২৯ বছর বয়সী কলকাতার সনামধন্য ডাক্তার স্বাগ্নিক মুখার্জী রোজকার ব্যস্ত জীবন থেকে ক্ষনিকের মুক্তি পেতে, তার চেয়ে বয়সে খানিক বড় কিন্তু খুব কাছের বন্ধু, ব্যবসা সুত্রে দার্জিলিং নিবাসী অনিমেষ সান্যালের নিমন্ত্রণ স্বীকার করেই নিলেন শেষমেষ। কিন্তু তার নিমন্ত্রণ রক্ষায় যে বাধ সাধলো সে হলো তার চোদ্দ বছর বয়সী আদরের ভাইজি তিতির ,সে বেশী কথায় না গিয়ে সোজাসুজি বলে দিল, “তোমার কাছে আপাতত দুটোই অপসন আছে সোনাকাকু :এক : তুমি দার্জিলিং যাবার নিমন্ত্রণে কোনো রাখ ঢাক না করে সটান না বলে দাও ,দুই :তোমার বন্ধুর সাথে কথা বলে নিজের সাথে আমার নিমন্ত্রণও তার কাছ থেকে আদায় করে নাও। “
সোনাকাকু হেসে বলল ,” যে শান্তি ও স্বাধীনতার লোভে পরে সারাজীবন বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি ,তোর কল্যাণে সে আশার বাটি আমার একেবারেই শূন্য থাকবে চিরকাল তা আমি ভালোই বুঝতে পারছি।”
তিতিরের নিবির্কার উত্তর ” তা সবই যখন জানো তাহলে আর কেন মিথ্যা দেরী করছো ,আমার দেওয়া অপসন দুটোর মধ্যে তাড়াতাড়ি ভেবে নাও কোনটা করবে। “
সোনা কাকু বলল ,” তোর কিন্তু ৩ মাস বাদে পরীক্ষা তিতির ,আবার অঙ্কে কম নম্বর পেলে বৌদি আগের বারের মতই এবারও আমার কানটাই মুলবে ,তাই বলছি একটু মাঝামাঝি কিছু ভাব মানে তোরও রইলো আর আমারও থাকলো গোছের “।
তিতির বলল ” তুমি তো আমাকে অঙ্ক করাচ্ছ এবার ,নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসের এতো অভাব হলে ,কাউকে গরীব মনে হলেই ড্রয়ার থেকে ফ্রি তে ওষুধ না দিয়ে, তাকের বইগুলো তো দিয়ে দিতে পারো ,তোমার ওষুধের দামের চেয়ে ওগুলো বেচে অনেক বেশী টাকা পাবে সে ,আর প্লিস ‘তোরও রইলো আমারও থাকলো’ এসব বাজে বার্গেনিং করতে এসো না আমার কাছে ,এখন নিজে ভুলে গেলেও তুমি ই আমাকে শিখিয়েছো ,যে বারে বারে কথা বদলায় তাকে আর যাই হোক ভদ্র বলা চলে না ।”
সোনাকাকু হেসে বলল ,”তবে চল, আর কি ! আমি অনিমেষকে ফোনে বলে দেব যে নির্দিষ্ট পাহারাদারনী ছাড়া আমার কোথাও যাওয়ার অনুমতি নেই । “
শুক্র বার , রাত্রি ৯:১৫ ,কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস প্রায় ৩ ঘন্টা লেটে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে এসে দাড়াতেই তিতির দেখলো সোনাকাকু জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তার বন্ধু কে খোঁজার চেষ্টা করছে , তিতির কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সোনাকাকু বলল, “মোবাইলে চার্জ নেই ,চার্জার বাড়িতে ভুলে ফেলে এসেছি। “
তিতির হেসে বলল ,” ঠিক আছে ,ট্রেন থেকে নেমে তোমার বন্ধুকে খুঁজে নেওয়া যাবে ক্ষণ ,একি আর হাওড়া স্টেশন !”
তিতির সোনাকাকুর পিছন পিছন ট্রেন থেকে নামতেই একজন ভদ্রলোক হাসিমুখে ওদের দিকে এগিয়ে এলেন। ভদ্রলোক লম্বায় প্রায় ৬ ফুট মতন ,শক্ত চোয়াল, বয়স আন্দাজ ৩৪ এর আশেপাশে ,প্রথম নজরেই নিয়মিত শরীরচর্চার প্রায় সব প্রমান ই দৃষ্টি গোচর হয় ।
ভদ্রলোক তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললেন , “তুমি নিশ্চই তিতির ?” তিতির হেসে “হ্যাঁ” বলতেই ভদ্রলোক বললেন , “তোমার গল্প স্বাগ্নিকের কাছে এত শুনেছি যে তোমাকে কখনো না দেখলেও আজ আমার চিনতে একেবারে অসুবিধা হয়নি। “
তারপর ভদ্রলোক সোনাকাকুকে জড়িয়ে ধরে বললেন ,”তুই ঠিক একইরকম আছিস স্বাগ্নিক,এতদিন পর তোকে দেখে যে কি ভালো লাগছে আমার ,তা বলে বোঝাতে পারব না। “
এতক্ষণে সোনাকাকু ভদ্রলোকের আলিঙ্গনের উত্তর দিয়ে বলল, “কিন্তু আমি যে তোকে ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখতে পেয়েও চিনতে পারিনি রে অনিমেষ ,এতো সুঠাম দেহ কবে বানালি তুই ? আর তোর গোলগাল মুখটাও তো আর নেই। “
অনিমেষ সান্যাল হেসে বললেন ,”কলকাতায় বসে পাহাড়ী জায়গায় থাকার কষ্ট তুই আর কি করে বুঝবি বল ,যাইহোক লম্বা ট্রেন যার্নি তে তোরা নিশ্চই খুব ক্লান্ত ,এখান থেকে দার্জিলিং পৌছতে আরো প্রায় ৩ ঘন্টা লেগে যাবে,আমার গাড়ি স্টেশনের বাইরে রাখা আছে। আর একটা কথা ,আমি তোদের আজ একা নিতে আসিনি কিন্তু, গাড়িতে তোদের জন্য অপেক্ষা করছে আমার স্ত্রী মিতা ,আমাদের ২ বছরের ছেলে অনি ,আর আমার পি.এ. শান্তনু ভৌমিক ।”
সোনাকাকু বলল ,”করেছিস কি ?আমাকে তো সেলেব্রিটি বানিয়ে ছাড়লি একেবারে”।
উত্তরে অনিমেষ সান্যাল হেসে বললেন “এতে আমার দোষ নেই স্বাগ্নিক ,সুস্থ পত্রিকায় নিয়মিত তোর লেখা বেরোনোর ফলে এই পাহাড়ী অঞ্চলেও তুই কলকাতার মতই জনপ্রিয় । আসলে কি জানিস ,মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাঁচার ইচ্ছাটাও যে দ্বিগুন হারে বাড়তে থাকে আর সে ইচ্ছাপূরণের জাদুকর হয়ে ওঠে তোর মতই খ্যাতনামা ডাক্তারদল। তাই ডাক্তারী থেকে বিশ্রাম নিতে তোর মনে হয় অন্য কোনো জায়গা বাছা উচিত ছিল ,শান্তনু বাবু কিন্তু তার হাঁটুর ব্যথার যাবতীয় চিকিৎসার প্রেসক্রিপসন আজকেই সাথে নিয়ে এসেছেন তোকে দেখাবে বলে। “
সোনা কাকু বলল “হাঁটুর ব্যথা ? কিন্তু আমি তো হার্টের … !”
সোনা কাকুর কথা শেষ না হতেই অনিমেষ সান্যাল বললেন ,”আমি জানি ,ওনাকে বলেও ছিলাম ,কিন্তু উনি শুনে বললেন ‘এত বড় ডাক্তার যখন শুধু কি হার্টেই আটকে আছে ভেবেছেন ,হাঁটু পেরিয়ে পায়ের গোড়ালিতেও নিশ্চই পৌঁছে গেছেন হবে ।হ্যাঁ, হার্টের উপরেও অনেক যন্ত্রপাতি আছে আমি জানি ,কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ বলেও তো কিছু হয় নাকি ! ‘।” কথাটা শুনে সোনাকাকু আর তিতির দুজনেই সজোরে হেসে উঠলো ।
তিতির সোনাকাকুর পাশাপাশি অনিমেষ সান্যাল কে অনুসরণ করলো ,স্টেশনের বাইরে দাড়ানো একটা ইনোভা গাড়ির সামনে এসে অনিমেষ সান্যাল সোনাকাকুকে বললেন, “এই যে ,এই গাড়িটা। ” সম্ভবত তাকে দেখতে পেয়েই গাড়ি র পিছনের সীট থেকে হাসিমুখে নেমে এলেন একজন ভদ্রমহিলা আর সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক। রাতের অন্ধকারেও বেশ বোঝা যাচ্ছে ভদ্রমহিলাকে ডাকসাইটে সুন্দরী বললেও কম বলা হবে ,আর তার সামনে মাঝ বয়সী ভদ্রলোকের বেঁটে খাটো মোটা চেহারা কেমন যেন ভগবানের ভারসাম্য রক্ষার অভাবনীয় নিদর্শন বলেই মনে হয়।
সোনাকাকুকে দেখে ভদ্রমহিলা হেসে বললেন ,”নমস্কার স্বাগ্নিক বাবু ,আমি মিতা সান্যাল,আপনার খ্যাতি অন্য কাউকে আপনার পরিচয় দেবার অবকাশ দেয় না ,আর আপনার বন্ধুর মুখে তিতিরের গল্প এত শুনেছি ,আমি তো ভেবেই নিয়েছি ওর বুদ্ধির কিছুটা আমার ছেলেটার জন্য ধার নেব ।”
সোনাকাকু হেসে বলল ,”সে নেবেন না হয় ,আমি তো ওর কাছ থেকে বুদ্ধি আর সাহস দুটোই ধার নিয়ে থাকি !”
তিতির রেগে বলল ,”সোনাকাকু এটা কিন্তু কথা ছিল না ,পাহাড়ে এসেও তুমি কলকাতার মত দলভারী করছো। “
অনিমেষ সান্যাল হেসে মাঝ বয়সী ভদ্রলোকের দিকে ঘুরে বললেন ,” স্বাগ্নিক আরেকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দি, ইনি হলেন শান্তনু ভৌমিক ,আমার ব্যবসার হিসেব নিকেশ সব ওনার দায়িত্বে ।”
শান্তনু ভৌমিক হেসে বললেন ,” হে হে ,মানে ওই একটা জিনিসই আমি পারি কিনা, ‘হিসেব’ ,আর ঠিক সেই জন্যই তো আজ আপনার সাথে দেখা করতে আসা ,এই হাঁটুর ব্যথায় সারা জীবনে যা হয়নি তাই হচ্ছে ডাক্তার বাবু ,হিসেবে আমার ভুল হচ্ছে প্রায়।”
অনিমেষ সান্যাল বেগতিক বুঝে এগিয়ে এসে বললেন ,”ওসব পরে হবে শান্তনু বাবু, একে ট্রেন লেট হওয়ায় এখন প্রায় ১০ টা বেজে গেছে ,বাংলো তে পৌছতে আরো ঘন্টা তিনেক লাগবে , অনিও দেখছি গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছে ,আর দেরী না করে চটপট গাড়িতে উঠে পড়াই ভালো,বাকি গল্প রাস্তায় যেতে যেতে হবে না হয় । “
গাড়িতে প্রায় ১ ঘন্টা পেরিয়ে গেলো ,গাড়ির ঘড়িতে চোখ যেতেই তিতির দেখল ১১ টা বাজতে ৫ মিনিট বাকি। রাত্রে বাইরের সৌন্দর্য উপভোগ করার কোনো উপায় নেই তবুও সকলের সাথে বিভিন্ন এলোমেলো গল্পে তার ক্লান্তি টাও কেমন যেন ক্রমশঃ দূর হয়ে যাচ্ছে ।পাহাড়ী রাস্তায় রাত্রে গাড়ি চালানো বেশ শক্ত তবুও স্টিয়ারিং র পিছনে অনিমেষ সান্যালের দক্ষ হাত সেটা এতক্ষণ কাউকে মালুমই হতে দেয়নি। হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে অজানা কারণে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ গাড়িতে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট করার ব্যর্থ চেষ্টা করার পর ,বাকি সকলকে গাড়ির ভিতরেই বসে থাকতে অনুরোধ করে অনিমেষ সান্যাল নিজে গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন ,তার অনুরোধ উপেক্ষা করে সোনাকাকুও গাড়ি থেকে নেমে পড়ল, প্রায় আধঘন্টা চেষ্টা করার পরও যখন কিছুই ফল হলো না তখন সকলের কপালেই চিন্তার ভাজ দেখা দিল। এত রাতে এই নির্জন পাহাড়ী রাস্তায় একদিকে যেমন কোনো গাড়ির দেখা পাওয়া মুশকিল অন্যদিকে ফোনে নেটওয়ার্ক ও আসছে না যে সাহায্যের জন্য কাউকে ফোন করা যাবে। রাত বাড়ার সাথে সাথে স্বাভাবিক নিয়মেই পাহাড়ে ঠান্ডা টা ও ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে,গন্তব্যের দূরত্ব পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা কোনো মতেই সম্ভব না জেনে অবস্থার প্রতিকূলতা আরো বেশী জটিল হয়ে উঠলো । অনি তার মায়ের কোলে মাথা রেখে এখনো ঘুমিয়েই আছে ,গাড়ির আলো জ্বালাতে তিতির লক্ষ্য করলো অনির মুখের আদল একেবারে তার মায়ের মতন , এখন অনি জেগে থাকলে সমস্যা টা আরো কত কঠিন হয়ে যেত সকলের জন্য, সেটা ভেবে তিতির মনে মনে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
এরকম অসহায় পরিস্থিতে শান্তনু ভৌমিক হঠাৎ বললেন ,”রাত বারোটা তো প্রায় বাজতে গেল ,বিপদ মুক্তির কোনো আশাই তো দেখছি না মশাই !”
অনিমেষ সান্যাল হালকা ভাবে বললেন ,”রোজ ই তো বাড়িতে ঘুমান ,আজ না হয় আমার গাড়িতেই ঘুমালেন,এটাকে হাওয়া বদল না বলা গেলেও বিছানা বদল বলে নিশ্চই চালানো যাবে। “
শান্তনু ভৌমিক বললেন ,” সেটা না মশাই ! এক রাত কেন ,অনেক রাত ই আমি না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে পারি ,কিন্তু এই জায়গাটা খুব একটা সুবিধের নয় বুঝলেন কিনা! তার ওপর সাথে ছোট বাচ্ছা আছে বলেই চিন্তা টা আরো বেশী হচ্ছে !”
অনিমেষ সান্যাল কিছু বলার আগেই সোনা কাকু বলল ,”ঠিক বুঝলাম না শান্তনু বাবু, এখানে চোর ডাকাতের উপদ্রব আছে বলে আপনি জানেন নাকি !”
শান্তনু ভৌমিক এবার আওয়াজ নীচু করে বললেন ,”না না মশাই , চোর ডাকাতের ভয় আমার মতন ছাপোষা লোক কেন পাবে বলুন ! এটা হলো যাকে বলে একেবারে তেনাদের রাজত্ব ,অনেক গল্প শুনেছি কিনা ,তাই বলছিলাম।”
তিতির তা শুনে বলল ,”ভূত ? সত্যি ভূত মানে চোখে দেখা যায় এমন ভূত ?”
সোনাকাকু গম্ভীর ভাবে বলল ,”এরমধ্যে অনি উঠে গেলে কিন্তু আরো মুশকিল বাড়বে, পাহাড়ী ভূত ঘুমপাড়ানি গান জানে কিনা আমার কিন্তু জানা নেই। ” কথা টা শুনে শান্তনু ভৌমিক ছাড়া বাকিরা সকলে হেসে উঠলো।
হঠাৎ একটু দূরে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখতে পেয়ে অনিমেষ সান্যাল আর সোনাকাকু দুজনেই তৎক্ষনাৎ রাস্তায় নেমে গাড়িটা থামানোর জন্য হাত দেখাতে লাগলো ,অপ্রত্যাশিত হলেও গাড়িটা সত্যি ওদের সামনে এসে থেমে গেল।
অনিমেষ সান্যাল গাড়িটার অল্প খোলা জানলার কাঁচের কাছে মুখ নামিয়ে বললেন ,” স্টেশন সে ওয়াপসি কে টাইম অচানক গাড়ি খারাপ হো গয়া হামারা ,সাথমে ছোটা বাচ্ছা হ্যয় ,ইতনে রাত মে ইহা কিসিকা মদত মিলনা মুশকিল হ্যয় ,আগার আপ মেরে ফ্যামিলি কো দার্জিলিং মে মেরে বাংলো তক ছোড় দেনগে ,হাম আপকা বহুত বহুত আভারী হোঙ্গে , হাম পয়সা দেনে কে লিয়ে ভি তৈয়ার হ্যয় , থোড়া মদত কর দিজিয়ে প্লিস ভাইসাহাব । “
গাড়ির ড্রাইভার উত্তরে বলল ,”হা জরুর ,বৈঠ যাইয়ে। “
গাড়িটা ছোট হওয়ায় ৪ জনের বেশী ধরা সম্ভব ছিল না তাই বোধ হয় অনিমেষ সান্যাল তার স্ত্রী কে বললেন , “এভাবে মাঝ রাস্তায় গাড়ি রেখে আমার যাওয়া টা ঠিক হবে না,তুমি বাকিদের নিয়ে বাড়ি পৌছে সীতারাম আর ডমরু কে অন্য গাড়িতে এখানে পাঠিয়ে দাও ,খুব বেশী কিছু না বিগড়ালে ওরাই ঠিক করে দিতে পারবে নাহলে সকাল অব্দি অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই ,এত রাতে মেকানিক খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ই বলা চলে । সে যাইহোক আপাতত তোমাদের ঠিকমত বাড়ি পৌঁছানো আগে দরকার। আমার কত অনুরোধের পর স্বাগ্নিক এখানে এসেছে, আমার আরো সাবধানতা নেওয়া উচিত ছিল ,এভাবে ক্লান্ত শরীরে নিয়ে আমার দোষেই ওদের এই বিপত্তি হল ,ভাগ্যিস ভদ্রলোক আমাদের সাহায্য করতে রাজি হল নাহলে যে কি হত ! “
সোনাকাকু কিছুতেই রাজি না হওয়া সত্বেও সকলের বার বার অনুরোধে শেষমেষ একটা শর্ত রেখে গাড়িতে উঠে বসলো সেটা হলো বাকিদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সীতারাম আর ডমরু র সাথে সোনাকাকুও আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে ফিরে আসবে । গাড়ির পিছনের সীটে তিতির আর সোনা কাকুর সাথে কোলে ঘুমন্ত অনিকে নিয়ে বসলেন মিতা সান্যাল ,আর সামনে ড্রাইভারের পাশের সীটে বসলেন শান্তনু ভৌমিক। অন্ধকার টা এত গাঢ় হয়ে এসেছে যে তিতির চেষ্টা করেও ড্রাইভারের মুখ দেখতে পেল না ,আপাদমস্তক শীত পোশাকে ঢাকা চেহারার আন্দাজ করাও বেশ অসম্ভব বলেই মনে হলো তার। গাড়িতে বসেই একটা বোঁটকা গন্ধ নাকে এলো তিতিরের ,সোনা কাকুর দিকে তাকিয়ে সেটা বলতে যাওয়ায় সোনা কাকু মুখে আঙুল দেখিয়ে ঘুমিয়ে থাকা অনির দিকে ইঙ্গিত করল।
গাড়ি কিছুক্ষণ চলার পর শান্তনু ভৌমিক ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বললেন “আপকো পাতা হ্যয় হামলোগ কিধার জায়েনগে ,মতলব বিনা পাতা পুছে হি আপ ইতনে দূর চলা আয়া। “
ড্রাইভার ভাঙা গলায় উত্তর দিল ,”দার্জিলিং পাহৌচকে পাতা জরুর পুছেঙ্গে ,ইধার রাস্তা ঠিক নাহি হ্যয় ,ইসিলিয়ে ধীরে যানা পর রাহা হ্যয়।”
শান্তনু ভৌমিক উত্তরে শুধু বললেন “ও ” ।
আরো প্রায় পনেরো মিনিট বাদে ড্রাইভার হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে বলল ,”আপলোগ থোড়া বৈঠিয়ে,ম্যয় আভি আয়া। ” গাড়ি থেকে নেমে সামনে একটা গেট দিয়ে তাকে ভিতরে ঢুকতে দেখা গেল।
শান্তনু ভৌমিক এবার পিছনে ঘুরে সোনাকাকুকে বললেন ,”এভাবে অচেনা লোকের গাড়িতে ওঠা আমাদের মোটেই উচিত হয়নি, ড্রাইভারের ভাবগতিক আমার মোটেই সুবিধার লাগছে না ডাক্তার বাবু। “
মিতা সান্যাল ও সাথে সাথে বলে উঠলেন ,”সত্যি কথা বলতে আমারও শুরু থেকেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে,আপনারা পেয়েছেন কিনা জানিনা ,গাড়িতে উঠে একটা বোঁটকা গন্ধে প্রথমে তো আমার বমি এসে গিয়েছিল ,এতটা রাস্তায় শান্তনু বাবুর কথার উত্তর ছাড়া একটা শব্দ আর ড্রাইভার টার মুখ থেকে বেরোয়নি ,আর এখন নামার আগে যা একটু আবার বলল ।”
তিতির কিছু বলতে যাওয়ায় সোনাকাকু ওর হাতের পাতা চেপে ধরলো ,তিতির ইঙ্গিত টা বুঝতে পেরেই আর কিছু বলল না।
সোনাকাকু বলল ,” কই আমি কোনো গন্ধ পাই নি তো” তারপর তিতিরের হাতে হালকা চাপ দিয়ে জিজ্ঞেস করলো “কিরে তিতির তুই পেয়েছিস নাকি ?”
তিতির উত্তর দিল ,” না ,আমিও কিছু পাইনি ।”
সোনাকাকু বলল ,” আমার মনে হয় ,আপনারা মিথ্যা ভয় পাচ্ছেন ,আমরা বাঙালী জেনেই বোধহয় ড্রাইভার ভদ্রলোক কোনো কথা বিশেষ বলছেন না ।”
শান্তনু বাবু বললেন ,” নাক বন্ধ থাকায় বৌদির মত কোনো গন্ধ আমি পাইনি ঠিকই, কিন্তু ডাক্তার বাবু ব্যাপারটা একেবারেই আমার স্বাভাবিক ঠেকছে না । “
সোনাকাকু বলল , “ঠিক বুঝলাম না শান্তনু বাবু ,কি আবার আপনার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকলো !”
শান্তনু ভৌমিক এবার গলা নামিয়ে পিছনে ঘুরে ফিসফিস করে বললেন ,” আমি হেডলাইটের আলোতে পরিস্কার দেখেছি, ড্রাইভারের চোখের পাতা একবারও পড়ছে না। আপনি তো ডাক্তার ,আপনি বলুন তো কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কতক্ষনই বা চোখের পাতা না ফেলে থাকা সম্ভব ? “
মিতা সান্যাল ভয়ার্ত স্বরে বললেন ,” সেকি ? বোঁটকা গন্ধ আর ওরকম ভাঙা গলার আওয়াজ শুনে আমার প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিল ,এখন আমরা কি করব স্বাগ্নিক বাবু?”
সোনাকাকু বলল , “আহা ! ওত ব্যস্ত হবেন না বৌদি ,শান্তনু বাবুর দেখার ভুলও হতে পারে ,আগে আমাদের জানা দরকার আমরা এখন কোথায় আছি ,গন্তব্যে পৌঁছতে আর কত সময় লাগবে,শান্তনু বাবু আপনার হাতে তো ঘড়ি আছে ,একটু সময় টা দেখে বলুন না।”
শান্তনু বাবু বললেন, “আপনি তো আমার কথা বিশ্বাসই করছেন না , আমার ঘড়ির সময় টাও ভুলই বলবেন নিশ্চই। “
সোনাকাকু বলল,” আপনি ভুল ভাবছেন শান্তনু বাবু , ব্যাপারটা বিশ্বাস অবিশ্বাসের নয় , আপনার কথা সত্যি হলেও আমরা তো এই গাড়ি থেকে এখনি নেমে যেতে পারবো না ,তাই মিথ্যা উদ্বেগ বাড়িয়ে কি লাভ আছে বলুন, আমাদের এখন একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গন্তব্যে পৌঁছানো ,সেজন্যই আপনাকে ঘড়িতে সময় দেখতে অনুরোধ করলাম ,রাস্তা জানিনা ঠিকই কিন্তু সময় জানতে পারলে আর কতক্ষণের রাস্তা বাকি তার একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। “
শান্তনু বাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একেবারে স্থির হয়ে গেলেন ,তাকে কিছু না বলতে দেখে সোনা কাকু বলল , “কি হল? অন্ধকারে বুঝি আপনার ঘড়ি দেখতে অসুবিধা হচ্ছে ?”
শান্তনু বাবু কোনরকমে ঢোক গিলে বললেন ,” সময় এগোচ্ছে না ডাক্তারবাবু,গাড়িতে ওঠার সময় যা ছিল এখনো তাই ,কাটায় কাটায় সাড়ে বারোটা। “
সোনা কাকু বলল , “আপনার ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে শান্তনু বাবু ,অন্যকিছু ভাবার এখানে কোনো অবকাশ নেই। “
মিতা সান্যাল একইরকম ভয়ার্ত স্বরে বললেন ,”আমার শরীর টা একদম ভালো লাগছে না স্বাগ্নিক বাবু ,গা টা খুব গোলাচ্ছে ,বমি হবে মনে হয়,আপনাদের কাছে কোনো প্লাস্টিক হবে? এই অবস্থায় আমি গাড়ির থেকে নামতে একদম সাহস পাচ্ছি না ।”
সোনাকাকু বলল ,”আমার আর তিতিরের ব্যাগ তো অনিমেষের গাড়িতেই রয়ে গেছে ” তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে বলল ” শান্তনুবাবু এদিক ওদিক একটু হাতড়ে দেখুন না ,ড্রাইভার নিজের প্রয়োজনে অনেক সময় কিছু জিনিস রেখে থাকতে পারে ।”
শান্তনু বাবু জবুথবু অবস্থা কোনরকমে কাটিয়ে প্লাস্টিক খুঁজতে তৎ পর হলেন, ড্রাইভারের সীটের সামনের ড্যাসবোর্ডে একটা প্লাষ্টিক হাতে লাগায় উনি বললেন ,
“পেয়েছি একটা ,কিন্তু খালি প্লাস্টিক নয় ,কিছু কাগজ পত্র আছে।” তারপর পকেট থেকে একটা টর্চ বার করে প্লাস্টিকের কাগজ গুলো নিজের কোলের উপর রেখে পিছনে ঘুরে মিতা সান্যালের হাতে খালি প্লাস্টিক টা দিলেন ।
মিতা সান্যাল পাশে বসা তিতিরকে বললেন ,”তিতির একটু অনি কে ধরতে পারবে?”
তিতির বলল “কেন পারবো না ? আপনি আস্তে করে ওকে আমার কোলে দিয়ে দিন, আমি নিতে গেলে অচেনা হাতের ছোঁয়ায় ওর ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে। “
তিতিরের কথা মত অনিকে তার কোলে দিয়ে মিতা সান্যাল প্লাস্টিক টা হাতে নিয়ে বমি করতে যাবেন ঠিক তখনি শান্তনু ভৌমিক বললেন, ” ডাক্তারবাবু !” ভয়ে তার গলার আওয়াজ একেবারে শুকিয়ে গেছে।
সোনাকাকু বলল, “আবার কি হলো শান্তনু বাবু ? “
শান্তনু ভৌমিক একইরকমভাবে ভয় জড়ানো স্বরে বললেন ,”আর সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই ,গাড়ির ব্লু বুকে লেখা নামের সাথে আমার হাতের ডেথ সার্টিফিকেটের নামের হুবহু মিল ,তাছাড়াও ছবির সাথে ড্রাইভারের মুখেরও কোনো অমিল দেখছি না ,আমার কথা বিশ্বাস না হলে নিজের চোখেই দেখুন। “
কথাটা বলে শান্তনু ভৌমিক হাতের কাগজ গুলো আর টর্চ টা পিছনে ঘুরে সোনাকাকুর হাতে দিলেন । সোনাকাকু টর্চ জ্বালিয়ে কাগজ গুলোতে চোখ বোলাতে শুরু করতেই মিতা সান্যালের মুখ থেকে বেরোনো গোঁ গোঁ শব্দে ব্যস্ত হয়ে তিতিরকে বলল ,” কি রে ? কি হল বৌদির ?”
ঘুমন্ত অনিকে কোলে নিয়ে তিতিরের নড়ার মত অবস্থা ছিল না , সে বলল , ” আমি দেখতে গেলে অনি উঠে যাবে সোনাকাকু ,মনে হচ্ছে শান্তনু আঙ্কেলের কথা শুনে মিতা আন্টি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। “
সোনাকাকু তাড়াতাড়ি টর্চ টা মিতা সান্যালের মুখের ওপর ধরায় বুঝতে পারলো তিতিরের আশঙ্কাই সত্যি। ডাক্তার বলেই হয়তো এখনকার অসহায় অবস্থাটা আরো বেশী অসহ্য হয়ে উঠলো তার কাছে ,তাও তিতিরকে সাবধানে টপকে মিতা সান্যালের কপালে হাত দিয়ে দেখে সোনাকাকু বলল , “না ,গা ঠান্ডাই আছে ,একটু জল দিলেই জ্ঞান টা ফিরে আসবে বলেই আমার মনে হয় ,কিন্তু গাড়িতে জল আছে কিনা সেটা দেখতে হবে।”
সোনাকাকু নিজের দিকের দরজাটা খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে খানিক বাধ্য হয়েই নিজের সীট থেকে উঠে দাড়িয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, “শান্তনু বাবু আপনি আরেকবার যদি দয়া করে ওদিকটা দেখেন ,গাড়িতে একটা জলের বোতল নিশ্চই থাকার কথা ।”
শান্তনু ভৌমিক রামনাম জপ বন্ধ করে ,শুধু সোনাকাকুর অনুরোধ রাখতেই বোধহয় জলের খোঁজে হাত পা এদিক ওদিক নাড়তে লাগলেন। হঠাৎ ওনার ‘বাবারে !’ বলে ভয়ানক চিৎকারে সোনাকাকু চমকে উঠে বলল ,”কি হল শান্তনু বাবু ?”
শান্তনু ভৌমিক কিছু বলার মত অবস্থায় ছিলেন না , অন্ধকার টা এতক্ষণে চোখ সওয়া হয়ে গেছিল বলেই সোনাকাকু বুঝতে পারলো উনি আঙ্গুল নির্দেশ করে সোনাকাকুকে কিছু দেখানোর চেষ্টা করছেন , সোনাকাকু সেই দিকে তাকাতেই দেখতে পেল ড্রাইভারের সিটের তলায় ২ টো চোখ জ্বলজ্বল করছে ।
সোনাকাকু ক্ষনিকের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় বোধ করলো ,হঠাৎ তিতিরের হাতের হ্যাঁচকা টান আর তাকে ওভাবে দাড়িয়ে থাকতে দিল না। সোনাকাকুর কানের কাছে মুখ টা নিয়ে গিয়ে তিতির বলল , ” বোঁটকা গন্ধটা খুব চেনা লেগেছিল আমার, অনেকটা রোহিনী সাহার কলঙ্কমোচনে তোমার দেওয়া ভাম বিড়ালের গায়ের গন্ধের মত (বিস্তারিত জানতে পড়ুন ‘ফেলুদার যোগ্য বউ ‘ গল্পটি “) সেটাই তখন তোমাকে আমি বলার চেষ্টা করছিলাম ,সামনের সীটের তলায় জন্তুটি এর আগেও কয়েকবার নড়াচড়া করেছে , আমি ইচ্ছা করেই পা টা এগিয়ে রেখেছিলাম ,তাই মিতা আন্টি র পা অব্দি না পৌছে বার বার আমার পায়েই তার লোমের ঘষা লেগেছে।”
সোনাকাকু আবার সীট থেকে উঠে শান্তনু ভৌমিকের দিকে ঝুঁকে বলল ,”ভয় পাবেন না শান্তনু বাবু ,ওটা বিড়াল বৈ আর কিছু না। ” শান্তনু ভৌমিকের অবস্থা যে শোচনীয় সেটা বুঝতে পেরে কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই সোনাকাকু আবার বলল ,”আপনি দরজাটা খুলে গাড়ি থেকে আস্তে আস্তে নামতে চেষ্টা করুন। ” এরপরও শান্তনু ভৌমিক কে একইভাবে বসে থাকতে দেখে সোনাকাকু নিজের দিকের দরজাটা বার বার ধাক্কা দিয়ে খোলার চেষ্টা করতে লাগলো।
অনির ঘুমটা ভেঙ্গে যেতে দেখে তিতির বলল , ” আস্তে সোনাকাকু ! ওটা মনে হয় খোলে না ,ঢোকার সময় তো আমরা তাড়াতাড়ি তে ওদিকের দরজা দিয়ে সবাই পর পর ঢুকে পড়লাম ,আমি অনিকে নিয়ে পিছনে সরছি ,তুমি ওই পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাও ,মিতা আন্টি র মাথাটা আমার কাঁধে রেখে দিয়ে তুমি সাবধানে নেমে যাও। “
সোনাকাকু তিতিরের কথামত গাড়ি থেকে নেমে সামনের সীটের দরজাটা খুলে বলল, ” গাড়ি থেকে নেমে আসুন শান্তনু বাবু ,আমি আছি, আপনার কোনো ভয় নেই। “
এতক্ষণ পাথর হয়ে বসে থাকা শান্তনু ভৌমিক নিজের হাতটা কোনরকমে সোনাকাকুর দিকে বাড়ালো ,ওনার হাতটা ধরে সোনাকাকু বুঝতে পারল এত ঠান্ডাতেও শান্তনু ভৌমিক ঘেমে জল হয়ে গেছেন,ওনাকে ধরে গাড়ি থেকে নামাবার পর সোনাকাকু পকেট থেকে টর্চ টা বের করে সামনের সীটের দিকে ফেলতেই দেখতে পেল একটা কালো লোমশ বেড়াল আলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, শান্তনু ভৌমিকের থেকে সে দৃশ্য আড়াল করতেই সোনাকাকু তাড়াতাড়ি টর্চ টা নিভিয়ে দিলেন, তারপর চোখ বুজে দাড়িয়ে রামনাম জপ করা শান্তনু ভৌমিকের দিকে তাকিয়ে বললেন ,”আপনি আমার সীটে গিয়ে বসুন, আমি একটু এগিয়ে দেখি কাউকে পাই কিনা ,এভাবে আর কতক্ষণ ই বা ড্রাইভারের ফিরে আসার ভরসায় বসে থাকা যাবে ! আমরা না পৌঁছাতে পারলে অনিমেষ কেও সারা রাত্রি গাড়িতে বসেই কাটাতে হবে ,তাই আর দেরী করবেন না ,চটপট পিছনের সীটে উঠে বসে পড়ুন ।”
শান্তনু ভৌমিক সোনাকাকুর হাত চেপে ধরে কোনরকমে বললেন , ” আমিও আপনার সাথে যাবো , আমি এভাবে একা কিছুতেই……”
সোনাকাকু বলল ,” একা কোথায় ? তিতির ,অনি ,বৌদি সবাই তো গাড়িতে ,আর ওদেরকে এভাবে একা ফেলে আমাদের দুজনের যাওয়া টা ঠিক হবে বলে আমার মনে হয় না ।”
তিতির গাড়ির কাঁচ টা অল্প নামিয়ে বলল , “তোমরা যাও সোনাকাকু ,আমি গাড়িতে আছি ,অনি আর মিতা আন্টির কিচ্ছু হবে না,সে দায়িত্ব আমার। এখানে দাড়িয়ে যত দেরী করবে ,সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। “
সোনাকাকু নিরুপায় হয়ে বলল ,” দরজা দুটো ভালো করে লক করে দে ,আর আমি না আসা পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই জানলার কাঁচ খুলবি না । আমি সামনেই যাচ্ছি, এখনি চলে আসবো ,কোনো বিপদের আঁচ পেলে ই আমাকে ডাকবি বুঝলি? নিজে পাকামি মেরে সামলাতে যাবি না। “
তিতির মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে সোনাকাকু সামনে এগিয়ে গেল ,শান্তনু ভৌমিকও ছায়ার মতন তার পিছু নিল ,যে গেট টা দিয়ে ড্রাইভার কে ঢুকতে দেখা গিয়েছিল, সেই গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই সোনাকাকু নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারল না ,নিজের মনেই বলে উঠলো “এটা তো কবরস্থান,তার মানে কি বাকিদের আশঙ্কা ই …….”
হঠাৎ আওয়াজে পিছনে ঘুরে তাকাতেই সোনাকাকু দেখলো শান্তনু ভৌমিক মাটিতে পড়ে আছেন , নিচে বসে তার দিকে ঝুঁকতেই সোনাকাকু বুঝলো শান্তনু ভৌমিকও এবার জ্ঞান হারিয়েছেন। কোনরকমে ওনাকে উঠিয়ে নিজের কাঁধে ভর দিইয়ে গাড়ির সামনে এসে দরজা খুলতেই সোনাকাকু দেখল মিতা সান্যাল অচৈতন্য অবস্থায় একা বসে আছেন গাড়িতে। দ্রুত শান্তনু ভৌমিক কে গাড়িতে বসিয়ে সীটবেল্ট আটকে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল সোনাকাকু ,তারপর একটা অজানা ভয়ের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে চিৎকার করে উঠলো “তিতির!”
শনিবার সকাল ১০ টা , অনিমেষ সান্যালের বাড়িতে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে আছে সোনাকাকু ,তিতির ,অনি ,মিতা সান্যাল ,শান্তনু ভৌমিক আর অনিমেষ সান্যাল নিজে।
শান্তনু ভৌমিক কৃতজ্ঞতাপূর্ণ স্বরে বললেন ,” আজকের দিনটা আমাদের পুনর্জন্মের প্রথম দিনও বলা চলে ,আপনি যে কিভাবে সেই ভয়ানক অবস্থা থেকে আমাদের বাঁচিয়ে ফেরৎ আনলেন সেটা না জানতে পারলে যে মরেও শান্তি পাবো না ডাক্তারবাবু ।”
অনিমেষ সান্যাল হেসে বললেন ,”আমি কিন্তু এই কৃতজ্ঞতার লিস্ট থেকে বাদ স্বাগ্নিক, আমাকে ডমরুর খোঁজা মেকানিক বাঁচিয়েছে ,তুই ডমরুকে নিয়ে না গেলেও গাড়িতে আমার বেশ ভালোই ঘুম হচ্ছিল । “
মিতা সান্যাল অনির মুখে সেদ্ধ ডিমের টুকরো দিয়ে বলল ,”আহ তুমি চুপ করো তো! সব ব্যাপারে মজা তোমার। কালকে স্বাগ্নিক বাবু না থাকলে ওই ভূতের কবল থেকে আমাদের কারোরই নিস্তার ছিল না , আমি নেহাত আগেই অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম, নাহলে হার্ট ফেল হয়ে কাল আমার মৃত্যু ছিল অনিবার্য। সকালে তোমরা ফেরার আগে আমি শান্তনু বাবুর কাছে বাকিটা শুনেছি ,এখনো আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আছে। “
অনিমেষ সান্যাল বললেন ,”গল্পটা পুরোটা শুনতে হবে তো! তারপর না হয় ভূতের ক্ষমতা নিয়ে বিচার করা যাবে। “
শান্তনু ভৌমিক রেগে বললেন , “আপনার ঠাট্টা আমি ভালোই বুঝতে পারছি অনিমেষ বাবু ,এত ঘটনার পরও আপনার এত অবিশ্বাস ? আমরা কেউ ফিরে না এলেও বোধহয় আপনার মতবদল হত না ! কি বলেন ?”
অনিমেষ সান্যাল বলল ,”আহা ! অবিশ্বাস কে বলল ? আমি শুধু বললাম বিশ্বাস করার আগে জানতে হবে তো কি বিশ্বাস করব ! “
শান্তনু ভৌমিক একইরকম ভাবে রেগে বললেন ,”আমাকে না হয় ডাক্তারবাবু কে তো বিশ্বাস করেন ! ওনাকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন না, কালকের ‘মানুষ’ ড্রাইভারের একবারও চোখের পাতা না পড়ার কি কারণ !”
তিতির বলল ,”পাথরের চোখের যে পাতা পড়ে না শান্তনু আঙ্কেল ।”
শান্তনু ভৌমিক বিস্ময় ভরা স্বরে বললেন , “পাথরের চোখ ?”
সোনাকাকু বলল ,”তিতির ঠিকই বলছে ,কালকের ড্রাইভারের বাদিকের চোখটা পাথরের ছিল।”
শান্তনু ভৌমিক বললেন ,”তা না হয় বুঝলাম কিন্তু ওই ড্রাইভারের ডেথ সার্টিফিকেট আর ব্লু বুকের ছবির সাথে তার মুখের হুবহু মিলের ও নিশ্চই ব্যাখ্যা আছে আপনাদের কাছে ?”
সোনাকাকু বলল , “আছে বৈকি ,যে গাড়িটা উনি কাল রাতে চালাচ্ছিলেন সেটা ওনার নিজের গাড়ি নয় ,ওনার বাবার গাড়ি ,যিনি কয়েকদিন আগে মারা গেছেন , অন্যের থেকে তার বাবার ধার নেওয়া টাকা পয়সার হিসেব মেটাতেই কাল উনি এসেছিলেন ,
প্রমান স্বরূপ নিয়ে আসা তার বাবার ডকুমেন্টসের কপি আপনার চোখে পড়েছিল। “
শান্তনু ভৌমিক বললেন ,”তা ওনার বাবা কি কবরস্থানের কোনো কবরের মালিকের থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন ? “
সোনাকাকু বলল, “কবরের মালিক নয় , ওই কবরস্থানের দেখাশোনা করেন একজন ভদ্রলোকের থেকে , যিনি বহুবছর থেকে ওনার বাবার কাছের বন্ধু,কবরস্থানের ওপাশের দিকে একটা ঝুপড়ি মত ঘরে নিজের পরিবার নিয়ে থাকেন। “
শান্তনু ভৌমিক বললেন ,”সত্যি কথা বলুন তো ডাক্তার বাবু , আপনার কাল এক মূহুর্তর জন্য ভয় লাগেনি ?”
সোনাকাকু বলল ,”লেগেছিল বৈকি ,আপনাকে অজ্ঞান অবস্থায় নিয়ে গাড়িতে ফিরে তিতির আর অনিকে না দেখতে পেয়ে আমি ভয়ে পাগল হয়ে গেছিলাম প্রায় ,আমার ভয়ার্ত চিৎকার শুনেই তো ঝোপের ধারে হিসি করা বন্ধ করে তিতিতের কোলে থাকা অনি কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিল ,সেই দেখে আমাকে কি বকা তিতিরের। তার ৫ মিনিটের মধ্যেই আপনার ‘ভূত’ ড্রাইভার গাড়িতে ফিরে এসে আমাদের কাছে তার অপ্রত্যাশিত দেরীর জন্য বারবার ক্ষমা চেয়েছিলেন। “
শান্তনু ভৌমিক অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বললেন ,”তার মানে কাল রাতের ড্রাইভারকে আপনার সাধারণ মানুষ বলেই মনে হয় ?”
সোনাকাকুর উত্তরের অপেক্ষা না করে তিতির বলল ,” মোটেই না, সোনাকাকুর ওনাকে সাধারণ মানুষ মনে হয়েছে কিনা জানিনা তবে আমার কিন্তু একেবারের জন্যও হয়নি। যে মানুষ রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটা আহত বুনো বিড়ালকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে পারেন ,তারপর ডাক্তারের উপদেশ মত প্রয়োজনীয় শুশ্রুষা করবেন বলে তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন , তিনি আর যাই হোক,আমাদের মত সাধারণ মানুষ তো কিছুতেই নন। “