ভগবান ও জাতিস্মর

Leave a comment আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ভগবানের সামনে দাড়িয়ে থাকা মৃত জাতিস্মর বলল : ” আপনি কিভাবে এটা করতে পারলেন ? শুধুমাত্র একটা জন্মের গ্লানি মানুষের কাছে কি ভীষণ অসহ্য আপনি জানেন না ? তা সত্বেও আমাকে আপনি এভাবে গত জন্মের স্ম্র্তি নিয়ে পুনর্জন্ম দান করে দিলেন ?

ভগবান : ওটা ভুল না ভেবে সুযোগ কেন ভাবছো না ?

জাতিস্মর :সুযোগ ?

ভগবান : হ্যা ,গত জন্মের ভুল গুলো শুধরে নেওয়ার সুযোগ।

জাতিস্মর : মোটেই না। আমি এঘরে ঢোকার আগে শুনেছি আপনি নিজের মনে নিজের করা ভুল আওরাচ্ছিলেন ,ভুলে যাবেন না আমি আর জীবিত মানুষ নই ,আমি এখন অশরীরী ,আপনার মত না হলেও আমারও কিছু বিশেষ ক্ষমতা আছে। নিজের ভুল স্বীকার করতে না পারলে আপনি কেমন ভগবান ?

ভগবান :তুমি বুঝতে ভুল করছো ,আসলে আমার তৈরী একটা যন্ত্র আমাকে আশানুরূপ ফল না দিয়ে বারবার অবাক করে দিচ্ছে । তাই সেই ক্যালকুলেশন টাই নতুন করে করার চেষ্টা করছিলাম।

জাতিস্মর : কিসের ক্যালকুলেশন?

ভগবান :আমার স্ম্র্তি যন্ত্রের ক্যালকুলেশন।

জাতিস্মর : স্ম্র্তি যন্ত্র টা আবার কি ?

ভগবান : আমার স্ম্র্তি যন্ত্রের পৃথিবীর দেওয়া নাম মস্তিষ্ক।

জাতিস্মর : ওটাই তো যত গন্ডগোলের মূল। আপনার ক্যালকুলেশনের ভুলের খেসারত কত লোক দিচ্ছে জানেন ? এভাবে অঙ্কে কাঁচা হলে কি আর ভগবান হওয়া যায় ?

ভগবান :আহ ! বিব্রত কোরো না,সকালবেলা ২ ঘন্টা ছাড়া আমি কোনো অভিযোগ শুনি না। এখন তুমি এসো। আমি ভুল টা কোথায় আবার বোঝার চেষ্টা করি ।

জাতিস্মর : আসবো মানে ? আপনার যমদূতের কাছে শুনলাম আমার আবার পুনর্জন্ম হবে। আপনার যন্ত্রের ডিফেক্ট না ঠিক হলে আমি আর কোনো রিস্ক নিতে চাই না। নাহলে এবার ২ জন্মের স্ম্র্তি নিয়ে না জন্মে যাই আমি!

ভগবান :তা হবে না ,আমি তোমার হবু মস্তিস্কে নিজে হাতে “সকল অতীত বিনাশ” বোতাম টিপে দিয়েছি ,একেবারে খালি পরীক্ষা করে তবে ই হ্যান্ড ওভার দেওয়া হয়েছে।

জাতিস্মর : তবে আবার এখন কি করছেন ?

ভগবান : এটা অন্য ব্যাপার। তুমি বুঝবে না। তুমি এসো এখন। তোমার সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে।

জাতিস্মর : আমাকে একবার বলেই দেখুন না। আপনার ভুলের অসীম কৃপায় পরপর ২ জন্মের অঙ্কবিদ্যা আমি একবর্ণ ভুলিনি। আপনার সব ক্যালকুলেশন পারফেক্ট না করে দিলে আমার নাম শ্যামাচরণ চাটুজ্যে নয় ,হে হে লেটেস্ট জন্মের নাম টাই বললাম,আপনি এমনিতেই যা কনফিউসড ,আর করতে চাই না।

ভগবান : বেশ বেশ। তা গোলমাল টা হচ্ছে যন্ত্রের মেমরি আইডেন্টিফিকেশন ক্ষমতা নিয়ে। মানে যা মনে রাখার কথা তা মনে রাখতে পারে না আবার যা ভুলতে চায় বা ভুলে যাওয়া উচিত বলেই আমার বিশ্বাস ,তাই বেশী করে মনে রাখে।

জাতিস্মর : একবার reboot করে দেখুন না।

ভগবান : ধুর ,তুমি যাও তো বাছা। যতসব উল্টোপাল্টা।

জাতিস্মর : কেন ? ভুল বললাম ?

ভগবান : তুমি ২ জন্মে কি শিখেছ কে জানে ! আর যেই জানুক ভগবান তো জানে না। প্রতিবার নতুন জন্মের আগে আমি নিজে বসে যন্ত্র reboot করি , “সব অতীত বিনাশ” বোতামের ওটাই কাজ ! অসুবিধা হচ্ছে এটা সিলেক্টিভ বিনাশ করতে পারে না ,একবার করতে শুরু করলে একসাথে সব করবে যদি না মাঝখানে বিগড়ে যায় ,সেটা যদিও খুবই কম হয়,তবুও যন্ত্র যখন ,বিগড়ানো স্বাভাবিক সে ভগবানের বানোনো হলেও।

জাতিস্মর : তা আমি এত কি করে জানব ? আমার বেলায় তো আর আপনি “সব অতীত বিনাশ” করেননি।

ভগবান : শুধু একবার করতে পারিনি ,তাও করছিলাম,প্রায় শেষের দিকে ছিল,ডাক্তারের তাড়া থাকায় আগেই তোমাকে মায়ের পেট থেকে বার করে নিল।

জাতিস্মর : তা ঠিক ,মা বলেছিল বটে ,আমি প্রি ম্যাচিওর বেবি ।

ভগবান : যাইহোক তোমাকে আগেই বলেছিলাম ,ভুল না ভেবে ওটাকে সুযোগ ভাবো যদিও গত জন্মের ভুলের পুনরাবৃত্তি ছাড়া তুমি আর কিছুই করে উঠতে পারোনি।

জাতিস্মর :শুনুন অন্যের ভুলের খেসারত দিতে হলে আর সুযোগের সদব্যবহার করা যায় না,সে ডাক্তারের করা ভুল আর ভগবানের দেওয়া সুযোগ ,যাই হোক না কেন!

ভগবান :আহ ! বললাম না ,অভিযোগের সময় সকালবেলা দুঘন্টা।

জাতিস্মর : তার আগেই যদি আমার পুনর্জন্ম হয়ে যায়! বলা কি যায় ? আমার বর দান চাই।

ভগবান :মানে ? কি বরদান ? আর বরদান লাভের কি বা যোগ্যতা তোমার ?

জাতিস্মর : যোগ্যতার প্রশ্ন ছাড়ুন ,আমি অন্যের ভুলের শিকার। পেনাল্টি র বদলে বরদান। আমাকে দিতেই হবে। দিয়ে দিন ,আমি চলে যাচ্ছি।

ভগবান :মহা মুশকিল হলো তো ! এদিকে ক্যালকুলেশন টা …আচ্ছা তাড়াতাড়ি বলো কি চাই তোমার ?

জাতিস্মর :নতুন জন্মে এক অমোঘ শক্তি।

ভগবান : কি শক্তি ?

জাতিস্মর :”যখন যা চাইবো মুহুর্তে ভুলে যাবো। ” ব্যাস তাহলেই নতুন জীবন একেবারে দুঃখ কষ্টহীন,এক কথায় স্বর্গপ্রাপ্তির সুখ বুঝলেন কিনা ! তথাস্তু বলে দিন , এক্ষুনি চলে যাচ্ছি!

ভগবান রেগে উঠে দাড়িয়ে জাতিস্মরকে মুহুর্তে টেনে নিয়ে গেলো একটা বিশালাকায় জানলার কাছে ,জাতিস্মর অবাক হয়ে দেখছে একটা ক্লাস ঘর, অনেক ছেলে মেয়ে সেখানে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে ,তার মাঝে একজন শিক্ষকের কড়া পায়ে টহলদারী । জাতিস্মর কিছু বলার আগেই ভগবান কঠিন কন্ঠস্মরে বলল “ভালো করে তাকিয়ে দেখো শেষ বেঞ্চিতে বসা ওই ছেলেটার দিকে। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ হলো ,ও এখনো কিছুই লিখে উঠতে পারেনি ,ওর জল ভরা চোখের ভিতর উথালপাতাল প্রশ্নের ভিড় দেখতে পাচ্ছো ? ২ বছর আগে ক্লাসের এই সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটি একবার নয় বারবার চেষ্টা করে চলেছে পরীক্ষার শেষ দিন তাকে স্কুল থেকে নিতে আসার সময় দুর্ঘটনায় মৃত মায়ের স্ম্র্তি ভুলতে। কিন্তু পারছে কি ? কেন পারছেনা বলে তোমার মনে হয় ? আমি যে এই পাগলের মত দিনরাত নিজের মনে ক্যালকুলেশন আওরাচ্ছি তা কি আমার স্বভাব দোষ বলে তোমার বিশ্বাস ? এখনো যদি কিছুই বোঝার ক্ষমতা না থাকে ২ জন্ম কেন ,হাজার জন্মের স্ম্র্তিও মূল্যহীন। “

নিথর হয়ে দাড়িয়ে থাকা জাতিস্ম্ররের পাশ থেকে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে ভগবান বললেন , “প্রহরী! আমাকে এখন একা থাকতে হবে ,কেউ যেন কিছুতেই আমাকে বিব্রত না করতে পারে। “

তারপরের কথাগুলো ভগবান নিজের মনে আওড়ালেন তবুও অশরীরী শক্তিবলে জাতিস্মর শুনতে পেল ভগবান বলছেন “কোথায় একটা ছোট্ট ভুল এতবার দেখেও কেন যে কিছুতেই বুঝতে পারছি না ,যেভাবেই হোক আমাকে খুঁজে বার করতেই হবে , নাহলে যে ছেলেটা ….”