নগেন মল্লিক অফিস যাচ্ছিলেন ,হঠাৎ দেখলেন পথের ধারে জটলা। ‘ওখানে কী হয়েছে ভাই?’ ,জটলার ধারে দাড়িয়ে থাকা এক অচেনা মানুষকে তার কৌতুহল পূর্ণ প্রশ্ন । ‘ওই একটা পকেট মার ধরা পড়েছে , তাই লোকে মার ধোর করছে আর কি ! ‘ কথাটা নগেন বাবু র সাধারণ একঘেয়ে সকালকে একটা নতুন মাত্রা এনে দিল ,তার হাতের তালুটা পুরনো অভ্যাসে নিসপিস করে উঠলো , প্রচন্ড উৎসাহে ভিড় ঠেলে এগিয়ে, মাটিতে নেতিয়ে পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে হাতের ঘুষি পাকিয়ে মারতে উদ্যোগী হতেই , কে যেন তার কানের কাছে এসে বলল, “নম্বর কাটা যাবে কিন্তু!” নগেন বাবু খানিক থমকে গেলেন , পিছন থেকে আচমকা ভিড়ের ধাক্কা য় সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার ঘুষি পাকাতেই সেই একই গলার স্বর, “নম্বর কাটা যাবে কিন্তু আপনার !” এবার খানিকটা ভয় পেয়েই পিছিয়ে এলেন নগেন মল্লিক, নিজের আশেপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন , সকলের মনোযোগ মাটিতে অবশ হয়ে পড়ে থাকা বছর চব্বিশের ছেলেটার দিকে ,এই অচেনা লোকগুলোর মধ্যে কেউ তার সাথে মশকরা করে কেনই বা সময় নষ্ট করতে যাবে ! তাহলে কি সবটাই তার মনের ভুল ? না! না ! তা কি করে হয় ? পর পর দু বার যে তিনি ওই কথা স্পষ্ট শুনলেন। ঘড়ির কাটার দিকে চোখ পড়ায় , অগত্যা নিজের মনোবাঞ্ছা অপূর্ন রেখে সামনের দিকে পা বাড়াতেই দেখলেন পকেটমার ছেলেটি একটু দূরে হাসি মুখে দাড়িয়ে আছে। “যার পকেট থেকে টাকা চুরি গিয়েছিল সে কি আপনার সাহায্য চেয়েছিল ? পেটের দায়ে অসৎ উপায় বেছে নেওয়া আধমরা ছেলে টিকে মেরে আত্মতৃপ্তি ছাড়া আর কিছু হত কি ? মাঝখান থেকে অনেকগুলো নম্বর কাটা যেত শুধু শুধু ” কথাটা বলেই পথ চলতি মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল ছেলেটি , নগেন মল্লিক নিজের চোখ কে বিশ্বাস না করতে পেরে আবার ঘটনাস্থলে ফিরে গিয়ে দেখলেন সেখানে কিছুই বদলায়নি , ছেলেটি আগের মতই মাটিতে নেতিয়ে পড়ে আছে , ভয়ে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো ।
অশেষ সাহা ব্যস্ত পায়ে ১৫ নম্বর বাস ধরতে দৌড় তেই ট্রাফিক সিগনালে দাড়িয়ে থাকা একজন অচেনা বৃদ্ধা আচমকা তার হাত ধরে বললেন ,”আমাকে একটু রাস্তাটা পার করে দেবে বাবা ? বয়সের দোষে চোখে ভালো দেখতে পাই না। “অশেষ সাহা মাথার ঘাম মুছে বেশ বিরক্তি ভরা স্বরে বললেন , “অফিসের দেরী হয়ে গেছে দিদিমা, ক্ষমা করবেন!”
“দশ নম্বর কাটা গেল তোমার ” , কথাটা বলার পরই এক রহস্যময় দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বৃদ্ধা মহিলা অবলীলায় রাস্তা পার হয়ে গেলেন । অবাক চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন অশেষ সাহা ,১৫ নম্বর বাসটা অনেক্ষণ দাড়িয়ে ,নতুন যাত্রী নিয়ে চলে গেল , চিন্তায় মগ্ন অশেষ বাবু র তা চোখেই পড়ল না ।
বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে সামনের চায়ের দোকানে বিস্কুট হাতে নিয়ে বসলেন বিনয় ভৌমিক । হঠাৎ তার চোখ পড়ল বিস্কুটের দিকে লোভাতুর চোখে তাকিয়ে থাকা রাস্তার ঘেয়ো কুকুর টার দিকে , সমস্ত মন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি তে ভরে গেল তার ,প্রচন্ড রাগে নিজের ছাতা টা উঠিয়ে কুকুরটাকে মারতে যেতেই গরম চায়ের ছ্যাকায় পা জ্বলে পুড়ে গেল তার । “ওরে বাবা রে !” বলে চিৎ কার করে উঠে সামনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকা কিশোর ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললেন ,”তুই বুঝি নতুন কাজে ঢুকেছিস ? নবারণ কে বলে আজকেই তোর ছুটির ব্যবস্থা করছি ,চায়ের কাপ টাও ঠিক করে ধরতে জানিস না ছোকড়া ! খরিদ্দার কে পুড়িয়ে মেরে নবারনের এতদিনের ব্যবসার দফারফা করে ছাড়বি তো তুই !” ছেলেটি একটু চুপ করে থেকে বলল , “একটু গরম ছ্যাঁকাই সহ্য করতে পারছেন না ,সেতুকে মারলে যখন অতগুলো নম্বর কাটা যেত তখন কি হত ? কম নম্বরের শাস্তি যে কত ভয়ানক হতে পারে সে বিষয়ে কোনো ধারণা আছে আপনার বিনয়বাবু ? শরীর থাকলেই খিদে পাবে , অবলা জীবও সে নিয়মের ব্যতিক্রম নয় , একটু ভেবে দেখুন তো, সেতু কি মার খাওয়ার মত কোনো দোষ করেছিল ?” কিশোর ছেলেটির আস্পর্ধা দেখে বিনয়বাবুর রাগের পারদ মাথায় চড়ে গেল , চিৎ কার করে ডেকে উঠলেন , “নবারণ !” একটি মাঝ বয়সী লোক দৌড়ে আসতেই বিনয় ভৌমিক সামনে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটির থেকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন ,” এই বেয়াদপ টাকে যদি এখনি দূর না করিস তবে তোর দোকানে আজই আমার শেষ দিন!” নবারণ নামের লোকটি অবাক হয়ে বললেন , “আপনি কার কথা বলছেন বিনয়বাবু ? বিনয় ভৌমিক আরো রেগে বললেন ,” চোখের মাথা খেয়েছিস নাকি ? তোর নতুন চাকুরে,নির্লজ্জের মত দাড়িয়ে থাকা এই অপদার্থের কথা বলছি ! প্রথমে আমার পায়ে গরম চা ফেলল ,ক্ষমা চাওয়ার বদলে তারপরে আবার মুখে ভাষণের পাঁচ কান্ড! ” নবারণ নামের লোকটি কাছে এসে বললেন , “আমি কিছু বুঝতে পারছি না বিনয় বাবু , আমি আর আপনি ছাড়া এখানে আর কেউ তো দাড়িয়ে নেই ,তাছাড়া দোকানে নতুন লোক রাখার মত আমার সামর্থ্য কোথায় !” সামনে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটির মতই দোকানে বসে থাকা অন্যান্য খরিদ্দারের চোখে মুখে বিদ্রুপের হাসি বিনয়বাবুর ভিতরের ভয়কে আরো বাড়িয়ে দিল , তাহলে কি তার মাথার কিছু গন্ডগোল ? আর কিছু ভাবতে না পেরে চিন্তিত মুখে দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ছেলেটি বিনয় বাবুর কানের সামনে এসে বলল , “নম্বরের ব্যাপারটা ভুলবেন না কিন্তু , বাড়াতে না পারেন ,খামোকা কমিয়ে নিজের বিপদ বাড়াতে যাবেন কেন !” বিনয়বাবু ভয়ার্ত চোখে তাকাতেই ছেলেটি অল্প হেসে অদৃশ্য হয়ে গেল ।
বাস থেকে নেমে মৌমি গোস্বামী একটু এগোতেই দেখলেন একটি যুবক রাস্তার ধারে উল্টে থাকা বাইকের পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে , আশেপাশের পথচলতি মানুষের মতই এই দৃশ্যতে একটুও বিচলিত না হয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই আবার সেই ভৎসনা পূর্ণ কন্ঠস্বর বেজে উঠলো তার কানে , “অনেক নম্বর কাটা গেল মৌমি ! তোমার জীবনের কিছু টা সময় কি আহত যুবকটির বাকি জীবনের থেকেও বেশী মূল্যবান ? ” মৌমি গোস্বামী ভীষণ ভয়ে চারিদিকে তাকাতেই দেখলেন রাস্তাটা তখনও একইরকম শুনশান , রক্তাক্ত ছেলেটার দিকে দুপা এগিয়েও আবার পিছিয়ে গিয়ে বাড়ির পথ ধরতেই সেই আগের কন্ঠস্বর , এবার তা আরো উত্তেজিত ও ভৎসনা পূর্ণ, ” যুবকটির মুখের দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখো মৌমি , এবার হয়তো চোখ ফেরানো ওতটা সহজ হবে না !” মৌমি গোস্বামী এক অলৌকিক শক্তির আবেশে অনিচ্ছাসত্তেও ছেলেটির দিকে ফিরে তাকাতেই ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন ,অচেনা যুবকটির জায়গায় রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে তার স্বামী মিলন গোস্বামী , নিজের কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থা কাটিয়ে পাগলের মত স্বামীর কাছে দৌড়ে গিয়ে দেখলেন দেহে তখনও ক্ষীন প্রানের স্পন্দন বর্তমান । নার্সিং হোমের চেয়ারে বসে প্রার্থনারত মৌমি গোস্বামীর দুঃস্বপ্নের ঘড়ি থেমে গেল অপেরাসন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসা ডাক্তারের গলার স্বরে যার সাথে গত রাতের অলৌকিক কন্ঠস্বরের হুবহু মিল ,”আপনার স্বামী এখন সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত। সকলের জীবনের দাম যে সমান মৌমি দেবী , সে জীবন পথে পড়ে থাকা অচেনা যুবকের হোক অথবা আপনার স্বামী মিলন গোস্বামীর । নম্বরের যোগ টা ঠিক করে বুঝতে শিখুন , বিয়োগের অভিশাপ যে বড় ভয়ানক!”
দুধের বাটি হাতে রান্নাঘর থেকে পা টিপে টিপে বেরিয়ে বিনি দৌড়ে বাড়ির পিছনে রাস্তায় গিয়ে , কোচড় খুলে ধরল অপেক্ষারত কালু ভুলু দের সামনে , সবাই যাতে দুধ রুটির ভাগ সমান পায় তা দেখা বিনির দায়িত্ব , বিনির কালু ভুলুরা ভাগ নিয়ে মারামারি করতে শেখেনি , বিনি যার সামনে যেমন পরিবেশন করে , ততটা খেয়ে আবার পরের পাতের জন্য বিনির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে , বিনিকে যেমন তারা ভালবাসে তেমন ভয় ও করে খুব । ভুলু আস্তে আস্তে খায় বলে একদিন বুটু নিজের খাবার শেষ করে ওর পাতের দিকে শুধু তাকিয়েছিল , তাতেই বিনি চিৎকার করে বলেছিল , “বুটু তোর ৫ নম্বর কাটা গেল !” নম্বরের হিসেব না বুঝলেও পর পর পাঁচদিন বিনির আদর না পাওয়ার দুঃখ বুটু আজও ভুলতে পারেনি ।
খাওয়া শেষের পর আদর পর্ব সাঙ্গ করে বিনি ঘরে ঢুকতেই মা বলল ,”মালতী বলছিল ,রান্না ঘরের রুটির হিসেব আজও মিলছে না ,কোথায় গিয়েছিলি বিনি ?”
বিনি মুখ নিচু করে বলল , “কোথাও না !”
মা হেসে বলল , “মা কে মিথ্যে বললে বুঝি নম্বর কাটা যায় না ?”
বিনি চিন্তিত মুখে বলল : “বাবা যে বলেছে , যে মিথ্যে কারোর ক্ষতি না করে শুধু অন্যের ভালোর জন্য বলা হয় তাতে একটুও নম্বর কাটা যায় না!”
মা : “সে অন্যের সংখ্যা যে দিনদিন বেড়েই চলছে বিনি !”
বিনি হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল , “তার সাথে আমার নম্বরও !”
বিনির মা রান্না ঘরে ফিরে এসে বললেন , “রাতেও কয়েকটা রুটি বেশী বানিয়ো মালতী দি ! আমার বিনির যোগের হিসেব ভুল হয়ে যাবে নাহলে !”
মালতী দি হেসে বলল , “সে আর বলতে ! নইলে বিনি দিদি আমারও নম্বর কেটে দেবে !”
বিনির মা : “তোমার দাদাবাবুর কথা মত জীবন টা যদি পরীক্ষা হয় নম্বরের হিসেব রাখাটা সত্যি খুব জরুরি , মনের ভিতরের সুক্ষ্ম অনুভূতি গুলো নষ্ট হয়ে গেলে এ পোড়া জীবনের আর কতটুকুই বা দাম থাকে বলো! নিজের আখের গোছাতে এই অল্প সময় টুকু ফুরিয়ে গেলে,লাল কালি ভরা রেসাল্ট হাতে ,পরীক্ষকের বেতের সামনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকতে হবে যে ! ”
মালতী দি : আমাদের বিনি দিদি সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা , তার সামনে অতি বড় পরীক্ষক কেও মাথা নীচু করে দাড়িয়ে থাকতে হবে বৌদিমনি !
বিনির মা : তোমার কথাই যেন সত্যি হয় মালতী দি ! আসলে কি জানো ,বয়সের সাথে সাথে হিসেবের বুদ্ধি পূর্ণতা পেলেও , মানুষের মন ভালো মন্দের সহজ বিচার শক্তি হারিয়ে ফেলে ,বলতে পারো স্কুল জীবনের নম্বর কাটার ভয়টা আর তার মনে থাকে না ,সেই সময়ে যদি কেউ একবার জীবনের আসল সত্যি টা তাকে মনে করিয়ে দিতে পারে ,তাহলে হয়তো সময় শেষে নম্বরের যোগফলের হিসেব টা অনেকটাই বদলে যাবে ।
বিনির মা য়ের কথা শুনে অদৃশ্য কেউ অলক্ষ্যে হাসলেন ! তার চারিদিকে ছড়ানো অগনিত হিসেবের খাতা ,নতুন বেশে প্রস্তুত হয়ে নিলেন তিনি নিজের সৃষ্টির নম্বরের হিসেব আরো একবার বদলে দিতে।
ধন্যবাদ
Bongnote