অমলেন্দুবাবু চোখ খুলতেই তার একমাত্র নাতি সৈকত কে পায়ের কাছে বসে থাকতে দেখে বিস্ময়ে বললেন : একি দাদুভাই ! তুমি কখন এলে ?
সৈকত মৃদু হেসে বলল : তোমার এই ঘরের প্রতিটা কোণায় জমে থাকা ছোট বেলার স্মৃতি গুলো এমন ভাবে জাপটে ধরেছিল যে ঘড়ির দিকে তাকাবার অবসর হয়নি |
>আহা ! কিন্তু আমাকে কেউ ডাকেনি তো ! দুপুরে ঘুমের অভ্যেস টা দাদু নাতির কতটা সময় মিছিমিছি নষ্ট করে দিল !
>তুমি যে বলেছিলে মহাভারতের গল্পে অর্জুন শ্রী কৃষ্ণের পায়ের কাছে বসে তার ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষা করেছিল কারণ সে জানতো ধৈর্য্যের পরীক্ষায় পাশ করলে নষ্ট সময়ও জীবনের হিসেব বদলে দিতে পারে।
>হ্যাঁ সে না হয় বলেছিলাম ! কিন্তু এই বুড়োকে সারথি করে কোন যুদ্ধ জয় করতে চাও তুমি দাদুভাই !
>তুমি তো জানো ,আমি যুদ্ধ থেকে বরাবর পালিয়ে এসেছি , আমার যে হারতে ভয় করে !
>হারা কি ওত সহজ দাদুভাই ? কত মানুষ যে চেষ্টা করেও হারতে পারে না ।
>কি যে বল তুমি দাদান ! কেউ বুঝি সেচ্ছায় হারতে চায় ?
> চায় বৈকি ! নিঃসঙ্গতার চোখের জলে রাতের বালিশ যখন ভিজে যায় , অতি বড় জয়ীর কানে মহাকাল তখন ফিস ফিস করে বলেন , “এর থেকে তো হেরে যাওয়াই ভালো ছিল , অন্তত দুদন্ড শান্তির ঘুম তো জুটত ভালবাসার মানুষ গুলোর পাশে ” , সেই মুহুর্তের দুর্বলতায় জয়ের মেডেল গুলো ছুঁড়ে ফেলে হারের খোঁজে পা বাড়াতেই , আরো একবার জেতার ইচ্ছাটা নাগপাশের মত মন কে বেঁধে ফেলে ! সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যত শক্ত হয় সে বাঁধন , একের পর এক পাশার দানে বিকোতে থাকে সম্পত্তি ও সম্পর্ক !
> তুমি বুঝি হারতে ভয় পাও না ?
> না দাদুভাই ! এখন আর পাই না ,তবে তোমার বয়সে পেতাম বৈকি , আর সেই ভয় থেকে বাঁচতেই বার বার জেতার লড়াইয়ে সামিল হতাম , আশ্চর্যের বিষয় হল ছোট বড় কোনো জয়ই আমার সে ভয়কে কখনো দূর করতে পারেনি উপরন্তু শত গুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল।হঠাৎই একদিন আমার মায়া ত্যাগ করে বিনা বাক্যব্যয়ে সে চিরতরে নিখোঁজ হল ।
> এতদিনের জাঁকিয়ে ধরা ভয় হঠাৎ একদিন দূর হয়ে গেল ! কবে ? ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন ? তোমার কি মনে আছে দাদান ?
> বাহ্ ! মনে থাকবে না ? সেদিনই তো আমি প্রথমবার বিশ্রী ভাবে হেরে গিয়েছিলাম । ফকিরের মনে সুখের পরিমাপের আন্দাজ পেয়ে সেদিন চমকে উঠেছিলাম আমি ।
>তোমার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে হারা ঠিক জেতার মতই কঠিন ?
>মোটেই না , আরো বেশী ! সর্বকালের জয়ীও অভ্যাসের ব্যতিক্রমে হেরে গেলে , প্রত্যাশা অপূর্ন রাখার অভিযোগে কৈফিয়তের কাঠগড়া তার আত্মসম্মান কে বিদ্রুপ মাখা বিশেষণে বার বার আঘাত করে! কজনই বা সে আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা রাখে ! আপাতদৃষ্টিতে দুর্বল মনের আত্ম হত্যার কারণ ক্ষনিকের হার মনে হলেও আসলে তারপরের পাওয়া চিরস্থায়ী অপমান !
>আমি তো ভেবেছিলাম চাইলেই জেতা যায় না কিন্তু হার অন্তত সহজলভ্য !
>তোমার ভাবনা সত্যি হলে আমার মত কিছু মানুষের আনন্দের পরিসীমা আকাশের প্রস্থ দিয়েও মাপা যেত না ! এই যে পঙ্গু শরীরটা রোজ মৃত্যুর কাছে হারতে চায় কিন্তু সেই হার লাভে তপস্যার হিসেবের খাতা সময় বোধহয় হারিয়েই ফেলেছে !
>উফ ! তুমি কি আমাদের একটুও ভালোবাসো না দাদান ?
>বোকা ছেলের কথা শোনো দেখি ! ভালো না বাসলে , ওই অখাদ্য ওষুধ গুলো আমাকে গেলানোর সাধ্যি বুঝি ওই সুরেন ডাক্তারের ছিল ?
>এরকম আর বোলো না দাদান ! তুমি ছাড়া এই অচেনা ভিড়ে আমি যে হারিয়ে যাবো ! আমি এখনো ঠিক বেঠিকের গোলক ধাঁধায় আটকে পড়ি ,বুঝতে পারিনা কতকিছু , নিরন্তর চেষ্টা করেও ভুলতে পারি না কিছু স্মৃতি , অসহায় মন নিদ্রাহীন রাতে ছটফট করে!
>আহা ! ছোটবেলায় কুমীর ডাঙা খেলায় ,গুনতির হারে কুমীর হওয়ার দুর্ভাগ্য , সেই বিকেলে কষ্ট দিলেও আজ আর দেয় কি !
> কিন্তু দাদান সে বিকেল ছিল নিষ্পাপ , জীবনের জটিল হিসেব তখনও শুরু হয়নি ! রাত ভোর হতেই যে হারের দুঃখ মন থেকে মুছে যায় , তার সাথে আজকের জটিলতার কি তুলনা চলে !
> দূরত্ব বাড়লে দৃষ্টির গণ্ডিতে সর্বোচ্চ পাহাড়ও ক্রমশ ক্ষুদ্র হতে থাকে । কি জানতো দাদুভাই! সময়ের ডাস্টার নিয়ম মত ব্ল্যাকবোর্ডের সকল হিসেবই মুছে দেয় , তার কাছে জটিল সরলের কোনো ভেদাভেদ নেই !
> সবকিছু মুছে দেয় ? কিছুই থাকে না?
> থাকে নাই তো ! একমুঠো ছাই ছাড়া কিচ্ছু থাকে না , সেটুকুও মা গঙ্গা এক ঢোকে গিলে ফেলে !
> তাহলে চারিদিকে যে এত লড়াই , উদ্বেগ ,টান টান উত্তেজনা !
> ঘড়ির কাঁটা ঘোরার অপেক্ষা লড়াই করেও করা চলে অথবা আপোষে , তাতে অন্যায় তো কিছু নেই দাদুভাই ! কিন্তু সেই ক্ষনিক জিত হারের হিসেব কে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা দেখে যদি মহাকাল হাসেন , তাকেও কি খুব বেশী দোষ দেওয়া চলে ?
>জীবন মানে কি তবে শুধুই মৃত্যুর অপেক্ষা দাদান ?
> তা কেন হবে দাদুভাই ! জীবন মানে শুধুই জীবন ! সেখানে জেতার লড়াই করাই যেতে পারে কিন্তু হারলেও বিশেষ ক্ষতি নেই , শুধু এই উপলব্ধি টুকুই যথেষ্ঠ যে এতখানি পথ যদি বিনা জয়লাভে কেটে যেতে পারে বাকিটা আটকানো কোন হারের সাধ্যি!
>সেই হারের ফাঁকে লুকিয়ে ফেলা চোখের জলের মূল্য কেউ চুকিয়ে দিলে হিসেব টা অনেক সহজ হয়ে যেত, তাই না দাদান ?
> নিজের চোখের জলের মূল্য অতি বড় বিধাতার কাছেও আদায় করতে চেও না দাদুভাই ! এর চেয়ে বড় মূর্খামি যে আর হয় না ।সব হিসেবও সহজ করতে নেই নইলে গণিতের আনন্দে ঘাটতি হয় যে ! ডাক্তারের নির্দেশে চিনি ছাড়া কালো চা খাওয়ার বেস্বাদ বিকেল গুলোয় , মাটির ভাড়ে চা খাওয়ার আনন্দের স্মৃতিই শুধু মুখে হাসি আনতে পারে । ফুটো ভাড়ের চা তে হাত পুড়ে যাওয়ার কষ্ট নিদারুণ ছিল বটে কিন্তু তৃপ্তির চুমুকের কাছে সে জ্বালা সেচ্ছায় হার মেনেছে বারবার ! তাই বলি আর দেরী না করে উঠে পড় রথে ,সময় ফুরোনোর আগে জীবনটাকে একটু চেখে দ্যাখো দেখি দাদুভাই ! যুদ্ধে জিত হারের মাশুল না হয় দিলেই কিছু , শেষমেষ আক্ষেপের মাশুল গুণতে না হলেই জীবনের সাথে মৃত্যুও স্বার্থক ।