প্রিয় শিক্ষক

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

সেমিস্টার শেষের ছুটিতে মামাবাড়িতে বেড়াতে আসা তৃতন তার মামাতো দিদি স্বাগতার ঘরে ঢুকে বলল : কি করছিস দিদিভাই ? আজকে তো sunday, তোর অফিস নিশ্চই ছুটি ,তাই না ?

স্বাগতা গল্পের বই থেকে মুখ তুলে হেসে বলল : হ্যাঁ রে। multinational কোম্পানি গুলোর এই এক সুবিধা ,সোম থেকে শুক্র রক্ত নিঙ্গড়ে নিলেও শনি-রবি শরীরকে সেই রক্তভান্ডারের শূন্যস্থান পূরণের সময় দেয় ,অনেকটা ওই রক্তদান শিবিরের মতন বুঝলি! বোতল ভরা রক্ত নেবার পর গ্লাস ভরা দুধ খাওয়ানোর চলন ।

তৃতন হেসে বলল : কেন ? তোর বুঝি অফিস যেতে ভালো লাগে না ?

স্বাগতা : না তা নয় ,আসলে ভালোলাগা যে কখন অভ্যেসে বদলে যায় আর অভ্যেসের স্থান যে কবে প্রয়োজন নিয়ে বসে ,তার হিসেব রাখাটা একটু মুশকিল বৈকি।

তৃতন হেসে বলল : তার মানে তুই প্রয়োজনে চাকরী করিস , ভালোবেসে নয় ?

স্বাগতা : প্রয়োজন তো বটেই , বেতনের অঙ্কের সাথে নিজের অজান্তেই খরচের হাতটাও যে এতদিনে অনেকটা লম্বা হয়ে গেছে বোনটি, আর শিক্ষকের খবরদারি কে ভালবাসা গেলেও অফিস বসের টহলদারীকে কিছুতেই যে যায় না।

তৃতন : তোর কথায় মনে পড়লো ,জানিস দিদিভাই স্কুল থেকে বেরোনোর পর কতবার ভেবেও তনিমা মিসের সাথে একবারও আর দেখা করতে যাওয়া হয়নি । এই সেমিস্টারের চাপ , প্রজেক্ট জমা দেওয়ার তাড়ায় সবকিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। একবার তো ফুলের তোড়া আর মিষ্টি কিনে ওনাকে হঠাৎ গিয়ে সারপ্রাইজ দেওয়ার প্ল্যান করেই ফেলেছিলাম ,কিন্তু শেষ মুহুর্তে কলেজে স্পেশাল ক্লাসের নোটিশটা সবকিছু ভেস্তে দিল।

স্বাগতা : তনিমা মিস ই বুঝি তোর সবচেয়ে ফেভারিট টিচার ?

তৃতন হেসে বলল : হ্যাঁ, সেই ক্লাস ১ এ স্কুলের প্রথম দিনে ওনাকে দেখেছিলাম, কখন যে নিজের অজান্তেই এতটা ভালোবেসে ফেলেছি ,এখন ভাবলে সত্যি অবাক হয়ে যাই।

স্বাগতা হেসে বলল: কেন ? উনি বুঝি সবার থেকে আলাদা ? নিশ্চই পড়া না পারলেও কিছু বলতেন না!

তৃতন হেসে বলল : না রে দিদিভাই ,তা নয় ! হেড মিসের কাছে আমাদের নামে অন্যদের করা বিভিন্ন অভিযোগ শুনলেই তনিমা মিস ভীষণ রেগে ক্লাসে এসে বলতেন, “আমি আর কি করবো ! আমি তো আর কোনো ক্লাস টিচার নই , আমি তো চিড়িয়াখানার ম্যানেজার ! আমি তো আজ হেড মিসকে বলে দিয়েছি ,এক এক করে নাম ডেকে ,হাতে TC ধরিয়ে সবকটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দিন , লোকের বাড়ি রান্না করাই যদি ভগবান কপালে লিখে দিয়ে থাকেন ,আমি তো আর ডাস্টার দিয়ে সে লিখন মুছে দিতে পারবো না ! “

কিন্ত আসলে সত্যি টা ছিল একদম অন্যরকম ,আমাদের হয়ে হেডমিসের সাথে তর্ক করতেও তনিমা মিস কখনো পিছপা হতেন না ,ওনার ক্লাস টিচার পদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলায় একদিন তো সবার সামনেই উনি হেড মিসকে বলে দিয়েছিলেন “যে বয়সের যা ধর্ম তা করতে না দিলে জীবনের অর্থটাই যে মূল্যহীন হয়ে যাবে,যদি ১২ বছরের ছেলেমেয়েরা রাতারাতি ম্যাচিওর হয়ে যায় ,তাহলে আর কৈশোর কথাটার যৌক্তিকতা কোথায় ! ” চিরকাল উনি হেডমিসের চক্ষুশূল ছিলেন ,নিজের যোগ্যতার জন্যেই কোনমতে চাকরীটা টিকে ছিল এই যা ,তাও কতদিন টিকেছে জানি না, শুনেছিলাম অসুস্থতার কারণে তাড়াতাড়ি রিটায়ার করেছেন ,আসল সত্যি তো অন্যকিছু বলেই আমার মনে হয়।

স্বাগতা : বুঝলাম ! চাকরীর যাওয়ার ভয়কে অবলীলায় উপেক্ষা করে , নিজের ভাবনাকে কেউ এভাবে সোজাসুজি বলতে পারলে, ভালবাসার দরজা তার জন্য যে অজান্তে খুলতে বাধ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই তবুও কেন জানি না খুব জানতে ইচ্ছা করছে, শুধু কি তাই ছিল তার বিশেষত্ব ?

তৃতন : মোটেই না। ওনার বাংলা ক্লাস না করলে আমি যে নিজের ভাষাকে কোনদিন ভালোই বাসতে পারতাম না দিদিভাই ,চিরকাল আমার কাছে সেটা থার্ড সাবজেক্ট হয়েই থেকে যেত ,অনেকটা উচ্চমাধ্যমিকে নেওয়া এডিশনালের মতন ,ওটাতে ফেল করলে নম্বর হয়তো কমবে কিন্তু ওভারঅলে পাশ হওয়া আটকানোর কোনো ভয় নেই।

স্বাগতা হেসে বলল : আরো মজার উধাহরণ হবে ছোটবেলার খেলায় ‘দুধভাতের’ মত, সে ভাবছে আছে কিন্তু বাকিরা সকলে জানে তার জানা সত্যিটা আসলে কত বড় মিথ্যা।

তৃতন হেসে বলল :একদম ঠিক ! জানিস দিদিভাই ,শুধু বোধহয় তনিমা মিসের জন্যই ‘কনভেন্টে পড়েছি বলে বাংলা জানিনা’, মুখে মুখে এই গর্বিত স্বীকারোক্তি শুনে আজও আশ্চর্যের চেয়ে লজ্জাই বেশী লাগে ।

স্বাগতা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল : তুই বরং এই ছুটিতেই তনিমা মিসের সাথে দেখা করে নিস। আবার কলেজ খুললে স্বাভাবিক নিয়মে ব্যস্ত হয়ে পড়বি।
‘যেমনি ভাবা ,তেমনি কাজ ‘ নিয়মে চলবি ,তাহলে দেখবি সব না হলেও বেশীরভাগ কাজ গুলোই শেষ করতে পারছিস।

তৃতন : সে না হয় একদিন দেখা করে নেওয়া যাবে ঠিক , অনেকদিন বাকি এখনো ছুটির ,তনিমা মিসের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে বেশী দূর নয় ।আচ্ছা দিদিভাই আমি তো বললাম ,এবার তুই তোর ফেভারিট টিচারের ব্যাপারে বল।

স্বাগতা বলল : আমার ফেভারিট টিচার স্কুলে পড়াতো না ,সেই ছোট থেকে স্কুলের শেষ দিন অব্দি আমার ওই একজনই প্রাইভেট টিউটর, আমাকে বিজ্ঞান পড়াতেন, বাকি সাবজেক্ট গুলো মা র কাছেই পড়তাম।

তৃতন : ওহ ,গোপাল স্যার ! ছুটিতে মামাবাড়ি এসে আমিও তো দেখেছি ওনাকে কতবার । একবার পড়াতে বসলে সময় জ্ঞান ই থাকতো না ওনার ,কি যে রাগ হত আমার ,সেই সময়টুকু একা একা আমার যে কাটতেই চাইতো না ,তাই তো আমি দরজার বাইরে লুকিয়ে ওনাকে ভেঙচি কাটতাম ,উল্টোদিকের চেয়ারে বসে তুই আমাকে দেখতে পেয়ে জোর করে হাসি চেপে রাখতিস।

স্বাগতা হেসে বলল : হ্যাঁ,আর মনে আছে ,স্যার বাথরুমে গেলেই টেবিলে রাখা ওনার ভাজা মৌরির প্রায় অর্ধেকের বেশী আমরা দুজনে শেষ করে দিতাম ? নিশ্চই বুঝতে পারতেন কিন্তু আজও ভেবে পাই না, কেন কোনদিনও আমাকে সেই ব্যাপারে একেবারের জন্যও জিজ্ঞাসা করেননি ।

তৃতন : আচ্ছা তুই ওনার সাথে শেষ কবে দেখা করেছিলি ?

স্বাগতা : উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে।

তৃতন : তারপর রেসাল্ট বেরোনোর পর আর দেখা করিসনি ? যতদূর মনে পড়ছে তুই তো সাইন্সের সব সাবজেক্টে ই লেটার পেয়েছিলি !

স্বাগতা : হ্যাঁ তা পেয়েছিলাম বটে কিন্তু সেইসময় আর ওনার সাথে দেখা করতে যাওয়া হয়নি ,বিভিন্ন কলেজে ফর্ম তুলতে ,কি নিয়ে পড়বো সেটা ঠিক করতে এত ব্যস্ত ছিলাম যে, ইচ্ছা থাকলেও কিছুতেই আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি ,তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ব্যস্ততা তোর মত আমারও সব ওলটপালট করে দিয়েছিল। তবে ক্যাম্পাসিং এ চাকরি পাওয়ার পরদিন সকালে ,কাউকে কিছু না জানিয়েই ওনার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম ,আমার হাতে ছিল একটা মিষ্টির প্যাকেট আর প্রথম পাওয়া চাকরীর এপয়েন্টমেন্ট লেটার। কিন্তু সেদিন উনি আমার সাথে দেখা করতে কিছুতেই রাজী না হওয়ায় ফিরে এসেছিলাম ,আর কখনো ওমুখো হইনি।

তৃতন : কেন ? দেখা করতে রাজি হলেন না কেন ? এতদিন যাসনি বলে তোর ওপর রেগে গিয়েছিলেন ?

স্বাগতা : তাই হবে হয়তো অথবা আমার সাথে দেখা করলে এত বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমে আমাকে দেওয়া সব শিক্ষাই যে মিথ্যা প্রমাণিত হতো ,সেই ভয় থেকেই বোধ হয় এড়িয়ে গেলেন।

তৃতন : মিথ্যা প্রমাণিত হতো ? মানে ঠিক বুঝলাম না দিদিভাই।

স্বাগতা : উনি যে বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন তৃতন,সবশেষে পঞ্চভূতের ছাই হওয়াতে বিশ্বাসী,বইমেলা থেকে কেনা আমার সাধের ভূতের গল্পের বইগুলোকে টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিতেন , সেই মানুষ পরলোক বলে কিছু আছে জানতে পারলেও আমাকে এত সহজে তা কি করেই বা জানতে দিতেন বল!