ধোঁয়াটে ইঙ্গিত

Comments 2 আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

পর্ব এক 
ছাদে একা বসে ছিল গিনি। ডিসেম্বরের শেষের সময়টায় চারিদিকের জগৎ টা যখন উৎসবের আমেজ উপভোগে ব্যস্ত একটা ভীষণ ভয় তাকে যেন আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে। ২ বছরের গিনিকে তার পছন্দ সই  বড়দিনের উপহার কিনে দেবার জন্যই সেদিন  বেড়িয়েছিল মা।  তার কিছু ঘণ্টা পর একটা ঝোপের ধার থেকেজীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে ২ বছরের গিনিকে পুলিশ তার বাবার হাতে তুলেদিয়েছিল। 
প্রকৃতির নিয়মে দুবছরের শিশুর অপরিণত মস্তিস্ক সেই ভয়াবহ স্মৃতির ভার বহনে অক্ষম  , এমনটা মনে হলেও গিনির ক্ষেত্রে সত্যিটা এক অস্বাভাবিক।  এক অদৃশ্য শক্তি  সেই দুর্ঘটনার মুহূর্ত গুলো সবিন্যস্তে গিনির সামনে উল্টে পাল্টে ধরেছে। অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাসারি সেজে উঠেছে  অলৌকিক  নিয়মে  , মায়ের স্পর্শের চেনা অনুভতি , আদো কথা , খিলখিল হাসি,  ভুবন মোহিনী সুরের প্রত্যাশিত ছন্দ পতন।  তখন বুঝতে না পারলেও,বাড়তি বয়সের পরিণত বুদ্ধি দিয়ে গিনি বুঝেছে সুন্দর  মুহূর্ত গুলোর রক্তময় হয়ে ওঠার সেই ভয়াবহ স্মৃতিমন্থনের পিছনে,  লুকিয়ে ছিল  কোনো গর্হিত ইঙ্গিত , খারাপ কিছু ঘটে যাওয়ার আভাস , দূরত্ব বাড়ার আগের মুহূর্তের নিস্তব্দতা।

স্পষ্ট মনে আছে গিনির , রোজের অভ্যাসমত স্কুলের   প্রার্থণা ঘরে  , সকলের অলক্ষ্যে পকেটে লুকিয়ে নিয়ে আসা চক দিয়ে  যীশু মূর্তির গায়ে  লেগে থাকা রক্তের রঙ মুছে দিচ্ছিল সে।  মাত্র আট  বছর  বয়সে সেই বা কি করে জানবে , কিছু দাগ যে মোছা যায় না , কিছু ক্ষতকে ঢাকতে গেলে আরো বেশি করে তা সামনে এসে পড়ে ।  গিনির চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল  এক ভীষণ চেনা মুখ, সে শুনতে পেয়েছিল তার প্রিয় স্বরের গুনগুন গান , দেখেছিল মায়ের বুকে আদরে জড়িয়ে থাকা নিজেকে । ওরা ওই গাড়িটা করে কোথাও যাচ্ছে , রাস্তাটা খুব উঁচুনীচু , গিনি অনুভব করছে অসম্ভব ঝাঁকুনি , মা যেন কি একটা বলল , ভালো শোনা যাচ্ছে না , ভীষণ হওয়ার শব্দ।  একি! সামনে এগিয়ে আসা গাড়িটা থামছে না কেন !   মা যে খুব ভয় পেয়ে যাচ্ছে , আচমকা সেই কান ফাটানো আওয়াজ , বুকের শিশু খোলা জানলা দিয়ে পাশের ঝোঁপে গিয়ে পড়ল , চারদিকে রক্তের ছিটে , সব শেষের গোঙানি , দমবন্ধ করা কালো ধোঁয়া, চোখ বন্ধ করে ফেলল গিনি।

ঘামে ভিজে যাওয়া , ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকা  আট বছরের মেয়েটিকে করা কোনো প্রশ্নেরই উত্তর সেদিন পাননি স্কুল শিক্ষিকা প্রতিমা কর । সবসময় একা থাকতে চাওয়া এই মেয়েটির এমন  অদ্ভুত আচরণ দেখেও  সেদিন চিন্তিত হননি প্রতিমা দেবী ।  অন্যান্য শিক্ষিকারা এমন ঘটনা বাড়িতে জানানোর কথা বলতে তিনি বলেছিলেন , “সব বাচ্চা তো সমান হয় না।  তাদের মাথা , তাদের মন , সবই একে ওপরের থেকে আলাদা।   কোন দোষের আড়ালে কোন গুণ লুকিয়ে আছে বা কোন সমাধানের আড়ালে নতুন সমস্যা, কেউ কি জানে! এ নিয়ে অহেতুক চিন্তা অপ্রয়োজন।” রোজের মত স্কুল বাসে নয় , সেদিন প্রতিমা মিসের হাত ধরে  বাড়ি ফিরে এসেছিল গিনি। ঘরে ঢুকে সবসময় হাসতে থাকা জ্যাঠামণিকে জীবনে প্রথমবার কাঁদতে দেখেছিল সে। সারা রাত ফুঁপিয়ে কাঁদা  গিনির ঘুম , পরদিন ভেঙেছিল জ্যাঠামণিরই ডাকে। ফুলে যাওয়া চোখ নিঃস্পলকে তাকিয়ে পরম স্বস্তিতে দেখেছিল তার জ্যাঠামণি আর কাঁদছে না।  গিনির গলা জড়িয়ে ধরে জ্যাঠামণি বলেছিল, “তোর মায়ের মত জ্যেঠিমাও কাল সকলের সাথে আড়ি করে দিয়েছে রে গিনি ! ওরা খুব বন্ধু ছিল তো , তাই শলাপরামর্শ করেই  এমন ঘটিয়েছে । আমাদের অবস্থা দেখে দুই বন্ধুর খুব হাসির ফোয়ারা ছুটেছে হবে , ঠিক আগের মত । লুডোর গুটি লুকিয়ে জেতাকে জোচ্চুরি বলে , আমি এই হার মানি না। তাই শুনে রাখ , আড়ি বৈ তো কিছু নয় , ওমন হয়েই থাকে , তাতে কাঁদতে আছে নাকি ! আমরাও হাসবো , মজা করবো , সবটা দিয়ে বাঁচবো , ওদের ছাড়াই। হ্যাঁ হ্যাঁ ওদের ছাড়াই। ”

আজ  আরেকটা বড়দিন।  ষোল বছরের গিনি  এখন পরিণত বুদ্ধির অধিকারী , বিজ্ঞানে ঘেরা দিন রাত।  তার পরিশ্রমের  ফর্মুলা আবিষ্কার করেছে তিনটি বিস্ময় ক্ষমতা ধারী  যন্ত্র , ফিরিয়ে দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক , আড়াল করেছে অযাচিত কতকিছু। প্রতি বছরের মত স্কুল ছুটি থাকা সত্ত্বেও  দাড়োয়ানজি গিনির বলে দেওয়া সময় মতই চাবি নিয়ে উপস্থিত ছিল  স্কুলের দরজায়। প্রার্থনা ঘরে যীশু মূর্তির সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে চোখ বন্ধ করতেই আবার ভেসে উঠল সেই ভয়াবহ দৃশ্য।  উল্টানো গাড়ি,মায়ের বাঁচার চেষ্টা  , রক্ত ভরা রাস্তা , ঝোপের মাঝে অসহায় ছোট্ট শিশুর অদম্য কান্না। গিনির দিকভ্রান্ত হয়ে স্কুল থেকে ছুটে বেড়িয়ে যাওয়ার কারণ  বৃদ্ধ দারোয়ানের বোধগম্য হয়নি।

পর্ব দুই 


ভয়ের মোড়কে নিজেকে গুটিয়ে  অস্থির পায়ে ছাদে  পায়চারী করছিল গিনি ।  সিঁড়িতে অচেনা পায়ের শব্দে পিছনে ঘুরল সে ।  আগন্তুকের মুখ অন্ধকারে  অস্পষ্ট।

গিনি : কে ?

আগন্তুক : আমি সময় , আপনার আলুভাজা দিদার পেয়িংগেস্ট।

গিনি :আপনি এখানে  ?

সময় : সন্ধ্যেবেলার নাকি আপনার দেওয়া একটা ডাক নাম আছে , ছাদবেলা।  দিদার কাছে কথাটা শুনে হাসলেও এখন তা বেশ মানানসই বলেই মনে হচ্ছে।

গিনি :আপনি আমার বাড়ি চিনলেন কি করে ?

সময় : সেদিন লেকের ধারে নেওয়া  আপনার  ফর্মুলার খাতার প্রথম পাতাতেই  নাম , ঠিকানা ,বাড়ির নম্বর এমনকি ইমেইল পর্যন্ত লেখা আছে। কিন্তু তা দেখে আপনার বাড়ি আসতে হলে এত গুলো দিন অপেক্ষা করার কোনো যুক্তি খুঁজে পেলে অবশ্যই বলবেন , ততক্ষণ না হয়  বিশ্বাস করুন  প্রেরকের লিখে দেওয়া ঠিকানা  , এই  চিঠিখানা পৌঁছানোর দায়িত্বপূরণের কাজে আমায় সাহায্য করেছে।

গিনি নিজের অপ্রস্তুত ভাব আড়াল করে কাগজের চিরকুট টা হাতে নিতেই  দেখল মন ভালো করে দেওয়া সেই চেনা হাতের লেখা ।

ওরে মেয়ে ,

কাঁপা হাতে আলুভাজা বেস্বাদ হয় , তাই বলে প্রাণদন্ড ? দিদার মরা মুখ ছাড়া বুঝি দেখবি না পণ করেছিস ?

গিনির শুধু গিনির ( আগে মচমচে  , এখন ন্যাতানো ) আলুভাজা দিদা।

গিনি :সত্যি ! পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে , তারপরে কিছু নিজস্ব কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে আর যাওয়া হয়নি দিদার কাছে , আপনি আছেন বলেই বোধহয় আরো নিশ্চিন্তে ছিলাম, একটা ফোন করার কথাও খেয়াল হয়নি।ক্ষমা চাওয়ার কোনো অজুহাত খুঁজে দেবেন আমাকে?

সময় : নিশ্চই দেব। অভিযোগ ও অজুহাত  মেল করানোই আমার নেশা , এ খেলায়  দাবার থেকেও বেশি বুদ্ধি লাগে।

গিনি : আমি কাল যাবো তাহলে।

সময় : কাল ? কিন্তু তাহলে তো …

এক অজানা ভয় ঘিরে  ধরল গিনিকে , ঠান্ডা হতে শুরু
ইঙ্গিত,অবশ্যম্ভাবী পরিণতি,আতঙ্কে কেঁপে উঠল  কণ্ঠস্বর:তাহলে কী ? দেরী হয়ে যাবে ? দেখা হবে না ? আপনি সব জানেন তাই না ?

সময় : হ্যাঁ  জানি। কখনো বেশিরভাগটা  কখনো বা   সবটাই।

গিনি আর ভয় আড়াল করতে পারছে না , অস্থির স্বরে কাঠিণ্য এনে বলল  : তাহলে শুনে রাখুন আমিও জানি , আমিও সবটা জানি।

সময় রহস্যময় হাসি মেখে বলল :জানতেই পারেন , জানাটাই তো স্বাভাবিক।  ছোটবেলা থেকে দিদার বাড়িতে আপনার নিত্য যাতায়াত । আমি তো মাত্র  এক মাস ধরে দেখছি দিদাকে , তবু যেন মনে হল  প্রতি  মঙ্গলবার দক্ষিণেশ্বরে যাওয়ার অভ্যাসটা  দিদার নতুন নয়।

গিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল : ওহ! তাই তো , কাল মঙ্গলবার।

সময় : MERRY  XMAS । আপনার ঘরের যীশুখ্রীষ্টের ফটো টা খুব জীবন্ত।

গিনি : আপনি আমার ঘরে গিয়েছিলেন ?

সময়: হুম , আপনার বাবা প্রথমে আমাকে আপনার ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন , ওখানে আপনাকে না দেখে খানিক ডাকাডাকি করতেই একজন ভদ্রমহিলা এসে বললেন আপনি সন্ধ্যের এই সময়টা রোজ ছাদে কাটান।  উনি বুঝি আপনার মা ?

গিনি : হুম।

সময় : তাহলে  যীশুখ্রীষ্টের ফটোর পাশে যে  ভদ্রমহিলার ছবি দেখলাম যার সাথে আপনার মুখের ভীষণ মিল , উনি …

গিনি : আমার মা , চোদ্দ বছর আগে এক পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এখন বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীকেই আমি মা বলে জানি। জন্ম দিলে এর থেকে বেশী ভালোবাসা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি না।  আর কিছু জানার আছে আপনার ?

সময় : দুঃখিত।  আমার অকারণ কৌতূহল আপনাকে   বিব্রত করেছে বেশ বুঝতে পারছি।

গিনি : আসলে আমার মনটা ভালো নেই , এরকম অসংযত ব্যবহারের জন্য ক্ষমা করবেন।

সময়:তা না হয় করা যাবে।  কিন্তু এমন দিনে মন খারাপ করতে নেই  গিনি ! আজ যে আপনার যীশুখ্রীষ্টের জন্মদিন।

গিনি : আর আমার মায়ের মৃত্যুদিনও ।

সময় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল :  সান্ত্বনা দেওয়া আমার অভ্যাস নয় , তাছাড়া জীবনে অস্তিত্বর  ভিত্তি হারানোর স্বান্তনা হয় না। ভেবে নিন প্রসঙ্গ বদলাতেই আবার এক অবান্তর প্রশ্ন করছি -ভালো তো কতকিছুই লাগতে পারতো , কৃষ্ণের বাঁশি , শিবের জটা ,  নামাজের টুপি,গুরুর  প্রসাদ । শুধু  সাদা আলখাল্লা ধারণকারী সুদর্শন ব্যক্তিটির উপর বিশেষ পক্ষপাতের  কোনো কারণ আছে কি ?

গিনি :  জন্মদিন সুখময় হয় আমার আপনার , তার মেরীময়। মৃত্যুর অতীত নাড়ির টান।

সময় :ব্যাপারটা আপেক্ষিক , দৃষ্টির পরিধি অনুযায়ী।  সাধারণ দৃষ্টি জীবন সীমার পরিধি অতিক্রম করতে পারে না , তাই মৃত্যুর পরও শুধু জীবনকালটাই আলোচ্য।   কিন্তু হতেও তো পারে মৃত্যুর অতীত জীবনকালের কোনো কিছুই নয় , সত্যিটা সেখানে অনেক বেশী সহজ , দুইয়ের বদলে হয়তো একটাই স্বত্বা , তাই আগে পিছে থাকার প্রয়োজন হয় না কখনো ।

গিনি : হতে তো অনেক কিছুই পারে , আবার অনেক কিছু না হলে ক্ষতি তো বিশেষ ছিল না বলেই মনে হয়। চক দিয়ে  যীশু মূর্তির শরীরে  লেগে থাকা লাল রঙ ঢাকা যায় ঠিকই  কিন্তু  ব্যস্ত রাস্তায় ঘটা  ভীষণ দূর্ঘটনা য়  সারা রাস্তাটা রক্তে  লাল হয়ে যায়  ! , ওত  চক তো আমার  কাছে নেই !

সময় অল্প হেসে বলল : রক্তের দাগ খুবই ক্ষণস্থায়ী।  চলতি গাড়ির চাকা কিংবা হঠাৎ বৃষ্টির জল বেশীক্ষণ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দেয় না। যা থেকে যায় তা হল  ভালোবাসার মানুষের  দীর্ঘশ্বাস  , নিরন্তর ছটফটানি , সত্যিকে মিথ্যা ভাবার ব্যর্থ প্রয়াস ,  স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও আবার হতাশার গভীরে তলিয়ে যাওয়া।তবু শেষমেশ যখন কিছু ই বদলায় না তখন  নিয়তির কালচক্রের অজুহাত দিয়ে নেওয়া হয় জীবনের  গতি  বাড়াবার অবশ্যম্ভাবী সিদ্ধান্তটি।

তাই আমার বিশ্বাস, প্রত্যেকের জীবনসীমা একটি জটিল অঙ্ক কষে নির্ধারিত হয়,তা বিশ্লেষণে  কালব্যয় বৃথা। যে অঙ্কের সমাধানে  আপনার  ভূমিকা নেই , তার  ফলাফল বদলানো আপনার পক্ষে  অসম্ভব। হ্যাঁ অসম্ভব , শুধু আভাস কেন , তারিখ- ক্ষণ-নাম-কারণ  জানলেও অসম্ভব।

গিনি : আপনার কি বিশ্বাস  সব অঙ্কের সমাধান সঠিক ? হিসাব নির্ভুল ?

সময় : তা তো বলিনি।  নিজের সাথে দাবা খেলেছেন কখনো ? দাবার চালে ভুল তো হতেই পারে , সেক্ষেত্রে ভুল বিচারই বলুন বা দান  শুধরানোর দায়িত্ব কিংবা নিজের করা ভুলেরই  সদ্ব্যবহার  , সবটা দাবাড়ু নিজেই করে থাকেন । খেলা শেষে নিশ্চই কোনো জটিল নিয়মে দানের কার্য কারণ ব্যখ্যা হয়  তার মস্তিষ্কে , তার প্রভাবও হয়তো পরের খেলায় প্রতিফলিত হয় , যেখানে দাবাড়ু আরও প্রখর , আরও সাবধানী।  রাজা মন্ত্রীর সাজানো ছকে  ডুবে থাকলেও  দাবাড়ু জানেন  তা ঘণ্টা কয়েকের খেলা বৈ তো নয় , তাই সে অবিচল , নিরুত্তাপ , হার জিতের হিসাব তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক।

নিজের ভিতরে লুকিয়ে রাখা পুরোনো প্রশ্ন টির থেকে আড়াল সরিয়ে , লৌকিকতা ভুলে অস্থির স্বরে গিনি বলল :  যখন এতো কিছু জানো,এটাও নিশ্চই জানো মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় ? তার ভালোবাসার সম্পর্কগুলো সেখানে তাকে অনুসরণ করতে অক্ষম , কিন্তু তার পূরণ না হওয়া  ইচ্ছাগুলো ! কোনোকিছুর টানেই কি সম্ভব নয় ফিরে আসা ? অন্তত  ফিরতে চাওয়া ! মৃত মানুষটি  তো  সবটা দিয়ে চাইবেই  তার সাথে হওয়া অঘটন  ফেলে আসা  ভালোবাসার মানুষ গুলোর সাথে না হোক,কিন্তু সে ইচ্ছাপূরণে বাঁধ সাজছে তার অকর্মণ্য মেয়েটি । বিশ্বাস করো  , ভীতু সে নয় , কোনোদিন ছিল না। আগেও সে  আসন্ন দূর্বিপাকের   ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল ,আজকে আবার সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। শুধু এটুকু জানি , আজকে আবার কারো  চিরবিদায় নেবার সন্ধিক্ষণ উপস্থিত , এর থেকে বেশী কিছু বোঝার শক্তি যে নেই আমার।

সময় নিজের দুর্ভেদ্য দৃষ্টি স্থির করল গিনির জল ভরা অস্থির চোখ দুটিতে , তারপর কঠিন স্বরে আশ্বাস মিশিয়ে বলল : শান্ত হও গিনি ! অকারণে নিজেকে দায়ী কোরো না  এভাবে , প্রতি সন্ধ্যায় ছাদের অন্ধকারে মৃত মায়ের কাছে ক্ষমা চেও না আর । হঠাৎ হাওয়া বা শুকনো পাতার শব্দে মায়ের আত্মার উপস্থিতি খোঁজা বন্ধ করে দাও ,  এটুকু জেনে রাখো  আয়নার কাঁচ  ভেদ করা প্রতিবিম্বর সাধ্যের বাইরে। তবুও  নাড়ির টান তার নিজের জায়গায় অবিচল , তার ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট , যা তোমার বোঝাটা  ভীষণ জরুরি –  আগে যা ঘটেছে ভবিষ্যতে তা আবার ঘটবে।  কাছের বা দূরের কারো সাথে, আজ  যা তোমার  সাথে , কাল  তাই  অন্যের  সাথে  , হয়তো স্থান টা অন্য , ধরণ টা অন্য ,  কিন্তু ঘটনাটা এক , তা ঘটবে, ঘটবেই।  তাই যে এতদিন হয়ে এসেছে , তাই যে নিয়ম। তুমি যার থেকে পালাতে চাইছো ,তার থেকে পালানো যায় না,কারণ সেই যে সত্যি , সেই যে মুক্তি।

গিনি :আর  কখনো দেখা হবে না , তাই তো  ? আদরে ভেজা  গলার স্বর টা আর কখনো শোনা হবে না আমার । কি যে সুন্দর গান গাইতো মা!পুরো গানটা সেদিন শোনা হয়নি , প্রথমদুটো  লাইন গাওয়ার পরই গাড়িটা …

সময় :অপেক্ষান্তে তোমার সত্ত্বা তার থেকে যখন ভিন্ন থাকবেনা , তখন দেখার প্রয়োজন যে হবে না গিনি ! সে না হয় পরের কথা , এখনকার হিসেবে বলছে   তুমি তো মৃত মায়ের বাকি থাকা আদরটুকু  পেয়েছো নতুন মায়ের থেকে , কতজনের তো পুরোটাই বাকি থেকে যায় , পাওয়া হয় না কিছুই , তাদের দাবী কি কম !

গিনি : নাহ ! কম নয় , বরং বেশি। সেই দাবী পূরণের গুরুদায়িত্ব যার ,  তার ক্ষমতায় থাকলে আমাকে যেন শুধু একটু সময় ভিক্ষা দেন , নিজেকে শক্ত করার , নতুন যন্ত্রণা সহ্যের শক্তি সঞ্চয় করার। জানিনা তা সম্ভব কিনা , তবুও আজ না চেয়ে থাকতে পারলাম না যে!

সময় : সব  ইচ্ছা না হলেও কিছু ইচ্ছা তো পূরণ হয় বলেই জানি। আমি এখন আসি গিনি! কিছু জরুরি কাজ বাকি আছে।  তুমি দিদার সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা ভুলো  না কিন্তু।

গিনি : সত্যি ! অনেক কথা বলে দেরী করে দিলাম খুব ! আসলে আমি আর পারছিলাম না , একটা ভীষণ ভয় , অদেখা কালো দেওয়াল..কথাগুলো না বললে ..। জানিনা মাত্র কয়েকদিনের আলাপে আমার থেকেও বেশি করে আমার পরিস্থিতির জটিল  না বলা সত্যি গুলো  বোঝা কিভাবে সম্ভব হল তোমার পক্ষে,  ধন্যবাদ।

সময় অল্প হেসে বলল : ধন্যবাদ ছাদবেলা কে ,  সৌজন্যের “আপনি”  কে বন্ধুত্বের “তুমি” তে করার জন্য । কেউ প্রথম আমার বন্ধু হল কিনা।

গিনি র কানে পৌঁছলো না সময়ের শেষ কথাগুলো , চিন্তার গভীরে তলিয়ে গেল সে। হঠাৎ বাবার ডাকে চমক ভাঙল তার। দ্রুত পায়ে নিচে এসে দ্যাখে লজেন্স কে ঘিরে বাবা মায়ের উৎকন্ঠা। লজেন্স গিনির প্রিয় কুকুর , গত মাসে ওর লিভারের ছোট অপারেশন হয়েছে  , তারপর থেকে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে  ওকে তরল খাবারই দেওয়া হচ্ছে  , ওর পক্ষে শক্ত খাবার হজম করা সম্ভব হবে না আরো দুমাস । সন্ধ্যেবেলা , সময়কে ভিতরে নিয়ে আসার পরে গিনির বাবা বাইরের দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন  , সেই ফাঁকেই লজেন্স বাইরে বেড়িয়ে বাগান থেকে কিছু একটা খেয়ে এসেছে ,যার ফলে তার এই অবস্থা। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পরছে  ওর  শরীর , ডাক্তারকে ফোন করা হয়েছে , তিনি এখনই ওকে পশু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

হাসপাতালের চেয়ারে বসে সেই ভয়ানক সত্যি শোনার অপেক্ষা , গিনি চোখের জল বাঁধ মানছে না , ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে  , সময়ের বলা কথাগুলো তার কানে  বাজছে বারবার ,”প্রত্যেকের জীবনসীমা একটি জটিল অঙ্ক কষে নির্ধারিত হয়,তা বিশ্লেষণে  কালব্যয় বৃথা। যে অঙ্কের সমাধানে  আপনার  ভূমিকা নেই , তার  ফলাফল বদলানো আপনার পক্ষে  অসম্ভব।” লজেন্সকে যে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে , ছোট্টবেলা থেকে সে তার ছায়া সঙ্গী।  গিনি আর কিচ্ছু ভাবতে পারছে না , সব কিছু হারিয়ে যাচ্ছে তার।  মায়ের কোলে মুখ গুঁজে গুমড়ে উঠল সে।

ডাক্তারের গলার  কেঁপে উঠল ওরা তিনজন , ” লজেন্স ভালো আছে , কাগজেরটুকরো খেয়েছিল বলেই এযাত্রায় প্রাণ রক্ষা ! বাকি দুমাস বকে পাথর রেখে হলেও বেঁধে রাখবেন ওকে।”পর্ব তিন সেই রাত টা  ঘুমন্ত  লজেন্সের পাশে হাসপাতালে  কাটিয়েছিল গিনি। লজেন্সের জিভের আদরের ঘুম ভাঙার নিয়ম পরদিন সকালেও যথাসময়ে পালন হল। হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে লজেন্সকে নিয়ে ফিরতে ওদের দুপুর হয়ে গেল। চটপট স্নান করে তৈরী হয়ে নিল গিনি। মা কে “আসছি “বলে দ্রুত পায়ে রওনা দিল আলুভাজা দিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। কড়া নাড়তেই  হাসিমুখে দরজা খুলে  দাঁড়াল তার  ছোটবেলার মুশকিল আসান – আলুভাজা দিদা।গিনি অবাক হয়ে বলল ,”একি ! দক্ষিণেশ্বর যাওনি ? মঙ্গলবার মানেই তো নিজের আলু নিজেই  রাঁধার  দিন।”আলুভাজা দিদা হেসে বললেন ,”আহারে ! পিওন দাদা না গেলে কত যেন আসতো আমার রাঁধুনি। আয় ভিতরে আয় ! আর বলিস না,কাল তোর বাড়ি থেকে ফেরার পথে পাথুরে অন্ধকার গলিটায়  হোঁচট খেয়ে সময় এক ভীষণ কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে , কত যে রক্ত তোকে কি বলবো!বাড়িতে ঢুকেই   আমাকে বলল , আমি যেন এ নিয়ে কোনো না চিন্তা করি ,  এসব নাকি হয়েই থাকে। ভাবতে পারিস  তুই ! ছেলের  অটল  জেদ , জ্ঞানের বুলি ফুটিয়ে  বলে “সময়ের কাছে সব ক্ষত মেলাতে বাধ্য সে তা যত ভয়ানক ই হোক না কেন।” উপায়ান্তে  নিজের মরা মুখের দোহাই দিয়ে কমল ডাক্তারের বাড়িতে নিয়ে গেলাম ছেলেকে । পাথর কুচি বের করতে গিয়ে পায়ের তলার কিছুটা মাংস কেটে বাদ দিয়েছে ডাক্তার ।  কি প্রচন্ড সে ছেলের সহ্যশক্তি ! কাটা ছেড়া , এতগুলো সেলাই , তবুও বাবুর ঠোঁটে কষ্টের  ‘রা’ নেইকো মোটে।গিনি :তারপর ?আলুভাজা দিদা : তার আর পর কি ! ধমক দিয়ে ওষুধ খাইয়ে শুইয়ে দিলাম , শিয়রে বসে  ছিলাম সারারাত , ডাক্তার যা বলেছিল ঠিক তাই!মাঝরাত থেকে ধুম  জ্বর , ভোরের দিকে যা একটু কমেছে। এই অবস্থায় ছেলেটাকে ফেলে মায়ের দুয়ারে গিয়ে শান্তি পাবো আমি !গিনি : হুম। এখন কি ঘুমোচ্ছে ? একটু দেখা করা যাবে?আলুভাজা দিদা : হ্যাঁ যা না ! ঘুম আছে নাকি ওর ? সেই কোন কাকভোরে থেকে জেগে আছে , আমি ততক্ষণ রান্না ঘরে যাই একটু , দুপুরে খেয়ে যাস কিন্তু।গিনি সিঁড়ি দিয়ে  উঠে যেতে যেতে উত্তর দিল , “আচ্ছা “।ব্যান্ডেজ বাঁধা  পা টিকে বালিশের উপর রেখে খাতা কলমের  হিসাবে মগ্ন ছিল সময়।  গিনিকে  ঘরে ঢুকতে দেখে হেসে বলল , “আরে  গিনি যে !   ইচ্ছাপূরণ হল তাহলে ?গিনি অবাক হয়ে বললো : ইচ্ছাপূরণ ? তুমি  কি করে !সময় তার রহস্যময় হাসি আড়াল করে বলল : ওই যে কাল কি  একটা অদ্ভুত ইচ্ছার কথা বলছিলে , কেন যেন আর একটু সময় দরকার ছিল । এখন  তোমার মুখ ভরে যে আনন্দের রেশ  লেগে আছে  ,হলফ করে বলতে পারি কাল  তা ছিল না। তাই মনে হল কোনো সদ্য  ইচ্ছাপূরণই  কি  এই  হঠাৎ খুশির  কারণ।গিনি : উঁহু ! ইচ্ছাপূরণই বটে। সে কথা পরে হবে , আগে বলো , তুমি এমনটা ঘটালে কি ভাবে !সময় : ঘটনা তো ঘটবার জন্যই ! এমন হোক বা তেমন। আচ্ছা, এবার বলো লজেন্স কেমন আছে ?গিনি : লজেন্স ! তুমি  কি করে জানলেন লজেন্সের শরীর খারাপ ?সময় বিস্ময়ের মুখোশ পরে বলল : শরীর খারাপ ? সেকি কবে থেকে ? কি হয়েছে ওর  ?গিনি : তা না জানলে হঠাৎ লজেন্সের কথা জিজ্ঞাসা করলেন যে !সময় :আসলে দিদার কাছে লজেন্সের কথা এতো শুনেছি , তোমার  বাড়িতে গিয়েও কাল ওর সাথে দেখা হল না , কথাচক্রে ওর খবর জানাও হয়নি , তাই আজ মনে করে জিজ্ঞাসা করলাম।গিনি: মাঝে মাঝে তোমাকে  কেমন ধাঁধার মত মনে হয়  , কিছু যেন আড়াল করছো প্রচণ্ড সাবধানী পদক্ষেপে। আবার কখনো তুমি খুব সহজ  যাকে অবিশ্বাস করতে একবারের জন্যও ইচ্ছা হয় না। তুমি কেমন অন্যরকম , সকলের থেকে আলাদা।সময় : আমি এরকমই , জটিল অঙ্ক নিয়ে কারবার করি বলেই হয়তো। তোমার প্রথম ধারণটা ই ঠিক , আমি জটিল , কঠিন , ধোঁয়াটে , প্রচলিত নিয়মে আমাকে বাঁধা অসম্ভব। দিদার কাছে না এলে আমার বোধহয় কখনো সহজ হওয়া শেখা  হত না।  সে যাক , লজেন্স কেমন আছে বললে না ?গিনি : ভালো আছে এখন , কাল শরীর টা খারাপ করেছিল , ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি , ভেবেছিলাম মায়ের মত….সময় : উফ ! তোমার  ভাবনাটা বড় বেশি , যা ঘটে গেছে  তা তো আছেই  , অথবা যা ঘটেনি  তা নিয়েও। তোমার অজানা হলেও , বিশেষ কারণেই হয়তো মহাকাল ঘটিয়ে থাকে কিছু  রক্তক্ষরণ , স্রষ্টার অনুমতি নিয়ে। তাই পকেটে চক নিয়ে ঘোরাটার পিছনে তোমার ভাবনাটা অমূলক। দাগ হালকাই হোক বা গাঢ় , কোনোটাই হিসেবের বাইরে নয়।গিনি : কাল আমার বাড়ি না গেলে সাদা মোড়কে পা ঢাকতে হত না । এই ভাবনাটা নিশ্চই ভুল নয়।সময় :হুম! হত না , সাথে আরো অনেক কিছুই হত না , আবার অনেক কিছু হয়তো হত।ইঙ্গিত বিশ্লেষণে অনুমানের আচ্ছাদন সরিয়ে  দিল  গিনি  : মানে ?সময়ের ঠোঁটে আবার সেই চেনা রহস্যময় হাসি  : মানে দিদার  চিঠিটা  পৌঁছানো হত না , আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সূত্রপাত  হত না , দিদার রান্নাঘরে জমে থাকা আলুগুলোর জীবনকাল স্বার্থক হত না ।গিনি হাসল না , তার  ভিতরের ঠান্ডা হওয়া পুরোনো ভয় আবার তার কন্ঠ স্বরে  হয়ে উঠল স্পষ্ট  : আর কী যেন হতে পারতো বলছিলেন !..সময় তার দুর্ভেদ্য দৃষ্টি সহজ করল এবার : তোমার চিন্তায় দিদার শরীর আরো খারাপ হত  ,দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে , দিদার কাছে বসে তোমার ছোটবেলার অদ্ভুত কান্ডকারখানা শুনতে হত আমাকেই, শেষমেশ আমার অঙ্কের খাতা , বাকি হিসেব পত্র  তোমার প্রিয় লেকের জলে ভেসে যেত  !”আয়রে মাগো ! সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে যে ! ” সময়কে কিছু যেন আরো বলতে চাইছিল গিনি , কিন্তু দিদার ডাকে থামতে হল থাকে।সময় : যাও ! তোমার অপেক্ষার আলুভাজা তৈরী হয়ে গেছে মনে হয়।গিনি : তোমার  খাবার তো ঢাকাই দেখছি। ঘুম তো পায়না তোমার দিদা বলল , খিদেও  কি ….সময় : খিদে ঘুমের সাধারণ নিয়মচক্রে বাঁধা পরলে হিসাবের খাতা অমিলে ভরে যাবে যে ! মাঝে মাঝে মনে হয় , জটিল অঙ্কের সমাধানই আমার যাবতীয় চাহিদা পূরণ করে ।গিনি : উফ ! আবার সেই কঠিন কঠিন কথা ! আলুভাজার গন্ধে বুদ্ধিটাও আবার ভালো কাজ করে না, তোমার আর হিজিবিজি  অঙ্কের মাঝখান থেকে আমার এখন চলে যাওয়াই সমীচীন।দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে চেঁচিয়ে উত্তর দিল গিনি -“আসছি দিদা! “গিনির চলে যাওয়া নিঃস্পলকে দেখে পুরোনো  হিসাবে মগ্ন হল সময়।