ধোঁয়াটে ইঙ্গিত

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

পর্ব এক 
ছাদে একা বসে ছিল গিনি। ডিসেম্বরের শেষের সময়টায় চারিদিকের জগৎ টা যখন উৎসবের আমেজ উপভোগে ব্যস্ত একটা ভীষণ ভয় তাকে যেন আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে। ২ বছরের গিনিকে তার পছন্দ সই  বড়দিনের উপহার কিনে দেবার জন্যই সেদিন  বেড়িয়েছিল মা।  তার কিছু ঘণ্টা পর একটা ঝোপের ধার থেকেজীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে ২ বছরের গিনিকে পুলিশ তার বাবার হাতে তুলেদিয়েছিল। 
প্রকৃতির নিয়মে দুবছরের শিশুর অপরিণত মস্তিস্ক সেই ভয়াবহ স্মৃতির ভার বহনে অক্ষম  , এমনটা মনে হলেও গিনির ক্ষেত্রে সত্যিটা এক অস্বাভাবিক।  এক অদৃশ্য শক্তি  সেই দুর্ঘটনার মুহূর্ত গুলো সবিন্যস্তে গিনির সামনে উল্টে পাল্টে ধরেছে। অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাসারি সেজে উঠেছে  অলৌকিক  নিয়মে  , মায়ের স্পর্শের চেনা অনুভতি , আদো কথা , খিলখিল হাসি,  ভুবন মোহিনী সুরের প্রত্যাশিত ছন্দ পতন।  তখন বুঝতে না পারলেও,বাড়তি বয়সের পরিণত বুদ্ধি দিয়ে গিনি বুঝেছে সুন্দর  মুহূর্ত গুলোর রক্তময় হয়ে ওঠার সেই ভয়াবহ স্মৃতিমন্থনের পিছনে,  লুকিয়ে ছিল  কোনো গর্হিত ইঙ্গিত , খারাপ কিছু ঘটে যাওয়ার আভাস , দূরত্ব বাড়ার আগের মুহূর্তের নিস্তব্দতা।

স্পষ্ট মনে আছে গিনির , রোজের অভ্যাসমত স্কুলের   প্রার্থণা ঘরে  , সকলের অলক্ষ্যে পকেটে লুকিয়ে নিয়ে আসা চক দিয়ে  যীশু মূর্তির গায়ে  লেগে থাকা রক্তের রঙ মুছে দিচ্ছিল সে।  মাত্র আট  বছর  বয়সে সেই বা কি করে জানবে , কিছু দাগ যে মোছা যায় না , কিছু ক্ষতকে ঢাকতে গেলে আরো বেশি করে তা সামনে এসে পড়ে ।  গিনির চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল  এক ভীষণ চেনা মুখ, সে শুনতে পেয়েছিল তার প্রিয় স্বরের গুনগুন গান , দেখেছিল মায়ের বুকে আদরে জড়িয়ে থাকা নিজেকে । ওরা ওই গাড়িটা করে কোথাও যাচ্ছে , রাস্তাটা খুব উঁচুনীচু , গিনি অনুভব করছে অসম্ভব ঝাঁকুনি , মা যেন কি একটা বলল , ভালো শোনা যাচ্ছে না , ভীষণ হওয়ার শব্দ।  একি! সামনে এগিয়ে আসা গাড়িটা থামছে না কেন !   মা যে খুব ভয় পেয়ে যাচ্ছে , আচমকা সেই কান ফাটানো আওয়াজ , বুকের শিশু খোলা জানলা দিয়ে পাশের ঝোঁপে গিয়ে পড়ল , চারদিকে রক্তের ছিটে , সব শেষের গোঙানি , দমবন্ধ করা কালো ধোঁয়া, চোখ বন্ধ করে ফেলল গিনি।

ঘামে ভিজে যাওয়া , ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকা  আট বছরের মেয়েটিকে করা কোনো প্রশ্নেরই উত্তর সেদিন পাননি স্কুল শিক্ষিকা প্রতিমা কর । সবসময় একা থাকতে চাওয়া এই মেয়েটির এমন  অদ্ভুত আচরণ দেখেও  সেদিন চিন্তিত হননি প্রতিমা দেবী ।  অন্যান্য শিক্ষিকারা এমন ঘটনা বাড়িতে জানানোর কথা বলতে তিনি বলেছিলেন , “সব বাচ্চা তো সমান হয় না।  তাদের মাথা , তাদের মন , সবই একে ওপরের থেকে আলাদা।   কোন দোষের আড়ালে কোন গুণ লুকিয়ে আছে বা কোন সমাধানের আড়ালে নতুন সমস্যা, কেউ কি জানে! এ নিয়ে অহেতুক চিন্তা অপ্রয়োজন।” রোজের মত স্কুল বাসে নয় , সেদিন প্রতিমা মিসের হাত ধরে  বাড়ি ফিরে এসেছিল গিনি। ঘরে ঢুকে সবসময় হাসতে থাকা জ্যাঠামণিকে জীবনে প্রথমবার কাঁদতে দেখেছিল সে। সারা রাত ফুঁপিয়ে কাঁদা  গিনির ঘুম , পরদিন ভেঙেছিল জ্যাঠামণিরই ডাকে। ফুলে যাওয়া চোখ নিঃস্পলকে তাকিয়ে পরম স্বস্তিতে দেখেছিল তার জ্যাঠামণি আর কাঁদছে না।  গিনির গলা জড়িয়ে ধরে জ্যাঠামণি বলেছিল, “তোর মায়ের মত জ্যেঠিমাও কাল সকলের সাথে আড়ি করে দিয়েছে রে গিনি ! ওরা খুব বন্ধু ছিল তো , তাই শলাপরামর্শ করেই  এমন ঘটিয়েছে । আমাদের অবস্থা দেখে দুই বন্ধুর খুব হাসির ফোয়ারা ছুটেছে হবে , ঠিক আগের মত । লুডোর গুটি লুকিয়ে জেতাকে জোচ্চুরি বলে , আমি এই হার মানি না। তাই শুনে রাখ , আড়ি বৈ তো কিছু নয় , ওমন হয়েই থাকে , তাতে কাঁদতে আছে নাকি ! আমরাও হাসবো , মজা করবো , সবটা দিয়ে বাঁচবো , ওদের ছাড়াই। হ্যাঁ হ্যাঁ ওদের ছাড়াই। ”

আজ  আরেকটা বড়দিন।  ষোল বছরের গিনি  এখন পরিণত বুদ্ধির অধিকারী , বিজ্ঞানে ঘেরা দিন রাত।  তার পরিশ্রমের  ফর্মুলা আবিষ্কার করেছে তিনটি বিস্ময় ক্ষমতা ধারী  যন্ত্র , ফিরিয়ে দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক , আড়াল করেছে অযাচিত কতকিছু। প্রতি বছরের মত স্কুল ছুটি থাকা সত্ত্বেও  দাড়োয়ানজি গিনির বলে দেওয়া সময় মতই চাবি নিয়ে উপস্থিত ছিল  স্কুলের দরজায়। প্রার্থনা ঘরে যীশু মূর্তির সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে চোখ বন্ধ করতেই আবার ভেসে উঠল সেই ভয়াবহ দৃশ্য।  উল্টানো গাড়ি,মায়ের বাঁচার চেষ্টা  , রক্ত ভরা রাস্তা , ঝোপের মাঝে অসহায় ছোট্ট শিশুর অদম্য কান্না। গিনির দিকভ্রান্ত হয়ে স্কুল থেকে ছুটে বেড়িয়ে যাওয়ার কারণ  বৃদ্ধ দারোয়ানের বোধগম্য হয়নি।

পর্ব দুই 


ভয়ের মোড়কে নিজেকে গুটিয়ে  অস্থির পায়ে ছাদে  পায়চারী করছিল গিনি ।  সিঁড়িতে অচেনা পায়ের শব্দে পিছনে ঘুরল সে ।  আগন্তুকের মুখ অন্ধকারে  অস্পষ্ট।

গিনি : কে ?

আগন্তুক : আমি সময় , আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িংগেস্ট।

গিনি :আপনি এখানে  ?

সময় : সন্ধ্যেবেলার নাকি আপনার দেওয়া একটা ডাক নাম আছে , ছাদবেলা।  দিদার কাছে কথাটা শুনে হাসলেও এখন তা বেশ মানানসই বলেই মনে হচ্ছে।

গিনি :আপনি আমার বাড়ি চিনলেন কি করে ?

সময় : সেদিন লেকের ধারে নেওয়া  আপনার  ফর্মুলার খাতার প্রথম পাতাতেই  নাম , ঠিকানা ,বাড়ির নম্বর এমনকি ইমেইল পর্যন্ত লেখা আছে। কিন্তু তা দেখে আপনার বাড়ি আসতে হলে এত গুলো দিন অপেক্ষা করার কোনো যুক্তি খুঁজে পেলে অবশ্যই বলবেন , ততক্ষণ না হয়  বিশ্বাস করুন  প্রেরকের লিখে দেওয়া ঠিকানা  , এই  চিঠিখানা পৌঁছানোর দায়িত্বপূরণের কাজে আমায় সাহায্য করেছে।

গিনি নিজের অপ্রস্তুত ভাব আড়াল করে কাগজের চিরকুট টা হাতে নিতেই  দেখল মন ভালো করে দেওয়া সেই চেনা হাতের লেখা ।

ওরে মেয়ে ,

কাঁপা হাতে আলুভাজা বেস্বাদ হয় , তাই বলে প্রাণদন্ড ? দিদার মরা মুখ ছাড়া বুঝি দেখবি না পণ করেছিস ?

গিনির শুধু গিনির ( আগে মচমচে  , এখন ন্যাতানো ) আলুভাজা দিদা।

গিনি :সত্যি ! পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে , তারপরে কিছু নিজস্ব কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে আর যাওয়া হয়নি দিদার কাছে , আপনি আছেন বলেই বোধহয় আরো নিশ্চিন্তে ছিলাম, একটা ফোন করার কথাও খেয়াল হয়নি।ক্ষমা চাওয়ার কোনো অজুহাত খুঁজে দেবেন আমাকে?

সময় : নিশ্চই দেব। অভিযোগ ও অজুহাত  মেল করানোই আমার নেশা , এ খেলায়  দাবার থেকেও বেশি বুদ্ধি লাগে।

গিনি : আমি কাল যাবো তাহলে।

সময় : কাল ? কিন্তু তাহলে তো …

এক অজানা ভয় ঘিরে  ধরল গিনিকে , ঠান্ডা হতে শুরু
ইঙ্গিত,অবশ্যম্ভাবী পরিণতি,আতঙ্কে কেঁপে উঠল  কণ্ঠস্বর:তাহলে কী ? দেরী হয়ে যাবে ? দেখা হবে না ? আপনি সব জানেন তাই না ?

সময় : হ্যাঁ  জানি। কখনো বেশিরভাগটা  কখনো বা   সবটাই।

গিনি আর ভয় আড়াল করতে পারছে না , অস্থির স্বরে কাঠিণ্য এনে বলল  : তাহলে শুনে রাখুন আমিও জানি , আমিও সবটা জানি।

সময় রহস্যময় হাসি মেখে বলল :জানতেই পারেন , জানাটাই তো স্বাভাবিক।  ছোটবেলা থেকে দিদার বাড়িতে আপনার নিত্য যাতায়াত । আমি তো মাত্র  এক মাস ধরে দেখছি দিদাকে , তবু যেন মনে হল  প্রতি  মঙ্গলবার দক্ষিণেশ্বরে যাওয়ার অভ্যাসটা  দিদার নতুন নয়।

গিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল : ওহ! তাই তো , কাল মঙ্গলবার।

সময় : MERRY  XMAS । আপনার ঘরের যীশুখ্রীষ্টের ফটো টা খুব জীবন্ত।

গিনি : আপনি আমার ঘরে গিয়েছিলেন ?

সময়: হুম , আপনার বাবা প্রথমে আমাকে আপনার ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন , ওখানে আপনাকে না দেখে খানিক ডাকাডাকি করতেই একজন ভদ্রমহিলা এসে বললেন আপনি সন্ধ্যের এই সময়টা রোজ ছাদে কাটান।  উনি বুঝি আপনার মা ?

গিনি : হুম।

সময় : তাহলে  যীশুখ্রীষ্টের ফটোর পাশে যে  ভদ্রমহিলার ছবি দেখলাম যার সাথে আপনার মুখের ভীষণ মিল , উনি …

গিনি : আমার মা , চোদ্দ বছর আগে এক পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এখন বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীকেই আমি মা বলে জানি। জন্ম দিলে এর থেকে বেশী ভালোবাসা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি না।  আর কিছু জানার আছে আপনার ?

সময় : দুঃখিত।  আমার অকারণ কৌতূহল আপনাকে   বিব্রত করেছে বেশ বুঝতে পারছি।

গিনি : আসলে আমার মনটা ভালো নেই , এরকম অসংযত ব্যবহারের জন্য ক্ষমা করবেন।

সময়:তা না হয় করা যাবে।  কিন্তু এমন দিনে মন খারাপ করতে নেই  গিনি ! আজ যে আপনার যীশুখ্রীষ্টের জন্মদিন।

গিনি : আর আমার মায়ের মৃত্যুদিনও ।

সময় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল :  সান্ত্বনা দেওয়া আমার অভ্যাস নয় , তাছাড়া জীবনে অস্তিত্বর  ভিত্তি হারানোর স্বান্তনা হয় না। ভেবে নিন প্রসঙ্গ বদলাতেই আবার এক অবান্তর প্রশ্ন করছি -ভালো তো কতকিছুই লাগতে পারতো , কৃষ্ণের বাঁশি , শিবের জটা ,  নামাজের টুপি,গুরুর  প্রসাদ । শুধু  সাদা আলখাল্লা ধারণকারী সুদর্শন ব্যক্তিটির উপর বিশেষ পক্ষপাতের  কোনো কারণ আছে কি ?

গিনি :  জন্মদিন সুখময় হয় আমার আপনার , তার মেরীময়। মৃত্যুর অতীত নাড়ির টান।

সময় :ব্যাপারটা আপেক্ষিক , দৃষ্টির পরিধি অনুযায়ী।  সাধারণ দৃষ্টি জীবন সীমার পরিধি অতিক্রম করতে পারে না , তাই মৃত্যুর পরও শুধু জীবনকালটাই আলোচ্য।   কিন্তু হতেও তো পারে মৃত্যুর অতীত জীবনকালের কোনো কিছুই নয় , সত্যিটা সেখানে অনেক বেশী সহজ , দুইয়ের বদলে হয়তো একটাই স্বত্বা , তাই আগে পিছে থাকার প্রয়োজন হয় না কখনো ।

গিনি : হতে তো অনেক কিছুই পারে , আবার অনেক কিছু না হলে ক্ষতি তো বিশেষ ছিল না বলেই মনে হয়। চক দিয়ে  যীশু মূর্তির শরীরে  লেগে থাকা লাল রঙ ঢাকা যায় ঠিকই  কিন্তু  ব্যস্ত রাস্তায় ঘটা  ভীষণ দূর্ঘটনা য়  সারা রাস্তাটা রক্তে  লাল হয়ে যায়  ! , ওত  চক তো আমার  কাছে নেই !

সময় অল্প হেসে বলল : রক্তের দাগ খুবই ক্ষণস্থায়ী।  চলতি গাড়ির চাকা কিংবা হঠাৎ বৃষ্টির জল বেশীক্ষণ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দেয় না। যা থেকে যায় তা হল  ভালোবাসার মানুষের  দীর্ঘশ্বাস  , নিরন্তর ছটফটানি , সত্যিকে মিথ্যা ভাবার ব্যর্থ প্রয়াস ,  স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও আবার হতাশার গভীরে তলিয়ে যাওয়া।তবু শেষমেশ যখন কিছু ই বদলায় না তখন  নিয়তির কালচক্রের অজুহাত দিয়ে নেওয়া হয় জীবনের  গতি  বাড়াবার অবশ্যম্ভাবী সিদ্ধান্তটি।

তাই আমার বিশ্বাস, প্রত্যেকের জীবনসীমা একটি জটিল অঙ্ক কষে নির্ধারিত হয়,তা বিশ্লেষণে  কালব্যয় বৃথা। যে অঙ্কের সমাধানে  আপনার  ভূমিকা নেই , তার  ফলাফল বদলানো আপনার পক্ষে  অসম্ভব। হ্যাঁ অসম্ভব , শুধু আভাস কেন , তারিখ- ক্ষণ-নাম-কারণ  জানলেও অসম্ভব।

গিনি : আপনার কি বিশ্বাস  সব অঙ্কের সমাধান সঠিক ? হিসাব নির্ভুল ?

সময় : তা তো বলিনি।  নিজের সাথে দাবা খেলেছেন কখনো ? দাবার চালে ভুল তো হতেই পারে , সেক্ষেত্রে ভুল বিচারই বলুন বা দান  শুধরানোর দায়িত্ব কিংবা নিজের করা ভুলেরই  সদ্ব্যবহার  , সবটা দাবাড়ু নিজেই করে থাকেন । খেলা শেষে নিশ্চই কোনো জটিল নিয়মে দানের কার্য কারণ ব্যখ্যা হয়  তার মস্তিষ্কে , তার প্রভাবও হয়তো পরের খেলায় প্রতিফলিত হয় , যেখানে দাবাড়ু আরও প্রখর , আরও সাবধানী।  রাজা মন্ত্রীর সাজানো ছকে  ডুবে থাকলেও  দাবাড়ু জানেন  তা ঘণ্টা কয়েকের খেলা বৈ তো নয় , তাই সে অবিচল , নিরুত্তাপ , হার জিতের হিসাব তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক।

নিজের ভিতরে লুকিয়ে রাখা পুরোনো প্রশ্ন টির থেকে আড়াল সরিয়ে , লৌকিকতা ভুলে অস্থির স্বরে গিনি বলল :  যখন এতো কিছু জানো,এটাও নিশ্চই জানো মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় ? তার ভালোবাসার সম্পর্কগুলো সেখানে তাকে অনুসরণ করতে অক্ষম , কিন্তু তার পূরণ না হওয়া  ইচ্ছাগুলো ! কোনোকিছুর টানেই কি সম্ভব নয় ফিরে আসা ? অন্তত  ফিরতে চাওয়া ! মৃত মানুষটি  তো  সবটা দিয়ে চাইবেই  তার সাথে হওয়া অঘটন  ফেলে আসা  ভালোবাসার মানুষ গুলোর সাথে না হোক,কিন্তু সে ইচ্ছাপূরণে বাঁধ সাজছে তার অকর্মণ্য মেয়েটি । বিশ্বাস করো  , ভীতু সে নয় , কোনোদিন ছিল না। আগেও সে  আসন্ন দূর্বিপাকের   ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল ,আজকে আবার সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। শুধু এটুকু জানি , আজকে আবার কারো  চিরবিদায় নেবার সন্ধিক্ষণ উপস্থিত , এর থেকে বেশী কিছু বোঝার শক্তি যে নেই আমার।

সময় নিজের দুর্ভেদ্য দৃষ্টি স্থির করল গিনির জল ভরা অস্থির চোখ দুটিতে , তারপর কঠিন স্বরে আশ্বাস মিশিয়ে বলল : শান্ত হও গিনি ! অকারণে নিজেকে দায়ী কোরো না  এভাবে , প্রতি সন্ধ্যায় ছাদের অন্ধকারে মৃত মায়ের কাছে ক্ষমা চেও না আর । হঠাৎ হাওয়া বা শুকনো পাতার শব্দে মায়ের আত্মার উপস্থিতি খোঁজা বন্ধ করে দাও ,  এটুকু জেনে রাখো  আয়নার কাঁচ  ভেদ করা প্রতিবিম্বর সাধ্যের বাইরে। তবুও  নাড়ির টান তার নিজের জায়গায় অবিচল , তার ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট , যা তোমার বোঝাটা  ভীষণ জরুরি –  আগে যা ঘটেছে ভবিষ্যতে তা আবার ঘটবে।  কাছের বা দূরের কারো সাথে, আজ  যা তোমার  সাথে , কাল  তাই  অন্যের  সাথে  , হয়তো স্থান টা অন্য , ধরণ টা অন্য ,  কিন্তু ঘটনাটা এক , তা ঘটবে, ঘটবেই।  তাই যে এতদিন হয়ে এসেছে , তাই যে নিয়ম। তুমি যার থেকে পালাতে চাইছো ,তার থেকে পালানো যায় না,কারণ সেই যে সত্যি , সেই যে মুক্তি।

গিনি :আর  কখনো দেখা হবে না , তাই তো  ? আদরে ভেজা  গলার স্বর টা আর কখনো শোনা হবে না আমার । কি যে সুন্দর গান গাইতো মা!পুরো গানটা সেদিন শোনা হয়নি , প্রথমদুটো  লাইন গাওয়ার পরই গাড়িটা …

সময় :অপেক্ষান্তে তোমার সত্ত্বা তার থেকে যখন ভিন্ন থাকবেনা , তখন দেখার প্রয়োজন যে হবে না গিনি ! সে না হয় পরের কথা , এখনকার হিসেবে বলছে   তুমি তো মৃত মায়ের বাকি থাকা আদরটুকু  পেয়েছো নতুন মায়ের থেকে , কতজনের তো পুরোটাই বাকি থেকে যায় , পাওয়া হয় না কিছুই , তাদের দাবী কি কম !

গিনি : নাহ ! কম নয় , বরং বেশি। সেই দাবী পূরণের গুরুদায়িত্ব যার ,  তার ক্ষমতায় থাকলে আমাকে যেন শুধু একটু সময় ভিক্ষা দেন , নিজেকে শক্ত করার , নতুন যন্ত্রণা সহ্যের শক্তি সঞ্চয় করার। জানিনা তা সম্ভব কিনা , তবুও আজ না চেয়ে থাকতে পারলাম না যে!

সময় : সব  ইচ্ছা না হলেও কিছু ইচ্ছা তো পূরণ হয় বলেই জানি। আমি এখন আসি গিনি! কিছু জরুরি কাজ বাকি আছে।  তুমি দিদার সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা ভুলো  না কিন্তু।

গিনি : সত্যি ! অনেক কথা বলে দেরী করে দিলাম খুব ! আসলে আমি আর পারছিলাম না , একটা ভীষণ ভয় , অদেখা কালো দেওয়াল..কথাগুলো না বললে ..। জানিনা মাত্র কয়েকদিনের আলাপে আমার থেকেও বেশি করে আমার পরিস্থিতির জটিল  না বলা সত্যি গুলো  বোঝা কিভাবে সম্ভব হল তোমার পক্ষে,  ধন্যবাদ।

সময় অল্প হেসে বলল : ধন্যবাদ ছাদবেলা কে ,  সৌজন্যের “আপনি”  কে বন্ধুত্বের “তুমি” তে করার জন্য । কেউ প্রথম আমার বন্ধু হল কিনা।

গিনি র কানে পৌঁছলো না সময়ের শেষ কথাগুলো , চিন্তার গভীরে তলিয়ে গেল সে। হঠাৎ বাবার ডাকে চমক ভাঙল তার। দ্রুত পায়ে নিচে এসে দ্যাখে লজেন্স কে ঘিরে বাবা মায়ের উৎকন্ঠা। লজেন্স গিনির প্রিয় কুকুর , গত মাসে ওর লিভারের ছোট অপারেশন হয়েছে  , তারপর থেকে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে  ওকে তরল খাবারই দেওয়া হচ্ছে  , ওর পক্ষে শক্ত খাবার হজম করা সম্ভব হবে না আরো দুমাস । সন্ধ্যেবেলা , সময়কে ভিতরে নিয়ে আসার পরে গিনির বাবা বাইরের দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন  , সেই ফাঁকেই লজেন্স বাইরে বেড়িয়ে বাগান থেকে কিছু একটা খেয়ে এসেছে ,যার ফলে তার এই অবস্থা। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পরছে  ওর  শরীর , ডাক্তারকে ফোন করা হয়েছে , তিনি এখনই ওকে পশু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

হাসপাতালের চেয়ারে বসে সেই ভয়ানক সত্যি শোনার অপেক্ষা , গিনি চোখের জল বাঁধ মানছে না , ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে  , সময়ের বলা কথাগুলো তার কানে  বাজছে বারবার ,”প্রত্যেকের জীবনসীমা একটি জটিল অঙ্ক কষে নির্ধারিত হয়,তা বিশ্লেষণে  কালব্যয় বৃথা। যে অঙ্কের সমাধানে  আপনার  ভূমিকা নেই , তার  ফলাফল বদলানো আপনার পক্ষে  অসম্ভব।” লজেন্সকে যে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে , ছোট্টবেলা থেকে সে তার ছায়া সঙ্গী।  গিনি আর কিচ্ছু ভাবতে পারছে না , সব কিছু হারিয়ে যাচ্ছে তার।  মায়ের কোলে মুখ গুঁজে গুমড়ে উঠল সে।

ডাক্তারের গলার  কেঁপে উঠল ওরা তিনজন , ” লজেন্স ভালো আছে , কাগজেরটুকরো খেয়েছিল বলেই এযাত্রায় প্রাণ রক্ষা ! বাকি দুমাস বকে পাথর রেখে হলেও বেঁধে রাখবেন ওকে।”পর্ব তিন সেই রাত টা  ঘুমন্ত  লজেন্সের পাশে হাসপাতালে  কাটিয়েছিল গিনি। লজেন্সের জিভের আদরের ঘুম ভাঙার নিয়ম পরদিন সকালেও যথাসময়ে পালন হল। হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে লজেন্সকে নিয়ে ফিরতে ওদের দুপুর হয়ে গেল। চটপট স্নান করে তৈরী হয়ে নিল গিনি। মা কে “আসছি “বলে দ্রুত পায়ে রওনা দিল আলুভাজা দিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। কড়া নাড়তেই  হাসিমুখে দরজা খুলে  দাঁড়াল তার  ছোটবেলার মুশকিল আসান – আলুভাজা দিদা।গিনি অবাক হয়ে বলল ,”একি ! দক্ষিণেশ্বর যাওনি ? মঙ্গলবার মানেই তো নিজের আলু নিজেই  রাঁধার  দিন।”আলুভাজা দিদা হেসে বললেন ,”আহারে ! পিওন দাদা না গেলে কত যেন আসতো আমার রাঁধুনি। আয় ভিতরে আয় ! আর বলিস না,কাল তোর বাড়ি থেকে ফেরার পথে পাথুরে অন্ধকার গলিটায়  হোঁচট খেয়ে সময় এক ভীষণ কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে , কত যে রক্ত তোকে কি বলবো!বাড়িতে ঢুকেই   আমাকে বলল , আমি যেন এ নিয়ে কোনো না চিন্তা করি ,  এসব নাকি হয়েই থাকে। ভাবতে পারিস  তুই ! ছেলের  অটল  জেদ , জ্ঞানের বুলি ফুটিয়ে  বলে “সময়ের কাছে সব ক্ষত মেলাতে বাধ্য সে তা যত ভয়ানক ই হোক না কেন।” উপায়ান্তে  নিজের মরা মুখের দোহাই দিয়ে কমল ডাক্তারের বাড়িতে নিয়ে গেলাম ছেলেকে । পাথর কুচি বের করতে গিয়ে পায়ের তলার কিছুটা মাংস কেটে বাদ দিয়েছে ডাক্তার ।  কি প্রচন্ড সে ছেলের সহ্যশক্তি ! কাটা ছেড়া , এতগুলো সেলাই , তবুও বাবুর ঠোঁটে কষ্টের  ‘রা’ নেইকো মোটে।গিনি :তারপর ?আলুভাজা দিদা : তার আর পর কি ! ধমক দিয়ে ওষুধ খাইয়ে শুইয়ে দিলাম , শিয়রে বসে  ছিলাম সারারাত , ডাক্তার যা বলেছিল ঠিক তাই!মাঝরাত থেকে ধুম  জ্বর , ভোরের দিকে যা একটু কমেছে। এই অবস্থায় ছেলেটাকে ফেলে মায়ের দুয়ারে গিয়ে শান্তি পাবো আমি !গিনি : হুম। এখন কি ঘুমোচ্ছে ? একটু দেখা করা যাবে?আলুভাজা দিদা : হ্যাঁ যা না ! ঘুম আছে নাকি ওর ? সেই কোন কাকভোরে থেকে জেগে আছে , আমি ততক্ষণ রান্না ঘরে যাই একটু , দুপুরে খেয়ে যাস কিন্তু।গিনি সিঁড়ি দিয়ে  উঠে যেতে যেতে উত্তর দিল , “আচ্ছা “।ব্যান্ডেজ বাঁধা  পা টিকে বালিশের উপর রেখে খাতা কলমের  হিসাবে মগ্ন ছিল সময়।  গিনিকে  ঘরে ঢুকতে দেখে হেসে বলল , “আরে  গিনি যে !   ইচ্ছাপূরণ হল তাহলে ?গিনি অবাক হয়ে বললো : ইচ্ছাপূরণ ? তুমি  কি করে !সময় তার রহস্যময় হাসি আড়াল করে বলল : ওই যে কাল কি  একটা অদ্ভুত ইচ্ছার কথা বলছিলে , কেন যেন আর একটু সময় দরকার ছিল । এখন  তোমার মুখ ভরে যে আনন্দের রেশ  লেগে আছে  ,হলফ করে বলতে পারি কাল  তা ছিল না। তাই মনে হল কোনো সদ্য  ইচ্ছাপূরণই  কি  এই  হঠাৎ খুশির  কারণ।গিনি : উঁহু ! ইচ্ছাপূরণই বটে। সে কথা পরে হবে , আগে বলো , তুমি এমনটা ঘটালে কি ভাবে !সময় : ঘটনা তো ঘটবার জন্যই ! এমন হোক বা তেমন। আচ্ছা, এবার বলো লজেন্স কেমন আছে ?গিনি : লজেন্স ! তুমি  কি করে জানলেন লজেন্সের শরীর খারাপ ?সময় বিস্ময়ের মুখোশ পরে বলল : শরীর খারাপ ? সেকি কবে থেকে ? কি হয়েছে ওর  ?গিনি : তা না জানলে হঠাৎ লজেন্সের কথা জিজ্ঞাসা করলেন যে !সময় :আসলে দিদার কাছে লজেন্সের কথা এতো শুনেছি , তোমার  বাড়িতে গিয়েও কাল ওর সাথে দেখা হল না , কথাচক্রে ওর খবর জানাও হয়নি , তাই আজ মনে করে জিজ্ঞাসা করলাম।গিনি: মাঝে মাঝে তোমাকে  কেমন ধাঁধার মত মনে হয়  , কিছু যেন আড়াল করছো প্রচণ্ড সাবধানী পদক্ষেপে। আবার কখনো তুমি খুব সহজ  যাকে অবিশ্বাস করতে একবারের জন্যও ইচ্ছা হয় না। তুমি কেমন অন্যরকম , সকলের থেকে আলাদা।সময় : আমি এরকমই , জটিল অঙ্ক নিয়ে কারবার করি বলেই হয়তো। তোমার প্রথম ধারণটা ই ঠিক , আমি জটিল , কঠিন , ধোঁয়াটে , প্রচলিত নিয়মে আমাকে বাঁধা অসম্ভব। দিদার কাছে না এলে আমার বোধহয় কখনো সহজ হওয়া শেখা  হত না।  সে যাক , লজেন্স কেমন আছে বললে না ?গিনি : ভালো আছে এখন , কাল শরীর টা খারাপ করেছিল , ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি , ভেবেছিলাম মায়ের মত….সময় : উফ ! তোমার  ভাবনাটা বড় বেশি , যা ঘটে গেছে  তা তো আছেই  , অথবা যা ঘটেনি  তা নিয়েও। তোমার অজানা হলেও , বিশেষ কারণেই হয়তো মহাকাল ঘটিয়ে থাকে কিছু  রক্তক্ষরণ , স্রষ্টার অনুমতি নিয়ে। তাই পকেটে চক নিয়ে ঘোরাটার পিছনে তোমার ভাবনাটা অমূলক। দাগ হালকাই হোক বা গাঢ় , কোনোটাই হিসেবের বাইরে নয়।গিনি : কাল আমার বাড়ি না গেলে সাদা মোড়কে পা ঢাকতে হত না । এই ভাবনাটা নিশ্চই ভুল নয়।সময় :হুম! হত না , সাথে আরো অনেক কিছুই হত না , আবার অনেক কিছু হয়তো হত।ইঙ্গিত বিশ্লেষণে অনুমানের আচ্ছাদন সরিয়ে  দিল  গিনি  : মানে ?সময়ের ঠোঁটে আবার সেই চেনা রহস্যময় হাসি  : মানে দিদার  চিঠিটা  পৌঁছানো হত না , আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সূত্রপাত  হত না , দিদার রান্নাঘরে জমে থাকা আলুগুলোর জীবনকাল স্বার্থক হত না ।গিনি হাসল না , তার  ভিতরের ঠান্ডা হওয়া পুরোনো ভয় আবার তার কন্ঠ স্বরে  হয়ে উঠল স্পষ্ট  : আর কী যেন হতে পারতো বলছিলেন !..সময় তার দুর্ভেদ্য দৃষ্টি সহজ করল এবার : তোমার চিন্তায় দিদার শরীর আরো খারাপ হত  ,দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে , দিদার কাছে বসে তোমার ছোটবেলার অদ্ভুত কান্ডকারখানা শুনতে হত আমাকেই, শেষমেশ আমার অঙ্কের খাতা , বাকি হিসেব পত্র  তোমার প্রিয় লেকের জলে ভেসে যেত  !”আয়রে মাগো ! সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে যে ! ” সময়কে কিছু যেন আরো বলতে চাইছিল গিনি , কিন্তু দিদার ডাকে থামতে হল থাকে।সময় : যাও ! তোমার অপেক্ষার আলুভাজা তৈরী হয়ে গেছে মনে হয়।গিনি : তোমার  খাবার তো ঢাকাই দেখছি। ঘুম তো পায়না তোমার দিদা বলল , খিদেও  কি ….সময় : খিদে ঘুমের সাধারণ নিয়মচক্রে বাঁধা পরলে হিসাবের খাতা অমিলে ভরে যাবে যে ! মাঝে মাঝে মনে হয় , জটিল অঙ্কের সমাধানই আমার যাবতীয় চাহিদা পূরণ করে ।গিনি : উফ ! আবার সেই কঠিন কঠিন কথা ! আলুভাজার গন্ধে বুদ্ধিটাও আবার ভালো কাজ করে না, তোমার আর হিজিবিজি  অঙ্কের মাঝখান থেকে আমার এখন চলে যাওয়াই সমীচীন।দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে চেঁচিয়ে উত্তর দিল গিনি -“আসছি দিদা! “গিনির চলে যাওয়া নিঃস্পলকে দেখে পুরোনো  হিসাবে মগ্ন হল সময়।

যুগপৎ

Comment 1 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

ফর্মুলার খাতায় আরো একবার চোখ বুলিয়ে নিল গিনি । গত কয়েক মাসের নিরলস পরিশ্রম স্বার্থক হলে ,তার তৈরী নতুন যন্ত্র টি দূর করতে পারবে একাকিত্ব , নিঃসঙ্গতা  প্রভাবিত হবে ফর্মুলার যাদু কাঠিতে , জীবনের হিসেব মুহুর্তে বদলে দিয়ে অসাধ্য সাধন করবে যন্ত্রটির ইচ্ছা বোতাম ,  তবে আগের  যন্ত্র গুলোর  মতন সম্পূর্ণ গিনির ইচ্ছায় পরিচালিত হবে না এটি , নিজের প্রয়োগ স্থান এবং পদ্ধতি নির্দিষ্ট করবে এটির ভিতরের ইচ্ছা বোতাম। যদিও তার অন্য আবিষ্কারের মত এটির কার্যকারিতাও পরীক্ষা সাপেক্ষ, তবুও গিনির চিন্তা জুড়ে অবাধে যাতায়াত করে চলল নতুন আবিষ্কারের উত্তেজনা। যন্ত্রটিকে টেবিলের উপরে রেখে বিছানার উপরে শুয়ে পড়তেই প্রিয় লজেন্সের আদরে ভিজে গেল গিনির ক্লান্ত শরীর।

শনিবার সকালে উঠে যন্ত্রটি হাতে নিয়ে মা কে বলে আলুভাজা দিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ল গিনি । রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সেই ছোটবেলা থেকে পাড়ার এই প্রবীণার সাথে এক অলৌকিক  মায়ার বাধনে বাঁধা সে, তার ছোট্টবেলার গোসাঘর হল দিদার চিলেকোঠার ধারের সিড়ির তলা । সেই গোসা ভাঙ্গানোর একমাত্র ওষুধ ছিল দিদার হাতে তৈরী ঝিরঝিরে আলুভাজা । দিদার কাছে নানা রঙের গল্প শুনে রাগের কারণ ভুলে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ত ছোট্ট গিনি , নিজের অজান্তে বাবার কোলে বাড়ি ফিরতো ঘুমন্ত মেয়েটা । খুব অল্প বয়সে বিধবা নিঃসন্তান এই মহিলার ভিতরের সীমাহীন ভালবাসা গিনির ছোটবেলার স্মৃতিকে আজকের ব্যস্ততার ভিড়েও ম্লান হতে দেয়না । বয়সের কারণে এখন প্রায় গৃহবন্দী একসময়কার ভীষণ কর্মঠ  মহিলা  নিহারী গুহ ওরফে গিনির আলুভাজা দিদা । প্রতিবেশীদের  থেকে শহরের নাম করা বৃদ্ধাশ্রম গুলোর সুযোগ সুবিধা অনেকবার শুনেও কিছুতেই এই বাড়িটার মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেননি নিহারী দেবী , ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী রক্ষনশীল পরিবারের মেয়েটি  কলেজে পড়াকালীন সকলের অমতে  বিয়ে করেন তার ভালবাসার  মানুষকে  , স্বামীর হাত ধরেই  বিয়ের রাতে প্রথম বার পা দেন  শ্বশুরের তৈরী করা এই বাড়িটি তে। বাড়িটির পবিত্রতা নিহারী দেবীর  কাছে মন্দিরের চেয়েও বেশী । ছোটবেলায় মা হারানো  একটি ছেলের  বড় হওয়ার নির্বাক সাক্ষী এই বাড়িটি, বাকি সকলে মুখ ফিরিয়ে নিলেও, ছেলেটির  স্ত্রীকে  প্রথম দেখাতেই   নিজের সবটা দিয়ে আপন করে নিয়েছিল এই বাড়ির প্রতিটা কোণা ,নিজের সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে  বেঁধে নিয়েছিল অলৌকিক মায়ার বাঁধনে । বিয়ের পরের কাটানো রঙীন দিন গুলোর স্মৃতি আজও বাড়িটার সর্বত্র লেগে আছে , হঠাৎ অসুখে স্বামীকে হারিয়ে সেই স্মৃতি আঁকড়েই  নিহারী দেবী কাটাতে পেরেছেন এতগুলো বছর , তাই কিছুতেই এই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন না  তিনি , তবে সারা জীবনে জুড়ে  তৈরী করা নিঃস্বার্থ সম্পর্ক গুলোর  গাঁট  আজও একই রকম অক্ষত, গিনির মত ভক্তের সংখ্যা  তার অগনিত কিন্তু  ব্যস্ত জীবনের চাপে স্বাভাবিক কারণেই  যখন তখন  স্বনিমন্ত্রিত অতিথির  সংখ্যা আজকাল হ্রাস পেয়েছে, শারীরিক অক্ষমতার কারণে নিজেও আর কারো বাড়ি বেশী যান  না , অভ্যাসের বলে এই বয়সেও সংসারের দৈনন্দিন  কাজ গুলো নিজেই করে থাকেন তাই বলা বাহুল্য কাজের লোকের  প্রয়োজন তার কখনো ই পড়েনি ,তাই নিহারী দেবীর  এখনের  একাকিত্বের দায়ভার শুধুই  যেন সময়ের । প্রিয় আলুভাজা দিদার  শারীরিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার উপায়  গিনির অজানা হলেও তার শেষ বয়সের একাকিত্ব দূরের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রমে সে তৈরী করেছে ‘যুগপৎ’ নামের এই নতুন যন্ত্রটি।

দিদার বাড়ির কড়া নাড়তেই দেখা মিলল সেই ছোট্টবেলা থেকে পরিচিত হাসি মুখ টার , পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রনাম করেই গিনি বলল,  “কী করব ? সকাল সকাল আলুভাজা খেতে ইচ্ছা হল যে ! ” নিহারী দেবী হেসে বললেন “ভাগ্যি আমার ! তাই না সোনা মেয়েটার দেখা পেলাম !” দিদাকে জড়িয়ে ধরে গিনি বলল , ” আমি বুঝি খুব স্বার্থপর?” সাথে  সাথে  দিদার শক্ত গলার  আদর জড়ানো  প্রত্যুত্তর “বালাই শাঠ!কান টা  যে অনেকদিন মোলা হয়নি  কথা শুনে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।” গিনি খিলখিল হেসে ছোটবেলার অজস্র স্মৃতি  জড়ানো বাড়িটাতে ধীর পায়ে মিশিয়ে দিল নিজের উপস্থিতি ।

আলুভাজা ভাজতে ব্যস্ত নিহারী দেবীর পিছনে  দাড়িয়ে গিনি ব্যাগ থেকে যন্ত্রটি বার করল, ইচ্ছা বোতামে আঙ্গুল ছোঁয়ানো  মাত্র  যন্ত্র থেকে বেরোনো আলো রশ্মি নিহারী দেবীকে স্পর্শ করলো ,নিহারী দেবী চমকে উঠে পিছন ফিরতেই গিনি যন্ত্রটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে ব্যাগের পিছনে আড়াল করে নিল। নিহারী মৃদু হেসে বললেন , “কি রে ! দিনের বেলায় টর্চ জ্বালছিস কেন ? ভাবছিস বুঝি দিদার চোখ টা একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে , ঝাপসা দৃষ্টি তে সাধের আলুভাজা বেস্বাদ হয়ে গেল বুঝি !” গিনি খানিকটা সামলে নিয়ে বলল ,”ধ্যুর ! তা কেন হবে ! আলুভাজার গন্ধে তাড়াতাড়ি আসতে গিয়ে অসাবধানে টর্চে হাত পড়ে গিয়েছিল ।কখনো কখনো কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতে দেরী হয় বলে মা এটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছে ।” নিহারী দেবীর উত্তর না শুনেই রান্নাঘর থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল  গিনি , বসার ঘরে ঢুকে যন্ত্রটা সামনে আনতেই  তা থেকে বিচ্ছুরিত আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল  তার , কয়েক সেকেন্ড পর ইচ্ছা বোতাম ভিতরে ঢুকে যেতে যন্ত্রের  আলো নিজে থেকে নিভে গেল । যন্ত্রটি নিহারী দেবীকে পর্যাপ্ত নিরীক্ষণের সুযোগ পেল না তাই তার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে উদ্বেগে গিনির মন ভরে  গেল।

দিদার সাথে সারাদিন অনেক গল্প করে সন্ধ্যে বেলা বাড়ি ফিরল গিনি।টেবিলের ওপর চিন্তায় অবশ  মাথা রেখে  নিজের অজান্তেই  সে  কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল ,মা ঘরে ঢুকে মাথায় হাত রেখে বললেন , “ক্লান্ত লাগছে  খুব , তাই না ? কতবার বলেছি এদিক সেদিক ঘুরিস না  ছুটির দিনগুলো তে।” গিনি চোখ কচলে উঠে খাটে শুয়ে বলল , “ক্লান্ত না হলে যে তুমি  তো আদর ই কর না !” মা হেসে পাশে বসে বললেন , “তাই বুঝি ! তোর লজেন্স কে জিজ্ঞাসা কর ! আজ সারা দুপুর আমার আদর খেয়েছে । ” নিজের নাম শুনে আল্হাদে গদগদ লজেন্স দৌড়ে  বিছানায়  উঠে গিনি আর মায়ের মাঝে ঠেলে  নিজের জায়গা করে আদরের বিশেষণ গুলো কে আরো একবার  লালাময় করতে লাগল ।

দুটো দিন বেশ চিন্তায় কাটল গিনির, অনেকবার ভেবেও আলুভাজা দিদার বাড়ি যেতে পারেনি সে , গিনি গেলেই দুর্বল শরীর নিয়ে দিদা রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্য কোনো উপায়ও তো নেই  , দুদিন আগে ঘুরে এসে ,এখনই ফোন করে খবর নিলে দিদার অদ্ভূত লাগতে পারে । সকালে জলখাবারের টেবিলে পৌঁছে বাবাকে একটা বই মনোযোগ সহ পড়তে দেখে  গিনি বলল , ” বাবা ! তুমি না শিখিয়েছ খাবার সময় অন্য কাজ করতে নেই ! ”

মা : তুই তো এখন দেখছিস ! এ চলছে কাল রাত থেকে , সারারাত ঘরে আলো  জ্বালিয়ে রেখেছিল তোর বাবা ! দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি মোটে , তোমার না হয় অফিসে না গেলে  চলবে , আমার সংসারের কাজে তো আর ছুটি নেই বাপু !

বাবা:  আরে ! এই বইটার কি অদম্য আকর্ষণ তোমাদের কী বলব! শেষ না করে এটার থেকে চোখ সরানো  এখন অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে ।

গিনি: তাই ? কী বই এটা ?

বাবা : মনস্ত্ব ত্ব কেন্দ্রিক  এমন জটিল কিছু তথ্য লেখা যা আমার মত ঘুম কাতুরে লোকেরও ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ !

গিনি : মনস্ত্ব ত্ব ? কই দেখি ! উহু !  আমার বইয়ের তাকের সদস্য তো নয় এটি , তাহলে বই টা কে দিল তোমাকে ?

বাবা : নিহারী মাসিমার  বাড়িতে আসা নতুন ছেলেটি !

গিনির চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল  : আলুভাজা দিদার বাড়িতে কেউ এসেছে?

বাবা : ওহ ! তোকে তো বলতে ভুলেই গেছি ! কাল অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় ভাবলাম মাসিমার খবর টা নিয়ে আসি , বাড়ি যেতেই উনি এই নতুন ছেলেটির  সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন ,বললেন  পেয়িং গেস্ট । ছেলেটি ব্যবহার যেমন  চমৎকার তেমনি

প্রশংসনীয় ওর সংগ্রহের বইগুলো ! এত সুদর্শন যুবক আমি আগে  দেখেছি বলে মনে পড়ে না , কিন্তু নিষ্পাপ মুখের মধ্যে কোথাও যেন একটা জটিল রহস্যের ছায়া ! আমি নিহারী দেবীকে আড়ালে বলে এলাম , ছেলেটির ব্যাপারে ভালো করে খোঁজ নিয়ে নিতে ,এখন যা দিনকাল পড়েছে !

গিনিকে অন্যমনস্ক দেখে মা ধাক্কা দিয়ে বললেন , ” খাবার টা খেয়ে নিয়ে বিজ্ঞানে মনোনিবেশ করলে ভালো হয় !”

গিনি : এখন আর সময় নেই মা ! আমাকে এখনি বেরোতে হবে ।

গিনি রুদ্ধশ্বাসে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই , মা খাবার গুলো ঢাকা দিতে দিতে বললেন , ” যেমন বাপ্ তার তেমনি মেয়ে ! তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস গিনি ! তুই না এলে কিন্তু আমি খাব না !”

আলুভাজা দিদার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তেই অচেনা ছেলেটি দরজা খুলে দাড়ালো ।

গিনি : আপনি ?

ছেলেটি : আমি আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িং গেস্ট ।

গিনি বিস্ময় আড়াল করে বলল, ” আপনি আমাকে চিনলেন কী করে   ?”

ছেলেটি : আমি চিনিনি তো ! দরজায় লাগানো যন্ত্র টা  চিনেছে ।

গিনি: যন্ত্র ?

ছেলেটি : হুম ! দিদার কাছের মানুষদের নাম , ছবি , আর কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে আমি এতে ঢুকিয়ে রেখেছি , কালকেই আপনার বাবা দিদাকে বলছিলেন আজকাল দিনকাল বিশেষ ভালো নয় , সাবধানের মার নেই । তাই ভাবলাম দরজা খোলার আগেই যদি দিদাকে আগন্তুকের পরিচয় জানিয়ে দেওয়া যায় ।

গিনি নিজের থতমত ভাবটা কাটিয়ে যন্ত্রটি খুঁটিয়ে দেখে বুঝল এটি দোকান থেকে কেনা নয় , তাই রাখঢাক না করেই প্রশ্ন করল , :

যন্ত্রটি আপনি বানিয়েছেন ?

ছেলেটি : হুম ।

গিনি : আপনি তো ২ দিন হবে এসেছেন , এর মধ্যে প্রয়োজন বুঝে যন্ত্রটা বানিয়ে ফেললেন ? নাকি অন্য কোনো

প্রয়োজনে এটা আগেই বানিয়েছিলেন ?

ছেলেটি : সে হিসেব না হয় আপনি কষে দেখুন , আমার জন্যে অন্য অনেক জরুরি অঙ্ক অপেক্ষায় আছে ।

গিনির উত্তরের আগেই  নিহারী দেবী দরজায় এসে বললেন , ” আমি অনেক ক্ষণ থেকে তোর গলার আওয়াজ শুনছি , এখনও ভিতরে আসছিস না দেখে শেষমেষ বুড়িকে আসতেই হল , আলুভাজা ভাগ হওয়ার ভয়ে  আর কত ঝগড়া করবি ? ভিতরে আয় তাড়াতাড়ি ।”

গিনি : আহ দিদা ! তুমি বুঝতে পারছ না , এরকম অচেনা অজানা কাউকে হুট করে পেয়িং গেস্ট রাখা আজকাল একদম উচিত নয়,কাগজে তো প্রায়ই  দেখা যায় পুলিশের চোখ এড়াতে সন্ত্রাসবাদীরা ছদ্মবেশে নিরিবিলি জায়গায় গা ঢাকা দেয়।

নিহারী দেবী ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত ভাবে বললেন , “এই পাগলী মেয়েটার কথা শুনে তুমি কিছু মনে কোরো না বাবা !”

ছেলেটি কোনো জবাব না দিয়ে মৃদু  হাসল ।

নিহারী দেবী এবার গিনির দিকে তাকিয়ে রাগের ভান করে বললেন , ” এত লেখা পড়া করে একি ব্যবহার গিনি ! এমন বুঝি কাউকে বলতে আছে ? ও সন্ত্রাসবাদী হতে যাবে কেন ? ও তোর মতই ভীষণ মেধাবী ছাত্র, মনস্তত্ব ও আরো কিছু জটিল বিষয়ে রিসার্চ করছে,সেই কাজেই কিছুদিন এখানে এসেছে ।”

গিনি : তুমি কী ভাবছ সন্ত্রাস বাদীরা মেধাবী হয় না ? ওদের মত মেধা বড় বড় বৈজ্ঞানিকেরও নেই । তাছাড়া তুমি তো কোথাও বিজ্ঞাপন দাওনি , ও কোথা থেকে জানল যে তুমি পেয়িং গেস্ট রাখতে চাও ? সন্দেহের আরো কারণ আছে ,  দুদিনের মধ্যে দরজায় লাগানো যন্ত্রটা বানানো কিছুতেই সম্ভব নয় , তাছাড়া তোমার মত নির্ঝ ঞ্ঝাট  মানুষের বাড়ির দরজায় ক্যামেরা লাগানোর কী প্রয়োজন !

নিহারী দেবী : আহ গিনি ! বিজ্ঞাপন না দিলেও আমি পাড়ায় অনেক কে বলেছিলাম পেয়িং গেস্টের কথা , সুনীতার কাকুর সুত্রে ও আমার

বাড়ি এসেছে , এভাবে ভাবতে নেই মাগো ! যাই হোক ঝগড়ার বহর তো দেখলাম , ওর সাথে পরিচয় করেছিস কী ?

গিনি অস্তত্বি ভাবটা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে না পেরে অসম্মতি সূচক মাথা নাড়ল ।

নিহারী দেবী ভিতরে যাবার আগে অমায়িক হেসে দরজার পাশে চুপ করে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটির উদ্দেশ্যে বললেন , “এই পাগল মেয়ের সন্দেহ দূর করার দায়ভার তোমার উপরে রইল  সময় ।

গিনি : সময় ?

ছেলেটি এবার মৃদু হেসে গিনির দিকে রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল , “হুম ! আমার নাম ।”

উপরের ঘরে ছেলেটির বইয়ের সংগ্রহ থেকে গিনি মনে মনে প্রশংসা না করে পারল না , কিন্তু  দিদার এই নতুন অতিথির হঠাৎ আগমন যুগপৎ  র  ইচ্ছা বোতামের সাফল্য নাকি নিতান্তই কাকতালীয়  ঘটনা তা না জানা অব্দি সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না ।

সে হঠাৎ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো  : আপনি এখানে কেন এসেছেন ?

সময় : ওই যে তখন দিদা বলল , রিসার্চের প্রয়োজনে ।

গিনি  উদ্বেগ ভরা গলায়  আবার প্রশ্ন করল : শুধু কি তাই ?

ছেলেটির নিষ্পাপ মুখে আবার রহস্যময় হাসি ফুটল  : না ।

গিনির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো  : তাহলে ?

সময় : সময়ের উদ্দেশ্য জানতে হলে যে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয় গিনি !

গিনি ম্লান দৃষ্টি আড়াল করে পিছনে ঘুরে প্রশ্ন করল : তা কতদিন থাকবেন ?

সময় : অনন্ত কাল ..

গিনি চমকে তাকাতেই ছেলেটি হেসে বলল : অনন্ত কাল নয় ! সময় হলেই চলে যাব ।

গিনি : পরিচয়ের জন্য শুধু নাম যথেষ্ঠ নয় ,আপনি কোথা থেকে এসেছেন ? আপনার পদবী কী ?

সময় : আমার জন্ম পরিচয় নিজেরই অজানা , জটিল হিসেব মেলাতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরি ফিরি , এখানে আসার আগে নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা ছিল না । আপনার সন্দেহ স্বাভাবিক , সন্ত্রান্সবাদী যে নই তার প্রমাণও আপাতত নেই, কিন্তু বিশ্বাস করুন দিদার সাথে কাটানো এই অল্প মুহুর্তের মায়া কাল যুগের অতীত সমান ভারী মনে হচ্ছে , একা থাকার পুরনো অভ্যেস ফিরে পেতে আর কিছুতেই মন চাইছে না ।

গিনি : দিদা এরকমই । খুব অল্প সময়ে পর কে আপন করে নেয় , সে জন্যই তো ভয় ..

সময় : ভয় পাবেন না । আলুভাজা আমি খাই না ।

গিনি হাসলো না , চিন্তায় ডুবে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল ।

হঠাৎ টর্চের আলো চোখে পড়ায় চমকে তাকাতে ছেলেটি বলল : দেখুন দেওয়ালে আপনার ছায়া পড়েছে ।

গিনি : এ তে দেখবার কি আছে ? আলো জ্বললে ছায়া তো পড়বেই ।

সময় : হুম তা ঠিক , কিন্তু আমি আপনার নয় ,পাশে রাখা ফুলদানি টার ছায়া ফেলতে চেয়েছিলাম । তার মানে আলো যার যার গায়ে পড়বে ছায়াও তারই পড়বে , এখানে আলোর ইচ্ছা শুধু একটাই , অন্ধকার দূর করা ,কিন্তু সেটার পরিধি নির্দির্ষ্ট করার দায়িত্ব যে তার নয় । তবে দীর্ঘ অন্ধকারের একাকিত্ব দূরের জন্য আলোর প্রথম ঝলক অস্বস্তি র কারণ তো বটেই ।

গিনির মনে পড়ে গেল  যুগপৎ র আলোয়  তার চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার কথা , সে ভীষণ ভয় পেয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল ,”আপনি কী বলতে চাইছেন ?”

ছেলেটি আবার সেই রহস্যময় হাসি মেখে বলল ,”বলছিলাম দিদার মত মানুষের স্নেহের পরিধি মাপা অসম্ভব , আপনার পাশে রাখা ফুলদানি টার মত অল্প স্বাদ না হয় আমিও পেলাম , এতে আপনার ভাগ যে কম পড়বে না সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন ।

বাড়ি ফিরে চিন্তার মধ্যেও এক অদ্ভূত স্বস্তিতে গিনির মন ভরে গেল , যুগপৎ র ফর্মুলা তাহলে সফল , দিদা আর একা নেই , নতুন ছেলেটি যতই অদ্ভূত হোক এই অল্প সময়েই দিদাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছে । হঠাৎ  মায়ের ডাকে চমক ভেঙ্গে পাশের ঘরে যেতেই যে অপ্রত্যাশিত খুশিতে সে লাফিয়ে উঠল , “জ্যাঠামনি তুমি!”  অমায়িক ভদ্রলোক দুহাতে গিনিকে জড়িয়ে বললেন , “হুম রে  ! আমিই তো ! তোদের জন্য মন কেমন করছিল ,তাই চলে এলাম !”

গিনি : এবার কিন্তু না বলে চলে গেলে আর কোনোদিনও কথা বলবো না ।

জ্যাঠামনি : বললে যে তুই যেতে দিস না মাগো ।

গিনি : “দেবই না তো । জেম্মা থাকতে তুমি তো এমন ….”

গিনির অসম্পূর্ন কথার উত্তরে জ্যাঠামনি মৃদু হেসে বলল , “ধ্যুর পাগল মেয়ে ! তোর জেম্মা থাকবে না কেন? সে না থাকলে তোর জ্যাঠামনি থাকতো বুঝি ? চোখের দেখা একরকম বিলাসিতা বলতে পারিস , সময়ের সাথে সে বদভ্যাস কেটে গেলেই আর কোনো অসুবিধা হয় না । ”

নিরুত্তর গিনি চিন্তার গভীরে আরো একবার হারিয়ে গেল । কয়েক বছর আগে জেম্মার হঠাৎ মৃত্যুতে জ্যাঠামনিকেও কখন যেন হারিয়ে ফেলেছে সে  । চাকরীতে সময়ের আগে অবসর নিয়ে বছরের বেশীর ভাগ সময় টাই জানা অজানা জায়গায় ঘুরে কাটায় জ্যাঠামনি , জরুরি দরকারেও যোগাযোগের কোনো মাধ্যম বা উপায় কোনোটাই নেই , অগত্যা এভাবে জ্যাঠামনির হঠাৎ ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গোনাই তাদের শেষ কবছরের অভ্যাস। গিনির মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল, একাকিত্বের এই ভীষণ দমবন্ধ মায়াজাল থেকে বার করে যুগপৎ নিশ্চই পারবে ফিরিয়ে দিতে তার জ্যাঠামনিকে পুরোনো জীবন , পালিয়ে বেড়ানোর প্রয়োজন ফুরালেই জ্যাঠামনির ভিতরের প্রাণখোলা আত্মভোলা মানুষটার হাসির আওয়াজে এ বাড়ির দেওয়াল গুলো আরো একবার ঝনঝন করে উঠবে ।

সারাদিন জ্যাঠামনির সাথে অনেক গল্প করেও প্রতিবারের মতো এবারেও গিনির স্বাদ মেটেনি , তবুও আজ তার কোনো তাড়া নেই ,মনে ভয় নেই , জ্যাঠামনি তো এখানেই থাকবে, সবসময় । আর কখনো গিনিকে জ্যাঠামনির ফিরে আসার অপেক্ষা করতে হবে না । জ্যাঠামনির ভিতরে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো মানুষটার সাথে  ফিরে আসবে গিনির ছোটবেলা । প্রহর শেষের আগেই  তা নিশ্চিত করবে গিনি , সব কিছু ঠিক আগের মতো করে দেবে ফর্মুলার জাদু কাঠিতে । ভাবনা মতই সকলে ঘুমিয়ে পড়লে গিনি জ্যাঠামনির ঘরে  যন্ত্রটা নিয়ে এসে তার ইচ্ছা বোতাম টা টিপতেই জ্যাঠামনির সারা শরীর যন্ত্রের  বিচ্ছুরিত আলোতে ভরে গেল, তার সাথে  অসীম পূর্ণতার আনন্দে আলোড়িত হল গিনির মন ।লজেন্স কে জড়িয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে ভিতরের ভীষণ আনন্দে তার চোখ জলে ভরে উঠলো  ,আরো একবার তার  আবিষ্কার  তাকে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক   নতুন করে ফিরিয়ে দেবে।

সকালে মায়ের  ডাকে  ঘুম  ভাঙলো গিনির । গিনি হাসিমুখে মা কে জড়িয়ে ধরে বললো , “আমি আজ খুব খুশী মা । জ্যাঠামনি আর কখনো আমাদের ছেড়ে যাবে না দেখো । জ্যাঠামনি কে আর কখনো একা থাকতে হবে না ।”

নিরুত্তর মায়ের চোখের দিকে তাকাতেই গিনি চমকে উঠলো , “মা ! তুমি কাঁদছো ? তবে কী !” গিনি দৌড়ে জ্যাঠামনির ঘরে যেতেই  তার মনে হল খালি ঘরটার  দেওয়াল গুলো থেকে যেন তার বিশ্রী ভাবে হেরে যাওয়ার ছবি প্রতিফলিত হচ্ছে । অসম্ভব কে সম্ভব করার স্বপ্ন তাকে এতটাই বিভোর করে দিয়েছিল ব্যর্থতার বিদ্রুপ চাহনী আজ তার অসহ্য মনে হচ্ছে । মুহূর্তে তার সমস্ত চিন্তাশক্তিকে ভর্ৎসনা করে নিজের ওপর প্রচন্ড রাগে গিনি যন্ত্র টা ব্যাগে নিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল । বাড়ির সামনের লেকের ধারে পৌঁছে যন্ত্রটা জলে ফেলতে যেতেই একটি অচেনা হাত তার থেকে যন্ত্র টা কেড়ে নিয়ে নিল , বিস্ময়ে তাকাতেই আগন্তুক টিকে চিনতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হল না ।

গিনি :  আপনি ?

ছেলেটি : কিছু  অঙ্ক মিলছিল না , ভাবলাম লেকের ধারের  স্নিগ্ধ হাওয়ায় মাথাটা খুলে যেতে পারে  ,তাই এদিকে এসেছিলাম , হঠাৎ আপনাকে দেখে..

গিনি : বুঝলাম ! কিন্তু আমি এখন একটু একা থাকতে চাই ।

ছেলেটি : তা তো আর হয় না ।

গিনি: মানে ?

ছেলেটি : বলছিলাম যন্ত্রটা ফেলে দিচ্ছেন  যখন এটা নিশ্চই আর আপনার দরকার নেই , তাই এটা আমার কাছে থাকলে  আপনার কোনো আপত্তি থাকার কথা নয় ।

গিনি : ও যন্ত্র কোনো কাজের নয় ।

ছেলেটি :আপনার না হতে পারে , আমার  কাজের।

গিনি : আহ ! বললাম তো আমার নয় , আপনার নয় ,কারোর কাজের নয়  ওটা ।

ছেলেটি : তাহলে সবটাই কাকতালীয় বলছেন ?

গিনি রাগে অস্থির হয়ে বললো : তাছাড়া আবার কী ? যদি সত্যি ই  এতে একাকিত্ব দূরের ক্ষমতা থাকতো তাহলে কি আমার জ্যাঠামনিকে মুক্তি দিতে পারতো না  ? ভিতরের যন্ত্রনা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে যে মানুষটা পালিয়ে বেড়াচ্ছে , ফর্মুলার জাদুকাঠিতে পারতো না তাকে কাছের মানুষগুলোর কাছে ফিরিয়ে দিতে ?

ছেলেটি : যুগপৎ শক্তির অধিকারী ঠিকই কিন্তু তার শক্তি একাকিত্ব দূর করাতেই সীমিত ,মৃত ব্যক্তিকে জীবন দান তার ক্ষমতার  উর্ধ্বে । একাকিত্ব দূরের চেষ্টায় যুগপৎ সফল হয়নি কারণ আপনার জ্যাঠামনি একা নন , উনি আজও নিজেকে ওনার স্ত্রীর থেকে আলাদা মনে করেন না । স্ত্রীর মৃত্যু শুধু ওনার  বেঁচে থাকার গণ্ডি ভাঙতে পেরেছে , একা করতে পারেনি । দেহের মৃত্যু মেনে নিলেও ভালোবাসার মৃত্যু উনি এক মুহূর্তের জন্যেও মানেন নি গিনি ! সেই ভালোবাসার মোড়কে তার যাযাবর জীবন সমাজের অযাচিত হস্তক্ষেপে পাচ্ছে অস্বস্তি বোধ করে , তাই তার এই পালিয়ে বেড়ানো ।

গিনি দুচোখ ঢেকে অসহায় কান্নায় গুমড়ে উঠলো ।

ছেলেটি তার কাছে এসে বলল , “বৈজ্ঞানিকের চোখের জলে ফর্মুলা ধুয়ে গেলে আমাকেও যে ফিরে যেতে হবে গিনি !”

দুর্বলতা কাটিয়ে  চিন্তাশক্তি ফিরে আসতেই গিনি চমকে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অস্থির ভাবে প্রশ্ন করলো , “আপনি আমার ব্যাপারে এতো কিছু জানলেন কী করে ?  আপনি ..আপনি  কে ?

ছেলেটি  চেনা রহস্যময় হাসি হেসে বলল : আমি ? আমি সময় । আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িং গেস্ট । দিদার থেকেই শুনেছি হবে, নাহলে আর কী করে জানবো বলুন !

গিনি : কিন্তু আলুভাজা দিদা তো এতকিছু …

গিনিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ছেলেটি কানের কাছে এসে বললো , ” করুন না , যা আপনি সবসময় করেন , অপেক্ষা ! সময়ের অপেক্ষা !”

বিস্মিত গিনি নিজের সবটুকু  দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত প্রশ্ন করলো , ” সময় ? মানে আপনার  অপেক্ষা ?”

চলে যাওয়ার আগে ছেলেটি পিছন ঘুরে আরো একবার রহস্যময় হাসি হেসে বললো , “করবেন না  ? তাহলে না হয়  যুগপৎ র  ফর্মুলার কার্যকারিতা  প্রমাণের অপেক্ষা করুন , লেকের জলে পড়া থেকে বাঁচানোর পর এটুকু দায়িত্ব তো তার উপর আমার থেকেই যায় । ”

 

প্রত্যাবর্তন

Comments 6 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

নিজের আবিষ্কৃত মাইন্ড রিডার যন্ত্রটি , গিনিকে তার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উপলব্ধি করিয়েছে। ছোট বেলায় মা হারানো মেয়েটা , এক অচেনা নারীর মধ্যে মায়ের মমতার সন্ধান পাওয়ায় , তার সম্পূর্ণ  অস্তিত্ব , এক অসম্ভব পরিতৃপ্তিতে ভরে উঠেছে , সেই স্বর্গী য় অনুভূতি ই তাকে এক  নতুন ফর্মুলা তৈরীর অনুপ্রেরণা দিয়েছে । গিনির ব্যস্ত আঙ্গুল  সেই ফর্মুলায় তৈরী নতুন যন্ত্রের শেষ  স্ক্রু টা আটকে দিল । যন্ত্রটির বিশেষত্ব হল  , হারানো জিনিস ফিরিয়ে দেওয়ার অলৌকিক ক্ষমতা,  তবে সেই ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত , জন প্রতি যেকোনো একটি  জিনিসই এটি ফিরিয়ে দিতে পারবে। এখন নতুন যন্ত্রটি  প্রত্যাশা মত  কাজ করবে কিনা আর যদি করেও তাতে কতটা সময় নেবে, তা পরীক্ষা সাপেক্ষ ।

মাইন্ড রিডার যন্ত্রটিকে হাতে নিয়ে  বিছানায় তার প্রিয় কুকুর লজেন্সের পাশে  শুয়ে পড়ল গিনি। লজেন্স তখন  গিনির নতুন কিনে দেওয়া প্লাস্টিকের হাড় টা আপন মনে কামড়াতে ব্যস্ত , গিনি তার গায়ে হাত রেখে আদর করে বলল , “লজেন্স! তোর ভীষণ প্রিয় কোনো কিছু  কি হারিয়ে গেছে  ?” মাইন্ড রিডার  যন্ত্র টা থেকে উত্তর  ভেসে এলো , “গেছেই  তো , তোর কিনে দেওয়া লাল বল টা । তুই যখন বাড়ি থাকতিস না , আমি তো ওটাকেই গিনি ভেবে জড়িয়ে শুয়ে থাকতাম । হতচ্ছাড়া লালুর বড় লোভ ছিল ওটার ওপর, আমার তো ওকেই বল লোপাটের পিছনে  সবচেয়ে বেশী  সন্দেহ হয় ।” গিনি দ্রুত বিছানা থেকে উঠে গিয়ে টেবিলে রাখা  নতুন যন্ত্রের ‘ON’ বোতাম টা টিপে দিয়ে বলল, “লজেন্সের লাল বল ফিরিয়ে দাও প্রত্যাবর্তন ।” প্রত্যাশা মতই যন্ত্রটি সাথে সাথে লজেন্সের সারা শরীর ক্ষনিকের বৈদ্যুতিক আলো দিয়ে স্ক্যান করে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল । এরপর শুধু ইচ্ছাপূরণের অপেক্ষা ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার নেই ।

পরদিন সকালে গিনি ঘুম থেকে উঠে  দেখলো , লজেন্স তার সেই খেলনা হাড় টা নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে , ঘরের চারিদিকে তাকিয়েও লজেন্সের হারিয়ে যাওয়া বলের ফিরে আসার কোনো চিহ্ন গিনি দেখতে পেল না।

“না ! না ! এত তাড়াতাড়ি  হার মানলে চলবে না” , নিজের মনেই বলে উঠলো সে । চটপট মুখ ধুয়ে ব্রেকফাস্টের টেবিলে গিয়ে বলল , ” মা ! তোমার কি কিছু হারিয়ে গেছে ?”

টেবিলে খাবার সাজাতে ব্যস্ত ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে বলল , ” কই না তো ! কেন বলতো ? “

গিনি : “ভেবে বলো , এমন কিছু , যা তুমি ফেরৎ চাও , যা না পেলে তোমার জীবন অসম্পূর্ণ ।”

মা : “না আমার কিছু হারায়নি , স্বামী  সন্তান  নিয়ে সুখী পরিবার আমার , ওত চাই চাই করলে ভগবান রাগ করবেন যে! তা তুই বা হঠাৎ একথা জিজ্ঞাসা করছিস কেন ! লজেন্স নিশ্চই আবার কিছু মুখে করে নিয়ে গিয়ে তোর ঘরে রেখেছে !”

গিনি : “আরে না না ! সে তোমায় পরে সব খুলে বলব ক্ষণ ,এখন আমায় একটু প্রতিমা মিসের বাড়ি যেতে হবে ।”

মা : “সে যা কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস । “

নতুন যন্ত্রটা হাতে নিয়ে  প্রতিমা মিসের বাড়ির উদ্দ্যেশে বেরিয়ে গেল গিনি। প্রতিমা মিস গিনির সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষিকা, উনি না থাকলে, বিজ্ঞান কে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে , গিনির বোধহয় আর শেখা হত না। মিসের বাড়িতে কয়েকবার তার ছেলেকে গিনি দেখেছে । কাজের সুত্রে আমেরিকা নিবাসী ছেলের অনেক অনুরোধ সত্তেও  মিস এই বাড়ি ছেড়ে বিদেশ যেতে রাজী না হওয়ায়  ,শেষমেষ মায়ের জেদের কাছে হার মেনে খুব শিগগিরি পরিবার  নিয়ে তার স্থায়ী ভাবে দেশে ফেরার কথা । স্কুলের  বন্ধুদের মুখে গিনি  শুনেছে , প্রতিমা মিসের  একটি মেয়েও ছিল । ২৫ বছর আগে সেই ষোড়শী মেয়েটি ,হঠাৎ সকালে নিজের পছন্দের ভালবাসার হাত ধরে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার আগে নিজের বাবা মায়ের জন্য রেখে গিয়েছিল ,একটি  চিঠি আর বাকি জীবনে সীমাহীন কষ্টের কঠিন অভিশাপ। এতদিন এত কথার মধ্যেও মিসকে  কখনো কাউকে সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়ের কথা  বলতে গিনি শোনেনি ,তার মত মায়ের দুঃখ সইবার ক্ষমতা অতি বড় বিধাতার ভাগ্যলিখন কে যে অবলীলায় বিদ্রুপ করতে পারে , সেই নির্মম সত্যি ব্যক্ত করে মিসের মুখে নিরন্তর হাসি। তবুও সেই হাসির আড়ালে লোকানো ,বছর পুরনো কষ্ট , গিনির সংবেদনশীল মনের কাছে  বার বার ধরা পড়েছে। মিসের  অনুপস্থিতিতে সে মেয়ে যদি কোনদিন বাড়ি এসে  বন্ধ তালা দেখে  আবার  ফিরে যায় , সেই ভয় ই যে মিসকে  এ  বাড়ি ছেড়ে কখনো কোথাও যেতে দেয়নি , তা আরো অনেকের মত  গিনিও  জানে । গিনির যন্ত্রটার অলৌকিক শক্তি কি পারবে সেই অভিশাপের যন্ত্রণার বদলে বৃদ্ধা  মায়ের মুখে এক চিলতে হাসি ফিরিয়ে দিতে? “নিশ্চই পারবে”, ভিতর থেকে জবাব পেল সে ।

দরজার কলিং বেল টা বাজতে প্রতিমা মিস দরজা খুলে দিলেন , এত বয়সেও উনি কারোর উপর নির্ভর করতে পছন্দ করেন না , বিদেশ থেকে ছেলের পাঠানো এই  অত্যাধুনিক স্বয়ং ক্রিয় হুইলচেয়ার টি ,তার মায়ের স্বনির্ভর থাকার ইচ্ছাপূরণে অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।

প্রতিমা মিস হেসে বললেন , “ভেতরে আয় ! কেমন আছিস গিনি ? এতদিন বাদে বুঝি মিসকে মনে পড়ল !”

গিনি ভিতরে ঢুকে বলল : “কদিন আগেই তো এসেছিলাম ,  আমার ভুলোমনের রোগ টা আপনার থেকেই পাওয়া ।”

প্রতিমা মিস : “তোর আর আমার বয়স বুঝি এক ?”

গিনি :”এখন এক না হলেও , খুব তাড়াতাড়ি আমি আপনার বয়সে পৌঁছে যাবো ,আমার বয়স তো আর আপনার মত এক জায়গায় থেমে  নেই !”

প্রতিমা মিস হেসে বললেন : “সেই ! আমার বয়স বাড়ছে না ! চোখ কানের শক্তি এমনি এমনি কমে আসছে , আমার বৈজ্ঞানিকের বুদ্ধির উপর ভালবাসার মরচে পড়েছে । “

গিনি একটু চুপ করে থেকে বলল : আচ্ছা মিস ! হঠাৎ যদি আপনার নিজের মেয়ে ফিরে আসে আপনি কি আমাকে ভুলে যাবেন ?

কথাটা শুনে প্রতিমা মিসের মুখে এক  মুহুর্তের জন্য বিষাদের অন্ধকার ছায়া পড়ল, পরক্ষণেই চেনা হাসি ফিরিয়ে এনে বললেন , “তোর কথা আমাকে শ্মশানের আগুনও ভুলিয়ে দিতে পারবে না গিনি ,তুই একটু বস দেখিনি ,আমি তোর প্রিয় গুজিয়া নিয়ে আসি ।”

হুইল চেয়ার টা পিছনে ঘুরতেই  গিনি নতুন যন্ত্রটা ব্যাগ থেকে বার করে বলল ,”প্রতিমা মিসের মেয়ে ওনাকে ফিরিয়ে দাও প্রত্যাবর্তন !” যন্ত্রের  ভিতর থেকে একটা হালকা আলো বেরিয়ে দরজার কাছে চলে যাওয়া মিসের শরীর ছুয়ে আবার ফিরে এলো ।

গুজিয়া খেতে খেতে অনেক ক্ষণ গল্প করার পর , প্রতিমা মিসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু পথ যেতেই , গিনির সাথে তার বাবার ছোটবেলার বন্ধুর মেয়ে অনামিকা দিদির দেখা হয়ে গেল ,মেয়েটি  তাকে জড়িয়ে ধরে বলল ,”কতদিন বাদে তোকে দেখলাম গিনি ! বাবার দিল্লী ট্রান্সফারের পর আমার আর কলকাতা আসাই হয়নি ,কলেজের পর ওখানেই চাকরি ,এবার ছুটি নিয়ে মায়ের সাথে মামাবাড়ি এসেছি,দেখা যখন হয়েই গেল , চল না কোথাও বসে গল্প করি।”

বয়সে ১০ বছরের বড় এই মেয়েটি ছোট থেকেই  গিনির খুব প্রিয়,বছর চারেক তাদের দেখা না হলেও  চেনা আন্তরিকতার স্পর্শে গিনির মন ভীষণ খুশীতে ভরে উঠলো । সামনের  সি. সি.ডি  তে কফি খেতে খেতে গিনি বলল ,”বাবা বলছিল তোমার আর জয়ন্ত দার  নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে।”

অনামিকা দিদি অল্প হেসে বলল ,” কাকু ঠিকই শুনেছিলেন রে , আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে আবার ক্যানসেল হয়ে গেছে । “

গিনি : সেকি ! কেন ?

অনামিকা : জয়ন্তের সাথে আমার অনেকদিন ধরেই সমস্যা চলছিল রে , দুদিকের পরিবারের চাপে দুজনে  বিয়েতে রাজী হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু  দিন দিন সমস্যা আরো জটিল হয়ে আসছিল , ওর মত  নির্বিকার স্বভাবের ছেলের কাছে আত্মসম্মান জলান্জ্বলি  দিয়ে ভালবাসার দাবিতে বার বার হাত পাতা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না তাই এই  চূড়ান্ত  সিদ্ধান্ত যা মুহুর্তে আমার জীবনের সব কিছু বদলে দিয়েছে গিনি ! সবটা হয়তো জয়ন্তের  দোষ  ছিল না  , আমিও শেষের দিকে খুব অধৈর্য হয়ে পড়েছিলাম । এখন সবসময় মনে হয় জানিস ,১২ বছরের পুরনো সম্পর্ক কে এভাবে শেষ করে দেওয়ার আগে আরো একটু সময় নেওয়া উচিত ছিল , সবকিছু হয়তো ততটা খারাপ ছিল না যতটা তখন মনে হয়েছিল ,আরো খানিকটা চেষ্টা করলে হয়তো এরকম টা হত না । যাক ওসব আর ভেবে লাভ নেই ..

অনামিকা দির চোখের কোণে জল লক্ষ্য করে গিনি বলল : জয়ন্ত দা যদি তোমার জীবনে ফিরে আসে তাহলে  …

অনামিকা : জয়ন্তের সাথে আমার অনেকদিন যোগাযোগ নেই রে , যা চলে যায় ,তা যে আর ফিরে আসে না গিনি , সময়ও না , তার সাথে হারিয়ে যাওয়া মানুষজনও না । এখন উঠি রে , খুব ভালো লাগলো তোর সাথে দেখা হয়ে , এখনো ১৫ দিন  আছি এখানে , যাওয়ার আগে আরেকবার দেখা করব তোর সাথে ।

গিনি অল্প হেসে বলল , “আচ্ছা !”

অনামিকা দিদি দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে গিনি যেই বলল , “অনামিকা দিদির জীবনে জয়ন্ত দা কে ফিরিয়ে দাও প্রত্যাবর্তন”, হাতের যন্ত্রটা স্বভাব মত অনামিকা নামের মেয়েটির গায়ে নিজের আলো ছুইয়ে ফিরে এলো ।

বাড়িতে ফিরে  স্নান সেরে , দুপুরের খাবার খেয়ে , মা আর লজেম্সের সাথে একটু ঘুমিয়ে নিল গিনি । সন্ধ্যে বেলা পড়াশোনার চেষ্টা করলেও বইতে তার মন বসলো না । দেখতে দেখতে রাত হয়ে এলো , গিনির মনে হল ফর্মুলাটা বোধহয় কাজ করছে না , আবার নতুন করে ভাবতে হবে তাকে । বিছানায় লজেন্সের পাশে শুয়ে গিনি  বলল ,”তোর বুঝি লাল বলটার কথা খুব মনে পড়ে লজেন্স ? তুই চিন্তা করিস না ,আমি তোকে ওইরকমই আরেকটা বল কিনে দেব ।”

লজেন্স মাথাটা গিনির  হাতে রেখে ,থাবা দিয়ে তাকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল ।

সকালে ঘুম ভাঙতেই , রোজের মত ব্রেকফাস্টের টেবিলে গিয়ে বসলো  গিনি ।তার সামনে প্লেট রেখে মা বলল , “আমি একটু আজকে রিনি দির বাড়ি যাবো , সন্ধ্যের আগেই ফিরে আসবো । দুপুরের খাবার গুলো যেন প্লেটে ঢাকা না পড়ে থাকে গিনি !

গিনি হেসে বলল : আচ্ছা !

বেলা  এগারটার দিকে গিনির ফোনটা বেজে উঠলো , ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সুনন্দার  কন্ঠস্বর ,”গিনি ! প্রতিমা মিস বেলভিউ নার্সিং হোমে ভর্তি ! কাল রাতে হার্ট এটাক হয়েছে , অবস্থা ভালো নয় ,এখন কাউকে দেখা করতে দিচ্ছে না ।আমাদের বুলা মাসি তো প্রতিমা মিসের বাড়িতেও রান্না করে ,ওর থেকেই আজকে খবর পেলাম ,কাল দুপুরে নাকি মিসের মেয়ে নিজের স্বামীকে নিয়ে এতদিন পরে হঠাৎ  এসে হাজির , কোনো রাখ ঢাক না করে সম্পত্তির সমান ভাগের দাবীতে উকিলের চিঠি ধরিয়েছে । মিসের শরীর বিশেষ ভালো ছিল না ,তার ওপরে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে চলা এই জোরজুলুম না নিতে পেরে , গতকাল রাত আট টার দিকে ওনার হার্ট এটাক হয় । ওই মেয়ের স্বামী নাকি ফন্দি আটছিল ,মিস হঠাৎ মারা গেলে তাদের কেস নাকি আরো অনেক সহজ হয়ে যাবে । বেগতিক দেখে বুলা মাসিই পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে , পাড়া প্রতিবেশীকে খবর দিতে সবাই এসে মিসকে নার্সিং হোমে নিয়ে যায় । ওনার ছেলেকেও খবর দেওয়া হয়েছে , আজকে রাত্রেই এসে পৌঁছানোর কথা ….”

গিনি  ফোনটা কেটে দিয়ে ভেজা চোখে বিছানায় বসে পড়ল । এসবের জন্য তার নিজেকেই দায়ী মনে হচ্ছে , সে যে কেন বুঝতে পারেনি যে কিছু জিনিস, কিছু সম্পর্ক , চির তরে হারিয়ে যাওয়াই ভালো। যারা ভালবাসার মূল্য  বোঝে না ,আত্মহননের কঠিন পণ করে ভালবাসা তাদেরই প্রানপনে জাপটে ধরে থাকে , এই নির্মম সত্যির এভাবে সামনে আসার কি খুব  দরকার ছিল !   বৃদ্ধা মায়ের  মুখে এক চিলতে হাসি  ফিরিয়ে দেবার খেলায় ,সবকিছু আগের মত হয়ে যাওয়ার মিথ্যা আশাটাও , তার কাছ থেকে আজ কেড়ে নিয়েছে গিনি ! কিন্তু এ যে সে চায়নি , প্রত্যাবর্তন যে শুধু ফিরিয়ে দিতেই জানে, দিয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার কৌশল শুধু যে ভগবানের আয়ত্তে । কথাটা মনে হতেই ঠাকুর ঘরে ছুটে গিয়ে মায়ের বসানো কৃষ্ণমূর্তি র সামনে হাত জোড় করে গিনি বলল , “প্রত্যাবর্তনের অভিশাপ ফিরিয়ে নাও ভগবান , প্রতিমা মিসের মৃত্যুর কারণ তার ভালবাসার বিজ্ঞান কে কিছুতেই হতে দিও না ।” গিনির অবিরাম চোখের জলে ভাবলেশ হীন পিতলের মূর্তির পা ভিজে যেতে লাগলো ।

হঠাৎ দরজার কলিং বেলের আওয়াজে চমকে উঠলো গিনি । চোখের জল মুছে দরজা খুলতেই দেখলো অনামিকা দিদি হাসিমুখে দাড়িয়ে আছে । গিনিকে গতকালের মতই জড়িয়ে ধরে সে বলল , “সব ঠিক হয়ে গেছে গিনি ,কালকে তোর সাথে কথা বলে ফেরার পথে হঠাৎ জয়ন্তের সাথে দেখা হয়ে গেল ।’কাকতালীয়’ শব্দের ব্যবহার এখানে ঠিক পর্যাপ্ত নয় , কোনো এক মায়াবী শক্তির যাদুতেই বোধহয় এতদিন পরে জয়ন্তও আমার মত  ছুটি নিয়ে কলকাতার বাড়িতে এসেছিল আর ঠিক ওই সময়েই  পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা করে বাড়ির পথে এগোচ্ছিল ।আমরা চেষ্টা করেও কাল একে ওপর কে এড়িয়ে যেতে পারিনি । একসাথে সারা সন্ধ্যে কাটানোর পর , আমাদের মধ্যে অতীতের ভুল বোঝাবুঝির বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব নেই । ভালবাসা হারানোর পরই , তাকে ছাড়া জীবনের মূল্যহীনতা চোখে পড়লেও আর সকলের মতো সময়ের কাছে আমরাও খুব অসহায় ছিলাম রে ! ওই নির্বিকার স্বভাবের পিছনের সহজ মানুষটা  কেই  যে আমি ভালো বেসেছিলাম , দৈনন্দিন চাওয়া পাওয়ার জটিলতায় সেই সত্যিটা আমি  নিজের অজান্তেই কখন যেন ভুলে গিয়েছিলাম ,তাই হয়তো জয়ন্তেরও মনে হয়েছিল  যে  ওর ওপর আমার অনুভূতি , ক্ষনিকের মতিভ্রম ছাড়া কিছুই নয় যা সারাজীবন দুটো মানুষকে একসাথে রাখার জন্য যথেষ্ঠ নয়। সব পাওয়ার আশায় কোনো কিছু হারানোই আর বাকি ছিল না,কালকের দিন টা না এলে ভাগ্যের পরিহাসের সাথে আপোষ করা ছাড়া আর হয়তো কোনো উপায়ই থাকত না। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না গিনি ! তুই হলি আমার লাকি চার্ম । তোকে ফোনে জানাতে কিছুতেই যে মন চাইল না , তাই এভাবে  ছুটে এলাম ।

গিনি মুখে অল্প হাসি এনে বলল , “তোমরা  খুব ভালো থাকো অনামিকা দিদি । ফেরৎ  পাওয়া সম্পর্কের  মুখ ,  স্মৃ তির আয়নায় চেনা লাগলে তার আনন্দ যে সীমাহীন হবে সেটাই প্রত্যাশিত কিন্তু সবার আর সে ভাগ্য কোথায় ! আমাকে এখনি একটু বেরোতে হবে অনামিকা দিদি,আমি সময় করে তোমাদের বাড়ি গিয়ে বাকি গল্প শুনব ক্ষণ ।

অনামিকা নামের মেয়েটি হেসে বলল , “আচ্ছা ! ঠিক আসিস কিন্তু , আমি এলাম এখন ।”

না খেয়ে দেয়ে , নার্সিং হোমে সন্ধ্যে অব্দি বসে থাকার পর ,ডাক্তার যখন বলল প্রতিমা মিস এখন সম্পুর্ন বিপদমুক্ত , গিনির স্বস্তির নিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞান তার পাপের ভার থেকে মুক্তি পেল । কাল সকালের আগে মিসের সাথে কারও দেখা করা বারণ ,তাই অগত্যা বাড়ির পথ ধরলো গিনি। প্রচন্ড বৃষ্টিতে স্নান করে বাড়ি ঢুকে দেখলো মা এখনো ফেরেনি ।বাবার  আসানসোল থেকে ফিরতে পরশু হযে যাবে , বাড়ি একদম ফাঁকা । লজেন্সের আদর সামলে ভিজে জামা ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল গিনি ,তার ক্লান্ত মন আনমনা হয়ে গেল আকাশ পাতাল চিন্তায় । হঠাৎ ল্যান্ড ফোন টা বেজে উঠলো , গিনি ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে মায়ের গলা , “গিনি ! সারাদিন কোথায় ছিলি ? কতবার ফোন করেছি তোকে , ফোনটা বন্ধ রেখেছিলি কেন ? আচ্ছা শোন ! প্রচন্ড বৃষ্টিতে রাস্তায় আটকে পড়েছি ,জায়গাটা ভালো চিনিও না , সব যানবাহন বন্ধ হয়ে গেছে , সামনে  নাকি বাজ পড়ে  বড়সর দুর্ঘটনা হয়েছে , কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না ।মালতীকে বলেছি আমি না ফেরা পর্যন্ত ও আমাদের বাড়িতে থাকবে , আমার ফোনে বেশী চার্জ নেই….”

গিনি কিছু বলার আগেই লাইন টা কেটে গেল, মায়ের জন্য ভীষণ চিন্তায় আবার  নম্বর টা ডায়াল করতেই বুঝলো  মায়ের ফোন বন্ধ হয়ে গেছে । রাত বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টিও বেড়ে চলল । গিনি বাড়ি ফেরার পরে মালতী দি কে দেখেনি , বাইরে বাজ পড়ার শব্দে লজেন্সও ভয়ে লেজ গুটিয়ে  শুয়ে আছে বিছানায় । মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করছে গিনির , বাবার কাছে সে শুনেছে এরকমই এক জল ঝড়ের রাতে গাড়ি দুর্ঘটনায় তার মায়ের মৃত্যু হয়েছিল , ২ বছরের গিনিকে সেই আতঙ্ক ছুতে না পারলেও আজ তার সারা শরীর ভয়ে অবশ হয়ে আসছে । এই বৃষ্টিতে একা রাতে মার যদি কোনো বিপদ হয়  , তার নতুন মা ও যদি তাকে  ছেড়ে। … “না না ! তা কিছুতেই হতে পারে না ”  কথাটা বলেই এক অজানা ভয়ে টেবিলে রাখা যন্ত্রের কাছে গিয়ে গিনি বলল , “আমার মা কে বাড়ি ফিরিয়ে দাও প্রত্যাবর্তন !”  যন্ত্রের আলো গিনিকে ছুয়ে  বন্ধ হয়ে গেল ।

“এ কি করলি গিনি !” তার ভিতরের মেয়েটা আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠলো ! ” বিজ্ঞানের কাছে মা মানে তো রক্তের সম্পর্ক ! তুই তো নিজের অজান্তে নিজের মৃত মা কে ফেরৎ চেয়ে বসলি ! এখন বাকি হিসেব মেলাতে পারবি তো ?” এক প্রচন্ড ভয়ে গিনি দরদর করে ঘামতে লাগলো ,  সত্যিই তো ! মা বলে এখন যাকে জানে , সে তো তাকে জন্ম দেয়নি , প্রত্যাবর্তন যদি অলৌকিক শক্তিতে সত্যি তার  নিজের  মৃত মা কে ফেরৎ নিয়ে আসে তাহলে গিনির বর্তমান পৃথিবী যে মুহুর্তে লন্ড ভন্ড হয়ে যাবে।

মাথা ব্যথা টা  আরো বাড়তে লাগলো , নিজেকে এত অসহায় এর আগে  কখনো লাগেনি তার, বাইরের বিদ্যুতের চমকানি ভিতরের ভয় কে ক্রমান্বয় বাড়াতে লাগলো । দরজা খোলার হঠাৎ আওয়াজে চমকে উঠলো গিনি । ভয়ে চোখ বুজে বালিশ আঁকড়ে শুয়ে রইলো সে , ঘরের ভিতরে আসা পায়ের শব্দ আরো বেশী করে স্পষ্ট হয়ে এলো। ঘর জুড়ে সব শেষ হয়ে যাওয়ার আগের নিস্তব্ধতা। চোখ জুড়ে ঘুমের আবেশ  নাকি সংজ্ঞা হীন হওয়ার পূর্বের সঙ্কেত !

সকালে গিনির যখন ঘুম ভাঙ্গলো, মার কোলে তার মাথা । মা তাকে আদর করে বললেন , ” এখন আর একটুও জ্বর নেই ,ভ্যাগিস বৃষ্টি থামার অপেক্ষা না করে হেঁটে হলেও আমি ভোর রাতে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম ,না হলে যে আমার মেয়েটার কি হত !  মালতীকে আমি আজই ছাড়িয়ে দেব , মিথ্যেবাদী কোথাকার ! “

গিনি মায়ের চেনা মুখটা দেখে স্বস্তির নিঃ শ্বাস ফেলে বলল  : আমার বুঝি জ্বর হয়েছিল ?

মা : তা নয়তো কি ! আমি এসে দেখলাম , তোর  গা আগুনের মত গরম । জ্বরের ঘোরে কিসব আবোল তাবোল লিখেছিস দ্যাখ ,আমি তো মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না , টেবিলের উপরে পাতাটা রাখা ছিল ।

মায়ের হাতের সাদা পাতাটা হাতে নিয়ে গিনি এক নিঃশ্বাসে লেখাটা পড়ল ,

“ফিরে আসার সময় যে নির্দিষ্ট, গিনি ! তা পেরিয়ে গেলে সময় নিজে হাতে সে দরজা বন্ধ করে দেয় , অলৌকিক শক্তি বলে জোর করে নিয়মের অবমাননা করলেও , সে শক্তি যে অন্যের অধিকৃত নিজের সবকিছু ফিরিয়ে দিতে অক্ষম ! “

লেখাটার ধরন গিনির সাথে মিললেও , গিনি বুঝতে পারলো এটা তার নিজের লেখা নয় ,মায়ের কোল আঁকড়ে ধরে , চোখের জলে অজানা কারো যন্ত্রণা উপলব্ধি করলো  গিনি।

লজেন্সের হঠাৎ  উল্লাসে চমকে উঠলো মা ও গিনি দুজনেই , লাল বলটা মুখে নিয়ে সোফার উপরে পাগলের মত লম্ফ ঝম্পের পর বিছানায় উঠে গিনিকে অবিরাম আদর করে চলল সে,তার চোখে মুখে বিশ্ব জয়ের আনন্দ । গিনি লজেন্সের কানের সামনে মুখ এনে বলল, “কোথায় পেলি এটা ? “

“রিঙ্কু দের বাড়ির গুদামে , শুধু শুধুই লালুকে সন্দেহ করছিলাম জানিস গিনি !  রিঙ্কুর হতচ্ছাড়া মানুষ ভাইটা  লালুর চেয়ে অনেক বেশী লোভী ,আমি ভালো করেই জানি ও  কখন স্কুল   থেকে  ফেরে , কালুদার গ্যাং কে বলে ওর জন্য জবর কামড়ের না ব্যবস্থা করিয়েছি তো আমার ‘লজেন্স চৌধুরী’ নাম বদলে ‘তুলসী গাছ চৌধুরী’ রাখিস  !”

মাইন্ড রিডার

Comments 5 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

যন্ত্র টা মোটামুটি বানিয়ে ফেলেছে গিনি । আজ রাত্রেই বাকি কাজ টুকু শেষ করে ভোর রাত্রে মহড়া । বিজ্ঞানের অসম্ভব কে সম্ভব করার  অদম্য ইচ্ছা তার ভিতরের মেয়েটাকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায়। আজ সে প্রথমবার তার কাল্পনিক চিন্তাকে  যন্ত্রের আকার দিতে চলেছে। গিনির ফর্মুলা যদি ঠিকমত কাজ করে তাহলে তার  বানানো আঙুরের মত ছোট্ট যন্ত্রটা ভোর রাতের দিকে আয়ত্ব করে ফেলবে অন্যের মনের ভাবনা মুহুর্তে পড়ে ফেলার অলৌকিক কৌশল।

গিনির মা তার অনেক ছোটবেলায় গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন , সেই একই গাড়িতে থাকা সত্তেও অলৌকিক ভাবে একটা ঝোপের ধার থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে, ২ বছরের গিনি কে পুলিশ তার বাবা র হাতে তুলে দিয়েছিল। তার ৩ বছরের মাথায় একাকীত্বের বোঝা সামলাতে না পেরে তার বাবার নিয়ে আসা এ বাড়ির স্থায়ী সদস্য কে, গিনি তার বাবার স্ত্রী বলেই মনে করে এসেছে বরাবর ,নিজের মা য়ের জায়গা চেষ্টা করেও তাকে সে কখনো দিতে পারেনি। গিনির সাথে সে মহিলার বিশেষ কথাবার্তা হয় না ,সেই প্রথম দিন থেকেই পারস্পরিক বোঝাপড়ায় তারা একে ওপরকে এড়িয়ে চলে, গিনির বাবাই তাদের দুজনের মধ্যে একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম, গিনির জীবনে ভালো খারাপের প্রভাব যে সেই অজ্ঞাত মহিলার উপরে পড়বে না , সেটাই গিনির কাছে খুব স্বাভাবিক বলে মনে হয়।গিনির মায়ের প্রতি তার বাবার ভালাবাসার গভীরতা নিয়ে তার মনে প্রশ্ন থাকলেও,নিজের মেয়ের প্রতি সেই মানুষটার আন্তরিকতা বা দায়িত্ব বোধ নিয়ে গিনি কখনো সন্দেহ প্রকাশ করেনি। বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার ইচ্ছা ,খামখেয়ালী পনা , যন্ত্রের সাথে ভালবাসা , যেমনি ভাবা তেমনি কাজ করার অবাধ স্বাধীনতা, এ সবকিছু গিনির বাবার অর্থ ব্যয় আর সমর্থন ছাড়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না।নিজের বয়সের তুলনায় গিনির মেধার মাত্রা অন্যের কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হওয়ার অস্বস্তি থেকে দূরে থাকার জন্যেই বোধহয় তার ১৬ বছরের জীবনে বন্ধু বলতে মাত্র একটি নাম ,সীমা। যদিও গিনির আরো একটি বন্ধু আছে কিন্তু সে মানুষ নয় , তার পোষা ল্যাব্রেডর কুকুর ,’লজেন্স ‘ যে দিবারাত্রি গিনির ছায়াসঙ্গী।

ভোর ৪ টে ৫৫ । যন্ত্রটা গলার হারের মধ্যে লকেটের মত ঢুকিয়ে যন্ত্রের ‘ON’ বোতাম টা টিপে দিল গিনি। কই কিছু শুনতে পাচ্ছে না তো ! এত চেষ্টার পরও তাহলে কি তার যন্ত্র টা কাজ করছে না ? কিন্তু তাই বা সে বলে কি করে ? আশেপাশে তো কেউ কোথাও নেই।সকাল হবার আগে যন্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার কোনো উপায়ও তো আর নেই । হঠাৎ রাস্তার কুকুর গুলো ডেকে উঠলো। লজেন্স চমকে ঘুম থেকে উঠে পড়ে বারান্দার দিকে যাবার জন্য প্রস্তুত ,ইতিমধ্যে গিনি পরিস্কার শুনতে পেল কে যেন বলছে , “ধ্যুর তেরি ! রোজ রাতে একই ব্যাপার ! শান্তিতে নিজেরাও ঘুমাবে না আর আমাকেও ঘুমোতে দেবে না ! যাই দেখি গিয়ে সত্যিই কিছু ঘটলো ,নাকি বাতিকগ্রস্ত লালুর অকারণ খ্যাক খ্যাক ! ওই ব্যাটার জন্য কুকুর সমাজের উপর মানুষের বিশ্বাসই উঠে যাবে এবার !” লজেন্স দৌড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যেতেই আবার চারিদিকে সব চুপচাপ। গিনি আনন্দে লাফিয়ে উঠলো , “কাজ করছে ! কাজ করছে ! ” এ যে আর কারো নয়, , যা সে একটু আগে শুনলো তা যে তার লজেন্সের মনের কথা ! লজেন্স ঘরে ফিরে এসে আবার বিছানায় উঠে পড়ল ,গিনি কান পেতে শুনলো এবারের কথাগুলো, “কালকে কালুদা কে বলে লালু ব্যাটার শায়েস্তা না করে আমি ছাড়ব না, রাত বিরেতে এভাবে অকারণে জ্বালানো ,লজেন্স চৌধুরী আর কিছুতেই সহ্য করবে না , একবার ঘুম ভেঙ্গে গেলে আবার ঘুম আসা যে কি মুশকিল সে আর ওই নিশাচর হতচ্ছাড়া লালু বুঝবে কি করে !”

পরদিন সকালবেলা গিনির ঘুম ভাঙ্গলো মালতীদির ডাকে , “দিদিমনি ওঠো ! চা নিয়ে এসেছি ,আজ একেবারে আদা দিয়ে তোমার প্রিয় চা বানিয়েছি ,কত রাত অব্দি তুমি পড়াশোনা করো রোজ ,সকালের দিকে মাথাটা নিশ্চই ধরে থাকে তোমার !” গিনি চোখ কচলে বিছানায় উঠে বলল, “Good Morning মালতী দি ! Thanks ! কাপ টা রেখে দাও টেবিলের ওপর!” গিনি শুনলো মালতী দি বলছে ,”মরে যাই! মরে যাই! সূর্য ডুবতে যায় ,এতক্ষণে সকাল হল ইংলিশ ইস্কুলে  পড়া বড়লোকের মেয়ের ! এত বড় ধিঙ্গি মেয়ের নিজের জিনিসের কোনো তালের ঠিক নেইকো ! তবে আমার তো ভালোই ! ঘুম ভাঙ্গার আগে ড্রয়ার থেকে জিনিস গুলো না সরাতে পারলে আমার যে এ মাসে কত খরচা বেড়ে যেত ! বাপ্পার  জন্য পেন্সিল ,পেন,রবার সব ই প্রায় পেয়ে গেছি , শুধু  কয়েকটা খাতা আরো লাগবে, কালকে অন্য ড্রয়ার টা ঘেটে নিশ্চই পেয়ে যাবো!” চমকে উঠে মালতী দির দিকে তাকালো গিনি , মালতী দির ঠোঁট নড়ছে না তবুও গিনি শুনতে পেল , “এভাবে তাকাচ্ছে কেন রে বাবা ! আঁচল টা আবার খুলে যায়নি তো! ” গিনি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নিল। মুখ ধুয়ে এসে চা টা  চটপট খেয়ে  নিল গিনি। নিজের ভুলোমন কে বিশ্বাস না করে তখনি তাক থেকে কয়েকটা নতুন খাতা বার করে সামনের ড্রয়ারে রেখে দিল সে! তারপর দ্রুত স্নান সেরে তৈরী হয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল গিনি!

সীমার বাড়ি পৌঁছে দরজার বেল বাজাতেই সীমার মা দরজা খুললেন । গিনি হেসে বলল , “কাকীমা! সীমা বাড়িতে আছে ? খুব জরুরি একটা দরকার আছে তাই এত সকালে এভাবে আসতে হল !” সীমার মা হাসি মুখে বললেন ,”ওমা !তাতে কি হয়েছে ?তুমি তো আমার ঘরের মেয়ে ! নিজের বাড়িতে কি ঘড়ি দেখে আসতে আছে! ভিতরে চলে এসো  তাড়াতাড়ি ! আমার কপাল কি তোমার মায়ের মত ওত ভালো গিনি ! দেখো গিয়ে আমার মেয়েটা এখনো ঠিক নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে  হবে !” গিনি হেসে ভিতরে ঢুকে সিড়িতে পা রাখতেই  শুনতে পেল কথাগুলো “বলা নেই কওয়া নেই, রবিবার কাক ভোরে এসে হাজির বৈজ্ঞানিক ,এখন আবার অতিথি সেবার ঝক্কি ! মরণ হয় না আমার ! সীমা টারও বলিহারি !বন্ধুত্ব করার জন্য এই আধ পাগল তাল জ্ঞান হীন মেয়েটাই চোখে পড়ল তোর ! কোন দুনিয়ায় থাকে কে জানে ,দু পায়ে দুরঙের চটি গলিয়ে চলে এলো সকাল সকাল আমার গতরের হাড়মাস  জ্বালাতে !”

গিনির ইচ্ছা করছিল এই মুহুর্তে  সীমার বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে , সেই ছোট্টবেলা থেকে কারণে অকারণে যখন তখন সে চলে আসে সীমার বাড়ি , তা কি শুধুই  সীমার জন্য? সীমা তার একমাত্র বন্ধু ঠিকই  কিন্তু গিনির  এ বাড়িতে ছুটে ছুটে আসার পিছনে আরো একটা অনেক গভীর কারণ ছিল যা সে সীমাকেও কখনো বলতে পারেনি ,আজকের পর আর সে কারণ টার কোনো অস্তিত্বই থাকবে না ! নিজের মরা মায়ের ছবি দেখতো সে যার মধ্যে, আজ তার মনের কথা শুনে, গিনির ভিতরে সবকিছু যেন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, উফ!কি অসহ্য যন্ত্রণা ! চোখের জল মুছে ,কোনরকমে অসহায় পায়ে গিনি সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল !

সীমার ঘরে ঢোকার মুহুর্তে আচমকা একটা হাতের হ্যাঁচকা টান গিনিকে অন্য একটা ঘরে টেনে নিয়ে গেল ! গিনি হাত টা ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল ,”সৈকত দা ! কী করছ ! ছাড়ো আমাকে !” ছেলেটি দেওয়ালে ঠেস দেওয়া গিনির খুব কাছে এসে বলল, “কালকে আমার ফোন ওঠালি না যে বড়! রাতে ঘুম হয়নি আমার জানিস ! আমার রাগ ভাঙ্গাতেই বুঝি এত সকাল সকাল রাজকন্যার আগমন ? ”  গিনি বলল ,”একটা দরকারী কাজ করছিলাম , ফোন টা সাইলেন্ট করা ছিল !” ছেলেটি গিনির আরো কাছে এসে বলল ,”আর তোর মন টা ? সেটাও সাইলেন্ট করা ছিল ? তুই কি এতদিনেও আমাকে একটুও ভালোবাসিস নি গিনি?” গিনি কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলো ! ছেলেটি তার ঠোঁটের কাছে মুখ আনতেই গিনি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল , “আমার সীমার সাথে দরকার আছে সৈকত দা ,প্লিস ! যেতে দাও আমাকে !” দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরোনোর আগে গিনি কথাটা শুনে ভয়ে শিউরে  উঠলো ,”আর কতদিন পালাবি গিনি ! আমার বিছানায় একদিন তোর ওই গুমোর না ভাঙলে লজেন্সের নাম বদলে সৈকত বিশ্বাস রাখিস !” গিনি দরজার মুখে দাড়িয়ে পিছনে ফিরতেই দেখলো ,ছেলেটি  মায়া ভরা মুখে তখনো তার দিকে একই ভাবে তাকিয়ে আছে,এতদিনের ভালাবাসার মুখোশের পিছনে  একটা ক্ষুধার্ত  সিংহের চেহারা আজ আর গিনির দৃষ্টি এড়াতে পারল না । সময়ে অসময়ে গিনি অনেকবার ভেবেছে সৈকত দা তাকে সত্যি ভালোবাসে ,নাহলে এত বছর ধরে গিনির থেকে কোনো উত্তর না পেয়েও ,নিজের ভালোবাসাকে অপরিবর্তিত রেখে কেন করে সে এই নিরন্তর প্রতীক্ষা ! গিনির নির্বিকার মন ,সৈকত দার এই  একপেশে ভালাবাসার ওপর বছরের পর বছর  নিষ্ঠুর অবিচার করে এসেছে বলেই সে বিশ্বাস করত কিন্তু আজ সেই বিশ্বাসের পরিনতি দেখে তার ভিতরে কে যেন বিদ্রুপের অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে !

সীমার ঘরে ঢুকে  গিনি দেখল সীমা আয়নার সামনে দাড়িয়ে তৈরী হচ্ছে । গিনি বলল ,”কোথাও বেরোবি সীমা? তোর সাথে আমার কিছু কথা ছিল !” সীমা গিনির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল ,”গিনি! তুই এত সকালে ? আরে সোহম কি একটা কথা বলবে বলে আজকে আমাকে দেখা করতে ডেকেছে ,তুইও চল না আমার সাথে , আমার একা যেতে কেমন যেন ভয় করছে ,যাবি ?”  গিনি একটু ভেবে তারপর এগিয়ে গিয়ে সীমার পাশে দাড়িয়ে বলল,”আচ্ছা চল ! তোর তো এখন আমার কথা শোনার সময় নেই কিন্তু কথাটা তোকে বলাটা যে খুব জরুরি, তাই রাস্তায় যেতে যেতেই  বলে দেব না হয়!” গিনি আয়নায় দেখতে পেল সীমা হাসি মুখে চুল টা খুলে আরেকবার আঁচড়াচ্ছে ,সীমার মুখের ভাবটা একটুও পরিবর্তন হলো না কিন্তু গিনি স্পষ্ট শুনতে পেল কথা গুলো ,”অন্যদিন  কত বলি কোথাও যায় না ! আজ ওমনি একবার বলতেই রাজী হয়ে গেল ! এত সাজলাম তবু গিনির এলমেলো চুল আর যত্নহীন মুখটাই বেশী সুন্দর লাগছে । যা একটা মেয়ের চোখকে অস্বস্তি দিচ্ছে সেটা কি সোহমের মত ছেলের চোখে পড়বে না? আর তাহলে তো আমার এতদিনের অপেক্ষার অবসান হয়েও হবে না । গিনি তো যন্ত্রপাতি ছাড়া কিছুই বোঝে না! নিশ্চই যন্ত্র নিয়ে কিছু বলবে বলেই সাত সকালে ছুটতে ছুটতে এসেছে আমার বাড়ি  ,সময়ও বেশী হাতে নেই যে ওর ইতিহাস বাড়িতে বসেই শুনবো ,এখন আমি যে কি করি ! ”

গিনি আর দাড়িয়ে থাকতে পারছে না , সবকিছু চারিদিকে যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে তার। কোনরকমে সে সীমাকে বলল “সীমা একটা জরুরি কাজ মনে পড়ে গেছে রে ,এখনি যেতে হবে আমাকে !” সীমার ঘর থেকে উদ্ভ্রান্তের মত বেরোনোর আগে ‘বাঁচা গেছে উফ!’ কথাটা গিনির কানে গিয়ে প্রচন্ড গতিবেগে ধাক্কা মারলো। এক নিঃশ্বাসে গিনি বাড়ি পৌঁছে, নিজের ঘরে ঢুকে ,বিছানার ওপর ভীষণ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল । এতদিন সে যা সত্যি ভেবে এসেছে ,তার সবটাই তো মিথ্যা, তার উজার করে ভালাবাসার বদলে তার জন্য এক ফোঁটা সহনাভূতিও নেই সেই ভালাবাসার মানুষ গুলোর মধ্যে , এ সত্যির যন্ত্রণা যে অসহ্য , এর থেকে তো অনেক ভালো হত যদি সে সারাজীবন মিথ্যে আঁকড়ে কাটিয়ে দিত । গিনির সব রাগ গিয়ে পড়ল গলায় ঝোলানো যন্ত্র টার ওপর ,ওটা টেনে ভেঙ্গে ফেলার আগের মুহুর্তে সে শুনতে পেল , “একি ! গিনি কখন এলো ? আমি তো সেই কখন থেকে ঠায় সামনের বারান্দায় বসে ছিলাম ,পিছনের দরজা দিয়ে এসেছে কি তাহলে ! আজ সীমার বাড়ি থেকে এত তাড়াতাড়ি কেন চলে এলো ও ? আর এভাবে বিছানার ওপর অসময়ে শুয়েই বা আছে কেন ? যাই দেখি শরীর খারাপ হল না তো আবার ! না না ,আমি গেলে এই শরীর নিয়ে আবার যদি রেগে বেরিয়ে যায়, আমাকে তো একেবারে সহ্যই করতে পারে না ,মালতী ও তো চলে গেছে আর ওর বাবাও তো একটু আগে কাজে বেরোলেন ! আমি যে এখন কি করি! আমাকে জিজ্ঞাসা করতেই হবে , অপমানই করুক না হয়, পেটে ধরিনি বলে মা নই জানি কিন্তু তাই বলে কি ক্ষনিকের গালাগালিও হজম করতে পারব না !”

ভদ্রমহিলা বিছানায় বসে গিনির পিঠে হাত দিয়ে আরষ্ট স্বরে বললেন ,”গিনি! কী হয়েছে তোমার ?শরীর খারাপ ?”গিনি কোনো উত্তর না দিয়ে তার কোলের উপর মুখ গুঁজে বলল , ” মানুষ চেনা বড় কঠিন ,তাই না মা ? ” ভদ্রমহিলার পুরো শরীর কেঁপে উঠলো ,মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরোলো না , গিনি শুনতে পেল ,”মা ? আমি গিনির মা ? না না , এ নিশ্চই আমার শোনার ভুল ! নাকি জ্বরের ঘোরে মায়ের স্বপ্ন দেখছিল আর আমি আসাতে ….” গিনি বলল , “মা র কোলে শুয়ে ,জেগে জেগে, কেউ মায়ের স্বপ্ন দেখে বুঝি ? আর আমার জ্বর কোথায় ! তোমার গায়ের থেকে আমার গা অনেক ঠান্ডা ! একটা কথা বলছি তোমাকে ,কাউকে বোলো না কখনো ,তোমার গিনি মাইন্ড রিডার । জানো মা ! বিজ্ঞান বোধহয় ইচ্ছা করেই কিছু জিনিসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে না , মানুষ যা বিজ্ঞানের অক্ষমতা বলে ভুল করছে সে ক্ষমতা বিজ্ঞান সর্বসমক্ষে কোনদিন প্রকাশ করলে ,পৃথিবীর মানুষ যে তার ভার সইতে পারবে না ,সে সত্যি আমার থেকে ভালো আজ আর কেউ জানে না!”

মায়ের কোল গিনির চোখের জলে আর মায়ের চোখের জলে গিনির হাতের পাতা নিঃশব্দে ভিজে যেতে লাগলো ,হঠাৎ বিছানায় লাফিয়ে ওঠা লজেন্সের জিভের আদরে গিনি ভেজা চোখেই হেসে উঠলো ,গিনি শুনতে পেল লজেন্স বলছে ,”আমার গিনি ! আমার গিনি ! আমার গিনি! আদর করে ভিজিয়ে দেব তোকে !”

ধন্যবাদ,

BongNote