তিতির পূজাবার্ষিকী টা হাতে নিয়ে সোনা কাকুকে বলল , ” এবার পুজোর পাঁচ দিন তোমার কিন্তু ডাক্তারি করা চলবে না !”
সোনা কাকু : সে তোর দূর্গা ঠাকুর যদি ওই পাঁচদিন কাউকে ডাক্তারের প্রয়োজন অনুভব না করায় ,তাহলে আমি আর আপত্তি করার কে!
তিতির : ভুলে যেও না ,আমি কিন্তু কাল তোমাকে দাবার খেলায় হারিয়ে দিয়েছি , আর তোমার দেওয়া কথা মত আমি যা চাইব তাই তোমাকে দিতে হবে ।
সোনা কাকু : তিতির ! তোর বয়স চোদ্দ না হয়ে পাঁচ হলে ,এই অযৌক্তিক আবদারের তবু কোনো ব্যাখ্যা থাকত আমার কাছে ।
তিতির : আমি তো শুনলাম তুমি জয়ন্ত কাকুকে ফোনে বলছিলে , মুর্শিদাবাদ না কোথায় যাবে পুজোতে ! সবসময় আমাকে না জানিয়ে প্ল্যান করো বলে ,আমার কিন্তু আড়ি পাতা স্বভাব হয়ে যাচ্ছে সোনাকাকু !
সোনা কাকু : আরে সে কি ঘুরতে যাবো নাকি ? মুর্শিদাবাদের বলরামপুর গ্রামে একজন ভদ্রলোক বহুদিনের চেষ্টায় একটা প্রাইভেট নার্সিং হোম তৈরী করছেন , ওত দূর বলে ওনার বারবার অনুরোধ সত্তেও এতদিন আমাদের যাওয়া হয়ে ওঠেনি , কিন্তু একবার না গেলে এতো বড় একটা উদ্যোগ কে যে অপমান করা হয় , তাই এবার পুজোর সময় যাব বলেছি । শুনেছি ভদ্রলোক অনেক অর্থ ব্যয় করে বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি এনে সাজাচ্ছেন নার্সিংহোমটা, সেটা একবার শুরু হলে আশেপাশের শহর- গ্রামের মানুষগুলোকে, অত্যাধুনিক চিকিৎসার খোঁজে আর প্রাণ হাতে নিয়ে কলকাতা আসতে হবে না ।
তিতির গম্ভীর হয়ে বলল : তাহলে তো সব ঠিকই হয়ে গেছে , আমার পুজোর নতুন জামাগুলো না হয় আলমারিতেই পচবে এবার ।
সোনা কাকু : বললেই হল ? তোর এবারের জামাগুলো কলকাতার বদলে বলরামপুর কে আলোড়িত করবে , ভেবেছিলাম যাওয়ার একদিন আগে বলব তোকে ,কিন্তু আড়ি পাতা মেয়েদের সারপ্রাইজ যে শুধু ঘরের দেওয়ালই দিতে পারে ।
তিতির পূজা বার্ষিকী টা দিয়ে মুখটা আড়াল করে হাসলো ।
ষষ্ঠী :
সকাল ৮ টায় যখন গাড়িটা একটা পুরনো আমলের বনেদি বাড়ির সামনে এসে দাড়ালো ,তখন ওরা তিনজনেই খুব ক্লান্ত। ভোর রাতে রওনা দেওয়ার তাড়ায় রাতে ভালো ঘুম হয়নি , তার ওপরে এতক্ষণ গাড়িতে বসে থাকায় কোমরও বেশ জোরালো বিদ্রোহ জানাচ্ছিল। শরীরের অস্বস্তি মুখের ভাবে প্রকাশ করার কোনো উপায় ছিল না কারণ ওরা গাড়ি থেকে নামতেই, বাড়ির সামনে দাড়িয়ে থাকা একজন বয়স্ক ভদ্রলোক হাসি মুখে এগিয়ে এলেন , ভদ্রলোকের বয়স আন্দাজ ৭০ হবে, কিন্তু তার শক্ত চেহারায় বার্ধ্যকের লেশ মাত্র নেই ,পোশাকে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট ।
ভদ্রলোক বললেন ,”নমস্কার , আমি রণজয় ব্যানার্জী , আপনাদের পরিচয় দেওয়া একেবারেই অনাবশ্যক । আমার মত ছাপোষা মানুষের অনুরোধ যে আপনাদের কাছে এত গুরুত্ব পাবে ,তা আমি কখনো ভাবিনি , এখানকার লোক খুব একটা মিথ্যে বলে না , আমি সত্যি মা দূর্গার কৃপা ধন্য ।”
সোনা কাকুর বন্ধু জয়ন্ত লাহা অমায়িক হেসে বললেন , “এভাবে বলে আমাদের লজ্জিত করবেন না রণজয় বাবু , আপনার মত মানুষের সান্নিধ্য লাভের লোভ সামলাতে না পেরেই কলকাতার পুজো ছেড়ে এখানে আসা , পয়সার জন্য নার্সিং হোম খুলতে হলে আপনি নিশ্চই এই গ্রাম কে বেছে নিতেন না , এমন মানুষকে সামনে থেকে দেখার সৌভাগ্য আজকাল আর কজনের হয় বলুন ! ”
ভদ্রলোক কিছু বলার আগেই সোনা কাকু বললেন , “জয়ন্ত একদম ঠিক বলেছে রণজয় বাবু তাছাড়া কলকাতার পুজোর ভিড় দেখে আমাদের চোখ অভ্যস্ত , তার থেকে এই নির্ভেজাল পরিবেশে এবার আমাদের শান্তির উৎ সব দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ । আমার ভাইজি তিতির কোনদিন বাড়ির দুর্গাপুজো দেখেনি, যখন শুনলাম আপনাদের বাড়িতে দূর্গা পুজো হয় , মন্ডপের মা কে ঘরের মেয়ে ভাবার স্বর্গীয় উপলব্ধি করাতেই ওকে সাথে করে নিয়ে এসেছি ।”
তিতির হাসি মুখে এগিয়ে গিয়ে বয়স্ক ভদ্রলোক কে প্রনাম করল । ভদ্রলোক তার মাথায় হাত রেখে বললেন , “দীর্ঘজীবি হও মা । দূর্গা মায়ের কাছে প্রার্থনা করি , এই পাঁচদিনে তোমার কাকুর কথা আমি যেন সত্যি করতে পারি, এখান থেকে নিয়ে যাওয়া স্মৃ তি তোমার সামনের দীর্ঘ জীবনে যেন কখনো আবছা না হয় তা দেখা যে আমারই দায়িত্ব । …. আপনারা নিশ্চই খুব ক্লান্ত , নীলকান্ত আপনাদের ঘরে নিয়ে যাবে , জল খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম করে নিন , তারপর দুপুরের খাবারের টেবিলে আমার পরিবারের সকলের সাথে আপনাদের আলাপ করিয়ে দেব।”
নীলকান্ত নামের পৌঢ় ভদ্রলোকের সাথে ওরা যে ঘরটায় পৌঁছলো তার সজ্জাশিল্পীর প্রতিভা সত্যি প্রশংসনীয় , বিশাল আকৃতির ঘরটার দুদিকে দুটো খাট রাখা যার একটিতেই ৪ জন মানুষ আরাম করে ঘুমাতে পারে । দেওয়ালে ঝোলানো ছবি , পুরাতন জিনিসের অভূতপূর্ব সংগ্রহ ব্যানার্জী পরিবারের আর্থিক প্রাচুর্য কে আরো স্পষ্ট করে দেয় । ঘরের রঙ, আসবাবপত্রের নকশা , সবকিছুতেই গাঢ় আভিজাত্যের ছাপ ।
নীলকান্ত বলল , ” এটা আপনাদের ঘর , কিছু লাগলে দয়া করে আমাকে ডাকবেন, আমি আশেপাশেই থাকব ।”
লোকটি চলে গেলে জয়ন্ত লাহা বললেন , “স্বাগ্নিক প্রথমে তোর পুজোয় কলকাতার বাইরে কাটানোর প্রস্তাবে আমি রাজী হইনি ঠিকই, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এখানে না এলে আমার নাম লোকসানের খাতায় লাল হরফে লেখা থাকত । নিজেকে কেমন যেন রাজার অতিথি বলে মনে হচ্ছে ।”
হঠাৎ ঢাকের আওয়াজ শুনে তিতির দৌড়ে বারান্দায় গেল । সোনাকাকু তার পাশে দাড়িয়ে বলল , “প্রথমবার মায়ের বোধন দেখছিস তিতির!” নিরুত্তর তিতির নিস্পলকে নিচের ঠাকুর দালানে ঘটা আন্তরিকতার আবেশ পূর্ণ এক অপরূপ দৃশ্যের সাক্ষী রইলো ।
দুপুর ১২:৩০ টা : জলখাবারের লুচি তরকারী খেয়ে , স্বর্গীয় বিছানার স্পর্শে কোমরের বিদ্রোহ অনেক ক্ষণ শান্ত হয়েছিল । তিতির আর সোনাকাকুর পর এবার জয়ন্ত লাহা স্নান সেরে বেরিয়ে বলল , “তোরা ঠিকই বলেছিলি, এখানকার জলের স্পর্শে সব পাপ ধুয়ে যাওয়ার মত একটা অনুভূতি হলো , আমার এখন আবার খিদে পাচ্ছে ।” তার কথা শেষ না হতেই নীলকান্ত নামের লোকটি ঘরের দরজায় আওয়াজ করে বলল , “আজ্ঞে বাবু আপনাদের জন্য খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছেন।” তার উত্তরে “আচ্ছা ,আমরা আসছি ” বলে সোনাকাকু তিতিরের কানের কাছে মুখ এনে বলল , “নীলকান্ত দা কে এর মধ্যেই আড়ি পাতা শিখিয়ে দিলি তিতির?”
তিতির ( হেসে ): হ্যাঁ, আমি যখন ঠাকুর দালানে মন দিয়ে দুর্গাপূজা দেখব , নীলকান্ত কাকুই আমার কাজটা করবে।
নীলকান্তের সাথে ওরা তিনজন খাবার ঘরে প্রবেশ করতেই রণজয় সাহা সেই চেনা হাসি মেখে বললেন , “আসুন, আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।”
সোনাকাকু লজ্জিত মুখে বলল ,”আসলে আমাদের স্নান সারতে একটু দেরী হয়ে গেল , এরকম জলের মায়া কাটিয়ে ওঠা খুব কঠিন ,এটা নিশ্চই সাধারণ কলের জল নয় ! ”
ভদ্রলোক হেসে বললেন , ” ঠিক ধরেছেন , এটা আমার বাপ ঠাকুরদার আমলে তৈরী করা পাতকুয়ার জল , মাটির অনেক গভীর থেকে আসা এই জল ,প্রথম স্পর্শেই তার আলৌকিকতার পরিচয় দেয় ,আমাদের বাড়িতে আসা সকল অথিতির ই একই রকম অভিজ্ঞতা । আপনারা দয়া করে বসুন , সকালের ওত টুকু জলখাবারের পর আর তো কিছু ই খান নি, নিশ্চই খুব খিদে পেয়েছে ।”
“এত সব সাজানো খাবার দেখে ভর পেটেও খিদের ঘুম ভেঙ্গে গেলে তাকে তো আর দোষ দেওয়া চলে না রণজয় বাবু!” কথাটা বলার পর জয়ন্ত লাহার পাশের চেয়ারে বসে ঘরের বাকিদের উদ্দেশ্যে জোড়হাতে সোনাকাকু বলল, “নমস্কার! আমি স্বাগ্নিক মুখার্জী আর ও আমার ভাইজি তিতির , আমার পাশে বসা স্বল্পভাষী ভদ্রলোকটিকে শুধু সহকর্মী বললে ভুল হবে , জয়ন্ত আমার অনেকদিনের ভালো বন্ধু। রণজয় বাবুকে আমাদের পরিচয় দেবার সুযোগ দিলাম না কারণ উনি এত বাড়িয়ে বলবেন যে এত ভালো ভালো খাবারগুলো তারপরে আমাদের লজ্জা করেই খেতে হবে। ”
ঘরের বাকি সকলের মত রণজয় ব্যানার্জী হেসে বললেন “প্রকৃত গুনীদের মধ্যে যে গর্বের লেশমাত্র থাকে না , তা আরো একবার অভিজ্ঞতা করলাম , আপনাদের সাথে বাকি সকলের পরিচয় করিয়ে দি :
টেবিলের উল্টোদিকে ,বাদিকের ধারের চেয়ারে বসা ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন , “ও আমার বড় ছেলে অরুণ।” আন্দাজ বছর চল্লিশ বয়সী , চশমা পড়া , মোটা ভদ্রলোকটি হাতজোড় করে বললেন “নমস্কার “।
“তার পাশে অরুণের স্ত্রী ,ঋতু , ।” পাশের চেয়ারে বসা বাচ্চা ছেলেটির থালায় ভাত মাখতে ব্যস্ত ,মাঝ বয়সী সুন্দরী ভদ্রমহিলা স্মিত হাসলেন ।
“ওর কোলে সৌনক ,আমার নাতি ।” বছর পাঁচের ছেলেটি নিজের মনে মোবাইলে গেম খেলায় ব্যস্ত , এই পরিচয় পালা তার মনোনিবেশ নষ্ট করতে পারল না ।
“তার পাশে আমার ছোট ছেলে ,নিলয় ।” বয়স আন্দাজ ৩২ , ছিমছাম, চেহারার ভদ্রলোকটি অল্প হেসে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন ।
“আমার পরিবারের দুজন সদস্য এখানে অনুপস্থিত , আমার স্ত্রী রমলা , ঠাকুর দালানে মাকে একা ফেলে উপরে আসতে রাজী হননি , আর আমার ছোট ছেলের স্ত্রী অমিতা , ও নিজের ঘরে আছে । অমিতা সন্তান সম্ভবা , মা দূর্গা কৃপা করলে দশমীর দিন এ বাড়িতে নতুন অতিথির পা দেওয়ার কথা ।”
সোনাকাকু হেসে বলল , ” বাহ্ , ঠাকুর দালানের শুন্যতা, মা দূর্গা এবার তাহলে আপনাদের পরিবারকে অনুভব করতে দেবেন না!” কথা টা শুনে রণজয় ব্যানার্জী স্মিত হাসলেও তার মুখে এক অজানা বিষাদের ছায়া পড়ল । তিতির সেটা লক্ষ্য করে আবার খাবারে মনোনিবেশ করলো ।
বিকেল ৫ টা : সোনাকাকু আরমোড়া ভেঙ্গে বলল ” দুপুরে দারুণ ভাত ঘুমের পর শরীরের ক্লান্ত ভাব টা আর একদম নেই।”
জয়ন্ত লাহা পাশ ফিরে শুয়ে বলল : “যা বলেছিস স্বাগ্নিক , অনেকদিন পর এতো শান্তির ঘুম ঘুমালাম,কলকাতা ফিরে গিয়েও অনেকদিন এই বিছানা , রাজসিক আতিথেয়তাকে মনে পড়বে ।”
তিতির ব্যস্ত হয়ে বলল , ” ঘুম ভাঙ্গলো তোমাদের ? চলো এবার নিচে গিয়ে সামনে থেকে সন্ধ্যার পুজো দেখি ।”
জয়ন্ত লাহা : “স্বাগ্নিক ! তুই বরং তিতিরকে নিয়ে ঘুরে আয় , আমি ব্যালকনির টিকিট কেটেই পুজো দেখব ভাবছি ।”
ওদের কথা শেষ না হতেই নীলকান্ত ঘরে ঢুকে চায়ের ট্রে টা টেবিলের উপর রেখে দিল , তারপর তিতিরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “তোমার জন্যও এনেছি কিন্তু , তুমি চা খাও তো? ”
তিতির স্মিত হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল ।
সন্ধে ৬ টা : তিতির নতুন জামা পড়ে সোনাকাকুর সাথে ঠাকুর দালানে পৌঁছলো । অরুণ ব্যানার্জী তাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে বললেন , “আপনারা বিশ্রাম করছিলেন তাই আর বিরক্ত করিনি , নীলকান্ত চা দিয়েছে আপনাদের ?”
সোনাকাকু : “হ্যাঁ ,তিতিরের খুব ইচ্ছা কাছ থেকে পুজো দেখার তাই চা খেয়েই নিচে চলে এলাম ।”
অরুণ ব্যানার্জী (হেসে): ” নিশ্চই ,তার আগে চলুন আপনাদের মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দি ।”
আন্দাজ ৬৫ বছরের একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলার সামনে গিয়ে অরুণ ব্যানার্জী বললেন , “মা ! ইনি Dr স্বাগ্নিক মুখার্জী আর সাথে ওনার ভাইজি তিতির ।”
ভদ্রমহিলা হেসে বললেন , “নমস্কার , আমি রমলা ব্যানার্জী , আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন , অনেক ইচ্ছা থাকতেও কিছুতেই দুপুরে আপনাদের সাথে দেখা করতে যেতে পারিনি , পুজোর পাঁচদিন যে আমাদের কি করে কাটে তা শুধু মা দুর্গাই জানেন,আমাদের বাড়িতে তো বেশী লোক নেই ,নিজেরাই কোনরকমে নাওয়া খাওয়া ভুলে এই মহা পুজোর জোগার করি,এবার তো অমিতা অসুস্থ , তাই আমার আর ঋতুর উপর চাপ টা একটু বেশি , এই যে এত পাড়া প্রতিবেশী দেখছেন, সবাই পুজো দেখতে আসে কিন্তু কাজের সময় কাউকে পাওয়া যায় না ।”
সোনাকাকু : “আমি আপনার ছেলের বয়সী ,’আপনি’ বলে লজ্জা দেবেন না । ক্ষমা তো আপনাদের কাছে আমাদের চাওয়া উচিত ,এই ভীষণ ব্যস্ততার সময় এভাবে এসে আপনাদের বিব্রত করলাম , আসলে পুজোর সময় যা একটু সময় থাকে , এখন না আসলে আপনার স্বামীর মহাযজ্ঞ দেখার সৌভাগ্য আবার কবে হত তা সত্যি জানা নেই ।”
ভদ্রমহিলা (হেসে) : ” তোমরা আসাতে আমার খুশী বলে বোঝানোর নয় , মায়ের মত যখন বললে তখন লজ্জা না করে যখন যা লাগবে বিনা সঙ্কোচে নিজে এসে চেয়ে নিও কিন্তু ।”
সোনাকাকু হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ।
অরুণ ব্যানার্জী , ঠাকুর দালানে মা দূর্গার একচালা মূর্তির সবচেয়ে কাছের চেয়ারে তাদের বসিয়ে দিয়ে চলে যেতেই তিতির সোনাকাকুর কানে বলল ” নীলকান্ত কাকুর মত বয়স্ক মানুষকে নাম ধরে ডাকাকে তুমি সমর্থন করো ? অরুণ ব্যানার্জীর এই সম্বোধন কে তুমি কী বলবে , আভিজাত্য না ঔদ্ধত্য ?”
সোনাকাকু : “তোকে অন্যায় সমর্থন না করা যে শিখিয়েছে তা সে নিজে কি করে সমর্থন করবে বল ? আমার মতে এটা আভিজাত্য বা ঔদ্ধত্য কোনটাই নয় বরং প্রকৃত শিক্ষা ও রুচির অভাব বলতে পারিস ।”
রাত্রি ১০ টা : মন্ডপে সকলের সাথে খিচুড়ি ভোগ খেয়ে সোনাকাকু ও তিতির ঘরে ঢুকতে দেখলো জয়ন্ত লাহা মন দিয়ে একটা বই পড়ছেন ।
সোনাকাকু : জয়ন্ত খেয়েছিস তো ?
জয়ন্ত লাহা : সে আর বলতে , খিচুড়ি টা সত্যি ভালো হয়েছিল। তা এতক্ষণ ধরে কি করছিলি তোরা ?
সোনাকাকু : এই পুজো দেখছিলাম ,সকলের সাথে কথা বলছিলাম , তোর মত ঘরকুনোই শুধু জানে নতুন জায়গায় এসে ঘরবন্দী হয়ে থাকার সুখ !
জয়ন্ত লাহা : তুই তো জানিস আমার বেশী কথা বলতে ভালো লাগে না ,তাছাড়া একটু আগে রণজয় ব্যানার্জী এসেছিলেন ,বললেন কাল সকাল বেলা আমাদের নার্সিং হোম দেখাতে নিয়ে যাবেন । আরামের সময় যে বড় কম আমার বন্ধু, তিতিরের বয়সটা ফিরে পেলে তাও ভাবা যেত ।
তিতির : আমি কাল তোমাদের সাথে নার্সিং হোম যাব না , ওখানে তো আমার কোনো কাজ নেই , বরং পুজো দেখে সময়টা কাটিয়ে দেব ।
সোনাকাকু : তথাস্তু । এবার চটপট শুয়ে পর দেখি , ভোর ভোর ঢাকের আওয়াজ তাহলে আর বেদনাদায়ক লাগবে না।
সপ্তমী
ভোর ৫:৩০ : দরজায় বার বার ধাক্কার আওয়াজে সোনাকাকুর ঘুম ভেঙ্গে গেল । দরজা খুলতেই রণজয় ব্যানার্জী চিন্তিত স্বরে বললেন ,”স্বাগ্নিক বাবু ! ক্ষমা করবেন এত ভোরে বিরক্ত করার জন্যে ,একবার আসবেন ? আমার স্ত্রীর শরীর টা হঠাৎ খুব খারাপ করেছে ।”
“সেকি ! আমি আসছি এখনি । ” কথাটা বলে সোনাকাকু একটা ব্যাগ ও টেবিলে রাখা চশমা টা নিয়ে রণজয় ব্যানার্জীর সাথে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল । তিতিরের ঘুম ও ভেঙ্গে গিয়েছিল , সে তাড়াতাড়ি উঠে সোনাকাকুর পিছু নিল ।
সোনাকাকু ঘরে ঢুকে দেখলো রমলা ব্যানার্জীর পরনের কাপড়ের অর্দ্ধেকের বেশী জলে ভেজা , মাথার কোনায় ,দু হাতের পিছনে বিশ্রী ভাবে কেটে গিয়ে রক্ত ঝড়ছে । বড় ছেলের স্ত্রী ঋতু ,সংজ্ঞাহীন ভদ্রমহিলার মাথার কাছে ফার্স্ট এইড বাক্স নিয়ে বসে ডেটল দিয়ে কাটা জায়গা গুলো পরিষ্কার করে দিচ্ছেন ।
প্রেসার মাপার পর , বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সোনাকাকু ব্যাগে রাখা একটা ওষুধ ভদ্রমহিলার হাতে ইঞ্জেক্ট করলো, তারপর একটা ট্যাবলেট জিভের তলায় দিয়ে ঘরের বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল , “এটা কিভাবে হল ?”
রনজয় ব্যানার্জী চিন্তিত মুখে বললেন : ঠিক জানিনা , সকালে নীলকান্তের ডাকে আমার ঘুম ভাঙ্গলো , কুয়ো তলা পরিষ্কার করতে গিয়ে ও রমলা কে উপুর হয়ে পড়ে থাকতে দেখতে পেয়েছে । রমলা কখন বা কেন ওখানে গিয়েছিল তা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না । ওর কিছু হবে না তো স্বাগ্নিক বাবু ?
সোনাকাকু চিন্তিত মুখে বলল ,”আপনাদের বাড়ি থেকে হাসপাতাল কতদূর? ”
রনজয় ব্যানার্জী : তা গাড়িতে ৪৫ মিনিট মতন লাগবে ।
সোনাকাকু গম্ভীর মুখে বললেন , ” হুম ! আর পনেরো মিনিটের মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে বিনা চিকিৎসায় বাড়িতে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করা ঠিক হবে বলে আমার মনে হয় না ।”
“আমরা এখনি গাড়ির ব্যবস্থা করছি । ” কথাটা বলেই রনজয় ব্যানার্জী ও তার বড় ছেলে অরুণ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন ।
এতক্ষণ মায়ের মাথার সামনে নিঃশব্দে দাড়িয়ে থাকা নিলয় ব্যানার্জী বললেন : “মা র কি হয়েছে স্বাগ্নিক বাবু ?”
সোনাকাকু : মাইল্ড হলেও হার্ট এটাক বলেই মনে হচ্ছে ,পরীক্ষা করলে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব ।
ভোর ৬ টা : সকলের উদ্বেগের দাড়ি টেনে রমলা ব্যানার্জীর জ্ঞান ফিরে এলো । রণজয় ব্যানার্জী কিছু বলতে চাওয়ায় তাকে বাঁধা দিয়ে সোনাকাকু বলল , “Mrs ব্যানার্জীর এখন বিশ্রাম দরকার , যেকোনো একজন বাদে বাকিরা দয়া করে নিজেদের ঘরে চলে যান ।
রণজয় ব্যানার্জী ছাড়া বাকি সকলে একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে দরজার সামনে এসে উনি সোনাকাকুকে বললেন, “আর চিন্তার কোনো কারণ নেই তো স্বাগ্নিক বাবু ? ”
সোনাকাকু : “না , তবে দুপুর বেলার আগে ওনাকে বিব্রত করলে হিতে বিপরীত হতে পারে । আপনি সেদিক টা খেয়াল রাখবেন , আর কিছু অসুবিধা হলেই বিনা সঙ্কোচে আমাকে ডাকবেন।”
সোনাকাকুর সাথে ঘরে ফেরার সময় তিতির বলল , “আমি যখন সাড়ে চার টে নাগাদ বাথরুমে উঠে কিছুক্ষণের জন্য বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলাম , Mrs ব্যানার্জীকে চিন্তিত মুখে ওদিকটায় যেতে দেখেছিলাম ।”
সোনাকাকু : হুম ! আর কাউকে দেখেছিলি কি ?
তিতির : না , তোমার কি মনে হয় উনি কারো পিছু নিচ্ছিলেন ?
সোনাকাকু : ওনার ডান হাতের কব্জিতে স্পষ্ট আঙ্গুলের দাগ , সেটা কোনো পুরুষের বলেই আমার মনে হল ।
রাত্রি ৯ টা :দুপুরের খাবার ও বিকেলের চা নীলকান্ত ঘরেই দিয়ে গেছে । Mrs রমলা ব্যানার্জী সকালের চেয়ে এখন অনেকটা ভালো আছেন ,বেশ কিছুদিন লাগবে ওনার সম্পুর্ন সুস্থ হতে , সোনাকাকুর পরামর্শ মত রণজয় ব্যানার্জী মন্ডপের ঢাকি দের পয়সা মিটিয়ে ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছেন । সকলের প্রশ্নের উত্তরে Mrs ব্যানার্জী বলেছেন, ভোর রাতের দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে উনি বারান্দায় আসেন, পিছনের দরজাটা খোলা থাকায় , একটা রাস্তার কুকুর সেখান দিয়ে ঢুকে ,মন্ডপে রাখা প্রসাদের থালায় মুখ দিচ্ছিল , তাই তাকে তাড়া করতে গিয়ে ঘুম চোখে কুয়ো তলার শেওলা ওনার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে ।
জয়ন্ত লাহা ও সোনাকাকু বিছানায় বসে বই পড়ছিল, তিতিরের চোখ বিছানায় শুয়ে জানলা দিয়ে রাতের পরিস্কার আকাশ দেখতে ব্যস্ত । হঠাৎ দরজার আওয়াজে তিনজনে একসাথে বাইরের দিকে তাকালো ।
রনজয় ব্যানার্জী তার ছোট ছেলে নিলয় ব্যানার্জী কে নিয়ে ঘরে ঢুকে বললেন, “আপনাদের সাথে একটু দরকারী কথা
ছিল ।”
সোনাকাকু : হ্যাঁ , বলুন না রনজয় বাবু । আপনার স্ত্রী ভালো আছেন তো ?
রনজয় ব্যানার্জী : হ্যাঁ , আজকের বিপত্তির কারণ শুধু ওই রাস্তার কুকুরটা নয় , আসলে রমলার হার্টের অসুখটা গত কয়েক বছর ধরে মাঝে মাঝেই বেড়ে যায় , তার ওপরে এখন আমার ছোট ছেলের স্ত্রী অমিতাকে নিয়ে ও খুব চিন্তায় আছে ,আপনাদের সাথে অমিতার এখনো পরিচয় হয়নি। পারিবারিক দুঃখের কথা কি বলব আপনাদের ,অমিতা এবার নিয়ে চার বার সন্তান সম্ভবা , এর আগের তিন বার ও মৃত সন্তান প্রসব করেছে ,এইবারেও ওর শরীর বিশেষ ভালো নয়। তাই ভাবলাম জয়ন্ত বাবু তো তো খুব বড় gynecologist, যদি অমিতাকে একবার দেখেন …
জয়ন্ত লাহা ইতস্তত করে বললেন : হ্যাঁ , কিন্তু এভাবে উপর থেকে দেখে তো কিছু বোঝা সম্ভব নয় ,তবে ওনার রিপোর্ট গুলো দেখলে হয়তো একটু হলেও আপনাদের সাহায্য করতে পারব ।
সোনাকাকু : আপনারা অমিতাদেবীকে কলকাতা নিয়ে যাননি কেন ?
নিলয় ব্যানার্জী : ও যে কিছুতেই যেতে চায় না ,অমিতার বাবা একজন ডাক্তারের অবহেলায় কলকাতার নার্সিং হোমে মারা গিয়েছিলেন , সেই থেকে ওখানকার ডাক্তারের উপর ওর খুব অবিশ্বাস ।
জয়ন্ত লাহা : রণজয় বাবুর নার্সিং হোম তো এখনো ওপেন হয়নি , তাহলে অমিতা দেবীর চিকিৎসা এখন কোথায় করাচ্ছেন ?
নিলয় ব্যানার্জী : এখানকার সরকারী হাসপাতালে পুলক বর্মন নামে একজন ডাক্তার আমাদের অনেকদিনের জানাশোনা , অমিতা ওনার আন্ডারেই আছে ।
জয়ন্ত লাহা : তা উনি কী বলছেন ,বার বার এরকম হওয়ার কি কারণ ?
নিলয় ব্যানার্জী : ডাক্তারের কোনো দোষ নেই জয়ন্ত বাবু , আসলে কাকতালীয় ভাবে তিনবারই ভরা মাসে অমিতা পড়ে গিয়েছিল , প্রথমবার সিড়ি থেকে , দ্বিতীয় বার বাথরুমে , তৃতীয় বার কুয়োর ধারে । এবার তাই বিছানা থেকে ওকে আর নামতে দেওয়া হচ্ছে না , গতকালের রিপোর্ট অনুযায়ী আমাদের সন্তান এখনো সুস্থ আছে কিন্তু প্রসবের দিন যত এগিয়ে আসছে একটা ভীষণ অবসাদ অমিতাকে ঘিরে ধরছে, হয়তো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাই তার এই অবস্থার কারণ ।
সোনাকাকু : হুম বুঝতে পারছি , আপনি বরং আপনার স্ত্রীর রিপোর্ট গুলো জয়ন্তকে দেখান , তারপর না হয় ওনাকে একবার দেখে আসা যাবে , তার সাথে আলাপ টাও সেরে নেব ।
নিলয় ব্যানার্জী অল্প হেসে বললেন , “তাহলে আমি আজকে রাত্রে পুরনো রিপোর্ট গুলো বার করে রাখছি , কাল সকালে সব একসাথে নিয়ে আসবো ।
জয়ন্ত লাহা : আচ্ছা ।
রণজয় ব্যানার্জী : আজকে যা বিপদ গেল , স্বাগ্নিক বাবু না থাকলে যে কি হত কে জানে , আপনাদের নার্সিং হোম দেখানো তো ছেড়েই দিন, সারাদিন আপনাদের কোনো খবর পর্যন্ত আসতে পারিনি । কালকে সকালে আমি না যেতে পারলেও অরুণ বা নিলয় আপনাদের নার্সিং হোম দেখিয়ে নিয়ে আসবে,বার বার তো আসতে পারবেন না ,
অনেক খুটিনাটি বিষয়ে আপনাদের মতামত জানাটা খুব জরুরি ।
জয়ন্ত লাহা : আরে এভাবে ভাবছেন কেন ! এরকম শান্ত পরিবেশে বিশ্রামের দিন ডাক্তারদের অনেক ভাগ্য করে পেতে হয় , আমাদের কোনো অসুবিধা হয়নি , নীলকান্ত দা সারাদিন সময়ে সময়ে এসে খিদের আগেই খাবার দিয়ে গেছেন । আমাদের নিয়ে অত চিন্তা করবেন না , আগে আপনি Mrs ব্যানার্জীর খেয়াল রাখুন,সব ঠিক হলে যাওয়া যাবে ক্ষণ নার্সিং হোম দেখতে , আমরা তো দশমী পর্যন্ত আছি এখানে ।
সোনাকাকু : আমিও জয়ন্তর সাথে একমত , আশা করি এই মঙ্গল উৎসবে ,সকল বিপদ কেটে গিয়ে আনন্দে ভরে উঠুক আপনার পরিবার ।
রণজয় ব্যানার্জী : আপনাদের ব্যবহার দেখে আমি সত্যি মুগ্ধ ,আন্তরিক ধন্যবাদ এই বিপদে আমাদের পাশে থাকার জন্য, মা দূর্গা বোধহয় সব ভেবেই আপনাদের আসার সময় নির্ধারণ করেছেন । আর বিরক্ত করব না , এখন আসি , আবার কাল সকালে দেখা হবে ।
রাতের খাবার খেয়ে সোনা কাকু আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল , তিতিরের মন কিছুতেই গল্পের বইতে বসছে না , জয়ন্ত লাহা একই রকম নির্বিকার ভাবে অনেক ক্ষণ জার্নালের পাতা উল্টে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লেন ।
অষ্টমী
ভোর ৪ টে : সোনাকাকুর ঘুম হঠাৎ ভাঙ্গতেই দেখল তিতির বিছানায় নেই । তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে বারান্দা আর বাথরুমেও তাকে না দেখে , পায়ে চটিটা গলিয়ে সিড়ি দিয়ে ঠাকুর দালানে নেমে এলো সোনাকাকু । মন্ডপে দুর্গামূর্তি আর ঘুমন্ত চাকর স্থানীয় মানুষ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না । সোনাকাকু ভীষণ উদ্বেগে মন্ডপের পিছনের গলিতে পা বাড়াতেই দেখল তিতির হন্তদন্ত করে হেঁটে আসছে ।
সোনাকাকু উদ্বেগ চেপে রেখে কঠিন গলায় বলল , “কিরে কোথায় গেছিলিস ? কতবার বলেছি এভাবে আমাকে না বলে কোথাও যাবি না, একটা বিপদ না ঘটিয়ে শান্তি নেই তোর ,তাই না ?
তিতির : “আহ । ওত রাগ তোমায় মানায় না ,তুমিও অনেক কিছু আমাকে না জানিয়ে করো , অনেক কথা আছে , উপরে চলো ।”
সোনাকাকু আরো কিছু বলতে চাওয়ায় তিতির মুখে আঙ্গুল দেখিয়ে তার হাত টেনে উপরে নিয়ে গেল ।
ঘরের ভিতর ঢুকে সোনাকাকু বলল : জয়ন্ত ঘুমাচ্ছে , বারান্দায় চল ।
তিতির বারান্দায় গিয়ে সোনাকাকুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল , “আমার রাত্রে কিছুতেই ঘুম আসছিল না , তাই ৪ টে নাগাদ উঠে বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলাম , হঠাৎ ঋতু ব্যানার্জী কে মন্ডপের পিছনের গলিতে যেতে দেখলাম , ভাবলাম গত কালের মত আবার যদি কিছু অনিষ্ট হয় , তাই ওনার পিছু নিয়েছিলাম ।”
সোনাকাকু : তিতির ….
তিতির : আহ ! পুরোটা শুনে তারপর চিৎকার করো । ঋতু ব্যানার্জী কুয়োর পাড়ে গিয়েছিলেন , আমি একটু দূরের দেওয়ালের পিছন থেকে পরিস্কার দেখেছি , উনি কুয়োর চারিদিকে ঘুরছিলেন ও ভিতরের দিকে দেখছিলেন বার বার , মনে হল কিছু একটা খুঁজছেন । কিছু বোঝার আগেই অরুণ ব্যানার্জী ওখানে চলে এলেন , ওত ভোরে ঋতু ব্যানার্জীর কুয়োর পাড়ে ঘোরাঘুরি তার স্বামীর কাছে যেন প্রত্যাশিত ব্যাপার। একটুও বিস্ময় প্রকাশ না করে প্রথমে উনি নিজের স্ত্রীকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন , তাতে সফল না হওয়ায় দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ঝগড়া হল , আমি দূরে থাকায় কোনো কথা শুনতে পাইনি ,শুধু মুখের ভাব দেখেই আন্দাজ করতে হয়েছে ,তাও সবে ফোঁটা আলোতে যা দেখেছি ,তাই বললাম। ওরা চলে আসার পরও কিছুক্ষণ ওখানে লুকিয়ে ছিলাম ,বলা কি যায় যদি দুজনের মধ্যে কেউ ফিরে আসে ! তাই একটু দেরী হয়ে গেল । ব্যাপারটা একদম সহজ নয় সোনাকাকু ।
সোনাকাকু : তার মানে তুই বলছিস কালকে রমলা ব্যানার্জীর দুর্ঘটনার পিছনে ঋতু ব্যানার্জীর হাত আছে ! ধস্তা ধস্তিতে কিছু পড়ে যাওয়ায় আজ উনি সেটা ওখানে খুঁজতে গেছিলেন !আর রমলা ব্যানার্জী পারিবারিক ঝামেলা সকলের থেকে লোকাতেই মিথ্যে বলেছেন ।
তিতির : সেই ফর্মুলায় দুটো ব্যাপার হতে পারে , অরুণ ব্যানার্জী হয় সত্যি টা জানেন অথবা জানেন না । যদি না জেনে থাকেন ,তাহলে স্ত্রীকে ওত ভোরে ওখানে দেখে একটুও বিস্ময় প্রকাশ করলেন না কেন ? তাছাড়া হঠাৎ স্বামীকে দেখে তো ঋতু ব্যানার্জীর ভয় পাওয়ার কথা , তা তো উনি পাননি । আর যদি ধরে নি , অরুণ ব্যানার্জী কোনো অজানা উদ্দেশ্যে কালকের ঘটনায় তার স্ত্রীকে সঙ্গ দিয়েছিলেন , তাহলে আজকের ঝগড়ার কারণ কী !
সোনাকাকু : এই ফেলুদাই সব সর্বনাশের ভুল , ঘুমো গিয়ে এখন তুই । পরে এসব নিয়ে কথা বলা যাবে , আমরা এখানে দু দিনের অতিথি, এসব পারিবারিক ঝামেলায় না পড়াই ভালো ।
তিতির গম্ভীর ভাবে ভিতরে যাওয়ার সময় বলল , “২ দিন নয় , ৫ দিন সোনাকাকু ,এত সহজ হিসেবে ভুল তোমার মত বিজ্ঞানের ছাত্রকে মানায় না ।”
সকাল ১১ টা : নীলকান্তের নিয়ে আসা জলখাবার খেয়ে সোনাকাকু আর তার বন্ধু, রণজয় ব্যানার্জীর গাড়িতে নার্সিং হোম দেখতে বেরিয়ে গেল । সকালবেলা তিতির ঠাকুর দালানে গিয়ে অঞ্জলি দিয়ে এসেছে , বাড়ির মহিলাদের মধ্যে শুধু ঋতু ব্যানার্জী ই উপস্থিত ছিল,আর বাকি সব আশেপাশের বাড়ির লোকজন । অঞ্জলির ফাঁকে সে লক্ষ্য করেছিল ঋতু ব্যানার্জীর চোখে মুখে ভীষণ বিষাদের চাপ । এখন একা বারান্দায় দাড়িয়ে , প্রায় খালি মন্ডপের দিকে তাকিয়ে কলকাতার কথা তিতিরের খুব মনে পড়ছিল । ফেলুদার গল্পের মতই, পাড়ার বন্ধুদের সাথে অষ্টমীর সকালে পুজো প্যান্ডেলে হুল্লোড়ের কোনো বিকল্প নেই ।
দুপুর ২ টো : সোনাকাকু আর জয়ন্ত লাহা ঘরে ঢুকতেই তিতির বলল , “এতক্ষণ লাগলো একটা নার্সিং হোম দেখতে ?”
সোনাকাকু (হেসে) : তুই তো গেলি না ! গেলে দেখতিস ভদ্রলোক সত্যি অনেক যত্ন ও খরচা করে নার্সিং হোম টাকে তৈরী করছেন ,একসময় এটা কলকাতার নাম করা নার্সিং হোমের সাথে পাল্লা দেবে ,তবে এখানে ভালো ডাক্তার পাওয়া মুশকিল , সেটা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল , আমি আর জয়ন্ত যেটুকু পেরেছি নিজেদের মতামত দিলাম , চেষ্টা করব ভবিষ্যতেও যদি আরো কোনোভাবে ওনাকে সাহায্য করতে পারি ।
তিতির : তা সে নার্সিং হোমে চিকিৎসা কবে থেকে শুরু হবে ?
সোনাকাকু : রণজয় বাবু তো বললেন ৬ মাসের মধ্যেই ,ভদ্রলোক কে দেখে তো মনে হয় না যে উনি বাজে কথা বলার লোক , আর যে গতিতে সব কাজ চলছে দেখলাম , আমার তো মনে হয় ভালো ডাক্তারের গ্রুপ পেলে তার আগেই শুরু হয়ে যেতে পারে ।
তিতির ‘হুম’ বলে উপন্যাসে মনোনিবেশ করলো ।
সন্ধ্যে ৭ টা : দুপুরের ভাত ঘুমের পর চা বিস্কুট খেয়ে তিতির যখন সোনাকাকু আর তার বন্ধুর সাথে তাদের ডাক্তারী জীবনের বিভিন্ন গল্প শুনতে ব্যস্ত , দরজার বাইরে নিলয় ব্যানার্জীর গলার আওয়াজ , ” আসতে পারি ? ”
সোনাকাকু : হ্যাঁ, আসুন না !
নিলয় ব্যানার্জী : আসলে আমি ওই অমিতার রিপোর্ট গুলো নিয়ে এসেছিলাম ! জয়ন্ত বাবু যদি একটু দেখেন !
জয়ন্ত লাহা উঠে গিয়ে রিপোর্ট গুলো হাতে নিয়ে অল্প হেসে বললেন : হ্যাঁ নিশ্চই , আজ রাতে দেখে নি ,তারপর আমার সাধ্যমত যথাসম্ভব চেষ্টা করব আপনাদের সাহায্য করতে !
নিলয় ব্যানার্জী কৃতজ্ঞতার হাসি মেখে বললেন : অনেক ধন্যবাদ ! আমি এখন আসি , অমিতা ঘরে একা আছে।
জয়ন্ত লাহা :আচ্ছা ।
রাত্রি বারোটা : জয়ন্ত লাহা মন দিয়ে অমিতা ব্যানার্জীর রিপোর্ট গুলো পড়তে ব্যস্ত, সোনাকাকু খাওয়া দাওয়ার পর অভ্যাস মত বারান্দায় পায়চারী করছে , তিতিরের হাতের উপন্যাস টা প্রায় শেষের মুখে ।
সোনাকাকু ঘরে ঢুকতেই জয়ন্ত লাহা বলল , “এই ছুটিতে এসেও ডাক্তারী থেকে মুক্তি নেই , নিজেও জড়ালি আর আমাকেও ঝামেলায় ফেললি !”
সোনাকাকু হেসে বলল , “তা কতদূর এগোলি ?”
জয়ন্ত লাহা : এখনি কি ! আজকে মনে হচ্ছে সারারাত জাগতে হবে ।
সোনাকাকু : তা তুই জেগে থাক , আমি ঘুমোতে গেলাম , আমার ভাইজি টির আবার রাত বিরেতে ঘুম চোখে চলার অভ্যেস ! তাকে খুঁজতে কখন আবার উঠতে হয় ঠিক নেই ।
নিরুত্তর তিতির মুখ বেঁকিয়ে পাশ ফিরে শুলো ।
নবমী
ভোর ৬ টা : ঠাকুর দালানে ভয়ানক শোরগোলে তিতিরের ঘুম ভেঙ্গে গেল । তিতির উঠে বারান্দায় যাওয়ার আগেই দরজায় উদ্বেগের টোকা পড়ল । সোনাকাকু ঘুম চোখে উঠে দরজা খুলতেই নিলয় ব্যানার্জী বললেন , “অমিতার ব্যথা উঠেছে স্বাগ্নিক বাবু ! আমরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি , আপনি যদি দয়া করে জয়ন্ত বাবুকে নিয়ে আসেন !
“হ্যাঁ , নিশ্চই ! আপনারা এগোন ,আমি জয়ন্তকে নিয়ে আসছি। ” কথাটা বলেই সোনাকাকু দ্রুত বিছানার কাছে গিয়ে ঘুমন্ত জয়ন্ত লাহাকে ধাক্কা দিয়ে বলল , “জয়ন্ত ওঠ তাড়াতাড়ি ! অমিতা দেবীর লেবার পেইন উঠেছে ! আমাদের হাসপাতালে যেতে হবে । ”
জয়ন্ত লাহা চমকে বিছানায় উঠে বসলেন , তারপর রাত জেগে পড়া রিপোর্ট গুলো দ্রুত ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে তৈরী হয়ে নিলেন ।”
তিতির : “সোনাকাকু আমিও যাব তোমাদের সাথে। ”
সোনাকাকু : “আচ্ছা !”
বেলা ৯ টা : একজন মাঝবয়সী ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন , “আমরা সবরকম পরীক্ষা করে দেখেছি , মা আর বাচ্চা দুজনেই ভালো আছে, এটা লেবার পেইন নয় ,তবে আজ কালের মধ্যেই ব্যথা ওঠার কথা,নর্মাল ডেলিভারি হবে আশা করছি ,চিন্তার কোনো কারণ নেই, আপনারা বাড়ি যেতে পারেন , কোনো খবর হলে আমি নিজে আপনাদের ফোন করে দেবো ।” ব্যানার্জী পরিবারের সকলের মুখে স্বস্তির হাসি নেমে এলো ।
জয়ন্ত লাহা ডাক্তারের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন ,
>”নমস্কার , আমি Dr জয়ন্ত লাহা , আমি পেশেন্ট কে একবার দেখতে চাই ।”
>ওহ আমি ,Dr পুলক বর্মন, নিলয়ের সাথে আমার কথা হয়েছে । আপনি নিশ্চই দেখতে পারেন কিন্তু অমিতা দেবী
এখন ঘুমাচ্ছেন ,আমার মনে হয় ওনাকে এখন বিব্রত না করাই ভালো ।
> ঠিক আছে , আমি তাহলে অপেক্ষা করছি , ওনার ঘুম ভাঙলে আমাকে ডাকবেন ।
>আচ্ছা ।
বেলা ১১ টা : নিলয় ব্যানার্জী পরিবারের বাকি লোকজনদের বাড়ি পাঠিয়ে নিজে জয়ন্ত লাহার পাশে বসে অপেক্ষা করছেন ,তিতির উল্টোদিকের বেঞ্চে বসে আছে, সোনাকাকু করিডোরে পায়চারী করছে । Dr পুলক বর্মন এসে বললেন, “আপনারা এখন অমিতা দেবীকে যেতে পারেন।”
জয়ন্ত লাহা : ধন্যবাদ ।
পুলক বর্মন যে তার চিকিৎসায় শহরের ডাক্তারের নাক গলানোতে খুশী নন , সেটা তার নিরুত্তর চলে যাওয়া আরো বেশী করে স্পষ্ট করে দিল । এতদিনের পরিচিত নিলয় ব্যানার্জীর সাথেও তিনি কোনো কথা বললেন না ।
সরকারী হাসপাতাল হলেও অমিতা দেবী যে ঘর টি তে শুয়ে আছেন , সেটা বেশ পরিষ্কার । নিলয় ব্যানার্জী তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললেন , “অমিতা ! বাড়িতে তোমার সাথে পরিচয় করানো হয়নি ,ইনি Dr স্বাগ্নিক মুখার্জী ,বিখ্যাত হার্ট সার্জেন , উনি Dr জয়ন্ত লাহা , নাম করা gynecologist আর ও তিতির , Dr মুখার্জীর ভাইজি ।”
অমিতা ব্যানার্জী বিছানায় শোয়া অবস্থায় হাসি মুখে হাত জোড় করে বললেন , “নমস্কার , আপনারা কদিনের অতিথি , আমার জন্য শুধু শুধু এত দূর কষ্ট করে এলেন ! এ নিশ্চই আমার স্বামীর অনুরোধে ।
সোনাকাকু : আমাদের পেশা যে তাই করতে শেখায় অমিতাদেবী ,আপনার স্বামী এখানে নির্দোষ ।
জয়ন্ত লাহা :আপনার রিপোর্ট গুলো আমি দেখেছি অমিতা দেবী , কোনো দিক থেকেই আপনার কেস আমার জটিল মনে হয়নি ,আগে যা হয়েছে তা ভাগ্য দোষ ছাড়া কিছুই নয় , আপনি মিথ্যা ভয় পাবেন না , আপনার ডেলিভারি খুব সুষ্ট ভাবে হবে এবার । আপনার পরিবার আপনাকে খুব ভালবাসে , অন্তত তাদের কথা ভেবে মনে জোর আনুন ,এই সময় মায়ের মন শক্ত হওয়া খুব দরকার !
অমিতা ব্যানার্জী : ধন্যবাদ ! আপনার কথা শুনে সত্যি ভরসা পেলাম জয়ন্ত বাবু ।
জয়ন্ত লাহা : Dr পুলক বর্মনের কথা অনুযায়ী আপনার বাচ্চা এখন ভালো আছে, আশা করি সুখবর টা শুনেই কলকাতা ফিরতে পারব ।
অমিতা ব্যানার্জী : আপনারা আর কষ্ট করবেন না , ওই ডাক্তার বাবুই বরাবর আমার চিকিৎসা করে এসেছেন , আমার মৃত সন্তানের জন্য তার ডাক্তারী বিদ্যাকে দায়ী করা অন্যায় হবে , আমার বাড়ির লোকের তার ওপরে ভরসা না থাকতে পারে , কিন্তু আমার আছে।আমার কপালে যদি মা হওয়া না থাকে তাহলে কলকাতার ডাক্তার কেন, শুনেছি ভগবান নিজেও তার লেখা ভাগ্যলিখন বদলাতে পারেন না ।
কথাটা বলেই অমিতা ব্যানার্জী ওপাশ ফিরে শুলেন ।
নিলয় ব্যানার্জী লজ্জিত মুখে হাত জোড় করে বললেন , “ক্ষমা করবেন জয়ন্ত বাবু , আপনাদের তো বলেছিলাম কলকাতার ডাক্তারের ওপর ওর রাগের কারণ ,এত বছরেও আমি কিছুতেই ওকে বুঝিয়ে উঠতে পারিনি যে ভালো মন্দ সব জায়গাতেই হয় , ওর হয়ে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি,দয়া করে কিছু মনে করবেন না ।”
জয়ন্ত লাহা : না না ঠিক আছে ! এসময়ে ওনাকে আর বিব্রত করা ঠিক হবে না ,আমরা বরং এখন আসি ।
জয়ন্ত লাহার সাথে সোনাকাকু ও তিতির ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।
বিকেল ৫ টা : চা এর কাপে চুমুক দিয়ে সোনাকাকু বলল , ” জয়ন্ত ! এখনো তো কোনো খবর এলো না রে , একবার আমাদের গিয়ে দেখে আসা উচিত,কি বলিস ?”
জয়ন্ত লাহা : তোর যাওয়ার হলে তুই যা , আজ পর্যন্ত বিনা কারণে এরকম অপমান আমাকে কেউ করেনি ।
সোনাকাকু : আরে নিজের বাবার মৃত্যুর জন্যেই হয়তো ভদ্রমহিলা …….
জয়ন্ত লাহা : বললাম তো ,আমি আর এর মধ্যে নেই ….
সোনাকাকু : হুম বুঝলাম ।
রাত সাড়ে এগারোটা : জয়ন্ত লাহার কানের কাছে গিয়ে সোনাকাকু বলল , “আমরা ঠিক দশমী শুরু হওয়ার মহেন্দ্রক্ষণে বেরোব ,চটপট তৈরী হয়ে নে ।”
জয়ন্ত লাহা : মানে কোথায় ?
সোনাকাকু : হাসপাতালে ।
জয়ন্ত লাহা : কেউ কিছু বলেছে নাকি ?
সোনাকাকু : না ! ডাক্তার পেশার কর্তব্য ভুললে চলবে কি করে !
জয়ন্ত লাহা আরো কিছু বলতে চাওয়ায় সোনাকাকু বলল , “আর কিন্তু ২৫ মিনিট বাকি !”
দশমী
রাত বারোটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে একটা ট্যাক্সি তে উঠলো ওরা । ১ টা নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছে সোনাকাকু বলল , “আমরা যেহেতু কাউকে বলে আসিনি , কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে ব্যানার্জী পরিবারের নাম না নিয়ে ID কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে ।”
জয়ন্ত লাহা :আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না এভাবে লুকিয়ে আসার মানে কি !
সোনাকাকু : ব্যাপারটা সেটা নয় , আজ সকালের ঘটনার পর ওনারা হয়তো আমাদের সাহায্য নিতে সঙ্কোচ করবেন, আচ্ছা শোন ! তুই অমিতা দেবীর কেবিনে যা , আমি তিতিরকে নিয়ে Dr পুলক বর্মনের সাথে কথা বলে আসি ,ওনার তো এখন হাসপাতালেই থাকার কথা ।
জয়ন্ত লাহা : আচ্ছা ।
সোনাকাকু রিসেপশনে গিয়ে Dr পুলক বর্মনের খোঁজ করায় ওখানে বসা ভদ্রলোকটি তাকে অপেক্ষা করতে বললেন , ডাক্তার এলে উনি ডেকে নেবেন । তিতির জয়ন্ত লাহাকে দ্রুত পায়ে এদিকে ফিরে আসতে দেখে সোনাকাকুর হাতে হালকা ধাক্কা দিল । বন্ধুর মুখের ঘৃণার অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে সোনাকাকু এগিয়ে গিয়ে বলল , ” কি হয়েছে জয়ন্ত ?”
জয়ন্ত লাহা নিজের মোবাইলে একটা ছবি দেখিয়ে বলল , “দ্যাখ ! এই হল অমিতা দেবীর গ্রামের ডাক্তারের চিকিৎসা । শুধু তুই যাতে এটা আমার অজুহাত না ভাবিস ,লজ্জার মাথা খেয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে এই ছবিটা তাই আমাকে তুলতে হয়েছে ,তোর কি এরপরেও আরো কিছু জানার আছে ? ”
সোনাকাকু চোয়াল শক্ত করে বলল : আছে বৈকি ।
অমিতা ব্যানার্জীর কেবিনের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সোনাকাকু , তিতির বিনা বাক্য ব্যয় তার পিছু নিল ।
সোনাকাকু অমিতা ব্যানার্জীর কেবিনের দরজায় আওয়াজ করতেই , অমিতা দেবী নিজের অসংলগ্ন কাপড় সামলে নিলেন , Dr বর্মনের কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থা উপেক্ষা করে সোনাকাকু ঘরে ঢুকে বলল :
“আপনার সকালের ব্যবহারের ব্যাখ্যা আমার কাছে থাকলেও Dr বর্মনের ব্যবহারে খটকা লেগেছিল বৈকি ! ডাক্তারী পেশায় অন্য ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করাকে কখনোই নিজের অজ্ঞতা বলে ভাবা হয় না । আপনাদের সম্পর্ক Mrs রমলা ব্যানার্জী জেনে ফেলেছিলেন বলেই কি তার এই অকারণ শাস্তি ? আর সকালে নিজের মৃত সন্তানের কথা বলতে গিয়ে আপনার চোখে যখন বিন্দুমাত্র জলের চিহ্ন দেখতে পেলাম না তখন সম্মানের সকল গন্ডি ভেঙ্গে সত্যি জানার আগ্রহ আমার অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। আপনি ইচ্ছা করেই আপনার স্বামীর সন্তান ধারণ করতে চাননি , ‘কাকতালীয়’ শব্দ টা নিতান্তই আপনার ভালো মানুষ স্বামীর বিশ্বাস , তাই না ? নিলয় বাবুর সাথে তারা তো আপনার অংশ ও ছিল , মা হয়ে বার বার সুকৌশলে নিজের সন্তান হত্যা করার ইতিহাস আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব কে নাড়া দিয়েছে অমিতাদেবী ! আমি এখন বুঝতে পারছি আপনি কেন রাতে ঘুমাতে পারেন না ,পাপের ভার ই বোধহয় আপনার সকল ভয়ের কারণ !”
নিরুত্তর অমিতা ব্যানার্জীর উত্তরের অপেক্ষা না করে তিতির বলল : তুমি ভুল করছ সোনাকাকু ! তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে বলে শোননি,জয়ন্ত কাকু কাল রাতে ওনার রিপোর্ট গুলো দেখে তোমাকে বলছিল যে শুধু একটা জায়গায় তার ভীষণ খটকা লেগেছে : অকস্মাৎ পড়ে যাওয়া , তিন তিনবার পেটের সন্তানের মৃত্যুর কারণ হলেও কোনো রিপোর্টে ওনার ইন্টারনাল আঘাতের কথা উল্লেখ নেই বা শরীরের বাইরে এমন কোনো জায়গাতেও কখনো আঘাত লাগেনি যা এমন অনিষ্ট ঘটাতে পারে । তাছাড়া আরেকটা কথা ভেবে দেখো সোনাকাকু , সন্তান হত্যা করতে হলে ভ্রুণ অবস্থায় কেন করেন নি ? শুধু শুধু ১০ মাস পেটে ধরার যন্ত্রণা সইতে গেলেন কেন !
সোনাকাকু বিস্মিত হয়ে তিতিরের দিকে তাকাতে সে বলল , ” আমাদের জানা দরকার তিনবারের মধ্যে একবারও ওনাকে পড়ে যেতে অন্য কেউ দেখেছে কি ?”
অমিতা ব্যানার্জী এবার ঘামতে লাগলেন , ওনার কঠিন দৃষ্টি মুহুর্তে কাকুতিতে বদলে গেল ।
সোনাকাকু : কিন্তু আপনার মৃত সন্তান তো সকলে দেখেছে , তাহলে সত্যি টা কি অমিতা দেবী ? কথা দিচ্ছি যদি সঙ্গত কারণ থাকে তা এই ঘরের বাইরে যাবে না ।
অমিতা ব্যানার্জী ভাঙ্গা গলায় বললেন , “তিতির ঠিকই বলেছে স্বাগ্নিক বাবু , সকলের জানা সত্যি ,পড়ে যাওয়ার কথাটা আসলে নিতান্তই মিথ্যে । নিজের সন্তান কে বাঁচাতে এছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না, নাহলে ঋতু দিদির মত আমার তিনটি মেয়ে সন্তানেরও সমাধি হত ব্যানার্জী বাড়ির গভীর পাত কুয়ো। Dr বর্মনের সাহায্য ছাড়া ভ্রুণের লিঙ্গ আগে থেকে জানা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না ,উনি আমার তিনটি মেয়েকে সকলের অগোচরে তিনটি নিঃসন্তান দম্পতির হাতে তুলে দিয়েছেন , আমি নিজের পরিচয় গোপন করে ,বিভিন্ন ছদ্মবেশে তাদের সাথে মাঝে মাঝে দেখাও করতে যাই । অন্য জায়গা থেকে সময় মত মৃত শিশুদেহ Dr বর্মন ই তিনবার নিয়ে এসেছেন, আমি যে ওনার কাছে চিরঋণী। এত উপকারের বদলে যদি উনি আমার কাছে সামান্য কিছু দাবী করেন ,তাতে না বলার সামর্থ্য যে এই মায়ের নেই স্বাগ্নিক বাবু ! ”
সোনাকাকু পিছনে ঘুরে চোখের জল আড়াল করে বলল , “এবার তাহলে আপনার ছেলে হবে ?”
অমিতা ব্যানার্জী : “তাহলে আর সত্যি লুকোতে আপনার বন্ধুকে বিনা দোষে সকালে এভাবে অপমান করতাম না স্বাগ্নিক বাবু !এবার আমার পেটে যমজ সন্তান , মেয়েটির জন্য একজন নতুন দম্পতি অপেক্ষা করছেন , শুধু এবার আর মৃত শিশুর প্রয়োজন হবে না,আমার ছেলে ব্যানার্জী পরিবারের মনস্কামনা পূরণ করবে । পরম করুণাময় ঈশ্বর অবশেষে এই অসহায় মায়ের কথা শুনেছেন , পরের বছর , বাবার নার্সিং হোমের যন্ত্রের কাছে সত্যি লুকোনো অসম্ভব হত ।
আর একটা কথা , ঋতু দির মত আমার শাশুড়ি মা ও প্রায়ই কুয়োর পাড়ে নিজের রক্তের সম্পর্ক গুলোর কাছে কাছে ক্ষমা চাইতে যান। মা আমাকে নিজের মেয়ের মতই ভালবাসেন,তাই সেদিন আমার সাথে ডাক্তার বর্মন কে দেখে উনি আর মাথার ঠিক রাখতে পারেন নি। ডাক্তারবাবুও নিজেকে বাঁচাতে ভীষণ বড় ভুল করে ফেলেছিলেন , এই অবস্থায় তাকে বাঁধা দেওয়ার শক্তি আমার ছিল না , তাই কোনভাবে ফিরে এসে নীলকান্ত দা কে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলাম , তার থেকে বেশী বিশ্বাস আমি নিজেকেও করি না , ছোটবেলা থেকে দেখা ব্যানার্জী পরিবারের অগণিত অপরাধের আগুনে জ্বলছে তার শরীর মন , তবু আমাদের মত হতভাগীদের মায়ার বাঁধন কাটিয়ে মুক্তির হাতছানিতে সে কখনো সাড়া দেয়নি । ”
সোনাকাকু আর দাড়িয়ে থাকতে না পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল , তিতির চোখের জল মুছে অমিতা ব্যানার্জীর পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে বলল , “এবার আমার মেয়ে জন্ম স্বার্থক হল ।” দ্রুত পায়ে বাইরে এসে দেখলো জয়ন্ত লাহা নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে দরজার পাশে দাড়িয়ে আছেন ।
দশমীর সকাল ১১ টা : ঠাকুর দালানে হৈ হৈ রবে কান পাতা দায় , রণজয় ব্যানার্জী ঘরে ঢুকে বললেন , জয়ন্ত বাবু! স্বাগ্নিক বাবু ! সুখবর আছে , হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল , নিলয়ের ছেলে হয়েছে । আপনারা সত্যি আমার বাড়ি মা দুর্গার আশীর্বাদ হয়ে এসেছেন, আজ কিন্তু কিছুতেই আপনাদের ফিরে যাওয়া চলবে না।
জয়ন্ত লাহা গম্ভীর মুখে বলল , বাহ্ ! খুব আনন্দের খবর , আপনাকে অনেক অনেক অভিনন্দন ,কিন্তু ক্ষমা করবেন , আমাকে আজ কলকাতায় পৌঁছতেই হবে, বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান আছে ,তাই দুপুরে না বেরোলে দেরী হয়ে যাবে ।
রণজয় ব্যানার্জী : ওহ , বিজয়া র শুভেচ্ছার কোলাকুলি তাহলে পরের বছরের জন্য তোলা থাকলো । আসলে নদী টা অনেকটা দূর তো , প্রতিমা ভাসান দিয়ে ফিরে আসতে সন্ধ্যে হয়ে যায় ।
তিতির বিদ্রুপের স্বরে বলল, “বাড়িতে এত বড় পাতকুয়ো থাকতে ভাসানের জন্য ওত দূরে যাওয়ার কি দরকার !”
কথাটা শুনে ভদ্রলোক মুহুর্তের জন্য বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন ।
সোনাকাকু পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল , “ওর কথা ছাড়ুন তো ,ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে তো তাই বাংলার নিয়ম কানুন কিছু জানে না । নদীর জলের বিস্তৃতি দূর্গা মায়ের চোখের জলকে আপন করে নিয়ে , বিদায়ের আন্তরিকতার মধ্যে দিয়ে তার শক্তিরূপ ফিরিয়ে দেয় তিতির আর সেই রূপকেই ধারণ করে সকল পাপের বিনাশ করতে আবির্ভূত হন মা কালী।
ভদ্রলোক হেসে বললেন , “সত্যি আপনার কথা শুনে মন ভরে গেল স্বাগ্নিক বাবু ! ভাবছি পরের বছর থেকে ব্যানার্জী বাড়িতে কালী পুজোও শুরু করব।”
দুপুর ২ টো : ওদের তিনজন কে নিয়ে গাড়ি টা কলকাতার দিকে রওনা হতেই তিতির বলল , “অমিতা ব্যানার্জীর কাছে স্বামীর পদবী টা কি ভীষণ গুরুত্বপূর্ন ?”
সোনাকাকু : হয়তো হ্যাঁ , এখনো আমাদের দেশের সব মেয়েরা যে তোর মত স্বাধীন নয় তিতির ! পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাদের খাঁচার দরজা শক্ত করে আটকে দেয় ,কিন্তু অমিতা দেবীর মত মেয়েরা সে খাঁচার মধ্যে থেকেও স্বাধীনতার নতুন মানে অবিষ্কার করেন , আজকের সমাজ তাদের কাছে কৃতজ্ঞ ।