মেঘার আজ জন্মদিন তবুও তার মন ভীষণ রকম খারাপ। সকাল থেকে নিরন্তর অপেক্ষা , একজন বন্ধুরও ফোন আসেনি , যাদের ফোন এসেছে তাদের সে বন্ধু বলে মনে করে না ।
স্কুল কলেজের দিন গুলোতে অজান্তে তৈরী হওয়া সম্পর্ক গুলোর পরীক্ষা নিতে হয়তো ভীষণ দেরী হয়ে গেল । তা হলেই বা কী ! সম্পর্ক যদি গভীর হয় , জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার ভিত তো অটুট থাকার কথা ! আর কিছু না ভেবেই ডায়াল করে ফেলল ভীষণ চেনা কিছু নম্বর । কথা বেশ খানিক ক্ষণ হল বটে কিন্তু ফল আশানুরূপ হল না , পরিবর্তে মন খারাপের মেঘ আরো জমাট বেঁধে গেল।
যে মানুষ টা আড়াল থেকে এসব নজর রাখছিলেন , এবার তিনি অবস্থা সামাল দিতে ঘরে ঢুকতে বাধ্য হলেন ।
মেঘা :মানুষ চেনা কি এতই কঠিন দাদান !
দাদান : আহা ! অল্পতেই বড় ব্যাস্ত হয়ে পড়িস তুই দিদিভাই! কঠিন সহজের বিচার তো তখন হবে যখন কাজটা করার চেষ্টা করবি !
মেঘা : তোমার বুঝি মনে হচ্ছে যে আমি তা করি না ?
দাদান : বলছিস যখন করিস হবে নিশ্চই , তা কটা মানুষ চিনলি এখনো পর্যন্ত ?
মেঘা : প্রথমে ভেবেছিলাম অনেক , তারপর হিসেবে করে দেখলাম হাতে গোনা , এখন তাও যে বড় জোর গলায় বলতে পারছি না ।
দাদান :সেই বরং ভালো , জটিল হিসেবে যত কম করা যায় বুঝলি কিনা !
মেঘা : সবাই যে একসাথে বদলে গেল , কত বছর ধরে জমানো মুহূর্ত দিয়ে গড়া গুটিকতক সম্পর্ক , শত টানা পোড়েনের মাঝখানেও ক্ষনিকের স্বস্তি , হারিয়ে গেল ! তা বুঝি হয় ? সকাল টাতেই গন্ডগোল , কাল রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগেও তো ঠিক একই রকম ছিল ।
দাদান : হয়তো ছিল না , মানে যাচাই তো তুই সকাল বেলায় করলি কিনা তাই বলছিলাম !
মেঘা : তোমার বুঝি খুব আনন্দ হচ্ছে ?
দাদান : ভীষণ ! তোর কোনো বন্ধু ফোন করেনি বলেই কিনা আজ দাদানের জন্য এতটা সময় । আর কদিন বাদে বিয়ে করে অন্য ঘরে চলে যাবি তখন তো তোর গুটিকয়েক পোষ্য র সাথে এই বুড়োকে একাই থাকতে হবে ।
মেঘা একটুও না হেসে আরো গম্ভীর হয়ে গেল ।
দাদান : শোন দিদি ! মানুষের যেমন বয়স হয় , সম্পর্কেরও তো হয় , সময়ের সাথে যেকোনো গাঁট ই দুর্বল হয়ে পড়ে যে ! নতুন বাঁধনের উত্তেজনা সেখানে কোথায় ! আমার মতো বুড়ো মানুষেরা যেমন সুস্থ থাকার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও পারে না , বয়স বাড়লে সম্পর্কের ও হয় সেই একই অবস্থা , তখন অস্তিত্বের তাগিদে তার শক্তি চাই , যত্ন চাই। বৃদ্ধ শরীর যাকে পথ্য বলে থাকে , সম্পর্কের ভাষায় তা হল সময় , না পেলে ফাটল অনিবার্য ।
মেঘা : সময় যে আর আগের মতন অনেক নেই দাদান ! সবাই যে ব্যস্ত !
দাদান : সমস্যা টা তো সেখানেই দিদি ! তুই যে সময় গাঁট গুলো বেঁধেছিলি তখন তো জীবন শুরু ই হয়নি , আর এখন যে সূর্য দেব ঘুম থেকে উঠে আপিস রওনা দিয়েছেন বলে কথা । কিন্তু জন্মদিনে হাসি বাতিলের মত শক্ত অজুহাত এটা নয় , ফোন টা নিয়ে আয় দেখি , ছোটবেলার মতো দাদান ই অগত্যা বন্ধুদের মাঝের সমস্যা মেটাক ।
মেঘা : কোনো দরকার নেই ! আমি ফোন করেছিলাম ।
দাদান : একজনকে করেছিলি হবে , বাকি দের করতে দোষ কোথায় !
মেঘা : না ! তিন জনকে করেছিলাম , কারোর কিছু মনে নেই । তৃনাকে কলেজে একটা বেশী ক্লাস নিতে হচ্ছে , বাড়ি ফিরে ফোন করবে বললেও আমি জানি সেটা কথার কথা । স্মৃতি র ছেলে খুব ছোট ও কাঁদুনে,শাশুড়ির নিন্দা ছাড়া আর কিছু করার ওর সময় নেই । সঞ্জু প্রেমিকা পরিবর্তনে ব্যস্ত , নতুন প্রেমিকা , নতুন পরিশ্রম , নতুন মিথ্যা,মেয়েরা কী উপহারে খুশি হয় তা জানতেই মাঝে মধ্যে আমার দরকার পড়ে ।
দাদান :আর পৃথা ? খুব হাসি খুশি মেয়েটা , আমার বেশ মনে আছে , প্রায়ই আমাদের বাড়ি আসতো ।
মেঘা :ও আর হাসি খুশি নেই দাদান , ভীষণ রকম সন্দেহ বাতিক ও বদমেজাজী হয়ে গেছে , বেশীর ভাগ সময় ফোন ধরে না , নিজের থেকে অম্লানের ফোনের দিকেই খেয়াল বেশী । এমনটাই তো হওয়ার ছিল , স্কুলের সময় থেকেই অম্লানের চরিত্র ভালো ছিল না , অনেক বারণ করেছিলাম , অগণিত ঝগড়া , শেষমেশ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতেই মুখে কুলুপ আটলাম ।
দাদান : তবু খবর তো নিতে হবে দিদিভাই ! কাছের মানুষদের ভালো মন্দ জানা টা যে ভীষণ জরুরি । সকলকে ভালো রাখতে না পারিস কিন্তু জানান তো দিতেই হবে যে তুই আছিস , যেমন টা কথা হয়েছিল , তেমনটাই । সবাই না রাখলেও কেউ কেউ তো কথা রাখেই।
মেঘা : তা তো রাখেই ! তাছাড়া নতুন হাতগুলো স্বার্থে ভরপুর দাদান , বন্ধুত্বের মুখোশে কি ভয়ানক চরিত্র কে না আড়াল করে ।
দাদান : নতুন সম্পর্কের বড় জ্বালা রে দিদি ! নতুন করে হিসেবে নিকেশ , কথার মার প্যাচ , সত্যি মিথ্যার বচসা , নিজেকে গোড়া থেকে প্রমাণ করার তাগিদ । আরো বয়স হলে বুঝবি পুরোনো গুলোই অভ্যাস , ভালোবাসা । অভাব অভিযোগ যেমন তেমন , মরচে সরলেই একদম তাজা , নির্ভেজাল , এপার ওপার দেখার জন্য আতস কাঁচ অপ্রয়োজন,আমার বন্ধু গুলো যখন একে একে চলে যাচ্ছে, খুব ইচ্ছা করে জানিস দিদি ! গন্তব্য না জানেই পিছু নি ঠিক আগের মতন , বলা কি যায় হঠাৎ খেয়াল করে আবার যদি আনন্দে পাগল হয়ে জড়িয়ে ধরে !
মেঘা দাদুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল আড়াল করল আর অস্ফুটে বলল , “প্লিজ !”
দাদান অল্প হেসে তার মাথায় হাত দিয়ে বলল ,
মনে রাখিস দিদি , কলেজে একদিন ছুটি পড়বে ই , কোনো কাঁদুনে ছেলেই চিরকাল ছোট্টটি থাকে না , এক্ষেত্রে ভীষ্ম লোচন শর্মার ব্যাপারটা ধরিস না । স্ত্রী ভাগ্য প্রাপ্তি হলেই অতি বড় প্রেমিকেরও প্রেমিকার খোঁজ ফুরাতে বাধ্য , সবশেষে সন্দেহ বড় এক ঘেয়ে বিষণ্ণতা আনে , একসময় ক্লান্তি আসতে বাধ্য।
অজান্তেই মেঘার মুখের হাসি মিশে গেল স্বস্তির নিঃশাসে ।