অন্তরাল

Comments 3 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

তিতির পূজাবার্ষিকী টা হাতে নিয়ে সোনা কাকুকে বলল , ” এবার পুজোর পাঁচ দিন তোমার কিন্তু ডাক্তারি করা চলবে না !”

সোনা কাকু : সে তোর দূর্গা ঠাকুর যদি  ওই পাঁচদিন কাউকে ডাক্তারের প্রয়োজন অনুভব না করায় ,তাহলে আমি আর আপত্তি করার কে!

তিতির : ভুলে যেও না ,আমি কিন্তু কাল তোমাকে দাবার খেলায় হারিয়ে দিয়েছি , আর তোমার দেওয়া কথা মত আমি যা চাইব তাই তোমাকে দিতে হবে ।

সোনা কাকু  : তিতির ! তোর বয়স চোদ্দ না হয়ে পাঁচ হলে ,এই অযৌক্তিক আবদারের তবু কোনো ব্যাখ্যা থাকত আমার কাছে ।

তিতির : আমি তো শুনলাম তুমি জয়ন্ত কাকুকে ফোনে বলছিলে , মুর্শিদাবাদ না কোথায় যাবে পুজোতে ! সবসময় আমাকে না জানিয়ে প্ল্যান করো বলে ,আমার কিন্তু আড়ি পাতা স্বভাব হয়ে যাচ্ছে  সোনাকাকু !

সোনা কাকু  : আরে সে কি ঘুরতে  যাবো নাকি ? মুর্শিদাবাদের বলরামপুর গ্রামে একজন ভদ্রলোক  বহুদিনের চেষ্টায় একটা  প্রাইভেট  নার্সিং হোম তৈরী করছেন , ওত দূর বলে  ওনার বারবার অনুরোধ সত্তেও এতদিন আমাদের যাওয়া হয়ে  ওঠেনি , কিন্তু একবার না গেলে এতো বড় একটা উদ্যোগ কে  যে অপমান করা হয় , তাই এবার পুজোর  সময় যাব বলেছি । শুনেছি ভদ্রলোক অনেক অর্থ ব্যয় করে বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি এনে সাজাচ্ছেন নার্সিংহোমটা, সেটা একবার শুরু হলে আশেপাশের শহর- গ্রামের মানুষগুলোকে,  অত্যাধুনিক চিকিৎসার খোঁজে আর প্রাণ হাতে নিয়ে কলকাতা আসতে হবে না ।

তিতির  গম্ভীর হয়ে বলল : তাহলে তো সব ঠিকই হয়ে গেছে , আমার পুজোর নতুন জামাগুলো না হয় আলমারিতেই  পচবে এবার ।

সোনা কাকু  : বললেই হল ? তোর এবারের জামাগুলো কলকাতার বদলে বলরামপুর কে আলোড়িত করবে , ভেবেছিলাম যাওয়ার একদিন আগে বলব তোকে ,কিন্তু আড়ি পাতা  মেয়েদের সারপ্রাইজ যে শুধু ঘরের দেওয়ালই দিতে পারে ।

তিতির  পূজা বার্ষিকী টা  দিয়ে মুখটা  আড়াল করে হাসলো ।

ষষ্ঠী :

সকাল ৮ টায় যখন গাড়িটা  একটা  পুরনো  আমলের  বনেদি  বাড়ির সামনে এসে দাড়ালো ,তখন ওরা  তিনজনেই খুব ক্লান্ত। ভোর রাতে  রওনা দেওয়ার তাড়ায় রাতে  ভালো ঘুম হয়নি , তার ওপরে এতক্ষণ গাড়িতে বসে থাকায় কোমরও  বেশ জোরালো বিদ্রোহ জানাচ্ছিল। শরীরের অস্বস্তি মুখের ভাবে প্রকাশ করার কোনো উপায় ছিল না  কারণ ওরা গাড়ি থেকে নামতেই, বাড়ির সামনে দাড়িয়ে থাকা একজন বয়স্ক ভদ্রলোক  হাসি মুখে এগিয়ে এলেন , ভদ্রলোকের বয়স  আন্দাজ ৭০ হবে, কিন্তু তার শক্ত  চেহারায় বার্ধ্যকের লেশ মাত্র নেই ,পোশাকে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট ।

ভদ্রলোক বললেন  ,”নমস্কার , আমি রণজয় ব্যানার্জী , আপনাদের পরিচয় দেওয়া একেবারেই অনাবশ্যক । আমার মত ছাপোষা মানুষের অনুরোধ যে আপনাদের কাছে এত গুরুত্ব পাবে ,তা আমি কখনো ভাবিনি  , এখানকার লোক খুব একটা মিথ্যে বলে না , আমি সত্যি মা দূর্গার কৃপা ধন্য ।”

সোনা কাকুর বন্ধু জয়ন্ত লাহা  অমায়িক হেসে বললেন , “এভাবে  বলে আমাদের লজ্জিত করবেন না রণজয় বাবু , আপনার মত মানুষের সান্নিধ্য লাভের লোভ সামলাতে না পেরেই কলকাতার পুজো ছেড়ে এখানে আসা , পয়সার জন্য নার্সিং হোম খুলতে হলে আপনি নিশ্চই  এই গ্রাম কে বেছে নিতেন না , এমন মানুষকে সামনে থেকে দেখার সৌভাগ্য আজকাল আর কজনের হয় বলুন ! ”

ভদ্রলোক কিছু বলার আগেই সোনা কাকু বললেন , “জয়ন্ত একদম ঠিক বলেছে রণজয় বাবু  তাছাড়া কলকাতার পুজোর ভিড় দেখে আমাদের চোখ অভ্যস্ত  , তার থেকে  এই নির্ভেজাল পরিবেশে  এবার আমাদের শান্তির উৎ সব দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ । আমার ভাইজি তিতির কোনদিন বাড়ির দুর্গাপুজো দেখেনি, যখন শুনলাম আপনাদের বাড়িতে দূর্গা পুজো হয় , মন্ডপের মা কে  ঘরের মেয়ে  ভাবার স্বর্গীয় উপলব্ধি করাতেই ওকে সাথে করে  নিয়ে এসেছি ।”

তিতির হাসি মুখে এগিয়ে গিয়ে  বয়স্ক ভদ্রলোক কে প্রনাম করল । ভদ্রলোক তার মাথায় হাত রেখে  বললেন , “দীর্ঘজীবি হও মা । দূর্গা মায়ের কাছে প্রার্থনা  করি , এই পাঁচদিনে তোমার  কাকুর  কথা আমি যেন সত্যি করতে পারি, এখান থেকে নিয়ে যাওয়া স্মৃ তি  তোমার সামনের দীর্ঘ জীবনে যেন কখনো আবছা না হয়  তা দেখা যে আমারই দায়িত্ব ।   …. আপনারা নিশ্চই খুব ক্লান্ত , নীলকান্ত আপনাদের ঘরে নিয়ে যাবে , জল খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম করে নিন , তারপর দুপুরের খাবারের টেবিলে আমার পরিবারের সকলের সাথে আপনাদের আলাপ করিয়ে দেব।”

নীলকান্ত নামের পৌঢ় ভদ্রলোকের সাথে ওরা যে ঘরটায় পৌঁছলো তার সজ্জাশিল্পীর প্রতিভা সত্যি প্রশংসনীয় , বিশাল আকৃতির ঘরটার দুদিকে দুটো খাট রাখা যার একটিতেই ৪ জন মানুষ আরাম করে ঘুমাতে পারে । দেওয়ালে ঝোলানো ছবি , পুরাতন জিনিসের অভূতপূর্ব সংগ্রহ  ব্যানার্জী পরিবারের আর্থিক প্রাচুর্য কে আরো স্পষ্ট করে দেয় । ঘরের  রঙ, আসবাবপত্রের নকশা , সবকিছুতেই  গাঢ় আভিজাত্যের ছাপ ।

নীলকান্ত বলল , ” এটা আপনাদের ঘর , কিছু লাগলে দয়া করে আমাকে ডাকবেন, আমি আশেপাশেই থাকব ।”

লোকটি চলে গেলে জয়ন্ত লাহা বললেন , “স্বাগ্নিক প্রথমে  তোর পুজোয় কলকাতার বাইরে কাটানোর প্রস্তাবে আমি রাজী হইনি ঠিকই, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এখানে না এলে আমার নাম লোকসানের খাতায় লাল হরফে লেখা থাকত । নিজেকে কেমন যেন  রাজার অতিথি বলে মনে হচ্ছে ।”

হঠাৎ ঢাকের আওয়াজ শুনে তিতির দৌড়ে বারান্দায় গেল । সোনাকাকু তার পাশে দাড়িয়ে বলল , “প্রথমবার মায়ের বোধন দেখছিস তিতির!” নিরুত্তর তিতির নিস্পলকে  নিচের ঠাকুর দালানে  ঘটা  আন্তরিকতার আবেশ পূর্ণ এক অপরূপ দৃশ্যের সাক্ষী রইলো ।

দুপুর  ১২:৩০ টা  : জলখাবারের  লুচি তরকারী  খেয়ে  , স্বর্গীয় বিছানার স্পর্শে কোমরের বিদ্রোহ অনেক ক্ষণ শান্ত হয়েছিল । তিতির আর সোনাকাকুর পর এবার জয়ন্ত লাহা  স্নান সেরে  বেরিয়ে বলল , “তোরা ঠিকই বলেছিলি, এখানকার জলের  স্পর্শে  সব পাপ ধুয়ে যাওয়ার মত একটা অনুভূতি হলো , আমার এখন আবার  খিদে পাচ্ছে ।” তার কথা শেষ না হতেই  নীলকান্ত নামের  লোকটি  ঘরের দরজায় আওয়াজ করে বলল , “আজ্ঞে বাবু আপনাদের জন্য খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছেন।” তার  উত্তরে  “আচ্ছা  ,আমরা আসছি ” বলে সোনাকাকু  তিতিরের কানের কাছে মুখ এনে বলল , “নীলকান্ত দা কে এর মধ্যেই আড়ি পাতা শিখিয়ে দিলি তিতির?”

তিতির ( হেসে ): হ্যাঁ,  আমি যখন ঠাকুর দালানে মন দিয়ে দুর্গাপূজা দেখব , নীলকান্ত কাকুই আমার কাজটা করবে।

নীলকান্তের সাথে ওরা তিনজন খাবার ঘরে প্রবেশ করতেই রণজয় সাহা সেই চেনা হাসি মেখে বললেন , “আসুন, আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা  করছিলাম।”

সোনাকাকু লজ্জিত মুখে বলল ,”আসলে আমাদের স্নান সারতে একটু দেরী হয়ে গেল , এরকম জলের মায়া কাটিয়ে ওঠা খুব কঠিন ,এটা নিশ্চই  সাধারণ কলের জল নয় ! ”

ভদ্রলোক হেসে বললেন , ” ঠিক ধরেছেন , এটা আমার বাপ ঠাকুরদার আমলে তৈরী করা পাতকুয়ার জল , মাটির অনেক গভীর থেকে আসা  এই জল ,প্রথম স্পর্শেই তার  আলৌকিকতার পরিচয় দেয় ,আমাদের বাড়িতে আসা সকল অথিতির ই একই রকম অভিজ্ঞতা । আপনারা দয়া করে বসুন , সকালের ওত টুকু জলখাবারের  পর আর তো কিছু  ই  খান নি, নিশ্চই খুব খিদে পেয়েছে ।”

“এত সব সাজানো খাবার দেখে ভর পেটেও  খিদের  ঘুম ভেঙ্গে গেলে তাকে তো আর দোষ দেওয়া চলে না  রণজয় বাবু!” কথাটা বলার পর  জয়ন্ত লাহার পাশের  চেয়ারে বসে  ঘরের বাকিদের উদ্দেশ্যে  জোড়হাতে সোনাকাকু বলল, “নমস্কার! আমি স্বাগ্নিক মুখার্জী  আর ও আমার ভাইজি তিতির , আমার পাশে বসা  স্বল্পভাষী ভদ্রলোকটিকে  শুধু সহকর্মী বললে ভুল হবে  , জয়ন্ত আমার অনেকদিনের ভালো বন্ধু।  রণজয় বাবুকে আমাদের পরিচয় দেবার সুযোগ দিলাম না কারণ উনি এত বাড়িয়ে বলবেন যে এত ভালো ভালো খাবারগুলো তারপরে আমাদের লজ্জা করেই খেতে হবে। ”

ঘরের বাকি সকলের মত রণজয় ব্যানার্জী হেসে বললেন  “প্রকৃত গুনীদের মধ্যে যে গর্বের লেশমাত্র থাকে না , তা আরো একবার অভিজ্ঞতা করলাম , আপনাদের  সাথে বাকি সকলের পরিচয় করিয়ে দি :

টেবিলের উল্টোদিকে ,বাদিকের ধারের চেয়ারে বসা ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন , “ও আমার বড় ছেলে অরুণ।” আন্দাজ বছর চল্লিশ বয়সী  , চশমা পড়া , মোটা ভদ্রলোকটি হাতজোড় করে বললেন “নমস্কার “।

“তার পাশে  অরুণের স্ত্রী ,ঋতু , ।” পাশের চেয়ারে বসা বাচ্চা ছেলেটির থালায়  ভাত মাখতে ব্যস্ত  ,মাঝ বয়সী সুন্দরী  ভদ্রমহিলা স্মিত হাসলেন ।

“ওর কোলে সৌনক ,আমার নাতি ।” বছর পাঁচের ছেলেটি নিজের মনে মোবাইলে গেম খেলায় ব্যস্ত , এই পরিচয় পালা তার মনোনিবেশ নষ্ট  করতে পারল না  ।

“তার পাশে আমার ছোট ছেলে ,নিলয় ।”  বয়স আন্দাজ ৩২ , ছিমছাম, চেহারার ভদ্রলোকটি  অল্প হেসে  হাতজোড়   করে নমস্কার করলেন ।

“আমার পরিবারের  দুজন সদস্য এখানে অনুপস্থিত , আমার স্ত্রী রমলা , ঠাকুর দালানে মাকে একা ফেলে উপরে আসতে রাজী হননি , আর আমার ছোট ছেলের স্ত্রী অমিতা , ও নিজের ঘরে আছে । অমিতা সন্তান সম্ভবা , মা দূর্গা কৃপা করলে দশমীর দিন এ বাড়িতে নতুন অতিথির  পা দেওয়ার কথা  ।”

সোনাকাকু হেসে বলল , ” বাহ্ , ঠাকুর দালানের শুন্যতা, মা দূর্গা  এবার তাহলে  আপনাদের পরিবারকে অনুভব করতে দেবেন না!” কথা টা  শুনে রণজয় ব্যানার্জী স্মিত হাসলেও তার মুখে এক অজানা বিষাদের ছায়া পড়ল । তিতির সেটা লক্ষ্য করে আবার খাবারে মনোনিবেশ করলো ।

বিকেল ৫ টা  : সোনাকাকু আরমোড়া  ভেঙ্গে বলল ” দুপুরে দারুণ ভাত ঘুমের পর শরীরের  ক্লান্ত ভাব টা আর একদম নেই।”

জয়ন্ত লাহা পাশ ফিরে শুয়ে বলল : “যা বলেছিস স্বাগ্নিক , অনেকদিন পর এতো শান্তির ঘুম ঘুমালাম,কলকাতা ফিরে গিয়েও  অনেকদিন এই বিছানা , রাজসিক আতিথেয়তাকে মনে পড়বে  ।”

তিতির ব্যস্ত হয়ে বলল , ” ঘুম  ভাঙ্গলো তোমাদের ? চলো এবার নিচে গিয়ে সামনে থেকে সন্ধ্যার পুজো দেখি ।”

জয়ন্ত লাহা : “স্বাগ্নিক ! তুই বরং  তিতিরকে নিয়ে ঘুরে আয় , আমি ব্যালকনির টিকিট কেটেই পুজো দেখব ভাবছি ।”

ওদের কথা শেষ না হতেই নীলকান্ত ঘরে ঢুকে চায়ের ট্রে  টা  টেবিলের উপর  রেখে দিল , তারপর তিতিরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “তোমার জন্যও এনেছি কিন্তু , তুমি চা খাও তো? ”

তিতির স্মিত হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল ।

সন্ধে  ৬ টা  : তিতির নতুন জামা পড়ে সোনাকাকুর সাথে ঠাকুর দালানে পৌঁছলো । অরুণ ব্যানার্জী তাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে বললেন , “আপনারা বিশ্রাম করছিলেন তাই আর বিরক্ত করিনি , নীলকান্ত চা দিয়েছে আপনাদের ?”

সোনাকাকু : “হ্যাঁ ,তিতিরের খুব ইচ্ছা কাছ থেকে পুজো দেখার তাই  চা খেয়েই নিচে চলে এলাম  ।”

অরুণ ব্যানার্জী (হেসে): ” নিশ্চই ,তার আগে চলুন আপনাদের মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দি ।”

আন্দাজ  ৬৫ বছরের একজন বয়স্ক  ভদ্রমহিলার সামনে গিয়ে অরুণ ব্যানার্জী  বললেন , “মা !  ইনি  Dr স্বাগ্নিক মুখার্জী আর সাথে ওনার ভাইজি তিতির ।”

ভদ্রমহিলা হেসে বললেন , “নমস্কার , আমি রমলা ব্যানার্জী , আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন , অনেক ইচ্ছা থাকতেও কিছুতেই দুপুরে আপনাদের সাথে দেখা করতে যেতে পারিনি , পুজোর পাঁচদিন যে আমাদের  কি করে কাটে তা  শুধু মা দুর্গাই জানেন,আমাদের বাড়িতে তো বেশী লোক নেই ,নিজেরাই কোনরকমে নাওয়া খাওয়া ভুলে  এই মহা পুজোর জোগার করি,এবার তো অমিতা অসুস্থ , তাই আমার আর ঋতুর উপর চাপ টা  একটু বেশি , এই যে এত পাড়া প্রতিবেশী দেখছেন,  সবাই পুজো দেখতে আসে কিন্তু কাজের সময় কাউকে পাওয়া যায় না  ।”

সোনাকাকু : “আমি আপনার ছেলের বয়সী ,’আপনি’ বলে লজ্জা দেবেন না । ক্ষমা তো আপনাদের কাছে আমাদের চাওয়া উচিত ,এই ভীষণ ব্যস্ততার সময় এভাবে এসে আপনাদের বিব্রত করলাম , আসলে পুজোর সময় যা একটু সময়  থাকে , এখন না আসলে আপনার স্বামীর মহাযজ্ঞ দেখার সৌভাগ্য আবার কবে হত  তা সত্যি জানা নেই ।”

ভদ্রমহিলা (হেসে) : ” তোমরা আসাতে আমার খুশী বলে বোঝানোর নয়  , মায়ের মত যখন বললে  তখন লজ্জা না করে যখন যা লাগবে বিনা সঙ্কোচে নিজে এসে চেয়ে নিও কিন্তু ।”

সোনাকাকু হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ।

অরুণ ব্যানার্জী , ঠাকুর দালানে মা দূর্গার একচালা মূর্তির সবচেয়ে কাছের চেয়ারে তাদের বসিয়ে দিয়ে চলে যেতেই তিতির সোনাকাকুর কানে বলল  ” নীলকান্ত কাকুর মত বয়স্ক মানুষকে নাম ধরে ডাকাকে তুমি সমর্থন করো ? অরুণ ব্যানার্জীর এই সম্বোধন কে  তুমি কী  বলবে , আভিজাত্য না ঔদ্ধত্য ?”

সোনাকাকু : “তোকে অন্যায় সমর্থন না করা যে শিখিয়েছে তা সে নিজে কি করে সমর্থন করবে বল ? আমার মতে এটা আভিজাত্য বা ঔদ্ধত্য কোনটাই নয় বরং প্রকৃত শিক্ষা ও রুচির অভাব বলতে পারিস ।”

রাত্রি ১০ টা : মন্ডপে সকলের সাথে খিচুড়ি ভোগ  খেয়ে সোনাকাকু ও তিতির ঘরে ঢুকতে দেখলো জয়ন্ত লাহা মন দিয়ে একটা বই পড়ছেন ।

সোনাকাকু :  জয়ন্ত খেয়েছিস তো ?

জয়ন্ত  লাহা : সে আর বলতে , খিচুড়ি টা সত্যি ভালো হয়েছিল।  তা এতক্ষণ ধরে কি করছিলি তোরা ?

সোনাকাকু :  এই পুজো দেখছিলাম ,সকলের সাথে কথা বলছিলাম , তোর মত ঘরকুনোই শুধু জানে নতুন জায়গায় এসে ঘরবন্দী হয়ে থাকার  সুখ !

জয়ন্ত  লাহা : তুই তো জানিস আমার বেশী কথা বলতে  ভালো লাগে না ,তাছাড়া একটু আগে রণজয় ব্যানার্জী এসেছিলেন ,বললেন কাল সকাল বেলা  আমাদের নার্সিং হোম দেখাতে  নিয়ে যাবেন । আরামের সময় যে বড় কম আমার বন্ধু, তিতিরের বয়সটা ফিরে পেলে তাও ভাবা যেত ।

তিতির : আমি কাল  তোমাদের সাথে নার্সিং হোম যাব না , ওখানে তো আমার কোনো কাজ নেই , বরং পুজো দেখে সময়টা কাটিয়ে দেব  ।

সোনাকাকু : তথাস্তু । এবার চটপট শুয়ে পর দেখি , ভোর ভোর ঢাকের আওয়াজ তাহলে আর বেদনাদায়ক লাগবে না।

সপ্তমী


ভোর ৫:৩০  : দরজায় বার বার ধাক্কার আওয়াজে সোনাকাকুর ঘুম ভেঙ্গে গেল । দরজা খুলতেই রণজয় ব্যানার্জী চিন্তিত স্বরে বললেন  ,”স্বাগ্নিক বাবু ! ক্ষমা করবেন এত ভোরে বিরক্ত করার জন্যে ,একবার আসবেন ? আমার স্ত্রীর শরীর টা হঠাৎ খুব খারাপ করেছে ।”

“সেকি !  আমি আসছি এখনি । ” কথাটা বলে সোনাকাকু একটা ব্যাগ  ও টেবিলে রাখা চশমা টা নিয়ে রণজয় ব্যানার্জীর সাথে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল । তিতিরের ঘুম ও ভেঙ্গে গিয়েছিল , সে তাড়াতাড়ি উঠে সোনাকাকুর পিছু নিল  ।

সোনাকাকু  ঘরে  ঢুকে দেখলো রমলা ব্যানার্জীর পরনের  কাপড়ের অর্দ্ধেকের বেশী জলে ভেজা , মাথার কোনায় ,দু হাতের পিছনে বিশ্রী ভাবে কেটে গিয়ে রক্ত ঝড়ছে । বড় ছেলের স্ত্রী  ঋতু  ,সংজ্ঞাহীন ভদ্রমহিলার মাথার কাছে ফার্স্ট এইড বাক্স  নিয়ে বসে ডেটল দিয়ে কাটা জায়গা গুলো পরিষ্কার করে দিচ্ছেন ।

প্রেসার মাপার পর , বিন্দুমাত্র  সময় নষ্ট না করে সোনাকাকু  ব্যাগে রাখা একটা ওষুধ ভদ্রমহিলার হাতে ইঞ্জেক্ট করলো, তারপর একটা ট্যাবলেট  জিভের তলায় দিয়ে ঘরের বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল , “এটা কিভাবে হল ?”

রনজয় ব্যানার্জী চিন্তিত মুখে বললেন : ঠিক জানিনা , সকালে নীলকান্তের ডাকে আমার ঘুম ভাঙ্গলো , কুয়ো তলা পরিষ্কার করতে গিয়ে ও রমলা কে উপুর হয়ে পড়ে থাকতে দেখতে পেয়েছে । রমলা  কখন বা কেন ওখানে গিয়েছিল তা আমি  কিছুতেই বুঝতে পারছি না । ওর কিছু হবে না তো স্বাগ্নিক বাবু  ?

সোনাকাকু  চিন্তিত মুখে বলল  ,”আপনাদের বাড়ি থেকে হাসপাতাল  কতদূর? ”

রনজয় ব্যানার্জী : তা গাড়িতে ৪৫ মিনিট মতন লাগবে  ।

সোনাকাকু  গম্ভীর মুখে বললেন , ” হুম ! আর পনেরো মিনিটের মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে বিনা চিকিৎসায় বাড়িতে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করা ঠিক হবে বলে আমার মনে হয় না ।”

“আমরা এখনি গাড়ির ব্যবস্থা করছি । ”  কথাটা বলেই রনজয় ব্যানার্জী  ও তার বড় ছেলে অরুণ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন ।

এতক্ষণ মায়ের মাথার সামনে নিঃশব্দে দাড়িয়ে থাকা নিলয়  ব্যানার্জী  বললেন : “মা র কি হয়েছে স্বাগ্নিক বাবু  ?”

সোনাকাকু : মাইল্ড হলেও হার্ট এটাক বলেই মনে হচ্ছে ,পরীক্ষা করলে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব ।

ভোর ৬ টা  : সকলের উদ্বেগের দাড়ি টেনে রমলা ব্যানার্জীর জ্ঞান ফিরে এলো । রণজয় ব্যানার্জী কিছু বলতে চাওয়ায় তাকে বাঁধা দিয়ে সোনাকাকু বলল , “Mrs ব্যানার্জীর এখন বিশ্রাম দরকার , যেকোনো একজন বাদে বাকিরা দয়া করে নিজেদের  ঘরে চলে যান ।

রণজয় ব্যানার্জী ছাড়া বাকি সকলে একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে দরজার সামনে এসে উনি সোনাকাকুকে বললেন, “আর চিন্তার কোনো কারণ নেই তো স্বাগ্নিক বাবু ? ”

সোনাকাকু : “না , তবে দুপুর বেলার আগে ওনাকে বিব্রত করলে হিতে বিপরীত হতে পারে । আপনি সেদিক টা খেয়াল রাখবেন , আর কিছু  অসুবিধা হলেই বিনা সঙ্কোচে আমাকে ডাকবেন।”

সোনাকাকুর সাথে ঘরে ফেরার সময় তিতির বলল , “আমি যখন সাড়ে চার টে  নাগাদ  বাথরুমে উঠে কিছুক্ষণের জন্য বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলাম , Mrs ব্যানার্জীকে চিন্তিত মুখে ওদিকটায় যেতে দেখেছিলাম ।”

সোনাকাকু : হুম ! আর কাউকে দেখেছিলি কি ?

তিতির : না , তোমার কি মনে হয় উনি কারো পিছু নিচ্ছিলেন ?

সোনাকাকু : ওনার ডান  হাতের কব্জিতে  স্পষ্ট  আঙ্গুলের দাগ , সেটা  কোনো পুরুষের বলেই আমার মনে হল ।

রাত্রি  ৯  টা :দুপুরের খাবার  ও বিকেলের  চা  নীলকান্ত ঘরেই দিয়ে গেছে । Mrs রমলা ব্যানার্জী সকালের চেয়ে এখন অনেকটা ভালো আছেন ,বেশ  কিছুদিন লাগবে ওনার সম্পুর্ন সুস্থ হতে , সোনাকাকুর পরামর্শ মত রণজয় ব্যানার্জী মন্ডপের  ঢাকি দের পয়সা মিটিয়ে ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছেন  । সকলের প্রশ্নের উত্তরে Mrs ব্যানার্জী বলেছেন, ভোর রাতের দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে উনি বারান্দায় আসেন, পিছনের দরজাটা খোলা থাকায় , একটা রাস্তার কুকুর   সেখান দিয়ে  ঢুকে ,মন্ডপে রাখা প্রসাদের থালায় মুখ দিচ্ছিল , তাই তাকে তাড়া করতে গিয়ে ঘুম চোখে কুয়ো তলার শেওলা ওনার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে ।

জয়ন্ত লাহা ও সোনাকাকু বিছানায় বসে বই পড়ছিল, তিতিরের চোখ বিছানায় শুয়ে জানলা দিয়ে  রাতের পরিস্কার আকাশ দেখতে ব্যস্ত । হঠাৎ দরজার আওয়াজে তিনজনে একসাথে বাইরের দিকে তাকালো ।

রনজয় ব্যানার্জী তার ছোট ছেলে নিলয় ব্যানার্জী কে নিয়ে ঘরে ঢুকে বললেন, “আপনাদের সাথে একটু দরকারী কথা

ছিল ।”

সোনাকাকু : হ্যাঁ , বলুন না রনজয় বাবু । আপনার স্ত্রী ভালো আছেন তো ?

রনজয় ব্যানার্জী  : হ্যাঁ  , আজকের বিপত্তির কারণ শুধু ওই রাস্তার কুকুরটা নয় , আসলে  রমলার হার্টের অসুখটা  গত কয়েক বছর ধরে মাঝে মাঝেই বেড়ে যায় , তার ওপরে এখন  আমার ছোট ছেলের স্ত্রী  অমিতাকে নিয়ে  ও খুব চিন্তায় আছে ,আপনাদের সাথে অমিতার এখনো পরিচয় হয়নি। পারিবারিক  দুঃখের কথা কি বলব আপনাদের ,অমিতা  এবার নিয়ে চার বার সন্তান সম্ভবা , এর আগের তিন বার ও মৃত সন্তান প্রসব করেছে ,এইবারেও ওর শরীর বিশেষ ভালো নয়। তাই ভাবলাম জয়ন্ত বাবু  তো  তো খুব বড় gynecologist,  যদি অমিতাকে একবার দেখেন …

জয়ন্ত লাহা ইতস্তত করে বললেন : হ্যাঁ , কিন্তু এভাবে উপর থেকে দেখে তো কিছু বোঝা সম্ভব নয় ,তবে ওনার রিপোর্ট গুলো দেখলে হয়তো  একটু হলেও আপনাদের সাহায্য করতে পারব ।

সোনাকাকু  : আপনারা অমিতাদেবীকে  কলকাতা নিয়ে যাননি কেন ?

নিলয় ব্যানার্জী : ও যে কিছুতেই যেতে চায় না ,অমিতার বাবা  একজন ডাক্তারের অবহেলায় কলকাতার নার্সিং হোমে মারা গিয়েছিলেন , সেই থেকে ওখানকার ডাক্তারের উপর ওর খুব অবিশ্বাস  ।

জয়ন্ত লাহা : রণজয় বাবুর নার্সিং হোম তো এখনো ওপেন হয়নি , তাহলে অমিতা দেবীর চিকিৎসা এখন কোথায় করাচ্ছেন ?

নিলয় ব্যানার্জী : এখানকার সরকারী হাসপাতালে পুলক বর্মন  নামে একজন ডাক্তার আমাদের অনেকদিনের জানাশোনা , অমিতা ওনার  আন্ডারেই আছে ।

জয়ন্ত লাহা : তা উনি কী বলছেন ,বার বার এরকম হওয়ার কি কারণ ?

নিলয় ব্যানার্জী : ডাক্তারের কোনো দোষ নেই জয়ন্ত বাবু , আসলে কাকতালীয় ভাবে তিনবারই ভরা মাসে অমিতা পড়ে গিয়েছিল , প্রথমবার  সিড়ি থেকে , দ্বিতীয় বার বাথরুমে , তৃতীয় বার কুয়োর ধারে । এবার তাই বিছানা থেকে ওকে আর নামতে দেওয়া হচ্ছে  না  , গতকালের রিপোর্ট অনুযায়ী আমাদের সন্তান এখনো সুস্থ আছে কিন্তু প্রসবের  দিন যত এগিয়ে আসছে একটা ভীষণ অবসাদ অমিতাকে ঘিরে ধরছে, হয়তো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাই  তার এই অবস্থার কারণ  ।

সোনাকাকু : হুম বুঝতে পারছি , আপনি বরং আপনার স্ত্রীর রিপোর্ট গুলো জয়ন্তকে দেখান , তারপর না হয় ওনাকে একবার দেখে আসা যাবে , তার সাথে আলাপ টাও সেরে নেব  ।

নিলয় ব্যানার্জী  অল্প হেসে বললেন , “তাহলে  আমি আজকে রাত্রে  পুরনো রিপোর্ট গুলো বার করে রাখছি , কাল সকালে সব একসাথে নিয়ে আসবো ।

জয়ন্ত লাহা : আচ্ছা ।

রণজয় ব্যানার্জী : আজকে যা বিপদ গেল , স্বাগ্নিক বাবু না থাকলে যে কি হত কে জানে , আপনাদের নার্সিং হোম দেখানো তো ছেড়েই দিন, সারাদিন আপনাদের কোনো  খবর পর্যন্ত আসতে পারিনি । কালকে সকালে আমি না যেতে পারলেও অরুণ বা নিলয় আপনাদের নার্সিং হোম দেখিয়ে নিয়ে আসবে,বার বার  তো  আসতে পারবেন না ,

অনেক খুটিনাটি বিষয়ে আপনাদের মতামত জানাটা খুব জরুরি ।

জয়ন্ত লাহা : আরে এভাবে ভাবছেন কেন ! এরকম শান্ত পরিবেশে বিশ্রামের দিন ডাক্তারদের অনেক ভাগ্য করে পেতে হয় , আমাদের কোনো অসুবিধা হয়নি , নীলকান্ত দা  সারাদিন সময়ে সময়ে এসে খিদের আগেই খাবার দিয়ে গেছেন । আমাদের নিয়ে অত চিন্তা করবেন না , আগে আপনি Mrs ব্যানার্জীর  খেয়াল রাখুন,সব ঠিক হলে যাওয়া যাবে ক্ষণ নার্সিং হোম দেখতে , আমরা তো দশমী পর্যন্ত আছি  এখানে ।

সোনাকাকু : আমিও জয়ন্তর সাথে একমত  , আশা করি  এই মঙ্গল উৎসবে ,সকল  বিপদ কেটে গিয়ে আনন্দে ভরে উঠুক আপনার পরিবার ।

রণজয় ব্যানার্জী : আপনাদের ব্যবহার দেখে আমি সত্যি মুগ্ধ ,আন্তরিক ধন্যবাদ এই বিপদে আমাদের পাশে থাকার জন্য, মা দূর্গা বোধহয় সব ভেবেই আপনাদের আসার সময় নির্ধারণ করেছেন । আর বিরক্ত করব না , এখন আসি , আবার কাল সকালে দেখা হবে ।

রাতের খাবার খেয়ে সোনা কাকু আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল , তিতিরের মন কিছুতেই গল্পের বইতে বসছে না , জয়ন্ত লাহা একই রকম নির্বিকার ভাবে অনেক ক্ষণ  জার্নালের পাতা উল্টে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লেন ।

অষ্টমী 


ভোর ৪ টে : সোনাকাকুর ঘুম  হঠাৎ ভাঙ্গতেই দেখল তিতির বিছানায় নেই । তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে বারান্দা আর বাথরুমেও তাকে না দেখে , পায়ে চটিটা গলিয়ে সিড়ি দিয়ে ঠাকুর দালানে নেমে এলো  সোনাকাকু । মন্ডপে দুর্গামূর্তি আর ঘুমন্ত চাকর স্থানীয় মানুষ  ছাড়া আর কিছু  চোখে পড়ল না । সোনাকাকু ভীষণ উদ্বেগে মন্ডপের পিছনের গলিতে পা বাড়াতেই দেখল তিতির হন্তদন্ত করে হেঁটে আসছে ।

সোনাকাকু উদ্বেগ চেপে রেখে কঠিন গলায় বলল , “কিরে কোথায় গেছিলিস ? কতবার বলেছি এভাবে আমাকে না বলে কোথাও যাবি না, একটা বিপদ না ঘটিয়ে শান্তি নেই তোর ,তাই না ?

তিতির : “আহ । ওত রাগ তোমায় মানায় না ,তুমিও অনেক কিছু আমাকে না জানিয়ে করো , অনেক কথা আছে , উপরে চলো ।”

সোনাকাকু আরো কিছু বলতে চাওয়ায় তিতির  মুখে আঙ্গুল দেখিয়ে তার হাত টেনে উপরে নিয়ে গেল ।

ঘরের ভিতর ঢুকে সোনাকাকু বলল : জয়ন্ত  ঘুমাচ্ছে , বারান্দায় চল ।

তিতির বারান্দায় গিয়ে সোনাকাকুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল , “আমার রাত্রে কিছুতেই ঘুম আসছিল না , তাই ৪ টে নাগাদ উঠে বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলাম , হঠাৎ ঋতু ব্যানার্জী কে মন্ডপের পিছনের গলিতে যেতে দেখলাম , ভাবলাম গত কালের মত আবার যদি কিছু অনিষ্ট হয় , তাই ওনার পিছু নিয়েছিলাম ।”

সোনাকাকু : তিতির ….

তিতির : আহ ! পুরোটা শুনে তারপর চিৎকার করো । ঋতু ব্যানার্জী কুয়োর পাড়ে গিয়েছিলেন , আমি একটু দূরের দেওয়ালের পিছন থেকে পরিস্কার দেখেছি , উনি কুয়োর চারিদিকে ঘুরছিলেন ও ভিতরের দিকে দেখছিলেন বার বার , মনে হল কিছু একটা খুঁজছেন । কিছু বোঝার আগেই অরুণ ব্যানার্জী ওখানে চলে এলেন , ওত ভোরে ঋতু  ব্যানার্জীর কুয়োর পাড়ে ঘোরাঘুরি তার স্বামীর কাছে যেন প্রত্যাশিত ব্যাপার। একটুও বিস্ময় প্রকাশ না করে প্রথমে উনি নিজের  স্ত্রীকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন , তাতে সফল না হওয়ায় দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ঝগড়া হল , আমি দূরে থাকায় কোনো কথা শুনতে পাইনি ,শুধু মুখের ভাব দেখেই আন্দাজ করতে হয়েছে ,তাও সবে ফোঁটা আলোতে যা দেখেছি ,তাই বললাম। ওরা চলে আসার পরও কিছুক্ষণ ওখানে লুকিয়ে ছিলাম ,বলা কি যায় যদি দুজনের মধ্যে কেউ ফিরে আসে ! তাই একটু দেরী হয়ে গেল । ব্যাপারটা একদম সহজ নয় সোনাকাকু ।

সোনাকাকু : তার মানে তুই বলছিস কালকে রমলা ব্যানার্জীর দুর্ঘটনার পিছনে ঋতু ব্যানার্জীর হাত আছে ! ধস্তা ধস্তিতে কিছু পড়ে যাওয়ায় আজ উনি সেটা ওখানে খুঁজতে গেছিলেন !আর  রমলা ব্যানার্জী পারিবারিক ঝামেলা সকলের থেকে লোকাতেই মিথ্যে বলেছেন ।

তিতির : সেই ফর্মুলায়  দুটো ব্যাপার হতে পারে , অরুণ ব্যানার্জী হয় সত্যি টা জানেন অথবা জানেন না । যদি না জেনে থাকেন ,তাহলে স্ত্রীকে  ওত ভোরে ওখানে দেখে একটুও বিস্ময় প্রকাশ করলেন না কেন ? তাছাড়া হঠাৎ স্বামীকে দেখে তো ঋতু ব্যানার্জীর ভয় পাওয়ার কথা , তা তো উনি পাননি ।  আর যদি ধরে নি , অরুণ ব্যানার্জী কোনো অজানা উদ্দেশ্যে কালকের ঘটনায় তার স্ত্রীকে সঙ্গ দিয়েছিলেন , তাহলে আজকের ঝগড়ার কারণ কী !

সোনাকাকু : এই ফেলুদাই সব সর্বনাশের ভুল , ঘুমো গিয়ে এখন তুই । পরে এসব নিয়ে কথা বলা যাবে , আমরা এখানে দু দিনের অতিথি, এসব পারিবারিক ঝামেলায় না পড়াই ভালো ।

তিতির  গম্ভীর ভাবে ভিতরে যাওয়ার সময়  বলল , “২ দিন নয় , ৫ দিন সোনাকাকু ,এত সহজ হিসেবে ভুল তোমার মত বিজ্ঞানের ছাত্রকে মানায় না ।”

সকাল ১১ টা : নীলকান্তের নিয়ে আসা জলখাবার খেয়ে সোনাকাকু আর তার বন্ধু, রণজয় ব্যানার্জীর গাড়িতে নার্সিং হোম দেখতে বেরিয়ে গেল । সকালবেলা  তিতির ঠাকুর দালানে গিয়ে অঞ্জলি দিয়ে এসেছে , বাড়ির মহিলাদের মধ্যে শুধু ঋতু ব্যানার্জী ই উপস্থিত ছিল,আর বাকি সব আশেপাশের বাড়ির লোকজন । অঞ্জলির ফাঁকে সে লক্ষ্য করেছিল ঋতু ব্যানার্জীর চোখে মুখে ভীষণ বিষাদের  চাপ । এখন একা বারান্দায় দাড়িয়ে , প্রায় খালি মন্ডপের দিকে তাকিয়ে  কলকাতার কথা তিতিরের খুব মনে পড়ছিল । ফেলুদার গল্পের মতই, পাড়ার বন্ধুদের সাথে অষ্টমীর সকালে পুজো প্যান্ডেলে হুল্লোড়ের কোনো  বিকল্প নেই ।

দুপুর ২ টো : সোনাকাকু আর জয়ন্ত লাহা ঘরে ঢুকতেই তিতির বলল , “এতক্ষণ লাগলো একটা নার্সিং হোম দেখতে ?”

সোনাকাকু (হেসে) : তুই তো গেলি না ! গেলে দেখতিস ভদ্রলোক সত্যি অনেক যত্ন ও খরচা করে নার্সিং হোম টাকে তৈরী করছেন ,একসময় এটা  কলকাতার নাম করা নার্সিং হোমের সাথে পাল্লা দেবে  ,তবে এখানে ভালো ডাক্তার পাওয়া মুশকিল , সেটা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল , আমি আর জয়ন্ত যেটুকু পেরেছি নিজেদের মতামত দিলাম , চেষ্টা করব ভবিষ্যতেও যদি আরো কোনোভাবে ওনাকে সাহায্য করতে পারি ।

তিতির : তা সে নার্সিং হোমে চিকিৎসা  কবে থেকে শুরু হবে  ?

সোনাকাকু : রণজয় বাবু তো বললেন ৬ মাসের মধ্যেই ,ভদ্রলোক কে দেখে তো মনে হয় না যে উনি বাজে কথা বলার লোক , আর যে গতিতে  সব কাজ চলছে দেখলাম , আমার তো মনে হয় ভালো ডাক্তারের গ্রুপ পেলে তার আগেই শুরু হয়ে যেতে পারে ।

তিতির ‘হুম’ বলে উপন্যাসে মনোনিবেশ করলো ।

সন্ধ্যে ৭ টা : দুপুরের ভাত ঘুমের পর চা বিস্কুট খেয়ে তিতির যখন সোনাকাকু আর তার বন্ধুর সাথে তাদের ডাক্তারী জীবনের বিভিন্ন গল্প শুনতে ব্যস্ত , দরজার বাইরে নিলয় ব্যানার্জীর গলার আওয়াজ , ” আসতে পারি ? ”

সোনাকাকু : হ্যাঁ, আসুন না !

নিলয় ব্যানার্জী : আসলে আমি ওই অমিতার রিপোর্ট গুলো নিয়ে এসেছিলাম ! জয়ন্ত বাবু যদি একটু দেখেন !

জয়ন্ত লাহা উঠে গিয়ে রিপোর্ট গুলো হাতে নিয়ে অল্প হেসে বললেন : হ্যাঁ নিশ্চই , আজ রাতে দেখে নি ,তারপর আমার সাধ্যমত যথাসম্ভব চেষ্টা করব আপনাদের সাহায্য করতে !

নিলয় ব্যানার্জী কৃতজ্ঞতার হাসি মেখে বললেন : অনেক ধন্যবাদ ! আমি এখন আসি , অমিতা  ঘরে একা আছে।

জয়ন্ত লাহা :আচ্ছা ।

রাত্রি বারোটা : জয়ন্ত লাহা মন দিয়ে অমিতা ব্যানার্জীর রিপোর্ট গুলো পড়তে ব্যস্ত, সোনাকাকু খাওয়া দাওয়ার পর অভ্যাস মত বারান্দায় পায়চারী করছে , তিতিরের  হাতের উপন্যাস টা প্রায় শেষের মুখে ।

সোনাকাকু ঘরে ঢুকতেই জয়ন্ত লাহা বলল , “এই ছুটিতে এসেও ডাক্তারী থেকে মুক্তি নেই , নিজেও জড়ালি  আর আমাকেও ঝামেলায় ফেললি !”

সোনাকাকু হেসে বলল , “তা কতদূর এগোলি ?”

জয়ন্ত লাহা : এখনি কি ! আজকে মনে হচ্ছে সারারাত জাগতে হবে ।

সোনাকাকু : তা তুই জেগে থাক , আমি ঘুমোতে গেলাম , আমার ভাইজি টির আবার  রাত বিরেতে  ঘুম চোখে চলার অভ্যেস ! তাকে খুঁজতে কখন আবার উঠতে হয় ঠিক নেই ।

নিরুত্তর তিতির মুখ বেঁকিয়ে পাশ ফিরে শুলো ।

নবমী 


ভোর ৬ টা : ঠাকুর দালানে ভয়ানক শোরগোলে তিতিরের  ঘুম ভেঙ্গে গেল । তিতির উঠে বারান্দায় যাওয়ার আগেই দরজায় উদ্বেগের টোকা পড়ল । সোনাকাকু ঘুম চোখে উঠে দরজা খুলতেই নিলয় ব্যানার্জী বললেন , “অমিতার ব্যথা উঠেছে স্বাগ্নিক বাবু ! আমরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি , আপনি যদি  দয়া করে জয়ন্ত বাবুকে নিয়ে আসেন  !

“হ্যাঁ , নিশ্চই ! আপনারা এগোন ,আমি জয়ন্তকে নিয়ে আসছি। ” কথাটা বলেই  সোনাকাকু দ্রুত বিছানার কাছে গিয়ে ঘুমন্ত  জয়ন্ত লাহাকে  ধাক্কা দিয়ে বলল  , “জয়ন্ত ওঠ তাড়াতাড়ি ! অমিতা দেবীর লেবার পেইন উঠেছে ! আমাদের হাসপাতালে যেতে হবে । ”

জয়ন্ত লাহা চমকে বিছানায় উঠে বসলেন , তারপর রাত জেগে পড়া রিপোর্ট গুলো দ্রুত ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে তৈরী হয়ে নিলেন ।”

তিতির : “সোনাকাকু আমিও যাব তোমাদের সাথে। ”

সোনাকাকু : “আচ্ছা !”

বেলা ৯ টা : একজন মাঝবয়সী  ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন , “আমরা সবরকম পরীক্ষা করে দেখেছি , মা আর বাচ্চা দুজনেই ভালো আছে, এটা লেবার পেইন নয়  ,তবে  আজ কালের  মধ্যেই ব্যথা ওঠার কথা,নর্মাল ডেলিভারি হবে আশা করছি  ,চিন্তার কোনো কারণ নেই, আপনারা বাড়ি যেতে পারেন , কোনো খবর হলে আমি নিজে আপনাদের ফোন করে দেবো ।”  ব্যানার্জী  পরিবারের সকলের মুখে স্বস্তির হাসি নেমে এলো ।

জয়ন্ত লাহা ডাক্তারের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন ,

>”নমস্কার , আমি Dr  জয়ন্ত লাহা , আমি পেশেন্ট কে একবার দেখতে চাই ।”

>ওহ আমি ,Dr পুলক বর্মন, নিলয়ের সাথে আমার কথা হয়েছে । আপনি নিশ্চই দেখতে পারেন  কিন্তু অমিতা দেবী

এখন ঘুমাচ্ছেন ,আমার মনে হয় ওনাকে এখন বিব্রত না করাই ভালো ।

> ঠিক আছে , আমি তাহলে অপেক্ষা করছি  , ওনার ঘুম ভাঙলে আমাকে ডাকবেন ।

>আচ্ছা ।

বেলা ১১ টা : নিলয় ব্যানার্জী পরিবারের  বাকি লোকজনদের বাড়ি পাঠিয়ে  নিজে জয়ন্ত লাহার পাশে বসে অপেক্ষা করছেন ,তিতির উল্টোদিকের বেঞ্চে বসে আছে, সোনাকাকু করিডোরে  পায়চারী করছে । Dr পুলক বর্মন এসে বললেন, “আপনারা এখন অমিতা দেবীকে যেতে পারেন।”

জয়ন্ত লাহা : ধন্যবাদ ।

পুলক বর্মন যে তার চিকিৎসায় শহরের ডাক্তারের নাক গলানোতে খুশী নন , সেটা তার নিরুত্তর চলে যাওয়া আরো বেশী করে স্পষ্ট করে দিল । এতদিনের পরিচিত  নিলয় ব্যানার্জীর সাথেও তিনি কোনো  কথা বললেন না  ।

সরকারী হাসপাতাল হলেও অমিতা দেবী যে ঘর টি তে শুয়ে আছেন , সেটা বেশ  পরিষ্কার  । নিলয় ব্যানার্জী তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললেন , “অমিতা ! বাড়িতে তোমার সাথে পরিচয় করানো হয়নি ,ইনি Dr স্বাগ্নিক মুখার্জী ,বিখ্যাত হার্ট সার্জেন , উনি Dr জয়ন্ত লাহা , নাম করা gynecologist আর ও তিতির , Dr মুখার্জীর ভাইজি ।”

অমিতা ব্যানার্জী বিছানায় শোয়া অবস্থায় হাসি মুখে হাত জোড় করে বললেন , “নমস্কার , আপনারা কদিনের অতিথি , আমার জন্য শুধু শুধু এত দূর কষ্ট করে এলেন  ! এ নিশ্চই আমার স্বামীর অনুরোধে ।

সোনাকাকু : আমাদের পেশা যে তাই করতে শেখায় অমিতাদেবী ,আপনার স্বামী এখানে নির্দোষ ।

জয়ন্ত লাহা :আপনার রিপোর্ট গুলো আমি দেখেছি অমিতা দেবী , কোনো দিক থেকেই আপনার কেস আমার জটিল মনে হয়নি ,আগে যা হয়েছে তা ভাগ্য দোষ  ছাড়া কিছুই নয় , আপনি মিথ্যা ভয় পাবেন না , আপনার ডেলিভারি খুব সুষ্ট ভাবে হবে এবার । আপনার পরিবার আপনাকে খুব ভালবাসে , অন্তত তাদের কথা ভেবে মনে জোর আনুন ,এই সময় মায়ের মন শক্ত হওয়া খুব দরকার !

অমিতা ব্যানার্জী : ধন্যবাদ ! আপনার কথা শুনে সত্যি ভরসা পেলাম জয়ন্ত বাবু ।

জয়ন্ত লাহা : Dr পুলক বর্মনের  কথা অনুযায়ী আপনার বাচ্চা এখন ভালো আছে, আশা করি সুখবর টা শুনেই কলকাতা ফিরতে পারব ।

অমিতা ব্যানার্জী : আপনারা আর কষ্ট করবেন না , ওই ডাক্তার বাবুই বরাবর আমার চিকিৎসা করে এসেছেন , আমার মৃত সন্তানের জন্য তার ডাক্তারী বিদ্যাকে দায়ী করা অন্যায় হবে , আমার বাড়ির লোকের তার ওপরে ভরসা না থাকতে পারে , কিন্তু আমার আছে।আমার কপালে যদি মা হওয়া না থাকে তাহলে কলকাতার ডাক্তার  কেন, শুনেছি ভগবান নিজেও তার লেখা  ভাগ্যলিখন বদলাতে পারেন না ।

কথাটা বলেই অমিতা ব্যানার্জী ওপাশ ফিরে শুলেন ।

নিলয় ব্যানার্জী  লজ্জিত মুখে হাত জোড় করে বললেন , “ক্ষমা করবেন জয়ন্ত বাবু , আপনাদের তো বলেছিলাম কলকাতার ডাক্তারের ওপর ওর রাগের কারণ ,এত বছরেও আমি কিছুতেই ওকে বুঝিয়ে উঠতে পারিনি যে ভালো মন্দ সব জায়গাতেই  হয় , ওর হয়ে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি,দয়া করে কিছু মনে করবেন না  ।”

জয়ন্ত লাহা : না না ঠিক আছে ! এসময়ে ওনাকে আর বিব্রত করা ঠিক হবে না ,আমরা বরং এখন আসি ।

জয়ন্ত লাহার সাথে সোনাকাকু ও তিতির ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।

বিকেল ৫ টা : চা এর কাপে  চুমুক দিয়ে সোনাকাকু বলল , ” জয়ন্ত ! এখনো তো কোনো খবর এলো না রে , একবার  আমাদের গিয়ে দেখে আসা উচিত,কি বলিস  ?”

জয়ন্ত লাহা : তোর যাওয়ার হলে তুই যা , আজ পর্যন্ত বিনা কারণে এরকম অপমান আমাকে কেউ করেনি ।

সোনাকাকু : আরে নিজের বাবার মৃত্যুর  জন্যেই হয়তো ভদ্রমহিলা …….

জয়ন্ত লাহা : বললাম তো ,আমি আর এর মধ্যে নেই ….

সোনাকাকু :  হুম বুঝলাম ।

রাত সাড়ে এগারোটা : জয়ন্ত লাহার কানের কাছে গিয়ে সোনাকাকু বলল , “আমরা ঠিক দশমী শুরু হওয়ার মহেন্দ্রক্ষণে বেরোব ,চটপট তৈরী হয়ে নে ।”

জয়ন্ত লাহা : মানে কোথায় ?

সোনাকাকু : হাসপাতালে ।

জয়ন্ত লাহা : কেউ কিছু বলেছে নাকি ?

সোনাকাকু : না ! ডাক্তার পেশার কর্তব্য ভুললে চলবে কি করে !

জয়ন্ত লাহা  আরো কিছু বলতে চাওয়ায় সোনাকাকু বলল , “আর কিন্তু ২৫ মিনিট বাকি !”

দশমী 


রাত বারোটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে  প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে একটা ট্যাক্সি তে উঠলো ওরা । ১ টা নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছে সোনাকাকু বলল , “আমরা যেহেতু কাউকে বলে আসিনি , কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে  ব্যানার্জী পরিবারের নাম না নিয়ে  ID কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে ।”

জয়ন্ত লাহা :আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না এভাবে লুকিয়ে আসার মানে কি !

সোনাকাকু : ব্যাপারটা সেটা নয় , আজ সকালের ঘটনার পর ওনারা হয়তো আমাদের সাহায্য নিতে সঙ্কোচ করবেন, আচ্ছা শোন ! তুই অমিতা দেবীর কেবিনে যা , আমি তিতিরকে নিয়ে Dr পুলক বর্মনের সাথে কথা বলে আসি ,ওনার তো এখন হাসপাতালেই থাকার কথা ।

জয়ন্ত লাহা : আচ্ছা ।

সোনাকাকু রিসেপশনে গিয়ে  Dr পুলক বর্মনের  খোঁজ  করায় ওখানে বসা ভদ্রলোকটি তাকে অপেক্ষা করতে বললেন , ডাক্তার এলে উনি ডেকে নেবেন । তিতির জয়ন্ত  লাহাকে দ্রুত পায়ে এদিকে ফিরে আসতে দেখে সোনাকাকুর হাতে হালকা ধাক্কা দিল । বন্ধুর মুখের ঘৃণার অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে সোনাকাকু এগিয়ে গিয়ে বলল , ” কি হয়েছে  জয়ন্ত ?”

জয়ন্ত  লাহা নিজের মোবাইলে একটা ছবি দেখিয়ে বলল , “দ্যাখ ! এই হল অমিতা দেবীর গ্রামের ডাক্তারের চিকিৎসা । শুধু তুই  যাতে এটা আমার অজুহাত না ভাবিস ,লজ্জার মাথা খেয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে এই ছবিটা তাই আমাকে তুলতে হয়েছে ,তোর কি এরপরেও আরো কিছু জানার আছে ? ”

সোনাকাকু চোয়াল শক্ত করে বলল : আছে বৈকি ।

অমিতা ব্যানার্জীর কেবিনের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সোনাকাকু , তিতির বিনা বাক্য ব্যয় তার পিছু নিল ।

সোনাকাকু অমিতা ব্যানার্জীর কেবিনের দরজায় আওয়াজ করতেই , অমিতা দেবী নিজের অসংলগ্ন কাপড় সামলে নিলেন , Dr  বর্মনের কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থা উপেক্ষা করে সোনাকাকু ঘরে ঢুকে বলল :

“আপনার সকালের ব্যবহারের ব্যাখ্যা আমার কাছে থাকলেও Dr  বর্মনের ব্যবহারে খটকা লেগেছিল বৈকি ! ডাক্তারী পেশায় অন্য ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করাকে কখনোই নিজের অজ্ঞতা বলে ভাবা হয় না । আপনাদের সম্পর্ক  Mrs রমলা ব্যানার্জী জেনে ফেলেছিলেন বলেই কি তার এই অকারণ শাস্তি ? আর সকালে নিজের মৃত সন্তানের কথা বলতে গিয়ে আপনার চোখে যখন বিন্দুমাত্র জলের চিহ্ন দেখতে পেলাম না তখন সম্মানের সকল গন্ডি ভেঙ্গে সত্যি জানার আগ্রহ আমার অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। আপনি ইচ্ছা করেই আপনার স্বামীর সন্তান ধারণ করতে চাননি , ‘কাকতালীয়’ শব্দ টা নিতান্তই আপনার ভালো মানুষ স্বামীর বিশ্বাস , তাই না ? নিলয় বাবুর সাথে  তারা তো আপনার অংশ ও ছিল , মা হয়ে বার বার সুকৌশলে নিজের সন্তান হত্যা করার ইতিহাস আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব কে নাড়া দিয়েছে অমিতাদেবী ! আমি এখন বুঝতে পারছি আপনি কেন রাতে ঘুমাতে পারেন না ,পাপের ভার ই বোধহয় আপনার সকল ভয়ের কারণ !”

নিরুত্তর অমিতা ব্যানার্জীর উত্তরের অপেক্ষা না করে তিতির বলল : তুমি ভুল করছ সোনাকাকু ! তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে বলে শোননি,জয়ন্ত কাকু কাল রাতে ওনার রিপোর্ট গুলো দেখে তোমাকে বলছিল যে শুধু একটা জায়গায় তার ভীষণ  খটকা লেগেছে  : অকস্মাৎ পড়ে যাওয়া , তিন তিনবার পেটের সন্তানের মৃত্যুর কারণ হলেও কোনো রিপোর্টে ওনার ইন্টারনাল আঘাতের কথা উল্লেখ নেই বা শরীরের বাইরে  এমন কোনো  জায়গাতেও কখনো আঘাত লাগেনি যা  এমন অনিষ্ট ঘটাতে পারে । তাছাড়া আরেকটা কথা ভেবে দেখো সোনাকাকু , সন্তান হত্যা করতে হলে ভ্রুণ অবস্থায় কেন করেন নি ? শুধু শুধু  ১০ মাস পেটে ধরার যন্ত্রণা সইতে গেলেন  কেন !

সোনাকাকু বিস্মিত হয়ে তিতিরের দিকে তাকাতে সে বলল , ” আমাদের জানা দরকার তিনবারের মধ্যে একবারও ওনাকে পড়ে যেতে অন্য কেউ দেখেছে কি ?”

অমিতা ব্যানার্জী এবার ঘামতে লাগলেন , ওনার কঠিন দৃষ্টি মুহুর্তে কাকুতিতে বদলে গেল ।

সোনাকাকু : কিন্তু আপনার মৃত সন্তান তো সকলে দেখেছে , তাহলে সত্যি টা কি অমিতা দেবী ? কথা দিচ্ছি যদি সঙ্গত কারণ থাকে তা এই ঘরের বাইরে যাবে না ।

অমিতা ব্যানার্জী ভাঙ্গা গলায় বললেন , “তিতির ঠিকই বলেছে স্বাগ্নিক  বাবু , সকলের জানা সত্যি ,পড়ে যাওয়ার কথাটা আসলে নিতান্তই মিথ্যে । নিজের সন্তান কে বাঁচাতে এছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না, নাহলে ঋতু দিদির মত আমার তিনটি মেয়ে সন্তানেরও সমাধি  হত ব্যানার্জী বাড়ির গভীর পাত কুয়ো। Dr বর্মনের সাহায্য ছাড়া ভ্রুণের লিঙ্গ আগে থেকে জানা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না ,উনি আমার তিনটি মেয়েকে সকলের অগোচরে  তিনটি নিঃসন্তান  দম্পতির হাতে তুলে  দিয়েছেন , আমি নিজের পরিচয় গোপন করে ,বিভিন্ন ছদ্মবেশে তাদের সাথে মাঝে মাঝে দেখাও করতে যাই । অন্য জায়গা থেকে সময় মত মৃত শিশুদেহ   Dr বর্মন ই তিনবার  নিয়ে এসেছেন, আমি যে ওনার কাছে চিরঋণী। এত উপকারের বদলে যদি উনি আমার কাছে  সামান্য কিছু দাবী করেন ,তাতে  না বলার সামর্থ্য যে এই মায়ের নেই স্বাগ্নিক বাবু ! ”

সোনাকাকু পিছনে ঘুরে চোখের জল আড়াল করে বলল , “এবার তাহলে আপনার ছেলে হবে ?”

অমিতা ব্যানার্জী : “তাহলে আর সত্যি লুকোতে  আপনার বন্ধুকে বিনা দোষে সকালে এভাবে অপমান করতাম না স্বাগ্নিক বাবু !এবার আমার পেটে যমজ সন্তান , মেয়েটির জন্য একজন নতুন দম্পতি অপেক্ষা করছেন , শুধু এবার আর মৃত শিশুর প্রয়োজন হবে না,আমার ছেলে ব্যানার্জী পরিবারের মনস্কামনা পূরণ করবে । পরম করুণাময় ঈশ্বর অবশেষে এই অসহায় মায়ের কথা শুনেছেন , পরের বছর , বাবার নার্সিং হোমের যন্ত্রের কাছে সত্যি লুকোনো অসম্ভব হত ।

আর একটা কথা , ঋতু দির মত আমার শাশুড়ি মা ও  প্রায়ই কুয়োর পাড়ে  নিজের রক্তের সম্পর্ক গুলোর কাছে কাছে ক্ষমা চাইতে যান। মা  আমাকে নিজের মেয়ের মতই ভালবাসেন,তাই সেদিন আমার সাথে ডাক্তার বর্মন কে দেখে উনি আর মাথার ঠিক রাখতে পারেন নি। ডাক্তারবাবুও নিজেকে বাঁচাতে ভীষণ বড়  ভুল করে ফেলেছিলেন , এই অবস্থায় তাকে বাঁধা দেওয়ার শক্তি আমার ছিল না , তাই কোনভাবে ফিরে এসে নীলকান্ত দা কে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলাম , তার থেকে বেশী বিশ্বাস আমি নিজেকেও করি না , ছোটবেলা থেকে দেখা ব্যানার্জী পরিবারের অগণিত অপরাধের আগুনে জ্বলছে তার শরীর মন , তবু  আমাদের মত হতভাগীদের  মায়ার বাঁধন কাটিয়ে মুক্তির হাতছানিতে সে কখনো সাড়া দেয়নি । ”

সোনাকাকু আর দাড়িয়ে থাকতে না পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল , তিতির চোখের জল মুছে  অমিতা ব্যানার্জীর  পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে বলল , “এবার আমার মেয়ে জন্ম  স্বার্থক হল ।” দ্রুত পায়ে বাইরে এসে দেখলো জয়ন্ত লাহা নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে দরজার পাশে দাড়িয়ে আছেন  ।

দশমীর সকাল ১১ টা  : ঠাকুর দালানে হৈ  হৈ রবে কান পাতা দায় , রণজয় ব্যানার্জী  ঘরে ঢুকে বললেন , জয়ন্ত  বাবু! স্বাগ্নিক বাবু ! সুখবর আছে , হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল , নিলয়ের ছেলে হয়েছে । আপনারা সত্যি আমার বাড়ি মা দুর্গার আশীর্বাদ হয়ে এসেছেন, আজ কিন্তু কিছুতেই আপনাদের ফিরে যাওয়া চলবে না।

জয়ন্ত লাহা গম্ভীর মুখে বলল , বাহ্  ! খুব আনন্দের খবর , আপনাকে অনেক অনেক অভিনন্দন ,কিন্তু ক্ষমা করবেন , আমাকে আজ কলকাতায় পৌঁছতেই  হবে, বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান আছে ,তাই দুপুরে না  বেরোলে দেরী হয়ে যাবে ।

রণজয় ব্যানার্জী : ওহ , বিজয়া র শুভেচ্ছার কোলাকুলি  তাহলে পরের বছরের জন্য তোলা থাকলো । আসলে নদী টা অনেকটা দূর তো , প্রতিমা ভাসান দিয়ে ফিরে আসতে সন্ধ্যে হয়ে যায় ।

তিতির বিদ্রুপের স্বরে বলল, “বাড়িতে এত বড় পাতকুয়ো থাকতে ভাসানের জন্য ওত দূরে যাওয়ার কি দরকার  !”

কথাটা শুনে ভদ্রলোক মুহুর্তের জন্য বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন ।

সোনাকাকু পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল , “ওর কথা ছাড়ুন তো ,ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে তো তাই বাংলার নিয়ম কানুন কিছু জানে না । নদীর জলের বিস্তৃতি দূর্গা  মায়ের চোখের জলকে আপন করে নিয়ে  , বিদায়ের আন্তরিকতার মধ্যে দিয়ে তার শক্তিরূপ ফিরিয়ে দেয় তিতির  আর সেই রূপকেই ধারণ করে সকল পাপের বিনাশ করতে আবির্ভূত হন মা কালী।

ভদ্রলোক হেসে বললেন , “সত্যি আপনার কথা শুনে মন ভরে গেল স্বাগ্নিক বাবু ! ভাবছি পরের বছর থেকে ব্যানার্জী বাড়িতে কালী পুজোও শুরু করব।”

দুপুর ২ টো  : ওদের তিনজন কে নিয়ে গাড়ি টা কলকাতার দিকে রওনা হতেই তিতির বলল , “অমিতা ব্যানার্জীর কাছে স্বামীর পদবী টা কি ভীষণ গুরুত্বপূর্ন ?”

সোনাকাকু : হয়তো হ্যাঁ , এখনো আমাদের দেশের সব মেয়েরা যে তোর মত স্বাধীন নয় তিতির ! পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাদের খাঁচার দরজা শক্ত করে আটকে দেয় ,কিন্তু অমিতা দেবীর মত মেয়েরা সে খাঁচার মধ্যে থেকেও স্বাধীনতার নতুন মানে অবিষ্কার করেন , আজকের সমাজ তাদের কাছে কৃতজ্ঞ ।

অদ্ভুত

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

২৯ বছর বয়সী কলকাতার সনামধন্য ডাক্তার স্বাগ্নিক মুখার্জী রোজকার ব্যস্ত জীবন থেকে ক্ষনিকের মুক্তি পেতে, তার চেয়ে বয়সে খানিক বড় কিন্তু খুব কাছের বন্ধু, ব্যবসা সুত্রে দার্জিলিং নিবাসী অনিমেষ সান্যালের নিমন্ত্রণ স্বীকার করেই নিলেন শেষমেষ। কিন্তু তার নিমন্ত্রণ রক্ষায় যে বাধ সাধলো সে হলো তার চোদ্দ বছর বয়সী আদরের ভাইজি তিতির ,সে বেশী কথায় না গিয়ে সোজাসুজি বলে দিল, “তোমার কাছে আপাতত দুটোই অপসন আছে সোনাকাকু :এক : তুমি দার্জিলিং যাবার নিমন্ত্রণে কোনো রাখ ঢাক না করে সটান না বলে দাও ,দুই :তোমার বন্ধুর সাথে কথা বলে নিজের সাথে আমার নিমন্ত্রণও তার কাছ থেকে আদায় করে নাও। “

সোনাকাকু হেসে বলল ,” যে শান্তি ও স্বাধীনতার লোভে পরে সারাজীবন বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি ,তোর কল্যাণে সে আশার বাটি আমার একেবারেই শূন্য থাকবে চিরকাল তা আমি ভালোই বুঝতে পারছি।”

তিতিরের নিবির্কার উত্তর ” তা সবই যখন জানো তাহলে আর কেন মিথ্যা দেরী করছো ,আমার দেওয়া অপসন দুটোর মধ্যে তাড়াতাড়ি ভেবে নাও কোনটা করবে। “

সোনা কাকু বলল ,” তোর কিন্তু ৩ মাস বাদে পরীক্ষা তিতির ,আবার অঙ্কে কম নম্বর পেলে বৌদি আগের বারের মতই এবারও আমার কানটাই মুলবে ,তাই বলছি একটু মাঝামাঝি কিছু ভাব মানে তোরও রইলো আর আমারও থাকলো গোছের “।

তিতির বলল ” তুমি তো আমাকে অঙ্ক করাচ্ছ এবার ,নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসের এতো অভাব হলে ,কাউকে গরীব মনে হলেই ড্রয়ার থেকে ফ্রি তে ওষুধ না দিয়ে, তাকের বইগুলো তো দিয়ে দিতে পারো ,তোমার ওষুধের দামের চেয়ে ওগুলো বেচে অনেক বেশী টাকা পাবে সে ,আর প্লিস ‘তোরও রইলো আমারও থাকলো’ এসব বাজে বার্গেনিং করতে এসো না আমার কাছে ,এখন নিজে ভুলে গেলেও তুমি ই আমাকে শিখিয়েছো ,যে বারে বারে কথা বদলায় তাকে আর যাই হোক ভদ্র বলা চলে না ।”

সোনাকাকু হেসে বলল ,”তবে চল, আর কি ! আমি অনিমেষকে ফোনে বলে দেব যে নির্দিষ্ট পাহারাদারনী ছাড়া আমার কোথাও যাওয়ার অনুমতি নেই । “

শুক্র বার , রাত্রি ৯:১৫ ,কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস প্রায় ৩ ঘন্টা লেটে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে এসে দাড়াতেই তিতির দেখলো সোনাকাকু জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তার বন্ধু কে খোঁজার চেষ্টা করছে , তিতির কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সোনাকাকু বলল, “মোবাইলে চার্জ নেই ,চার্জার বাড়িতে ভুলে ফেলে এসেছি। “

তিতির হেসে বলল ,” ঠিক আছে ,ট্রেন থেকে নেমে তোমার বন্ধুকে খুঁজে নেওয়া যাবে ক্ষণ ,একি আর হাওড়া স্টেশন !”

তিতির সোনাকাকুর পিছন পিছন ট্রেন থেকে নামতেই একজন ভদ্রলোক হাসিমুখে ওদের দিকে এগিয়ে এলেন। ভদ্রলোক লম্বায় প্রায় ৬ ফুট মতন ,শক্ত চোয়াল, বয়স আন্দাজ ৩৪ এর আশেপাশে ,প্রথম নজরেই নিয়মিত শরীরচর্চার প্রায় সব প্রমান ই দৃষ্টি গোচর হয় ।

ভদ্রলোক তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললেন , “তুমি নিশ্চই তিতির ?” তিতির হেসে “হ্যাঁ” বলতেই ভদ্রলোক বললেন , “তোমার গল্প স্বাগ্নিকের কাছে এত শুনেছি যে তোমাকে কখনো না দেখলেও আজ আমার চিনতে একেবারে অসুবিধা হয়নি। “

তারপর ভদ্রলোক সোনাকাকুকে জড়িয়ে ধরে বললেন ,”তুই ঠিক একইরকম আছিস স্বাগ্নিক,এতদিন পর তোকে দেখে যে কি ভালো লাগছে আমার ,তা বলে বোঝাতে পারব না। “

এতক্ষণে সোনাকাকু ভদ্রলোকের আলিঙ্গনের উত্তর দিয়ে বলল, “কিন্তু আমি যে তোকে ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখতে পেয়েও চিনতে পারিনি রে অনিমেষ ,এতো সুঠাম দেহ কবে বানালি তুই ? আর তোর গোলগাল মুখটাও তো আর নেই। “

অনিমেষ সান্যাল হেসে বললেন ,”কলকাতায় বসে পাহাড়ী জায়গায় থাকার কষ্ট তুই আর কি করে বুঝবি বল ,যাইহোক লম্বা ট্রেন যার্নি তে তোরা নিশ্চই খুব ক্লান্ত ,এখান থেকে দার্জিলিং পৌছতে আরো প্রায় ৩ ঘন্টা লেগে যাবে,আমার গাড়ি স্টেশনের বাইরে রাখা আছে। আর একটা কথা ,আমি তোদের আজ একা নিতে আসিনি কিন্তু, গাড়িতে তোদের জন্য অপেক্ষা করছে আমার স্ত্রী মিতা ,আমাদের ২ বছরের ছেলে অনি ,আর আমার পি.এ. শান্তনু ভৌমিক ।”

সোনাকাকু বলল ,”করেছিস কি ?আমাকে তো সেলেব্রিটি বানিয়ে ছাড়লি একেবারে”।

উত্তরে অনিমেষ সান্যাল হেসে বললেন “এতে আমার দোষ নেই স্বাগ্নিক ,সুস্থ পত্রিকায় নিয়মিত তোর লেখা বেরোনোর ফলে এই পাহাড়ী অঞ্চলেও তুই কলকাতার মতই জনপ্রিয় । আসলে কি জানিস ,মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাঁচার ইচ্ছাটাও যে দ্বিগুন হারে বাড়তে থাকে আর সে ইচ্ছাপূরণের জাদুকর হয়ে ওঠে তোর মতই খ্যাতনামা ডাক্তারদল। তাই ডাক্তারী থেকে বিশ্রাম নিতে তোর মনে হয় অন্য কোনো জায়গা বাছা উচিত ছিল ,শান্তনু বাবু কিন্তু তার হাঁটুর ব্যথার যাবতীয় চিকিৎসার প্রেসক্রিপসন আজকেই সাথে নিয়ে এসেছেন তোকে দেখাবে বলে। “

সোনা কাকু বলল “হাঁটুর ব্যথা ? কিন্তু আমি তো হার্টের … !”

সোনা কাকুর কথা শেষ না হতেই অনিমেষ সান্যাল বললেন ,”আমি জানি ,ওনাকে বলেও ছিলাম ,কিন্তু উনি শুনে বললেন ‘এত বড় ডাক্তার যখন শুধু কি হার্টেই আটকে আছে ভেবেছেন ,হাঁটু পেরিয়ে পায়ের গোড়ালিতেও নিশ্চই পৌঁছে গেছেন হবে ।হ্যাঁ, হার্টের উপরেও অনেক যন্ত্রপাতি আছে আমি জানি ,কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ বলেও তো কিছু হয় নাকি ! ‘।” কথাটা শুনে সোনাকাকু আর তিতির দুজনেই সজোরে হেসে উঠলো ।

তিতির সোনাকাকুর পাশাপাশি অনিমেষ সান্যাল কে অনুসরণ করলো ,স্টেশনের বাইরে দাড়ানো একটা ইনোভা গাড়ির সামনে এসে অনিমেষ সান্যাল সোনাকাকুকে বললেন, “এই যে ,এই গাড়িটা। ” সম্ভবত তাকে দেখতে পেয়েই গাড়ি র পিছনের সীট থেকে হাসিমুখে নেমে এলেন একজন ভদ্রমহিলা আর সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক। রাতের অন্ধকারেও বেশ বোঝা যাচ্ছে ভদ্রমহিলাকে ডাকসাইটে সুন্দরী বললেও কম বলা হবে ,আর তার সামনে মাঝ বয়সী ভদ্রলোকের বেঁটে খাটো মোটা চেহারা কেমন যেন ভগবানের ভারসাম্য রক্ষার অভাবনীয় নিদর্শন বলেই মনে হয়।

সোনাকাকুকে দেখে ভদ্রমহিলা হেসে বললেন ,”নমস্কার স্বাগ্নিক বাবু ,আমি মিতা সান্যাল,আপনার খ্যাতি অন্য কাউকে আপনার পরিচয় দেবার অবকাশ দেয় না ,আর আপনার বন্ধুর মুখে তিতিরের গল্প এত শুনেছি ,আমি তো ভেবেই নিয়েছি ওর বুদ্ধির কিছুটা আমার ছেলেটার জন্য ধার নেব ।”

সোনাকাকু হেসে বলল ,”সে নেবেন না হয় ,আমি তো ওর কাছ থেকে বুদ্ধি আর সাহস দুটোই ধার নিয়ে থাকি !”

তিতির রেগে বলল ,”সোনাকাকু এটা কিন্তু কথা ছিল না ,পাহাড়ে এসেও তুমি কলকাতার মত দলভারী করছো। “

অনিমেষ সান্যাল হেসে মাঝ বয়সী ভদ্রলোকের দিকে ঘুরে বললেন ,” স্বাগ্নিক আরেকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দি, ইনি হলেন শান্তনু ভৌমিক ,আমার ব্যবসার হিসেব নিকেশ সব ওনার দায়িত্বে ।”

শান্তনু ভৌমিক হেসে বললেন ,” হে হে ,মানে ওই একটা জিনিসই আমি পারি কিনা, ‘হিসেব’ ,আর ঠিক সেই জন্যই তো আজ আপনার সাথে দেখা করতে আসা ,এই হাঁটুর ব্যথায় সারা জীবনে যা হয়নি তাই হচ্ছে ডাক্তার বাবু ,হিসেবে আমার ভুল হচ্ছে প্রায়।”

অনিমেষ সান্যাল বেগতিক বুঝে এগিয়ে এসে বললেন ,”ওসব পরে হবে শান্তনু বাবু, একে ট্রেন লেট হওয়ায় এখন প্রায় ১০ টা বেজে গেছে ,বাংলো তে পৌছতে আরো ঘন্টা তিনেক লাগবে , অনিও দেখছি গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছে ,আর দেরী না করে চটপট গাড়িতে উঠে পড়াই ভালো,বাকি গল্প রাস্তায় যেতে যেতে হবে না হয় । “

গাড়িতে প্রায় ১ ঘন্টা পেরিয়ে গেলো ,গাড়ির ঘড়িতে চোখ যেতেই তিতির দেখল ১১ টা বাজতে ৫ মিনিট বাকি। রাত্রে বাইরের সৌন্দর্য উপভোগ করার কোনো উপায় নেই তবুও সকলের সাথে বিভিন্ন এলোমেলো গল্পে তার ক্লান্তি টাও কেমন যেন ক্রমশঃ দূর হয়ে যাচ্ছে ।পাহাড়ী রাস্তায় রাত্রে গাড়ি চালানো বেশ শক্ত তবুও স্টিয়ারিং র পিছনে অনিমেষ সান্যালের দক্ষ হাত সেটা এতক্ষণ কাউকে মালুমই হতে দেয়নি। হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে অজানা কারণে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ গাড়িতে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট করার ব্যর্থ চেষ্টা করার পর ,বাকি সকলকে গাড়ির ভিতরেই বসে থাকতে অনুরোধ করে অনিমেষ সান্যাল নিজে গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন ,তার অনুরোধ উপেক্ষা করে সোনাকাকুও গাড়ি থেকে নেমে পড়ল, প্রায় আধঘন্টা চেষ্টা করার পরও যখন কিছুই ফল হলো না তখন সকলের কপালেই চিন্তার ভাজ দেখা দিল। এত রাতে এই নির্জন পাহাড়ী রাস্তায় একদিকে যেমন কোনো গাড়ির দেখা পাওয়া মুশকিল অন্যদিকে ফোনে নেটওয়ার্ক ও আসছে না যে সাহায্যের জন্য কাউকে ফোন করা যাবে। রাত বাড়ার সাথে সাথে স্বাভাবিক নিয়মেই পাহাড়ে ঠান্ডা টা ও ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে,গন্তব্যের দূরত্ব পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা কোনো মতেই সম্ভব না জেনে অবস্থার প্রতিকূলতা আরো বেশী জটিল হয়ে উঠলো । অনি তার মায়ের কোলে মাথা রেখে এখনো ঘুমিয়েই আছে ,গাড়ির আলো জ্বালাতে তিতির লক্ষ্য করলো অনির মুখের আদল একেবারে তার মায়ের মতন , এখন অনি জেগে থাকলে সমস্যা টা আরো কত কঠিন হয়ে যেত সকলের জন্য, সেটা ভেবে তিতির মনে মনে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।

এরকম অসহায় পরিস্থিতে শান্তনু ভৌমিক হঠাৎ বললেন ,”রাত বারোটা তো প্রায় বাজতে গেল ,বিপদ মুক্তির কোনো আশাই তো দেখছি না মশাই !”

অনিমেষ সান্যাল হালকা ভাবে বললেন ,”রোজ ই তো বাড়িতে ঘুমান ,আজ না হয় আমার গাড়িতেই ঘুমালেন,এটাকে হাওয়া বদল না বলা গেলেও বিছানা বদল বলে নিশ্চই চালানো যাবে। “

শান্তনু ভৌমিক বললেন ,” সেটা না মশাই ! এক রাত কেন ,অনেক রাত ই আমি না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে পারি ,কিন্তু এই জায়গাটা খুব একটা সুবিধের নয় বুঝলেন কিনা! তার ওপর সাথে ছোট বাচ্ছা আছে বলেই চিন্তা টা আরো বেশী হচ্ছে !”

অনিমেষ সান্যাল কিছু বলার আগেই সোনা কাকু বলল ,”ঠিক বুঝলাম না শান্তনু বাবু, এখানে চোর ডাকাতের উপদ্রব আছে বলে আপনি জানেন নাকি !”

শান্তনু ভৌমিক এবার আওয়াজ নীচু করে বললেন ,”না না মশাই , চোর ডাকাতের ভয় আমার মতন ছাপোষা লোক কেন পাবে বলুন ! এটা হলো যাকে বলে একেবারে তেনাদের রাজত্ব ,অনেক গল্প শুনেছি কিনা ,তাই বলছিলাম।”

তিতির তা শুনে বলল ,”ভূত ? সত্যি ভূত মানে চোখে দেখা যায় এমন ভূত ?”

সোনাকাকু গম্ভীর ভাবে বলল ,”এরমধ্যে অনি উঠে গেলে কিন্তু আরো মুশকিল বাড়বে, পাহাড়ী ভূত ঘুমপাড়ানি গান জানে কিনা আমার কিন্তু জানা নেই। ” কথা টা শুনে শান্তনু ভৌমিক ছাড়া বাকিরা সকলে হেসে উঠলো।

হঠাৎ একটু দূরে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখতে পেয়ে অনিমেষ সান্যাল আর সোনাকাকু দুজনেই তৎক্ষনাৎ রাস্তায় নেমে গাড়িটা থামানোর জন্য হাত দেখাতে লাগলো ,অপ্রত্যাশিত হলেও গাড়িটা সত্যি ওদের সামনে এসে থেমে গেল।

অনিমেষ সান্যাল গাড়িটার অল্প খোলা জানলার কাঁচের কাছে মুখ নামিয়ে বললেন ,” স্টেশন সে ওয়াপসি কে টাইম অচানক গাড়ি খারাপ হো গয়া হামারা ,সাথমে ছোটা বাচ্ছা হ্যয় ,ইতনে রাত মে ইহা কিসিকা মদত মিলনা মুশকিল হ্যয় ,আগার আপ মেরে ফ্যামিলি কো দার্জিলিং মে মেরে বাংলো তক ছোড় দেনগে ,হাম আপকা বহুত বহুত আভারী হোঙ্গে , হাম পয়সা দেনে কে লিয়ে ভি তৈয়ার হ্যয় , থোড়া মদত কর দিজিয়ে প্লিস ভাইসাহাব । “

গাড়ির ড্রাইভার উত্তরে বলল ,”হা জরুর ,বৈঠ যাইয়ে। “

গাড়িটা ছোট হওয়ায় ৪ জনের বেশী ধরা সম্ভব ছিল না তাই বোধ হয় অনিমেষ সান্যাল তার স্ত্রী কে বললেন , “এভাবে মাঝ রাস্তায় গাড়ি রেখে আমার যাওয়া টা ঠিক হবে না,তুমি বাকিদের নিয়ে বাড়ি পৌছে সীতারাম আর ডমরু কে অন্য গাড়িতে এখানে পাঠিয়ে দাও ,খুব বেশী কিছু না বিগড়ালে ওরাই ঠিক করে দিতে পারবে নাহলে সকাল অব্দি অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই ,এত রাতে মেকানিক খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ই বলা চলে । সে যাইহোক আপাতত তোমাদের ঠিকমত বাড়ি পৌঁছানো আগে দরকার। আমার কত অনুরোধের পর স্বাগ্নিক এখানে এসেছে, আমার আরো সাবধানতা নেওয়া উচিত ছিল ,এভাবে ক্লান্ত শরীরে নিয়ে আমার দোষেই ওদের এই বিপত্তি হল ,ভাগ্যিস ভদ্রলোক আমাদের সাহায্য করতে রাজি হল নাহলে যে কি হত ! “

সোনাকাকু কিছুতেই রাজি না হওয়া সত্বেও সকলের বার বার অনুরোধে শেষমেষ একটা শর্ত রেখে গাড়িতে উঠে বসলো সেটা হলো বাকিদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সীতারাম আর ডমরু র সাথে সোনাকাকুও আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে ফিরে আসবে । গাড়ির পিছনের সীটে তিতির আর সোনা কাকুর সাথে কোলে ঘুমন্ত অনিকে নিয়ে বসলেন মিতা সান্যাল ,আর সামনে ড্রাইভারের পাশের সীটে বসলেন শান্তনু ভৌমিক। অন্ধকার টা এত গাঢ় হয়ে এসেছে যে তিতির চেষ্টা করেও ড্রাইভারের মুখ দেখতে পেল না ,আপাদমস্তক শীত পোশাকে ঢাকা চেহারার আন্দাজ করাও বেশ অসম্ভব বলেই মনে হলো তার। গাড়িতে বসেই একটা বোঁটকা গন্ধ নাকে এলো তিতিরের ,সোনা কাকুর দিকে তাকিয়ে সেটা বলতে যাওয়ায় সোনা কাকু মুখে আঙুল দেখিয়ে ঘুমিয়ে থাকা অনির দিকে ইঙ্গিত করল।

গাড়ি কিছুক্ষণ চলার পর শান্তনু ভৌমিক ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বললেন “আপকো পাতা হ্যয় হামলোগ কিধার জায়েনগে ,মতলব বিনা পাতা পুছে হি আপ ইতনে দূর চলা আয়া। “

ড্রাইভার ভাঙা গলায় উত্তর দিল ,”দার্জিলিং পাহৌচকে পাতা জরুর পুছেঙ্গে ,ইধার রাস্তা ঠিক নাহি হ্যয় ,ইসিলিয়ে ধীরে যানা পর রাহা হ্যয়।”

শান্তনু ভৌমিক উত্তরে শুধু বললেন “ও ” ।

আরো প্রায় পনেরো মিনিট বাদে ড্রাইভার হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে বলল ,”আপলোগ থোড়া বৈঠিয়ে,ম্যয় আভি আয়া। ” গাড়ি থেকে নেমে সামনে একটা গেট দিয়ে তাকে ভিতরে ঢুকতে দেখা গেল।

শান্তনু ভৌমিক এবার পিছনে ঘুরে সোনাকাকুকে বললেন ,”এভাবে অচেনা লোকের গাড়িতে ওঠা আমাদের মোটেই উচিত হয়নি, ড্রাইভারের ভাবগতিক আমার মোটেই সুবিধার লাগছে না ডাক্তার বাবু। “

মিতা সান্যাল ও সাথে সাথে বলে উঠলেন ,”সত্যি কথা বলতে আমারও শুরু থেকেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে,আপনারা পেয়েছেন কিনা জানিনা ,গাড়িতে উঠে একটা বোঁটকা গন্ধে প্রথমে তো আমার বমি এসে গিয়েছিল ,এতটা রাস্তায় শান্তনু বাবুর কথার উত্তর ছাড়া একটা শব্দ আর ড্রাইভার টার মুখ থেকে বেরোয়নি ,আর এখন নামার আগে যা একটু আবার বলল ।”

তিতির কিছু বলতে যাওয়ায় সোনাকাকু ওর হাতের পাতা চেপে ধরলো ,তিতির ইঙ্গিত টা বুঝতে পেরেই আর কিছু বলল না।

সোনাকাকু বলল ,” কই আমি কোনো গন্ধ পাই নি তো” তারপর তিতিরের হাতে হালকা চাপ দিয়ে জিজ্ঞেস করলো “কিরে তিতির তুই পেয়েছিস নাকি ?”

তিতির উত্তর দিল ,” না ,আমিও কিছু পাইনি ।”

সোনাকাকু বলল ,” আমার মনে হয় ,আপনারা মিথ্যা ভয় পাচ্ছেন ,আমরা বাঙালী জেনেই বোধহয় ড্রাইভার ভদ্রলোক কোনো কথা বিশেষ বলছেন না ।”

শান্তনু বাবু বললেন ,” নাক বন্ধ থাকায় বৌদির মত কোনো গন্ধ আমি পাইনি ঠিকই, কিন্তু ডাক্তার বাবু ব্যাপারটা একেবারেই আমার স্বাভাবিক ঠেকছে না । “

সোনাকাকু বলল , “ঠিক বুঝলাম না শান্তনু বাবু ,কি আবার আপনার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকলো !”

শান্তনু ভৌমিক এবার গলা নামিয়ে পিছনে ঘুরে ফিসফিস করে বললেন ,” আমি হেডলাইটের আলোতে পরিস্কার দেখেছি, ড্রাইভারের চোখের পাতা একবারও পড়ছে না। আপনি তো ডাক্তার ,আপনি বলুন তো কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কতক্ষনই বা চোখের পাতা না ফেলে থাকা সম্ভব ? “

মিতা সান্যাল ভয়ার্ত স্বরে বললেন ,” সেকি ? বোঁটকা গন্ধ আর ওরকম ভাঙা গলার আওয়াজ শুনে আমার প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিল ,এখন আমরা কি করব স্বাগ্নিক বাবু?”

সোনাকাকু বলল , “আহা ! ওত ব্যস্ত হবেন না বৌদি ,শান্তনু বাবুর দেখার ভুলও হতে পারে ,আগে আমাদের জানা দরকার আমরা এখন কোথায় আছি ,গন্তব্যে পৌঁছতে আর কত সময় লাগবে,শান্তনু বাবু আপনার হাতে তো ঘড়ি আছে ,একটু সময় টা দেখে বলুন না।”

শান্তনু বাবু বললেন, “আপনি তো আমার কথা বিশ্বাসই করছেন না , আমার ঘড়ির সময় টাও ভুলই বলবেন নিশ্চই। “

সোনাকাকু বলল,” আপনি ভুল ভাবছেন শান্তনু বাবু , ব্যাপারটা বিশ্বাস অবিশ্বাসের নয় , আপনার কথা সত্যি হলেও আমরা তো এই গাড়ি থেকে এখনি নেমে যেতে পারবো না ,তাই মিথ্যা উদ্বেগ বাড়িয়ে কি লাভ আছে বলুন, আমাদের এখন একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গন্তব্যে পৌঁছানো ,সেজন্যই আপনাকে ঘড়িতে সময় দেখতে অনুরোধ করলাম ,রাস্তা জানিনা ঠিকই কিন্তু সময় জানতে পারলে আর কতক্ষণের রাস্তা বাকি তার একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। “

শান্তনু বাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একেবারে স্থির হয়ে গেলেন ,তাকে কিছু না বলতে দেখে সোনা কাকু বলল , “কি হল? অন্ধকারে বুঝি আপনার ঘড়ি দেখতে অসুবিধা হচ্ছে ?”

শান্তনু বাবু কোনরকমে ঢোক গিলে বললেন ,” সময় এগোচ্ছে না ডাক্তারবাবু,গাড়িতে ওঠার সময় যা ছিল এখনো তাই ,কাটায় কাটায় সাড়ে বারোটা। “

সোনা কাকু বলল , “আপনার ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে শান্তনু বাবু ,অন্যকিছু ভাবার এখানে কোনো অবকাশ নেই। “

মিতা সান্যাল একইরকম ভয়ার্ত স্বরে বললেন ,”আমার শরীর টা একদম ভালো লাগছে না স্বাগ্নিক বাবু ,গা টা খুব গোলাচ্ছে ,বমি হবে মনে হয়,আপনাদের কাছে কোনো প্লাস্টিক হবে? এই অবস্থায় আমি গাড়ির থেকে নামতে একদম সাহস পাচ্ছি না ।”

সোনাকাকু বলল ,”আমার আর তিতিরের ব্যাগ তো অনিমেষের গাড়িতেই রয়ে গেছে ” তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে বলল ” শান্তনুবাবু এদিক ওদিক একটু হাতড়ে দেখুন না ,ড্রাইভার নিজের প্রয়োজনে অনেক সময় কিছু জিনিস রেখে থাকতে পারে ।”

শান্তনু বাবু জবুথবু অবস্থা কোনরকমে কাটিয়ে প্লাস্টিক খুঁজতে তৎ পর হলেন, ড্রাইভারের সীটের সামনের ড্যাসবোর্ডে একটা প্লাষ্টিক হাতে লাগায় উনি বললেন ,
“পেয়েছি একটা ,কিন্তু খালি প্লাস্টিক নয় ,কিছু কাগজ পত্র আছে।” তারপর পকেট থেকে একটা টর্চ বার করে প্লাস্টিকের কাগজ গুলো নিজের কোলের উপর রেখে পিছনে ঘুরে মিতা সান্যালের হাতে খালি প্লাস্টিক টা দিলেন ।

মিতা সান্যাল পাশে বসা তিতিরকে বললেন ,”তিতির একটু অনি কে ধরতে পারবে?”

তিতির বলল “কেন পারবো না ? আপনি আস্তে করে ওকে আমার কোলে দিয়ে দিন, আমি নিতে গেলে অচেনা হাতের ছোঁয়ায় ওর ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে। “

তিতিরের কথা মত অনিকে তার কোলে দিয়ে মিতা সান্যাল প্লাস্টিক টা হাতে নিয়ে বমি করতে যাবেন ঠিক তখনি শান্তনু ভৌমিক বললেন, ” ডাক্তারবাবু !” ভয়ে তার গলার আওয়াজ একেবারে শুকিয়ে গেছে।

সোনাকাকু বলল, “আবার কি হলো শান্তনু বাবু ? “

শান্তনু ভৌমিক একইরকমভাবে ভয় জড়ানো স্বরে বললেন ,”আর সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই ,গাড়ির ব্লু বুকে লেখা নামের সাথে আমার হাতের ডেথ সার্টিফিকেটের নামের হুবহু মিল ,তাছাড়াও ছবির সাথে ড্রাইভারের মুখেরও কোনো অমিল দেখছি না ,আমার কথা বিশ্বাস না হলে নিজের চোখেই দেখুন। “

কথাটা বলে শান্তনু ভৌমিক হাতের কাগজ গুলো আর টর্চ টা পিছনে ঘুরে সোনাকাকুর হাতে দিলেন । সোনাকাকু টর্চ জ্বালিয়ে কাগজ গুলোতে চোখ বোলাতে শুরু করতেই মিতা সান্যালের মুখ থেকে বেরোনো গোঁ গোঁ শব্দে ব্যস্ত হয়ে তিতিরকে বলল ,” কি রে ? কি হল বৌদির ?”

ঘুমন্ত অনিকে কোলে নিয়ে তিতিরের নড়ার মত অবস্থা ছিল না , সে বলল , ” আমি দেখতে গেলে অনি উঠে যাবে সোনাকাকু ,মনে হচ্ছে শান্তনু আঙ্কেলের কথা শুনে মিতা আন্টি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। “

সোনাকাকু তাড়াতাড়ি টর্চ টা মিতা সান্যালের মুখের ওপর ধরায় বুঝতে পারলো তিতিরের আশঙ্কাই সত্যি। ডাক্তার বলেই হয়তো এখনকার অসহায় অবস্থাটা আরো বেশী অসহ্য হয়ে উঠলো তার কাছে ,তাও তিতিরকে সাবধানে টপকে মিতা সান্যালের কপালে হাত দিয়ে দেখে সোনাকাকু বলল , “না ,গা ঠান্ডাই আছে ,একটু জল দিলেই জ্ঞান টা ফিরে আসবে বলেই আমার মনে হয় ,কিন্তু গাড়িতে জল আছে কিনা সেটা দেখতে হবে।”

সোনাকাকু নিজের দিকের দরজাটা খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে খানিক বাধ্য হয়েই নিজের সীট থেকে উঠে দাড়িয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, “শান্তনু বাবু আপনি আরেকবার যদি দয়া করে ওদিকটা দেখেন ,গাড়িতে একটা জলের বোতল নিশ্চই থাকার কথা ।”

শান্তনু ভৌমিক রামনাম জপ বন্ধ করে ,শুধু সোনাকাকুর অনুরোধ রাখতেই বোধহয় জলের খোঁজে হাত পা এদিক ওদিক নাড়তে লাগলেন। হঠাৎ ওনার ‘বাবারে !’ বলে ভয়ানক চিৎকারে সোনাকাকু চমকে উঠে বলল ,”কি হল শান্তনু বাবু ?”

শান্তনু ভৌমিক কিছু বলার মত অবস্থায় ছিলেন না , অন্ধকার টা এতক্ষণে চোখ সওয়া হয়ে গেছিল বলেই সোনাকাকু বুঝতে পারলো উনি আঙ্গুল নির্দেশ করে সোনাকাকুকে কিছু দেখানোর চেষ্টা করছেন , সোনাকাকু সেই দিকে তাকাতেই দেখতে পেল ড্রাইভারের সিটের তলায় ২ টো চোখ জ্বলজ্বল করছে ।

সোনাকাকু ক্ষনিকের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় বোধ করলো ,হঠাৎ তিতিরের হাতের হ্যাঁচকা টান আর তাকে ওভাবে দাড়িয়ে থাকতে দিল না। সোনাকাকুর কানের কাছে মুখ টা নিয়ে গিয়ে তিতির বলল , ” বোঁটকা গন্ধটা খুব চেনা লেগেছিল আমার, অনেকটা রোহিনী সাহার কলঙ্কমোচনে তোমার দেওয়া ভাম বিড়ালের গায়ের গন্ধের মত (বিস্তারিত জানতে পড়ুন ‘ফেলুদার যোগ্য বউ ‘ গল্পটি “) সেটাই তখন তোমাকে আমি বলার চেষ্টা করছিলাম ,সামনের সীটের তলায় জন্তুটি এর আগেও কয়েকবার নড়াচড়া করেছে , আমি ইচ্ছা করেই পা টা এগিয়ে রেখেছিলাম ,তাই মিতা আন্টি র পা অব্দি না পৌছে বার বার আমার পায়েই তার লোমের ঘষা লেগেছে।”

সোনাকাকু আবার সীট থেকে উঠে শান্তনু ভৌমিকের দিকে ঝুঁকে বলল ,”ভয় পাবেন না শান্তনু বাবু ,ওটা বিড়াল বৈ আর কিছু না। ” শান্তনু ভৌমিকের অবস্থা যে শোচনীয় সেটা বুঝতে পেরে কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই সোনাকাকু আবার বলল ,”আপনি দরজাটা খুলে গাড়ি থেকে আস্তে আস্তে নামতে চেষ্টা করুন। ” এরপরও শান্তনু ভৌমিক কে একইভাবে বসে থাকতে দেখে সোনাকাকু নিজের দিকের দরজাটা বার বার ধাক্কা দিয়ে খোলার চেষ্টা করতে লাগলো।

অনির ঘুমটা ভেঙ্গে যেতে দেখে তিতির বলল , ” আস্তে সোনাকাকু ! ওটা মনে হয় খোলে না ,ঢোকার সময় তো আমরা তাড়াতাড়ি তে ওদিকের দরজা দিয়ে সবাই পর পর ঢুকে পড়লাম ,আমি অনিকে নিয়ে পিছনে সরছি ,তুমি ওই পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও ,মিতা আন্টি র মাথাটা আমার কাঁধে রেখে দিয়ে তুমি সাবধানে নেমে যাও। “

সোনাকাকু তিতিরের কথামত গাড়ি থেকে নেমে সামনের সীটের দরজাটা খুলে বলল, ” গাড়ি থেকে নেমে আসুন শান্তনু বাবু ,আমি আছি, আপনার কোনো ভয় নেই। “

এতক্ষণ পাথর হয়ে বসে থাকা শান্তনু ভৌমিক নিজের হাতটা কোনরকমে সোনাকাকুর দিকে বাড়ালো ,ওনার হাতটা ধরে সোনাকাকু বুঝতে পারল এত ঠান্ডাতেও শান্তনু ভৌমিক ঘেমে জল হয়ে গেছেন,ওনাকে ধরে গাড়ি থেকে নামাবার পর সোনাকাকু পকেট থেকে টর্চ টা বের করে সামনের সীটের দিকে ফেলতেই দেখতে পেল একটা কালো লোমশ বেড়াল আলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, শান্তনু ভৌমিকের থেকে সে দৃশ্য আড়াল করতেই সোনাকাকু তাড়াতাড়ি টর্চ টা নিভিয়ে দিলেন, তারপর চোখ বুজে দাড়িয়ে রামনাম জপ করা শান্তনু ভৌমিকের দিকে তাকিয়ে বললেন ,”আপনি আমার সীটে গিয়ে বসুন, আমি একটু এগিয়ে দেখি কাউকে পাই কিনা ,এভাবে আর কতক্ষণ ই বা ড্রাইভারের ফিরে আসার ভরসায় বসে থাকা যাবে ! আমরা না পৌঁছাতে পারলে অনিমেষ কেও সারা রাত্রি গাড়িতে বসেই কাটাতে হবে ,তাই আর দেরী করবেন না ,চটপট পিছনের সীটে উঠে বসে পড়ুন ।”

শান্তনু ভৌমিক সোনাকাকুর হাত চেপে ধরে কোনরকমে বললেন , ” আমিও আপনার সাথে যাবো , আমি এভাবে একা কিছুতেই……”

সোনাকাকু বলল ,” একা কোথায় ? তিতির ,অনি ,বৌদি সবাই তো গাড়িতে ,আর ওদেরকে এভাবে একা ফেলে আমাদের দুজনের যাওয়া টা ঠিক হবে বলে আমার মনে হয় না ।”

তিতির গাড়ির কাঁচ টা অল্প নামিয়ে বলল , “তোমরা যাও সোনাকাকু ,আমি গাড়িতে আছি ,অনি আর মিতা আন্টির কিচ্ছু হবে না,সে দায়িত্ব আমার। এখানে দাড়িয়ে যত দেরী করবে ,সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। “

সোনাকাকু নিরুপায় হয়ে বলল ,” দরজা দুটো ভালো করে লক করে দে ,আর আমি না আসা পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই জানলার কাঁচ খুলবি না । আমি সামনেই যাচ্ছি, এখনি চলে আসবো ,কোনো বিপদের আঁচ পেলে ই আমাকে ডাকবি বুঝলি? নিজে পাকামি মেরে সামলাতে যাবি না। “

তিতির মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে সোনাকাকু সামনে এগিয়ে গেল ,শান্তনু ভৌমিকও ছায়ার মতন তার পিছু নিল ,যে গেট টা দিয়ে ড্রাইভার কে ঢুকতে দেখা গিয়েছিল, সেই গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই সোনাকাকু নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারল না ,নিজের মনেই বলে উঠলো “এটা তো কবরস্থান,তার মানে কি বাকিদের আশঙ্কা ই …….”
হঠাৎ আওয়াজে পিছনে ঘুরে তাকাতেই সোনাকাকু দেখলো শান্তনু ভৌমিক মাটিতে পড়ে আছেন , নিচে বসে তার দিকে ঝুঁকতেই সোনাকাকু বুঝলো শান্তনু ভৌমিকও এবার জ্ঞান হারিয়েছেন। কোনরকমে ওনাকে উঠিয়ে নিজের কাঁধে ভর দিইয়ে গাড়ির সামনে এসে দরজা খুলতেই সোনাকাকু দেখল মিতা সান্যাল অচৈতন্য অবস্থায় একা বসে আছেন গাড়িতে। দ্রুত শান্তনু ভৌমিক কে গাড়িতে বসিয়ে সীটবেল্ট আটকে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল সোনাকাকু ,তারপর একটা অজানা ভয়ের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে চিৎকার করে উঠলো “তিতির!”

শনিবার সকাল ১০ টা , অনিমেষ সান্যালের বাড়িতে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে আছে সোনাকাকু ,তিতির ,অনি ,মিতা সান্যাল ,শান্তনু ভৌমিক আর অনিমেষ সান্যাল নিজে।

শান্তনু ভৌমিক কৃতজ্ঞতাপূর্ণ স্বরে বললেন ,” আজকের দিনটা আমাদের পুনর্জন্মের প্রথম দিনও বলা চলে ,আপনি যে কিভাবে সেই ভয়ানক অবস্থা থেকে আমাদের বাঁচিয়ে ফেরৎ আনলেন সেটা না জানতে পারলে যে মরেও শান্তি পাবো না ডাক্তারবাবু ।”

অনিমেষ সান্যাল হেসে বললেন ,”আমি কিন্তু এই কৃতজ্ঞতার লিস্ট থেকে বাদ স্বাগ্নিক, আমাকে ডমরুর খোঁজা মেকানিক বাঁচিয়েছে ,তুই ডমরুকে নিয়ে না গেলেও গাড়িতে আমার বেশ ভালোই ঘুম হচ্ছিল । “

মিতা সান্যাল অনির মুখে সেদ্ধ ডিমের টুকরো দিয়ে বলল ,”আহ তুমি চুপ করো তো! সব ব্যাপারে মজা তোমার। কালকে স্বাগ্নিক বাবু না থাকলে ওই ভূতের কবল থেকে আমাদের কারোরই নিস্তার ছিল না , আমি নেহাত আগেই অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম, নাহলে হার্ট ফেল হয়ে কাল আমার মৃত্যু ছিল অনিবার্য। সকালে তোমরা ফেরার আগে আমি শান্তনু বাবুর কাছে বাকিটা শুনেছি ,এখনো আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আছে। “

অনিমেষ সান্যাল বললেন ,”গল্পটা পুরোটা শুনতে হবে তো! তারপর না হয় ভূতের ক্ষমতা নিয়ে বিচার করা যাবে। “

শান্তনু ভৌমিক রেগে বললেন , “আপনার ঠাট্টা আমি ভালোই বুঝতে পারছি অনিমেষ বাবু ,এত ঘটনার পরও আপনার এত অবিশ্বাস ? আমরা কেউ ফিরে না এলেও বোধহয় আপনার মতবদল হত না ! কি বলেন ?”

অনিমেষ সান্যাল বলল ,”আহা ! অবিশ্বাস কে বলল ? আমি শুধু বললাম বিশ্বাস করার আগে জানতে হবে তো কি বিশ্বাস করব ! “

শান্তনু ভৌমিক একইরকম ভাবে রেগে বললেন ,”আমাকে না হয় ডাক্তারবাবু কে তো বিশ্বাস করেন ! ওনাকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন না, কালকের ‘মানুষ’ ড্রাইভারের একবারও চোখের পাতা না পড়ার কি কারণ !”

তিতির বলল ,”পাথরের চোখের যে পাতা পড়ে না শান্তনু আঙ্কেল ।”

শান্তনু ভৌমিক বিস্ময় ভরা স্বরে বললেন , “পাথরের চোখ ?”

সোনাকাকু বলল ,”তিতির ঠিকই বলছে ,কালকের ড্রাইভারের বাদিকের চোখটা পাথরের ছিল।”

শান্তনু ভৌমিক বললেন ,”তা না হয় বুঝলাম কিন্তু ওই ড্রাইভারের ডেথ সার্টিফিকেট আর ব্লু বুকের ছবির সাথে তার মুখের হুবহু মিলের ও নিশ্চই ব্যাখ্যা আছে আপনাদের কাছে ?”

সোনাকাকু বলল , “আছে বৈকি ,যে গাড়িটা উনি কাল রাতে চালাচ্ছিলেন সেটা ওনার নিজের গাড়ি নয় ,ওনার বাবার গাড়ি ,যিনি কয়েকদিন আগে মারা গেছেন , অন্যের থেকে তার বাবার ধার নেওয়া টাকা পয়সার হিসেব মেটাতেই কাল উনি এসেছিলেন ,
প্রমান স্বরূপ নিয়ে আসা তার বাবার ডকুমেন্টসের কপি আপনার চোখে পড়েছিল। “

শান্তনু ভৌমিক বললেন ,”তা ওনার বাবা কি কবরস্থানের কোনো কবরের মালিকের থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন ? “

সোনাকাকু বলল, “কবরের মালিক নয় , ওই কবরস্থানের দেখাশোনা করেন একজন ভদ্রলোকের থেকে , যিনি বহুবছর থেকে ওনার বাবার কাছের বন্ধু,কবরস্থানের ওপাশের দিকে একটা ঝুপড়ি মত ঘরে নিজের পরিবার নিয়ে থাকেন। “

শান্তনু ভৌমিক বললেন ,”সত্যি কথা বলুন তো ডাক্তার বাবু , আপনার কাল এক মূহুর্তর জন্য ভয় লাগেনি ?”

সোনাকাকু বলল ,”লেগেছিল বৈকি ,আপনাকে অজ্ঞান অবস্থায় নিয়ে গাড়িতে ফিরে তিতির আর অনিকে না দেখতে পেয়ে আমি ভয়ে পাগল হয়ে গেছিলাম প্রায় ,আমার ভয়ার্ত চিৎকার শুনেই তো ঝোপের ধারে হিসি করা বন্ধ করে তিতিতের কোলে থাকা অনি কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিল ,সেই দেখে আমাকে কি বকা তিতিরের। তার ৫ মিনিটের মধ্যেই আপনার ‘ভূত’ ড্রাইভার গাড়িতে ফিরে এসে আমাদের কাছে তার অপ্রত্যাশিত দেরীর জন্য বারবার ক্ষমা চেয়েছিলেন। “

শান্তনু ভৌমিক অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বললেন ,”তার মানে কাল রাতের ড্রাইভারকে আপনার সাধারণ মানুষ বলেই মনে হয় ?”

সোনাকাকুর উত্তরের অপেক্ষা না করে তিতির বলল ,” মোটেই না, সোনাকাকুর ওনাকে সাধারণ মানুষ মনে হয়েছে কিনা জানিনা তবে আমার কিন্তু একেবারের জন্যও হয়নি। যে মানুষ রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটা আহত বুনো বিড়ালকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে পারেন ,তারপর ডাক্তারের উপদেশ মত প্রয়োজনীয় শুশ্রুষা করবেন বলে তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন , তিনি আর যাই হোক,আমাদের মত সাধারণ মানুষ তো কিছুতেই নন। “

ফেলুদার যোগ্য বউ

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

“তুই কাকে বিয়ে করবি তিতির ? ” সোনা কাকুর প্রশ্নের উত্তরে গল্পের বই থেকে মুখ না তুলেই তিতির জবাব দিল “ফেলুদাকে !”সোনা কাকু হেসে বলল ” সামনের চায়ের দোকানের ফেলুদা ? ” তিতির মাথাটা দুদিকে নাড়িয়ে বলল “না! সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা !” সোনা কাকু বলল “আচ্ছা , কিন্তু কোন ফেলুদা ? সৌমিত্র চ্যাটার্জী ,সব্যসাচী চক্রবর্তী নাকি আবীর চ্যাটার্জী ? ” তিতির নির্বিকার ভাবে বলল “প্রদোষ মিত্র!” সোনা কাকু এবার আপাত গম্ভীর ভাবে বলল “তোর পছন্দ সত্যি প্রশংসনীয় তিতির ,পাত্র হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়ে আমার কেন, কারোর কোনো সন্দেহের অবকাশ সে রাখেনি কিন্তু তাকে তোর মনের কথা জানিয়েছিস কি ?” তিতির বলল ” না !সরাসরি বলিনি তবে তার প্রত্যেকটা গল্প এভাবে বার বার করে পড়া , বিশেষ করে তার মুখ থেকে বেরোনো কথা গুলো একেবারে মুখস্থ করে ফেলার কারণ আর যার হোক তার মত বুদ্ধিমান মানুষের তো না বোঝার কথা নয় !” সোনা কাকু বলল ” তা সে ও কি তোকে বিয়ে করতে রাজী ?” তিতির নির্বিকার ভাবে বলল ” নাহলে সাতাশ বছর বয়স অব্দি তার কোনো মেয়ে বন্ধু না থাকার কারণ আর কি বা হতে পারে তুমি ই বল সোনা কাকু ?” সোনা কাকু গম্ভীর ভাবে বলল “তা বটে !!”

হঠাৎ সোনা কাকুর ফোনটা বেজে উঠলো। তিতির শুনলো সোনাকাকুর চিন্তিত গলার স্মর “আচ্ছা,আমি নিশ্চই যাব !” তিতির বই টা নামিয়ে রেখে বলল ” কি হয়েছে সোনা কাকু ?” সোনা কাকু বলল “অনন্তের ফোন ছিল ,ওর মাসতুতো বোন নাকি খুব অসুস্থ ,খুব করে বলল আমি যদি পারি তাহলে যেন একবার গিয়ে দেখে আসি !” তিতির বলল ” তা এতে চিন্তিত হবার কি আছে ? এত বড় ডাক্তার তুমি আর অনন্ত কাকু তো তোমার পুরনো বন্ধু!” সোনাকাকু বলল ” না রে তিতির, ব্যাপারটা অত সহজ নয় ,যে অসুখের কথা অনন্ত বলল তার চিকিৎসা ডাক্তারি শাস্ত্রে আছে বলে আমার জানা নেই! তাই আমি গিয়ে কতটা কি করতে পারব সন্দেহ হচ্ছে !” তিতির বলল “মানে ? কি অসুখ ?” সোনাকাকু চিন্তিত মুখে বলল “অনন্তের বোনকে নাকি ভুতে ধরেছে !” তিতির অল্প হেসে বলল ” তাই নাকি ? আমার যে ভূত দেখার ইচ্ছা সেই ছোটবেলা থেকে ,আমাকেও সাথে নিয়ে চলো সোনাকাকু ,রথ দেখা আর কলা বেচা দুই হবে !” সোনাকাকু বলল ” রথ দেখা আর কলা বেচা ? স্কুলে যে কি শেখাচ্ছে তোকে কে জানে ! এই কথা টার মানে তখনি হয় যখন ২ টো কাজ একটা লোকই করে ,আর এখানে আমি করব চিকিৎসা আর তুই দেখবি ভূত ! ” তিতির হেসে বলল “ওই হল ,তুমি আর আমি কি আলাদা নাকি ?” সেই শুনে সোনা কাকু আবার আপাত গম্ভীর ভাবে বলল “বুঝলাম !!”

তিতির আর সোনাকাকু গাড়ি থেকে নেমে একটা বাড়ির সামনে এসে দাড়ালো ,সোনাকাকু বলল “অনন্তের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী এই বাড়িটাই মনে হচ্ছে বুঝলি তিতির ?” সেটা শুনে তিতির দৌড়ে গিয়ে দরজায় আটকানো কলিং বেল টা বাজিয়ে দিয়ে এসে আবার সোনাকাকুর পাশে দাড়ালো।

একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এসে দরজা খুলে বললেন , “ক্ষমা করবেন ,আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না !” সোনাকাকু হাত জোড় করে বলল ” নমস্কার ,আমি Dr. স্বাগ্নিক মুখার্জী ,আর ও হলো তিতির ,আমার ভাইঝি ,আমাকে অনন্ত ফোন করেছিল।” বয়স্ক ভদ্রলোক এবার লজ্জিত হয়ে বললেন ” ও! আসলে আপনার নাম বহুবার শুনলেও কোনদিন চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। অনন্ত আমাদের বলেছিল বটে কিন্তু আপনি যে বাড়িতে আসতে রাজী হবেন তা একবারও ভাবতে পারিনি ! দয়া করে ভিতরে আসুন। “

সোনাকাকুর সাথে যেকোনো জায়গায় গেলে এক অভাবনীয় আতিথেয়তা তিতির আগেও বহুবার উপভোগ করেছে,এটা কতটা আন্তরিক তা নিয়ে সে কোনদিন মাথা ঘামায়নি ,গুনের বা গুনীর আদর সব মানুষই করে বলে তার বিশ্বাস। যদিও সোনাকাকু তাকে বার বার বলেছে “পেটের দায়ে কয়েকটা পুথি পড়া লোক কে কখনোই গুনী বলা চলে না ,গুন হল জন্মগত জিনিস, একেবারে ভিতরের ,যাকে কেবল সময়ের সাথে শানিয়ে নেওয়া যায় !” তবুও তিতিরের চোখে সোনাকাকুই তার দেখা সবচেয়ে গুনী মানুষ।

তিতির সোনাকাকুর সাথে ভদ্রলোক কে অনুসরন করলো ।একটা ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে ভদ্রলোক সোনাকাকুর দিকে তাকিয়ে বললেন “আপনারা একটু বসুন ,রোহিনী মানে আমার ছেলের বউ ওদিকের ঘরে থাকে। আমি একবার ওকে গিয়ে বলে আসি ,তারপর আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি। ” সোনাকাকু বলল ” সে ঠিক আছে কিন্তু তার আগে আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল ! ” বয়স্ক ভদ্রলোক দরজার সামনে থেকে ফিরে এসে বললেন “আমার সাথে ? হ্যা নিশ্চই ! বলুন না। ” সোনা কাকু বলল ” কিছু মনে করবেন না মিস্টার সাহা,আপনার পুত্রবধু কে দেখতে যাওয়ার আগে আমার সবটা জানা দরকার,সব শুনে যদি আমার মনে হয় আমি সত্যি আপনাদের কিছু সাহায্য করতে পারব তাহলেই আমি এগোবো নাহলে শুধু শুধু সকলের মূল্যবান সময় নষ্ট করাতে আমার অমত! ” বয়স্ক ভদ্রলোক এবার সামনের সোফায় বসে বললেন “বুঝতে পারছি। আমি যথা সম্ভব চেষ্টা করব আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে। ” তারপরের কথাবার্তা এরকম :

সোনাকাকু : আমাকে খোলাখুলি বলুন আপনার কেন মনে হয় যে আপনার পুত্রবধুকে ভূতে ধরেছে।

ভদ্রলোক : এটা মাস দুই আগেকার ঘটনা। প্রায় একবছর পর সমীর মানে আমার ছেলের বিদেশ থেকে ফেরার আগের দিন বাজার থেকে জ্যান্ত মাছ কিনে আনা হয়েছিল। কিন্তু অবিশ্বাস্য ভাবে বন্ধ রান্না ঘরে বালতি ঢাকা মাছ পরের দিন সকালে একেবারে ভ্যানিশ যাকে বলে। এর কারণ নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে আবার নতুন মাছ কিনে আনায় পরদিন সকালে সেই একই ঘটনা ঘটল । মানদা হলো আমাদের পুরনো কাজের মেয়ে,সে নাকি ওই দুদিনই রোহিনীকে রান্না ঘরে ঢুকে কাঁচা মাছ খেতে দেখেছিল । শুধু তাই নয় ,তার কথা অনুযায়ী রোহিনী নাকি যখন তখন সামনের পুকুর ধারে ঘুরে বেড়ায় ,আর আশে পাশে কাউকে না দেখলেই পারের ধারে বসে পুকুরের কাঁচা মাছ ধরে খায়। সেদিন আমি মানদার কথায় কান না দিলেও তারপর কিছুদিন মাছ আনা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। হঠাৎ সমীর একদিন আবার সবার জন্য জ্যান্ত মাছ কিনে আনলো বাজার থেকে। সত্যি জানার কৌতুহলে সেদিন রাতে আমি আর আমার স্ত্রী কিছুতেই ঘুমাতে পারিনি। স্ত্রীর সাথে রান্নাঘরের পিছনের উঠোনে দেওয়ালের ধারে লুকিয়ে রান্না ঘরের দিকে চোখ রেখে অপেক্ষা করছিলাম। ক্লান্ত হয়ে প্রায় ঘুমিয়েই পরেছিলাম, কিন্তু মাঝরাতের দিকে রান্নাঘর থেকে আসা আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল ,এখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি স্বাগ্নিক বাবু ,রান্না ঘরে মাছের বালতির দিকে তাকিয়ে যে দাড়িয়ে ছিল ,সে আর কেউ নয় ,আমার পুত্রবধু রোহিনী। বেশ কিছুক্ষণ পর সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলে আমি আর আমার স্ত্রী রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম বালতি তে একটাও মাছ নেই। কিন্তু ছেলের মুখ চেয়ে একথা আমরা আর কাউকে বলতে পারিনি। কিন্তু এরপর যেটা হলো তাতে আর চুপ করে থাকা সম্ভব হলো না। আমাদের বাড়িতে আমার স্ত্রী র নিয়ে আসা সাধের কাকাতুয়া ‘টিটু’ ওই বারান্দায় দাড়ের উপর রাখা থাকতো। গত রবিবার দুপুরে আমাদের এলসেশিয়ান কুকুর রক্সীর চিৎকারে আমাদের ভাত ঘুম ভেঙে গেলে দৌড়ে বাইরে বারান্দায় গিয়ে দেখি ,টিটুর পালক গুলো অবিন্যস্ত ভাবে বারান্দা জুড়ে ছড়িয়ে আছে ,আর হাতে মুখে রক্ত মেখে বসে থাকা রোহিনী প্রাণপণে রক্সীর গলা টিপে ধরার চেষ্টা করছে। সে দৃশ্য একবার দেখলে আপনিও আমাদের মত আর রাতে ঘুমাতে পারতেন না স্বাগ্নিক বাবু। টিটুকে না বাঁচাতে পারলেও রক্সী কে কোনো ভাবে রোহিনীর কবল থেকে ছাড়িয়ে আমরা রোহিনীকে ওপাশের ঘরে নিয়ে গেছিলাম। তারপর থেকেই ওই তালা বন্ধ ঘর থেকে আমরা আর রোহিনীকে বেরোতে দিতে পারিনি ,খুব অসহায় লাগছে নিজেকে কিন্তু আমাদের আর কি বা করার আছে বলুন। ছেলেটার মুখের দিকে তাকাতে পারি না স্বাগ্নিক বাবু,একদিকে লোক লজ্জার ভয় অন্যদিকে এই বিপদ থেকে বের হওয়ার জন্য আকুলি বিকুলি প্রাণ ,আমরা যে কি করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। ইতিমধ্যে গতকাল অনন্ত আসায় লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও ওকে সব খুলে বলেছি। এখন যা আইন কানুন ,হয়তো লোক জানাজানি হলে অনেকেই ভাববে আমরা এসব বানিয়ে বানিয়ে বলছি ,ছেলে বউ কে জব্দ করার জন্য নিজেদের আটা ফন্দি ,কিন্তু বিশ্বাস করুন রোহিনী কে আমরা ভীষণ ভালোবাসি ,ওর মত ভালো মেয়ে আজকাল কার দিনে দেখা যায় না।আপনি যদি ওকে চিকিৎসা করে ভালো করে তুলতে পারেন,আপনার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ থাকবে না! “

সোনাকাকু : হুম বুঝলাম। আপনারা বাড়িতে কজন থাকেন ?

ভদ্রলোক :আমি ,আমার স্ত্রী ,সমীর ,রোহিনী ,সবুজ ,মানদা ,শ্যামচরণ আর রক্সী। সবুজ হল আমার নাতি আর শ্যামচরণও মানদার মত আমাদের অনেক পুরনো কাজের লোক।

সোনাকাকু :আমার সকলের সাথে পরিচয় হওয়া প্রয়োজন। আপনার কথা তো শুনলাম ,বাকিদের মতামতও জানা আবশ্যক। আসলে বুঝতেই পারছেন যে অসুখের কথা আপনি বলছেন সেটা সরানোর ক্ষমতা আমি কেন কোনো ডাক্তারেরই নেই ,তাই আমার জানা দরকার যদি এমন কিছু থেকে থাকে যেখানে আমি আপনাদের একটু হলেও সাহায্য করতে পারবো। তার আগে আপনার পুত্রবধুর সাথে একবার দেখা করতে চাই।

ভদ্রলোক :হ্যা নিশ্চই। আপনারা বসুন। আমি রোহিনী কে বলে আসছি ।

প্রায় ৫ মিনিট বাদে ভদ্রলোক আবার ঘরে এসে আমাদেরকে ওনাকে অনুসরন করতে অনুরোধ করলেন।লম্বা করিডোর পেরিয়ে একটা ঘরের সামনে এসে উনি বললেন “এই ঘরটা ,আপনারা যান ,আমি এখনি আসছি। ” তিতির সোনাকাকুর সাথে ঘরে ঢুকতেই দেখল একজন মাঝ বয়সী ভদ্রমহিলা খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে আছেন। সোনাকাকু বলল “নমস্কার। আমার নাম স্বাগ্নিক মুখার্জী ,আমি অনন্তের বন্ধু। ” ভদ্রমহিলা এবার সোনাকাকুর দিকে ঘুরে অল্প হেসে বললেন , “জানি ,বসুন।” তারপর তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললেন “এই বুঝি তিতির ? অনন্ত দার কাছে আপনাদের অনেক গল্প শুনেছি। ” সোনাকাকু হেসে বলল ” আপনি ঠিক ধরেছেন। ওই আমার ভাইঝি তিতির।” তারপর কিছক্ষন চুপ করে সোনাকাকু বলল “আপনি নিশ্চই জানেন আমি কেন এখানে এসেছি !” ভদ্রমহিলা হেসে বললেন ,”ডাইনীর চিকিৎসা কি আর মানুষের ডাক্তার করতে পারবে ?” সোনাকাকু বললেন ” সত্যি টা আমাকে বলুন রোহিনী দেবী , কথা দিচ্ছি আমি আপনার সাহায্য না করতে পারলে সহনাভূতি দিয়ে বিব্রত করবো না। ” ভদ্রমহিলা বললেন , “আপনি যা শুনেছেন সবই সত্যি। কাঁচা মাছ দেখলে আমি লোভ সামলাতে পারি না , আর টিটুকেও আমি খেয়েছি ,নেহাত সবাই এসে পরেছিল বলে নাহলে রক্সীকেও আপনারা দেখতে পেতেন না।” সোনাকাকু তিতিরের হাত ধরে উঠে দাড়িয়ে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন “নমস্কার ,এখন আমরা আসি ,আবার যদি কখনো আসার সুযোগ হয় নিশ্চই দেখা হবে। “

তারপরে সোনাকাকুর অনুরোধে বাড়ির বাকি লোকজন একে একে ড্রয়িং রুমে এলে তাদের সাথে সোনাকাকুর প্রশ্ন উত্তর পালা এরকম :

সোনাকাকু : আপনার পরিচয় ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : আমি মানদা ,এ বাড়িতে অনেকদিন কাজ করি।
সোনাকাকু :Mr সাহার কথা অনুযায়ী আপনি রোহিনী দেবীকে কাঁচা মাছ খেতে দেখেছেন,সেটা কি সত্যি ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : মিথ্যে কেন বলতে যাবো ডাক্তার বাবু ? একবার নয় বহুবার দেখেছি।
সোনাকাকু : আপনি এখন আসতে পারেন ।

সোনাকাকু : আপনি নিশ্চই Mrs সাহা !
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : হ্যা।
সোনাকাকু :আপনিও কি মনে করেন রোহিনী দেবীকে ভুতে ধরেছে ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা : না মনে করার কোনো উপায় কি সে রেখেছে ? নিজের পেটের মেয়ের মত ভালোবাসি তাকে ডাক্তার বাবু,আপনি যে ভাবে হোক আমাদের এ বিপদ থেকে রক্ষা করুন।
সোনাকাকু : কথা দিতে পারছি না কিন্তু চেষ্টা করব। আপনি এখন আসুন।

সোনাকাকু : আপনি?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক : ডাক্তার বাবু আমি শ্যামাচরণ। আপনি মানদার কথা শুনবেন না ডাক্তার বাবু ,ও খুব মিথ্যে কথা বলে।
সোনাকাকু : তাহলে সত্যি টা কি তুমি জানো ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: তা না জানলেও আমি জানি বৌদিমুনিকে ভুতে ধরতে পারে না। তিনি যে দেবী ,তাকে কি করে ভুতে ধরবে!
সোনাকাকু :দেবী? ঠিক বুঝলাম না। খুলে বল।
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: তা আমি বলতে পারবো না ডাক্তার বাবু কিন্তু আপনি দয়া করে মানদার কথা বিশ্বাস করবেন না।
সোনাকাকু :তুমি এখন এসো।

সোনাকাকু : আপনি নিশ্চই সমীর সাহা ?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক : হ্যা।
সোনাকাকু : আপনার কি ধারণা আপনার স্ত্রী র ব্যাপারে?
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: আমি ভুতে বিশ্বাস করি না ,রোহিনী অসুস্থ ,সঠিক চিকিৎসা হলে সেরে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস।
সোনাকাকু :কিন্তু আপনার স্ত্রী তো আমার সাথে সহযোগিতা করছেন না।
সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক: আমি জানি।ও বরাবরই খুব জেদী। আমি ওকে বোঝাবার প্রানপন চেষ্টা করবো। আপনার ক্লিনিকের ঠিকানা আমি অনন্তের কাছে নিয়ে নিয়েছি,আমি রোহিনীকে নিয়ে সেখানে যাবো।
সোনাকাকু :আচ্ছা ,তাই আসবেন তাহলে।

সোনাকাকু : তোমার নাম কি ?
বাচ্ছা ছেলেটি : সবুজ ।
সোনাকাকু : বাহ্ ,খুব সুন্দর নাম।
বাচ্ছা ছেলেটি চীৎকার করে বলল :আমার মা ডাইনী নয় ,তোমরা সবাই খারাপ।

কথাটা বলেই বাচ্ছা ছেলেটি দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

সোনাকাকু আর কথা না বলে সকলের সামনে হাত জোড় করে বলল : ” ক্ষমা করবেন ,আমার মনে হয় আমি আপনাদের সমস্যায় কিছু সাহায্য করতে পারবো না। “

তারপর তিতিরের সাথে ওই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গাড়িতে উঠে নিজের বাড়িতে পৌছনো অব্দি সোনা কাকু আর কোনো কথা বলল না।বাড়িতে পৌছে স্নান সেরে তিতির সোনাকাকু র ঘরে ঢুকতেই শুনলো সোনাকাকু তার বন্ধু অনন্তের সাথে কথা বলছে ” ঠিক আছে রে ,ভালো থাকিস। “

তিতির বলল “কি হয়েছে সোনাকাকু ?” সোনাকাকু বলল “কিছু না ,ওই অনন্ত কে বললাম আজকের ঘটনা। “

পরদিন সকালে তিতির সোনা কাকুর ঘরে ঢুকে বই এর তাক থেকে একটা গল্পের বই খুঁজছিল ,ঠিক তখনি সোনাকাকুর ফোনটা বেজে উঠলো। সোনা কাকু হেসে বলল “আরে ঠিক আছে ,ধন্যবাদের কি আছে ? আমি তো কিছুই করিনি। ভালো থাকবেন। “

তিতির বলল “কার ফোন ছিল সোনাকাকু ?” সোনাকাকু বলল “সমীর সাহার ,কালকে আবার জ্যান্ত মাছ কিনে আনার পর আসল সত্যি টা উদ্ধার হয়েছে ,কি জানিস তিতির ,সব একটা ভাম বিড়ালের কান্ড। মাছ আর টিটুর সাথে কাকতালীয় ভাবে রোহিনী দেবীও সেই ভামবিড়ালের স্বীকার ,টিটুকে বিড়াল টার কবল থেকে বাঁচাতে গিয়েই যত বিপত্তি,বাড়ির লোকের অবিশ্বাসের শিকার হয়ে তার মত অভিমানী মেয়ের থেকে গতকালের ব্যবহার ই প্রত্যাশিত।

তিতির কে চুপ করে থাকতে দেখে সোনাকাকু বলল “কিরে তিতির ,তোর ভূত দেখা হলো না বলে মন খারাপ ?”

তিতির :”কাল রাতে তুমি কোথায় গিয়েছিলে সোনাকাকু ?”

সোনাকাকু একবার চমকে উঠে তৎক্ষনাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল “ঘুম আসছিল না বলে ছাদে পায়চারী করছিলাম। “

তিতির :আমি নিজে সকালবেলা ছাদের দরজার তালা খুলেছি সোনাকাকু । সে যাই হোক তোমার রাতের খোলা জামাতে বিড়ালের লোমে ভর্তি আর কেমন একটা বোটকা গন্ধ। ভালো করে স্নান করে নাও আর জামাটা নগেন দা কে কাঁচতে দিয়ে দাও।

সোনাকাকু হেসে বলল :তুই কি ভাবছিস বলতো ?

তিতির : সত্যি টা নিজে চোখে দেখার পর আর কিছু ভাবার অবকাশ নেই ।

সোনাকাকু : তার মানে আমি যেটা বললাম সেটা সত্যি নয় বলছিস ?

তিতির :তোমার কথার মধ্যে শুধু একটাই সত্যি ছিল যে রোহিনী সাহা কে ভুতে ধরেনি। বাকি সত্যিটা আমি তোমাকে বলছি।

আমি তোমাকে যা চিনি তাতে ভালো করেই জানতাম সত্যি জেনে তুমি চুপ করে বসে থাকার লোক নয়,কালকে বাড়ি ফেরার সময়ই তুমি ভেবে নিয়েছিলে তোমার পরবর্তী পদক্ষেপ।খুব তাড়াতাড়িতে ছিলে বলেই বোধহয় খেয়াল করনি রাত্রে তোমার গাড়ির পিছু নেওয়া একটা ট্যাক্সিকে।

সোনাকাকু অবাক হয়ে : দেখেছিলাম কিন্তু একবারও ভাবিনি সেটা তুই!

তিতির বলল : এবার না হয় আমাকেই বাকিটা বলতে দাও ,কিছু ভুল হলে শুধরে দিও।

সোনাকাকু হেসে বলল : বল তবে শুনি ! সবসময়ের মত এবারও আমার মিথ্যে বলা সার্থক করে দে।

কালকে সমীর বাবু তোমার কথাতেই বাজার থেকে জ্যান্ত মাছ কিনে রান্নাঘরের বালতিতে ঢেকে রেখেছিলেন আর রাতে ঘুমের ভান করে রোহিনী দেবীর পাশে শুয়েছিলেন। রাত্রি ১২ টা নাগাদ ওখানে পৌছে পাঁচিল টপকে ও বাড়িতে ঢুকে তুমি ওনাদের রান্না ঘরের পিছনের উঠোনে ভুতের কাঁচা মাছ খাওয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলে । রোহিনী দেবী রান্না ঘর থেকে বেরোনোর পরই তুমি অন্যদিকের রাস্তা দিয়ে ওনার পিছু নিলে। একটু দূরে তোমার পিছনে লুকিয়ে থাকা আমিও দেখেছিলাম উনি পুকুরের সিড়ি দিয়ে নামার পর এদিক ওদিক ভালো করে তাকালেন,তারপর শেষ সিড়িতে বসে আচলের তলা থেকে একটা থালা ঢাকা বাটিতে রাখা জ্যান্ত মাছ গুলোকে পুকুরে ছেড়ে দিলেন। …

রোহিনী দেবীকে সিড়ি দিয়ে উঠে আসতে দেখে তুমি এগিয়ে গেলে ,তারপরের কথা বার্তা অনেকটা এরকম :

তুমি :আপনার মাছ খাওয়া হলো ?

চমকে উঠে রোহিনী দেবী বললেন : এতো রাতে আপনি এখানে ?

তুমি :গতকাল সত্যি টা বলে দিলে আমাকে আজ এত রাতে এভাবে আসতে হত না। মাছ গুলো জলে ছেড়ে দিলেন কেন রোহিনী দেবী ?

রোহিনী দেবী:আমার ছেলের জন্য। কোনো জীবকে কষ্ট পেতে দেখলে ও সহ্য করতে পারে না ,রাতে ভয় কান্নায় ওর জ্বর চলে আসে।

তুমি :তাই টিটুকেও বোধহয় সবুজ ই ছেড়ে দিতে গিয়েছিল আর বাঁধন টা ঠিক মত খুলতে না পারায় পা জড়িয়ে গিয়ে টিটু নীচে পরে যায়,আর তখনি রক্সীর থাবা র কিছুটা গিয়ে পরে তার ওপর আর বাকিটা টিটুকে বাঁচাতে যাওয়া আপনার ওপর,রক্সীর থাবার আঁচড়ে বের হওয়া রক্ত মুহুর্তে আপনাকে ডাইনী বানিয়ে দিল।

রোহিনী দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের চোখের জল মুছে বললেন :হ্যা,সেদিন আমি ঠিক সময়ে না পৌছলে আমার ছেলেটাকে সবাই বাড়ি ছাড়া করে ছাড়তো। আমিই টিটুকে বাঁধন থেকে মুক্ত করে দিয়েছি ,টিটুর স্বাধীন হওয়া দেখে সবুজের চোখে মুখে যে খুশির ছবি আমি সেদিন দেখেছিলাম ,জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি তা ভুলতে পারবো না। তাই দেখতে গিয়েই রক্সীর থাবায় টিটুর খসে যাওয়া অবিন্যস্ত পালকগুলো আমি আর সরানোর সময় পায়নি। রক্সীর রাগ সামলানোর জন্যই আমি ওর গলার বকলেস টা আলগা করার চেষ্টা করছিলাম , আর বাবা মা ভাবলো ….

তুমি :সবুজ আপনার নিজের ছেলে নয় তাই তো ? আমি অনন্তের কাছে সব শুনেছি ,দয়া করে আর আমার কাছে কিছু লোকাবেন না।

রোহিনী দেবী: আমার দিদি জামাইবাবু গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার সময় সবুজের বয়স ছিল মাত্র ২ মাস। তারপর থেকে আমাকেই ও মা বলে জানে ,এ বাড়ির আর কেউ না মানলেও আমি জানি যে সবুজ আমারই ছেলে।আর নিজের ছেলের জন্য সব মা যা করে আমিও তাই করেছি ,জীবনের শেষ দিনেও আমি এই ডাইনী অপবাদ নিয়ে আক্ষেপ করবো না।

তুমি :আমি অনন্তের কাছে কৃতজ্ঞ ,ও না থাকলে আপনার মত মায়ের সান্নিধ্য আর এ জীবনে পেতাম কিনা সন্দেহ।

তারপর তুমি এগিয়ে গিয়ে ওদিকের দেওয়ালের পিছনে দাড়িয়ে থাকা সমীর বাবুকে বললে “আপনি নিশ্চই সব শুনেছেন। দয়া করে আমার সাথে একবার গাড়ির কাছে আসুন। ” সমীর বাবু নিঃশব্দে গাড়ি অব্দি তোমাকে অনুসরণ করলে তুমি গাড়ির ডিকি থেকে একটা ফুটো বস্তা বার করে বললে “একে নিয়ে আপনাদের রান্নাঘরে বন্ধ করে রাখুন। এই আপনার স্ত্রীর ওপর লাগানো কলঙ্ক মোচনে সাহায্য করবে। আমার পাড়ার পুরোনো বন্ধু মাত্র একদিনের অনুরোধে একে পাশের জঙ্গল থেকে ধরে দিয়েছে। ভয় নেই ,আমি ঘুমের ইনজেকশন দিয়েই নিয়ে এসেছি ,কাল সকালের আগে এর ঘুম ভাঙবে না।এরপরের ছোট খাটো খটকা গুলো আপনি নিজেই সবার কাছে পরিস্কার করে দেবেন যেমন রাত্রি বেলা পিপাসা পেলে লোকে তো রান্নাঘরেই যাবে নাকি ! আর আমার নিয়ে আসা এই জন্তুটি অনায়াসে আপনাদের রান্নাঘরের খোলা জানলা র ফাঁক দিয়ে গলতে পারবে,তাই স্বাভাবিক ভাবেই বন্ধ দরজা ওর মাছ খাওয়া আটকাতে পারেনি ।”

শুনে সমীর বাবু বললেন : আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দেবো।….

উত্তরে তুমি বললে :সেটা না দিয়ে পারলে রোহিনী দেবীর কাছে ক্ষমা চাইবেন ,আজ আমি যা করলাম তা হয়তো আপনার কাছ থেকে সে আশা করেছিল। কালকে সকালে সব মিটলে একবার ফোন করে জানাবেন। আমি এগোলাম।

সোনা কাকু এতক্ষণ চুপ করে সবটা শুনে হেসে বলল :”তুই সত্যি প্রদোষ মিত্রের যোগ্য বউ,সারা দুনিয়ার থেকে সত্যি লুকাতে পারলেও সোনাকাকু যে বরাবর তার সত্যান্বেষী তিতিরের কাছে এমনি ভাবেই ধরা পরে যায়। “

তিতির হেসে বলল “ফেলুদা আমাকে বিয়ে করতে রাজী না হলেও এখন আর আমার একটুও মন খারাপ হবে না সোনাকাকু,তার মত গোয়েন্দা না হলেও আমার সোনাকাকু তার থেকে অনেক বেশী ভালো মানুষ। “