তিতিরের প্লেন টা ১ ঘন্টা লেট। প্রায় ২ বছর বাদে ১ মাসের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে সে। জানলা দিয়ে দেখতে পেল সে তার নিজের শহর। একটা অদ্ভুত আনন্দে মন টা ভরে গেল তার। অনেকবার অনেক আলোচনায় কলকাতার পিঠ যখন কোনঠাসা তার বিরুদ্ধে ওঠা জ্যাম জট, রাজনীতি ,সাধারণের নিরাপত্তা ,চাকুরীভাব ইত্যাদি নানারকম অভিযোগে, তিতির মুখে কিছু না বললেও মনে মনে কলকাতা কে বলেছে “তা হোক,তবু তুমি আমার , সেই ছোট থেকেই যে ভালোবাসি তোমাকে ,তুমি না থাকলে তো কিছুই থাকবে না, আমার ছোটবেলা,আমার নিজের মানুষ গুলো,আমার করা অগনিত ভুলের হিসেব,জীবনে সফল হবার সেই লম্বা পথ ,সব কিছু যে মুহুর্তে হারিয়ে যাবে।”
তিতির প্লেন থেকে নেমে একটা ট্যাক্সি ধরে নিল।,বাড়িতে কেউ জানে না তিতির আসছে আজকে,সবার চোখে অপ্রত্যাশিত আনন্দ দেখার লোভ তিতির কিছুতেই সামলাতে পারেনি ।
নিজের শহর কে সে প্রাণ ভরে দেখতে লাগলো ট্যাক্সির জানলার বাইরে দিয়ে , কিছুই তো বদলায়নি এই ২ বছরে , ওই তো ওই রাস্তা টা দিয়ে একটু এগোলেই ডানদিকে পরবে তিতিরের কলেজ।
ট্যাক্সি টা আরেকটু এগোতেই তিতির ভ্রু কুচকে ট্যাক্সি ড্রাইভার কে বলল ” এটা কবে হলো এখানে?”
ট্যাক্সি ড্রাইভার একগাল হাসি নিয়ে উত্তর দিল “এটা তো শপিং মল দিদিমনি , সিনেমা হল ও আছে ভিতরে , তা আমি তো সেই প্রথম দিন থেকেই দেখে আসছি ,আপনি বোধহয় কলকাতায় থাকেন না , তাই না দিদিমনি?”
তিতির এবার প্রচন্ড বিরক্তিতে উঁচু গলায় বলল , “তুমি এখানে কতদিন আছো শুনি? ”
প্রচন্ড ভিড়ে ড্রাইভার তিতিরের বিরক্তি লক্ষ্য না করে আবার অমায়িক হাসি হেসে বলল, ”তা দিদিমনি ১ বছরের উপর হয়ে গেল আমার এখানে ।”
তিতির উপেক্ষার হাসি মেখে বলল, ” ও তাই বলো , সবে ১ বছর হয়েছে কলকাতায় এসেছো , ঐজন্যই ! এখানে আগে শপিং মল ছিল না, একটা বইয়ের দোকান ছিল তার পাশে একটা প্রিন্টার আর xerox এর দোকান, আর তোমার কেন মনে হলো আমি কলকাতায় থাকি না ? এই শপিং মল টা চিনি না বলে ? হ্যাঁ ,আমি কদিন এখানে ছিলাম না ঠিকই , কিন্তু আমাদের আদি বাড়ি কলকাতায় , আমার ঠাকুরদাদা সেই ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় সপরিবারে চলে এসেছিল কলকাতাতে , তখন থেকে এটাই আমাদের শহর ! আমার জন্ম , পড়াশোনা , চাকরি সব এই কলকাতায় , আর কালকের একটা শপিং মল চিনিনা বলে তুমি বলছ আমি কলকাতার মেয়ে নই ?”
হতকচিত ড্রাইভার তিতিরের এই রাগের কারণ বিন্দু বিসর্গ বুঝতে না পেরে ,অল্প হেসে বলল ” না দিদিমনি ! তা হবে কেন ? এটা তো আপনাদেরই শহর , আমরা গ্রামের মানুষ পেটের দায়ে পরে আছি।”
এবার তিতিরের মন খারাপ করে উঠলো , সত্যি এভাবে বলাটা একদম উচিত হয়নি তার , একটা অচেনা মানুষের পক্ষে কিভাবেই বা জানা সম্ভব এ শহর তার কতটা আপন , কি প্রচন্ড অভিমানে তার মন ভরে যায় কলকাতার সাথে তার সম্পর্ককে মুহুর্তের জন্য কেউ অস্বীকার করলে , এ তার অধিকারের জায়গা , হোক শত বছরের ফারাক , যা তার নিজের তা সমসময় নিজেরই থাকবে ।
তিতির ব্যাগ থেকে একটা চকলেট বার করে ড্রাইভার এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “খাবেন ? আমার কথায় কিছু মনে করবেন না প্লিস , আসলে লম্বা প্লেন জার্নি তে আমি খুব ক্লান্ত !”
ড্রাইভার চকলেট টা হাতে নিয়ে বলল , ” কি যে বলেন দিদিমনি ! নিজের মাটির টান কার বা নেই বলুন , আমিও তো ভিটে বাটি ছেড়ে এখানে পরে আছি কিছু বেশি রোজগারের জন্য , তাই বলে কি আমি নিজের জায়গা ভুলে গেছি ? কলকাতা আমার কাছে সবসময় আপনাদের শহর হয়েই থাকবে , আমার নিজের কোনদিন হবে না !”
তিতির খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়েই আবার জানলার বাইরে দেখতে লাগলো আর কলকাতাকে মনে মনে বলল “দেখলে কত ভালোবাসি তোমাকে!আমার একছত্র অধিকারে আপাতত আর কেউ ভাগ বসানোর নেই !”
বাড়ির সামনে ট্যাক্সি দাড়াতেই তিতির দেখল কুট্টুস একেবারে গেট এর বাইরে চলে এসেছে ,প্রবল বেগে লেজ নাড়ছে আর আনন্দের চিৎকারে তিতির কে যেন সে বলছে “ওমনি ভাবলেই হলো ? আমাকে ফাঁকি দেওয়া ওত সহজ নয় ,আমাকে যখন ড্রপার দিয়ে দুধ খাওয়াতে,তখনই তোমার গন্ধ আমি প্রানের ভিতরে নিয়ে নিয়েছি সারাজীবনের মত ।” কুট্টুস তিতিরের আদরের কুকুর ,তার রাত্রিবেলার ভুতের ভয়ের একমাত্র ভরসা ,সবরকম খাবারের নির্বিকার ভাগীদার,নিমেষে মন ভালো করে দেবার মোক্ষম ওষুধ ,প্রচন্ড ভালবাসে তিতির ওকে।
কুট্টুসের আনন্দের কারণ জানতে মা বেরিয়ে এসে তিতির কে দেখতে পেয়ে একেবারে কেঁদে কেটে অস্থির, কাঁদতে কাঁদতে যা বলল তা তিতিরের সাধের surprise এর excitement ঠান্ডা করতে যথেষ্ঠ । তিতিরের ফোন অনেকক্ষণ বন্ধ পেয়ে দিশেহারা হয়ে মা নাকি তিতিরের অফিসের সব বন্ধুকে ফোন করে ফেলেছে,শুধু তাই করেই শান্ত হয় নি সে মহিলা ,তিতির যাদেরকে প্রচন্ড ইমার্জেন্সি ছাড়া call করতে বারবার করে মানা করেছিল ,যেমন তার অফিসের ম্যানেজার,এপার্টমেন্ট মালিক ,তাদেরও নম্বর একবার নয় ,বহুবার ঘুরিয়ে ফেলেছে এর মধ্যেই।
তিতির কিছু বলার আগেই মা রাগী গলায় বলল “আমার দিকে অমন করে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই , নিজে মা হও ,তখন বুঝবে হতচ্ছারি, এ কি জ্বালা।” এই কথাটা সেই ছোটবেলা থেকে কারণে অকারণে শুনে আসছে তিতির ,শব্দ sequence ছেড়ে দিলেও ,বলার ভঙ্গি টাও অবিশ্বাস্য ভাবে প্রতিবার সেই একই রকম । তিতির মা কে যেই surprise এর বাপারটা বোঝাতে গেল ,তাকে শেষ না করতে দিয়েই মা বলে চলল , ” বুঝেছি আমি ! আজকালকার কি এক হয়েছে ! সব ব্যাপারে surprise, মা মরে গেলে surprise এর জল মিষ্টি দিও।”
মা এর গলার আওয়াজে বাড়ির বাকি সকলে একে একে বেরিয়ে এলো। সকলের আশ্চর্যের অভিপ্রকাশ ,প্রাণ খোলা আনন্দে মায়ের প্রথম রাউন্ড বকুনি টা ভুলেই গেল তিতির | গোটা বাড়ি একেবারে গমগম করে উঠেছে তিতিরকে ফিরে পাওয়া র আনন্দে! কাকু , কাকিমা , ভাইয়ের সাথে গল্পের ফাঁকে তিতির বলল “বাবাকে দেখছিনা তো,কোথায় গেলো এতো সকালে ?”
(মা বলল ) “বাবা তোর গলার আওয়াজ পেয়েই পিছনের দরজা দিয়ে বেড়িয়ে গেছে বাজারে ,আজ তো রবিবার ,বাজার বন্ধ হবার সময় হয়ে গেল,আর দেরী হলে কিছুই পাবে না,তোর সাথে কথা বলতে গেলে যদি মাছ মাংসের দোকান বন্ধ হয়ে যায় ,সেই আফসোসের দায় আমাকে বইতে হবে সারাদিন গজর গজর শুনে ,তাই বাপু আমি আটকাতে যায়নি। ”
তিতির অবাক হয়ে ভাবলো কিছু মানুষ , কিছু সম্পর্ক কেমন সারাজীবন একই থেকে যায় ,সময় চেষ্টা করেও একটু পরিবর্তনের দাগ কাটতে পারে না। ভাগ্যিস পারে না ,নাহলে তিতির তো এই অচেনা পৃথিবীতে কবেই হারিয়ে যেত,কোনো কিছুরই যে হিসেব মিলত না কখনো ।
নিজের চেনা বিছানার ওপর কুট্টুসের সাথে খানিক গড়িয়ে নিল তিতির , তারপর দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে মাসিমনির বানানো তেতুলের আঁচার খেতে খেতে তিতির জিজ্ঞাসা করলো “ব্রেকফাস্ট এর মেনু কি মা ?”
রান্নাঘর থেকে ভেসে এলো মায়ের গলার স্বর “রবিবার যা হয় মা গো ,লুচি আর ছোলার ডাল!”