্য কিচ্ছু নেই।
> সবাই বললেও মিথ্যা যে মিথ্যাই থাকে। আমার সাধ্য ছুড়ি ,কাঁচি ও গুটিকয় ওষুধের মধ্যেই সীমিত।
> এভাবে বলবেন না ডাক্তারবাবু , আপনি ই আমাদের শেষ ভরসা। রাতে ঘুমোতে পারি না , ভীষণ ভয় করে,শুনেছি ক্যান্সারের কবল থেকে প্রাণ ফিরিয়ে নিয়ে আসা খুব কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয় , তাই না ডাক্তারবাবু ?
অস্থির হয়ে টেবিলে রাখা স্টেথোস্কোপ টা হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ডঃ আসিফ বললেন : শুধু এটুকু জেনে রাখুন মিঠির ভালো হওয়াটা আমার জন্যেও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়
অপারেশনের ঘর থেকে ডঃ আসিফ বেরোতেই সেদিনের শীর্ন চেহারার ভদ্রমহিলা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বললেন , “মিঠি ! কেমন আছে ডাক্তারবাবু ? ”
ডঃ আসিফ : আমি মিঠির মায়ের সাথে কিছু কথা বলতে চাই।
ভদ্রমহিলা : ডাক্তারবাবু !! আপনি বোধহয় আমায় ঠিক চিনতে পারেন নি , আমিই …..”
ডঃ আসিফ এবার চোয়াল শক্ত করে বললেন , ” চেনার ভুল কার হয়েছে তা না হয় অবসর সময়ে কখনো ভেবে দেখবেন। মিঠির ডাক্তার হিসেবে আমি এখন তার মায়ের সাথে কথা বলতে চাই , দয়া করে তাকে আমার কেবিনে আসতে বলবেন। ”
ডঃ আসিফ নিজের কেবিনের জানলার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন , চোখের শান্ত দৃষ্টি ভিতরের তোলপাড় কে অদ্ভুত কৌশলে আড়াল করে রেখেছে।
অস্থির পায়ে পরিচিতা সে ঘরে প্রবেশ করে প্রশ্ন করলেন , “আমাকে ওরা আই. সি. ইউ তে ঢুকতে দিচ্ছে না কেন?”
দৃষ্টি না ফিরিয়ে ডঃ আসিফ শান্ত গলায় বললেন : “আমি বারণ করেছি বলে, মিঠির এখন বিশ্রামের প্রয়োজন রানী। ”
পরিচিতা তার কাঁপা কণ্ঠে যথাসম্ভব জোর এনে বললেন : মিঠি আর বাঁচবেনা তাই না ? সেটা বলার জন্যই মিঠি র মায়ের সাথে কথা বলাটা হঠাৎ জরুরি হয়ে পড়লো ? সব কিছু শেষ হয়ে যাবার আগের মুহূর্তের সান্ত্বনা! তবে তাই হোক ! জানলার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দেখুন ডঃ আসিফ খান , মিঠি রায়ের মা আপনার সামনে প্রস্তুত। অবসম্ভাবী মৃত্যুর জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে দেরী করে , আর নিজের বহুমূল্য সময়ের সাথে অবিচার করবেন না।
>সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসার যেমন কোনো পরিমাপ নেই , ঠিক তেমনই এতো বছর পরেও আমার জন্যে তোর মনে ঘৃণার গভীরতা আদি অন্তহীন । তাই বোধহয় আমাকে অপমানের জন্য মিঠির জীবনের প্রশ্নেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলি না।
> দ্বিধা তো সত্যি করিনি, বিশ্ব জুড়ে বারে বারে চমৎকার ঘটিয়ে আসা আলহার দুলারা ডঃ আসিফ খানের ভারতে আসার খবর পেতেই এক মুহূর্তের জন্যও ভাবিনি তার সামনে আরো একবার হাত পাতার আগে।কেন জানিনা বিশ্বাস হয়েছিল , যে মানুষটির সাথে লড়াইতে মৃত্যু বার বার হার নিতে বাধ্য হয়েছে , মিঠির বেলাতেও তার অন্যথা হবে না ! অতীতের যন্ত্রণা আমার আজকের মিঠিময় জীবনকে স্পর্শ করে শুধুই দুঃস্বপ্নে ,তা বাস্তব না হতে দেওয়ার চেষ্টাতেই নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলাম। কিন্তু ভিক্ষার কারণ প্রেমই হোক বা প্রাণ , দাতার চোখ ভিক্ষুকের জাত ভালোই চেনে , তাই বোধহয় মিঠির মায়ের মিথ্যা এতো সহজে ধরা পড়ে গেল।
> যারা হাত পাততে পারে , নিজের জিনিষকে অধিকারের জোরে চেয়ে নিতে পারে তারা তো ভাগ্যবান রানী ! কাঙ্খিত জিনিসের থেকে স্বেচ্ছায় মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার যন্ত্রনা তাদের বোঝানো বৃথা। আমার ছোটবেলা যে মেয়েটির সাথে কেটেছে , তার সাথে মিঠির আজকের মুখের অমিল খোঁজা কোনো জটিল ধাঁধা র সমতুল্য। মানছি তা বদলানো সম্ভব ছিল না , কিন্তু নিজেকে আড়াল করা যদি এতই জরুরি ছিল , মিঠির পুরোনো মেডিক্যাল রিপোর্ট গুলোতে মায়ের নাম টা অন্তত মুছে দিতে হত। যুদ্ধ টা বরাবরই আবেগ দিয়ে করে এলি রানী!
>যার মেয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে নিজের মস্তিকের পটুতা তার সামনে নাই বা জাহির করলেন ডঃ আসিফ খান ! তাতে আপনার বুদ্ধি বিন্দুমাত্র স্থানচ্যুত হবে না , বরং বিবেগ নিজের হদিস খুঁজে পেতে পারে।
> বিবেগ নিজের হদিস খুঁজে পেলে এতো বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা মনটাও যে জেগে উঠবে , আবার তার চারিদিকে জমে উঠবে সেই উত্তর না জানা চেনা প্রশ্নের ভিড় !
> এসব বাজে কথা শোনবার প্রবৃত্তি বা মানসিক অবস্থা কোনোটাই আমার নেই। আপনি হয়তো ভুলে গেছেন , মিঠির ব্যাপারে কথা বলার জন্যই তার মা কে এই কেবিনে আসতে বলা হয়েছিল।
>মিঠি নিশ্চই শুধু তোর একার মেয়ে নয় , ওর বাবা কে দেখছি না রানী!
পরিচিতার কণ্ঠস্বরে কাঠিণ্যের প্রলেপ > মিঠির শরীরের অবস্থা জানানোর জন্য ওর বাবা মায়ের মিলিত আবেদন পত্র দরকার , তাই তো?
এবার দৃষ্টি ফেরালেন ডঃ আসিফ । আর সে দৃষ্টি তার ভিতরের তোলপাড়কে আড়াল করতে পারছে না।
> যদি তাই হয় , তাহলে নিশ্চই মিঠির মায়ের মতো মুহূর্ত ব্যয়ে ওর সাজানো বাবা ও হাজির হয়ে যাবে! আমাকে মিথ্যা বলছিস না নিজেকে ? সমস্ত সমাজের সামনে নাই বা স্বীকার করলি একজন খারাপ মুসলমানের রক্ত বইছে মিঠির শরীরে , কিন্তু এই বন্ধ দরজার পিছনেও সে পরিচয়ের সত্যি থেকে আড়াল সরিয়ে নিতে এতো দ্বিধা রানী !
পরিচিতা ব্যাঙ্গাত্বক হেসে বললেন > এতক্ষণে বুঝলাম ! রক্তের অধিকার দাবী করতে এসেছিস ! দশ বছর পর ! যথাযথ প্রমাণ ও আছে নিশ্চই। বৃথা প্রশ্নে আর সময় নষ্ট নাই বা করলি।
> অধিকার আমি চাইনি রানী ! সেদিনও চাইনি , আজও চাই না । ভুলে যাস না ধর্ম পরিবর্তন না করে সাথে থাকার সিদ্ধান্ত যতটা তোর ছিল ততটাই আমার। ভালোবাসার সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে জন্মের সম্পর্ক কে অবমাননা করার কঠিন মুহূর্ত , তোর মত সাহসী আমি কোনোদিনই ছিলাম না , দুর্বলতা আড়াল করতেই তোর প্রশ্ন মাখা চাহনির সামনে নিরুত্তর ছিলাম সেদিন । আমার ভিতরের অপরাধ বোধ কে মুহূর্তে ভালোবাসার অ সম্মান ভেবে নিলি তুই। ক্ষনিকের বিবাদ মাটি চাপা দিল এতগুলো বছরের সম্পর্কের কবরে। ধর্ম ও ভালোবাসার লড়াইতে হার কি শুধু তোর একার হয়েছিল সেদিন ? সবকিছু দিয়ে আগলে রাখা অনুভূতির সমাধি হল কঠিন আত্মসম্মানের অতল গহ্বরে,অজান্তে তলিয়ে গেল সারাজীবনের প্রতিশ্রুতি। কোন অপরাধের শাস্তি দিতে সেদিন হারিয়ে গেলি রানী ? বহু নিদ্রাহীন রাতও তার উত্তর খুঁজে পায়নি। অভিমানের কাঠগড়ায় আজও ঠিক একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছি। মিঠিকে নিয়ে তোর একার লড়াইয়ে আমার অস্তিত্বের কোনো অবকাশ নেই । ধর্মের ভার যে ভীষণ, নিজস্ব উপলব্ধিতে জানি , ছোট্ট মিঠি তা বইতে পারবে না! ওকে ছোঁয়ার ক্ষণিক মুহূর্তই আমার বাকি জীবনের জন্য যথেষ্ঠ। মিঠির ভালো হতে যতটুকু দেরী, শুধু ততটুকু সময় হাতে গুণে ধার্য করিস আমার জন্যে।
ঝাপসা চোখে ঘর থেকে বেরোনোর আগে ডঃ আসিফ বললেন : মিঠি ভালো আছে রানী! ছোট একটা টিউমার ছিল যা আজকের অপারেশনে বাদ দেওয়া হয়েছে , পুরোনো রিপোর্টের কথা সন্দেহ ছিল মাত্র , আর তা ভেবে নিজেকে কষ্ট দিস না।
এতক্ষনের নিঃশব্দ চোখের জল সকলের অজান্তে বাঁধ ভাঙা কান্নায় রূপান্তরিত হল।
চতুর্থ
ডঃ আসিফ মিঠির ঘরে ঢুকতেই একগাল হেসে মিঠি বললো , “গুডমর্নিং ম্যাজিসিয়ান । ”
>আজকে মর্নিং টা তো সত্যি গুড বলতে হবে, এখন মিঠি মেয়েটা কেমন আছে ?
>একদম ভালো। তুমি কখন ছুমন্তর বললে ?
> মিঠি যখন ঘুমাচ্ছিল , ঠিক তখন।
>আমি কবে বাড়ি যাবো ?
>খুব তাড়াতাড়ি।
>তাহলে তোমার সাথে কিভাবে দেখা হবে ?
> মিঠি ভালো হয়ে যাবে তো , আর দেখা হবার দরকার ই হবে না।
>হবে হবে হবে।
>আচ্ছা সে দেখা যাবে ক্ষণ।
>না , আগে আমাকে ছুঁয়ে বলো তুমি রোজ আমার সাথে দেখা করবে।
মুহূর্তের জন্য স্মৃতির গভীরে হারিয়ে গেলেন ডঃ আসিফ , হুবহু সেই একই জেদ , অবাধ্য ভালোবাসার জোরে একই ভাবে আঁকড়ে বাঁধার চেষ্টা। মিঠির মাথায় হাত রেখে বললেন : “ছুঁয়ে বললেও যে সবাই কথা রাখে না মিঠি!”
দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য উঠতেই মিঠি তার হাত ধরে বললো : ” তুমি সত্যি চলে যাবে ম্যাজিসিয়ান ?
>তোমার মতো আরও অনেক মিঠির অসুখ যে এখনো ছুমন্তর হওয়া বাকি , আমাকে যে যেতেই হবে মাগো।
মিঠি জল ভরা চোখে মুখ ঘুরিয়ে বললো : তুমি খারাপ ,আমার বাবার মতো। মিঠি অচেনা কাউকে দেখে আর কখনও হাসবে না ।
ডঃ আসিফ বিস্ময়বিহ্বল স্বরে বললেন : তোমার বাবা কে তুমি চেনো মিঠি ?
> না। তোমার গল্পের মিঠিদের মতো আমার বাবা মায়ের দল আলাদা, আমি মায়ের সাথে থাকি। ডঃ আসিফ খান , আমার বাবার নাম। মা বলে আমার বাবা নাকি খুব ভালো মানুষ , কিন্তু কষ্ট তো শুধু খারাপ মানুষ দেয় , তাই না ম্যাজিসিয়ান ?
অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠলেন ডঃ আসিফ , সর্বহারা জীবনের সঞ্চিত সবটুকু সাহস একত্রিত করে মিঠিকে জড়িয়ে ধরে বললেন , “একদম ঠিক। কিন্তু যদি কখনো জানতে পারো কষ্ট সে মানুষটাও কিছু কম পায়নি , তাহলেও কি বিচার টা একই থাকবে মিঠি ?
মিঠি : জানিনা , মা কে জিজ্ঞাসা করে বলবো তোমাকে।
ডঃ আসিফ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন : আচ্ছা।
ঘুমন্ত মিঠির হাত ছাড়িয়ে পরম প্রাপ্তির সম্বল টুকু নিয়ে ঘরের বাইরে পা রাখতেই পরিচিতার কণ্ঠস্বর, “অধিকার চাসনি ঠিকই কিন্তু পেয়েছিস কিনা দেখার জন্য ফিরেও তো দেখিসনি কোনোদিন । বন্ধ দরজার প্রয়োজন পাপের হয় , ভালোবাসার নয়। ধর্ম ও ভালোবাসার লড়াইতে আমরা যেখানে হার স্বীকার করে নিয়েছিলাম ,আমাদের মিঠিকে সেখানেই জিততে হবে । তাই মিঠির বাবাকে ছুমন্তর করে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত ম্যাজিসিয়ানের ছুটি কোনোমতেই মঞ্জুর হবে না।”
ধীরে পায়ে ঘুমিয়ে থাকা মিঠির ঘরে প্রবেশ করলেন পরিচিতা। অঙ্গীকারের পরম আবেশে চোখ বুজলেন ডঃ আসিফ। বহু বছরের মরচে ধরা স্বপ্ন আরো একবার স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
ধন্যবাদ ,
রোমি